১৭. লুপ্ত নাশপাতির গন্ধ

লুপ্ত নাশপাতির গন্ধ

পরের দিন, উনিশে ফেব্রুয়ারি, সকালবেলায় নেড ল্যাণ্ড সবেগে আমার ঘরে এসে ঢুকলো। তারই প্রত্যাশা করছিলুম আমি। বড় হতাশ দেখালো তাকে।

হলো তে! হতাশভাবে সে বললে আমায়।

তা কী করবে, বলো? ভাগ্য বিরূপ ছিলো কাল।

কিন্তু ঠিক ওই সময়টাতেই কিনা ক্যাপ্টেন জলের তলায় নামলো।

হ্যাঁ, নেড। ব্যাংকে গিয়ে টাকা তোলা দরকার ছিলো তাঁর।

ব্যাংকে?

ব্যাংক ছাড়া আর কী বলি? কোনো ব্যাংকের লোহার সিন্দুকের চেয়েও সমুদ্রের তলা অনেক বেশি নিরাপদ তাঁর কাছে। আর এখানেই তিনি তার সব সম্পদ জমা রাখেন। এই বলে কাল রাতের সব ঘটনা আমি তাকে খুলে বললুম। এত কথা তাকে বলার উদ্দেশ্য ছিলো এই যে যদি তাতে নেডের মতি ফেরে, যদি এর পর ক্যাপ্টেন নেমো সম্বন্ধে সে আর বিরূপ না-হয়। কিন্তু সব শুনে নেড কেবল আপনোস করে বলতে লাগলো যে হায় রে!-সে কিনা ওই ইনকাদের সোনা আনতে যেতে পারলে না।

ঠিক আছে। কোনো পরোয়া নেই, যাবার আগে নেড বললে, পরের বারে ঠিক পালাবো, দেখবেন। দরকার হলে আজ রাতেই পালাবো

নটিলাস কোন দিকে যাচ্ছে, জানো?

না।

আচ্ছা, দুপুরবেলা ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে আমি জেনে নেবো।

নেড কোনসাইলের খোঁজে চলে গেলো।

পালাবার পরিকল্পনা কিন্তু সেদিন তাকে বাদ দিতে হলো। প্রথমত আশপাশে কোথাও ডাঙার চিহ্ন দেখা গেলো না; উপরন্তু আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখে ঝড়ের সম্ভাবনাটা আর আগোচর রইলো না। নেড রাগে এমন ভাব করতে লাগলো যে পারলে সে যেন মেঘেদের ছিড়ে খায়। আমি কিন্তু গোপনে বলি যে মেঘ দেখে আমার অতটা দুঃখ হয়নি—পালাবার জন্য আমি আর অতটা উৎসুক ছিলুম না।

ক্যাপ্টেন নেমোর সঙ্গে দেখা হলো রাত এগারোটায়। আমাকে দেখেই জিগেস করলেন আমি ক্লান্ত কিনা। আমি মাথা নাড়তেই সরাসরি কাজের কথা পাড়লেন নেমে। মঁসিয় আরোনা, আপনি তো কখনো রাত্রিবেলায় সমুদ্রের নীচে বেরোননি। চলুন না, একটু ঘুরে আসা যাক। অবশ্য খুব ক্লান্ত লাগবে পরে, একথা আগে থেকেই বলে রাখি কারণ প্রথমত আমাদের অনেকটা পথ হাঁটতে হবে, উঠতে হবে এমন কি একটি পাহাড়ের চুড়োয়, দ্বিতীয়ত রাস্তাঘাট তেমন ভালো নয়–অনেকদিন মেরামত হয়নি কিনা।

আপনার কথা শুনে দ্বিগুণ কৌতূহল জাগছে। চলুন, যাই।

ডুবুরি-পোশাক পরে নিলুম দুজনে, সঙ্গে নিলুম লোহার আংটা লাগানো লাঠি। কিন্তু দেখি বৈদ্যুতিক লণ্ঠন নেবার কোনো উদ্যোগই করলেন না ক্যাপ্টেন নেমো? জিগেস করতেই বললেন, ও-লণ্ঠন আমাদের কোনো কাজেই লাগবে না।

আমরা দুজনেই কেবল রাতের সিন্ধুতলে বেড়াতে বেরোবো–নেমো সঙ্গে কোনো অনুচর নিলেন না, বা নেড ও কোনসাইলকেও নেবার কোনো প্রস্তাব করলেন না। আমরা যখন সমুদ্রতলে পা দিলুম তখন রাত বারোটা বাজে। অনেক দূরে কোথায় যেন সমুদ্রের তলায় একটা লালচে আলো জ্বলছে, সেই দিকে আঙুল তুলে দেখালেন ক্যাপ্টেন প্রথমে, তারপর ওই লাল আলো লক্ষ্য করে এগিয়ে চললেন। আমিও তার পাশাপাশি হাঁটতে লাগলুম।।

ওই লোহার লাঠিটা কেন সঙ্গে নিতে হয়েছিলো, হাঁটতে গিয়ে তার কারণ বেশ স্পষ্টই বোঝা গেলো। সামুদ্রিক গুল্ম আর শৈবালে বারে বারে পা পিছলে যাচ্ছিলো, হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে সামলে নিলুম প্রতিবারেই। এই পিছল উদ্ভিজ্জ সত্ত্বেও মনে হলো পায়ের তলার পাথুরে মাটির মধ্যে যেন কোনো সচেতন প্রকল্প রয়েছে, যেন নিসর্গসুন্দরীর স্বাভাবিক সৃষ্টি নয়, কারো পরিকল্পনা অনুসারেই রচিত ও বিস্তৃত। মধ্যে-মধ্যে মনে হলো আমার শিশের জুতোর তলায় রাশিরাশি হাড়গোড় গুড়িয়ে যাচ্ছে শব্দ করে।

ক্রমশ পিছনে নটিলাস-এর আলো যতই ক্ষীণ ও দূরবর্তী হয়ে এলো, সামনের সেই লাল দীপ্তিও যেন ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগলো। আরো খানিকটা এগোবার পর বুঝতে পারলুম ওই আরক্তিম আলোর উৎস হলো সামনের একটি পাহাড়ের চুড়ো। রাত যখন প্রায় একটা বাজে, তখন আমরা সেই পাহাড়ের পাদদেশে এসে দাঁড়ালাম।

এখানে সামুদ্রিক গাছপালা গজিয়েছে নিবিড় ও ঘন-ভাবে, আর সেই ধন অরণ্যের মধ্যে দিয়েই পথ করে নিয়ে এগোতে লাগলেন ক্যাপ্টেন নেমো। সবই যেন তাঁর অতি চেনা; একটুও ইতস্তত না করে কোনো রকম দোটানায় না পড়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন! দু পাশে তাকিয়ে দেখলুম, সত্যি, পাইন গাছের জঙ্গল চলে গেছে সারিবদ্ধভাবে-পচে গেছে গাছগুলো, কোনো সবুজের চিহ্ন নেই, না পাতা, না অন্য কিছু; সোজা পঁড়িয়ে আছে তারা, কয়লার খনির মধ্যে যেমনভাবে দূর অতীতের গাছের প্রতিভাস দেখা যায়—আর ডালপালার মধ্য দিয়ে রঙবেরঙের বিচিত্র মাছের দল সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে-যেন পাখি উড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর বনে।

জঙ্গল যেখানে শেষ হলো পাহাড়ের চুড়ো সেখান থেকে বেশকিছু ফুট দূরে; এবড়ো-খেবড়ো বন্ধুর পার্বত্যপথ ধরে আমরা উঠতে লাগলুম। কালো-কালো গর্তের মধ্যে, আনাচে-কানাচে, ঘুলঘুলির মতো পাহাড়ের ফাটলে কত সিন্ধুদানবের উজ্জ্বল চক্ষু দেখতে পেলুম, তাদের নড়াচড়ার শব্দ কানে এলো কর! পায়ের তলা থেকে কতবার সরে গেলে বিকট দাঁড়-ওলা কাঁড়া আর অতিকায় চিংড়ি। নেমে দৃকপাত না-করে সোজা ওই চুড়োর দিকে এগিয়ে চললেন।

পাহাড়ের চুড়োয় পৌঁছে যে-আশ্চর্য দৃশ্য চোখের সামনে উন্মোচিত হলো তা আমার চিরকাল মনে থাকবে। সারা অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে অগুন্তি প্রাসাদের ভগ্নপ —সবই কোনো পুরাকালীন মানুষের কীর্তি। শ্যাওলা-পড়া গুল্মেভরা প্রাসাদ আর মন্দিরগুলো চিনতে আমার সত্যি অনেকক্ষণ লাগলো। মানে কী এই ভগ্ন্যুপের? এ কোন জনপদ এই সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে? এই বিশাল হর্মরাজি কারা গড়েছিলো, কোন যুগে?

বহু যুগের ওপার হতে যেন জলমর্মর ভেসে এলো। আমি যা ভাবছি সত্যি কি তবে তাই? সাগ্রহে ক্যাপ্টেন নেমোর হাতটা চেপে ধরলুম আমি; নেমো কোনো চাঞ্চল্য প্রকাশ না করে শুধু আরো এগিয়ে চললেন। কিছুক্ষণ পরে আরো-উচু একটা চুড়োয় ওঠবার পর সেই কোন দুরন্ত রক্তচক্ষুর মত লাল আলোর উৎস চোখে পড়লো আমার : প্রায় পঞ্চাশ ফুট নিচেই পাহাড় হাঁ করে আগুন ওগরাচ্ছে–আগ্নেয়গিরির জ্বালামু খি দিয়ে তপ্ত লাল লাভার স্রোত গলগল করে বেরিয়ে আসছে। কোনো শিখা নেই—অক্সিজেন না-থাকলে শিখা থাকে না। শুধু লাল গনগনে সেই তরল আগুন পাহাড়ের গা বেয়ে জলের মধ্যে গড়িয়ে পড়েছে।

মহাকালের এই প্রচণ্ড রক্তচক্ষু আর এই জনপদের ভগ্নস্তুপ একটা জাতির পুরো ইতিহাস বলে দিচ্ছে। দূরবিস্তৃত সমতল ভূমি জুড়ে এই পাহাড়ের তলায় যেসুন্দর নগর গড়ে উঠেছিলো, সভ্যতার কোলাহল জেগেছিলো যেখানে একদা, এখন সেখানে ছাদ, মন্দিরের চুড়ো, মস্ত থামগুলির মধ্য দিয়ে লাভার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। দূরে একটা বন্দরের নিদর্শনও চোখে পড়লো। এখানে একদিন কত পালভোলা জাহাজ ফেনিল জলের উপর দিয়ে ভেসে যেতো।

আমার মাথার ভিতরটায় যেন আবর্ত খেলে গেলো। কোথায় আছি আমি, কোনখানে? আমার উন্মাদনা এতই প্রবল হয়েছিলো যে শিরস্ত্রাণ খুলে ফেলে জিগেস করতে যাচ্ছিলুম আমি, কিন্তু ক্যাপ্টেন নেমো আমাকে বাধা দিলেন। নিচু হয়ে খড়িমাটি তুলে তিনি সেই হারানো জগতের পাথরের গায়ে ছোট্ট একটি নাম লিখলেন : আটলান্টিস।

যেন তড়িৎ খেলে গেলো আমার মধ্যে। চকিতে পরিষ্কার হয়ে গেলো এই লুপ্ত নগরীর রহস্য। যাকে এতকাল কিংবদন্তি বলে ভেবেছি, ওরিগেন, ইয়ানসি, দ্যানভিল, নান্টেন, হুগোল্ট যার কথা বিশ্বাস করেননি, প্লারে সেই আটলান্টিস নগরী, ততয়োগোম্পসের সেই বিখ্যাত দেশ। শৌর্যে বীর্যে একদিন যারা উন্নতির চরম শিখরে উঠেছিলো, প্রাচীন গ্রীকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেও যারা একদিন পেছপা হয়নি, রাতারাতি এক প্রলয়ংকর ভূমিকম্পে তারা সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে গেলো, সমস্ত কীর্তিধ্বজা সমেত নিঃশেষে হারিয়ে গেলে পৃথিবীর উপর থেকে।।

আর আমি, সামান্য পিয়ের আরোনা, পারী বিচিত্রাভবনের কর্মচারী—আমি কি না এই লুপ্ত মহাদেশের বুকে দাঁড়িয়ে আছি এখন? যেন বহুযুগের ওপারের কোনো হারানো দেশের স্বপ্নে আচ্ছন্ন হয়ে গেলুম আমি। আর ক্যাপ্টেন নেমো সারাক্ষণ শ্যাওলাজমা একটি পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে পাথরের মতোই নিশ্চল দাড়িয়ে রইলেন। কী স্বপ্ন দেখছেন এই কবিমানুষটি এখানে? তিনি কি সেই হারানো মানুষদের কাছ থেকে জেনে নিতে চাচ্ছেন মানবভাগ্যের পরম রহস্য? যেমানুষটি তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে আধুনিক পৃথিবীকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সে কি বারেবারে এখানে এসে অতীতের ছায়ার মধ্যে নিজেকে ফিরে পায়!

প্রায় একঘণ্টা ছিলাম সেখানে। সারাক্ষণ পায়ের তলায় মাটি কাপিয়ে সেই গনগনে রক্তিম তরল আগুন বয়ে গেলে এই হারানো মহাদেশের উপর দিয়ে। আর তারপর জলের উপর উঠে এলো কম্পমান পাণ্ডুর চাঁদ। চাঁদ ঠিক নয়, ঈদের উজ্জ্বল প্রতিভাস শুধু। আর চাঁদের সেই ছায়ার মধ্যেই আমরা ফিরে চললুম।

যখন ক্লান্ত অবসন্ন দেহটিকে নটিলাস-এ টেনে তুললুম, তখন আলো হয়ে এসেছে পুবদিক।

সূর্য উবে এবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *