০২. বৈজ্ঞানিকের খেয়াল

০২. বৈজ্ঞানিকের খেয়াল

বুকটা কেঁপে উঠলো। যে ভয় করছিলাম, শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো।

তখন অবশ্য মিছিমিছি বেশি মাথা ঘামালাম না। কাকামণি তো একেবারে পাগল নন। ভাল-মন্দ বুঝবার শক্তি নিশ্চয়ই তাঁর আছে। পৃথিবীর অন্তঃপুরে ঘুরে বেড়ানো কি আর সম্ভব? তাই তখনকার মতো সব ভাবনা-চিন্তা ঝেড়ে ফেলে খাবার ঘরে ঢুকলাম।

ঢুকে দেখি, কাকামণি পর্বতপ্রমাণ খাবার নিয়ে বসেছেন। কালকে সারাদিনে খাওয়া-দাওয়া হয়নি, তাই আজ তার শোধ তুলছেন।

খাওয়া-দাওয়া চুকে গেলে কাকামণি আমাকে আবার পড়ার-ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। চেয়ারে আয়েস করে গা এলিয়ে দিয়ে কাকামণি বললেন, অ্যাকজেল, তুই যে আমার কী উপকার করেছিল তা বলে বোঝাতে পারবো না। কিন্তু সাবধান, এ-কথা যেন কাক-পক্ষীও টের না পায়। একবার যদি কেউ এ কথা জানতে পারে, অমনি সেফেলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো লেগে যাবে।

আমি বাধা দিয়ে বললাম, আচ্ছা কাকামণি, তুমি কি মনে করো লোকে এ-কথা বিশ্বাস করবে?

সকলের কথা বলতে পারিনে। কিন্তু কোনো বিজ্ঞানী এ-কথা জানতে পারলে তখুনি যে আইসল্যাণ্ডে ছুটবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই!

আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না। চিরকুটের কথাগুলো যে সত্যি, তার তো কোনো প্রমাণ নেই?

কাকামণি আমার কথা শুনে তো রেগেই অস্থির! তুই বলতে চাস স্যাক্‌ন্যুউজম মিথ্যে কথা লিখে গেছেন? তা, তোমার মতো গবেট এ-কথা বলবে না তো কে বলবে? সেদিন পিটার্মানের কাছ থেকে যে ম্যাপখানা পেয়েছি, নিয়ে আয় সেটা। তোকে সবকিছু দেখিয়ে দিচ্ছি।

ম্যাপটা টেবিলের উপর বিছিয়ে কাকামণি বলে চললেন, এটা হলো আইসল্যাণ্ডের সবচেয়ে ভালো ম্যাপ, সমস্ত খুঁটিনাটি দেয়া আছে। এই দ্যাখ, কতোগুলো আগ্নেয়গিরি এখানে। এদের অনেকগুলোই এখন মরে গেছে। এবার এদিকে দ্যাখ, আইসল্যাণ্ডের এটা পশ্চিম উপকূলে। এটা হলো আইসল্যাণ্ডের রাজধানী রিজ কিয়াভি। এই উপকূলে অগুন্তি পর্বতময় ঘাঁটি আছে। এইটে হলো পয়ষট্টি ডিগ্রি অক্ষাংশ। আর এটা হলো একটা ছোটো উপদ্বীপ। এবার এর বরাবর উপরে তাকিয়ে দ্যাখ। বল দিকিন এটা কী?

সমুদ্রের কোল থেকে একটা পাহাড় উঠেছে।

এই পাহাড়টাই হলো স্নেফেল। এই পাহাড়ের চুড়ে পাঁচ হাজার ফুট উঁচু। এই চুড়োর উপরে যখন স্কার্টারিস পর্বতচুড়োর ছায়া পড়বে, তখন পাওয়া যাবে পৃথিবীর অভ্যন্তরে যাবার পথ।

অসম্ভব! সে কী করে হবে? এই আগ্নেয়গিরির মধ্যে হয়তো এখন জ্বলন্ত আগুন, অঙ্গার, ছাই, ধাতু, লাভা-সবকিছুই আছে–

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কাকামণি বললেন, পৃথিবীর বেশির ভাগ আগ্নেয়গিরিই তো এখন নিভে গেছে। এইটে যে যায়নি তা তুই কী করে জানলি? বাবোশো উনিশ সালে স্নেফেল শেষবার অগ্ন্যুদ্গার করেছিল। এরপর থেকে তো একদম চুপ করে আছে।

বলেই চললেন কাকামণি : সাকৃউজম যে কতত হুঁশিয়ায় হয়ে এ-কথা লিখে গেছেন, তা তুই বুঝতে পারিসনি এখনো। আমাদের যাতে কোনো ভুল না হয় সেজন্য তাঁর কতো সতর্কতা, সেটা তুই খেয়াল করেছিস? স্নেফেলের অনেকগুলো জালামুখ। যে-জ্বালামুখটা দিয়ে ঢুকলে একবারে পাতালে পৌঁছনো যায়, সেটা বোঝানোর জন্যেই জুলাই মাসের কথা উল্লেখ করেছেন উনি। জুলাই মাসের গোড়ার দিকে স্কার্টারিস পর্বতচুড়োর ছায়া ঠিক সেই নির্দিষ্ট মুখের উপর পড়ে। এটা উনি খুব ভালো করে লক্ষ্য করেছিলেন বলেই লিখে গেছেন। এর পরও কি ওঁকে অবিশ্বাস করা চলে?

কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে সাকউজম তার দেশের চলতি প্রবাদ শুনেই এ-কথা লিখে গেছেন? আইসল্যাণ্ডের লোকেদের হয়তো ধারণা ছিলো যে এই পাহাড়ের মুখ দিয়ে একেবারে পৃথিবীর মধ্যখানে গিয়ে পৌঁছনো যায়। এমন প্রবাদ তো কতো দেশেই শুনতে পাওয়া যায়। এইটেও হয়তো তেমনি একটা কিছু।

কাকামণি চটে উঠে বললেন, আর-কিছু বলবার আছে তোর?

আছে! বললাম আমি। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যে যাওয়া অসম্ভব, বিজ্ঞান সে-কথা জোর গলায় বলে। বিজ্ঞান বলে যে, পৃথিবীর ভিতর অসহ্য উত্তাপ, যে-উত্তাপে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। পৃথিবীর নিচে প্রতি সত্তর ফুট অন্তর এক ডিগ্রী করে উত্তাপ বাড়ে। সে হিশেবে পৃথিবীর ঠিক মধ্যখানের উত্তাপ দাঁড়ায় তিন লক্ষ হাজার বত্রিশ ডিগ্রির কাছাকাছি। সেখানটা গ্যাসে ভরা।

তাহলে তোর প্রধান আপত্তি হলো সাঙ্ঘাতিক উত্তাপ, তাই না?

জোর গলায় বললাম, নিশ্চয়ই! বিজ্ঞান এ-কথাও বলে যে, পৃথিবীর ত্রিশ মাইল নিচু পর্যন্ত মাটি, বালি বা কাদা। তারপরেই জ্বলন্ত তরল পদার্থ।

কাকামণি রাগ করে বলে উঠলেন, আমোক কি আর কথায় বলে–অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী! পৃথিবীর নিচে কী হচ্ছে-না-হচ্ছে সে-কথা কেউই নিশ্চয় করে বলতে পারে না, সবই আন্দাজের ব্যাপার। বিজ্ঞান তো এখনো রীতিমতো শিশু। সে আজ যে-কথা বলে, কালকেই তার উল্টো কথা বলে। তুই নিশ্চয়ই মস্ত বড়ো বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক পোজঁসের নাম শুনেছিস। উনি কি বলেন নি যে, যদি পৃথিবীর নিচে তিন লক্ষ ষাট হাজার বত্রিশ ডিগ্রি উত্তাপ থাকতো, তবে ঐ ভয়ঙ্কর উত্তাপ ভিতরে বন্ধ করে রাখার ক্ষমতা উপরের এই ত্রিশ মাইল মাটির মোটই থাকতো না-কবে ভেঙে-চুরে গুড়ো গুড়ো হয়ে যেত। আর শুধ পোঅঁস নন, আরো অনেকেই সে-কথায় সায় দিয়েছেন। পৃথিবীর ভিতরে যে গ্যাস বা আগুন নেই, এ তো সবাই জানে। হাজার-হাজার বছর আগে যে-সব আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুদ্গার করত, এখন তার বেশির ভাগই মরে গেছে। তার মানে কি এই নয় যে, পৃথিবীর অভ্যন্তর ক্রমশ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে! যাক-এ নিয়ে তোর সঙ্গে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। চাক্ষুষ প্রমাণ নিলেই সতিমিথ্যে বোঝা যাবে। আঠারো শো পঁচিশ সালে স্যর হাফ্রি ডেভির সঙ্গে আমার তর্ক বেধেছিলো যে, পৃথিবীর অভ্যন্তর এখনো তরল আছে কি না। শেষে মীমাংসা হলো যে তরল থাকতেই পারে না।

কোন যুক্তির উপর নির্ভর করে তোমরা সিদ্ধান্ত করেছিলে?

কাকামণি হেসে বললেন, এ তো খুব সহজ ব্যাপার। যা-কিছু তরল, তা-ই সমুদ্রজলের মতো চন্দ্রের আকর্ষণের পাল্লায় পড়ে। পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ যদি তরল হতো তাহলে নিশ্চয়ই দিনে দুবার করে তা জোয়ারের মতো ফুলে-ফেঁপে উঠতো। তাতে নিয়মিত সময়ে দু-বার করে ভূমিকম্প হতো দিনে।

আমি আর কোনো যুক্তি খুঁজে না পেয়ে বললাম, কিন্তু পাতালে যাবে কী করে? যা অন্ধকার–

কেন? টর্চ নেই?

শুকনো গলায় বললাম, তাহলে পৃথিবীর অভ্যন্তরে গেলেও যাওয়া যেতে পারে?

উত্তেজিত হয়ে কাকামণি বললেন, তার মানে? নিশ্চয়ই যাওয়া যাবে। নইলে এতক্ষণ ধরে তোকে কী আর বোঝালাম?

আমি আর কোনো কথা না বলে নীরবে পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। কাকামণির কথা শুনে মাথাটা ঝিমঝিম করলো। একটু ঠাণ্ডা হাওয়ায় বেড়িয়ে এলে ভালো লাগবে বলে মনে হলো। পথে বেরিয়ে লক্ষ্যহীনের মতো অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম। কিন্তু মনে হলো যেন হ্যামবুর্গ শহরে একটুও হাওয়া নেই।

কাকামণির কথা শুনে বোঝা গেছে যে, পৃথিবীর অভ্যন্তরে না গিয়ে ছাড়বেন না কোনোমতেই। অথচ পাতালে যাওয়া যায় বলে আমার বিশ্বাস হতে চাইছিলো না। যতোই যুক্তি দেখান কাকামণি, পৃথিবীর অভ্যন্তরে নিশ্চয়ই দিনরাত আগুন জ্বলছে। মানুষের পক্ষে কি আর সেখানে যাওয়া সম্ভব?

অনেকক্ষণ পর বাসায় ফিরে এসে দেখলাম, গ্লোবেন হোস্টেল থেকে ফিরে এসেছে কী উপলক্ষে দিন-দুয়েকের ছুটি পেয়েছে বলে। ওকে দেখতে পেয়ে সবকিছু খুলে বললাম। ও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, এ তো খুব গৌরবের কথা, অ্যাকজেল। ভয় কিসের? সম্ভব হলে আমিও তোমাদের সঙ্গে যেতাম। ইতিহাসে তোমাদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। ভাবতেও তো আমার রীতিমতো হিংসে হচ্ছে।

এ-কথার জবাবে আর কী বলতে পারি আমি? চুপচাপ নিজের ঘরে চলে এলাম। সারা রাতটা কাটলো পাগলের মতো নানান এলোমেলো চিন্তায়। ভোরের দিকে কখন ঘুম এসেছিলো জানি নে, ভাঙলো লোকজনের শোরগোলে। কাকামণি একলাই চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করে তুলেছেন।

হঠাৎ ঝড়ের মতো আমার ঘরে ঢুকলেন কাকামণি। তখনো শুয়ে আছি দেখে রেগে উঠলেন একেবার। শিগগির, শিগগির ওঠ! চটপট জিনিশপত্র গুছিয়ে নে। আমার কাগজপত্রও সব নি কিন্তু।

ভ্যাবাচাকা খেয়ে চিঁ-চিঁ করে বললাম, সত্যিই তবে যাব আমরা?

সত্যি না তো কি মিথ্যে? কালই তো আমরা রওনা হবে। তাড়াতাড়ি ওঠ তুই-এই বলে আমাকে আরো হতভম্ব করে দিয়ে কাকামণি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

খানিকক্ষণ বাদে সম্বিত ফিরলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। সেখানে তখন ভীষণ ব্যাপার। বাক্স, পোর্টম্যান্টো, দড়ির মই, গিঠদেয় দড়ি, মশাল, বড়োবড়ো শিশি-বোতল, কুঠার, গাইতি-কতো কী ছড়ানো!

এমন সময় পিছন থেকে গ্রোবেন আমায় ডাক দিলে। বললে, অতো ভয় পাচ্ছে। কেন তুমি? বাবার সঙ্গে এইমাত্র আমার আলোচনা হলো। যা বললেন তাতে বুঝলাম, যে কাজে তোমরা নামছ, তা মোটেই অসম্ভব নয়। আমার মন বলছে, তোমরা সফল হবেই।

গ্রোবেনের দৃঢ় গলা শুনে একটু জোর পেলাম মনে। ওকে সঙ্গে নিয়ে কাকামণির ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। আচ্ছা কাকামণি, যেতেই যদি হয়, তবে এতে তাড়াহুড়ো করবার দরকার কী? এখনও তো ঢের সময় হাতে আছে। এখনও তো মে মাসই শেষ হয়নি–

আইসল্যাণ্ড তত আর দুদিনের পথ নয়-বললেন কাকামণি জুনের শেষের দিকে আমাদের স্নেফেলের উপর উঠতে হবে। তারপর জুলাই মাসের গোড়ার দিকে সে পয়লা জুলাইও হতে পারে, দোসরাও হতে পারে–আমাদের কেটারের মধ্য দিয়ে নিচে নামতে হবে। এ ছাড়া এক্ষুনি কোপেন–

হেগেনের জাহাজের আপিস থেকে আইসল্যাণ্ডের টিকিট কাটতে হবে। কারণ, মাসে শুধু একবার কোপেনহেগেন থেকে জাহাজ ছাড়ে আইসল্যাণ্ডের দিকে। এ মাসে সে তারিখটা হলো বাইশে মে। কাজেই দেখ-হাতে মোটেই সময় নেই আমাদের।

বললাম, কিন্তু বাইশে জুন জাহাজে চড়লেও তো চলে।

না, চলে না। কাকামণি যেন একটু রেগে উঠলেন : তাতে প্রচুর দেরি হয়ে যাবে। কারণ, কখন যে স্কার্টারিস পর্বতচুডোর ছায়া স্নেফেলের উপর পড়বে, তার কোনো ঠিক নেই। সেইজন্যে আমাদের সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। তাই কোপেনহেগেনে যতো শিগগির পৌঁছুনো যায় ততই ভালো।

সুতরাং সারাদিন জিনিশপত্র গোছগাছ করতেই কাটল। সন্ধেবেলা কাকামণি জানালেন যে, পরদিন ভোর ছটায় আমরা রওনা হবে।

রাত দশটার সময়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম কি আর সহজে আসে? রাত সতো গভীর হলো, ততোই ভয় করতে লাগলো। তার থে; কটা দুঃস্বপ্নও দেখলাম। মনে হলো, যেন পৃথিবীর অভ্যন্তরে নেমেছি। নিরেট অন্ধকার। চলতে-চলতে এক সময় এক গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলেছি। হঠাৎ আছাড় খেয়ে পড়েছি একটা বড়ো পাথরে, আর সঙ্গে-সঙ্গে সারা পৃথিবী ভেঙে পড়েছে আমার গায়ের উপর। সঙ্গে-সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেলো। ঘড়িতে তখন পঁচটা বাজে।

হাত-মুখ ধুয়ে জামা-কাপড় পরে নিচে নেমে দেখি কাকামণি প্রাতরাশে বসেছেন। আমাকেও তাড়াতাড়ি প্রাতরাশ করে নিতে বললেন। এখুনি রওনা হতে হবে।

সাড়ে পাঁচটার সময় একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেলো ফটকের সামনে। মালপত্র তোল। হলো গাড়িতে। গ্রোবেনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আর কাকামণি গাড়ির ভিতরে গিয়ে বসলাম। গাড়ি ছেড়ে দিলো। চলতে লাগলো স্টেশনের দিকে।

One thought on “০২. বৈজ্ঞানিকের খেয়াল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *