১. ছেলের নাম সান্তিয়াগো

১.০১

ছেলের নাম সান্তিয়াগো। শূণ্য গির্জার বুকে উঠে এল সে ভেড়ার পাল নিয়ে, আকাশ বেয়ে উঠে এল অন্ধকার। কত আগে ভেঙে পড়েছে ছাদ। বিশালবপু এক গাছ উঠেছে আজ সেখানে, যেখানে ছিল ধার্মিকদের আনাগোনা।

রাতটা কাটাবে এখানেই। সব ভেড়া ঢুকছে ভাঙা দরজা দিয়ে। ভাঙা ডালপালা জোগাড় করে সে, যেন পালটা এদিক সেদিক বেরিয়ে যেতে না পারে। এ তল্লাটে নেকড়ের নাম নিশানাও নেই। না থাকলে কী হবে, একবার কী এক নাম না জানা পশু হানা দিল। তারপর বেচারাকে পরদিন সারাটা সময় খরচ করতে হল সেটার খোঁজে।

পরনের ভারি জামাটা দিয়ে মেঝে ঝেড়ে নেয় সে। শুয়ে পড়ে সটান। এইমাত্র পড়ে শেষ করা বইটাই এখন বালিশের কাজ দিবে। নিজেকে শোনায়, এবার ভারি ভারি বই পড়া শুরু করতে হবে। পড়তে বেশি সময় লাগে, শুতে লাগে আরাম।

জেগে উঠে দেখে এখনো আঁধার কাটেনি। উপরে তাকালে দেখা যায় আধভাঙা ছাদ। আর দেখা যায় তারার দল।

আরো একটু ঘুমিয়ে নিতে চেয়েছিলাম আমি, ভাবে সে। সপ্তাখানেক আগে দেখা সেই স্বপ্নটা আবার এসেছে। আবারো ফুরিয়ে যাবার আগেই ঘুম হাপিস।

এখনো ঘুমিয়ে থাকা ভেড়াগুলোকে এবার জাগানোর পালা। হাতে তুলে নেয় লাঠি। যেন কোন অজানা শক্তি তাকে চালায়, চালায় ভেড়ার পালকেও, চালাচ্ছে বছর দুয়েক ধরে, চালাচ্ছে ঘাসের সন্ধানে, পানির খোঁজে।

এরা আমার সাথে এত অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে সময়ের ব্যাপারগুলোও ঠিক ঠিক বোঝে। বিড়বিড় করে সে। একটু ভাবে। ব্যাপারটা ভিন্ন হতে পারে, হয়ত সেই তাদের সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে আস্তে আস্তে।

কিন্তু কোন কোনটা কুঁড়ের বাদশা। উঠতেই চায় না। পুঁতিয়ে চলে। ছেলেটা। আলতো করে। একে একে জাগিয়ে তোলে সবগুলোকে। নাম ধরে ডাকে প্রত্যেককে। তার নিত্যদিনের বিশ্বাস, ওরা তার কথা বুঝতে পারে। তাই মাঝে মাঝে যখন বই থেকে কিছুটা পড়ে শোনায় ওগুলোকে, সাড়াও যেন পায়। কখনো কখনো আপনমনে বকে যায়, শোনায় রাখাল ছেলের একাকীত্বের কথা, শোনায় তাদের আনন্দের কথা। মাঝে মাঝে পেরিয়ে যাওয়া গ্রামগুলোয় কী দেখল সেসবও শোনায়।

কিন্তু গত কদিন ধরে তার কথা শুধু একটা ব্যাপার নিয়ে। মেয়েটার ব্যাপার। বণিকের মেয়ে। চারদিন পর সেখানে পৌছানোর কথা। গ্রামটায় গিয়েছিল মাত্র একবার। গেল বছরে। শুকনা পণ্যের বেসাতি করে বণিক লোকটা। তার দাবি, ভেড়াগুলোকে তার সামনেই মুড়িয়ে দিতে হবে, নাহলে ঠকল কিনা বোঝা যাবে না। কোন এক বন্ধুর কাছে দোকানের কথা শুনেছিল ছেলেটা, তারপর সেখানেই ভেড়ার পাল নিয়ে যাবার পালা।

 

১.০২

কিছু উল বিক্রি করা দরকার। বণিককে বলে ছেলেটা।

দোকানের বিকিকিনি চলছে দেদার। তাকে অপেক্ষা করতে হবে বিকাল পর্যন্ত। কী আর করা, সে বসে পড়ে দোকানের সিঁড়ির এক ধাপে। ঝোলা থেকে বের করে একটা বই।

রাখাল ছেলেরাও যে বই পড়তে পারে তাতো জানতাম না। পিছন থেকে বলে উঠল মেয়েটা।

আন্দালুসিয়ার সাধারণ বেশভূষার এক মেয়ে। ঢেউ খেলানো চুল আছে। তার। চোখদুটা দেখলে ঠিক ঠিক মুরিশ শাসকদের কথা মনে পড়ে যাবে।

আসলে আমি বই থেকে যতটা শিখি তারচে বেশি শিখি ভেড়াগুলোর কাছ থেকে।

দু ঘন্টা ধরে কথা বলল তারা। মেয়েটা জানায়, বণিক তার বাবা। জানায় গ্রামের জীবনের কথা, যেখানে হররোজ একই ভাবে কাটে।

রাখাল শোনায় আন্দালুসিয়ার দূরপ্রান্তের সব কথা। যেসব শহরে থেমেছে সেখানকার কথা। ভেড়াদের সাথে কথা বলারচে অন্যরকম লাগে তার কাছে।

পড়তে শিখলে কী করে?

আর সবার মত, চটপট জবাব দেয় ছেলেটা, স্কুলে।

আচ্ছা। পড়তে জানলে তুমি রাখাল ছেলে কেন?

পাশ কাটিয়ে যাওয়া একটা জবাব ছুঁড়ে দেয় সে। জানে, মেয়েটা এসব বুঝবে না। তারপর শোনায় বসত থেকে বসতিতে যাবার গল্প; মেয়ের উজ্জ্বল মুরিশ চোখের তারা বড় হয়, বড় বড় হয়ে যায় চোখদুটা ভয় আর বিস্ময়ে। বয়ে চলে সময়। ধীরে ধীরে ছেলেটা কেন যেন আশা করতে থাকে, দিনটা যেন না ফুরায়। যেন বাবা ব্যস্তসমস্ত হয়ে থাকে অহর্নিশি। যেন তিন দিনেও না। ডাকে। এমন কোন অনুভূতি হচ্ছে যা আগে কখনো হয়নি। এক জায়গায় সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছা। দিনগুলো আর আগের মত কাটবে না।

কিন্তু অবশেষে হাজির হয় দোকানি। চারটা ভেড়া মুড়িয়ে দিতে হবে। টাকাটা দিয়ে জানিয়ে দেয়, আসতে হবে আগামি বছর।

 

১.০৩

আর এখন সেখানে যেতে মাত্র চারদিন বাকি। তার অস্থির লাগছে, একটু একটু লজ্জাও হয়। কে জানে, মেয়েটা হয়ত এতদিনে ভুলেই গেছে। কত রাখালই যায় আসে, কতজন বিক্রি করে পশম তার ঠিক নেই।

এতে কিছু এসে যায় না, ভেড়াদের শোনায় সে, আমি অন্য সব গ্রামে। অন্য মেয়েদের চিনি।

কিন্তু হৃদয়ের গভীর থেকে জানে, কিছু না কিছু এসে যায়। জানে, নাবিক আর ভবঘুরে বিকিকিনি করা লোকজনের মত রাখালরাও কোন না কোন জায়গায় এমন কারো কথা মনে রাখে যে তাদের থিতু হতে বলে। মুখে না। বলুক, মনকে দিয়ে বলায়।

দিনের শুরুতে রাখাল ছেলে সূর্যের দিকে চালিয়ে দেয় পালটাকে। তাদের কোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে না, হয়ত এজন্যই আমার কাছে থাকতে ভালবাসে।

ভেড়াগুলোর একটাই চিন্তা। খাবার আর পানি। যতদিন ছেলেটা আন্দালুসিয়ার খাবারের উৎস চিনবে, ততদিন তারা চলবে তার সাথে। অবশ্যই, তাদের দিনরাত সবই একঘেয়ে। কাটে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তারা পড়তে জানে না। জানে না কী করে রাখালের কথা শুনতে হয়। তারা শুধু খাবার চেনে। বিনিময়ে দেয় পশম। মাঝে মাঝে মাংস।

আমি যদি আজ একটা বিকট দানব হয়ে একে একে তাদের মেরে ফেলতে থাকি, তাহলে বিচ্ছিন্ন হতে দেরি করবে না। বিশ্বাস করে আমাকে, তাই নিজের কল্পনা আর সাবধানতার উপর ভরসা করতে ভুলেই গেছে। কারণ পুষ্টির পথ দেখাই আমি।

ভাবনা থেকে অবাক হয়ে যায় ছেলেটা। হয়ত গির্জা, গির্জার ভিতরের দৈত্যাকার গাছটা ভূতুড়ে। এটাইতো তাকে এক স্বপ্ন দুবার দেখিয়েছে, রাগিয়ে তুলেছে তার পোষা জীবগুলোর বিরুদ্ধে। কাল রাতের খাবার থেকে বেঁচে যাওয়া একটু মদ চেখে নেয় সে। শরীরের সাথে জ্যাকেটটা আটসাট থেকে ঢিল করে। তারপর খুলে ফেলে। আর একটু পর সূর্যটা যখন মাথার উপরে চলে আসবে তখন কড়া তাপে মাঠের ভিতর দিয়ে ভেড়া চালানো রীতিমত মুশকিল হয়ে যাবে। আজ এমন এক ভোর যখন পুরো স্পেন ঘুমে কাতর। গ্রীষ্মের ভোরতো, তাই। রাত নামা পর্যন্ত ভারি জামাটা বয়ে নিতে হল তাকে। ভারটা নিয়ে বিরক্ত হতে গিয়ে মনে পড়ে গেল, এটাই ভোরের শীত থেকে রক্ষা করে।

আমাদের বদলের জন্য প্রস্তুত হতে হবে, ভাবে সে, ভাবে, থাক ভারি জামার ওজন। মন্দ নয়।

ভারি জামার একটা উদ্দেশ্য আছে, যেমন আছে ছেলেটার। তার জীবনের লক্ষ্য পরিভ্রমণ, আর আন্দালুসিয়ায় দুটা বছর হেঁটে হেঁটে এলাকার সব শহর চলে এসেছে নখদর্পণে। এবার সে মেয়েটার কাছে ব্যাখ্যা করবে কী করে এক রাখাল ছেলে পড়তে জানে। বলবে, ষােল বছর পর্যন্ত পাঠশালায় ছিল। বাবা

মা চেয়েছিল সে হবে যাজক, আর সাধারণ সে পরিবারে আসবে সম্মান। তারা শুধু খাবার পানির জন্য অনেক কষ্ট করত, ঠিক এ ভেড়াগুলোর মত।

সে লাতিন পড়েছে, পড়েছে স্প্যানিশ, আর ধর্মতত্ত্ব। কিন্তু একেবারে ছেলেবেলাতেই তার ইচ্ছা ছিল পৃথিবীকে জানার, মনে হয়েছে ঈশ্বর আর পাপ সম্পর্কে জানারচে এসব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারপর, এক বিকালে সে সাহস করে বাবাকে বলেই ফেলল, যাজক হতে চায় না। চায় ঘুরে ঘুরে পৃথিবীটাকে দেখতে।

 

১.০৪

পৃথিবীর এখান সেখান থেকে কত মানুষ যে এ গ্রাম দিয়ে গেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই, ছেলে। বলেছিল বাবা। তারা নতুনের খোঁজে আসে এখানে, কিন্তু ছেড়ে যাবার সময় তারা যে মানুষ হয়ে এসেছিল তা হয়েই চলে যায়। দুর্গ দেখার আশায় ওঠে পাহাড়চূড়ায়, তার পরও, মনে করে অতীত বর্তমানেরচে ভাল। কারো লালচুল, কারো চামড়া কালো, কিন্তু সবাই আসলে এখানে থাকা মানুষের মতই। খুব বেশি হেরফের নেই।

কিন্তু যেসব শহরে তারা থাকে সেখানকার দুর্গগুলো দেখার ইচ্ছা ছিল আমার।

আর তারা যখন আমাদের এখানে আসে, বলে সারাটা জীবন এখানে কাটিয়ে যেতে পারলে মন্দ হত না। আমাদের মধ্যে যারা ভ্রমণ করে তারা রাখাল।

ভাল! তাহলে আমি রাখাল ছেলে হব!

বাবা আর কোন কথা বলে না। পরদিন ছেলের হাতে ধরিয়ে দেয় স্প্যানিশ সোনার তিনটা মোহর।

একদিন মাঠে পেয়েছিলাম এগুলো। চেয়েছিলাম তোমার কাজে লাগুক কোনদিন। এম্নি খরচ করে ফেলেনা। পর পাল কিনে নিও। মাঠ থেকে মাঠে ঘুরে বেড়াও। তারপর একদিন ঠিক ঠিক উপলব্ধি করবে যে তোমার দেশটাই সেরা। তোমার দেশের মেয়েরাই সবচে সুন্দর।

তারপর বাবার আশীর্বাদ পড়ে ছেলের উপর। ছেলে দেখতে পায় বাবার চোখজোড়া। অবাক হয়ে দেখে, সেখানেও পৃথিবী ঘোরার উদ্দাম নেশা ঝিলিক খেলে যাচ্ছে। এখনো সে কামনা মুছে যায়নি। যুগ যুগ ধরে প্রোথিত বুকের ভিতর। স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাবা দিনের পর দিন পান করার পানি খুজে বেড়ায়, যুঝে চলে একমুঠো খাবার জন্য, ঘুমায় বা নিঘুম রাত কাটায় একই জায়গায়।

 

১.০৫

দিগন্তরেখা লালচে হতে হতে এক সময় সূর্যকে নিয়ে এল। বাবার কথা মনে পড়ে যায় ছেলেটার, কেন যেন নিজেকে সুখি সুখি মনে হয়; অনেক দুর্গ দেখেছে সে, দেখেছে অনেক নারীর রূপ (কিন্তু কেউ আর কদিন পর যার সাথে দেখা হবে তার সাথে তুলনীয় নয়)। একটা ভারি জামা আছে তার, আছে বেচে দিয়ে বা বদলে নিয়ে নতুন একটা কেনার মত বই, আর আছে একদল ভেড়া। আর আছে হররোজ স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার সাহস। আন্দালুসিয়ান মাঠে মাঠে এক সময় ক্লান্ত হয়ে যেতেই পারে সে, তখন প্রিয় ভেড়াগুলোকে বিক্রি করে দিয়ে পাল তুলে দিবে সাগরের বুকে। উত্তাল সমুদ্রের বুকে ভাসতে ভাসতে হরেক রকমের নগর দেখা হয়ে যাবে, দেখা পাবে অতুল রূপের সব রমণীর, দেখা পাবে বিচিত্র সব সুখের।

ধর্মশালায় আমি ঈশ্বরের দেখা পাব না, হয়ত পেতাম না কোনদিন, ভাবে সে উঠতে থাকা টকটকে লাল সূর্যের দিকে তাকিয়ে।

যখনি সম্ভব নতুন পথ ধরে সে, আগে কখনো ভাঙা গির্জায় যায়নি, যেমন যায়নি একই জায়গায় বারবার। পৃথিবী বিশাল, এখানে ক্লান্তির কোন স্থান নেই, তাকে শুধু ভেড়ার পাল চড়িয়ে যেতে হবে, তারপর তাকিয়ে দেখতে হবে অনির্বচনীয় সব দৃশ্য। সমস্যা হল, ভেড়াগুলো বুঝতেও পারে না তারা যে প্রতিদিন এক একটা নতুন পথে যাচ্ছে। দেখে না ঋতু বদলের খেলা। তাদের চিন্তা শুধু খাবার আর পানীয়, পানীয় আর খাবার।

হয়ত আমরা কাছাকাছি চলে এসেছি। মৃদু হাসির রেখা ছেলেটার ঠোঁটের কোণায়। বণিকের মেয়ের দেখা পাবার পর আর কারো কথা ভাবেনি সে। দুপুরের আগে তারিফায় পৌছে যাবে, সূর্যের দিকে তাকিয়ে বুঝে নেয়। সেখানে বইটা বদলে ভারি আরেকটা নিয়ে নেয়া যাবে। ভরে নেয়া যাবে মদের বোতলটা, দাড়ি কামিয়ে ছেটে নেয়া যাবে চুল। মেয়ের সাথে দেখা হবার আগে একটু সুন্দর হয়ে নিতে হবে তো। ভাবতেও পারে না যে আরো বড় কোন পাল নিয়ে অন্য কোন রাখাল এসে এর মধ্যেই মেয়েটার হাত ধরে বসেছে।

একটা স্বপ্নকে সত্যি করে দেখা, জীবনটাকে আরো একটু সাজিয়ে নেয়া, সূর্যের দিকে তাকিয়ে গতি আর একটু বাড়ানো, এসবই এখন মনের ভিতরে হানা দেয়।

হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল। তারিফায় এক বয়েসি মহিলা আছে। সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে জানে।

 

১.০৬

তাকে বাসার পিছনে একটা কামরায় নিয়ে গেল মহিলা; রঙচঙে পর্দা দিয়ে ঘরটা শোবার ঘর থেকে আলাদা করা। ঘরটায় যিশুর পবিত্র হৃদয়ের ছবি, একটা টেবিল আর খান দুয়েক চেয়ার ছাড়া কিছু নেই।

মহিলা বসে পড়ে তাকেও বসতে বলে। তারপর হাতে তুলে নেয় হাত। নিরব প্রার্থনা করতে থাকে।

শুনে মনে হয় বেদুইনদের কোন প্রার্থনা। পথেঘাটে অনেক বেদুইনের সাথে পরিচয় হয়েছে তার; তারাও ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু কোন পশুর পাল নেই। লোকে বলে বেদুইনরা অন্যদের ঠকিয়ে টকিয়ে জীবন চালায়। তাদের সাথে নাকি দুষ্ট আত্মার খুব দহরম মহরম। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েকে তুলে নিয়ে গোপন জায়গায় নিয়ে যায়। তারপর জন্মের তরে দাস দাসী বানিয়ে রাখে। ছেলেবেলায় সে সর্বক্ষণ একটা আতঙ্কে থাকত। এই বুঝি বেদুইনরা এল, এই বুঝি তারা তাকে চিরদিনের জন্য নিয়ে গেল। সেই বাল্যকালের স্মৃতি ফিরে আসে মহিলার হাতে হাত রাখার সাথে সাথে।

কিন্তু এখানে তো যিশুর পবিত্র হৃদয় আছে, ভয়ের কী? ভাবে নিজেকে ফিরে পাবার চেষ্টা করতে করতে। হাত যেন না কাপে, তাহলে ভয়ের ব্যাপারটা বয়েসি মহিলা টের পেয়ে যাবে।

বিচিত্র ব্যাপার, ছেলের হাত থেকে চোখদুটা এক পলকের জন্য না সরিয়ে বলে মহিলা। তারপর একেবারে চুপ বনে যায়।

আস্তে আস্তে অস্থির হয়ে উঠছে ছেলেটা। মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। মৃদু কাঁপছে হাতদুটা। টের পায় মহিলা। সাথে সাথে হাত সরিয়ে নেয় সান্তিয়াগো।

আমি এখানে আমার হাত দেখাতে আসিনি তো! এর মধ্যেই তার আসার জন্য আফসোস হচ্ছে। কেন খামোখা বিপদ ডেকে আনা বাবা! এখন ভালয় ভালয় পাওনা টাকাকড়ি বুঝিয়ে দিয়ে কেটে পড়তে পারলেই বাঁচে। স্বপ্নকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে কেন?

তুমি এসেছ, এসেছ স্বপ্ন বিষয়ে জানতে। আর স্বপ্ন কী তা জান নাকি? স্বপ্ন হল ঈশ্বরের ভাষা। যখন তিনি আমাদের ভাষায় কথা বলেন, তখন আমি সেটা অনুবাদ করে দিতে পারি। কিন্তু যখন কথাটা হয় আত্মার ভাষায়, তখন শুধু তুমিই ধরতে পারবে প্রকৃত অর্থ। যাই হোক, আমি উপদেশের জন্য তোমার কাছ থেকে কিছু নিব।

আবার ছলচাতুরি, ভাবে ছেলেটা। কিন্তু একটা সুযোগ নেয়া যেতে পারে। রাখাল ছেলে সব সময় নেকড়ের ঝুকি নেয়, ঝুকি নেয় খরার, আর এসব করলেই জীবনটা হয়ে ওঠে দারুণ।

আমি একই স্বপ্ন দুবার দেখেছি। ভেড়াগুলোকে নিয়ে একটা মাঠে ছিলাম, এমন সময় এক ছেলে কোখেকে যেন এসে সেগুলোর সাথে খেলা শুরু করে। এমনধারা মানুষ আমার মোটেও ভাল্লাগেনা। কারণ আছে, ভেড়াগুলো নতুন কাউকে দেখলে ভড়কে যায়। কিন্তু শিশুরা কী করে যেন তাদের ভয় না পাইয়ে সুন্দর খেলে যায়। কে জানে কীভাবে করে কাজটী। মানুষের বয়সটা কেমন করে পশু আন্দাজ করে তাও জানি না।

স্বপ্নটার ব্যাপারে আরো কিছু বল দেখি। চটজলদি রান্নাবাড়ার কাজে যেতে হবে। বোঝাই যায়, তোমার কাছে খুব বেশি পয়সা নেই, যখন খুব বেশি পয়সা নেই, তখন আমার হাতে খুব বেশি সময়ও নেই।

বাচ্চাটা আমার ভেড়াগুলোর সাথে বেশ কিছুক্ষণ খেলল। সামান্য হতাশ হয়ে বলতে থাকে ছেলেটা, তারপর হঠাৎ সে আমাকে জড়িয়ে ধরে। ধ করে নিয়ে যায় মিশরের পিরামিডে।

ইচ্ছা করেই থামে সান্তিয়াগো। বোঝার চেষ্টা করে মহিলা মিশরিয় পিরামিডের ব্যাপারে কিছু জানে কিনা। কিন্তু কোন জবাব নেই মহিলার মুখে।

তারপর, মিশরিয় পিরামিডে,- ধীরলয়ে বলে চলে সে, যেন প্রতিষ্টা বর্ণ ঠিক ঠিক ধরতে পারে মহিলা- নিয়ে গিয়ে মেয়েটা বলে, এখানে এলে পাবে এক লুকানো জিনিস। গুপ্তধন। তারপর যখনি সে ঠিক জায়গাটা দেখাতে চায় তখনি ঘুম ভেঙে যায়। দু বারই একভাবে জেগে গেছি আমি।

মহিলা কিছুক্ষণ কোন কথা বলে না। তারপর আবার সান্তিয়াগোর হাত হাতে তুলে নেয়ার পালা। আবার সেগুলো খুটিয়ে দেখার পালা।

এখন আমি তোমার কাছ থেকে সোনা-রূপা কিছুই চাই না। কিন্তু গুপ্তধন পেলে দশভাগের একভাগ চাই।

ঝলমলিয়ে হেসে ওঠে ছেলেটা। যাক, গুপ্তধনের স্বপ্নের ব্যাখা চাইতে গিয়ে যে টাকাটুকু জলে যেত সেটা আর হারাল না।

ঠিক আছে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিন।

আগে শপথ কর। শপথ কর যে আমি যা বলব সে অনুসারে গুপ্তধন। পেলে আমাকে দশভাগের একভাগ দিয়ে দিবে।

শপথ করে সান্তিয়াগো। মহিলা আবার যিশুর হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে শপথ করতে বলে।

স্বপ্নটা পৃথিবীর ভাষায় এসেছে, ব্যাখ্যাতো আমি করতে পারি হরহামেশা, কিন্তু অর্থ বের করা একটু জটিল। তাই মনে হচ্ছে আমি তোমার পাওনা থেকে কিছু প্রাপ্য।

আর এ হল আমার অর্থ: তোমাকে অবশ্যই মিশরের পিরামিডে যেতে হবে। আমি কখনো তাদের কথা শুনিনি, তবে কোন শিশু যদি তোমাকে সেসব দেখিয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তেমন কিছু আছে। সেখানে সম্পদ পাবে। ধনী বনে যাবে তুমি।

এবার সান্তিয়াগোর অবাক হবার পালা। এরপর বিরক্ত। এ কথা জানার জন্যতো বয়েসি মহিলার কাছে আসার কোন দরকার নেই। তার পর মনে পড়ে যায়, ভাগ্য ভাল, কোন টাকাকড়ি দিতে হচ্ছে না।

আমি এসবের জন্য সময় নষ্ট করব বলে মনে হয় না।

আগেই বলেছি, তোমার স্বপ্নটা জটিল। এ হল জীবনের সাধারণ ব্যাপার যা ধীরে ধীরে অসাধারণ হয়ে ওঠে। শুধু জ্ঞানীরাই মূল অর্থ ধরতে পারে। কিন্তু আমি জ্ঞানী নই। আর জ্ঞানী নই বলে আর সব জিনিস শিখতে হয়, শিখতে হয় হাতের তালু পড়া।

তাহলে কী করে মিশরে যাব?

আমার কাজ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা। কী করে বাস্তব করতে হয় সে সম্পর্কে আমি ক অক্ষর গো-মাংস। তাইতো আমাকে মেয়ের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়।

 

এরপর মহিলা তাকে চলে যেতে বলে। অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। আর নয়।

ছেলেটার আশাভঙ্গ হয়। সে আর কখনো স্বপ্নে বিশ্বাস করবে না। কখনো। অনেক ব্যাপারে ভাবতে হয় তাকে, অনেক বিষয় মাথায় রেখে চলতে হয়।

বাজারে গিয়ে কিছু খাবার দাবার কিনে খেয়ে নেয় প্রথমে। তারপর পুরনো বইটা বিকিয়ে দিয়ে আরো একটু মোটা দেখে বই কিনে নেয়। তারপর চত্বরে বসে নতুন মল থেকে একটু চোখে দেখে। ভ্যাপসা গরমের দিনে সামান্য মদ্যপান মন্দ লাগে না।

শহরে ঢোকার পথে ভেড়াগুলোকে কোন এক বন্ধুর আস্তাবলে রেখে এসেছে সে। ভ্রমণের এই এক মজা। দেশ থেকে দেশ দেশান্তরে যাও, নতুন। নতুন বন্ধু বানাও, আবার তাদের সাথে বেশি সময় কাটিয়ে বিরক্ত হবার সুযোগও নেই হাতে। মানুষ যখন নিত্যদিন একই মুখ দেখতে থাকে ধর্মশালায় থাকার দিনগুলোর মত, তখন সেই অবয়বগুলো জীবনের অংশ হয়ে যায়। তখন মানুষের মনে তাদের একটু বদলে দেখার ইচ্ছা হয়। যখন বদলে দেখা যায় না, কেন যেন রাগে ফেটে পড়ে কেউ কেউ। সবারই যেন একটা গাধা নিয়ম আছে, সবাই যেন চায় অন্যের জীবনের চালচলন তার ইচ্ছামত বা তার। আদর্শমত হোক। শুধু নিজের জীবনটার ব্যাপারে এসব থলি শুণ্য।

সূর্য আরো একটু নেমে যাবার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সান্তিয়াগো। তখন পাল নিয়ে মাঠের দিকে রওনা হওয়া যাবে। আর মাত্র দিন তিনেক। তার পরই মেয়ের সাথে দেখা। সেই মেয়েটার সাথে দেখা।

কিনে আনা বইটা পড়তে শুরু করে সে। প্রথম পাতাতেই কবর দেয়ার অনুষ্ঠানের বর্ননা। সেখানকার মানুষগুলোর নামও কেমন বিদঘুটে। উচ্চারণ করতে দাত ভেঙে যায়। যদি কখনো বই লিখি, ভাবে সে, তাহলে এক সময়ে একজনের বেশি মানুষ হাজির করব না যাতে লোকে নাম মনে করতে গিয়ে ভিড়মি না খায়।

পড়ার দিকে অবশেষে মন দিতে পেরে ভাল লাগে তার। বইটা মন্দ না। শুধু কবর দেয়ার দিনটা কেমন যেন মন খারাপ করে দেয়। রীতিমত তুষারপাত হচ্ছিল তখন। শিতল অনুভূতি এসে যায় মনে।

পড়া চলছে, এমন সময় বয়েসি এক লোক ধপ বসে পড়ে তার পাশে। কথা চালানোর জন্য যেন উসখুস করছে লোকটা।

কী করছে এর, এ্যা? চত্বরের দিকে আঙুল তাক করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় লোকটা।

কাজ। এমন শুদ্ধভাবে জবাব দেয় সান্তিয়াগো যেন লোকটা বুঝে যায় সে কথা চালাচালিতে খুব একটা আগ্রহী নয়।

আসলে তার মনে এখন বণিকের মেয়ের সামনে ভেড়া মুড়িয়ে দেয়ার কল্পনা। মেয়েটা তাহলে বুঝবে। বুঝবে এ যে সে ছেলে নয়। কঠিন কঠিন কাজ করে ফেলতে পারে সহজেই। সে অনেকবার ভেবে ফেলেছে কথাগুলো। আস্তে আস্তে মেয়েকে বলবে, কী করে ভেড়া ন্যাড়া করতে হয়। শুরু করতে হবে পিছনদিক থেকে। মুড়িয়ে নেয়ার সময় কিছু গালগল্প চালাতে হবে, কী কথা বলা যায় সেসব ভেবে ভেবেও হয়রান সে। মেয়েটা বইয়ের গল্প আর তার বলা গল্পের ফারাক বুঝতে পারবে না মোটেও। পড়তেই জানে না।

এদিকে এখনো বুড়ো লোকটা কথা চালানোর জন্য অস্থির হয়ে আছে। আগেই বলেছে, একেতো ক্লান্ত তার উপর তৃষ্ণার্ত। সান্তিয়াগোর বোতল থেকে এক চুমুক মিলবে নাকি? তার এদিকে ছেড়ে দে মা কেদে বাচি অবস্থা। বোতল এগিয়ে দেয়। তাও সে তাকে ছেড়ে যাক।

কিন্তু বয়েসি লোকটার একটাই ইচ্ছ। আরো একটু কথা বলা। কী বই পড়ছে সে? এবার আর পারে না সান্তিয়াগো। অন্য কোন বেঞ্চিতে গিয়ে বসবে কিনা ভাবছে। কিন্তু বাবা বলেছিল, বয়স্কদের সাথে সম্মান দেখিয়ে আচরণ করতে হয়। ফলে বইটা এগিয়ে দেয় তার দিকে দুটা উদ্দেশ্যে প্রথমত, সে নিজেও ছাই জানে না নামের উচ্চারণটা কী হবে; দ্বিতীয়ত বয়েসি লোকটা যদি পড়তে না জানে তাহলে সে লজ্জা পেয়ে অন্য কোন বেঞ্চে গিয়ে বসবে।

হুম… উল্টেপালে এমনভাবে বইয়ের দিকে তাকায় বুড়ো, যেন বিচিত্র কিছু দেখছে, বইটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিরক্তিকর।

এবার সান্তিয়াগোর অবাক হবার পালা। লোকটা শুধু পড়তে জানে না, আগেভাগেই সেটা পড়ে রেখেছে। আর তার কথামত সত্যি সত্যি যদি এ বই বিরক্তিকর হয়ে থাকে তো এখনো বদলে নেয়ার সময় আছে।

এ বইতে যা আছে প্রায় একই কথা থাকে দুনিয়ার আর সব বইতে, কথা বলার বিষয় পেয়ে গেছে বয়েসি লোকটা, এখানে কী ব্যাখ্যা করা আছে জান? ব্যাখ্যা করা আছে যে মানুষ তার আসল গন্তব্য নিজে নিজে ঠিক করে নিতে পারে না। আর শেষে লেখা আছে যে সবাই সর্বশান্ত হয়ে ধরে নেয় পৃথিবী আসলে বিশাল এক ফক্কিকার।

তাহলে পৃথিবীর সবচে বড় মিথ্যাটা কী? অবাক না হয়ে পারে না ছেলেটা।

তা হল: আমাদের একেকজনের জীবনের এক একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে আমাদের আশপাশে যা হচ্ছে তার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। তখন জীবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় ভাগ্য। এটাই দুনিয়ার সবচে বড় মিথ্যা।

কিন্তু এমন কিছু আমার ক্ষেত্রে হয়নি। তারা আমাকে ধরেবেধে যাজক বানাতে চেয়েছিল। আমি চেয়েছিলাম রাখাল হতে। তাই হয়েছি।

ভাল। দারুণ। কারণ তুমি সত্যি সত্যি ভ্রমণ করতে ভালবাস।

আমি কী ভাবছি তার নাড়িনক্ষত্র দেখি জানে লোকটা! ফিসফিসিয়ে নিজেকে বলে সান্তিয়াগো। এদিকে লোকটা পাতার পর পাতায় চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। এখন আর তার দিকে কোন মনোেযোগ নেই। এতক্ষণে তার নজরে পড়ল, লোকটার বেশভূষা বিচিত্র। দেখে মনে হয় আরব। এ তল্লাটে আরবদের দেখা পাওয়া দুরাশা। তারিফা থেকে আফ্রিকা যেতে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময় লাগে। শুধু সরু জলাশয় পেরিয়ে যেতে হবে জাহাজে করে। নৌকা হলেও চলে। ও, আরবরাতে এ শহরে মাঝেমধ্যেই আসে। তারপর বিকিকিনি করে। অবাক করা প্রার্থনা করে দৈনিক কয়েকবার।

কোত্থেকে এসেছেন আপনি?

অনেক জায়গা থেকে।

কেউ অনেক জায়গা থেকে আসতে পারে না। আমি রাখাল, অনেক অঞ্চলে গিয়েছি, কিন্তু এসেছি মাত্র একটা এলাকা থেকে। আদ্যিকালের দুর্গের পাশের শহর। সেখানেই জন্ম।

আচ্ছা, তাহলে বলতে হয় আমি জন্মেছিলাম সালেমে।

কে জানে সালেম কোথায়। কিন্তু প্রশ্ন করতে সাহস হয় না। যদি ছোট চোখে দেখে বৃদ্ধ লোকটা। চত্বরে ভিড় করা হরেক ধরনের মানুষের দিকে তাকায় সে। সব আসছে যাচ্ছে। যাচ্ছে আসছে। মহাব্যস্ত।

মানে, সালেম জায়গাটা কেমন? কোন সূত্র পাবার আশায় আন্দাজে ঢিল ছোড়ে সান্তিয়াগো।

সব সময় যেমন ছিল তেমনি।

কোন সূত্র পাওয়া গেল না। এটুকু সে জানে, সালেম আন্দালুসিয়ার কোন এলাকা নয়। থাকলে এতদিনে যাক না যাক, শুনতে পেত সে এলাকার কথা।

সালেমে কী করেন আপনি?

আমি সালেমে কী করি? এবার সত্যি হেসে উঠল লেকিটা। আসলে… আমি সালেমের রাজা!

মানুষ কত বিচিত্র কথাই না বলে! মাঝে মাঝে তাই মনে হয়, ভেড়াদের সাথে থাকাটা মোটেও মন্দ নয়। তারা কি বলতে পারে না। আর সাথে একটা বই হলে- তোফা। সেখানে আছে বিচিত্র সব কাহিনী। আর সবখানে যাওয়া, সব পরিবেশ বুঝে নেয়া কঠিন; সহজ হল, সাথে একটা বই রাখা। কিন্তু মুশকিল হয় লোকজনের সাথে কথা বলার সময়, মাঝে মাঝে ধুপ করে মানুষ এমন সব কথা বলে বসবে যে কথার পিঠে কোন কথা খুজে পাবে না তুমি।

আমার নাম মেলসিজেদেক, অবশেষে বলল লোকটা, কতগুলো ভেড়া আছে তোমার?

যথেষ্ট। ঠান্ডা জবাব দেয় সান্তিয়াগো। লোকটা তার সম্পর্কে আরো জানার চেষ্টা করছে। বোঝা যায়।

আচ্ছা! তাহলে আমাদের একটা সমস্যা দেখা দিল মে। তোমার যদি সত্যি সত্যি যথেষ্ট পরিমাণে ভেড়া থেকে থাকে তাহলে আমি তোমাকে কোনভাবেই সহায়তা করতে পারব না।

এবার আরো বিরক্ত হচ্ছে ছেলেটা। সে সাহায্য চাইল কোন সময়? বুড়ো লোকটাইতো আগ বাড়িয়ে তার কাছ থেকে একটু মদ খেতে চেয়েছিল। গায়ে পড়ে কথা শুরু করাটাও তারই কাজ।

বইটা দেন দেখি। আমার এখন উঠতে হবে। অনেক কাজ বাকি। ভেড়াগুলো একত্র করে রওনা দিতে হবে।

তোমার ভেড়াগুলোর দশভাগের একভাগ আমাকে দাও, বলল বয়েসি লোকটা, তাহলে আমি তোমাকে গুপ্তধন পাবার পথের কথা বলতে পারি।

স্বপ্নের ব্যাপারটা মনে পড়তেই বাকি কথাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বয়েসি মহিলা তার কাছ থেকে কিছু নেয়নি, কিন্তু এ বুড়ো লোকটা কে জানে। মহিলার স্বামী কিনা- এমন কিছু চাচ্ছে যা দিয়ে মহিলার টাকাও পুষিয়ে যাবে, আবার বাড়তি কিছু পাওয়া যাবে। মনে হয় বুড়ো লোকটা বেদুইন।

কি সে কিছু বলার আগেই বয়স্ক লোকটা উবু হয়ে চতুরের ধুলার গায়ে। সান্তিয়াগোর লাঠি দিয়ে কী যেন লেখা শুরু করল। তার বুক থেকে উজ্জ্বল। কীসের আলো যেন বিচ্ছুরিত হয়। এক পলকের জন্য রীতিমত অন্ধ বনে যায় ছেলেটা। মুহূর্তের মধ্যে, এ বয়েসি লোকদের জন্য যা বেমানান গতি, সে গতিতে বুক ঢেকে ফেলল লোকটা। এবার দৃষ্টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মাটিতে লেখাগুলো পড়তে পারছে সে।

সেখানে, এক খুদে শহরের ক্ষুদ্রতর চতুরে জমে ওঠা ধুলার উপর ছেলেটা দেখতে পায় তার বাবার নাম, দেখে মায়ের নাম, বে ধর্মশালায় পড়েছিল সেটার নাম। দেখে বণিকের মেয়েটার নাম- যে নাম জানে না সে। দেখে আরো অনেক শব্দ, যেগুলো কখনো বলেনি কাউকে।

 

১.০৭

আমি সালেমের রাজা। বলেছিল বয়েসি লোকটা।

রাজা কেন সামান্য এক রাখাল ছেলের সাথে কথা বলবে?

বেশ কিছু কারণে। সবচে বড় কারণ, তোমার লক্ষ্য খুজে বের করতে পেরেছ তুমি।

ছেলেটা জানে না কোন মানুষের লক্ষ্য জিনিসটা কী।

লক্ষ্য হল সে বিষয় যা কেউ সব সময় চায়। কম বয়েসি থাকতে সবাই তার লক্ষ্য চিনে যায়।

সেটা পরিচিত হবার পর স্পষ্ট হয়, সম্ভব। সব সম্ভব। স্বপ্নে আর ভয় পায় না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অদ্ভুত এক শক্তি তাদের বিশ্বাস করাতে শুরু করে যে লক্ষ্যে পৌছানো অসম্ভব।

সব অর্থ ছাই বুঝছে রাখাল ছেলে। তার শুধু একটাই চিন্তা। সেই রহস্যময় শক্তির ব্যাপারটুকু বুঝে নিতে হবে। শুনলে চোখ বড় বড় করে ফেলবে বণিকের মেয়ে।

এও এক শক্তি। শক্তিটা না-বোধক। কিন্তু আসলে সেটাই তোমাকে লক্ষ্য অর্জনের পথ দেখাবে। তোমার আত্মা, তোমার ইচ্ছাকে প্রস্তুত করে এটা, শিখায় এ গ্রহের বড় সত্যিটা; যেই হও না কেন তুমি, যাই কর না কেন, যখন সত্যি সত্যি মন থেকে চাইবে কিছু, চাও এ কারণে যে বিশ্বব্রহ্মান্ডের ভিতর থেকেই ইচ্ছা জেগে ওঠে তোমার ভিতরে। পৃথিবীর বুকে এটাই তোমার অভিযান।

এমনকি যদি আমি ভ্রমণ করতে চাই, যদি কাপড়-সুতার বণিকের মেয়েকে বিয়ে করতে চাই, সেটাও লক্ষ্য হতে পারে?

আবার কোন গুপ্তধনের পিছু ধাওয়াও হতে পারে। বিশ্বের আত্মা শুদ্ধ হয়। কী করে জান? মানুষের আনন্দে। আবার নিরানন্দ, হিংসা, ক্রোধ দিয়েও হয়। লক্ষ্য বুঝতে পারাই মানুষের জীবনের আসল উদ্দেশ্য। সব জিনিসই এক।

আর যখন তুমি কিছু যাও, পুরো সৃষ্টিজগতে সাড়া পড়ে যায়। ফিসফাস করে তোমাকে সাহায্য করার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়ে সবকিছু।

নিরবতা নেমে আসে ছোট শহরের চত্বরে। আবার কথা বলে ওঠে বয়েসি লোকটা।

তুমি ভেড়ার পাল চালাও কেন?

ভ্রমণ করতে চাই, তাই।

লোকটা এক রুটিওয়ালার দিকে আঙুল তোলে। লোকটা দাড়িয়ে আছে নিজের দরজার সামনে। বাচ্চা থাকতে ঐ লোকটাও পরিভ্রমণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথমে চিন্তা করল একটা রুটির কারখানা কিনে কিছু পয়সাকড়ি জমিয়ে নিবে। বুড়ো হলে মাসখানেক কাটিয়ে আসবে আফ্রিকায়। লোকটা বুঝতেই পারল না যে আসলে মানুষ যার স্বপ্ন দেখে তা করতে পারে যে কোন সময়ে।

লোকটার তো রাখালছেলে হবার কথা তাহলে।

কথাটা কিন্তু তার বিবেচনায় ছিল। বলল বয়েসি লোক, কিন্তু রুটিওয়ালারা, রুটির কারখানার মালিকরা রাখালেরচে বেশি সম্মানিত। তাদের আছে ঘর, আর রাখালের আছে খোলা মাঠ। বাবা মা মেয়েকে রাখালের সাথে বিয়ে দিতে চায় না, দিতে চায় রুটি কারখানার মালিকের সাথে।

হৃদয়ের কোথায় যেন একটু ধাক্কা লাগে সান্তিয়াগোর। এক বণিকের মেয়ে আছে কাছাকাছি কোথাও। সেখানে যে রুটিওয়ালাও আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বলে যাচ্ছে বুড়ো, অবশেষে মানুষ রুটির কারখানার মালিক আর রাখালদের ব্যাপারে কী ভাবে সেটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল জীবনের লক্ষ্যেরছে।

লোকটার কথা থেমে যায় হঠাৎ করে। সে মন দেয় বইয়ের পাতায়। পড়তে থাকে একমনে। তারপর আচমকা বাধা দেয় সান্তিয়াগো।

আমাকে এসব বলছেন কেন?

কারণ তুমি তোমার উদ্দেশ্য খুজে বের করার চেষ্টা করছ। আর যে পর্যায়ে আছ তাতে যে কোন মুহূর্তে ইচ্ছাটা ত্যাগ করতে পার।

আর ঠিক এ মুহূর্তে দৃশ্যে আপনি হাজির হন?

না। সবসময় এভাবে হাজির হই না। কিন্তু কোন না কোন গড়ন নিয়ে হাজির হই বৈকি। কখনো সমাধান আকারে, কখনো ভাল কোন ধারণা হিসাবে। আবার কখনো খুব গুরুত্বপূর্ণ পল অনুপলে ঘটনাগুলোকে সহজে ঘটিয়ে দেই। আরো নানা ঘটনা ঘটাই, শুধু লোকে বুঝতে পারে না যে আমিই এসব করছি।

লোকটা বুঝিয়ে বলে, গত সপ্তাহের আগের সপ্তায় খনি শ্রমিকের সামনে তাকে পাথর হয়ে আসতে হয়েছিল। তার গত পাঁচ বছরের শ্রম শুধু রত্নের জন্য। এমারাল্ড পাথর বের করবে সে পাথর থেকে। সেজন্য লাখ লাখ পাথর ভেঙেছে সে নদীর নিচ থেকে তুলে এনে, পাহাড়ের গা থেকে খুলে এনে।

আর মাত্র একটা, একটা পাথর ভাঙলেই সে এমারাল্ড পেয়ে যেত। লোকটা যখন লক্ষ্যের জন্য সব ছেড়ে দিয়েছে, হাজির হতে হল বৃদ্ধকে। পাথর হয়ে গেল সে। পাথরটা গড়িয়ে এল তার পায়ের কাছে।

পাঁচ বছরের রাগ সামলাতে না পেরে সে পাথরটাকে ছুঁড়ে দেয় দূরে। এত জোরে ছেড়ে সে যে পাথর ভেঙে যায়। সেটার ভিতরেই ছিল পৃথিবীর সবচে সুন্দর এমারাল্ডটা।

মানুষ তার জীবনের শুরুতে জানতে শুরু করে জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে, এ কেমন যেন তিক্ত শোনায় বয়েসি লোকটার কণ্ঠ, আর সে কারণেই হয়ত চটজলদি হালও ছেড়ে দেয়। এই হল ঘটনা।

লোকটাকে ছেলেটা তার লুকানো সম্পদের ব্যাপারে বলে।

বহতা ধারার আঘাতে জেগে ওঠে সম্পদ, আবার ডুবে যায় সেই একই ধারার নিচে, বলছে লোকটা, তুমি যদি নিজের সম্পদ সম্পর্কে জানতে চাও, ভেড়া থেকে দশভাগের একভাগ দিয়ে দিতে হবে।

সম্পদের এক দশমাংশ হলে কেমন হয়?

হতাশ দেখায় লোকটাকে।

তুমি যদি যা হাতে নেই তা নিয়েই ওয়াদা দিতে থাক, সেটা পাবার আশাই চলে যাবে।

 

১.০৮

এ জানালাটা দিয়ে লোকে আফ্রিকার টিকেট কাটে। আর সে জানে, মিশর আফ্রিকায়।

কোন সাহায্য করতে পারি? জানালার পিছনে বসা লোকটা জিজ্ঞেস

হয়ত কাল, সরে যেতে যেতে বলে ছেলেটা। একটা ভেড়া বিক্রি করলেই সে অপর প্রান্তে পৌছে যাবার রাহা খরচ পেয়ে যাবে। কিন্তু ভাবনাটা কেমন যেন ভয় ধরিয়ে দেয়।

আরেক স্বপ্নবিলাসী, সাথের লোকটাকে শোনায় টিকিটওয়ালা, যাবার মত টাকা নেই, ইচ্ছা আছে।

টিকেটের জানালায় বসে থাকার সময় তার মনে হঠাৎ দেখা দেয় ভেড়াগুলোর চিন্তা। আর সে চিন্তা কী করে যেন অস্থির করে তোলে। ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়। ইচ্ছা করে আবার রাখাল ছেলে হয়ে যেতে। দু বছরে রাখালদের সব কাজ শিখে ফেলেছে: কী করে ভেড়ার পাল চালাতে হয়, গর্ভবতী ভেড়াগুলোর যত্ন নিতে হয় কী করে, কী করে বাঁচাতে হয় শিকারী পশুর হাত থেকে। আন্দালুসিয়ার সব মাঠ, সব পানির ধারা তার পরিচিত। এবং সে তার প্রত্যেক ভেড়ার ন্যায্য মূল্য কতটা তাও জানে।

যত ঘুরপথে সম্ভব আস্তাবলের দিকে পা বাড়ায় সে। যাবার পথে শহরের বাইরে থাকা বিশাল দুৰ্গটার পাশ দিয়ে উপরে ওঠে। দেখতে পায় জলরাশি। জলরাশি ছাড়িয়ে দেখতে পায় আফ্রিকার উপকূল। সেখান থেকেই মুররা এসেছিল স্পেনে। জয় করেছিল স্পেন।

এখান থেকে পুরো নগরীও দেখা যায়। দেখা যায় বুড়ো লোকটার সাথে বসে থাকার জায়গা। এ শহরে এসেছিল শুধু এক মহিলাকে পাবার জন্য যে স্বপ্নের তাবির জানে। মহিলা বা বয়েসি লোককেউ তার রাখাল পরিচয়ে খুব বেশি সন্তুষ্ট হয়নি। এ মানুষগুলো একা। তারা রাখাল ছেলের ভেড়ার পাল নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর ব্যাপারটা বোঝে না। সে তার পালের প্রত্যেকটার নাড়িনক্ষত্র চেনে। জানে কোনটা কুড়ের বাদশা, কোনটা দুমাস পর বাচ্চা বিয়াবে, কোনটা ছটফটে। এ প্রাণিগুলোকে ছেড়ে গেলে ভুগবে বেচারারা।

শা শা করে বেড়ে যায় বাতাসের গতি। এ বাতাসকে লোকে ডানে লিভাটার নামে। কারণ মুররা লিভ্যান্ট থেকে এসেছিল।

মুহূর্তে বেড়ে যায় বাতাসের বেগ। আমি এখন সম্পদ আর ভেড়ার পালের মাঝামাঝি অবস্থান করছি। এখন বেছে নিতে হবে। বেছে নিতে হবে চিরাচরিত অভ্যাসের একটা বিষয় আর চাওয়ার একটা বিষয়ের মধ্য থেকে যে কোনটাকে।

বণিকের মেয়েও আছে, কিন্তু তার গুরুত্ব ভেড়ার পালেরচে বেশি নয়। কারণ মেয়েটা তার উপর নির্ভর করে না। কে জানে, তার কথা মনে নাও থাকতে পারে। কবে সান্তিয়াগো তার কাছে যাবে তাতে কিছু এসে যায় না মেয়ের: তার কাছে সব দিন সমান, আর যখন সব দিন কারো কাছে সমান হয়ে যায় তখন মানুষ তার জীবনে হররোজ ওঠা সূর্যের সাথে আসা নতুন আর ভাল ব্যাপারগুলোকে চিনতে পারে না।

আমি বাবাকে ছেড়ে এসেছি, ছেড়ে এসেছি মা, আমার শহর, আমার প্রিয় দুৰ্গটাকে। অনেক পিছনে। তারা এখন আমাকে ছাড়াই অভ্যস্ত। যেভাবে ভেড়াগুলোও আস্তে আস্তে মানিয়ে নিবে। আমার অভাব বোধ করবে না।

এখান থেকে চতুর দেখা যায়। দেখছে সে একমনে। লোকজন আসছে যাচ্ছে রুটিওয়ালার দোকানে। দুজন তরুণ তরুণী বসে আছে সেই বেঞ্চিটায়, যেখানে সে আর বুড়ো লোকটা বসেছিল।

ঐ রুটিওয়ালী… নিজের কানেই কী যেন শোনাতে চায় সে। কথাটা আর শেষ হয় না। এখনো লেভেন্টারের শক্তি বাড়ছে মদমত্ত হাতির মত। মুখে এসে ঝাঁপ্টা মারছে। এ বাতাস নিয়ে এসেছে মুরদের। কথা সত্যি। একই সাথে সব সময় নিয়ে আসে মরুভূমির দমকা হাওয়া। নিয়ে আসে পর্দাঘেরা মেয়েদের কথা। সেসব মানুষের ঘাম আর স্বপ্ন নিয়ে আসে এ বাতাস, যারা এক সময় অজানাকে জানার জন্য পাড়ি জমিয়েছিল, পাড়ি জমিয়েছিল স্বর্ণের জ্য, অভিযানের আশায়, পিরামিডের জন্য। T! বাতাসের স্বাধীনতা কেমন যেন হিংসা বয়ে আনে। আহা, তারও একই ধরনের স্বাধীনতা থাকতে পারত। তাকে আকড়ে ধরার মত কেউ নেই এক সে ছাড়া। ঐ ভেড়ার পাল, বণিকের ঐ মেয়েটা, আন্দালুসিয়ার ধূ ধূ প্রান্তর শুধুই তার লক্ষ্যের পথে কিছু পদক্ষেপ।

পরদিন। দুপুরে আবার দেখা বুড়ো লোকটার সাথে। সাথে করে ছটা ভেড়া নিয়ে এসেছে।

অবাক হচ্ছিতো! বলল ছেলেটা, আমার বন্ধু সব ভেড়া কিনে নিয়েছে। তার নাকি সব সময়ের স্বপ্ন, রাখাল হবে।

সত্যিইতো, সায় জানায় বয়েসি লোক, একেই বলে সহায়তার নীতি। তুমি প্রথমবার তাস খেলতে বসলে জিতে যাবার সম্ভাবনাই বেশি।

কেন?

কারণ তোমার লক্ষ্য পূরণের জন্য একটা শক্তি কাজ করে; সাফল্যের একটু ছোয়া দিয়ে সে তোমার ক্ষুধাকে বাড়িয়ে তোলে আরো।

বয়স্ক লোকটা ভেড়াগুলো যাচাই করে দেখার সময় চোখ পড়ে যায় খোড়া ভেড়ার উপর। সান্তিয়াগো বলে, ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ পালের মধ্যে এ ভেড়াই সবচে বুদ্ধিমান আর তার পশমও হয় অনেক বেশি।

গুপ্তধন কোথায়? এবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সে।

মিশরে। পিরামিডের কাছাকাছি।

এবার বিস্মিত হয় ছেলেটা। বয়েসি মহিলা একই কথা বলেছিল। কিন্তু বিনিময়ে কিছুই চায়নি।

গুপ্তধন পেতে হলে, তোমাকে সুলক্ষণ অনুসরণ করতে হবে। ঈশ্বর সবার অনুসরণের জন্য এক একটা পথ তৈরি করে রেখেছেন। তোমাকে শুধু লক্ষণগুলো অনুসরণ করতে হবে।

কোন জবাব দেয়ার আগেই তার আর বুড়ো লোকটার মাঝে তিরতির করে পাখা নাড়াতে নাড়াতে উড়ে যায় একটা চঞ্চল প্রজাপতি। সাথে সাথে মনে পড়ে যায়, প্রজাপতি সুলক্ষণ। দাদু বলেছিল। যেমন সুলক্ষণ ঝিঝি পোকা, গিরগিটি।

ঠিক তাই, বলল বয়েসি লোক, যেন পড়ে ফেলছে সান্তিয়াগোর সব চিন্তা, ঠিক যেমন শিখিয়েছিলেন তোমার দাদু। এগুলো সুলক্ষণ।

বুকের কাপড় সরায় বয়েসি লোকটা। বিস্ময়ে থ বনে যায় সান্তিয়াগো। সেখানে ভারি একটা সোনার ঝকঝকে পাত আছে। আর বসানো আছে অমূল্য সব রত্ন। গতকাল দেখা ঝিলিকের কথা মনে পড়ে যায় তার।

এ লোক সত্যি সত্যি রাজা! চোরদের উৎপাত এড়ানোর জন্য ছদ্মবেশ ধরে আছে!

এগুলো নাও, সোনার পাতের মাঝখানে থাকা বড় দুটা পাথরের দিকে হাত বাড়ায় লোকটা। একটা পাথর সাদা, আরেকটা কালো। নাম হল উরিম আর থুমিম। কালোটা বোঝাবে হ্যাঁ। আর সাদাটা না। যখন তুমি লক্ষণের অর্থ ধরতে পারবে না, তখন এগুলো তোমাকে পথ দেখাবে। মনে রেখ, সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে হবে এগুলোকে।

কিন্তু সম্ভব হলে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিও। গুপ্তধন আছে পিরামিডে, এটুকু তুমি ঠিকই জান। কিন্তু আমাকে ছুটা ভেড়া নিতে হবে কারণ সিদ্ধান্ত ঠিক করার পথে আমি তোমাকে সহায়তা করেছি।

সান্তিয়াগো পাউচের ভিতরে নিয়ে নেয় ব্লত্ব দুটা। এখন থেকে নিজের সিদ্ধান্তটা সে নিজেই নিবে।

সব সময় মনে রেখ যে যা কিছু নিয়ে তোমার কারবার সেগুলো শুধু সে বিষয়, তারচে বেশি কিছু নয়। ভুলে যেওনা সুলক্ষণের ভাষা। সবচে বেশি মনে রাখতে হবে যা, তা হল জীবনের লক্ষ্য।

কিন্তু চলে যাবার আগে, ছোট একটা গল্প শুনিয়ে যেতে চাই।

কোন এক দোকানি তার ছেলেকে দুনিয়ার সবচে জ্ঞানী লোকের কাছে পাঠায় অপ্রকাশিত সুখের কথা জানতে, শিখতে। বেচারা চল্লিশদিন ধরে মরুর বুকে ঘুরে ঘুরে মরে। তারপর হাজির হয় বিশাল এক পর্বতের উপর বানানো সুন্দর দুর্গের সামনে। এখানেই সে জ্ঞানীর বাস।

সে সেখানে গিয়ে শান্ত সমাহিত এক জ্ঞানগুরুর দেখা পাবে, এমন আশা ছিল মনে। সব দেখেতো আক্কেল গুড়ুম! কেল্লার মূল কামরায় সে কী ব্যস্ততা! মানুষ কোণায় কোণায় নানা আলাপে মশগুল, বণিকেরা যাচ্ছে আর আসছে, আরেক দিকে মৃদুমন্দ বাজনা বাজছে। আর টেবিলের উপর পৃথিবীর সে প্রান্তে যত ধরনের সুস্বাদু খাবার দেখা যায় তার সব থরে বিথরে সাজানো।

একে একে মানুষ যাচ্ছে জ্ঞানী লোকটার কাছে। তার পালা আর আসে।। পাকা দুটা ঘন্টা ব্যয় করে তারপর যাবার সুযোগ হল।

জ্ঞানী লোকটা শান্তভাবে তার আসার ব্যাপারে সব শোনে, তারপর আরো শান্তভাবে জানায় যে এখন সুখে থাকার রহস্য জানানো যাবে না। তারচে সে প্রাসাদে ঘুরেফিরে সব দেখুক, তারপর আরো ঘন্টা দুয়েক পর।

এদিকে আমি তোমাকে একটা কাজ করতে বলি, বলে জ্ঞানী লোকটা, দু ফোটা তেল সহ একটা চায়ের চামচ হাতে ধরিয়ে দিয়ে, যাই কর, যেখানেই যাও, এতক্ষণ তেলটাকে চামচ থেকে পড়তে দিও না। হাতে রেখ।

ছেলেটা প্রাসাদের নানা গলিঘুপচি ঘুরে বেড়ায়। উঠতে নামতে থাকে নানা দৈর্ঘের সিঁড়ি। চোখ তেলের উপর নিবদ্ধ। এরপর ফিরে আসে সে ঘরটায়।

তো, প্রশ্ন করে জ্ঞানী লোক, আমার খাবার কামরায় ঝুলে থাকা পারস্যের কাপড় দেখেছ, তাই না? আর যে বাগানটা বানাতে মহামালির দশ বছর লেগেছিল সেটাওতো দেখেছ? আর লাইব্রেরির সুন্দর পার্চমেন্টগুলো?

অস্বস্তিতে পড়ে যায় ছেলেটা। স্বীকার করে, কিছুই দেখেনি। শুধু খেয়াল রেখেছে যেন চামচ থেকে তেলটুকু পড়ে না যায়।

তাহলে ফিরে যাও আর দেখে এস আমার সব বিস্ময়কর জিনিস। তুমি কারো বাড়ি না দেখে তাকে বিশ্বাস করতে পার না। তাই না?

ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। স্বস্তি ফিরে আসে মনে। উঠে পড়ে সে তেলের চামচ হাতে নিয়ে। এমন বাড়ি দেখতে পারাও সৌভাগ্যের ব্যাপার। এবার তার সব দেখা হয়। ঘর-দোর-দেয়াল-ছাদ সব। বাগান দেখে, দেখে চারধারের আসমান ছোয়া পাহাড়, ফুলের সৌন্দর্য, সাবধানে এনে জড়ো করা সব সবকিছু। ফিরে যায় লোকটার কাছে।

কিন্তু তোমার হাতে তুলে দেয়া তেলটুকু কোথায়?

চামচের দিকে তাকিয়ে ছেলেটা অবাক হয়ে দেখে তেল নেই সেখানে।

তাহলে আমি তোমাকে মাত্র একটা উপদেশ দিতে পারি। অবশেষে বলে সবচে জ্ঞানীর চেয়েও জ্ঞানী লোকটা, সুখের গোপন উৎস হল, তোমাকে পৃথিবীর সব বিস্ময় দেখতে হবে, সেইসাথে মনে রাখতে হবে চামচের উপর থাকা এক বিন্দু তেলের কথাও।

বুঝে যায় সে অর্থটুকু। একজন ভ্রমণকারী ভ্রমণ করতে পারে, কিন্তু তার পর পালের কথা ভুলে গেলে চলবে না।

লোকটা তাকায় তার দিকে। তারপর মুখে, কপালে বিচিত্রভাবে হাত বুলিয়ে, আঙুল দিয়ে বাতাসে নকশা কেটে চলে যায় পশুর পাল নিয়ে।

 

১.০৯

তারিফার সবচে উঁচু জায়গায় একটা দুর্গ আছে। মুরদের বানানো। উপর থেকে কেউ চাইলেই দেখতে পাবে আফ্রিকা। সালেমের রাজা মেশিজেডেক সেদিন বিকালে বসে ছিল সেই দুর্গের গায়ে। ল্যাভেন্ডারের স্পর্শ নিচ্ছিল সারা গায়ে। ভেড়ার দল আশপাশে ঘোরাফেরা করে। নতুন মালিক আর নতুন পরিবেশের সাথে সাথে উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

তাদের শুধু খাবার আর পানি দরকার।

মেলশিজেডেক তাকিয়ে থাকে একটা ছোট ভেড়ার দিকে। আর কখনো দেখা হবে না রাখাল ছেলেটার সাথে, যেমন দেখা হয়নি ইব্রাহিমের সাথে। ইব্রাহিমের এক দশমাংশও সে নিয়ে নিয়েছিল। এই তার কাজ।

দেবতাদের কামনা থাকা ভাল নয়। কারণ তাদের লক্ষ্য নেই। তবু সালেমের রাজা কায়মনোবাক্যে ছেলেটার সাফল্য চায়।

আমার নামটা এক পলকে ভুলে যাবে সে, আফসোসের ব্যাপার। আবার বলা উচিত ছিল। যখন আমার কথা বলবে কাউকে, হয়ত বলবে আমি যেলশিজেডেক, সালেমের রাজা।

আকাশের দিকে তাকায় সে। তারপর বলে, আমি জানি, এটা গর্ব করার বিষয় নয়, প্রভু আমার। তবু, কোন এক বৃদ্ধ রাজা তার নামটা উজ্জ্বল করতে চাইলে দোষের কিছু কি আছে?

 

১.১০

আফ্রিকা কী অবাক করা, ভাবে সান্তিয়াগো।

তাঞ্জিয়ারের আর সব গলি-তস্য গলির শুড়িখানার মত এক মদের দোকানে। বসে আছে সে। কেউ কেউ বিশাল বাশের খস্তে করে ধূমপান করছে। বাড়িয়ে দিচ্ছে অন্যদের দিকে। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সে বিচিত্র সব ব্যাপার দেখছে। দেখছে লোকে হাতে হাত রেখেও হাটে। মেয়েদের মুখের উপর নামানো থাকে পর্দা। ল-ম-বা দাড়িওয়ালা সাধুরা উঠে যায় লম্বাটে টাওয়ারের শেষপ্রান্তে। তারপর সুরেলা গলায় আবৃত্তি করে কোন কবিতা। মানুষ সার দিয়ে দাড়ায়। তারপর হাঁটু মাটিতে ঠেকিয়ে আস্তে করে মাথা অবনত করে। নামিয়ে আনে মাটিতে।

কৃতজ্ঞতার ধারা নিজেকে শোনায় সে। ছেলেবেলায় গির্জায় বসে সে সন্ত সান্তিয়াগো মাতামোরোসের হাতে খোলা তলোয়ার নিয়ে সাদা ঘোড়ায় চড়ে থাকার দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায়। কেন যেন অনেক একা মনে হয় নিজেকে।

একটা ব্যাপারই তাকে এ অভিযান থেকে বিরত রাখতে পারত, ভুলে গেছে সে ব্যাপারটা। এ তল্লাটে আরবি এবং শুধু আরবি ভাষা বলা হয়।

শুড়িখানার মালিক এগিয়ে এল। পাশের টেবিলে রাখা তিতকুটে চায়ের বদলে তার একটু মদ দরকার।

এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। এখন ভাবতে হবে কী করে গুপ্তধন পাওয়া যায় সে বিষয়ে। ভেড়ার পাল হারিয়ে সে অনেক টাকা পেয়েছে। আর যার হাতে টাকা আছে তার আর যাই থাক, একাকীত্ব নেই। টাকা জাদু জানে। খুব। দেরি না করে তাকে পিরামিডের এলাকায় যেতে হবে। হয়ত চলেও যাবে। সোনার পাত গলায় পরা এক বুড়ো নোক শুধু দুটা ভেড়া পাবার জন্য মিথ্যা। কথা বলবে তা ঠিক বিশ্বাস্য নয়।

লক্ষণ নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে গলি পেরিয়ে যায়। লোকটা কী বোঝাতে চায় সে বুঝে গেছে। আন্দালুসিয়ার প্রান্তরে অনেক লক্ষণ বিচার করে চলতে হত তাকে। চলতে হত আকাশ দেখে, বাতাস দেখে, মাটির উর্বরতা দেখে, সূর্যের উচ্চতা দেখে। জানত, নির্দিষ্ট একটা পাখি দেখা গেলে বোঝা যাবে আশপাশে নির্দিষ্ট এক ধরনের সাপ আছে। কোন এক ধরনের ঝোপ দেখলেই বুঝতে হবে কাছাকাছি আছে পানির উৎস।

ঈশ্বর যদি ভেড়ার পালকে এত ভালভাবে চালাতে জানেন, তিনি একজন মানুষকেও চালাতে পারবেন। কেমন একটা তৃপ্তি আসে মনে। চা আর তেমন খারাপ মনে হয় না।

কে তুমি? স্প্যানিশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল একজন।

স্বস্তির পায় ছেলেটা। লক্ষণের কথা ভাবছিল আর তার ভাষায় কেউ প্রশ্ন। করে বসল।

আপনি স্প্যানিশ বলছেন কী করে? পশ্চিমা পোশাকে কেতাদুরস্ত কমবয়েসি ছেলেটার দিকে তাকায় সে। তার চামড়া বলে দেয়, আসলে এ শহরেরই অধিবাসী। উচ্চতা আর বয়স একই হবে। সান্তিয়াগোর মত।

এখানে প্রায় সবাই কমবেশি স্প্যানিশ বলতে পারে। মাত্র দু ঘন্টার পথ পেরিয়ে গেলেই স্পেন।

তাহলে বস দেখি। কিছু নেয়া যাক। আমার জন্য এক গ্লাস মদের জন্য বল। এ চা খেয়ে খেয়ে মুখে ঘা পড়ে যাবার দশা।

এ দেশে মদ নেই। এখানকার ধর্মে মদের কোন স্থান নেই।

এখন তার যাবার কথা পিরামিডে, জানায় ছেলেটা। আর একটু হলেই গুপ্তধনের কথাও বলে ফেলত। সামলে নিল। তাহলে আরবটা কিছু অংশ চেয়ে বসতে পারে সেখানে নিয়ে যাবার বদলে। আর যা তোমার হাতে নেই সেটা। দিতে চাওয়াটা এক ধরনের খারাপ কাজ।

তুমি পারলে নিয়ে যাও না। গাইড হিসাবে নাহয় আমি কিছু টাকাপয়সা দিব।

সেখানে কী করে যেতে হয় সে সম্পর্কে কোন ধারণা আছে তোমার?

দোকানি পাশেই দাড়িয়ে একমনে শোনার চেষ্টা করছে তাদের কথোপকথন। শুনুক। সে পেয়ে গেছে একজন গাইডকে। এখন আর হাতছাড়া করা যাবে না।

তোমাকে পুরো সাহারা মরুভূমি পার করতে হবে। বলছে ছেলেটা, আর এজন্য তোমার দরকার টাকা। আগে জানতে হবে যথেষ্ট টাকা আছে কিনা।

প্রশ্নটা অবাক করে তাকে। একই সাথে মনে পড়ে যায় বৃদ্ধের কথা। যখন তুমি কিছু পাবার জন্য চেষ্টা করবে তখন পুরো বিশ্বব্রহ্মান্ড তা পাইয়ে দেয়ার জন্য ফিসফাস শুরু করে দিবে।

পাউচ থেকে টাকাপয়সা দেখায় সে। দোকানিও দেখেছে সামনে এসে। এরপর প্রথমে চোখাচোখি হয় ছেলেটা আর দোকানির মধ্যে, আরবিতে দু একটা কথা হয়।

চল, চলে যাই। বলল কালো আরব ছেলেটা, লোকটা আমাদের চলে যেতে বলছে।

টাকা দিতে এগিয়ে গেল সে। জামা ধরে বসল দোকানি। তারপর রাগি রাগি গলায় অনর্গল আরবিতে কী যেন বলে গেল।

সান্তিয়াগোর গায়ে বল কম নেই। কি ভিনদেশে এসে গায়ের জোর দেখানো ভাল হবে কিনা ভেবে পায় না সে। সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে অন্য ছেলে। দোকানিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলে, ও তোমার টাকাকড়ি নিয়ে নিতে চেয়েছিল। তাঞ্জিয়ার এলাকাটা বাকি আফ্রিকার মত নয়। এটা হল বন্দর। আর সব বন্দরেই চোর ছাচোড়ের কোন অভাব নেই।

নতুন বন্ধুকে বিশ্বাস করা যায়। ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে বের করে এনেছে সে সান্তিয়াগোকে। টাকা বের করে গুণল সে।

আমরা কালকে পিরামিডে যেতে পারি, পয়লাগুলো হাতে নিতে নিতে বলল ছেলেটা, কিন্তু আমাকে আগে দুটা উট কিনতে হবে।

তাঞ্জিয়ারের সরু পথ ধরে হেটে চলে তারা। সবখানে নানা পণ্যের পসরা। আসল বাজার বিশাল এক চতুরে। হাজার লোকের ভিড়। দরদাম করছে, কিনছে, বিক্রি করছে। সবজি যেমন আছে তেমনি আছে তামাক। বিশাল সব ছুরিও আছে, আছে চোখ জুড়ানো গালিচা। কিন্তু নতুন বন্ধুর উপর থেকে চোখ সরানো যায় না। কারণ তার কাছেই সমস্ত পয়সা। একবার মনে হলে চেয়ে নিয়ে নেয়। কিন্তু তাতো ঠিক বন্ধুসুলভ হবে না। নতুন দেশের রীতিনীতির কিছুই জানে না সান্তিয়াগো।

আমি শুধু তাকে দেখব। নিজেকে শোনায় সে। গায়ের শক্তিতে সান্তি মাগোই উতরে যাবে।

হঠাৎ সমস্ত চিন্তা তালগোল পাকিয়ে যায়। এত সুন্দর তলোয়ার এর আগে কখনো দেখেনি সে। খাপটায় রূপার এম্বস করা। হাতল কালো। দামি সব পাথর বসানো সেখানে। মিসর থেকে ফেরার সময় সে এ তলোয়ারটা কিনবে।

দোকানদারকে একটু জিজ্ঞেস করে দেখতে তলোয়ারটার দাম কত। বন্ধুকে বলে সে।

তার পরই মুখ ঘোরায়। সচকিত হয়ে। নড়তেও ভয় পায়। কী দেখবে কল্পনা করা সহজ।

চারপাশে ব্যস্ত মানুষ। আসছে, যাচ্ছে, আলাপ করছে। অচেনা খাবারের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। শুধু সেই বন্ধু নেই।

বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তার। অপেক্ষা করবে বন্ধুর জন্য। ফিরে আসবে সে। হয়ত কোন কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তারা। কিন্তু চলে যেতে পারেনা ছেলেটা।

লম্বা টাওয়ারের উপর চলে গেছে এক সাধু। সেই বিচিত্র সুরে কী যেন পাঠ করছে। তারপর, শ্রমিক পিপড়ার বাসার মত সবাই দোকানপাট ছেড়ে চলে গেল।

পাটে যেতে বসেছে সূর্যও। ডুবতে বসেছে। আস্তে আস্তে সূর্যাস্ত হয় চত্বরের সাদা বাড়িগুলোর পিছনে। মনে পড়ে যায়, গতদিন সূর্যাস্তের সময় সে। আরেক মহাদেশে ছিল। তার সাথে ছিল আটটা ভেড়া। আশা ছিল এক মেয়ের সাথে দেখা হবে। সেখানকার সব খানাখন্দ তার হাতের তালুর মত স্পষ্ট। সেখানকার সব মাঠ তার চেনা। এরপর কী হবে তাও জানা। কিন্তু আজ একেবারে অচিন এক দেশে কপর্দকহীন দাড়িয়ে আছে সে। কোন ভেড়া নেই, অর্থ নেই এমনকি ভাষাটা পর্যন্ত অজানা। আজ আর সে রাখাল নয়। দেশে ফিরে যাবার টাকাটাও নেই হাতে।

একবার সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে এতকিছু হয়ে গেল! এত দ্রুত জীবনটা বদলে যাবে কখনো কল্পনা করেনি।

এত খারাপ লাগছে যে পারলে কেঁদে ফেলে। ভেড়াগুলোর সামনে কোনদিন একটুও কাঁদেনি। সে কঁদে কারণ চত্বরে আর কেউ নেই, কারণ ঈশ্বর ন্যায়বিচার করেননা, কারণ তিনি এভাবে স্বপ্নদ্রষ্টাদের শাস্তি দেন।

ভেড়া থাকতে আমি ছিলাম সুখি, যেসব মানুষ আমাকে দেখত, স্বাগত জানাত। কিন্তু এখন একেবারে নিঃস্ব। লোকে বিশ্বাস করবে না। ঠকেছি যে! যারা নিজের সম্পদ পেয়ে গেছে তাদের ঘৃণা করব কারণ আমি আমারটা পাইনি। এখন নিজের যেটুকু আছে সেটা নিয়েই পথ চলতে হবে। দিগ্বিজয়ী হবার তুলনায় আমি কিছুই নই।

পাউচ খোলে সে। কী আছে? জাহাজে খেয়ে রেখে দেয়া কিছু আছে নাকি? বইটা আছে, আছে ভারি জামা, আর আছে বুড়ো লোকটার দেয়া পাথরদুটা।

পাথরে চোখ পড়ে মনে পড়ে গেল আশার কথা। ছটা ভেড়ার বিনিময়ে সে সোনার পাত থেকে তুলে আনা দুটা রত্ন পেয়েছে। এগুলো বেচে দিলে ফিরে, যাবার টিকিটটা ভাত কাটা যাবে।

এবার আর ঠকব না আমি। এটা বন্দরনগরী, আর বন্দরে আছে চোর ছাচোড়ের দল। রত্ন দুটাকে পকেটে রেখে দেয় সে।

এবার সে দোকানির ব্যাপারটা বুঝতে পারে। আসলে পানশালার লোকটা। ঐ বন্ধুর কথা বলছিল। তাকে যেন বিশ্বাস না করে। আমিতো আর সবার মত, যা বিশ্বাস করার চেষ্টা করি তাই বিশ্বাস করি। যেভাবে দেখার চেষ্টা করি সেভাবেই দেখি।

পকেটে হাত বুলিয়ে নেয়ার সাথে সাথে অনুভব করে পাথরগুলো, অনুভব করে সেই কথা, কিছু পাবার চেষ্টা করলে পুরো বিশ্বব্রহ্মান্ড তোমাকে তা পাইয়ে দেয়ার জন্য ফিসফাস করতে থাকবে।

এ কথার পূর্ণ অর্থ এখনো ধরতে পারেনি সে। এখন পড়ে আছে শূণ্য বাজারে। একটা ফুটা পয়সা নেই হাতে। রক্ষা করার জন্য কোন ভেড়া নেই।

কিন্তু এ পাথরগুলোই প্রমাণ করবে যে সে এমন এক রাজার সাথে দেখা করেছে যে তার অতীত জানত একেবারে আয়নার মত ঝকঝকে মন নিয়ে।

এগুলোর নাম উরিম আর ঘুমিম। এরা তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। লক্ষণ চিনতে সাহায্য করবে।

পরখ করে দেখা যাক না। প্রথমে সে পাথরদুটাকে পাউচে রেখে দেয়। সুস্পষ্ট প্রশ্ন করার জন্য তুলে আনে একটা।

বুদ্ধের আশীর্বাদ এখনো আমার উপর আছে? কালো পাথর। হ্যাঁ। আমি কি আমার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব?

বলেই আবার হাত ঢোকায় পাউচে। ফাঁক গলে পাথর দুটা পড়ে গেছে। সেখানে যে ছিদ্র ছিল তাও সে জানত না। এ ফাঁকে আরেক কথা মনে পড়ে।

লক্ষণ চেনার চেষ্টা কর, তারপর অনুসরণ কর সেগুলোকে। বলেছিল বয়েসি লোকটা।

সুলক্ষণ। ফিক করে হেসে ফেলে সান্তিয়াগো। পাউচে পুরে ফেলে সেগুলোকে। ছিদ্র একটা আছে, সেখান দিয়ে যে কোন সময় পড়ে যেতে পারে। পাথরগুলো। সেসবের পরোয়া নেই। অন্য চিন্তা ঘুরছে মাথায়।

আমাকে আমার নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। নিতে হবে নিজের সিদ্ধান্ত। শোনায় নিজেকে।

মনে কেন যেন শান্তির পরশ। বয়েসি লোকটা এখনো তাকে আশীর্বাদ করছে। খালি হয়ে যাওয়া বাজারের মাঝে দাড়িয়ে চারদিকে তাকায় সে। জায়গাটা অদ্ভুত নয়, নতুন।

হাজার হলেও, সে নূতন এক তল্লাটে এসে হাজির হয়েছে। এমন এক জায়গা, মাত্র দু ঘন্টার পথ দূরে, যেখানকার কথা রাখালরা ধরতে গেলে জানেই না। নতুন ধরনের মানুষ, নতুন আচরণ, নতুন ব্যবস্থা আর নতুন সব পণ্য। মন খারাপ লাগে তলোয়ারের কথা মনে পড়লে, কিন্তু সে দেখেছে তো! পিরামিডে যেতে না পারলেও এসব মন্দ কী? চোরের নিকুচি করে সে। কত চোর আরো গরিব সব মানুষের সর্বনাশ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। কত অভিযাত্রি, কত মানুষ সর্বশান্ত হয়ে যায়!

আমি এক অভিযাত্রি, গুপ্তধনের সন্ধানে বেরিয়েছি। নিজেকে শোনায় সে।

 

১.১১

কে যেন ঝাঁকিয়ে জাগানোর চেষ্টা করছে তাকে। এক ঘুমন্ত বাজারের ঠিক মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। এখন এখানে বয়ে যাবে জীবনের স্রোত।

উঠে বসেই যখন ভেড়াগুলোকে জাগানোর জন্য চারপাশে তাকায়, বিচিত্র এক অনুভূতি হয়। খুব বেশি কষ্ট নয়। নতুন এক জায়গায় আছে সান্তিয়াগো। এখন আর ভেড়ার জন্য খাবার পানির জন্য হন্যে হয়ে মরতে হবে না। চাইলেই গুপ্তধনের খোঁজে বের হওয়া যায়। পকেটে কানাকড়ি নেই তো কুছ পরোয়া নেই। আছে বিশ্বাস। কাল রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, বইতে পড়া আর সব অভিযাত্রির মত সেও খুশি থাকবে, তাদের মত অভিযাত্রি হবে।

ব্যস্ত হয়ে উঠছে বাজার। চকলেট বিক্রি করার লোকটার মুখে কী নির্মল হাসি। সে জানে কী করতে হবে, কী করছে। জীবনে সুখ আছে তার। বুড়ো অচেনা রাজার কথা মনে পড়ে যায় তার।

এ চকলেটওয়ালা কোন বণিকের মেয়েকে বিয়ে করার জন্য চকলেট বিকিকিনি করে না। সে কাজটা করতে চায়, এজন্য করে। সিদ্ধান্তে আসে সে।

সে-ও তো বুড়ো লোকটার মত একই কাজ করতে পারে। যারা লক্ষ্য থেকে দূরে সরে গেছে বা খুজে পাচ্ছে না তাদের সাহায্য করতে পারে। শুধু তাদের দিকে তাকাতে হবে। তাদের মনোভাব বুঝতে হবে। তবু, আগে কখনো করেনি।

চকলেটওয়ালা তার দিনের শুরু করল সান্তিয়াগোকে একটা সেধে। ধন্যবাদ জানিয়ে তুলে নেয় সে জিনিসটুকু। তারপর এগিয়ে চলে সামনে। টের পাচ্ছে, অস্থায়ি দোকানগুলো সাজানোর সময় একজন আরবিতে কথা বলেছিল। বাকিরা স্প্যানিশে।

একে অন্যকে বুঝাতেও পারছিল বেশ ভালভাবে।

নিশ্চই এমন কোন ভাষা আছে যেটা শব্দের উপর ভর করে চলে না? আগেই ভেড়ার সাথে আমার এমন হয়েছিল, এখন হচ্ছে মানুষের সাথে।

অনেক নতুন বিষয় শিখছে সে। কোন কোন ব্যাপার আদৌ নতুন নয়, জীবনে আগেও এসেছে, কিন্তু অনুভব করছে নতুনভাবে। আগে টের পায়নি কারণ অভ্যাস ধরে গিয়েছিল। ভাবে, যদি আমি এসব ভাষা বুঝতে পারি তাহলে বুঝতে পারব বিশ্বটাকে।

মন শান্ত করে নিয়ে সে স্থির করে, তাঞ্জিয়ারের গলি ধরে এগিয়ে যাবে। এছাড়া লক্ষণ বোঝার তো কোন উপায় নেই। পথ চলায় কোন ক্লান্তি থাকার কথা নয় রাখাল ছেলের। আসলে, এসব শিখে আসায় কাজে দিচ্ছে। এক একটা শিক্ষা অন্য ক্ষেত্রেও অসাধারণ প্রভাব ফেলে।

সবই আসলে এক। বলেছিল বয়েসি রাজা।

১.১২

স্ফটিকের বণিক জেগে ওঠে সকাল সকাল। নিত্যদিনের মত আজও মনে সেই অস্থিরতা। ত্রিশ বছর ধরে একই জায়গায় কাজ করে। পাহাড়ের পাশে। খুব কম ক্রেতা যায় এদিক দিয়ে। এখন আর বদলে দেয়া যাবে না ব্যাপারগুলোকে। সে খুব কষ্টে যেটা শিখেছে, তা হল, স্ফটিকের জিনিসপাতি কেনা এবং বেচা। এককালে অনেক মানুষ চিনত তার দোকানটা: আরব বণিক, ফরাসি আর ইংরেজ ভূতত্ত্ববিদ, উঁচু হিল পরা জার্মান সেনা।

সেসব দিনে মনে হত টিক বেচা খুব ভাল কাজ। বয়সটা আরেকটু বাড় ক ধনী হবে সে, তারপর অনেক মেয়ে পাওয়া শুধু মুখের কথা।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বদলে গেল তাঞ্জিয়ার। পাশের সিউটা শহর কোথেকে শুরু হয়ে চো চো করে চলে গেল তাঞ্জিয়ারকে ছাড়িয়ে। পড়ে গেল বেচাকেনার হার। আস্তে ধীরে সরে গেল প্রতিবেশীরা। এখন পাহাড়ের উপর হাতেগোণা কয়েকটা দোকান পাওয়া যাবে। সামান্য কয়েকটা ছোটখাট দোকান ঘুরে দেখার জন্য কে চড়বে পাহাড়ের গায়ে?

কিন্তু স্ফটিক ব্যবসায়ীর আর কোন উপায় নেই। এক কাজ করতে করতে টানা ত্রিশটা বছর কাটিয়ে বসে আছে। এখন নতুন কী করবে!

রাস্তায় লোকে যাতায়ত করে সামান্যই, সেদিকে তাকিয়ে থাকে সে মনমরা হয়ে। এ কাজ করতে করতে এখন সবার সময়-মাত্রা জানা হয়ে গেছে। কিন্তু খাবার সময়ের ঠিক আগে আগে এক ছেলে হাজির হল দোকানের সামনে। পরনে সাদাসিধা পোশাক, আর স্ফটিক বণিকের ধুরন্ধর চোখ একবার দেখেই বুঝতে পারে এ ছেলের কিছু কেনার মত টাকা নেই। তবু, কেন যেন সে খাবারের ব্যাপারটা মিনিট কয়েকের জন্য পিছিয়ে দিল। দেখা যাক না, কী কথা হয় ছেলেটার সাথে।

 

১.১৩

দরজার বাইরে একটা কার্ড ঝুলছে। লেখা- এখানে অনেক ভাষায় কথা বলা যাবে। কাউন্টারের পিছন থেকে এগিয়ে এল এক লোক।

আপনি চাইলে জানালায় রাখা কাচগুলো পরিষ্কার করে দিতে পারি, বলল ছেলেটা, এখন যে ছিরি হয়েছে, তাতে কারো কেনার রুচি থাকবে না।

কোন জবাব না দিয়ে লোকটা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

বিনিময়ে নাহয় খাবার জন্য কিছু দিবেন।

লোকটা এখনো কোন কথা বলল না। সে একবার ভাবে রত্নগুলোর কথা। মরুভূমিতে কোন কাজে লাগবে না। ভারি জামা বের করে মুছতে শুরু করে স্ফটিকগুলো। আধঘন্টার মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যায় জানালায় রাখা সব। এর মধ্যে দুজন খদ্দের এসে কিনেও নেয় কিছু কিছু।

কাজ শেষ করে বণিকের কাছে খেতে চায় কিছু।

চল দেখি, খাওয়া যায় নাকি কিছু। বলে বণিক।

সামনে ছোট সাইন ঝুলিয়ে চলে যায় কাছের ছোটখাট কাফেতে। জায়গামত, একমাত্র টেবিলে বসার পর হেসে ওঠে স্ফটিক ব্যবসায়ী।

তোমার কিছু পরিষ্কার করার দরকার ছিল না। কোরান বলেছে, আমার কাউকে খাওয়াতে হবে।

আচ্ছা। তাহলে কাজটা করতে দিলেন কেন?

কারণ ফুটিকগুলো আসলেই নোংরা হয়ে গিয়েছিল। আর আমাদের দুজনের মন থেকেই না বোধক চিন্তা সরানো জরুরি হয়ে পড়েছিল।

খাবার শেষ হলে সান্তিয়াগোর দিকে তাকায় বণিক লোকটা।

আমার দোকানে কাজ করবে নাকি? কাজ করার সময় দুজন খদ্দের আসে। ভাল লক্ষণ, কী বল?

লোকে লক্ষণ নিয়ে খুব ভাবে, ছেলেটা সিদ্ধান্তে এল। বলে তারচে বেশি। কিন্তু ভিতরে থাকা অর্থটা ধরতে পারে না। যেমন অনেক বছর ধরে বুঝতেই পারিনি কথা ছাড়াই কী এক ভাষায় যেন কথা বলি আমি ভেড়াগুলোর সাথে।

বল? কাজ করবে আমার সাথে?

আজ দিনটার জন্য করতে পারি। এমনকি সূর্য ওঠা পর্যন্ত সারারাত ধরে কাজ করতে কোন আপত্তি নেই। দোকানের প্রতিটা টুকরা সাফসুতরো করে দিব। বিনিময়ে আপনি আমাকে মিশর যাবার টাকা দিবেন। কালই।

হাসল বণিক, এমনকি তুমি যদি সারা বছর ধরে আমার স্ফটিকগুলো পরিষ্কার করে যাও, প্রতিটা বিক্রি থেকে পাও মোটা অঙ্কের টাকা, তবু মিশরে যাবার জন্য ধার করতে হবে তোমাকে। এখান থেকে সেখানে হাজার কিলোমিটারের মরুভূমি। বলা উচিত আরো অনেক বেশি।

এরপর এত লম্বা একটা নিরবতা নেমে আসে যে মনে হয় পুরো শহর ঘুমিয়ে গেছে আচানক। কোন বাজার নেই, বাজারে নেই দরকষাকষি, মুয়াজ্জিনের আজান নেই, নেই নতুন দেশ, নতুন চাওয়া, এমনকি নেই সেই পুরনো রাজা। পিব্রামিড বলেও কিছু নেই এ জগতে। পুরো জগত যেন থেমে গেছে, কারণ থমকে গেছে ছেলেটার হৃদয়।

সে বসে আছে সেখানে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরে। যদি এখন মরে যেতে পারত সে, যদি থেমে যেত সবকিছু!

অবাক হয়ে সান্তিয়াগোর চোখেমুখে চেয়ে থাকে বণিক। সকালে দেখা সব আনন্দ উবে গেছে কী করে যেন।

দেশে ফিরে যাবার টাকাটা দিতে পারি আমি তোমাকে, বাবা, অবশেষে বলে স্ফটিক ব্যবসায়ী।

সান্তিয়াগোর মুখে কোন জবাব নেই। উঠে দাঁড়ায়, টেনেটুনে ঠিক করে সবকিছু, তারপর হাতে তুলে নেয় পাউচটা।

আমি আপনার জন্য কাজ করব। বলে সে।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলে শেষ কথাগুলো, টাকা দরকার। ভেড়া কিনে আনার টাকা।

One thought on “১. ছেলের নাম সান্তিয়াগো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *