১৪. কেবল মরা ধূলোর মরুভূমি

যেদিকে তাকানো যায়, কেবল মরা ধূলোর মরুভূমি। হলুদ, তপ্ত ধু-ধু বালি ছড়িয়ে আছে দিগন্তের শেষ পর্যন্ত—জলহীন, জনহীন, প্রাণহীন : যে-কালো শ্যমলতা তাঁরা ছাড়িয়ে এলেন, তার সঙ্গে এর কোনোই মিল নেই-কিছুতেই ভাবা যায় না, সবুজের ঐ উদ্দাম বন্যার পর এই রুক্ষ লাল দিগন্তজোড়া পিপাসা থাকে কী করে।

ভয়ানক এক দুশ্চিন্তা আঁকড়ে ধরেছে ফার্গুসনকে। বেলুনে যে জল আছে, তাতে আর বেশি সময় চলবে না। অথচ কাছাকাছি কোথাও পানীয় জল পাবার সম্ভাবনা নেই। ফার্গুসন দস্তুরমতো ভয় পেলেন, চুল্লিকে সবসময় জ্বালিয়ে রাখার জন্যে পানীয় জল আরো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাচ্ছে।

আকাশের অনেক ওপরে নিয়ে যাওয়া হলো বেলুনকে, যাতে চারদিকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। সন্ধে নাগাদ প্রায় নব্বই মাইল পাড়ি দেয়া হলো : জানজিবার থেকে এখন তারা মোট প্রায় আড়াই হাজার মাইল দূরে এসে পৌঁছেছেন।

দুরবিন চোখে দিয়ে বৃথাই জলের খোঁজে চারদিক নিরীক্ষণ করলেন ফার্গুসন, কিন্তু মরুভূমির মরা ধুলোর রুক্ষ তাপ ছাড়া আব-কিছুই দেখা গেলো না কোনোদিকে। বিষম এক অবসাদ আর হতাশা এসে আচ্ছন্ন করলো তাকে, কিন্তু মুখে তিনি কিছুই প্রকাশ করলেন না। কী ভীষণ দায়িত্ব তার উপর! প্রায় জোর করেই তিনি এই দুটি প্রাণীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, এখন যদি জলাভাব হয়, আর তার ফলে যদি…ফার্গুসন আরকিছু ভাবার চেষ্টা করলেন না। যেদিকে চোখ যায় শুধু বালি আর কাঁটাঝোপ; হলুদ লোলুপ, লেলিহান মরুভূমির দেশে প্রবেশ করেছে এবার বেলুন-শুধু নির্জলা প্রান্তর পড়ে আছে। হাওয়া নেই বললেই চলে।

ভীষণ এক স্তব্ধতার ভিতর রাত কাটলো, একবারও দুচোখের পাতা এক করতে পারলেন না ফার্গুসন যদি হাওয়া থাকতো প্রবল, তাহলে ভরসা পাওয়া যেতো চট করে হয়তো মরুভূমির এলাকা পেরিয়ে যেতে পারতো বেলুন। সকাল এলো, কিন্তু তবুও আকাশ নির্মেঘ, আর অসহ্য গুমোট, সব বাতাস যেন মরে গিয়েছে। ফাওঁসন হতাশায় ভরে গেলেন। গত দশদিনে আমরা মাত্র অর্ধেক পথ এসেছি, কিন্তু এখন যেভাবে বেলুন যাচ্ছে, তাতে গন্তব্যস্থলে পৌঁছুতে কত সময় যে লাগবে তা কেবল ঈশ্বরই জানেন। তার ওপর জল আবার ফুরিয়ে আসছে।

নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোথাও জল পাবো, কেনেডি বন্ধুকে ভরসা দেবার চেষ্টা করলেন, কোনো-না-কোনো নদী কিংবা জলাশয় নিশ্চয়ই পথে পড়বে।

আমিও তো সেই আশাতেই বুক বেঁধে আছি। ঈশ্বর করুন, তা-ই যেন হয়!

মিলিয়ে গেছে সমস্ত বাড়ি-ঘর-গ্রাম, জনপদের শেষ চিহ্নটুকু। সর্বনেশে মরুভূমির ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে বেলুন, দিগন্তের অন্তরাল নেই, কেবল হলুদ বালিকে ঘিরে আকাশের বিরাট বন্ধনী পড়ে আছে। অল্পই জল রয়েছে বেলুনে, পিপাসা মেটাবার জন্যে মোটেই যথেষ্ট নয়। প্রত্যেকের মুখে-চোখে আতঙ্কের কালো ছায়া ফুটে উঠলো।

যতক্ষণ ফেরার উপায় ছিলো কিছুই বোঝা যায়নি যে এমন হবে। এখন আর পেছনে ফেরার উপায় নেই-শুধু মৃদু বাতাস সামনের দিকে ধীরে-ধীরে ঠেলে নিয়ে চলেছে। এক হয় যদি ঝড় আসে দৈবাৎ, আর উলটো দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় বেলুনকে। কিন্তু সেই দুরাশাটুকু করার মতো মনোবলও ছিলো না কারু আগুন ঝরছে। আকাশ থেকে, আগুন আর শুস্কতা-মেঘের চিহ্নটুকু পর্যন্ত নেই। সারাদিন মাত্র ত্রিশ মাইল পথ গেছে ভিক্টরিয়া। যদি জলের জন্য ভাবনা না-থাকতো, যদি এই উদ্বেগ কি উৎকণ্ঠা তাদের তাড়া না-করতো, তাহলে এইটুকু অগ্রগতিতে মোটেই তারা বিচলিত হতেন না। কিন্তু তীক্ষ্ণ একটি যতিচিহ্নের মতো এই নির্মম সত্য সারাক্ষণ তাদের চেপে থাকলো : আর মাত্র তিন গ্যালন জল আছে।

এক গ্যালন রাখা হলো ৯১ ডিগ্রি গরমের সহ্যাতীত পিপাসা মেটাবার জন্যে, বাকি দুই গ্যালন যাবে চুল্লির গ্যাস বাড়াবার জন্যে; অথচ এই দুই গ্যালনে মাত্র ৪৮০ ঘনফুট গ্যাস তৈরি হবে, অর্থাৎ মাত্র চুয়ান্ন ঘণ্টা পথ চলা যাবে এর সাহায্যে।

পুরো চুয়ান্ন ঘণ্টাও চলা যাবে না, ফার্গুসন বললেন, কেননা রাতে যাওয়া চলবে

-পাছে অন্ধকারে কোনো নদীনালা বা জলাশয় পেরিয়ে চলে যাই। কাজেই বাদবাকি যে-সামান্য সময়টুক আমাদের হাতে আছে, তার মধ্যে যে ভাবেই হোক না কেন জল আমাদের জোগাড় করে নিতেই হবে। এখন থেকে সাবধানে জল খরচ করতে হবে–র্যাশন করে দেয়াই ভালো।

তা-ই ভালো। কেনেডি সায় দিলেন। এই জলেই ফোঁটা-ফোঁটা করে আমাদের তিন দিন চালাতে হবে। তাতে যত কষ্টই হোক, তা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

এর মধ্যে নিশ্চয়ই জল পেয়ে যাবো।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সামান্য জল পান করা হলো—অল্প জল, তৃষ্ণার পক্ষে যথেষ্ট নয়। রাত্রির মতো বেলুন নামলো বিরাট বালুকাময় ভূমিতে। নিটোল, ঝকঝকে, মিটমিট-জ্বলা তারারা ফুটে আছে আকাশে, আলোর ফুলের মতো, কিন্তু সেই সঙ্গে হাওয়া কেবল ছড়িয়ে দিচ্ছে শুষ্কতা। দিনের বেলায় খর রৌদ্রের সহ্যাতীত আঁচ-যেন সব পুড়িয়ে দিয়ে যাবে।

সকল পাঁচটায় ফের যাত্রা শুরু হলো, কিন্তু ভিক্টরিয়া কিছুতেই আর চলতে চায় —স্থির দাঁড়িয়ে রইলো একই জায়গায় : গোটা জগৎ থেকেই যেন বাতাস উবে গিয়েছে, চরাচর পর্যন্ত যেন তৃষ্ণার্ত।

এই-ই হলো আফ্রিকার আসল চেহারা : তৃষ্ণা, তাপ আর হতাশা দিয়ে তিলেতিলে শুকিয়ে মারে। ফার্গুসন আপন মনে বলে উঠলেন।

সন্ধেবেলায় হিশেব করে দেখা গেলো, সারা দিনে মাত্র কুড়ি মাইল পথ অতিক্রম করেছে বেলুন। দিনের বেলায় ঘন নিশ্বাসের মতো একটু উষ্ণ বাতাস তবু থাকে, কিন্তু রাতে তাও মরে যায়। সারা শরীর জ্বলে যেতে চায় শুকনো তাপে, যেন ফোঁসকা পড়ে যাবে।

পরদিন বিকেলে চারটের সময় দিগন্তে কতগুলো পাম গাছ দেখে সবাই চিৎকার করে উঠলো, ঐ তো গাছ দেখা যাচ্ছে—নিশ্চয় মরূদ্যান আছে, এবার তাহলে জল পাবো

বড্ড গরম! জো শুকনো মুখে বললে, মরূদ্যান যখন পাওয়া গেলো, তখন এবার নিশ্চয়ই একটু জল পাওয়া যেতে পারে!

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।

প্রত্যেকে এক পাত্র করে জল পান করলেন। আর মাত্র সাড়ে-তিন পাত্র জল রইলো। এদিকে গরম ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। আকাশে যদি মেঘও থাকতে একটু, তাহলে হয়তো রোদের খরতা একটু কমতো, কিন্তু মেঘের কোনো চিহ্নই নেই কোথাও।

ছ-টা নাগাদ পামগাছগুলোর কাছে এলো বেলুন। মরা কতগুলি গাছ নীরক্ত ও শ্বেত কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে, সব পাতা ঝরে গেছে। গাছগুলির তলায় একটু গহ্বর-মতো দেখা গেলো, হয়তো কোনোকালে কোনো কুয়ো ছিলো এখানে। ইতস্তত চারপাশে ছড়িয়ে আছে কতগুলি পাথর, কিন্তু একফোঁটাও জল নেই কোথাও; পশ্চিম দিকে, অনেক দূর পর্যন্ত, নানা ধরনের কঙ্কাল পড়ে আছে; মড়ার মাথার শাদা খুলি, রাশি-রাশি হাড় আর হাড়। যে-সব হতভাগ্যরা জলের আশায় এখানে এসে প্রাণ হারিয়েছে, সেইসব মানুষ আর প্রাণীর কঙ্কাল মৃত্যুর ঠাণ্ডা শাদা দাঁত-বার-করা টিটকিরির মতো পড়ে আছে। এই মরা গাছগুলি পথ দেখিয়ে এনেছে পিপাসার্তদের, তারপর তারা এখানে এসে অসহ্য তৃষ্ণায় এই হলুদ বালির ওপর পড়ে ধুকতে-ধুকতে আলিঙ্গন করেছে মৃত্যুকে।

বেলুন নামতেই সকলে কুয়োর দিকে গেলেন, তারপর তার গা বেয়ে ধাপে-ধাপে নিচে নেমে গেলেন কেনেডি, পেছনে গেলো জো। কিন্তু সব শুকনো, শুধু বালি আর বালি, হলুদ ধূ-ধূ, তপ্ত। আঙুলগুলি পাগলের মতো খুঁড়ে তুলতে চাইলো জল, কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। অনেক অনেক বছর ধরেই শুকিয়ে মৃত পড়ে আছে এই কুয়ো। সর্বাঙ্গে বালি মেখে সঙ্গী দু-জন মূর্তিমান হতাশার মতো কুয়ো থেকে বেরিয়ে এলো, ফার্গুসন এক অবর্ণনীয় হতাশায় ভরে গেলেন।

রাতে খাওয়া-দাওয়া করা হলো নির্জলা। কারু মুখেই কোনো কথা নেই। সেই মৃত. রিক্ত, শ্বেতশুভ্র হাড়গুলি স্পষ্ট গলায় তাদের ভবিষ্যৎ জানিয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *