১৯. বনাম তুষারম

বনাম তুষারম

পরদিন, বাইশে মার্চ, সকাল ছটা থেকেই ফেরার আয়োজন শুরু হলো। সন্ধ্যালোকের শেষ ঝলশানিটুকু যেন নিকশ কালো রাত্রির মধ্যে গলে যাচ্ছে। কনকনে ঠাণ্ডায় আমরা থেকে-থেকে কেঁপে উঠছি। আকাশে ক্রমশ তারাদের দীপ্তি বেড়ে যাচ্ছে, আর তারই মধ্যে ঝলমল করছে কুমেরুর সেই আশ্চর্য মেরুতারা।

জলাধারগুলি ভর্তি করে জলের তলায় ডুব দিলে নটিলাস। হাজার ফুট। নিচে আস্তে, ঘণ্টায় পনেবে মাইল বেগে, ফিরে চললো উত্তর দিকে। সন্ধ্যাবেলাতেই সে হিমশৈলের তলা দিয়ে ফেরা শুরু করলো!

রাত যখন তিনটে, এক দারুণ ঝাঁকুনিতে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। উঠে বসত-না-বসতেই আবার এক ঝাঁকুনির চোটে মেঝেয় ছিটকে পড়লুম আমি। কোনোরকমে দেয়াল ধরে-ধরে সেলুনে গিয়ে দেখি তখনো আলো জ্বলছে বটে, কিন্তু সারা ঘরে যে প্রলয় হয়ে গেছে একটু আগে। দেওয়ালের ছবিগুলো বেঁকে গেছে, ট্যারাবাঁকা হয়ে ঝুলছে তারা, আশবাবপত্র এলোমেলো ছিটকে পড়েছে। বোঝা গেলো নটিস হঠাৎ কোন কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে কাৎ হয়ে পড়ে গেছে। বাইরে মস্ত শোরগোল শোনা গেলো, কিন্তু ক্যাপ্টেন নেমোর দেখা পাওয়া গলো না! গভীরতা মাপবার যন্ত্র দেখা গেলো তখনও এক হাজার ফুট নিচেই রয়েছে।

ক্যাপ্টেন নেমে এলেন একটু পরেই; চোখমুখে দারুণ উদ্বেগের ছাপ। হঠাৎ একটি হিমশৈল না, উল্টে যাওয়ার সময় নটিলাস-এর উপর এসে পড়েছে। এখন অবশ্য আস্তে আস্তে ভেসে উঠছে পাহাড়টা, সেই সঙ্গে নটিলাসকেও তুলে ধরছে একটু-একটু করে, আর সেই জন্যেই নটিলাস নাকি এখনো কাৎ হয়ে পড়ে আছে বরফের উপর। ধারগুলো খালি করে ফেলে মাল্লারা প্রাণপণে চেষ্টা করছে নটিলাস কে মুক্ত করতে, কিন্তু বিপদের আশঙ্কা তাতে একটুও কমছে না। নটিলাসকে যে আস্তে-আস্তে তুলে ধরছে সেই হিমশৈল, তা গভীরতা মাপবার যন্ত্র দেখেই বোঝা গেলো, কারণ যন্ত্রে একটু-একটু বরে গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে। এই তুলেশরা যদি বন্ধ করা না-যায় তাহলে জাতিলের মধ্যে পড়বে নটিলাস, জাতার মধ্যে গম যেমন ধেৎলে যায় তেমনিভাবে উপরের আর নিচের বরফের মধ্যে ধেৎলে চ্যাপ্টা হয়ে যাবে।

কিন্তু আপাতত এই আশঙ্কাকে নস্যাৎ করে একটা মস্ত ঝাঁকুনি দিয়ে আবার ধীরে-ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো দেয়ালগুলো। দশ মিনিটের মধ্যেই আগের মতো আবার জলের মধ্যে ভাসতে লাগলো জাহাজ। কিন্তু জানালা দিয়ে যে দৃশ্য চোখে পড়লো, তা আমাকে আতঙ্কে ভরে দিয়ে গেলো। উপরে-নীচে ডাইনে-বাঁয়ে চারপাশে বরফের অবরোধ, আর তারই মধ্যে এতটুকু সংকীর্ণ জলের মধ্যে ভাসছে নটিলাস। হিমশুভ্র বরফের উপর তীব্র আলো এসে পড়েছে জাহাজ থেকে, আর প্রতিফলিত হয়ে তীব্র বিচ্ছুরণে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।

আস্তে-আস্তে সামনে এগোতে থাকে নটিলাস। কিন্তু তক্ষুনি যেন তীব্র আলোয় চোখ অন্ধ হয়ে গেলো। নটিলাস চলছে বলেই সেই তীব্র শুভ্র প্রবল আলো যেন আরো বেশি করে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে গেলো। জানালা বন্ধ করে দিয়েও প্রথমটায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। যেন এই প্রবল বিচ্ছুরণ দৃষ্টিশক্তি হরণ করে গেছে।

প্রাতঃকালে আবার ছোট্ট একটা ঝাঁকুনি লাগলো; বুঝতে পারলুম বরফের দেয়ালে বা খেয়েছে নটিলাস! এবার নটিলাস ধীরে ধীরে পিছোতে লাগলো খোলা জলের পথ পাবার জন্য। কিন্তু সাড়ে আটটার সময় যখন পিছনেও আবার প্রচণ্ড ধাক্কা লাগলো, তখন বুঝতে পারলুম দক্ষিণে যাবার পথও আর নেই।

আর সেই কথাই গম্ভীরভাবে ঘোষণা করলেন ক্যাপ্টেন নেমে! জানালেন, প্রফেসর আবোন, আমরা আটকা পড়েছি। এবার তুষারমরুর সঙ্গে সরাসরি লড়াই ঘোষণা হলো।

নেড আর কোনসাইল তখন সেখানে বসে ছিলো। ক্যাপ্টেন নেমোর কথা শেষ। হবার আগেই নেড টেবিলের উপর এক প্রচণ্ড ঘুষি বসিয়ে দিলে। কোনসাইল টু শব্দটিও না-করে বিবর্ণ মুখে বসে রইলো। আমি কোনো কথা না-বলে ক্যাপ্টেন নেমোর দিকে তাকিয়ে রইলুম। বুকের উপর আড়াআড়িভাবে দু-হাত ভাজ করে গম্ভীরভাবে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন তিনি-মুখবর্ণ পাণ্ডুর, শুধু চোখ দুটি অস্বাভাবিক ভাবে জ্বলছে।

একটু পরেই ক্যাপ্টেন আমাদের এই বিপন্ন অবস্থার সব ভয়ংকর সম্ভাবনার কথা ব্যাখ্যা করে বললেন। পরিস্থিতি যে-রকম দাড়িয়েছে, তাতে যদি চারপাশের বরফের বিস্তার নটিলাসকে চুর্ণ নাও করে, বাতাসের ট্যাঙ্কে যতনি হাওয়া ঘরে, তাতে দু-দিন চলে নটিলাস-এর। একটানা ছত্রিশ ঘণ্টা জলের তলায় আছে নটিলাস, আর আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে বাতাসের ভাড়াও ফুরিয়ে যাবে। ফলে মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টাই সময় আছে হাতে-তারই মধ্যে যেমন করে হােত এই বরফের অবরোধের মধ্যে পথ কেটে বেরিয়ে পড়তে হবে নটিলাসকে।।

এর মধ্যেই নটিলাস-এর বারোজন ডুবুরি একেকটা কুড়ুল হাতে বরফের মধ্যে নেমে পড়েছিলো। নেড ল্যাণ্ড আর ক্যাপ্টেন নেমোও গিয়ে কুডুল হাতে তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। এখানকার বরফ প্রায় তিরিশ ফুট পুরু: নটিলাস যাতে গলে যেতে পারে, সেই জন্য যত বড় গর্ত খুঁড়তে হবে তার জন্য ৭০০০ ধন-গজ বরফ সরানো দরকার। ক্ষিপ্রহাতে বরফ কাটা শুরু হলো। একেকটা বরফের চাঙড় মূল তূপ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সঙ্গে সঙ্গে ডিগবাজি খেয়ে ভেসে উঠতে লাগলো উপর দিকে, আর একটু একটু করে পথ হতে লাগলো।

ঘণ্টা দুয়েক পর নেড ল্যাণ্ড ও অন্যান্যরা ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামের জন্য ফিরে এলো; এবার যাদের হাতে বরফ কাটার ভার পড়লো, তাদের মধ্যে আমি আর কোনসাইলও রইলুম। দু-ঘণ্টা পরে বিশ্রামের জন্য নটিলাস-এ ফিরে এসে শিরস্ত্রাণ খুলতেই স্পষ্ট বুঝতে পারলুম ইতিমধ্যেই নটিলাস-এর বাতাস আস্তেআস্তে ভারি আর দূষিত হয়ে উঠছে।

কিন্তু এভাবে কাজ করে কোনো ফল হবে বলে মনে হলো না। প্রথমত ৭০০০ ঘন গজ ব্রফ সরাতে হলে অন্তত পাঁচদিন ধরে একটানা বরফ কাটতে হবে আমাদের। অথচ হাওয়া ফুরিয়ে যাবে দু দিনেই। আর, দ্বিতীয়, বরফ খুড়েই বা কি লাভ? কারণ এই নিদারুণ ঠাণ্ডায় কিছুক্ষণের মধ্যেই টলমলে জলও বরফ হয়ে জমে যাচ্ছে–যেখানটাই খুড়ছি, সেখানটায় পরক্ষণেই আবার বরফের রাশি নিরেট কঠিন ধবল অট্টহাসির মতো জমে যাচ্ছে-যেন কোনো তুহিনদন্তিল নিষ্টর ব্যঙ্গ করে, যেন এই পাষাণ তুষারম আমাদের সমস্ত চেষ্টাকে উদ্দেশ করেই বল হাশে ফেটে পড়ছে!

আর নিষ্ফল চেষ্টার মধ্যেই পরদিন উপস্থিত হলো বাতাসের অভাবে শ্বাসকষ্ট। সেই সঙ্গে আরো ভয়ংকর বিপদের পূর্বাভাস হিসাবে দেখা গেলো বরফের ছাদ ও দুপাশের দেয়াল রাতারাতি আরো পুরু হয়ে উঠেছে আর অনেকখানি এগিয়ে এসেছে নটিলাস-এর দিকে। জাহাজের সামনে পিছনে বোধহয় দশ ফুট করেও জল নেই।

ক্যাপ্টেন নেমো আর-একটি সমাধান বের করলেন মাথা খাটিয়ে। নটিলাস, এর বড়-বড়ো চুল্লিতে জল গরম করে সেই টগবগে জল পিচকিরির মতো চারপাশের দেয়ালে ছড়িয়ে দিতে লাগলেন। ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেলে তাপমাত্রা, অবস্থা ঈষৎ নিয়ন্ত্রণে এলো। রাত্রির মধ্যেই তাপমাত্রা উঠে এলো শূদ্যাঙ্কের এক ডিগ্রি নিচে। শূন্যাঙ্কের দু-ডিগ্রি নিচে জল জমে বরফ হয় বলে আপাতত আর বরফের দেয়ালের চাপে পিষ্ট হয়ে মরার ভয় রইলো না। কিন্তু ভীষণ হয়ে উঠলো শ্বাসকষ্ট।

মাত্র চার ঘন-গজ বরফ খুড়লেই নটিলাস পথ পাবে, সাতাশে মার্চ আমরা এই অবস্থায় পৌঁছলুম। আরো দুদিন দু রাত একটানা পুরো খাটলে হয়তো এই চার-গজ বরফের মধ্যে ছাদা করা যাবে। কিন্তু আর যে মোটেই বাতাস নেই। বেলা তিনটের সময় আমার চেতনা যেন বিলুপ্ত হয়ে এলো। অন্যদের অবস্থাও কিছু ভালো নয়। তবু তারই মধ্যে পুরোদমে কাজ চললো। ইশশ করে নিশ্বাস নিচ্ছি আমরা, ঘূর্ণিরোগাক্রান্তের মতো টলছি, প্রচণ্ড ব্যথায় মাথার ভিতরটা ছিড়ে পড়তে চাচ্ছে; তবু তারই মধ্যে অনেকটা কাজ এগিয়েছে আমাদের : আর মাত্র দু-গজ বরফ কাটতে হবে।

ছদিন হলো এই ভাবে বন্দী হয়ে আছি। ক্যাপ্টেন নেমোরও নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তিনি এমন অবিচল আছেন যে তাকে দেখে কিছুই বোঝবার জো নেই। যখন আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, তখন নেমো মরিয়া হয়ে স্থির করলেন শেষ স্তরটুকু তিনি নটিলাসকে পূর্ণবেগে চালিয়ে বরফের দেয়াল ভেঙে চুরমার। করে বেরিয়ে যাবেন। নটিলাস-এর জলাধারে জল ভরা হলল, ক্রমশ ভারি হয়ে উঠলো নটিলাস। তারপরেই প্রচণ্ড শব্দে, বিস্ফোরকের মতে, বরফের স্তর কাটিয়ে নটিলাস নিচে ডুবে গেলো।।

পূর্ণবেগে উত্তরদিকে ছুটে চললো নটিলাস। কিন্তু আর কতক্ষণ এভাবে থাকবে? আরো একটা দিন? পুরো একটা দিন? ততক্ষণ আমরা বেঁচে থাকতে পারবো?

আমার আর হুঁশ ছিলো না, আচ্ছন্নের মতো পড়ে আছি নটিলাস-এর সেলুনে, আর কোনসাইল ও নেড তাদের জীবন বিপন্ন করে আমার নাকের কাছে ছোট্ট একটা অক্সিজেনের টিউবের শেষ বাতাসটুকু ধরে আছে।

মাত্র বিশ ফুট বরফের তলা দিয়ে যাচ্ছিলো তখন নটিলাস। হঠাৎ জাহাজের পিছন দিকটা হেলে পড়লো, মাথা উপর দিক করে মন্ত দুরমুশের মতো প্রচণ্ড বেগে নটিলাস আছড়ে পড়লো বরফের ছাদে। তারপর একটু পিছিয়ে আবার সেই আগের জায়গাতেই হাতুড়ির মতো ধাক্কা খেয়ে বরফ ভেঙে ছিটকে বেরিয়ে গেলো নটিলাস। আর তক্ষুনি হু-হু করে উনপঞ্চাশ পবনের বেগে ভিতরে ঢুকলোখোলা হাওয়া।

নটিলাস-এর বহিদ্বার খুলে দেয়ায় খোলা হাওয়া এসে ঢুকছে বাধভাঙা বন্যার মতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *