০২. আমি, পিয়ের আরেনা

আমি, পিয়ের আরেনা

আমার নাম পিয়ের আরোনা। পারী মিউজিয়ামের প্রাকৃতিক ইতিহাসের অধ্যাপক আমি। সেই সূত্রেই আমাকে কিছুকাল আগে নেব্রাস্কা যেতে হয়েছিলো অতীব দুষ্প্রাপ্য কিছু উদ্ভিদ প্রাণীসংগ্রহের অভিযানে। ফ্রাসে ফেরার পথে নিউইয়র্কে এসে আমি যখন সংগৃহীত জিনিশগুলির একটা তালিকা তৈরি করছি, তখনই এই অতিকায় সিন্ধুদানবের জনরব বিস্ফোরণের মতে ফেটে পড়লো।

সত্যি এটা কোনো সামুদ্রিক প্রাণী কিনা প্রাকৃতিক ইতিহাসের অধ্যাপক বলে এ-সম্বন্ধে মতামত চাওয়া হলো আমার কাছে। নিউইয়র্ক হেরাল্ড কাগজের প্রতিনিধির অনুরোধে ৩০শে এপ্রিল আমি একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলুম। সমুদ্রতল যে এখনো কৌতূহলী ও উন্মুখ মানুষের কাছে বিষম রহস্যের আধার, এটাই ছিলো আমার প্রবন্ধের মূল বক্তব্য। পৃথিবীর মাত্র একভাগ স্থল, বাকি তিনভাগই জল-আর সেই জলের তলায় কী আছে, তার কতটুকুই বা আমরা জানি। আমরা কেবল কতগুলো অনুমান ও ধারণা করতে পারি মাত্র। যদি সমুদ্রতলের সমস্ত জীবদের কথাই আমরা এতদিনে জানতে পেরে থাকি, এবং যদি বিভিন্ন দেশের সরকার সত্যিই কোনো প্রবল ও গোপন ড়ুবোজাহাজের অস্তিত্ব অস্বীকার করে থাকেন, তাহলে বলা বাহুল্য আমি প্রবন্ধে বললুম–জিনিশটি আসলে একটি অতিকায় নারহোয়াল–অর্থাৎ বিকট খঙ্গের মতো দন্তময় সেই মহাকায় সামুদ্রিক ড্রাগন, মেরুবলয়ের হিমজল যার গোপন আবাস। অবশ্য নারহোয়ল যে ষাট ফুটের বেশি লম্বা হয়, তা এতকাল আমরা জানতুন না—অথচ নানা তথ্য থেকে জানা গেছে যে এই হিংস্র ও খুনে নারহোয়ালটি প্রায় সাড়ে তিনশো ফুট লম্বা। এমন হতে পারে যে আদিকালের একটি নারহোয়ল প্রকৃতির কোনো অদ্ভুত খেয়ালে এই উনবিংশ শতাব্দীর আধুনিক কালেও কোনোক্রমে বেঁচে ছিলো—সে-ই হঠাৎ সমুদ্রতল আলোড়িত করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে নারহোয়ল বা সী-ইউনিকর্ন বলে মনে করার কারণ স্কটিয়া জাহাজের লোহার পুরু চাদরের খোলের মধ্যে ওই বিপুল ও আকস্মিক ছাদাটি-কারণ কেবলমাত্র নারহোয়ালেরই মাথায় ইস্পাতের মতো কঠিন ও সুদৃঢ় খঙ্গ থাকে, যার এক ধাক্কায় এমনকী লোহার পুরু চাদর শুদ্ধ, ফুটো হয়ে যেতে পারে। অবশ্য আমার এই আন্দাজ যে পুরোপুরি সত্যি, তা বলি না। কারণ এই অতিকায় জীবটি সম্বন্ধে হয়তো সমস্ত তথ্য এখনও আমরা জানি না।

আমার প্রবন্ধের সারমর্ম মোটামুটি এই। কিন্তু এই প্রবন্ধ বেরুবার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে নানারকম জল্পনা শুরু হয়ে গেলো। এদিকে আবার আরো জাহাজড়ুবির খবর আসতে লাগলো; সবাই যে এই নারহোয়লের খড়ের আঘাতের ফল, তা নয়। তবু চারদিকে একটা বিষম আতঙ্কের রেশ পড়ে গেলো। সবাই ভাবলে যে এই অতিকায় খুনে জীবটিই বুঝি সব সর্বনাশের মূল।

অবস্থা যখন এইরকম, তখন মার্কিন নৌবহর স্থির করলে যে এই সামুদ্রিক আতঙ্ক দূর করার জন্ঠে তারা একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। সমুদ্রের এই বিভীষিকার সঙ্গে সরাসরি লড়াই করবে এই জাহাজ; মস্ত কামানওলা এই জাহাজটির নাম অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন। অভিযানের নেতৃত্ব দেয়া হয়েছে ক্যাপ্টেন ফ্যারাটের ওপর; তার অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তা এই বিভীষিকাটি নিপাত করার কাজে যথেষ্ট সাহায্য করবে।

ব্রুকলিন জাহাজঘাটা থেকে আব্রাহাম লিঙ্কন ছেড়ে যাওয়ার ঠিক তিন ঘণ্টা আগে আমার কাছে নিচের চিঠিটা এসে পৌঁছুলো।

মহাশয়, অনুগ্রহপূর্বক আপনি আব্রাহাম লিঙ্কনের সামুদ্রিক অভিযানে যোগদান করিলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার আপনার মাধ্যমে ফরাশি দেশকে ইহাতে লাভ করিতে পারিনা অনুগৃহীত ও আনন্দিত হইবে। ক্যাপ্টেন ফ্যারাগুট আপনার জন্য একটি কেবিন নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন।

বশম্বদ
মার্কিন নৌবহরের সম্পাদক
জে. বি. হবসন।

এই চিঠি পাবার আগে, চাঁদে পাড়ি দেবার মতে, এই সামুদ্রিক অভিযানে বেরোবার সম্ভাবনাটা স্বপ্নেও আমার মনে জাগেনি। কিন্তু হঠাৎ এই চিঠিটা পাবার পরই মনে হলো পৃথিবীর সব সম্পদের বিনিময়েও এই সোনালি সুযোগ আমি হাতছাড়া করতে পারবো না।

তক্ষুনি অধীরভাবে আমার পরিচারক কোনসাইলকে ডাক দিলুম। কোনসাইল আসলে ওলন্দাজ, সাহসী বিশ্বস্ত ও অনুগত। আমার সমস্ত অভিযানেই সে সঙ্গী হয়, কোনো প্রশ্ন তোলে না, নীরব কর্মীর মতো সমস্ত করে ফ্যালে মুহূর্তে, কোনো কিছুতেই তার বিস্ময় নেই। ফলে ক্ষিপ্রহাতে জিনিশপত্র গোছাতে-গোছাতে কোনসাইল যখন শুনলো যে আমরা এবার এই সিন্ধুদানবের বিরুদ্ধে অভিযানে বেরোচ্ছি, সে মোটেই অবাক হলো না; আমার কথার ফাকে-ফাকেই চটপট সে সব গুছিয়ে নিলে। আমার অভিযানের নিদর্শন ও সংগ্রহগুলো আমি পারী বিচিত্রা ভবনে পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিলাম। অতঃপর যখন কোচবাক্সে বসে আমরা নিউইয়র্কের জাহাজঘাটায় পৌঁছোলুম, তখন দেখি অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন তার সামুদ্রিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে তার মস্ত দুটি চিমনি দিয়ে ভলকে ভলকে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

তক্ষুনি আমাদের মালপত্র জাহাজে তুলে ফেলা হলো। আমরাও জাহাজে গিয়ে উঠলুম। একজন নাবিককে জিগেস করতেই সে আমাকে এক হাসিখুশি অফিসারের কাছে নিয়ে এলো। তিনি আমাদের দেখেই হাত বাড়িয়ে দিলেন। জিগেস করলেন, মঁসিয় পিয়ের আরোনা?

আমি স্বয়ং, উত্তর দিলুম আমি, আপনি ক্যাপ্টেন ফ্যারাশুট তো?

সশরীরে বর্তমান। আপনার কামরা তৈরি আছে, প্রফেসর।

তাঁকে ডেকের উপরে রেখেই কোনসাইলকে নিয়ে আমি আমার কেবিনে গিয়ে ঢুকলুম।

লং-আইল্যাণ্ডের হলদে বেলাভূমি ছেড়ে অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন যখন তার অভিযানে বেরোলো, তখন তিনটে বাজে! তীরে হাজার-হাজার নরনারী দাঁড়িয়ে রুমাল উড়িয়ে আমাদের বিদায় জানালে। এমনকী মস্ত একটা বড়োপাল্লার কামান থেকে তোপধ্বনিও করা হলো আমাদের বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে। রাত যখন আটটা, তখন ফায়ার-আইল্যাণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব দিয়ে অতলান্তিক মহাসাগরের ফেনিল, কালো ও রহস্যময় জলের মধ্যে গিয়ে পড়লো, অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন।

তিমি শিকারের যাবতীয় শরঞ্জাম টাল করে রাখা ছিলো জাহাজে। কেবল যে হাতে ছেড়ার শাদাশিধে হারপুনই ছিলো তা নয়, এমনকি অতি-আধুনিক হারপুন-বন্দুক শুদ্ধ, বাদ যায়নি। আর ছিলো নেড ল্যাণ্ড-হারপুন ছোড়ার রাজা। বয়েস তার চল্লিশের মতো আমারই প্রায় সমান–; ঢ্যাঙা, অসুরের মতো চেহারা, ছ-ফুটের উপর লম্বা, গম্ভীর অথচ দিলদরিয়া, কিন্তু যখন তখন ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে; ক্ষিপ্রতায়, দুঃসাহসে ও কৌশলে তার জুড়ি নেই বলেই কোনো অতি চালাক তিমির পক্ষেও তার হারপুনকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তীক্ষ্ণ্ণ-প্রবল দৃষ্টিশক্তি তার মুখের মধ্যে দৃঢ়তার রেশ এনে দিয়েছে। এই অকুতোভয় মানুষটিকে নিয়োগ করে ক্যাপ্টেন ফ্যারাসুট যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে আমার কোনো সন্দেহ ছিলো না।

ক্যাপ্টেন ফ্যারাট অবশ্য আরেকটি কাজও করেছিলেন। ওই খুনে জানোয়ারটাকে যে সবচেয়ে আগে দেখতে পাবে, তাকে দু-হাজার ডলার পুরস্কার দেয়া হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন তিনি। ফলে সকলেরই উৎসাহ খুব বেড়ে গিয়েছিলো। প্রত্যেকেই দিনরাত ডেকের উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্রের অথৈ জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতো।

কিন্তু কোথায় কী? সেই অতিকায় সিন্ধুদানবের কোন পাত্তাই পাওয়া গেলো না। শেষকালে কেপ হর্ন পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়লুম আমরা। কিন্তু তবু সেই সিন্ধুদানবের কোনো চিহ্নই নেই। তবে কি সমস্ত জনব আসলে কোনো অমূল কল্পনা? কোনো অলীক স্বপ্নবিলাস? তা কেমন করে হয়? কারণ স্কটিয়ার সেই মস্ত ছিদ্রটি তত মিথ্যে নয়।

তাহলে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *