বিদায় নিলেন শার্লক হোমস

বিদায় নিলেন শার্লক হোমস
[ হিজ লাস্ট বাও ]

শার্লক হোমস নাটকের শেষ অঙ্ক

দোসরা অগাস্ট রাত নটা–পৃথিবীর ইতিহাসে এহেন কালান্তক অগাস্ট আর আসেনি–ভয়ংকরের ঘনঘটা এভাবে কখনো দেখা দেয়নি। স্বয়ং ঈশ্বর বুঝি কুপিত হয়েছিলেন–বদ্ধ গুমোট বাতাস তাই বুঝি থমথম করছিল তারই চূড়ান্ত অভিশাপের অশনিসংকেত রূপে। সূর্য ড়ুবে গেছে কোনকালে–তবুও সুদূর পশ্চিমের আকাশে রক্তরাঙা ক্ষতচিহ্নের মতো দগদগ করছে একটা লাল তির্যক আভা। মাথার ওপর আকাশে ঝিলমিল করছে অগুনতি জাহাজের রোশনাই। বাগানের পাথুরে পথে ধীরপদে পায়চারি করছে দুজন জার্মান, ঠিক পেছনেই লাল পাথর গাঁথা পাথরের নীচু প্যাটার্নের বাড়ি। পায়ের নীচে এবড়োখেবড়ো চকখড়ি পাহাড়ের সানুদেশে সমুদ্রসৈকত। চার বছর আগে এই পাহাড় আর বাড়িতে আস্তানা গেড়েছে ভন বর্ক–দিক-দিগন্তে টহল দেওয়ার জন্যেই যেন জায়গা খুঁজে নিয়েছে প্রকাণ্ড একটা ইগল। দুই মাথা এক করে গোপনে ফিসফাস করছে দুই মূর্তি–যেন ঘোর ষড়যন্ত্র পাকিয়ে উঠেছে–দুজনের কথায়। মুখে জ্বলন্ত চুরুট। নীচে থেকে চুরুটের আগুন দেখে মনে হবে যেন দূরায়ত কোনো পিশাচ ধূমায়িত গনগনে চোখ মেলে কটমট করে দেখছে অন্ধকারের দৃশ্য।

কাইজারের অগুনতি অনুরক্ত গুপ্তচরের মধ্যে অতুলনীয় এই ভন বৰ্ক লোকটা অনন্য প্রতিভার দৌলতেই ইংরেজদের সর্বনাশ করার ভার পেয়েছিল প্রথমে এবং এই কুচক্রী ধীশক্তির প্রসাদেই আজ সে অদ্বিতীয় গুপ্তচর হতে পেরেছে। এই পৃথিবীর অন্তত জনাছয়েক ব্যক্তি যারা ভেতরের খবর রাখে–তারা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি ভন বর্ক কী চিজ। কী বিপুল তার অধ্যবসায় এবং কী পরিমাণ সূক্ষ্ম তার কূট বুদ্ধি। এই ছ-জনের একজন এই মুহূর্তে তার পাশেই দাঁড়িয়ে। এঁর নাম ব্যারন ভন হালিং। জার্মান কূটনৈতিক রাষ্ট্র-প্রতিনিধির চিফ সেক্রেটারি। অদূরে সরু রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর এক-শো হর্সপাওয়ারের সুবৃহৎ বেঞ্জগাড়ি–কথা শেষ হলেই এই গাড়ি চেপে তিনি ফিরে যাবেন লন্ডনে।

চিফ সেক্রেটারি বলছিলেন, ঘটনাস্রোত দেখে মনে হচ্ছে এই হপ্তার শেষ নাগাদ তুমি বার্লিন ফিরে যাবে। অভ্যর্থনার বহর দেখে অবাক হয়ে যাবে। দেশের জন্যে যা করেছ, তা নাড়া জাগিয়েছে খুব উঁচুমহলে। এদেশের উঁচুমহলও তোমাকে তো মাথায় তুলে রেখেছে। ব্যারন ভদ্রলোক কথা বলেন খুব মন্থর ভঙ্গিমায় টেনে টেনে কূটনৈতিক জীবনে শুধু এই বাচনভঙ্গিকে সম্বল করেই আজ তিনি এত ঊর্ধ্বে উঠেছেন। বিরাট চেহারা। কপাটের মতো চ্যাটালো বুক। মাথায় বেশ লম্বা।

হেসে উঠল ভন বর্ক।

ওদের ঠকানো এমন কিছু কঠিন নয়, ব্যারন। বড়ো সাদাসিদে, সরল। ঘোরপ্যাঁচ একদম বোঝে না।

তা অবশ্য বলতে পারব না, চিন্তাচ্ছন্ন সুরে বললেন ব্যারন। এদের ব্যাপারস্যাপার বড়ো অদ্ভুত–দেখে শেখার মতো। বাইরে থেকে গোবেচারা মনে হয় বটে কিন্তু শেষপর্যন্ত সেই ফাঁদেই পড়তে হয় নতুন লোককে ঠকে যায় বাইরের সরল ব্যাপার দেখে। প্রথমটা দেখে মনে হয় না জানি কী নরম ধাত। তারপরেই আচমকা এমন একটা শক্ত জায়গায় হোঁচট খেতে হয় যে উচিৎ শিক্ষা দিয়ে ছাড়ে। এদের এই সনাতনী রূপটা দেখে ভুল ধারণা করা কিন্তু ঠিক নয়। যেমন ধরো, এদের সনাতনী কাষ্ঠলৌকিকতা। যত আড়ষ্টই হোক না কেন, অশ্রদ্ধা করা উচিত নয়।

তা আর বলতে, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভন বক–যেন অভিজ্ঞতাটা তারও খুব কম নয়।

আমি নিজে একটা বিরাট ভুল করেছিলাম আমার অনেক সফল কীর্তি যখন তুমি জান, বিফল কীর্তিটাও জেনে রাখো। এদেশে এসেই নেমন্তন্ন পেলাম একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর বাগানবাড়িতে। কথাবার্তা হল অত্যন্ত অবিবেচকের মতো।

জানি। আমিও ছিলাম সেখানে, শুকনো গলায় বললেন ভন বৰ্ক।

রিপোর্ট পাঠালাম বার্লিনে। চ্যান্সেলর বড়ো কড়া লোক। এমন একটা মন্তব্য করলেন যে বুঝলাম তিনি ধরে ফেলেছেন আমি সব গুবলেট করে বসেছি। দু-দুটো বছর এই ভুলের মাশুল গুনতে হয়েছে। বাইরে থেকে যাঁকে খুব নরম ভেবেছিলাম, এই ঘটনার পর সেই ইংরেজ গৃহস্বামীর অন্য মূর্তি দেখলাম–সে-মূর্তি আর যাই হোক নরম নয় মোটেই। আমার যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে, এখন তুমি এসেছ স্পোর্টসম্যানের ভেক নিয়ে।

ভেক বলছেন কেন–ভেক মানে তো মিথ্যে, নকল। আমি তা নই। স্পোর্টস আমার শিরায় উপশিরায়। সারাজীবন খেলাধুলা নিয়েই তো কাটালাম।

সেইজন্যেই অভিনয়টা আরও ভালো হচ্ছে–ওষুধ ধরছে–কাজ হচ্ছে। একই সঙ্গে নৌকা চালাও, শিকারে বেরোও, পোলো খেলো, সব খেলাতেই নেমে পড়, অলিম্পিয়ায় গিয়ে প্রাইজ পর্যন্ত নিয়ে আসো। শুনলাম ছোকরা অফিসারদের সঙ্গে বক্সিংও লড়ছ। ফলে নিজের মতো করেই তোমাকে নিয়েছে সবাই। খেলাধুলা-পাগল জার্মান হিসেবে খ্যাতির শ্রদ্ধা, সম্মান পেয়েছ সর্বত্র। নাইট ক্লাবে যাও, টেনে মদ খাও, শহর জুড়ে দাপিয়ে বেড়াও বেপরোয়া জীবনযাপন দেখে ওরা হাসে তোমাকে আরও কাছে টেনে নেয়। কেউ জানতেও পারে না, পাহাড়ের ওপর ছোট্ট এই বাড়িটায় ইংলন্ডের অর্ধেক দুষ্কর্মের ঘাঁটি আগলে বসে রয়েছ তুমি নাটের গুরু হয়ে কল্পনাও করতে পারে না জার্মান হয়েও খেলা-পাগল বলে যাকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না তার চেয়ে স্টুদে গুপ্তচর সারাইংলন্ডে আর নেই। ভায়া ভন বর্ক–সত্যিই তুমি একটা জিনিয়াস!

খুব যে খোশামোদ করছেন দেখছি। তবে হ্যাঁ, এই চারটে বছর বৃথা কাটাইনি এদেশে। আমার ভাড়ার কখনো দেখাইনি আপনাকে আসুন না ভেতরে।

পড়ার ঘরে ঢুকল ভন বর্ক। আলো জ্বেলে জানলার পর্দা টেনে দিল ভালো করে। তারপর রোদে-পোড়া বাজপাখির মতো মুখ ঘুরিয়ে তাকাল বিরাটকায় ব্যারনের পানে।

বললে, গতকাল স্ত্রী কিছু জিনিসপত্র নিয়ে গেছে ফ্লাসিং-এ। তবে আসল কাগজপত্র আমার কাছে। দূতাবাস যেন আমাকে সাহায্য করে।

করবে। তোমার মালপত্র আগলাবার বিশেষ ব্যবস্থা হয়েছে। তবে আমাদের ইংলন্ড ছেড়ে যাওয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না আমার। ফ্রান্সের কপালে যা আছে তা ঘটবেই—ইংলন্ড আটকাতে পারবে না। দু-দেশের মধ্যে সন্ধিপত্রও সই হয়নি।

বেলজিয়ামের কী হবে?

বেলজিয়ামকে ড়ুবতে হবে।

কিন্তু তা কী করে হয়? সন্ধিপত্র সই করা আছে যে। হেনস্থা সইবার পাত্র ওরা নয়।

কিছুদিনের জন্যে শান্তিতে থাকব–তারপর যা হবার তা হবে।

কিন্তু মাথা হেঁট হয়ে যাবে না?

আরে রাখো ওসব ঘেঁদো কথা! যুগটাই হল জনহিতকর ন্যায়সংগত মতবাদের যুগ। সম্মান শব্দটা সেকালে চলত এখন চলে না। তা ছাড়া, ইংলন্ড এখনও তৈরি নয়। খুবই অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্যি। টাইমস পত্রিকার প্রথম পাতায় যখন খবর বেরোল, আমরা বিশেষ যুদ্ধ কর বাবদ পাঁচ কোটি টাকা সংগ্রহ করছি–তখনই তো টনক নড়া উচিত ছিল কিন্তু ঘুম এখনও ভাঙেনি–অথচ সে-খরচটা আমার আসল মতলবের বিরাট বিজ্ঞাপন বললেই চলে। মাঝে মাঝে এক আধটা প্রশ্ন কানে আসে আমার কাজ মনের মতো জবাব বানিয়ে বলে যাওয়া। মাঝেমধ্যে কেউ খেপে যায়–আমি তাদের ঠান্ডা করি। এর বেশি আসল প্রস্তুতি কোথাও হচ্ছে না। সাবমেরিন আক্রমণ আটকানোর প্রস্তুতি, গোলাবারুদ গুদোমজাত করা, আরও বড়ো রকমের বিস্ফোরণ বানানো কোনো ব্যাপারেই এরা এক পাও এগোয়নি–বিশ্বাস করো, কোথাও কোনো প্রস্তুতি নেই। উলটে আমরাই আইরিশ গৃহযুদ্ধের মতো নানারকম সমস্যা সৃষ্টি করে এদের মন অন্যদিকে আটকে রেখেছি–প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা কারো খেয়ালই নেই!

কিন্তু খেয়াল করা তো দরকার–ভবিষ্যৎ নিয়ে সজাগ হওয়া দরকার।

সেটা ওদের ব্যাপার আমাদের নয়। ভবিষ্যতে আমরা কী করব ইংলন্ডকে নিয়ে, তা ঠিক করাই রয়েছে তোমার আনা খবর-টবরগুলো তখন কাজে লাগবে। সেটা আজকে কি কালকে–তা কিন্তু ঠিক করবেন জন বুল মশাই। উনি যদি মনে করেন টক্কর লাগুক আজকেই আমরা তৈরি। আর যদি লড়াই বাধাতে হয় দু-দিন পরে আমরা আরও একটু বেশি তৈরি হব–এই যা তফাত। আমার কী মনে হয় জান–একলা লড়বার সাহস ওদের হবে না–মিত্রপক্ষর সাহায্য নেবে। এই সপ্তাহেই বোঝা যাবে নিয়তি ওদের কোনদিকে নিয়ে যায়। যাক সে-কথা, কাগজপত্র দেখাবে বলছিলে দেখাও। আর্মচেয়ারে বসে মৌজ করে চুরুট টানতে লাগলেন ব্যারন–আলোয় চিকমিক করতে লাগল চওড়া টাকখানা।

বইয়ের তাকের সামনে পর্দা ঝুলছিল। এককোণে ওককাঠের টানা লম্বা প্যানেল। পর্দা টেনে সরাল ভন বর্ক। দেখা গেল তামার পাত দিয়ে মজবুত একটা প্রকাণ্ড সিন্দুক। পকেট থেকে চাবি বার করে বেশ কিছুক্ষণ কসরত করবার পর তালা খুলে ভারী পাল্লা টেনে দু-হাট করল ভন বর্ক।

বলল, দেখুন।

খোলা সিন্দুকের গর্ভে আলো পড়ায় স্পষ্ট দেখা গেল সারি সারি অনেকগুলো খুপরি। প্রত্যেকটা খুপরিতে কাগজের লেবেল সাঁটা। লেবেলে লেখা—ফোর্ডস, বন্দর–প্রতিরক্ষা, এরোপ্লেন, আয়ারল্যান্ড, মিশর, পোর্টসমাউথ কেল্লা, চ্যানেল, রোসিথ ইত্যাদি। প্রত্যেকটা খুপরির মধ্যে থরে থরে সাজানো দলিল আর নকশা।

দারুণ! মুখ থেকে চুরুটটা নামিয়ে মোটাসোটা দুই হাত এক করে আনন্দে উথলে উঠলেন ব্যারন।

আমার চার বছরের কাজ, ব্যারন। গাঁইয়া জমিদারের ছদ্মবেশে কাজটা খারাপ নয়, তাই না? মদ খাওয়া আর খেলাধুলো নিয়ে মেতে থেকেছি কিন্তু কাজও করেছি। তবে সব সেরা বস্তুটি এখুনি এসে পৌঁছোবে, বলে একটা খুপরি দেখাল ভন বর্ক–খুপরির ওপরকার লেবেলে লেখা নৌদপ্তরের সাংকেতিক চিহ্ন।

কিন্তু এ-সম্বন্ধে কাগজপত্র সব খরচ তো তোমার নেওয়া হয়ে গেছে।

এখন তা বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিতে হবে। নৌবিভাগ কীভাবে জানি না সন্দেহ করেছিল খবর পাচার হচ্ছে রাতারাতি সব সাংকেতিক চিহ্ন পালটে দিয়েছে। এত বছর কাজ করছি শেষ মুহূর্তে এমন চোট কখনো খাইনি। তবে আমার এই চেকবুকের দৌলতে সে বাধাও পেরিয়েছি। আজ রাতেই আলটামন্ট আসছে সব খবর নিয়ে।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন ব্যারন।

আরে সর্বনাশ? এখুনি যেতে হবে আমাকে। কার্লটন টেরেসে এই মুহূর্তে এখন কী ঘটছে, তা তুমিও জান। কাজেই যে-যার ঘাঁটি আগলানো দরকার। আলটামন্ট কখন আসবে বলেছে?

একটা টেলিগ্রাম এগিয়ে দিল ভন বর্ক।

আজ রাতে–সঙ্গে আনবে নতুন স্পার্কিং প্লাগ।

স্পার্কিং প্লাগ?

আলটামন্ট মোটর এক্সপার্টের ভেক নিয়েছে। আমার গ্যারেজে গাড়িও তো অনেক। এক-একটা স্পেয়ার পার্টসের নামে পাঠায় এক-একটা গোপন খবর। র্যাডিয়েটর নিয়ে টেলিগ্রাম পাঠালে বুঝে নিতে হবে যুদ্ধজাহাজের কথা বলছে, অয়েল পাম্প মানে ক্রুজার, এইরকম আর কি। স্পার্কিং প্লাগ মানে নৌ দপ্তরের সাংকেতিক চিহ্ন।

টেলিগ্রামটা নিজের মনেই পড়লেন সেক্রেটারি আজই আসছি পোর্টসমাউথ থেকে! ভালো কথা ওকে কত টাকা দিচ্ছ?

শুধু এই কাজের জন্যে পাঁচশো পাউন্ড–এ ছাড়াও মাস-মাইনে তো আছেই। টাকার লোভে বিশ্বাসঘাতক হতে এদের আটকায় না। সব ভালো, কিন্তু এত টাকা শুষে নেয় যে বলবার নয়!

আলটামন্টকে টাকা দিয়ে আমি কিন্তু কখনো পস্তাইনি। একহাতে টাকা নেয়, আর এক হাতে কাজ দেয়। তা ছাড়া, ওকে বিশ্বাসঘাতক বলা যায় না। আইরিশ-আমেরিকানরা ইংলন্ডকে যতখানি ঘৃণা করে, ততখানি আমরা জার্মানরাও করি না।

তাই নাকি? আলটামন্ট আইরিশ-আমেরিকান?

কথা শুনলেই বুঝবেন। ওর সব কথা বুঝতেই পারি না–এমন উচ্চারণ। রাজার ইংরিজি আর ইংরেজ রাজা–এই দুইয়ের বিরুদ্ধেই যেন যুদ্ধঘোষণা করেছে একই সাথে। চললেন নাকি? আর একটু বসে গেলে দেখা হয়ে যেত।

না হে, এমনিতেই অনেকক্ষণ আছি–আর নয়। কাল সকালে তোমার আশায় থাকব। নৌ দপ্তরের সাংকেতিক চিহ্ন তোমার হাতে এলেই ইংলন্ডের সব খবর নেওয়া শেষ হল বুঝব। আরে! টোকে নাকি! ধুলোঢাকা একটা বোতল দেখিয়ে হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন ব্যারন।

দেব এক গেলাস?

আর না? কিন্তু খুব হইহল্লা হবে মনে হচ্ছে!

মদ জিনিসটা আলামন্টের খুব পছন্দ–ভালো জিনিস পেলে তারিফ করতে জানে। টোকে ওর মনে ধরেছে। ছোটোখাটো ব্যাপারেও ত্রুটি থাকলে ওর আবার আঁতে লেগে যায়–তাই বোতলটা তৈরি রেখেছি।

কথা বলতে বলতে দুই মূর্তি বেরিয়ে এল উঠোনে। অদূরে দাঁড়িয়ে সুবিশাল গাড়িটা। ব্যারনের ড্রাইভারের আঙুলের ছোঁয়ায় চাপা শব্দে গর্জে উঠল ইঞ্জিন।

কোটটা গায়ে দিয়ে ব্যারন বললেন, চারদিক কী শান্ত, কী সুন্দর। কয়েক হপ্তার মধ্যেই ছুটে যাবে এই শান্তি–ইংলন্ডের উপকূল বরাবর আগুন জ্বালিয়ে ছাড়ব আমরা। শুধু সমুদ্র কেন, আকাশেও আগুন জ্বলবে যদি জেপেলিন বাহিনী ঠিকমতো ভেলকি দেখাতে পারে। আরে বুড়িটা কে?

একটিমাত্র জানলায় আলো জ্বলছে পেছনে। একটা ল্যাম্প। ল্যাম্পের সামনে টেবিলে বসে গাঁইয়া টুপি মাথায় লালমুখো এক বুড়ি। হেঁট হয়ে উল বুনছে, আর মাঝে মাঝে পাশের টুলে বসা একটা বিরাট কালো বেড়ালের মাথায় হাত বুলোচ্ছে।

মার্থা–আমার ঝি। আর সবাইকে ছেড়ে দিয়েছি শুধু ওকে রেখেছি।

নীরস হাসি হাসলেন সেক্রেটারি।

শান্ত ইংলন্ডের মূর্ত প্রতীক ওই বুড়ি। নিশ্চিন্তভাবে বসে দিন কাটাচ্ছে পরম আরামে। জানেও না কী ঘটতে চলেছে আর কয়েক হপ্তার মধ্যে। ঠিক আছে, ভন বর্ক। চললাম! হাত নেড়ে বিদায় অভিনন্দন জানিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন ব্যারন। একজোড়া হেডলাইটের জোরালো আলো অন্ধকার ছিঁড়েখুঁড়ে ধেয়ে গেল সামনে। ধাবমান গাড়ির পেছনে নরম কুশনে হৃষ্টচিত্তে বসে সুখকর চিন্তায় নিমগ্ন থাকার দরুন ব্যারন মশায় খেয়াল করলেন না গাঁয়ের রাস্তার মোড় ফেরার সময়ে উলটো দিক থেকে একটা ছোট্ট ফোর্ড গাড়ি বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে।

মোটর ল্যাম্পের শেষ দীপ্তি বহুদূর মিলিয়ে যেতেই ধীরপদে পড়ার ঘরে ফিরে এল ভন বর্ক। যাওয়ার সময়ে দেখল বুড়ি ঝি ল্যাম্প নিভিয়ে শুতে গিয়েছে। এতবড়ো নিঝুম বাড়িতে এভাবে একলা কখনো থাকেনি ভন বক–এতদিন বাড়ি গমগম করত লোকজন থাকায়। একদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া গিয়েছে নিরাপদ জায়গায় পাচার করা গিয়েছে ফ্যামিলির প্রত্যেককে। বিরাট এই বাড়ির রান্নাঘরে ওই এক বুড়ি ছাড়া কেউ আর নেই! যাওয়ার আগে পড়ার ঘরে বেশ কিছু জিনিস সাফ করতে হবে। সেই কাজেই ড়ুবে গেল ভন বর্ক। কাগজ পোড়াতে পোড়াতে আগুনের তাতে লাল হয়ে গেল সুশ্রী শানিত মুখটা। সিন্দুক থেকে মহামূল্যবান দলিল আর নকশা নামিয়ে একটা চামড়ার ব্যাগে থরে থরে সাজাতে লাগল। আচমকা কানে ভেসে এল দূরায়ত মোটর ইঞ্জিনের আওয়াজ। সোল্লাসে চেঁচিয়ে লাফিয়ে উঠল ভন বর্ক। চামড়ার ব্যাগ বন্ধ করল, সিন্দুকের পাল্লায় তালা দিল। বেরিয়ে এল বাইরে। ঠিক সেই সময়ে অদূরে এসে দাঁড়াল একটা ছোট্ট গাড়ি। লাফিয়ে নামল এক চটপটে ব্যক্তি। ইঞ্জিন বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসল ড্রাইভার ভারী চেহারা লোকটার, বয়স্ক, ধূসর গোঁফ ঝুলছে নাকের নীচে। এমনভাবে বসল গা এলিয়ে যেন বসতে হবে অনেকক্ষণ।

দৌড়ে গিয়ে ভন বর্ক বললে, এনেছেন?

ব্রাউন পেপারে মোড়া একটা প্যাকেট বিজয়-গৌরবে মাথার ওপর তুলে ধরল দর্শনার্থী লোকটা।

বলল, সব নিশানা এর মধ্যে।

সিগন্যাল তো?

সমস্ত–যতরকম সংকেত আছে নৌদপ্তরে–সমস্ত। ল্যাম্পের গুপ্ত সংকেত, দূরে সংকেত জানানোর যন্ত্র, মার্কনি বেতার সংকেত–সমস্ত। কপি করে এনেছি কিন্তু মূল দলিল আনা খুবই বিপজ্জনক।বলেই সশব্দে চাষাড়ে ভঙ্গিমায় পিঠ চাপড়ে দিল ভন বর্কের। চোখ টিপে সহ্য করল ভন বর্ক।

বলল, ভেতরে আসুন। কেউ নেই বাড়িতে আমি একা। কপি করে এনে ভালোই করেছেন–আসলের চাইতে ভালো। আসলটা খোয়া গেছে জানাজানি হয়ে গেলে সমস্ত পালটে নতুন করে করতে পারে। কপিটা ঠিকমতো হলেই হল।

ভেতরে এসে আর্মচেয়ারে লম্বা হাত-পা ছড়িয়ে বসল আইরিশ আমেরিকান আগন্তুক। লোকটা তালট্যাঙা। কৃশ। বয়স প্রায় ষাট, চোখ-মুখ ধারালো, ছাগুলে দাড়ির জন্যে আঙ্কল স্যামের কৌতুকচিত্রের মতো দেখতে লাগছে। ঠোঁটের কোণ থেকে ঝুলছে একটা আধপোড়া থুথুভেজা চুরুট। দেশলাই ধরিয়ে চুরুটটা জ্বালিয়ে নিল চেয়ারে বসবার পর। চারদিক দেখে নিয়ে বললে, ওড়বার মতলবে আছেন দেখছি। সিন্দুকের ওপর চোখ পড়তেই চমকে উঠে বললে, আরে সর্বনাশ, কাগজপত্র ওর মধ্যে রাখেন নাকি?

রাখলে ক্ষতি কী?

আরে, এ-রকম খোলাখুলিভাবে রাখেন এত গোপন কাগজপত্র! আপনি না স্পাই? টিন কাটা যন্ত্র দিয়ে যেকোনো ইয়াঙ্কি বদমাশ চক্ষের নিমেষে কেটে খুলে ফেলবে ওই সিন্দুক। ওর মধ্যে আমার চিঠি রাখেন জানতে পারলে একটা চিঠিও আপনাকে লিখতাম ভেবেছেন?

ও-সিন্দুক কাটবার ক্ষমতা কোনো চোর বদমাশের নেই কোনো যন্ত্র দিয়ে এ-সিন্দুকের ধাতু কাটা যায় না।

কিন্তু তালাটা?

ডবল কম্বিনেশন তালা। মানেটা বুঝেছেন নিশ্চয়?

খুলে বলুন।

প্রথমে একটা শব্দ আর কয়েকটা সংখ্যা দরকার হবে। নইলে তালা খুলবে না।উঠে দাঁড়াল ভন বর্ক। চাবির ফোকরের চারধারে বেড় দেওয়া দুটো চাকতি দেখাল। বাইরের চাকতিটা শব্দের অক্ষরের, ভেতরেরটা সংখ্যার।

চমৎকার!

তাই বলছিলাম, যত সহজ ভাবছেন তত সহজ নয়। চার বছর আগে বানিয়েছিলাম এই সিন্দুক। জানেন তখন কী শব্দ আর কী সংখ্যা রেখেছিলাম?

কী করে বলব বলুন।

অগাস্ট আর ১৯১৪।

বিস্ময় আর প্রশংসা যুগপৎ ফুটে ওঠে আমেরিকান ভদ্রলোকের চোখে-মুখে।

দারুণ ব্যাপার করেছেন দেখছি! এক্কেবারে নিখুঁত।

তারিখটা পর্যন্ত আমাদের কেউ কেউ আঁচ করে নিতে পারবে। কাল সকালেই লম্বা দিচ্ছি দলিল দস্তাবেজ নিয়ে।

আমিও সরে পড়ব হপ্তাখানেকের মধ্যে। একলা এদেশে থেকে মরব নাকি? সাগর পার থেকে দেখব কীভাবে ল্যাংচায় বেটা জন বুল।

আপনি পালাতে যাবেন কেন? আপনি তো আমেরিকার নাগরিক।

ব্রিটিশ আইনে আমেরিকান নাগরিক হলেই যে সাতখুন মাপ হয়ে যাবে, তার কোনো মানে নেই। যেদেশে যে নিয়ম–অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে। যেমন পাচ্ছে জ্যাক জেমস পচে মরছে পোর্টল্যান্ড জেলে। ভালো কথা, আপনারা কিন্তু নিজের লোকদের বিপদ থেকে মোটেই বাঁচান না।

কী বলতে চান? তেড়ে ওঠে ভন বর্ক।

আপনার হয়ে যারা কাজ করেছে তাদের বিপদে-আপদে রক্ষা করা আপনাদের কর্তব্য। কিন্তু আপনারা পিছলে বেরিয়ে যান। যেমন ধরুন জেমস

জেমস মরেছে নিজের দোষে। আপনি তা জানেন। নিজের মতে চলতে গেলে অমন হবেই।

জেমস না হয় মাথামোটা। কিন্তু হোলিসকে বাঁচালেন না কেন?

ও তো একটা পাগল!

সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত একনাগাড়ে অভিনয় করলে আর অষ্টপ্রহর শ-খানেক পুলিশচর লেগে থাকলে পাগল প্রত্যেকেই হয়। কিন্তু স্টিনারের কেসটা—

চমকে ওঠেন ভন বৰ্ক, কী হয়েছে স্টিনারের?

ধরা পড়েছে। কাল রাতে দোকানে হানা দিয়েছিল পুলিশ। কাগজপত্র সমেত স্টিনার এখন পোর্টল্যান্ডে। ফাঁসির দড়ি এড়াতে পারবে কি না সন্দেহ। এইসব কারণেই আমি সাগরপারে যেতে চাই যত তাড়াতাড়ি পারি।

ভন বর্কের মনের জোর নেহাত কম নয়। নিজেকে সামলাতে সে জানে। কিন্তু খবরটায় বিলক্ষণ বিচলিত হয়েছে দেখা গেল–ফ্যাকাশে হয়ে গেল লালচে মুখ।

বিড়বিড় করে বললে, স্টিনারকে ওরা পাকড়াও করল কী করে?

আমি বেঁচে গেছি অল্পের জন্যে।

কী বলতে চান?

বাড়িউলির কাছে আমার খোঁজ নিতে এসেছিল একজন। শুনেই বুঝেছি এবার আমার পালা। এত তাড়াহুড়ো করছি সেই কারণেই। কিন্তু পুলিশ এত খবর পাচ্ছে কী করে? স্টিনারকে নিয়ে পাঁচ জনকে ওরা ধরল–ষষ্ঠজন কে হবে আঁচ করতে পেরেই আমি সটকান দেব ঠিক করেছি। কিন্তু আপনার হয়ে যারা খাটছে, একে-একে তারা ধরা পড়ছে কেন? কীভাবে?

মুখখানা টকটকে লাল হয়ে গেল ভন বর্কের।

আপনার সাহস তো কম নয়!

মিস্টার, সাহস আছে বলেই আপনার সেবা করতে এসেছি–নইলে আমাকে পেতেন না। যা বলব মুখের ওপর বলব। শুনেছি আপনারা জার্মানরা কাজ মিটে গেলেই ছেড়া ন্যাকড়ার মতো ফেলে দেন কাজের লোককে।

তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল ভন বর্ক।

তার মানে আপনি বলতে চান আমিই ধরিয়ে দিয়েছি আমার এজেন্টদের?

আমি তা বলতে চাই না। তবে কোথাও কেউ কলকাঠি নাড়ছে। সেইজন্যেই হল্যান্ডে না-যাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারছি না।

রাগ সামলে নিল ভন বর্ক।

অ্যাদ্দিন একসঙ্গে কাজ করার পর শেষকালে আর ঝগড়া করতে চাই না। আপনি হল্যান্ডে যান রাটারড্যাম থেকে জাহাজে নিউইয়র্ক চলে যান। এক সপ্তাহ পর থেকে আর কোনো জাহাজ লাইন নিরাপদ থাকবে না। বইটা দিন–প্যাক করে ফেলি।

হাতের পার্সেলটা হাতেই রেখে দিল আমেরিকান বাড়িয়ে দিল না ভন বর্কের দিকে।

টাকাটা?

আবার কীসের টাকা?

আরও পাঁচশো পাউন্ড বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। সেটা এখুনি দিতে হবে।

তেঁতো হেসে ভন বর্ক বললে, আপনি আমাকে অসম্মান করছেন। বই দেওয়ার আগেই টাকা চাইছেন।

কারবার করতে এসে অত ভাবলে চলে না।

ঠিক আছে, ঠিক আছে, টেবিলে গিয়ে বসল ভন বর্ক। খসখস করে লিখল একটা চেক। চেক রাখল টেবিলের ওপর। ঘাড় ফিরিয়ে বললে, আমাদের সম্পর্কটা যখন অবিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে শেষ হতে চলেছে, তখন চেক নেওয়ার আগে বইটা আমাকে দেখাবেন।

নিরুত্তরে প্যাকেট এগিয়ে দিল আমেরিকান। মোড়ক খুলে স্তম্ভিত চোখে নীলরঙের ছোট্ট বইটার দিকে চেয়ে রইল ভন বর্ক। মলাটে লেখা মৌ-চাষের হাতেকলমে বিদ্যে। জ্বলন্ত চোখ তোলবার আগেই পেছন থেকে সাঁড়াশির মতো কয়েকটা আঙুল চেপে বসল গলার ওপর এবং ক্লোরোফর্ম ভিজোননা তুলো এসে পড়ল নাকের ওপর।

 

ওয়াটসন, নাও আর এক গেলাস!ইম্পিরিয়েল টোকের বোতল বাড়িয়ে দিয়ে বলল শার্লক হোমস।

টেবিলের পাশে আসীন হৃষ্টপুষ্ট ড্রাইভার সাগ্রহে হাত বাড়িয়ে দিল বোতলটার দিকে।

খাসা মদ, হোমস।

অত্যাশ্চর্য বলতে পার। সোফায় শুয়ে ওই যে ঘুমোচ্ছে আমাদের প্রাণের বন্ধুটি, ওর মুখেই শুনেছি, সসানবার্ন প্যালেসের বিশেষ মদের কুঠরি থেকে আনা হয়েছে এই বোতল। জানলাটা খুলে দাও–ক্লোরোফর্মের গন্ধে মনের মেজাজ চলে যায়।

সিন্দুকের পাল্লা দু-হাট করে খুলে দাঁড়িয়ে আছে শার্লক হোমস। ভেতর থেকে নামাচ্ছে গুপ্ত দলিল আর নকশা। দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়ে সাজিয়ে রাখছে ভন বর্কের চমড়ার ব্যাগে। সোফায় শুয়ে নাক ডাকছে জার্মান গুপ্তচর হাত আর পা চামড়ার ফিতে দিয়ে বাঁধা।

তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, ওয়াটসন। কেউ নেই বাড়িতে মার্থা ছাড়া। ওর সাহায্য–পেলে এত সহজে কিস্তিমাত করতে পারতাম না। ঘণ্টা বাজাও–মার্থা আসবে। ওই তো এসে গেছে!

দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে সেই বৃদ্ধা পরিচারিকা–মুখে মৃদু হাসি। সোফায় শায়িত জার্মানকে দেখে ঈষৎ উদবিগ্ন হয়েছে মনে হল।

হোমস বললে, ঘাবড়াও মাৎ, মার্থা। চোট লাগেনি ঘুমোচ্ছে।

বাঁচলাম। মনিব হিসেবে ভদ্রলোক খুব ভালো। উনি চেয়েছিলেন গতকাল ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে জার্মানি চলে যাই–তাতে আপনার প্ল্যান ভণ্ডুল হয়ে যেত, তাই না?

ঠিক কথা। তুমি এখানে ছিলে বলেই তো এত নিশ্চিন্ত ছিলাম আমি। আজ রাতে অবশ্য তোমার সিগন্যালের জন্যে অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হয়েছে।

কী করি বলুন। সেক্রেটারি না-যাওয়া পর্যন্ত সিগন্যাল দিতে পারিনি!

জানি, জানি, আমাদের পাশ দিয়েই গাড়ি নিয়ে গেলেন ভদ্রলোক।

যেতে কি আর চায়, খুব চিন্তায় পড়েছিলাম।

তোমার ল্যাম্প নিভতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। কালকে ক্ল্যারিজ হোটেলে দেখা করো, কেমন?

ঠিক আছে স্যার।

জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা আছে তো?

আছে। আজ উনি সাতটা চিঠি লিখেছেন। একই ঠিকানায়।

কাল সকালে দেখবখন। গুড নাইট, বিদেয় হল মার্থা। ওয়াটসনকে বললে হোমস, এ-কাগজগুলো খুব একটা কাজে লাগবে না–বেশির ভাগ খবরই জার্মানিতে পৌঁছে গেছে। কিন্তু এই মূল দলিলগুলো দেশের বাইরে যেতে দেব না।

অন্য কাগজগুলো তাহলে আর কাজে লাগবে না?

এর বেশির ভাগ আমিই পাঠিয়েছিলাম। ঠিক যেখানে যেখানে জলে মাইন ডোবানো আছে, সেই সেই জায়গা দিয়ে জার্মান জাহাজ যখন যাবে আমার পাঠানো নকশা অনুযায়ী, তখন যে-কাণ্ডটা ঘটবে, তা দেখে শেষ জীবনটা আমার ভালোভাবেই কাটবে ওয়াটসন। কিন্তু তোমাকে তো এখনও ভালো করে আলোয় দেখিনি। এতগুলো বছর কাটল কীরকম বল? ঠিক আগের মতোই ছোকরা আছ দেখছি।

বিশ বছর বয়স কমে গেছে হোমস তোমার টেলিগ্রাম পেয়ে। সঙ্গেসঙ্গে হাজির হয়েছি হারউইচে গাড়ি নিয়ে। তুমিও খুব একটা পালটাওনি–বিকট ওই ছাগুলে দাড়িটাই কেবল চোখে লাগছে।

কাল থেকে এ-দাড়ি একটা বিকট স্মৃতি হয়েই থাকবে, ওয়াটসন। দেশের জন্যে অনেক স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়–দাড়িটা তার মধ্যে একটা। ক্ল্যারিজ হোটেলে দাড়ি কামিয়ে চুল কেটে ঠিক আগের চেহারায় ফিরে যাব ঠিকই কিন্তু আমেরিকান বুকনি রপ্ত করতে গিয়ে আমার চোস্ত ইংরিজিটাকে জন্মের মতো জখম করে ফেলেছি মনে হচ্ছে।

কিন্তু তুমি তো শুনেছিলাম অবসর নিয়েছ। মৌমাছির চাষ আর বই লেখা নিয়ে সাউথ ডাউন্সে সন্ন্যাসীর মতো দিন কাটাচ্ছ।

শুনেছ ঠিকই ওয়াটসন। এই তো আমার পরবর্তী জীবনের পরিশ্রমের ফল! টেবিল থেকে বইটা তুলে নিয়ে পুরো নামটা পড়ে শোনাল হোমস। মৌ-চাষের হাতেকলমে বিদ্যে–বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রানি মক্ষিকাকে পর্যবেক্ষণ। একাই করেছি ওয়াটসন। দিনরাত একনাগাড়ে মেহনতি দলবলের ওপর চোখ রাখতে গিয়ে মনে হয়েছে যেন লন্ডনের ক্রিমিনাল দুনিয়ার ওপর নজর রাখছি।

কিন্তু ফের কাজে নামলে কেন?

সে এক কাহিনি। বৈদেশিক মন্ত্রী পর্যন্ত ঠেকিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু যখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই দীনের কুটিরে পায়ের ধুলো দিলেন–। ওয়াটসন, অত্যন্ত ভালো মানুষ সেজে অনেক দিন ধরে দেশের সর্বনাশ করে ছাড়ছিল সোফায় শোয়া এই লোকটা। দীর্ঘদিন ধরে লটঘট ব্যাপার চলছে, বিস্তর স্পাই ধরা পড়ছে, কিন্তু বেশ বোঝা যাচ্ছিল মধ্যমণির নাগাল ধরা যাচ্ছে না কিছুতেই। আমার ওপর বেজায় চাপ পড়ল পালের গোদাকে খুঁজে বার করার জন্যে। দুবছর সেই খোঁজেই কাটিয়েছি ওয়াটসন, সময়টা খুব খারাপ কাটেনি–প্রতি মুহূর্তে পেয়েছি আশ্চর্য উত্তেজনা। হাতেখড়ি হল শিকাগোতে, বাফেলোর আইরিশ গুপ্ত সমিতি থেকে বেরিয়ে পাক্কা গুপ্তচরের শিক্ষা নিয়ে, স্কিবেরিনের পুলিশ মহল নাকের জলে চোখের জলে হল আমার জ্বালায় ফলে চোখে পড়লাম ভন বর্কের এক স্যাঙাতের। তার সুপারিশ নিয়ে এলাম পালের গোদার কাছে সেই থেকেই ভন বর্ককে গোপন খবর জুগিয়ে আসছি আমি। ফলে, ওদের, সব প্ল্যান ভন্ডুল হয়েছে পাঁচজন সেরা স্পাই জেলে পচছে। পাঁচজনের কাজ কারবার লক্ষ করতাম–সময় হলেই টুপ করে জেলে ঢুকিয়ে দিতাম। মশায়, আপনাকেও সেই দলে ঢুকতে হবে!

শেষ কথাটা বলা হল ভন বর্ককে। চুপচাপ শুয়ে চোখ পিটপিট করতে হোমসের কথা শুনছিল এতক্ষণ। জার্মান গালাগালির ফুলঝুরি ঝরতে লাগল এখন রাগের চোটে বেঁকে গেল মুখখানা। কান দিল না হোমস, চটপট চোখ বুলিয়ে নিতে লাগল দলিল দস্তাবেজের ওপর।

কিছুক্ষণ পরেই দম ফুরিয়ে গেল ভন বর্কের। হোমস বললে, জার্মান ভাষাটা কাঠখোট্টা হলে কী হবে, মনের ভাব প্রকাশের পক্ষে উপযুক্ত। আরে! আরে! আর একটা বড়ো পাখিকে পাওয়া গেছে। অনেক দিন ধরে চোখ রেখেছিলাম এর ওপরে–কিন্তু এত বড়ো রাসকেল জানা ছিল না তো! সিন্দুকের কোণে খরখরে চোখে তাকিয়ে হোমস ফেটে পড়ল প্রচণ্ড উল্লাসে। মিস্টার ভন বর্ক, তোমাকে অনেক কিছুর জন্যেই জবাবদিহি করতে হবে দেখছি।

অতি কষ্টে সোফার ওপর বসে বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে হোমসের পানে চেয়েছিল ভন বর্ক। এবার ঘৃণা মিশ্রিত কণ্ঠে বললে চিবিয়ে চিবিয়ে, অ্যালটামন্ট, এ-জীবনে তোমার রেহাই নেই!

এর আগেও ও-হুমকি অনেকবার শুনেছি। প্রফেসর মরিয়ার্টি শুনিয়েছে জীবদ্দশায়, শুনেছি কর্নেল সিবাসটিয়ান মোরানের মুখেও। কিন্তু এখনও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছি সাউথ ডাউন্সে মৌমাছিদের নিয়ে।

বিশ্বাসঘাতক কোথাকার! জ্বলন্ত চোখে বাঁধন ছেড়ার চেষ্টা করতে করতে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল ভন বর্ক।

আরে ছ্যাঃ! অতটা বদ আমি নই। আমার কথা শুনে বুঝছ না কেন শিকাগোর অ্যালামন্ট কাজ শেষ করে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

কে তুমি?

জেনে আর লাভ আছে কী? তাহলেও তোমার কৌতূহল চরিতার্থ করব। মিস্টার ভন বর্ক, তোমার দেশের লোক এর আগেও আমার নাম শুনেছে–তুমিও শুনে থাকতে পারো।

তোমার খুড়তুতো ভাই যখন রাজদূত, তখন আইরিন অ্যাডলার আর বোহেমিয়ার পরলোকগত রাজার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিলাম আমিই। আমি না-থাকলে নিহিলিস্ট কোপম্যানের হাতে নির্ঘাত খুন হয়ে যেতেন তোমার বড়োমামা কাউন্ট গ্রায়েন্সটাইন। আমার

জন্যেই–

সবিস্ময়ে সোজা হয়ে বসল ভন বর্ক।

সে-লোক তো একজনই আছে পৃথিবীতে!

হ্যাঁ, আমিই সেই লোক!

গুঙিয়ে উঠে সোফায় এলিয়ে পড়ল ভন বর্ক।

যা কিছু খবর জার্মানিতে পাঠিয়েছি, সমস্ত এসেছে আপনার মারফত! কী দাম সেই খবরের বলতে পারেন? এ আমি কী করলাম? নিজের হাতে নিজের পায়ে কুড়ুল মারলাম।

খুবই খারাপ কাজ করেছ। তোমার দেশ দু-দিন পরেই টের পাবে ফলটা। দেখবে এদেশের কামান বন্দুককে যতটা খাটো মনে করা হয়েছিল–তার চাইতে ঢের বেশি লম্বা। যুদ্ধজাহাজগুলোও এত জোর ছুটবে যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।

নিঃসীম হতাশায় দু-হাতে নিজের টুটি টিপে ধরল ভন বর্ক।

হোমস বলল, আরও অনেক ব্যাপার শিগগিরই জানবে তোমার দেশের জন্যে আমি খেটেছি আমার দেশের জন্যে। অন্যায় কিছু কি? তুমি বেশি চালাকি করতে গিয়েছিলে বলেই নিজের জালে জড়িয়ে পড়েছ। ওয়াটসন, কাগজপত্র নেওয়া হয়ে গেছে। হাত লাগাও, কয়েদিকে নিয়ে লন্ডনে রওনা হওয়া যাক।

ভন বককে টেনে তুলতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে গেল দুজনে। একে শক্তিমান, তায় বেপরোয়া। শেষকালে দু-দিক থেকে ধরে একরকম টেনে হিঁচড়েই রাস্তা দিয়ে নিয়ে গিয়ে ছুঁড়ে ফেলা হল গাড়ির পেছনের সিটে। কয়েক ঘণ্টা আগে এই রাস্তাতেই কিন্তু ভন বর্কের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন সুবিখ্যাত কূটনীতিবিদ ভদ্রলোক।

হোমস বললে, যদি অনুমতি দাও তো একটা চুরুট ধরিয়ে তোমার মুখে গুঁজে দিতে পারি।

আপ্যায়নটা পছন্দ হল না ভন বর্কের।

রক্তচোখে বললে, মিস্টার শার্লক হোমস আপনার এই কাজটা কিন্তু জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ করার শামিল আশা করি আপনার সরকার তা বুঝবে?

এই ব্যাগে যা নিয়ে যাচ্ছিলে, সেটাও তাই, বললে হোমস। তোমার দেশ নিশ্চয় তা বুঝবে।

আমাকে গ্রেপ্তার করার শমন আপনার নেই। আপনি সরকারি পুলিশ নন। কাজটা বেআইনি। বলা বাহুল্য। জার্মানকে কিডন্যাপ করার ফল কিন্তু সাংঘাতিক হবে। সেইসঙ্গে তার কাগজপত্র চুরি করার শাস্তি পেতে হবে! তাহলে যদি এখন গলা ফাটিয়ে চেঁচাই, আপনাদের দুজনের কী হাল হবে বুঝতে পারছেন?

ওহে ভন বর্ক, বোকামি করতে যেয়ো না। ইংরেজদের তুমি এখনও চেনো না। ছোট্ট এই গাঁয়ের লোক তোমার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে গাছে ঝুলিয়ে দেবে যদি চেঁচাতে যাও। এরা কীরকম খেপে আছে জান না বলেই সাবধান করে দিলাম। চুপচাপ চলে এসো স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে। ওয়াটসন, লন্ডনে গিয়ে তুমি রুগি দেখতে যাবে২৫–আর দেখা হবে না, তাই এসো শান্তিতে শেষ বারের মতো দুটো কথা বলে নিই।

দুই বন্ধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করল মিনিট কয়েক। গাড়ির মধ্যে ছটফট করতে লাগল জার্মান গুপ্তচর। গাড়ির দিকে পা বাড়ালে হোমস। আঙুল তুলে দেখাল চন্দ্রালোকিত সমুদ্রের দিকে।

চিন্তাচ্ছন্নভাবে বললে, ওয়াটসন, পুবের ঝড় আসছে।

আরে না। বেশ তো গরম বাতাস বইছে।

সেই আগের মতোই রয়ে গেলে ওয়াটসন, একটুও পালটালে না। ঝড় কিন্তু আসছে। এ-রকম ঝড় এর আগে ইংলন্ডের ওপর কখনো বয়নি। হিমেল ঝড় আসবার আগেই আমাদের মতো অনেককেই বিদেয় নিতে হবে ধরাধাম থেকে২৬। স্বয়ং ঈশ্বর যে-ঝড় আনছেন তা আসবেই। ঝড় চলে গেলে আবার রোদ উঠবে, আরও বলিষ্ঠ, আরও পরিচ্ছন্ন, আরও ভালো ইংলন্ড জেগে উঠবে। চালাও, ওয়াটসন, সময় হয়েছে এবার রওনা হওয়া যাক। পাঁচশো পাউন্ডের চেকটা ঝটপট ভাঙাতে হবে–নইলে চেক যে দিয়েছে, ব্যাঙ্ককে সে বারণ করে দিতে পারে।

———-

টীকা

বিদায় নিলেন শার্লক হোমস : স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর ১৯১৭ সংখ্যায় এবং কেলিয়ার্স উইকলির ২২ সেপ্টেম্বর ১৯১৭ তারিখের সংখ্যায় হিজ লাস্ট বাও প্রথম প্রকাশিত হয়।

শার্লক হোমস নাটকের শেষ অঙ্ক : অ্যান এপিলোগ অব শার্লক হোমস নামের এই সাব-টাইটেলের বদলে স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনে লেখা হয়েছিল দ্য ওয়ার-সার্ভিস অব শার্লক হোমস।

কালান্তক অগাস্ট : ১৯১৪-র অগাস্ট মাসেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এক তারিখে এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তিন তারিখে। তার ঠিক পরদিন, চার তারিখে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে গ্রেট ব্রিটেন। এরপর সারা মাস বিভিন্ন দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে আরম্ভ করে।

কাইজার : ওই সময়ে জার্মানির সম্রাট বা কাইজার ছিলেন ফ্রিডরিশ উইলহেলম ভিক্টর অ্যালবার্ট (১৮৫৯-১৯৪১) বা দ্বিতীয় উইলিয়াম। দ্য সেকেন্ড স্টেন গল্পের টীকা দ্রষ্টব্য।

বেঞ্জগাড়ি : জার্মান ইঞ্জিনিয়ার কার্ল বেঞ্জ-এর নকশায় নির্মিত মোটরগাড়ি। এই সংস্থার পত্তন হয় ১৮৮৬ সালে। পরে ডেইমলার কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৯২৬-এ শুরু হয় মার্সিডিজ-বেঞ্জ নামক গাড়ির নির্মাণ।

চ্যান্সেলর : ১৯০৯ থেকে ১৯১৭ পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন থিওবোল্ড ফন বেথম্যান-হললায়েগ (১৮৫৬-১৯২১)। অলিম্পিয়া : লন্ডনের কেনসিংটন অঞ্চলে অবস্থিত অলিম্পিয়া অ্যাম্পিথিয়েটারে নানারকম ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সার্কাস, রোলার স্কেটিং, সংগীতানুষ্ঠান প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হত। এখানে প্রায় দশ হাজার দর্শকের বসবার ব্যবস্থা ছিল।

ফ্লাসিং : ওলন্দাজ উচ্চারণে ব্লিসিজেন বা ফ্লাসিং হল্যান্ডের ভিল্যান্ড রাজ্যের অন্তর্গত ওয়ালসেরেন দ্বীপের দক্ষিণ তটে অবস্থিত শহর। নেপোলিয়নের সময়ে এই শহর ব্যবহৃত হয়েছিল নৌ-ঘাঁটি হিসেবে।

আইরিশ গৃহযুদ্ধ : আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার যুদ্ধ। ১৯১৪ সালের মহাযুদ্ধের কারণে আয়ারল্যান্ড সংক্রান্ত আইন পাশ করতে পারেনি বা করেনি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। সেই সময়ে আয়ারল্যান্ডের আলস্টার শহরে এবং অন্যত্র প্রবল আন্দোলন চলে আয়ারল্যান্ডের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে।

জন বুল মশাই : ভারতবর্ষের মানবরূপ যেমন ভারতমাতা, ব্রিটেনের তেমন হল জন বুল। মাঝবয়সি এবং ভারিক্কি চেহারার জন বুলকে প্রায়শই দেখা যায় ব্রিটেনের জাতীয় পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক দিয়ে তৈরি ওয়েস্টকোট পরিহিত অবস্থায়।

পোর্টসমাউথ কেল্লা : ইংলন্ডের প্রধান নৌঘাঁটি পোর্টসমাউথ। রোসিথ : স্কটল্যান্ডের ফার্থ বা ফোর্থ নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি। এডিনবরা শহরের সামান্য পশ্চিমে এর অবস্থান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এখানে জাহাজ সারানোর কারখানা নির্মিত হয়।

কার্লটন টেরেস : ওই বিশেষ সময়ে লন্ডনে জার্মানির রাষ্ট্রদূতের অফিসের ঠিকানা ছিল ৯, কার্লটন হাউস টেরেস।

টোকে : হাঙ্গেরির টোকে বা টোকায় (Tokaj) শহর-সন্নিহিত এলাকায়, কার্পাথিয়ান পর্বতমালার পাদদেশে তৈরি মদ।

জেপেলিন : জার্মান মিলিটারি অফিসার ফার্দিনান্দ ফন জেপেলিন (১৮৩৮-১৯১৭) সৈনিক জীবন থেকে অবসর নিয়ে নিজেকে নিযুক্ত করেন মোটরচালিত উড়োজাহাজ নির্মাণে। ১৯০৬ সালে জার্মানির ফ্রিডরিশ্যাফেনে প্রতিষ্ঠিত হয় জেপেলিন ফাউন্ডেশন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহিনী এক-শোর কিছু বেশি সংখ্যক জেপেলিন যুদ্ধে ব্যবহার করে।

ফোর্ড গাড়ি : হেনরি ফোর্ড কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মোটরগাড়ি নির্মাণ সংস্থা ফোর্ড মোটর কোম্পানি সংগঠিত হয় ১৯০৩-এর ১৬ জুন। তাদের তৈরি ছোটো গাড়ি আমেরিকা এবং ইংলন্ডে দারুণভাবে জনপ্রিয় হয় বাজারে আসবার সঙ্গেসঙ্গে।

মার্কনি : ইতালিয় পদার্থবিদ গুগলিয়েমমা মার্কনির বেতার সংকেত প্রেরণ করবার আগে অন্য কয়েকজন বিজ্ঞানী, যেমন জগদীশচন্দ্র বসু, তা করে থাকলেও আধুনিক রেডিয়োর জনক হিসাবে মার্কনিকেই চিহ্নিত করা হয়। মার্কনি এই কীর্তির পেটেন্ট গ্রহণ করেন ১৮৯৪ সালে এবং ১৮৯৭-এ নিজের ভাইয়ের আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করেন ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ অ্যান্ড সিগন্যাল কোং লিমিটেডের। ১৯০৯ সালে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।

পোর্টল্যান্ড জেল : ইংলন্ডের ডেভনশায়ারের সমুদ্রতটের একটি উপদ্বীপ, আইল অব পোর্টল্যান্ড-এ ছিল ষোলোশো কয়েদি রাখবার মতো কারাগার এবং একট নৌঘাঁটি।

ইম্পিরিয়াল টোকে : একটি বিশেষ দ্রাক্ষাক্ষেত্রের দ্রাক্ষারস থেকে তৈরি ইম্পিরিয়াল টোকের উৎপাদন অনেকদিন হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

সোনবার্ন প্যালেস : সনড্রন প্যালেস বা শ্লস সনন, ভিয়েনা শহরে অস্ট্রিয়ার রাজপরিবারের বাসস্থান। এই প্রাসাদের লাগোয়া বাগান এবং পশুশালা, যা সম্ভবত ইউরোপের প্রাচীনতম, তা সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় ১৭৭৯ সালে।

এতগুলো বছর কাটল কীরকম বলো : ১৯১৪-র ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এই গল্পে। এর ঠিক আগের ঘটনা ১৯০৩-এ। দ্য ক্রিপিং ম্যান গল্পে বলেছেন ড. ওয়াটসন।

প্রধানমন্ত্রী : আর্ল অব অক্সফোর্ড অ্যান্ড অ্যাসকুইথ, হার্বার্ট হেনরি অ্যাসকুইথ (১৮৫২-১৯২৮) ইংলন্ডের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৯০৮ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত।

স্কিবেরিন : আয়ারল্যান্ডের কর্ক কাউন্টির একটি শহর।

বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিলাম আমিই ভুল। আইরিন অ্যাডলার বোহেমিয়ার রাজাকে ত্যাগ করে নিজেই চলে গিয়েছিলেন তার সদ্য-বিবাহিত স্বামীর সঙ্গে।

তুমি রুগি দেখতে যাবে : রুগি দেখেছিলেন কি ওয়াটসন? এই ঘটনার এক মাস পরেই প্রকাশিত হয় দ্য ভ্যালি অব ফিয়ার উপন্যাস। ওয়াটসন নিশ্চয়ই তার পাণ্ডুলিপি পরিমার্জন করছিলেন তখন। অনুমান করেছেন গবেষক এডগার স্মিথ।

বিদেয় নিতে হবে ধরাধাম থেকে : বিদেয় নিতে হয়নি হোমস বা ওয়াটসনকে। হলে ১৯২৬ বা ১৯২৭ সালে প্রকাশিত গল্পগুলো আর লেখা হত না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *