২০. গগনের মাসকুণ্ডলী

গগনের মাসকুণ্ডলী

উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে আমাজন পর্যন্ত চঞ্চল নটিলাস ছুটে এসেছে; কিন্তু আমেরিকার উপকূলের কাছে যাচ্ছে না কখনোই; হয়তো তীরের কাছে যাওয়া বা উপকূলের জাহাজের মুখখামুখি পড়ার কোনো দৈব সুযোগ করে দেয়াও ক্যাপ্টেন নেমোর অভিপ্রেত নয়।

বিশে এপ্রিল বাহামার কাছে দিয়ে সাতশো ফ্যাদম জলের মধ্য দিয়ে ছুটে যাচ্ছিলো নটিলাস, আর তার বৈদ্যুতিক আলোয় কালো জল আলো হয়ে উঠেছিলো।

নেড ল্যাণ্ড যখন আমাকে জানলায় ডেকে নিয়ে গেলো, তখন বেলা এগারোটা বাজে।

দেখুন, কী ভীষণ জানোয়ার?

ভীষণই বটে! যেন কিংবদন্তির পাতা থেকে উঠে এসেছে সমুদ্রের এই অষ্টবাহ ড্রাগন। অতিকায় একটা কালামারি সে, বোধ হয় বত্রিশ ফিট হবে দৈর্ঘ্যে। প্রচণ্ড বেগে সে ছুটে আসছিলো নটিলাস-এর দিকে। নোষে জলে উঠেছে তার সবুজ চোখ দুটি, মাথা থেকেই বেরিয়েছে তার আটটি কদাকার ও ভয়ানক পাশ, গরগনের নাগকুণ্ডলীর মতো মাথা থেকেই তা কিলবিল করে জলে আড়াচ্ছে। তার কঠিন চঞ্চুটা কেবলি খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে—আর ধারালো দাঁতে সাজানো তার কঠিন জিটি লকলক করে বেরিয়ে আসছে। অন্তত পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড ওজন হবে এই সিন্ধুদানবের। ভীষণ রোষে মুহুর্মুহ বদলে যাচ্ছে তার গায়ের রঙ-এই ধূসর, আবার পরমুহূর্তেই লালচে বাদামি।

নটিলাস-এর উপস্থিতিই যে তার এই প্রল রোষের কারণ তা বুঝতে আমাদের দেরি হলো না। আট হাতে সে অড়িয়ে ধরতে চাচ্ছে নটিলাসকে; কাচের ওপাশে বিষম রোষে সে প্রচণ্ডভাবে আছড়াচ্ছে তার অষ্ট পাশ। আর ইস্পাতে-মোড়া জাহাজকে মোটেই আঁকড়ে ধরতে পারছে না বলে আরো ক্রুদ্ধ ও প্রচণ্ড হয়ে উঠছে প্রতিমুহূর্তে।

দৈবই আমাকে এই ভীষণ দানবের সম্মুখীন করে দিলে। এই সুযোগ কিছুতেই নষ্ট করা উচিত হবে না। ভয় জয় করে তাই কাগজ পেন্সিলে তার একটা ছবি আঁকতে বসে গেলুম আমি। ততক্ষণে জানলার ওপাশে আরো কতগুলি সিন্ধুদানবের আবির্ভাব হয়েছে, যেন কোনো বিক্ষুব্ধ মিছিল করে তারা জলের এই মূত জন্তুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে এলো। লোহার চাকায় তাদের চষ্ণুর মুহুর্মুহু আষা শোনা গেলো। গুণে দেখি সংখ্যায় তারা সাত : সবাই ক্ষিপ্তের মতো নটিলাসকে আক্রমণ করতে চাচ্ছে।

হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠেই নটিলাস নিশ্চল হয়ে গেলো।

কল খারাপ হয়ে গেলে নাকি? জিগেস করলুম আমি।

বোধ হয় না, নেড বললে, কারণ নটিলাস তো ভেসেই আছে।

ভেসে আছে বটে, কিন্তু এগোচ্ছে না। চাকা ঘুরছে না আর। পরক্ষণেই ফাস্ট অফিসারকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন ক্যাপ্টেন নেমো। অত্যন্ত গম্ভীর ও চিন্তাভারাতুর তাঁর মুখ। আমাদের দিকে দৃকপাত না-করেই সোজা জানলার কাছে গিয়ে পড়ালেন তিনি—সেই অক্টোপাসগুলোর দিকে তাকিয়ে তার সেই দুর্বোধ্য জটিল ভাষায় কতগুলো নির্দেশ দিলেন তিনি। তারপর জানলার উপর লোহার পর্দা ফেলে দেয়া হলো। ফাস্ট অফিসার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

মাঝখানে অনেকদিন ক্যাপ্টেন নেমোর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। অত্যন্ত বিমর্ষ দেখালো তাকে, ঈষৎ শোকাকুল।।

তখনও ভয়ংকর বিপদটা সম্বন্ধে সচেতন হইনি আমি।

অনেকগুলো অক্টোপাস জড়ো হয়েছে দেখছি। হ্যাঁ, প্রফেসর। আর এদের সঙ্গেই হাতাহাতি লড়তে হবে আমাদের।

হাতাহাতি?

হ্যাঁ, কারণ ওদের শুঁড়ে পেঁচিয়ে গিয়েই নটিলাস-এর চাকা বন্ধ হয়ে গেছে।

কিন্তু—

ওদের শরীর এত নরম যে আমার বৈদ্যুতিক গুলি কোনো কাজেই আসবে না—কারণ কোনো বাধা না-পেলে, ধাক্কা না-লাগলে, ওই গুলি ফাটে না। কাজেই কুড়ল দিয়েই লড়াই করতে হবে আমাদের।

আর হারপুন? নেড যুদ্ধের সম্ভাবনায় লাফিয়ে উঠলো। অবিশ্যি যদি আমার সাহায্য সম্বন্ধে আপনার কোনো আপত্তি না থাকে।

কোনোই আপত্তি নেই, মিস্টার ল্যাণ্ড।

নটিলাস ততক্ষণে জলের উপর ভেসে উঠেছে। নটিলাস-এর একটি মাল্লা বহিদ্বার খুলে দিলে। সঙ্গে সঙ্গে লোহার সিঁড়ি বেয়ে কিলবিল করে নেমে এলো একটা মস্ত সাপের মতো শুঁড়–কিংবা তাকে বাহুও হয়তো বলা যায়; আর মাথার উপর আরো কতগুলো শুঁড় দুলতে লাগলো। কুড়লের এক ঘায়ে সেই ভয়ংকর বাহুটা দু-টুকরো করে দিলেন ক্যাপ্টেন নেমো।

প্ল্যাটফর্মে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় ভীষণ কাণ্ড হলো! আচম্বিতে একটা শুঁড় নেমে এসে সিঁড়ির কাছের সেই মাল্লাটিকে পাকে পাকে পেঁচিয়ে নিয়ে এক হ্যাচকা টানে বাইরে তুলে নিয়ে গেলো। চীৎকার করে উদ্যত কুঠার হাতে ক্যাপ্টেন নেমো তার অনুসরণ করলেন। আমরাও পিছন পিছন উঠে এলুম।

সেই ভীষণ দৃশ্য ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। শুঁড়ে পেঁচিয়ে সেই হতভাগ্য লোকটাকে শূন্যে দোলাচ্ছে সেই ভয়ংকর অক্টোপাস আর সেই অবস্থাতেই আর্তকণ্ঠে সে চেঁচিয়ে উঠছে : বাঁচাও বাঁচাও? ফরাসি ভাষায় সেই আর্তনাদ শুনে আমি চমকে উঠলাম। নটিলাস-এ এতদিন তাহলে আমি ছাড়া আরোএকজন ফরাসি ছিলো, আর আজ মৃত্যু তার উদ্দেশে থাবা বাড়িয়েছে!

আট বাহুর ভীষণ বাঁধনে লোকটা হারিয়ে গেলো। কে তাকে ওই মরণআলিঙ্গন থেকে বাঁচাব?

ক্যাপ্টেন নেমে কুঠার তুলে লাফিয়ে পড়লেন অক্টোপাসটার উপর, আরেকটা বাহু ছিন্ন করে দিলে তার কুঠার। ফাস্ট অফিসারটি তখন অন্য অক্টোপাসগুলোর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে চলেছেন। তিনজনে নেড, কোনসাইল আর আমি পাগলের মতো কুঠার চালাচ্ছি তখন। সাতটা বাহু কেটে ফেলার পরও শেষ বাহুটায় লোকটাকে শূন্যে তুলে ধরে নাড়াচ্ছে সেই সিন্ধুদানব। কিন্তু যেই ক্যাপ্টেন নেমো তার দিকে ছুটে গেলেন, অমনি তার পেটের থলি থেকে ঘন কালো রঙের একরকম কালি উগরে দিলে সেই অক্টোপাস, আমাদের চোখ যেন অন্ধ হয়ে গেলো। যখন দৃষ্টি ফিরে পেলুম ততক্ষণে সেই কালামারি জলের তলায় পালিয়েছে, আর সেই হতভাগ্য মাল্লাটির কোনো চিহ্নই নেই আশপাশে।

রাগে ক্ষোতে জ্ঞানশূন্তের মতো বাকি কালামারিগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লুম আমরা। সেই সর্পকুণ্ডলীর মত বাহুগুলো ছিটকে পড়তে লাগলো কুঠারের ঘায়ে, রক্তে আর কালো কালির স্রোতে প্ল্যাটফর্ম স্পেসে গেলো। কিছুতেই যেন সেই ভীষণ শুঁড়ের অরণ্য ফুরোয় না-যেন ছিন্ন বাহুমূল থেকেই নতুন বাহু গজাচ্ছে বারে বারে। নেড ল্যাণ্ড তার হারপুন আমূল বসিয়ে দিচ্ছে কালামারিগুলোর সবুজ চোখে। কিন্তু হঠাৎ এক সময়ে একটা শুঁড় তাকেও পেঁচিয়ে ধরলো কঠোরভাবে, আতঙ্কে ও বিভীষিকায় আমার বুক যেন তখন ফেটে যাবে, কিন্তু ক্যাপ্টেন নেমোর কুঠার তড়িৎবেগে দু-টুকরো করে ফেললো সেই ভীষণ শুঁড়, আর মৃত্যু পাশ থেকে বেরিয়ে এসে নেড় তার হারপুন আমূল বসিয়ে দিলে সেই কালামারির তিন হৃৎপিণ্ডে।

শোধবোধ হলো, ক্যাপ্টেন নেমো বললেন নেড ল্যাণ্ডকে।

নেড কোনো কথা না-বলে হারপুন চালাতে চালাতেই একটু নুয়ে তাঁকে অভিবাদন করলে।

কেউ যদি জিগেস করে তোমার জীবনে ভীষণতম পনেরো মিনিট কবে এসেছিলো, তাহলে এই ভয়ংকর যুদ্ধের কথাই বলব আমি। পনেরো মিনিটের মধ্যেই সব তছনছ হয়ে গেলো। অক্টোপাসগুলো বিধ্বস্ত হয়ে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়লো, আর ঢেউয়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলে তাদের ছিন্ন দেহ। আর ক্যাপ্টেন নেমো রক্ত মেখে ঘেমে নিশ্চল পঁড়িয়ে রইলেন প্ল্যাটফর্মে, যে-সমুদ্র তাঁর একজন অনুচরকে গিলে খেলো তার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ বেয়ে অবোরে জল গড়িয়ে পড়লো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *