০৮. বেকার-স্ট্রিটের ছন্নছাড়া বাহিনী

বেকার-স্ট্রিটের ছন্নছাড়া বাহিনী

বললাম, এবার কী করবে বল? টোবি আর অভ্রান্ত বলা যায় না–সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

ও যা পেয়েছে, সেই অনুযায়ীই কাজ দেখিয়েছে, পিপের ওপর থেকে টোবিকে নামিয়ে কাঠের গোলার বাইরে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বললে হোমস। সারাদিনে লন্ডন শহরে কত ক্রিয়োসসটের গাড়ি চলে তা যদি ভাবো তো বুঝবে বেচারার গন্ধ গুলিয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। এখানেও গন্ধ আরও উগ্র এই কারণে যে কাঠ সিজন করার জন্য ক্রিয়োসোটের দরকার। টোবির আর দোষ কী বল।

যে-গন্ধ ধরে বেরিয়েছিলাম, সেই গন্ধেই এখন ফিরে যাওয়া উচিত, তাই না?

হ্যাঁ। কপাল ভালো বেশিদূর যেতে হবে না। নাইটস প্লেসে দু-দিকে দুটো গন্ধ পেয়ে টোবি বেচারি গোলমালে পড়েছিল। তখন এগিয়েছিল ভুল গন্ধ ধরে, এখন এগোবে ঠিক গন্ধ ধরে।

খুব একটা অসুবিধে হল না ঠিক গন্ধ খুঁজে নিতে। গোলমালে যেখানে পড়েছিল, সেইখানে টোবিকে নিয়ে যেতেই বাই বাঁই করে এক চক্কর ঘুরে নিয়েই তিরের মতো ছিটকে গেল নতুন একদিকে।

আমি বললাম, দেখ আবার ক্রিয়োসোট পিপে এসেছে যেখান থেকে, সেখানেই না টেনে নিয়ে যায় আমাদের।

সে-সম্ভাবনাও ভেবেছি। কিন্তু পিপে এসেছে মাঝ রাস্তা দিয়ে ও চলেছে ফুটপাত দিয়ে। না হে, এবার ঠিক গন্ধই ধরেছে টোবি।

গন্ধের পেছন নিয়ে বেলমন্ট প্লেস আর প্রিন্সেস স্ট্রিটের মধ্যে পৌঁছোলাম। নদীর ধারে ব্রন্ড স্ট্রিটের শেষে টোবি সোজা দৌড়ে নেমে গেল নদীর পাড়ে–সামনে একটা ছোটো কাঠের জেটি। জেটিতে উঠে একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে লাগল কালো স্রোতের পানে তাকিয়ে।

কপাল মন্দ আমাদের, বললে হোমস। ওরা তো দেখছি নৌকো নিয়েছে।

কতকগুলো ছোটো ছোটো শালতি আর ডিঙি নৌকো ভাসছিল জলে আর জেটির ধারে। প্রত্যেকটার কাছে নিয়ে গেলাম টোবিকে, গন্ধ শুকল টোবি, কিন্তু ঠিক গন্ধ পেয়েছে এমন লক্ষণ দেখাল না।

জেটির কাছে একটা ইটের ছোটো বাড়ি দেখলাম। দ্বিতীয় জানালার সামনে একটা কাঠের বিজ্ঞাপন-পত্র। বড়ো বড়ো হরফে লেখা মর্ডেকাই স্মিথ, তলায় লেখা দিন বা ঘণ্টা হিসেবে নৌকো ভাড়া পাওয়া যায়। দরজার ওপর একটা লেখা পড়ে জানা গেল একটা লঞ্চও ভাড়া পাওয়া যায়। জেটিতে স্তুপীকৃত কয়লা দেখে বুঝলাম কথাটা সত্যি। চারপাশে দেখল শার্লক হোমস অমনি সংকেত দেখা গেল চোখে-মুখে।

বলল, গতিক সুবিধের মনে হচ্ছে না। লোকগুলোকে যা ভেবেছিলাম দেখছি তার চাইতেও বেশি ধুরন্ধর। পিছু নিয়ে যাতে ধরা না-যায়, সে-ব্যবস্থা আগে থেকেই করা ছিল এখানে।

দরজার দিকে এগোচ্ছে হোমস। এমন সময়ে কোঁকড়া চুলো ছ-বছর বয়সের একটা ছেলে তিরবেগে দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাইরে পেছন পেছন চেঁচাতে চেঁচাতে এল লালমুখো মোটাসোটা এক স্ত্রীলোক–হাতে একটা মস্ত স্পঞ্জ।

জ্যাক ফিরে আয় বলছি। চান করে যা, নোংরা ভূত কোথাকার। তোর বাবা ফিরে এসে যদি তোকে এই অবস্থায় দেখে দু-জনকেই শেষ করে ছাড়বে।

এই সুযোগ! চেঁচিয়ে উঠল হোমস, আয় খোকা! কী দুষ্টু! কী দুষ্টু! গাল দুটো তো দেখছি গোলাপের মতো সুন্দর! জ্যাক, বল দেখি কী তোর চাই?

এক মুহূর্ত ভেবে নিল ছেলেটা।

তারপর বললে, একটা শিলিং।

ব্যাস? আর কিছু না?

দুটো শিলিং। আবার একটু ভেবে নিয়ে বুদ্ধির পরাকাষ্ঠা দেখাল শিশুটি।

এই নে! লুফে নে!–ভারি সুন্দর ছেলে আপনার, মিসেস স্মিথ!

আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। ছেলে আমার সুন্দর তো বটেই; তবে বড্ড দুষ্টু। একদম সামলাতে পারি না–বিশেষ করে কর্তা যদি একটানা ক-দিন বাইরে যায়।

বাইরে গেছেন নাকি? নিরাশ কণ্ঠে বললে হোমস; কী কপাল আমার। মি. স্মিথের সঙ্গে যে কথা ছিল আমার।

কাল সকাল থেকেই বেরিয়েছে বাইরে। সত্যি কথা বলতে কী এবার একটু ভয়-ভয়। করছে আমার। নৌকো যদি চান তো বলুন, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

আমি চাই মি. স্মিথের স্টিম লঞ্চটা।

আরে মশাই, সে তো স্টিম লঞ্চ নিয়েই বেরিয়েছে। ভয় হচ্ছে তো সেইজন্যেই। উলউইচে গিয়ে ফিরে আসার মতো কয়লা তো নেই লঞ্চে। বজরা নিয়ে বেরোলে অত ভাবতাম না। গ্রেভসেন্ডে অনেক কাজ নিয়ে গেছে–দেরি হয়ে গেলে থেকেও গিয়েছে। কিন্তু কয়লা ছাড়া স্টিম লঞ্চ নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি যে অনেক।

নদীর ধারে কোনো জেটি থেকে কিনে নেবে খন!

নিলে তো হয়, কিন্তু সে-পাত্র ও নয়। দাম নিয়ে ঝগড়া করে মরবে। কত কথাই কানে আসে এ নিয়ে। বস্তা কয়েক কয়লার জন্যে দু-চার পয়সা বেশি তো দেবেই না, উলটে গলাবাজি করে ভূত ছাড়িয়ে দেবে। তা ছাড়া কেঠো-পাঅলা ওই লোকটা সুবিধের নয়। দেখতে কদাকার, কথায় অদ্ভুত টান। যখন-তখন দরজায় ধাক্কা দিয়ে চায় কী বলতে পারেন?

ভীষণ অবাক হয়ে গিয়ে হোমস বলল, কেঠো পা-অলা লোক?

আজ্ঞে হ্যাঁ। মুখখানা বাঁদরের মতো বাদামি। যখন-তখন এসে ডেকে তোলে আমার কর্তাকে। কাল রাতে সে-ই ডেকে নিয়ে গেল কাকে। কর্তাটিও কম নয়। জানত লোকটা আসবে–স্টিম তুলে রেখেছিল লঞ্চে। আমার কাছে ঢাক-ঢাক গুড়-গুড় নেই স্যার, স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, ভাবগতিক ভালো মনে হচ্ছে না।

দু-কাঁধ ঝাঁকিয়ে হোমস বললে, আপনি বোধ হয় অকারণে ভয় পাচ্ছেন, মিসেস স্মিথ। কাল রাতে যে কেঠো-পাঅলাই এসেছিল জানছেন কী করে? এত নিশ্চিত বলছেন কী করে বুঝছি না।

গলা শুনে স্যার, গলা শুনে। ও গলা আমি হাড়ে হাড়ে চিনি–যেমন মোটা তেমনি জড়ানো। টক টক করে টোকা মারল জানলায়–রাত তখন তিনটে হবে। হেঁড়ে গলায় বললে, উঠে পড়ো দোস্ত! সময় হয়েছে। শুনেই আমার বড়ো ছেলে জিমকে ঘুম থেকে তুলে বেরিয়ে গেল কর্তা সঙ্গে নিয়ে। কেঠো-পায়ের খটাখট আওয়াজ শুনলাম পাথরের ওপর।

কেঠো পা-অলা লোকটার সঙ্গে আর কেউ ছিল?

বলা মুশকিল। আর কারো গলা তো শুনিনি।

মিসেস স্মিথ আমার কপাল মন্দ। স্টিম লঞ্চ ভাড়া নেব বলেই এসেছিলাম। তার বদলে লঞ্চ সম্বন্ধে কত খবরই না-পেলাম ভালো কথা, নাম কী লঞ্চের?

অরোরা।

আ! সবুজ লঞ্চ তো? পুরোনো রং? হলদে লাইন কাটা? কড়ি খুব চওড়া?

মোটেই না। পাতলা ছিপছিপে। এই সেদিন রং করা হয়েছে কালোর ওপর জোড়া লাল লাইন।

ধন্যবাদ। আশা করি মি. স্মিথের খবর শিগগিরই পেয়ে যাবেন। আমাকে তো বেরোতেই হবে নদীতে, অরোরার দেখা পেলে জানিয়ে দেব আপনি উদবেগে আছেন। কালো চিমনি বললেন না?

আজ্ঞে না। কালোর ওপর সাদা বেড়।

হ্যাঁ, হা, তাই বটে। কালো রং তো পাশের দিকটা। গুড মর্নিং মিসেস স্মিথ। ওয়াটসন, ওই তো একটা পানসি রয়েছে, মাঝিও রয়েছে। চলো ওতেই নদী পেরোনো যাক।

পানসিতে উঠে বসবার পর হোমস বললে, এ ধরনের লোকদের পেট থেকে কথা বার করার প্রথম কায়দা হল কখনো ওদের ভাবতে দিতে নেই যে কথাগুলো তোমার কাজে লাগবে–তাহলে শুক্তির মতো খটাস করে মুখের ডালা সেঁটে বসে থাকবে। বরং প্রতিবাদের সুরে যা বলবে তার মধ্যেও হাঁড়ির খবর বেরিয়ে আসবে–এখন যা করলাম।

পথ পরিষ্কার মনে হচ্ছে, বললাম আমি।

কী করতে চাও?

একটা লঞ্চ ভাড়া করে নদীতে বেরিয়ে পড়তে চাই–অরোরাকে খুঁজতে চাই।

ভায়া, কাজটা বিরাট। এখান থেকে গ্রিনউইচ পর্যন্ত নদীর দু-ধারে যেকোনো জেটি অরোরা ছুঁয়ে যেতে পারে। ব্রিজের তলায় তো অসংখ্য জেটির একটা গোলকধাঁধা হয়ে রয়েছে। মাইলের পর মাইল শুধু জেটি আর জেটির গলিখুঁজি। একা খুঁজতে গেলে অনেকদিন লাগবে, তোমার দমও ফুরিয়ে যাবে।

তাহলে পুলিশ লেলিয়ে দাও।

না! অ্যাথেলনি জোন্সকে ডাকতে পারি শেষ মুহূর্তে। লোক সে খারাপ নয়–পেশার দিক দিয়ে যাতে তার ক্ষতি না হয়, সে-ব্যবস্থাও আমি করব। তবে অ্যাদূর যখন এগিয়েছি, শেষ পর্যন্ত একাই চালিয়ে যেতে চাই তদন্ত।

জেটির মালিকদের কাছে খবর চেয়ে কাগজে বিজ্ঞাপন দিলে হয় না?

তাতে আরও খারাপ হবে। যাদের পেছনে ছুটেছি, তারা টের পেয়ে যাবে যে আমরা পিছু নিয়েছি–দেশ ছেড়ে তখন লম্বা দেবে। দেশের বাইরে যাওয়ার জন্যে এখনো তারা তৈরি, কিন্তু তাড়াহুড়ো করছে না নিশ্চিন্ত আছে বলে। জোন্সের উৎসাহ উদ্যম একদিক দিয়ে আমাদের কাজে লাগছে। কেননা, কেস সম্বন্ধে ওর ধারণা খবরের কাগজে ছাপা হবেই, পলাতকরাও মনে করবে বিপথে চলেছে প্রত্যেকেই।

মিলব্যাঙ্ক পেনিটেনসিয়ারির কাছে পানসি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করলাম—

তাহলে এখন কী করব?

গাড়ি নিয়ে সোজা বাড়ি যাবে, ব্রেকফাস্ট খেয়ে ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নেবে–কেননা আজ রাতে ফের বেরুতে হতে পারে। গাড়োয়ান, টেলিগ্রাফ অফিসে দাঁড়িয়ে যেয়ো! টোবিকে কাছে রাখব–ফের দরকার হতে পারে।

গ্রেট পিটার স্ট্রিট পোস্ট অফিসে গিয়ে ভাড়াটে গাড়ি দাঁড়াল। একটা টেলিগ্রাম পাঠাল হোমস। চলমান গাড়িতে বসে বললে–বল দিকি কাকে পাঠালাম?

জানলে তো বলব।

জেফারসন হোপ কেসে গোয়েন্দা পুলিশবাহিনীর বেকার স্ট্রিট ডিভিশনকে কাজে লাগিয়েছিলাম মনে পড়ে?

তাই নাকি? হেসে ফেললাম আমি।

ঠিক এই ধরনের কেসেই ওদের ভীষণ দরকার–বিকল্প হয় না। যদি না-পারে, অন্য ব্যবস্থা করব–কিন্তু প্রথম সুযোগ ওদের। টেলিগ্রামটা পাঠালাম আমার পুঁচকে নোংরা লেফটেন্যান্ট উইগিন্সকে। ব্রেকফাস্ট খেতে খেতেই আশা করি দলবল নিয়ে এসে যাবে ছোকরা।

সারারাত উত্তেজনার ধকল এখন অনুভব করছিলাম শরীরের মধ্যে। সময়টা তখন সকাল আটটা আর ন-টার মাঝামাঝি। খোঁড়াচ্ছিলাম, নেতিয়ে পড়ছিলাম, দেহমনে প্রচণ্ড ক্লান্তি বোধ করছিলাম–এক কথায় কুঁকছিলাম। আমার বন্ধুটির মতো পেশাদার উদ্দীপনা আমার নেই–সমস্যাকে সূক্ষ্ম বুদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে মাথা ঘামাতেই পারি না। বার্থোলোমিউ শোন্টোর মৃত্যু হয়েছে বটে, কিন্তু লোকটা সম্বন্ধে এত খারাপ কথা শুনেছি যে তার হত্যাকারীদের ওপর তিলমাত্র বিদ্বেষ আমার নেই। গুপ্তধনটা অবশ্য একটা আলাদা ব্যাপার। সবটা, অথবা কিছুটা, ন্যায্যত প্রাপ্য মিস মটানের। জীবন দিয়ে উদ্ধার করব সেই সম্পদ, উদ্ধারের সম্ভাবনা যখন সমুজ্জ্বল। এও ঠিক যে রত্নপেটিকা পাওয়ার পর চিরকালের মতো আমার নাগালের বাইরে চলে যাবেন মিস মর্সটান। কিন্তু এ-ধরনের চিন্তাকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে ভালোবাসাকে ক্ষুদ্র স্বার্থ দিয়ে পঙ্কিল করে তোলা। হোমস যদি অপরাধী অন্বেষণে এত মেহনত করতে পারে–তাহলে আমিই-বা অজানা সম্পদ উদ্ধারে জীবনপাত করতে পারব না কেন? ও যে-কারণে ক্রিমিন্যাল খুঁজছে, তার চাইতে দশগুণ জোরালো কারণে আমি খুঁজব রত্নপেটিকা।

বেকার স্ট্রিটে ফিরে স্নান সেরে জামাকাপড় পালটে শরীর ঝরঝরে হয়ে গেল। বেরিয়ে এসে দেখলাম ব্রেকফাস্ট তৈরি। কফি ঢালছে হোমস।

দেখে যাও হে। হাসতে হাসতে খোলা খবরের কাগজের এক জায়গা দেখিয়ে বললে ও, পরমোৎসাহী জোন্স আর সর্বব্যাপী সাংবাদিক মিলেমিশে কাজটা শেষ করে এনেছে। খাওয়ার পরে দেখ–এ-কেসের অনেক খবরই তোমার জানা ডিম আর শূকরের ঊরুর সদ্ব্যবহার করো আগে।

কাগজটা হাত থেকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিজ্ঞপ্তিটা পড়লাম–শিরোনামায় লেখা রয়েছে : আপার নরউডে রহস্যজনক কাণ্ড।

স্ট্যান্ডার্ডের খবর! কাল রাত বারোটায় আপার নরউডস্থ পণ্ডিচেরি লজ নিবাসী মি. বার্থোলোমিউ শোল্টোকে যেভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে তাঁর ঘরে, তাতে মনে হয় একটা ঘোর ষড়যন্ত্র রয়েছে এর মধ্যে। যদ্র জানা গিয়েছে, মি. শশাল্টোর শরীরে মারধরের চিহ্ন নেই, তবে বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভারতবর্ষ-থেকে-আনা রত্নরাজিপূর্ণ একটি পেটিকা উধাও হয়েছে। মৃত ব্যক্তির ভাই মি. থেডিয়াস শোল্টোর সঙ্গে পণ্ডিচেরি লজে গিয়েছিলেন মি. শার্লক হোমস এবং ডা. ওয়াটসন রত্নপেটিকা চুরির বিষয়টি তারাই প্রথম লক্ষ করেন। ভাগ্যক্রমে গোয়েন্দা পুলিশবাহিনীর বিখ্যাত অফিসার মি. অ্যাথেলনি জোন্স সেই সময়ে নরউড পুলিশ ফাঁড়িতে হাজির ছিলেন–খবর পেয়েই আধ ঘণ্টার মধ্যে তিনি অকুস্থলে হাজির হন। সুদীর্ঘ অনুশীলন আর অভিজ্ঞতার দরুন তিনি দ্রুত তদন্ত পরিচালনা করে অপরাধীদের ধরে ফেলেন এবং মৃত ব্যক্তির ভাই থেডিয়াস শশাল্টোসহ হাউসকিপার মিসেস বার্নস্টোন, ভারতীয় খাস চাকর লাল রাও এবং দারোয়ান বাকুলি ম্যাকমুর্জোকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান। বাড়ির সব কিছুই নখদর্পণে ছিল চোর বা চোরেদের। কেননা মি. জোন্সের সুবিখ্যাত বিশেষ জ্ঞানের দৌলতে এবং অতি সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার ফলে অবিসম্বাদিতভাবে প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে যে দুষ্কৃতকারীরা জানলা বা দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকেনি ঢুকেছে ঘরের ছাদ ফুটো করে। সেই ফুটো দিয়ে চিলেকোঠায় ওঠা যায় এবং চিলেকোঠা থেকে ঠেলা দরজা দিয়ে ছাদে বেরিয়ে যাওয়া যায়। এই পথেই আততায়ীরা ঘরে এসেছে এবং এই ঘরেই পাওয়া গিয়েছে মৃতদেহ। এটা যে নিছক সুপরিকল্পিত, সিধকাটা চুরি নয়, উপর্যুক্ত ঘটনা থেকেই তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। আইনরক্ষক অফিসারদের দ্রুত এবং উদ্দীপনাপূর্ণ তৎপরতার ফলে দেখা গেল এসব ক্ষেত্রে শক্তিমান এবং তেজস্বী পুরুষ যদি একজনও হাজির থাকেন তার কত সুফল দেখা যায়। গোয়েন্দাদের বিকেন্দ্রীকরণ যাঁরা পছন্দ করে এই ঘটনা তাঁদের দাবিকে জোরদার করবে। এর ফলে আরও ফলপ্রদভাবে গোয়েন্দারা নিজেদের কর্তব্য সম্পাদন করতে পারবেন।

দারুণ জমকালো, তাই না? কফির কাপ ঠোঁটের কাছে ধরে কাষ্ঠ হাসি হাসে হোমস। কী মনে হয় তোমার?

আমার তো মনে হয় একই অপরাধে গ্রেপ্তার হতে হতে বেঁচে গেছি আমরা।

আমারও তাই মনে হয়। এখনও খুব নিরাপদ বোধ করছি না। উৎসাহ নতুন করে মাথা চাড়া দিলে জোন্স এখানেও দৌড়ে আসতে পারে হাতকড়া নিয়ে।

ঠিক এই সময়ে খুব জোরে বেজে উঠল সদর দরজার ঘণ্টা যুগপৎ শোনা গেল মিসেস হাডসনের নৈরাশ্য ও অনুযোগ মিশানো কাংস্যকণ্ঠ।

চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললাম–সর্বনাশ। হোমস, পুলিশ দেখছি সত্যিই এসে গেল।

পরিস্থিতি এখনও অতটা খারাপ হয়নি, ওয়াটসন। এরা আমার বেসরকারি পুলিশবাহিনী–বেকার স্ট্রিটের ঠিকে গোয়েন্দাদের দল।

কথা শেষ হতে-না-হতেই অনেকগুলো খালি পায়ের দুপদাপ আওয়াজ শোনা গেল সিঁড়িতে, সেইসঙ্গে উচ্চকণ্ঠের হট্টগোল, পরমুহূর্তেই হুড়মুড় করে ঘরে ধেয়ে এল ছেড়া জামাকাপড় পরা, ধূলিধূসরিত, নোংরা চেহারার একদল ছন্নছাড়া রাস্তার ছেলে। মহা হইচই করে প্রবেশ করলেও দেখা গেল নিয়মানুবর্তিতা বস্তুটার কিছু তাদের জানা আছে। কেননা, ঘরে ঢোকার সঙ্গেসঙ্গে চক্ষের নিমেষে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল আমাদের সামনে এবং চেয়ে রইল সাগ্রহ মুখে। এদের মধ্যে একজন মাথায় বড়ো, বয়সেও বড়ো, যাচ্ছেতাই এই কাকতাড়ুয়াদের মধ্যে সেই যেন কেষ্টবিষ্ণু, এইরকম একটা হাস্যকর খানদানি ভাব নিয়ে এগিয়ে দাঁড়িয়েছে সামনে।

বলল, আপনার টেলিগ্রাম পেয়েই ঝটপট দলবল নিয়ে চলে এলাম স্যার। টিকিটের দাম সাড়ে তিন শিলিং দেবেন।

এই নে, খুচরো পয়সা দিল হোমস। উইগিন্স, এরপর ওরা খবর পাঠাবে তোর কাছে তুই এসে খবর দিয়ে যাবি আমাকে। এভাবে বাড়িতে হামলা বরদাস্ত করব না। যাই হোক, কী করতে হবে সবাই শুনে যা ! একটা স্টিম লঞ্চ খুঁজছি আমি কোথায় কীভাবে আছে খবর দিতে হবে; লঞ্চের নাম অরোরা মালিকের নাম মর্ডেকাই স্মিথ, কালো রঙের লঞ্চ দু-পাশে দুটো লাল ডোরা, ফানেল কালো রঙের, সাদা বেড আছে। নদী যেদিকে সমুদ্রের দিকে গেছে–ওইদিকেই কোথাও পাবে লঞ্চটাকে। মর্ডেকাই স্মিথের জেটি হল মিলব্যাঙ্কের উলটো দিকে একজন ছেলে থাকবে সেখানে লঞ্চ ফিরলেই খবর দেবে। নদীর দু-পাড়েই চোখ রাখতে হবে ঠিক করে নে, কে কোথায় যাবি। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবি। পরিষ্কার হয়েছে তো?

ইয়েস গভর্নর, বলল উইগিন্স।

মাইনে পাবি আগের হারে–নৌকো যে দেখতে পাবে, সে পাবে একটা মোহর। এই নে অগ্রিম। যা, ভাগ এখন।

প্রত্যেকের হাতে একটা শিলিং দিল হোমস। বোঁ-বোঁ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল ছন্নছাড়া বাহিনী। তারপরেই দেখলাম ছুটছে রাস্তা দিয়ে।

টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পাইপ ধরাল হোমস। বলল, লঞ্চ যদি জলের ওপর থাকে, ওদের চোখে পড়বেই। ওরা সর্বত্র যেতে পারে, সমস্ত দেখতে পারে, সবার কথা পাশে দাঁড়িয়ে শুনতে পারে। মনে হয় আজ রাত্রেই আসবে খবর। যতক্ষণ না তা পাওয়া যায়, ততক্ষণ ছিন্নসূত্রেই খেই ধরা যাবে না। আমাদেরও কিছু করার নেই। অরোরা বা মৰ্ডেকাই স্মিথের খবর না-পাওয়া পর্যন্ত বসে থাক গ্যাঁট হয়ে।

এঁটোকাটাগুলো খাইয়ে দিচ্ছি টোবিকে। একটু ঘুমিয়ে নেবে? বললাম আমি। না।

আমি ক্লান্ত নই। অদ্ভুত ধাত আমার। ধকল সইতে পারি আশ্চর্যভাবে, কাজ করে ক্লান্ত হয়েছি কখনো মনে পড়ে না কিন্তু নিষ্কর্ম থাকলে একেবারে কাহিল হয়ে যাই। সুন্দরী মক্কেলের অদ্ভুত সমস্যা নিয়ে এখন তামাক খেতে খেতে চিন্তা করব। কাজটা অবশ্য খুবই সোজা–এর চাইতে সোজা কাজ পৃথিবীতে আছে বলে মনে হয় না। কেঠো পা-অলা লোক চট করে পড়ে না মানছি, কিন্তু অন্য লোকটা জানবে একেবারেই অসাধারণ।

আবার সেই লোকের কথা এসে গেল!

লোকটাকে নিয়ে তোমার কাছে রহস্য তৈরি করতে চাই না। কিন্তু লোকটা সম্বন্ধে তুমি নিশ্চয় ভেবেছ। টুকটাক খবর আর তথ্য যা পেয়েছ তার ভিত্তিতেই চিন্তা কর না কেন। আকারে ছোট্ট পায়ের ছাপ, আঙুলগুলো ফাঁক-ফুঁক, বুটের চাপে সাজানো আঙুল নয়, খালি পা, পাথর বাঁধা কাঠের গদা, দারুণ চটপটে, বিষ মাখানো খুদে তির। বল, কী বুঝলে এ থেকে?

বর্বর। বললাম সবিস্ময়ে। জোনাথন স্মলের ভারতীয় শাগরেদের কেউ নিশ্চয়!

মোটেই তা নয়। বিদঘুটে অস্ত্র দেখে প্রথমে তাই ভেবেছিলাম, পায়ের ছাপের বৈচিত্র্য লক্ষ করে অন্য ধারণা মাথায় এসেছে। ভারতবর্ষ উপদ্বীপের বাসিন্দারা কেউ কেউ মাথায় খাটো হয় ঠিকই, কিন্তু তাদের পায়ের ছাপ কম হয় না। খাঁটি হিন্দুদের পা লম্বা আর পাতলা। চটি-পরা মুসলমানদের বুড়ো আঙুল অন্য আঙুল থেকে তফাতে থাকে মাঝে চটির চামড়ার ফিতে থাকে বলে। ছোটো ছোটো এই তীরগুলো ছুঁড়তে হলে একটিমাত্র পন্থাতেই ছুঁড়তে হয় এবং তা ব্লোপাইপ থেকে–ফুঁ দেওয়া নল থেকে। এ ধরনের বর্বর কোথায় থাকে বল তো?

দক্ষিণ আমেরিকায় ঢোক গিলে বললাম।

লম্বা হাত বাড়িয়ে তাক থেকে একটা মোটা বই নামিয়ে আনল হোমস। বইখানা সদ্য প্রকাশিত–ভৌগোলিক শব্দ কোষের প্রথম খণ্ড। সর্বাধুনিক তথ্যের প্রামাণ্য গ্রন্থ। দেখ কী লেখা রয়েছে। সুমাত্রা থেকে ৩৪০ মাইল উত্তরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ। হুম? হুম! দেখ, দেখ, আরও কত কী খবর! আর্দ্র আবহাওয়া, প্রবাল প্রাচীর, হাঙর, পোর্ট ব্লেয়ার, দ্বীপান্তর কয়েদিদের ব্যারাক, রাটল্যান্ড দ্বীপ, কটন উডস, আ! এই তো পেয়েছি! বিশ্বের সবচেয়ে বেঁটে জাত বোধ হয় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীরা। কিছু নৃতত্ত্ববিদ অবশ্য এ-সম্মান দিতে চান আফ্রিকার বুশমেনদের, আমেরিকা ডিগার ইন্ডিয়ানদের এবং টিয়েরা ডেল ফুয়েজিয়ান্সদের। গড়পড়তা উচ্চতা চার ফুটের চেয়েও কম। কিছু প্রাপ্তবয়স্করা এর চাইতেও বেঁটে। এরা বড় দুর্ধর্ষ, রুক্ষ এবং অশাসনীয়। কিন্তু একবার মন জয় করতে পারলে প্রাণের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। কথাটা খেয়াল রেখো, ওয়াটসন। এবার শোনো এইটা। স্বাভাবিকভাবেই ওরা কদাকার। মাথাটা প্রকাণ্ড, নির্দিষ্ট কোনো আকার নেই। চোখ ছোটো ছোটো এবং ভীষণাকার। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকৃত১৩। হাত আর পা আশ্চর্যরকম ছোটো। অত্যন্ত দুর্দান্ত, অশাসনীয় এবং ভয়ংকর প্রকৃতির দরুন অনেক চেষ্টা করেও ব্রিটিশ শাসক এদের মাথা নোয়াতে পারেনি। জাহাজড়ুবি খালাসিদের কাছে এরা সাংঘাতিক আতঙ্ক। পাথরের গদা দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেয়, নয়তো বিষ মাখানো তির ছুঁড়ে নিমেষে মেরে ফেলে। তারপর লাশ নিয়ে নরমাংস ভোজ১৪ আরম্ভ হয়। চমৎকার অমায়িক লোক বটে, তাই না ওয়াটসন! এ-লোককে নিজের ওপর ছেড়ে দিলে নিজস্ব পদ্ধতিতে কী বীভৎস কাণ্ড করা যেত ভাবতে পার! আমার তো মনে হয় এমনকী জোনাথন স্মলও তা বরদাস্ত করত না, ওর সাহায্যই নিত না।

তা তো বুঝলাম, কিন্তু এ-লোককে সে সঙ্গী জোটাল কী করে?

আরে ভায়া, এর বেশি আর কিছু জানি না আমি। ধরে নাও যেহেতু স্মল নিজেই আন্দামানে ছিল এবং সেখান থেকেই এখানে তার আগমন, সুতরাং বিচিত্র ভয়ংকর এই দ্বীপবাসীটাও তার সঙ্গে এসেছে। সময় এলে এর সম্বন্ধে আরও খবর পাবই, নিশ্চিন্ত থেকো। ওয়াটসন, তোমাকে ভীষণ কাহিল লাগছে। শুয়ে পড়ো সোফায়, দেখি তোমাকে ঘুম পাড়াতে পারি কিনা।

কোণ থেকে বেহালা নিয়ে এল হোমস। আমি লম্বা হলাম সোফায়। অদ্ভুত একটা বাজনা শুরু করল ও। সুরটা নিশ্চয় নিজের, কেননা নতুন নতুন সুর তোলার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে ওর। স্বপ্নময়, ছন্দোময়, মিষ্টি বাজনা কানের মধ্যে দিয়ে মাথায় পৌঁছে আমাকে ঘুমের রাজ্যে নিয়ে গেল একটু একটু করে। অস্পষ্ট মনে পড়ে দীর্ঘক্ষণ হাত নেড়ে ছড়ি টানছে বন্ধুবর, চোখে-মুখে নিবিড় তন্ময়তা, তারপর মনে হয় যেন শব্দের প্রশান্ত কোমল সাগরে ভেসে যাচ্ছি, পৌঁছেছি স্বপ্নের দেশে এবং নির্নিমেষ আমার পানে চেয়ে আছে মেরি মর্সটানের মিষ্টি মুখখানি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *