রং-ব্যাপারীর বিরং ব্যাপার

রং-ব্যাপারীর বিরং ব্যাপার
[ দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য রিটায়ার্ড কালারম্যান ]

বিষণ্ণ দার্শনিক মেজাজে সেদিন সকালে দেখলাম শার্লক হোমসকে।

দেখেছ লোকটাকে? শুধোল আমাকে।

এইমাত্র বেরিয়ে গেল যে-বুড়োটা?

হ্যাঁ।

দরজার কাছে দেখলাম।

কী মনে হল?

দেহমনে ভেঙে পড়া মানুষ। দেখলে মায়া হয়। জীবন যেন শূন্য, অসার।

আহা, এক্কেবারে খাঁটি কথা। তবে কী জান ওয়াটসন, সব জীবনই তো এমনি। শূন্য, অসার। বড়ো মায়া হয়। বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন ঘটিয়ে গেল বুড়ো। সারাজীবন মানুষ মরীচিকার পেছনেই ছুটে ছুটে যা চায় তা হাতের মুঠোয় পাওয়ার পর দেখে–সব ফক্কা, সব মিথ্যে, সব ছায়া। জীবনে এত দৈন্যতা তো সেই কারণেই। ছায়াবাজির চাইতেও যা মর্মান্তিক।

তোমার মক্কেল বুঝি?

তা বলতে পার। পাঠিয়েছে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। হালে পানি না-পেলে বিশেষজ্ঞ যেমন রুগি পাঠায় হাতুড়ের কাছে–জানে তো আর কিছু করার নেই, এও তেমনি।

ব্যাপারটা কী?

টেবিল থেকে একটা বেশ ময়লা কার্ড তুলে নিয়ে হোমস বললে, জোসিয়া অ্যামবার্লি। ছবি আঁকার সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক ব্রিকফল অ্যান্ড অ্যামবার্লি কোম্পানির জুনিয়ার পার্টনার। পেন্টবক্সের গায়ে কোম্পানির নামটা দেখে থাকবে। একষট্টি বছর বয়সে রিটায়ার করে জমানো টাকা নিয়ে লুইহ্যামে একটা বাড়ি কিনে ভেবেছিলেন শেষ জীবনটা শান্তিতে কাটাবেন।

তারপর।

খামের পেছনে কয়েকটা পয়েন্ট টুকে রেখেছিল হোমস। এখন দেখে নিয়ে বলল, অবসর নিলেন ১৮৯৬ সালে। বিয়ে করলেন ১৮৯৭ সালে। বউয়ের বয়স ওঁর চাইতে কুড়ি বছর কম। সুন্দরী–ছবি তাই বলছে। স্বচ্ছন্দে বাস করার মতো টাকাপয়সা, সুন্দরী স্ত্রী, অখণ্ড অবসর জীবনটা মধুময় হওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু হল না। দু-বছরের মধ্যেই সব গেল। ভেঙে পড়লেন দেহে মনে নিজের চোখেই তো দেখলে।

কিন্তু কেন?

ওয়াটসন, গল্প সেই পুরোনো। বিশ্বাসঘাতক বন্ধু আর চপলমতি স্ত্রী। জীবনে একটাই শখ ছিল অ্যামবার্লির দাবা খেলা। বাড়ির কাছেই থাকতেন এক দাবাড়ে ছোকরা ডাক্তার। ডক্টর

রে আর্নেস্ট। যাতায়াত ছিল ফলে স্ত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা জন্মায়। বুড়োকে তো দেখলে ভেতর সুন্দর হলেও বাইরেটা নয়। কাজেই স্ত্রীর আর দোষ কি। গত হপ্তায় নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছে এই দুজন। যাবার সময়ে বুড়োর সারাজীবনের জমানো বেশ কিছু টাকা আর দলিলের বাক্সটাও নিয়ে গেছে। মেয়েটিকে খুঁজে বার করতে হবে, টাকাপয়সা উদ্ধার করতে হবে। সামান্য মামুলি কিন্তু বুড়োর কাছে মর্মান্তিক।

কী করবে ঠিক করেছ?

তুমি হলে কী করতে? হাতের কেস নিয়ে এখন ভীষণ ব্যস্ত আমি। লুইহ্যামে যাওয়ার সময় নেই, অথচ অকুস্থলের প্রমাণের বিশেষ দাম আছে। বুড়ো চাইছিল আমি যাই। কিন্তু অসুবিধেটা বুঝে আমার বদলি কাউকে পাঠাতে বলেছে।

তাহলে, আমি যাব—যদিও খুব একটা কাজে লাগবে বলে মনে হয় না।

বিকেলের দিকে রওনা হলাম লুইহ্যাম অভিমুখে। তখন বুঝিনি মামুলি এই ব্যাপার নিয়েই ইংলন্ডের হাট বাজার পর্যন্ত গরম হয়ে উঠবে দু-দিনেই!

একটু রাত করেই ফিরলাম বেকার স্ট্রিটে। পাইপ টানতে টানতে অর্ধনিমীলিত চোখে রিপোর্ট শুনে গেল হোমস। মাঝে মাঝে ঝকঝকে ধারালো ধূসর চোখ পুরোপুরি তাকিয়ে দু-চারটে প্রশ্ন না-করলে মনে হত যেন দীর্ঘকৃশ শরীর এলিয়ে ঘুমিয়েই পড়েছে।

বললাম, জোসিয়া অ্যামবার্লির বাড়ির নাম হ্যাভেন। ইট বাঁধানো একঘেয়ে রাস্তার মাঝে সংস্কৃতি আর সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে অপরূপ যেন একটা দ্বীপভূমি। রোদূর পোড়া, শ্যামলা ছাওয়া পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এমন একটা পাঁচিল যা—

কবিতা রাখো ওয়াটসন, কড়া গলায় বললে হোমস, ইটের উঁচু পাঁচিল, এই তো?

হ্যাঁ। রাস্তায় একটা লোককে জিজ্ঞেস করে জানলাম হ্যাভেন কোথায়। লোকটা সিগারেট খাচ্ছিল দাঁড়িয়ে। লম্বা, ময়লা। মিলিটারি-মিলিটারি চেহারা। ইয়া মোটা গোঁফ। হ্যাভেন কোথায় জিজ্ঞেস করতেই অদ্ভুত চোখে তাকাল আমার দিকে।

ফটক পেরোতে-না-পেরোতেই দেখলাম এগিয়ে আসছেন মিস্টার অ্যামবার্লি। সকালে এক ঝলক দেখে বিচিত্র জীব মনে হয়েছিল–এখন দেখলাম আরও বেশি। লোকটা স্বাভাবিক মোটেই নয়।

আমিও লক্ষ করেছি, বলল হোমস।

পিঠ বেঁকে গেছে যেন ভারী জিনিস তুলে তুলে। অথচ রোগাপটকা দুর্বল মোটেই নন–অসুর কাঁধ আর বুকের ছাতি দেখলেই মালুম হয়। পা দুটো কিন্তু নেমে এসেছে আলপিনের মতো সরু হয়ে।

বাঁ-পায়ের জুতো ভাজ খাওয়া। ডান পায়ের জুতো মসৃণ।

অত দেখিনি।

আমি দেখেছি। নকল পা লাগিয়ে হাঁটেন বুড়ো। তারপর?

স্ট্র-হ্যাটের তলা দিয়ে ঝুলন্ত সাপের মতো তেল চুকচুকে চুলের গোছা আর বলিরেখা আঁকা ভীষণ মুখচ্ছবি দেখেও অবাক হয়েছি।

বেশ করেছ। কী বলেছেন তাই বলো!

দুঃখকষ্টের কথা বলে গেলেন হাউ হাউ করে। গাড়ি চলার পথ বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে আশপাশ দেখে নিলাম। যত্ন-আত্তির চিহ্ন নেই কোথাও, বাড়ি আর বাগানের সর্বত্র অযত্ন আর হেলাফেলার ছাপ। বাগান হবে ছবির মতো কিন্তু যা দেখলাম তা জঙ্গলের মতো। কোনো সুরুচিম্পন্না মহিলা এ-পরিস্থিতি বরদাস্ত করতে পারেন না। বাড়ির অবস্থাও তথৈবচ। এই একটি ব্যাপারে বুড়োর টনক নড়েছে মনে হল। কেননা হল ঘরে মস্ত গামলা বোঝাই সবুজ রং আর বুড়োর হাতে রঙের বুরুশ দেখলাম। কাঠে রং লাগাচ্ছিলেন।

আমাকে নিয়ে গেলেন নিজের নোংরা ঘরে। অনেকক্ষণ কথা বললেন। তুমি নিজে–যাওয়ায় হতাশ হয়েছেন দেখা গেল। বললেন, পথের ফকির হয়ে গেছি, কাজেই আমার মতো দীনহীন মানুষের বাড়িতে শার্লক হোমসের মতো বিখ্যাত পুরুষ আসবেন–এতটা আশা করাই অন্যায়।

বুঝিয়ে বললাম, টাকাকড়ির প্রশ্নই এখানে ওঠে না। বুড়ো বললেন, তা ঠিক। তবে কি জানেন, ক্রাইমও একটা আর্ট–সেদিক দিয়ে এই কেসে মনের খোরাক পেতেন উনি। মানুষকে চেনা মুশকিল। স্ত্রীর কোন আবদারটা রাখিনি বলুন। সে-ছোকরাকেও ছেলের মতোই দেখেছিলাম। তারপরেও কিনা এই ব্যবহার! ডক্টর ওয়াটসন, সংসার বড়ো ভয়ংকর!

ঘন্টাখানেক ধরে শুরু এই পালাগানই শুনে গেলাম। এতবড়ো একটা ষড়যন্ত্র ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি বুড়ো। বাড়িতে কর্তাগিন্নি ছাড়া আর জনমনিষি নেই। একজন ঠিকে ঝি সকালে আসে সন্ধ্যায় যায়। এ-ঘটনা যেদিন ঘটে, সেদিন হে-মার্কেট থিয়েটারে দুটো বেশি দামের আপার সার্কেলের টিকিট কেটেছিলেন বুড়ো নিজের আর স্ত্রীর জন্যে। শেষ মুহূর্তে মাথাব্যথা করছে বলে বউ আর যায়নি। বুড়ো একাই গেছিলেন। বউয়ের না-যাওয়া টিকিটটাও দেখালেন।

হোমস বললে, আশ্চর্য! সত্যিই আশ্চর্য! কৌতূহল জাগিয়ে দিলে দেখছি। টিকিটটা নিজে দেখাচ্ছিল? নম্বরটা মনে আছে?

সগর্বে বললাম–তা আছে। একত্রিশ–আমার পুরোনো স্কুলের নাম্বার বলেই মাথার মধ্যে থেকে গেছে।

অপূর্ব! বুড়োর সিট নাম্বার তাহলে নয় তিরিশ নয় বত্রিশ।

একটু গোলমাল লাগল হোমসের অকস্মাৎ আগ্রহ আর কথাবার্তা শুনে। বললাম, তা তো বটেই। B সারির টিকিট, তাও দেখেছি।

খুব ভালো করেছ। আর কী বললেন বুড়ো?

স্ট্রংরুম দেখালেন! স্ট্রংরুমই বটে। ব্যাঙ্কে যেমন থাকে–অবিকল তাই। দরজা জানলা সব লোহার। চোরের বাবার সাধ্যি নেই ভেতরে ঢোকে। ভদ্রমহিলা কিন্তু নকল চাবি জোগাড় করেছিলেন। উপপতির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার পাউন্ড নগদ নোট আর কোম্পানির কাগজ নিয়ে ভাগলবা হয়েছেন।

কোম্পানির কাগজ নিয়ে বিক্রি করবে কী করে?

সে-পথ বন্ধ করে দিয়েছেন বুড়ো। পুলিশকে লিস্ট দিয়েছেন। মাঝরাতে থিয়েটার থেকে ফিরে দেখেন বাড়ি খালি, দরজা জানলা খোলা, স্ট্রংরুম লুঠ হয়ে গেছে। যাবার সময়ে চিঠিপত্র

পর্যন্ত রেখে যায়নি স্ত্রী। সঙ্গেসঙ্গে পুলিশকে খবর দেন বুড়ো।

মিনিট কয়েক কী ভাবল হোমস!

তারপর বলল, কোথায় রং করছিলেন অ্যামবার্লি?

প্যাসেজ। স্ট্রংরুমের দরজা জানলা আগেই করেছিলেন।

তোমার খটকা লাগেনি? এই পরিস্থিতিতে রং করা নিয়ে ব্যস্ত থাকাটা একটু অদ্ভুত নয় কি?

মন খারাপ থাকলে কিছু একটা নিয়ে ভুলে থাকে সবাই। কথাটা বুড়োর। মাথার ছিট আছে, তাই এমন কথা বলতে পারলেন। আমার সামনেই চিলের মতো চেঁচাতে চেঁচাতে বউয়ের একটা ফটোগ্রাফ ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেললেন–কালামুখ এ-জীবনে যেন আর না-দেখি।

আর কিছু লক্ষ করলে?

একটা ব্যাপার খুব বেশি চোখে পড়েছে। ব্ল্যাকহীদ স্টেশনে ফিরে ট্রেনে উঠলাম। যেই ট্রেন ছেড়েছে অমনি আমার পাশের কামরায় একটা লোক লাফিয়ে উঠে পড়ল। তুমি তো জান, যে-মুখ একবার দেখি, চট করে আর তা ভুলি না। লোকটাকেও ওই ঝকিদর্শনেই চিনে ফেললাম। রাস্তায় যাকে হ্যাভেন কোথায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, সেই লোক। আবার তাকে দেখলাম লন্ডন ব্রিজে। তারপর ভিড়ে হারিয়ে গেল। আমাকেই ফলো করছিল–কোনো সন্দেহ নেই।

ঠিক… ঠিক… কোনো সন্দেহ নেই। লোকটা ময়লা, লম্বা ফো আর গগলস পরা–তাই?

হোমস! তুমি কি গণকার? চোখে গগলস আছে আমি তো বলিনি।

ম্যাসোনিক টাই-পিনও আছে নেকটাইতে।

হোমস!

ভায়া ওয়াটসন এ তো খুবই সোজা ব্যাপার। সেটা কিন্তু জমে উঠছে, আগে ভেবেছিলাম সাদামাটা আমার মাথা ঘামানোর উপযুক্ত নয়। যদিও গুরুত্বপূর্ণ সবকটা ব্যাপারই তোমার চোখ এড়িয়ে গেছে, তাহলেও যা দেখেছ তার মধ্যেই গভীর চিন্তার খোরাক পাওয়া যাচ্ছে।

আরে ভায়া, আঘাত দেওয়ার জন্য কথাটা বলিনি। যা করে এসেছ, অন্য কেউ তা করতে পারত না। কিন্তু কয়েকটা পয়েন্ট একদম খেয়াল করনি। যেমন ধরো, আমবার্লি আর তার স্ত্রী সম্পর্কে প্রতিবেশীরা কী বলে? খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ডক্টর আর্নেস্ট সম্পর্কেই-বা পাড়াপ্রতিবেশীর মন্তব্য কী? লক্কাপায়রা লম্পট কি? ওয়াটসন, তোমার একটা মস্ত সুবিধে হচ্ছে যে তুমি ডাক্তার। মেয়েরা সহজেই মন খোলে তোমার কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ওদের কাছেই অনেক খবর পেতে। যেমন ধর পোস্টঅফিসের কেরানি মেয়ে অথবা মুদির বউ এরাই তোমার স্যাঙাত হয়ে উঠতে পারত। সরাইখানার মেয়েটাকেও কানে মন্ত্র দিলে অনেক কথা বেরিয়ে আসত। কিন্তু কিছুই তুমি করনি।

এখনও করা যায়।

করা হয়ে গেছে। এ-ঘর থেকে না-বেরিয়েই টেলিফোন আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের দৌলতে তা করেছি। বুড়ো যা বলেছে তা সত্যি। পাড়ার সবাই তাকে মহাকিপটে আর চামার স্বামী বলে জানে। স্ত্রীর সঙ্গে মিষ্টি কথা পর্যন্ত বলত না। স্ট্রংরুমে টাকা থাকত কাঁড়িকাড়ি। আইবুড়ো ডক্টর আর্নেস্ট দাবা খেলত বুড়োর সঙ্গে অন্য খেলা বুড়োর বউয়ের সঙ্গে। সবই যেন জলের মতো পরিষ্কার–তবুও যেন কোথায় একটা লটঘট ব্যাপার থেকে যাচ্ছে!

সেটা কী?

স্রেফ কল্পনা বলেই মনে হচ্ছে। আপাতত তা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাই না। চলো, অ্যালবার্ট হলে গিয়ে ক্যারিনার গান শুনে আসা যাক।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে রুটির গুঁড়ো আর জোড়া ডিমের খোলা দেখেই বুঝলাম আমার আগেই উঠেছে হোমস। টেবিলে একটা হাতে-লেখা চিঠি পেলাম।

প্রিয় ওয়াটসন,

জোসিয়া অ্যামবার্লির সঙ্গে মোলাকাত করে দু-একটা পয়েন্ট পরিষ্কার করে নিতে চাই। তারপর ভাবব কেসটা হাতে রাখব না ছেড়ে দেব। তিনটের সময়ে তৈরি থেকো। দরকার হতে পারে।

সারাদিন টিকি দেখা গেল না হোমসের। বাড়ি ফিরল ঠিক তিনটের সময়ে। মুখ গম্ভীর, চিন্তাবিষ্ট এবং অন্যমনস্ক। এ-অবস্থায় ওর সঙ্গে কথা না-বলাই সংগত।

অ্যামবার্লি এসেছিলেন?

না।

আসবেন এখুনি।

একটু পরেই ভীষণ উদবিগ্ন ও ভ্যাবাচ্যাকা মুখে আবির্ভূত হলেন বুড়ো ভদ্রলোক।

মিস্টার হোমস, এই টেলিগ্রামটা পেয়ে ছুটে এলাম। মাথামুণ্ডু কিছুই তো বুঝছি না, হাত থেকে টেলিগ্রাম নিয়ে জোরে জোরে পড়ে গেল হোমস।

এখুনি আসুন। আপনার সাম্প্রতিক লোকসান সম্পর্কিত খবর দিতে পারব।–এলমান, পল্লি পুরোহিত ভবন।

হোমস বললে, টেলিগ্রাম পোস্ট করা হয়েছে দুটো দশ মিনিটে লিটল পার্লিংটন থেকে! জায়গাটা এসেক্স ফ্লিনটমের কাছে! এখুনি বেরিয়ে পড়ুন। গাঁয়ের পুরুত বাজে কথা বলার লোক নন। ট্রেন ক-টায়, ওয়াটসন?

পাঁচটা পঁচিশে একটা আছে লিভারপুল থেকে।

চমৎকার। ওয়াটসন, তুমিও যাও সঙ্গে। কেসটা চূড়ান্ত আকার নিতে চলেছে। তোমার থাকা দরকার।

কিন্তু রওনা হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখালেন না বৃদ্ধ মক্কেল।

বললেন, মিস্টার হোমস, এ বড়ো উদ্ভট ব্যাপার। আমার ব্যাপার গাঁয়ের পাদরি জানবেন কী করে? মিছিমিছি সময় আর পয়সা খরচই হবে।

না-জানলে টেলিগ্রাম করতেন না। পালটা টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দিন আপনি আসছেন।

আমার যাওয়ার দরকার দেখছি না।

কঠোর হয়ে গেল হোমসের চোখ-মুখ কণ্ঠস্বর।

মিস্টার অ্যামবার্লি, এ-রকম স্পষ্ট একটা সূত্র পাওয়ার পর আপনি যদি তার সুযোগ না-নেন, তাহলে আমি আর পুলিশ ধরে নেব কেসটার ফয়সালা করায় আপনার আগ্রহ নেই।

যেন আঁতকে উঠলেন বৃদ্ধ মক্কেল।

আরে মশাই, তাই যদি মনে করেন, তাহলে এক-শোবার যাব। মনে হচ্ছিল গিয়ে লাভ নেই, তাই বলছিলাম–

কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনার যাওয়াই দরকার। জোর দিয়ে বললে হোমস।

রওনা হওয়ার আগে আমাকে ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে হোমস এমন একটা কথা বললে যা শুনে বুঝলাম বিষয়টা ওর কাছে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। বলল, বুড়ো যেন সত্যিই যান–এইটুকুই শুধু দেখবে। যদি ভেঙ্গে পড়েন বা ফিরে আসেন, পোস্টঅফিসে গিয়ে টেলিগ্রাম করবে আমাকে। লিখবে, ভাগলবা। যেখানেই থাকি না কেন, সে-টেলিগ্রাম যাতে আমার কাছে পৌঁছোয় সে-ব্যবস্থা করে যাব!

লিটল পার্লিংটন স্টেশনটা ব্রাঞ্চ লাইনে বলে যাওয়া একটু মুশকিল। যাত্রাপথও খুব সুখকর হল না। একে তো গরম পড়েছে, ট্রেনও টিকিয়ে টিকিয়ে চলেছে, তার ওপর বুড়ো অ্যামবার্লি মুখখানা শুকনো আমসির মতো গোমড়া করে চুপচাপ বসে রইল তো বসেই রইল। মাঝে মাঝে এক-আধবার বাঁকা সুরে শুধু বলল–পণ্ডশ্রম হচ্ছে–গিয়ে কোনো লাভ হবে না। স্টেশনে পৌঁছে মাইল দুয়েক পথ ঘোড়ার গাড়িতে পাড়ি দিয়ে হাজির হলাম পল্লিপুরোহিত ভবনে। হৃষ্টপুষ্ট বিরাটকায় সৌম্যমূর্তি পুরুতমশায় সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। টেলিগ্রাম দেখে বললে, এ কী! এ-টেলিগ্রাম তো আমি পাঠাইনি! জোসিয়া অ্যামবার্লির নামও কখনো শুনিনি।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম আমি আর বুড়ো। বললাম, তাহলে বোধ হয় ভুল ঠিকানায় এসেছি। আর একটা পল্লিপুরোহিত ভবন নিশ্চয় এ-গ্রামে আছে। পাদরি সাহেবের নামটা দেখুন এলমান।

দেখুন মশায়, এ-গাঁয়ে পুরুত-ভবন একটাই, পুরুতও একজন। এই টেলিগ্রাম জাল এবং জালিয়াতি নিয়ে তদন্ত করার দায়িত্ব পুলিশের। আপাতত আর কথা বাড়াতে চাই না।

বেরিয়ে এলাম ইংলন্ডের আদিমতম গ্রামের রাস্তায়। পোস্টাফিসে গেলাম টেলিগ্রাম করতে অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় করা গেল না। শেষ পর্যন্ত রেলওয়ে আর্মস থেকে টেলিফোন করলাম হোমসকে।

সব শুনে ও বললে, আশ্চর্য! সত্যিই বড়ো আশ্চর্য! আজ রাতে ফেরবার ট্রেনও তো নেই, ওয়াটসন। রাতটা গাঁইয়া চটিতে কাটিয়ে দাও প্রকৃতি আর জোসিয়া অ্যামবার্লির সান্নিধ্যে। খুক। খুক হাসির আওয়াজ শুনলাম শেষের দিকে।

বুড়ো অ্যামবার্লিকে কেন যে লোকে হাড়কিপটে বলে, সেদিন তা হাড়ে হাড়ে বুঝলাম। ট্রেনে আসার খরচপত্র নিয় গজগজ করছিলেন গোড়া থেকে, জোরজবরদস্তি করে থার্ডক্লাসে টিকিট দেওয়া নিয়ে। পরের দিন লন্ডন পৌঁছোনোর পর দুজনের মধ্যে কার মেজাজ যে বেশি খিঁচড়ে ছিল, সেটাও বলা মুশকিল হয়ে দাঁড়াল।

বললাম, বাড়ি ফেরার আগে বেকার স্ট্রিট ঘুরে যান। মিস্টার হোমসের নতুন নির্দেশ থাকতে পারে।

বিচ্ছিরি রকমের ভ্রুকুটি করে অ্যামবার্লি বললেন, কালকের মতো নির্দেশ হলে শুনে লাভ কিছু হবে কি? মুখে বললেন বটে, কিন্তু সঙ্গে গেলেন বেকার স্ট্রিটে। হোমসকে আগেই টেলিগ্রাম করে আমার ফেরার সময় জানিয়ে দিয়েছিলাম! কিন্তু বাসায় ফিরে দেখলাম হোমস নেই। একটা চিঠি রেখে গেছে। লুইহ্যামে গেলেই তাকে পাওয়া যাবে। আশ্চর্য হলাম চিঠি পড়ে। আরও অবাক হলাম বুড়োর বসবার ঘরে হোমসের সঙ্গে ম্যাসোনিক টাইপিন পরা চোখে গগলস আঁটা ময়লা চেহারার কঠোর প্রকৃতির সেই লোকটাকে বসে থাকতে দেখে যে আমাকে এখান থেকে লন্ডন পর্যন্ত ফলো করেছিল।

হোমস বললে, ইনি আমার বন্ধু মিস্টার বার্কার। আপনার কেস তদন্ত করেছি দুজনেই আলাদা আলাদাভাবে। এখন দুজনেই একটা প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে।

কী প্রশ্ন?

লাশ দুটি কোথায় পাচার করলেন?

বিকট চিৎকার করে তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে ছিটকে গেলেন জোসিয়া অ্যামবার্লি। সরু সরু হাড় বার করা আঙুল দিয়ে খামচে ধরলেন বাতাস। চোয়াল ঝুলে পড়ল, মুখ হাঁ হয়ে গেল, ভয়ানক বাজপাখির মতো দেখাল ক্ষণেকের জন্যে। চকিতের মধ্যে স্পষ্ট দেখলাম আসল অ্যামবার্লিকে, দানব প্রকৃতিপিশাচ অ্যামবার্লি–যার মন দেহের মতই বিকৃত, বীভৎস, ক্রূর, কুটিল। ধপাস করে পড়ে গেলেন চেয়ারে, পর মুহূর্তেই ঠোঁট চেপে ধরলেন উদগত কাশি আটকানোর প্রয়াসে। বাঘের মতো লাফিয়ে গেল হোমস। মুখখানা সবলে চেপে ধরে কঁকিয়ে নামিয়ে ধরল মেঝের দিকে। খাবি খাওয়া ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে টুপ করে খসে পড়ল একটা সাদা বড়ি।

শর্টকাট রাস্তায় যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায়, জোসিয়া অ্যামবার্লি? যা হবার তা আইনসংগতভাবেই হবে। বার্কার, আপনি কী বলেন?

গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছি।

ওয়াটসন, তুমি বোসা এখানে। থানায় ছেড়ে দিয়ে ফিরছি আধঘণ্টার মধ্যে।

জোসিয়া অ্যামবার্লি বুড়ো হলে কী হবে, বিরাট শরীরে সিংহের শক্তি ছিল। কিন্তু দু-দুজন অভিজ্ঞ পালোয়ানের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে সুবিধে হল না। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে বুড়োকে তোলা হল ছ্যাকড়াগাড়িতে। আধঘণ্টার আগেই স্মার্ট চেহারার এক ছোকরা পুলিশ ইনস্পেকটরকে নিয়ে ফিরে এল হোমস।

বললে, ওয়াটসন, বার্কার আমার পয়লা নম্বর প্রতিদ্বন্দ্বী। সারি উপকূলে খুব টক্কর দিয়েছে এককালে। লম্বা ময়লা একজন তোমাকে ফলো করেছে শুনেই চেহারার নিখুঁত বর্ণনা দিতে পেরেছিলাম সেইজন্যেই। বেশ কিছু কেসের ফয়সালা ওর হাতে হয়েছে, তাই না ইনস্পেকটর?

সংযত কণ্ঠে ইনস্পেকটর বললেন, নাক গলিয়েছে বলা যায়।

আমার মতোই ধরাবাঁধা পদ্ধতিতে বার্কার কাজ করে না–হাতে হাতে তাই পাওয়া যায়।

এ-কেসে যে আমরা আমাদের পদ্ধতিতে তদন্ত করে ফল পেতাম না, এমনটা ভাববেন না মিস্টার হোমস। আপনাদের উলটোপালটা পদ্ধতি দিয়ে তদন্ত করে প্রাপ্য কৃতিত্ব থেকে আমাদের বঞ্চিত করাটা আমি ভালো চোখে দেখছি না কিছু মনে করবেন না সোজাসুজি বলছি বলে।

আরে মশাই, কৃতিত্ব থেকে কে বঞ্চিত করছে আপনাদের? কেস শেষ হল–আমিও সরে দাঁড়াচ্ছি।

শুনে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ইনস্পেকটর। উত্তম কথাই বলেছেন। প্রশংসা বা নিন্দায় আপনার কিছু হয় না কিন্তু খবরের কাগজের টিটকিরিতে আমাদের ক্ষতি হয়।

প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারলে টিটকিরি দেবে কেন? যেমন ধরুন আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কী দেখে বুড়োর গোপন পাপ আঁচ করতে পারলেন, জবাব দেবেন কী?

ঘাবড়ে গেলেন ইনস্পেকটর।

তিনজন সাক্ষীর সামনে আসামি স্বীকার করেছে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল স্ত্রী আর স্ত্রীর প্রেমিককে হত্যা করার পর। এ ছাড়া আর কী থাকতে পারে বলুন?

বাড়ি তল্লাশির ব্যবস্থা করেছেন?

তিনজন কনস্টেবলকে পাঠিয়েছি।

তাহলে লাশের খবরও এবার পাবেন। বাড়িটায় জলের পাইপ লাগানো হয়েছে বাড়ি তৈরির অনেক পরে। তার মানে এমন একটা কুয়ো কোথাও পাবেন যা এখন ব্যবহার করা হয় না। লাশ দুটো তার মধ্যে থাকতে পারে অথবা বাগানে বা পাতালঘরেও থাকতে পারে।

কিন্তু আপনি জানলেন কী করে? খুনটাই-বা হল কী করে?

খুন করলেন কী করে, আগে তাই বলি। বুড়ো অ্যামবার্লির ঠাঁই হওয়া উচিত পাগলাগারদে, ফাঁসিকাঠে নয়। বউয়ের ওপর এমন অত্যাচার করেছেন টাকাকে বেশি ভালোবাসার দরুন, যার ফলে ভদ্রমহিলা বাধ্য হয়েছে পরপুরুষে আসক্ত হতে। অ্যামবার্লি কুচক্রী বলেই দাবাটা ভালো খেলতেন। হাড়কিপটেরা বড়ো ঈর্ষাকাতর হয়–অ্যামবার্লিও তাই ছিলেন। ডাক্তারের সঙ্গে স্ত্রীর গোপন প্রণয় আঁচ করে ফেলেছিলেন। তাই প্ল্যান করে ফেলেছিলেন দুজনকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। এ-রকম পৈশাচিক পরিকল্পনা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কে আসে না। আসুন দেখাচ্ছি।

যেন এ-বাড়িতেই দীর্ঘদিন বাস, এমনিভাবে পথ দেখিয়ে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেল হোমস, দাঁড়াল স্ট্রংরুমের খোলা দরজার সামনে।

 

হোমস বললে, প্রথম সূত্র হল এই রঙের গন্ধ। ধন্যবাদটা ডক্টর ওয়াটসনের প্রাপ্য। গন্ধটা ওর নাকেও এসেছিল কিন্তু ঠাহর করতে পারেনি। আমি কিন্তু লাইন করে ফেলেছিলাম। এই পরিস্থিতিতে বাড়িময় রঙের গন্ধ কেউ ছড়ায় কেন? কী উদ্দেশ্যে? নিশ্চয় অন্য কোনো গন্ধ ঢাকবার মতলবে–এমন একটা গন্ধ যা বাইরের লোকের নাকে সন্দেহ হতে পারে। তারপরেই শুনলাম এইরকম একটা ঘর রয়েছে বাড়ির মধ্যে দরজা জানলা লোহার–বাতাস পর্যন্ত বেরুতে পারে না। দুটো বিষয় পাশাপাশি রাখুন–কী পাচ্ছেন? নিজের চোখে বাড়ি দেখার পর আমি নিজে বুঝে ফেলেছিলাম আসল ব্যাপার। কেসটা যে সিরিয়াস আঁচ করেছিলাম আগেই। হে-মার্কেট থিয়েটারের বি-সারিতে তিরিশ, আর বত্রিশ নম্বর সিটে কেউ যে আসেনি বিশেষ সেই রাতে–তা নিজে গিয়ে জেনেছিলাম। এ-সূত্রটাও ডক্টর ওয়াটসনের বাঘের চোখে ধরা পড়েছিল কিন্তু তলিয়ে দেখেনি। কাজেই অ্যামবার্লির অন্যত্র স্থিতি ধোপে টিকল না–কেননা থিয়েটারে উনি যানইনি সেই রাতে। বউয়ের জন্য কাটা টিকিট দেখাতে গিয়ে ডক্টর ওয়াটসনকে টিকিট নাম্বার দেখিয়ে ফেলে বিরাট ভুল করেছিলেন। বাড়ির মধ্যে থেকে অ্যামবার্লিকে সরানোর জন্যে একটা কায়দা করতে হল। আমার এক এজেন্টকে পাঠিয়ে দিলাম এমন একটা দূর গ্রামে যেখান থেকে রাত্রে ফেরা যায় না–ট্রেন থাকে না বলে। গাঁয়ের পাদরির নাম দিয়ে এজেন্ট একটা টেলিগ্রাম পাঠাল অ্যামবার্লিকে। ডক্টর ওয়াটসনের সঙ্গে অ্যামবার্লিকে একরকম জোর করেই পাঠালাম সেখানে। কী বুঝলেন?

দারুণ!ইনস্পেকটরের সশ্রদ্ধ মন্তব্য।

পথ পরিষ্কার করার পর হানা দিলাম বাড়িতে। সিঁধেল চোরের ব্যবসায়ে নামলে নাম করতে পারতাম। কী পেলাম নিজের চোখে দেখুন। এই যে গ্যাসপাইপটা দেখছেন–এই দেখুন পাইপের গায়ে কোণের দিকে একটা কলও রয়েছে। দেখতেই পাচ্ছেন পাইপটা দেওয়াল বেয়ে উঠে স্ট্রংরুমের ভেতরে গিয়েছে–কড়িকাঠের যেখানে কারুকাজ করা–সেইখানে পাইপের খোলা মুখটা লুকোনো রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বাইরের কল খুলে দিয়ে ঘরের ভেতরে গ্যাস ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। বাঁচবে না। স্ত্রীর আর ছোকরা ডাক্তারকে এই গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে খুন করেছেন আমবার্লি–পৈশাচিক পন্থাটা বুড়োর মাথায় এল কী করে জানি না।

পাইপ দেখলেন ইনস্পেকটর। বললেন, আমাদের এক অফিসার গ্যাসের গন্ধ পেয়েছিলেন। তখন অবশ্য দরজা জানলা খোলা ছিল–রঙের গন্ধও ছিল। অ্যামবার্লি রং করা শুরু করেছিলেন নাকি আগের দিন থেকে। তারপর মিস্টার হোমস?

তারপর একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। ভোররাতে ভাড়ার ঘরের জানলা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময়ে খপ করে কে যেন কলার খামচে ধরে চাপা গলায় হুংকার ছাড়ল, রাসকেল, এবার যাবি কোথায়? ফিরে দেখলাম প্রতিদ্বন্দ্বী বন্ধু মিস্টার বার্কারকে। হাসতে লাগলাম দুজনেই। অদ্ভুত পরিস্থিতি। বার্কারকে এ-কাজে লাগিয়েছে নিখোঁজ ছোকরা ডাক্তারের বাড়ির লোক–বাকারও আঁচ করেছিল জঘন্য কিছু একটা ঘটেছে বাড়ির মধ্যে। ক-দিন ধরেই বাড়ির ওপর নজর রেখেছিল। ডক্টর ওয়াটসনকে বাড়ি থেকে বেরুতে দেখেই ওঁকে সন্দেহ করে এবং পেছন নেয়। গ্রেপ্তারও করত ওয়াটসনকে, কিন্তু ভঁড়ার ঘরের জানলা বেয়ে আর একটা লোককে চোরের মতো বেরোতে দেখে আর ধৈর্য ধরতে পারেনি। এরপর থেকেই দুজনে কাজ করেছি একসঙ্গে।

আমাদের সঙ্গে না-করে তার সঙ্গে কাজ করার কী দরকার ছিল?

দুজনে মিলে ছোট্ট যে-পরীক্ষা করলাম এবং সফলও হলাম–সে-পরীক্ষা আপনাদের দিয়ে হত না বলে।

যাই হোক, কেস থেকে এখন সরে দাঁড়াচ্ছেন তো?

নিশ্চয়। আমার কাজের রীতিই তাই।

পুলিশ বাহিনীর তরফ থেকে ধন্যবাদ রইল।

আপনাকে আরও একটা প্রমাণ দিয়ে যাই। ধরুন আপনাকে এ-ঘরে কেউ আটকে রেখে গ্যাস ঢোকাচ্ছে আর বাইরে থেকে টিটকিরি দিচ্ছে। মাত্র দু-মিনিট সময় পেয়েছেন মৃত্যুর আগে। কী করবেন তখন?

চিঠি লিখে যাব।

খাঁটি কথা। কীভাবে মারা যাচ্ছেন–তা লিখে রাখার চেষ্টা করবেন। কাগজে লিখলে তা চোখে পড়ে যাবে। তাই এই দেখুন এখানে দেওয়ালের নীচের দিকে বেগনি কপিং পেনসিলে লেখা : আমরা খু– ব্যস আর লেখা হয়নি।

আপনি কী বুঝেছেন?

মেঝে থেকে মাত্র এক ফুট ওপরে লেখা। অর্থাৎ মরবার আগের মুহূর্তে–শেষ করার আগেই জ্ঞান লোপ পেয়েছে।

বুঝেছি। লিখছিলেন : আমরা খুন হচ্ছি।

আমারও তাই বিশ্বাস। লাশ পেলে পকেটে পেনসিলও পেতে পারেন।

দেখব। কিন্তু কোম্পানির কাগজগুলো গেল কোথায়?

কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন নিশ্চয়। কিছুদিন পরে নিজেই বলতেন পলাতকরা পাঠিয়ে দিয়েছে কাজে লাগবে না বলে অথবা কোথাও ফেলে গিয়েছিল, এখন পাওয়া গেছে।

আপনার কাছে সাহায্য নিতে গেল কেন?

অত্যন্ত সেয়ানা বলে। বড়ো বেশি বিশ্বাস ছিল নিজের ওপর। পাড়াপ্রতিবেশীকে পরে বলতেন–দেখছ, শুধু পুলিশ নয়–খোদ শার্লক হোমসকে দিয়েও খোঁজবার ব্যবস্থা করেছি।

হেসে ফেললেন ইনস্পেকটর, কাজটা চমৎকার করেছেন বলেই খোদ শব্দটা মাপ করে দেওয়া গেল, মিস্টার হোমস।

দিন দুই পরে নর্থ সারি অবজারভার পত্রিকার একটা সংখ্যা আমার দিকে ছুঁড়ে দিলে হোমস। পত্রিকাটা দ্বিসাপ্তাহিক। প্রথম পৃষ্ঠাতেই চোখ-কেড়ে-নেওয়া চনমনে কয়েকটা শিরোনামা শুরু হ্যাভেন বিভীষিকা দিয়ে, শেষ চমকপ্রদ পুলিশ তদন্ত দিয়ে। তলায় অত্যাশ্চর্য এই কাহিনির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। উপসংহারটাই আসল। তাতে লেখা :

সরকারি গোয়েন্দাদের প্রখর বুদ্ধির প্রকৃষ্ট উদাহরণস্বরূপ অপরাধ ইতিহাসে চিরকাল সুবর্ণ অক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে ইনস্পেকটর ম্যাকিননের অসাধারণ সূক্ষ্মদর্শিতা। রঙের গন্ধ শুকেই তিনি বুঝেছিলেন গ্যাস জাতীয় কোনো উৎকট গন্ধ ঢাকবার জন্যেই বিকট রঙের গন্ধ ছড়ানো হয়েছে বাড়িময়, এই থেকেই উনি সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে স্ট্রংরুমকে গ্যাস চেম্বারে রূপান্তরিত করা হয় এবং এই সূত্র অনুসরণ করেই লাশ দুটোকে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করেন কুকুরশালা দিয়ে সুকৌশলে আচ্ছাদিত একটা অব্যবহৃত কুয়োর তলদেশ থেকে। জয়তু ইনস্পেকটর ম্যাকিনন!

কাষ্ঠ হেসে হোমস বললে, ম্যাকিনন লোকটা তো খারাপ নয়। কেসটা খাতায় লিখে রাখো। একদিন আসল ব্যাপার সবাই জানবেখন।

———

টীকা

১. রং-ব্যাপারীর বিরং ব্যাপার : লিবার্টি পত্রিকার ১৮ ডিসেম্বর ১৯২৬ সংখ্যায় এবং স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন-এর জানুয়ারি ১৯২৭ সংখ্যায় দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য রিটায়ার্ড কালারম্যান প্রথম প্রকাশিত হয়।

হে-মার্কেট থিয়েটার : ১৭২০ সালে হে-মার্কেট থিয়েটার নির্মাণ করেন জন পটার। ১৮২১-এ এর লাগোয়া বড়ো থিয়েটার হল নির্মিত হয়। তার নাম থিয়েটার রয়্যাল হে-মার্কেট।

টেলিফোন : এই গল্প ছাড়া বেকার স্ট্রিটে হোমসের বাড়ির টেলিফোনের উল্লেখ পাওয়া যায় দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ইলাসট্রিয়াস ক্লায়েন্ট এবং দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য থ্রি-গ্যারিডেবস গল্পে। এই দুটি গল্পই ১৯০২ সালের ঘটনা।

অ্যালবার্ট হল : ২৯ মার্চ ১৮৭১-এ খোলা হয়েছিল রয়্যাল অ্যালবার্ট হল, পরলোকগত প্রিন্স অ্যালবার্টের স্মৃতিতে। সাত হাজার আসনবিশিষ্ট এই হল ইংলন্ডের বৃহত্তম কনসার্ট হল।

ক্যারিনা : ক্যারিনা নামটি কাল্পনিক। তবে কিছু গবেষক মনে করেন এই কল্পনার পেছনে আমেরিকান শিল্পী অ্যানি লুই ক্যারি (১৮৪১-১৯২১) কিংবা ক্রোয়েশিয় গাইয়ে মিলিকা তেরনিনা (১৮৬৩-১৯৪১) অথবা ভেনিজুয়েলার পিয়ানো-বাদিকা, সুরস্রষ্টা এবং কণ্ঠশিল্পী মারিয়া টেরেসা ক্যারেননার (১৮৫৩-১৯১৭) প্রভাব থাকা সম্ভব।

পকেটে পেনসিলও পেতে পারেন : মরবার আগের মুহূর্তে লেখাটা শেষ করার আগেই যে লেখকের জ্ঞান লোপ পেয়েছে, তার পক্ষে কি পেনসিলটা পকেটে রাখা সম্ভব?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *