০১. বিশ্বজুড়ে সমাদৃত আইফেল টাওয়ার

দ্যা লস্ট সিম্বল

পৃথিবীর অসংখ্য রহস্য আর বৈচিত্রের অর্থ না জেনে মিলিতভাবে বেঁচে থাকা আর বিশাল কোন লাইব্রেরিতে ঢুকে কোন বই স্পর্শ না করে সেখানে অনর্থক ঘোরাঘুরি করা একই কথা।

–দি সিক্রেট টিটিংস অব অল এজেস

.

অনুবাদ প্রসঙ্গে

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিম্বোলজিস্ট বা চিহ্নতাত্ত্বিক প্রফেসর রবার্ট ল্যাংডনকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে লেখা ড্যান ব্রাউনের বই দ্য লস্ট সিম্বল। ২০০০ সালে অ্যাঞ্জেলস এন্ড ডেমোন এবং ২০০৩ সালে দ্য ডা ভিঞ্চি কোড–এ বই দুটি প্রকাশের পরই বিশ্বব্যাপী সাড়া পড়ে যায়। বইগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্র রবার্ট ল্যাংডন একজন জীবন্ত চরিত্র হয়ে ওঠেন। দ্য ডা ভিঞ্চি কোডে যীশুর বিবাহ ও বংশধর রেখে যাওয়া সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে ব্রাউন ব্যাপক বিতর্কিত হন।

দ্য লস্ট সিম্বল উপন্যাসেও এসেছে নানা রহস্য, শ্বাসরুদ্ধকর নানা ঘটনাপ্রবাহের ধারা বর্ণনা। ওয়াশিংটন ডিসিতে ১২ ঘণ্টার নানা লোমহর্ষক ঘটনা নিয়ে এর কাহিনী গড়ে উঠেছে। গুপ্ত ফ্রি ম্যাসোনারিকে ঘিরেই ঘটনাপ্রবাহ এগিয়েছে। কাহিনীর শুরুতেই দেখা যায় স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউশনের প্রধান পিটার সলোমনের আমন্ত্রণে ল্যাংডন ইউএস ক্যাপিটলের ন্যাশনাল স্ট্যাচুয়ারি হলে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আসেন। কিন্তু এখানে এসেই জড়িয়ে পড়েন চিহ্নতত্ত্বের গোলক ধাঁধায়। কাহিনীর এক পর্যায়ে দেখা যায় ওয়াশিংটন ডিসির উর্ধতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ প্রেতসাধনার মতো চিহ্নতত্ত্ব বিষয়ক ফ্রিম্যাসোনে যুক্ত।

ক্রমান্বয়ে ল্যাংডন মুখোমুখি হন মালআখ নামের একটি খল চরিত্রের সাথে। গোপন সংকেতের অর্থ উদ্ধারের জন্য মালআখ ল্যাংডনের সহায়তা নিয়ে তাকেই হত্যা করতে উদ্যত হয়। এক পর্যায়ে সিআইএ অফিসারদের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

এ গল্পে এসেছে ধর্মতত্ত্ব, চিহ্নতত্ত্ব, বিজ্ঞান, ধর্মভিত্তিক পৌরাণিক ইতিহাস ও প্রযুক্তিনির্ভর ফ্যান্টাসি। ২০০৬ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি মুক্তি পায় ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। ওই দিনই উপন্যাস বিক্রির নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। প্রথম দিন শুধু আমেরিকা, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে ১০ লাখ কপি বিক্রি হয়। প্রকাশনা সংস্থা ডাবলডে এমনটাই আশা করেছিল। তাই তারা প্রথম সংস্করণে এ বই ছেপেছে ৬৫ লাখ কপি যা মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।

বাংলাদেশেও ড্যান ব্রাউন তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তার অন্য সবকটি উপন্যাস বাংলাদেশি পাঠকরা লুফে নিয়েছেন। দ্য লস্ট সিম্বলও তার ব্যতিক্রম হবেনা বলেই বিশ্বাস করি।

বাংলা ভাষায় অনুবাদের স্বত্বদানের ক্ষেত্রে প্রকাশনা সংস্থা র‍্যান্ডম বুক হাউসের শাখা প্রতিষ্ঠান ডাল ডের কর্মকর্তারা ত্বড়িত সহযোগিতা না দিলে এত দ্রুত বইটি বাজারে আনা সম্ভব হতো না। বিশেষ করে বইটির প্রধান সম্পাদক জেসন কুফম্যান ও লেখক ড্যান ব্রাউনের এজেন্ট হেইড ল্যাও এক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়ায় প্রকাশকের তরফ থেকে তাদের বিশেষ ধন্যবাদ।

দুঃখজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশে এক শ্রেনীর প্রকাশক ও অনুবাদক যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই ব্রাউনের প্রকাশিত উপন্যাসগুলোর বিকৃত অনুবাদের বই বাজারজাত করেছে। এর ফলে পাঠক প্রতারিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রকাশনা ব্যবস্থার সুনামও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এ কারণে এ, বইটি যাতে পাইরেটেড না হয় সে ক্ষেত্রে দেশের স্বনামধন্য প্রকাশনা ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি।

ধন্যবাদসহ–
ওমর ফারুক
মনোজিৎকুমার দাস

.

উপজীব্য

১৯৯১ সালে সিআইএর পরিচালকের সিন্দুকে একটা অতি গোপনীয় ডুকমেন্ট তালাবন্ধ করে রাখা হয়। সেটা আজও সেখানে সেভাবেই রয়েছে। প্রাচীন যুগের বিভিন্ন আকিবুকি ওয়ালা সংকেত এবং অজানা জায়গার দিক নির্দেশনা রয়েছে এই ডকুমেন্টের বিষয়বস্তুর মধ্যে। ফ্রি ম্যাসসান, দি ইনভিজিবল কলেজ, দি অফিস অব সিকিউরিটি, দি এসএমএসসি এবং ইন্সটিটিউট অব নোয়েটিক সায়েন্সসহ যতগুলো সংগঠনের কথা এ উপন্যাসে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবেও রয়েছে। এ উপন্যাসে যেসব সাংস্কৃতিক চিনহ, শিল্পকর্ম, বিজ্ঞান, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার সবই বাস্তবভিত্তিক ও জীবন্ত।

.

উপক্রমনিকা

হাউস অব দি টেম্পল

৮:৩৩ মিনিট

মৃত্যু কীভাবে কখন হবে তা এক অপার রহস্য।

সৃষ্টির শুরু থেকেই কখন কার কীভাবে মৃত্যু হবে তা রহস্যঘেরাই থেকে গেছে। দুহাতের তালুতে মানুষের মাথার খুলিটা একবার দুলিয়ে সেটার দিকে একনজর তাকালো ৩৪ বছর বয়সী লোকটা। খুলিটা বেশ পুরনো। বাটির মতো খুলিতে রক্তের মতো লাল রংয়ের মদ। টলটল করছে। সেদিকে চেয়ে সে নিজেই নিজেকে বললো, খাও! খেয়ে যাও, তোমার ভয়ের তো কিছু নেই!

 দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সনাতন প্রথা অনুসারে মধ্যযুগের ভিন্নমতালম্বী অপরাধীকে ফাঁসিমঞ্চের দিকে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার রীতি পালনের মধ্যে দিয়ে আর আজকের যাত্রা শুরু হয়েছে,তার গায়ের ঢোলা শার্টের সামনের খোলা অংশ। দিয়ে বেচারার নির্লোম ফ্যাকাশে বুক দেখা যাচ্ছিল,তার প্যান্টের বা পাটা হাটু পর্যন্ত গোটান আর শার্টের ডান হাতাটা গুটিয়ে কনুইয়ের কাছে তোলা হয়েছে।তার গলার চারপাশে দড়ির একটা ভারী ফাঁস ঝুলছে সঙ্রে ভাইয়েরা আদর করে যাকে বলে–কেবল-টো। অবশ্য আজরাতে উপস্থিত ভক্ত ভাইদের মত, তার পরনেও মাস্টারের ন্যায় পোশাক।

তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইদের প্রতেকের পরনে আজ তাদের সম্পূর্ণ। রিগেলিয়া। একে সঙ্গের প্রতীক বলা হয়। সাথে সাদা দস্তানা আর কোমরে ঝোলান রয়েছে পরিকর। তাদের প্রত্যেকের গলায় ঝোলান আনুষ্ঠানিক রত্ন, মৃদু আলোতে অশরীরী চোখের মত জ্বল জ্বল করছে। উপস্থিত লোকদের ভেতরে অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত আর অমিত ক্ষমতাধর কিন্তু নব্য দিক্ষিত ব্যক্তি জানে চারপাশের এই দেয়ালের অভ্যন্তরে তাদের পার্থিব মর্যাদার। কোন মূল্য নেই। এখানে সবাই সমান এক রহস্যময় বাধনে আবদ্ধ ভাই।

চারপাশে সমবেত অদম্য শঙ্কাহীন লোকগুলোকে সে পর্যবেক্ষণ করে, নব্য দিক্ষিত ভাবে বাইরের জগতের কে বিশ্বাস করবে এমন ভিন্ন ধারার লোকদের একটা সমাবেশ এমন এক স্থানে হয়েছে…….এত জায়গায় থাকতে এখানেই। ঘরটাকে প্রাচীন পৃথিবীর কোন এক মন্দিরের মত দেখায়। অবশ্য, সত্যটা তার চেয়ে বিস্ময়কর। হোয়াইট হাউস থেকে আমি সামান্য দূরে রয়েছি।

১৭৩৩ সিক্সটিন স্ট্রীট এনডাব্লিউ, ওয়াশিংটন, ডি.সির এই প্রকাণ্ড প্রাসাদ বা স্বপ্ন সৌধ যে নামেই অভিহিত করি আসলে খ্রিষ্টপূর্ব যুগের মন্দিরের রেপল্লিকা দি টেম্পল অব কিং মোউসেলেস, আসল মোসেলিয়াম….. একটা স্থান যেখানে মৃত্যুর পর নিয়ে যাওয়া যায়। বাইরে প্রধান ফটকের সামনে দুটো সতের টন ওজনের পিতলের স্ফিংস মূর্তি পাহারা দিচ্ছে। ভবনের ভিতরটা প্রার্থনা কক্ষ, হলরুম, বন্ধ প্রকোষ্ঠ, পাঠাগার, এমনকি ফাপা দেয়াল যেথানে দুটো কঙ্কালের অবশিষ্ঠাংশ আছে। সব মিলিয়ে একটা গোলক ধাঁধা। নবদিক্ষিতকে বলা হয়েছে এই ভবনের প্রতিটি কক্ষের একটা গোপন রহস্য আছে কিন্তু তারপরেও সে বুঝতে পারে এই মুহূতে হাটু মুড়ে খুলি হাতে যে বিশালকার চেম্বার রয়েছে সেটার গূঢ় রহস্যের সাথে অন্য কক্ষগুলোর তুলনা হয়না।

দি টেম্পল রুম।

ঘরটা একদম চার কোণা বিশিষ্ট। অনেকটা গুহার মত। মাথার একশ ফিট উপরে ছাদ। মনোলিথিক গ্রানাইট পাথরের স্তম্ভের উপরে স্থাপিত। রাশিয়ান ওয়ালনাটের সারিবদ্ধ গ্যালারি ঘরটাকে বৃত্তাকারে ঘিরে রেখেছে আর আসনের কুশনগুলো শুকরের চামরা দিয়ে হাতে বাধান। পশ্চিমের দেয়ালের অংশ জুড়ে চৌত্রিশ-ফুট-উঁচু সিংহাসন। বিপরীত দিকের দেয়ালে একটা পাইপ লুকান রয়েছে। পুরা দেয়াল জুড়ে প্রাচীন সব সংকেত। মিশরীয়, হেবারিক, মহাকাশ সম্বন্ধীয়, আলকেমী এবং অন্যান্য সব অজানা চিহ্নের সমাহার।

আজরাতে টেম্পলার রুম নিখুঁত ভাবে বসানো মোমবাতির সারি দ্বারা আলোকিত। ছাদের প্রশস্ত গবাক্ষ দিয়ে নেমে আসা চাঁদের আলোর একটা মৃদু ধারার সাথে মোমবাতির আলো যুক্ত হয়ে পুরা ঘরটাকে আধো আলোকিত আর ঘরের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্যকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। বেলজিয়াম কালো মার্বেলের একটা আস্ত খন্ড খোদাই করে তৈরী করা বিশাল বেদী চারকোনা ঘরের ঠিক মধ্যেখানে স্থাপিত।

গোপন কথাটা হল কিভাবে মারা যাবে, নবদিক্ষিত পুনরায় নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সময় হয়েছে  একটা কণ্ঠ ফিসফিস করে বলে ওঠে।

নবদিক্ষিত চোখ তুলে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা আলখাল্লা পরিহিত বিশিষ্ট অবয়বের দিকে তাকায়। প্রধান যাজক। লোকটার বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ। আমেরিকার একটা আইকন, লোকপ্রিয়, শক্ত সমর্থ এবং অমিত সম্পদের অধিকারী। তার মাথার একসময়ের কালো চুলে বয়সের ছাপ পড়েছে।

শপথ নাও প্রধান যাজক বলেন, তাঁর কণ্ঠস্বর তুষারপাতের মত কোমল। তোমার দীক্ষা পূর্ণ কর।

নবদিক্ষিতের যাত্রা, একদম প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয়েছিল। সেদিন রাতে আজকের মতই একটা কৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, সর্বোচ্চ পূজারী প্রভূ তার মাথা একটা ভেলভেটের মস্তকাবরণী দ্বারা ঢেকে দিয়েছিল এবং তার খোলা বুকে আনুষ্ঠানিক ড্যাগার স্পর্শ করে জানতে চেয়েছিলেন: কোন ধরনের আর্থিক মোহ বা কোন ধরনের পুরস্কারের অভিপ্রায় দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, তুমি নিজের সম্মান বজায় রেখে ঘোষনা করছো যে স্বেচ্ছায় এবং মুক্তচিত্তে তুমি আমাদের এই ভ্রাতৃসঙ্রে রহস্য আর বিশেষ অধিকার ভোগের একজন প্রার্থী হিসাবে নিজেকে উৎসর্গ করবে?

আমি রাজি, সদ্য দিক্ষিত মিথ্যা বলে।

তাহলে তোমার চেতনায় এটা প্রথিত হোক, মাস্টার তাকে সর্তক করে বলেন, তোমার কাছে অবারিত করা গোপনীয়তা যদি তুমি কখনও বিশ্বাসঘাকতা করে ভঙ্গ কর তাহলে তার পরিণতি হবে তাৎক্ষনিক মৃত্যু।

সেই সময়ে, নবদিক্ষিত বিন্দু মাত্র ভয় অনুভব করেনা। আমার আসল উদ্দেশ্য তারা কখনও আঁচ করতে পারবেনা।

আজরাতে, অবশ্য টেম্পল রুমে সে কেমন একটা গাম্ভীর্যের আলামত লক্ষ্য করে এবং তার দীক্ষা দানের বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চারিত সর্তক বাণী পুণরাবৃত্তি শুরু হয়, যে প্রাচীন জ্ঞান সে লাভ করতে চলছে সেটা কখনও করলে তার ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা:কানের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত জবাই করা। হবে।……টেনে বের করা হবে জী…..নাড়িভুড়ি পুড়িয়ে দেয়া। সেগুলোর ছাই ছড়িয়ে দেয়া হবে বাতাসে…..বক্ষপিঞ্জর থেকে হৃৎপিণ্ড বের করে সেটা বন্য পশু কে খাওয়ান হবে।

ব্রাদার  ধুসর চোখের মাস্টার বলেন, নবদিক্ষিতের হাতে তার বাম হাত রাখা। চুড়ান্ত শপথ গ্রহণ কর।

নিজেকে পরিক্রমার শেষ অংশের জন্য প্রস্তুত করার ফাঁকে, নব্যদিক্ষিত নিজের পেশল কাঠাম নড়ায় এবং তালু দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখা করোটির প্রতি মনোযোগ দেয়। মোমবাতির মৃদু আলোতে ক্রিমসন ওয়াইন প্রায় কাল দেখায়। পুরা কক্ষে মৃত্যুর নিরবতা নেমে আসে এবং সে অনুভব করে উপস্থিত সবার দৃষ্টি তার প্রতি নিবদ্ধ, চুড়ান্ত শপথ গ্রহণের শেষে অভিজাতদের তালিকায় তার অভিষেক অপেক্ষা করছে।

আজরাতে, সে মনে মনে ভাবে, ভ্রাতৃসক্সের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি এমন একটা ঘটনা এই চার দেয়ালের ভিতরে ঘটতে চলেছে। বিগত কয়েক শতাব্দিতে এমনটা ঘটেনি।

সে জানে এর ফলে একটা স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হবে……আর এটা তাকে প্রবল ক্ষমতার অধিকারী করবে। উদ্দীপ্ত ভঙ্গিতে, সে শ্বাস নেয় এবং সারা পৃথিবীতে অসংখ্য দেশে তার আগে অগণিত মানুষ যে শব্দ উচ্চারণ করেছে সেটাই উদাত্ত কণ্ঠে বলে উঠে।

আমি যে মদ এখন পান করছি তা যেন আমার ভিতরে বিষে রূপান্তরিত হয়।…..ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে আমি যদি কখনও শপথ ভঙ্গ করি তাহলেই এমনটি হবে।

কক্ষের শূণ্যস্থানে তার কথা প্রতিধ্বনিত হল। তারপর নেমে আসে শুনশান নিরবতা।

হাত স্থির করে, নবদিক্ষিত করোটি নিজের মুখের কাছে উঠিয়ে আনে এবং টের পায় তার ওষ্ঠের প্রাভ শুষ্ক হাড় স্পর্শ করেছে। সে চোখ বন্ধ করে এবং কোটি তার মুখের দিকে দিয়ে, লম্বা চুমুকে মদ পান করতে থাকে। ওয়াইন এর শেষ বিন্দু পান করে সে করোটি মুখ থেকে নামায়।

এক মুহূর্তের জন্য, তার মনে হয় তার ফুসফুস ভারী হয়ে উঠছে এবং হৃৎপিণ্ড উন্মত্তের মত আঁচরণ করছে। ঈশ্বর, তা জানে! তারপর দ্রুত অস্বস্তিকর অনুভূতিটা কেটে যায়।

এক প্রীতিকর উষ্ণতা তার দেহে ছড়িয়ে পড়ে। দিক্ষিত ব্যক্তি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, ভ্রাতৃসঙ্গের সবচেয়ে গোপনতম পংক্তিতে বোকার মত তাকে অন্তর্ভূক্ত যে লোকটা করেছে তার অসন্দিগ্ধ ধুসর চোখের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে হাসে।

অজানা আশঙ্কায় মন কেপে ওঠে। মনে হতে থাকে অচিরেই তারা কাঙ্খিত সব কিছু হারাবে।

.

১ অধ্যায়

বিশ্বজুড়ে সমাদৃত আইফেল টাওয়ারের দক্ষিণ পিলারের লিফট ওপরে যাচ্ছে। লিফটের ভেতরে পর্যটকের গাদাগাদিতে নাভিশ্বাস অবস্থা। ওদের মধ্যে স্যুট পরা এক ব্যবসায়ী পর্যটক তার পাশে দাঁড়ানো তার ছোট ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ছেলেটাকে কেমন যেন মন মরা লাগছিল। তিনি তাকে বললেন, তোমাকে খুব বিমর্ষ লাগছে বাবা, তোমার ওপরে না ওটাই ভালো ছিল।

না, না ঠিক আছে। ……নিজের চাপা উদ্বেগ দমন করে ছেলেটা বলে। আমি পরের লেভেলেই নেমে যাব। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

ভদ্রলোক তার দিকে ঝুঁকে আসে। আমি ভেবেছিলাম এতদিনে তুমি ব্যাপারটা কাটিয়ে উঠেছ। সে পরম স্নেহে ছেলেটার গালে হাত বুলিয়ে দেয়।

নিজের বাবাকে আশাহত করার জন্য ছেলেটা লজ্জায় মরে যায়, কিন্তু কানের ভো ভো শব্দের জন্য সে কিছুই শুনতে পায় না। আমি শ্বাস নিতে পারছি না এই ঘোড়ার ডিম বাক্স থেকে আমাকে বের হতে হবে।

প্রায়এসে পড়েছি, ছেলেটা নিজেকে বলে, গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে উপরের অবরোহনের পাটাতনের দিকে তাকায়। একটু সবর কর।

চারপাশের দৃশ্যবলী অবলোকনের জন্য নির্মিত উপরের ডেকের দিকে তির্যকভাবে লিফটা উঠতে শুরু করলে, চারপাশটা কেমন যেন হয়ে আসে, এটি

অতিকায় সংকীণ সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে।

বাবা, আমার মনে হয় না।

সহসা মাথার উপর থেকে প্রচণ্ড শব্দের প্রতিধ্বনি ভেসে আসে। খাঁচাটা হঠাৎ থেমে গিয়ে, বেকায়দাভাবে একপাশে হেলে যায়। সাপের মত ছিঁড়ে যাওয়া ইস্পাতের দড়ি লিফটের খাঁচা কে চাবুকের মত প্রহার করে। বাচ্চা ছেলেটা তার বাবা কে আঁকড়ে ধরে।

বাবা

আতঙ্কিত চোখে এক সেকেণ্ডের জন্য তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তখনই মেঝেটা খসে পড়ে।

রবটি ল্যাংডন চমকে ওঠেন তার নরম চামড়ার গদিমোড়া চেয়ারে খাড়া হয়ে বসেন। দিবাস্বপ্নের ঘোর কেটে গিয়েছে।

ফ্যালকন ২০০০ ইএক্স কর্পোরেট জেটপ্লেনের এক বিশাল কেবিনে এই মুহূতে একা বসে রয়েছে ঝঞ্ঝাবাতের কারণে বিমান টা ঝাঁকি খেয়েছে। বাইরে থেকে দুটো প্র্যট এণ্ড উইটনি ইঞ্জিনের সাবলীল গুঞ্জন ভেসে আসছে।

ইন্টারকম জীবন্ত হয়ে উঠে। মি, ল্যাংডন? আমরা আমাদের যাত্রার শেষ পর্যায় রয়েছি।

ল্যাংডন সোজা হয়ে বসে নিজের লেকচার শীট পুনরায় তর চামড়ার ফোল্ডারে ঢুকিয়ে রাখে।ম্যাসনিক সিমবোলজির প্রায় অর্ধেক সে চোখ বুলিয়েছিল। নিজের মৃত পিতার সম্পকে আসা কল্পনা, ল্যাংডনের ধারণা, তার গুর পিটার সলোমনের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণ। সবকিছুই মনে। পড়ছিল।

আরেকজন মানুষ যাকে আমি কখনও নিরাশ করতে চাই না। প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে আটান্ন বছর বয়সী মানব প্রেমিক, ইতিহাসবিদ আর বিজ্ঞানী ল্যাংডনকে নিজের ছত্রছায়ায় নিয়ে এসেছিল, তার অকাল প্রয়াত বাবার রেখে যাওয়া শূণ্যস্থান তিনি অনেকাংশ পূর্ণ করেছিলেন। পারিবারিক প্রতিপত্তি আর অমিত সম্পদসত্বেও ল্যাংডন সলোমনের কোমল ধুসর চোখে সবসময় বিনয়ই দেখেছেন।

জানলার বাইরে সূর্য অস্ত গিয়েছে। কিন্তু ল্যাংডন তবুও পৃথিবীর দীর্ঘতম ওবেলিস্কের সরু ছায়ামূর্তি ঠিকই দেখতে পান যেন, পাতালপুরীর রাক্ষসের হাতের বর্শার মত দিগন্ত ফুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ৫৫৫- ফিট লম্বা মার্বেলের ওবেলিস্কটা। যে এই জাতির হৃদয়ের প্রতীক। মোচাকৃতির চূড়ার চারপাশে, সড়ক আর সমাধিসৌধের নিখুঁত জ্যামিতিক বিস্তৃতি বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

ওয়াশিংটন ডি.সি. এমনকি আঁকাশ থেকেও রহস্যময় শক্তি বিকিরণ করছে।

এই শহরটাকে ল্যাংডন ভালবাসেন। তাকে বহনকারী জেট বিমানটি ভূমিতে অবতরণ করতে অপেক্ষা করে আছে কল্পনা করে। এতে তিনি নিজের ভিতরে উত্তেজনার মাত্রা অনুভব করেন। ডালাস আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কোথাও অবস্থিত এক ব্যক্তিগত টার্মিনালে প্লেনটা ট্যাক্সি করে এগিয়ে যায় এবং গন্তবে পৌচ্ছে থামে।

ল্যাংডন নিজের জিনিস পত্র গুছিয়ে নেয়, পাইলট কে ধন্যবাদ জানায় এবং বিমানের বিলাস বহুল অভ্যন্তরভাগ ত্যাগ করে ভাঁজ করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। জানুয়ারী মাসের শীতল বাতাসে মুক্তির আমেজ।

রবার্ট নিঃশ্বাস নাও, প্রশস্ত খোলা স্থানের প্রংশসা করে সে নিজের মনে ভাবে।

রানওয়ের উপর দিয়ে সাদা কুয়াশার একটা মিছিল ভেসে যায় এবং কুয়াশাবৃত্ত টারমাকে নেমে আসলে ল্যাংডনের মনে হয় সে বুঝি কোন জলাশয়ে ভুল করে উপস্থিত হয়েছে।

 হ্যালো! হ্যালো! টারমাকে অন্যপ্রান্ত থেকে স্পষ্ট বৃটিশ টানের চিৎকার শোনা যায়। অধ্যাপক ল্যাংডন?

ল্যাংডন চোখ তুলে তাকালে ব্যাজ পরিহিত মাঝ বয়সী এক মহিলাকে ক্লিপবোর্ড হাতে তার দিকে ব্যাস্তসমস্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসতে দেখে, তাকে। এগোতে দেখে উল্লসিত ভঙ্গিতে হাত নাড়ছে। উলের স্টাইলিশ বুননের একটা টুপির নীচে দিয়ে তার কোকড়ান সোনালী চুল বেরিয়ে আছে।

স্যার ওয়াশিংটনে আপনাকে স্বাগতম!

ল্যাংডন হাসে। ধন্যবাদ।

আমি যাত্রী সেবা বিভাগের কর্মচারী, প্যাম।

মেয়েটা অস্থিরতার পর্যায় পড়ে এমন প্রানোচ্ছলতায় কথাগুলো বলে। স্যার আপনি যদি এখন আমার সাথে আসেন, আপনার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে।

চকচক করা সব ব্যক্তিগত জেট প্লেনে বোঝাই একটা প্রাচুর্যের স্মারক খচিত টার্মিনালের দিকে রানওয়ে অতিক্রম করে ল্যাংডন মেয়েটাকে অনুসরণ করে। বিখ্যাত আর ধনীদের ট্যাক্সি স্টাণ্ড।

প্রফেসার আপনাকে ব্ৰিত করতে আমার খারাপ লাগছে। মেয়েটা বলে, তার কণ্ঠ স্বরে একটা অপ্রতিত্ব,  কিন্তু ধর্ম আর প্রতীক নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থ প্রণয়নকারী রবাট ল্যাংডন আর আপনি কি একই ব্যক্তি নন?

ল্যাংডন প্রথমে ইতস্তত শেষ পর্যন্ত সম্মত্তির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।

আমি সেটাই ভাবছি! সে খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে বলে। আমাদের পাঠচক্র আপনার চার্চ আর স্ত্রীলিঙ্গ সম্পকিত পুস্তকটি আগ্রহের সাথে পাঠ করেছে। আপনার কারণে একটা উপভোগ্য কেলেঙ্কারি আমরা জানতে পেরেছি! আপনি শেয়ালের কাছে মুরগী বর্গা দিতে পছন্দই করেন। ল্যাংডন কোন কথা না বলে হাসে। কলঙ্করটান কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল না।

মেয়েটা বুঝতে পারে ল্যাংডন এই মুহূর্তে নিজের কাজ সম্পর্কে আলোচনা করতে খুব একটা আগ্রহী না। আমি দুঃখিত। বক বক করার জন্য আমি দুঃখিত। আমি জানি আপনি সম্ভবত প্রায়শই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন…..কিন্তু সেটার জন্য আপনার খ্যাতি দায়ী। মেয়েটা পুলকিত ভঙ্গিতে তার পরনের কাপড়ের দিকে নির্দেশ করে। আপনার পোশাকই আপনাকে চিনিয়ে দেয়।আমার পোশাক? ল্যাংডন আড়চোখে নিজের পড়নের কাপড়ের দিকে তাকায়। বরাবরের মত আজও তার পরনে চারকোল রঙের টার্টলনেক হ্যারিস টুইড জ্যাকেট, খাকি আর কলেজিয়েট করডোভান লোকার পায়ে……সামাজিক অনুষ্ঠান, লেখক চিত্র বক্তৃতা দেয়া আর ক্লাশের জন্য তার পছন্দের পোষাক।

মেয়েটা এবার তার অপ্রতিভতা লক্ষ্য করে হেসে উঠে। আপনার পরনের টার্টলনেক অনেক পুরানো হয়েছে। টাই পরলে আপনাকে আরও অনেক চৌকষ দেখাবে।

অসম্ভব, ল্যাংডন ভাবে। ফাঁসির দড়ি গলায় দেই আরকি।

ফিলিপস এক্সটার একাডেমিতে যোগ দেবার সময় ল্যাংডনকে সপ্তাহে হয়দিন নেকটাই পড়তে হয়েছে, এবং প্রধান শিক্ষকের রোমান্টিক দাবী সত্ত্বেও যে রোমান বাগ্মীরা নিজেদের গলায় স্বরযন্ত্র উষ্ণ রাখতে যে রেশমের ফাসকালিয়া পরিধান করতেন সেখানে থেকেই গলাবন্ধ হিসাবে ব্যাবহৃত কাভেটের উৎপত্তি। ল্যাংডন ঠিকই জানেন, বুৎপত্তিগতভাবে কাভেট শব্দটা এসেছে নির্মম ক্রোট মার্সেনারীদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে গলায় গিটবাধা উত্তরীয় থেকে। আজ পর্যন্ত, যুদ্ধের প্রাচীন সাজ অফিসগামী চাকুরে যোদ্ধার দল পরিধান করে চলছে প্রতিদিনের বোর্ডরুম লড়াইয়ে তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাবার উদ্দেশ্যে।

পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। ল্যাংডন মৃদুহেসে বলে। ভবিষ্যতে আমি টাইয়ের কথা বিবেচনা করে দেখব।

টার্মিনালের কাছে পার্ক করা একটা ঝকঝকে লিংকন টাউন গাড়ীর ভিতর থেকে গাঢ় রঙের স্যুট পরিহত পেশাদার দেখতে একটা লোক সাবলীল ভঙ্গিতে বের হয়ে আসে এবং আঙ্গুল উঁচু করে। মি. ল্যাংডন? আমি বেল্টওয়ে সার্ভিসের পক্ষ থেকে চার্লস। সে কথা শেষ করে যাত্রী আসনের দরজা খুলে ধরে। শুভ সন্ধ্যা, স্যার। ওয়াশিংটনে আপনাকে স্বাগতম।

প্যামকে তার অপূর্ব আতিথেয়তার জন্য টিপস দিয়ে ল্যাংডন টাউন কারের মোলায়েম কোমল অভ্যন্তরে উঠে বসে। ড্রাইভার তাকে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনের কন্ট্রোল, পানির বোতল আর ঝুরি ভর্তি গরম গরম আস্তা মাফিন দেখিয়ে দেয়।মুহূর্ত পরে ল্যাংডনের গাড়ি ব্যক্তিগত এক্সেস রাস্তা দিয়ে ছুটতে থাকে। এভাবেই তাহলে বাকী অর্ধেক লোক বেঁচে আছে।

ড্রাইভার গাড়িটা উইণ্ডসক ড্রাইভে দ্রুত গতিতে আনার ফাঁকে তার যাত্রীর কর্মসূচী দেখে নিয়ে দ্রুত একটা ফোন করে। বেল্টওয়ে লিমোজিন থেকে বলছি, পেশাগত দক্ষতায় ড্রাইভার কথা বলে। আমার মেহমান গাড়িতে উঠবার পরে আমাকে বিষয়টা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল। কথা বলে সে চুপ করে থাকে। স্যার আপনার অতিথি যথাসময়ে এসেছেন এবং সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আমি তাকে ক্যাপিটল ভবনের সামনে নামিয়ে দেব। সে লাইন কেটে দেয়।

ল্যাংডন মনে মনে হাসে। কোন কিছুই নজর এড়ায় না। খুটিনাটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি পিটার সলোমনের সবচেয়ে জোরাল বৈশিষ্ট, যার সাহায্যে সে নিজের অমিত ক্ষমতা সরলতায় নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যাংকে কয়েকশ কোটি ডলার জমা থাকলে ব্যাপারটা অন্যরকম হতে বাধ্য। ল্যাংডন চামড়ার গদি মোড়া সীটে আয়েশ করে জাকিয়ে বসে এবং এয়ারপোটের শব্দ মিলিয়ে যেতে চোখ বন্দ

দ্য লস্ট সিম্বল করে। ইউ .এস . ক্যাপিটল আধঘন্টার দূরত্ব এবং এই সময় টুকুর মধ্যে সে নিজের ভাবনা গুলো একটু গুছিয়ে নিতে চায়। আহ সব কিছু এত দ্রুত ঘটেছে

যে ল্যাংডন এতক্ষণ পর আসন্ন সন্ধ্যার যাত্রা চিন্তা করার ফুসরত পায়।

নিরবতার বাতাবরণে আগমন, বিষয়টা সম্ভাবনা কল্পনা করে সে মুচকি হাসে।

ক্যাপিটল ভবন থেকে দশ মাইল দূরে একটা লম্বা অবয়ব রবাট ল্যাংডনের আগমনের জন্য অধীর চিত্তে প্রস্তুতি নেয়।

.

২ অধ্যায়

মাল’আখ নামে নিজেকে যে পরিচয় দেয় সে নিজের পরিষ্কার করে কামান মাথায় সুইয়ের অগ্রভাগ চাপ দিয়ে প্রবেশ করায়, তীক্ষ্ণ ইস্পাত তার মাংসের ভেতরে প্রবেশ আর বের হয়ে আসবার সময়ে সে আনন্দে দ্রুত শ্বাস নেয়। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির এই মৃদু গুঞ্জন মাদকতাময়…ঠিক যেমন তার ত্বক ভেদ করে গভীরে সুইটা পিছলে যাবার সময়ে আর পেট ভর্তি রঞ্জক পদার্থ উগরে দেবার অনুভূতি।

আমি একটা শিল্পকর্মের নমুনা বটে।

উল্কি আঁকবার মূল লক্ষ্য কিন্তু কখনওই সৌন্দৰ্য্য ছিল না। লক্ষ্য ছিল পরিবর্তন। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর পূর্বের নুবিয়ান প্রিস্টের আত্মোৎসর্গ থেকে প্রাচীন রোমের সিবেলে কাল্টের উল্কি সজ্জিত পুরোহিতের সহচর, বর্তমান সময়ের মাউরি সম্প্রদায়ের মোকা ক্ষতচিহ্ন, সবকিছুর পেছনেই রয়েছে উল্কির মাধ্যমে নিজেদের দেহকে আংশিক উৎসর্গ করার বাসনা, অলঙ্করনের সময়ে। অনুভূত দৈহিক কষ্ট ভোগ করে পরিবর্তিত মানুষে পরিণত হওয়া।

১৯:২৮ এ লেভিটিকাসের অলুক্ষণে বলে সতর্ক করে দেয়া সত্ত্বেও, যেখানে কারও মাংসপেশীতে চিহ্ন দিতে বারণ করা হলেও আধুনিক কালে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে উল্কি পরিবর্তনের স্মারক হিসাবে পরিচিত- এদের ভিতরে সহজ সরল কিশোর কিশোরী থেকে পাড় নেশারু এমন কি শহুরে বধূরাও এর মোহে মুগ্ধ।

 নিজের ত্বকে উল্কি আঁকবার অর্থ হল ক্ষমতার রূপান্তরের ঘোষণা দেয়া, বিশ্বের কাছে একটা হুশিয়ারী: আমার নিজের তুকের নিয়ন্ত্রক আমি নিজে। নিয়ন্ত্রণের এই মাদকতাময় অনুভূতি আবার এসেছে শারীরিক রূপান্তরের ব্যাখ্যা থেকে যা অগণিত মানুষকে খোদার উপরে খোদকারী করার নেশায় বুঁদ করে রেখেছে…কসমেটিক সার্জারী, বডি পিয়ার্সিং, শরীরচর্চা, এবং স্টেরয়েড. ..এমনকি উভলিঙ্গ আর সর্বগ্রাসী ক্ষুধাও এর অর্ন্তভূক্ত। মানব সত্ত্বা তার দৈহিক খোলসের উপরে ওস্তাদী দেখাতে ব্যস্ত।

মাল’আখের গ্রাণ্ডফাদার ক্লকে একটা ঘন্টার শব্দ শোনা যেতে সে চোখ তুলে তাকায়। বিকেল ছয়টা তিরিশ মিনিট। যন্ত্রপাতি সরিয়ে রেখে সে তার ছয় ফুট তিন ইঞ্চির নগ্ন দেহে একটা কিরইউ সিল্কের তৈরী আলখাল্লা জড়ায় এবং হল ঘরের ভিতর দিয়ে হেঁটে যায়। বিশাল প্রাসাদের ভিতরের বাতাস তার তুক রঞ্জনের তীক্ষ্ণ গন্ধ আর সুঁই জীবাণুমুক্ত করতে ব্যবহার করা মৌমাছির মোম থেকে তৈরী করা মোমবাতির ধোয়ায় ভারী হয়ে আছে। অমূল্য ইতালিয়ান। পুরাকীর্তি সজ্জিত করিডোর দিয়ে ঢ্যাঙা লোকটা হেঁটে যায়- পীরানেসী খোদাইকর্ম, সাভোনারোলার ব্যবহৃত চেয়ার, রূপার তৈরী বুগারিনি প্রদীপ।

হেঁটে যাবার সময়ে সে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত জানালা দিয়ে তাকায়, দূরের ধ্রুপদী দিগন্তরেখার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে একবার তাকায়। ইউ.এস ক্যাপিটলের আলোকিত গম্বুজটা থেকে শীতের অন্ধকার আঁকাশের প্রেক্ষাপটে শক্তির দম্ভ বিকিরিত হচ্ছে।

জিনিসটা ঐখানে লুকান রয়েছে, সে ভাবে। ওখানে কোথাও সেটা পুতে রাখা আছে।

খুব কম মানুষই এর অস্তিত্বের কথা জানে…আর তারচেয়েও কম লোক এর অমিত শক্তির কথা বা কি সুচতুর ভাবে সেটা লুকিয়ে রাখা হয়েছে সেটা জানে। আজ পর্যন্ত, বিষয়টা এদেশের সবচেয়ে অবর্ণনীয় সিক্রেট। অল্প সংখ্যক যে কয়েকজন আসল বিষয়টা সম্বন্ধে জানেন তারা বিষয়টা সংকেত, লিজেও আর। রূপকের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছেন।

তারা এখন সে দ্বার আমার সামনে অবারিত করেছে, মাল’আখ ভাবে।

তিন সপ্তাহ আগে, আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী লোকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক গোপন কৃত্যানুষ্ঠানের মাধ্যমে মাল’আখ এখন পর্যন্ত টিকে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ভ্রাতৃসঙ্রে, তেত্রিশতম মাত্রায় অভিষিক্ত হয়েছে, সঙ্রে সর্বোচ্চ স্তর। মাল’আখের নতুন অর্জিত প্রতিপত্তি সত্ত্বেও ভক্ত ভাইয়েরা তাকে কিছুই বলেনি। সে জানে, তারা সেটা বলবেও না। পুরো বিষয়টা এভাবে কাজ করে না। এখানে চক্রের ভিতরে চক্র রয়েছে…ভ্রাতৃসঙ্রে ভিতরে আরেক ভ্রাতসঙ্ঘ। মাল’আখ যদি আরও বহুবছর ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে তারপরেও সে হয়ত তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে ব্যর্থ হবে।

সৌভাগ্যবশত, তাদের চরমতম রহস্যের কথা জানাবার জন্য তাদের বিশ্বাস অর্জনের কোন প্রয়োজন তার নেই।

আমার উদ্যোগই আমাকে পথ দেখাবে।

এখন, আসন্ন পরিস্থিতির কথা মনে করে উদ্দীপিত হয়ে সে নিজের শোবার ঘরের দিকে হেঁটে যায়। তার পুরো প্রাসাদে, অডিও স্পীকার লাগান রয়েছে, এখন সেখানে গুইসেপ্পি ভার্দির শোকগাথা লাক্স এ্যাটারনা একটা দুর্লভ রেকর্ডিং, যার গায়ককে গলার স্বর যাতে পরিবর্তিত না হয় সেজন্য বয়:সন্ধিক্ষণের পূর্বে তাকে খোঁজা করে দেয়া হয়েছে, রহস্যময় সুরে বাজছে

দ্য লস্ট সিম্বল আগের জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মাল’আখ রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করে ডাইজ আইরের আওয়াজ গমগমে করে তোলে। টিম্পানি ড্রামের বিধ্বংসী আওয়াজ আর সমান্তরাল পঞ্চকের জটিল ছন্দে মাতোয়ারা হয়ে সে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকলে তার পেশল পায়ের বরাভয়ে গায়ের

আলখাল্লা পতপত করে উড়তে থাকে।

সে দৌড়াতে থাকলে, তার খালি পেট বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আজ দিন হল, মাল’আখ কিছুই খায়নি, কেবল পানি পান করেছে, প্রাচীন রীতিতে সে নিজের শরীরকে প্রস্তুত করছে। ভোর নাগাদ তোমার ক্ষুধা নিবৃত্ত হবে, সে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তোমার কষ্টেরও অবসান ঘটবে।

সশ্রদ্ধ চিত্তে মাল’আখ তার শোবার ঘরের শরণস্থলে প্রবেশ করে, পেছনের দরজাটা বন্ধ করে দেয়। কাপড় বদলাবার স্থানের দিকে এগিয়ে যাবার সময়ে, সে থেমে যায়, টের পায় বিশাল গিল্টি করা আয়নাটা তাকে টানছে। নিজেকে বিরত করতে না পেরে, শেষ পর্যন্ত সে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়। মূল্যবান উপহার সামগ্রীর আবরণ খোলার মত ধীরে ধীরে মাল’আখ নিজের আলখাল্লা খুলে নিজের নগ্ন অবয়ব উন্মোচিত করে। সামনের দৃশ্য দেখে সে শিহরিত হয়।

আমি আসলেই একটা শিল্পকর্মের নমুনা।

তার বিশাল দেহ নিলোম এবং মসৃণ। সে প্রথমে নিজের পায়ের দিকে তাকায় যেখানে বাজপাখির আঁশ আর বাঁকান নখরের উল্কি আঁকা রয়েছে। এর উপরে, তার পেষল পায়ে স্তম্ভের উল্কি আঁকা- বাম পায়ে প্যাচানো আর ডান পায়েরটা উল্লম্বভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বোয়াজ আর জ্যাকিন। তার কুঁচকি আর উদরকে একটা খিলানের রূপ দেয়া হয়েছে, যার উপরে তার শক্তিশালী বুকে আঁকা হয়েছে দুই মাথাঅলা ফিনিক্স…মাল’আখের স্তনবৃন্ত দুই মাথার প্রোফাইলের চোখের কাজ করছে। তার পুরো ঘাড়, গলা, কাঁধ, মুখ আর কামান মাথায় প্রাচীন সিম্বল আর আঁকৃতির জটিল নক্সাই ঢাকা।

আমি একটা শিল্পকর্ম…উদীয়মান আইকন।

আঠার ঘন্টা আগে মাল’আখকে নগ্ন দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল এক মরণশীল মানবসন্তানের। বেচারা ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল। ঈশ্বর, তুমি দেখছি সাক্ষাৎ শয়তান!

যদি তুমি আমাকে সেভাবে দেখতে চাও, মাল’আখ উত্তর দিয়েছিল, সনাতন ধারণা অনুযায়ী শয়তান আর ভগবান একই- সতত পরিবর্তনশীল সত্ত্বা পুরোটাই বিপরীতধর্মিতা: যুদ্ধক্ষেত্রে যে দেবদূত তোমাকে শত্রু নিধনে সাহায্য করে প্রতিপক্ষের চোখে কিন্তু সেই অসুরের দোসর।

মাল’আখ এবার মুখটা নীচু করে, এবং তার মাথার একটা তির্যক প্রতিচ্ছবি আয়নায় ফুটে উঠে। সেখানে মুকুটের মত বলয়ের মাঝে, ফ্যাকাশে উল্কিবর্জিত ত্বকের একটা বৃত্তাকার ক্ষুদ্র অংশ ফুটে উঠে। যত্নের সাথে রক্ষা করা মস্তিষ্কের এই অংশটুকুই মাল’আখের একমাত্র কুমারী বৃক। পবিত্র স্থানটা ধৈর্য্যের সাথে অপেক্ষা করে আছে… আর আজ রাতে এটাও পূর্ণ হয়ে যাবে। নিজের মাস্টারপিস শেষ করতে প্রয়োজনীয় উপাচার যদিও এখনও তার হস্তগত হয়নি, কিন্তু সে জানে সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে।

নিজের প্রতিবিম্ব দেখে উত্তেজিত হয়ে, সে নিজের ভিতরে ক্ষমতার রাশ অনুভব করে। আলখাল্লাটা আবার গায়ে চাপিয়ে সে জানালার কাছে হেঁটে যায়। এবং তার সামনে বিছিয়ে থাকা রহস্যময় নগরীর দিকে তাকিয়ে থাকে। ওখানে কোথাও জিনিসটা পুতে রাখা আছে।

বর্তমান সময়ের চাহিদা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে মাল’আখ ড্রেসিং টেবিলের সামনে এগিয়ে আসে এবং যত্নের সাথে মুখ, খুলি আর গলার উল্কির উপরে বেস মেকআপের একটা পরত বুলাতে থাকে যতক্ষণ না সবকিছু এর নিচে ঢাকা পড়ে যায়। তারপরে সে বিশেষ উপলক্ষ্যের জন্য বাছাই করা পোষাক আর আজ সন্ধ্যার জন্য বেছে বেছে নির্দিষ্ট করা অন্যান্য অনুষঙ্গে নিজেকে ভূষিত করে। পোষাক পরা শেষ হলে সে আবার আয়নার দিকে তাকায়। সন্তুষ্ট হয়ে, সে নিজের মসৃণ মাথায় নিজেরই নরম তালু আলতো করে একবার বুলিয়ে নেয়।

ঐখানে কোথাও জিনিসটা আছে সে ভাবে। আর আজরাতে, একজন মানুষ আমাকে সাহায্য করবে সেটা খুঁজে বের করতে।

মাল’আখ প্রস্তুতি নিয়ে নিজের প্রাসাদ থেকে যে ঘটনার জন্য বের হয় শীঘ্রই সেটার আমেজে ইউ.এস ক্যাপিটল ভবন নড়েচড়ে উঠবে। আজ রাতের সব কিছু আয়োজন করার জন্য সে তার সাধ্যের অতিরিক্ত প্রয়াস নিয়েছে।

আর এখন, তার শেষ ঘুটিটাও উপস্থিত হয়েছে খেলায় যোগ দেবার জন্য।

.

৩ অধ্যায়

রবার্ট ল্যাংডন যখন তার নোটকার্ডে চোখ বুলাতে ব্যস্ত তখন তাকে বহনকারী টাউন কারের চাকা নীচের রাস্তার উপরে দিক পরিবর্তন করে। ল্যাংডন চোখ তুলে তাকাতেই বিস্মিত হয়।

এর ভেতরেই মেমোরিয়াল সেতুর কাছে পৌছে গিয়েছি?

সে তার হাতের নোট নামিয়ে রাখে এবং তাদের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া পোটোম্যাক নদীর শান্ত জলরাশির দিকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে থাকে। নদীর বুকে ঘন কুয়াশার আনাগোনা। ফগি বটম, যথার্থই বলা হয় জায়গাটাকে জাতির রাজধানী স্থাপনের স্থান হিসাবে এমন উদ্ভট স্থানকে কেন বেছে নেয়া হয়েছিল সেটা দুর্বোধ্য। নিউ ওয়ার্ল্ডের এত জায়গা থাকতে পূর্বপুরুষেরা কেন তাদের ইউটোপিয়ান সোসাইটির ভিত্তিপ্রস্থর নদীর তীরবর্তী এমন জলাবদ্ধ স্থানে করেছিলেন।

ল্যাংডন বামে, টিডাল বেসিনের ওপারে জেফারসন মেমোরিয়ালের গাম্ভীর্যপূর্ণ বৃত্তাকার অবয়বের দিকে তাকায় আমেরিকার প্যান্থেয়ন, এই নামেই সবাই একে চেনে। তাদের গাড়ির ঠিক সামনে লিংকন মেমোরিয়াল ঋজু নিরাভরণ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এর অর্থোগোনাল সমকোণী রেখার সাথে এথেন্সের প্রাচীন প্যান্থেয়নের মিল রয়েছে। কিন্তু ল্যাংডন আরও দূরে শহরের মধ্যমণির দিকে তাকায়- এই একই চূড়াটা সে আঁকাশ থেকে দেখছিল। রোমান বা গ্রীকদের থেকেও অনেক অনেক প্রাচীন এর স্থাপত্যশৈলীর অনুপ্রেরণা।

আমেরিকার মিশরীয় ওবেলিস্ক।

ওয়াশিংটন স্মৃতিসৌধের মনোলিথিক চূড়া এখন ঠিক তার সামনে অবস্থিত, সমুদ্রগামী জাহাজের রাজসিক মাস্তুলের মত রাতের আঁকাশ আলোকিত করে রেখেছে। ল্যাংডনের তির্যক দৃষ্টিপথ থেকে, আজ রাতে ওবেলিস্কটাকে মনে হয় যেন আঁকাশে ভাসছে…অশান্ত সমুদ্রের বুকে নিরানন্দ আঁকাশের প্রেক্ষাপটে অজানার উদ্দেশ্যে ভেসে চলেছে। ল্যাংডনের নিজেকেও কেমন ভাসমান মনে হয়। ওয়াশিংটনে তার এবারের আগমন একেবারেই অপ্রত্যাশিত। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে কোথায় ভেবেছিলাম রবিবারের সকালটা বেশ আয়েশ করে কাটাব…তা না আমি এখন কিনা ইউ.এস ক্যাপিটল হিল থেকে কয়েক মিনিটের দূরত্বে অবস্থান করছি।

আজ সকালে ঠিক পৌনে পাঁচটার সময়ে, হার্ভাডের নিঃসঙ্গ সুইমিং পুলের নিথর পানিতে ল্যাংডন প্রতিদিনের মত আজও সকালটা শুরু করেছিল, পঞ্চাশ ল্যাপের সাঁতার দিয়ে। কলেজে পড়বার সময়ে অল-আমেরিকান ওয়াটার-পোলো দলে সদস্য থাকার সময়ে তার যে স্বাস্থ্য ছিল সেটা এখন অনেকটাই ভেঙেছে, কিন্তু চল্লিশ বছর বয়স্কের তুলনায় তার দেহ আজও ঈর্ষণীয় রকমের সুঠাম আর সাবলীল। পার্থক্য একটাই আজকাল এটা বজায় রাখতে গিয়ে তাকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়।

ছয়টার সময়ে ল্যাংডন যখন বাসায় পৌঁছায়, সে হাতে-পেষা সুমাত্রা কফির গুড়ো দিয়ে কফি তৈরী করে আর রান্নাঘরে ম ম করতে থাকা অদ্ভুত সুগন্ধটা উপভোগের ফাঁকে তার দিনের প্রাত্যহিক কাজকর্ম শুরুর প্রস্তুতি নেয়। আজ সকালে অবশ্য বাসায় পৌঁছে সে তার ভয়েস-মেলের জ্বলতে থাকা লাল-বাতিটার দিকে অবাক চোখে তাকায়। রবিবার সকাল ছয়টার সময়ে আবার কে ফোন করলো? সে বাটন টিপে মেসেজটা শোনে।

সুপ্রভাত, প্রফেসর ল্যাংডন। এত সকালে ফোন করার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। স্পষ্টতই বোঝা যায় ভদ্র কণ্ঠস্বরটা বাস্তবিকই ব্ৰিত, কণ্ঠস্বরে দক্ষিণের বাচনভঙ্গি মৃদু আঁচ করা যায়। আমার নাম অ্যান্থনী জেলবার্ট আর। আমি পিটার সলোমনের কার্যনির্বাহী সহকারী। মি. সলোমন আমাকে বলেছেন আপনি খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেন…সহসা প্রয়োজন হওয়ায় তিনি আজ সকাল থেকেই আপনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। আপনি মেসেজটা পাওয়া মাত্রই যদি সরাসরি পিটারের সাথে যোগাযোগ করেন তবে উপকৃত হব। আপনার কাছে সম্ভবত তার নতুন ফোন নাম্বারটা রয়েছে, তবুও আপনার কাজে লাগতে পারে মনে করে আবারও আমি সেটার পুনরাবৃত্তি করছে, নম্বরটা ২০২-৩২৯-৫৭৪৬।

ল্যাংডন সহসা তার বৃদ্ধ বন্ধুর কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। পিটার সলোমনের মত সুশিক্ষিত আর সৌজন্যতা বেঁধের মানুষ খুব বিপদে না পড়লে রবিবার সকালে কাউকে বিরক্ত করবে না, কি হল মানুষটার।

ল্যাংডন কফির পানি চড়িয়ে দিয়ে দ্রুত তার স্টাডিতে আসে ফিরতি ফোনকল করতে।

আমি আশা করি তার কোন বিপদ হয়নি।

ল্যাংডনের চেয়ে মাত্র বারো বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও, পিটার সলোমন ছিল তার বন্ধু আর বিজ্ঞ পরামর্শদাতা আর প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা হবার পরে। থেকে সে অনেকটাই তার বাবার স্থান দখল করে নিয়েছিল। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায়, ল্যাংডনকে একবার সুপরিচিত তরুণ মানবপ্রেমিক আর ইতিহাসবিদদের অতিথি ভাষণে অংশ নিতে হয়েছিল। সলোমন সংক্রামক আবেগ নিয়ে, সেমিওটিকস আর মৌলিক ইতিহাস সম্বন্ধে এমন প্রাণবন্ত রূপকল্প। অঙ্কন করেছিল যা ল্যাংডনের মাঝে সিম্বলের প্রতি তার আজীবনের এক প্রেমময় সম্বন্ধের সৃষ্টি করেছে। পিটার সলোমনের চৌকষতা না বরং তার ধুসর চোখের বিনয় ল্যাংডনকে সাহস দিয়েছিল ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে চিঠি লিখতে। দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত সেই ছাত্র কখনও কল্পনাও করেনি যে আমেরিকার অন্যতম ধর্নাঢ্য আর তরুণ বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান পিটার সলোমন তার চিঠির উত্তর পাঠাবে। কিন্তু সলোমন উত্তর দেয়। আর সেটা ছিল এক সত্যিকারের তুষ্টিকর বন্ধুত্বের সূচনা।

প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ যার শান্ত মেজাজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতাশালী ঐতিহ্যের বিন্দুমাত্র টের পাওয়া যায় না, পিটার সলোমন ধনকুবের সলোমন পরিবারের সন্তান, সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় আর ভবনগুলোর সাথে যে পরিবারের নাম ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ইউরোপের রথচাইল্ডের মত, আমেরিকায় সলোমন পদবীটার সাথে রহস্যময় রাজকীয়তা আর সাফল্যের গাঁধা একসাথে জড়িয়ে আছে। খুব অল্প বয়সে তার বাবার মৃত্যু হবার হবার কারণে পিটার তরুণ বয়সেই উত্তরাধিকার সূত্রে মনোযোগের কেন্দ্রস্থলে চলে আসে আর এখন আটান্ন বছর বয়সে সে ক্ষমতার নানান অন্ধিসন্ধি দেখে ফেলেছে। বর্তমানে সে স্মিথসোনিয়ান অনুষদের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছে। ল্যাংডন প্রায়শই পিটারকে উত্যক্ত করার জন্য বলতো যে তার ঝা চকচকে ঠিকুজিতে একমাত্র কলঙ্কের দাগ ইয়েলের মত একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া ডিপ্লোমা।

এখন, ল্যাংডন, তার স্টাডিতে প্রবেশ করে পিটারের কাছ থেকে ইতিমধ্যেই একটা ফ্যাক্স চলে এসেছে দেখে বেশ অবাক হয়।

পিটার সলোমন
সেক্রেটারীর অফিস
স্মিথসোনিয়ান অনুষদ
সুপ্রভাত, রবার্ট।

এই মুহূর্তে তোমার সাথে আমার কথা হওয়াটা জরুরী।

অনুগ্রহ করে আজ সকালে যত শীঘ্র সম্ভব এই ২০২-৩২৯-৫৭৪৬ নাম্বারে একটা ফোন করতে পারবে।

পিটার

ল্যাংডন সাথে সাথে ফোন ঘুরিয়ে, তার হাতে তৈরী ওক কাঠের পড়ার টেবিলে বসে অন্য প্রান্তে কেউ ফোন উঠাবার জন্য প্রতিক্ষা করে।

পিটার সলোমনের অফিস, সহকারীর পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে। অ্যান্থনী বলছি। আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি?

হ্যাঁলো, আমি ল্যাংডন কথা বলছি। তুমি আমাকে কিছুক্ষণ আগে একটা মেসেজ পাঠিয়েছিলে-

হ্যাঁ, প্রফেসর ল্যাংডন! তরুণ সহকারীর কণ্ঠে একটা ভার মুক্তির রেশ স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। মিসলোমন আপনার সাথে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। দাঁড়ান, আমি তাকে বলছি যে আপনি ফোন করেছেন। আমি কি আপনাকে হোল্ড করাতে পারি?

অবশ্যই।

ল্যাংডন সলোমনের ফোন ধরার জন্য অপেক্ষা করার অবসরে, স্মিথসোনিয়ানের লেটারহেডের উপরে ছাপা পিটারের নামটার দিকে তাকায় এবং হেসে ফেলে। সলোমন পরিবারে তার জুড়ি খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। পিটারের বংশলতিকায় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ভুরি ভুরি খুঁজে পাওয়া যাবে যাদের কেউ কেউ আবার লণ্ডনের রয়েল সোসাইটির সদস্য। সলোমনের একমাত্র জীবিত পারিবারিক সদস্য, তার ছোট বোন, ক্যাথরিন, আপাত দৃষ্টিতে যে উত্তরাধিকার সূত্রে বৈজ্ঞানিকের ধারা পেয়েছে, কারণ আজকাল সে বিজ্ঞানের একেবারে নতুন কাটিং-এজ ধারা নিওটিক সাইন্সের একজন কেবিন্ধু।

আমার কাছে পুরোটাই হিব্রু, ল্যাংডন ভাবে, গত বছর তার ভাইয়ের বাসায় একটা দাওয়াতের সময় তাকে নিওটিক সাইন্স কি সেটা বোঝাবার জন্য বেচারীর ব্যর্থ চেষ্টার কথা মনে পড়তে সে হেসে উঠে। ল্যাংডন তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছিল, এবং তার পরে আপাত সারল্য মিশ্রিত কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিল, বিজ্ঞানের চেয়ে তন্ত্রমন্ত্রের সাথেই বুঝি বেশি মিল।

ক্যাথরিন অপ্রস্তুতভাব কাটাতে গিয়ে চোখ পিটপিট করে। রবার্ট, তুমি যতটা কাছাকাছি মনে করছো এই দুটোর ভিতরে তারচেয়েও বেশি মিল রয়েছে।

সলোমনের সহকারীর কণ্ঠ আবার ভেসে আসে। আমি দুঃখিত, মি. সলোমন এই মুহূর্তে একটা কনফারেন্স কল নিয়ে মহাব্যস্ত। আজ সকালে সবকিছুই কেমন যেন গোলমেলে।

কোন সমস্যা নেই। আমি পরে আবার ফোন করবো।

আসলে, তিনি আমাকে বলেছেন আমি যেন আপনাকে তার যোগাযোগের কারণটা খুলে বলি, আপনি যদি ব্যাপারটা অন্যভাবে না নেন?

না, একেবারেই না।

সহকারী ছেলেটা একটা গভীর শ্বাস নেয়। প্রফেসর, আপনি সম্ভবত জানেন যে প্রতিবছর স্মিথসোনিয়ান বোর্ড আমাদের সবচেয়ে উদার পৃষ্ঠপোষকদের ধন্যবাদ জানাতে ওয়াশিংটনে একটা ঘরোয়া গালার আয়োজন করে থাকে। দেশের অনেক সংস্কৃতমনা অভিজাতরা এতে অংশ নেন।

ল্যাংডন খুব ভাল করেই জানে তার ব্যাংক একাউন্টে এখনও আরও কয়েকটা শূন্য বাড়াতে হবে নিজেকে সংস্কৃতমনা অভিজাতদের কাতারে সামিল করতে, কিন্তু সে ভাবে পিটার কি তবে আমাকে অংশগ্রহণের জন্য ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ পাঠাতে চাইছে।

এই বছর, প্রথা অনুসারে, সহকারী কথা চালিয়ে যায়, ডিনারের আগে একটা স্বাগত ভাষণের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। আমাদের কপাল ভাল বলতে হবে বক্তৃতাটার আয়োজন ন্যাশনাল স্ট্যাচুয়ারী হলে করা হয়েছে।

পুরো ওয়াশিংটনে এর চেয়ে আর ভাল হল নেই, ল্যাংডন ভাবে, নাটকীয় অর্ধ-বৃত্তাকার এই হলে সে একবার একটা রাজনৈতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছিল। স্মৃতিটা ভুলে যাওয়া খুব কঠিন, পাঁচশ ভাজ করা যায় এমন চেয়ার নিখুঁত বৃত্তচাপে বিন্যস্ত, তাদের চারপাশে প্রমাণ আঁকৃতির আটত্রিশটা মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, হলরুমটা একসময়ে জাতির জনপ্রতিনিধিদের চেম্বার হিসাবে ব্যবহৃত হত।

এখন সমস্যা হয়েছে এই যে, লোকটা বলে। আমাদের আগে থেকে নির্ধারিত বক্তা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, আর আজ সকালেই ভদ্রমহিলা আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি ভাষনটা দিতে পারবেন না। লোকটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে থেমে যায়। তারমানে আমরা এই মুহূর্তে একজন বিকল্প বক্তা হন্যে হয়ে খুঁজছি। আর মি. সলোমন আশা করছেন আপনি আমাদের চাহিদা পূরণ করবেন।

ল্যাংডন চমকে উঠে। আমি? আর যাই হোক এটা তার কল্পনাতেও ছিল। আমি নিশ্চিত পিটার আমার চেয়ে অনেক ভাল বিকল্প বক্তা খুঁজে পাবে।

মি.  সলোমনের প্রথম পছন্দ আপনি, এবং আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি আপনি অতিশয় বিনয়ী। অনুষদের শ্রোতারা আপনার ভাষণ শুনতে পুলকিত বোধ করবে, আর মি. সলোমনের ইচ্ছা কয়েকবছর আগে বুকস্প্যান টিভিতে যে ভাষণটা দিয়েছিলেন সেটারই পুনরাবৃত্তি আপনি করবেন। আর সেটা হলে, আপনাকে প্রস্তুতিতে কোন সময় ব্যয় করতে হবে না। তিনি আমাকে বলেছেন, আপনার সেই ভাষনে আমাদের রাজধানীর স্থাপত্যের সিমবোলিজমও অন্তর্ভূক্ত ছিল- সেটা হলে বিষয়টা একেবারে আদর্শ বক্তৃতা হবে।

ল্যাংডন তবুও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আমার যতদূর মনে পড়ছে আমার সেই বক্তৃতায় ভবনগুলোর ম্যাসনিক ইতিহাসের উপরে বেশি জোর দেয়া হয়েছিল আর-।

ঠিক তাই! আপনি তো জানেনই, মি. সলোমন নিজে একজন ম্যাসন, আর সমাবেশে আগত সুধীমণ্ডলীর ভিতরে অনেকেই তার মনোভাব ধারণ করে। আমি নিশ্চিত এই বিষয়টা নিয়ে তারা আপনার মুখ থেকে কিছু শুনতে পছন্দই করবে।

মানছি কাজটা এমন কঠিন হবে না। ল্যাংডন অভ্যাসবশত তার সব বক্তৃতার নোট জমিয়ে রাখে। আমি ব্যাপারটা ভেবে দেখছি। আপনাদের অনুষ্ঠানটা কবে?

সহকারী একবার কেশে গলা পরিষ্কার করে, সহসা তাকে কেমন আমতা আমতা করতে শোনা যায়। মানে, স্যার, সত্যি বলতে আজ রাতে।

ল্যাংডন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। আজরাতে?

এই কারণেই আজ সকালে সবাই এত ব্যাতিব্যস্ত হয়ে রয়েছে। স্মিথসোনিয়ান এমন গ্যাড়াকলে এর আগে কোন দিন পড়েনি…সহকারী হড়বড় করে কথা বলতে থাকে। মি. সলোমন বস্টন থেকে আপনাকে নিয়ে আসতে একটা ব্যক্তিগত জেটবিমান পাঠাবার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন। আঁকাশপথে এক ঘন্টা লাগবে এখানে আসতে আর আজ মাঝরাতের আগেই আপনি আবার বাসায় ফিরে যেতে পারবেন। বস্টনের লোগান এয়ারপোর্টের ব্যক্তিগত টার্মিনালটা তো আপনি চেনেন?

তা চিনি, হাল ছেড়ে দেয়া ভঙ্গিতে ল্যাংডন বলে। পিটার সবসময়ে তার প্রয়োজন আদায় করেই ছাড়ে।

চমৎকার! আপনি কি তাহলে পাঁচটার সময়ে সেখান থেকে জেটে আরোহন করতে পারবেন?

তুমি আমার জন্য আর কোন পথ খোলা রাখনি, তাই না? ল্যাংডন মুচকি হেসে বলে।

আমি কেবল মি. সলোমনকে সন্তুষ্ট রাখতে চাই, স্যার।

মানুষের উপরে পিটারের প্রভাব এতটাই প্রবল। ল্যাংডন অনেকক্ষন সময় নিয়ে চিন্তা করে, দেখে পাশ কাটিয়ে যাবার কোন উপায় নেই। ঠিক আছে। বুড়োটাকে বললো, আমি কাজটা করবো।

অসাধারণ! সহকারী তার খুশি চাপা রাখতে পারেনা, স্পষ্টতই বোঝা যায় একটা ভার তার উপর থেকে নেমে গেছে। সে ল্যাংডনকে জেটবিমানের নম্বর আর অন্যান্য দরকারী তথ্য সরবরাহ করে।

ল্যাংডন অবশেষে যখন ফোনটা নামিয়ে রাখে তখন সে মনে মনে ভাবে আচ্ছা পিটার সলোমনকে কি কেউ কখনও না বলে।

কফি তৈরীর জায়গায় ফিরে এসে, ল্যাংডন আরও কিছু বিন গ্রাইণ্ডারে দেয়। আজ সকালে একটু বেশি ক্যাফিইন, সে ভাবে। আজকের দিনটা লম্বা হবে।

.

৪ অধ্যায়

প্রাকৃতিক মালভূমির ওপরে আর ন্যাশনাল মলের ঠিক পূর্ব পাশের শেষ প্রান্তে ইউএস ক্যাপিটল বিল্ডিং। সিটি ডিজাইনার পিয়েরে লয়েনফ্যান্ট এই মালভূমিটাকে বলতেন মূর্তির জন্য অপেক্ষমান বেদী। ক্যাপিটল হিলের এই বিশাল পদছাপের আয়তন লম্বায় সাড়ে ৭শ ফুট আর গভীরতায় সাড়ে ৩শ ফুট। ১৬ একর জমির ওপর হাউজিং গড়ে উঠেছে। এতে রয়েছে ৫ শ ৪১ কক্ষের বিশাল আবাসন ব্যবস্থা। নিওক্ল্যাসিক্যাল প্রকৌশলীরা প্রাচীন রোমের স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে ক্যাপিটল হিলের ডিজাইন করেছিলেন।

নতুন আমেরিকান প্রজাতন্ত্রে যে আইন ও সংস্কৃতি যুক্ত হয়েছিল সেগুলো ছিল রোমান সংস্কৃতি থেকে নেওয়া। রোমানদের স্থাপত্য-কলা ও শিল্প সংস্কৃতি আমেরিকানদের দারুনভাবে আকর্ষণ করেছিল।

ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ে পর্যটকদের ঢোকার জন্য নতুন যে ভিজিটর সেন্টার বানানো হয়েছে তার ঠিক নিচে একটি সিকিউরিটি চেকপয়েন্ট। এই চেকপয়েন্টে একজন নতুন সিকিউরিটি গার্ডকে কয়েকদিন হল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। লোকটার নাম অ্যালফোনসো ন্যুনেজজ। ন্যুনেজ বেশ কিছুক্ষণ ধরে সামনের দিক থেকে এগিয়ে আসা লোকটাকে লক্ষ্য করছিল। লোকটা চেকপয়েন্টের দিকে এগিয়ে আসছে। ভদ্রলোকের মাথা কামানো। টাকটা চকচক করছে। গেটের কাছে আসার সময় সে মোবাইল ফোনে কারও সংগে কথা বলছিল। কথা শেষ হতেই আবার এগিয়ে এল। লোকটার ডান হাতে ব্যান্ডেজ। একটু খুড়িয়ে খুড়িয়ে। হাঁটছিল সে। তার গায়ে আর্মি-নেভিদের মতো খাকি কাপড়ের কোট। ন্যুনেজজ লোকটাকে প্রথম দর্শনেই সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা অথবা কর্মচারি বলে ধরে নিল। আমেরিকান সেনাসদস্যদের ক্যাপিটল হিল পরিদর্শন অবশ্য খুবই সাধারণ বিষয়।

গুড ইভনিং স্যার! স্নান্যুনেজ তার পেশাদারি ভঙ্গিমায় হাত বাড়িয়ে দিল। হ্যালো!- দর্শনার্থীও হাস্যোজ্জল জবাব দিল। তারপর চারপাশটাতে নজর বুলিয়ে বলল, ভালোই, বেশ শুনশান রাত এখানটায়।

সামনের ডিশটাতে আপনার কাছে থাকা ধাতব কিছু থাকলে সেগুলো রাখুন।- আগন্তুককে বললো ন্যুনেজজ।

ভদ্রলোক এবার এক হাতে তার কোটের পকেট হাতড়াতে লাগলেন। এখানে ঢোকার আগে দেহ তল্লাশির অংশ হিসেবে এসব করতে হচ্ছে তাকে। লোকটা যখন পকেট হাতড়াচ্ছিল তখন ননে তাকে ভালো করে একবার দেখে নিল। লোকটার একটা হাতে ভারি প্রাস্টার ব্যান্ডেজ। হাতটা হয়তো ভেঙে গিয়েছে।

যে হাতটা ভালো সেই হাতে ভদ্রলোক তার পকেটে থাকা ভাংতি পয়সা, চাবি এবং এক জোড়া সেল ফোন সেট বের করে সেগুলো মেটাল ডিটেকটরের পাশে রাখা ট্রেতে রাখলেন।

ব্যান্ডেজে বাধা হাতটার দিকে চেয়ে ন্যুনেজ বললো, ভেঙ্গে গেছে?

মাথা মোড়ানো ভদ্রলোক মিষ্টি করে হাসলেন। বললেন, বরফের রাস্তায় আছাড় খেয়ে এই অবস্থা। এক সপ্তাহ আগের ঘটনা কিন্তু ব্যথা এখনও একটুও কমেছে বলে মনে হচ্ছে না।

খুবই দুঃখজনক ন্যুনেজ বললো, আপনি এবার ডিটেকটর মেশিনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে আসুন।

ভদ্রলোক কথা না বাড়িয়ে মেশিনের গেটে ঢুকতেই সেটা ক্যাক ক্যাক করে উঠলো।

ভদ্রলোক কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, যা ভেবেছিলাম, তাই। আমার হাতের ব্যান্ডেজের নিচে একটা রিং পরানো আছে। হাতটা অনেক ফুলে যাওয়ায় ডাক্তাররা রিংটা পরিয়ে তার ওপরে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়েছে। সেটার জন্যই মেশিনে সতর্ক সংকেত বাজছে।

ন্যুনেজ বললো, কোন সমস্যা নেই। আমি ওয়াল্ড ব্যবহার করব। বলেই সে তার হাতলযুক্ত লাঠির মতো লম্বা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে ভদ্রলোকের সর্ব শরীর সার্চ করা শুরু করল।

ওয়াল্ডটা ব্যান্ডেজের ওপর ধরতেই সংকেত বাজলো। ভদ্রলোক জানালেন, আঙুলগুলোকে ঘিরে রিংটা পরানো হয়েছে।

ন্যুনেজ ভাবছিল, সিকিউরিটি সুপারভাইজার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার সাহায্যে তার কাজ লক্ষ্য করছে। সবেমাত্র এক মাস হয়েছে এখানে চাকরি নিয়েছে সে। সে হিসেবে একটু বাড়তি সতর্কতা তারা আশা করতেই পারে।

ওয়াল্ডের ঘষায় ব্যাথা পেয়ে লোকটা উহ্ বলে কুকিয়ে উঠলেন।

সরি- ন্যুনেজ সৌজন্যতার সুরে বললো।

ভ্যান ব্রাউন না, ইটস ওকে! ভদ্রলোক উল্টো সৌজন্য দেখালেন। মেটাল ডিটেকটরের কাজ শেষ। এবার চোখের তল্লাশি শুরু করলো ন্যুনেজ। লোকটার দিকে আবার আপাদমস্তক দেখলো। তেমন কোন অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লো না। সব ঠিক আছে! আপনি ভেতরে যেতে পারেন- ন্যুনেজ তার ওয়াল্ড সরিয়ে বললো।

ধন্যবাদ! বলেই ভদ্রলোক ট্রেতে রাখা তার মোবাইল ফোনসেট, ভাংতি পয়সা, আর চাবি গুছাতে লাগলো।

ভদ্রলোক যখন সেগুলো তুলছিলেন তখন আবার তার হাতের ব্যাভেজের দিকে চাইল ন্যুনেজজ। ব্যান্ডেজের শেষ মাথায় আঙুলগুলো বেরিয়ে রয়েছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তার আঙুলে আঁকা ট্যাটু। বুড়ো আঙুলের মাথায় একটা তারা আঁকা। তর্জনিতে একটা মুকুটের ছবি।

ন্যুনেজ বললো, চোট লেগে কি আপনার ট্যাটুও নষ্ট হয়ে গেছে।

ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন, খুব সামান্য। আপনি যতটা ভাবছেন ততটা নয়।

ন্যুনেজ বললো, যাক বেঁচে গেছেন। আপনার ভাগ্য ভালো। আমার পিঠেও ট্যাটু আছে। জলপরীর ছবি।

জলপরী! টেকো লোকটা কেমন যেন চমকে উঠলো।

হ্যাঁ, যৌবনে যতগুলো ভুল করেছিলাম এটাও হয়তো তার একটা বললো ন্যুনেজ।

আমিও যৌবনের ভুলেই পিঠে জলপরীর ছবি বয়ে বেড়াচ্ছি। রোজ তার সংগেই আমাকে ঘুম থেকে উঠতে হয়। লোকটার কথা শেষ না হতেই দুজনই হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতেই ভদ্রলোক সামনের দিকে পা বাড়ালেন।

এই জ্বলোকই হলেন মাল’আখ। ন্যুনেজকে অতিক্রম করে ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের দিকে যে এস্কেলেটরটা উঠে গেছে সেদিকে তিনি রওনা হলেন। এখানে এত সহজে ঢোকা যাবে তা তিনি ভাবতে পারেন নি।

সারা দেহে পাতলা প্যাড আর হাতে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে রাখায় ট্যাটু কারও চোখে পড়েনি। এদিক ওদিক চেয়ে সন্তর্পনে এগিয়ে চললো মাল’আখ।

.

৫ অধ্যায়

যেটি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর অত্যাধুনিক জাদুঘর সেটিতে যখের ধনের মতো গুপ্ত ধন বা গোপন তথ্য থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। ভ্যাটিকান মিউজিয়াম এবং নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামের যত প্রত্ন সামগ্রী আছে এখানে তার চেয়ে অনেক বেশী রয়েছে। এত দর্শনীয় প্রত্ন সামগ্রী থাকতেও সাধারণ লোকজন এখানে ঢুকতে পারেনা। আম জনতার খুব ছোট একটা অংশই সুরক্ষিত এ মিউজিয়ামে ঢোকার অনুমতি পায়।

ওয়াশিংটন ডিসির বাইরেই ৪২১০ সিলভার হিল রোডে আকাবাকা আকৃতির এই বিশাল জাদুঘর ভবন। পরস্পর যুক্ত পাঁচটা গম্বুজাকৃতির বিশাল বিশাল হল রুমে এই জাদুঘর একেকটা হল একেকটা ফুটবল মাঠের চেয়েও বড়। ৬ লাখ স্কয়ার ফুটের এই মিউজিয়ামের একটা বড় অংশে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীনতম লিপি চিহ্ন।

আজ রাতে এখানে এসে বিজ্ঞানী ক্যাথরিন সোলোমন কেমন যেন অস্থিরতা বোধ করছিলেন। বিল্ডিংয়ের মেইন সিকিউরিটি গেইটের কাছাকাছি এসে তার সাদা ভলভো থামলো।

গার্ড তাকে স্বাগত জানালো।

ক্যাথরিন বললেন, সেকি আছে এখনও?

গার্ড তার সামনের খাতায় একবার নজর বুলিয়ে বললো, লগ বুকে তো তার নাম দেখছি না।

ও আচ্ছা, তাহলে আমিই আগে এসে পড়েছি। বলেই ক্যাথরিন গাড়িটাকে পার্কিং প্লেসে নিয়ে দাঁড় করালেন। এখানকার সব গার্ড তাকে ভালো করে চেনে।

পঞ্চাশ বছর বয়স হয়েছে। তারপরও ক্যাথরিনের যৌবনে ভাটা পড়েনি। সব সময় মেকআপে থাকেন। চুলে পাক ধরেনি। বড় ভাই পিটারের মতো ক্যাথরিনেরও ধূষর চোখ।

ক্যাথরিনের যখন ৭ বছর বয়স তখন তার বাবা ক্যান্সারে মারা যান। বাবার স্মৃতি খুব কমই মনে আছে। তার ভাই তার আট বছরের বড়। বাবা যখন মারা যান তখন পিটারের বয়স ১৫ বছর।

সেই সময় থেকেই পিটার তাকে কোলে পিঠে করে বড় করেছিল। এমন কি এখনও ক্যাথরিনকে তিনি বাচ্চা খুকির মতো আদর করেন।

ক্যাথরিন ভাইয়ের অকৃত্রিম স্নেহে বড় হয়েছেন। বন্ধু বান্ধব পেয়েছেন। কিন্তু জীবন সংগী তার বেছে নেওয়া হয়ে ওঠেনি। অনেক পানিপ্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বিয়েটা করা হয়নি। অবশ্য এ নিয়ে তার মধ্যে খুব একটা যে হা পিত্যেশ আছে তা ও নয়।

নোয়েটিক সায়েন্স তার মূল গবেষণার বিষয়। মানুষের মানষিক ক্ষমতা ও মনোজাগতিক শক্তির ওপর তার লেখা দুটি বই বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছে। আজ রাতে এখানে এক ভদ্রলোকের সংগে জরুরি মিটিং রয়েছে।– গাড়িটা পার্ক করে ব্যাগ হাতে হেঁটে মূল গেটের দিকে এগুতেই সেল ফোন বেজে উঠলো।

ফোনের মনিটরে ভেসে ওঠা কলার আইডির দিকে তাকালেন ক্যাথরিন। তারপর ইয়েস বাটনে চাপ দিয়ে কানে ফোন ধরলেন।

মাইল ছয়েক দুরে ইউ এস ক্যাপিটলের করিডোর দিয়ে কানে মোবাইল ফোন চেপে ধরে হাটছিলেন মাল’আখ। বেশ কিছুক্ষণ ধরে রিং হচ্ছে কিন্তু ওপাশ থেকে ধরছে না। অবশেষে একটা মহিলা কণ্ঠ রিসিভ করলো, ইয়েস?

মাল’আখ বললেন, আমাদের আবার দেখা করা দরকার। বেশ কিছুক্ষণ বিরতির পর নারীকণ্ঠটি বললো, সব ঠিক আছে তো?

আমার হাতে কিছু নতুন তথ্য এসেছে।–বলো।

মাল’আখ একটা গভীর নিঃশ্বাস নিলেন। তারপর বললেন, ওয়াশিংটন ডিসিতে যে গোপন জিনিস আছে বলে তোমার ভাইয়ের দৃঢ় বিশ্বাস, সে ব্যাপারেই কথা আছে।

–কী বল তো।

–তিনি যে ধারণা করেছেন তা সত্য। জিনিসগুলো পাওয়া যেতে পারে।

ক্যাথরিন সলোমন একমুহূর্ত চুপ মেরে রইলেন। তারপর বললেন, তার মানে তুমি বলছো জিনিসগুলো সত্যিই আছে?

মাল’আখ আপন মনে একবার হাসলেন। মনে মনে বললেন, কোন কোন কিংবদন্তি শত শত বছর ধরে বেঁচে থাকে। সেগুলো এমনি এমনি বাচেনা। এর পেছনে কারণ থাকে।

.

৬ অধ্যায়

দরজা কি বন্ধ থাকবে? যাওয়ার পথে ল্যাংডন ভাবতে লাগলেন। বিষয়টি রীতিমত তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার ফার্স্ট স্ট্রিটে চলে এলেন। জায়গাটা ক্যাপিটল বিল্ডিং থেকে মাত্র সিকি মাইল দূরে।

ড্রাইভার বললেন, খুব ভয় হচ্ছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির লোকজন চারদিকে। ওই ভবনের কাছে কোন গাড়ি ভীড়তে দিচ্ছে না। আমি দুঃখিত স্যার। আমি ওখানে যেতে পারব না।

ল্যাংডন ঘড়ির দিকে তাকালেন। তখন ৬টা ৫০ মিনিট বেজে গেছে। ন্যাশনাল মলের চারদিকে নির্মাণ কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তার লেকচার শুরু হতে আর মাত্র ১০ মিনিট বাকি।

ড্রাইভার বললেন, আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাচ্ছে। অথচ আপনি দ্রুত যেতে বলছেন। কি করব বুঝতে পারছি না। ল্যাংডন বললেন, তুমি এতক্ষণ বেশ ভাল কাজ করেছ। এজন্য তোমার টাকাটা একটু বাড়িয়ে দেয়া উচিত। গাড়ি গন্তব্যে এসে পৌঁছল। ল্যাংডন ড্রাইভারকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন।

ল্যাংডন গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তিনি দ্রুত ক্যাপিটল হিলের আন্ডারগ্রাউন্ডে অবস্থিত পরিদর্শক রুমে ঢুকে গেলেন।

ক্যাপিটল ভিজিটর সেন্টারটি নির্মাণে খুব পয়সা খরচ করা হয়েছে। এটা আকার আকৃতিতে এত বড় যে মনে হবে একটা ছোটখাটো শহর। ডিজনি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গেও একে তুলনা করা চলে।

গোটা এলাকাটার আয়তন ৫ লাখ বর্গ ফুটেরও বেশি। এখানে প্রদর্শনী কক্ষ, রেস্টুরেন্ট, কনফারেন্স কক্ষসহ শত সহস্র কক্ষ রয়েছে।

ল্যাংডন সব কিছু লক্ষ্য করতে লাগল। চারদিক দেখে শুনে সামনে এগুতে লাগলেন, ওখানে সবকিছু দেখা গেলেও অফিস দেখা ছিল দুরহ ব্যাপার। ল্যাংডন লেকচারের পোশাক পড়ে ছিলেন।

ল্যাংডন নিচে পৌঁছে রীতিমত হাঁফাতে লাগলেন। তার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। তিনি দ্রুত সেন্টারের উক্ত প্রান্তরে চলে এলেন। এবার তিনি নিশ্বাস নিতে পারছেন। ল্যাংডন নবনির্মিত এই বিশাল ফ্লোরের চারদিকে কিছুটা চোখ বুলিয়ে নিলেন।

ল্যাংডন যা ভেবেছিলেন ক্যাপিটল ভিজিটর সেন্টারটি আসলে সেরকম ছিল। সেখানকার সিংহভাগ জায়গায় ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড। এটা অতিক্রম করা নিয়ে ল্যাংডন রীতিমত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। ছোটবেলায় ল্যাংডন একবার কুয়োর মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। সারারাত তাকে সেখানে কাটাতে হয়েছিল। সেই দুর্বিসহ স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়াতে শুরু করল।

তবে তখনকার পরিস্থিতি আর আজকের পরিস্থিতির মধ্যে তফাৎ আছে। কুয়োর মধ্যে তেমন আলোকপাত ছিল না। জায়গা ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। কিন্তু এখানে পর্যাপ্ত আলো বাতাস আছে। জায়গাও বিশাল, কিন্তু এরপরও এই আন্ডারগ্রাউন্ড সেন্টারটি তার কাছে অস্বস্তিকর মনে হল।

এই সেন্টারের সিলিং ডেকোরেশন করা হয়েছে দামী গ্লাস দিয়ে। এই অত্যন্ত আশ্চর্য রকম মুক্তার রঙের গ্লাসগুলো সবসময় জ্বল জ্বল করে।

ল্যাংডন এক ঘণ্টা সময় ব্যয় করলেন এই বিশাল সেন্টারের নির্মাণ শৈলী নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে। অনুষ্ঠান শুরু হতে ৫ মিনিট বাকী। ল্যাংডন মাথা নোয়ালেন। কি যেন ভাবলেন, এরপর দ্রুত বেগে মূল হল রুমের দিকে ছুটলেন। হলরুমে চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে যেতে হয়।

চলন্ত সিঁড়িতে যাওয়ার আগে নিরাপত্তা চেক পয়েন্ট পার হতে হয়। ওখানে যাওয়ার আগে পিছন থেকে একজন বললেন, থাম। আস্তে যাও। পিটার জানে তুমি এখন সেদিকে যাচ্ছ। আর তোমাকে ছাড়া ওই অনুষ্ঠান শুরু হবে না।

নিরাপত্তা চৌকিতে একজন যুবক হিসপ্যানিক নিরাপত্তাকর্মী ওই লোকের। সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন। এই ল্যাংডন তার পকেট পরিষ্কার করে ফেললেন। বিশেষ করে দুপ্রাপ্য ঘড়িটি পকেট থেকে বের করে হাতে লুকালেন। আপনি কি মিটিং হাউজ- নিরাপত্তা কর্মী বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলে ল্যাংডন মাথা নাড়লেন। কোন মন্তব্য করলেন না। নিরাপত্তাকর্মী স্মিথ হেসে বললেন, আপনাকে খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছে।

ল্যাংডন মুচকি হাসলেন, তার ব্যাগটি এক্সরে মেশিনে ঠেলে দিলেন।

স্টাচুয়ার্ক হলে যাওয়ার রাস্তা জানতে চাইলেন। নিরাপত্তা কর্মী চলন্ত সিঁড়ি দেখিয়ে বললেন, ওখানে গেলেই আপনি পথ নির্দেশ পাবেন। ল্যাংডন ব্যাগটি হাতে নিলেন। নিরাপত্তাকর্মীকে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করলেন।

চলন্ত সিঁড়ি নিচে নামতে লাগল, গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন ল্যাংডন। নানা বিষয় নিয়ে ভাবতে লাগলেন। ক্যাপিটল জোমের সিলিংয়ের সজ্জিত বিশেষ ধরনের গ্লাসের কথা বার বার ভাবতে লাগলেন। এটা ছিল অনেকটা অবাক করা ভবন। এর ছাদ ফ্লোর থেকে কমপক্ষে ৩শ ফুট উঁচুতে অবস্থিত।

বাইরের স্টাচু অব ফ্রিডমটি সেখান থেকে খুব রহস্যময় মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছে রহস্যময় অন্ধকারে দাঁড়ানো একটি মূর্তি। ওখানে আরও মূর্তি ছিল। ল্যাংডনের মনে হচ্ছিল, ওখানকার সাড়ে ১৯ ফুট উঁচু একেকটি ব্রঞ্জের মূর্তি তৈরি ও স্থাপনে যারা কাজ করেছে তারা সবাই ছিল দাস।

এ পুরো ভবনটাই রহস্যময় গুপ্ত ধনের ভান্ডার হিসেবে অনেকের কাছে। পরিচিত। এখানে অনেক খুন খারাবি হয়েছে। এজন্য এই ভবনকে কিলারদের বাথটাবও বলা হত। এখানে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি আততায়ির হাতে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি উইলসন, ১৯৩০ সালে ভবনে আততায়ির গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। ভুত-প্রেতের গল্পও আছে এই রহস্যময় বিশাল ভবনকে জড়িয়ে। শোনা যায় ১৩টি প্রেতাত্মা এই ভবন দাবিয়ে বেড়ায়। এই প্রাসাদতুল্য বিশাল ভবনের মূল প্রমুজটি বানাতে গিয়ে যারা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন সেগুলো তাদেরই প্রেতাত্মা। এ ভবনের ভুগর্ভস্থ অসংখ্য কক্ষে মাঝে মধ্যে অল্প সময়ের জন্য একটি কালো বেড়ালকেও অনেকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন।

ল্যাংডন এসকেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন আর এসব কথা তার মনে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছিল। বার বার তিনি ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন, আর মাত্র তিন মিনিট বাকি। দিক নির্দেশনা দেখে দেখে তিনি দ্রুত স্টাচুর্ট হলের দিকে যেতে লাগলেন। ল্যাংডন মনে মনে লেকচারের রিহার্সেল দিতে শুরু করলেন। লেকচারের বিষয় নির্ধারণে পিটার যে কোন ভুল করেনি এটা ল্যাংডন। স্বীকার করে নিলেন।

ওয়াশিংটন ডিসিতে একজন বিখ্যাত পাথর কর্তনকারী মিস্ত্রি যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন তার সঙ্গে এর যথেষ্ট মিল আছে।

চুন সুরকির ঘরবাড়ি পাথর কাটা, পাথর সংক্রান্ত স্থাপনার সুপ্রাচীন ইতিহাস আছে ওয়াশিংটন ডিসির। এটা গোপন কোন কথা নয়, এই ভবনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর করেছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন নিজে। এ শহরের নকশাও করেছিলেন তিনি। এসব ছিল পাথর নির্ভর।

পরবর্তীতে বেন ফ্রাঙ্কলিন, পিয়ের এল এনকন্টিসহ আরো অনেকে এ শহরের সৌন্দর্য বর্ধনে কাজ করেন তারা পাথরের ব্যাবহারই বেশি করেছেন, এজন্য ওয়াশিংটন ডিসিতে পাথর কর্তনকারীসহ পাথর শ্রমিকের জন্য আগে থেকেই বিখ্যাত ছিল।

অবশ্য লোকজন এখন আগেকার সেসব পাথর সর্বস্ব অবকাঠামো ও প্রতীককে রীতিমত পাগলামি হিসেবেই গণ্য করে।

পাথর কর্তনকারী ও চুন সুরকীর এসব মিস্ত্রীর পুর্ব পুরুষরা এক সময় খুব প্রভাবশালী ছিল বলে বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়। রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন অবকাঠামোতে তাদের অনেকসাধারণ ও গোপন বার্তা এখনও বহাল আছে। ল্যাংডন অবশ্য এসবের দিকে কখনো ক্ৰক্ষেপ করেননি। এসব পাথরকর্তনকারী কারিগরদের সম্পর্কে সমাজে অনেক ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। এমনকি হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পর্যন্ত তাদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানে না।

প্রথম বর্ষের এক ছাত্র ঊর্ধ্বশ্বাসে ল্যাংডনের ক্লাস রুমে ঢুকে পড়েন। তর হাতে ছিল ওয়েবসাইট থেকে প্রিন্ট করা একটা কপি। ওটা ছিল আসলে ওয়াশিংটনের রাস্তার একটি মানচিত্র। এতে কয়েকটি রাস্তার আকার আকৃতি গঠন প্রনালীর বিস্তারিত বিবরণ ছিল। ওই নকশা থেকে একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে ওয়াশিংটন ডিসির নকশা প্রণয়নে পাথরকর্তনকারী ও চুন-সুরকির কারিগররা বড় ধরণের ভূমিকা রাখেন। ছাত্র ল্যাংডনকে মানচিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এটা সাধারণ কোন সংযোগকারী সড়কের নকশা নয়। ল্যাংডন রাস্ত। রি নকশাটিকে অন্য ছাত্রদের দেখিয়ে বলেন, এটার আদলে ডেট্রয়টের রাস্তার। নকশা করা যাবে।

ল্যাংডন আরো বললেন, তোমরা নিরাশ হয়োনা। মানচিত্রে যে রকম অবিশ্বাস্য ধাচের রাস্তা দেখানো হয়েছে- ওয়াশিংটনে আসলে সে ধরনের রাস্তা নেই। এই মানচিত্রের মত কোন রাস্তা নেই।

তরুন ছাত্র চঞ্চল হয়ে উঠলেন। বললেন, কি বলছেন এসব। গোপন রাস্তা। নকশায় গোপন রাস্তা আছে? সেটা আবার কি?

ল্যাংডন বললেন, প্রতি বসন্তে আমি একটি কোর্স শিক্ষা দিই। এটাকে বলা হয় অকুলেন্ট সিম্বলস। এখানে ওয়াশিংটন ডিসি নিয়ে আলোচনা করা হয়। তুমি ইচ্ছা করলে কোর্সটা করতে পার।

ঐন্দ্রজালিক বা রহস্যময় প্রতীক! ছাত্রটা কিছুটা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। বললেন, তাহলে ওয়াশিংটন ডিসিতেও অনেক অশুভ প্রতীক আছে।

ল্যাংডন হাসলেন। বললেন, অকুলেন্ট শব্দটা দ্বারা শয়তানের প্রার্থনা বোঝানো হলেও তিনি অন্য অর্থে একে ব্যবহার করেন। ওই শব্দের অর্থ গুপ্ত বা রহস্যময় কিছু একটা।

ধর্মীয় নির্যাতনের যুগে ওই শব্দের ব্যবহার ছিল বেশি। ডাইনি, প্রেতাত্মা ইত্যাদি অশুভ শক্তির কথা বলে তখন ধর্মীয় নেতারা অনেকের ওপর অত্যাচার করত। গীর্জার কর্তারা তখন এ ধারণা লালন করত।

এসব কথা শুনে ছাত্র ধপ করে বসে পড়ল। ল্যাংডন হাভার্ডের ৫ শ ছাত্রের সামনে ওই নতুন ছাত্রকে বসিয়ে লেকচার দেয়া শুরু করলেন।

ল্যাংডন লেকচার দিতে শুরু করলেন। সুপ্রভাত বলে সবাইকে অভিবাদন জানালেন। অত্যন্ত দামী মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি এ বক্তৃতা দিতে লাগলেন। তার পেছনে পেছনে ছিল প্রজেক্টরের সাহায্যে পর্দায় ফেলা বিশাল এক ছবি। ল্যাংডন হবিটিকে লক্ষ্য করে ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেন, বলতো এটা কিসের ছবি। কয়েক ডজন ছাত্র সমস্বরে বলে উঠল, ক্যাপিটল হিলের। যেটা ওয়াশিংটন। ডিসিতে অবস্থিত।

বললেন হ্যাঁ, তোমরা ঠিক বলেছ। এ ভবনের বিশাল গম্বুজটি তৈরি করতেই লেগেছে ৯০ লাখ পাউন্ড লোহার রড ও পাত। এটা ১৮৫০ সালের এক অসাধারণ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী স্থাপত্য।

একথা শুনে কি আশ্চর্য বলে অনেকে চিৎকার করে উঠলেন, ল্যাংডন জিজ্ঞেস করলেন, ওয়াশিংটন গিয়েছ এখানে এমন কতজন আছ?

খুব অল্পসংখ্যক হাত উঠল, ল্যাংডন বিস্মিত হলেন।

রোম, প্যারিস, মাদ্রিদ অথবা লন্ডন গিয়েছ কারা? এবার অনেক হাত উঠল। বলতে গেলে কনফারেন্স রুমের সবাই হাত উঠালেন।

ল্যাংডন বললেন, তোমরা বলতে গেলে সবাই ইউরোপ গিয়েছ। অথচ তোমাদের সিংহভাগই নিজ দেশের রাজধানীতে যাওনি। কেন এমনটা হল? কেন তোমরা নিজ দেশের রাজধানী না দেখেই অন্য দেশ সফরের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠ?

পেছন থেকে অনেকে বলল, ইউরোপে ড্রিংক করার নির্দিষ্ট কোন বয়স বেধে দেয়া হয়নি। ল্যাংডন হাসলেন। বললেন, এখানে যদি ড্রিংক করার বয়সের বাধ্যবাধকতা তুলে নেয়া হয় তাহলে কি করবে?

সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

ল্যাংডন তার সম্মোহনী কথা বার্তা দ্বারা শিক্ষার্থীদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করতে পারতেন। ছাত্রদের হাসাতে তাদেরকে ক্লাসে ধরে রাখতে তার কোন জুড়ি ছিল না। তিনি যতক্ষণ ক্লাসে থাকতেন ততক্ষণ সবাই পিনপতন নিরবতার মধ্যে তার কথা শুনত।

ল্যাংডন বললেন, কথাটা হাল্কা ভাবে নিওনা। ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বের সবচেয়ে কিছু সুন্দর স্থাপত্য, শিল্প ও প্রতীক আছে। তাহলে কেন তোমরা নিজ দেশের রাজধানী দেখার আগে অন্য দেশে যাবে?

একজন বলল, এখানে প্রাচীন কালের নিদর্শন নেই।

ল্যাংডন বললেন, প্রাচীন কালের নিদর্শন বলতে তুমি কি বোঝাতে চাও? দুর্গ, গীর্জা, মন্দির, গুপ্তধন, না কি পিরামিড। সবাই চুপ রইলো।

ল্যাংডন বললেন, তুমি যদি প্রাচীন নিদর্শন বলতে ওসব কিছুকে বোঝাতে চাও তাহলে ধরে নাও ওয়াশিংটন ডিসিতে তার সবকিছুই আছে। এমনকি পিরামিড পর্যন্ত আছে।

ল্যাংডন গলার স্বর নিচু করলেন, স্টেজের কিছুটা সামনে এলেন এরপর বললেন, বন্ধুগন, পরবর্তী এক ঘন্টায় তোমরা দেখতে পাবে আমাদের দেশে কত প্রাচীন স্থাপত্য কত গুপ্ত ও রহস্যময় স্থান আছে। যেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত না ইতিহাস, কত না অজানা কথা, বলতে পার গোটা ইউরোপে যত না প্রাচীন নিদর্শন আছে তার চেয়ে বেশি আছে আমেরিকায়। এগুলোর কোন। কোনটি তুলনাহীন। এসময় পুরো হল জুড়ে ছিল নীরবতা।

ল্যাংডন গোটা আলো কমিয়ে দিলেন, দ্বিতীয় স্লাইডটি দেখিয়ে বললেন, কে বলতে পারবে এখানে জর্জ ওয়াশিংটন কি করছেন। ছবিটা ছিল জর্জ ওয়াশিংটনের একটি বিশাল মূর্তি। এখানে তিনি একটি উঁকি দিয়ে একটি যন্ত্র। দেখছিলেন। সুদৃশ্য পোশাক পড়া আরো কিছু লোক পাশে দাঁড়ানো ছিল। কয়েকজন জবাব দিলেন, জর্জ ওয়াশিংটন বড় কেটি পাথর সরাচ্ছেন। ল্যাংডন বললেন হয়নি। আরেকজন ছাত্র বললেন, উনি পাথরটি নিচের দিকে নামাচ্ছেন। তার পরনে পাথর কর্তনকারীদের পোশাক। মনে হচ্ছে ওয়াশিংটন কোন আপনার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করছেন।

ল্যাংডন বললেন, অসাধারণ। তোমার জবাব একেবারে ঠিক। এটা আমাদের জাতির পিতার ছবি। এখানে উনি ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করছেন। ১৭৯৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের দৃশ্য এটি। ল্যাংডন আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কেউ কি ওই তারিখের তাৎপর্যটা বলতে পারবে। সবাই নীরব। এ তারিখের সঙ্গে, এ দিনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আছেন ওয়াশিংটন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ও পিয়েরে এল এলফ্রান্টের নাম।

এখনো সবাই নীরব। ওই দিনটিতে ক্যাপুট ড্রাকনিস ভিরগ্যোতে ছিলেন। একজন ছাত্র বললেন, আপনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড্রাগনিসের কথা বলছেন?

ল্যাংডন বললেন, ঠিক তাই। উনি ছিলেন, একজন ভিন্ন প্রকৃতির জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আজকের জ্যোতির্বিদদের মত নয়। একজন ছাত্র হাত উঁচু করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন আমাদের জাতির পিতা জ্যোতির্বিদ্যা বা ভবিষ্যত জানায় বিশ্বাস করতেন। ঠিক তাই।

ল্যাংডন বলতে লাগলেন এ কারণে ওয়াশিংটন ডিসিতে নানা স্থাপনা ও অবকাঠামোতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানা নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। বিশ্বের যে কোন শহরের তুলনায় ওয়াশিংটন ডিসিতে এ সংক্রান্ত বেশি নিদর্শন আছে।

সে সময় ওয়াশিংটনের অর্ধেকেরও বেশি লোক গ্রহ নক্ষত্রের বিচরণ, চন্দ্র সূর্যের পরিভ্রমন, ভবিষ্যত গননা ইত্যাদীতে বিশ্বাস করত। এজন্য ক্যাপুট ড্রাকনিসের ভির্গোতে অবস্থানকালে ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এজন্য বিশ্বের যে কোন শহরের তুলনায় ওয়াশিংটন ডিসিতে জ্যোতির্বিদ্যার নিদর্শন বেশি আছে।

ল্যাংডন বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। সবাই পিন পতন নীরবতার মধ্যে শুনছেন। হাত্ররা বক্তৃতা থেকে নোট নিচ্ছে। ল্যাংডন বলতে লাগলেন, তোমাদের অনেকে প্রথম বর্ষের ছাত্র। এসব কথা শুনে তোমাদের মাথা ঘুরে যেতে পারে।

সবাই বলতে লাগল, না আমরা ঠিক আছি। আমাদের আরও বলুন।

ল্যাংডন বললেন, তোমরা এসব বিষয়ে আরো জানতে চাইলে তোমরা ইস্টার্ন স্টারের পাথর কর্তনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পার। কিন্তু একজন যুবক বললেন, তাদেরকে তো আমরা পাবনা। তারা সমাজের সবচেয়ে গোপন লোক। ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

ল্যাংডন বললেন, আসলে কি তাই। মোটেও না। তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখে না। বরং সমাজ তাদের লুকিয়ে রাখে।

কয়েকজন বললেন, বিষয়টা আসলে একই রকম।

ল্যাংডন চ্যালেঞ্জ করে বললেন, আসলে কি তাই? কোকা কোলাকে কি। তোমরা গোপন সমাজের অন্তর্ভুক্ত করবে? ছাত্ররা বললো, অবশ্যই না।

ভালো কথা। তাহলে তোমাদের কেউ যদি কোকাকোলার হেড অফিসে গিয়ে এক গ্লাস কোক কিনতে চাও তাহলে কি কিনতে পারবে? তারা কখনোই তোমার কাছে তা বিক্রি করবে না। অথবা কোকাকোলার হেড কোয়ার্টারে কোক সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেও পারবে না।

কোকাকোলার গোপন বিষয়াবলী সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে হলে তোমাকে ওই কোম্পানীতে চাকরি নিতে হবে। বছরের পর বছর কাজ করতে হবে, চোখকান খোলা রাখতে হবে। যারা তথ্য জানে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আর এটা করতে পারলেই তুমি সফল হবে। তোমার ওপর কোম্পানীর নির্ভরতা বাড়বে। অনেক গোপন তথ্য কোম্পানী তোমাকে জানাবে। তবে তোমাকে এ অঙ্গীকার করতে হবে যে কখনও গোপনীয়তা ভঙ্গ করবে না।

কাজেই তোমরাও যদি সমাজের গোপন কোন সম্প্রদায়ের কাউকে বের করতে চাও তাহলে একই পন্থা অবলম্বন করতে হবে। খাটাখাঁটি করতে হবে একই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে। সব ক্ষেত্রে গোপনীয়তা অবলম্বন করতে হবে। এমন সময় একজন যুবক দাঁড়িয়ে বলল, আমার চাচা একজন পাথর কর্তনকারী। তবে আমার চাচী এ পেশাকে ঘৃণা করেন। তিনি এটাকে পেশা হিসেবে মানতেও নারাজ। তার মতে এটা ধর্ম। অদ্ভুত এক ধর্ম।

.

এটা একটা সাধারণ ধারণা। অনেকেই এটা মনে করেন। ছাত্র বলল, তাহলে এটা কি ধর্ম নয়। ল্যাংডন বললে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এখানে উপস্থিত সিপাহীদের মধ্যে কে প্রফেসর উইথপারসনের তুলনামূলক ধর্ম তত্ত্ব কোর্সটি সম্পন্ন করেন?

কয়েকজন হাত উঠালেন।

ভাল। তাহলে আমাকে বল ধর্মের মূল বিষয়গুলো কি? অর্থাত কোন কোন জিনিস থাকলে একটা বিষয়কে ধর্ম হিসেবে গণ্য করা যাবে।

একজন মহিলা বললেন, এ বিসি, অর্থাত এসিউর, বিলিভ, কনভার্ট অর্থাত বিশ্বাস, আস্থা এবং পরিবর্তন। কোন মতাদর্শে এই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে সেটাকে ধর্ম হিসেবে গণ্য করা যায়।

ল্যাংডন বললেন, ঠিক বলেছেন ধর্মের প্রতি মানুষের প্রগাঢ় আস্থা ও বিশ্বাস থাকতে হবে। এর বশবর্তী হয়ে অবিশ্বাসীরা যখন এটাকে গ্রহণ করবে বা এমতবাদে নিজেদের রূপান্তরিত করবে তখনই এটাকে ধর্ম বলা যাবে। কিন্তু পাথর কর্তনকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে এ তিনটি বিষয়ই অনুপস্থিত। এ সম্প্রদায়ের মধ্যে পাপ সম্পর্কে কোন অনুশোচনা নেই। তারা নির্দিষ্ট কোন মতাদর্শে বিশ্বাসী নয়। তারা কোন মতাদর্শে রূপান্তরিত পর্যন্ত হয় না, এবং ধর্মের নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর প্রতি তাদের ঝোঁক বেশি।

কাজেই এ সম্প্রদায়কে ধর্ম বিদ্বেষী বলা যায়। আরেকটি ব্যাপার হল ম্যাসন বা পাথর কর্তনকারী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে প্রবল ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস করতে হবে। প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাসী আর পাথর কর্তনকারী সম্প্রদায়ের মধ্যের মূল পার্থক্যটা বিশ্বাসে। আমরা প্রবল পরাক্রমশালী, আল্লাহ, যিশু, ঈশ্বর বা ভগবান হিসেবে সম্বোধন করি। কিন্তু পাথর কর্তনকারী সম্প্রদায়ের লোকজন সেটা করে না। তারা বিশ্বের অধিকর্তা হচ্ছে সবচেয়ে বড় স্থপতি বা প্রকৌশলী। এ বিশ্বের সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে তার নির্মাণশৈলী। এগুলোর মাধ্যমেই খুঁজে পাওয়া যাবে ঈশ্বরকে।

দুরে থেকে শব্দ ভেসে এল। একজন জিজ্ঞেস করলেন, মনে হচ্ছে তারা খুব খোলা মনের মানুষ। ল্যাংডন বললেন, আজকের যুগে চলছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এক সংস্কৃতি আরেক সংস্কৃতিকে গ্রাস করছে। যে সংস্কৃতি টিকতে পারছে সেটি নিজের মত করে ঈশ্বরকে সজ্ঞায়িত করছে। এদিক বিবেচনা করলে পাথর কর্তনকারী সম্প্রদায়কে ভোলামনের ও সহিষ্ণু বলেই মনে হয়, তাদের কাছে ধর্ম বর্ণ জাতি ভাষা কোন বিষয় নয়। সবাই সমান। তারা কোন বৈষম্য করে না।

এমন সময় পিছন থেকে এক মহিলা দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, তাহলে কতজন মহিলাকে ওই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হবার সুযোগ দেয়া হয়েছে প্রফেসর ল্যাংডন?

ল্যাংডন বললেন, কয়েকশবছর আগের কথা। ১৭০৩ সালে ওই সম্প্রদায়ের একটা মহিলা শাখা আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেটির নাম ছিল ইস্টার্ন স্টার। তাদের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ।

আরেক মহিলা বলে উঠলেন, তাহলে ওই সম্প্রদায়কে অত্যন্ত শক্তিশালী বলতে হবে। তবে খানে নারীরা বঞ্চিত।

আসলে ল্যাংডন নিজেও জানেন না ওই সম্প্রদায় বর্তমানে কতটা শক্তিশালী। এরপর ল্যাংডন পেছনের সাড়ীতে বসা সুন্দরী এক তরুণীকে জিজ্ঞেস করলেন, পাথর কর্তনকারী সম্প্রদায় যদি সমাজের গোপন কোন অংশ মা হয়, এটা যদি কোন ব্যবসায়ী সংগঠন না হয় অথবা এটা যদি কোন ধর্ম না হয় তাহলে এটা আসলে কি?

আশা, আপনি যদি ওই সম্প্রদায়ের কাউকে এ প্রশ্ন করতেন তাহলে

অ আ বলতো, এটা নৈতিকতা, ও প্রতাঁকের সমন্বয়ে তৈরি মতাদর্শ। লাতে বললেন তোমার নাম কি? মেয়েটি বলল- ফ্রিকি। ল্যাংডন সমবেত সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি ওর সজ্ঞার সঙ্গে একমত? সবাই সমপরে যা জবাব দিল।

.

৭ অধ্যায়

ক্যাথরিন সলোমন জিনস এবং ক্যাশমির সোয়েটারের চেয়ে ভারী কিছু পরে বের না হবার জন্য নিজেকে মনে মনে অভিশাপ দিতে দিতে হাড় কাঁপান বৃষ্টির মধ্যে পার্কিং লটের উপর দিয়ে ঝেড়ে দৌড় দেয়। ভবনের প্রধান ফটকের নিকটবর্তী হলে, অতিকায় বায়ু পরিশোধক যন্ত্রের গর্জন আরও স্পষ্ট শোনা যায়। এইমাত্র পাওয়া ফোন কলের গুঞ্জন তার কানে অনুরনিত হবার কারণে পরিশোধকের গর্জন সে ভাল করে খেয়ালই করে না।

তোমার ভাই ডি.সিতে যা লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে বিশ্বাস করে….সেটা খুঁজে বের করা সম্ভব।

ক্যাথরিনের কাছে কথাটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় না। রহস্যময় ফোন কল কারীর সাথে তার এখনও অনেক কিছু আলাপ করা বাকী আছে আর আজ বিকালে তার সাথে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করতে সে রাজিও হয়েছে।

অতিকায় এই ভবনটার প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছে ভিতরে প্রবেশের সময়। সে বরাবরের মত আজও একই উত্তেজনা অনুভব করে। এখানে এই স্থানটার কথা কেউ জানে না।

দরজার উপরে বিশাল করে লেখা রয়েছে:

স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম সাপোর্ট সেন্টার

(এসএমএসসি)

স্মিথসোনিয়ান অনুষদ, ন্যাশনাল মলে ডজনখানেক বিপুলায়তন জাদুঘরের মালিক হওয়া সত্ত্বেও, তার বিশাল সংগ্রহের মাত্র দুই শতাংশ কোন এক নির্দিষ্ট সময়ে সেসব জাদুঘরে প্রদর্শন করা সম্ভব। বাকী ৯৮% সংগ্রহ অন্য কোথায় সুরক্ষিত রাখা হয়। আর সেই অন্য কোন স্থানটা…এখানে।

এই ভবনটার বিচিত্র বিপুল শিল্পকর্মের সংগ্রহে তাই অবাক হবার কিছু নেই- বিশালাকৃতি বুদ্ধমূর্তি, হাতেলেখা পাণ্ডুলিপি, নিউ গিনি থেকে সংগৃহীত বিষাক্ত তীর, মণিমুক্তাখচিত ছোরা, তিমি মাছের কঙ্কাল থেকে তৈরী কায়াক। ভবনটার প্রাকৃতিক সংগ্রহও সমান মাত্রার বিস্ময় উদ্রেককারী- প্লেসিসরের কঙ্কাল, অমূল্য উল্কাখণ্ডের সমষ্টি, দানবীয় স্কুইড, এমনকি আফ্রিকা সাফারিতে গিয়ে টেডী রুজভেল্টের নিয়ে আসা হাতির করোটির একটা বিশাল সংগ্রহ।

স্মিথসোনিয়ান অনুষদের সেক্রেটারী পিটার সলোমন, তিন বছর আগে নিজের বোনকে এসএমএসসির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। সে তার বোনকে বৈজ্ঞানিক বিস্ময় তদারকির জন্য না, বরং বিস্ময় সৃষ্টির জন্যই তার অভিষেক ঘটেছে। আর ক্যাথরিন ঠিক সেটাই করে আসছে।

এই ভবনের গভীর অলিন্দে, অন্ধকারাচ্ছন্ন নিভৃত প্রকোষ্ঠে একটা ছোট বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার রয়েছে যার তুলনা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে না। নিওটিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ক্যাথরিনের সাম্প্রতিক আবিষ্কারসমূহের বিজ্ঞানের প্রতিটা শাখায় অবদান রয়েছে- পদার্থবিজ্ঞান থেকে ইতিহাস এবং দর্শন থেকে ধর্মতত্ত্ব। শীঘ্রই সবকিছু বদলে যাবে, সে ভাবে।

ক্যাথরিন লবিতে প্রবেশ করা মাত্র, ফ্রন্ট ডেস্কের প্রহরী দ্রুত রেডিও বন্ধ করে এবং কান থেকে এয়ারপ্লাগ খুলে উঠে দাঁড়ায়। মিস, সলোমন! তার মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠে।

রেডস্কিনস?

বেচারার চোখমুখ লাল হয়ে মুখে একটা অপরাধবোধ ফুটে উঠে। প্রিগেম।

সে হাসে। ভয় পেয়োনা, আমি কাউকে বলবো না। সে পকেট খালি করতে করতে মেটাল ডিটেক্টরের দিকে হাটা দেয়। বরাবরের মত কব্জি থেকে সোনার কার্টিয়ের হাতঘড়িটা খোলার সময়ে একটা বিষণ্ণতা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ক্যাথরিনের অষ্টাদশ জন্মবার্ষিকীতে ঘড়িটা তার মায়ের দেয়া উপহার। প্রায় দশ বছর হতে চলল মায়ের নির্মম মৃত্যুর…তার হাতে বেচারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল।

তো মিস.সলোমন? আমুদে কণ্ঠে প্রহরী ফিসফিস করে বলে। আপনি পেছনের ঐ ঘরে কি করেন তা কি কখনও বলবেন আমাদের?

সে চমকে তাকায়। বলবো একদিন, কাইল। তবে আজরাতে না।

বলেন না, সে জোরাজোরি করার ভান করে। একটা গোপন বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার…একটা গোপন জাদুঘরে? নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কিছু একটা করছেন আপনি।

সাংঘাতিককেও মামুলি বলে মনে হবে, নিজের জিনিস সংগ্রহ করার ফাঁকে ক্যাথরিন ভাবে। সত্যি কথাটা হল ক্যাথরিন এত উচ্চতর বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছে যে বিষয়টার সাথে এখন আর বিজ্ঞানের কোন মিল খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

.

৮ অধ্যায়

ন্যাশনাল স্ট্যাচুয়ারী হলের দোরগোড়ায় রবার্ট ল্যাংডন মূর্তিরমত স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং তার চোখের দৃষ্টি অবাক বিস্ময়ে সামনের প্রেক্ষাপটে গিয়ে আছড়ে পড়ে। তার যেমন মনে আছে ঘরটা ঠিক তেমনই রয়েছে- গ্রীক অ্যাম্ফিথিয়েটারের আদলে গঠিত একটা সুষম অর্ধবৃত্ত। সম্রমউদ্রেককারী বেলেপাথরের খিলানাকৃতি দেয়াল ইতালিয়ান প্লাস্টারের মাঝে বিভিন্ন ধরণের পাথরের সমন্বয়ে গঠিত বর্ণিল কলামে দাঁড়িয়ে আছে জাতির ভাস্কর্য সংগ্রহ-অর্ধবৃত্তের পুরোটা বিস্তারে সাদা-কালো মার্বেল টাইলের উপরে। আটত্রিশজন মহান আমেরিকানের প্রমাণ আঁকৃতির মূর্তি রয়েছে।

শেষবার সেমিনারে যোগ দেবার সময়ে যেমন দেখেছিল ল্যাংডন হুবহু তাই দেখতে পায়।

কেবল একটা পরিবর্তন হয়েছে।

আজরাতে, কামরাটা একদম খালি।

কোন চেয়ার পাতা নেই। নেই শ্রোতাদের ভীড়। পিটার সলোমনের টিকিও কোথাও দেখা যায় না। ল্যাংডনের এত কষ্ট করে সৃষ্ট নাটকীয় আর্বিভাবের প্রতি একেবারে উদাসীন কয়েকজন পর্যটক এদিকওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। পিটার কি তাহলে রোটানডার কথা বলেছিল? রোটানডার দিকে এগিয়ে যাওয়া দক্ষিণের করিডোরের দিকে সে একবার উঁকি দেয় এবং সেখানেও পর্যটকদের এলোমেলো ঘুরে বেড়াতে দেখে।

ঘড়ির ঘন্টার প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যায়। ল্যাংডন এবার সত্যি সত্যিই দেরী করে ফেলেছে।

সে তাড়াতাড়ি করে হলওয়েতে ফিরে আসে এবং একজন গাইডকে দেখতে পায়। মাফ করবেন, আজরাতে স্মিথসোনিয়ান গালার বক্তৃতার বিষয়ে আমি জানতে চাইছি? সেটা কোথায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে?

গাইড একটু ইতস্তত করে। স্যার, আমি ঠিক বলতে পারছি না। কখন শুরু হবার কথা?

এখন!

লোকটা মাথা নাড়ে। আজ সন্ধ্যাবেলায় অনুষ্ঠিত কোন স্মিথসোনিয়ান গালার কথা আমি জানি না। অন্তত এখানে না।

বিভ্রান্তি ল্যাংডন আবার ঘরের কেন্দ্রে ফিরে আসে, পুরো এলাকাটা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখে। সলোমন কি তাহলে আমার সাথে মশকরা করছে। ল্যাংডন। সেটা কল্পনাও করতে পারে না। সে তার পকেট থেকে সেলফোন আর আজ সকালে পাওয়া ফ্যাক্সটা বের করে এবং পিটারের নাম্বারে রিং করে।

তার ফোন এক মুহূর্ত সময় নেয় এই বিশাল ভবনের অভ্যন্তরে সিগন্যাল সনাক্ত করতে। অবশেষে অন্যপ্রান্তে রিং বাজতে শুরু করে।

পরিচিত দক্ষিণী বাচনভঙ্গির কণ্ঠস্বর উত্তর দেয়। পিটার সলোমনের অফিস থেকে বলছি? বলুন কি ভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

অ্যান্থনী! ল্যাংডন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে। বাচলাম তুমি এখনও অফিসে আছ। আমি রবার্ট ল্যাংডন। বক্তৃতাটা সম্বন্ধে বোধহয় একটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। আমি এই মুহূর্তে স্ট্যাচুয়ারী হলে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু এখানে কাউকে দেখছি না। বক্তৃতাটা কি অন্য কোন ভেন্যুতে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

স্যার, আমার সেটা মনে হয় না। আমি দেখছি। তার সহকারী কিছুক্ষণ বিরতি নেয়। আপনি কি সরাসরি মি. সলোমনের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছিলেন?

ল্যাংডনের এবার দিশেহারা অবস্থা। না, অ্যান্থনী আমি তোমার সাথে কথা বলে নিশ্চিত করেছি। আজ সকালে?

হ্যাঁ, সেটা আমার মনে আছে। লাইনে একটা নিরবতা নেমে আসে। প্রফেসর, আপনার কি মনে হয় না, আজ আপনি একটু অসতর্ক ছিলেন?

ল্যাংডন নিমেষে সজাগ হয়ে উঠে। মাফ করবেন?

ব্যাপারটা এভাবে দেখেন…লোকটা বলে। নির্দিষ্ট একটা নাম্বারে ফোন করার কথা বলে আপনাকে ফ্যাক্স পাঠান হলে, আপনি তাই করেন। আপনি পিটার সলোমনের সহকারী মনে করে সম্পূর্ণ অচেনা একজন লোকের সাথে কথা বলেন। তারপরে ওয়াশিংটনগামী একটা ব্যক্তিগত বিমানে স্বেচ্ছায় উড়ে এসে অপেক্ষমান একটা গাড়িতে আরোহন করেন। কি ঠিক বললাম?

ল্যাংডন অনুভব করে তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়। জাহান্নামে যাও তুমি কে? পিটার কোথায়?

আমি দুঃখিত কিন্তু পিটার জানেই না যে তুমি আজ ওয়াশিংটন এসেছো। লোকটা দক্ষিণী বাচন ভঙ্গি উধাও হয়ে যায় এবং তার কণ্ঠস্বর ভারী মাদকতাময় সুললিত গুঞ্জনে পরিণত হয়। মি. ল্যাংডন, তুমি এখানে এসেছে, কারণ আমি তোমাকে এখানে চাই।

.

৯ অধ্যায়

স্ট্যাচুয়ারী হলে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ল্যাংডন তার সেলফোনটা কানের কাছে আঁকড়ে ধরে পায়চারি করতে থাকে। তুমি কোথাকার কে কথা বলছো?

লোকটা রেশমের মত মোলায়েম একটা ফিসফিসে কণ্ঠে উত্তর দেয়। প্রফেসর, আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। আপনাকে কারণ আছে বলেই ডেকে আনা হয়েছে।

ডেকে আনা? ল্যাংডনের নিজেকে খাঁচায় আবদ্ধ পশু মনে হয়। বলো অপহরণ!।

মোটেই না। লোকটা কণ্ঠস্বর বাড়াবাড়ি রকমের শান্ত। আমি যদি আপনার ক্ষতি করতে চাইতাম তাহলে টাউন কারে এতক্ষণে আপনার লাশ পড়ে থাকতো। সে কথাগুলোর গুরুত্ব বোঝনর জন্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি, আমার উদ্দেশ্য একেবারেই মহৎ। আমি কেবল আপনাকে একটা আমন্ত্রণ পৌঁছে দিতে চাই।

না ধন্যবাদ। গত কয়েকবছরে ইউরোপের অভিজ্ঞতার কারণে, ল্যাংডনের অযাচিত তারকা খ্যাতি চুম্বকের মত যতসব উদ্ভট ঘটনার সাথে তাকে জড়িয়ে ফেলেছে, আর এবার সেটা সব মাত্রা ভঙ্গ করেছে। দেখো আমি জানি না এখানে কি ঘটতে চলেছে, কিন্তু আমি ফোনটা এখন রাখছি-।

অবিবেচকের মত কাজ হবে, লোকটা বলে। পিটার সলোমনের প্রাণ বাঁচাতে চাইলে আপনার সামনে খুব ক্ষীণ একটা সুযোগ আছে।

ল্যাংডন একটা গভীর শ্বাস নেয়। কি বললে তুমি এইমাত্র? আমি নিশ্চিত নামটা আপনি শুনেছেন।

পিটারের নাম লোকটা যেভাবে উচ্চারণ করে ল্যাংডন তাতেই ঘাবড়ে যায়। পিটার সম্বন্ধে তুমি কি জান?

এই মুহূর্তে, আমি তার সবচেয়ে গূঢ় রহস্যটা জানি। মি. সলোমন আমার অতিথি আর আমি খুব প্ররোচক গৃহকর্তা হতে পারি?

এটা হতে পারে না। পিটার তোমার কাছে নেই।

আমি তার ব্যক্তিগত সেলফোন থেকে কথা বলছি। মাথাটা খাটাও একটু।

আমি পুলিশকে খবর দিচ্ছি।

তার প্রয়োজন নেই, লোকটা বলে। কর্তৃপক্ষ আর কিছুক্ষণের ভিতরেই তোমার সাথে যোগ দেবে।

পাগলটা এসব কি উলোটপালোট বলছে? ল্যাংডনের কণ্ঠস্বর কঠিন হয়। পিটার যদি তোমার কাছেই আছে তবে এই মুহূর্তে ফোনটা তাকে দাও।

সেটা অসম্ভব। মি. সলোমন একটা ভাগ্যবিড়ম্বিত স্থানে আটকে আছেন। শোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তিনি আরাফে রয়েছেন।

কোথায়? ল্যাংডন টের পায় প্রচণ্ড জোরে ফোনটা আঁকড়ে ধরার কারণে তার আঙ্গুলগুলো অবশ হয়ে যেতে থাকে।

দি আরাফ? হামিস্তাগান? তার কিংবদন্তির ইনফার্নো শেষ করার অব্যবহিত পরে দান্তে স্তুতিগান যে স্থানের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন?

লোকটার ধর্মীয় আর সাহিত্যের জ্ঞানের বহর দেখে ল্যাংডনের ধারণা আরও পোক্ত হয় যে এবার তিনি এক পাগলের পাল্লায় পড়েছেন। দ্বিতীয় স্তুতিগান। ল্যাংডন খুব ভাল করেই জানেন: দান্তে না পড়ে কেউ ফিলিপ এক্সেটার একাডেমী থেকে কেউ ছাড়া পায় না। তুমি বলছো তুমি মনে কর পিটার সলোমন…আত্মা বিশোধন স্থানে আছেন?

খ্রিস্টানদের জন্য শব্দটা বড় নিষ্ঠুর তবে হ্যাঁ, সলোমন এখন শুদ্ধিস্থানে আছেন।

লোকটার কথা ল্যাংডনের কানে বাজতে থাকে। তুমি বলতে চাইছো পিটার…মৃত?

ঠিক তা নয়, না।

ঠিক তা নয়?! ল্যাংডন চিৎকার করে উঠলে, তার কণ্ঠস্বর হলঘরে জোরালভাবে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। একটা পর্যটক পরিবার চমকে উঠে তার দিকে তাকায়। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে গলার স্বর নীচু করে। মৃত্যু সাধারণত হয় অথবা নয় একটা ব্যাপার?

প্রফেসর, তুমি আমাকে অবাক করলে। আমি ভেবেছিলাম জীবন মৃত্যুর রহস্য সম্বন্ধে তোমার ভালই জানা আছে। দুটোর মাঝে একটা জগৎ রয়েছে এই মুহূর্তে পিটার সলোমন সেখানেই ভেসে বেড়াচ্ছেন। হয় সে তোমার জগতে ফিরে আসবে বা সে অন্য জগতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে…নির্ভর করছে তোমার এই মুহূর্তের প্রতিক্রিয়ার উপরে।

ল্যাংডন ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করে। তুমি আমার কাছে কি চাও?

ব্যাপারটা সহজ। খুবই প্রাচীন কিছু একটায় তোমাকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে। আর আজরাতে তুমি সেটা আমার সাথে শেয়ার করবে।

তুমি কিসের কথা বলছো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

না? প্রাচীন সব রহস্য যা তোমার কাছে গচ্ছিত রাখা হয়েছে তুমি ভান করছো সেগুলো তুমি বোঝ না?

ল্যাংডনের সহসা কেমন ডুবন্ত একটা অনুভূতি হয়, সম্ভবত এখন সে ধারণা করতে পারছে গ্যাড়াকলটা কোথায়। প্রাচীন রহস্য। কয়েক বছর আগের প্যারিসের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে সে কারো কাছে একটাও শব্দ উচ্চারন করেনি কিন্তু গেইলের অন্ধ সমর্থকেরা সংবাদ মাধ্যম খুটিয়ে পড়ে এবং মাঝের শূন্যস্থান পূরণ করে কারো কারো ধারণা হয়েছে ল্যাংডন বর্তমানে হলি গ্রেইল সম্পর্কিত গোপন তথ্যের প্রিভি- সম্ভবত অবস্থান সম্পর্কেও অবগত।

দেখো, ল্যাংডন বলে, এটা যদি হলি গ্রেইল সম্পর্কে হয়, তাহলে আমি তোমাকে নিশ্চিত করতে পারি আমি বেশি কিছু জানি না কেবল-।

মি. ল্যাংডন অনুগ্রহ করে আমার বুদ্ধিমত্তাকে অপমান না করলে খুশী হব, লোকটা তীব্র কণ্ঠে ধমকে উঠে। হলি গ্রেইলের মত অকিঞ্চিৎকর কিছুতে বা ইতিহাসের ভাষ্য কাঁদের সঠিক সে বিষয়ে মানবজাতির নিদারুন বিতর্কে আমার কোন আগ্রহ নেই। বিশ্বাসের সিমেনটিকস নিয়ে কূটতর্কেও আমার কোন আগ্রহ নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল মৃত্যুর মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব।

কঠোর শব্দবাণ ল্যাংডনকে বিভ্রান্ত করে তোলে। তাহলে তুমি আমার কাছে কি চাও?।

উত্তর দেবার আগে লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তুমি হয়ত জান, এই শহরের ভিতরে কোথাও একটা প্রাচীন সিংহদ্বার রয়েছে।

একটা প্রাচীন সিংহদ্বার?

এবং আজ রাতে প্রফেসর তুমি সেই সিংহদ্বার আমার জন্য খুলে দেবে। আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করেছি বলে তোমার গর্বিত হওয়া উচিত জীবনে এমন আমন্ত্রণ একজন একবারই পায়। কেবল তোমাকেই মনোনীত করা হয়েছে।

আর তুমি বেহেড পাগল হয়ে গেছে। আমি দুঃখিত, কিন্তু বলতেই হচ্ছে তোমার পছন্দ একদম পানিতে পড়েছে, ল্যাংডন বলে। প্রাচীন সিংহদ্বারের বিন্দুবিসর্গ আমি জানি না।

প্রফেসর, তুমি বুঝতে পারনি। আমি তোমাকে পছন্দ করিনি….তোমাকে নির্বাচন করেছে পিটার সলোমন।

কি? ফিসফিস কণ্ঠে ল্যাংডন উত্তর দেয়।

মি সলোমন সিংহদ্বার খুঁজে পাবার উপায় আমাকে বলেছেন এবং তিনি আমাকে বলেছেন পৃথিবীতে কেবল একজনই সেটা খুলতে পারবে। এবং তিনি বলেছেন সেই লোকটা তুমি।

পিটার যদি এটা বলে থাকে তবে সে ভুল বলেছে…বা মিথ্যা বলেছে।

আমার সেটা মনে হয় না। কথাটা কবুল করার সময়ে তার শারীরিক অবস্থা মিথ্যা বলার মত পরিস্থিতিতে ছিল না এবং আমি তার কথা বিশ্বাস করেছি।

ক্রোধের একটা ঢেউ হঠাৎ ল্যাংডনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমি তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, তুমি যদি পিটারকে আঘাত করে থাক-

সে জন্য এখন একটু দেরী হয়ে গেছে, লোকটা আমুদে কণ্ঠে বলে। পিটার সলোমনের কাছ থেকে আমি আমার প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিয়েছি। কিন্তু তুমি যদি তার মঙ্গল চাও, তবে আমি পরামর্শ দেবো আমি তোমার কাছে যা চাই সেটা দেবার জন্য। সময় বড় মূল্যবান…তোমাদের দুজনের জন্যেই। আমার পরামর্শ হল সেই সিংহদ্বারটা খুঁজে বের করে সেটা উন্মুক্ত করা। পিটার তোমাকে পথ দেখাবে।

পিটার? আমি ভেবেছিলাম তুমি বলেছছা পিটার জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

যতটা উপরে, ঠিক ততটাই নীচে, লোকটা বলে।

ল্যাংডন টের পায় শীতল অনুভূতিটা গাঢ় হচ্ছে। এই অদ্ভুত উত্তরটা একটা প্রাচীন হার্মেটিক প্রবচন যা স্বর্গ আর পৃথিবীর ভিতরে বিদ্যমান প্রত্যক্ষ বা ভৌত সম্পর্কে বিশ্বাসের কথা ঘোষণা করে। যতটা উপরে ঠিক ততটাই নীচে। ল্যাংডন বিশাল কামরাটায় চোখ বুলায় এবং ভাবতে চেষ্টা করে কিভাবে আজ রাতে সহসা সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। দেখো, আমি জানি না প্রাচীন কোন সিংহদ্বার কিভাবে খুঁজে পেতে হয়। আমি পুলিশে খবর দিচ্ছি।

ব্যাপারটার গুরুত্ব এখনও তোমার বোধগম্য হয়নি, তাই না? কেন তোমাকে বাছাই করা হয়েছে?

না, ল্যাংডন সত্যি কথাই বলে।

শীঘ্রই হবে, লোকটা গা-জ্বালান হাসি হেসে বলে। এখন থেকে যে কোন মুহূর্তে।

তারপরে ফোনের লাইনটা সহসা নিরব হয়ে যায়।

ল্যাংডন কয়েকটা আতঙ্কিত মুহূর্ত স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে থাকে, এই মাত্র যা ঘটল সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে চেষ্টা করে।

সহসা, দূর থেকে সে একটা অপ্রত্যাশিত শব্দ শুনতে পায়। শব্দটা রোটানডা থেকে ভেসে আসছে। কেউ একজন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে।

.

১০ অধ্যায়

রবার্ট ল্যাংডন জীবনে বহুবার ক্যাপিটল রোটানায় প্রবেশ করেছে, কিন্তু কখনও দৌড়ে না। উত্তর দিকের প্রবেশদ্বারের নীচ দিয়ে দৌড়ে যাবার সময়ে সে ঘরের মধ্যেখানে একদল পর্যটককে জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। একটা বাচ্চা ছেলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে এবং তার বাবা-মা চেষ্টা করছে বেচারাকে শান্ত করতে। বাকিরা তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে এবং কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।

সে তার স্লিঙের হাতে বাঁধা পটির ভিতর থেকে জিনিসটা টেনে বের করেছে, একজন উত্তেজিত কণ্ঠে কথা বলছে, এবং নির্বিকার চিত্তে ওখানে সেটা হড়ে ফেলেছে।

ল্যাংডন আরও কিছুদূর এগিয়ে আসার পরে হট্টগোল সৃষ্টিকারী বস্তুটা প্রথমবারের মত এক ঝলক দেখতে পায়। স্বীকার করতে হবে, ক্যাপিটলের মেঝেতে জিনিসটা খাপছাড়া কিন্তু কেবল সেটার উপস্থিতির কারণে এত হট্টগোলের সৃষ্টি হতে পারে না।

মেঝেতে পড়ে থাকা জিনিসটা ল্যাংডন আগে বহুবার দেখেছে। হার্ভাড শিল্পকলা অনুষদে ডজনখানেক আছে- মানবদেহের সবচেয়ে জটিল বৈশিষ্ঠ্যের ধারণা পেতে ভাস্কর আর চিত্রকরদের দ্বারা ব্যবহৃত প্রমাণ আঁকৃতির প্লাস্টিকের মডেল, বিস্ময়করভাবে মানুষের মুখের বদলে সেটা মানুষের হাত। কেউ একজন ম্যানিকুইনের একটা হাত রোটানডায় ফেলে গিয়েছে।

ম্যানিকুইনের হাত, বা অনেকে যাকে হাণ্ডিকুইন বলে থাকে, এতে খোলাও বন্ধ করা যায় আঙ্গুল সংযযাজিত থাকার কারণে চিত্রকরেরা তাদের পছন্দসই ভঙ্গিতে এতে বিন্যস্ত করতে পারেন, কলেজে সদ্যআগত ছাত্ররা প্রায়ই মধ্যমা ঊর্ধ্বমুখী করে রেখে দেয়। এই হ্যাণ্ডিকুইনের অবশ্য, তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলি ছাদের দিকে নির্দেশ করছে।

ল্যাংডন আরেকটু নিকটবর্তী হলে, সে বুঝতে পারে এই হাণ্ডিকুইনে কোন গোলমাল আছে। এর প্লাস্টিকের উপরিভাগ অন্যান্যগুলোর মত মসৃণ না। উপরিতল বরং সামান্য কুঞ্চিত এবং কয়েকটা বর্ণে চিত্রিত, মনে হয় একদম…

একেবারে ত্বকের মত।

ল্যাংডন বেমাক্কাভাবে থেমে দাঁড়িয়ে যায়।

এবার সে রক্ত দেখতে পায়। হা ঈশ্বর!

কাটা কব্জিটাকে একটা কাঠের বেদীর উপরে কাঁটা দিয়ে আটকান হয়েছে যাতে সেটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। গলায় টকটক অনুভূতি সে পরিষ্কার টের পায়। ল্যাংডন সামান্য সামনে যায়, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, এবার সে তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলির ডগায় খুদে খুদে উল্কি আঁকা দেখতে পায়। উল্কিগুলো অবশ্য ল্যাংডনের মনোযোগ আকর্ষণ করে না। চতুর্থ আঙ্গুলের পরিচিত সোনার আংটিটার দিকে সাথে সাথে তার মনোযোগ আঁকৃষ্ট হয়।

না। ল্যাংডন মনে মনে সিটিয়ে যায়। পিটার সলোমনের ডান হাতের কাটা কব্জির দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ে সে টের পায় তার চারপাশে পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরতে শুরু করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *