১.০৮ কানপুর পেরিয়ে

১.০৮ কানপুর পেরিয়ে

একদা অযযাধ্যা ছিলো ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রদেশগুলির অন্যতম; এখন তার গুরুত্ব কিঞ্চিৎ কমেছে বটে, কিন্তু সমৃদ্ধি রয়েছে আগের মতোই। জেনারেল উট্রামের চক্রান্তের ফলে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ শেষ পর্যন্ত যখন ১৮৫৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঈস্ট ইণ্ডিয়া কম্পানির আনুগত্য স্বীকার করে নিলেন, তখন থেকেই বিক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছিলো। তাই কয়েকমাস পরেই লক্ষ্ণৌ আর কানপুর প্রচণ্ডভাবে ফেটে পড়েছিলো। লক্ষ্ণৌ অযোধ্যার রাজধানী, কিন্তু কানপুর এই প্রাচীন রাজ্যের একটি প্রধান নগর।

বিপুল নীলখেত পেরিয়ে গঙ্গার ডান তীর ধরে আমরা কানপুর পৌঁছলুম ২৯শে মে সকালবেলায়। কানপুরের অধিবাসীর সংখ্যা প্রায় ষাট হাজার, আয়তন মাইল পাঁচেক। শহরে একটি সামরিক ক্যানটনমেন্ট আছে—প্রায় সাত হাজার লোক থাকে সেখানে। কানপুর অত্যন্ত পুরোনো শহর হলে কী হবে, সেই অর্থে কোনো দ্রষ্টব্য স্থান এখানে নেই। তবু তিরিশে মে সকালবেলায় আমরা আমাদের শিবির ছেড়ে শহরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লুম : ব্যাঙ্কস, ক্যাপ্টেন হুড আর আমি, আর তদুপরি সঙ্গে রয়েছেন সার এডওয়ার্ড মানরো ও সার্জেন্ট ম্যাক-নীল।

আর যেতে-যেতেই ব্যাঙ্কস আমাকে কানপুরের বিক্ষোভের কথা শোনালে। কেমন করে মিরাট আর দিল্লির বিদ্রোহের কথা পৌঁছুতেই কানপুর বারুদের মতো ফেটে পড়লো, কেমন করে কানপুরের দীর্ঘ অসন্তোষ ও রোষ বিদেশীদের বিন্দুমাত্র ক্ষমা করেনি, কেমন করে বিবিঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো নারী ও শিশুদের—যাদের মধ্যে একজন ছিলেন লেডি মানরো ও তার মা, আর কেমন করেই বা জেনারেল হ্যাভলকের বাহিনীর আগমন-সংবাদ পেয়ে বিবিঘরের বন্দীদের উপর নতুন করে নিগ্রহ ও অত্যাচার শুরু হয়। রক্ত-রাঙা সে-সব দিন; শুনতে-শুনতে যেন অনুভব করলুম নিয়তির কোনো রক্তরাঙা সংকেত বিপদ জ্ঞাপন করে ভেসে উঠলো আমার সামনে। ব্যাঙ্কস আরো বলেছিলো যে কর্নেল মানরো যখন দু-দিন পরে কানপুর পৌঁছুলেন তখন কোনোই চিহ্ন দেখলেন না তাঁর স্ত্রী ও শাশুড়ির। আর তারপর থেকেই মানুষটা যেন কেমন হয়ে গেলেন, নানাসাহেবের উপর প্রতিশোধ নেয়া ছাড়া আর-কোনো কাজই যেন তার করার রইলো না।

এই কানপুরে পৌঁছেই মানবরা প্রথমে গেলেন তাঁদের বাংলোবাড়ির দিকে, যেবাড়িতে লেডি মানরো তার শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন একদা, সে-বাড়িতেই বিক্ষোভের সময় সেই প্রবল ভীষণ রণরোলের মধ্যে অস্বস্তিতে ও আশঙ্কায় তিনি দিন কাটিয়েছিলেন। শহরতলির ধারেই এই বাড়িটা, ক্যানটনমেন্টের খুব কাছে। কিন্তু এখন ভাঙাচোরা ইটকাঠ ছাড়া আর কিছুই নেই সেখানে; সমস্তই জীর্ণ, পরিত্যক্ত ও বিমর্ষ–যেন একটা হানাবাড়ি; আগাছা গজিয়েছে চারপাশে, দেখাশোনা না-করার ফলে সমস্তটাই যেন কোনো চিরস্থায়ী দুঃখের প্রতিভাস এনে দেয়। আর এই ভগ্নস্তুপের মধ্যেই মানরো নীরবে ঘুরে-ঘুরে বেড়ালেন ঘণ্টাখানেক, যেন হারানো দিনগুলো আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছেন তিনি বারে-বারে, কিন্তু তাঁর হাত এড়িয়ে সেগুলো যেন বারে-বারেই পালিয়ে যাচ্ছে। শেষটায় যেন এক হ্যাচকা টানে নিজেকে তিনি ছিনিয়ে আনলেন সেই স্মৃতিজাগা ভাঙাচোরার মধ্য থেকে, দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন বিবিঘরের দিকে—যেখানে, শোনা যায়, লেডি মানরোকে নাকি শেষ দেখা গিয়েছিলো। আর সেইখানে শোকে ও বেদনায় মোহ্যমান ও আর্ত মানুষটির মুখে যেন সান্ত্বনাহীন কোনো আকুলতা ফুটে উঠলো। শেষটায় আমরা অনেক চেষ্টার পরে সার এডওয়ার্ডকে ওই ভয়ংকর জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে এলুম। কিন্তু তার আগে একবার একটা বড় পাথরের গায়ে আমার চোখ পড়লো, কে যেন সঙিনের খোঁচায় সেই পাথরের গায়ে ছোট্ট কিন্তু অগ্নিগর্ভ একটি কথা খোদাই করে গেছে; সারা রাস্তা এই কথাগুলো আমার মনে হানা দিলে : কানপুর মনে রেখো।

শিবিরে যখন ফিরে এলুম, তখন এগারোটা বাজে। সবাই কী-রকম স্তব্ধ হয়ে আছে, যেন একটা চাপা শোকের ছায়া সকলেরই মুখে। তাড়াতাড়ি এখন কানপুর ছাড়তে পারলে যেন বেঁচে যায় সবাই। কিন্তু বেহেমথের এঞ্জিনের দু-একটা ছোটোখাটো মেরামতির কাজ বাকি ছিলো, সেগুলো সারতে-সারতে একদিন লেগে যাবে। ফলে বাকি দিনটুকু আমার আর কিছুই করণীয় ছিলো না, সেইজন্যেই আমি ঠিক করলুম একাই গিয়ে লক্ষ্ণৌ থেকে ঘুরে আসবো। কারণ ব্যাঙ্কস ঠিক করেছিলো কিছুতেই আর লক্ষৌ হয়ে যাবে না—সেখানে গেলে সার এডওয়ার্ড মানরো হয়তো আরো-বিমর্ষ হয়ে পড়বেন বিদ্রোহের যাবতীয় স্মৃতি দেখে।

দুপুরবেলায় একটি লোকাল ট্রেন ধরে আমি অযোধ্যার এই রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হয়ে পড়লুম। সপ্তদশ শতকের সব স্থাপত্য, হিন্দু, চৈনিক, আরব্য ও ইওরোপীয় স্থাপত্যের মিশোলই লক্ষ করা যায় প্রধানত। কাইজারবাগ, ফরিদাবাগ, সেকেন্দ্রাবাদ, হজরত গাউজের বুলভার, কৈফিয়াতুল্লার কেল্লা-এইসব বিখ্যাত জায়গাগুলো সরেজমিন দেখে আমি কানপুর ফিরে এলুম।

পরদিন ৩১শে মে আবার আমাদের যাত্রা শুরু হলো।

অবশেষে, বললে ক্যাপ্টেন হুড, সত্যিকার যাত্রা শুরু হলো আমাদের–এলাহাবাদ, কানপুর, লক্ষ্ণৌ তো নিছকই কেবল ফাঁকা আওয়াজ-আসল মজা তো জঙ্গলে, সেখানে বাঘ-সিংহ-হাতি-গণ্ডার-গণ্ডায় গণ্ডায় ঘুরে বেড়াচ্ছে…

ওর কথায় কান দিয়ো না, মোক্লের, ব্যাঙ্কস বললে, উত্তর-পশ্চিমে আরো কতগুলো খুব নামজাদা শহর আছে—দিল্লি, আগ্রা, লাহোর….

ও-সব ছোটো-ছোটো খুপরিগুলো আবার নামজাদা হলো কবে থেকে? হুড বলে উঠলো, আসল জায়গা তো নেপালের জঙ্গল, ভয়ংকর তরাই-এ-সব। অন্তত আমার মতে তো আজকেই আমাদের সত্যিকার যাত্রা শুরু হলো। বলে, সে চেঁচিয়ে হাঁক পাড়লে, ফক্স!

এই-যে, ক্যাপ্টেন! ফক্স এসে হাজির হলো।

ফক্স! সব বন্দুক, রাইফেল, রিভলভারগুলো সাফসুফ করে রেখে দাও, যাতে ঘোড়া টিপলেই গুলি বেরোয়!

তৈরিই তো আছে সব-টোটাভরা, গুলিভরা, তেল-দেয়া…

সব তৈরি?

সব।

সব আরো-তৈরি করে রাখো তাহলে।

তা-ই করবো তাহলে!

ভেবো না, ফক্স! শিগগিরই তোমার ওই অসমাপ্ত উজ্জ্বল তালিকায় আটতিরিশ নম্বরটি যোগ হয়ে যাবে।

আটতিরিশ নম্বর! হঠাৎ ফক্সের চোখের তারা আলো হয়ে উঠলো। তার জন্যে আমি যে-ছোট্ট গোলাটা তুলে রেখেছি, সে-সম্বন্ধে তার নালিশ করার কিছুই থাকবে না।

যাক। সব ঠিকঠাক করে রাখো!

ফক্স একেবারে গোড়ালি ঠুকে সামরিক কায়দায় অভিবাদন করে চলে গেলো আবার তার বন্দুকের ঘরে!

অযোধ্যা আর রোহিলখণ্ডের পশ্চিম দিয়েই নেপালের উদ্দেশে যাচ্ছিলুম আমরা; পথে নদীনালা বর্জন করার জন্যে একটু ঘুরতে হবে বটে, কিন্তু তাতে বেহেমথের জ্বালানি জোগাড় করার অনেক সুবিধে হবে—কারণ এদিকটায় বন-জঙ্গল নেহাৎ কম নেই।

এখানে বলা ভালো যে কানপুর ছাড়ার পর থেকেই কর্নেল মানবরা আবার অত্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে উঠেছেন; আগের মতোই কথা বলেন খাবার টেবিলে, আমাদের আড্ডা ও তর্কাতর্কিতে যোগ দেন—অথচ এটাও ঠিক যে ভিতরে ভিতরে নেপালের অরণ্যদেশ তাকে যেন চুম্বকের মত টানছিলো। মাঝে-মাঝে আমার বিষম সন্দেহ হতে নানাসাহেবের নিধনসংবাদ তিনি মোটেই বুঝি বিশ্বাস করেননি; অবশ্য এ-সম্বন্ধে তিনি কিছু মুখ ফুটে বলতেন না বলে আমরাও কোনো উচ্চবাচ্য করতুম না।

জুন মাসের তিন তারিখে আচমকা ভীষণ গরম পড়লো; এমন অসহ্য গরম এর আগে কিন্তু কখনোই পড়েনি। রাস্তার দু-ধারে যদি মস্ত-সব গাছপালা মাঝে-মাঝে ছায়া না-ছড়িয়ে দিতো, তাহলে সেই হাওয়াহীন লু-বওয়া গরমে আমরা বোধহয় জ্যান্তই ঝলসে যেতুম। হয়তো এত গরম বলেই জন্তুজানোয়াররা এমনকী রাত্তিরেও তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোয় না—অন্তত কোনো শিকার না-পেয়ে হুড গজগজ করে যা বললে, তার সারমর্ম প্রধানত ছিলো তা-ই।

পরদিন সকালবেলায় পশ্চিম দিগন্ত কেমন যেন অস্বচ্ছ ও ঝাঁপসা দেখালো, আর তারপরেই আমরা সেই আশ্চর্য দৃশ্য দেখলুম, লোকে যাকে মরীচিকা বলে—আকাশের গায়ে যেন ফুটে উঠলো কোনো মিনার-গম্বুজওলা আশ্চর্য প্রাসাদের সারি, যা আসলে নিছকই দৃষ্টিরই বিভ্রম ছাড়া আর-কিছু নয়। এখানকার মরীচিকায় খেজুরকুঞ্জের ছায়াঘেরা টলটলে দিঘিজল দেখা যায় না, বরং দেখা যায় এইসব আকাশপ্রাসাদ, আর নীল-নীল মেঘের চুড়ো। আর সঙ্গে-সঙ্গে পাঁচ-ছশো বছর আগেকার মধ্যযুগের কথা মনে পড়ে গেলো আমার। এই বিভ্রমকে এমনই সত্যি ঠেকে, এইসব মস্ত কেল্লাকে এমনই চেনা ঠেকে যে মনে হয় আমরা বুঝি মধ্যযুগের-ইওরোপের কোনো বীরপুরুষের দুর্গপ্রাকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আর বেহেমথ যত সেদিকে এগিয়ে গেলো, ততই সেই আকাশেজেগে-ওঠা প্রাসাদনগরী ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো; পূর্ব দিগন্ত থেকে উঠলো সবিতা, আর সাত ঘোড়ার, রথ যত ছুটে আসতে লাগলো তত তার পায়ের তলায় গুড়িয়ে গেলো সেই প্রতিসরিত মায়ানগর।

এর মানে কী, বুঝতে পারছো তো, মোক্লের? ব্যাঙ্কস বললে, ঋতু পরিবর্তনের পূর্বাভাস। আবহাওয়া বদল হবে এবার। শিগগিরই বর্ষা শুরু হবে। আমার মনে হয় দু-এক দিনের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মেঘ দেখতে পাবো আমরা।

ব্যাঙ্কস ভুল বলেনি। সন্ধেবেলাতেই পশ্চিম দিগন্ত মেঘে ও বাষ্পে অস্পষ্ট ও আবছা হয়ে গেলো; বিদ্যুৎ-ভরা এই কালো-মেঘ দেখতে-দেখতে এগিয়ে আসে মৌশুমিতাড়িত হাওয়ার সঙ্গে, আর তুলকালাম প্রচণ্ড ঝড় চারপাশে হুলুস্থুল বাধিয়ে দেয়।

সারাদিন ধরে এই বাষ্পমেঘময় আবহাওয়ারই বিষম প্রস্তুতি চলেছিলো; ঘুরেঘুরে হলুদ বালির স্তম্ভ উঠে যাচ্ছিলো আকাশে, আর আলো পড়ে সেই ঘূর্ণমান বালুস্তম্ভ ঝলসে উঠছিলো বারে-বারে, মনে হচ্ছিলো আমরা যেন কোনো নিরীহ ও নির্দোষ অগ্নিকুণ্ডের মধ্য দিয়ে চলেছি, যা পোড়ায় না কিছুই, শুধু যেন চারপাশ আলো করে দেয়।

সন্ধে সাতটা নাগাদ একটি ঝুরিনামা ছায়াঢাকা অশ্বথকুঞ্জের কাছে এসে বেহেমথ থামলো। এইখানেই ছায়ায় রাত কাটানো হবে বলে ঠিক করা হলো। পরদিনও যদি এ-রকম বিষম গরম পড়ে, তাহলে আস্ত দিনটাই কাটানো হবে এখানে, পরে রাতের বেলায় অপেক্ষাকৃত কম গরমের মধ্যে আবার রওনা হওয়া যাবে।

ক্যাপ্টেন হুডের মৎলব কিন্তু ছিলো অন্যরকম।ফক্স! গৌমি! এখন তো মাত্র সাতটা বাজে-অন্ধকার ঘন হবার আগেই—এসো, জঙ্গল থেকে একটু ঘুরে আসি। আপনিও আসবেন না কি, মঁসিয় মোক্লের?

আমি কোনো উত্তর দেবার আগেই ব্যাঙ্কস বলে উঠলো, হুড, তুমি বরং আজ আর শিকারের খোঁজে না-ই বা বেরুলে। লক্ষণ মোটেই ভালো ঠেকছে না আমার। ঝড় এসে গেলে শেষকালে কিন্তু ফিরে আসতে বিস্তর বেগ পাবে। বরং কাল যদি আমরা এখানে থাকি, তখন না-হয় বেরিয়ো—

বাধা দিয়ে হুড বললে, কিন্তু কাল তো দিনের আলো থাকবে। রাতের অন্ধকার ছাড়া কি আর শিকার কখনও জমে নাকি?

তা আমি জানি, হুড। কিন্তু আজকের রাতটা কেন যেন মোটেই সুবিধের ঠেকছে

আমার। তবু যদি যেতে চাও তাহলে বেশি দূরে যেয়ো না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বনের মধ্যে ঘুটঘুট্টে অন্ধকার হয়ে যাবে তখন হয়তো ফেরবার পথ গুলিয়ে ফেলবে।

না, না, তোমার অযথা ভয়ের কিছু নেই। এখন তো মাত্র সাতটা বাজে–আমি দশটার মধ্যেই ফিরে আসবো, কথা দিচ্ছি।

ফক্স আর গৌমিকে নিয়ে তক্ষুনি ক্যাপ্টেন হুড বেরিয়ে পড়লো; আর অমনি পরক্ষণেই গাছের আড়ালে তাদের আর দেখা গেলো না। সারা দিনের গরমে আর ধকলে আমি এতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলুম যে আমি আর তাদের সঙ্গে গেলুম না।

বেহেমথের এঞ্জিনের আগুন কিন্তু নিবিয়ে ফেলা হলো না; কোনো জরুরি অবস্থা দেখা দিলে যাতে চটপট রওনা হয়ে পড়া যায়, সেইজন্যে ব্যাঙ্কস এঞ্জিনকে সম্পূর্ণ নিবিয়ে ফেলতে নিষেধ করেছিলো।

বেশ সুন্দর সন্ধেটা। আমরা একটা ছোট্ট ঝরনার ধারে গিয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগলুম। পশ্চিমের জ্বলন্ত সূর্য ছায়া ফেলেছে ঝরনার জলে; আর অদ্ভুত এক গাঢ়নীল রঙে ছুপিয়ে দিয়েছে আকাশ; ঘন বাষ্পমেঘে-ঢাকা একটা পুরু পর্দা যেন ঝুলে আছে পৃথিবীর উপর; হাওয়া নেই, তবু ওই মেঘগুলো ক্রমেই ধীরে এগিয়ে আসছে অলক্ষিতে—যেন কোনো আপন চলার ছন্দেই গভীর গম্ভীর বেগে তারা ধাবমান।

আটটা পর্যন্ত ঝরনার ধারে শুয়ে-বসে আড্ডা দিলুম আমরা, কেবল ব্যাঙ্কস মাঝেমাঝে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলো। শেষকালে যখন অশ্বথ গাছের তলায় অন্ধকার জমাট বেঁধে নিরেটকালো হয়ে গেলো, তখন আমরা উঠে পড়লাম। সেই ঝুলন্ত ঘন মেঘ তখন একেবারে কাছে এসে পড়েছে। আকাশ এত গম্ভীর শান্ত যে কেমন থমথমে ঠেকছে। একটাও পাতা কাপছে না–সব স্থির, অনড় ও নিষ্কম্প। কেমন যেন একটা ভয়-ধরানো ভাব আছে চারপাশে—এই গুম-হয়ে থাকাটা যেন কোনো অচিকিৎস্য ব্যাধির লক্ষণ; যেন ছিলা টান করে বসে আছে সমস্ত আবহাওয়া—হঠাৎ টংকার দিয়ে উঠবে।

আর, সত্যিই, টংকার আসন্ন ও অবশ্যম্ভাবী। ফুলে ফেঁপে উঠছে মেঘমালা, যেন কোনো উদ্যত অতিকায় জন্তু পেশী টান করে নেবার আগে আড়মোড়া ভেঙে নিচ্ছে। ছেঁড়া-ছেড়া মেঘগুলো একটা-আরেকটার দিকে চুম্বকের টানে এগিয়ে যাচ্ছে-তারপর একসময় একটানা নিকষ কালো মেঘ ছাড়া মাথার উপর আর-কিছু রইলো না।

সাড়ে-আটটার সময় সেই কালো পর্দা চিরে ফেঁড়ে টুকরো-টুকরো করে বিদ্যুতের শিখা লকলক করে উঠলো; গুনে-গুনে ঠিক পয়ষট্টি সেকেণ্ড পরে বাজ ফেটে পড়লো ভয়ংকর, আর তার গম্ভীর গুমগুমে আওয়াজ যেন আমাদের লক্ষ্য করে ভীষণ বেগে গড়িয়ে এলো।

ষোলো মাইল দূরে-ঘড়ি থেকে চোখ তুলে বললে ব্যাঙ্কস, ঝড় শুরু হলো। কিন্তু একবার যখন খ্যাপা হাতির মতো শিকল খুলে বেরিয়েছে তখন দেখতে-না-দেখতে

এখানে এসে পড়বে। আর দেরি নয়, এক্ষুনি ভিতরে চলো সবাই।

কিন্তু ক্যাপ্টেন হুড? তার কী হবে? সার্জেন্ট ম্যাক-নীল জিগ্যেস করলে।

বই তো তাকে ডাক দিয়েছে, বললে ব্যাঙ্কস। বুদ্ধিমানের মতোই সে বাজের হুকুম তামিল করবে বলেই আশা করি।

আমরা বেহেমথের বারান্দায় এসে বসলুম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *