সত্য সব সময় জনপ্রিয় হয় না, জনপ্রিয়ও সব সময় সত্য নয়।
– রুডইয়ার্ড কিপলিং

লেখকের কৃতজ্ঞতা

সর্বপ্রথম আমার বন্ধু জেসন কফম্যানকে, যিনি এই প্রজেক্টে কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং সত্যিকারভাবে বইটির বিষয়বস্তু বুঝতে পেরেছেন। আর অতুলনীয় হেইডি ল্যাংক–দা ভিঞ্চি কোডর অক্লান্ত চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট এবং বিশ্বস্ত বন্ধু। আমি ডাবল ডের পুরো দলটির কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তাদের উদারতা, আস্থা আর অসাধারণ দিক্‌ নির্দেশনার জন্যে। ধন্যবাদ লি থমাস আর স্টিভ রুবিনকে, যাঁরা শুরু থেকেই এই বইটির ব্যাপারে আস্থা রেখেছিলেন।

এই বইয়ের গবেষণা কাজে উদারভাবে সাহায্য করার জন্যে আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি লুক্স মিউজিয়াম, ফরাসি সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়, প্রজেক্ট গুটেনবার্গ, বিবিলিওথেক ন্যাশনেইল, নস্টিক সোসাইটি লাইব্রেরি, লুভরের ডিপার্টমেন্ট অব পেইন্টিংস স্টাডি এ্যান্ড ডকুমেন্টেশন সার্ভিস, ক্যাথলিক ওয়ার্ল্ড নিউজ, গনউইচ রয়্যাল অবজারভেটরি, লন্ডন রেকর্ড সোসাইটি, মুনিমেষ্ট কালেকশান এ্যাট ওয়েস্ট মিনিস্টার এবং ওপাস দাইর পাঁচজন সদস্য (তিনজন বর্তমান, দুজন সাবেক), যারা তাদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক, দুধরণেরই গল্প আর ওপাস। দাইর অভ্যন্তরে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা আমাকে বলেছিলো।

আমার গবেষণা কর্মে অসংখ্য বই-পুস্তক সরবরাহ করে দেয়ার জন্যে আরো কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি ওয়াল্টার স্টুট বুক স্টোরগুলো এবং আমার গণিত শিক্ষক এবং লেখক বাবা রিচার্ড ব্রাউনকে।

আর যে দুজন নারীর সাহায্য ছাড়া এ বই লেখা সম্ভব হোতো না তাদের কথা বললেই নয়। আমার প্রকৃতিবাদী, সঙ্গীতজ্ঞ মা কনি ব্রাউন এবং আর্ট হিস্টোরিয়ান, চিত্রশিল্পী, ফ্রন্টলাইন এডিটর, আমার স্ত্রী রাইথ নিঃসন্দেহে, আমার দেখা অসম্ভব প্রতিভাময়ী এক নারী।

সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

–ড্যান ব্রাউন

 

তথ্য :

প্রায়োরি অব সাইওন—একটি ইউরোপিয় সিক্রেট সোসাইটি; ১০৯৯ সালে সম্রাট গদই দ্য বুইলো প্রতিষ্ঠিত করেন—এটি একটি সত্যিকারের সংগঠন।

১৯৭৫ সালে প্যারিসের বিবলিওথেক ন্যাশনেইল একটি পার্চমেন্ট উদঘাটন করে যা লো ডোসিয়ে সিক্রেট নামে পরিচিত, এতে প্রায়োরি অব সাইওনর অসংখ্য সদস্যের পরিচয় পাওয়া যায়, যার মধ্যে স্যার আইজ্যাক নিউটন, বত্তিচেল্লি, ভিক্টোর হুগো এবং লিওনার্দো দা ভিঞ্চিও আছেন।

ওপাস দাই ভ্যাটিকানের একটি অঙ্গ সংগঠন। এই গোড়া ক্যাথলিক সংগঠনটি সাম্প্রতিককালে তাদের ব্রেন ওয়াশিং কর্মকাণ্ড আর কোরপােরাল মর্টিফিকেশন নামক একটি বিপজ্জনক অনুশীলনের জন্যে বিতর্কিত এবং সমালোচিত। কিছু দিন আগে ওপাস দাই ৪৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নিউইয়র্কের ২৪৩ লেক্সিংটন এভিনুতে তাদের ন্যাশনাল হেডকোয়ার্টারের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছে।

 

এই বইয়ে উল্লেখিত সমস্ত শিল্পকর্ম, স্থাপত্যশৈলী, দলিল দস্তাবেজ আর গুপ্ত-ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের বিবরণ একেবারেই সত্যি।

 

মুখবন্ধ

লুভর মিউজিয়াম, প্যারিস
রাত-১০: ৪৬

স্বনামখ্যাত কিউরেটর জ্যাক সনিয়ে মিউজিয়ামের গ্র্যান্ড গ্যালারির তোরণ শোভিত পথ ধরে টলতে টলতে ছুটতে লাগলেন। সবচাইতে সামনের চিত্রকর্মটির দিকে তিনি ঝাপিয়ে পড়লেন, সেটা ছিলো কারাজ্জিওর। ছিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধলোকটি ছবিটার কাঠের ফ্রেম দুহাতে আঁকড়ে ধরে দেয়াল থেকে খুলে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে দুপায়ের ফাঁকে নিয়ে ছবিটাসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাছের একটা ভারি লোহার গেট বিকট শব্দে পড়ে গেলে ঘরটা থেকে প্রবেশদ্বারের পথটা বন্ধ হয়ে গেলো। দূরে, একটা এলার্ম বাজতে শুরু করলে নক্সা করা কাঠের পাটাতনটা কেঁপে উঠলো।

কিউরেটর মাটিতে শুইয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিলেন। আমি এখনও বেঁচে আছি। ক্যানভাসের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে লুকানোর জন্য একটা জায়গা খুঁজতে লাগলেন তিনি।

খুব কাছ থেকে একটা কণ্ঠ বললো, নড়বেন না। কিউরেটরের হাত-পা বরফের মতো জমে গেলো। আস্তে আস্তে ঘুরে তাকালেন তিনি।

মাত্র পনেরো ফুট দূরে, বন্ধ হওয়া গৃলের দরজার ওপাশ থেকে বিশাল আকৃতির শক্ত-সামর্থ্যের আক্রমণকারী লোহার গৃলের ভেতর দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সে লম্বা চওড়া, ফ্যাকাশে চামড়া আর সাদা পাতলা চুলের। তার চোখের মনি গোলাপী, গভীর লাল ফুটকি যুক্ত। শ্বেতি লোকটা কোটের পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে গৃলের ভেতর দিয়ে কিউরেটরের দিকে সরাসরি তা করলো। দৌড়াবেন না। তার উচ্চারণ শনাক্ত করা খুব সহজ না। এখন বলেন সেটা কোথায়।

আমি তো তোমাকে বলেছিই, কিউরেটর আত্মরক্ষার কোন চেষ্টা না করেই হাটুর ওপর ভর দিয়ে গ্যালারির ফ্লোরের ওপর একটু উঠে দাঁড়ালেন। তুমি কি বলছো কিছুই বুঝতে পারছি না!

মিথ্যে বলছেন, লোকটা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে, একদম নড়ছে না, শুধু তার চক্ চকে ভুতুরে চোখ দুটো বাদে। আপনি এবং আপনার ভায়েদের কাছে এমন কিছু আছে যেটা আপনাদের নয়।

কিউরেটর চম্‌কে গেলেন। তাঁর শিড়দাড়া বেয়ে শীতল একটা অনুভূতি বয়ে গেলো। এটা সে কিভাবে জানলো?

আজ রাতে নায্য ও বৈধ অভিভাবকেরা পুনঃস্থাপিত হবে। এখন আমাকে বলুন সেটা কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। বললে বেঁচে যাবেন। লোকটা কিউরেটরের মাথা বরাবর পিস্তল তাক করে ধরলো। এটা কি এমন গোপনীয় কিছু যার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করতে পারেন?

সনিয়ে শ্বাস নিতে পারছিলেন না।

লোকটা তার মাথা নেড়ে পিস্তলের ব্যারেলের দিকে তাকালো।

সনিয়ে আত্মরক্ষার্থে হাত দুটো তুলে ধরলেন। দাড়াও, খুব আস্তে করে বললেন। তোমার যা জানার দরকার তা আমি বলবো। কিউরেটর এরপর খুব সাবধানে বলতে শুরু করলেন। যে মিথ্যাটি বললেন, সেটা অনেকবার অনুশীলন করা ছিলো … সবসময়ই তিনি প্রার্থনা করতেন তাঁকে যেনো এটা কখনও ব্যবহার করতে হয়।

কিউরেটর কথা বলা বন্ধ করতেই ঘাতক বিশ্রী একটা হাসি দিলো। হ্যাঁ, অন্যেরাও ঠিক এরকমই বলেছে।

সনিয়ে চমকে গেলেন, অন্যেরাও?

আমি তাদেরকেও খুঁজে পেয়েছিলাম, বিশাল আকৃতির লোকটা উপহাস করে বললো। তিন জনের সবাইকে। তারাও আপনার মতোই বলেছে।

এটা হতে পারে না! কিউরেটরের সত্যিকারের পরিচয়, সেই সাথে তাঁর অন্য তিন জন সেন্যের পরিচয়, যে গোপনীয়তা তারা রক্ষা করছে, প্রায় সেরকমই গুপ্ত একটি ব্যাপার। সনিয়ে এবার পরিস্থির ভয়াবহতা বুঝতে পারলেন, তাঁর সেন্যেরা এভাবেই নিজেদের মৃত্যুর আগে কঠিন নির্দেশটা মেনে গেছেন। এটা তাদের সন্ধিরই একটা অংশ।

আক্রমণকারী আবার পিস্তল তাক্‌ করলো, আপনার মৃত্যুর পরে আমিই হবো একমাত্র ব্যক্তি যে সত্যটা জানবে।

সত্যটা। তৎক্ষণাৎ কিউরেটর পরিস্থিতির সত্যিকারের ভীতিকর অবস্থাটা অনুধাবন করতে পারলেন। আমি যদি মারা যাই, সত্যটা চিরকালের জন্যই হারিয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সচেতন হয়ে ওঠে পরিস্থিতিটা সামলাতে চেষ্টা করলেন।

পিস্তলটা গর্জে উঠলো, বুলেটটা পেটে আঘাত করার সাথে সাথে কিউরেটর প্রচণ্ড গরম অনুভব করলেন। সামনের দিকে পড়ে গেলেন তিনি…মাথাটা সামলে নেবার চেষ্টা করলেন। মাটিতে গড়িয়ে কুকড়ে গিয়ে লোহার গৃলের ভেতর দিয়ে আক্রমণকারীর দিকে ফিরে তাকালেন জ্যাক সনিয়ে।

লোকটা এখন সনিয়ের মাথা বরাবর পিস্তল তাক করে নেই।

সনিয়ে চোখ বন্ধ করলেন, তাঁর চিন্তাভাবনাসমূহ ভীতি এবং অনুশোচনার ঝড়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। পিস্তলের ফাঁকা চেম্বারের ক্লিক্ শব্দটা করিডোর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো।

কিউরেটর চোখ খুলে তাকালেন।

লোকটা নিজের অস্ত্রের দিকে তাকিয়ে আছে, খুব বিস্ময়েই তাকিয়ে আছে। সে দ্বিতীয়বার গুলি করতে উদ্যত হলো। কিন্তু কী যেনো কী মনে করে বোকার মতো হেসে সনিয়ের পেটের দিকে তাকালো। আমার কাজ শেষ।

কিউরেটর তাঁর সাদা নীল শার্টের মধ্যে বুলেটের ফুটোটার দিকে তাকালেন, পাঁজরের হাড়ের ঠিক নিচেই সেটা বিদ্ধ হয়েছে, ফুটোটার চারদিক লাল রক্তের একটা ফ্রেম তৈরি করেছে। আমার পেটে। অনেকটা নিষ্ঠুরভাবেই অল্পের জন্য বুলেটটা তাঁর হৃদপিণ্ড ভেদ করেনি। একজন লাগুয়েরে দা আলজেরির সাবেক যোদ্ধা হিসেবে এরকম ভয়ংকরভাবে ধুকে ধুকে মরার ঘটনা এর আগেও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। পনেরো মিনিট পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন তিনি। তারপর পাকস্থলীর এসিড চুইয়ে চুইয়ে বুকের ভেতর ঢুকে যাবে, ধীরে ধীরে তাঁকে বিষাক্ত করে ফেলবে।

যন্ত্রণা ভালো, সিয়ে, লোকটা বললো।

তারপরই সে চলে গেলো।

এখন একেবারে একা, জ্যাক সনিয়ে লোহার গেটের ভেতর দিয়ে আবার তাকালেন। ফাঁদে পড়ে গেছেন তিনি, আর এইসব দরজা কমপক্ষে বিশ মিনিটের আগে খুলবে না। এই সময়ের মধ্যে কেউ তাঁকে খুঁজে পেলেও সে মরে পড়ে থাকবে। তারপরও, নিজের মৃত্যুর ভয় থেকে অন্য একটা ভয়ই তাঁকে বেশি পেয়ে বসলো।

আমাকে অবশ্যই সিক্রেটটা কাউকে বলে যেতে হবে।

নিজের পায়ের ওপর টলতে টলতে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন, তাঁর চোখে ভেসে উঠলো বাকি তিন গুরু-ভায়ের খুন হওয়ার দৃশ্যটা। পূর্বসূরীদের কথা ভাবলেন…যে মিশনে তাঁরা সবাই নিয়োজিত ছিলেন, বিশ্বস্ত ছিলেন।

জ্ঞানের এক অবিচ্ছিন্ন শেকল।

এখন হঠাৎ, সব ধরনের পূর্ব সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও…সবধরনের ভূয়া-নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও…জ্যাক সনিয়েই একমাত্র বেঁচে থাকা সংযোগ, সবচাইতে শক্তিশালী গোপনীয় ব্যাপাটার একমাত্র অভিভাবক।

কোঁকাতে কোঁকাতে নিজের পায়ের ওপর উঠে দাঁড়ালেন।

আমাকে অবশ্যই একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

গ্র্যান্ড গ্যালারির ভেতরে আঁটকা পড়ে গেছেন তিনি, আর এই পৃথিবীতে একজন ব্যক্তির অস্তিত্ত্বই আছে যার কাছে এই মশালটা হস্তান্তর করে যেতে পারেন। সনিয়ে তাঁর বন্দীশালার দেয়ালের ওপরের দিকে তাকালেন। বিশ্বের সবচাইতে বিখ্যাত চিত্রকর্মের সংগ্রহগুলো, মনে হলো তাঁর দিকে চেয়ে পুরনো বন্ধুর মতো হাসছে।

তীব্র ব্যথা নিয়ে সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করলেন তিনি। তাঁর সামনে যে কঠিন কাজটি রয়েছে তার জন্যে, তাঁর জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডেরই দরকার রয়েছে।