বেলুন এবারে কিন্তু পাহাড় পেরিয়েই নামতে শুরু করে দিলে, নিচে পড়লো বিরাট এক বনভূমির কালো বিস্তার।কোনো-একটা গাছে বেলুনটি বেঁধে রেখে রাত কাটাতে হবে আমাদের, ফার্গুসন সঙ্গীদের তার সিদ্ধান্ত জানালেন, মাটিতে নামা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

সন্ধে হতেই হাওয়া পড়ে গেলো। আকাশের তারা দেখে ফার্গুসন হিশেব করে দেখলেন, সেনেগল নদী থেকে এখনও সাতশো মাইল দূরে আছেন তারা। সেনেগল নদীর ওপর কোনো সেতু নেই, যদি থেকেও থাকে তবে তার খোঁজই বা পাবেন কোথায়, অথচ নদী তাঁদের পেরুতেই হবে এবং পেরুতে হবে এই বেলুনে করেই। ফার্গুসন খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ক্রমশ যেভাবে বেলুন তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, তাতে এই অবস্থায় ঐ মস্ত নদী পেরুবার কথা ভাবা নিছকই এক অমূল কল্পনা। শেষটায় অনেক ভেবে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, শোনো, আমাদের যে করেই হোক এই বেলুনে করেই নদী পেরুতে হবে, কিন্তু এই অবস্থায় বেলুনে করে নদী পেরুবার কথা ভাবাও বাতুলতা। বেলুনকে যাতে আরো হালকা করা যায়, তারই চেষ্টা করতে হবে আমাদের। গ্যাস বাড়াবার যে-সব যন্ত্রপাতি আছে ওগুলোকে এবার খুলে ফেলা যাক, তাতে তো আর কিছু না-হোক অন্তত ন-শো পাউণ্ড ভার কমে যাবে। এ ছাড়া আর কোনো উপায়ই তো আমার চোখে পড়ছে না।

কিন্তু তাহলে আমরা গ্যাস বাড়াবো কী করে? আর গ্যাস ছাড়া তোমার এই আকাশযান উড়তে পারবে নাকি? গ্যাসই তো তার অদৃশ্য ডানা।

অন্যভাবে ওড়াবার ব্যবস্থা করতে হব। ফার্গুসন বললেন, বেলুনের ভেসে থাকার ও বহন করার ক্ষমতা আমি ভালোভাবে হিশেব করে দেখেছি। অল্প-কিছু জিনিশপত্র আর আমাদের তিনজনকে নিয়ে বেলুন এখনও কিছুদূর অব্দি যেতে পারবে। আমাদের তিনজনেরই ওজন এ-ক-দিনের ধকলে অনেক কমে গেছে-কিছুতেই সবশুন্ধু পাঁচশো পাউণ্ডের বেশি হবে না আমরা।

ছোটো-ছোটো অংশে ভাগ করে সব যন্ত্রপাতি খুলে ফেলতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেলো। বড়-বড়ো কাজের চাইতে সাধারণত ছোটোখাটো খুচরো কাজেই সময় বেশি লাগে! কিন্তু কোনো উপায় নেই—এই সময়টুকু দিতেই হলো তাদের, অনিচ্ছাসত্ত্বেও। এইভাবে শেষকালে অনেকখানি হালকা হয়ে গিয়ে বেলুন আবার আকাশে ওড়বার ক্ষমতা ফিরে পেলে।

রাতে সামান্য-কিছু খেয়ে নেবার পর যথারীতি জো আর কেনেডির পাহারা দেবার পালা এলো। স্তব্ধ জ্যোৎস্নাঢাকা রাত। মাঝে-মাঝে ঝাপসা মেঘ এসে পাৎলা এক আবরণ বিছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে তাদের গায়ে, তারপরেই আবার রুপোর পাতের মতো গলেগলে নেমে আসছে নরম আলোর ধারা। তন্দ্রাহীন চোখে সেই নিশুতি রাতের আবছায়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন. ফার্গুসন। ধীরে-ধীরে তার শোরগোল-তোলা ঐতিহাসিক অভিযান শেষ হয়ে আসছে। যতই তিনি এ-কথা ভাবলেন ততই তার মনের ভেতর উত্তেজনার আভাস লাগলো। কী-রকম যেন একটা অস্বস্তি অনুভব করলেন তিনি। রাতের স্তব্ধতায় কী-রকম একটা উশখুশ ভাব ছড়িয়ে আছে যেন। হঠাৎ খুব নিঃসঙ্গ মনে হলো নিজেকে—এই কালো বনের ভেতরে হঠাৎ এই-প্রথম তিনি ক্লান্তি আর অবসাদ অনুভব করলেন-শারীরিক শ্রান্তি নয়, সমস্তটাই মানসিক। ডিক হয়তো ঠিকই বলতে তাঁকে, এখন কিছুদিন ঘরে বসে শান্তভাবে দিন কাটালে হয়। নিজেই তিনি অবাক হয়ে গেলেন নিজের এই ভাবনায়। এতটা অবসাদ কোনো অভিযানের পরেই তিনি কখনও অনুভব করেননি। এটা ঠিক যে অন্যান্য বারেও অভিযানের শেষ পর্যায়ে পোঁছে তিনি এক ধরনের ক্লস্তি অনুভব করতেন, একটু বিশ্রাম করার জন্যে সমস্ত দেহ মন উন্মুখ হয়ে উঠতো; কিন্তু এমনভাবে তা কখনও তাঁকে আচ্ছন্ন করেনি। হয়তো এই কালো বন, তার ঝাপসা রাত্রি আর ছমছমে স্তব্ধতা—সব এখন তার বুকে একসঙ্গে চেপে বসেছে বলেই এমন-সব কথা মনে পড়ছে তার।

হঠাৎ একটা খশ-খশ শব্দ কানে এলো। দূরে তাকিয়ে অন্ধকারে একটু রক্তিম আলোকরেখা দেখতে পেলেন ফাণ্ডসন। দুরবিন তুলে নিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে সাবধানে চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন-কিন্তু সন্দেহজনক আর-কিছুই তার চোখে পড়লো না। দুরবিন নামিয়ে রেখে আবার তিনি তাঁর নিঃসঙ্গ স্মৃতির ভিতর তলিয়ে গেলেন। কেনযে এতকাল তিনি বারেবারে ঘরের আরাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন, এখন যেন তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন। এই স্তব্ধ রাতের ঝাপসা রশ্মিজ্বলা মেঘগুলি যেন তাকে এখন এই বুনো রাতটায় বলে দিলে তার রক্তের এই চঞ্চলতার কারণ। কে যেন এক টানে পর্দা তুলে দিয়ে সব উন্মোচিত করে দিয়েছে তার চোখের সামনে। ছেলেবেলা থেকেই তিনি নিঃসঙ্গ, একা-একেবারে একা, আর সেইজন্যেই তিনি সর্বত্র উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ খুঁজে বেড়িয়েছেন, যাতে কোনোরকমে এই একলা মুহূর্তগুলিকে ভুলে থাকা যায়। এখন তার মনে হলো সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলো, দিগন্ত থেকে দিগন্তে তাঁকে তাড়া করে নিয়ে এলো তার নিঃসঙ্গতা; খ্যাতি পেয়েছেন, বিত্ত, যশ, সম্মান-সব তাকে অকৃপণভাবে দিয়েছে ভাগ্য, কিন্তু সেই স্নেহসূচক পদার্থটি থেকে তাকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, যার অভাবে সবই নিষ্ফল হয়, যাকে বলে মায়ামমতা ভালোবাসা, অন্যকারু সঙ্গে অন্তরঙ্গ কোনো সম্পর্ক। শূন্য চোখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। যথাসময়ে কেনেডিকে ঘুম থেকে তুলে পাহারায় বসিয়ে দিয়ে জোর পাশে শুয়ে পড়লেন। খানিকক্ষণ পরে সুপ্তি এসে তাকে তার সব অভাববোধ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেলো এমন-এক মায়ালোকে যেখানে কোনো সোনার কাঠির ছোঁয়ায় সব হতাশা যেন মুক্তোর মতো ঝলমল করে উঠে অসীমের দিকে বিচ্ছুরণ পাঠিয়ে দেয়।

পাহারা দিতে বসে কেনেডিরও কেন যেন কালো বনের এই ভারি স্তব্ধতাকে বড় অস্বস্তিকর বলে বোধ হলো। মোলায়েম মৃদু হাওয়ায় একটু-একটু করে দুলে উঠছিলো বেলুনের দোলনা। এই দোল কেনেডির চোখে ঘুম মাখিয়ে দিয়ে গেলো যেন—অনেক বার দুই হাতে চোখ কচলে তিনি জেগে থাকার চেষ্টা করলেন, কিন্তু নিদ্রার আকর্ষণ তার চেয়েও বেশি, সে তার মন্ত্র-পড়া অন্ধকারে তাকেও একসময়ে আচ্ছন্ন করে দিলে।

কতক্ষণ যে এভাবে ঘুমিয়েছিলেন, জানেন না। হঠাৎ দোলনার নিচে প্রবল একটি শব্দ হতেই কেনেডির ঘুম ভেঙে গেলো লাফিয়ে উঠে বসলেন, তিনি, আর সঙ্গেসঙ্গে ভয়ে ত্রাসে আতঙ্কে তার সারা মুখ যেন কাগজের মতো শাদা হয়ে গেলো। কে যেন একচুমুকে তার শরীরের সব রক্ত শুষে নিয়েছে। আগুন ধরে গেছে সারা বনে!

আগুন! আগুন। আর্তস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন কেনেডি।

তাঁর সেই আর্তনাদ যেন অনেক, অনেক দূর থেকে এসে পৌঁছুলো ফার্গুসনের কাছে। প্রথমটায় কিছুই বুঝতে পারেননি, আর্তনাদটা ছিলো যেন স্বপ্নেরই মধ্যে, তারপরে যেই তন্দ্রা ও চটকা ভেঙে গেলো, সচমকে এস্ত উঠে তিনি জিগেস করলেন : কী! কী হয়েছে?

আগুন কে লাগালে? ফার্গুসন ফিশ-ফিশ করে জিগেস করলেন।

আর ঠিক এমন সময়ে এক বিলম্বিত কান-ফাটা চীৎকারে মস্ত বনের পরিপূর্ণ স্তব্ধতাটা যেন ছিড়ে, চিরে, ফেঁড়ে গেলো। জংলিদের চীৎকারই তাদের স্পষ্টভাবে বলে দিলে এই ভীষণ আগুনের পেছনে কারা রয়েছে। এটা বুঝতে বাকি রইলো না যে, জংলিরা তাদের জ্যান্ত ঝলসে পুড়িয়ে মারবার জন্যেই অতর্কিতে সারা বনে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

বেলুনের চারদিকে আগুন সাপের মতো তার লকলকে লেলিহান জিভ বাড়িয়ে দিয়েছে। মটমট করে পুড়ে ভেঙে যাচ্ছে ডালগুলো, অদ্ভুতভাবে শব্দ হচ্ছে সবুজ ডালগুলি পুড়তে, পাতাগুলি পুড়ে গিয়ে ফুলকি আর ছাই উড়ছে চারপাশে : বীভৎস আর ভয়ানক একটা দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে চারদিকে। ঢেউয়ের মতো হাওয়ায় কেঁপেকেঁপে উঠছে লাল শিখা, আর রশ্মিগুলো তাদের লাল আভা ছড়িয়ে দিয়েছে তিনজন আরোহী সমেত ভিক্টরিয়ার গায়ে। হঠাৎ এক দমকা হাওয়া সব তাপ আর শিখাকে যেন বেদম তাড়া দিয়ে বেলুনের দিকে নিয়ে এলো।

শিগগির উড়ে পালাই, চলো! কেনেডি তীব্রস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, নয়তো এসো নিচে নেমে পড়ি! তা ছাড়া আমাদের বাঁচবার আর-কোনো রাস্তা নেই।

ফার্গুসন তক্ষুনি দৃঢ় মুঠোয় কেনেডির হাত চেপে ধরলেন, আর ইঙ্গিত অনুযায়ী জো দড়ি কেটে দিয়ে বেলুনকে মুক্ত করে দিলে।

শিখারা সব লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠছে ওপরে, এই বুঝি ছুঁয়ে দিলে বেলুনকে। প্রচণ্ড তাপ আসছে হাওয়ার ঢেউয়ে ঝাপটায়, হিল্লোলে। দড়ি কাটার পর মুহূর্তেই-বেলুন এক ঝাপটায় হাজার ফিট ওপরে উঠে এলো। নিচে থেকে ভীষণ শারগোল উঠলো, এমন ভীষণ, যে এত ওপরেও তার সামান্য রেশ এসে পৌঁছুলো। বেলুন তখন নিরাপদে অনেক উঁচু দিয়ে পশ্চিম দিকে ভেসে চলেছে।