০৮. লোকটা

দ্বিতীয় খণ্ড
স্কোরারস্‌
০৮. লোকটা

১৮৭৫ সালের চৌঠা ফেব্রুয়ারি। দারুণ শীত পড়েছিল, গিলমারটন পর্বতমালার গিরিখাতে জমে রয়েছে রাশি রাশি তুষার। বাষ্পীয় লাঙলের দৌলতে রেললাইন এখনও খোলা রয়েছে। ভারমিসা উপত্যকার মাথার দিকে অবস্থিত কেন্দ্রীয় নগরী ভারমিসা সমতল থেকে স্ট্যাগভিল পর্যন্ত যে-রেললাইনটা ঢালু পাহাড়ের ওপর কয়লাখনি আর লোহার কারখানাকে জুড়ে রেখেছে, সন্ধের ট্রেন টিকিয়ে টিকিয়ে চলেছে সেই লাইনের ওপর দিয়ে। রেললাইনের এখান থেকে গড়িয়ে নেমে গেছে বার্লটন্স ক্রসিং হেল্মডেল আর মার্টনের নির্ভেজাল কৃষি অঞ্চলের দিকে। রেলপথ একটাই অর্থাৎ একটাই রেলগাড়ি যেত সেই লাইন দিয়ে সামনের দিক থেকে আরেকটা ট্রেন এলে এ-ট্রেনকে সরে দাঁড়াতে হবে সাইডিং-এ। সাইডিংয়ের সংখ্যা অসংখ্য। প্রত্যেকটা সাইডিং-এ কয়লা আর লোহার আকর ভরতি ট্রাক দাঁড়িয়ে সারি সারি–দেখলেই বোঝা যায় গুপ্তধনের আকর্ষণে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের এই বিজনতম অঞ্চলে ছুটে এসেছে দলে দলে রুক্ষ কঠোর মানুষ জীবনের স্পন্দনে স্পন্দিত করে তুলেছে ঊষর প্রান্তর।

ঊষরই বটে। সত্যিই খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। প্রথম যে পুরোধা ব্যক্তি এই রুক্ষ বিজন অঞ্চলে পা দিয়েছিল সে কিন্তু কল্পনাও করতে পারেনি বিশ্বের সবচেয়ে সেরা সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা অঞ্চলেও কালো কর্কশ খাড়া এবড়োখেবড়ো পাহাড় আর জঙ্গলের জটায় সমাকীর্ণ ঘোর বিষণ্ণ এই অঞ্চলের তুলনায় একেবারেই মূল্যহীন। মাঝে মাঝে প্রায় দুর্ভেদ্য অরণ্য কালো হয়ে রয়েছে খাড়া পাহাড়ের গায়ে, অনেক উঁচু উলঙ্গ পর্বতমুকুটে জমে রয়েছে সাদা বরফ, চারিদিকে পাহাড় মাথা উঁচিয়ে রয়েছে মেঘমালার দিকে, মাঝখানে পাকানো পেঁচানো সুদীর্ঘ উপত্যকা এঁকেবেঁকে বিস্তৃত দুর হতে দূরে। ছোট্ট রেলগাড়িটা টিকিয়ে টিকিয়ে চলেছে এরই ওপর দিয়ে।

সামনের দিকে যাত্রী গাড়িতে এইমাত্র জ্বালানো হয়েছে তেলের বাতি। কামরাটা লম্বা, নিরাভরণ। বসে আছে বিশ তিরিশজন যাত্রী। এদের অধিকাংশ শ্রমিক। নিম্ন উপত্যকায়, সারাদিন খেটে বাড়ি ফিরছে। জনা-বারোর মুখ কালিঝুলিতে কালো, হাতে সেফটিল্যাম্প নিঃসন্দেহে খনি শ্রমিক। দল বেঁধে বসে তারা ধূমপান করছে, গলা নামিয়ে কথা বলছে এবং মাঝে মাঝে কামরায় অন্য প্রান্তে উপবিষ্ট দু-জন লোকের পানে তাকাচ্ছে–এদের পরনের ইউনিফর্ম আর ব্যাজ দেখে বোঝা যাচ্ছে পুলিশের লোক। বাকি লোকের মধ্যে কয়েকজন কুলি মেয়ে। দু-একজন যাত্রী স্থানীয় দোকানদারও হতে পারে। এক কোণের একজন যুবা পুরুষ যেন এদের দল ছাড়া। একটু ভালো করে তাকান এর দিকে চেহারাটা দেখবার মতো।

রং তাজা, বয়স বড়োজোর তিরিশ। দুই চক্ষু ধূসর বিশাল। ধূর্ত এবং কৌতুকময় চশমার মধ্যে দিয়ে আশেপাশের লোকদের দিকে তাকানোর সময়ে অনুসন্ধিৎসা ঝিলিক দিয়ে উঠছে সেই চোখে। দেখেই বোঝা যায় যুবাপুরুষ খুবই মিশুক, স্বভাব সাদাসিদে, সবশ্রেণির লোকের বন্ধুত্ব অর্জন করতে সক্ষম। সঙ্গপ্রিয়, পেটপাতলা, প্রখর উপস্থিতবুদ্ধি সম্পন্ন এবং সদা হাস্যময় এক নজরে এইরকমটাই মনে হবে যেকোনো ব্যক্তির। কিন্তু একটু কাছ থেকে খুঁটিয়ে যদি লক্ষ করা যায়, চোয়ালের দৃঢ়তা আর ভয়ানক ঠোঁট টিপুনি দেখেই সতর্ক হতে হবে স্পষ্ট বোঝা যাবে ছিমছাম চেহারার বাদামিচুলো এই তরুণ আইরিশম্যানের অন্তরের গভীরে এমন কিছু বস্তু আছে যা তাকে ভালো বা মন্দ যেকোনো রকমের খ্যাতি এনে দিতে পারে ধরাপৃষ্ঠের যেকোনো সমাজে।

সবচেয়ে কাছের খনি শ্রমিকের সঙ্গে দু-একটা কথা বলতে গিয়ে কাটছাঁট জবাব শুনে হাল ছেড়ে দিল তরুণ যাত্রী। চুপচাপ থাকা তার স্বভাব নয়–তবুও নীরব থাকতে হল। নিমগ্ন চোখে জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল বিলীয়মান দৃশ্যপটের দিকে। দৃশ্যটা খুব সুখাবহ নয়। ঘনায়মান অন্ধকারে পাহাড়ের গা লাল হয়ে উঠেছে চুল্লির আভায়। দু-পাশে স্তুপীকৃত গাদ আর ছাই, মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে কয়লাখনির প্রবেশদ্বার। লাইনের দু-পাশে বিক্ষিপ্ত নোংরা কদর্য কাঠের বাড়ির জটলা। আলো জ্বলছে কিছু কিছু জানলায়। ট্রেন মাঝে মাঝে দাঁড়ালে এইসব বাড়ি থেকেই ময়লা, কালো বাসিন্দারা উঠে ভিড় করছে গাড়িতে। কৃষ্টি, সংস্কৃতি, অলসতার ধারক ও বাহক যারা, ভারমিসা জেলার লোহা আর কয়লা উপত্যকা তাদের জায়গা নয়। চারদিকেই স্থূলতম-সংগ্রামের কঠোর চিহ্ন এখানকার কাজ রুক্ষ, কর্মীরাও রুক্ষ।

বিষাদ-মাখা ধুধু প্রান্তরের দিকে বিতৃষ্ণা আর কৌতূহল মিশানো চোখে চেয়ে রইল যুবাপুরুষ–চাহনি দেখেই বোঝা গেল এ-দৃশ্য তার চোখে একেবারেই নতুন। মাঝে মাঝে পকেট থেকে একটা ইয়া-বড়ো চিঠি বার করে পড়ে নিয়ে টুকটাক লিখতে লাগল পাশের সাদা অংশে। একেবারে কোমরের পেছন থেকে এমন একটা বস্তু বার করল যা এই ধরনের নরম চেহারার যুবকের কাছে আশা করা যায় না। জিনিসটা একটা বৃহত্তম আকারের নেভি রিভলবার। আলোর দিকে ফেরাতেই আলো ঠিকরে গেল ড্রামের ভেতর পোরা পেতলের কার্তুজের বেড় থেকে, তার মানে রিভলবার গুলিভরা। চট করে গুপ্তপকেটে লুকিয়ে ফেলার আগেই অবশ্য সংলগ্ন বেঞ্চিতে উপবিষ্ট একজন শ্রমিকের নজরে পড়ল হাতিয়ারটা।

বললে, হ্যাল্লো, বন্ধু! আপনি দেখছি তৈরি হয়ে বেরিয়েছেন।

ঈষৎ বিব্রত হয়ে হাসল যুবা পুরুষ।

বললে, হ্যাঁ। যেখান থেকে আসছি, সেখানে এ-জিনিসের যখন-তখন দরকার পড়ে।

সে-জায়গাটা কোথায় বলবেন?

শিকাগো থেকে আসছি আমি।

এদিকে নতুন?

হ্যাঁ।

এখানেও দেখবেন এর দরকার হবে, বললে শ্রমিক।

আ! তাই নাকি? আগ্রহী মনে হয় যুবাপুরুষকে।

এখানকার কাণ্ডকারখানা কিছুই কি শোনেননি?

অসাধারণ কিছু তো শুনিনি।

সেকী! সারাদেশ তোলপাড় হয়ে গেল এই নিয়ে। আপনিও শুনবেনখন–শিগগিরই কানে আসবে। কী জন্যে এলেন এদিকে?

শুনেছি, কাজ যে করতে চায়, এখানে নাকি তার কাজের অভাব হয় না।

আপনি কি শ্রমিক ইউনিয়নের কেউ?

নিশ্চয়।

তাহলে মনে হয় কাজ পাবেন। বন্ধু-টন্ধু কেউ আছে?

এখনও নেই, তবে করে নেওয়ার ব্যবস্থা জানি।

সেটা আবার কী?

আমি এনসেন্ট অর্ডার অফ ফ্রিম্যান সংস্থার সদস্য। হেন শহর নেই যেখানে এদের শাখা নেই। শাখা থাকা মানেই আমার বন্ধু পাওয়া।

কথাটায় অসাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল সঙ্গীর ওপর। এস্ত সন্দিগ্ধ চাহনি নিক্ষেপ করল কামরার অন্য সবাইয়ের দিকে। খনি শ্রমিকরা এখনও ফিসফাস করছে নিজেদের মধ্যে। পুলিশের লোক দু-জন চুলছে। বেঞ্চি থেকে উঠে এসে তরুণ যাত্রীর পাশে বসে হাত বাড়িয়ে দিল নিজের।

বলল, হাত রাখুন।

হাতে হাত মিলল দু-জনের।

সত্যি বলছেন জানি। তবুও নিশ্চিত হতে চাই।

বলে, ডান হাতটা তুলল ডান ভুরুর সামনে। তরুণ যাত্রীও তৎক্ষণাৎ বাঁ-হাত তুলল বাঁ-ভুরুর সামনে।

অন্ধকার রাত অস্বস্তিকর, বললে শ্রমিক।

পথ যে চেনে না তার কাছে, বললে তরুণ যাত্রী।

ওতেই হবে। আমি ভারমিসা ভ্যালির ৩৪১ নম্বর লজের ব্রাদার স্ক্যানল্যান। এ-তল্লাটে আপনাকে দেখে খুশি হলাম।

ধন্যবাদ। আমি শিকাগোর ২৯ নম্বর লজের ব্রাদার জন ম্যাকমুর্দো। জে. এইচ. স্কট আমাদের বডিমাস্টার। আমার কপাল ভালো, এত তাড়াতাড়ি একজন ব্রাদার পেয়ে গেলাম।

আমরা এখানে অনেক। ভারমিসা ভ্যালিতে অর্ডার যেমন ছড়িয়েছে, এমনটি যুক্তরাষ্ট্রের আর কোথাও দেখতে পাবেন না। তবে আপনার মতো কিছু ছেলের আমাদের দরকার। শ্রমিক ইউনিয়নের এ-রকম একজন কর্মঠ সদস্যের কাজ নেই শিকাগোতে, এটা কিন্তু বুঝতে পারছি না।

কাজের অভাব ছিল না আমার, বললে ম্যাকমুর্দো।

তাহলে চলে এলেন কেন?

পুলিশের লোক দু-জনের দিকে মাথার ইশারা করে হাসল ম্যাকমুর্দো।

বললে, ওরা জানতে পারলে কিন্তু খুশি হত।

সহানুভূতিসূচক চুক-চুক শব্দ করে স্ক্যানল্যান।

শুধোয় ফিসফিসে স্বরে, ঝামেলায় পড়েছেন মনে হচ্ছে?

গভীর ঝামেলায়।

শ্রীঘরের ব্যাপার-ট্যাপার নাকি?

সেইসঙ্গে আরও কিছু।

মানুষ খুন নয় তো?

এত তাড়াতাড়ি এসব কথা বলা যায় না, ম্যাকমুর্দো যেন নিজেও একটু অবাক হয়ে যায় ইচ্ছে না-থাকলেও এত কথা বলে ফেলার জন্যে। শিকাগো ছেড়ে চলে আসার পেছনে আমার নিজস্ব যথেষ্ট কারণ ছিল। এইটুকুই আপনার পক্ষে যথেষ্ট। এত কথা আপনি জানতে চাইছেন কেন?

চশমার আড়ালে সহসা বিপজ্জনক ক্রোধ ঝলসে উঠল দুই চোখে।

ঠিক আছে, দোস্ত, ঠিক আছে। খোঁচা মারার ইচ্ছে আমার নেই। অনেকে অনেক কথাই ভাবতে পারে আপনার কীর্তিকাহিনি শুনলে। চলেছেন কোথায়?

ভারমিসায়।

এখান থেকে তৃতীয় স্টপেজে ভারমিসা। কোথায় উঠবেন?

লেফাফাটা বার করে কালিমাখা তেলের লণ্ঠনের সামনে ধরল ম্যাকমুর্দো।

এই ঠিকানায়–জ্যাকব শ্যাফটার, শেরিডান স্ট্রিট। বোর্ডিং হাউস। সুপারিশ করেছেন, শিকাগোর এক পরিচিত ভদ্রলোক।

আমি অবশ্য চিনি না, ভারমিসা আমার আওতার বাইরে। আমি থাকি হবসন্স প্যাঁচ-এ, সবাই জমায়েত হই সেইখানে। কিন্তু ছাড়াছাড়ি হওয়ার আগে একটা উপদেশ দিতে চাই আপনাকে। ভারমিসায় কোনো ঝামেলায় পড়লে সোজা চলে যাবেন ইউনিয়ন হাউসে দেখা করবেন বস ম্যাকগিন্টির সঙ্গে। উনিই ভারমিসা লজের বডিমাস্টার ব্ল্যাকজ্যাক ম্যাকগিন্টি না-চাইলে জানবেন এ-তল্লাটে কোনো ঘটনা ঘটে না। আজ এই পর্যন্ত, দোস্ত। লজে দেখা হয়ে যেতে পারে কোনো এক সন্ধ্যায়। তবে আমার কথাটা মনে রাখবেন, বিপদে পড়লে বস ম্যাকগিন্টির শরণাপন্ন হবেন।

নেমে গেল স্ক্যানল্যান। আবার নিজের চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে রইল ম্যাকমুর্দো। রাত হয়েছে। মাঝে মাঝে ফার্নেসের গনগনে আগুন সগর্জনে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে অন্ধকারের মধ্যে। মৃতবৎ পাণ্ডু। তমিস্রা-পটভূমিকায় কালো কালো ছায়ামূর্তি দেখা যাচ্ছে। ভারী জিনিস টেনে তোলার যন্ত্র চালাচ্ছে শরীর দুমড়েমুচড়ে, চরকি কল ঘোরাচ্ছে ঝুঁকে পড়ে অতি কষ্টে, ঝনঝন খটাং খটাং ধাতব শব্দে ছন্দ আর গর্জনের যেন বিরাম নেই, অন্ত নেই।

কে একজন বললে, নরকের চেহারা নিশ্চয় এইরকমই হবে।

ঘাড় ফিরিয়ে ম্যামুর্দো দেখলে একজন পুলিশের লোক চেয়ারে ঘুরে বসেছে, গনগনে রাঙা ভয়ানক আবর্জনা স্তুপের দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে।

অন্য পুলিশের লোকটা বললে, সেদিক দিয়ে বলব ঠিকই বলেছে। নরক নিশ্চয় এই রকমই দেখতে। যত বদমাশের নাম আমরা জানি, তার চাইতে অনেক জঘন্য বদমাশ ওদের মধ্যে রয়েছে। ইয়ংম্যান আপনি এদিকে নতুন মনে হচ্ছে?

নতুনই যদি হই তো হয়েছে কী? তেতো গলায় জবাব দেয় ম্যাকমুর্দো!

একটু সাবধান থাকবেন বন্ধু বাছবার সময়ে। আমি যদি আপনি হতাম, মাইক স্ক্যানল্যান বা তার দলবলের কারো সঙ্গে দোস্তি পাতাতে যেতাম না!

আমার বন্ধু নিয়ে আপনার মাথাব্যথা কেন? এমন রুক্ষকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল ম্যাকমুর্দো যে কামরায় প্রত্যেকের মুণ্ডু ঘুরে গেল এইদিকে।কে জ্ঞান দিতে বলেছে আপনাকে? ভেবেছেন কী? আপনি আমায় শিখিয়ে দেবেন, নইলে আমি হোঁচট খাব? গায়ে পড়ে কথা বলতে আসবেন না।

বলতে বলতে মুণ্ডটা ঠেলে বাড়িয়ে ধরল ম্যাকমুর্দো, জ্বলন্ত চোখে টহলদার পুলিশ দু-জনের দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ কুকুরের মতো হাসল দাঁত খিচিয়ে।

পুলিশের লোক দু-জনের স্বভাবটা ভালো, গায়েগতরেও ভারী বন্ধুভাবে উপদেশ দিতে গিয়ে এইরকম অসাধারণ তেজ দেখে তো হতবাক!

একজন বললে, আরে ভাই, এদেশে আপনি নতুন, অত চটছেন কেন? আপনার ভালোর জন্যেই বলেছিলাম।

বজ্ৰনাদে বললে ম্যাকমুর্দো, নতুন এদেশে হতে পারি, আপনাদের কাছে নই। সব দেশেই আপনারা এক ছাঁচে ঢালা। গায়ে পড়ে জ্ঞান দিতে আসেন।

অন্য পুলিশের লোকটি কাষ্ঠ হেসে বললে, শিগগিরই হয়তো মোলাকাত হতে পারে আপনার সঙ্গে। যদূর মনে হচ্ছে আপনি তোক সুবিধের নন।

আমারও তাই মনে হচ্ছে, বললে অপরজন। শিগগিরই ফের দেখা হবেখন।

চিৎকার করে ম্যাকমুর্দো বললে, আপনাদের ডরাই না আমি। দেখে কি তাই মনে হল না? আমার নাম জ্যাক ম্যাকমুর্দো–শুনেছেন? আমাকে যখনই দরকার হবে, চলে যাবেন ভারমিসার শেরিডান স্ট্রিটের জ্যাকব শ্যাফটারের বাড়িতে তার মানে আপনাদের ভয়ে লুকিয়ে থাকছি না। দিনে হোক, রাতে হোক–যখন হয় আপনাদের চোখে চোখে তাকানোর সাহস আমার আছে জানবেন। ভুল যেন না হয়।

নবাগতের এ ধরনের অকুতোভয় আচরণ দেখে বিস্ময়, তারিফ আর সহানুভূতির মিশ্রিত গুঞ্জন শোনা গেল শ্রমিকদের মধ্যে, পুলিশ দু-জন হতাশভাবে দু-কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে কথাবার্তা আরম্ভ করল নিজেদের মধ্যে। মিনিট কয়েক পরেই স্বল্পালোকিত ডিপোয় এসে দাঁড়াল ট্রেন। বহু লোক আর মালপত্র নেমে গেল গাড়ি থেকে–কেননা ভারমিসা এ-লাইনের সবচেয়ে বড়ো শহর। চামড়ার থলিটা তুলে নিয়ে ম্যাকমুর্দো অন্ধকারে পা বাড়াতে যাচ্ছে, এমন সময়ে একজন খনিশ্রমিক এল পাশে পাশে।

বলল ভয়ার্ত চাপা গলায়, দোস্ত, টিকটিকিগুলোর মুখে মুখে বেশ তো জবাব দিতে পারেন। আপনার কথা শুনলে ভালো লাগে। চলুন আপনার থলি আমি নিয়ে যাচ্ছি রাস্তাও চিনিয়ে দিচ্ছি। শ্যাফটারের বোর্ডিং হাউস আমার ঝুপড়িতে যাওয়ার পথেই পড়বে।

প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে আসার সময়ে সম্মিলিত কণ্ঠে শুভরাত্রি জানিয়ে গেল অন্যান্য খনিশ্রমিকরা। ভারমিসায় পা ফেলার আগেই মুখে মুখে নাম ছড়িয়ে গেল দুর্দান্ত ম্যাকমুর্দোর। সে যে কী চরিত্র, লোকমুখে ছড়িয়ে গেল সেই খবর।

এ-তল্লাটে আতঙ্ক আকাশে বাতাসে, শহরটা যেন আরও এক কাঠি বেশি। বুক দমে যায়! সুদীর্ঘ উপত্যকা বরাবর আসবার সময়ে বিপুল আগুন আর ভাসমান ধোঁয়ার মেঘের মধ্যে অন্তত কিছুটা বুক কাঁপানো জাঁকজমকের চিহ্ন দেখা যায়। শক্তি আর পরিশ্রম দিয়ে দানবিক গর্ত খুঁড়ে মাটি বার করে পাশেই পাহাড় জমিয়ে মানুষ যে আসুরিক মেহনতের স্মৃতিস্তম্ভ রচনা করেছে, তার মধ্যেও জমকালো আভাস চোখে পড়ে। শহরটা কিন্তু দারিদ্র, মালিন্য, কদর্য আর নোংরামির একটা মৃত সমতল ভূমি বললেই চলে। রাস্তা চওড়া, কিন্তু যানবাহনের যাতায়াতে অজস্র ভয়ংকর আঠালো খাত জেগে উঠেছে কাদাটে তুষারের ওপর। ফুটপাথ সরু এবং এবড়োখেবড়ো। অসংখ্য গ্যাসের বাতির আলোয় আরও স্পষ্টভাবে কেবলই দেখা যায় কাঠের বাড়ির সুদীর্ঘ সারি, প্রতিটা বাড়ির নোংরা অপরিচ্ছন্ন বারান্দা ফেরানো রাস্তার দিকে। শহরের কেন্দ্র যতই এগিয়ে আসতে থাকে, ততই চোখে পড়ে প্রচুর আলো ঝলমলে দোকান পসারির দৌলতে উজ্জ্বল দৃশ্য, মদ খাওয়ার আর জুয়োখেলার আড্ডা। কষ্টার্জিত অর্থ দু-হাতে এখানে উড়িয়ে দেয় শ্রমিকরা।

প্রায় হোটেলের মতোই খানদানি একটা সেলুন ভবনের দিকে আঙুল তুলে বললে পথপ্রদর্শক, ওই হল ইউনিয়ন হাউস। ম্যাকগিন্টি ওখানকার বস।

ভদ্রলোক কীরকম? শুধোয় ম্যাকমুর্দো।

সেকী। বসের কথা কখনো শোনেননি নাকি?

কী করে শুনব? শুনলে তো এ-তল্লাটে আমি নতুন।

আমি তো জানতাম সারাদেশের লোক তার নাম জানে। কাগজেও উঠেছিল নামটা।

কী জন্যে?

গলা নামিয়ে বললে পথপ্রদর্শক, সেই ব্যাপারে।

কী ব্যাপারে?

হায় ভগবান! আপনি তো দেখছি অদ্ভুত রকমের ভালো লোক মশায়। কিছু মনে করলেন তো? এ-তল্লাটে শুধু একটা ব্যাপারই আপনার কানে আসবে–স্কোরারসদের ব্যাপারে।

স্কোরারসদের ব্যাপার আমি শিকাগোয় পড়েছি বটে। মানুষ খুনির দল, তাই না?

চুপ! বাঁচতে যদি চান, একদম চেঁচাবেন না! সভয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে সবিস্ময়ে সঙ্গীর পানে তাকায় পথপ্রদর্শক। আরে মশাই, খোলা রাস্তায় যদি এইভাবে কথা বলতে থাকেন তো এ-অঞ্চলে বেশিদিন আর প্রাণ নিয়ে থাকতে পারবেন না। এর চাইতেও অনেক লঘু অপরাধে বহু লোকের জীবন গিয়েছে জানবেন।

অতশত জানি না। যা পড়েছি তাই বললাম।

যা পড়েছেন তা সত্যি নয়, এমন কথা আমি বলছি না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আশপাশ দেখতে দেখতে বললে লোকটা এমনভাবে জুলজুল করে চেয়ে রইল ছায়ামায়ার দিকে যেন বিপদ ওত পেতে রয়েছে সেখানে, ঝাঁপিয়ে পড়ল বলে। মানুষকে মারার নাম যদি খুন করা হয়, তাহলে জানবেন এ-তল্লাটে তা আকছার হয়–ভগবানও তা নিয়ে মাথা ঘামান না। দোহাই আপনার, খুনখারাপির সঙ্গে জড়িয়ে জ্যাক ম্যাকগিন্টির নামটা যেন উচ্চারণ করে বসবেন না নিশ্বেসের সঙ্গেও যেন এ-নাম কখনো না-বেরোয় আপনি নতুন এসেছেন তাই বলি–ফিসফিস করে কথা বললেও ম্যাকগিন্টির কানে তা পোঁছোয় এবং সে যা লোক, এ-কান দিয়ে শুনে ও-কান দিয়ে বার করে দেওয়ার পাত্র সে নয়। যাই হোক ওই সেই বাড়ি যেখানে যাবেন বলে এসেছেন রাস্তা থেকে একটু ভেতর দিকে। ওখানকার মালিক বুড়ো জ্যাকব শ্যাফটারের মতো সৎ লোক জানবেন এ-শহরে আর দু-টি নেই।

ধন্যবাদ, সদ্য পরিচিতের সঙ্গে করমর্দন করে চামড়ার থলিটা নিজের হাতে নিল ম্যাকমুর্দো, রাস্তা মাড়িয়ে বসতবাড়িটার সামনে গিয়ে খটাখট শব্দে আঙুলের গাঁট ঠুকল পাল্লায়। তৎক্ষণাৎ খুলে গেল কপাট–দোরগোড়ায় যাকে দেখা গেল মোটেই তাকে আশা করেনি ম্যাকমুর্দো।

অনিন্দ্যসুন্দরী একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। সুইডিশ ধরনের সুন্দরী, সোনালি সাদাটে চুল, তীব্র বৈষম্য প্রকট হয়েছে ভারি সুন্দর কাজলকালো চোখজোড়ার মধ্যে, অসাধারণ এই নয়ন যুগল দিয়েই আগন্তুকের আপাদমস্তক সবিস্ময়ে নিরীক্ষণ করে লাল করে ফেলল পাণ্ডুর মুখখানা–বিব্রত একটু হল বটে, কিন্তু তাও যেন অনেক সুখের। দরজার ফ্রেমে অত্যুজ্জ্বল আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা আশ্চর্য সুন্দর সেই চিত্রের পানে তাকিয়ে ম্যাকমুর্দোর মনে হল মন-ভার-করা নোংরা এই পরিবেশের পটভূমিকায় এর চাইতে মন-টেনে নেওয়া ছবি বুঝি সে জীবনে দেখেনি। বৈষম্য যেন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে পটভূমিকা আর মূর্তির মধ্যে। খনি অঞ্চলের পাহাড়প্রমাণ ওই কালো গাদের মধ্যে যদি একটা মনোরম ভায়োলেট ফুলও ফুটত, তাও বুঝি এমন চমকপ্রদ হত না। অত্যন্ত অভিভূত হওয়ার দরুন মুখ দিয়ে কথা পর্যন্ত বেরুল না, শেষকালে নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ করল মেয়েটাই।

মিষ্টি সুইডিস উচ্চারণে বললে, আমি ভেবেছিলাম বাবা এসেছে। আপনি কি বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন? বাবা শহরে গেছে। এই এল বলে।

দুই চোখে অকপট প্রশংসা জাগিয়ে তখনও ম্যাকমুর্দো ঠায় তাকিয়ে রয়েছে অনলাকসামান্যা এই রূপসীর পানে শেষকালে কর্তৃত্বব্যঞ্জক মানুষটার সামনে বিড়ম্বিত চক্ষু নামিয়ে নিতে বাধ্য হল মেয়েটি।

অবশেষে বলল ম্যাকমুর্দো, খুব একটা তাড়া নেই দেখা করার। থাকার জন্যে এই বাড়িটাই সুপারিশ করা হয়েছিল আমাকে। তখন ভেবেছিলাম হয়তো মনের মতো হবে, এখন দেখছি সত্যিই মনের মতো হবে।

একটু হাসল মেয়েটি। বলল, বড়ো তাড়াতড়ি মন ঠিক করে ফেলেন তো।

জবাবে বলল ম্যাকমুর্দো, অন্ধ ছাড়া প্রত্যেকেই তাই করবে।

অভিনন্দন শুনে হেসে উঠল সুন্দরী।

বললে, ভেতরে আসুন। আমি মি. শ্যাফটারের মেয়ে মিস এট্টি শ্যাফটার। মা স্বর্গে গেছে, সংসার আমার হাতে। বাবা না-ফেরা পর্যন্ত সামনের ঘরে চুল্লির পাশে বসতে পারেন। এই তো এসে গেছে বাবা। এখুনি সেরে নিন কথাবার্তা।

ভারী চেহারার একজন প্রৌঢ় রাস্তা দিয়ে এলেন দরজার সামনে। দু-চার কথাতেই কাজের কথা শেষ করল ম্যাকমুর্দো। এ-ঠিকানা তাকে শিকাগোয় দিয়েছে মর্ফি নামে এক ভদ্রলোক। ঠিকানাটা মর্ফি পেয়েছে আবার আরেক জনের কাছে। বুড়ো শ্যাফটার রাজি হলেন। শর্ত নিয়ে দরকষাকষির মধ্যে গেল না আগন্তুক রাজি হল সব কথাতেই মনে হল টাকার অভাব নেই তার। সাতদিনের অগ্রিম বারো ডলার দিলেই থাকা খাওয়া মিলবে। এইভাবেই শ্যাফটারের বাড়িতে থাকার জায়গা পেয়ে গেল ম্যাকমুর্দো–সেই ম্যাকমুর্দো যে স্বমুখে স্বীকার করেছে আইন পুলিশ আদালতের রক্তচক্ষু এড়িয়ে পালিয়ে এসেছে সুদূর ভারমিসায়। আতঙ্ক উপত্যকায় এই হল গিয়ে তার প্রথম পদক্ষেপ–এর পরেই শুরু হল কৃষ্ণকালো ঘোর কুটিল, সুদীর্ঘ ঘটনাপরম্পরা–শেষ হল বহুদূরের এক ভূমিখণ্ডে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *