০৭. রাজা ও সন্ন্যাসী

রাজা ও সন্ন্যাসী

কাপ্তেন নেমে আমাকে কী দেখিয়েছিলেন নটিলাস-এ? সব-কিছু। হয় এই ছোট্ট উত্তরটিতে পাঠকদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে, আর নয়তো এ-তথ্যটা মনে রাখতে হবে যে পাতার পর পাতা জুড়ে লিখলেও এই বিচিত্র ড়ুবোজাহাজটির ভিতরকার স্বয়ম্পূর্ণ পৃথিবীর বর্ণনা কিছুতেই সম্পূর্ণ হবে না। দেখেছিলুম মন্ত গ্রন্থাগার-সব ভাষার সব রুচির বই সাজানো আছে থরেথরে, তবে সংখ্যায় বিজ্ঞানের বই-ই বেশি; দর্শন, পুরাণ, কাব্য, সাহিত্য, ইতিহাস-এদেরও তাই বলে অবহেলা করা হয়নি। দেখেছিলুম এমন এক বিচিত্রভবন বা সংগ্রহশালা, সারা ইমোরোপে যার কোনো তুলনা মিলবে না, যা এমনকী কল্পনাকেও অনায়াসে ছাড়িয়ে যায়। যাবতীয় দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য বস্তু তো আছেই, তাছাড়াও ছিলো এমন অনেক বস্তু, যার সন্ধান পৃথিবীর কোনো বিজ্ঞানীই এখনো পায়নি। আর দেখেছিলুম রত্নশালা–যেখানে নানা রঙের নানা আকারের ছোটো-বড়ো অসংখ্য মূল্যবান মুক্তো জমিয়ে রাখা হয়েছে।

এই সংগ্রহের পিছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, তার সামান্য একভাগও সাত রাজাকে ফতুর করে দিতে পারে। অথচ এই অসীম ধনবান মানুষটির শয়নকক্ষ আমাকে আশ্চর্য করেছিলো সবচেয়ে বেশি। এ যেন কোনো সন্ন্যাসীর ঘর–নিরাবরণ ও নিরাভরণ; একটা লোহার খাট, একটা ছোট্ট টেবিল, আর হাত খোবার একটা বেসিন ছাড়া আর কিছুই নেই। এই অতুল ঐশ্বর্যের পাশেই এই সুকঠোর তপশ্চর্যা তাঁর সম্বন্ধে কি রকম যেন দুর্বল করে ফেললে আমাকে।

তারপরে এই বিদ্রোহী মানুষটি আমাকে নটিলাস-এর সব যন্ত্রপাতি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। নাবিকরা যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তার কোনোটা তার সংগ্রহ থেকে বাদ যায়নি।

নটিলাস-এর যে-দানবিক শক্তি সাত সমুদ্রকে কাঁপিয়ে তুলেছে, তার মূল হলো বিদ্যুৎ। সমুদ্রজল থেকে সোডিয়াম নিষ্কাশন করে অত্যন্ত অনায়াসে ও শস্তায় অফুরন্ত বিদ্যুৎ শক্তি বানিয়ে নেয় নটিলাস। তার প্রচণ্ড গতিবেগ, আলো আর উত্তাপের উৎসই হচ্ছে এই অফুরান বিদ্যুতের ভাণ্ডার–সিন্ধুতল। শক্তিশালী পাম্প দিয়ে বাতাস-ঘরে প্রচুর ধন-বাতাস জমিয়ে রাখতেন কাপ্তেন নেমো, যাতে জলের তলায় একটানা অনেকদিন থাকতে হলেও কোন অসুবিধে না-হয়। বিদ্যুৎচালিত ধড়ি, জাহাজের গতিমাপক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, জলস্তরের তাপমাত্রা মাপবার তাপমান যন্ত্র, বহু অতিরিক্ত গীয়ার প্রভৃতি নানাবিধ জিনিশ তিনি এক এক করে দেখালেন আমাকে।

নটিলাস-এর ঠিক মাঝখানে একটা কুয়োর মতো খাড়া সুরঙ্গ দেখতে পেলাম। কুয়োর উপরে ঘোরানো-সিঁড়ি উঠে গেছে। এটা যে কী, বা কেন এটা আছেকিছুই আমি বুঝতে পারছিলুম না। আমার কৌতূহলী চাহনি দেখে কাপ্তেন নেমো জানালেন, উপরে আমার নৌকো আছে প্রফেসর।

তাই নাকি? কিন্তু নৌকোয় চড়তে হলে নিশ্চয় নটিলাসকে জলের উপর নিয়ে যেতে হয়।

মোটেই না। নৌকোর উপরে-নিচে দুটি ঢাকনি আছে। নিচেরটা বন্ধ করে বাঁধন খুলে দিলেই, ছিপির মতো, নৌকো জলের উপর ভেসে ওঠে। তারপর পাটাতনের উপরকার ঢাকনি খুলে মাস্তুল লাগিয়ে পাল তুলে দাঁড় টানলেই হলো।

কিন্তু ফিরে আসেন কী করে?

আমি আসি না, বরং নটিলাসই আমার কাছে যায়। বৈদ্যুতিক তারের সাহায্যে বার্তা পাঠালেই জাহাজ চলে যায় আমার কাছে।

নটিলাস-এর আরেক দিকে গিয়ে সমুদ্রের নোজল পরিশ্রুত করে টলটলে পানীয় জল তৈরি করার ব্যবস্থা দেখলুম। ইঞ্জিন-ঘরটা ছিলো সবচেয়ে পিছনে। এখান থেকেই প্রচণ্ড বেগ লাভ করে নটিলাস-এর প্রপেলার ঘুরিয়ে ঘণ্টায় এমনকী পঁয়তাল্লিশ নট বেগেও জাহাজ চালানো যায়।

সব দেখে-শুনে আমরা আবার গ্যালারি-ঘরে ফিরে এলুম। একটি সোফায় বসতে বসতে বললুম, কাপ্তেন নেমো, সবই দেখতে পেলুম, কিন্তু এখনো অনেক তথ্য আমার কাছে গোপন ও রহস্যময় থেকে গেলো।

আমার দিকে একটি সিগার বাড়িয়ে দিলেন কাপ্তেন নেমো৷ নিন, আপনি নিশ্চয়ই ধূমপান করেন।

সে কি! আপনারা এখানে চুরুটও খান নাকি?

নিশ্চয়ই!

তাহলে এখনো নিশ্চয়ই হ্যাভানার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছেন আপনি?

না, তা রাখি নি। চুরুটটা যদিও হ্যাভার নয়, তবু তা আপনার ভালো লাগবে বলে আশা করি।

সোনালি রঙের চুরুট জ্বালিয়ে বুক ভরে ধোয়া নিলুম আমি। চমৎকার চুরুট। কিন্তু তামাক আছে বলে তো মনে হয় না।

না। এই তামাক হ্যাভানারও নয়, ব্ৰহ্মদেশেরও নয়। আসলে এটা সমুদ্রেরই একরকম শ্যাওলা-নিকোটিনে ভতি। অবশ্য এই শ্যাওলা খুব-যে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, তা নয়। আপনার যদি এই চুরুট ভালো লেগে থাকে, তাহলে আপনি যত-ইচ্ছে তা খেতে পারেন।

চুরুট খেতে-খেতেই আমি আবার বললুম, নটিলাস-এর রহস্য এখনো আমার

কাছে গোপন থেকে গেলো, ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টেন নেমো আমার দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে বললেন, কোনো রহস্যই আপনার গোপন থাকবে না, মঁসিয় আরেনা; সবই আপনাকে খুলে বলবে, কারণ নটিলাস থেকে আমার এই গোশল বর নিয়ে কোনোদিনই আব সভ্যশতে ফিরে যেতে পারতেন না আপনি।

একটু থেমে তিনি সব বিশদ করলেন, মঁসিয় আবোনা, নটিলাস-এর দৈর্ঘ্য পঁচাত্তর গজ। পুরো জাহাজটা দু-দুটো ইস্পাতের খোলে মোড়া আছে, একটা ইস্পাতের পাতের উপর আরেকটা ইস্পাতের পাত বসানো বলে যে-কোনো ভীষণ আঘাতও অনায়াসে প্রতিহত ও উপেক্ষা করতে পারে নটিলাস। জাহাজের ভিতরে মন্ত কয়েকটা ট্যাঙ্ক আছে–ড়ুব দেবার সময় পাম্প করে ওই জলাধারগুলো শুরে নিই। কখনো খুব গভীরে নামতে হলে নটিলাস অবশ্য হাইড্রোপ্লেনের সাহায্যে কোণাকুণিভাবে জল কেটে নামতে পারে।

কিন্তু জলের তলায় চালক পথ দেখষে কেমন করে? সিন্ধুতলে তো আর সূর্য ওঠে না।

মস্ত একটা ঘুলঘুলি বসানো স্তম্ভের মধ্যে চালক আর হুইল থাকে— দেয়ালের গায়ে আবার টেলিস্কোপও বসানো আছে। দু-পাশ থেকে তীব্র বিদ্যুতের আলোয় সমুদ্রের জল দিনের মতো ঝলমল করতে থাকে।

ও, তাহলে এই আলোকেই আমরা সিন্ধুদানবের গা থেকে ছড়িয়ে-পড়া ফসফরাসের দীপ্তি বলে মনে করেছিলুম। কিন্তু স্কটিয়া জাহাজকে আপনি খামকা হঠাৎ জখম করতে গেলেন কেন?

সেদিন নটিলাস মাত্র এক বাও তলা দিয়ে যাচ্ছিলো। তাহতেই হঠাৎ স্কটিয়ার খোলে ধাক্কা লেগে যায়।

আর অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন?

মঁসিয় আরোনা, এটা ভুলে যাবেন না যে অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন আমাকে আক্রমণ করেছিলো, তাই আত্মরক্ষার জন্যই আপনাদের জাহাজকে কেবল বিকল করে দিয়েছিলুম, ড়ুবিয়ে দিই নি।

আমি তক্ষুনি প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললুম। তাছাড়া নটিলাস-এর সম্বন্ধে আমার শ্রদ্ধা ও বিস্ময় তখন অমীমে পৌঁছেছিলো। জিগেস করলুম, আচ্ছা, এত বড়ো জাহাজটা এত গোপনে আপনি তৈরি করলেন কোথায় যে কাকপক্ষীও তার কথা টের পেল না?

একটা নির্জন দ্বীপে। টুকরো-টুকরো অংশগুলো আমি এক জায়গায় কিনি নি–তাহলে লোকের সন্দেহ হতে পারতো। নানা দেশ থেকে নানা অংশ আনিয়েছিনু আমি–খোলটা এসেছে ফ্রান্স থেকে, লণ্ডন থেকে চাকার রড, লিভারপুল থেকে ইস্পাতের বর্ম, গ্লাসগো থেকে আস্ত চাকাটা, ট্যাঙ্কগুলো বানিয়েছিলাম পারীতে, জার্মানিতে ইঞ্জিন, সুইডেনে সামনের অংশটা, আর নিউইয়র্কে সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতিগুলো। প্রত্যেকটা কারখানায় ভিন্ন-ভিন্ন নামে নক্সা আর বড়া পাঠিয়েছিলুম। তারপর একটা নির্জন দ্বীপে সব জুড়ে দিয়ে তৈরি হলো নটিলাস! তারপর নটিলাস নিয়ে অকুল পাথারে ভেসে-পড়ার আগে আগুন দিয়ে সবকিছু একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলুম, যাতে কোনোদিন আপনাদের সভ্যজগৎ এরকিছু টের না-পায়।

আপনার ঐশ্বর্যের নিশ্চয়ই সীমা নেই–

সত্যি সীমা নেই, প্রফেসর। ফরাশিদের জাতীয়-ঋণ আমি অনায়াসে নিজের একটুও অসুবিধে না-করে–মিটিয়ে দিতে পারি।

ক্যাপ্টেন নেমো কথাটা এমন নির্বিকারভাবে বললেন যে আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলুম। তিনি কি তাহলে আমাকে উজবুক বানাতে চাচ্ছেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *