১১-১৫. শূন্য কামরা পেরিয়ে বারান্দায়

১১.

শূন্য কামরা পেরিয়ে বারান্দায়, এলাম। বারান্দা থেকে উঠানে। খান পথ দেখাচ্ছে। উঠানে পৌঁছুতেই সে ফিসফিস করে বললো, ছায়ায় ছায়ায় এসো।

আকাশে পূর্ণ চাদ। স্পষ্ট আলোয় হাসছে চারদিক। এখনও কাউকে দেখিনি, আমাদেরও কেউ দেখেনি বলেই মনে হয়। তবু ভেবে পেলাম না, শেষ পর্যন্ত প্রাসাদ ফটুক বা নগর তোরণ পেরোবো কি করে। ওসব জায়গায় খানিয়ার নির্দেশে প্রহরীর সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে।

দরজার দিকে গেল না খান। ওটাকে ডানে রেখে সরু একটা পথ ধরে প্রাসাদের প্রাচীরের কাছে নিয়ে এলো আমাদের। জায়গাটা ঝোপঝাড়ে ছাওয়া। ঝোপের পেছনে ছোট একটা গুপ্ত দরজা। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুললো র‍্যাসেন। দরজা পেরিয়ে দেখলাম সামনে প্রাসাদের বাইরের দেয়াল ঘেরা বাগান। ফটকের দিকে এগিয়ে চললাম আমরা খানের পেছন পেছন।

আর সামান্য গেলেই প্রাসাদ ফটক। এই সময় একটা অন্ধকার ঝোপ দেখিয়ে আমাদের অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল খান। একটু ভয় ভয় করতে লাগলো আমাদের। এখন যদি খান চার-পাঁচজন বিশ্বস্ত লোক নিয়ে এসে আমাদের ওপর চড়াও হয়? খুন করে লাশ গুম করে ফেলে?

কিন্তু না, তেমন কিছু ঘটলো না। দুটো সাদা ঘোড়া নিয়ে ফিরে এলো র‍্যাসেন একটু পরেই।

উঠে পড়ো, ফিসফিস করে সে বললো, আমার মতো মুখ ঢেকে নাও আলখাল্লা দিয়ে।

বিনাবাক্যব্যয়ে নির্দেশ পালন করলাম আমরা।

এবার এসো আমার পেছন পেছন, বলে দৌড়াতে শুরু করলো খান। প্রাচীনকালের অভিজাত বা জমিদারদের আগে আগে যেমন দৌড়বিদ দৌড়াতো তেমন। আমরাও ঘোড়া ছোটালাম। কেউ বাধা দেয়ার আগেই পেরিয়ে গেলাম উঁচু পাচিল ঘেরা বাগানের ফটক। রক্ষীরা পিছু নিলো না; সম্ভবত ভাবলো কালুনের দুই অভিজাত ব্যক্তি খান বা খানিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে।

শহরের প্রধান সড়ক ছেড়ে অলিগলি দিয়ে আমাদের নিয়ে চললো র‍্যাসেন। রাত এখন অনেক। পথে খুব একটা লোকজনের সাথে দেখা হলো না। একটু পরে নগর প্রাচীর পেরোলাম। সামনে নদী। আসার সময় যেখানে নৌকা থেকে নেমেছিলাম সেদিকে গেল না খান। অন্য একটা পথ ধরে ছোট একটা জেটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। লাগাম টেনে ধরলাম আমরা। জেটির সঙ্গে বাঁধা একটা খেয়া নৌকা।

ঘোড়াসুদ্ধ এই খেয়ায় চড়ে নদী পেরোতে হবে তোমাদের, বললো র‍্যাসেন। পুলগুলো সব পাহারা দিচ্ছে রক্ষীরা। নিজেকে প্রকাশ না করে ওগুলোর কোনোটা দিয়ে তোমাদের পার করে দিতে পারবো না।

একটু কষ্ট হলো, তবে শেষ পর্যন্ত ঘোড়া দুটোকে ওঠাতে পারলাম নৌকায়। আমি লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম, দাঁড় তুলে নিলো লিও।

নদীর মাঝামাঝি পৌঁছুইনি তখনও, জেটির ওপর থেকে ভেসে এলো অট্টহাসির শব্দ। তারপর র‍্যাসেনের কণ্ঠস্বর-পালাও, বিদেশীরা, জলদি পালাও, পেছনেই আসছে মৃত্যু, হা-হা-হা-হা… ঘুরে দাঁড়ালো সে। পেছনে আলখাল্লা উড়িয়ে দ্রুত নেমে গেল জেটি থেকে।

অশুভ আশঙ্কায় পূর্ণ হয়ে উঠলো আমাদের অন্তর। কিছু একটা ফন্দি এঁটেছে খান। কিন্তু কি, বুঝতে পারছি না।

বেয়ে চলো, লিও, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম।

নদীতে স্রোত প্রবল বলে সরাসরি ওপারে গিয়ে পৌঁছুতে পারলাম না। নৌকা তীরে নিতে নিতে স্রোতের টানে ভাটির ঠিকে বেশ খানিকটা চলে গেলাম। অবশেষে তীরে নামলাম আমরা। ঘোড়া দুটোকে নামালাম। তারপর ওদের পিঠে উঠে ছুটিয়ে দিলাম দূরে পাহাড়-চূড়ার গনগনে আভা লক্ষ্য করে।

প্রথম কিছুক্ষণ বেশি দ্রুত এগোতে পারলাম না, কারণ কোনো পথ খুঁজে পেলাম না। মাঠের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। অবশেষে একটা গ্রামের কাছে পৌঁছে পথের দেখা পাওয়া গেল। এবার একটু জোরে ঘোড়া ছোটাতে পারলাম।

সারারাত একটানা ছুটে চললাম। ভোরের কিছু আগে চাঁদ ডুবে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক। দূরে অগ্নি-পর্বতের চূড়ায় লাল একটা আভা ছাড়া আর কোনো আলো দেখতে পাচ্ছি না। পথে কোথাও খানাখন্দক আছে কিনা জানি না। আপাতত কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। নিজেদের, এবং ঘোড়াগুলোকেও একটু বিশ্রাম দিতে হবে।

একটু পরে ধূসর হয়ে এলো আকাশ। পথের পাশে ক্ষেতে নামিয়ে দিলাম ঘোড়া দুটোকে। বেশিক্ষণ লাগলো না ওদের পেট ভরতে। কিছু দূরে একটা খালে নিয়ে গিয়ে পানি খাওয়ালাম। তারপর আবার ছুটে চলা।

সূর্য ওঠার কিছুক্ষণের ভেতর মাঠের এখানে ওখানে দেখা যেতে লাগলো কৃষকদের। সাত সকালে চলে এসেছে কাজ করতে। আমাদের ওপর দৃষ্টি পড়া মাত্র হাঁ করে চেয়ে রইলো ওরা, কালুন নগরীর লোকরা যেমন তাকিয়ে থাকতো তেমন। দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওরা বুঝে ফেলেছে আমরা কারা। অনেকেই চিৎকার করে বললো, তোমরা যাও, আমাদের বৃষ্টি ফিরিয়ে দাও। এক গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামবাসীরা লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণই করে বসলো। তীর বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে সেযাত্রা রক্ষা পেলাম আমরা।

সন্ধ্যা নাগাদ ধারণা করলাম, কালুনের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। এমন ধারণার কারণ, এক জায়গায় বেশ দূরে দূরে কয়েকটা পর্যবেক্ষণ চূড়া দেখতে পেলাম। তবে কোনো সৈনিক বা রক্ষী দেখলাম না। সম্ভবত প্রাচীনকালে, কালুনের খানরা যখন বহিঃশত্রুর আক্রমণ আশঙ্কা করতো তখন তৈরি করা হয়েছিলো চূড়াগুলো। এখনকার শাসকশ্রেণী বাইরের আক্রমণ আশঙ্কা করে না, তাই পাহারা রাখারও প্রয়োজন বোধ করেনি।

পর্যবেক্ষণ চূড়াগুলো পেরিয়ে কিছুদূর আসার পর সূর্য ডুবে গেল। ঘোড়াগুলোকে একটু বিশ্রাম দেয়ার জন্যে থামলাম আমরা। চাঁদ উঠলেই আবার রওনা হবো।

জিন খুলে নিয়ে ঘোড়া দুটোকে ছেড়ে দিলাম চরে বেড়ানোর জন্যে। আশেপাশে পানি নেই। তবে ও নিয়ে ভাবলাম না। ঘণ্টাখানেক আগে পথের পাশের এক জলা থেকে ওদের পানি খাইয়ে নিয়েছি। আপাতত পানি না খেলেও চলবে। কাল রাতে প্রাসাদ ছেড়ে বেরোনোর আগে কিছু খাবার সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম, তার খানিকটা খেয়ে নিলাম আমরা। সারারাত এবং দিনের ছুটে চলা শেষে খাবারটুকুর সত্যিই খুব প্রয়োজন বোধ করছিলাম। কিছুক্ষণ ঘাস খেলে ঘোড়াগুলো। তারপর ক্লান্তি দূর করার জন্যে গড়াগড়ি করতে লাগলো; পিঠ মাটিতে, পা-গুলো আকাশে। আমরা ঘাসের ওপর বসে দেখতে লাগলাম ওদের গড়াগড়ি খাওয়া।

একটু একটু করে আঁধার হয়ে আসছে চারদিক। ঘোড়াগুলোর গড়াগড়ি শেষ। ধীরে ধীরে পা নামিয়ে আনলো ওরা। প্রথমে আমার ঘোড়াটা। লিও বসে ছিলো ওটার কাছেই।

আরে ওর খুরগুলো অমন লাল কেন? বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো ও। কেটে গেছে নাকি?

দিন শেষের অস্পষ্ট আলোয় আমিও এবার খেয়াল করলাম লাল দাগগুলো। উঠে গেলাম পরীক্ষা করার জন্যে। স্মরণ করার চেষ্টা করলাম লাল মাটির কোনো এলাকা দিয়ে এসেছি কিনা। মনে পড়লো না। বসে এক হাতে তুলে নিলাম ঘোড়াটার এক পা। বিশ্রী একটা গন্ধ ঝাঁপটা মারলো নাকে। কস্তুরী এবং গরম মসলার সঙ্গে রক্ত মেশালেই কেবল এমন গন্ধ ছুটতে পারে।

আশ্চর্য! অবশেষে বললাম আমি। দেখি, লিও, তোমার ঘোড়ার পা–।

এক অবস্থা এটারও। উৎকট গন্ধওয়ালা কোনো জিনিসে চুবিয়ে নেয়া হয়েছিলো খুরশুলো।

খুব বেশি চাপ পড়লেও খুরের যেন ক্ষতি না হয় সেজন্যে স্থানীয়দের কোনো পদ্ধতি বোধহয়, বললো লিও। আমরা যেমন নাল ব্যবহার করি অনেকটা তেমন আর কি।

এক মুহূর্ত ভাবলাম। ভয়ঙ্কর একটা চিন্তা উঁকি দিয়ে গেল আমার মনে।

না, লিও, আমার তা মনে হয় না। আমি তোমাকে ঘাবড়ে দিতে চাই না, তবে—তবে আমার মনে হচ্ছে, এক্ষুণি রওনা হয়ে গেলেই আমরা ভালো করবো।

কেন?

আমার ধারণা এটা ঐ খানেরই কীর্তি।

খানের কীর্তি! কি কারণে ও এমন করবে? ঘোড়াগুলোকে খোড়া করে দিতে চায়?

না, লিও, ও চায় ওরা ছোটার সময় শুকনো মাটিতে তীব্র গন্ধ রেখে যাক।

চমকে উঠলো লিও। মানে–মানে তুমি বলতে চাও, ঐ কুকুরগুলো?

মাথা ঝাঁকালাম আমি। এবং কথা বলে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে জিন চাপালাম ঘোড়ায়। শেষ ফিতেটা সবে বাঁধা হয়েছে কি হয়নি, দূর থেকে ভেসে এলো অস্পষ্ট আওয়াজ।

শুনেছো? বললাম আমি। আবার এলো শব্দ। এবং এবার কোনো সন্দেহ রইলো না, ওগুলো কুকুরের ডাক।

ও ঈশ্বর। মরণ-শ্বাপদ! চিৎকার করলো লিও।

হ্যাঁ, আমাদের পরম বন্ধু খান শিকারে বেরিয়েছে। এতক্ষণে বুঝতে পারছি ওর সেই হাসির মর্ম।

এখন কি করবো আমরা? ঘোড়াগুলো রেখে হেঁটে যাবো?

পাহাড়টার দিকে তাকালাম। ওটার পাদদেশের সবচেয়ে কাছের অংশ এখনও বহু বহু মাইল দূরে।

উঁহুঁ, পায়ে হেঁটে অত দূর যেতে পারবো না,,পারলেও সে সুযোগ বোধহয় পাওয়া যাবে না। প্রথমে ঘোড়াগুলোকে ছিঁড়ে খাবে কুকুরের পাল, তারপর বিড়াল যেমন ইঁদুর ধরে তেমনি করে ধরবে আমাদের। না, লিও, ঘোড়ায় চড়েই যেতে হবে।

লাফ দিয়ে জিনের ওপর চড়ে বসলাম। লাগামে টান দেয়ার আগে একবার ঘাড় ফিরিয়ে চাইলাম। সন্ধ্যার অস্পষ্ট আলোয় দূরে দেখতে পেলাম এক দঙ্গল খুদে খুদে অবয়ব। সেগুলোর মাঝে এক অশ্বারোহী। লাগাম ধরে অন্য একটা ঘোড়া ছুটিয়ে আনছে পেছন পেছন।

পুরো পাল নিয়ে আসছে, গম্ভীর ভাবে বললো লিও। বদলি ঘোড়াও আছে সঙ্গে।

ঘোড়া ছুটিয়ে দিলাম আমরা। 

.

মৃদু ঢালের একটা চূড়া অতিক্রম করলাম। তারপরই শুরু হলো উঁচু নিচু পাথুরে, জমি। ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে একটা নদীতে গিয়ে মিশেছে। মাঝে মাঝে ছোট বড় ঝোপঝাড়। কয়েক মাইল নিচে দেখতে পাচ্ছি পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীটা। দুঘণ্টা একটানা ছুটিয়ে নিয়ে চলেছি ঘোড়াগুলোকে। ঘোড়ায়। চড়ার যতরকম কৌশল জানা আছে সব প্রয়োগ করে যথাসম্ভব গতিবেগ আদায় করার চেষ্টা করছি। কিন্তু লাভ হচ্ছে না। ক্রমশ কমছে তাড়া করে আসা শ্বাপদের পালের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান। এখন অনেক কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে কুকুরের ঘেউ ঘেউ। আধ মাইল দূরে কিনা সন্দেহ।

ঢাল বেয়ে কিছুদূর নামার পর বিরাট দুটো পাথরের স্কুপের মাঝ দিয়ে যাওয়ার জন্যে এক দিকে মোড় নিতে হলো সেই মুহূর্তে দেখতে পেলাম কুকুরের পালটা খুব বেশি হলে তিনশো গজ পেছনে রয়েছে। শ্বাপদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে অবশ্য। সম্ভবত ছুটতে ছুঁটতে ক্লান্ত হয়ে পথের মাঝে থেমে পড়েছে কয়েকটা। তবে এখনও যে আছে তা-ও কম নয়। তার ওপর ওদের সামান্য পেছনেই ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে খান। তার বদলী ঘোড়াটা নেই, বোধহয় সেটার পিঠেই এখন ও বসে আছে, অন্যটাকে বিশ্রাম নেয়ার জন্যে ছেড়ে দিয়ে এসেছে কোথাও।

আমাদের ঘোড়াগুলোও দেখলো ওদের। সঙ্গে সঙ্গে পাখা পেলো যেন ওরা। এখন আর আমাদের তাড়ায় নয়, প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে ছুটছে ওরা। বেশ কিছুক্ষণ স্থির রইলো কুকুরের পাল আর আমাদের মাঝের ব্যবধান। আর সামান্য গেলেই নদীর পাড়ে পৌঁছে যাবে। এই সময় আবার কমতে শুরু করলো ব্যবধান। কিছুতেই কি ক্লান্ত হয় না শ্বাপদগুলো?

দূরত্ব কমে দুশো গজেরও নিচে চলে এসেছে। প্রতি মুহূর্তে আরও কমে আসছে। সামনে ছোটখাট একটা বন দেখতে পেয়ে চিৎকার করলাম আমি লিও, সামনে দিয়ে ঘুরে ওই বনের ভেতর ঢুকে পড়ো।

বনটার ভেতর ঢুকে মাত্র ঘোড়া থেকে নেমেছি কি নামিনি, তীব্র চিৎকার করতে করতে আমাদের পঞ্চাশ গজের কম দূর দিয়ে চলে গেল কুকুরের পাল।

গন্ধ শুঁকে শুঁকে এক্ষুণি চলে আসবে ওরা, চেঁচালাম আমি, দৌড়াও, লিও, ঐ পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিতে হবে। বলেই ছুটলাম শখানেক গজ দূরে,প্রকাণ্ড পাথরের চাঙড়টার দিকে।

ঘোড়র পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এখন বনের দিকেই আসছে কুকুরগুলো। ভাগ্য ভালো আমাদের, ওরা এসে পড়ার আগেই পাথরটার আড়ালে চলে যেতে পারলাম। ইতিমধ্যে প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে শুরু করেছে ঘোড়া দুটো। তাদের ধাওয়া করে চলেছে শ্বাপদের পাল। এবারও ভাগ্য সহায়তা করলো আমাদের, আমরা যেখানে আছি তার উল্টোদিকে ছুটছে ঘোড়াগুলো। তার মানে আপাতত কিছুক্ষণের জন্যে আমরা নিরাপদ।

কুকুরগুলো বন পেরিয়ে যেতেই আবার ছুটলাম আমরা, নদীর দিকে। যতখানি সম্ভব এগিয়ে যেতে চাই। দৌড়াতে দৌড়াতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম একবার। চাঁদের আলোয় দূরে দেখতে পেলাম, মাঠের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের ঘোড়াদুটো। পেছন পেছন ছুটছে কুকুরগুলো। এখনও ওদের ভেতর ব্যবধান বেশ, কিন্তু কতক্ষণ থাকবে বুঝতে পারছি না। খানকেও দেখতে পেলাম, ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে ফেরানোর চেষ্টা করছে শাপদগুলোকে। পারছে না। ঘোড়া দুটোর পেছনে ছুটতেই বেশি উৎসাহ বোধ করছে ওরা।

এদিকে সামান্য একটু দৌড়েই হাঁপাতে শুরু করেছি আমি। যৌবন পেরিয়ে এসেছি অনেক আগে, এমনকি প্রৌঢ়ত্বও। একটু শক্ত-পোক্ত, কিন্তু বৃদ্ধ বই তো নই, এ বয়সে কত ধকল সহ্য করতে পারে শরীর? কাল মাঝ রাত থেকে একটু আগ পর্যন্ত বলতে গেলে ঘোড়ার পিঠেই কেটেছে। এর ভেতর খেয়েছি মাত্র একবার, তাও না খাওয়ার মতো।

পেছনে আবার শুনতে পেলাম মরণ-শ্বাপদের চিৎকার। ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, ঘোড়ার পিঠে ঋজু হয়ে বসে আছে খান র‍্যাসেন। ডাকাডাকি করে গোটা তিনেক কুকুরকে ছুটিয়ে আনতে পেরেছে ঘোড়াগুলোর লেজ থেকে। এখন আমাদের ওপর লেলিয়ে দিচ্ছে। প্রভুর মুখের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেণ্ড ঘেউ ঘেউ করলো কুকুরগুলো, তারপর লেজ উঁচিয়ে ছুটে আসতে লাগলো আমাদের দিকে।

কিন্তু আমি আর পারছি না। পাথরের মতো ভারি মনে হচ্ছে পা দুটো। কোমর ধরে গেছে, শিরদাঁড়া টনটন করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি বসে পড়ি। এবার বোধহয় সাঙ্গ হলো সাধের জীবন! দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি।

দৌড়াও, দৌড়াও, লিওর দিকে তাকিয়ে বললাম। আমি এখানে রইলাম, কয়েক মিনিট অন্তত ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবো। এই ফাঁকে তুমি চলে যাও, নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ো।

দাঁড়িয়ে পড়লো লিও। আস্তে কথা বলো, ওরা শুনে ফেলবে, নিচুস্বরে বলতে বলতে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমার হাত ধরে নিয়ে চললো টানতে টানতে।

নদীর মোটামুটি কাছে পৌঁছে গেছি আমরা। চাঁদের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি পানিতে। কুকুরের শব্দও কাছে এসে গেছে। এখন আর শুধু ঘেউ ঘেউ নয়, শুকনো মাটিতে ওদের পা ফেলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, খানের ঘোড়ার খুরের শব্দও

এখন আমরা যে জায়গায় পৌঁছেছি সেখানে ছড়িয়ে আছে ছোট বড় নানা আকারের অসংখ্য পাথরের চাই। পথ বলতে কিছু নেই। নদীর প্রান্ত এখনও কয়েকশো গজ দূরে। এমন জায়গার ওপর দিয়ে দৌড়ে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। হোঁচট খেয়ে পড়ে দাঁত-মুখ ভাঙার সম্ভাবনা ষোলা আনা। আস্তে আস্তে যেতে হবে। আর আস্তে গেলে তীরে পৌঁছানোর আগেই ধরে ফেলবে শ্বাপদগুলো। আমার মতো লিও-ও বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা। লাভ নেই হোরেস, বলে উঠলো ও, পারবো না আমরা। তারচেয়ে দাঁড়াও, দেখি শেষ পর্যন্ত কি ঘটে।

থেমে মুখোমুখি হলাম আমরা র‍্যাসেন আর তার কুকুরদের। বিরাট একটা চাঙড়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালাম। হা এসে গেছে ওঁরা। সোজা আমাদের লক্ষ্য করে ছুটে আসছে তিনটে প্রকাণ্ড লাল কুকুর সত্যিই এত বড় কুকুর আমি জীবনে দেখিনি। কয়েক গজ পেছনেই খান। এখনও সেই ঋজু ভঙ্গিতে বসে আছে ঘোড়ার পিঠে। আশ্চর্য প্রাণশক্তি লোকটার! আমাদের মতোই একটানা ছুটে আসছে কালুন থেকে, কিন্তু ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই অভিব্যক্তিতে।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারতো, বললো লিও। পুরো পালটাই থাকতে পারতো। বলতে বলতে কোমর থেকে বড় হান্টিং নাইফটা খুলে হাতে নিলো ও। অন্য হাতে পিঠ থেকে খুলে নিলো ছোট্ট একটা বল্লম। সিমব্রির ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় দুটো বল্লম নিয়ে এসেছিলাম আমরা। খান জিজ্ঞেস করেছিলো, এগুলো দিয়ে কি করবো। জবাবে বলেছিলাম, অগ্নি-পর্বতের জংলীরা আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে পারবো। এখন জংলী নয় কালুনের খানের আক্রমণ ঠেকানো কাজে লাগছে ওগুলো। আমিও এক হাতে আমার হান্টিং নাইফ আর অন্য হাতে বল্লম নিয়ে তৈরি হয়ে দাঁড়ালাম।

আর মাত্র কয়েক গজ দূরে কুকুরগুলো। তীব্র চিৎকারে কানে তালা ধরে যাওয়ার অবস্থা। একেবারে সামনের কুকুরটা লাফ দিলো আমাকে লক্ষ্য করে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ভয়ানক আতঙ্কে আমার কলজেটা গলার কাছে উঠে আসতে চাইলো—সিংহের মতো আকার একেকটা কুকুরের। তবে হ্যাঁ, আতঙ্কে বোধশক্তি লুপ্ত হলো না। কুকুরটা লাফ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও বল্লমধরা হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। শরীরের পুরো ওজন নিয়ে বল্লমের ফলার ওপর পড়লো ওটা। সামনের দুপায়ের মাঝ বরাবর গেঁথে গেল ফলা। প্রবল ধাক্কায় চিৎ হয়ে পড়ে যাওয়ার অবস্থা হলো আমার। হাত থেকে ছুটে গেল বল্লমের আঁটি। অনেক কষ্টে তাল সামলে যখন সোজা হলাম তখন বুকে বল্লম গাঁথা অবস্থায় মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে কুকুরটা, সেই সঙ্গে রক্ত হিম করা স্বরে মরণ আর্তনাদ।

অন্য দুটো কুকুর এক সঙ্গে আক্রমণ করেছে লিওকে। কিন্তু ওর গায়ে দাঁত বসাতে পারেনি এখনও। পোশাকের বেশ খানিকটা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে একটা। বোকার মতো সেটার দিকে বল্লম চালালো লিও। ফস্কে গেল আক্রমণটা। বল্লমের ফলা গভীরভাবে গেঁথে গেল মাটিতে। সেই মুহূর্তে আর আক্রমণ করলো না কুকুর দুটো। হয়তো এক সঙ্গীর মৃতদেহ দেখে থমকে গেছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দাঁত মুখ খিচিয়ে চিৎকার করতে লাগলো ওরা। দুটো বল্লমই হাত ছাড়া হয়ে গেছে, তাই কিছু করতে পারলাম না আমরা।

ইতিমধ্যে স্থান পৌঁছে গেছে। অদ্ভুত এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠেছে তার মুখে। প্রথমে ভাবলাম হামলা করার সাহস পাবে না। কিন্তু ওর চোখে চোখ পড়তেই বুঝলাম, হামলা করবেই। ঘৃণা, ঈর্ষা, আর শিকারের উত্তেজনায় বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে আধপাগল লোকটা। ওর দৃষ্টিই বলে দিচ্ছে, ও এসেছে হয় মারবে নয় মরবে বলে। ঘোড়া থেকে নেমে তলোয়ার বের করলো সে। শিস বাজিয়ে কুকুর দুটোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তলোয়ার উঁচিয়ে ইশারা করলো আমার দিকে। মুহূর্তে লাফিয়ে উঠলো জন্তুদুটা। লিওর দিকে ছুটে গেল সে নিজে।

আমার হান্টিং নাইফ বাট পর্যন্ত ঢুকে গেল একটা কুকুরের পেটে। শূন্য থেকে মাটির ওপর আছড়ে পড়ে স্থির হয়ে রইলো সেটা। কিন্তু অন্যটা কামড়ে ধরলো আমার হাত, কনুইয়ের খানিকটা নিচে। হাড়ের সাথে কুকুরটার দাঁতের ঘষা খাওয়ার শব্দ হলো। তীব্র যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম আমি। হাত থেকে খসে পড়ে গেল ছোরা।

ভয়ঙ্কর জন্তুটা হাত কামড়ে ধরে আছে আমার। সামনে ঝাকাচ্ছে আর টানছে। সর্বশক্তিতে ওটার পেটে একটা লাথি মারা ছাড়া আর কিছু আমি করতে পারলাম না। বলশালী শ্বাপদের প্রবল ঝাঁকুনির মুখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে হলো। এখনও কুকুরটা ঝাকাছে আমাকে, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলার চেষ্টা করছে। এমন সময় আমার মুক্ত হাতটা একটা পাথরের ওপর পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে আঁকড়ে ধরলাম কমলার চেয়ে সামান্য বড় পাথরটা। তুলে এনে সর্বশক্তিতে ঘা মারলাম জন্তুটার মাথায়। আশ্চর্য! বিন্দুমাত্র শিথিল হলো না কুকুরের কামড়।

ধস্তাধস্তি করছি আমি আর কুকুরটা। একবার এদিকে ঘুরতে হচ্ছে একবার ওদিকে। একবার কুকুরটা টানছে, একবার আমি। আমি চেষ্টা করছি কুকুরটাকে নিচে ফেলে ওপরে উঠে বসার, তাহলে হয়তো একটু সুবিধা করতে পারবো। কিন্তু কিছুতেই বাগে আনতে পারছি না ওটাকে। হাতটা যদি মুক্ত করতে পারতাম কোনো ভাবে!

ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছি আমি। এখনও এক বিন্দু শিথিল হয়নি কুকুরের কামড়। মাথার ভেতর আঁ আঁ করছে। এবার মুখ থুবড়ে পড়বো। হ্যাচকা এক টানে আমাকে এক দিকে ঘুরিয়ে দিলো কুকুরটা। মনে হলো লিও আর খানকে মাটিতে পড়ে ধস্তাধস্তি করতে দেখলাম যেন। একটু পরেই আরেক পাক ঘোরার। সময় দেখলাম, একটা পাথরে হেলান দিয়ে বসে আছে খান, আমার দিকে চোখ। নিজের এই ভয়ানক বিপদের মধ্যেও তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো হৃৎপিণ্ডটা। মেরে ফেলেছে লিওকে! এখন কুকুরটা আমাকে কি করে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো। করে তাই দেখছে তারিয়ে তারিয়ে!

এরপর বেশ কিছুক্ষণ অন্ধকার। কিছু মনে নেই আমার। হঠাৎ হাতের তীব্র যন্ত্রণাকাতর টান শিথিল হয়ে এলো। যেন ঘুমের ঘোরে চমকে চোখ মেললাম। আমি। সেই মুহূর্তে দেখলাম বিশাল শ্বাপদটা আকাশে উঠে যাচ্ছে। তারপর আরও আশ্চর্য, শূন্যে পাক খাচ্ছে ওটা! ভালো হাতটা দিয়ে চোখ ডললাম। হ্যাঁ! শূন্যে পাক খাচ্ছে জানোয়ারটা, লিও তার পেছনের এক পা ধরে মাথার ওপর তুলে ঘোরাচ্ছে আর এগিয়ে যাচ্ছে একটা বড় পাথরের দিকে।

ঠক! পাথরের ওপর আছড়ে দিলো। লিও কুকুরটার মাথা। তারপর ছেড়ে দিলো ওর পা। নিষ্পন্দ পড়ে রইলো সেটা মাটির ওপর।

অচেতন হয়ে পড়তে পড়তেও কি করে যেন সজ্ঞান হলাম আমি। সম্ভবত কুকুরের কামড় থেকে হাত মুক্ত হয়ে যাওয়ায় আচমকা যে ব্যথা ঝাঁপিয়ে পড়লো তা-ই আমাকে সজ্ঞান করে দিয়েছে।

আর চিন্তা নেই, হোরেস, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো লিও। শামানের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে। তবু একবার দেখি চলে, নিশ্চিত হয়ে নেয়া যাক।

লিওর পেছন পেছন এগিয়ে গেলাম আমি। মরণ-শ্বাপদের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে যেমন দেখেছিলাম তেমনি পাথরে হেলান দিয়ে বসে আছে খান। নিঃশেষিত চেহারা। পাগলামির কোন চিহ্ন নেই চোখে। অসুস্থ শিশুর মতো বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

তোমরা খুব সাহসী, দুর্বল গলায় বললো সে। শক্তিশালীও। আমার কুকুরগুলোকে হত্যা করেছে, আমার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। অবশেষে বুড়ো ইঁদুরের ভবিষ্যদ্বাণীই সত্য হলো। আমি ভুল করেছি। তোমাদের নয়, আতেনকেই শিকারের চেষ্টা করা উচিত ছিলো। যাহোক, আতেন রইলো। আমার মৃত্যুর প্রতিশোধ ও নেবে। আমার নয়, ওর নিজের স্বার্থেই নেবে। হলদে-দাড়ি, পারলে ওর হাতে পড়ার আগেই পাহাড়ে চলে যাও। অবশ্য তোমার আগেই আমি সেখানে পৌঁছাবো।

আর কিছু বলতে পারলো না র‍্যাসেন। ওর থুতনিটা ঝুলে পড়লো বুকের ওপর।

.

১২.

খুব একটা ক্ষতি হলো না পৃথিবীর, হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম আমি।

যা-ই হোক, বললো লিও, হতভাগ্য লোকটা মরে গেছে, ওর সম্পর্কে খারাপ কিছু আর না বলাই ভালো। সত্যিই হয়তো বিয়ের আগে ও সুস্থ ছিলো।

কি করে ওর এ দশা করলে?

তলোয়ারের নিচে দিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তারপর তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম ঐ পাথরটার ওপর। ভাগ্য ভালো সময় মতো ওকে কায়দা করতে পেরেছিলাম, নইলে তোমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে যেতো। খুব বেশি ব্যথা পেয়েছে, হোরেস?

আমার একটা হাত চিবিয়ে মণ্ড বানিয়ে দিয়েছে, আর কিছু না! চলো, তাড়াতাড়ি নদীর কাছে চলে, পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে। তাছাড়া অন্য কুকুরগুলোও এসে পড়তে পারে।

আমার মনে হয় না ওরা আসবে। ঘোড়া দুটোকে শেষ করার আগে অন্য কোথাও যাবে না। একটু দাঁড়াও, আমি আসছি।

খানের তলোয়ার আর আমাদের বল্লম ও ছুরি দুটো কুড়িয়ে নিয়ে এলো লিও। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। এরপর কোন ঝামেলা ছাড়াই ধরে ফেললো র‍্যাসেনের ঘোড়াটা। কাছেই ঘাড় নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো বেচারা। ক্লান্ত বিধ্বস্ত।

উঠে পড়া, বুড়ো, বললো লিও। আর হাঁটা ঠিক হবে না তোমার। .

ওর সাহায্য নিয়ে উঠলাম আমি ঘোড়ার পিঠে। লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চললো লিও। তিন চারশো গজের বেশি হবে না নদীর তীর, কিন্তু ব্যথা আর ক্লান্তির কারণে এই পথটুকুই অসম্ভব দীর্ঘ মনে হতে লাগলো আমার।

অবশেষে পৌঁছুলাম নদীতীরে। ব্যথা, ক্লান্তি সব ভুলে ঘোড়া থেকে নেমে ঝাঁপিয়ে পড়লাম পানিতে। আমার পেছন পেছন সিও। চেঁ-চো করে পানি খেলাম, মুখ ধুলাম, তারপর আবার পানি খেলাম। পানির স্বাদ যে এমন অপূর্ব হতে পারে আগে কখনও বুঝিনি। মুখ, মাথা ডুবিয়ে দিলাম পানির ভেতর। একটু পরে প্রাণ ঠাণ্ডা হতে উঠলো লিও। জিজ্ঞেস করলোএবার? বেশ চওড়া নদী, মনে হচ্ছে একশো গজের বেশিই হবে। গভীরতা কেমন কে জানে? এখনই পার হওয়ার চেষ্টা করবো, না সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবো?

জানি না, দুর্বল গলায় জবাব দিলাম আমি। আমি আর এক পা-ও যেতে পারবো না।

তীর থেকে গজ তিরিশেক দূরে ছোট্ট একটা দ্বীপ। ঘাস আর নলখাগড়ার ঝোপে ছাওয়া।

ওখানে বোধহয় পৌঁছুতে পারবো, বললো লিও। তুমি আমার পিঠে ওঠো, দেখি চেষ্টা করে।

বিনাবাক্যব্যয়ে ওর নির্দেশ পালন করলাম। আস্তে আস্তে, পা দিয়ে নদীর তলা অনুভব করে করে চলতে লাগলো লিও। পানি খুব গভীর নয়। হাঁটুর ওপরে একবারও উঠলো না। কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই দ্বীপটার কাছে পৌঁছে গেলাম। আমাকে শুইয়ে দিয়ে লিও আবার চলে গেল তীরে। র‍্যাসেনের ঘোড়া আর অস্ত্রগুলো নিয়ে ফিরে এলো।

এরপর ও বসলো আমার ক্ষত পরিষ্কার করতে। পোশাকের হাতা অনেক পুরু হওয়া সত্ত্বেও মাংস ঘেঁতলে গেছে। একটা হাড় ভেঙে গেছে বলেও মনে হলো। নদী থেকে পানি এনে ক্ষতস্থানটা ধুয়ে দিলো লিও, রুমাল পেঁচিয়ে তার, ওপর দুর্বা ঘাসের প্রলেপ দিয়ে আবার একটা রুমাল পেঁচিয়ে বেঁধে দিলো। ও যখন এসব করছে সে সময় কখন যে আমি ঘুমিয়ে গেছি বা জ্ঞান হারিয়েছি জানি না।

.

হাতের অসহ্য যন্ত্রণা আমার ঘুম ভেঙে দিলো। চোখ মেলে দেখলাম ভোর হচ্ছে। কুয়াশার পাতলা একটা স্তর জমে আছে নদী এবং দ্বীপের ওপর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, আমার পাশেই গভীর ঘুমে নিমগ্ন লিও। একটু দূরে র‍্যাসেনের কালো ঘোড়াটা ঘাস খাচ্ছে। আবার চোখ বুজলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে জলের কুলকুল আওয়াজ ছাপিয়ে একটা শব্দ হলো। মানুষের কণ্ঠস্বর; কিন্তু লিওর নয়! চমকে উঠে বসলাম আমি। নলখাগড়ার ফাঁক ফোকর দিয়ে দেখতে পেলাম পাড়ের ওপর দুটো অশ্বারোহী মূর্তি। একজন নারী, একজন পুরুষ। এমন ভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, বুঝতে অসুবিধে হলো না, আমাদের পায়ের ছাপ পরীক্ষা করছে ওরা।

ওঠো! লিওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, ওঠো, কারা যেন এসেছে।

এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়লো লিও। ছোঁ মেরে একটা বর্শা তুলে নিয়েছে। পাড়ের ওরা দেখতে পেলো ওকে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে মিষ্টি একটা গলা ভেসে এলো—অস্ত্র রেখে দাও, অতিথি, তোমার কোনো ক্ষতি করতে আমরা আসিনি।

খানিয়া আতেনের কণ্ঠস্বর! তার সাথের লোকটা বুড়ো শামান সিমব্রি।

এখন কি করবো আমরা, হোরেস? আর্তনাদের মতো শোনালো লিওর গলা।

আপাতত কিছুই না, বললাম আমি। আমরা কি করবো তা নির্ভর করছে ওরা কি করে তার ওপর।

এখানে এসো, জলের ওপর দিয়ে ভেসে এলো খানিয়ার গলা। আমি শপথ করে বলছি, তোমাদের ক্ষতি করতে আসিনি। দেখছে না আমরা একা?

জানি না, বললো লিও, তোমরা একা না পেছনে আরও লোক আছে? কিন্তু, যেখানে আছি সেখান থেকে নড়ছি না আমরা।

ফিসফিস করে সিমব্রিকে কিছু একটা বললো খানিয়া। মাথা নেড়ে নিষেধ করলো সিমব্রি। তর্ক করার ভঙ্গিতে আবার কিছু বললো আতেন। এই নদী অগ্নি পর্বতের সীমানা। এটা অতিক্রম করা ঠিক হবে কিনা সম্ভবত তা নিয়ে আলাপ করছে ওরা। একটু পরে সিমব্রির ঘন ঘন মাথা নাড়া সত্ত্বেও ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দিলো খানিয়া। পানি ভেঙে এগিয়ে আসছে দ্বীপের দিকে। অগত্যা শামানও আসতে লাগলো পেছন পেছন। সে

দ্বীপে উঠে ঘোড়া থেকে নামলো আতেন। বললো, শেষবার দেখা হওয়ার পর অনেক দূর চলে এসেছো তোমরা। অশুভ এক পথ বেছে নিয়েছে। ওখানে, পাথরের মাঝে একজন মরে ড়ে আছে। গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখলাম না, কি করে মারলে ওকে?

এগুলো দিয়ে, দুহাত সামনে মেলে দিলো লিও।

আমি জানতাম। অবশ্য এজন্যে তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। অমোঘ নিয়তিই নির্ধারণ করে দিয়েছে ওর মৃত্যুর উপায়। তার নড়চড় তো হতে পারে না। তবু এমন লোক আছে যারা এ মৃত্যুর কৈফিয়ত চাইতে পারে। এবং একমাত্র আমিই পারি তাদের হাত থেকে তোমাদের রক্ষা করতে।

নাকি তাদের হাতে তুলে দিতে? খানিয়া, কি চাও তুমি?

সেই প্রশ্নের জবাব। কাল সূর্যাস্তের আগেই যা তোমার দেয়ার কথা ছিলো।

ঐ পাহাড়ে চলো, জবাব পাবে, অগ্নি-পর্বতের দিকে হাত তুলে লিও বললো। ওখানে আমি খুঁজবো আমার…

মৃত্যুকে। মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, কিন্তু বলতে ছাড়লো না আতেন। আগেই তো বলেছি, বিদেশী, ও জায়গা পাহারা দেয় জংলীরা; দয়া, মায়া বলতে তাদের কিছু নেই।

হোক। মৃত্যুই আসুক তাহলে। চলো, হোরেস, দ্রলোকের সাথে মোলাকাত করতে যাই।

আমি শপথ করে বলছি, আবার বললো খানিয়া, তোমার স্বপ্নের নারী ওখানে নেই। আমি সেই নারী, হা, আমিই, যেমন তুমি আমার স্বপ্নের পুরুষ।

বেশ, ঐ পাহাড়েই তাহলে প্রমাণ হবে।

ওখানে কোনো মেয়েমানুষ নেই, ব্যস্তভাবে বললো আতেন। কিছুই নেই। খালি আগুন আর একটা কণ্ঠস্বর।

কার কণ্ঠস্বর?

কারও না। অলৌকিক। আগুন থেকে বেরোয়। সেই স্বরের মালিককে কেউ কখনও দেখেনি, দেখবেও না।

এসো, হোরেস, বলে ঘোড়ার দিকে এগোলো লিও।

থামো! এবার কথা বললো বৃদ্ধ শামান, মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাবেই তোমরা? শোনো তাহলে, আমি গিয়েছি ঐ ভূতুড়ে জায়গায়। নিয়ম অনুযায়ী খানিয়া আতেনের পিতাকে সমাহিত করার জন্ধে যেতে হয়েছিলো। আমার তখনকার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ভুলেও যেও না ওখানে।

আর আপনার ভাইঝি বলছে ওখানে কেউ যেতে পারে না, আমি মন্তব্য করলাম।

বুড়োকে কিছু বলার সুযোগ না দিলে লিও বলে উঠলো, সাবধান করে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। হোরেস, আমি ঘোড়ায় জিন চাপাচ্ছি, তুমি নজর রাখো ওদের দিকে।

অক্ষত হাতে একটা বল্লম তুলে নিয়ে দাঁড়ালাম আমি। কিন্তু ওরা কিছু করলো না। যেমন ছিলো তেমন দাঁড়িয়ে রইলো ঘোড়ার লাগাম ধরে।

কয়েক মিনিটের ভেতর র‍্যাসেনের ঘোড়ায় জিন চাপানো হয়ে গেল। আমাকে উঠতে সাহায্য করলো লিও। তারপর বললো, আমরা চললাম। ভাগ্যে যা নির্ধারিত হয়ে আছে ঘটবে। কিন্তু, খানিয়া, যাওয়ার আগে তোমাকে ধন্যবাদ। জানাতে চাই, যথেষ্ট সদয় ব্যবহার করেছে আমাদের সাথে। আমি চাইনি তবু তোমার স্বামীর রক্তে আমার হাত রঞ্জিত হয়েছে। আমার ধারণা এই একটা, ঘটনাই আমাদেরকে চির বিচ্ছিন্ন রাখার জন্যে যথেষ্ট। তুমি ফিরে যাও। যদি কখনও কষ্ট দিয়ে থাকি, জানবে দিয়েছি অনিচ্ছায়। আমাকে ক্ষমা কোরো। বিদায়।

মাথা নিচু করে শুনলো, আতেন। শেষে বললো, তোমার নম্র কথার জন্যে ধন্যবাদ। কিন্তু, লিও ভিসি, এত সহজে তো আমরা আলাদা হতে পারি না। তুমি আমাকে পাহাড়ে যেতে বলেছো, হ্যাঁ, আমি যাবো ওখানে। তোমার পেছন। পেছন আমিও যাবো এখানে। ঐ পাহাড়ের আত্মার সাথে সাক্ষাৎ করবো। আমার সমস্ত শক্তি এবং যাদুবিদ্যা প্রয়োগ করবো। দেখি কে জয়ী হয়।

আর কিছু না বলে এক লাফে ঘোড়ায় উঠলো আতেন। জল ঝাঁপিয়ে চলে গেল পাড়ের দিকে। অনুসরণ করলো বৃদ্ধ সিমব্রি।

কি বললো ও, বুঝলে কিছু? জিজ্ঞেস করলো লিও।

না, তবে আশা করা যায় শিগগিরই বুঝবো। এখন চলো, আমরা রওনা হই।

নিরাপদে নদীর ওপারে পৌঁছুলাম। নদীর এ অংশেও পানি হাঁটু ছাড়িয়ে উঠলো না। কাল রাতের মতো হেঁটে পার হয়ে গেলাম। পাড় থেকে সামান্য একটু যাওয়ার পরই শুরু হলো জলাভূমি। খুব বেশি গভীর নয়। নদী যেভাবে পেরিয়েছি সেভাবেই পেরোতে লাগলাম এ জায়গা। যথাসম্ভব দ্রুত এগোনোর চেষ্টা করছি আমরা। তাড়াতাড়ি পাহাড়ে পৌঁছানোর ইচ্ছা ছাড়াও এর পেছনে যা কাজ করছে তা হলো, খানিয়ার ভয়। কেন যেন মনে হচ্ছে রক্ষীদের আনতে গেছে আতেন। কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে থাকতে বলে এসেছে, এখন গিয়ে ডেকে আনবে অবাধ্য বিদেশীদের শায়েস্তা করার জন্যে।

জলা পেরিয়ে সামান্য ঢালু একটা সমভূমিতে পৌঁছুলাম। তিন-চার মাইল দূরে পাহাড়ের প্রথম ঢাল পর্যন্ত বিস্তৃত সেটা। ঢিপ ঢিপ করছে বুকের ভেতর। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে এই বুঝি হা-হা করতে করতে হাজির হলো জংলীরা। এতবার এতভাবে ওদের ভীতিজনক আচরণের কথা শুনেছি যে কিছুতেই ভয়টা তাড়াতে পারছি না মন থেকে।

হঠাৎ বেশ দূরে শাদা কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখলাম। কি হতে পারে ভাবছি, কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছি না। একটু পরে আরও অনেকগুলো একই রকম জিনিস পড়ে থাকতে দেখলাম। তারপর আরও অসংখ্য। কৌতূহল বেড়ে উঠলো আমাদের। চলার গতি আপনা থেকেই কখন যে বেড়ে গেছে খেয়াল করিনি।

. অবশেষে পৌঁছুলাম সেখানে। জিনিসগুলো দেখলাম। প্রথমে বিশ্বাস হইতে চাইলো না। ভুল দেখছি না যে? কিন্তু তা কি করে হয়? স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সাদা জিনিসগুলো নরকঙ্কাল। তারমানে এই উপত্যকা বিশাল এক কবরখানা ছাড়া আর কিছু নয়। মনে হয় বুড়সড় এক সেনাবাহিনী এখানে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো।

বিষণ্ণ মনে এগিয়ে চললাম ছড়িয়ে থাকা কঙ্কালের মাঝ দিয়ে। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পথ খুঁজছি, কিন্তু পাচ্ছি না। চারদিকে কেবল হলদেটে সাদা রঙের হাড় আর হাড়, খুলি আর খুলি। দিনে দুপুরেও গা ছমছম করে উঠতে চায়। ঘোড়াটাও কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছে। ঘনঘন সশব্দে নাক টানছে। একটু পরে হাড়ের একটা স্কুপের কাছে পৌঁছুলাম। এই হাড়গুলো এমন টিবি করে রাখলো কে? আশ্চর্য, স্কুপের ওপর ছোট আরেকটা স্থূপ! হাড়েরই মনে হচ্ছে। কেন? পটার এমন চেহারা দিলো কে?

শিগগিরই এখান থেকে বেরোনোর পথ না পেলে পাগল হয়ে যাবো! চারপাশে তাকাতে তাকাতে চিৎকার করলাম আমি।

কথাগুলো আমার মুখ থেকে সম্পূর্ণ বেরোতে পারেনি, চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম, নড়ে উঠেছে স্তূপের উপরের পটা। আতঙ্কে হিম হয়ে আসতে চাইলো আমার শরীর। হ্যাঁ, নড়ে উঠেছে ছোট পটা। ভাঁজ হয়ে থাকা একটা মূর্তি উঠে দাঁড়াচ্ছে। প্রথম দর্শনে মনে হলো নারী মূর্তি—আমি নিশ্চিত নইমাথা থেকে পা পর্যন্ত শাদা কাপড়ে মোড়া যেন কাফন পরা মৃতদেহ। চোখের কাছটায় দুটো গোল গোল গর্ত। হাড়ের স্তূপের ওপর থেকে নেমে এলো ওটা। মমির মতো সাদা হাত উঁচু করলো ইশারার ভঙ্গিতে। ঘোড়াটা আতঙ্কে চি-হি-হি করে খাড়া হয়ে গেল দুপায়ের ওপর।

কে তুমি? চেঁচিয়ে উঠলো লিও। দূরের পাহাড় থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো ওর কণ্ঠস্বর। কিন্তু কোনো জবাব দিলো না মূর্তি। আবার ইশারা করলো।

চোখের ভুল কিনা, নিশ্চিত হওয়ার জন্যে লিও এগিয়ে গেল ওটার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত, প্রায় হাওয়ায় ভেসে হাড়ের স্তূপের পেছনে চলে গেল মূর্তি। দাঁড়িয়ে রইলো প্রেতাত্মার মতো। আবার এগোলো লিও। বোধহয় স্পর্শ করে দেখতে চায় সত্যিই ভূত না অন্য কিছু। কাছাকাছি পৌঁছুতেই আবার হাত উঁচু করলো মূর্তি। আলতো করে চুলো লিওর বুক। তারপর আবার হাত গুটিয়ে নিয়ে ইশারা করলো প্রথমে উপরে চূড়ার দিকে, তারপর আমাদের সামনে কিছুদূরে পাথরের দেয়ালটার দিকে।

ফিরে এলো লিও। কি করবো আমরা?

ওর পেছন পেছন যাবো, বললাম আমি। ওপর থেকে বোধহয় পাঠানো হয়েছে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।

নাকি নিচে থেকে? বিড় বিড় করলো ও। একদম ভালো লাগছে না ওর ভাবভঙ্গি, চেহারা।

তবু ওকে ইশারায় এগোতে বললো লিও। দ্রুত অথচ একেবারে নিঃশব্দে পাথর আর কঙ্কালের মাঝ দিয়ে এগিয়ে চললো মূর্তি। আমরা অনুসরণ করছি। কয়েকশো গজ যাওয়ার পর নিচু একটা ঢালের মাথায় পৌঁছুলো ওটা। পর মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।

 নিশ্চয় ওটা ছায়া! সন্দেহ লিওর কঠে।

গাধা, আমি বললাম, ছায়া মানুষকে স্পর্শ করতে পারে? এগোও।

ঘোড়ার লাগাম ধরে চুড়ার কাছে পৌঁছুলো লিও। ওখানে তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিয়েছে ঢাল। মোড় ঘুরতেই দেখতে পেলাম মূর্তিটাকে। আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। আবার এগিয়ে চললো এটা। পেছন পেছন আমরা। কিছুদূর যাওয়ার পর ছোট একটা সুড়ঙ্গের কাছে পৌঁছুলাম। দেখে মনে হলো, সুড়ঙ্গটা মানুষের হাতে তৈরি।

মূর্তির পেছন পেছন ঢুকে পড়লাম প্রায়ান্ধকার সুড়ঙ্গে। লাগাম ধরে হেঁটে চলেছে লিও। ঘোড়ার পিঠে আমি। সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে জমাট বাঁধা লাভার একটা ঢাল বেয়ে উঠে যেতে লাগলাম আমরা। অসংখ্য ছোট বড় লাভার চাঙড় ছড়িয়ে আছে চারপাশে। একটু দূরে কুল কুল করে বয়ে যাচ্ছে একটা পাহাড়ী ঝরনা।

মাইল খানেক যাওয়ার পর আচমকা তীক্ষ্ণ একটা শিসের আওয়াজ শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গে চাঙড়গুলোর আড়াল থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো একদল লোক। জনাপঞ্চাশেক তো হবেই, বেশিও হতে পারে। প্রত্যেকের চেহারায় অসভ্য এক অভিব্যক্তি। লালচে চুল-দাড়ি তাদের। গায়ের রঙ কালোর ধার ঘেঁষে। পরনে সাদা ছাগলের চামড়া। প্রত্যেকেরই হাতে রয়েছে বর্শা আর ঢাল। আবার শিস বাজাল ওদের কেউ একজন। তীক উল্লসিত চিৎকার করে উঠলো পুরো দলটা। তারপর ঘিরে ফেললো আমাদের।

বিদায়, হোরেস, কোনোমতে বলেই খানের তলোয়ারটা বের করলো লিও।

খানিয়া আর বুড়ো শামার কথাই তাহলে ঠিক হলো! পাহাড়ের-প্রথম ঢাল অতিক্রম করার আগেই মরতে চলেছি আমরা! দুর্বল গলায় বললাম, বিদায়, লিও।

বল্লম উঁচিয়ে এগিয়ে আসছে বর্বররা। ইতিমধ্যে আমাদের পথপ্রদর্শক অদৃশ্য হয়েছে কোনো একটা চাঙড়ের আড়ালে, আমরা খেয়াল করিনি। অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলো মন। আমিই লিওকে পরামর্শ দিয়েছিলাম মূর্তিটার পেছন পেছন আসার। কিন্তু না, অসভ্যরা যখন মাত্র কয়েক গজ দূরে তখন উঁচু একটা চাঙড়ের ওপরে দেখা গেল তাকে। কোনো কথা উচ্চারণ করলো না। হাত দুটো ছড়িয়ে দিলো শুধু।

সঙ্গে সঙ্গে আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটলো। মুখ মাটিতে দিয়ে শুয়ে পড়লো বুনন লোকগুলো। প্রত্যেকে। বজ্রপাত হয়েছে যেন ওদের মাথায়। ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে আনলো মূর্তিটা। তারপর কাছে ডাকার ভঙ্গিতে ইশারা করলো। বিশালদেহী এক লোক, সম্ভবত দলনেতা, উঠে এগিয়ে গেল। হাঁটার ভঙ্গিটা অত্যন্ত বিনীত, মার খাওয়া কুকুরের মতো। মূর্তির ইশারা ও দেখলো কি করে বুঝলাম না, নিশ্চয়ই মুখ নিচের দিকে থাকলেও চোখ টেরিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো। হাত দুটো আড়াআড়িভাবে একটার ওপর অন্যটা একবার রেখে আবার সরিয়ে এনে আরেকটা ইশারা করলো মূর্তি। এবারও কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে শুনলাম না। দলনেতা বুঝতে পারলো ইশারার মর্ম। দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু একটা বললো সে। তারপর আবার সেই তীক্ষ্ণ শিস। মুহূর্তে উঠে দাঁড়ালো বর্বরের দল। পড়িমরি করে ছুটে পালালো যে যেদিকে পারলো সেদিকে।

এবার আবার আমাদের দিকে ফিরলো পথ প্রদর্শক। ইঙ্গিতে নির্দেশ দিলো এগোনোর।

দুঘণ্টা একটানা চললাম আমরা। লাভার ঢাল শেষ। ঘাসে ছাওয়া একটা সমান জায়গায় পৌঁছে ঝরনাটার উৎসমুখ দেখতে পেলাম কিছু দূরে। তারপর আশ্চর্য হয়ে দেখলাম আগুন জ্বলছে এক পাশে। তার ওপর ঝুলছে একটা মাটির পাত্র। কিছু একটা সেদ্ধ হচ্ছে তাতে। কোনো মানুষ দেখলাম না আশেপাশে।

আমাকে ঘোড়া থেকে নামার নির্দেশ দিলো মৃর্তি—অবশ্যই ইশারায়। তারপর ইঙ্গিতে পারে পদার্থটুকু খেয়ে নিতে বললো আমাদের। খুব খুশি মনেই আমি খেতে লেগে গেলাম। প্রচণ্ড খিদেয় রীতিমতে অস্থির লাগছিলো এতক্ষণ। শুধু আমাদের নয়, ঘোড়াটার জন্যেও খাবারের বন্দোবস্ত রয়েছে দেখলাম।

গরম গরম খেয়ে নিয়ে (জিনিসটা কি জানি না, তবে স্বাদ মন্দ নয়) ঝরনার উৎসমুখের কাছে গিয়ে পানি খেয়ে এলাম। ঘোড়াটাকেও খাইয়ে নিলাম। কিন্তু মূর্তি কিছু খেলো না। পানি পর্যন্ত না। ভদ্রতা করে আমরা একবার সাধলাম ইশারায়। নিরাসক্ত ভঙ্গিতে প্রত্যাখ্যান করলো সে।

খাওয়ার পর আমার হাতের ক্ষত পরিষ্কার করে আবার বেঁধে দিলো লিও। এদিকে ভরপেট খাওয়ার সাথে সাথে ঝিমুনি এসে গেছে আমার। কিন্তু ঘুমানোর সুযোগ দিলো না পথপ্রদর্শক। হাত তুলে ইশারা করলো প্রথমে সূর্যের দিকে তারপর ঘোড়াটার দিকে। যেন বোঝাতে চাইলো এখনও অনেক দূর যেতে হবে আমাদের। সুতরাং আবার রওনা হলাম।

দিন শেষে ঘাসে ছাওয়া এলাকা পেরিয়ে গেলাম। তারপর আবার শুরু হলো পাথুরে ঢাল। মাঝে মাঝে মাথা তুলেছে দু’একটা খর্বাকৃতির ফার গাছ।

সূর্য ডুবে গেল। গোধূলির আলোয় এগিয়ে চললাম সেই অদ্ভুত মূর্তির পেছন পেছন। চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো। তবু চলছি আমরা। পাহাড় চূড়ার লাল আভা আবছাভাবে এসে পড়েছে। সেই সামান্য আলোয় পথ দেখে এগোচ্ছি। কয়েক পা সামনে মূর্তিটাকে সত্যিই ভূতের মতো লাগছে এখন। একবারও পেছনে না তাকিয়ে, একটাও কথা না বলে এগিয়ে চলেছে সে। একটু পরপরই বাঁক নিচ্ছে, একবার এদিকে একবার ওদিকে। কিছুক্ষণের ভেতর পথের দিশা  হারিয়ে ফেললাম। এখন যদি একা ফিরে যেতে বলা হয়, কিছুতেই পারবো না।

চাঁদ উঠলো। সরু একটা গিরিখাতের ভেতর পৌঁছুলাম। এঁকে বেঁকে এগিয়ে চললাম তার ভেতর দিয়ে। একটু পরে এমন এক জায়গায় পৌঁছুলাম, যার সঙ্গে কেবল গ্রীক অ্যামফিথিয়েটারেরই তুলনা চলে। পার্থক্য একটাই, এটা মানুষের তৈরি নয়, প্রাকৃতিক। অত্যন্ত সংকীর্ণ তার প্রবেশ পথ। একজন মানুষ কোনোরকমে ঢুকতে বা বেরোতে পারে। তার ওপাশে একটা ফাঁকা জায়গায় পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো ছোট ছোট পাথরের ঘর। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ঘরগুলোর সামনে বড় একটা চত্বর। সেখানে জড় হয়েছে কয়েকশো নারী পুরুষ। অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ধর্মীয় আচার পালন করছে।

তাদের সামনে, অর্ধবৃত্তের ঠিক কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে এক লোক। বিশালদেহী, লাল দাড়িওয়ালা। কোমরে এক টুকরো চামড়া জড়ানো, বাকি শরীর উলঙ্গ। সামনে পেছনে দুলছে সে; হাত দুটো নিতম্বের ওপর স্থির। দুলুনির তালে তালে চিৎকার করে বলছে হো-হাহা-হো! সে যখন দর্শকদের দিকে ঝুঁকছে অমনি দর্শকরাও একসাথে ঝুঁকে আসছে তার দিকে। সোজা হওয়ার সময় সবাই তার শেষের আওয়াজটার ধুয়া ধরে চেঁচিয়ে উঠছে হো! চারপাশের পাহাড়ী দেয়াল থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে শব্দটা। লোকটার দীর্ঘ চুলওয়ালা মাথার ওপরে বসে আছে বড় একটা সাদা বিড়াল। দুলুনির তালে তালে মৃদু মৃদু লেজ নাড়ছে সেটা।

চাঁদনী রাত, চারপাশে পাহজ, তার মাঝে এমন একটা দৃশ্য আর আওয়াজ! অদ্ভুত এক স্বপ্নের মতো মনে হলো আমার কাছে।

যে চত্বরে জংলীগুলো এই অদ্ভুত আচরণ বা উপাসনার কাজ করছে তার চারপাশে প্রায় ছফুট উঁচু একটা দেয়াল। দেয়ালের এক জায়গায় একটা দরজা। সেটার দিকে এগিয়ে চললাম আমরা সবার অলক্ষ্যে। দরজার কয়েক গজ দূরে পৌঁছে আমাদের থামতে ইশারা করলো মূর্তি। সে এগিয়ে গেল দেয়ালের নিচু একটা অংশের দিকে। অনাকাক্ষিত কিছু একটা দেখছে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর ফিরলো আমাদের দিকে। যেখানে আছি সেখানেই থাকার ইশারা করে মুখ ঢাকলো হাত দিয়ে। পরমুহূর্তে চলে গেল সে। কোথায়, কিভাবে, বলতে পারবো না। শুধু দেখলাম, যেখানে ছিলো সেখানে সে নেই।

এখন কি করবো আমরা? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো লিও।

কি আর? যতক্ষণ না ও ফিরে আসে বা কিছু ঘটে ততক্ষণ অপেক্ষা করাই উচিত আমার মনে হয়।

অপেক্ষা করছি আর দেখছি জংলীদের কাণ্ড-কারখানা। একটাই দুশ্চিন্তা, ঘোড়াটা না ডাক ছেড়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে ধরা পড়ে যাব অসভ্যদের কাছে। তারপর কি ঘটবে জানি না।

দেখছি জংলীদের অদ্ভুত আচরণ। এখন আর উপাসনা মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে বিচার সভা। হ্যাঁ, একটু পরে হঠাৎ মন্ত্রোচ্চারণ থেমে গেল। বিড়াল মাথায় লোকটার সামনের মানুষগুলো দুভাগ হয়ে সরে গেল দুপাশে। একই সঙ্গে তার পেছন থেকে ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী উঠলো, যেন সাজিয়ে রাখা চিতায় আগুন দেয়া। হয়েছে। সামনের মানুষগুলো আরেকটু সরে দাঁড়ালো। পেছনের ঘরগুলোর একটা থেকে পিছমোড়া করে বাঁধা সাতজন লোককে নিয়ে আসা হলো। নিম্নাঙ্গে এক টুকরো চামড়া জড়ানো, উর্ধাঙ্গ অনাবৃত সব কজনের। নারী-পুরুষ দুরকম মানুষই আছে তাদের ভেতর। দীর্ঘাঙ্গী, চমৎকার দেহসৌষ্ঠবের অধিকারিনী একটা মেয়েকে দেখলাম। মনে হয় সবে কৈশোর পেরিয়েছে। একজন বৃদ্ধকেও দেখলাম। এক সারিতে দাঁড় করানো হলো সাতজনকে! ভয়ে কাঁপছে সবাই। বৃদ্ধ তো বসেই পড়লো কাঁপতে কাঁপতে। মহিলারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কিছুক্ষণ অমনি রইলো ওরা। ইতিমধ্যে কয়েকজনে ভালো করে জ্বালিয়ে ফেলেছে অগ্নিকুণ্ডটা। কমলা রঙের লকলকে শিখা উঠেছে মানুষগুলোর মাথা ছাড়িয়ে।

সবকিছু তৈরি। একজন একটা কাঠের বারকোশ এনে দিলো লাল দাড়িওয়ালা পুরোহিতের হাতে। একটু আগে বিড়ালটাকে কোলে করে একটা টুলের ওপর বসেছে সে। বারকোশটার হাতল ধরে বিড়ালের দিকে তাকিয়ে কিছু বললো। সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে গিয়ে বারকোশের মাঝখানে বসে পড়লো বিড়ালটা।

গভীর নিস্তব্ধতার ভেতর উঠে দাঁড়ালো পুরোহিত। বিড়বিড় করে কিছু মন্ত্র পড়লো। মনে হলো বিড়ালটার উদ্দেশ্যেই-ওটা এখন তার মুখোমুখি বসে। এরপর বারকোশটা ঘুরিয়ে ধরলো সে। বিড়ালের পেছনটা চলে এলো তার সামনে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল লোকটা বন্দীদের দিকে।

একেবারে বাঁয়ের বন্দীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো পুরোহিত। বারকোশ উঁচু করে ধরলো। বিড়ালটা এবার উঠে দাঁড়ালো। ধনুকের মতো পিঠ বাঁকিয়ে থাবা নাড়তে লাগলো উপরে নিচে। পরের বন্দীর সামনে চলে এলো পুরোহিত। একই ভঙ্গিতে বারকোশ উঁচু করে ধরলো। একই ভঙ্গিতে এবারও বিড়ালটা থাবা নাড়লো। তৃতীয়, চতুর্থ, অবশেষে পঞ্চম জনের সামনে এলে পুরোহিত। এ হচ্ছে সেই দীর্ঘাঙ্গীনী মেয়েটা। বারকোশ উঁচু করে ধরতেই খ্যাক-ম্যাক করে চেঁচাতে, গর্জাতে শুরু করলো বিড়ালটা। তারপর হঠাৎ থাবা তুলে আঁচড়ে দিলো মেয়েটার মুখ। রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে তীব্র, জী আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা। দর্শকরাও সবাই হৈ-চৈ করে উঠলো। একটামাত্র শব্দ বারবার আওড়াচ্ছে তারা। কালুনের লোকদের মুখে বহুবার শুনেছি শব্দটা—ডাইনী! ডাইনী! ডাইনী!

জল্লাদরা অপেক্ষা করছিলো। এবার তৎপর হয়ে উঠলো তারা। মেয়েটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চললো আগুনের দিকে। সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলো মেয়েটা নিজেকে মুক্ত করার। হাত পা ছুঁড়ে, শরীর মুচড়ে, আঁচড়ে, কামড়ে, চিৎকার করে সে ছুটে যেতে চাইলো জল্লাদদের হাত থেকে। পারলো না। দুদিক থেকে দুজন দুই বাহু ধরে শূন্যে তুলে ফেললো তাকে। দর্শকরা মহা উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো আবার।

এ-তো খুন! সন্ত্রস্ত গলায় বললো লিও। ঠাণ্ডা মাথায় খুন! আমি এ হতে দিতে পারি না, বলতে বলতে তলোয়ার বের করলো ও।

আমি কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতে গেলাম। কিন্তু তার আগেই খোলা তলোয়ার হাতে প্রাচীর দরজার দিকে ছুটেছে লিও, সেই সাথে চিৎকার। অগত্যা আমি ঘোড়া ছোটালাম ওর পেছন পেছন। দশ সেকেণ্ডের মাথায় অসভ্যদের মাঝখানে পৌঁছে গেলাম আমরা।

অবাক বিস্ময়ে তাকালো ওরা আমাদের দিকে। প্রথম দর্শনে অপদেবতা বা ভূত জাতীয় কিছু মনে করলো বোধহয়। সেই সুযোগে জল্লাদদের একেবারে কাছে। চলে গেলাম আমরা।

ওকে ছেড়ে দাও, বদমাশের দল! ভয়ঙ্কর গলায় চিৎকার করে উঠে এক জল্লাদের হাতে কোপ বসিয়ে দিলো লিও।

মেয়েটার হাত ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল লোকটা। জনতার দিকে তাকিয়ে অক্ষত হাতটা নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে বলে চললো কিছু একটা। এই ফাঁকে হতভম্ব অন্য জল্লাদদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে অন্ধকারের দিকে ছুটলো দীর্ঘাঙ্গিনী মেয়েটা। এদিকে পুরোহিতও এক লাফে উঠে দাঁড়িয়েছে। বারকোশটা এখনও তার হাতে, বিল্লিটাও বসে আছে বারকোশে। লিওর দিকে তাকিয়ে হিংস্র কণ্ঠে দাত মুখ খিচিয়ে চিৎকার করতে লাগলো সে। লিও-ও সমানে চেচিয়ে চলেছে ইংরেজি এবং আরও অনেকগুলো ভাষায়। তার বেশির ভাগই অকথ্য গালাগাল।

হঠাৎ বিড়ালটা, সম্ভবত চিৎকার চেঁচামেচিতে ভয় পেয়ে, লাফ দিলো বারকোশ থেকে, সোজা লিওর মুখ লক্ষ্য করে। মুখে থাবা পড়ার আগেই বাঁ হাতে শূন্যেই ওটাকে ধরে ফেলে লিও সর্বশক্তিতে আছাড় মারলো মাটিতে পড়ে আর নড়তে পারলো না বিড়ালটা। দলামোচা পাকিয়ে মিউ মিউ করতে লাগলো। তারপর, হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে আবার ওটাকে তুলে নিলো লিও। এবং ছুঁড়ে দিলো আগুনের ভেতর।

এই জংলীগুলোর উপাস্য দেবতা ঐ বিড়াল। ওটার এহেন দশা দেখে খেপে উঠলো ওরা। সমস্বরে ভয়ানক চিৎকার করতে করতে সাগরের ঢেউয়ের মতো ধেয়ে এলো আমাদের দিকে। একটা লোকের ধড় থেকে মাথা নামিয়ে দিলো লিও। পর মুহূর্তে দেখলাম, আমি আর ঘোড়ার পিঠে নেই। বুনো উল্লাসে একদল অসভ্য টানতে টানতে আমাকে নিয়ে চলেছে আগুনের দিকে। পাথর খুঁড়ে গভীর একটা গর্ত করা হয়েছে, তার ভেতর জ্বলছে আগুন। টেনে হিচড়ে আমাকে গর্তের কিনারে নিয়ে ফেললো ওরা। ঘাড় ফিরিয়ে চকিতের জন্যে দেখলাম সাত-আট জন জংলীর সাথে একা লড়ছে লিও। কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছে না। তার মানে আর আশা নেই আমার।

টানা হ্যাচড়ায় কুকুরে কামড়ানো হাতটার যন্ত্রণা দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে। তবু গর্তটার ভেতর চোখ পড়তেই ভুলে গেলাম সে যন্ত্রণার কথা। আগুনের শিখা আমার মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে। ভেতরটা লাল, গন গন করছে। তীব্র আঁচ গায়ে এসে লাগছে। আমাকে ঠেলে ফেলে দেয়ার জন্যে তৈরি হলো ওরা। চোখ বুজলাম আমি। জীবনের সমস্ত মধুর স্মৃতি মুহূর্তে ভেসে গেল চোখের সামনে দিয়ে। তারপর হঠাৎ, শক্ত হয়ে চেপে বসা জান্তব হাতগুলো ঢিলে হয়ে গেল। না, আগুনে নয়, মাটির ওপর চিৎ হয়ে পড়ে গেছি আমি। তাকিয়ে আছি উপর দিকে।

যা দেখলাম, কল্পনাতীত! আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সেই প্রেত-দর্শন পথপ্রদর্শক। তীব্র ক্রোধে কাঁপছে সে। এক হাত উঁচু করা বিশালদেহী পুরোহিতের দিকে। এখন আর একা নয়, সাদা আলখাল্লা পরা জনা বিশেক তলোয়ারধারী রয়েছে তার সঙ্গে। কালো চোখ সব কজনের, এশীয় চেহারা; গাল, মাথা পরিষ্কার করে কামানো।

একটু আগেই খ্যাপা ষাঁড়ের মতো গর্জাচ্ছিলো জংলীগুলো, এখন ছুটে পালাচ্ছে যে যেদিকে পারছে সেদিকে, যেন ভেড়ার পালে নেকড়ে পড়েছে। সাদা আলখাল্লাধারী পুরোহিতদের একজন, সম্ভবত দলনেতা, সামনে এগিয়ে এলো। জংলী পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে ধমকাতে লাগলো সে। ভাষাটা কিছু কিছু বুঝতে পারলাম আমি।

কুকুর, শান্ত মাপা মাপা স্বরে সে বললো। অভিশপ্ত কুকুর, জানোয়ারের উপাসক, পাহাড়ের সর্বশক্তিময়ী মায়ের অতিথিদের কি করতে যাচ্ছিলি? এজন্যেই কি তোদের এতদিন বাচিয়ে রাখা হয়েছে? জবাব দে, কিছু বলার আছে তোর? তাড়াতাড়ি বল! তোর সময় ঘনিয়ে এসেছে!

ভীত একটা আর্তনাদ বেরোলো লাল, দাড়িওয়ালা বিশালদেহীর গলা চিরে। ছুটে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো-প্রধান পূজারীর সামনে নয়, আমাদের পথ-প্রদর্শক প্রেত-দর্শন মূর্তির সামনে। হাউমাউ করে আউড়ে চললো সে ক্ষমা ভিক্ষার আবেদন।

থাম! বলে উঠলো প্রধান পুরোহিত। উনি মায়ের প্রতিনিধি, বিচারের মালিক। আমি কান এবং কণ্ঠস্বর, যা বলার আমাকে বল! যাদেরকে দ্রভাবে সহৃদয়তার সাথে স্বাগত জানাতে বলা হয়েছিলো তাদের হত্যা করতে গিয়েছিলি কি না? উহুঁ, মিথ্যে বলে লাভ হবে না, আমি সব দেখেছি। তোকে ফাঁসানোর জন্যেই ফাঁদ পেতেছিলাম আমরা। অনেক দিন বলেছি, ওসব বর্বর রীতি ছাড়, শুনিসনি। এবার তার মূল্য দে।

তবু বেচারা ক্ষমা ভিক্ষা করে চললো।

দূত, প্রধান পুরোহিত বললো, আপনার মাধ্যমেই শক্তির প্রকাশ ঘটে। রায় দিন।

ধীরে ধীরে হাত তুললো আমাদের পথপ্রদর্শক। আগুনের দিকে ইশারা, করলো। মুহূর্তে ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গের লোকটার মুখ। আর্তনাদ করে পিছিয়ে গেল।

জংলীদের সবাই পালিয়ে যায়নি। দু-একজন রয়ে গিয়েছিলো। তাদের দিকে তাকিয়ে কাছে আসার ইঙ্গিত করলো পূজারী। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এক পা দুপা করে এগিয়ে এল তারা।

দেখ, বললো সে, মা হেস-এর বিচার দেখ। মা-র অবাধ্য হলে, তোদর বেলায়ও এমন হবে। এখন তুলে আন তোদের সর্দারকে।

কয়েকজন এগিয়ে এসে নির্দেশ পালন করলো।

ফেলে দে ঐ গর্তে। অপরকে পোড়ানোর জন্যে যে আগুন জ্বেলেছিস তাতে নিজেই পুড়ে মর।

এবারও নিঃশব্দে নির্দেশ পালন করলো ওরা। মাংস, চামড়া পোড়ার উৎকট গন্ধ ছুটলো কয়েক সেকেণ্ড তারপর সব আবার আগের মতো।

শোন তোরা, পুরোহিত বললো, ওর পাওনা শাস্তি ও পেয়েছে। এই বিদেশীরা যে মেয়েটাকে বাঁচিয়েছে তাকে কেন ও খুন করতে চেয়েছিলো জানিস? তোরা ভাবছিস ডাইনী বলে। শুনে রাখ, তা নয়। মেয়েটিকে ও স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিলো। পারেনি, তাই প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে এ কাজ করতে যাচ্ছিলো। কিন্তু চোখ দেখেছে, কান শুনেছে, কণ্ঠস্বর কথা বলেছে, এবং দূত বিচার করেছেন।

পর্বত গর্ভের অগ্নিসিংহাসনে বসে এমনি চুলচেরা বিচার করেন হেসা।

.

১৩.

একে একে প্রায় পা টিপে টিপে চলে গেল আতঙ্কিত জংলীরা।

প্রভু, কালুন রাজসভার পারিষদরা যেমন বলে তেমন বিকৃত গ্রীকে বললো প্রধান পুরোহিত, আপনি আঘাত পেয়েছেন কিনা জিজ্ঞেস করবো না। কারণ, জানি পবিত্র নদীতে পা রাখার মুহূর্ত থেকে অদৃশ্য এক শক্তি রক্ষা করছে আপনাদের। তবু অপবিত্র হাত আপনাদের ওপর পড়েছে, মায়ের নির্দেশ, আপনারা চাইলে ওদের  প্রত্যেককে আপনাদের সামনে হত্যা করা হবে। বলুন, তা-ই চান?

না, জবাব দিলো লিও। ওর বর্বর, অন্ধ। আমরা চাই না আমাদের জন্যে আরও রক্ত ঝরুক। আমরা চাই, বন্ধু-কি বলে ডাকবো আপনাকে?

অরোস।

বন্ধু অরোস, আপাতত আমরা চাই খাবার আর আশ্রয়। তারপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছুতে চাই আপনি যাকে যা বলছেন, যার খোঁজে আমরা এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি তার কাছে।

মাথা নুইয়ে অবোস জবাব দিলো, খাবার এবং আশ্রয় তৈরি। বিশ্রাম নিন। কাল সকালে যেখানে চাইবেন সেখানে নিয়ে যাবো। সেরকমই নির্দেশ দেয়া হয়েছে আমাকে।

গজ পঞ্চাশেক দূরে পাহাড়ের গায়ে একটা দালানের কাছে আমাদের নিয়ে গেল অরোস। ভেতরে ঢুকে মনে হলো অতিথিশালা, অন্তত এ মুহূর্তে ঘরটাকে সেভাবেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। প্রদীপ জ্বলছে। ঘর গরম রাখার জন্যে আগুন জ্বালানো হয়েছে। দুটো কামরা বাড়িটায়। প্রথমটার ভেতর দিয়ে দ্বিতীয়টায় যেতে হয়। এই দ্বিতীয় ঘরটাতেই আমাদের শোয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

ভেতরে যান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নিন, বললো আরোস। আমার দিকে ফিরে যোগ করলো, তারপর আপনার কুকুরে কামড়ানো হাতের চিকিৎসা হবে।

আমার হাত কুকুরে কামড়েছে আপনি জানলেন কি করে!? আমার কণ্ঠে বিস্ময়।

জবাবটা এড়িয়ে গেল অরোস। শুধু বললো, জেনেছি, এবং সেমতো ব্যবস্থাও করা হয়েছে। চলুন দয়া করে।

ঘরের ভেতর লোহার পাত্রে কুসুম গরম পানি রাখা ছিলো। হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। ধবধবে সাদা চাদর পাতা বিছানার ওপর পরিষ্কার কাপড়, আগে থাকতেই রেখে দেয়া হয়েছে আমাদের জন্যে। পরে নিলাম। তারপর আমার হাতের চিকিৎসা করলো অরোস। লিওর বেঁধে দেয়া পট্টি খুলে ফেলে মলম লাগিয়ে নতুন পট্টি বেঁধে দিলো। বাইরের ঘরে এসে দেখি খাবার সাজানো। খেয়ে নিয়ে আবার ঢুকলাম শোবার ঘরে। বিছানায় শুতে না শুতেই ঘুম।

গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল আমার। কোনো শব্দ পাইনি, তবু কেন যেন মনে হচ্ছে কেউ এসেছে ঘরে। চোখ মেললাম। হ্যাঁ, যা ভেবেছি তাই। ছোট্ট একটা প্রদীপ মিটমিট করে জ্বলছে। তাতে অন্ধকার দূর হওয়ার চেয়ে আরও গাঢ় হয়েছে যেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে অস্পষ্ট প্রেতের মতো একটা মূর্তি। প্রথমে ভাবলাম সত্যিই বুঝি ভূত। তারপর মনে পড়লো আমাদের কাফন মোড়া লাশের মতো পথপ্রদর্শকের কথা। হ্যাঁ সে-ই। লিওর বিছানার দিকে তাকিয়ে আছে।

কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো সে। তারপর হঠাৎ আকুল কণ্ঠে বিলাপ করে উঠলো।

তাহলে যা ভেবেছিলাম তা-ই! কাফনের মতো পোশাকের আড়ালে ওটা নারী! আর ও বোবাও নয়, দিব্যি কথা বলতে পারে! আরে, পুরু কাপড়ে ঢাকা হাত দুটো মোচড়াচ্ছে! যেন অকথ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাইছে। একটু পরে দেখলাম ঘুমন্ত লিও–ও যেন ওর উপস্থিতির প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছে। ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে উঠে স্পষ্ট গলায় আরবীতে ডাকলো সে–আয়শা! আয়শা!

অত্যন্ত লঘু পায়ে, প্রায় হাওয়ায় ভর করে এগিয়ে এলো মূর্তি। উঠে বসলো লিও। চোখ বোজা, অর্থাৎ এখনও ঘুমে অচেতন। আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে আবার বললো-আয়শা! আমার আয়শা! জীবন মৃত্যুর ভেতর দিয়ে কতদিন ধরে খুঁজছি তোমাকে। এসো, দেবী, আমার আকাক্ষিতা, আমার কাছে এসো।

আরেকটু কাছে এগুলো মূর্তি। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সে কাঁপছে। এবার তার হাত দুটো প্রসারিত হলো।

লিওর বিছানার পাশে গিয়ে থামলো সে। যেমন উঠেছিলো তেমনি ঘুমের ঘোরে শুয়ে পড়লো লিও। ওর গায়ের কম্বলটা পড়ে গেছে। উক্ত বুকের ওপর পড়ে আছে চামড়ার থলেটা। আয়শার চুল রয়েছে তার ভেতর। স্থির চোখে তাকিয়ে রইল মূর্তি থলেটার দিকে। তারপর একটু একটু করে এগিয়ে গেল তার হাত। থলের মুখ খুললো। কোমল হাতে বের করে আনলো চকচকে চুলের গোছাটা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো সেটার দিকে। তারপর আবার চুলগুলো রেখে থলের মুখ বন্ধ করে দিলো সে। ফুঁপিয়ে উঠে কাঁদলো একটু। এই সময় আবার হাত বাড়িয়ে দিলো লিও। গভীর আবেগে বলে উঠলো—

এসো, কাছে এসো, প্রিয়তমা, আমার বুকে এসো।

অনুচ্চ ভীত স্বরে একবার চিৎকার করে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মূর্তি। যখন নিশ্চিত হলাম, সত্যিই ও চলে গেছে তখন সশব্দে শ্বাস টানলাম আমি। একটা চিন্তাই তখন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে: কে এই নারীমূর্তি? আয়শা? পুরোহিত অবোস বলছিলো আমাদের পথপ্রদর্শক নাকি প্রতিনিধি এবং তরবারি; অর্থাৎ রায় কার্যকর করে। কিন্তু কার রায়? ওর নিজের? ওকি মানুষ, না অশরীরী? ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি নিজেও জানি না।

.

পরদিন যখন ঘুম ভাঙলো তখন প্রায় দুপুর। পুরোহিত অরোস দাঁড়িয়ে আছে আমার বিছানার পাশে। লিও এখনও ওঠেনি। পুরোহিত ফিসফিস করে জানালো, আমার হাতে নতুন করে ওষুধ লাগিয়ে দেয়ার জন্যে সে এসেছে। তারপর ঘুমন্ত লিওর দিকে তাকিয়ে যোগ করলো–

ওঁকে জাগানোর দরকার নেই। এতদিন অনেকৃষ্ট করেছেন, সামনে আবার কি আছে কে জানে? তারচেয়ে ভালো করে ঘুমিয়ে নিতে দিন। ঘণ্টাখানেকের ভেতর আপনাদের রওনা হতে হবে।

এর অর্থ কি, বন্ধু অরোস? তীক্ষ্ণকণ্ঠে প্রশ্ন করলাম আমি। কালই না আপনি বললেন এখানে আমরা নিরাপদ?

এখনও বলছি, বন্ধু—

আমার নাম হলি।

হ্যাঁ, বন্ধু হলি, এখনও বলছি শারীরিক দিক থেকে আপনারা নিরাপদ। কিন্তু শুধুই কি শরীর নিয়ে মানুষ? মন, আত্মা আছে না? সেগুলোও জখম হতে পারে।

চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলালাম আমি। অবোস আমার হাতের পট্টি খুলতে লাগলো।

দেখুন প্রায় ভালো হয়ে গেছে আপনার হাত, খোলা শেষ হতে বললো সে। এখন আরেকবার মলম লাগিয়ে পট্টি বেঁধে দিচ্ছি, কয়েক দিনের ভেতর পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে, খান র‍্যাসেনের কুকুর যে কোনোদিন কামড়েছিলো তা বুঝতেই পারবেন না। ও হ্যাঁ, খুব শিগগিরই আবার ওর দেখা পাবেন, সঙ্গে থাকবে ওর সুন্দরী স্ত্রী।

আবার ওর দেখা পাবো! এ পাহাড়ে এলে কি মরা মানুষ বেঁচে ওঠে?

না। এখানে ওকে সমাহিত করতে আনা হবে। কালুনের শাসকরা অনেকদিন ধরে এই সুবিধাটুকু ভোগ করে আসছে। এই যে আপনার সঙ্গী উঠে গেছেন। তৈরি হয়ে নিন।

.

ঘণ্টাখানেক পরে আবার শুরু হলো আমাদের উধ্বমুখী যাত্রা। এবারও আমি খানের ঘোড়ায় চেপে চলেছি। আহার আর বিশ্রাম পেয়ে আবার তাজা হয়ে উঠেছে ঘোড়াটা। লিওর জন্যে একটা পালকির ব্যবস্থা করতে চাইলো অরোস। প্রত্যাখ্যান করলো লিও, মেয়ে মানুষের মতো পালকিতে চড়ে যাবে না ও। একেবারে সামনে আমাদের পথপ্রদর্শক সেই নারীমূর্তি। তার পেছনে অরোস। তারপর ঘোড়ার পিঠে আমি, পাশে পায়ে হেঁটে চলেছে লিও। সবশেষে সাদা আলখাল্লা পরা পূজারীবাহিনী।

চত্বর পেরিয়ে সেই ছোট্ট দরজা দিয়ে দেয়ালের বাইরে এলাম। কাল রাতে যে ঝরনার পাশ দিয়ে গ্রামটার কাছে এসেছিলাম সেখানে পৌঁছুলাম। তারপর উঠে যেতে লাগলাম পাহাড়ের ঢাল বেয়ে।

দুপাশে পাহাড়ের দেয়াল খাড়া উঠে গেছে, মাঝখান দিয়ে চলেছি আমরা। হঠাৎ সমবেত কণ্ঠের সুরেলা একটা ধর্মসঙ্গীত কানে ভেসে এলো। একটা বাঁক নিলো পথ। মোড় ঘুরে দেখলাম ধীর গম্ভীর একটা মিছিল এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। তার পুরোভাগে ঘোড়ার পিঠে আছে সুন্দরী খানিয়া, পেছনে তার চাচা বৃদ্ধ শামান, তারপর একদল সাদা আলখাল্লা পরা ন্যাড়া মাথা পূজারী। একটা শববাহী খাঁটিয়া বহন করেছে তারা। খাঁটিয়ায় শুয়ে আছে খান র‍্যাসেনের দেহ, কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত।

আমাদের পথপ্রদর্শকের সাদা অবয়বটা দেখা মাত্র ভয়ঙ্কর বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে এলো খানিয়া। চিৎকার করে উঠলো-কে তুই, কাফন পরা ডাইনী, খানিয়া আতেন আর তার মৃত স্বামীর পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছিস? তারপর লিওর দিকে ফিরে, দেখতে পাচ্ছি কুসংসর্গে পড়েছে তোমরা, ওর সঙ্গে কোথায় যাচ্ছো? পরিণতি শুভ হবে না। ও যদি স্বাভাবিক নারীই হবে অমন মুখ লুকিয়ে রেখেছে কেন? কিসের লজ্জা ওর?

ইতিমধ্যে সিমব্রিও এগিয়ে এসেছে। পোশাকের হাতায় টান দিয়ে আতেনকে থামানোর চেষ্টা করলো সে। আর পূজারী অরোস, বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে বললো, দয়া করে চুপ করুন; অমন অশুভ কথা বলবেন না।

কিন্তু চুপ করল না আতেন। ঘৃণার ছাপ আরও গভীর ভাবে এঁটে বসলো তার মুখে। আগের চেয়ে কঠোরস্বরে চিৎকার করলো, কেন, চুপ করবো কেন? ডাইনী, তোর ঐ কাফন খুলে ফেল, মরা লাশই অমন কাপড় পরে থাকে। সাহস থাকে

তো মুখ দেখা; আমরা বুঝি, সত্যিই তুই কি।

থামুন, আমি মিনতি করছি, থামুন, আবার বললো অরোস, এখনও আগের মতো শান্ত তার গলা। উনি প্রতিনিধি, আর কেউ নন, ক্ষমতা ওঁরই সাথী।

আমি কালুনের খানিয়া, আমার বিরুদ্ধে ওর ক্ষমতা কোনো কাজে আসবে না। ক্ষমতা, হা! দেখাতে বলল ওর ক্ষমতা।

ভাইঝি, আতেন, চুপ করো! সন্ত্রস্ত গলায় বললো বৃদ্ধ শামান। আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে তার মুখ।

আবার কিছু বলার জন্যে মুখ খুললো আতেন। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎগতিতে হাত। উঁচু করলো আমাদের পথপ্রদর্শক, জংলীদের পুরোহিতকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সময় যেমন করেছিলো তেমন। এক বিন্দু নড়েনি সে, একটা শব্দ করেনি, কেবল হাত উঁচু করেছে, যেন ইশারা করছে। আতেনের হাঁ মুখটা হাঁ হয়েই রইলো কিছুক্ষণ তারপর ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।

এদিকে মূর্তিকে হাত উঁচু করতে দেখেই এস্তভঙ্গিতে দুহাত তুলেছে অবোস। প্রার্থনার সুরে বলছে, ও দয়াময়ী মা, দয়ার সাগর, করুণার সিন্ধু, তুমি সব শুনেছো, সব দেখেছো, আমি ভিক্ষা চাই তোমার কাছে, এই রমণীর উন্মাদলুলভ আচরণ ক্ষমা করে দাও দয়া করে। শত হলেও ও এই অগ্নিগিরির অতিথি, ওর রক্তে তোমার দাসের হাত কলঙ্কিত কোরো না, এ আমার একান্ত মিনতি।

একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, হাত ওপরে ওঠানো থাকলেও অরোসের চোখ দুটো স্থির আমাদের পথপ্রদর্শকের ওপর।

অরোসের প্রার্থনার গুণেই কিনা জানি না, আস্তে আস্তে নেমে এলো মূর্তির হাত। অদৃশ্য কোনো শক্তির প্রভারে যেন খানিয়া আতেন ভয়ানক এক খোঁচা দিলো ঘোড়ার পেটে। মুহূর্তে ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করলো ঘোড়াটা। শামান সিমব্রিও ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো পেছন পেছন।

আবার রওনা হলাম আমরা। শিগগিরই খান রাসেনের শব বহনকারী মিছিলটা পেরিয়ে গেলাম। সূর্যের আলোয় ধোয়া উপত্যকার ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছি শ্বেতশুভ্র উজ্জ্বল চুড়ার দিকে। কিছুক্ষণ পর ঘন একগুচ্ছ পাইন গাছের কাছে পৌঁছুলাম। পাইনের ছায়ায় পৌঁছুলো আমাদের পথপ্রদর্শক, তারপর হঠাৎ আর দেখলাম না তাকে।

কোথায় গেলেন উনি? অরোসকে জিজ্ঞেস করলাম, খানিয়ার সাথে বোঝাঁপড়া করতে?

না? মৃদু হেসে বললো পুরোহিত। আমার ধারণা, হেসার অতিথিরা প্রায় এসে পড়েছেন এই খবর দেয়ার জন্যে এগিয়ে গেছেন উনি।

আশ্চর্য হলাম জবাবটা শুনে। পাহাড়ের শূন্য ঢাল উঠে গেছে চূড়া পর্যন্ত, মানুষ দূরে থাক একটা ইদুরও আমাদের চোখ এড়িয়ে ওখান দিয়ে যেতে পারবে না। ও গেল কি করে? আর কিছু বললাম না আমি। অরোসের পেছন পেছন উঠে যেতে লাগলাম।

বাকি দিনটুকু এক ভাবে উঠে গেলাম আমরা। ক্রমশ তুষারের কাছাকাছি হচ্ছি।

.

সূর্যাস্তের সামান্য আগে চূড়ার তুষার ছাওয়া এলাকার ঠিক নিচে বিশাল এক প্রাকৃতিক পেয়ালার কাছে এলাম। তলাটার আয়তন কয়েক হাজার একর। পাথর নয়, চমৎকার উর্বরা মাটি দিয়ে গঠিত। ওখানে চাষাবাদ করে মন্দিরের পুরোহিতেরা। চোখ জুড়ানো ফসল ফলে আছে। নিচে থেকে কিছুই দেখা যায় না, পেয়ালার মতো দেখতে উপত্যকাটার অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় না। প্রাকৃতিক একটা ফটক দিয়ে ঢুকলাম আমরা সেখানে।

বাগানের মতো সবুজ এলাকা পেরিয়ে ছোট্ট একটা শহর। লাভা পাথরের তৈরি সুন্দর ছিমছাম শহরটায় পূজারীরা থাকে। উপজাতীয়দের কাউকে বা কোনো আগন্তুককে আসতে দেয়া হয় না এখানে।

শহরের প্রধান সড়ক ধরে এগিয়ে উঁচু একটা পাহাড়ী দেয়ালের কাছে পৌঁছুলাম। সামনে বিরাট একটা দরজা। লোহার ভারি পাল্লাগুলো লাগানো। এখান থেকে বিদায় নিলো আমাদের রক্ষী পুরোহিতেরা। আমার ঘোড়াটাও নিয়ে গেল ওরা। অবোস, আমি আর লিও কেবল রইলাম।

নিঃশব্দে খুলে গেল বিশাল দরজাটা। বাঁধানো একটা পথ ধরে এগিয়ে চললাম। কিছুক্ষণ পর অনেক উঁচু আরেকটা দরজার সামনে এলাম। এটাও লোহার। আগেরটার মতোই খুলে গেল নিঃশব্দে, কোনো সংকেত বা নির্দেশ দিতে হলো না বাইরে থেকে। পরমুহূর্তে ভেতরের উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাধিয়ে গেল আমাদের।

পাঠক, আপনার দেখা সবচেয়ে বড় গির্জার কথা স্মরণ করুন; তার দ্বিগুণ বা তিনগুণ আয়তনের একটা মন্দিরের ভেতর ঢুকেছি আমরা। কোনো কালে হয়তো নিছক পাহাড়ী গুহা ছিলো, কে বলতে পারে? কিন্তু এখন এর উঁচু খাড়া দেয়াল, বিশাল স্তম্ভসমূহে ভর করে থাকা ছাদ প্রমাণ করছে হাজার হাজার বছর আগে অগ্নি-উপাসক মানুষদের কি কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিলো এটা তৈরি করতে।

বিস্ময়কর এক পদ্ধতিতে আলোকিত করা হয়েছে মন্দিরটাকে। মেঝে থেকে উঠে এসেছে উঁচু মোটা অগ্নিস্তম্ভ। গুণে দেখলাম আঠারোটা। নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর দুই সারিতে উজ্জ্বল সাদা আলো বিকিরণ করে জ্বলছে সেগুলো। ছাদের সামান্য নিচে শেষ হয়েছে অগ্নি-স্তম্ভগুলোর মাথা। কোনো গন্ধ বা ধোয়া তৈরি হচ্ছে না। সবচেয়ে আশ্চর্য, এক বিন্দু তাপ ছড়াচ্ছে না সেগুলো। বাইরের মতো শীতল পরিবেশ মন্দিরের ভেতরেও। মৃদু একটা হিস হিস শব্দ হচ্ছে শুধু।

মন্দির জনশূন্য।

আপনাদের এই মোমবাতি কখনও নেভে না? জিজ্ঞেস করলো লিও।

কি করে নিভবে? জবাব দিলো অরোস। এই মন্দিরের নির্মাতারা যার পূজা করতো সেই অনন্ত আগুন থেকে উঠে আসছে ওগুলো। আদি থেকে জ্বলছে এ আলো, অন্ত পর্যন্ত জ্বলবে। তবে ইচ্ছে করলে কিছুক্ষণের জন্যে আমরা বন্ধ করে দিতে পারি কোনো একটা বা সবগুলো। যাক, চলুন, আরও বড় জিনিস দেখার আছে।

নিঃশব্দে এগিয়ে গেলাম আমরা। অবশেষে মন্দিরের শেষ মাথায় পৌঁছলাম। সামনে একটা কাঠের দরজা, আগেরগুলোর মতোই বিরাট। ডান বা দুদিকে দুটো গলি মতো চলে গেছে। আমাদের থামতে ইশারা করলো অরোস। একটু পরেই দুপাশের গুলি থেকে ভেসে এলো সমবেত কণ্ঠের ধর্ম-সঙ্গীত। একবার এদিকে একবার ওদিকে তাকালাম। সাদা আলখাল্লাধারীদের দুটো মিছিল এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে।

ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে ওরা। ডান দিকের মিছিলটা পূজারীদের, বা দিকেরটা পৃজারিনীদের। সব মিলে একশো জনকি তার বেশি হবে। আমাদের সামনে এসে সারি বেঁধে দাঁড়ালো তারা। পূজারিনীরা দাঁড়ালো পেছনের সারিতে। চুপ সবাই।

অরোস একটা ইশারা করতেই আবার গেয়ে উঠলো তারা। এবার একটু দ্রুত লয়ের একটা সঙ্গীত। সামনের কাঠের দরজাটা খুলে গেল। আবার এগোলাম আমরা। পেছন পেছন সারি বেধে এলো পূজারী-পূজারিনীরা। তারপর যেমন খুলেছিলো তেমনি নিঃশব্দে আমাদের পেছনে বন্ধ হয়ে গেল দরজা। উপবৃত্তাকার একটা কামরায় পৌঁছেছি। এতক্ষণে বুঝলাম, পাহাড়ের চূড়ায় যে আঙটাওয়ালা স্তম্ভ আছে সেটার আদলে তৈরি করা হয়েছে মন্দিরটার দৈর্ঘ্যে প্রস্থে দুটো সমান। এই কামরায়ও মেঝে থেকে অগ্নি-স্তম্ভ উঠেছে। এছাড়া কামরাটা ফাঁকা।

না, পুরোপুরি ফাঁকা নয়, উপবৃত্তের শেষ প্রান্তে একটা উঁচু চৌকো বেদীমতো। একটু কাছাকাছি হতে দেখলাম, রুপোর সরু সুতো দিয়ে তৈরি পর্দা ঝুলছে সেটার সামনে। বেদীর ওপর বসানো রয়েছে বড় একটা রুপোর প্রতিমা। অগ্নি-স্তম্ভের উজ্জ্বল আলো তার ওপর পড়ে ঝকমকিয়ে উঠছে।

দেখতে সুন্দর হলেও জিনিস্টার ঠিক ঠিক বর্ণনা দেয়া দুষ্কর। মূর্তিটা ডানাওয়ালা পরিণত বয়সের এক মহিমাময়ী রমণীকে প্রতীকায়িত করছে যেন। একটা ডানা বেঁকে এসে ঢেকে দিয়েছে তার সামনেটা। ডানার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা বাচ্চা ছেলের মুখ। বাঁ হাতে সে ধরে আছে নারীমূর্তির এক স্তন, ডান হাতটা উঁচু হয়ে আছে আকাশের দিকে। এক পলক দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে মূর্তিটা মাতৃত্বের প্রতিরূপ।

আমরা যখন মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখছি তখন পূজারী আর পূজারিনীরা ডানে-বাঁয়ে নড়ে চড়ে নতুন একটা সারি তৈরি করে দাঁড়িয়ে গেছে। একজন পুরুষের পাশে একজন নারী এভাবে দাঁড়িয়েছে তারা। গম্ভীর অথচ সুরেলা কণ্ঠের গান চলছে। উপবৃত্তাকার কামরাটা এত বড় যে দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছে তার আওয়াজ। সব মিলিয়ে গভীর গাম্ভীর্যময় এক পরিবেশ। কথা বলা দূরে থাক, হাত পা নাড়তে পর্যন্ত ভয় হচ্ছে, পাছে অবমাননা হয় এই গাম্ভীর্যের। নৈঃশব্দ্যই যেন এর একমাত্র সাথী, আর সব কিছু এখানে বেমানান।

শেষ পূজারী তার জায়গা নেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো অরোস। তারপর ফিরলো আমাদের দিকে। মৃদু, বিনীত কণ্ঠে বললো, এবার কাছে আসুন, প্রিয় বিদেশী পথিক, মা-কে প্রণতি জানান।

কই তিনি? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো লিও। কাউকে তো দেখছি না। হেসা ওখানেই থাকেন। প্রতিমার দিকে ইশারা করলো অবোস। তারপর আমাদের দুজনের হাত ধরে এগিয়ে চললো বেদীর দিকে।

যত আমরা এগোচ্ছি ততই উঁচুগ্রামে উঠছে পূজারীদের কণ্ঠস্বর। বিশাল শূন্য কামরার পরিবেশ আরও গমগমে হয়ে উঠেছে। সেই সাথে আমার মনে হলো–হয়তো এটা নেহায়েতই মনে হওয়া-অগ্নি স্তম্ভের উজ্জ্বলতাও যেন বাড়ছে।

অবশেষে আমরা পৌঁছুলাম সেখানে। আমাদের হাত ছেড়ে দিয়ে তিনবার মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলো অরোস। তারপর উঠে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে রইলো; মাথা নিচু, আঙুলগুলো ভাজ করা। আমরাও দাঁড়িয়ে রইলাম। অরোসের মতোই নিঃশব্দে। আশা-নিরাশার দোলায় দুলছে আমাদের হৃদয়। অবশেষে কি সব পরিশ্রমের শেষ হলো?

.

১৪.

ধীরে ধীরে সরে গেল রুপোর পর্দা। একটা কুঠুরি মত দেখতে পেলাম বেদীর নিচে। সে কুঠুরির কেন্দ্রস্থলে একটা সিংহাসন। সিংহাসনে আসীন এক মূর্তি। তুষার শুভ্র ঢেউ নেমে এসেছে তার মাথা থেকে বাহু ছাড়িয়ে মর্মরের মেঝে পর্যন্ত। বস্ত্রাবৃত হাতে রত্নখচিত আংটাওয়ালা দণ্ড-সিসট্রাম!

হঠাৎ কি যে হলো আমাদের, মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণতি জানালাম মূর্তিকে, অরোস যেমন করেছিলো। এবং তারপর সেখানেই বসে রইলাম হাঁটু গেড়ে, মুখ নিচু করে। অনেক অনেকক্ষণ পর ছোট্ট ঘণ্টাগুলোর মৃদু টুং টাং আওয়াজ শুনে মুখ তুলে দেখলাম, দণ্ড ধরা হাতটা আমাদের দিকে প্রসারিত। তারপর সরু কিন্তু স্পষ্ট একটা কণ্ঠস্বর, আমার মনে হলো সামান্য যেন কাঁপছে, বিশুদ্ধ খ্রীকে বললো স্বাগতম পথিকেরা। অন্য ধর্মাবলম্বী হয়েও দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এই প্রাচীন দেবায়তনে এসেছে, সেজন্যে তোমাদের অভিনন্দন। ওঠো, আমাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমিই তো তোমাদের আহ্বান করেছি। সে জন্যে কি দূত এবং ভৃত্যদের পাঠাইনি? তাহলে আর ভয় কেন?

উঠলাম আমরা। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম। কি বলবো বুঝতে পারছি না।

আমি তোমাদের অভিনন্দন জানাই, আবার শোনা গেল সেই কণ্ঠস্বর। এখন বলল,লিওর দিকে ঘুরলো দণ্ডটা-কি বলে সম্বোধন করা হয় তোমাকে?

আমার নাম লিও ভিনসি।

লিও ভিনসি! চমৎকার নাম! তোমাকেই মানায়। আর তুমি? আমাকে করা হলো প্রশ্নটা।

আমি হোরেস হলি।

আচ্ছা। এবার বলো, লিও ভিনসি, হোজেস হলি, কিসের খোঁজে এসেছ এত দূরে?

একে অন্যের দিকে তাকালাম আমরা। আমি জবাব দিলাম, সে এক আশ্চর্য, দীর্ঘ কাহিনি—কিন্তু আপনাকে কি বলে সম্বোধন করবো আমরা?

যা আমার নাম, হেস।

হ্যাঁ, সে এক দীর্ঘ কাহিনি, হেস।

হোক দীর্ঘ, তবু আমি শুনতে চাই। আগ্রহ তার গলায়। না, এখনই সবটা নয়, আমি জানি তোমরা ক্লান্ত, এখন কিছুটা বলল, বাকিটা পরে শুনবো। তুমি বলো, লিও, যথাসম্ভব সংক্ষেপে।

পূজারিনী, স্বভাবসুলভ চটপটে ভঙ্গিতে বললো লিও, আপনার আদেশ শিরোধার্য। বহু বছর আগে, আমি যখন যুবক, আমার বন্ধু এবং পালক পিতা হোরেস হলি আর আমি প্রাচীন কিছু তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বুনো এক দেশে গিয়েছিলাম। সেখানে স্বর্গীয় এক নারীর সাথে সাক্ষাৎ হয় আমাদের। সময়কে জয় করতে সক্ষম হয়েছিল সে।

অর্থাৎ সেই রমণীর বয়স ছিল বেশি, দেখতেও নিশ্চয় কুৎসিত?,

পূজারিনী, আমি বলেছি, সে সময়কে জয় করেছিলো সহ্য করেছিলো নয়। সে ছিলো অনন্ত যৌবনের অধিকারী, আর সৌন্দর্য? ওর তুলনা একমাত্র ও-ই। পৃথিবীর কোনো সৌন্দর্যের সাথে সে সৌন্দর্যের তুলনা চলে না।

তাহলে, বিদেশী, আর দশটা পুরুষের মত তুমিও নিছক সৌন্দর্যের খাতিরেই ওকে পূজা করেছো?

উঁহুঁ, আমি ওকে পূজা করিনি, ভালোবেসেছি। প্রেম আর পূজা নিশ্চয়ই এক জিনিস নয়? পূজারী অরোস আপনাকে পূজা করে, সেজন্যে মা ডাকে। আমি ঐ অনন্ত যৌবনা রমণীকে ভালোবেসেছিলাম।

তাহলে তো এখনও ওকে তোমার ভালোবাসা উচিত। নইলে বলতে হয়, খাদ ছিলো তোমার প্রেমে।

আমি এখনও ওকে ভালোবাসি, বললো লিও। ও মরে গেছে তবু।

তা কি করে সম্ভব? এই না বললে সে অমর।

এখনও আমি তা-ই বিশ্বাস করি। তবে আমার মানবীয় বোধ হয়তো বুঝতে পারছে না, ভাবছে ও মরে গেছে, হয়তো ও রূপ বদলেছে। মোট কথা, আমি ওকে হারিয়েছি, এবং সেই হারানো ধনই আমি খুঁজে ফিরছি এত বছর ধরে।

বুঝলাম, কিন্তু আমার পাহাড়ে কেন?

কারণ এক অলৌকিক দর্শন আমাকে এই পাহাড়ের দৈববাণীর পরামর্শ নিতে বলেছে। আমার হারানো প্রিয়তমার খবর পাবো সেই আশায় এখানে এসেছি।

আর তুমি, হলি? তুমিও কি অমন এক অমর নারীকে ভালোবাসো, যার অমরত্ব মৃত্যুর পায়ে মাথা নোয়ায়?

না, পূজারিনী, আমার দায় অন্যখানে। আমার পালিত পুত্র যেখানেই যায় আমিও ওর সঙ্গে সঙ্গে যাই। ও সৌন্দর্যেপছনে ছুটছে, আমি ওর–

তুমি ওর পেছন পেছন ছুটছো। তার মানে তোমরা দুজনই যুগ যুগ ধরে মানুষ অন্ধের মতো, পাগলের মতো যা করেছে তা-ই করছে–সৌন্দর্যের পেছনে ছুটছে।

না, আমি বললাম, ওরা যদি অন্ধ হতো সুন্দরকে দেখতে পেতো না, আর পাগল হলে বুঝতে পারতো না কোনটা সুন্দর কোনটা অসুন্দর। জ্ঞান এবং চোখ দুটোই স্বাভাবিক মানুষের আয়ত্তাধীন অনুভব।

হুঁ, বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারো তুমি, হলি, অনেকটা সেই- থেমে গেল সে। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, আমার দাসী কালুনের খানিয়া তোমাদের যথাযথ সমাদর করেছে তো? যেমন নির্দেশ দিয়েছিলাম সেই মতো এখানে আসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো?

আমরা জানতাম না ও আপনার দাসী, বললাম আমি। সমাদর? হ্যাঁ, তা পেয়েছি মোটামুটি। তবে এখানে আসার ব্যাপারে ওর চেয়ে ওর স্বামী, খানের মরণ-শ্বাপদগুলোর অবদান বেশি। আচ্ছা, পূজারিনী, আমাদের আসা সম্পর্কে কি জানেন আপনি?

খুব বেশি কিছু না, তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জবাব দিলো সে। তিন চাঁদেরও কয়েকদিন আগে আমার গুপ্তচররা তোমাদের দেখতে পায় দূরের ঐ পাহাড়ে। এক রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে তোমাদের তাঁবুর খুব কাছে গিয়ে তোমাদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পারে। তারপরই ঝটপট ফিরে এসে আমাকে জানায় সব। তখন আমি খানিয়া আতেন আর তার যাদুকর চাচাকে নির্দেশ দিই কালুনের প্রাচীন রাজ্যতোরণের কাছে গিয়ে যেন অপেক্ষা করে এবং তোমরা পৌঁছুলে সমাদরের সাথে অভ্যর্থনা জানিয়ে দ্রুত এখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু দেখছি কালুন থেকে এপর্যন্ত আসতে তোমাদের তিন মাসেরও বেশি লেগে গেছে।

যথাসম্ভব দ্রুত আসার চেষ্টা করেছি আমরা, বললো লিও; আপনার গুপ্তচররা যখন ওই দূরের পাহাড়ে গিয়ে আমাদের আসার সংবাদ আনতে পারে। আমাদের দেরি হওয়ার কারণও নিশ্চয়ই তারা বলতে পারবে। আমার প্রার্থনা, এ সম্পর্কে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না আমাদের।

হ্যাঁ, আমি আতেনকেই জিজ্ঞেস করবো, শীতল গলায় জবাব দিলো হেসা। অবোস, খানিয়াকে নিয়ে এসো এখানে। তাড়াতাড়ি করবে।

চলে গেল পুরোহিত প্রধান।

আমার দিকে তাকালো লিও। ইংরেজিতে বললো, এখানে আসা ঠিক হয়নি। এবার বোধহয় ঝামেলা হবে।

আমার মনে হয় না। যদি হয়ও ঝামেলার ভেতর দিয়ে সত্যই বেরিয়ে আসবে। থেমে গেলাম আমি। মনে পড়লো, পাহাড়ে থাকতে ইংরেজি ছাড়া আর কিছু বলিনি আমরা। তবু সামনে বসা এই অদ্ভুত মহিলার চররা আমাদের কথা বুঝেছিলো। এই মহিলাও নিশ্চই বোঝে।

এক সেকেণ্ড পরেই আমার কথা সত্যি প্রমাণিত হলো।

তুমি অভিজ্ঞ লোক, হলি, বললো সে, ঠিকই বলেছো, ঝামেলার ভেতর দিয়েই সত্য বেরিয়ে আসে।

.

দরজা খুলে গেল। কালো পোশাক পরা একদল মানুষ ঢুকলো প্রায় বৃত্তাকার কামরাটায়। পুরোভাগে রয়েছে শামান সিমব্রি। তার পেছনেই খানের শববাহী খাঁটিয়া বয়ে আনছে আটজন পূজারী। তারপর খানিয়া আতেন, মাথা থেকে পা। পর্যন্ত কালো আলখাল্লায় মোড়া। সবশেষে আরেক দল পূজারী। বেদীর সামনে নামিয়ে রাখা হলো খাঁটিয়াটা। পূজারীরা পিছিয়ে গেল। আতেন আর তার চাচা কেবল রইলো মৃতদেহের কাছে।

আমার দাসী, কালুনের খানিয়া কি চায়? শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করলো হেসা।

এগিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো আতেন। প্রণাম করলো, তবে খুব বিনীত ভঙ্গিতে নয়।

মা, আমার পূর্ব-পুরুষদের মতো আমিও এসেছি আপনার চরণে আমার ভক্তি নিবেদন করতে, আবার প্রণাম করলো সে। মা, এই মৃত মানুষটা আপনার এই

পবিত্র পাহাড়ের আগুনে সমাহিত হওয়ার অধিকার চায়।

এটা আবার চাওয়ার কি হলো? যুগ যুগ ধরে তো এ নিয়মই চলে আসছে, খান পরিবারের সদস্যরা মারা যাওয়ামাত্র এখানে সমাহিত হওয়ার অধিকার লাভ করে। তোমার মৃত স্বামীর বেলায় ব্যতিক্রম হবে কেন? যখন সময় আসবে তোমার বেলায়ও হবে না।

ধন্যবাদ, ও হেস, আমার প্রার্থনা, নির্দেশটা লিখিতভাবে রাখা হোক। বয়সের তুষার স্তরে স্তরে জমেছে আপনার পূজনীয় দেহের ওপর। শিগগিরই হয়তো সাময়িকভাবে আমাদের ছেড়ে বিদায় নেবেন আপনি। তারপর নতুন যে হেসা আমাদের শাসন করবেন তার সময়ে যেন এর অন্যথা না হয়।

থামো! গর্জে উঠলো হেসা। বন্ধ করো তোমার এই লাগামহীন কথাবার্তা! নির্বোধ, কার সামনে বসে কি বলছো খেয়াল নেই? সৌন্দর্য আর যৌবন নিয়ে তোমার যে অহঙ্কার তা কালই আগুনের খোরাক হতে পারে জানো না? বাজে কথা রেখে বলো, কি করে মরেছে তোমার স্বামী? ১

ঐ বিদেশীদের জিজ্ঞেস করুন।

আমি ওকে হত্যা করেছি, বললো লিও। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে এ কাজ করতে হয়েছে। আমাদের ওপর ও হিংস্র কুকুরের পাল লেলিয়ে দিয়েছিলো। এই যে তার প্রমাণ, আমার হাতের দিকে ইশারা করলো ও। পূজারী অরোসও জানেন, উনি ঐ ক্ষত চিকিৎসা করছেন।

কি করে এ সম্ভব? আতের্নের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো হেসা।

আমার স্বামী উন্মাদ ছিলো, দৃঢ় গলায় বললো খানিয়া। নিষ্ঠুর হলেও ব্যাপারটাকে ও খেলা হিসেবে নিয়েছিলো।

আচ্ছা! তোমার স্বামী বোধহয় একটু ঈর্ষাকাতরও হয়ে উঠেছিলো, তাই না? উই, মিথ্যে বলার চেষ্টা কোরো না। লিও ভিনসি, তুমি বলোনা, যে নারী তোমার কাছে প্রেম নিবেদন করেছে তার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করবো না। হলি, তুমি বলো, সত্যি বলবে।

খানিয়া আতেন আর শামান সিমব্রি আমাদের উদ্ধার করার পর থেকে এ পর্যন্ত যা যা ঘটেছে সংক্ষেপে বলে গেলাম আমি। নিঃশব্দে শুনলো হেসা। তারপর বললো— বলছো, খানিয়া তোমার পালিত পুত্রের প্রেমে পড়েছিলো। কিন্তু পালিত পুত্রের অবস্থা কি? ও প্রেমে পড়েনি?

তা আমি সঠিক বলতে পারবো না। তবে যতটুকু জানি, খানিয়ার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছিলো লিও।

হুঁ। দাসী আতেন! কি বলার আছে তোমার?

সামান্য, জবাব দিলো, আতেন, একটুও কাঁপছে না ওর গলা। ঐ পাগল বর্বরটার সাথে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। এমন সময় এলো এই বিদেশী। একে অন্যকে দেখলাম আমরা। তারপর প্রকৃতির খেয়াল, আমি কি করবো?-পরস্পরের প্রতি আসক্ত হলাম দুজন। পরে ব্ল্যাসেনের প্রতিশোধের ভয়ে কালুন ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করে ওরা। নেহায়েত দৈবক্রমেই এদিকে চলে এসেছিলো। এটুকুই আমার বক্তব্য। এবার দয়া করে অনুমতি দিন, বিশ্রাম নিতে যাই, ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছি।

দাঁড়াও, আতেন! কঠোর কণ্ঠে বললো হেসা। তুমি বলছে, প্রকৃতির খেয়ালে তুমি আর ঐ লোকটা একে অন্যের প্রেমে পড়েছিলে। ওর বুকের কাছে ছোট্ট একটা থলেতে এক গোছা চুল আছে। বলো, সেটা কি তোমার প্রেমের নিদর্শন?

ওর বুকের কাছে কোনো থলে আছে কিনা বা সেই থলেতে কোনো কিছু লুকানো আছে কিনা, আমি জানি না, শান্ত নিরাবেগ গলায় বললো খানিয়া।

তোমার তোরণ-গৃহে যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলো তখন ও ঐ গোছাটা তোমার চুলের সাথে মিলিয়ে দেখেনি ব চাও?—ভালো করে মনে করে দেখ।

ওহ! আমাদের সব গোপন কথা ফাঁস করে দিয়েছে! ঘৃণার দৃষ্টিতে লিওর দিকে তাকালো আতেন। অনেক পুরুষই প্রেয়সীর স্মৃতিচিহ্ন বুকে করে রাখতে চায়, ও-ও রেখেছে।

না। এ সম্পর্কে আমি ওঁকে কিছুই বলিনি, খানিয়া! শান্তকণ্ঠে বললো লিও।

না, তুমি বলোনি; আমার অলৌকিক ক্ষমতাই আমাকে জানিয়েছে। নিজেকে তুমি কি মনে করো, আতেন? সর্বজ্ঞ সর্বদশী হেমার কাছে সত্য গোপন করবে, এতই সহজ? আমি সব জানি, আতেন, বিদেশীরা অসুস্থ বলে মিথ্যা সংবাদ দিয়েছিলে আমাকে। আমার অতিথিদের বন্দী করেছিলে। যে তোমার প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিলো তার কাছ থেকে জোর করে ভালোবাসা আদায় করতে চেয়েছিলে? থামলো হেসা। তারপর হিম শীতল কণ্ঠে বলে গেল, তোমার পাপের পেয়ালা পূর্ণ হয়েছে, আতেন। এত কিছুর পরও আমার আশ্রমে, আমার সামনে বসে মিথ্যা বলেছে তুমি।

হলোই বা, তাতে কি? তাচ্ছিল্যের সাথে বললো খানিয়া। আপনি নিজে কি ওই লোকটাকে ভালোবাসেন? না, সে-তো দানবীয় ব্যাপার! উহুঁ, হেস, অত রেগে যাবেন না, আপনার অশুভ ক্ষমতার কথা আমি জানি, এ-ও জানি আমি আপনার অতিথি, অতিথির রক্তে আপনি আপনার হাত কলঙ্কিত করবেন না। তাছাড়া, আমার ধারণা, আমার ক্ষতি করা আপনার সাধ্যের বাইরে। অতিলৌকিক ক্ষমতার দিক থেকে আমি আপনি দুজনেই সমান।

আতেন, মাপা গলায় জবাব দিলো হেস, ইচ্ছে করলে এ মুহূর্তে তোমাকে ধ্বংস করতে পারি। তবে, তুমি ঠিকই বলেছো, করবো না। কিন্তু এই অতিথিদের সম্পর্কে আমার স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তা লঙ্ঘন করার সাহস দেখালে কি করে?

তাহলে শুনুন, স্পর্ধা, ব্যঙ্গ সব দূর হয়ে গেছে আতেনের গলা থেকে। ওর অন্তর থেকে যেন উঠে এলো কথাগুলো। আমি আপনার নির্দেশ অমান্য করেছি কারণ, ঐ মানুষটা আপনার নয়, আমার, এবং একমাত্র আমার; অন্য কোনো নারীর নয়! আমি ওকে ভালোবাসি, জন্ম-জন্মান্তর ধরে ভালোবাসি। হ্যাঁ, আমাদের আত্ম প্রথম যখন দেহের খাঁচায় বন্দী হয়েছে তখন থেকেই আমি ওকে ভালোবাসি, যেমন ও ভালোবাসে আমাকে। আমার হৃদয় আমাকে বলেছে একথা, আমার চাচার ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা আমাকে বলেছে একথা, যদিও কখন, কোথায় এ প্রেমের সূচনা তা আমি জানি না। জানার জন্যেই এসেছি আপনার কাছে, মা। অতীতের কোনো রহস্যই আপনার অজ্ঞাত নয়, আপনি বলুন, সত্য প্রকাশ করুন। জানি নিজের বেদীতে বসে আপনি মিথ্যে বলতে পারবেন না। জবাব দিন আমার প্রশ্নের-কে এই লোক। কেন ওকে দেখার সঙ্গে আমার অন্তর পেয়ে গেছে ওর দিকে? অতীতে ওর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিলো? আপনার কাছে কেন এসেছে ও? বলুন, ও মহিমাময়ী মা সব গোপনীয়তার অবসান হোক। আমি আদেশ করছি, বলুন, পরে আমাকে হত্যা করতে চান করবেন, কিন্তু আগে সত্য প্রকাশ করুন।

হ্যাঁ, বলুন! বলুন! আতেন থামতেই বলে উঠলো লিও। আমিও জানতে চাই। আশা-নিরাশায় হাবুডুবু খাচ্ছে আমার মন, আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে স্মৃতি। বলুন আপনি!

আমিও প্রতিধ্বনি করলাম, বলুন!

চুপ করে আছে হেসা। একটা দুটো করে সেকেণ্ড পেরিয়ে যাচ্ছে।

লিও ভিনসি, অবশেষে বললো সে, তোমার কি মনে হয়? আমি কে হতে পারি?

আমার বিশ্বাস, শান্ত গলায় জবাব দিলো লিও, তুমি আয়শা। কোর-এর। গুহায় দুহাজার বছরেরও বেশি আগে যার হাতে আমি নিহত হয়েছিলাম সেই আয়শা। হ্যাঁ, আমার বিশ্বাস, তুমি আয়শা। কোর-এর সেই একই গুহায় বিশ বছর আগে আবার ফিরে আসার শপথ নিয়ে যাকে মারা যেতে দেখেছিলাম তুমি সেই আয়শা।

শুনে খুব মজা পেলো যেন খানিয়া। বললো, শোনো পাগল কি বলে! বিশ বছর নয়, আশি গ্রীষ্ম আগে আমার দাদা, তখন উনি যুবক, মায়ের এই সিংহাসনে বসে থাকতে দেখে গিয়েছিলেন এই পূজারিনীকে।

তোমার কি মনে হয়, হলি? আমি কে হতে পারি? অ্যাতেনের কথা যেন শুনতেই পায়নি এমন ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো হেসা।

লিওর যা বিশ্বাস আমারও তাই। অবশ্য আসলে আপনি কি তা একমাত্র আপনিই বলতে পারেন।

হ্যাঁ, আমিই বলতে পারি আসলে আমি কি। কাল ঐ মৃতদেহ সত্ত্বারের জন্যে যখন উপরে নিয়ে যাওয়া হবে তখন এ নিয়ে আবার আলাপ করবো আমরা। ততক্ষণ তোমরা বিশ্রাম নাও, আর প্রস্তুতি নাও সেই ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার।

হেসার কথা শেষ হওয়ার আগেই, রুপালি পর্দা সরে এলো আগের জায়গায়। কালো পোশাক পরা পুরোহিতরা ঘিরে ধলো আতেন আর তার চাচা শামানকে। মন্দির থেকে বেরিয়ে গেল তারা। পূজারী-প্রধান অবোস ইশারায় তার পেছন পেছন যেতে বললো আমাদের। আমরাও বেরিয়ে এলাম মন্দির থেকে। অন্য পূজারী পূজারিনীরাও বেরিয়ে এলো। কেবল খান র‍্যাসেনের মৃতদেহ পড়ে রইলো যেখানে ছিলো সেখানে।

চমৎকার আসবাবপত্র সজ্জিত একটা বাড়িতে আমাদের নিয়ে এলো অরোস। অদ্ভুত এক পানীয় খেতে দিলো স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো বিনা প্রতিবাদে খেয়ে নিলাম আমি আর লিও। তারপর আর কিছু মনে নেই।

ঘুম ভাঙতে দেখলাম, বিছানায় শুয়ে আছি। চমৎকার ঝরঝরে লাগছে শরীর। এখনও রাত শেষ হয়নি। তার মানে খুব বেশিক্ষণ হয়নি ঘুমিয়েছি। পাশ ফিরে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুম এলো না। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার। পর মনের ভেতর ভীড় করে এলো একরাশ চিন্তা। বিশেষ করে হেসার শেষ কথাগুলো প্রস্তুতি নাও ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার!

কি সেই ভয়ঙ্কর সত্য? যদি দেখা যায় ও আয়শা নয়, সত্যিই ভয়ঙ্কর কিছু, তাহলে? শেষ দিকে অত মনোবল কোথায় পেলো, খানিয়া? ভাবতে ভাবতে উঠে বসলাম আমি। দেখলাম, একটা মূর্তি এগিয়ে আসছে। চিনতে পারলাম। অরোস।

অনেক ঘুমিয়েছেন, বন্ধু হলি, সে বললো, এবার উঠুন, তৈরি হয়ে নিন।

অনেক ঘুমিয়েছি! এখনও দেখছি অন্ধকার রয়েছে!

বন্ধু, এ অন্ধকার নতুন একটা রাতের। পুরো একরাত একদিন ঘুমিয়েছেন। আপনি।

আচ্ছা, একটা কথা–।

না, বন্ধু, কোনো কথা নয়। আমি কিছুই বলবো না। এখন খানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেবেন, সেখানে ভাগ্যে থাকলে আপনার প্রশ্নের জবাব পেয়ে যেতেও পারেন।

দশ মিনিট পরে খাওয়ার ঘরে নিয়ে গেল আমাকে অবোস। লিও আগে থাকতেই সেখানে বসে আছে। ওকে কাপড়-চোপড় পরিয়ে এখানে রেখে আমার কাছে গিয়েছিলো পূজারী-প্রধান। খাওয়া শেষে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে।

.

প্রথমেই মন্দিরে নিয়ে গেল আমাদের অরোস। অগ্নি স্তম্ভের আলোয় আলোকিত দীর্ঘ কামরা পেরিয়ে উপবৃত্তাকার কক্ষে ঢুকলাম। একদম ফাঁকা এখন জায়গাটা। এমন কি খানের মৃতদেহটাও নেই। বেদীর ওপর প্রতিমা তেমনই আছে কিন্তু নিচের কুঠুরিতে কিছু নেই। রুপালি পর্দা খোলা।

মতকে সম্মান দেখানোর জন্যে চলে গেছেন মা। প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে এ রীতি, ব্যাখ্যা করলো অরোস।

বেদীর ওপর উঠলাম আমরা। প্রতিমার পেছনে একটা দরজা। দরজার ওপাশে একটা গলি। তার শেষে বড় একটা কামরা। কামরার চার দেয়ালে অনেকগুলো দরজা। সেগুলো দিয়ে ঢোকা যায় বিভিন্ন কক্ষে। অরোস জানালো, হেসা তার পরিচারিকাদের নিয়ে বাস করেন ঐ কক্ষগুলোয়।

গলির শেষের কামরায় পৌঁছে দেখলাম ছজন পূজারী বসে আছে। প্রত্যেকের বগলে কয়েকটা করে মশাল আর হাতে একটা প্রদীপ।

অন্ধকারের ভেতর দিয়ে যেতে হবে আমাদের, বললো অরোস। দিন হলে বাইরের তুষার ছাওয়া ঢাল বেয়ে যাওয়া যেতো, রাতে ওখান দিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক।

এক পূজারীর কাছ থেকে তিনটে মশাল নিয়ে জ্বাললো সে। দুটো আমাদের দুজনের হাতে দিয়ে তৃতীয়টা রাখলো নিজের কাছে। কামরার শেষ প্রান্তের একটা। দরজা খুললো অবোস। অন্ধকার এক সুড়ঙ্গ দেখা গেল। পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠে গেছে ওপর দিকে। মশাল হাতে উঠতে শুরু করলাম আমরা। প্রায় একঘণ্টা ওঠার পর দীর্ঘ এক সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছুলাম।

লিওর দিকে তাকালো অবোস। মাথা নুইয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে বললো, এবার একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন, প্রভু, এই সিঁড়ি বেয়ে অনেকুদূর উঠতে হবে। এখন আমরা পাহাড়ের চূড়ার ঠিক নিচে রয়েছি। আংটাওয়ালা স্তম্ভে উঠবো এবার।

বসে রইলাম আমরা। সুড়ঙ্গের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। মশালের শিখা কেঁপে কেঁপে উঠছে। মেঘ গর্জনের মতো অদ্ভুত গুরু গুরু একটা আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি একটু পর পরই। অবোসকে জিজ্ঞেস করলাম, ওটা কিসের শব্দ। সে বললো, অগ্নিগিরির জ্বালামুখ থেকে খুব দূরে নেই আমরা। নিরেট পাথর ভেদ করে ভেসে আসছে অনন্ত আগুনের শব্দ।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠতে শুরু করলাম আমরা। উঠছি—উঠছি—উঠছি— শেষই হয় না সিঁড়ি। প্রায় এক ফুট উঁচু একেকটা ধাপ। পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠে গেছে স্তম্ভের ভেতর দিয়ে। কয়েক মিনিটের ভেতর হাঁপাতে শুরু করলাম। আবার বিশ্রাম নিলাম, আবার উঠলাম, তারপর আবার বিশ্রাম এবং আবার ওঠা। পুরো ছয়শো ধাপ টপকে স্তম্ভের মাথায় পৌঁছানো গেল। কিন্তু শেষ হলো না ওঠা। আংটার ভেতর দিয়েও উঠে গেছে সিঁড়ি। আবার খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে চললাম আমরা। অবশেষে আলো দেখতে পেলাম সামনে। আর বিশটা ধাপ টপকাতেই উঠে এলাম আংটার একেবারে মাথায় মঞ্চ মতো একটা জায়গায়।

আশি ফুট লম্বা ত্রিশ ফুট চওড়া সমতল জায়গাটা। মাথার ওপর নক্ষত্রখচিত আকাশ। শো শো করে বাতাস বইছে। প্রবল তার বেগ। মনে হচ্ছে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। দক্ষিণে বিশ হাজার ফুট বা তারও নিচে অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি কালুনের সমভূমি। পুব এবং পশ্চিমে দূরে তুষার ছাওয়া পাহাড়শ্রেণী। এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, আমাদের ঠিক নিচে আগ্নেয়গিরির প্রকাণ্ড জ্বালামুখ। প্রশস্ত একটা আগুনের হ্রদ। টগবগ করে বুদবুদ উঠছে। নানান রঙের নানান চেহারার ফুলঝুরি তুলে ফাটছে একেকটা বুদবুদার নতুন করে তৈরি হচ্ছে আরেকটা।

আতঙ্কে হাত পা হিম হয়ে আসতে চাইছে আমার। হৃৎপিন্ত্রে গতি দ্রুত হয়ে গেছে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। লিওকেও চিৎকার করে বললাম আমার মতো করতে। এবার একটু স্বস্তি পেলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম চারপাশে। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না-না হেসাকে না খানিয়া আতেনকে, না তার মৃত স্বামীকে। অরোস আর তার সঙ্গী ছয় পুরোহিত নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে।

কোথায় হতে পারে ওরা ভাবছি, এমন সময় পূজারীরা ঘিরে ধরলো আমাদের। ভয়ের লেশমাত্র নেই তাদের আচরণে। ধরে ধরে মঞ্চের কিনারে নিয়ে গেল ওরা আমাকে আর লিওকে। একটা সিঁড়ি দেখতে পেলাম মশালের নিভু নিভু আলোতে। সেটা দিয়ে কয়েক ধাপ নিচে নামতেই লক্ষ করলাম আগের মতো উন্মুক্ত জায়গায় আর নেই আমরা। বাতাসের গর্জন এখন মাথার ওপরে। আরও বিশ পা মতো এগোলাম। মাথার ওপর ছাদ দেখতে পেলাম। প্রাচীনকালের সেই অগ্নিউপাসকরা বানিয়েছিলো বোধহয়। ছাদের নিচে তিন দিকে দেয়াল, একটা দিক উক্ত, যেদিক থেকে আমরা এসেছি সেদিকটা। তিন দেয়ালওয়ালা বড়সড় একটা কামরা যেন। আগ্নেয়গিরির গভীর থেকে উঠে আসা আগুন লাল পর্দার মতো মেলে আছে পেছনে। সেই আলোয় আলোকিত কামরাটা।

এবার মানুষজনের দেখা পেলাম। পাথর কুঁদে বানানো একটা চেয়ারে বসে আছে হেসা। গাঢ় লাল রঙের কারুকাজ করা একটা পোশাক তার পরনে। আগের মতোই মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে খানিয়া আতেন আর তার চাচা, বৃদ্ধ শামান। সব শেষে খান র‍্যাসেন, শুয়ে আছে তার অন্ত্যেষ্টি শয্যায়।

এগিয়ে গিয়ে মাথা নুইয়ে সম্মান জানালাম আমরা। আবরণে ঢাকা মুখটা উঁচু করলো হেসা। আমাদের দিকে চোখ রেখেই অরোসকে বললো, তাহলে নিরাপদেই নিয়ে আসতে পেরেছে ওদের! অতিথিরা, কেমন মনে হচ্ছে হেস-এর সন্তানদের সমাধি গুহা?

আমাদের ধর্মে নরক বলে একটা জায়গার কথা বলা হয়েছে, জবাব দিলো লিও, আমার ধারণা সেটা এমনই দেখতে।

না, না, নরক বলে কিছু নেই, বললো হেসা। ওগুলো সব মন গড়া কথা। লিও ভিনসি, নরক বলে সত্যিই যদি কিছু থেকে থাকে তা আছে এই পৃথিবীতেই, এখানে। হাত দিয়ে বুকের ওপর টোকা দিলো সে। আবার স্কুলে পড়লো তার মুখ, গভীর ভাবে কিছু যেন ভাবছে।

বেশ কিছুক্ষণ ওভাবে রইলো সে। তারপর আমার মুখ তুললো।

মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। অনেক কাজ, অনেক ভোগান্তি সামনে, সব ভোরের আগে শেষ করতে হবে। হ্যাঁ, আঁধার সরিয়ে আলো আনতে হবে, নয়তো আলো সরিয়ে অনন্ত অন্ধকার।

 রাজকীয় নারী, আতেনকে সম্বোধন করে বলে চললো হেসা, মৃত স্বামীকে নিয়ে এসেছো তুমি। পবিত্র আগুনে সমাহিত হওয়ার অধিকার আছে ওর। কিন্তু তার আগে, অরোস, আমার পূজারী, অভিযোগকারী আর পক্ষ সমর্থনকারী–দুজনকে ডাকো; খাতা খুলতে বলো।

মৃত্যু সভার কাজ শুরু হচ্ছে!

.

১৫.

মাথা নুইয়ে চলে গেল অরোস। হেসা ইশারায় তার ডান পাশে গিয়ে দাঁড়াতে বললো আমাদের, আতেনকে বাঁ পাশে। একটু পরেই দুপাশ থেকে পূজারী পূজারিনীর দুটো দল ঢুকলো ঘরে। সংখ্যায় প্রায় পঞ্চাশ জন। মস্তকাবরণ প্রত্যেকের মাথায়। দেয়ালের কোল ঘেঁষে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল তারা। তারপর ঢুকলো কালো আলখাল্লা পরা দুটো মূর্তি, মুখে মুখোশ আঁটা, হাতে একটা করে পার্চমেন্টের বাঁধানো খাতা। মৃতদেহের দুপাশে দাঁড়ালো তারা। আর অবোস পায়ের কাছে, হেসার দিকে মুখ।

হাতের সিসট্রামটা উঁচু করলো হেসা। অনুগত ভৃত্যের মতো কথা বলে উঠলো অবোস–

খাতা খোলা হোক।

মৃতদেহের ডান পাশে দাঁড়ানো অভিযোগকারী সীলমোহর ভেঙে খাতা খুলে পড়তে শুরু করলো। মৃত মানুষটার পাপের বিবরণী লেখা তাতে। জন্ম থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যত দুষ্কর্ম করেছে র‍্যাসেন তার ফিরিস্তি দিয়ে গেল কালো পোশাক পরা, মুখে মুখোশ আঁটা লোকটা।

আশ্চর্য হয়ে শুনলাম আমি। জন্মের পরমুহূর্ত থেকে লোকটার ওপর কিভাবে নজর রাখা হয়েছে বুঝতে পেরে বিস্ময়ে থ হয়ে গেলাম। সবশেষে আমাদের হত্যা করার জন্যে কি ভাবে মরণ-শ্বাপদ নিয়ে তাড়া করেছিলো খান তা পড়লো লোকটা। তারপর খাতা বন্ধ করে মাটিতে রাখতে রাখতে বললো–

এই হলো বিবরণ। এবার, মা, আপনার প্রজ্ঞা দিয়ে বিচার করুন। 

কোনো কথা বললো না হেসা। সিসট্রাম উঁচু করে পক্ষ সমর্থনকারীকে ইশারা করলো। খাতার সীলমোহর ভেঙে পড়তে শুরু করলো সে।

মৃত খান জীবনে কি কি ভালো কাজ করেছে তার বিবরণ দিয়ে গেল লোকটা। খারাপ কাজ যেগুলো করেছে কেন করেছে তারও ব্যাখ্যা দিলো। স্ত্রী কিভাবে তাকে প্রতারিত করেছে, কিভাবে মদে ওষুধ মিশিয়ে পাগল করা হয়েছে সব।

পড়া শেষ করে সমর্থনকারীও খাতাটা মাটিতে নামিয়ে রাখলো। বললো—

এই হলো বিবরণ। এবার, মা, আপনার প্রজ্ঞা দিয়ে বিচার করুন।

এতক্ষণ শান্ত, নিরাবেগ মুখে শুনেছে খানিয়া এবার সামনে এগিয়ে গেল কথা বলার জন্যে। পেছন পেছন গেল তার চাচা শামান সিমব্রি। কিন্তু আতেনের মুখ থেকে একটা কথাও বেরোনোর সুযোগ দিলো না হেসা। সিসট্রাম তুলে নিষেধ করলো। বললো

উঁহুঁ, তোমার বিচারের দিন এখনও আসেনি। যখন আসবে তোমার পক্ষ সমর্থনকারী তোমার হয়ে বলবে যা বলার।

ঠিক আছে, ঝাঝ মেশানো গলায় বলে পেছনে সরে এলো আতেন।

এবার পূজারী-প্রধান অরোসের পালা। মা, শুরু করলো সে, আপনি সব শুনেছেন। এবার আপনার প্রজ্ঞা, আপনার জ্ঞান দিয়ে বিশ্লেষণ করে রায় দিন; পা নিচে দিয়ে আগুনে যাবে র‍্যাসেন, যাতে আবার ও জীবনের পথে হাঁটতে পারে; নাকি মাথা নিচে দিয়ে যাবে, যার অর্থ চিরতরেই মারা গেছে ও?

নীরবতা। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সবাই। অবশেষে রায় দিলো হেসা।

আমি শুনেছি, চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছি, কিন্তু বিচার করার সাধ্য আমার নেই। যে মহাশক্তি ওকে ঠেলে দিয়েছে সামনে, আবার যার কাছে ও ফিরে গেছে। সে-ই ওর বিচার করবে। মৃত লোকটা পাপ করেছে, সন্দেহ নেই, গুরুতর পাপ। করেছে, কিন্তু ওর বিরুদ্ধে করা হয়েছে আরও গুরুতর পাপ। সুতরাং, পা নিচের দিকে দিয়েই ওকে সমাহিত করবে, যাতে নির্ধারিত সময়ে আবার ও ফিরে আসতে পারে এই পৃথিবীতে।

এবার অভিযোগকারী মাটি থেকে অভিযোগের খাতা তুলে নিয়ে এগোলো সামনের দিকে। মঞ্চের কিনারে গিয়ে খাতাটা ফেলে দিলো নিচে অগ্নিগিরির জ্বালামুখের ভেতর, এবং ঘুরে দাঁড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। এর অর্থ র‍্যাসেন নামের লোকটার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মুছে দেয়া হলো। অন্যদিকে সমর্থনকারীও তুলে নিলো তার খাতা। সবিনয়ে তুলে দিলো পূজারী-প্রধানের হাতে। মন্দিরের সংগ্রহশালায় অনন্তকালের জন্যে সংরক্ষিত থাকবে ওটা। পূজারীরা অন্ত্যেষ্টি সঙ্গীত শুরু করলো এবার। সমবেত কণ্ঠের করুণ মূর্ছনায় পূর্ণ হয়ে উঠলো ঘরটা।

শেষ হলো সঙ্গীত। ধীর পায়ে এগিয়ে এলে কয়েকজন পুরোহিত। শববাহী খাঁটিয়া তুলে নিয়ে চলে গেল কিনারে। ঘাড় ফিরিয়ে মায়ের দিকে তাকালো তারা। হাতের দণ্ড তুলে সঙ্কেত দিলো হেসা! পা নিচের দিকে দিয়ে ফেলে দেয়া হলো র‍্যাসেনের মৃতদেহ। সব কজন ঝুঁকে তাকালো নিচে। যতক্ষণ না ওটা টগবগে লাভার সরোবরে ডুবে গেল ততক্ষণ তাকিয়ে রইলো।

.

সময় হয়েছে। নিঃশব্দে মাথা নিচু করে বসে আছে হেসা তার প্রস্তর সিংহাসনে। সে-ও জানে সময় হয়েছে। এবার সব রহস্যের সমাধান হবে।

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মুখ তুললো সে। সিস্ট্রাম নেড়ে ইশারা করে একটা কি দুটো কথা বললো। যেমন এসেছিলো তেমনি সারিবদ্ধভাবে বিদায় নিলো পূজারী-পূজারিনীরা। দুজন মাত্র রইলো, অবোস আর অপূর্ব চেহারার এক পূজারিনী, নাম পাপাভ। পূজারিনীদের প্রধান সে।

তোমরা শোনো, শুরু করলো হেসা, বড় কিছু ঘটনা ঘটবে, এখন। এই বিদেশীদের আগমনের সাথে সম্পর্ক আছে তার। তোমরা জানো, দীর্ঘদিন ধরে আমি এক বিদেশীর আসার অপেক্ষায় আছি। সে এসেছে। এই দুই বিদেশীরই একজন। এখন কি ঘটবে আমি বলতে পারি না। অনেক ক্ষমতা আমার, হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই। কিন্তু একটা শক্তি থেকে আমাকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যৎ দর্শনের ক্ষমতা আমার নেই। সুতরাং একটু পরেই যে কি ঘটবে তা অনুমান করারও সাধ্য আমার নেই। হয়তো-হয়তো শিগগিরই শূন্য হয়ে যাবে এই সিংহাসন, অনন্ত অ গুনের খোরাক হবে আমার দেহ। না, মন খারাপ কোরো না, মন খারাপ কর কছু নেই, কারণ আমি মরবো না। যদি মরিও আমার আত্মা ফিরে আসবে আবার।

মন দিয়ে শোনো, পাপা, তুমিই একমাত্র রক্ত মাংসের মানুষ যার সামনে আমি জ্ঞানের সকল দুয়ার খুলে দিয়েছি। একটু পরে, বা কখনও যদি আমাকে চলে যেতে হয় তুমিই গ্রহণ করবে এই সুপ্রাচীন ক্ষমতার দণ্ড; পূরণ করবে আমার শূন্যস্থান। তোমাকে আমি আরও নির্দেশ দিচ্ছি, এবং তোমাকেও, অবোস, আমাকে যদি চলে যেতেই হয় অত্যন্ত যত্নের সাথে এই বিদেশীদের পৌঁছে দিয়ে আসবে এদেশের বাইরে। হ্যাঁ, কোনোরকম কষ্ট যেন না হয় ওদের। যে পথে ওরা এসেছে সে পথে বা উত্তরের পাহাড়শ্রেণী ডিঙিয়ে–যেদিক দিয়ে সুবিধা মনে করো, বা ওরা যেতে চায়, দিয়ে আসবে। খানিয়া আতেন যদি ওদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওদের আটকে রাখতে চায়, বা দেরি করিয়ে দিতে চায়, উপজাতীয়দের আমার নাম করে বলবে, যেন লড়াইয়ে নামে। দখল করে নেবে ওর রাজ্য। শুনেছো?

শুনেছি, মা, আপনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে, এক স্বরে জবাব দিলো অরোস আর পাপাভ।

এখানেই ইতি হলো ব্যাপারটার। এবার খনিয়ার দিকে ফিরলো হেসা।

আতেন কাল রাতে তুমি আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলে, লিওর দিকে ইশারা করলো সে, কেন এই লোকটাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তোমার মনে প্রেম জাগলো। জবাব খুব সোজা। ওর মতো পুরুষকে দেখে কোন নারীর বুকে ভালোবাসা না জাগবে? তুমি আরও বলেছিলে, তোমার হৃদয় এবং তোমার চাচার ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা নাকি কি বলেছে তোমাকে। তাহলে অতীতের পর্দা এবার উন্মোচন করতে হয়।

নারী, সময় হয়েছে, আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো। না, তুমি আদেশ করেছে সেজন্যে নয়, আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই। শুরুর কথা আমি কিছু বলতে পারবো না, কারণ আমি মানুষ, দেবী নই। আমি জানি না আমরা তিনজন কেন নিয়তির এ খেলায় জড়িয়ে গেলাম, জানি না কোথায় এর শেষ। সুতরাং যেখান থেকে আমার স্মৃতিতে আছে সেখান থেকেই শুরু করছি।

থামলো হেসা। কেঁপে উঠলো তার শরীর যেন প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে দমন করছে উদগত আবেগ। তারপর হঠাৎ দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে চিঙ্কার করে উঠলো, পেছনে তাকাও!

ঘুরে দাঁড়ালাম আমরা। প্রথমে কিছুই দেখতে পেলাম না। আগ্নেয়গিরির গর্ভ থেকে উঠে আসা আগুন কেবল পর্দার মতো ভাসছে সামনে। কিন্তু একটু পরেই দেখলাম, সেই লাল পর্দার গভীর থেকে যেন উঠে আসছে একটা কিছু। অস্পষ্ট। কিন্তু ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। কি আশ্চর্য! একটা ছবি! একেবারে জীবন্ত মনে হচ্ছে।

প্রশস্ত এক নদীর তীর। বালুকাবেলায় একটা মন্দির। মিসরীয় ঢংয়ের দেয়াল ঘেরা উঠানে পূজারীদের মিছিল। আসা যাওয়া। ফাঁকা হয়ে গেল উঠানটা। তারপরই দেখলাম, বাজপাখির ডানার ছায়া পড়লো সেই সূর্যালোকিত উঠানে। মাথা কামানো, খালি পা, পুরোহিতের সাদা আলখাল্লা পরা এক লোক এগিয়ে এলো দক্ষিণ পাশের একটা দরজা দিয়ে ঢুকলো উঠানে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল গ্রানাইটের তৈরি একটা বেদীর দিকে। বেদীর ওপর বসে আছে মিসরীয় ধাচের মুকুট পরা এক নারীপ্রতিমা। পবিত্র সিসট্রাম প্রতিমার হাতে। হঠাৎ যেন কিছু একটা শব্দ শুনে থেমে দাঁড়ালো পুরোহিত। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো আমাদের দিকে। কিন্তু, ও ঈশ্বর! এ কে? এ যে দেখছি লিও ভিনসি! যৌবনে ঠিক এমন। ছিলো ওর চেহারা। কোর-এর গুহায় মৃত ক্যালিক্রেটিসের যে চেহারা দেখেছিলাম তার সঙ্গেও হুবহু মিলে যায় এই পুরোহিতের চেহারা!

দেখ, দেখ! আমার হাত আঁকড়ে ধরে ঢোক গিলে বললো লিও। জবাবে আমি মাথা ঝাকালাম শুধু।

আবার হেঁটে চললো লোকটা। প্রতিমার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো। দুহাতে পা জড়িয়ে ধরে প্রার্থনা করলো। এর পরই মন্দিরের সবগুলো দরজা খুলে। গেল এক সাথে। একটা মিছিল ঢুকলো। পুরোভাগে মুখ ঢাকা এক মহিলা। পোশাক-আশাক প্রমাণ করছে মহিলা সম্ভ্রান্ত ঘরের। বেদীর পায়ে অর্ঘ্য নিবেদন করতে এসেছে। প্রতিমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলো সে। হাতের জিনিসপত্রগুলো নামিয়ে রাখলো তারপর উঠে দাঁড়ালো। চলে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় একটা হাত বুলিয়ে দিয়ে গেল পুরোহিতের হাতে। এক মুহূর্ত ইতস্তত করে রমণীর পেছন পেছন চললো পুরোহিত।

খুব ধীরে হাঁটছে রমণী। তার সঙ্গীরা এগিয়ে গেল উঠানের ফটক পেরিয়ে। এতক্ষণে উঠানের প্রান্তে এলো রমণী। ফটক না পেরিয়ে দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে পড়লো। পুরোহিতও এসে দাঁড়ালো। ফিসফিস করে তাকে কিছু বললো রমণী, হাত তুলে ইশারা করলো নদীর দিকে। বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠলো পুরোহিতের মুখে। প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলো রমণীর কথার। চকিতে একবার চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো রমণী, ক্রন্ত হাতে সরিয়ে আনলো মুখের কাপড়। তারপর বুকলো পুরোহিতের দিকে। মিলে গেল ওদের দুজোড়া ঠোঁট।

আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না রমণী। ফটক পেরিয়ে ছুটলো। তার আগে আমাদের দিকে ফিরলো একবার ওর মুখ। এবং—কি আশ্চর্য! হ্যাঁ, মুখটা আতেনের। কালো চুলের মাঝ থেকে মণি-মুক্তা খচিত সোনার ঝিলিক। পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে হাসলো একবার রমণী–ঘোর লাগা হাসি। অস্তায়মান সূর্য আর নদীর দিকে ইশারা করলো আবার। তারপর চলে গেল সে।

আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে বহু বহু দিন আগের সেই হাসির প্রতিধ্বনি করলো আতেন। ঠিক তেমনি ঘোর লাগা হাসি হেসে চিৎকার করে উঠলো বুড়ো শামানের উদ্দেশ্যে–

ঠিকই অনুভব করেছিলো আমার হৃদয়! দেখ অতীতে কি করে আমি জিতে নিয়েছিলাম ওকে।

ঠিক তক্ষুণি আগুনে বরফ পড়লো যেন। শীতল কণ্ঠে বলে উঠলো হেসা, থামো, এখন দেখ, অতীতে কি করে তুমি হারিয়েছিলে ওকে।

আমরাও দেখলাম।

বদলে গেছে দৃশ্য। সুন্দর একটা দেহ শুয়ে আছে মনোরম পালঙ্কে। স্বপ্ন দেখছে মেয়েটা। ভয় পেয়েছে ও। ওর শরীরের ওপর আবছা ছায়া ছায়া একটা অবয়ব। মন্দিরে বেদীর ওপর দেখা সেই প্রতিমার মতো। কিন্তু এখন তার মুখে রয়েছে শকুনির মুখোশ। চমকে স্বপ্ন থেকে জেগে উঠলো মেয়েটা। চারপাশে তাকালো। মুখটা আয়শার মুখের মতো। কোর-এর গুহায় প্রথম যেদিন মুখের কাপড় সরিয়েছিলো সেদিন যেমন দেখেছিলাম ঠিক তেমন।

আবার ঘুমিয়ে গেল সে। ভয়ানক মূর্তিটা আবার ঝুঁকে পড়লো তার ওপর। ফিসফিস করে কানে কানে কিছু বললো। পরমুহূর্তে আরেকটা দৃশ্য ভেসে উঠলো। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরে একটা নৌকা। নৌকার মার্কার ওপর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে সেই পুরোহিত আর রাজকীয় নারী। হঠাৎ দেখা গেল মূর্তিমান প্রতিশোধের মতো তাদের ওপর দিয়ে ডানা মেলে আসছে এক গলাছিলা শকুনি। একটু আগে দেবীর মুখে যেমন মুখোশ দেখেছি তেমন।

ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে গেল ছবিটা। দুপুরের আকাশের মতো শূন্য হয়ে গেল আগুনের পর্দা। তারপর আরেকটা দৃশ্য। প্রথমে বিরাট, মসৃণ দেয়ালওয়ালা একটা গুহা, বালির মেঝে, দেখা মাত্র চিনতে পারলাম আমরা। বালির ওপর পড়ে আছে সেই পুরোহিত। মৃত। এখন আর কামানো নয়, ঝাকড়া সোনালী চুল তার মাথায়। চোখ দুটো চেয়ে আছে ওপরে, জ্বল জ্বল করছে। সাদা, গায়ে ছোপ ছোপ রক্ত। তার পাশে দাঁড়িয়ে দুই নারী। একজন সম্পূর্ণ নগ্ন, দীর্ঘ চুলের রাশি কাঁধ পিঠ ছাড়িয়ে নেমে এসেছে তার গোড়ালির কাছে। অসম্ভব সুন্দরী সে। যে দেখেনি তার পক্ষে কল্পনা করা দুঃসাধ্য সে সৌন্দর্য। হাতে বর্শা। অন্য নারীর দেহ কালো আলখাল্লায় আবৃত। হাত ছুঁড়ে ছুঁড়ে বিলাপ করছে আর অভিশাপ দিচ্ছে তার প্রতিদ্বন্দীকে। এই দুই নারী আর কেউ নয়, একজন সেই ঘুমন্ত রমণী যার কানের কাছে ফিসফিস করেছিলো ছায়ামূর্তি, অন্যজন সেই মিসরীয় রাজপুরাঙ্গনা, যে মন্দিরফটকের নিচে চুমু খেয়েছিলো পুরোহিতকে।

ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল এ দৃশ্যটাও। হেসা এতক্ষণ সামনে ঝুঁকে ছিলো, এবার হেলান দিয়ে বসলো। এরপর অত্যন্ত দ্রুত, টুকরো টুকরো ভাবে এলো, গেল অনেকগুলো ছবি। বন, মানুষের দল, বিশাল বিশাল গুহা, সে সব গুহায় অনেক মানুষ; আমাদের মুখও দেখলাম তাদের ভেতর, হতভাগ্য জব, বিলালী, সেনাবাহিনী কুচকাওয়াজ করছে, বিশাল যুদ্ধক্ষেত্র, রক্তাক্ত লাশ…আরও অনেক কিছু। এই ছবিগুলোও মিলিয়ে গেল এক সময়। আগুনের আয়না আবার শূন্য।

আতেন, তোমার প্রশ্নের জবাব পেয়েছো? নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো হেসা।

স্বীকার করছি, মা, অদ্ভুত কিছু দৃশ্য দেখলাম। কিন্তু কি করে বুঝবো এর ভেতরে কোনো কারসাজি নেই। আপনার যাদুর প্রভাবে মূর্ত হয়ে উঠছে না এসব?

তাহলে শোনো, ক্লান্ত কণ্ঠে শুরু করলো আয়শা, অনেক অনেক যুগ আগে, তখন সবে শুরু হয়েছে আমার এ পর্যায়ের জীবন, নীলনদের তীরে বেহবিত-এ ছিলো মিসরের মহান দেবী আইসিসের মন্দির। এখন তা ধ্বংসস্তূপ। মিসর থেকে চলে গেছেন আইসিস। অবশ্য তার কর্তৃত্ব এখনও পুরোমাত্রায়ই আছে সেখানে, সারা পৃথিবীতেই আছে, কারণ তিনিই প্রকৃতি। সেই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ছিলো ক্যালিফ্রেটিস নামের এক গ্রীক। দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে সে পুরোহিতের ব্ৰত গ্রহণ করে। শপথ নেয়, আজীবন দেবীর সেবা করে যাবে।

একটু আগে যে পুরোহিতকে দেখলে সে-ই সে। আর এখানে, তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পুনর্জন্ম নেয়া ক্যালিক্রেটিস।

সে সময়কার মিসরের ফারাওয়ের এক মেয়ে ছিলো, নাম আমেনার্তাস। সে প্রেমে পড়ে এই ক্যালিক্রেটিসের। যাদুবিদ্যার চর্চা করতো আমেনার্তাস। যাদুর প্রভাবে সে ক্যালিক্রেটিসকে বাধ্য করে ব্রত ভঙ্গ করে তার সাথে পালিয়ে যেতে। তুমি, আতেন, ছিলে সেই আমেনার্তাস।

সব শেষে, সেখানে বাস করতো এক আরবীয় কন্যা, নাম আয়শা। বুদ্ধিমতি, সুন্দরী এক নারী। সে তার হৃদয়ের শূন্যতা আর জ্ঞানের বেদনা নিয়ে আশ্রয় খুঁজেছিলো বিশ্বমায়ের চরণে, ভেবেছিলো প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করবে, যে জ্ঞান কখনোই তার ভেতর থেকে লুপ্ত হয়ে যাবে না। সেই আয়শাকে, যেমন তোমরা দেখলে, স্বপ্নে আদেশ দিলেন দেবী, অবিশ্বাসীদের পেছন পেছন গিয়ে স্বর্গের প্রতিশোধ কার্যকর করে আসতে হবে। প্রতিশ্রুতি দিলেন, সাফল্য লাভ করলে দেবেন মরণ জয় করার ক্ষমতা আর এমন সৌন্দর্য যা পৃথিবীর কোনো নারীতে কেউ দেখেনি।

রওনা হয়ে গেল সে। অনেক অনেক পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছুলো এমন এক জায়গায় যেখানে ঘুরতে ঘুরতে হাজির হবে সেই অবিশ্বাসীরা—ক্যালিক্রেটিস আর আমেনার্তাস। সেখানে নুট নামের মহাজ্ঞানী এক ঋষির সাথে সাক্ষাৎ হলো তার। আয়শাকে সাহায্য করার জন্যে মা-ই নিযুক্ত করেছিলেন তাকে—তুমি, ও হলি, তুমিই ছিলে সেই নুট। অবিশ্বাসীদের জন্যে যখন অপেক্ষা করছে তখন মুটের কাছে আয়শা জানতে পারে অনন্ত জীবনের সৌরভ ঘূর্ণায়মান অগ্নিস্তম্ভের কথা। সেই আগুনে স্নান করলে অনন্ত সৌন্দর্য আর অমর যৌবন লাভ করে মানুষ।

অবশেষে অবিশ্বাসীরা এলো। তারপর, কি আশ্চর্য! জীবনে কখনও যে ভালোবাসেনি, ভালোবাসা কাকে বলে জানেনি, জানার চেষ্টা করেনি, সেই আয়শা দেখামাত্র কামনা করে বসলো ক্যালিক্রেটিসকে। ওদের প্রাণের আগুনের কাছে নিয়ে গেল সে, ইচ্ছা ক্যালিক্রেটিসকে আর নিজেকে অমরত্বের আবরণে জড়িয়ে নেবে। কিন্তু অন্যভাবে নির্ধারিত হয়ে ছিলো ওদের নিয়তি। দেবীর প্রতিশ্রুতি মতো অনন্ত জীবন পেলো আয়শা-কেবল আয়শা, এবং তারই হাতে প্রাণ ত্যাগ করলো তার দয়িত ক্যালিক্রেটিস।

এভাবেই দেবীর ক্রোধ পরিণতি পেলো। আয়শা অনন্ত জীবন, যৌবন নিয়ে পড়ে রইলো অনন্ত যাতনা ভোগ করার জন্যে।

দিন গড়িয়ে চললো। যুগের পর যুগ কেটে গেল, পেরিয়ে গেল শতাব্দীর পর শতাব্দী। অমর আয়শা কিন্তু তখনও অপেক্ষা করছে, পুনর্জন্ম নিয়ে আসবে তার ক্যালিক্রেটিস। অবশেষে এলো সে। কিন্তু দেবীর ক্রোধ প্রশমিত হয়নি। প্রেমিকের চোখের সামনে অপার লজ্জা আর বেদনা নিয়ে ডুবে গেল আয়শা। সুন্দর হয়ে গেল ভয়ঙ্কর কুৎসিক অমর, মনে হলো, মারা গেল।

তবু, ও ক্যালিক্রেটিস, আমি বলছি, সে মরেনি। কোর-এর গুহায় আয়শা শপথ করেনি তোমার কাছে, আবার সে আসবে? তারপর লিও ভিনসি, ক্যালিক্রেটিস, ওর আত্মা কি দেখা দেয়নি তোমার স্বপ্নে? তোমাকে দেখায়নি এই চূড়ায়, ওর কাছে ফিরে আসার পথ?

থামলো হেসা। লিওর দিকে তাকালো, যেন জবাবের অপেক্ষা করছে।

কাহিনির প্রথম অংশ, অর্থাৎ পোড়া মাটির ফলকে যা লেখা ছিলো তার বাইরের যা যা দেখলাম শুনলাম এসব সম্পর্কে আমি কিছু জানি না, বললো লিও। বাকিটুকু সম্পর্কে আমি বা আমরা বলতে পারি, সব সত্যি। এখন আমার প্রশ্ন, আয়শা কোথায়? আপনিই কি আয়শা? তাহলে গলার পর অন্যরকম কেন? তাছাড়া, আয়শা অনেক দীর্ঘাঙ্গী ছিলো। বলুন, আপনার উপাস্য দেবীর দোহাই দিয়ে বলছি, আপনিই কি আয়শা?

হ্যাঁ, আমিই আয়শা, শান্ত অচঞ্চল গলায় হেলা বললো, সেই আয়শা যার কাছে তুমি অনন্তকালের জন্যে সমর্পণ করেছিলে নিজেকে।

মিথ্যে কথা! ও মিথ্যে কথা বলছে! চিৎকার করে উঠলো আতেন। স্বামী, ও-ই না একটু আগে বললো প্রায় বিশ বছর আগে যখন তোমাদের ছাড়াছাড়ি হয় তখন ও যুবতী, সুন্দরী? তাহলে কি করে ও এই মন্দিরের পূজারিনী হলো? আমি জানি একশো বছরের ভেতর এখানে নতুন কোনো পূজারিনীর অভিষেক হয়নি, আর ও যদি কুৎসিত-ই না হবে মুখ দেখাচ্ছে না কেন?

অরোস, মা বললো, খানিয়া যে পূজারিনীর কথা বলছে তার মৃত্যুর কাহিনিটা শোনাও।

মাথা নুইয়ে স্বভাবসুলভ শান্তশ্বরে শুরু করলো পূজারী প্রধান–

আঠারো বছর আগে, এই পাহাড়ে দেবী হেস-এর পূজা শুরু হওয়ার ২৩৩৩-তম বছরের শীতকালে খানিয়া আতেন যে পূজারিনীর কথা বলছেন তিনি মারা গেছেন। আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম, সে সময়। দীর্ঘ একশো আট বছর তিনি দায়িত্ব পালন করে গেছেন, অবশেষে বার্ধক্যজনিত কারণে তার মৃত্যু ঘটে। সে সময় তিনি সিংহাসনে বসে ছিলেন। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী তিন ঘণ্টা পর আমরা তাঁর মৃতদেহ সমাহিত করার জন্যে প্রস্তুত করতে যাই। কিন্তু আশ্চর্য! গিয়ে দেখি, আবার বেঁচে উঠেছেন তিনি, অবশ্য চেহারা আর আগের মতো নেই।

অশুভ কোনো যাদুর খেলা ভেবে পূজারী পূজারিনীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সিংহাসন থেকে বিতাড়িত করার উদ্যোগ নেয়। আর তক্ষুণি প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে পাহাড়, ভীম গর্জনে বজ্র নেমে আসে, মন্দিরে অগ্নিস্তম্ভের আলো নিভে যায়। আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে উঠি। তারপর গভীর অন্ধকারে, বেদীর ওপর যেখানে মায়ের প্রতিমা স্থাপিত সেখান দুইকৈ দেবীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো- ওকে গ্রহণ করো, আমিই ওকে পাঠিয়েছি তোমাদের শাসন করার জন্যে, আমার উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্যে।

মিলিয়ে গেল কণ্ঠস্বর। আলো জ্বলে উঠলো আবার। তখন আমরা হাঁটু গেড়ে বসে আনুগত্য প্রকাশ করলাম নতুন হেসার কাছে; মা হিসেবে স্বীকার করে নিলাম। এই হলো কাহিনি, শুধু আমি নই, শত শত পূজারী পূজারিনী তার সাক্ষী।

শুনলে, আতেন, বললো হেসা। এখনও তোমার সন্দেহ আছে?

হ্যাঁ, দুর্বিনীত গলায় জবাব দিলো খানিয়া। অলরাসের একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না। যা বললো তা যদি মিথ্যা না হয় তা হলে বলবো ও স্বপ্নে দেখেছিলো ওসব, অথবা নিজের কল্পনার রঙে রাঙিয়ে রচনা করেছে। সত্যিই তুমি যদি সেই অনন্ত যৌবনা আয়শা হও, প্রমাণ দাও। এই দুজন অতীতে তোমাকে দেখেছে, এখনও দেখুক। তোমার ঘোমটা খুলে ফেল, ওরা দেখুক, আমিও দেখি, সত্যিই তুমি অনন্ত সৌন্দর্যের আধার। দেখে চোখ জুড়াই। নিশ্চয়ই তোমার প্রেমিক এখনও তোমার মোহ থেকে মুক্তি পায়নি, নিশ্চয়ই তোমাকে দেখেই ও চিনতে পারবে, এবং পদতলে লুটিয়ে পড়ে বলবে, এই তো আমার অমর মানসী, আর কেউ নয়। তার আগে আমি কিছুতেই বিশ্বাস করবে না এসব আজগুবি গল্প।

সামনে পেছনে দুলতে লাগলো হেসা। কাপড়ে ঢাকা রয়েছে বলে তার মুখটা দেখতে পাচ্ছি না, তবু বুঝতে পারছি, গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ পড়েছে মুখে।

ক্যালিক্রেটিস, কাতর কণ্ঠে সে বললো, তোমারও কি তাই ইচ্ছা? যদি হয় তাহলে আমি অবশ্যই তা অপূর্ণ রাখবো না। তবু আমি তোমার কাছে মিনতি করছি, এখনই দেখতে চেয়ো না, এখনও সময় হয়নি, আমার শপথ এখনও পূরণ হয়নি। আমি বদলে গেছি, ক্যালিক্রেটিস, কোর-এর গুহায় যেদিন তোমার কপালে চুমু খেয়েছিলাম, তোমাকে আমার নিজের বলে ঘোষণা করেছিলাম, সেদিন যেমন দেখেছিলে তেমন আর নেই আমি।

হতাশ ভঙ্গিতে চারপাশে তাকালো লিও।

সরাতে বলো, প্রভু, এই সময় চিৎকার করে উঠলো আতেন, ঘোমটা সরাতে বলল। কথা দিচ্ছি, আমি ঈর্ষাকাতর হবো না।

ঠিক, বললো লিও, তা-ই বলবো একে, ভালো হোক মন্দ হোক, আর সহ্য করতে পারছি না এই উৎকণ্ঠা! যতই বদলে থাকুক আমি ওকে চিনতে পারবোই।

পুরুষোচিত কথা, জবাব দিলো হেসা। তোমার মুখেই মানায়, ক্যালিক্রেটিস। অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাই তোমাকে। বেশ, আমি ঘোমটা সরাবো। কিন্তু, হ্যাঁ, তারপর আর আমার হাতে কিছু থাকবে না, তোমাকেই। সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমার আজন্ম প্রতিদ্বন্দী ঐ নারীকে গ্রহণ করবে না আয়শাকে। ইচ্ছে হলেই আমাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারো, কোনো ক্ষতি হবে না তোমার, বরং পাবে পৃথিবীর সব মানুষ যা চায় সেই ক্ষমতা, ধন, প্রেম। কেবল আমার স্মৃতিটুকু উপড়ে ফেলতে হবে তোমার হৃদয় থেকে।

তারপর হেস আমার দিকে ফিরলো। ওহ, হলি, আমার সত্যিকারের বন্ধু, এ ঘটনা, শুরুরও আগে থেকে আমাকে পথ দেখিয়ে আসছে, ওর পরেই আমি সবচেয়ে ভালোবাসি তোমাকে, তুমি ওকে পরামর্শ দাও, সঠিক পরামর্শ। বহু শতাব্দী আগে আমাকে পথ দেখিয়েছিলে, এখন ওকে দেখাও। হ্যাঁ, ও যদি। আমাকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যানই করে, আমরা চলে যাবো, এলোক ছাড়িয়ে। অন্যলোকে, যেখানে সব জাগতিক আবেগ, কামনা; বাসনা অস্পষ্ট হয়ে আসে; অনন্তকাল আমরা বাস করতে থাকবো, পরম গৌরবময় বন্ধুত্ব নিয়ে, কেবল তুমি আর আমি।

জানি তুমি আমার বন্ধুত্ব প্রত্যাখ্যান করবে না, তোমার অন্তর ইস্পাতের মতো কঠিন শুদ্ধ সত্যে পূর্ণ। ছোটখাটো লোভের স্ফুলিঙ্গ তাকে গলাতে পারবে না, বরং পরিণত হবে মরচে ধরা শিকলে, যে শিকল তোমাকে বাঁধার চেষ্টা করে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

ধন্যবাদ, আয়শা, আমি বললাম, এতবড় বিশেষণ আমাকে মানায় কিনা জানি না। তবে এটুকু জানি, আমি তোমার বন্ধু-এর বেশি কিছু হওয়ার কথা কোনোদিন ভাবিনি। আমি জানি, বিশ্বাস করি, তুমিই আমাদের হারানো সে।

কি বলবো ভেবে না পেয়ে এটুকুই শুধু বললাম আমি। অপার আনন্দে পূর্ণ হয়ে গেছে আমার হৃদয়, আয়শা নিজ মুখে বলেছে আমিও তার প্রিয়। এতদিন জানতাম পৃথিবীতে একজনই আমার বন্ধু; আজ জানলাম, আরেকজন আছে। এর চেয়ে বেশি আর কি চাইবে আমি?

.

একটু পিছিয়ে এলাম আমি আর লিও। নিচু স্বরে লিওর মতামত জানতে চাইলাম।

তুমিই ঠিক করো, বললো ও।তোমার সিদ্ধান্তের ফলে যা কিছুই ঘটুক না কেন, তোমাকে দোষ দেবো না, হোরেস, এটুকুই শুধু আমি বলতে পারি।

বেশ। আমি ঠিক করে ফেলেছি, বলে হেসার সামনে এগিয়ে গেলাম। আর অপেক্ষা করতে পারছি না আমরা; যে সত্য জানতেই হবে তা দেরিতে কেন? কেন এখনি নয়? আমাদের ইচ্ছা, হেস, তুমি আমাদের সামনে মুখের আবরণ সরাবে। এখানে এবং এখনি।

বেশ, পূর্ণ হবে তোমাদের ইচ্ছা, মিইয়ে যাওয়া গলায় জবাব দিলো হেসা। আমার কেবল একটাই প্রার্থনা আমাকে একটু করুণা কোরো, বিদ্রূপ কোরো না আমাকে দেখে; যে আগুন আমার হৃদয় দগ্ধ করছে আরেকটু কয়লা দিয়ো না সে আগুনে।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো হেসা। হেঁটে-বলা ভালো টলতে টলতে চলে গেল ছাদহীন ফাঁকা জায়গার প্রায় কিনারে। আর কয়েক পা পরেই আগুনের অতল গহ্বর। ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর, তীক্ষ্ণস্বরে চিৎকার করে উঠলো-এখানে এসো, পাপাভ, খুলে দাও আবরণ!

এগিয়ে গেল পাপাভ, স্পষ্ট ভীতি তার সুন্দর মুখে। কাজ শুরু করলো সে। পাপাভ মেয়েটা খুব লম্বা নয় তবু হেসার পাশে রীতিমতো একটা মিনারের মতো মনে হচ্ছে তাকে।

বাইরের সাদা কাপড়টা ধীরে সাবধানে খুলে আনলো পাপাভ। ভেতরে একই রকম আরেকটা কাপড়। সেটাও সরানো হলো। মমির মতো শীর্ণ একটা মূর্তি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। আরও কমে গেছে যেন ওর উচ্চতা। হাড়ের স্তূপের কাছে যে মূর্তিটা দেখেছিলাম ঠিক সেটার মতো লাগছে এখন ওকে। বুঝলাম আমাদের রহস্যময় পথপ্রদর্শক আর হেসা একই মানুষ।

একটার পর একটা সরু, লম্বা কাপড়ের ফালি খুলে আনছে পাপাভ-ওর শরীর থেকে, মুখ থেকে। এর কি শেষ নেই? কত ছোট হয়ে গেছে কাঠামোটা, আশ্চর্য! পূর্ণ বয়স্কা একজন নারী এত বেঁটে হতে পারে কল্পনাই করা যায় না। ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি বোধ করছি আমি। শেষ ফালিটা খোলা হচ্ছে। কাঠির মতো সরু বাঁকানো দুটো হাত দেখা গেল। তারপর একই রকম দুটো পা।

একটা মাত্র অন্তর্বাস আর শেষ মুখাবরণটা ছাড়া আর কিছু এখন নেই তার শরীরে। হাত নেড়ে পাপাভকে পিছিয়ে যেতে বললো হেসা। কোনোমতে সরে এলো পূজারিনীপ্রধান। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মাটিতে পড়ে রইলো অচেতনের মতো। তীক্ষ্ণ একটা দুর্বোধ্য চিৎকার করে কাঠির মতো হাত দিয়ে মুখের কাপড়টা ধরলো হেসা। হ্যাচকা এক টানে সেটা ছিঁড়ে ফেলে চরম হতাশার ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়ালো আমাদের দিকে মুখ করে।

ওহ! সে-না, আমি তার বর্ণনা দেবো না। দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিনেছি, শেষবার প্রাণের আগুনের কাছে দেখেছিলাম ওকে। এবং আশ্চর্য, তখন আতঙ্কে খেয়াল করতে পারিনি, এখন দেখলাম, সেই মহামহিমাময়ী অপরূপা আয়শার সাথে কোথায় যেন একটু সাদৃশ্য আছে এই অদ্ভুত কুৎসিত বানরের মতো অবয়বটার।

.

ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা মঞ্চে। আমি দেখলাম, লিওর ঠোঁট সাদা হয়ে গেছে, কাঁপছে হাঁটু দুটো। অনেক কষ্টে সামলালো ও নিজেকে। তারপর দাঁড়িয়ে রইলো সোজা, যেন তারে ঝোলানো মৃতদেহ।

আতেনকে দেখলাম, বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদ্বন্দ্বীর পরাভব দেখতে চেয়েছিলো সে, তবু এমন দৃশ্য সম্ভবত স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। কেবল সিমব্রি জ্বর অরোসকে দেখলাম নির্বিকার। আমার ধারণা ওরা আগে থেকেই জানতে কি দেখতে হবে।

নীরবতা ভাঙলো, অরোস। বিড়বিড় করে কি যেন বললো। কিন্তু তার কোনো অর্থ ধরতে পারলো না আমার মস্তিষ্ক। আমার মাথার ভেতরটায় কিসে যেন কামড়াচ্ছে। খালি মনে হচ্ছে কেন মাথাটা ফেটে যাচ্ছে না, তাহলে আরও কিছু শোনার বা দেখার কষ্ট থেকে বেঁচে যেতাম।

আয়শার মমি মুখে প্রথমে সামান্য আশার ছাপ পড়লো। কিন্তু ক্ষণিকের জন্যে। তারপরই তীব্র হতাশা আর যন্ত্রণা সে আশার স্থান দখল করলো।

কিছু একটা করতে হয়, এভাবে আর চলতে পারে না। কিন্তু কে করবে? আমার ঠোঁট দুটো যেন সেঁটে গেছে একটার সাথে অন্যটা, খুলতেই পারছি না তো কথা বলবো কি? পা দুটো যেন পাথরের তৈরি! লিও এখনও তেমন দাঁড়িয়ে পাথরের মূর্তির মতো। পাপাভ তেমনি মাটিতে পড়ে। অরোস আর সিমব্রিও নির্বাক।

ওহ! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আতেন কথা বলছে! মুণ্ডিত মাথা জিনিসটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো সে-তার সমস্ত সৌন্দর্য, নিখুঁত নারীত্ব নিয়ে দাঁড়ালো।

লিও ভিনসি, বা ক্যালিক্রেটিস, বললো আতেন; যে নাম খুশি তুমি নিতে পারো। তুমি হয়তো অত্যন্ত নীচ ভাবব আমাকে, কিন্তু জেনে রাখো, অন্তত প্রতিদ্বন্দীর চরম লজ্জার সময় আমি তাকে বিদ্রূপ করিনি, করতে পারিনি। ও একটা অসম্ভব গল্প শুনিয়েছে আমাদের, সত্যি না মিথ্যে জানি না। আমি নাকি দেবীর এক সেবককে চুরি করে নিয়েছি, তাই দেবী প্রতিশোধ নিয়েছেন আমার কাছ থেকে আমার প্রাণের মানুষকে কেড়ে নিয়ে! বেশ, আমরা মানুষ, অসহায়। আমাদের নিয়ে যত পারেন খেলুন দেবীরা! কিন্তু আমি, যতক্ষণ প্রাণ আছে পরিপূর্ণ আত্মমর্যাদা নিয়ে যা আমার তার ওপর স্বত্ব ঘোষণা করে যাবো।

উপস্থিত এতগুলো লোকের সামনে বলতে লজ্জা পাচ্ছি না, আমি তোমাকে ভালোবাসি। এবং সম্ভবত এই মহিলাও-বা দেবী যা-ই বলল, ভালোবাসে তোমাকে। এবং একটু আগে ও বলেছেজমাদের দুজনের ভেতর থেকে একজনকে তোমার বেছে নিতে হবে। বলেছে, ও যার প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে দাবি করছে আমি সেই আইসিসের কাছে পাপ করেছি। কিন্তু ও কি করছে? ও তো একজন স্বর্গের দেবী আর একজন মর্তের মানবী—দুজনের কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নিতে চাই। আমি যদি পাপী হই ও দ্বিগুণ পাপী নয়?

অতএব বেছে নাও, লিও ভিনসি, এবং এখানেই চুকে যাক সব। নিজের সম্পর্কে আর কিছু বলতে চাই না আমি। তুমি জানো আমি কে, কি দিতে পারি তোমাকে। অতীত, সে তো স্বপ্ন, স্মৃতি। সহজেই মুছে ফেলা যায় মন থেকে। বর্তমান নিয়ে ভাবো। তুমি কাকে নেবে, আমাকে না ওকে?

নিঃশব্দে শুনলো আয়শা। একটা কথাও বললো না। এমন কি হাতটা পর্যন্ত নাড়লো না!

লিওর ফ্যাকাসে মুখটা দেখলাম। একটু যেন আতেনের দিকে ঝুকলো। তারপর আচমকা সোজা হলো আবার। মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অদ্ভুত এক আলো যেন জ্বলে উঠেছে ওর মুখে।

যত যা-ই হোক, যেন কথা বলছে না, সশব্দে চিন্তা করছে লিও। যত যা-ই হোক, অতীত হলো স্বপ্ন। এমন এক স্বপ্ন যার সাথে কোনোই সম্পর্ক নেই আমার। বর্তমান নিয়ে ভাবতে হবে আমাকে। আয়শা দুহাজার বছর ধরে অপেক্ষা করেছে আমার জন্যে; আর আতেন ক্ষমতার লোভে বিয়ে করেছে এমন এক লোককে যাকে সে ঘৃণা করে, পরে বিষ খাইয়েছে বেচারাকে। আমাকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে উঠলে আমাকেও যে বিষ খাওয়াবে না এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে? আমেনার্তাসের কাছে কি শপথ করেছিলাম আমার মনে নেই, অমন কোনো নারী আদৌ ছিলো কিনা তা-ই জানি না। কিন্তু আয়শার কাছে কি শপথ করেছিলাম মনে আছে। এ জীবনেই করেছিলাম। এখন যদি তা ভঙ্গ করি মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে আমার জীবন। আমি হয়ে যাব প্রবঞ্চক। প্রেম কি বয়সের স্পর্শে মিলিয়ে যেতে পারে?

না, আয়শা কি ছিলো স্মরণ করে, কি হতে পারে কল্পনা ও আশা করে, এখনকার আয়শাকে আমি গ্রহণ করছি।

এগিয়ে গিয়ে ভয়ঙ্কর মূর্তিটার সামনে দাঁড়ালো লিও। ঝুঁকে চুমু খেলো তার কপালে।

হ্যাঁ, ও চুমু খেলো সহস্র কুঞ্চনে সংকুচিত জিনিসটাকে। মূর্তিমান আতঙ্কটাকে। আমার মনে হয় সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ যত ভয়ঙ্কর দুঃসাহসিক কাজ করেছে তার একটা হিসেবে গণ্য হতে পারে লিওর এ কাজটা।

বেশ, লিও ভিনসি, বললো আতেন, অদ্ভুদ শান্ত, শীতল তার গলা, তোমার বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে তুমি বেছে নিয়েছে। আমার কিছু বলবার নেই। তোমাকে হারানোর বেদনা আমি বয়ে বেড়াবো সারাজীবন। তোমার—তোমার বধূকে গ্রহণ করো, আমি যাই।

এবারও কিছু বললো না আয়শা। একই রকম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর তার হাড়সর্বস্ব হাঁটু মাটিতে ঠেকিয়ে বসলো। উচ্চকণ্ঠে প্রার্থনা করতে লাগল—ও সর্বশক্তিমান ইচ্ছার প্রতিনিধি, তুমি শেষ বিচারের ক্ষুরধার তরবারি, প্রকৃতি নামের অলঙ্ঘনীয় আইন; মিসরীয়রা তোমাকে অভিষিক্ত করেছিলো আইসিস নামে; তুমি মায়ের বুকে সন্তান দাও, মৃতকে দাও জীবন, প্রাণবানকে করো মৃত; তুমি সুজলা সুফলা করেছো ধরিত্রীকে; তোমার মৃদু হাসি বসন্ত, অট্টহাসি সাগরের ঝঞা, ঘুম শীতের রাত্রি; হতভাগিনী সন্তানের সবিনয় প্রার্থনা শোনো:

এক সময় তুমি আমাকে তোমার নিজের শক্তি, অমর জীবন আর অনন্ত সৌন্দর্য দিয়েছিলে। কিন্তু আমি হতভাগিনী, এই মহার্ঘ প্রাপ্তির মূল্য দিতে পারিনি, গুরুতর পাপ করেছি তোমার কাছে, এবং সেই পাপের প্রতিফল ভোগ করছি শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাণান্তকর নিঃসঙ্গতায় কাটিয়ে। অবশেষে আমার প্রেমিকের সামনে আমার সৌন্দর্য তুমি কেড়ে নিলে, ড্রিপের পাত্রে পরিণত করলে আমাকে। তোমার নিঃশ্বাসের যে সৌরভ আমাকে আলো দিয়েছিলো তা-ই নিয়ে এলো নিঃসীম আঁধার। তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, আমি কখনও মরবো না, কিন্তু এই কুৎসিত কদাকার চেহারা নিয়ে, প্রেমিকের উপহাসের পাত্র হয়ে অনন্ত কাল বেঁচে থেকে কি লাভ? আমাকে আরেকবার সুযোগ দাও, মা, আর একটি বারের জন্যে আমাকে তুলতে দাও আমার অনন্ত সৌন্দর্যের হারানো ফুলটি। মহামহিমাময়ী মা, তোমার চরণে এই আমার প্রার্থনা। প্রেমিকের অকৃত্রিম প্রেমের কথা বিবেচনা করে আমার পাপ ক্ষমা করো। নয়তো তোমার পরম শান্তিদায়ক প্রসাদ-মৃত্যু দাও আমাকে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *