১১. জিলবোয়ার জংলিরা

জিলবোয়ার জংলিরা

সত্যি বলতে, ডাঙায় পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে কেমন অদ্ভুত একটা মুক্তির আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো আমার মধ্যে। আসলে নটিলাস-এ যে কখনো কষ্টে ছিলুম তা নয় বরং কোনো রকম অস্বাচ্ছন্দ্যেরই অবকাশ ছিলো না সেখানে। যখনই যা। চাই, তৎক্ষণাৎ তা হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। এমনকী ক্যাপ্টেন নেমোর বিরাট গ্রন্থাগারে আমার পড়াশোনার কোনো অসুবিধে হতো না। উপরন্তু নটিলাস,-এর কাচের জানলা দিয়ে এই আশ্চর্য সিন্ধুতলের অভিজ্ঞতা হয়েছিলো আমার, পৃথিবীর অন্য কোনো বিজ্ঞান সাবকের যে-সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু সব সতেও শক্ত মাটিতে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারছিলুম আসলে আমরা ডাঙারই জীব–সম্পূর্ণভাবে পারিপার্শ্বিকের ক্রীতদাস। অথচ আমরা মাত্র দু-মাস ধরে নটিলাস-এর যাত্রী হিশেবে সিন্ধুতলে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

আমাদের অভিযান তাই আনন্দে ও উৎসাহে ভরে গেলো। নেডের ফুর্তি আর উৎসাহের তো আর শেষ নেই। তার নাকি মাছ খেয়ে-খেয়ে অরুচি ধরে গেছে; ডাঙার জগতের পশুপক্ষীর মাংস ভক্ষণ না করা অবধি তার মুখে নাকি আর কখনোই রুচি ফিরবে না। তাই টো-টো করে বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়ালুম আমরা শিকারের উদ্দেশ্যে। রাত্রে সমুদ্রের তীরে বসে মাংস পুড়িয়ে আর চেনা-অচেনা সুস্বাদু ফলে আমাদের নৈশভোজ সাঙ্গ হলো। কাছেই আমাদের নৌকো বাধা; একটু দূরে নটিলাস কোনো মস্ত পাথরের মতো সমুদ্রের উপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নেড ল্যাণ্ডের প্রচণ্ড ফুর্তি আমাদের নৈশভেজকে আরো চঞ্চল ও আনন্দময় করে তুললো। তার তৃপ্তি এইখানেই সবচেয়ে বেশি যে নটিলাস-এর নরাধমেরা কিছুতেই এই উপাদেয় খাদ্যের আস্বাদ পাচ্ছে না।

দ্বিতীয় দিনও সন্ধ্যার পরে দ্বীপের উপকূলে আমাদের সৈশভোজ সাঙ্গ হলো। আর খেতে-খেতে এই প্রথম আমি কোনসাইলের মুখে তার গোপন ইচ্ছার প্রকাশ শুনতে পেলুম, আহা! আজ সন্ধ্যায় যদি ওই নটিলাস-এ ফিরতে না-হতো।

যদি কোনোদিনই না-ফিরি, নেড ল্যাণ্ড যোগ করে দিলে। কিন্তু তার কথা শেষ হবার আগেই আচম্বিতে আমাদের পায়ের কাছে একটা মস্ত পাথর এসে পড়লো। সচমকে জঙ্গলের দিকে তাকালুম আমরা।

আকাশ থেকে তো আর পাথর পড়ে না, কোনসাইল বললে, অন্তত উল্কা নাহলে। বলে কোম্পাইল তার হাতের পায়রার ঠ্যাংটায় কামড় বসাতে যাবে, এমন সময় দ্বিতীয় আরেকটা পাথর এসে পড়লো—পড়লো ঠিক তার হাতেই, এবং পায়রার ঠ্যাংটা তার হাত থেকে বশে পড়ে গেলো।

তিনজনেই উঠে দাঁড়িয়ে বন্দুক তুলে ধরলুম; কেউ কোনো আক্রমণ করলে তাকে সমুচিত উত্তর দিতে হবে।

বাঁদরের কাণ্ড নয় তো? নেড ল্যাণ্ড জিগেস করলো।

বনমানুষই বটে, কোনসাইল বললে, তবে তাদের জংলি বলা হয়।

নৌকোয়–শিগগিরি নৌকোয় চলো। বলেই দৌড়োতে লাগলুম আমি। এ-সব দ্বীপে সে চতুষ্পদ শ্বাপদের চেয়ে দ্বিপদ নারখাদকের ভয়ই বেশি, তা আমার জানা ছিলো।

তৎক্ষণাৎ গাছপালার আড়াল থেকে তীরধনুক নিয়ে জনাকুড়ি জংলির আবির্ভাব ঘটলো। আমরা যেখানে বসে নৈশভোজ সারছিলুম, নৌকোটা সেখান থেকে প্রায় ষাট ফিট দূরে বাঁধা ছিলো। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলুম আমরা নৌকো লক্ষ্য করে। নেড কিন্তু এই বিষম বিপদের মধ্যেও তার ফলমূল আর মাংসের সংগ্রহ আনতে ভুললো না। আরো কয়েকটা ঢিল এসে পড়লো আশেপাশে। ঝপাঝপ করে দাড় টেনে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নটিলাস-এ পৌঁছে গেলুম।

নটিলাস-এ পৌঁছেই আমি সেলুনের দিকে ছুটলুম। কারণ অর্গানের প্রবল গম্ভীর সুর থেকে বোঝা যাচ্ছিলো যে ক্যাপ্টেন নেমো সেলুনে বসে অর্গান বাজাচ্ছেন।

ক্যাপ্টেন, উত্তেজিতভাবে ডাক দিলুম আমি।

সুরের মধ্যে ড়ুবে আছেন যেন তিনি, আমার কথা তার কানেই পৌঁছালোনা। তার হাত ধরে আবারও আমি বললুম, ক্যাপ্টেন নেমো!

যেন ছন্দ কেটে গেলো, কেঁপে উঠে ফিরে তাকালেন নেমো। ও আপনি। তা শিকার কেমন লাগলো? উদ্ভিদবিদ্যার কোনো নতুন তথ্য যোগাড় হলো?

হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা একদল দ্বিপদকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি, বংশপরম্পরায় যাদের বেশ বিপজ্জনক বলে খ্যাতি আছে।

তা সেই দ্বিপদগুলো কী?

জংলি।

জংলি? ক্যাপ্টেন নেমোর কণ্ঠস্বর ব্যঙ্গে ভরে গেলো, পৃথিবীর এক জায়গায় পা দিয়ে বর্বর জংলি দেখে আপনি অবাক হচ্ছেন, প্রফেসর? একটা জায়গার নাম করুন তো যেখানে বর্বরদের বাস নেই? আর তাছাড়া আপনি যাদের বর্বর জংলি বলেন তারা কি অন্য কারো চেয়ে কোন অংশে নিকৃষ্ট?

কিন্তু ক্যাপ্টেন—

জংলিরা কোথায় নেই, প্রফেসর? আমার কথা যদি বরেন, মঁসিয়, তো জানাই : আমি এই বর্বরদের পৃথিবীর সর্বত্র দেখেছি।

তা আপনি যদি নটিলাস-এর মধ্যে তাদের না-দেখতে চান তত আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হয়।

সে সম্বন্ধে আপনাকে ভাবতে হবে না, প্রফেসর। এতে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই।

কিন্তু ওরা যে সংখ্যায় অগুন্তি।

কতজনকে দেখেছেন আপনি?

অন্তত একশো তো হবেই।

মঁসিয় আরোনা, ক্যাপ্টেন নেমো আবার অর্গ্যানের চাবিতে হাত দিলেন, যদি পাপুয়ার সমস্ত বর্বর এসে চড়াও হয় তবু নটিলাস-এর গায়ে একটা আঁচড় কাটার ক্ষমতা কারো নেই, বলেই আমার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে আবার তিনি অর্গ্যানের উপর ঝুকে পড়লেন।

পরের দিন কাতারে কাতারে পাপুয়ার জংলিরা চারপাশ থেকে নটিলাসকে ঘিরে ধরলে, কিন্তু জাহাজের উপরে উঠতে বা জাহাজের খুব কাছে আসতে দের কারো সাহসে কুলোলো না। সারাদিন তারা তীরে ভিড় করে রইলো; রাতে তীরে-জলে-ওঠা অজস্র অগ্নিকুণ্ড দেখেও বোঝা গেলো অচিরে নটিলাস-এর সঙ্গ ত্যাগ করার মতলব তাদের নেই।

তার পরের দিন ডেকের উপর উঠতেই দেখা গেলো গোটাকুড়ি ফাপা গাছের ক্যানো জলে ভাসিয়ে বিস্তর পাপুয়া যোদ্ধা নটিলাস লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে। আমাকে আর কোনসাইলকে দেখেই তারা চাচামেচি করে উঠলো। তার পরেই আমাদের আশপাশে এক ঝাঁক তীর এসে পড়লো।

এবারে তাহলে সত্যি তারা আক্রমণ করার জন্য উৎসুক। অথচ জোয়ার নাএলে একচুলও নড়ানো যাবে না নটিলাসকে। তাহলে আর রক্ষে নেই। হন্তদন্ত হয়ে নিচে গিয়ে ক্যাপ্টেন নেমোকে খবর দিলুম। নেমো কিন্তু আদৌ কিছুমাত্র বিচলিত না-হয়ে নটিলাস-এর বহিদ্বার বন্ধ করে দেবার আদেশ দিলেন। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, মিথ্যেই আপনি এত উত্তেজিত হচ্ছেন, প্রফেসর। আপনাদের যুদ্ধ জাহাজের কামানের গোলাই যদি নটিলাস-এর গায়ে আঁচড়টি কাটতে না-পারে, তাহলে কয়েকশো পাপুয়াই বা তীর-ধনুক নিয়ে কী করবে, বলুন?

কিন্তু ক্যাপ্টেন, কাল বাতাস নেবার জন্য আপনাকে তো নটিলাস-এর ঢাকনি বা বহির খুলতেই হবে —তখন যে জংলিরা ভিতরে ঢুকে পড়বে।

মঁসিয় আরোনা, ঠাণ্ডা গলায় বললেন ক্যাপ্টেন নেমে, বহিরি খোলা থাকলেও কি নটিলাস-এর ভিতরে ঢোকা এতই সহজ? আপনি কিছুমাত্র বিচলিত হবেন না। হ্যাঁ, ভালো কথা। নটিলাস কিন্তু কাল দুটো চল্লিশের সময় জোয়ারের জলে ভেসে উঠবে। জংলিদের প্রসঙ্গে আর কোন কথাই বললেন না ক্যাপ্টেন নেমো। এই ক-দিন এই অদ্ভুত মানুষটিকে যতটুকু চিনেছিলুম, তাতে আমিও আর কোনো উচ্চবাচ্য করে নিজের ঘরে ফিরে এলুম।

ফিরে এলুম বটে, কিন্তু সে রাতে জংলিদের উৎপাতে ভালো করে ঘুমানো গেলো না। সারা রাত তারা নটিলাস-এর উপর উন্মাদের মতো দাপাদাপি করলে, আর থেকে-থেকে রক্ত-জল-করা রণহুংকার দিলে।

পরের দিন বেলা যখন দুটো পঁয়ত্রিশ, ক্যাপ্টেন নেমে আমাকে ডেকে ওঠার সিঁড়ির কাছে নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখি নেড আর কোনসাইলও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাপ্টেন নেমোর নির্দেশ মতো একটি নাবিক বহিদ্বারটি খুলে দিলে।

তৎক্ষণাৎ বিকট উল্কি-কাটা একটি বিশ্রী মুখ দেখা গেলো ফোকর দিয়ে; পর মুহূর্তে সে সিঁড়ির রেলিঙে হাত রাখলে নিচে নামবে বলে, আর পরক্ষণেই কানফাটা আর্ত চীৎকারে জংলিটা লাফিয়ে উঠলো। আরো কয়েকটি জলি কৌতূহলতরে রেলিঙে হাত দিতেই তাদেরও ওই একই ভাবে চীৎকার করে লাফিয়ে উঠতে হলো। তিড়িং-তিড়িং করে লাফিয়ে ওরা গিয়ে নামতে থাকলো ক্যানোয়। ডেকের উপর একটা দারুণ হট্টগোল শুরু হয়ে গেলো। ব্যাপার দেখে কোনসাইল তো হেসেই লুটোপুটি!

কী ব্যাপার বুঝতে না পেরে আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলুম। নেভের আবার কৌতূহল আর বুকের পাটা দুটোই কিঞ্চিৎ বেশি, তাই সেও সিঁড়ির রেলিঙে হাত রেখে ব্যাপারটা বোঝবার চেষ্টা করলো। সঙ্গেসঙ্গে সেও বিকট চীৎকার করে আমাদের দিকে ছিটকে এলো।

বিদ্যুৎ! বিদ্যুৎ! বাজ পড়েছে আমার উপর!

নেডের চঁচানি শুনেই সমস্ত রহস্যটা আমার কাছে পরিস্কার হয়ে গেলো। ক্যাপ্টেন নেমে রেলিঙের মধ্যে বিদ্যুৎ চার্জ করে দিয়েছেন এমন মাত্রায় দিয়েছেন যে প্রবল ধাক্কা লাগবে কেবল, তাছাড়া আর কোনো ক্ষতিই হবে না; কিন্তু তাতেই মন্ত্রের মতো কাজ হলো। সমস্ত ব্যাপারটা ভৌতিক বা অপার্থিব ভেবে উন্মাদের মতো পাপুয়ারা পালাতে লাগলো, দেখতে-খেতে তাদের চীৎকার দুরে মিলিয়ে গেলো।

ইতিমধ্যে জোয়ারের জলে নটিলাস ভেসে উঠেছিলো। ঠিক দুটো চল্লিশের সময় ইঞ্জিন জেগে উঠলে সশব্দে; শুরু হলো চাকার আন্দোলন; ধীরে ধীরে সেই ভয়ানক টোরেজ প্রণালীকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলো নটিলাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *