০৬. নীল আকাশে তুলোর পাঁজার মতো শাদা মেঘ

নীল আকাশে কেবল তুলোর পাঁজার মতো শাদা মেঘ, তাদের গা থেকে রোদ আর আলো যেন চুঁইয়ে পড়ছে। সূর্য পূর্বদিকে অনেকখানি উঠে এসেছে, আর অনুকূল হাওয়ার গায়ে লেগে আছে তারই উষ্ণ স্পর্শ। ভিক্টরিয়া এক দমকে শূন্যে প্রায় দেড় হাজার ফিট উঠে এসে নিমেষের মধ্যে তাদের চোখের সামনে ভীষণ-সুন্দর আফ্রিকাকে উন্মোচিত করে দিয়েছিলো।

প্রথমে কথা বলে উঠেছিলো জো, কী চমৎকার দেখাচ্ছে! এই-প্রথম বোধহয় জীবনে সে নিজের থেকে কথা বললে, আর তার মধ্যে এই প্রথম তার বিস্ময়ের স্পর্শ পাওয়া গেলো। ফার্গুসন তার কথা শুনে স্মিতভাবে একটু তাকালেন কেবল, তারপর ব্যারোমিটারের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে নানারকম নোট নিতে লাগলেন। কেনেডি কথাও বললেন না, অন্য-কোনো দিকে তাকালেনও না-মুগ্ধ চোখে অপলকে সব দৃশ্য রুদ্ধশ্বাসে দেখতে লাগলেন।

ঘণ্টাদুয়েক বাদে, ঘণ্টায় আট মাইল গতিতে, আফ্রিকার মূল উপকূলে এসে উপস্থিত হলো ভিক্টরিয়া। বেলুনটিকে খুব নিচে দিয়ে উড়িয়ে নিতে চাচ্ছিলেন ফার্গুসন, কেননা তাতে ভালো করে সব দেখা যাবে। বিশেষভাবে নির্মিত চুল্লির আগুন তাই একটু কমিয়ে দিলেন তিনি। বেলুনের ভেতরকার গ্যাস ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এলো; আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেলুনটি ক্রমে-ক্রমে দেড় হাজার ফিট থেকে নেমে এলো। প্রায় তিনশো ফিট উচ্চতায় এলে পর ফার্গুসন আর তাপ কমালেন না : আপাতত এই উচ্চতা দিয়েই যাক।

আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের উজারামো নামক স্থানের ওপর দিয়ে বেলুন চলে গেলো এক মিশকালো গভীর বনের দিকে–সমুদ্রর ফেনিল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে, দূরে দিগন্তের কাছে উঁচু পাহাড়ের কালো চুড়োগুলি দেখা যাচ্ছে। ধীরে-ধীরে বন পেছনে ফেলে একটি গ্রামের উপর চলে এলো ভিক্টরিয়া। মানচিত্র দেখে বোঝা গেলো এই গ্রামের নাম কিজোটু।

গ্রামের লোকেরা বেলুনটাকে দেখতে পেয়েছিলো। বাঁশপাতার ছোটো-ছোটো ঘর থেকে দলে-দলে বেরিয়ে এলো তারা, আকাশের দিকে আবাক চোখ-মুখ তুলে দুর্বোধ্য ভাষায় সমস্বরে এত জোরে চেঁচিয়ে উঠলো যে তার খানিকটা রেশ বেলুনেও এসে পৌঁছুলো। ভয়ে, আতঙ্কে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করলে তারা প্রথমে, তারপরে সন্ত্রাসের প্রথম ধাক্কাটা কেটে যেতেই লোকগুলো রেগে উঠলো, তীরধনুক নিয়ে এসে অজস্র তীর ছুঁড়লো বেলুন লক্ষ্য করে, আকাশের দিকে। কিন্তু তাদের সব চেষ্টা নিষ্ফল হলো, তাদের বিষের তীর মোটেই বেলুনের কাছে পৌঁছুলোই না, অবলীলাক্রমেই সেই তীক্ষ্ণ তীরগুলির অনেক ওপর দিয়ে বেলুন ভেসে গেলো। তারপর ক্রমে-ক্রমে সেই গ্রামটিও পেছনে পড়ে রইলো, ক্রমে দিগন্তের কালো বন যেন তার রাক্ষুসে বিবরে গ্রামটিকে লুকিয়ে ফেললে।

এতক্ষণে ডিক কথা বললেন, সত্যি কী অদ্ভুত আমাদের এই আকাশযান! এর কাছে গাড়ি-ঘোড়া, জাহাজ-রেল কিছুই লাগে না, আর-কোনো যানবাহন থেকেই এক নিমেষে চারদিক এমনভাবে দেখে নিতে পারা যায় না। অপূর্ব! আগাগোড়া ব্যাপারটাই স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে।

কেবল তা-ই নয়, ফাসন যোগ করে দিলেন, নিজের চোখেই তো দেখলে, ডাঙার কোনো বিপদ-আপদই শূন্যে এতদূর পর্যন্ত এসে পৌঁছোয় না। এখন নিশ্চয় তুমি বুঝতে পারছো, কেন আমি বেলুনে করে যাবার পরিকল্পনা করেছিলুম। যদি তোমার কথা শুনে স্থলপথে যেতুম তাহলে কত সময় যেতো আর কত হাজার রকম ঝামেলা পোহাতে হতো, তা নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছো?

আমি তখন এতটা বুঝতে পারিনি, ডিক বললেন, তার জন্যে আমার খুব-একটা দোষ নেই। এর আগে কে আর ভাবতে পেরেছিলো যে মানুষ একদিন আকাশ জয় করে নেবে যেমনভাবে জয় করেছে জলকে। জলের জাহাজের মতো তৈরি হবে শূন্যের জাহাজও!

ফার্গুসন কেবল একটু হাসলেন।

জো জিগেস করলে, এখন কি নাস্তার ব্যবস্থা করবো? জলযোগের উদ্যোগ?

তাই-তো, জো বলাতেই জঠর জানান দিচ্ছে যে বেশ খিদে পেয়েছে। কেনেডি বলে উঠলেন : তাহলে আর দেরি কোরো না, চটপট তোমার ব্যবস্থা করে ফ্যালো, জো।

না-না, দেরি কেন হবে? বিস্কুট তো আছেই, টিন থেকে একটু শুকনো মাংস বের করে নিলেই হবে। তাছাড়া কফিও সঙ্গে প্রচুর আছে। বানাতেও কোনো অসুবিধে হবে না। ওই চুল্লিটা থেকে যত-খুশি জল গরম করে নিতে পারা যাবে। আলাদা করে আগুন জ্বালাবার কোনো দরকার নেই, তাতে বরং খামকা বিপদ ডেকে আনা হবে।

ফার্গুসন এত নির্দেশ না-দিলেও পারতেন জো-কে। সে চক্ষের পলকে সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে।

খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার সবাই নিচে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন ঘন সবুজ গাছ আর স্নিগ্ধ শস্যের খেত। এই সবুজের ভেতর প্রাণের আয়োজন কী বিপুল-প্রচুর যেন উদ্দাম সবুজের বন্যা! এমন উর্বর জমি আর-কোথায় পাওয়া যাবে? প্রকৃতি যেন মানুষের হাতে ফসলের রাশি তুলে দেবার জন্যে উশখুশ করছে, এতটুকু চেষ্টাতেই যে-কেউ ওখানে সোনা ফলাতে পারবে। এই শস্যশ্যামল কালো মাটির গায়ে কোথাও তামাক গাছের সারি, কোথাও-বা ভারতীয় শস্য, বার্লি, ধান গাছের প্রাচুর্য, অজস্র কলা, খেজুর ও নারকেল প্রভৃতি নানা গাছ উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে, মাঝে-মাঝে ছোটো-ছোটো পাহাড়, কোনোখানে আবার এমনসব গাছের সারি, যাদের কাউকেই তারা চেনেন না।

দৈত্যের মতো প্রকাণ্ড ওই গাছগুলোর নাম কী? কী মস্ত ঐ গাছগুলো, দেখেছো? এর গোটাকয়েকেই তো এমন-এক বিশাল বন তৈরি হয়ে যাবে, যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত ভেতরে পৌঁছুতে পারবে না। কী নাম এগুলোর, জানো?

এ-গাছের নাম বাওবাব, ফার্গুসন উত্তর দিলেন, এখানকার ভাষায় এর অন্যএকটা নাম আছে। এ-দেশের আদি বাসিন্দারা একে বলে বাঁদুরে রুটি গাছ। ওই দ্যাখো আরেকটা কী মস্ত গাছ-ওটা প্রায় একশো ফিট মোটা হবে।

আফ্রিকার পুবদিকে ভারত সাগরের মধ্যে মোম্বাসা হচ্ছে একটি ছোটো দ্বীপ, তার বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় হাজার চল্লিশ। হাতির দাঁত, চামড়া আর রবারের ব্যাবসার জন্যে এই দ্বীপে অনেক লোক আনাগোনা করে। বহুদিন থেকেই দ্বীপটি ইতিহাসবিখ্যাত হয়ে আছে। ১৯৯০ সালে বিখ্যাত নাবিক ভারত-আবিষ্কারক ভাশকু-ডা-গামা এখানে এসেছিলেন। সেই সময় একজন আরব সর্দার তাকে জাহাজগুদু ড়ুবিয়ে মারার চক্রান্ত করেছিলো। দৈব সহায় ছিলো বলে কোনো গতিকে এই চক্রান্তের কথা আগেই জেনে গিয়েছিলেন ভাকু-ডা-গামা, আর জেনেই মহা খাপ্লা হয়ে মোসাকে তিনি তোপের মুখে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু এখানকার সুলতান অনেক অনুনয়-বিনয় করে তাকে ঠাণ্ডা করেন। মোম্বাসার প্রধান রাজপথ ভাকু-ডা-গামা স্ট্রিট আজও এই অবিস্মরণীয় নাবিকের স্মৃতি বহন করছে। মোম্বাসা শহর প্রতিষ্ঠিত হয় প্রায় হাজার বছর আগে, কিন্তু শহরটি যে তার চেয়েও ঢের পুরোনো, তা এখানে-আবিষ্কৃত প্রাচীন চিন, মিশর ও পারস্য দেশের অনেক জিনিশ দেখে বোঝা যায়। ১৫০৫ থেকে ১৭২৯ সাল পর্যন্ত এই দ্বীপটি ছিল পর্তুগিশদের অধীনে—এই নিয়ে আরবদের সঙ্গে পূর্তুগিশদের অনেকবার লড়াইও হয়ে গিয়েছে। ১৬৯৬ সালের মার্চ মাস থেকে সুদীর্ঘ সোয়া তিন বছর ধরে পর্তুগিশরা আরবদের দ্বারা এই দ্বীপে অবরুদ্ধ হয়ে থাকে; পুর্তুগাল থেকে সাহায্য পাবার আশায় অবরুদ্ধ পুর্তুগিশরা প্রাণপণে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের আশা সফল হয়নি। দুর্ধর্ষ আরবদের তলোয়ারের মুখে পর্তুগিশদের আবালবৃদ্ধবনিতার প্রাণ যায়; কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর ঠাট্টা যে কত নিদারুণ হতে পারে তাই প্রমাণ দেবার জন্যে, সেই হত্যাকাণ্ডের ঠিক দু-দিন পরেই পুর্তুগাল থেকে সাহায্য এসে উপস্থিত হয়। কিছুদিন পরে মোম্বাসা আবার পুর্তুগিশদের হাতে গেলেও তাদের সেই প্রাধান্য স্থায়ী হতে পারেনি। মোসা এখন জানজিবারের সুলতানের অধীনে। আফ্রিকার বিপুল অভ্যন্তরে কত-যে গভীর জঙ্গল, দুর্গম গিরিমালা ও বিজন মরুভূমি লুকিয়ে আছে মোম্বাসাকে দেখলে তা কিছুই মনে হয় না।

সম্ভব হলে জানজিবার থেকে মোম্বাসা হয়েই যেতেন অভিযাত্রীরা! কিন্তু জানজিবার থেকে বেলুন হাওয়ার তাড়নে আফ্রিকার উপকূলে গিয়ে পৌঁছুলো-হাওয়ার গতি ছিলো উত্তর-পশ্চিম দিকে। বোঝা গেলো বেলুন মোম্বাসার ঠিক ওপর দিয়ে যাবে না বটে, তবে তার কিছু দূর দিয়ে তাকে অতিক্রম করেই ভিক্টরিয়া হ্রদের ধার ঘেঁসে নীলনদের দিকে চলে যাবে।

বিষুবরেখার নিকটবর্তী অঞ্চল বলে এখানকার দিন আর রাতের মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি। দিনের বেলা বেশ গরম, সকালে-সন্ধেয় থাকে আরামদায়ক উষ্ণতা, আর রাতে ঠাণ্ডা পড়ে। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের উঁচু এলাকায় উচ্চতার জন্যে উত্তাপ কিছু কম থাকে–কিন্তু যত উত্তরে যাওয়া যায় গরমের প্রবলতা ততই বেশি। এ-দেশের বেশির ভাগ জায়গার জলবায়ুই হচ্ছে চরম প্রকৃতির—অনেকটা মরা ধুলোর মরুভূমির মতো—তেমনি উগ্র আর পরস্পর-বিরোধী আবহাওয়া।

যে-সব জায়গায় বৃষ্টিপাত তুলনায় বেশি, সেখানেই বনভূমি দুর্গম।সেই বনে আছে রুপোলি ইউক্যালিপটাস, কপূর, দেবদারু আর বাঁশের ঝাড়। কোনোখানে আবার সিডার গাছের দীর্ঘ বন। মরুভূমির স্পর্শলাগা অঞ্চলে রয়েছে নানা রঙের গুল্ম আর চারাগাছের ঝোপ। কোনো-কোনো এলাকায় কফি আর চায়ের চাষ হয়।

সন্ধে সাড়ে ছটায় ভিক্টরিয়া ডাথুমি নামক পর্বতের কাছাকাছি এসে উপস্থিত হলো। এই পর্বত অতিক্রম করার জন্যে আরো তিনশো ফিট উঁচুতে তুলতে হবে বেলুনকে, ফার্গুসন সেইজন্যে তার চুল্লির তাপ আঠারো ডিগ্রি বাড়িয়ে দিলেন। দেখতে দেখতে ওপরে উঠে গেলো বেলুন, অনায়াসেই ডিঙিয়ে গেলো সেই উঁচু পর্বত।

ওপরে যত তাড়াতাড়ি ওঠা যায়, নিচে নামতে তার চেয়ে ঢের বেশি সময় লাগে। নামতে-নামতে একসময় কার থেকে নোঙর নামিয়ে দেয়া হলো। একটি বিরাট বাওবাব গাছের ডালে সেটি ভালোভাবে জড়িয়ে যেতেই বেলুন থেমে গেলো, সঙ্গে-সঙ্গে দড়ির মই নামিয়ে দিয়ে জো নিজে নেমে এসে নোঙরটাকে ভালো করে ডালের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিলে, তারপর সেই রেশমি মই বেয়ে আবার কার-এ উঠে এলো। বেলুন নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো, পুবদিকে পাহাড়ের আড়াল থাকায় হাওয়ার চাপ লাগলো না তার গায়ে, আর তাই থেমে গেলো তার কাঁপুনিও।

রাতের মতো বিশ্রাম এখানে।

হিংস্র বনভূমির কালো রাত, ঠাণ্ডাও বেশ পড়েছে। কত-রকম অজ্ঞাত বিপদের আশঙ্কা থাকতে পারে, তার ঠিক নেই। কাজেই সাবধানে থাকার জন্যে ঠিক করা হলো পালা করে তিনজনে সারারাত পাহারা দেবেন। ফার্গুসন দেবেন নটা থেকে বারোটা, কেনেডি বারোটা থেকে তিনটে, আর জো বাকি সময়টুকু—সকাল ছ-টা পর্যন্ত।

রাতের খাওয়া সাঙ্গ করে খানিকক্ষণ নানা বিষয়ে আলোচনা করে কেনেডি কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন, জো-ও তাই করলে; কেবল ফার্গুসন অতন্দ্র পাহারায় জেগে বসে থাকলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *