২. জার্মান পঞ্চম আর্মি

নোয়েলে, প্যারিস ১৯৪০

০৪.

১৪ জুন, ১৯৪০, শনিবার। জার্মান পঞ্চম আর্মি প্যারিসের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ম্যাগিনেট লাইন তছনছ হয়ে গেছে।

দিনটা শুরু হয়েছে অঘটনের মধ্যে দিয়ে। শহরবাসীরা ভাবতেই পারেনি, এমন একটা অভাবিত ঘটনা শেষ পর্যন্ত ঘটে যাবে। প্যারিসের রাস্তায় এখন আর্তনাদ। মানুষজন পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। বাতাসের মধ্যে গুজব ভাসছে। রেডিওর খবর, খবরের কাগজ, লোকের মুখ। জার্মান বাহিনী ফরাসি উপকূল দখল করেছে। লন্ডন শহরটা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। হিটলার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শেষ যুদ্ধ ঘোষণা করতে চলেছেন। জার্মানরা প্যারিসকে বোমাবর্ষণে ধ্বংস করে দেবে। প্রতি মুহূর্তে একটা নতুন গুজবের জন্ম হচ্ছে। মানুষজনের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

তারপর? কী ঘটবে কেউ বলতে পারছে না।

.

প্যারিসে এখন বিদেশী মানুষদের আনাগোনা। ইউনিফর্ম পরা অদ্ভুত ভাষায় তারা কথা বলছে। সর্বত্র ছেয়ে গেছে মার্সিডিজ আর লিমুজিন গাড়িতে। নাজি পতাকা উড়ছে। তারা বোধহয় এই শহরের দখলদারি নিয়েছে।

দু-সপ্তাহের মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটে গেল। জার্মানদের পদচিহ্ন সর্বত্র আঁকা হল। ফরাসি বিদ্বেষ স্ট্যাচু ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। জার্মানরা মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করছে।

পথেঘাটে শুধু সৈন্যদের আনাগোনা। খাবার সরবরাহ কমে গেছে। বড়োলোকরাই শুধু দুবেলা দুমুঠো খেতে পাচ্ছে। সাধারণ মানুষের অবস্থা চেয়ে দেখা যাচ্ছে না। জার্মান সৈন্যদের যৌনক্ষুধা মেটানোর জন্য মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বেয়নেটের ভয় দেখানো হচ্ছে। এমন কী জার্মান নেতারাও সাধারণ মেয়েদের ধর্ষণ করতে দ্বিধা বোধ করছে না।

ফরাসি জনগণের অবস্থা হয়েছে শোচনীয়। এই নরকের অন্ধকার থেকে তারা কি কখনও আলোকিত সূর্যের সকালে পা রাখতে পারবে?

জার্মানরা অনেকগুলো বড়ো বাড়ি দখল করল। সেখানে গেস্টাপোর অফিস স্থাপিত হল। অনেকগুলো মন্ত্রকের অফিস হল।

জার্মানরা রাস্তাঘাটে উৎপাত করছে। যখন-তখন বাজারে ঢুকে পড়ছে। খাবার দাবি করছে। এখন এখানে গেস্টাপোরই অস্তিত্ব।

খাবার থেকে সাবান সবকিছু পাওয়া যাচ্ছে না। ড্যাসোলিন নেই, মাংস নেই, দুগ্ধজাত জিনিসগুলো বাজার থেকে হারিয়ে গেছে। জার্মানরা সব কিছু নিয়ে নিয়েছে। যে সমস্ত দোকানে ডাক্তারি জিনিসপত্র বিক্রি হয়, সেগুলোকে জোর করে খুলে রাখা হয়েছে। সৈন্যরা এসে চটপট জিনিস তুলে নিচ্ছে। পয়সা দিচ্ছে না।

ফরাসি ব্যবসায়ীদের অবস্থা হয়েছে শোচনীয়। কে পয়সা দেবে?

জার্মানরা হেসে বলছে– ইংল্যান্ডের ব্যাঙ্ক থেকে টাকা আসবে।

 এই দুঃখ দুর্দশা চোখে দেখা যাচ্ছে না। চোরাবাজারিতে দেশ ছেয়ে গেছে।

.

নোয়েলে পেজের জীবন পাল্টে গেছে। সে এখন একটা সংস্থার মডেল হিসেবে কাজ করছে। মোটামুটি ভালোই পয়সা পাচ্ছে। নতুন নতুন প্রস্তাব আসছে তার কাছে। তাদের সাথে তার দেখা হচ্ছে, তারা জার্মান দেশের বাসিন্দা। যখন কাজ থাকে না, সে কাফেতে বসে একা একা কফি খায়। মাঝে মধ্যে কোথাও বেড়াতে যায়। হ্যাঁ, জার্মান ইউনিফর্ম পরা লোকগুলো ফরাসি সুন্দরী কিশোরীর সাথে ঘোরাফেরা করছে। সাধারণ মানুষ মুখে কলুপ এটেছে। নোয়েলের মনে হচ্ছে এছাড়া আর কোনো উপায় নেই বোধহয়। মাঝে মধ্যে আড়চোখে জার্মান সৈন্যদের দিকে সে তাকায়। আহা, ঔদ্ধত্য আর পৌরুষের প্রতিমূর্তি। আলেকজান্ডারের কথা মনে হয়। নোয়েলে তাদের ঘৃণা করতে পারে না। তবে ভালোবাসতেও পারে না। লোকগুলো এখনও নোয়েলেকে বিরক্ত করেনি।

জীবনটা আরও বেশি কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে। প্রত্যেকটা পা ফেলার আগে নোয়েলে ভালোভাবে চিন্তা করছে। নোয়েলে জানে তার আসল লক্ষ্যটা কোথায় লুকিয়ে আছে। সেই লক্ষ্যে তাকে পৌঁছোতেই হবে। সে বোধহয় প্রাইভেট ডিটেকটিভকে নিযুক্ত করতে পারবে। তার হাতেই সব কাজ দিয়ে দেওয়া হবে।

শেষ অব্দি এমন একটা জায়গাতে সে পৌঁছে গেল।

সাইনবোর্ডে নাম লেখা ছিল ক্রিস্টিয়ান বারবেড। শরীরটা খুব একটা পাকাপোক্ত নয়। মাথায় টাক পড়তে শুরু হয়েছে। দাঁত ভাঙা। চোখগুলো ছোটো। ঠোঁটের ডগায় নিকোটিনের কলঙ্ক।

উনি প্রশ্ন করলেন– আপনার জন্য কী করতে পারি?

–ইংল্যান্ডে একজন আছেন, তার সম্বন্ধে খবর চাই।

কী ধরনের খবর?

সব খবর, তার বিয়ে হয়েছে কিনা, সে কী করছে? মনে সুখ আছে, নাকি দুঃখ?

 বারবেড অবাক চোখে তাকালেন উনি কি ব্রিটিশ?

–না, আমেরিকান। আর এ এফ-এর ঈগল স্কোয়াড্রনের একজন পাইলট।

বারবেড টাকে হাত বোলালেন– আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এখন যুদ্ধ চলছে। আমি কী করে ইংল্যান্ডে গিয়ে এই খবর আনব?

অসহায়তার ছাপ। জার্মানরা আমাকে দেখলেই গুলি করবে।

–আমি যুদ্ধের কোনো খবর আনতে বলছি না। নোয়েলে পার্স বের করল, কিছু ফ্রাঙ্ক নিয়ে লোকটার দিকে এগিয়ে দিল।

–হ্যাঁ, ইংল্যান্ডে আমার কিছু পরিচিতি আছে। তবে অনেক খরচ হবে।

তিন মাস কেটে গেল, একদিন লোকটার টেলিফোন। ছুটতে ছুটতে নোয়েলে তার অফিসে গেল। প্রথমেই জানতে চাইল- লোকটা বেঁচে আছে?

বারবেড ঘাড় কাত করল।

আপনার বয়ফ্রেন্ডকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

–কোথায়?

উনি এখন ৬০৯ নম্বর স্কোয়াড্রনের সঙ্গে আছেন। তাঁকে ইস্ট অ্যাংলিয়াতে পাঠানো হয়েছে।

–আর কিছু?

-হ্যাঁ, আমি অনেক খবর এনেছি। উনি এখন হ্যারিকেনের হয়ে আকাশে উড়ছেন। এর আগে উনি ছিলেন আমেরিকান বাফেলোতে।…এখানে কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে।

নোয়েলে বলল– বলে যান।

বারবেড বলতে থাকেন যেসব মেয়ের সাথে উনি রাত কাটান তাদের তালিকা। এটা কি আপনার কাজে লাগবে?

–আমি তো বলেছিলাম সবকিছু।

 নিজের কণ্ঠস্বর শুনে নিজেই অবাক হয়ে গেল নোয়েলে। না, এখানে সবকিছুর মধ্যে কেমন একটা সন্দেহের আবরণ, ক্রিস্টিয়ান বারবেডের ওপর নির্ভর করা যায় কি? তৃতীয় শ্রেণীর গোয়েন্দা। মিথ্যে কথা বলছেন বোধহয়। নোয়েলের তাই মনে হল। না, প্রথমদিকে বারবেড ভেবেছিলেন, এই খদ্দের বোধহয় তাকে একটা বাজে ব্যাপারের সঙ্গে জড়িয়ে দেবে। তারপর? ভাবা হয়েছিল, বিবাহ বিচ্ছিন্ন এক নারী অসহায় হয়ে তার স্বামীর খোঁজ করছেন। সব কিছু ভুল। এখন বোঝা গেল, এই ক্লায়েন্ট কেন সংবাদ চাইছেন। তিনি নোয়েলের হাতে ল্যারি ডগলাসের গার্লফ্রেন্ডদের নাম তুলে দিলেন। মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। না, মনে হল, নোয়েলে যেন ধোপাবাড়ির খাতা দেখছে।

পড়া শেষ হয়ে গেল। ক্রিস্টিয়ান বারবেড নোয়েলের পরবর্তী শব্দ শুনে অবাক হয়ে গেলেন। আমি খুব খুশি হয়েছি।

–আর কোনো কিছু নতুন খবর থাকলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবেন কিন্তু?

 নোয়েলে বেরিয়ে গেল। বারবেড তখনও অফিসে বসে আছেন। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। বুঝতে পারছেন না, এই ক্লায়েন্টের আসল দরকার কী?

.

থিয়েটারে আবার লোক সমাগম শুরু হয়েছে। জার্মানরা বিদায় উৎসব পালন করছে। ফরাসি মেয়েদের আরও বেশি ভালোবাসছে। ফরাসিরা অনেক কিছু ভুলে গেছে। তারা মনেই রাখেনি, তারা হল পরাজিত জাতি।

নোয়েলে মারসেইলেতে একটা থিয়েটার দেখতে গিয়েছিল। এইসব অ্যামেচার থিয়েটার দেখতে তার মোটেই ভালো লাগে না। তবু মাঝে মধ্যে যায়, কী আর কররে? তবে এখন দু-একটা বই দেখতে তার বেশ ভালোই লাগে। অনেকের অভিনয় তাকে আকর্ষণ করে।

বিশেষ করে জাঁ পলসাত্রের একটা লেখা তাকে প্রভাবিত করেছে। এমন কিছু অভিনেতা সেখানে আছেন। সমস্ত ইওরোপ যাঁদের নামে জয়ধ্বনি করে।

একদিন সন্ধ্যেবেলা নোয়েলের হাতে কে যেন একটা চিরকুট তুলে দিল।

লেখা আছে– রাতে তোমার সঙ্গে দেখা হবে কি? ব্যাপারটা খুব জরুরি।

নোয়েলে চিরকুটটা বারবার পড়ল। ঠিক বুঝতে পারল না, কে হতে পারে? হয়তো ফিলিপ্পে সোরেল।

অভিনয় শেষ হয়ে গেছে। সোরেলের ড্রেসিংরুমের দিকে নোয়েলে এগিয়ে গেল। মেকাপ মিররের সামনে সোরেল বসে আছে। ছোট্ট প্যান্ট পরে। মেকাপ তুলছেন।

আয়নাতে নোয়েলের মুখচ্ছবি

উনি বললেন- আঃ, তুমি এত সুন্দরী?

ধন্যবাদ, মঁসিয়ে সোরেল।

তুমি কোথা থেকে আসছ?

মারসেইল থেকে।

সোরেল ভালোভাবে তাকালেন। পা থেকে মাথা অব্দি। তারপর বললেন- তুমি তো চাকরি খুঁজছ?

না।

–ঠিক করে বলল, তুমি কি আমার বই দেখবে? যদি চাকরি দরকার থাকে, তাহলে তোমাকে একটু খারাপ কাজ করতে হবে।

নোয়েলে তাকাল- আপনি কী জন্য চিন্তিত?

–তোমার জন্য।

রাতের খাবারটা এক সঙ্গেই খাওয়া হল। নোয়েলে সোরেলের অ্যাপার্টমেন্টে গেল। ভারী সুন্দর সাজানো। ফিলিপ্পে সোরেলকে এক বুদ্ধিমান প্রেমিক বলা যেতে পারে। নিজের সম্বন্ধে খুব একটা চিন্তা করতে পারেন না। নোয়েলের সৌন্দর্য দেখে মজে গেছেন। বিছানাতে তার ছলাকলা সোরেলকে অবাক করেছে।

–হ্যায় ক্রাইস্ট! তুমি তো অসাধারণ, এসব কোথা থেকে শিখলে।

 নোয়েলে কী যেন ভাবল, হ্যাঁ, এসব কি শিখতে হয়? অনুভূতির বিষয়। সে জানে, পুরুষের দেহ হল এমন একটি যন্ত্র, সাবধানে বাজাতে হয়। সব কিছু আবিষ্কার করতে হয়। ভিত্তির ওপরে বাড়ি স্থাপন করতে হয়।

জন্ম থেকেই আমি অভিজ্ঞ, হেসে নোয়েলে জবাব দিয়েছিল।

এবার নোয়েলের আঙুলডগা ওই পুরুষের ঠোঁটের ওপর খেলা করছে। মনে হচ্ছে, এবার বুঝি তার বুকে আঁকিবুকি কাটবে। তারপর নেমে আসবে পেটের দিকে।

জিনিসটা শক্ত হচ্ছে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নোয়েলে উঠল। বাথরুমে গেল। একটু বাদে এগিয়ে এল। শক্ত পুংদণ্ডটা মুখের ভেতর ভরে নিল। মুখটা এখন গরম, গরম জলে ভরতি।

লোকটা চিৎকার করছেন– হায় ঈশ্বর।

সমস্ত রাত তারা এইভাবে বুনো আদর বিনিময় করেছিল। সকালবেলা সোরেল বললেন তুমি আমার সঙ্গে যাবে কি?

.

 ফিলিপ্পে সোরেলের সাথে নোয়েলে ছমাস কাটিয়ে ছিল। সুখ অথবা অসুখ, কোনো কিছুই ছিল না তার মনের মধ্যে। সে জানে, যে করেই হোক সোরেলকে আরও আনন্দ দিতে হবে। নিজে আনন্দ পাব কিনা, সে বিষয়ে ভেবে কী লাভ? সে যেন একজন ছাত্রী। রোজ নতুন নতুন কিছু-না-কিছু শিখছে। অনেক বড় পরিকল্পনা আছে তার। এটা তো একটা ছোট্ট পদক্ষেপ।

একজনের কথা সে ভুলতে পারছে না। সে হল ল্যারি ডগলাস। তাকে হারাতেই হবে। জীবনের লড়াইতে।

দু-মাস কেটে গেছে। ক্রিস্টিয়ান বারবেডের কাছ থেকে একটা খবর।

–আপনার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট আছে।

–লোকটা বেঁচে আছে?

  বারবেড বললেন– হা, এখনও।

নোয়েলের কণ্ঠস্বরে নির্ভরতা- ঠিক আছে, অন্য কোনো খবর?

রিপোর্টটাকে দুভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমটায় ল্যারি ডগলাসের পেশার কথা বলা হয়েছে। তাকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে, সেই কাজ সে সফলতার সঙ্গে করেছে। পাঁচটা জার্মান প্লেনকে গুলি করে নামিয়েছে। সে হল প্রথম আমেরিকান, যাকে বিশেষ পদক দেওয়া হয়েছে। তাকে ক্যাপ্টেন করা হয়েছে।

এই রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশটাই নোয়েলেকে আরও বেশি আকর্ষণ করেছে। লন্ডনে সে এখন এক পরিচিত ব্যক্তিত্ব। সে নাকি এক ব্রিটিশ অ্যাডমিরালের কন্যার প্রতি অনুরক্ত। আরও কিছু মেয়ের তালিকা। ল্যারির সম্ভাব্য শয্যাসঙ্গিনী, সে নাকি মন্ত্রীসভার এক আন্ডার সেক্রেটারির স্ত্রীকেও কবজা করেছে।

বারবেড জানতে চাইলেন- আর কিছু?

–অনেক হয়েছে। নোয়েলে জবাব দিল। সে একটা এনভেলাপ বারবেডের হাতে তুলে দিল। বলল, নতুন কোনো খবর থাকলে অবশ্যই জানাবেন।

বারবেড তাকালেন সিলিং-এর দিকে। এখনও বুঝতে পারছেন না, এই ক্লায়েন্টের আসল উদ্দেশ্য কী?

.

ফিলিপ্পে সোরেল, নোয়েলের মনের ভেতর গভীর ছাপ ফেলেছেন। কেন এই ধরনের আচরণ? নোয়েলে কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না।

একরাত্রি, ডিনার হয়ে গেছে, নোয়েলে বলল- আমি একজন অভিনেত্রী হতে চাই ফিলিপ্পে।

তুমি যথেষ্ট সুন্দরী, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি তোমাকে অভিনেত্রী হতে দেব কেন? তোমার একটা মন আছে, এই মন তুমি অন্য কারও সাথে ভাগ করবে, তা আমি সইব না। তোমাকে আমি সব দেব, যা চাও তুমি।

তারা অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসেছেন। সোরেল বলতে চেয়েছিলেন, ভালোবাসার খেলা ফুরিয়ে গেল। নোয়েলে খুব উত্তেজিত। সসারেল এখন নতুন রূপে দেখা দিয়েছে।

পরের রোববার নোয়েলের জন্মদিন। ফিলিপ্পে ডিনার পার্টির আয়োজন করলেন, ম্যাকসিমে। প্রাইভেট ডাইনিং রুম। সুন্দর করে সাজানো। নোয়েলে অতিথিদের তালিকার দিকে তাকাল। একটা নাম সেখানে দিতেই হবে। মোট চল্লিশ জন আসছে। তারা অনেক উপহার নিয়ে এসেছে। ডিনার শেষ হয়ে গেল। সোরেল বেশ কিছুটা মদ খেয়েছেন। এখনও ব্রান্ডি পান করছেন। শ্যাম্পেনও খাচ্ছেন। কথাটা জড়িয়ে গেছে।

উনি বললেন– প্রিয় বন্ধুরা, বিশ্বের সব সেরা সুন্দরীদের সম্মানে পান করা যাক। আমরা ওই সুন্দরীর হাতে জন্মদিনের উপহার তুলে দিয়েছি। আমি তাকে এমন একটা উপহার দেব, যা শুনলে সে অবাক হয়ে যাবে।

সোরেল নোয়েলের দিকে তাকালেন। তারপর অতিথিদের দিকে তাকিয়ে বললেন আমরা বিয়ে করতে চলেছি।

হাততালির শব্দ। শুধুই শব্দের ঝড়। আহা, আশীবাদ, ঝরে পড়ছে বৃষ্টি হয়ে। নোয়েলে বসে আছে, হাসি হাসি মুখ করে।

একজন উঠে দাঁড়ায়নি। সে এককোণের টেবিলে বসে আছে। কেন? লম্বা চেহারা, একটা অদ্ভুত ভাব আছে। সে বোধহয় সবকিছু দেখছে কৌতুকের ভঙ্গিতে।

নোয়েলের দিকে তার চোখ পড়ল।

তিনি কে? আরমান্দ গটিয়ার, যাঁকে ফরাসি দেশের অন্যতম সেরা পরিচালক বলা হয়। তিনি ফরাসি রিপারটরি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। তার নাটকগুলো সারা পৃথিবীর মননশীল দর্শকদের মনকে জয় করেছে। গটিয়ার কেন দাঁড়ান?

ডারলিং, তুমি খুশিতো? আমি তোমাকে এখনই বিয়ে করতে চাই। বিয়ের অনুষ্ঠানটা আমার ভিলাতে হবে। নোয়েলে আরমান্দ গটিয়ারকে দেখতে পাচ্ছে। মুখে হাসি। বন্ধুরা আসছে, ফিলিপ্পের সঙ্গে কথা বলছে। এবার নোয়েলের পালা। গটিয়ার দাঁড়িয়ে আছেন।

কী বলতে চাইছেন?

–ফিলিপ্পে সোরেল একটা দামী মাছ। কী করে পাকড়াও করলে?

–আমার বুদ্ধির প্রশংসা করবেন না?

–আমি কিন্তু তোমার প্রতি একদম আকর্ষিত নই।

–আপনার কথার মানে কী?

–শুভ রাত।

-মঁসিয়ে গটিয়ার?–আজ রাতে আপনার সঙ্গে দেখা হবে? আমি একলা কথা বলতে চাই।

আরমান্দ গাটিয়ার তাকালেন, বললেন- যদি তুমি আসো?

–আপনার বাড়িতে আসব। সেটাই বোধহয় ভালো হবে।

–ঠিকানাটা হল।

–আমি জানি। রাত বারোটায়।

.

আরমান্দ গটিয়ার একটা পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে বাস করেন। নোয়েলে লবির দিকে চলে গেল। এলিভেটরে পা রাখল। পাঁচতলায় পৌঁছে গেল। এটাই গটিয়ারের অ্যাপার্টমেন্ট। কলিং বেলে হাত দিল। দরজা খুলে গেল।

গটিয়ার একটা সুন্দর ড্রেসিং গাউন পরেছেন। উনি বললেন- ভেতরে এসো।

নোয়েলে অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে ঢুকে গেল। তার চোখ বিস্ফারিত হয়েছে। এত সুন্দর সাজানো।

–আমি পোশাকটা পরে আসি। গটিয়ার বললেন- আমি টেলিফোনে ছিলাম।

 নোয়েলের চোখ– না, আর কিছু পরতে হবে না।

নোয়েলে কৌচের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে বসল। 

গটিয়ার হাসছেন–অদ্ভুত অনুভূতি। মিস পেজ, কোনো একটা ব্যাপারে আমি খুব আগ্রহী। অনেকেই তো ছিল, কিন্তু আমি কেন? আমি বেশ বুঝতে পারছি, তুমি ভালো একটা মক্কেল পাকড়াও করতে পেরেছ। আমাকে কি মনে ধরেছে? তুমি আমার কাছ থেকে কী চাইছ?

নোয়েলের জবাব- আপনি আমাকে অভিনয় শেখাবেন?

আরমন্দ গটিয়ার দাঁড়ালেন। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তুমি আমাকে নিরাশ করলে। আমি অন্য কিছু ভেবেছিলাম।

আপনি তো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেন, তাই না?

–হ্যাঁ, অভিনেতা, তারা কিন্তু অ্যামেচার নয়। তুমি কখনও অভিনয় করেছো?

না। কিন্তু আপনি আমাকে শেখাবেন। আপনার বেডরুমটা কোথায়?

গটিয়ার একটু ইতস্তত করছেন। তার জীবনে অনেক সুন্দরী মহিলা এসেছে। থিয়েটারের বিশিষ্ট অভিনেত্রীরা নতুন পার্ট নেবার আশায়। অনেক ড্রেসিংরুম। ওই মেয়েটিকে আনন্দ দিয়ে কী লাভ?

এ মেয়েটি সুন্দরী, সন্দেহ নেই। গটিয়ার বললেন- ওদিকে।

 নোয়েলে বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। গটিয়ার তখনও তাকিয়ে আছেন। না, ওরা ছিল বাজারের বেশ্যা। এই মেয়েটা হয়তো অন্যরকম। অন্যরকমভাবে শরীরকে আনন্দ দেবে।

গটিয়ার ব্রান্ডি ঢাললেন। কয়েকটা ফোন করলেন। শেষ পর্যন্ত বেডরুমে পৌঁছে গেলেন।

নোয়েলে বিছানাতে শুয়ে আছে, একেবারে ল্যাংটো হয়ে। গটিয়ার স্বীকার করলেন, ঈশ্বরের এক আশ্চর্য সৃষ্টি। তার মুখে কিশোরী সুলভ সারল্য। শরীরের কোথাও এতটুকু খুঁত নেই। দেহের রং টাটকা মধুর মতো। শুধু একটি সোনালি ত্রিভুজ, দুটি পায়ের ফাঁকে।

গটিয়ার কীভাবে শুরু করবেন, ভাবছেন, অনেক সুন্দরী রমণীর সাথে তার সঙ্গম হয়েছে। কিন্তু এমন কেউ? না, মনে করতে পারছেন না।

গটিয়ার ছোটো প্যান্ট খুললেন, মেঝের ওপর রেখে দিলেন। তারপর বললেন-আমি তোমাকে নতুন খেলা শেখাব। মনে হচ্ছে এই খেলাটার কথা তুমি শুনেছ।

নোয়েলে বলল- হ্যাঁ, আনন্দের খেলা, তাই তো?

গটিয়ার তাকালেন- হ্যাঁ, এসো, আমরা শরীর বিনিময় করি।

আরমান্দ গটিয়ার, এক চালাক প্রেমিক। জার্মানি এবং আমেরিকানদের সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছেন। তারা নাকি চট করে একটা মেয়ের ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে যায়। হ্যাটটা খুলে রাখে। ওটা হয়ে গেলেই চলে যায়।

কিন্তু আরমন্দ গটিয়ার? উনি জানেন, সঙ্গমকে আরও সুন্দর করতে গেলে অনুভূতির দরকার। অনেক যন্ত্র আছে ওনার কাছে। এভাবেই উনি উত্তেজনাটাকে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দেন। তবেই তো আসল আনন্দ আসবে।

এবং নোয়েলে। নোয়েলে জানে, যে করেই হোক এই মানুষটির মন জয় করতে হবে।

এবার আরমান্দ ওপরে নোয়েলে নীচে। নোয়েলে বলল- না, আমি চেষ্টা করব।

নোয়েলে এগিয়ে গেল, দুটো ছোটো টিউব নিয়ে এল। সে একটা টিউব হাতে ধরল। তারপর অন্য এক হাতে গটিয়ারের পুংদণ্ডে চাপ দিল।

–এট কী?

নোয়েলের মুখে হাসি দেখুন না, কী হবে।

নোয়েলে পাগলের মতো ঠোঁটে চুমু দিল। জিভে জিভ ঠেকে গেল। মনে হল দুটি পাখি বুঝি জাপটা জাপটি করছে। এবার সে জিভ নামিয়ে আনল পেটের দিকে। তার আচরণটা এখন বুনো বাঘিনীর মতো। হ্যাঁ, ওটা আবার দাঁড়াতে শুরু করেছে। সে জিভের পরশ দিল। জিনিসটা শক্ত হয়ে গেছে।

হ্যাঁ, এবার ওটা ঢুকে পড়েছে। ভালো লাগছে, এই উষ্ণতা। এই আন্দোলন উত্তেজনা। একজন অন্যজনের ওপর চড়ার চেষ্টা করছে। এবার অণ্ডকোশে নোয়েলে হাত রাখল, সেটাও গরম হয়ে গেছে। পেনিসের মধ্যে ক্রিম মাখানো হয়েছে। একটা শীতল অনুভূতি। গরম আর ঠান্ডার সহাবস্থান।

সারারাত ধরে প্রেমের খেলা। নোয়েলে নানাভাবে উত্তেজনার চেষ্টা করেছে।

সকাল হয়েছে। আরমান্দ গটিয়ার বললেন-আমার চলার শক্তি নেই। তুমি কি ব্রেকফাস্ট দিয়ে যাবে।

নোয়েলে বলল– চুপটি করে শুয়ে থাকো। আমি আসছি।

— পঁয়ত্রিশ মিনিট কেটে গেছে। নোয়েলের হাতে ব্রেকফাস্টের ট্রে। এত সুন্দর করে সাজিয়েছে।

তুমি কীভাবে?

না, ইজিচেয়ারের ওপর নোয়েলে বসে আছে। তাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। অসামান্য রূপবতী। ড্রেসিং গাউন পরেছে। বুকের খাঁজ দেখা যাচ্ছে। চুলগুলো এলোমেলো ছড়ানো।  

আরমান্দ পটিয়ার তাকিয়ে আছেন। নোয়েলেকে অভিনেত্রী করলে কেমন হয়? এক অসাধারণ সম্পদ হতে পারবে কি? না, ব্যাপারটা ভাবতে হবে।

সন্ধ্যাবেলা, আরমান্দ ভাবলেন নোয়েলের সঙ্গে রাত কাটাতে হবে। তারপর অন্য কিছু ভাবা যাবে।

হ্যাঁ, অনেক কিছু ভাবার আছে।

নোয়েলে জানতে চেয়েছিল– আরমান্দ গটিয়ার সত্যি বলো তো, তুমি কী ভাবছ?

–তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাইছ?

–না, আমার মনে এখন সে চিন্তা আসেনি। আমি চাইছি, একজন অভিনেত্রী হতে।

গটিয়ার আবার ভাবলেন।

–হ্যাঁ, তুমি সত্যি অভিনয় করবে?

নোয়েলে চারদিকে তাকাল, গটিয়ারের হাতে পড়লে তার নাম পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু কী করে গটিয়ারকে রাজী করানো যায়?

গটিয়ার বললেন দেখি, তোমাকে একটা সংলাপ দেব, তুমি সেটা ভালোভাবে পড়বে। তোমাকে মনে রাখতে হবে। আমি দেখব, তোমার মধ্যে কতটা লুকোনো ট্যালেন্ট আছে। তারপর ভাবব, তোমাকে আমি আমার দলে নেব কিনা?

তোমাকে ধন্যবাদ আরমান্দ। নোয়েলে জবাব দিল, কথার মধ্যে উত্তেজনা নেই। কিন্তু মনটা ছটফট করছে। এই প্রথম তার মনে হল, গটিয়ার এক সৎ স্বভাবের মানুষ।

নোয়েলে পোশাক পরল। আরমান্দ গটিয়ার স্টাডিতে চলে গেলেন। শেলফ থেকে বই বার করলেন। শেষ অব্দি একটা ভালো বই পেলেন তিনি। বেডরুমে ফিরে এলেন। একটা নাটকের বই নোয়েলের হাতে দিলেন।

উনি বললেন– এই অংশটা মনে রাখতে হবে। এসো, আমরা একসঙ্গে পড়ি।

–তোমাকে ধন্যবাদ আরমান্দ। আমি নিজেই পড়তে পারব।

নতুন স্বপ্ন, নতুন জীবন। এক সপ্তাহ অথবা দু-সপ্তাহ লাগবে, পুরো সংলাপ মুখস্থ করতে। তারপর? নোয়েলে না হয় গটিয়ারের কাছে ফিরে আসবে। দেখাই যাক না, কী হয়?

নোয়েলে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এল। ফিলিপ্পে সোরেলের পাশে বসল। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তার মনটা একদম ভালো নেই।

কুকুরির বাচ্চা, এ কদিন কোথায় ছিলে?

ফিলিপ্পে কী বলছে, সেদিকে মন দিতে নেই।

নোয়েলে পরিষ্কার বলল- ফিলিপ্পে আমি আর একজনের সঙ্গে এখন আছি। আমার জিনিসগুলো নিতে এসেছি।

সোরেল অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। বিশ্বাস করতে পারছেন না।

নোয়েলে বেডরুমে চলে গেল। জিনিসপত্র গোছাতে।

উনি বললেন– ঈশ্বরের দোহাই নোয়েলে, এমন করো না। আমরা একে অন্যকে ভালোবাসি। আমরা আজ বাদে কাল বিয়ে করব।

আধঘণ্টা ধরে বোঝানো হল, ভয় দেখানো হল। কিন্তু নোয়েলের প্যাকিং শেষ হয়ে গেছে। সোরেল বুঝতেই পারলেন না, কেন এই শাস্তি?

.

আরমান্দ গটিয়ার একটা নতুন নাটক শুরু করতে চলেছেন। সারাদিন রিহার্সালে কেটে যায়। গটিয়ার যখন কোনো প্রযোজনায় হাত দেন, অন্য কিছু ভাবতে পারেন না। সব সময় কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকেন। তিনি জানেন, থিয়েটারের চার দেওয়ালের মধ্যেই তার অস্তিত্ব। তবে এই দিনটা একেবারে অন্যরকম। উনি নোয়েলের কথা চিন্তা করছেন। নোয়েলের সঙ্গে কাটানো সুন্দর স্মৃতিঘন মুহূর্তগুলো।

নোয়েলে কি সত্যি এক অভিনেত্রী হতে পারবে? দেখাই যাক।

গটিয়ার এই ব্যাপারে যথেষ্ট বিশ্লেষণী। তিনি জানেন, নোয়েলের মধ্যে সহজাত রূপ আছে। গটিয়ার পৃথিবীর কয়েকজন সেরা সুন্দরীর সাথে রাতে শুয়েছেন। কেউ কেউ শরীরের ছলাকলায় ওস্তাদ। কিন্তু নোয়েলের মতো এত সুন্দর মন কারও নয়।

গটিয়ার কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হল, আবার রিহার্সাল।

নোয়েলে ফিরে এসেছে। সারারাত ধরে ভালোবাসার খেলা। আরমান্দ গটিয়ার দু-একটা ছলাকলা বোঝালেন। নোয়েলে বোঝার চেষ্টা করল।

সকালবেলা ব্রেকফাস্ট, নোয়েলে নিজের হাতে বানিয়েছে।

গটিয়ার বললেন–হ্যাঁ, তুমি সুন্দরী, তুমি ভালোবাসতে পারো আর রান্না করতে পারো। ব্রেভো, একজন বুদ্ধিমান মানুষ এমন জীবনসঙ্গিনীকেই পছন্দ করে। তুমি খেতে খেতে ভালোবাসতে পারবে? কী বিষয়? হ্যাঁ, আমি বলে দিচ্ছি।

আরও কিছু বলার ছিল, নতুন নাটক। নোয়েলেকে বোঝাতে হবে।

গটিয়ার জানতে চাইলেন– তুমি কি ফিলিপ্পের কাছ থেকে চলে এসেছ?

নোয়েলে জবাব দিল- হ্যাঁ, আমি আর সেখানে ফিরব না।

গটিয়ার নোয়েলের দিকে তাকালেন। বললেন- ঠিক আছে, দেখছি কী করা যায়।

সমস্ত রাত তারা একসঙ্গে কাটিয়ে ছিল। যখন তারা আদর করেনি, গল্প করছিল। ওফ, গটিয়ার বলছিলেন, নোয়েলে তন্ময় হয়ে শুনছিল। গটিয়ারের অতীত জীবন সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। নেহাত এই পুরুষ মানুষটাকে খুশি রাখতে হয়, তাই।

পরেরদিন রাত, ডিনার শেষ হয়ে গেছে। এবার ঘুমের জগতে পা দিতে হবে। গটিয়ার বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।

নোয়েলে বলল না, এখন ভালো লাগছে না।

–তুমি কি বলেছিলে? আমার কাছে নাটক শিখবে, তাইতো?

–হ্যাঁ, নোয়েলে বলল।

 –আমি তৈরি আছি।

 –এখন। ঠিক আছে তা হলে শুরু হোক।

 গটিয়ার জানতে চাইলেন- সংলাপ মুখস্থ হয়েছে?

নোয়েলে বলল- হ্যাঁ, আমি সবটা মুখস্থ করছি।

গটিয়ারের আচরণে অবিশ্বাস। সম্ভব নয়। তিনদিনে একটা পুরো পার্ট মুখস্থ করা কি সম্ভব?

নোয়েলে বলল- তুমি কি আমার কাছ থেকে শুনতে চাও?

আরমান্দ গটিয়ারের হাতে এখন আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বললেন- ঠিক আছে শোনাও দেখি।

নোয়েলে ঘরের মধ্যে চলে এল।

তিনি যেন এক কল্পিত নাটকে অভিনয় করছেন।

নোয়েলে নাটকটা দেখাতে শুরু করল। গটিয়ার বুঝতে পারলেন, এর মধ্যে একটা সহজাত প্রতিভা আছে। অনভিজ্ঞ, তাই হয়তো ঠিক মতো ফুটিয়ে তুলতে পারছে না, চেষ্টা করছে, এই চেষ্টাটা আন্তরিক।

 একক অভিনয়টা শেষ হয়ে গেল। গটিয়ার বললেন– একদিন তুমি এক নামজাদা অভিনেত্রী হবে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। আমি তোমাকে ফেবারের কাছে পাঠাব। সে হল ফরাসি দেশের এক বিখ্যাত নাট্যপ্রশিক্ষক। তার সঙ্গে কাজ করলে তুমি

-না।

 গটিয়ার অবাক হয়ে নোয়েলের দিকে তাকালেন।

না কেন? গটিয়ার জানতে চাইলেন, ফেবার বড়ো বড়ো অভিনেতার সন্ধান করে। আমি বললে, উনি রাজী হবেন।

না, আমি তোমার সঙ্গে কাজ করব।

 গটিয়ারের মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি। আমি তো কাউকে শেখাই না। আমি নাট্যপ্রশিক্ষক নই। আমি পেশাদার মানুষদের নিয়ে নাটক প্রযোজনা করি। যখন তুমি এমন পেশাদার অভিনেত্রী হবে, আমি তোমায় নির্দেশনা দেব।

রাগের অনুভূতি। গটিয়ার বললেন- তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছ?

-হ্যাঁ, আরমান্দ, আমি বুঝতে পারছি।

–তা হলে?

একটু বাদে উনি নোয়েলেকে জড়িয়ে ধরলেন–আহা, উষ্ণ চুমুর বর্ষণ। গটিয়ার জানেন, এখন আর কোনো ওজোর আপত্তি থাকবে না।

না, এই মেয়েটি অন্য আর পাঁচজন নারীর মতো নয়। তাকে অধিকার করতে হবে।

ভালোবাসার খেলা আবার শুরু হল। এই রাত তোমার আমার গটিয়ার ভাবলেন, না, ঝগড়া করে এই সুন্দর প্রহরকে হত্যা করে কী লাভ?

মাঝরাতে উনি বলেছিলেন- তুমি একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী হবে, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। আমি তোমার জন্য গর্ব অনুভব করব।

–তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, আরমান্দ।

নোয়েলে ব্রেকফাস্টের টেবিল সাজাল। গটিয়ার থিয়েটারে বেরিয়ে গেলেন। তিনি নোয়েলেকে ফোন করলেন, দুপুরবেলা, কোনো উত্তর নেই। গটিয়ার বাড়িতে ফিরলেন। নোয়েলে কোথায়? সে কি বাতাসে হারিয়ে গেল? গটিয়ার অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন। নোয়েলে এল না। সারারাত গটিয়ারের চোখে ঘুম ছিল না। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছিল, নোয়েলের বোধহয় কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। তিনি নোয়েলেকে ফোন করলেন, অ্যাপার্টমেন্টে। কোনো উত্তর নেই। টেলিগ্রাম পাঠালেন। ফেরত চলে এল। না, রিহার্সাল থেকে ফেরার পথে মাঝে মধ্যে ওই অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়ান, কলিংবেলে হাত রাখেন। শব্দ শুনে কেউ বেরিয়ে আসে না।

আর একটা সপ্তাহ কেটে গেল। গটিয়ার পাগলের মতো হয়ে গেছেন। রিহার্সালে মন বসছে না। অভিনেতারা রেগে যাচ্ছেন। কেন এইভাবে ডেকে এনে অপমান? তারা সকলেই দল থেকে চলে গেলেন। অন্ধকার স্টেজে গটিয়ার একা বসে আছেন। কী ঘটেছে, তা ভাববার চেষ্টা করছেন।

নোয়েলে একজন সাধারণ রমণী। একটা সস্তাদরের উচ্চাকাঙ্খী নারী। তাকে নিয়ে এত চিন্তা করে কী লাভ? এই প্রতিভা নিয়ে সে কিনা বিখ্যাত অভিনেত্রী হবে। না, জীবনটা একেবারে আমার ব্যর্থ হয়ে গেল।

সেই রাতে প্যারিসের অনেক মানুষ ছোটো ছোটো বারে গিয়ে নাচানাচি করছে।

নোয়েলে এর মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেছে? ফিলিপ্পে সোরেল, সে বোধহয় নোয়েলের শুভাকাঙ্খী নয়। এছাড়া নোয়েল যত জনের সঙ্গে মিশেছে, সকলের সাথেই ভালো সম্পর্ক।

নোয়েলে চলে যাবার পর এক সপ্তাহ কেটে গেল। আরমান্দ গটিয়ার সকাল চারটের সময় বাড়ি ফিরেছেন। প্রচুর মদ গিলেছেন। হাঁটতে পারছেন না। কোনোরকমে দরজাটা খুললেন। লিভিংরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। লাইটগুলো জ্বলছে। নোয়েলেকে ইজিচেয়ারে পাওয়া গেল। কুঁকড়ে শুয়ে আছে। পুরুষের পোশাক পরে।

-হ্যালো আরমান্দ?

 গটিয়ার অবাক হয়ে তাকালেন। রক্ত মুখে এসে জমেছে। হ্যাঁ, একটা নিরাপত্তা, প্রশান্তি এবং আনন্দ।

তিনি বললেন– কাল থেকে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করব।

.

ক্যাথারিন, ওয়াশিংটন, ১৯৪০

০৫.

ওয়াশিংটন ডিসি, ক্যাথারিন আলেকজান্ডার এমন সুন্দর শহর কখনও দেখেনি। সে ভেবেছিল, চিকাগো হল আমেরিকার প্রাণকেন্দ্র। ওয়াশিংটন তার ছায়ামাত্র। এখানে এসে সে আসল আমেরিকাকে দেখতে পেল। ক্ষমতার কেন্দ্র। প্রথমেই ক্যাথারিন এই শহরের সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। ইউনিফর্ম পরা মানুষরা দৃপ্ত ভঙ্গিতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে। স্থলবাহিনী, জলবাহিনী, বিমানবাহিনী, আরও কত কী। এই প্রথম ক্যাথারিন বুঝতে পারল, যুদ্ধ তো একটা ভয়ঙ্কর সত্য ঘটনা। নেহাত অন্য কোথাও থাকলে যুদ্ধের আগুন আঁচের পরশ পাওয়া যায় না, তাই রক্ষে।

ওয়াশিংটনের সর্বত্র যুদ্ধের বাতাবরণ, এটা হল এমন একটা মহানগর, যেখানে সত্যি সত্যি যুদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু কোথায়? এবং ক্যাথারিন আলেকজান্ডার। এই পরিবেশের একজন হয়ে গেল।

সে সুসি রবার্টসের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। একটা সুন্দর অ্যাপার্টমেন্টে সুসির বসবাস।

তাড়াতাড়ি করো, সবথেকে ভালো পোশাকটা পরে নাও। আজ রাতে তোমাকে একটা ডিনারে যেতে হবে।

সুসির এই কথা শুনে ক্যাথারিন অবাক– কোথায়?

ক্যাথি, এটা ওয়াশিংটন, এখানে মেয়েদের অনেক বেশি স্বাধীনতা মনে রেখো। এই শহরটা নিঃসঙ্গ পুরুষে পরিপূর্ণ। ব্যাপারটা দুঃখজনক, তাই নয় কি?

.

সে রাতে তারা উইলার্ড হোটেলে রাতের খাবার খেয়েছিল। সুসি ইনডিয়ানার এক কংগ্রেস প্রতিনিধির সাথে ভালোবাসার খেলা খেলল। ক্যাথারিনের ভাগ্যে এসেছিল, অরিগনের এক রাজনীতিবিদ। তারা স্ত্রীদের ছাড়াই এই শহরে এসেছেন। ডিনারের পর নাচের আসর শুরু হল। ওয়াশিংটন কাউন্টি ক্লাবে। ক্যাথারিনের মনে হয়েছিল ওই রাজনীতিবিদ বোধহয় চাকরির সন্ধান দিতে পারবেন। না, এটা সফল হল না। সে তার নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্টে চলে গেল। ধন্যবাদ দিতে ভুলে গেল।

ওই কংগ্রেস প্রতিনিধিকে সে তার বাড়িতে নিয়ে এসেছে। এটা সুসির গল্প। ক্যাথারিন বিছানাতে শুতে গেছে। একটু বাদে সুসির বেডরুম থেকে আওয়াজ ভেসে এল। মনে হল, ধরফড় করে বিছানাটা বুঝি ভেঙে যাবে।

না, শোওয়া যাচ্ছে না, নানাভাবে ঘুম আনবার চেষ্টা করল ক্যাথারিন। সে বুঝতে পারল, সুসি এখন বিছানাতে শুয়ে আছে। উন্মত্তের মতো আদর খাচ্ছে। কামনা ঘন ভালোবাসা।

সকাল হল। ক্যাথারিন উঠেছে। ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে হবে। সুসির ঘুম ভেঙে গেছে। সে বোধহয় দৈনন্দিন কাজ শুরু করবে।

ক্যাথারিন সুসির শরীরে কোনো কিছুর চিহ্ন দেখতে চেয়েছিল। না, কোনো চিহ্ন নেই, সুখ অথবা বিভ্রান্তির। একটু অবাক হল সে। সুসিকে কেমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। তার চামড়া আরও চকচকে হয়ে গেছে।

হায় ঈশ্বর, ক্যাথারিন ভাবল, এ বোধহয় ডোরিয়ান গ্রে। একদিন সে আরও মহান হয়ে উঠবে। আমি বেশ বুঝতে পারছি, একশো দশ বছর আয়ু হবে তার।

কয়েকদিন কেটে গেছে। ব্রেকফাস্টের আসরে সুসি বলল– বেশ কয়েকটা চাকরির খবর আমার কাছে আছে। আশা করি, চাকরিগুলো তুই করতে পারবি। গত রাতে একটা মেয়ে মদ খেয়ে বলেছিল, চাকরি ছেড়ে সে টেকসাসে চলে যাচ্ছে। সে কোথায় চাকরি করত, সে খবরটাও আমাকে কানে কানে বলে গেছে। দেখা যাক, তোর জন্য কতটা কী করা যায়।

–এই মেয়েটি কোথায় কাজ করে?

–কোন্ মেয়েটির কথা বলছিস?

ক্যাথারিন শান্তভাবে বলল– এই মেয়েটি?

–ও বিল ফ্রেসারের অধীনে কাজ করে। বিল ফ্রেসার স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যুক্ত। গতমাসে নিউজ উইকে বিল ফ্রেসার সম্পর্কে একটা প্রচ্ছদ কাহিনী বেরিয়েছিল।

ওনার হাতে অনেকগুলো চাকরির চাবিকাঠি আছে। তুই এখনই যোগাযোগ করার চেষ্টা কর।

ক্যাথারিন শান্তভাবে বলেছিল- উইলিয়াম ফ্রেসার, এই তো আমি এসে গেছি।

কুড়ি মিনিট কেটে গেছে। ক্যাথারিনকে একটা গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় দেখা গেল। সে এখন স্টেট ডিপার্টমেন্টে যাবে। সে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে নামল। ফ্রেসারের অফিস কোথায়, তা জানতে পারল। এলিভেটরে পা রাখল। এখন তাকে ওপরতলায় যেতে হবে।

মাস কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা। এই ধরনের চাকরিটা বোধহয় ক্যাথারিন চাইছে।

হ্যান্ড মিররে মুখখানা দেখে নিল। নটা তিরিশ এখনও বাজেনি। এবার আস্তে আস্তে ঢুকতে হবে। ক্যাথারিন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

বাইরে অফিসে অনেক মেয়ের ছড়াছড়ি। কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ বসে আছে, কেউবা দেওয়ালে ঠেস দিয়েছে।

রিসেপশনিস্ট বলল- এখন মিঃ ফ্রেসার খুবই ব্যস্ত। আমি জানি না, দেখা করার সময় হবে কিনা।

একজন মেয়ে বলল- উনি কি ইন্টারভিউ নিচ্ছেন?

–হাঁ, রিসেপশনিস্টের চোখে অসহায়তা। আর পারা যাচ্ছে না।

আরও তিনজন মেয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছে। ক্যাথারিনকে তারা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

একজন বলল– চাকরিটা হয়ে গেছে?

–আহা, উনি একটা হারেম তৈরি করলেই তো পারেন, একটা মেয়ে খিকখিক করে হাসছে। তাহলে আমরা সবাই থাকতে পারি।

ভেতরের অফিসের দরজা খুলে গেল। একজন বেরিয়ে এলেন। ছ-ফুটের মতো উচ্চতা। চেহারাটা খুব একটা সুদৃঢ় নয়। তার কোঁচকানো সোনালি চুল। নীল উজ্জ্বল চোখ। তিনি বললেন- এখানে কী হচ্ছে শ্যালি?

কণ্ঠস্বরে কর্তৃত্ব এবং গাম্ভীর্য।

–মিঃ ফ্রেসার, ওই ভেকেন্সি সম্বন্ধে শুনে চাকরির জন্য এসেছে।

–ওঃ, এক ঘন্টা আগেও আমি এটা জানতাম না।

তিনি চারদিকে তাকালেন। মনে হচ্ছে, জঙ্গলে বুঝি বাজনা বাজছে।

তার চোখ ক্যাথারিনের দিকে পড়ল। হ্যাঁ, এই মেয়েটিকেই আমি আমার সেক্রেটারি করতে পারি। এবার রিসেপশনিস্টের দিকে লাইফ পত্রিকার একটা কপি দাওতো। চার সপ্তাহ আগে যেটা বেরিয়েছে। তার প্রচ্ছদে স্ট্যালিনের ছবি ছিল।

রিসেপশনিস্ট বলল– আমি এটা আনিয়ে দেব মিঃ ফ্রেসার?

–না, এটা এখনই চাই।

 –আমি কি পত্রিকা অফিসে ফোন করব?

 ফ্রেসার তাকালেন– শ্যালি, ফোনে সেনেটর বরো আছেন। একটা নিবন্ধ পড়ে শোনাতে হবে। দু-মিনিট সময় দেব। কপিটা আমার চাই।

তিনি ভেতরের ঘরে গেলেন। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

মেয়েরা পরস্পরের চোখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। ক্যাথারিন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল। কিছু একটা চিন্তা করল। চট করে সে অফিসের বাইরে চলে এল।

একটা মেয়ে বলল- হায় ভগবান, একজন কমে গেল, তাই না?

রিসেপশনিস্ট টেলিফোনটা তুললেন। টাইমলাইফ ব্যুরোতে ফোন করতে হবে।

ঘরটা এখন শান্ত হয়ে গেছে। ফোন করা হল। রিসেপশনিস্ট রিসিভার নামিয়ে রাখল। আবার ফোন করল, হ্যালো মিঃ উইলিয়াম ফ্রেসারের অফিস থেকে বলছি। স্টেট ডিপার্টমেন্ট, এক্ষুনি লাইফ পত্রিকার একটি পুরোনো সংখ্যা চাই। ওখানে কি সংখ্যাগুলো রাখা হয়? আমি কার সঙ্গে কথা বলব?

একটা মেয়ে বলল– না, হনি, মনে হচ্ছে চাকরিটা আমাদের হবে না।

–কেন বলছিস বলতো? আমাকে যেতেই হবে। ইন্টারকমের শব্দ হচ্ছে।

ফ্রেসারের কণ্ঠস্বর- দু মিনিট হয়ে গেছে। পত্রিকাটা কোথায়?

রিসেপশনিস্টের গলায় অসহায়তা– আমি এক্ষুনি কথা বললাম। কিন্তু সংখ্যাটা পাওয়া যাবে না।

দরজাটা খুলে গেল। ক্যাথারিন ঢুকে পড়েছে। তার হাতে লাইফ পত্রিকার একটা কপি। কভারে স্ট্যালিনের ছবি। সে ডেস্কের কাছে চলে এল। রিসেপশনিস্টের হাতে পত্রিকাটা তুলে দিল।

রিসেপশনিস্টের চোখে অবিশ্বাস। সে ক্যাথারিনের দিকে তাকাল। মিষ্টি হেসে ভেতরে চলে গেল।

পাঁচ মিনিট কেটে গেছে, ফ্রেসার বেরিয়ে এসেছেন। রিসেপশনিস্ট বলল- স্যার, এই মেয়েটির জন্যই পত্রিকাটি পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

ফ্রেসার বললেন- তুমি কি একবার ভেতরে আসবে?

-ইয়েস স্যার, আমি এক্ষুনি আসছি।

ফ্রেসার দরজা বন্ধ করে দিলেন। ওয়াশিংটনের অফিস যেমন হয়ে থাকে, উনি কিন্তু তেমনি সুন্দর সাজিয়েছেন। ফার্নিচারের ভেতর ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার ছাপ আছে।

বসো, মিস…।

 –আলেকজান্ডার, ক্যাথারিন আলেকজান্ডার।

শ্যালি আমাকে জানিয়েছে, তুমি লাইফ পত্রিকাটা নিয়ে এসেছ। তোমার পার্সের ভেতর কি তিন সপ্তাহ আগের কাগজটা ছিল?

-নো, স্যার।

 –তাহলে এত চট করে কোথায় পেলে?

আমি একটা সেলুনে গিয়েছিলাম। সেলুনের দোকানে পুরোনো কাগজ থাকে।

ফ্রেসারের মুখে হাসি হ্যাঁ, তুমি কাজটা করতে পারবে? সেক্রেটারির দায়িত্ব নিতে পারবে?

ক্যাথারিন বলল- হ্যাঁ, আপনার সহকারী হতে পারলে আমার ভালোই লাগবে।

–আজ থেকেই কাজটা শুরু করলে কেমন হয়? আজ তুমি সেক্রেটারি হও, কাল আমার অ্যাসিট্যান্ট হবে, কেমন?

ক্যাথারিন তাকাল তার মানে আমি একটা চাকরি পাচ্ছি।

-হ্যাঁ, কিন্তু ট্রায়ালে। উনি ইন্টারকমে কথা বললেন। বললেন শ্যালি, ওই সব মেয়েদের ধন্যবাদ দাও, বলো চাকরিটা হয়ে গেছে।

-ঠিক আছে, মিঃ ফ্রেসার।

উনি বোম টিপলেন- প্রত্যেক সপ্তাহে তিরিশ ডলার। আশা করি তোমার চলে যাবে।

–আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আগামীকাল সকাল নটায় এসো। শ্যালির কাছে যাও। ও তোমাকে একটা ফর্ম দেবে, কেমন?

.

ক্যাথারিন অফিস থেকে চলে গেল। ওয়াশিংটন পোস্টে যেতে হবে। ডেস্কে যে পুলিশ দাঁড়িয়েছিল, সে ক্যাথারিনকে থামিয়ে দিল।

ক্যাথারিন বলল–আমি উইলিয়াম ফ্রেসারের পার্সোনাল সেক্রেটারির ডিপার্টমেন্ট থেকে আসছি। আপনার কাছ থেকে কিছু গোপন খবর জানতে চাইছি।

-কী ধরনের খবর?

–উইলিয়াম ফ্রেসার সম্পর্কে।

 ভদ্রলোক এক মুহূর্ত দেখল, তারপর বলল– কেন বলুন তো?

-আমি ওনার ওপর একটা প্রতিবেদন লিখব।

পাঁচ মিনিট কেটে গেছে। উইলিয়াম ফ্রেসারের ফাইল এখন ক্যাথারিনের হাতে।

এক ঘণ্টা পর ক্যাথারিন উইলিয়াম ফ্রেসার সম্পর্কে অনেক কথাই জেনে ফেলল। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স, গ্রাজুয়েট, বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি করতেন। তারপর সরকারের হয়ে কাজ করছেন, লাদিয়া ক্যাম্পিয়ান তার স্ত্রী, সমাজ সেবিকা, চার বছর আগে ডিভোর্স হয়ে গেছে, সন্তান হয়নি। ফ্রেসার অনেক অর্থের মালিক। জর্জটাউনে বাড়ি আছে। বারহারবারে সামার প্লেস। টেনিস খেলতে ভালোবাসেন। ভালোবাসেন নৌকো চালাতে এবং পোলো খেলায় অংশ নিতে। তাকে আমেরিকার অন্যতম ব্যাচিলার বলা হয়।

ক্যাথারিন বাড়িতে এল। সুসির কানে তার খবরটা জানিয়ে দিল। আহা, এই শুভ মুহূর্তটাকে উদযাপন করতে হবে।

দুজন অ্যানাপোলিশ ক্যারেট শহরে এসেছে। তাদের সাথে বন্ধুত্ব করলে কেমন হয়?

ক্যাথারিনের ভাগ্যে একটা ছটফটে স্বভাবের ছেলে পড়েছে। সেই সন্ধ্যেটা ক্যাথারিন তারই সঙ্গে কাটাল। সব সময় উইলিয়াম ফ্রেসারের সাথে সেই ছেলেটির তুলনা করল। ভাবল, আমি কি আমার নতুন বসের প্রেমে পড়ে গেলাম নাকি?

ইটালিয়ান রেস্টুরেন্টে ডিনারের আসর। ওয়াশিংটনের উপকণ্ঠে। তারপর হৈ-হুল্লোড়।

সুসি ইতিমধ্যেই ছেলেটার সাথে জমিয়ে বসেছে। হাতে হাত রেখে ফেলছে। ক্যাথারিনের ভালো লাগছে না। এই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই বোধহয় ভালো হয়।

পরের দিন সকাল সাড়ে আটটা। ক্যাথারিন নতুন অফিসে চলে এসেছে। এখনও দরজা . খোলা হয়নি। কিন্তু রিসেপশন কাউন্টারে আলো জ্বলছে। ভেতরের ঘর থেকে এক পুরুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

ক্যাথারিন ভেতরে ঢুকে পড়ল।

উইলিয়াম ফ্রেসার ডেস্কে বসে আছেন। মেশিনে কিছু বলছেন। তিনি ক্যাথারিনকে দেখে মেশিন বন্ধ করে বললেন- এত তাড়াতাড়ি?

–আমি চারপাশটা দেখতে চাইছি। তারপর কাজ শুরু করব।

বসো। তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে। আমি চাই না, কেউ আমার ওপর গোয়েন্দাগিরি করুক।

-আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

ওয়াশিংটন একটা ছোটো শহর। এটাকে একটা গ্রাম বলতে পারো। পোস্ট পত্রিকার প্রকাশক দু-মিনিট আগে আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি জানালেন, তুমি নাকি আমার ওপর রিসার্চ করছ?

এই অভিযোগের জবাব ক্যাথারিন কী দেবে বুঝতে পারছে না।

–তুমি কি কোনো গোপন খবর পেয়েছ?

-না, স্যার। সেভাবে ব্যাপারটা নেবেন না। আমি আপনার সম্পর্কে জানতে চাইছি, আমাকে দেখতে হবে, কী ধরনের মানুষের সহকারী হিসেবে আমি কাজ করব।

ক্যাথারিনের কণ্ঠে জেগেছে উত্তেজনা আমি বিশ্বাস করি, একজন সেক্রেটারির সঙ্গে তার বসের সুসম্পর্ক থাকা দরকার।

ফ্রেসার বসে আছেন, চোখে মুখে বৈরিতার ছাপ।

 ক্যাথারিন ফ্রেসারের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে জল এসে গেছে।

–মিঃ ফ্রেসার, আপনাকে আর চিন্তা করতে হবে না। আমি এখনই এখান থেকে চলে যাচ্ছি। চাকরি আমার দরকার নেই।

বসো, এরকম আচরণ করছ কেন? আচ্ছা ঠিক আছে, যা বলেছি, তার জন্য দুঃখ পেয়েছ কি?

ভদ্রলোক একটা পাইপ বের করলেন, আগুন ধরালেন।

ক্যাথারিন কিছু বলার চেষ্টা করছে। ভীষণ অপমান হয়েছে তার। সে বলল- না, এখানে কাজ করা আমার উচিত হবে না।

-কেন? ক্যাথারিন, তুমি এখনই ছেড়ে যেও না। ভেবে দেখো, নতুন একজন কাউকে নিতে গেলে কত সমস্যায় পড়তে হয়।

ক্যাথারিন তাকাল, নীল চোখের তারায় কৌতুক চিহ্ন। ফ্রেসার হাসছেন। ক্যাথারিনের চোখে হাসি, ক্যাথারিন চেয়ারে বসে পড়ল।

-কেউ তোমায় কিছু বলেছে? হ্যাঁ, আমাকে আমেরিকার সবথেকে এলিজেব ব্যাচিলার বলা হয়। তাই তো?

ক্যাথারিন কোনো কথা বলতে পারছে না। সে কিছু বলার চেষ্টা করল।

ফ্রেসার বললেন- বোকা অবিবাহিতা মেয়েরা আমাকে শিকার ভাবে, আমি কিন্তু এমন স্বভাবের নই। ফ্রেসার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর জানতে চাইলেন, তোমার ব্যক্তিগত জীবন? বয়ফ্রেন্ড?

–না, তেমন কেউ নেই।

তুমি কোথায় থাকো?

–আমি আমার এক বান্ধবীর সাথে অ্যাপার্টমেন্টে আছি। সে কলেজে আমার ক্লাসমেট ছিল।

নর্থ ওয়েস্টার্ন?

ক্যাথারিন অবাক হয়ে গেছে, তার মানে? আমার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক খবর চলে এসেছে।

–আমি অন্য সূত্র থেকে খবর সংগ্রহ করি। তুমি কি জানো আমি এ ব্যাপারে আপোস করি না।

এবার বোধহয় কাজ শুরু হবে। ফ্রেসার কিছু উপদেশ দেবেন।

তিনি বললেন আজ রাতে যখন বাড়ি ফিরবে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কিছু বলবে, কী করে আরও-আরও উপযুক্ত হতে হবে।

ভদ্রলোক ঝুঁকলেন।

ক্যাথারিন বলল- হ্যাঁ, মিঃ ফ্রেসার আমি তাই করব।

মিটিংটা অনেকক্ষণ ধরে চলেছিল। ক্যাথারিন ভাবতেই পারেনি। কাজটা খুব একটা ভাল লাগছে না। তবুও এটা করতে হবে। ক্যাথারিন ভাবল, আমার সম্পর্কে এত খবর নেওয়ার কী দরকার ছিল? মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আমাকে এক সেরা সেক্রেটারি হতে হবে।

তা কি সম্ভব? ধীরে ধীরে কাজটা ক্যাথারিনের ভালো লাগছে। ঘন ঘন টেলিফোনের আর্তনাদ। যে সব নামগুলো শুনতে পাচ্ছে সে উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। প্রথম সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহামান্য ভাইস প্রেসিডেন্ট দুবার ফোন করেছিলেন। অন্তত ছজন সেনেটর। সেক্রেটারি অফ স্টেট। এক বিখ্যাত অভিনেত্রী, যিনি গত সিনেমাতে ফাটাফাটি অভিনয় করেছেন। শেষ অব্দি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছ থেকে একটা ফোন এল। ক্যাথারিন এত ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, সে রিসিভারটা হাত থেকে ফেলে দেয়। এছাড়া আরও গণ্যমান্য মানুষ আসেন। কোনো কোনো সময় ক্যাথারিনকে ফ্রেসারের কাউন্টি ক্লাবে যেতে হয়। নামকরা রেস্টুরেন্টেও যেতে হয়। কয়েকটা সপ্তাহ কেটে গেল। এবার ফ্রেসার আরও সহজ হয়ে উঠেছেন। ক্যাথারিনের ওপর তিনি নির্ভর করছেন। ক্যাথারিন ফ্রেসারের মনটা বুঝতে পারে। ক্যাথারিন জানে, কোন ব্যাপারটা ফ্রেসার ভালোবাসে। কোনটা তিনি অপছন্দ করেন।

ফ্রেসারের সাথে সম্পর্কটা আরও অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে। ফ্রেসার মাঝে মধ্যে ব্যক্তিগত কথা ক্যাথারিনকে বলেন। ক্যাথারিন অবাক হয়ে শুনতে থাকে। উইলিয়াম ফ্রেসার, আপাত দৃষ্টিতে এক অত্যন্ত দাম্ভিক এবং রুচিবান পুরুষ, অন্তরে ভালোবাসার ভিখারি।

সুসি ক্যাথারিনের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। সুসি কিন্তু এখনও তার পুরোনো খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক বয়ফ্রেন্ড বাতিল করছে। ক্যাথারিনের এ ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগছে না। ক্যাথারিন ভাবছে, কী লাভ? এইভাবে জীবনটাকে নষ্ট করে।

একদিন রাতে ক্যাথারিন অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসেছে।

সুসি বলল, তোর জন্য একজন এসেছিল, সুসির মুখে হাসি।

ক্যাথারিন অবাক, এখানে কাউকে তো সে চেনে না। দু-একজনকে চেনে বটে। কিন্তু তারা কেউ অ্যাপার্টমেন্টের ঠিকানা জানে না।

সে অবাক হবার ভান করে বলল- কে?

 –এফ বি আই থেকে একজন গোয়েন্দা। তোর ওপর অনুসন্ধান করছে।

ক্যাথারিন ভাবল, আমার ওপর অনুসন্ধান কেন?

তার মনের ভাবটা বুঝতে পেরে সুসি বলল, তুই তো এখন সরকার পক্ষের হয়ে কাজ করছিস। সেইজন্য, হারে, তোর বসের খবর কী?

-হ্যাঁ, বস ভালোই আছেন। সম্পর্কটা অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

 সপ্তাহ কেটে যাচ্ছে। ক্যাথারিন অন্যান্য সেক্রেটারিদের সাথে পরিচিত হল। কয়েকটা মেয়ে তাদের বসেদের সাথে জমিয়ে নিয়েছে। বস বিবাহিত কিনা, এ ব্যাপারটা মোটেই দেখছে না। ক্যাথারিন যে উইলিয়াম ফ্রেসারের অধীনে কাজ করছে, ব্যাপারটা তাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ আগেই বলা হয়েছে, উইলিয়াম হলেন মার্কিন দেশের সব থেকে গ্রহণযোগ্য অবিবাহিত পুরুষ।

একজন জিজ্ঞাসা করেছিল লাঞ্চের আসরে, সোনালি ছেলেটি কী ধরনের কথা বলেন? তোমার সঙ্গে কতটা অন্তরঙ্গ হয়েছেন?

ক্যাথারিন হাসতে হাসতে বলল–না, আমি অতটা ভেতরে ঢুকতে পারিনি। সকাল নটায় অফিসে আসি, সারাদিন কেটে যায়, আমরা লাঞ্চের সময় একসঙ্গে লাঞ্চ করি।

সত্যি বলছ? আরও কিছু বলো।

ক্যাথারিন মিথ্যে কথা বলল না, ওনার তেমন কোনো আকর্ষণ নেই।

ক্যাথারিন বুঝতে পারছে, উইলিয়াম ফ্রেসারের প্রতি তার তীব্র টান ক্রমশ গম্ভীর হচ্ছে। সত্যিটা সে কাকে বলবে? ভালো লাগে উইলিয়াম ফ্রেসারের সান্নিধ্য। তিনি যে কোন ব্যাপারে একশো শতাংশ নির্ভুল বিষয়ে অবতারণা করতে চান।

কাজের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। একদিন ফ্রেসার বললেন, একসঙ্গে ডিনার খেতে হবে। অনেক রাত অব্দি কাজ আছে। ফ্রেসারের ড্রাইভার লিমুজিন নিয়ে বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছিল। কয়েকজন সেক্রেটারি এল। ফ্রেসারের দিকে তাকিয়ে থাকল। ক্যাথারিন ব্যাকসিটে বসে আছে। লিমুজিন রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে।

ক্যাথারিন বলল- আমি কি আপনার গৌরব বিঘ্নিত করছি?

ফ্রেসার হাসলেন– তোমায় কিছু উপদেশ দেব। তুমি যদি কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোল, সকলের চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে তাই করবে। লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু করবে না। তুমি বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে যাবে, থিয়েটারে যাবে।

ক্যাথারিন জানতে চেয়েছিল– কী ধরনের থিয়েটার? শেক্সপীয়ারের নাটক?

 ফ্রেসার বললেন- হ্যাঁ, লোকে যাতে তোমায় সন্দেহ করতে না পারে।

এ ব্যাপারে আপনার কোনো তথ্য আছে কি?

–তুমি এডগার অ্যালান পো-র নাম শুনেছ কি? ভদ্রলোক অসাধারণ রহস্য গল্প লিখতেন। তার গল্প পড়ে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি।

–আর্থার কোনান ডয়েল, তিনিও তো এক মস্ত বড় সাহিত্যিক।

ক্যাথারিন বলার চেষ্টা করে। বাকি রাস্তা তারা কেউ কোনো কথা বলেনি।

ফ্রেসারের বাড়ি হল জর্জটাউনে। ছবিতে দেখা যায় যেমন শহর তেমনই সুন্দর সাজানো এই বাড়িটি। দুশো বছরের পুরোনো। সাদা জ্যাকেট পরা এক বাটলার দরজাটা খুলে দিল। বলল- আসুন স্যার।

ফ্রেসার পরিচয় করিয়ে দিলেন ফ্রাঙ্ক, এ হল মিস আলেকজান্ডার।

-হ্যাঁ, টেলিফোনে আমাদের কথা হয়েছে, ক্যাথারিন জানাল।

মিস আলেকজান্ডার, আপনাকে স্বাগত সম্ভাষণ জানাচ্ছি।

ক্যাথারিন রিসেপশন হলের দিকে তাকাল। পুরোনো একটা সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। ওক কাঠ দিয়ে তৈরি করা, চকচক করছে। মেঝেতে মার্বেল পাতা। ঝাড়বাতি ঝুলছে।

ফ্রেসার ক্যাথারিনের মুখের ভাব লক্ষ্য করে বললেন- এটা ভালো লাগছে?

–অসাধারণ, ক্যাথারিন এখন কিশোরী হয়ে গেছে বুঝি।

ভদ্রলোক হাসলেন। ক্যাথারিন আর একটু কাছে এগিয়ে এল। ফ্রেসার জানেন, ক্যাথারিন হয়তো তার ঐশ্বর্যকে ভালোবাসে। যেমন করে থাকে আগ্রাসী মেয়েরা। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল, এই মেয়েটি বোধহয় একেবারে অন্যরকম।

–এসো, আমার স্টাডিতে, ফ্রেসার বললেন।

 ক্যাথারিন ওনাকে অনুসরণ করে একটা ঘরে ঢুকে পড়ল। চারদিকে শুধু বই আর বই।

ফ্রেসার বললেন- কেমন লাগছে?

 ক্যাথারিন বলল– এত বই আপনি পড়েন?

ফ্রেসার হাসলেন, তাঁর হাতে আইস প্যাকেট। তিনি বারের এক কোণে বসলেন।

কখন তুমি ডিনার খাবে?

–সাড়ে সাতটার সময়।

–আমি রান্নার লোককে বলে আসছি।

 –আমি কি ড্রিঙ্কটা তৈরি করব?

না, তোমাকে ধন্যবাদ।

ফ্রেসার বললেন, তুমি একটু ড্রিঙ্ক নেবে কি?

না, আমি কাজ করার সময় নিই না। পিকিউ গোলমাল হয়ে যায়।

 তার মানে?

–সব কেমন এলোমেলো।

হো হো করে হেসে উঠলেন ফ্রেসার। অনেকদিন বাদে এমন একটা সুন্দর পরিবেশ এসেছে। 

ফ্রেসার একটা মারটিনি তৈরি করলেন। ক্যাথারিন শুধু বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্ববিখ্যাত ক্ল্যাসিক বই। এছাড়া ইতালিয় সাহিত্যিকদের সেরা রচনা সম্ভার। একটা অংশে শুধু আরবি লেখকদের সৃজনশীলতা।

ফ্রেসার বললেন- কী দেখছ অমন করে? ভাবছ, আমি আরবি কোথায় শিখলাম? হ্যাঁ, কয়েক বছর মধ্যপ্রাচ্যে ছিলাম। যত্ন করে আরবি ভাষাটা শিখেছি। আর ইতালিয়ান? এক ইতালিয়ান অভিনেত্রীর সাথে আমার একটা ছোটো সম্পর্ক হয়েছিল। সে-ই আমাকে ইতালিয় ভাষা শিখিয়েছে।

ফ্রেসার ক্যাথারিনের চোখের দিকে তাকালেন। ক্যাথারিনের চোখে এখন শুধু আগ্রহ এবং উৎসাহ। ক্যাথারিনকে মনে হচ্ছে বুঝি একজন স্কুল ছাত্রী। উইলিয়াম ফ্রেসারের প্রতি তার ভালোবাসা অথবা ঘৃণা- কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

ডিনারটা দারুণ হয়েছিল। ফরাসি দেশের রান্না। স্বর্গীয় সসে চোবানো, ডেজার্টটাও ভারী চমৎকার।

ফ্রেসার জানতে চাইলেন– কেমন লাগল?

 ক্যাথারিন বলল- অসাধারণ।

ফ্রেসার এবার দোলচেয়ারে বসেছেন। ব্রান্ডির গ্লাস হাতে তুমি গল্প শুনবে? কী ধরনের গল্প তুমি ভালোবাসো?

–যে গল্পের মধ্যে জীবনের সত্যি ঘটনাগুলোকে বলা হয়।

–সত্যি? জীবনে সত্যি বলতে কিছু আছে কি?

দুজনে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেন। তারপর ফ্রেসার অনেক কথা বললেন। কথা কলার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মধ্যে তাঁর নীল চোখের তারায় ঈষৎ দ্যুতি দেখা যাচ্ছিল।

ক্যাথারিনের মনে হল, কোথায় যেন বিপর্যয় ঘটে গেছে। ভাঙনের গান সে শুনতে পাচ্ছেন। নতুন একটা অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।

.

মধ্যরাত অব্দি তারা কাজ করেছিল। তারপর ড্রাইভার এসে গেল। মেয়েটিকে তার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে দিতে হবে।

অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ক্যাথারিন শুধু ফ্রেসারের কথাই ভেবেছে। তার সাহস, তাঁর শক্তি, তার প্রবল অনুভব– সবকিছু মিলেমিশে একাকার। হ্যাঁ, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, উইলিয়াম ফ্রেসার এক শক্তিশালী পুরুষ। ওই রাতটার কথা ক্যাথারিন কখনও ভুলতে পারবে না। ভাবল, সকলের কানে এই সুখবরটা পৌঁছে দেবে। কিন্তু এখনই বলা উচিত নয়। ক্যাথারিন জানে, ওয়াশিংটনের যে কোনো কুমারি কন্যা ফ্রেসারকে শয্যাসঙ্গী করার জন্য উন্মাদ আচরণ করবে। না, আমি সেই জনতার দলে কখনও যোগ দেব না।

সুসি ক্যাথারিনের জন্য অপেক্ষা করছিল। ক্যাথারিন আসার সঙ্গে সঙ্গে সুসি চিৎকার করে বলল- কী হয়েছে বল? তোকে দেখেই বুঝতে পারছি, দারুণ কিছু একটা ঘটে গেছে।

ক্যাথারিন ঠোঁট উল্টে বলল না, বলার মতো কিছুই ঘটেনি। আমরা একসঙ্গে ডিনার খেলাম।

সুসি হাসল- কী বলিস? তোর গায়ে কোথাও টুসকি মারে নি? আমি বিশ্বাস করব?

–সুইটি, সব ছেলেই কি হ্যাংলা হয় নাকি? আমি এখন ভার্জিন মেরিই থেকে গেলাম।

ক্যাথারিনের চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। অনেক কথাই বলার ছিল কিন্তু সে বলতে পারছে না।

চোখ বন্ধ করল। সে ভাবল, আমি কী এখন আর ভার্জিন ক্যাথারিন আছি? অথবা সেন্ট ক্যাথারিন? না, এই মুখোশটা আমাকে খুলে ফেলতেই হবে। সব কিছু যখন পাল্টে যাচ্ছে, আমি কেন নিজেকে পালটে ফেলব না?

.

পরবর্তী ছমাসের মধ্যে ফ্রেসারের কাজের চাপ আরও বেড়ে গেল। মাঝে মধ্যে তাকে শিকাগো এবং সানফ্রানসিসকো যেতে হচ্ছে। কখনও যাচ্ছেন ইওরোপে। ক্যাথারিন কাজে খুব ব্যস্ত হয়ে গেছে। ফাঁকা সময় একদম পাচ্ছে না।

অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বেশির ভাগই পুরুষ। প্রত্যেকের মধ্যে একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। ক্যাথারিনকে লাঞ্চের আসরে যোগ দিতে হয়। ডিনার পার্টিতে যেতে হয়। কত কী কাজ তাকে করতে হয়। জীবনটা আরও দ্রুত ছন্দে এগিয়ে চলেছে।

ফ্রেসারের সম্মতি আছে। ফ্রেসার জানেন, এইসব মানুষদের সঙ্গে আরও ভালো ব্যবহার করতে হবে ক্যাথারিনকে। ক্যাথারিনের সৌন্দর্য আছে। ক্যাথারিন বুদ্ধিমতী, ইচ্ছে করলে ক্যাথারিন একটা বিরাট সাম্রাজ্য তৈরি করতে পারে। মাঝে মধ্যেই ফ্রেসারের সাথে ক্যাথারিন ডিনারের আসরে বসে। তার মাইনে এখন বেড়ে গেছে। সপ্তাহে আরও দশ ডলার বেশি পাচ্ছে ক্যাথারিন।

.

শহরের মধ্যে হঠাৎ কীসের উন্মাদনা? মানুষজন আরও দ্রুত ছুটে চলেছে। মন চঞ্চল। খবরের কাগজের পাতায় একটার পর একটা শিরোনাম, ইওরোপের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ফরাসি দেশের পতন। আমেরিকানদের মনে দুঃখের বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে। মনে হচ্ছে, এটা তাদের ব্যক্তিগত পরাজয়। স্বাধীনতার মৃত্যু।

নরওয়ে হেরে গেল, ইংল্যান্ড জীবন যুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করছে। ইতিমধ্যে জার্মানি, ইতালি এবং জাপানের মধ্যে একটা চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আমেরিকাকে বোধহয় যুদ্ধে যোগ দিতে হবে। একদিন ক্যাথারিন এ ব্যাপারে ফ্রেসারের মতামত জানতে চাইছিল।

ফ্রেসার বললেন- হ্যাঁ, অনেক চিন্তা করে যুদ্ধে যোগ দেওয়া উচিত। যদি ইংল্যান্ড হিটলারকে থামাতে না পারে, আমাদের সে দায়িত্ব নিতেই হবে।

সেনেটর বরো বলেছেন– আমেরিকা তো আর উটপাখি হয়ে বালির মধ্যে মুখ খুঁজে বসে থাকতে পারে না।

ফ্রেসার রেগে গিয়ে মন্তব্য করলেন।

-যদি যুদ্ধ বাধে তা হলে আপনি কী হবেন?

–অবশ্যই একজন মহান নেতা, তুমি হিরো বলতে পারো।

 ক্যাথারিন ভাবল, এই মানুষটি সৈনিকের ইউনিফর্ম পরেছেন। না, ব্যাপারটা ভালো লাগছে না।

ফ্রেসার বললেন– ভয় নেই ক্যাথারিন, যুদ্ধ এক্ষুনি হবে না। হলেও আমি সে যুদ্ধে হয়তো যোগ দেব না। তবে সব ব্যাপারে নজর রাখতে হবে।

অনেকক্ষণ কথা হল। এই ব্যাপারে আলোচনা করতে ফ্রেসারের আর ভালো লাগছে না। তিনি অন্য বিষয়ে কথা বলতে শুরু করলেন।

এক সপ্তাহ কেটে গেছে। রুজভেল্ট আরও কঠিন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন।

দিনগুলো হু-হু করে বেরিয়ে যাচ্ছে। ক্যাথারিন মাঝে মধ্যে একটু ছুটি পাচ্ছে। কিন্তু তেমন বয়ফ্রেন্ড তার কোথায়? বরং উইলিয়াম ফ্রেসারের সাহচর্য তাকে অনেক আনন্দ দিচ্ছে। যে কোনো ছেলের সাথে সে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে না।

একদিন সন্ধ্যেবেলা ক্যাথারিন কাজ করছিল। ফ্রেসার এলেন। একটা নাটক দেখে এসেছেন। ফ্রেসারের দিকে তাকিয়ে ক্যাথারিন অবাক হয়ে গেল।

ফ্রেসার বললেন–এ কী? এখনও কাজ করছ কেন? তুমি কি কেনা বাঁদি নাকি?

ক্যাথারিন বলল- না স্যার, এই রিপোর্টটা শেষ করতে হবে। আপনি কালকে তো সানফ্রানসিসকোতে যাবেন, এই রিপোর্টটা সঙ্গে নিতে হবে।

ফ্রেসার বললেন- তুমি তো এটা আমাকে মেল করতে পারতে।

তিনি ক্যাথারিনের উল্টেদিকের একটা চেয়ারে বসলেন। ক্যাথারিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

-সন্ধ্যেবেলা আর কিছু করার থাকে না তোমার? তুমি বসে বসে এই রিপোর্টগুলো তৈরি করছ!

-না, স্যার। এই কাজ করতে আমার ভালো লাগে।

 ফ্রেসার ঝুঁকলেন। আবার তাকালেন ক্যাথারিনের চোখের দিকে।

মনে আছে, অফিসে প্রথম দিন তুমি আমাকে কী বলেছিলে?

–হ্যাঁ, আমি অনেক কিছু বলে ফেলেছিলাম। এখন ভাবলে কেমন লাগে।

–তুমি বলেছিলে, তুমি আমার সেক্রেটারি হিসেবেই থাকবে না, একদিন আমার সহকারিণী হবে।

ক্যাথারিনের মুখে হাসি কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

তুমি কি বুঝতে পারছ, আমি কী বলছি?

ক্যাথারিন অবাক হয়ে গেছে না স্যার, বুঝতে পারছি না।

ব্যাপারটা খুবই সোজা ক্যাথারিন। ফ্রেসার শান্তভাবে বললেন, গত তিনমাস ধরে তুমি সত্যি আমার সহকারিণীর কাজ করেছ। এখন আমি এটার ওপর একটা সরকারী শীলমোহর দিতে চাইছি।

ক্যাথারিন অবাক হয়ে গেছে, অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে সবকিছু আপনি সত্যি বলছেন?

–আমি সব কিছু তোমার সাথে ভাগ করব।

–আমি বুঝতে পারছি না স্যার, আপনি কী বলছেন?

–আমার অ্যাসিস্ট্যান্টরা আমাকে বিল নামে ডেকে থাকে।

 –বিল?

রাত্রি গম্ভীর হয়েছে, ক্যাথারিন একা শয্যায় শুয়ে আছে। ভাবছে, কীভাবে ফ্রেসার তার দিকে তাকিয়েছিলেন। ক্যাথারিনের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল। অনেকক্ষণ বাদে ক্যাথারিন ঘুমের জগতে প্রবেশ করল।

বাবাকে বেশ কয়েকবার ক্যাথারিন চিঠি লিখেছে। একবার বাবা যেন ওয়াশিংটনে আসে, এমন আবদার করেছে। ক্যাথারিন চাইছে, বাবাকে এই সুন্দর শহরটা ঘুরিয়ে দেখাবে। বন্ধুদের সাথে বাবাকে আলাপ করাবে। বিল ফ্রেসারের কাছেও নিয়ে যাবে। গত দুটো চিঠির কোনো উত্তর ক্যাথারিন পায়নি। চিন্তিত হয়েছে। কাকার বাড়িতে ফোন করেছে। কাকা বলেছেন ক্যাথি, এক্ষুনি তোকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম।

ক্যাথারিনের হৃৎস্পন্দ স্তব্ধ হয়েছে।

-কেন? কী হয়েছে? বাবা কেমন আছে?

একটুখানি নীরবতা। দাদার স্ট্রোক হয়েছে। তুই কি একবার আসতে পারবি? এখন অবশ্য দাদা একটু ভালো আছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, দাদার একদিকটা বোধহয় প্যারালাইসড হয়ে যাবে।

ক্যাথারিন চিৎকার করেছে– এ কী?

ক্যাথারিন বিল ফ্রেসারের কাছে পৌঁছে গেল। খবরটা তাঁকে শোনাল।

ফ্রেসার বললেন শুনে খুব খারাপ লাগছে, আমার কোনো সাহায্য?

–বিল, আমি এক্ষুনি বাবাকে দেখতে যাব।

–নিশ্চয়ই যাবে। বিল পকেট থেকে একটা ডাইরি বের করলেন। কয়েকটা টেলিফোন করলেন। ড্রাইভার এসে ক্যাথারিনকে অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে দিল। ক্যাথারিন কোনো রকমে কয়েকটা জামাকাপড় স্যুটকেসে ছুঁড়ে দিল। ড্রাইভার তাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে গেল। ইতিমধ্যেই ফ্রেসার উড়ান পাখিতে একটা সিট বুক করেছেন।

.

প্লেনটা কোমাহা এয়ারপোর্টে নামল। ক্যাথারিনের কাকা আর কাকিমা দাঁড়িয়ে ছিলেন। বেশ বোঝা গেল, অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। নীরবতার মধ্যে দিয়ে তারা গাড়িতে উঠলেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুশয্যায় বাবার সাথে দেখা হল। এখানে শুধুই নীরবতা। এখানে সব কিছু হারানোর বেদনা। কফিনের ওপর বাবার শরীরটা শোয়ানো আছে। সবথেকে সুন্দর পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সময় তাকে আক্রমণ করেছে। এইভাবে কেউ কি বেঁচে থাকতে পারে? শরীরটা ছোটো হয়ে গেছে।

কাকা ক্যাথারিনের হাতে সামান্য সম্পদ তুলে দিলেন। সারাজীবন ধরে তিল তিল করে তিনি যা সংগ্রহ করেছেন–পঞ্চাশ ডলার, কয়েকটা পুরোনো ছবি, কয়েকটা বিল, একটা রিস্টওয়াচ, একটা পুরোনো রুপোর কলম, ক্যাথারিন যেসব চিঠি দিয়েছিল, সেগুলো।

ক্যাথারিনের চোখে জল। ভালো লাগছে না, এভাবেই কি মানুষ চলে যায়। বাবার সাথে শেষ দেখাটা হল না। বাবার স্বপ্ন ছিল মস্ত বড়ো। স্বপ্ন সফল করতে পারেনি। মনে পড়ল, কী জীবন্ত ছিল তার বাবা। যখন ক্যাথারিন এক ছোট্টো মেয়ে, বাবার হাতেই হাত রেখে সে পৃথিবী জয় করতে শিখেছিল। আঃ, সেই আবিষ্কার, সেই রহস্য, সেই রোমাঞ্চ, নাঃ, জীবনে আর কখনও ফিরে আসবে না।

বাবাকে শুইয়ে দেওয়া হল ছোট্ট একটা সমাধিক্ষেত্রে। চার্চের পাশে। ক্যাথারিন ভেবেছিল, সে রাতটা কাকা-কাকিমার সঙ্গে কাটাবে। পরের দিন সকালে ট্রেনে করে চলে যাবে। কিন্তু, সেখানে সে আর থাকতে পারছে না। সে এয়ারপোর্টে চলে গেল। ওয়াশিংটনে চলে আসতে হবে। বিল ফ্রেসার এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন। ক্যাথারিনের সঙ্গে দেখা করতে। এই জগতটাতেই এখন ক্যাথারিনকে থাকতে হবে। বাবার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল।

বিল ক্যাথারিনকে একটা ছোটো সরাইখানায় নিয়ে গেলেন। ভার্জিনিয়াতে। এখানে ডিনার খেতে হবে। ক্যাথারিন অনেক কথা বলে গেল। বিল শান্তভাবে শুনলেন। ক্যাথারিন কাঁদছে। বিল কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

বিল বলেছিলেন, ছুটি নিতে। ক্যাথারিন রাজি হয়নি। কাজের মধ্যে নিজেকে মগ্ন রাখতে হবে। এখন সপ্তাহে একবার দুবার ফ্রেসারের সঙ্গে ডিনার খেতে যায় ক্যাথারিন। ক্যাথারিন আরও অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে।

আগে কোনো প্রস্তুতি ছিল না। ব্যাপারটা হঠাই ঘটে গেল। বিল কাজ করছিলেন, ক্যাথারিন কতগুলো কাগজ পরীক্ষা করছিল। বুঝতে পারল, বিল পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। একটু বাদে ক্যাথারিন বুঝতে পারল, তার ঘাড়ে বিলের আঙুল।

ক্যাথারিন?

 কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন।

একটু বাদে ক্যাথারিন দেখল, সে বিলের বাহু বন্ধনে ধরা পড়েছে। মনে হচ্ছে, এর আগে তারা বোধহয় হাজার বার চুমু খেয়েছে। ভবিষ্যতে আরও অনেকবার পরস্পরকে আদর দেবে।

ক্যাথারিন ভাবল, এটা তো এক সফল সহজ পরিণতি। এতদিন কেন ঘটেনি তাই ভাবছি।

বিল ফ্রেসার বললেন- চলো ডার্লিং, আমরা বাড়িতে যাব।

গাড়িটা জর্জটাউনে পৌঁছে গেল। ফ্রেসার ক্যাথারিনের হাতে হাত রেখে বসে আছেন। এই হাতে আছে নির্ভরতা, আছে নিরাপত্তা। এত আনন্দ? এত সুখ? ভালোবাসার এটাই কি আসল মানে?

রন পিটারসনের কথা মনে পড়ল। ক্যাথারিন হঠাৎ কেঁপে উঠল।

ফ্রেসার শান্তভাবে জানতে চাইলেন– ক্যাথি, শরীর খারাপ লাগছে?

ক্যাথারিন তাকাল, মুখে বুদ্ধির আভাস।

ক্যাথারিন বলার চেষ্টা করল বিল, সত্যি বলব, আমি কিন্তু একেবারে কুমারী।

ফ্রেসার হাসলেন, অবিশ্বাস্য! ওয়াশিংটনে তুমিই একমাত্র কুমারি কন্যা? ভাবতে অবাক লাগছে। আমার কি সৌভাগ্য বলো।

ক্যাথারিন বলার চেষ্টা করেছিল– হ্যাঁ, আমি সত্যিই বলছি।

তারপর? শান্ত কিছু কথাবার্তা। ভবিষ্যতের চিন্তাধারা।

আধঘণ্টা কেটে গেছে। গাড়িটা বাড়ির সামনে পৌঁছে গেছে। ফ্রেসার আর ক্যাথারিন লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়েছে।

–একটু ড্রিঙ্ক দেবে?

ক্যাথারিন বলল– ওপরতলায় যাব।

হাতে হাত, একে অন্যকে পাগলের মতো চুমু দিচ্ছে। ক্যাথারিন বুঝতে পারছে, আগুন এবার জ্বলবে।

–ভেতরে এসো, ক্যাথারিনের হাতে হাত রেখে ফ্রেসার বললেন।

 বিল ফ্রেসারের বেডরুম। ভারী সুন্দর সাজানো। ঘরের একটা কোণে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে। ব্রেকফাস্ট টেবিল, ডাবল বেড, বাঁদিকে ড্রেসিং রুম তার পাশে বাথরুম।

সত্যি তুমি ড্রিঙ্ক নেবে না?

 না, আমার দরকার পড়বে না।

ফ্রেসার আবার আলিঙ্গন করলেন। শরীরের সবখানে চুমুর চিহ্ন আঁকলেন। ক্যাথারিন বুঝতে পারছে, এই পৌরুষ এখন তার দরকার। আঃ, আনন্দ, এত শিহরণ?

ফ্রেসার বললেন আমি এক্ষুনি আসছি।

ফ্রেসার চলে গেলেন ড্রেসিংরুমের মধ্যে। এমন সুন্দর মানুষের সাক্ষাৎ আগে পাইনি কেন? ক্যাথারিনের হঠাৎ মনে হল, ফ্রেসার বোধহয় পোশাক ছাড়ছেন। ক্যাথারিন ধীরে ধীরে তার পোশাক খুলতে শুরু করল। সম্পূর্ণ নগ্না হয়ে সে একমিনিট দাঁড়িয়ে থাকল। নিজের শরীরের দিকে তাকাল। গুডবাই সেন্ট ক্যাথারিন, সে ওই অবস্থায় বিছানাতে চলে গেল। হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকল।

ফ্রেসার ফিরে এসেছেন, সিক্রেট ড্রেসিং গাউন পরে। তিনি নগ্নিকা ক্যাথারিনের দিকে তাকালেন। আঃ! কালো চুলগুলো সাদা ওয়াড়ের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। অসাধারণ সুন্দর এক মুখচ্ছবি।

ফ্রেসার তাকিয়ে থাকলেন। বললেন আমি কিন্তু এবার সবটুকু করতে চাইছি।

ক্যাথারিনের আর্তনাদ আমি কোনো কিছু আনিনি। আমি কি গর্ভবতী হয়ে যাব?

ফ্রেসার হাসলেন– মনে হচ্ছে অতটা অঘটন হবে না।

ক্যাথারিন তাকাল। এবার ঠোঁট আরও চেপে বসেছে। এত আনন্দ, চেষ্টা করছে। কিছুই হচ্ছে না। শেষ অব্দি কিছু একটা ঢোকার চেষ্টা করল। অসাধারণ ছন্দ।

আঃ, ক্যাথি। এটাই বোধহয় শেষতম আঘাত। তখনও পুংদণ্ডটা ক্যাথারিনের যোনির মধ্যে ঢুকে আছে। নিঃসরণ হয়ে গেছে।

ফ্রেসার জানতে চাইলেন ক্যাথি, ভালো লেগেছে? ক্যা

থারিন বলল- হ্যাঁ, অসাধারণ। আবার কখন হবে?

 স্বর্গীয় সুখ, সন্তুষ্টি এবং আনন্দ।

অনেক কথাই ক্যাথারিনের মনে পড়ে গেল। রগরগে উপন্যাসের পাতায় সে পড়েছে, ভালোবাসা মানে কী? শরীরের শিহরণ? কাছে আসার তীব্র আকুতি? না, আরও কিছু বোধহয় আছে, যা ওই উপন্যাসে লেখা থাকে না।

ফ্রেসার বললেন- ডার্লিং, সোনামনি, ভয় পেও না, প্রথমবার এমনই হয়ে থাকে। আস্তে আস্তে দেখবে, সবকিছু সয়ে যাবে।

ক্যাথারিন উত্তর দিতে পারছে না। ফ্রেসার জিজ্ঞাসা করলেন কেমন লাগল?

-কী করে বলব বলো? এভাবে ভালোবাসলে তুমি আমাকে? আমি কীভাবে প্রতিদান দেব?

তারা পরস্পরকে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। ক্যাথারিন সত্যি সুখী হয়েছে।

–তুমি একটুব্র্যান্ডি খাবে?

না, লাগবে না।

 –আজ প্রথম আমি এক কুমারি কন্যার সাথে শুলাম।

তুমি কি কিছু মনে করলে?

ফ্রেসার তাকালেন। কিছু বলার চেষ্টা করলেন।

-তুমি ভারী সুন্দর।

সত্যি বলছ?

–হ্যাঁ, আমি সত্যি বলছি।

–তুমি কি আমার থাকবে সারাজীবন? ক্যাথির প্রশ্ন।

–কেন একথা বলছ?

মনে হচ্ছে তুমি হয়তো আমার মুখ আর দেখতে চাইবে না।

–না-না, এটা তোমার ভুল ধারণা। তোমাকে আমি ভালোবাসি। প্রথম যেদিন তুমি। অফিসে এসেছিলে, সেদিন থেকে।

বোকা মেয়েটা হয়তো সব কিছু সত্যি বলে ভাবল। চোখ বন্ধ করল সে। অন্য এক মহিলা এসে তার জায়গাটা দখল করেছে? না, কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। এখন শুধু ঘুম, একটুকরো ঘুম চাই!

.

নোয়েলে, প্যারিস, ১৯৪১

০৬.

১৯৪১ সালের প্যারিস। দুর্নীতিতে চারপাশ ছেয়ে গেছে। জীবন্ত নরক বুঝি। গেস্টাপো শব্দটা সকলের মনে শঙ্কা আর শিহরণের সৃষ্টি করছে। তারা যা খুশি তাই করছে।

২৯ মে, নতুন একটা নির্দেশনামা জারি করা হল। বলা হল, এখন থেকে কেউ আর দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে পারবে না।

ফরাসিরা জার্মানদের অধীনস্থ হয়ে থাকতে ভালোবাসছে না। গোপন সন্ত্রাসবাদী দল চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাচ্ছে।

একটির পর একটি অঘটন ঘটে চলেছে। মাঝে মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যাচ্ছে।

জার্মানরা এখনও বিজয়ীর মতো আচরণ করছে। সাধারণ ফরাসিদের তারা পাত্তাই দিচ্ছে না।

সবকিছুই এখন বাড়ন্ত। সিগারেট থেকে কফি, চামড়ার ব্যাগ সবকিছু। ফরাসিরা নানা ধরনের অবস্থার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। রাস্তাঘাট প্রায় কঁকা।

এমন কী চার্চগুলোকেও আক্রমণ করা হল। ধর্মের নামে অধর্মের অনুশাসন।

থিয়েটার হল বন্ধ হয়ে গেছে। পাব অথবা বারে আর লোক যাচ্ছে না।

নোয়েলে পেজ এক নামকরা অভিনেত্রীতে পরিণত হয়েছে। আরমান্দ গটিয়ারকে ধন্যবাদ। গটিয়ার এভাবেই তাকে পাদপ্রদীপের নীচে নিয়ে এসেছেন।

নোয়েলের মধ্যে অভিনয়ের ক্ষমতা আছে। অসামান্য শরীর সৌন্দর্য আছে। নোয়েলে জানে, আগামীকাল সে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করবে।

প্রথমদিকে গটিয়ার এটা বিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি ভাবতেন, ধীরে ধীরে উন্নতির শিখরে উঠতে হয়। কিন্তু নোয়েলে সবকিছু মিথ্যে বলে প্রমাণ করেছে। প্রথম থেকে সে অসামান্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আরমান্দ অবাক হয়ে গেছেন। বুঝতে পেরেছেন, জিনিয়াস শব্দটার আসল মানে কী?

একদিন বন্ধুদের সাথে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন- তোরা নোয়েলের দিকে নজর রাখিস। না হলে পরে পস্তাতে হবে।

–হ্যাঁ, বন্ধুরা জবাব দিয়েছে, সত্যিই তো, নোয়েলের উত্থান অবিশ্বাস্য।

.

প্রথম রজনীর কথা গটিয়ারের মনে পড়ে গেল। অনেকবার সংলাপ লিখে কাটতে হয়েছিল। এমন এক রমণীর গল্প, যার স্বামী যুদ্ধে গেছে। একদিন বন্ধু বলে পরিচয় দিল। তারা রাশিয়ার রণক্ষেত্রে একসঙ্গে লড়াই করেছে। ঘটনা প্রবাহ এগিয়ে চলল। মহিলা সৈনিকের প্রেমে পড়ল। জানত না, সে একটা মানসিক রোগী। মানুষকে হত্যা করাটাই তার একমাত্র নেশা।

অসামান্য এক চরিত্র। গটিয়ার পরিচালনা করতে রাজী হলেন। একটাই শর্ত দেওয়া হল। ওই রমণীর চরিত্রে নোয়েলে পেজকে অভিনয় করার সুযোগ দিতে হবে। প্রযোজকরা প্রথমে রাজী হননি। তা সম্ভব নয়, নোয়েলে এখনও পর্যন্ত এক অপরিচিতা। শেষ পর্যন্ত রাজী হতে হল তাদের। গটিয়ার বাড়িতে এলেন। নোয়েলেকে খবরটা শোনালেন। এই ব্যাপারটা সফল হলে নোয়েলে স্টার-এ পরিণত হবে। নোয়েলে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল।

–আরমান্দ, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। ব্যাপারটা আমি ভাবতেই পারছি না।

শুরু হল গটিয়ারের প্রশিক্ষণ, নোয়েলে আবেগগুলো প্রকাশ করতে পারছে কি? না, ঠিক মতো হচ্ছে না। কিন্তু কেন? এমন সুন্দরী এক রমণী। পৃথিবীর কাছ থেকে অনেক কিছু পেতে চাইছে। গটিয়ার আবার নতুন করে চেষ্টা করতে শুরু করলেন।

অডিসনের আসর, নোয়েলে অসাধারণ অভিনয় করেছিল। দু মাস পরে প্যারিসে থিয়েটারটা শুরু হল। রাতারাতি নোয়েলে ফরাসি দেশের সবথেকে বড়ো অভিনেত্রীতে পরিণত হল। সমালোচকরা অভিনয়ের সমালোচনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যখন তাদের কানে এই খবর পৌঁছে গেল, গটিয়ার তার রক্ষিতা নোয়েলেকে মূল ভূমিকায় নামিয়েছেন, সব স্তব্ধ হয়ে গেল। নোয়েলে কিন্তু অভিনয়ের মাধ্যমে সকলের মন জয় করেছিল। সৌন্দর্য বর্ণনার জন্য বাছা বাছা বিশেষণ ব্যবহার করা হতে থাকে। নাটকটা অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

প্রত্যেক রাতে নোয়েলের ড্রেসিংরুমে অনেক ভিজিটর আসত। সে সকলের সঙ্গে কথা বলত। সৈনিক থেকে শুরু করে কোটিপতি, দোকানের সেলসগার্ল, সকলের সাথে। গটিয়ার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। মনে হচ্ছে, এক রাজকুমারি বোধহয় তার প্রজাদের সঙ্গে কথা বলছেন।

একবছরের মধ্যে নোয়েলে মারসেইল থেকে তিনখানা চিঠি পেয়েছিল। চিঠিগুলো সে ছিঁড়ে ফেলে, তুলে রাখেনি। এরপর আর চিঠি এল না।

বসন্তকাল, নোয়েলে এবার একটা মশাল দীপ জ্বালিয়ে অভিনয় করতে চলেছে। আরমান্দ গটিয়ার তার পরিচালক। ছবিটা শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেল। নাম চারদিকে আরও ছড়িয়ে পরল। দিকে দিকে নোয়েলের ছবি ছাপা হচ্ছে। ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে। সে জানে, তার বক্স অফিস মূল্য এখন কতখানি।

মাঝে মধ্যে সে দক্ষিণ ফ্রান্সে চলে যাচ্ছে। ছুটি কাটাবে বলে। গটিয়ার তার জীবনে একটা মস্ত বড়ো পরিবর্তন এনে দিয়েছেন।

এত কিছু করার অন্তরালে কী আছে? ল্যারি ডগলাসকে শাস্তি দিতে হবে।

মাঝে মধ্যে নোয়েলে ফটো সেশনে যোগ দেয়। তাকিয়ে থাকে পত্রিকার পাতার দিকে। যখন ছবিতে অভিনয় করে, তখন মনে হয়, এই বুঝি ল্যারি এসে গেছে।

একদিন সত্যি তেমন কিছু ঘটল হয়তো।

ল্যারিকে দেখা যাচ্ছে, দর্শক আসনে বসে আছে।

ল্যারি নিশ্চয়ই নোয়েলের নাম শুনেছে। সেই ডিটেকটিভের সাথে যোগাযোগ করার কী দরকার? ক্রিস্টিয়ার বারবেড। নতুন কোনো খবর আছে কি?

নোয়েলে জানতে চেয়েছিল।

বারবেডের মুখে হাসি হা, ইংল্যান্ড থেকে খবর আনা সম্ভব হচ্ছে না। নাজিরা সবদিকে সর্তক নজর রেখেছে।

কিন্তু বারবেডের নিজস্ব পন্থা আছে। সে জাহাজের নাবিকদের সাথে ভাব করে। চিঠি চুরি করে নিয়ে আসে। এটাই হল একমাত্র উৎস। এখন হয়তো এই উৎসটা আর কাজে লাগবে না।

তাহলে? কী করা যায়?

একদিন একটা রিপোর্ট পাওয়া গেল। ইংলিশ চ্যানেলে মৃত্যু ঘটেছে, সত্যি কি?

নোয়েলের মুখের ছবি? না, শেষ অব্দি জীবিত অবস্থায় তাকে বাঁচিয়ে ভোলা গেছে। ব্রিটিশ রেসকিউ বোটটাকে তুলে নিয়েছে।

সবকিছু ঠিক মতো এগিয়ে চলেছে। নোয়েলের কাজকর্ম আরও বেড়ে গেছে। এখন সে আর অন্য কোনো কিছুতে মন দিতে পারছে না।

নোয়েলে অফিসে দাঁড়িয়ে আছে। বারবেড তার হাতে আর একটা রিপোর্ট তুলে দিল।

নোয়েলে পড়ল তার স্কোয়াড্রন কিরটনে চলে গেছে। লিঙ্কনসায়ারে।

এসব ব্যাপারে নোয়েলের কোনো আগ্রহ নেই।

নোয়েলে জানতে চাইল- অ্যাডমিরালের মেয়ের সাথে এনগেজমেন্ট হয়েছে, কি হয়নি?

বারবেড অবাক হয়ে তাকালেন। বললেন– না, এখন উনি বোধহয় অন্য কোনো মেয়েতে মজেছেন।

নোয়েলে রিপোর্টটা ইতিমধ্যেই পড়ে ফেলেছে। ডগলাস সম্পর্কে তাজা খবর চাই।

শুক্রবার সন্ধ্যাবেলা। অভিনয় শেষ হয়ে গেছে। নোয়েলে তার ড্রেসিং রুমে বসে আছে। মেকাপ তুলে ফেলছে। দরজায় শব্দ হল। একজন বলল, মিস পেজ, একজন ভদ্রলোক। এগুলো আপনাকে দিতে বলেছেন।

নোয়েলে কাঁচের আয়না দিয়ে তাকাল। দেখল লাল গোলাপের গোছা। সুন্দর সাজানো ফুলদানিতে।

নোয়েলে বলল- এখানে রাখুন।

নভেম্বর শেষ হয়ে গেছে। প্যারিসের কেউ গত তিনমাসে গোলাপ ফুল দেখেনি। এত সুন্দর গোলাপ? শিশির সিক্ত। নোয়েলে কার্ডটা পড়ল। কী লেখা আছে?– প্রিয়তমা, অভিনেত্রী, আমার সাথে রাতের ডিনার সারবেন কি? জেনারেল হানস।

নোয়েলে অবাক হয়ে গেল। কী হয়েছে? কেন এভাবে আমাকে ফুল দেওয়া হল?

যিনি ফুল নিয়ে এসেছিলেন, মাথা নাড়লেন। ফুলদানিটা হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। নোয়েলে এখনও জানে না, কী হবে। এক জার্মান জেনারেলের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। অন্য কেউ হলে হয়তো সহজে পার পেত, এখন পাবে কি? নাজিরা সাংঘাতিক হয়ে থাকে, নোয়েলে শুনেছিল। কিন্তু আমন্ত্রণ যখন এসেছে, তাকে সাড়া তো দিতেই হবে। তা না হলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। হাজার বছর ধরে তৃতীয় রাইক বিশ্ব শাসন করবে। এমন একটা কথা শোনা যাচ্ছে।

আরমন্দ গটিয়ার জানতে চাইলেন কী হয়েছে?

নোয়েলে থরথর করে কাঁপছে– নাজিদের সম্ভাব্য আক্রমণ, সে কোনো কথা বলতে পারছে না।

গটিয়ার বললেন- হ্যাঁ, নাজিদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে।

নোয়েলে বলল- আপনি কি মনে করেন? ভগবান আমাদের সাহায্য করবেন? সত্যি কি ভগবান আছেন? তা হলে? উনি তো সমস্ত মানুষকে তৈরি করেছেন। তার মানে? নিঃশর্ত জার্মানদেরও সাহায্য করবেন।

অক্টোবর, নোয়েলের নাটকের প্রথম বার্ষিকী পূর্ণ হল। পার্টির অনুষ্ঠান। সুন্দরী ফরাসি মেয়েরা ঘোরাঘুরি করছে। এক জার্মান অফিসারকে দেখা গেল। বছর চল্লিশ বয়স। মুখে বুদ্ধির ছাপ। সবুজ চোখের তারা। অ্যাথলেটিক চেহারা।

 নোয়েলে জানতে চাইল- এই মানুষটি কে?

এক ভদ্রলোক ওই মানুষটির দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ইনি হলেন জেনারেল হানস।

নোয়েলের মনে পড়ে গেল, ওই গোলাপগুচ্ছের কথা। সে বলল- মানুষ হিসেবে আপনি কেমন?

পাশে বসে থাকা পুরুষটির মুখ বিবর্ণ হয়ে গেছে।

আরমান্দ পটিয়ার কাউকে সঙ্গে এনেছেন। কথাবার্তা পাল্টে গেল। নোয়েলে এর পর আর জেনারেলের দিকে তাকায়নি।

পরের দিন সন্ধ্যাবেলা।

নোয়েলে ড্রেসিংরুমে পৌঁছে গেছে। আবার একটা ছোটো ফুলদানি, ছোট্ট কার্ড। লেখা আছে– এবার থেকে শুরু হোক, আমি কি তোমাকে দেখতে পাব?

তলায় লেখা আছে, হানস।

নোয়েলে চিরকুটটা ছিঁড়ে দিল। প্রস্ফুটিত গোলাপ ছুঁড়ে ফেলে দিল বাজে কাগজের বাক্সে।

.

সেই রাতের পর নোয়েলে প্রত্যেক পার্টিতে সাবধানে যায়। আরমান্দ গটিয়ারকে সঙ্গে নিয়ে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জেনারেল থাকেন। নোয়েলের দিকে তাকিয়ে থাকেন অবাক দৃষ্টিতে।

নোয়েলে বুঝতে পারছে না, জেনারেল তার প্রতি এত আকর্ষিত কেন? মাঝে মধ্যে নোয়েলের মনে হয়, আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে কী বা ক্ষতি হবে?

নাজিরা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। প্যারিসের অবস্থা শোচনীয়। স্বাধীনতার অপমৃত্যু ঘটে গেছে। চোরাগোপ্তা হত্যা করা হচ্ছে। ট্রাকের ওপর বোমা ফেলা হচ্ছে। ব্রিজ ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদীদের চক্রান্ত। এর অন্তরালে কে আছে? একজনের নাম জানা গেছে, সত্যি নামটা কেউ জানে না। তিনি হলেন লে কাফার্ড। সবাই তাকে আদর করে আরশোলা বলে ডাকে। গেস্টগোরা তাকে ধরতে পারছে না। কোথায় তিনি থাকেন কেউ জানে না। অনেকে বলছেন, তিনি একজন ইংরাজ, প্যারিসের বাসিন্দা, আবার কেউ বলছেন, তিনি জেনারেল দগলের এজেন্ট। দগল হলেন ফরাসি জাতীয়তাবাদী সংগঠনের প্রধান অধিনায়ক।

পরিচয় অজানা, পরিচিতি গোপন। কিন্তু, সর্বত্র তার উপস্থিতি। গেস্টাপোরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু লে কাফার্ড ইতিমধ্যেই এক মহানায়কে পরিণত হয়েছেন।

.

ডিসেম্বরের সন্ধ্যেবেলা, টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। নোয়েলে একটা আর্ট এগজিবিশন দেখতে গিয়েছিল।

অনেক মানুষের ভিড়। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এসেছেন। নোয়েলে এগিয়ে চলেছে। একটার পর একটা ছবি দেখছে। হঠাৎ ঘাড়ে কার হাতের পরশ। সে পেছনে ফিরল। মাদাম রোজ, নোয়েলে মুখটা ভুলেই গেছে। সেই একই কুৎসিত মুখ। নোয়েলের মনে হল, সে বোধহয় এবার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।

মাদাম বললেন- তুমি কি আমার সঙ্গে দেখা করবে?

নোয়েলে জবাব দিতে পারল না, মাদাম রোজ ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। ফটো গ্রাফাররা নোয়েলের চারপাশে ভিড় করেছে। নোয়েলে হাসল। মাদাম রোজের কথা মনে পড়ে গেল। ইসরায়েল কাটজকেও মনে পড়ে গেল। একসময় ওঁরা দুজন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইসরায়েল দু-দুবার নোয়েলের জীবন বাঁচিয়েছেন। মাদাম রোজ কী চাইছেন? সম্ভবত টাকা, নোয়েলে ভাবল।

কুড়ি মিনিট কেটে গেছে। নোয়েলে একটা ট্যাক্সি নিল। বৃষ্টি পড়ছে, কনকনে হাওয়া দিচ্ছে। ট্যাক্সি এগিয়ে চলেছে। নোয়েলে বাইরে বেরিয়ে এল। রেইনকোট পরা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে নোয়েলে চিনতে পেরেছে। হ্যাঁ, বয়স তাকে অনেকখানি পাল্টে দিয়েছে। তিনি হলেন ইসরায়েল কাটজ।

ইসরায়েল বললেন– এই বৃষ্টিতে কোথায় যাব?

তিনি নোয়েলের হাতে হাত দিলেন। কাফেতে ঢুকে গেলেন। কিছু মানুষের ভিড়। নোয়েলে এবং ইসরায়েল কোণের টেবিলে বসলেন।

কী খাবে?

না, কিছু নিতে হবে না।

ইসরায়েল বৃষ্টিতে ভেজা টুপিটা খুলে রাখলেন। নোয়েলে মুখের দিকে তাকালো। কিছু পরিবর্তন হয়েছে কি?

উনি বললেন- নোয়েলে, তুমি এখনও সুন্দরী, আমি তোমার সবকটা মুভি দেখেছি। তুমি তো এক মহান অভিনেত্রী।

ব্যাকস্টেজে আসো না কেন?

ইসরায়েল হাসলেন। বললেন আমি তোমাকে বিরক্ত করতে চাই না।

 নোয়েলে তাকিয়ে আছে। অনেক কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে।

 নোয়েলে বলল- আমার এখন অনেক বন্ধু হয়েছে। জীবনটা ভালোই কাটছে।

 ইসরায়েলের মুখে হাসি তোমার সাহসের প্রশংসা করতে হয়।

-তোমার কথা বলো।

কাঁধে ঝাঁকানি আমার জীবনটা একঘেয়েমিতে কেটে যাচ্ছে, আমি একজন সার্জেন হয়েছি। এক বিখ্যাত হার্ট সার্জেনের অধীনে কাজ করছি। নাজিরা আমার লাইসেন্স নিয়ে গেছে। আমি আর কোনোদিন মেডিসিন নিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারব না।

কাটজের দিকে নোয়েলে তাকাল- সত্যি?

তার মানে?

 ভদ্রলোকের মুখে বিষণ্ণতার ছাপ।

সময় এগিয়ে চলেছে। চারজন জার্মান সৈন্য ঢুকে পড়ল। সবুজ ইউনিফর্ম পরা। সামনে একজন করপোরাল।

করলোরাল চিৎকার করে বলল- আপনাদের পরিচিতি পত্রগুলো দেখাবেন।

ইসরায়েল কাটজের মুখ বিষণ্ণ হয়ে গেছে। নোয়েলে দেখল, উনি কেমন আচরণ করছেন। পাশের অলিন্দের দিকে তাকালেন।

উনি বললেন- এখনই আমার কাছ থেকে চলে যাও। সামনের দরজা দিয়ে।

 নোয়েলে বলল- কেন?

জার্মানরা কোনো কোনো খদ্দেরের কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

কাটজ বললেন- চলে-যাও, কোনো প্রশ্ন করো না।

নোয়েলে কী যেন ভাবল, তারপর দরজা দিয়ে চলে গেল।

এবার বোধহয় ইসরায়েলের পালা। ইসরায়েল এখন অসহায়। নোয়েলে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। সৈন্যরা তার দিকে তাকিয়েছে। নোয়েলে ফিরে আসছে কি?

এক করপোরালকে দেখা গেল তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে। তিনি বললেন ফয়লিন, আপনি কি এই মানুষটির সাথে এসেছেন?

–হ্যাঁ, আমরা শান্ত-শিষ্ট সাধারণ ফরাসি নাগরিক। আমাদের ওপর এই অত্যাচার কেন করা হচ্ছে?

–আমি দুঃখিত, ফয়লিন।

নোয়েলে চিৎকার করে কিছু বলার চেষ্টা করল। সে বলল আমি নোয়েলে পেজ। আমি থিয়েটারের অভিনেত্রী। এই ভদ্রলোক আমার সাথে অভিনয় করেন। আজ রাত্রে আমি আমার বন্ধু জেনারেল হানসের সাথে ডিনার খাব। আমি তাকে সব কথা বলব। দেখুন, কী পরিণতি হয়।

নোয়েলে দেখল, করপোরালের চোখে মুখে ভয়ের ছায়া, জেনারেল হানসের নামটাতে কাজ দিয়েছে।

-আমি দুঃখিত ফয়লিন, উনি বললেন, হ্যাঁ, আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি।

ইসরায়েল কাটজের দিকে তাকালেন বললেন, আমি তো ওনাকে চিনতে পারছি না।

কোথা থেকে পারবেন? অসভ্য শয়তানরা কেন যে থিয়েটার দেখতে যায়। তারপর নোয়েলে বললেন আমাকে কি অ্যারেস্ট করা হয়েছে? নাকি আমরা এখান থেকে যেতে পারব?

করপোরাল অবাক হয়েছেন, তিনি বললেন– না, আমাকে ক্ষমা করবেন।

ইসরায়েল কাটজ ওই সৈনিকের দিকে তাকালেন বাইরে বৃষ্টি পড়ছে করলোরাল। কেউ কি একটা ট্যক্সি ডেকে দেবে?

-হ্যাঁ, এখনই ব্যবস্থা করছি।

ইসরায়েল ট্যাক্সিতে বসলেন নোয়েলের সঙ্গে। জার্মান করপোরাল দাঁড়িয়ে ছিল। ট্যাক্সিটা এগিয়ে গেল। তিনটে ব্লক পার হয়ে একটা ট্রাফিক রাইটের সামনে ট্যাক্সিটা থেমে গেল। ইসরায়েল দরজা খুললেন। নোয়েলের হাতে হাত রাখলেন। কোনো কথা না বলে অন্ধকার রাতে মিলিয়ে গেলেন।

সন্ধ্যে সাতটা। নোয়েলে থিয়েটার ড্রেসিং রুমের দিকে চলে গেল। দুজন অপেক্ষা করছে। একজন জার্মান করলোরাল, অন্যজন কে? মাথায় চুল নেই, গোলাপি চোখ, ঠিক বুঝতে পারা যাচ্ছে না। বছর তিরিশ বয়স হয়েছে।

মিস নোয়েলে পেজ?

–হ্যাঁ, বলুন?

–আমি কর্নেল গেস্টাপো বলছি। আপনি জেনারেল হানসের সঙ্গে দেখা করেছেন?

–হ্যাঁ, কেন কী হয়েছে বলুন তো?

 –আজ তো দেখা হবার কথা ছিল, তাই না?

–হ্যাঁ, আমার সঙ্গে অনেকের দেখা হয়।

কর্নেল মাথা নাড়লেন– সকলের কথা মনে থাকে না, তাই তো? ঠিকই বলেছেন।

-এই বন্ধুটি, সে নাকি আপনার সঙ্গে অভিনয় করে?

 নোয়েলে গেস্টাপোর দিকে তাকাল। আর বলল- কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে।

না, ফয়লিন, করপোরাল বললেন, আপনি বলেছিলেন।

কর্নেল কঠিন চোখে সবকিছু দেখলেন।

 কুটমুলার বললেন-এই ঘটনাটা বারবার ঘটতে পারে। বিদেশী ভাষা তো, আদান-প্রদানে অসুবিধা হচ্ছে।

নোয়েলে বলল- আপনারা ঠিকই বলেছেন।

করপোরালের মুখে রাগের প্রতিচ্ছবি।

–আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য খারাপ লাগছে। কুটমুলার বললেন।

 নোয়েলের মনে হল, ব্যাপারটার এখানেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।

 নোয়েলে বলল- ঠিকই বলেছেন। টিকিট দেব কি? নাটকটা দেখবেন?

 গেস্টাপো বললেন আমি দেখেছি। করপোরাল হানসও দেখেছেন। ধন্যবাদ।

তিনি দরজার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন- করপোরালকে অসভ্য বদমাইস বললেন? সঙ্গে সঙ্গে উনি টিকিট কেটেছেন। লবিতে অ্যাক্টরদের ছবি ঝোলানো ছিল। কিন্তু আপনার বন্ধুর ছবি কোথাও নেই। সে কথাই আমরা আলোচনা করছিলাম।

নোয়েলের বুক ধড়পড় শুরু হয়েছে।

-মোয়াজেল, বলুন তো? লোকটা কি আপনার খদ্দের?

না, আমার বন্ধু।

 নামটা জানতে পারি?

–নাম জেনে কী হবে?

একজন ক্রিমিনালকে আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি। তার সাথে আপনার বন্ধুর চেহারার মিল আছে। ক্রিমিনালটাকে সেন্ট জর্জিয়ান চার্চের কাছে দেখা গেছে।

নোয়েলের মন ভারাক্রান্ত।

–আপনার বন্ধুর নাম কী?

–আমি ঠিক জানি না।

তার মনে, ওঁকে আপনি চেনেন না?

–হ্যাঁ।

 নীল দুটি চোখ নোয়েলেকে পর্যবেক্ষণ করছে। অবশ্য ওর পাশে আপনি বসেছিলেন। তার মানে? সৈন্যরা যাতে ওঁর কাগজপত্র পরীক্ষা করতে না পারে, আপনি তার ব্যবস্থা করেছেন।

নোয়েলে বলল- এর জন্য আমি দুঃখিত। উনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।

–কোথায়?

নোয়েলে সবকিছু ভেবে নিল, কতটা বলা যায়। তারপর বলল- কাফের বাইরে। সে বলেছিল, মুদির দোকান থেকে কিছু মালপত্র চুরি করেছে, বউ এবং ছেলেমেয়েকে খাওয়াবে বলে, সৈন্যরা তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি ভেবেছি, এটা একটা ছোটো অপরাধ। আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম।

গড়গড় করে শব্দগুলো উচ্চারণ করল নোয়েলে। তারপর তাকিয়ে থাকল।

মুলার নোয়েলের দিকে তাকালেন। বললেন- হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি, আপনি অভিনয়টা ভালোই শিখেছেন। কয়েকটা উপদেশ দেব মানবেন কি? ফরাসিরা বুদ্ধিমতী এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মাদমোয়াজেল, ভবিষ্যতে আর একটু সতর্ক হবেন।

নোয়েলে বলল- পৃথিবীতে কোনো কিছুতেই আমার ভয় নেই।

না, আপনি ভুল করছেন। একদিন আমাকে ভয় হবে। যদি শুনি, আর কিছু গড়বড় হয়েছে।

নোয়েলে ভাবতে পারছে না, ভবিষ্যতে কী হবে। দুজন লোক চলে গেল।

নোয়েলে বিধ্বস্ত হয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। হ্যাঁ, তার কথার মধ্যে ফাঁক আছে। গেস্টাপো সম্পর্কে অনেক গল্প সে শুনেছে। মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল শিহরণ। মনে হল ইসরায়েল কাটজকে ইতিমধ্যেই ধরা হয়েছে। ইসরায়েল কাটজকে প্রশ্ন করা হচ্ছে। নোয়েলের তখনই একটা নাম মনে হল, লে কাফার্ড, এই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করলে কেমন হয়?

.

আধ ঘণ্টা কেটে গেছে। নোয়েলে এখন স্টেজে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছে। মন থেকে সবকিছু বাদ দিয়ে দিয়েছে। যে চরিত্রে তাকে নামতে হবে, সেই চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে। অভিনয় শেষ হয়ে গেল। হাততালির ঝড়। ড্রেসিংরুমে চলে এল। কী অবাক। জেনারেল হানস বসে আছেন।

উনি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন- আজ রাতে আমরা এক সঙ্গে ডিনার খাব। তোমার আমন্ত্রণ। আমি কি ভুল শুনেছি।

সুন্দর রেস্টুরেন্ট, প্যারিস থেকে কুড়ি মাইল দূরে। জেনারেলের নিজস্ব গাড়ি, কালো লিমুজিন। বৃষ্টি থেমে গেছে। রাতটা সুন্দর, আরামদায়ক। জেনারেল সকালবেলার ঘটনার কথা বললেন না। খাওয়া শেষ হল। নোয়েলের মনে হল, জার্মানরা সবসময় কি খারাপ আচরণ করে?

জেনারেল বললেন- গেস্টাপো হেডকোয়াটার থেকে একটা খবর পেলাম। তুমি বলেছো, করপোরাল মুলারকে, আমরা আজ সন্ধ্যেবেলা একসঙ্গে ডিনার খাব?

উনি বললেন- আঃ, এমন একটা আমন্ত্রণ। আমাকে তো রাজী হতেই হবে।

নোয়েলে বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল–না, আমি একজন গরীব মানুষকে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম।

জেনারেলের কণ্ঠস্বরে তীক্ষ্ণতা- মিথ্যে কথা বলল না। জার্মানরা সবাই বোকা? তুমি কি জানো গেস্টাপো শব্দের আসল অর্থ কি?

নোয়েলে বলল- এসব কথা বলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন কেন?

এবার বোধহয় হানসের আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসবে। তিনি বললেন– কর্নেল মুলার আমাকে সবকিছু বলেছেন। তুমি এমন একজন মানুষকে সাহায্য করছ, পুলিশের চোখে যে জঘন্য অপরাধী। যদি ব্যাপারটা সত্যি হয়, তাহলে তোমাকে নানা সমস্যায় পড়তে হবে। কর্নেল মুলারকে তুমি চেনো না। উনি কোনো দিন কাউকে ক্ষমা করেন না। কেননা কথা ভুলে যান না।

উনি এবার নোয়েলের দিকে তাকালেন- তোমার বন্ধুর সঙ্গে আর দেখা হবে কি? তুমি কি কগনাক নেবে?

নোয়েলে মাথা নাড়ল।

 জেনারেল দুটো নেপোলিয়ান ব্র্যান্ডির অর্ডার দিলেন।

 উনি বললেন- তুমি কতদিন আরমান্দ গটিয়ারের সঙ্গে আছে?

–আমার মনে হয়, উত্তরটা আপনি জানেন।

 –তুমি কেন আমার সঙ্গে ডিনারে আসতে চাওনি? গটিয়ারের জন্য কি?

নোয়েলে মাথা নেড়ে বলল- না।

–আচ্ছা, আমি পরে দেখব।

 কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন। নোয়েলে অবাক হয়ে গেছে।

নোয়েলে বলল– প্যারিসে অনেক মেয়েরা ঘোরাঘুরি করে। আপনি তাদের কাছে কেন যাচ্ছেন না?

জেনারেল বললেন-তুমি বোধহয় আমাকে ঠিক মতো বুঝতে পারোনি। বার্লিনে আমার স্ত্রী আছে, আমার ছেলে আছে, আমি তাদের খুবই ভালোবাসি। একবছর বাড়ি ছাড়া। জানি না জীবনে আর তাদের সাথে দেখা হবে কিনা। এখানে আমার অনেক বন্ধু আছে। আরও বন্ধুত্ব করতে চাই।

নোয়েলে বলল- আমি তো আপনাকে কিছুই দিতে পারব না।

-সেটা আমার জানা আছে।

নোয়েলের সাথে জেনারেলের আর দেখা হবে কি? ঘটনা দ্রুত ঘটে চলেছে। লোকটাকে দেখে নোয়েলে অবাক হয়ে গেল। মাথার ভেতর বিদ্যুতের শিহরণ, বুদ্ধি আছে যথেষ্ট। একটার পর অন্য একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নোয়েলে হাঁ করে শুনছে। সব ব্যাপারে লোকটার অসম্ভব জ্ঞান। জার্মান জাতির অহংকার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

নোয়েলে জানতে চাইল আপনার মাথার ক্ষতচিহ্নটা কী করে হয়েছে?

জেনারেল জবাব দিলেনঅনেক বছর আগে আমাকে একটা ডুয়েলে লড়তে হয়েছিল। সেই লড়াইয়ের ফল।

জেনারেল আবার বললেন আমরা কিন্তু রাক্ষস নই। পৃথিবীকে শাসন করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। কিন্তু অপমানের দায়ভার নিয়ে কতদিন বেঁচে থাকব? কুড়ি বছর আগের সেই চুক্তিটা। ভারসাইলের সন্ধি। এটা হল আমাদের কাছে একটা ভয়ঙ্কর অপমান।

 প্যারিসের কথা উঠল। বলা হল, ফরাসি সৈনিকেরা নাকি জার্মানদের সাথে লড়াইতে পেরে উঠছে না।

জেনারেল আরও বললেন- নেপোলিয়নের মতো কাউকে দরকার।

 নোয়েলে বলল- আপনি কি আমার সঙ্গে মজা করছেন?

জেনারেল বললেন– না, আমি সত্যি কথা বলছি। নেপোলিয়নের সময় তোমাদের মধ্যে দেশপ্রেম ছিল। এখন সব হারিয়ে গেছে।

ডিনার শেষ হয়ে গেল। প্যারিসের রাজপথ দিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে।

জেনারেল জানতে চাইলেন- তুমি কি আরমান্দ গটিয়ারকে ভালোবাসো?

— এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর নোয়েলের জানা নেই।

উনি আবার মাথা নাড়লেন। আমি তোমাকে সুখী করতে পারব, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করবে?

–যেভাবে আপনি আপনার স্ত্রীকে সুখী করেছেন, তাই তো?

জেনারেল কঠিন চোখে তাকালেন। তারপর বললেন আমি কি তোমার ভালো বন্ধু হতে পারি? আমরা কখনও কেউ কারও শত্রু হব না।

নোয়েলে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরল। রাত তিনটে বেজে গেছে। আরমান্দ গটিয়ার এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন।

তিনি বললেন- এতক্ষণ কোথায় ছিলে?

–আমার একটা এনগেজমেন্ট ছিল।

নোয়েলে ঘরে ঢুকে পড়ল। মনে হল, ঘরে যেন সাইক্লোন হয়ে গেছে। ড্রয়ারগুলো খোলা, ক্লোসেটের জিনিসপত্র এলোমেলো ছড়ানো। একটা ল্যাম্প ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ছোটো টেবিলটা উল্টে দেওয়া হয়েছে।

কী হয়েছে? নোয়েলে জানতে চাইল।

 গেস্টাপো এসেছিল। তুমি ভালো আছে তো নোয়েলে?

 হা, ভালো আছি।

 –তা হলে ওরা একাজ কেন করল?

নোয়েলে চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক কিছু চিন্তা করছে। তারপর সে বলল কিছুই বুঝতে পারছি না।

গটিয়ার বললেন, রহস্যটা জানতেই হবে।

নোয়েলে সব কথা বলল, ইসরায়েল কাটজের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। নামটা সে বলেনি। কর্নেল মুলারকে বোকা বানাবার চেষ্টা করেছে।

শেষ অব্দি সে বলল আমার বন্ধু লে কাফার্ড। কিন্তু আমি তা কী করে বিশ্বাস করব।

গটিয়ার চেয়ারে বসলেন- হায় ঈশ্বর, আমি জানি না লে কাফার্ডের আসল পরিচয় কী? কিন্তু আমাদের তো ধ্বংস করে ফেলা হবে। জার্মানদের আমি ঘেন্না করি।

তিনি আবার বললেন– জার্মানরা এদেশে অশান্তির বাতাবরণ জিইয়ে রাখবে। গেস্টাপোরা আরও অত্যচারী হয়ে উঠবে। ওই ইহুদি লোকটির নাম কী?

–আমি বলব না।

–সে কি তোমার প্রেমিক?

না, আরমান্দ।

–তাহলে বলছ না কেন?

 –আমি দায়বদ্ধ।

গটিয়ার বললেন- হয়তো এখনই চিন্তার কিছু নেই। আর কখনও ওর সঙ্গে দেখা হবে কি তোমার?

নোয়েলে বলল– আমি ঠিক জানি না।

পরের দিন নোয়েলেকে দুজন গেস্টাপোর অনুচর নিঃশব্দে অনুসরণ করছে।

.

এরপর থেকে নোয়েলের প্রতিটি গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হল। নোয়েলে বুঝতে পারছে, কেমন একটা শিরশিরানি অনুভূতি।

গটিয়ারকে সে কিছুই বলছে না। গটিয়ারকে ভয় দেখিয়ে লাভ? জীবন তার এই রকমভাবে কেটে চলেছে। জেনারেলের কাজ থেকে কয়েকটা টেলিফোন কল এসেছে। নোয়েলে ফোনগুলো ধরেনি। বারবার ইসরায়েল কাটজের কথা মনে পড়ছে।

দু-সপ্তাহ কেটে গেছে। ইসরায়েলকে দেখা গেল। খবরের কাগজের পাতায় বড়ো বড়ো করে ছাপা হয়েছে। গেস্টাপোেরা একদল দুবৃত্তকে ধরে ফেলেছে। লে কাফার্ড তাদের নেতা। নোয়েলে পুরো প্রতিবেদনটা পড়ল। কিন্তু বলা হয়নি, লে কাফার্ডকে ধরা সম্ভব হয়েছে কিনা। নোয়েলের মনে হল, ইসরায়েল কাটজ বোধহয় লুকিয়ে আছেন। কিন্তু তাকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় গেস্টাপোরা ধরে ফেলবেই। নোয়েলে ভাবল, এটা কি আমার কষ্টকল্পনা? এখন ইসরায়েল কাটজ বোধহয় ছুতোরের ছদ্মবেশ ধারণ করেছেন। যেমনটি তিনি বলেছিলেন। গেস্টাপোরা কেন এত চিন্তিত?

উনি কি পালিয়ে গেছেন? নোয়েলে জানলা দিয়ে তাকাল রাস্তার দিকে। কালো রেইনকোট পরা দুজন দাঁড়িয়ে আছে। কীসের জন্য অপেক্ষা? নোয়েলে বুঝতে পারল, কখন সে এই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরোবে, তার জন্যই দুজন দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেল মুলারের শব্দগুলো মনে পড়ল– একদিন তুমি আমাকে ভয় পাবে।

এটা একটা চ্যালেঞ্জ। এখনই ইসরায়েল কাটজের সঙ্গে দেখা করার জন্য নোয়েলে উদগ্রীব হয়ে উঠল।

.

পরের দিন সকালবেলা, খবর এসেছে। সত্তর বছরের কেউ একজন তার সাথে দেখা করতে এসেছে। যার মুখে বলিরেখা, নীচের দাঁত ভেঙে গেছে। নোয়েলে এলিভেটরের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর? কে যেন বলল, বেকারিতে কেক তৈরি আছে, যেটা তুমি অর্ডার দিয়েছিলে।

নোয়েলে অবাক হয়ে তাকাল। বলার চেষ্টা করল আমি তো কেকের অর্ডার দিইনি।

ভদ্রলোক ভাঙা ভাঙা ফরাসি উচ্চারণে বললেন- সে কী? রুয়ে দেপাসি।

নোয়েলে বুঝতে পাল, হা, এবার বোধহয় বোঝা যাচ্ছে। গেস্টাপোর দুজন তখনও তাকিয়ে আছে। সে বোধহয় একজন ক্রিমিনাল। দুজন পরস্পরের মধ্যে কথা বলছে। নোয়েলে এগিয়ে গেল। ব্যাক করিডরের দিকে। বেসমেন্টের দিকে সিঁড়ি চলে গেছে। তারপর ছোট্ট একটা অলিন্দ পথ। তিন মিনিট বাদে সে একটা ট্যাক্সিতে উঠে বসেছে। এখনই ইসরায়েল কাটজের সঙ্গে তার দেখা হবে।

.

বেকারিতে পৌঁছে গেল। সাধারণ চেহারার একটা অঞ্চল। চারপাশে মধ্যবিত্তদের বসবাস। জানলা দিয়ে তাকাল। নোয়েলে দরজা খুলল। ভেতরে ঢুকে পড়ল। একজন ভদ্রমহিলা বসে আছে, সাদা অ্যাপ্রন পরে- ইয়েস মাদমোয়াজেল?

নোয়েলে থমকে গেল। ভদ্রমহিলা অপেক্ষা করছেন।

নোয়েলে বলল- জন্মদিনের কেক তৈরি হয়েছে কি?

ভদ্রমহিলা মাথা নেড়ে বললেন- হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আপনি ওদিকে এগিয়ে যান।

 ছোট্ট একটা বিছানা, মুখে যন্ত্রণা তার। সারাদেহে ঘাম।

ইসরায়েল?

 নোয়েলে আরও কাছে এগিয়ে গেল। তার সমস্ত শরীরে একটা যন্ত্রণা।

সে বলল- কী হয়েছে?

–তারা লে কাফার্ডকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি।

নোয়েলে বলল- আমি সব কিছু পড়েছি। আপনি ঠিক আছেন তো?

 ইসরায়েল যন্ত্রণা চেপে রাখার চেষ্টা করলেন। কোনোরকমে কথা বলছেন তিনি।

-গেস্টাপো প্যারিস শহরকে ধ্বংস করবে। যদি আমি একবার এই শহরের বাইরে যেতে পারতাম। লে হাবরেতে। ওখানে আমার অনেক বন্ধু আছে।

আমি কি সাহায্য করব? আপনার কেউ নেই? নোয়েলে জানতে চাইল। আপনি একটা ট্রাকের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারেন না?

না, রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটা ইঁদুরও এখন প্যারিস থেকে পালাতে পারবে না।

নোয়েলে ভাবল, অন্য কোনো ভাবে?

না, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

 দরজা খুলে গেল। দাড়িওয়ালা একজন ভদ্রলোক ঢুকে পড়েছে। তার হাতে একটা কুঠার। সে এগিয়ে গেল খাটের দিকে। নোয়েলে বুঝতে পারল, এখন কী ঘটনা ঘটতে চলেছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ল। টেপো আলবিননা, গেস্টাপোর সেই নেতা।

নোয়েলে তখনও বলছে, আমি আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করব।