১২. যে শব্দ কটি আপনার জীবনের মোড় ফেরাতে পারে

যে শব্দ কটি আপনার জীবনের মোড় ফেরাতে পারে

ক’বছর আগে এক বেতার অনুষ্ঠানে আমাকে এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে বলা হয় : জীবনে সবচেয়ে বড় কোন্ শিক্ষা লাভ করেছেন আপনি?

ব্যাপারটা বলা নেহাতই ছিল সহজ ছিল। সবচেয়ে বড় যা শিখেছি তা হল আমরা যা চিন্তা করি তার গুরুত্ব। আমি যদি জানি আপনার চিন্তাধারা কেমন তাহলে বুঝতে পারব আপনি কেমন ধরণের মানুষ। আমাদের মানসিক পরিস্থিতির উপরই আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। আমরা কি, সেটা আমাদের চিন্তার উপরেই নির্ভরশীল। এমার্সন বলেছেন : একজন মানুষ সারাদিন যা চিন্তা করে সে হল তাই…. সত্যিই, তার পক্ষে অন্যরকম হওয়া কিভাবে সম্ভব?

আমি দৃঢ়ভাবেই জানি এবং সন্দেহাতীত ভাবেই আমার বা আপনার বড় সমস্যা হল–আসলে একমাত্র সমস্যাই– সঠিক কোন চিন্তা করব। এটা যদি করতে পারি তাহলে আমাদের সব সমস্যাই মিটিয়ে ফেলতে পারি । যে বিখ্যাত দার্শনিক এককালে রোম সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন সেই মারকাস অরেলিয়াস কটি কথায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন–যে কটি কথা আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে : আমাদের চিন্তার মধ্যেই আছে আমাদের জীবন।

হ্যাঁ তাই। যেমন ভালো চিন্তায় আমরা সুখী হই। দুঃখের চিন্তা করলেই দুঃখীই হতে হয়। ভয়ের চিন্তা করলে ভয় পেতে হয়, অসুখের চিন্তায় হতে হয় অসুস্থ। ব্যর্থতার চিন্তায় নামে ব্যর্থতা। পরাজয়ের ভাবনা থাকলে সবাই পরাজিতই ভাবতে চাইবে। নর্মান ভিনসেন্ট পীল বলেছিলেন : আপনি নিজেকে যা ভাবেন আপনি তা নন, আপনি নিজে যা ভাবেন আপনি তাই।

সমস্ত সমস্যা এভাবেই দেখা উচিত বলছি কি? না, জীবনের সব কিছু এরকম সহজ সরল কখনই নয়। আসলে আমি বলতে চাই জীবনের সব কিছুতে নঙর্থক ভাব না নিয়ে চলাই উচিত; আমার কথা হলো জীবনের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা দরকার তবে দুশ্চিন্তা নয়। তাহলে ভাবনা আর দুশ্চিন্তার মধ্যে তফাৎ কি? একটা ব্যাখ্যা দেওয়া যাক। যখনই আমি নিউয়র্কের প্রচুর গাড়ি চলা রাস্তায় চলি তখন আমি চিন্তা করি–কিন্তু দুশ্চিন্তা করি না। চিন্তা হল সমস্যা কি সে বিষয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তার সমাধানে চেষ্টা করা–দুশ্চিন্তা হল পাগলের মত ভেবে ঘুরপাক খাওয়া।

কোন মানুষ তার মারাত্মক সমস্যা নিয়ে একই সঙ্গে চিন্তা করতে পারে আবার কোটের বোতামঘরে লাল ফুলও লাগাতে পারে : আমি লাওয়ের টমাসকে ঠিক তাই করতে দেখেছি। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় তিনি যখন অ্যালেনবি–লরেন্সের ছবি দেখাচ্ছিলেন তখন সৌভাগ্যবশতঃ আমি তার সঙ্গে ছিলাম। তিনি ও তার বন্ধু অন্ততঃ ছটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছবি তুলে আনেন। এসবের মধ্যে সব সেরা ছবি ছিল টি ই লরেন্সের এবং তার ঝকমকে বিচিত্র আরবীয় বাহিনীর চিত্র । তাছাড়াও ছিল অ্যালেনবীর পবিত্র ভূমি জয় করারও ছবি। তার অ্যালেনবি আর লরেন্স সম্পর্কিত ছবি ও বক্তৃতা লন্ডনকে চমকিত করেছিল। তাছাড়া সারা বিশ্বেও তার নাম হয়েছিল। কভেন্ট অপেরায় তিনি যাতে ওই সব অ্যাডভেঞ্চারের কথা শোনাতে পারেন এবং ছবি দেখাতে পারেন সেজন্য অপেরা ছ’ সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হয়। এরপর তিনি সারা বিশ্ব পরিক্রমা করেন। এরপর অবিশ্বাস্য দুর্ভাগ্যের পর তিনি লন্ডনে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। আমি সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলাম। আমার মনে আছে আমাদের সস্তার রেস্তোরাঁয় খেতে হত। আর সে খাওয়াও জুটতো না। যদি মিঃ টমাস একজন স্কচের কাছ থেকে টাকা না ধার করতেন। ঐ ভদ্রলোক ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী জেমস ম্যাকবে। এ কাহিনীর সারবস্তু হল এই : লাওয়েল টমাসের যখন বিরাট দেনা আর শুধু হতাশায় ভরা জীবন তখনও তিনি চিন্তা করলেও–দুশ্চিন্তা করেন নি। তিনি জানতেন এই বিপর্যয়ে যদি ভেঙে পড়েন তাহলে কেউ তাকে মূল্য দেবেনা আর ধারও পাবেন না। তাই একটা ফুল বুকে খুঁজে তিনি মাথা উঁচু করে অক্সফোর্ড স্ট্রীট ধরে হেঁটে যেতেন। তিনি নানা সাহসের কথা ভাবতেন আর পরাজয় স্বীকার করতেন না। তার বিশ্বাস ছিল বড় হতে গেলে ছোট হতে হয়। এটা প্রয়োজনীয় আমাদের দৈহিক শক্তির উপর এই মানসিক ভাব অদ্ভুত রকম কাজ করে। বিখ্যাত বৃটিশ মনস্তত্ত্ববিদ জে এ হ্যাঁডফিল্ড তাঁর সাইকোলজি অব পাওয়ার’ বইতে এর চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আমি তিনজন লোককে মানসিক শক্তি ইত্যাদি সম্বন্ধে ডায়নামোমিটারে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য আমায় সাহায্য করতে বলেছিলাম, তিনি তাদের তিনটি বিভিন্ন অবস্থায় মনের ও শারিরীক শক্তির প্রভাব পরীক্ষা করেন।

তাদের যখন স্বাভাবিক অবস্থার পরীক্ষা করা হলো, তারা গড়ে ১০১ পাউন্ড টানতে পেরেছিল ।

তিনি তাদের সম্মোহিত করে যখন বলেন তারা খুব দুর্বল, তারা মাত্র ২৯ পাউণ্ড ওজন টানতে পারে। তখন দেখা গেল তারা কেবল মাত্র ২৯ পাউণ্ড ওজন টানতে পেরেছে। এদের একজন আবার চ্যাম্পিয়ন লডিয়ে! তাকে যখন সম্মোহিত করা হয়, সে বলেছিল তার নিজের হাত শিশুর মতই লাগছিল।

এরপর ক্যাপ্টেন হ্যাঁডফিল্ড তাদের যখন সম্মোহিত করে বললেন তাদের দেহে প্রচণ্ড শক্তি, তারা তখন গড়পড়তা ১৪২ পাউণ্ড টানতে পারলো। তাদের মনে শক্তির কথা জেগে উঠতেই তাদের দৈহিক শক্তি প্রায় শতকরা পঁচশ ভাগই বেড়ে যায়।

মানসিক অবস্থার এই হল অবিশ্বাস্য ক্ষমতার উদাহরণ।

.

চিন্তার যাদুকরী ক্ষমতা বোঝানোর জন্য আমেরিকার ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু উদাহরণ রাখা যাক। কাহিনীগুলো সত্যিই আশ্চর্যজনক সন্দেহ নেই। এসব নিয়ে একখানা বইও লিখতে পারি। তবে ছোট করেই বলি। এক কুয়াশাচ্ছন্ন গৃহযুদ্ধের কিছু পরে অক্টোবরের রাত–একজন গৃহহারা দুঃস্থ মহিলা যিনি অনবরত পৃথিবীতে সৎ পথেই চলেছেন তেমন একজন মহিলার দরজায় কড়া নাড়লেন। সেই মহিলার নাম ‘মা ওয়েবস্টার’ তিনি জনৈক অবসর প্রাপ্ত জাহাজের ক্যাপ্টেনের স্ত্রী, থাকতেন ম্যাসাচুসেটসে।

দরজা খুলে মা ওয়েবস্টার দেখলেন দাঁড়িয়ে আছে অতি দুর্বল, রুগ্ন ছোটখাটো একটা দেহ, ওজন হবে বড়জোর হাড়মাস মিলিয়ে একশ পাউন্ড । আগন্তুক ছিলেন মিসেস গ্লোভার, তিনি তাঁকে জানালেন সারা দিনরাত একটা সমস্যা নিয়ে ভাবতে চান। এমন একটা সমস্যা নিয়ে ভাবনার জন্য তিনি একটা বাড়ি চান।

এখানেই তাহলে থাকুক না কেন : মিসেস ওয়েবস্টার বললেন। এবাড়িতে আমি একদম একা।

মিসেস গ্লোভার হয়তো মা ওয়েবস্টারের কাছে অনির্দিষ্টকালই থেকে যেতেন। কিন্তু তা সম্ভব হল না। একদিন গৃহকর্ত্রীর জামাই বিল এলিম নিউইয়র্ক থেকে সেখানে ছুটি কাটাতে এলেন। সে মিসেস গ্লোভারকে বাড়িতে দেখেই চিৎকার করে বললো : এ বাড়িতে কোন ভবঘুরেকে আমি থাকতে দিতে রাজি নই। এরপর সে গৃহহীন মহিলাটিকে পথেই বের করে দিল। সে সময় প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছিল । মিসেস গ্লোভার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কিছুক্ষণ কাঁপতে লাগলেন তারপর ওরই মধ্যে রাস্তা ধরে কোন আশ্রয়ের সন্ধানে চললেন ।

এ কাহিনীর আশ্চর্যজনক দিকটার কথা এবারে শুনুন। ওই ভবঘুরে মহিলা, যাকে বিল এলিম বাড়ি থেকে বের করে দেয় তিনি ভবিষ্যতে চিন্তার জগতকে যেরকম প্রভাবিত করেন কোন মহিলাই বিশ্বে আর তা পারেন নি । আজকে সবাই তাকে জানে ক্রিশ্চিয়ান সায়ন্সের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মেরী বেকার এডি বলে–লক্ষ লক্ষ অনুরাগীদের কাছে তিনি বিশেষ পরিচিত।

তবুও এ পর্যন্ত তিনি শুধু পেয়ে এসেছেন রোগ, শোক আর বিষাদ ব্যঞ্জনা। তাঁর প্রথম স্বামী বিয়ের কিছুকাল পরেই মারা যান। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী তাঁকে ত্যাগ করে এক বিবাহিতা স্ত্রীলোককে নিয়ে পালান। তাঁর শেষ পর্যন্ত এক অনাথ আশ্রমে মৃত্যুও হয়। তাঁর একটি মাত্র ছেলে ছিল–কিন্তু অবস্থার বিপর্যয়ে এবং অভাব অনটনে আর রোগে তাকেও তার চার বছর বয়সে ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। একত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত ওই ছেলের আর দেখা পাননি তিনি। সব সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেছিলেন।

নিজের অসুখের জন্যেই মিসেস এডি বছরের পর বছর কেবল বৈজ্ঞানিক উপায়ে মানসিক শক্তির সাহায্যে রোগ নিরাময়ের কথা ভাবতেন। তিনি সব সময় যা খুঁজতেন তা হল–মানসিক ক্ষমতায় বৈজ্ঞানিক প্রথায় রোগ নিরাময়। তার জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন আসে ম্যাসাচুসেটসের লেনে। এক প্রচন্ড শীতার্ত দিনে বরফ মাখা রাস্তায় পা পিছলে পড়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। তাঁর মেরুদণ্ডে এমনই আঘাত লাগে যে শ্বাস কষ্ট দেখা দেয়। এমন কি ডাক্তারও ভেবে ছিলেন তিনি বাঁচবেন না। তিনি এও বলেন কোন রকমে উনি বেঁচে গেলেও কখনও হাঁটতে পারবেন না।

মেরী বেকার এডি যাকে বলা যায়, তার মৃত্যু শয্যায় শুয়ে বাইবেল খুলতেই যেন ঈশ্বর সেন্ট ম্যাথুর এই কথাগুলো তাকে দিয়ে পড়িয়ে নিলেন : দেখ, তার কাছে তারা একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোককে নিয়ে। এল । লোকটি তার শয্যায় শায়িত। তখন যীশু বললেন : পুত্র, আনন্দ করো …তোমার পাপ ক্ষমা করা হলো ওঠ, বিছানা কাঁধে করে গৃহে প্রত্যাবর্তন করো। এরপর সে উঠে বিছানা কাঁধে নিয়ে গৃহে ফিরে গেল।

যীশু খ্রীষ্টের ওই কথাগুলোয় তিনি যেন তার সমস্ত বিশ্বাস, শক্তি আর রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা ফিরে পেয়ে গেলেন আর সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় বিছানা ছেড়ে উঠে হেঁটে বেড়ালেন।

মিসেস এডি বলেছেন, ওই অভিজ্ঞতাই আমার কাছে নিউটনের আপেল, ওটা থেকেই আমি নিজের ভালো করার পথ নির্দেশ লাভ করি। লাভ করি অপরেরও ভালো করার পথ … এ থেকেই আমার বিজ্ঞান সম্মত বিশ্বাস জন্মায় সব কিছুর মূলই হল মন, সব কার্য কারণই মনের সৃষ্টি।

এই পথ ধরেই মেরী বেকার এডি এক নতুন ধর্মমতের প্রতিষ্ঠা করলেন : খৃষ্ট বিজ্ঞান–কোন মহিলার প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত । এই ধর্মমত সারা দুনিয়াতেই ছড়িয়ে পড়েছে।

আপনি বোধ হয় এখন নিজেকে প্রশ্ন করছেন : এই কার্নেগী লোকটা নিশ্চয়ই খৃষ্ট বিজ্ঞানের হয়ে প্রচার চালাতে চায়। না, আপনারা ভুল করছেন। আমি কোন খৃষ্ট বিজ্ঞানী নই। তবে যত ততই আমি দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে উঠছি–চিন্তার শক্তি কত বিরাট। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে বয়স্কদের শিক্ষাদানে ব্যাপ থেকে বুঝেছি পুরুষ আর স্ত্রীলোকেরা সকলেই সব দুশ্চিন্তা, ভয় আর নানা রকম রোগ দূর করতে পারে এবং তাদের চিন্তাধারা বদল করে তাদের জীবনকেও পাল্টাতে পারে। আমি জানি! আমি জানি। আমি বহুবার এমন কান্ড ঘটতে দেখেছি। আমি এতবার এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি যে এতে আর আশ্চর্য হই না।

উদাহরণ হিসেবে আমার এক ছাত্রের জীবনের কথাই বলছি, কিভাবে এই চিন্তার শক্তি কি রকম অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ছাত্রটির স্নায়ু ভেঙ্গে পড়েছিল। এটা হলো কেন? দুশ্চিন্তার জন্য । ছাত্রটি আমাকে বলেছিল, সব ব্যাপারেই আমার দুশ্চিন্তা হত আমি রোগা বলে দুশ্চিন্তা হত, দুশ্চিন্তা হত টাক পড়েছে বলে, ভয় পেতাম বিয়ে কারা জন্য যথেষ্ট টাকা আয় করতে পারব না, ভালো বাবা হতে পারব না, দুশ্চিন্তা করতাম ভালভাবে জীবন কাটাচ্ছিনা, যাকে বিয়ে করতে চাই সেই মেয়েটিকে হারাতে চলেছি। আমার দুশ্চিন্তা হত অন্য লোকেরা আমার প্রতি কিরকম ধারণা গ্রহণ করছে। দুশ্চিন্তা করতাম আমার পেটে আলসার হয়েছে। আমি আর কাজ করতে পারলাম না, আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম। আমার মধ্যে এসব দুশ্চিন্তা একেবারে বয়লারের মত টগবগ করে ফুটতে চাইতো। কিন্তু সেই দুশ্চিন্তা দমনে কোন সেফটি ভাল্ব ছিল না। এতে এমনই চাপ বেড়ে গেল যে একটা কিছু ঘটে যাবে বলে মনে হল–আর হলও তাই। আপনাদের কখনও যদি স্নায়ু ভেঙ্গে না পড়ে থাকে, ঈশ্বর করুণ কখনও যেন তা না হয়। কারণ শরীরের কোন যন্ত্রণা যন্ত্রণাকাতর মনের তুলনায় কিছুই না।

আমার ওই ভেঙে পড়া অবস্থা এমনই হল যে আমার পরিবারের লোকজনের সঙ্গেও কথা বলতে পারতাম না। আমার চিন্তাধারায় কোন লাগাম ছিলো না। একরাশ ভয়ই আমায় চেপে ধরেছিল। সামান্য শব্দেই আমি চমকে উঠতাম। প্রত্যেককেই আমি এড়িয়ে চলতাম। কোন বিশেষ কারণ না থাকলেও চিৎকার করে কেঁদে উঠতাম।

আমার প্রতিটা দিনই ওই যন্ত্রণায় কাটতে লাগল। আমার মনে হতে লাগলো সবাই আমাকে ত্যাগ করে যাচ্ছে–এমনকি ঈশ্বরও। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন শেষ করে দেবার কথাও ভেবেছিলাম।

এর বদলে ফ্লোরিডায় বেড়াতে যাব ঠিক করলাম–ভাবলাম নতুন জায়গায় গেলে ভালো হবে । ট্রেনে ওঠার সময় বাবা আমার হাতে একখানা চিটি দিয়ে বললেন ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর আগে যেন চিঠিটা খুলি। সেই সময় ছুটি কাটানোর জন্য ফ্লোরিডায় প্রচুর জনসমাগম হয়। হোটেলে জায়গা না পেয়ে একটা গ্যারেজে আশ্রয় নিলাম। মিয়ামির উপকূলে একটা মালবাহী জাহাজে চাকরি জোগাড়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম । তাই সমুদ্র তীরেই সময় কাটাতে লাগলাম। দেখলাম বাড়িতে যা ছিলাম তার চেয়ে খারাপ সময় কাটতে লাগলো, তাই চিঠিটা খুলে দেখতে চাইলাম বাবা কি লিখেছেন। তিনি লিখেছিলেন : ‘প্রিয় বক্স, তুমি এখন বাড়ি থেকে ১৫০০ মাইল দুরে আর কোন তফাৎ বুঝতে পারছো কি? আমি জানি তা পারছে না। কারণ আমি জানি তুমি তোমার সঙ্গে নিয়ে গেছে এমন কিছু যা সব গোলমালের মূল–আর তা হল তুমি নিজে! তোমার শরীর বা মনে আসলে কিছুই হয়নি। পারিপার্শ্বিকতা তোমায় শাস্তি দিচ্ছে না। বরং তুমি যা ভাবছো তাই দিচ্ছে। মানুষ হৃদয়ে যা চিন্তা করে, সে নিজে হল তাই। এটা যখন বুঝতে পারবে, বৎস, তখনই বাড়ি ফিরে এস, কারণ তুমি তখন সেরে যাবে।

বাবার চিঠিতে বেশ রাগ হল। আমি সহানুভূতি চাই, উপদেশ নয় । আমার এমন পাগলের মত রাগ হল যে ঠিক করলাম আর কখনও বাড়ি ফিরব না। ওই রাত্তিরে যখন মিয়ামির উপকূলের রাস্তায় হাঁটছিলাম তখন এক গির্জার পাশে এসে শুনলাম সেখানে সান্ধ্য প্রার্থনার অনুষ্ঠান চলছে। কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় ভিতরে ঢুকে প্রার্থনা শুনতে চাইলাম। তখন বলা হচ্ছিলো : যে তার নিজের ইচ্ছাকে জয় করতে সক্ষ সে একজন শহর বিজয়ী সৈনিকের চেয়েও শক্তিমান। ঈশ্বর উপাসনা গৃহের পবিত্র এলাকায় যে কথা শুনলাম আমার বাবাও তো তাই লিখেছেন–এ সমস্ত মিলে আমার মস্তিষ্কের সব ময়লা বেরিয়ে গেলো। জীবনে এই প্রথম পরিষ্কার আর বুদ্ধিমানের মত চিন্তা করতে পারলাম। বুঝতে পারলাম কত মূর্খ আমি । নিজেকে সঠিকভাবে চিনতে পেরে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমি এখানে বসে সারা পৃথিবীর আর সবাইকে বদলে ফেলার চেষ্টা করছি অথচ যা দরকার তা হল আমার মনের ক্যামেরার লেন্সটাই বদলে ফেলা।

পরের দিনই মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি রওয়ানা হলাম। এক সপ্তাহ পরেই কাজে যোগ দিলাম। চার মাস পরে যে মেয়েটিকে হারাতে বসেছি ভেবে ছিলাম তাকেই বিয়ে করলাম। আমাদের এখন পাঁচটি সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। ঈশ্বর আমার বাস্তাবে আর মানসিক দিক থেকে সুখী করেছেন। স্নায়ু ভেঙে পড়ার সময় আঠারো জনের শিফটে রাতের ফোরম্যান হিসেবে কাজ করতাম। আজ আমি সাড়ে চারশ লোকের এক কার্টন তৈরির কারখানার সুপারিন্টে ডেন্ট! আজ আমার জীবন বহু বান্ধব নিয়ে পরিপূর্ণ । আমার বিশ্বাস জীবনের পরিপূর্ণতা আমি টের পেয়েছি। যখন কোন অস্বস্তিকর অবস্থা আসে (যা প্রত্যেকের জীবনে আসে) তখন নিজেকে বলি ক্যামেরার লেন্সটা অতীতের দিকে ঘুরিয়ে দিতে। তাতেই সব ঠিক হয়ে যায়।

সত্যিই বলতে চাই আমার স্নায়ু ভেঙে পড়ার জন্য আমি খুশি, কারণ আমি বেশ কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে বুঝেছি চিন্তা আমাদের মনের আর শরীরের উপর কি রকম প্রভাব বিস্তার করে। এখন আমি আমার চিন্তাকে মনের বিরুদ্ধে না গিয়ে স্বপক্ষে আনাতে পারি। এখন বুঝতে পারছি বাবা ঠিকই বলেছিলেন বাইরের অবস্থা আমার যন্ত্রণার কারণ ছিলো না। সেই অবস্থা নিয়ে আমি যা ভেবেছিলাম তাই দুর্দশার কারণ। সেটা বুঝতে পারলাম যখন তখনই আমার সব রোগ সেরে গেল আর আমিও ঠিক রইলাম।

আমার ছাত্রটির অভিজ্ঞতা এই রকমই ছিল।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের জীবন যাপন থেকে মানসিক আর অন্য যে আনন্দ পাই তা আমাদের অবস্থার উপর নির্ভর করে না। অথবা আমাদের কি আছে তার উপরও না। বরং সম্পূর্ণ নির্ভর করে আমাদের মানসিক অবস্থার উপর । বাইরের অবস্থার এর উপর হাত নেই উদাহরণ হিসেবে জন ব্রাউনের কথাটাই ধরুন। জন ব্রাউনকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রশস্ত্রের গুদামে লুঠ আর ক্রীতদাসের বিদ্রোহে প্ররোচিত করার জন্য ফাঁসি দেওয়া হয়। তিনি তার কফিনের উপর বসে বধ্যভূমিতে যান। যে জেলার তার সঙ্গে ছিলেন তিনি বেশ দুশ্চিন্তায় পড়লেও জন ব্রাউন বেশ শান্ত সমাহিত ছিলেন। তিনি ভার্জিনিয়ার বুরিজ পাহাড় লক্ষ্য করে বলে ওঠেন : আহা কি সুন্দর দৃশ্য! এমন সুন্দর দেশটা ভালো করে দেখার সুযোগ হলো না।

এবার রবার্ট ফ্যালকন স্কট আর তার সঙ্গীদের কথাই ধরুন–তিনিই ছিলেন ইংরেজদের সর্বপ্রথম দক্ষিণ মেরু অভিযানকারী। তাদের দেশে প্রত্যাবর্তনের কাজই বোধ হয় মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ভ্রমণ। কোন খাদ্য ছিলো না–জ্বালানীও ছিলো না। দিনরাত সমানে এগারো দিন ধরে প্রচণ্ড তুষার ঝড় চলেছিল তাই হাঁটাও ছিল অসম্ভব। এমন ভয়ানক জোরে বাতাস বইছিল যে তুষারের বুক কেটে গর্ত হয়ে যাচ্ছিল। স্কট আর বন্ধুরা বুঝতে পেরেছিলেন তাদের মৃত্যু আসন্ন । এরকম কোন ভয়ংকর অবস্থার মুখোমুখি হতে পারে ভেবেই তারা সঙ্গে খানিকটা আফিম এনেছিলেন। একটু বেশি খেলেই তারা ঘুমিয়ে সুখের স্বপ্নে বিভোর হবেন আর কোনদিন জাগতে হবে না। কিন্তু তারা আফিম না খেয়ে আনন্দের গান গাইতে গাইতে মৃত্যু বরণ করেছিলেন। একথা যে সত্য তা আমরা জেনেছি। কারণ প্রায় আটমাস পরে একদল উদ্ধারকারী তাদের বরফে জমাট বাঁধা মৃতদেহের কাছে তাদের বিদায়কালীন একটা চিঠি আবিষ্কার করেন।

হ্যাঁ, আমরা যদি গঠনমূলক চিন্তা আর সাহস এবং শান্তির কথা ভাবতে পারি তাহলে কফিনে বসেও পারিপার্শ্বিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারি! পারি বধ্যভূমিতে হাসি মুখে পৌঁছতে বা আনন্দের গান গেয়ে মৃত্যুকেও জয় করতে পারি।

কবি মিল্টনও এটা তাঁর অন্ধত্বের মধ্য দিয়ে তিনশ বছর আগে আবিষ্কার করেছিলেন:
        মানুষের মন একই জায়গায় থাকে।
        এই মনই স্বৰ্গকে নরক আর নরককে স্বর্গ করে তোলে।

নেপোলিয়ান আর হেলেন কেলারই মিল্টনের কথার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে। মানুষ যা চায় তার সবই ছিল নেপোলিয়ানের–সম্মান, ক্ষমতা, সম্পদ–তা সত্ত্বেও তিনি সেন্ট হেলেনায় বলেন, জীবনে ছটা দিনও সখে কাটাই নি। অন্যদিকে অন্ধ, বাকশক্তিহীন, বধির হেলেন কেলার বলেছিলেন : জীবনে আমার কাছে এত সুন্দর।

পঞ্চাশ বছরের জীবনে আমি যদি কিছু শিখে থাকি তাহলো, আপনি নিজে ছাড়া কেউ শান্তি আনতে পারে না।

আত্মনির্ভরতা নামে একটি প্রবন্ধের শেষে এমার্সন যা বলেছিলেন সেই কথাটাই আপনাদের শোনাতে চাই। কথাটা এই : রাজনৈতিক জয়, ভাড়া বৃদ্ধি, রোগমুক্তি বা আপনার হারানো বন্ধুর প্রত্যাবর্তন বা অন্য যে সব জিনিস আপনাকে খুশি করে, তাতে ভাবেন সুদিন আসছে। এটা কিন্তু বিশ্বাস করবেন না, কারণ কখনই তা হয় না। আপনি নিজে ছাড়া কেউ আপনাকে শান্তি এনে দিতে পারবে না।

বিখ্যাত উদাসী দার্শনিক এপিকটেটাস সকলকে সতর্ক করে বলেছিলেন, আমাদের উচিত দেহ থেকে টিউমার বা পুঁজ বের করে দেওয়ার চেয়ে বদ চিন্তা তাড়ানো অনেক বেশী প্রয়োজনীয়।

.

এপিকটেটাস কথাটা বলেছিলেন উনিশশো বছর আগে, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান তার কথাই সমর্থন করে। ড. জি. ক্যানরি রবিনসন বলেন জন্স হপকিন্স হাসপাতালে যেসব রোগী আগে তাদের পাঁচজনের মধ্যে চারজনই আবেগজনিত রোগের শিকার। এমনকি শরীরের নানা বিকলনেরও মূল এটাই। তিনি বলেছেন যে জীবনের পথে চলতে গিয়ে নানা সমস্যা থেকেই এই সব রোগ আসে। বিখ্যাত ফরাসী দার্শনিক মতেইনের কথা হল : যা ঘটে তাতে মানুষ যতটা না আঘাত পায়, তার চেয়ে বেশী আঘাত পায় সেই ঘটনা সম্পর্কে তার অভিমতের ফলে। আর সেই মতামত নির্ভর করে আমাদের নিজেদেরই উপরে।

দুশ্চিন্তামুক্ত নতুন জীবন কি বলতে চাই জানেন? আমার কি এমন ধৃষ্টতা যে আপনার মুখের উপর বলছি যে আপনার দুঃখ কষ্টের পরিসীমা নেই আর তা সত্বেও এর পরিবর্তন সম্ভব? হ্যাঁ, আসলে তাই বলতে চাই। আর সেটাই সব নয়। আমি সেটা কেমন করে করা যায় দেখাচ্ছি। এতে একটু চেষ্টার দরকার হলেও ব্যাপারটা খুবই সহজ। ব্যবহারিক মনস্তত্বের বিখ্যাত পণ্ডিত উইলিয়াম জেমস একবার বলেন : মনে হতে পারে মানুষ অনুভূতির ফলেই কাজ করে। আসলে কিন্তু দুটোই একসঙ্গে চলে। কাজকে যদি মন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত করা যায়–যা করা সম্ভব, আমরা পরোক্ষভাবে অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারি।

অন্যকথায় বললে উইলিয়াম জেমস বলেছেন যে আচমকা আমরা আমাদের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না–তবে আমাদের কার্যধারা বদল করতে পারি। আর যখনই কার্যধারা বদল করব তখনই আমাদের অনুভূতিও বদলাতে পারি।

.

এই সহজ কৌশল কি ফলপ্রদ? নিজেই চেষ্টা করুন না । মুখে সত্যিকার একটা হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করুন, তারপর হেলান দিয়ে বসে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে এক কলি আনন্দের গান গাইতে থাকুন । যদি গাইতে না পারেন তবে শিস দিন। যদি শিস না দিতে পারেন গুনগুন করুন। উইলিয়াম জেমস ঠিকই বলেছিলেন, আপনি দেখবেন যে এইরকম খুশির সুর ভাজতে থাকলে মন খারাপ করে থাকা একেবারেই অসম্ভব।

এটাই প্রকৃতির একটা অমোঘ সত্য যা আমাদের জীবনে অলৌকিক কাণ্ড ঘটাতে পারে। আমি ক্যালিফোর্নিয়ার এক মহিলাকে জানি–অবশ্য তাঁর নাম করব না–তিনি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই সুখী হতে পারতেন শুধু যদি এই কৌশলটা জানতেন। মহিলাটি বৃদ্ধা আর বিধবা, স্বীকার করতেই হবে ব্যাপারটা খুবই দুঃখের। তবে তিনি কি সুখী হওয়ার চেষ্টা করেছেন? উত্তর হল ‘না’ তাঁকে যদি প্রশ্ন করা হয় তিনি উত্তর দেন, ওহ্, আমি ঠিক আছি–তবে তাঁর মুখভাব আর কণ্ঠস্বরই বলে দেবে কথাটা ঠিক নয় যেহেতু মনে হবে তিনি বলছেন, ওঃ ঈশ্বর, যদি জানতেন কত কষ্ট না আমি পেয়েছি। মনে হয় তাঁর সামনে সুখী থাকায় যেন আপত্তি আছে।

অনেক মেয়েই তাঁর চেয়ে কষ্টে আছে, তাঁর স্বামী তার জন্য বীমার যে টাকা রেখে গেছেন তাতে তার অভাব নেই। তার বিবাহিত ছেলেমেয়েরা আছে সেখানে তিনি থাকতে পারেন। তবে আমি কখনই তাকে হাসতে দেখিনি; তিনি সব সময় অভিযোগ করেন তার জামাইরা কৃপণ আর স্বার্থপর–অথচ তিনি তাদের বাড়িতে মাসের পর মাস কাটিয়েছেন। তিনি আরও বলেন মেয়েরা তাকে কোন উপহারই দেয় না–অথচ তিনি নিজে এক পয়সা খরচ করেন না, নিজের জন্য সব টাকা জমিয়ে রাখেন। তিনি তার পরিবারকে এইভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছেন।

কিন্তু এরকম হওয়ার কোন প্রয়োজন ছিলো? সেটাই হল দুঃখের কথা–তিনি ইচ্ছে করলেই অসুখী থেকে সুখী হতে পারতেন–নিজেকে তিনি হতভাগিনী তিক্ততা মাখা এক অসখী স্ত্রীলোক তা আদরণীয়, প্রিয় একজন হতে পারতেন। এটা না করে নিজের অসুখী জীবনের দিকে সর্বদা মত । মোটেও কেউ সুখী হতে পারে না ।

আমি ইন্ডিয়ানাতে একজনকে জানতাম, নাম এইচ জে. ইঙ্গলার্ট, তিনি আজও বেঁচে আছেন তিনি এই রহস্য আবিষ্কার করতে পেরেছেন। দশ বছর আগে তার স্কারলেট ফিভার হয়। তা থেকে সেরে ওঠার পরেই তিনি আক্রান্ত হন মূত্রাশয়ের প্রদাহে। সব রকম ডাক্তার দেখালেন ইঙ্গলার্ট এমনকি হাতুড়েদেরও। কিন্তু কিছুতেই তাঁর রোগ সারলো না; তারপর কিছুকাল পরেই নতুন উপদ্রব সুরু হল। তার রক্তচাপ বেড়ে গেল। তিনি এক ডাক্তারের কাছে দেখাতেই শুনলেন রক্তচাপ ২১৪। তাকে বলা হল এটা মারাত্মক–সেটা বেড়েই চলছে অতএব ভবিষ্যতের সব কিছু ঠিকঠাক করে ফেলা উচিত।

ভদলোক বলেন, আমি বাড়ি চলে গেলাম, আর দেখতে চাইলাম বীমা কোম্পানির টাকা মেটানো আছে কিনা। তারপর বিধাতার কাছে ক্ষমা চাইলাম আমার সব ত্রুটির জন্য এবং মনখারাপ করা হল তলিয়ে গেলাম। আমি এবার সকলকেই অসুখী বানিয়ে ছাড়লাম । আমার স্ত্রী আর পরিবারের সবাই ভারি অসুখী করে তুলোম এবং নিজে হতাশায় ডুবলাম। যাইহোক এক সপ্তাহ ধরে আনিগতের সহ নিজেকে বললাম : তুমি বোকার মতই কাজ করছ। হয়তো আগামী এক বছরেও তোমার মত হবে, অতএব আবার সুখী হতে চেষ্টা করছ না কেন?

আমি তাই সটান হেলান দিয়ে বসে হাসি মাখানো মুখে এমন ভাব করতে চাইলাম যেন সবই স্বাভাবিক। স্বীকার করছি ব্যাপারটা গোড়ায় তেমন সহজ হয়নি–তবে চেষ্টা করে খশির ভারস রাখলাম আর তাতে যে আমার পরিবারকেই খুশি করলাম তাই নয় আমারও ভালো হল ।

প্রথমতঃ আমি ভলো বোধ করতে আরম্ভ করলাম–যা ভাবতাম সেই রকমই। ক্রমেই ভালো হয়েও উঠলাম। আর আজ? আজ যখন আমার কবরে থাকার কথা তারও কয়েক মাস পরে শুধু যে সুখী তাই নই। বেশ ভালো ভাবেই বেঁচে আছি, আমার রক্তের চাপও স্বাভাবিক! একটা জিনিস আমি নিশ্চিত জানি, ডাক্তারের ভবিষ্যতবাণীই ঠিক হত যদি মৃত্যুর ওই চিন্তা করতাম। কিন্তু আমি আমার শরীরকে সেরে ওঠার সুযোগ দিই আর সেটা হল মানসিক অবস্থার পরিবর্তন!

আনন্দের একটা প্রশ্ন করি আসুন : যদি আনন্দের ভান আর সত্যিকার সুস্বাস্থ্যের কথা ভাবলে এবং মনে সাহস আনলে একজনের জীবন রক্ষা করতে পারেন, তাহলে আমি বা আপনি ছোটখাটো দুঃখ আর মন খারাপের কথা ভাববো কেন? কেন আমদের চারপাশের সবাইকে অসুখী করব? অথচ কেবল হাসিখুশি থাকলেই তাদেরও ভালো করা যায়।

বহু বছর আগে একটা ছোট্ট বই পড়েছিলাম বইখানা আমার জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। বইটার নাম মানুষ যেরকম ভাবে। লেখক জেমস অ্যালেন। তাতে কি ছিল বলছি।

একজন মানুষ যখন কোন লোক বা জিনিস সম্পর্কে তার চিন্তাধারা বদল করে, অন্য লোক আর জিনিসও তেমনি বদলে যায় । …একজন লোককে তার চিন্তাধারা বদলাতে দিন তাহলে অবাক হয়ে দেখবেন যে তার জীবনের বাস্তব অবস্থারও পরিবর্তন ঘটছে। যে ঈশ্বর আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি আমাদেরই মধ্যে। এ আমরা নিজেরাই …মানুষ যা করে তাহল তার নিজের চিন্তারই ফসল…কোন মানুষের উন্নতি, জয়লাভ আর সবই তার নিজের চিন্তাতেই হয়। যখনই যে দুর্বল, আর দুঃখে ভারাক্রান্ত হবে তখনই চিন্তার উন্নয়ন সে ছেড়ে দেয়।

বাইবেলের প্রথম পরিচ্ছেদ অনুসারে ঈশ্বর মানুষকে দুনিয়ার অধীশ্বর বানিয়ে ছিলেন। এ এক মহান উপহার । কিন্তু এরকম রাজকীয় উপহার আমি চাই না। আমি যা চাই তা হল নিজের উপর অধিকার–আমার চিন্তার অধীশ্বর হতে, ভয় জয় করতে, আমার মন আর চিন্তার উপর প্রভুত্ব করতে । আমি এও জানি একাজ আমার পক্ষে সম্ভব–ইচ্ছে করলেই আমি আমার মনের অধীশ্বর হতে পারি।

অতএব আসুন উইলিয়াম জেমসের এই কথাগুলো মনে গেঁথে রাখি :

যাকে আমরা অকল্যাণ বলে থাকি…তাকে সঙ্কজেই কল্যাণকর সালসা তৈরি করা ও সম্ভব। যে মানুষ দুর্ভাগ্যতাড়িত তার উচিত মন থেকে ভয় দূর করে লড়াই করা।

আসুন আমরা আমাদের সুখের জন্য যুদ্ধ করি।

আসুন এজন্য আমরা প্রত্যেক দিনের প্রফুল্লতা আর গঠনমূলক কাজের কার্যসূচী তৈরী করি। এই কার্যসূচীকে নাম দিতে পারি ‘শুধু আজকের জন্য।’ এটা আমার এত ভালো লেগেছিল যে শয়ে শয়ে কপি বিলিয়েছি। এটা ছত্রিশ বছর আগে প্রয়াত সিবিল এফ প্যাট্রিজ লিখেছিলেন। যদি এটা আমরা মেনে চলি তাহলে আমাদের দুশ্চিন্তার আবেগটা কেটে গিয়ে আনন্দের ভাগ ঢের বেড়ে যাবে।

শুধু আজকের জন্য

(১) শুধু আজকের জন্য আমি সুখী হব। এতে বোঝা যায় আব্রাহাম লিঙ্কন যা বলেছেন তাই ঠিক যে ‘অধিকাংশ মানুষই যতখানি খুশী হতে চায় তাদের মন যা চায় ততটাই তারা তাই হয়।’ সুখ বাইরের বস্তু নয়। এ হলো অন্তরের।

(২) শুধু আজকের জন্য যা ঘটে তাকে গ্রহণ করব, আমার ইচ্ছেমতো সেটা করতে চাইব না। আমি আমার পরিবার, ব্যবসা আর ভাগ্য যেমন আসবে তাকে সেই ভাবেই মেনে নেব।

(৩) শুধু আজকের জন্য আমার শরীরের যত্ন নেব। আমি ব্যায়াম করব, যত্ন করব, শরীরকে অবহেলা করব না। কারও দোষ খুঁজব না, কাউকে নিয়ন্ত্রণ বা উন্নত করার চেষ্টা করব না।

(৪) শুধু আজকের জন্য মনকে আমি সবল করার চেষ্টা করব। দরকারী কিছু শিক্ষা করব আমি এমন কিছু পড়তে চেষ্টা করব যাতে চেষ্টা দরকার। সেইসঙ্গে দরকার চিন্তা আর মনঃসংযোগ।

(৫) শুধু আজকের জন্য আমার আত্মাকে তিনটি পথে সক্রিয় করব। আমি একজনের কোন উপকার করব কিন্তু নিজের পরিচয় জানাবো না। যা করতে চাই না–এমন দুটো কাজ করব উইলিয়াম জেমসের উপদেশ মত। কেবল অভ্যাসের জন্যই এই সব কাজ করব।

(৬) শুধু আজকের জন্য আমি প্রীতিময় থাকব। আমি আজ বাহ্যিকভাবে সুদর্শন থাকতে, পোশাক পরতে চেষ্টা করব। আমি ধীরে কথা বলব, শিষ্ট থাকব। আমি অপরের প্রশংসা করব। কোন সমালোচনা করব না। শুধু আজকের জন্য আজকের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করবো। সারা জীবনের সমস্যা নিয়ে একসাথে মাথা ঘামাবো না। আমি বারো ঘন্টার জন্য কোন কাজ করতে পারি তবে তা সারা জীবন ধরে করে চলব না। শুধু আজকের জন্য একটা কাৰ্যসূচী রাখব। প্রতি ঘণ্টায় কি করব তার হিসেব রাখব। আমি যে সব সময় তা মেনে চলব তা নয়, তবু তা সত্ত্বেও রাখব। এতে দুটো জিনিস ধ্বংস হবে তাহল–ব্যস্ততা আর অনির্দিষ্টতা।

(৯) শুধু আজকের জন্য আধঘন্টা একাকী বিশ্রাম নেব। এই আধ ঘন্টায় ঈশ্বরের চিন্তা করব যাতে জীবনকে প্রকৃত উপলব্ধি করতে পারি।

(১০) শুধু আজকের জন্য আমি ভয় পাব না। অন্তত সুখী হতে ভীত হব না। যা ভাল অর্থাৎ সেই সুন্দরকে নির্ভীকভাবে পূজা করব, এবং যাদের ভালোবাসি তাদের বিশ্বাস করতে চাইব যে তারাও আমায় ভালোবাসে।

শান্তি ও সুখের জন্য যদি মনকে সুদৃঢ়ভাবে তৈরি করতে চান তাহলে এই নিয়মটি মেনে চলুন : হাসি মুখে চিন্তা করে কাজ করুন, দেখবেন তাহলেই প্রফুল্লতা সত্যিই আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *