১২. ভয়ংকরের গান

ভয়ংকরের গান

পরের দিন সকাল বেলা নটিলাস-এর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখি ফাস্ট অফিসার সমুদ্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যথোচিত নির্দেশ দিচ্ছেন। নটিলাস তখন ১০৫ দ্রাঘিমা আর ৭৫° দক্ষিণ অক্ষরেখায় প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলেছে–সম্ভবত এই ক-দিন টোরেজ প্রণালীতে আটকে থাকতে হয়েছে বলেই এত জোরে সে যাচ্ছে।

আমি প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াবার পরক্ষণেই ক্যাপ্টেন নেমোও সেখানে এসে দাঁড়ালেন, তারপর দুরবিন দিয়ে কিছুক্ষণ দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

পাথরের মূর্তির মতো কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন নেমো, তারপর দুরবিন নামিয়ে কী এক দুর্বোধ ভাষায় ফাস্ট অফিসারকে কয়েকটি কথা বললেন। তিনি; ফাস্ট অফিসারকে অত্যন্ত অস্থির ও উত্তেজিত দেখালো, কিন্তু ক্যাপ্টেন নেমোর শান্ত সংযত মূত দেখে কোলে কিছুই বোঝবার জো ছিলো না। আমার দিকে দৃকপাত পর্যন্ত না করে কিছুক্ষণ ইতস্তত পায়চারি করলেন ক্যাপ্টেন, মাঝেমাঝে কেবল একটু থেকে-থেকে দিগন্তের সেই বিশেষ দিকটাতে তাকাতে লাগলেন। ফাস্ট অফিসারও তার দুরবিন দিয়ে বারে বারে সেই দিকে তাকাচ্ছিলেন। কিন্তু আমি সেদিকে তাকিয়ে কিছুই আবিষ্কার করতে পারলাম না। সূর্য আর সমুদ্রের মিলনমন্দিরে কিছুই দেখা গেলো না। এই বিশাল সমুদ্রের মধ্যে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে কী দেখতে পেয়েছেন তারা? হঠাৎ ক্যাপ্টেন নেমো ফাস্ট অফিসারকে কী একটা নির্দেশ দিতেই নটিলাস-এর গতি আরো বেড়ে উঠলো।

আমার আর এই রহস্য ভালো লাগলো না। অধীরভাবে সেলুনে ফিরে গিয়ে একটা দুরবিন নিয়ে চোখে দিলুম। কিন্তু কিছু নিরীক্ষণ করার আগেই এক হ্যাচকা টানে তা হাত থেকে খশে পড়লো।

পিছন ফিরে তাকিয়ে যাকে দেখলুম তিনি ক্যাপ্টেন নেমো হলেও তাকে আমি চিনি না। সম্পূর্ণ বদলে গেছেন তিনি। কেঁচকানো ভুরুর তলায় চোখের তারা দপদপ করে জ্বলছে; দৃঢ় বিন্যস্ত ঠোঁটের ভিতর দাঁতে দাঁত চেপে আছেন তিনি; কেমন যেন শক্ত হয়ে গেছে তার শরীর; কঠিন হয়ে উঠেছে মুখচ্ছবি, আর তার আস্ত প্রতিচ্ছবি থেকে কী-এক প্রচণ্ড ঘৃণা ফুটে বেরোচ্ছে।

তাহলে কি না-জেনে এমন কোনো অপরাধ করেছি যাতে রোষে তার সমগ্র মূর্তি এমন বদলে গেছে? কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারলুম তার রোষ ও ঘৃণার উৎস আমি নই, কারণ কঠিনভাবে তখনও তিনি দিগন্তের সেই বিশেষ কোণটিরই দিকে তাকিয়ে আছেন। ফাস্ট অফিসারকে কোনো বিদেশি ভাষায় অল্প কয়েকটি কথায় নির্দেশ দিতে দিতে নিজেকে তিনি সামলে নিলেন।

মঁসিয় আরোনা, নটিলাস-এ আশ্রয় দেবার সময় আপনাদের যে-শর্ত দিয়েছিলুম, তা মান্য করার সময় এসেছে এখন।

কী বলতে চাচ্ছেন, তা ঠিক বুঝতে পারছি না।

আপনাদের তিনজনকেই একটি ঘরে বন্দী করে রাখা হবে। পরে অবিশ্যি আবার যথাসময়ে চলাফেরার স্বাধীনতা ফিরে পাবেন।

আপনি নটিলাস-এর সর্বময় কর্তা, কাজেই আপনি যা বলবেন তা-ই হবে। কিন্তু একটা কথা আমি জিগেস করব?

না, মঁসিয়, একটাও না।

একথার পর তার নির্দেশ মান্য করা ছাড়া আর কিছুই করার রইলো না। নিচে আসতেই চারজন নাবিক আমাদের নিজকে নিয়ে গেলে সেই ঘরটিতে, যেখানে সর্বপ্রথম আমাদের বন্দী করে রাখা হয়েছিল। টেবিলের উপর ছটোহাজৰি সাজানো হয়েছিলো। নেড গোড়ায় খুব খানিকটা চোটপাট করে তাই খেতে করে দিলে। যদিও আমি সাত-পাঁচ নানা কথা ভাবছিলুম, তবু আমিও দেরি নাকরে হাত লাগালুম। কোনসাইলও কোনো বাক্য ব্যয় না করে দক্ষিণ হস্তে ব্যবহারে তন্ময় হয়ে পড়লো। খাওয়া শেষ হবার পরেই নেড আর কোনসাইল দিব্যি শুয়ে পড়ে ঘুম লাগালো। হঠাৎ এমন অসময়ে ওদের ঘুমিয়ে পড়ার কোনো কারণ বুঝলুম না। আমারও বেজায় ঘুম পাচ্ছিলো। চোখের পাতায় কে যেন আঠা মাখিয়ে দিয়েছে, কিছুতেই চোখ খুলে রাখতে পারছি না। সেই আধো-ঘুম আবোজাগরণের মধ্যে চকিতে একটা কথা মাথার মধ্যে খেলে গেলো। বুঝতে পারলুম যে ক্যাপ্টেন খাবারের মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছেন। নটিলাস তখন আর দুলছিলো না, সম্ভবত জলের তলায় ড়ুব দিয়েছে। তারপর আর কিছু মনে নেই।

পরের দিন ঘুম ভাঙলে কিন্তু আশ্চর্য ঝরঝরে লাগল নিজেকে। তাড়াতাড়ি উঠে বাকা দিতেই দরজা খুলে গেলো। তাহলে এখন আমি স্বাধীন। তাহলে আমার চলাফেরার এখন আর কোনো বাধা-নিষেধ নেই।

করিডরে বেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে যাবার দরজা খোলা দেখে সোজা সেখানে গিয়ে হাজির হলুম। নেড আর কোনসাইলও সেখানে ছিলো তখন। সমুদ্র তেমনি শান্তনীল, আকাশ ফেটে শাদা রোদ চুঁইয়ে পড়ছে, কোনো উপদ্রব বা কিছুরই কোনো চিহ্ন নেই। আর এই শান্ত সমুদ্রের মধ্যেই নটিলাস ভেসে যাচ্ছে তার সমস্ত গোপন রহস্য সমেত। নিচে নেমে এলুম। নটিলাসও জলের তলায় ড়ুব দিলে। খানিক পরেই আবার ভেসে উঠলো। কয়েকবার এমনি ওঠা-নামা করলো ড়ুবোজাহাজ—যেন কোনো কারণে বড় অশান্ত, বড় অস্থির হয়ে পড়েছে সে।

বেলা তখন দুটো হবে, আমি সেলুনে বসে আমার দিনলিপি লিখছি, এমন সময় ক্যাপ্টেন নেমে এসে ঢুকলেন। আমার শুভেচ্ছার উত্তরে সামান্য মাখা সুইয়ে চুপ করে অভিবাদন জানালেন, কোনো কথাই বললেন না। তাঁর সমস্ত শরীরে ক্লান্তির ছাপ, চোখ দুটি রক্তবর্ণ–সারা রাতে বোধ হয় এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। অস্থিরভাবে খানিকক্ষণ পায়চারি করলেন তিনি ঘরের মধ্যে। দু-চারটে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে দেখলেন কিন্তু এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো যে, যন্ত্রপাতির দিকে মোটেই তার মন নেই। যেন কি একটা বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করছেন, কিন্তু কিছুতেই আর মনস্থির করতে পারছেন না। শেষকালে হঠাৎ আমার সামনে এসে সোজাসুজি জিগেস করলেন, মঁসিয় আরোনা, আপনি কি কখনো ডাক্তারি করেছেন?

প্রশ্নটা এমনি আকস্মিক যে প্রথমটায় আমি অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।

ক্যাপ্টেন নেমো আবার জিগেস করলেন, আপনি কি ডাক্তারি জানেন? আমি এটা জানি যে আপনার কয়েকজন সহকর্মী চিকিৎসা বিদ্যালয় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন–কিন্তু আপনি?

আমিও আসলে ডাক্তার ছিলুম। পারী বিচিত্রাভবনে যোগ দেবার আগে আমি ডাক্তারি করতুম।

তাহলে আমার একজন লোককে আপনি একটু পরীক্ষা করে দেখবেন কি?

কেন দেখবে না? তার কি খুব অসুখ করেছে হঠাৎ?

কোনো কথা না বলে ক্যাপ্টেন নেমো আমাকে সঙ্গে করে একটা ছোটো কামরায় নিয়ে গেলেন। লোকটি যে মুম্ষু, তা বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি হলোল। কী একটা ভোতা হাতিয়ারের মারাত্মক আঘাতে তার মাথার খুলি চৌচির হয়ে মগজটা বেরিয়ে এসেছে। রক্তমাথা পট্টিটা খোলার সময় টু শব্দটি পর্যন্ত করলে না সে, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। মুখ দেখে মনে হলো লোকটা বোধ হয় আসলে ইংরেজ।

দেখার কিছুই ছিলো না বস্তুত। এর মধ্যেই মৃত্যুর লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছিলো তার সর্বাঙ্গে হাত-পা ঠাণ্ডা হতে শুরু করছিলো।

এমন মারাত্মক চোট ও পেল কোত্থেকে? ক্যাপ্টেন নেমোকে আমি জিগেস করলুম।

তা শুনে আপনার কি হবে? হঠাৎ একটা দারুণ ঝাঁকুনিতে ইঞ্জিনের একটা কীলক ভেঙে যায়–লাফিয়ে গিয়ে চোটটা সম্পূর্ণ নিজের মাথায় নিয়ে ও ওর সঙ্গীকে বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু অবস্থা কী-রকম দেখলেন, বলুন? আপনি নিঃসংকোচে বলতে পারেন কারণ ও ফরাশি জানে না।

বলার কিছুই নেই। বেশি হলে বোধকরি আর মাত্র ঘণ্টা-দুই ওর পরমায়ু।

কিছুতেই কি ওকে আর বাঁচানো যায় না?

না, কিছুতেই না।

ক্যাপ্টেন নেমোর হাত দুটি হঠাৎ কী একটা প্রচণ্ড আবেগে মুঠি হয়ে গেলো। তারপরেই তার চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো জলের ধারা।

কী করে মানুষের দেহে প্রাণের স্ফুলিঙ্গ নিভে আসে, আরো কিছুক্ষণ তা-ই দেখে আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলুম।

সে-রাত্রে আমার আর ভালো ঘুম হলো না। সারা রাত ধরে ক্যাপ্টেন নেমোর চঞ্চল ও স্পর্শাতুর আঙুলের তলায় গম্ভীর অর্গ্যান কেঁদে উঠলো। মানুষের কোনো আবেগ যেখানে পায়ে হেঁটে যেতে পারে না, সেখানে এই বিষণ্ণ, মর্মন্তুদ, চাপা কান্নার মতো সংগীত যেন কোনো এক পাখির মতো বারেবারে পাখা ঝাপটে পেছোতে চাচ্ছে।

পরের দিন সকালবেলায় সমুদ্রের অনেক নিচে নিঃশব্দ এক শোকযাত্রা বোেলো একটি কফিন কাঁধে। প্রবালস্থূপে অন্ত্যেষ্টি হলো লোকটির, আর লাল ফুলের মতো প্রবাল ছড়িয়ে রইলো তার কবরের উপর। সেই স্তব্ধ শোকাতুর শেষ যাত্রার সঙ্গী ছিলুম আমিও। ফিরে আসার পর ক্যাপ্টেন নেমোক বলেছিলুম, সত্যি হাঙরের খপ্পর থেকে অনেক দূরে আপনাদের এই কবরখানা

হ্যাঁ তাই, গম্ভীরভাবে বললেন ক্যাপ্টেন নেমো, শুধু হাঙর নয়, মানুষেরও কাছ থেকে অনেক দূরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *