০১. সারারাত ধরে জুয়া খেলা চলেছে

সারারাত ধরে জুয়া খেলা চলেছে এই ক্যাসিনোতে। এখন ভোর তিনটে।

জেমস বন্ড এখন নিদারুণ ক্লান্ত। ক্লান্তি তার দেহে ও মনে, তাই পৃথিবীর সেরা ডিটেকটিভ হয়েও যার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, তার পক্ষেও এখন ভুলভ্রান্তি হবার উপক্রম। এই খেলাটার মধ্যেই এমনকিছু আছে, যা নেশা ধরিয়ে দেয়।

বন্ড, জেমস বন্ড, আধুনিক পৃথিবীতে এই বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সবচেয়ে নামজাদা সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট। দেশে দেশে তার কারবার। এর সাথে সাধারণ ডিটেকটিভদের তুলনা হয় না।

রুলেত–এর টেবিল ছেড়ে সে চুপিচুপি উঠে গেল। ঘরের বাইরে গিয়ে পিতলের রেলিং-এর কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। ল্য শিফ একটানা জিতেছে তার টেবিলের সামনে একগাদা পিতলের চাকতি–এক একটা এক লাখের। বাঁ দিকে হলুদ চাকতিগুলোর প্রত্যেকটার মানে পাঁচ লাখ ফ্রাঁ।

ক্যাশ কাউন্টার উঁচু রেলিং দিয়ে ঘেরা। টুলে বসা কাশিয়ার যেন এক সতর্ক ব্যাংক কেরানি। তার সামনে এবং দুপাশে সাজিয়ে রাখা থাকে গোল চাকতি আর করকরে নোটের বান্ডিল। কারুর সাধ্যি নেই ক্যাশ কাউন্টারের রেলিং টপকে ঢোকে অথবা বেরিয়ে আসে। দুজন ক্যাশিয়ার। ক্যাসিনো থেকে টাকা হাতাবার ব্যাপারটা অসম্ভব।

বন্ড কিছু নোটের বান্ডিল নিচ্ছিল— দশ হাজার এবং এক লাখ ফ্রাঁ-র নোটের বান্ডিল। তার মনে তখন আর একটা চিন্তা কাল সকালে ক্যাসিনো কমিটির মিটিং। অবশ্য এটা প্রাত্যহিক ব্যাপার।

আজকের ফলাফল ঘোষণা হচ্ছে। মঁসিয়ে ল্য শিফ পেয়েছেন দু লাখ, একইভাবে নিজস্ব স্টাইলে খেলেন তিনি। মিস ফেয়ারচাইল্ড একঘন্টার মধ্যে দশ লাখ জিতে চলে গেছেন। ভাইকাউন্ট দ্য ভিলোরা জিতেছেন দশ লাখ। বহু ঝুঁকি নিয়ে খেলেছেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য সহায়। তাই শেষ পর্যন্ত ভালোই লাভ করেছেন। এরপর ওই ইংলিশ জেন্টলম্যানকে লক্ষ করতে হয়–মিস্টার বন্ড। আশ্চর্য এই, তিনি জিতেছেন তিরিশ লাখ। দুদিনের মধ্যে এতখানি জয় সোজা কথা নয়। শেফ দ্য পার্টি বিশদ বিবরণ নোট করেছে। লোকটার স্বভাব এবং চালচলন লক্ষণীয়–বরাবর চড়া দরে বাজি ধরে। সুদৃঢ় নার্ভ এবং ভাগ্যও আশ্চর্য রকমের ভালো।

ঘোষণা শেষ। সভাও শেষ। সৌজন্য বিনিময় চলছে।

বন্ড সুইং ডোর ঠেলে বাইরে এল। সামনেই একজন স্যুটেড-বুটেড লোক, সে মাথা নোয়াল বটে, যেন বিরক্তি চেপে। এর কাজটা খুব দায়িত্বপূর্ণ–গোলমাল দেখলেই পা দিয়ে ইলেকট্রিক সুইচ টিপে দেয়, এবং সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ভিতরের কেউ বেরোতে পারে না, উটকো লোক ঢুকতে পারে না।

এরপর ক্যাসিনো কমিটি খেতে যাবে–কেউ বাড়িতে, কেউ কাফেতে।

বন্ডের ভাবভঙ্গি অবশ্য রহস্যজনক কিন্তু ক্যাশ লুঠ করবার কোনো ইচ্ছে ছিল না তার। বরং ব্যাপারটা কল্পনা করে তার মজা লাগছিল। হ্যাঁ, যদি ক্যাশ লুঠ করতেই হয়, তাহলে এক ডজন শক্তিমানের দরকার, যা সহজেই দু চারটেকে খতম করে দিতে পারবে। অবশ্য এতেও ঝুঁকি আছে–এরাই আবার পরস্পরকে ধরিয়ে দেয়।

ফ্রান্সের অপরাধ জগতের চরিত্র মোটামুটি ভালোই বুঝেছে বন্ড।

ক্লোক রুম। এখানে এক হাজার ফ্রাঁ দিতে হল। নীচে নেমে গেল বন্ড। একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, ক্যাশ লুঠের চিন্তাটা ত্যাগ করাই উচিত।

অতঃপর কী বড় ভাবতে গিয়ে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়ল। তার চোখ জ্বলছে, দম নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। অবশ্য এখন বাইরে এসে রাতের হাওয়ায় নিশ্বাস নেওয়াটা সহজ হল। সাধারণ অনুভূতিগুলো সাথে সাথে মস্তিষ্ক আবার কাজ শুরু করল।

হোটেল স্‌প্লেনডিড! ঘরে ঢুকে আগে দেখতে হবে, অনুপস্থিতিতে কেউ ঢুকেছিল কিনা।

কেয়ারটেকার চাবি ও টেলিগ্রাম দিল।

বন্ডের রুম নং ৪৫। টেলিগ্রাম এসেছে জ্যামাইকা থেকে।

…কিংস্টোন, জ্যামাইকা… বন্ড স্প্লেন্‌ডিড রয়্যাল লেজো। খারাপ মাল তৈরি হয়েছে, সব হাভানা সিগারের ফ্যাক্টরিতে, ১৯১৫…এক কোটি রিপিট এক কোটি স্টপ…. আশা করি এই টাকায় কাজ হবে… শুভেচ্ছা… দাসিলভা…

বন্ড বুঝল, এক কোটি ফ্রাঁ তাকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু লন্ডনে হেড কোয়ার্টারের কাছে তার দাবি ছিল আরও বেশি। কাল বিকেলে প্যারিস থেকে লন্ডনে ক্লিমেন্টসের কাছে যে বার্তা পাঠানো হয়, তার উত্তরেই এই টেলিগ্রাম এসেছে। ক্রিমেন্টস বন্ডের ডিপার্টমেন্টে চিফ। তিনি যার সাহায্য চাইছেন তার সাংকেতিক নাম এম। এম এব সাহায্যে ট্রেজাবিকে প্রভাবিত করা গেছে।

জ্যামাইকা বন্ডের কাছে নতুন নয়। কিন্তু এখন তাকে নতুন ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। তার ছদ্মভূমিকা অনুযায়ী সে এখন মেসার্স ক্যাফারি নামে জ্যামাইকার সবচেয়ে বড়ো কোম্পানিব এক জাঁদরেল ক্লায়েন্ট। মেসার্স ক্যাফারির আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা। সমস্ত নির্দেশ আসছে জ্যামাইকা থেকে। নির্দেশদাতা খবরের কাগজের লোক, সংবাদপত্রটির নাম ডেইলি প্লিনার, আর নির্দেশদাতার নাম ফসেট।

কে এই ফসেট? একসময় কোন আইল্যান্ডে একটি কোম্পানির অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাজ করত। কোম্পানির কাজ ছিল কচ্ছপ ধরা। পরে যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে নাম লেখায় সে। এবং শেষ পর্যন্ত মাল্টায় নেভির গোয়েন্দা দপ্তরে কেরানির কাজ পায়। যুদ্ধশেযে সিক্রেট সার্ভিসের নজর পড়ে তার দিকে। ক্যারিবিয়ান শাখায় ফসেট ফটোগ্রাফির কাজ শেখে। এরপর এক বড়ো ব্যক্তির সাহায্যে ডেইলি প্লিনারে চাকরি পায়। প্রধানত ফটোগ্রাফ বাছাইয়ের কাজ।

মাঝে মাঝে অজানা লোকের কাছ থেকে টেলিফোনে আদেশ পেত সে। এবং সেই আদেশ ঠিকমতো সময়মাফিক পালন করতে হত। পুরো ব্যাপারটাই ছিল টপ সিক্রেট। এর জন্য সে মাসে অতিবিক্ত কুড়ি পাউন্ড পেত। ব্যাংকে জমা পডত টাকা; সবাই জানত তার এক আত্মীয ইংল্যান্ড থেকে টাকা পাঠাচ্ছে।

ফসেটের বর্তমানে কাজ এই অজানা ব্যক্তির নির্দেশগুলো ঠিকমতো বন্ডকে জানিয়ে দেওয়া। কেন, ফসেটের মাধ্যমে কেন? কারণ, ফসেটকে জ্যামাইকার পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট কোনো সন্দেহ করবে না। তাছাড়া সে এখন ম্যারিটাইম বেস এন্ড ফোটো এজেন্সির সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করে। ইংল্যান্ডে ও ফ্রান্সে কিছু বিশে সুযোগ পায়। ফলে উপরি টাকা মাসিক আরও দশ পাউন্ড।

উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে করতে একটা গাড়ি বুক করে বসল সে। অফিসেও একটা সবুজ রঙের আই-শেড চোখে লাগিয়ে ডেস্কে বসে কাজ করত। এমন একটা ব্যক্তিত্ব তৈরি করল যে, সবাই তাকে মান্য করতে বাধ্য।

বন্ড ভাবছে–এটাই ভালো, মানে এই ঘুরপথে নির্দেশ আসা। হয়তো এই শহরে সিক্রেট সার্ভিসের আরও লোক আছে। রিজেন্ট পার্কের হেড কোয়ার্টার থেকে ফন্দিফিকির আঁটছে–অর্থাৎ মাত্র ১৫০ মাইল দূর থেকে। তাছাড়া কিংস্টোনে বসে একবারে গাড়ি কেনা সহজ হবে না লন্ডন থেকে প্রশ্ন উঠবে।

বন্ড টেলিগ্রামের উত্তর দিল–ধন্যবাদ .. এই দিয়েই কাজ হবে… বন্ড।

টেলিগ্রামটা আর কে করে ফেলেছে কে জানে! কেউ হয়তো কপি করে নিয়েছে। কেয়ারটেকারকে ঘুস দেওয়া সোজা ব্যাপার।

গুড নাইট!

বন্ড লিফটে উঠতে গিয়ে থেমে গেল। না, লিফটে সে উঠবে না। লিফটে সবসময় সিগন্যাল ফিট করা থাকে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠাই ভালো। ধীর পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বন্ড এম–কে পাঠানো খবরটার কথাই চিন্তা করছিল। এটা বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। জুয়া খেলতে গিয়ে সে শিখেছে, অল্প মূলধন নিয়ে কাজে নামা ঠিক নয়। যাকগে, যা হবার হয়ে গেছে। তাছাড়া এম-এর বেশি টাকা দিতও না।

হঠাৎ কী ভেবে এক নিমেষে আলো জ্বেলে দরজা খুলল। বলাবাহুল্য তার হাতে এখন উদ্যত রিভলবার। ঘর অবশ্য খালি… কিন্তু একী! বাথরুমেব দরজাটা অর্ধেক খোলা! কিন্তু সেটাও বড়ো ব্যাপার নয়। রুমের দরজা ভিতর থেকে লক করে দিল বন্ড। টেবিলের কাছে এসে মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখল! আসলে দু এক গাছি চুল টেবিলের ড্রয়ারে আটকে রেখেছিল সে। দেখল, সেগুলো ঠিকই আছে। আলমারির কাচের হাতলের ওপর পাউডার ছড়িয়ে দিয়েছিল। না, কারো হাতের ছাপ নেই সেখানে। বাথরুমের রিজার্ভারে জলের লেভেলে একটা আঁচড় দিয়ে মার্কা করে রাখা হয়েছিল। জল ঠিক লেভেলেই আছে।

সিক্রেট সার্ভিসের লোকেরা জানে–এরকম ছোটোখাটো কাজগুলো করতে হয়। আত্মরক্ষার জন্য, সাবধানতার জন্য। প্রতি পদে বিপদ। হাঁ করে ওৎ পেতে বয়েছে। সবসময় মৃত্যুর পাশে পাশে তাদের জীবন কাটে। এদেব সঙ্গে তুলনা করা যায় গভীব জলের ড়ুবুবি বা টেস্ট পাইলটের জীবনের। সবসময় মৃত্যু নিয়ে খেলা–এটাই কাজ। এটাই জীবিকা।

যাই হোক, এখন বোঝা যাচ্ছে, এই ঘরে কেউ ঢোকে নি। আপাতত নিশ্চিন্ত মনে স্নান সারল বন্ড। তারপর টাকার হিসেব শেষ হল। নোটবুকে কয়েকটা সংখ্যা টুকতে হল! হ্যাঁ ঠিকই দু দিনেব জিত তিবিশ লাখ। লন্ডনে সে পায় এক কোটি, চাওয়া হয়েছিল আরও এক কোটি। টেলিগ্রাম বলছে সেটা আসছে। সুতরাং, আপাতত সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে–দুকোটি তিরিশ লাখ ফ্রাঁ–মানে তেইশ হাজার পাউন্ড।

সিগারেট ধরাল বন্ড। এই নিয়ে আজ সাবাদিনে সত্তরটা সিগারেট খরচ হল। আলো নিভিয়ে জানলা দিয়ে কিছুক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর বালিশের তলায় নোটের বান্ডিল এবং ৩৮ কোল্ট পুলিশ পজিটিভ রিভলভারটা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *