৫. পেছনে কারা যুদ্ধে মেতেছে

৫১.

পেছনে কারা যুদ্ধে মেতেছে, দেখার সময় নেই রানার। টিলার চূড়ায় উঠেই থমকে গেল। সামনেই মস্ত হাঁ মেলেছে বিশাল এক বৃত্তাকার গহ্বর। ঢালু দেয়াল নেমেছে অন্তত তিন শ ফুট। এত ওপর থেকে মনে হলো, ওটা উন্মুক্ত খনির প্রকাণ্ড মুখ। নিচে গিয়ে ঢালু দেয়াল মিশেছে নিথর জলের সুনীল এক লেকে।

নামতে হবে, বিড়বিড় করল রানা।

লেকের মাঝে বিশ ফুট বৃত্তাকার, পাথুরে, সমতল ছোট্ট দ্বীপ। আর্কিওলজিস্ট প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন গতরাতে বলেছিলেন ওটার কথা। লেক ছুঁড়ে উঠেছে। এক পাশের সিঁড়ি নেমেছে লেকের জলে। সাঁতরে গিয়ে উঠতে হবে ওই দ্বীপে।

চারপাশে চোখ বোলাতেই একটু দূরে সরু একটা পথ দেখল রানা। কিন্তু ওই পথে যাওয়ার সময় ওর হাতে নেই। ঢালু দেয়াল বেয়ে পিছলে নামল রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর থামল প্রায় খাড়া এক জায়গায়। তখনই বজ্রপাতের আওয়াজ তুলে মাথার ওপর স্থির হলো কী যেন!

মুখ তুলে তাকাল রানা, টিলা টপকে হাজির হয়েছে ল্যাং এর স্কাইক্রেন হেলিকপ্টার। খুলে গেছে দরজা। এবার ওকে গেঁথে ফেলবে ইপার। কিন্তু বিস্মিত হলো রানা। দরজায় থেমেছে রুপালি চকচকে আমার পরা এক লোক!

কিছু ভাবার আগেই তিরিশ ফুট ওপর থেকে লাফিয়ে ভারী পাথরের মত নেমে এল সে। রানা সরার আগেই দুজনের বুকে লাগল বেকায়দা ধাক্কা। ভারসাম্য হারিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল ওরা!

.

গানশিপ নিয়ন্ত্রণে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ইগোর দিমিতভ, কিন্তু সর্বনাশ হয়েছে ইঞ্জিনের। বিকট জোরালো ধুপ শব্দে মেসার ঘাসে পড়ে পঞ্চাশ ফুট পিছলে থামল হিন্দ-ডি।

সিটবেল্ট বাঁধা বলে ছিটকে উইণ্ডশিন্ডে পড়েনি মিতা। হার্নেস থেকে নিজে মুক্ত হয়ে খুলে দিল ইগোর দিমিতভের সিটবেল্ট। বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার থেকে নেমে পড়ল দুজন। এদিকে চড়-চড় শব্দে পুড়তে শুরু করেছে হিন্দ-ডি।

বিশ ফুট যেতেই খেয়াল করল মিতা, খুঁড়িয়ে হাঁটছে ইগোর দিমিতভ। জানতে চাইল ও, আপনার কী হয়েছে?

মৃদু মাথা নাড়ল রাশান। ভেঙে গেছে ডান গোড়ালি। আমার লড়াই শেষ।

উপত্যকার যেদিকে দেখেছে ল্যাং-এর লোক, ওদিকে তাকাল মিতা। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, আপনার পিস্তলটা দিন।

বিনা-বাক্যে কোমরে গোঁজা ম্যাকারভ মিতার হাতে দিল ইগোর দিমিতভ।

ক্রল করে পৌঁছে বোল্ডারের মাঝ দিয়ে উঁকি দিল মিতা। বুকে টের পেল স্বস্তির ঝিরঝিরে ঢেউ। ফিরতি পথে চলেছে ল্যাং-এর লোক। যুদ্ধ শেষ তাদেরও।

আবারও ইগোর দিমিতভের কাছে ফিরল মিতা। এদিকটা নিরাপদ। অপেক্ষা করুন। কাজ শেষ হলে রানাকে নিয়ে ফিরব। তারপর দেখব ভাঙা গোড়ালির কী করা যায়।

আপনার যেতে হবে টিলার পশ্চিমে।

ওদিকে তাকাল মিতা। এক হাজার গজ দূরে টিলার চূড়ায় ভাসছে তৃতীয় স্কাইক্রেন হেলিকপ্টার। আকাশে ঘুরছে শামুকের গতি তুলে। ওদিকে কোথাও নেই রানা। তবে ওর আর ভাসমান হেলিকপ্টারের মাঝে মেসা ধরে ছুটছে খুব ছোট কেউ! উচ্চতা তার তিন ফুট!

পিচ্চি পাবলো!

.

পুরো এক শফুট পিছলে ও গড়িয়ে এবড়োখেবড়ো কিছু পাথরের সরু এক কার্নিশে থামল রানা। পাশেই হুয়াং লি ল্যাং!

সামনে বেড়ে আছে কার্নিস। সরাসরি দু শফুট নিচে নীল লেক।

একইসময়ে পাথুরে জমি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রানা ও ল্যাং।  

লাফ দিয়ে এগোল রানা। হামলাকারীর বুকে প্রচণ্ড এক ঘুষি বসাল। কিন্তু ওটা অনায়াসে ঠেকাল শত্রুর আমার পরা কবজি। পরক্ষণে ঘুষি মারল লোকটা।

ওটা ভীষণ মারাত্মক!

ভুস করে বেরোল রানার বুকের সমস্ত বাতাস। টলতে টলতে পা পিছলে চিত হয়ে পড়ল ও। জীবনে অনেক লড়াই করেছে, কিন্তু আগে জানত না কেউ এত ব্যথা দিতে পারে!

ল্যাং-এর শক্তি ভবিষ্যতের দানবীয় কোনও রোবটের মত!

ধড়মড় করে উঠে সরতে চাইল রানা। কিন্তু সামনে বেড়ে খপ করে ওর কলার চেপে ধরল লোকটা। পরক্ষণে তুলে ফেলল শূন্যে।

ভেজা বেড়ালের মত করুণভাবে ঝুলছে রানা। বিস্মিত চোখে দেখল, ভঙ্গুর দেহের লোক হুয়াং লি ল্যাং। কিন্তু নানাদিকের হাইড্রলিক অ্যাকচুয়েটর, প্যাডিং ও আর্মার তাকে করে তুলেছে খেপা মোষের মতই শক্তিশালী।

তুমি আসলে খুব সামান্য মানুষ, কর্কশ স্বরে বলল লোকটা।

সত্যি কথা, হাড়ে হাড়ে বুঝেছে রানা। ঝুলতে ঝুলতে ঘুষি মারল শত্রুর ঘাড়ের পাশে। কিন্তু আরেক হাতে মুহূর্তে ঘুষি ঠেকিয়ে দিল ল্যাং। নির্বিকার সুরে বলল, যা চাই, ওটা দিয়ে দাও। তা হলে সহজে মরতে পারবে।

মরতে চাই কে বলল তোমাকে? দাঁতে দাঁত চেপে লোকটার অণ্ডকোষ লক্ষ্য করে কষে লাথি ছুঁড়ল রানা।

খটাং শব্দে লাগল জায়গা মত!

কিন্তু রানার মনে হলো পায়ের টনটনে ব্যথায় দুভাজ হবে ও সংবেদনশীল অঙ্গ স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে বাঁধিয়ে এসেছে হারামজাদা আধা রোবট ব্যাটা!

দাও ওই স্ফটিক! কড়া ধমক দিল হুয়াং লি ল্যাং।

লজ্জাজনকভাবে হেরে গেছে অসহায় রানা। নরম সুরে বলল, আগে পিঠ থেকে নামাতে হবে ব্যাকপ্যাক।

ধপ করে ওকে সামনে নামাল ল্যাং। কই?

পিঠ থেকে ব্যাকপ্যাক খুলল রানা, পরক্ষণে ল্যাং-এর কানের তিন ইঞ্চি দূর দিয়ে ওটা ছুঁড়ল সংকীর্ণ কার্নিশে। বদমাশটাকে পাশ কাটিয়েই ঝেড়ে দৌড় দিল। এবার ব্যাকপ্যাক তুলে নিয়েই একটু দূরের ঢালু দেয়াল বেয়ে সরসর করে নামবে। তুলল ওটা…।

কিন্তু ঝড়ের গতি শক্রর। ঘুরেই ল্যাং মারল হুয়াং লি ল্যাং!

কিছু বোঝার আগেই হোঁচট খেল রানা। তাল হারিয়ে খসে পড়ল কার্নিশের কিনারা থেকে!

আঁকড়ে ধরেছিল বলে সঙ্গে চলেছে স্ফটিক রাখা ব্যাকপ্যাক।

দুই শ ফুট নিচে লেকের সুনীল জল!

সাঁই-সাঁই করে নামছে রানা। কানের পাশে শোঁ-শোঁ শব্দ!

এদিকে প্রচণ্ড রাগে কর্কশ একটা গর্জন ছাড়ল হুয়াং লি ল্যাং।

সামান্য লোক মাসুদ রানা ঠকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার স্কটিক!

 বিশাল লাফে কিনারা পেরিয়ে গেল সে, চলেছে সোজা লেক লক্ষ্য করে!

কসেকেণ্ড পর বুঝল, দুশ ফুট উঁচু কার্নিশ থেকে পড়েই তীরের মত লেকের জলে তলিয়ে গেছে রানা!

স্বচ্ছ কাঁচের মত জলে এখন অসংখ্য বৃত্তাকার ঢেউ!

 তিন সেকেণ্ড পর একই আলোড়ন তৈরি করল ল্যাং।

ওদিকে লেকের পঞ্চাশ ফুট নিচে তলিয়ে গেছে রানা। ওপরে শুনেছে জোরালো, ভোতা ঝপাৎ শব্দ। হাল ছাড়েনি চাইনিজ দানব! রানা বুঝে গেছে, বাঁচতে হলে সরে যেতে হবে। তবে নড়ার আগেই দেখল, হাজির হয়েছে ল্যাং!

তার আর্মার সুট ওঅটারপ্রুফ!

ওপরে উঠতে প্রাণপণে দুপা ছুঁড়ল রানা।

কিন্তু হাত বাড়িয়ে ওর গোড়ালি ধরে ফেলেছে চাইনিজ বিলিয়নেয়ার।

বাম পায়ে তার ঘাড়ে দুর্বল লাথি মারল রানা। দম ফুরাবার আগেই উঠতে হবে ওপরে!

একই কাজ করত হুয়াং লি ল্যাং, কিন্তু আর্মার, হাইড্রলিক ও ব্যাটারি প্যাক-এর ভারী ওজন কমপক্ষে এক শ পাউণ্ড!

গোড়ালি খামচে ধরে রানাকে টেনে নিয়ে ভারী পাথরের মত চলল সে লেকের তলদেশে!

.

হামভিতে চেপে জেমস ব্রায়ানের পিছু নিয়েছে সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু। পেছনের এয়ার ফোর্সের এসপির উদ্দেশে ঘেউ করে উঠল, গুলি কর! খুন কর, শালা, হারামজাদাকে!

হামভির পাশ দিয়ে রাইফেলের নল বের করে গুলি করল সৈনিক। কিন্তু ট্রাকের ক্যাবের পেছনে ব্রাযিল স্টোন রাখার ভারী ভল্ট। রাইফেলের গুলির সাধ্য নেই লক্ষ্যভেদ করবে, স্টিলের দেয়ালে লেগে নানান দিকে ছিটকে পড়ছে ঠুং-ঠাং শব্দে।

তুমুল বেগে ছুটছে দ্বিতীয় হামভির ড্রাইভার। গুলির জন্যে খুঁজছে ভাল অ্যাংগেল। কিন্তু বারবার ট্রাক এদিক-ওদিক সরিয়ে নিচ্ছেন ব্রায়ান। মস্ত ট্রাকের লেজ দিয়ে টানেলের দেয়ালে পিষে দিতে চাইলেন হামভিটাকে।

অন্ধকার সুড়ঙ্গে ছিটকে উঠল কমলা ফুলকি।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল হামভি, তিন গড়ান দিয়ে লাগল গিয়ে ওদিকের দেয়ালে। তার আগে ধাক্কা দিয়েছে ক্যালার হামভির নাকে।

কাত হতে শুরু করেও শেষ মুহূর্তে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সামলে নিল ক্যালাপুর ড্রাইভার। পেছনে ফেলে এল বিধ্বস্ত হামভি। এই ধাওয়ায় অংশ নিয়েছে তৃতীয় হামভি। কিন্তু ঝড়ের গতি তুলে ছুটে চলেছেন ব্রায়ান। গতি আরও বাড়ছে ট্রাকের।

চাকা লক্ষ্য করে গুলি! গলা ফাটাল ক্যালাণ্ড। থামাতে হবে হারামজাদাকে, নইলে আমরা সবাই শেষ!

তার কথা শেষ হতে না হতেই গোটা কমপ্লেক্স জুড়ে শুরু হলো কর্কশ অ্যালার্ম। ওটা ছাপিয়ে এল কমপিউটারাইড় এক নারীর মিষ্টি কণ্ঠ: One minute to EM Burst Event. Shut down all electrical systems. Repeat, shut down all electrical systems.

হামভির ক্যাবে আছে ডিজিটাল রিডআউট। চট করে ওটা দেখল ক্যালাগু। মরা কাঠের মত শুকিয়ে গেল গলা।

সুড়ঙ্গের মাঝে রিনরিনে নারীকণ্ঠ অনুত্তেজিত স্বরে বলল, Fifty-five… fifty-four… fifty-three.

ক্যালাগু দূরে দেখল সুড়ঙ্গের মুখে ঝকঝকে সাদা আলো।

 ওখানে কোনওভাবেই পৌঁছুতে দেয়া যাবে না ব্রায়ানকে!

বন্ধ করো দরজা! রেডিয়োতে চিৎকার ছাড়ল ক্যালাপ্ত, বন্ধ করো নরকের দরজা!।

.

টাইটানিক জাহাজের গতি তুলে তলিয়ে চলেছে রানা। টের পাচ্ছে চাপ বাড়ছে কানের ওপর। খামচে ধরতে চাইল একটু দূরের খাড়া দেয়াল। কিন্তু মসৃণ এ্যানেট পাথরে নেই ফাটল বা ভাঁজ!

রানার গোড়ালি শক্ত করে ধরেছে ল্যাং-এর যান্ত্রিক হাত। নেমে চলেছে ওরা নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে!

মুক্ত পায়ে ল্যাং-এর বুকে লাথি মারল রানা। কিন্তু তাতে ওই পা-ও ধরতে চাইল দানবটা। সফল হলো না দুজনের কেউই। পাথরের মত নেমে এল ওরা লেকের পাথুরে তলদেশে। জোর ঝাঁকি লেগে ল্যাং-এর হাত থেকে ছুটে গেল রানার গোড়ালি। কিন্তু তখনই সামনে বেড়ে ওর গলা আঁকড়ে ধরল সে। এবার খুশিমনে ছিঁড়বে কণ্ঠনালী!

খুন হবে, বুঝে গেছে রানা। তবুও ব্যস্ত হয়ে ডানহাতে ধরল ল্যাং-এর ঘাড়ের পাশের হাইড্রলিক পাইপ, পরক্ষণে দিল হ্যাঁচকা টান।

সরু সব তার মোড়া পাইপ, ছিঁড়ল না।

রানার কণ্ঠনালীতে বাড়ল ল্যাঙের আঙুলের চাপ। সময় নিয়ে কষ্ট দিয়ে ওকে খুন করতে চায় লোকটা!

দুহাতের সমস্ত জোর খাঁটিয়ে মোড়ানো তার বিশ্রীভাবে মুচড়ে দিল রানা।

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাইড্রলিক অ্যাকচুয়েটর সিস্টেম। খুলে গেল হুয়াং লি ল্যাঙের মুঠি। ওর পেটে একটা লাথি মেরে সরে গেল রানা। প্রাণপণে হাত-পা নেড়ে উঠে যেতে লাগল ওপরে। একটু পরেই ফুরাবে ফুসফুঁসের সব বাতাস। উঠতে উঠতে একবার তাকাল নিচে।

পাথুরে মেঝে ছেড়ে উঠে আসতে চাইছে হুয়াং লি ল্যাং। কসেকেণ্ড পর বুঝল, এত ওজন নিয়ে ভেসে ওঠা অসম্ভব। পাগল হয়ে উঠল সে। তাকাল মসৃণ দেয়ালের দিকে! ভয় পেয়েছে ভীষণ। তাড়াহুড়ো করে খুঁজতে চাইল অন্য উপায়। কিন্তু তার জন্যে খোলা নেই কোনও পথ। অসহায় চোখে তাকাল ওপরে।

ওই যে উঠে যাচ্ছে বদমাশ মাসুদ রানা!

এদিকে বুক আঁকড়ে আসছে রানার। অক্সিজেনের অভাবে যে-কোনও সময়ে জ্ঞান হারাবে। উঠছে পূর্ণ গতি তুলে।

পাঁচ সেকেণ্ড পর ভুস করে ভেসে উঠল গভীর লেকের খাড়া কিনারায়। বিষাক্ত কার্বন-ডাইঅক্সাইড ছেড়ে বুক ভরে নিল তাজা অক্সিজেনে। বিশ্রাম নেয়ার সময় নেই। রওনা হলো সেনোটের মাঝের দ্বীপ লক্ষ্য করে।

স্ট্যাটিকের চড়-চড়ে অনুভূতি, খুব শিরশির করছে শরীর। দুই মায়ান স্ফটিক শুরু করছে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বিচ্ছুরণ। অস্থির হয়ে নাচছে লেকের জল। গভীর থেকে এল গুরুগম্ভীর আওয়াজ।

দ্বীপের পাশে সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেল রানা। টলতে টলতে উঠে গেল ওপরে। পৌঁছুল মাঝের কূপের পাশে।

সামনেই প্রফেসরের সেই দেহ উৎসর্গের আয়না।

কূপের ভেতর চোখ বোলাল রানা। তলা থেকে আসছে ভীষণ কোনও কম্পন, ফলে ওর দেহ জুড়ে শুরু হয়েছে টনটনে ব্যথা। মাথার ভেতর ভয়ঙ্কর গুঞ্জন। ওর মনে হলো, সব ছাপিয়ে আসছে মস্ত, বিরাট এক ঢেউ।

চোখের কোণে কিছু নড়তে দেখল রানা। ঘুরে তাকাল তীরের দিকে। ঢালু পাথুরে দেয়াল বেয়ে নেমে আসছে পাবলো!

আরে! ছেলেটা এখানে এল কী করে?–ভাবল রানা।

পাবলো এসে থামল লেকের তীরে। হাত বাড়িয়ে পানি থেকে তুলে নিল রানার ভাসমান ব্যাকপ্যাক।

টান দিয়ে খুলছে ওটার চেন।

না, পাবলো! তীব্র ব্যথা সহ্য করে প্রাণপণে চেঁচাল রানা। সরে যাও!

কিছুই শুনল না পিচ্চি পাবলো। ব্যাগে ভরে দিয়েছে হাত। বের করে নিল সীসা দিয়ে বাঁধানো বাক্স। ওটা থেকে নিয়ে অবাক চোখে দেখল চকচকে স্ফটিক, যেন পেয়েছে স্বর্গীয় কিছু।

পরবর্তী আওয়াজের ঢেউ এল প্রচণ্ড বেগে। থরথর করে কাপল চারপাশ। প্রচণ্ড ব্যথার মধ্যেও পাবলোর দিকে চেয়ে আছে রানা। ছেলেটার অল্প দূরে দেখতে পেল মিতাকে। প্রায় দৌড়ে নেমে আসছে ও। চোখ পাবলোর ওপর।

আবারও এল ইলেকট্রোম্যাগনেটিক আরেকটি ঢেউ। এবার আরও ভয়ঙ্কর। জোরালো ভূমিকম্পে থরথর করে কাঁপল  দুনিয়া। ছোট্ট দ্বীপ ভাসিয়ে নিতে উঠে আসছে লেকের জলরাশি।

যেন চুরমার হচ্ছে গোটা পৃথিবী। প্রবল ভূকম্পনে ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে গেল রানা। ক্রল করে পৌঁছুল কূপের কপিকলের সামনে।

ওটা ব্যবহার করতে বলেছেন প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন।

.

তুমুল বেগে চলেছে প্রকাণ্ড ট্রাক, মেঝের সঙ্গে অ্যাক্সেলারেটর চেপে রেখেছেন ব্রায়ান। অবাক হলেন, বুজে আসছে সামনের আলো!

বন্ধ হচ্ছে ইয়াকা মাউন্টেনের সুড়ঙ্গের প্রকাণ্ড দুই কবাট!

Twenty-nine… twenty-eight… twenty-seven.

সুড়ঙ্গ মুখে এক পাশে রাখা খোঁড়ার মেশিনটা পেরিয়ে গেলেন ব্রায়ান। অনেকটা চওড়া হলো সুড়ঙ্গ। একইসময়ে বাম থেকে ক্যাবের পাশে পৌঁছুল দ্বিতীয় হামভি। বিশাল ট্রাক নিয়ে ওটার দিকে চেপে এলেন ব্রায়ান।

একরাশ গুলি ঢুকল ক্যাবে। গাল কুঁচকে ফেললেন ব্রায়ান। এইমাত্র উড়ে গেছে রিয়ার ভিউ মিরর। তার ডান বাহুতে লাগল একটা বুলেট। হাত থেকে ছুটে গেল স্টিয়ারিং হুইল।

তখনই হঠাৎ করে বিস্ফোরিত হলো ট্রাকের সামনের একটা চাকা। বাঁক নিল যন্ত্রদানব, তাল হারিয়ে কাত হয়ে পড়ল রাস্তার ওপর। কর্কশ ধাতব আওয়াজ তুলে হেঁচড়ে চলেছে প্রবেশ পথের দিকে। কিন্তু থেমে গেল এক্সিট ডোের থেকে বিশ ফুট আগে।

মিষ্টি সুরে জানাল কমপিউটারাইযড় নারীকণ্ঠ: Twenty three… twenty-two… twenty-one.

ভাঙা উইণ্ডশিল্ডের প্লাস্টিক মেশানো কাঁচ লেগে কেটে গেছে ব্রায়ানের মুখ, দরদর করে পড়ছে রক্ত। বুজে গেছে ডান চোখ। বাম চোখে বাইরে তাকালেন। ভাবলেন, এখনও একটা সুযোগ আছে!

মেঝে থেকে কোট তুলে ক্রল করে বেরোলেন বিধ্বস্ত ট্রাক থেকে। উঠে দাঁড়িয়ে চললেন একটু দূরের আলোর দিকে।

অ্যালার্মের তীব্র আওয়াজের ওপর দিয়ে শুনলেন: Nineteen… cighteen…

হঠাৎ এক পা-ও আর এগোতে পারলেন না ব্রায়ান। ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন প্রায় বুজে আসা চোখে।

পেছন থেকে টাই টেনে ধরেছে সিআইএ চিফ ক্যালাগু। ভাব দেখে মনে হলো, এইমাত্র খুঁজে পেয়েছে অবাধ্য কুকুরকে।

দেরি করে ফেলেছ, কর্কশ স্বরে বলল ক্যালাগু। কেড়ে নিল ব্রায়ানের হাতের কোট! একইসময়ে ধুম করে ধাতব আওয়াজ তুলে বন্ধ হলো সুড়ঙ্গ-মুখের ভারী দুই স্টিলের কপাট।

দ্রুত হাতে ব্রায়ানের কোট সার্চ করল ক্যালাগু।

কিছুই নেই ভেতরে!

Fifteen… fourteen..

এখানেও কিছুই নেই! বিধ্বস্ত ক্যাব থেকে উঁকি দিল এক গার্ড।

কোথায় ওটা? চিৎকার করে জানতে চাইল ক্যালাগু।

করুণ চেহারায় তাকে দেখলেন পরাজিত ব্রায়ান। তবে শান্ত স্বরে বললেন, ওটা আমার কাছে নেই।

দ্বিধা-ভয় ক্যালাগুর চোখে-মুখে। তারপর হঠাৎ করেই বুঝে গেল সব। ঝট করে ঘুরে তাকাল গভীর সুড়ঙ্গের দিকে।

ক্যাথিবা আলিহা!

.

ইয়াকা মাউণ্টেনের সুড়ঙ্গে বহু দূরে স্টিলের মই বেয়ে প্রায় চূড়ার কাছে পৌঁছেছেন রেড ইণ্ডিয়ান বিজ্ঞানী ক্যাথিবা আলিহা। কয়েক শ ফুট নিচে সুড়ঙ্গের মেঝে, পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু, তবুও তার বুকে কোনও ভয় নেই। শুনলেন আরও জোরালো হয়ে বাজছে অ্যালার্ম। বেশ কয়েক ধাপ উঠে হ্যাঁচ খুলবেন, এমনসময় শুনলেন: Three…

অন্ধকার সুড়ঙ্গ ছেড়ে সূর্যের আলোয় বেরোতে হবে!

 শুনলেন মিষ্টি নারীকণ্ঠ: Two…

ন্যাভেজো গালি বকে ঝট করে খুললেন হ্যাঁচের দরজা। চোখে পড়ল ন্যাভেজো সূর্যের কড়া সোনালি রশ্মি। ছিটকে বেরিয়ে এসে পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলেন ক্যাথিবা আলিহা, হাতে সেই স্বচ্ছ ব্রাযিল স্টোন। পেছনে শুনলেন মিষ্টি কণ্ঠ: One…

.

যা আছে কপালে! বিড়বিড় করে কূপের লিভার টানল রানা।

খুলে গেছে লিভারের কাউন্টারওয়েইট। প্রচণ্ড বেগে ঘুরছে কপিকল। তুমুল বেগে নেমে গেল ভারী পাথরের স্তূপ, একই বেগে উঠে এল কূপের পাশে ধাতব একটা বাটি।

পলকের জন্যে ওটার ভেতর স্ফটিক দেখল রানা।

যেন স্থির হয়ে গেছে গোটা পৃথিবী।

 অবাক হয়ে রানা দেখল, কিছুই ঘটছে না।

 পরক্ষণে জীবনের বড় একটা শখ পূরণ হলো ওর।

নিচ দিয়ে যাওয়া কবুতরের মত সই-সাঁই করে উড়ে চলল রানা। মাত্র কয়েক ফুট নিচেই বিক্ষুব্ধ নীল লেক। তীব্র যন্ত্রণা মিলিয়ে গেলে ভাবত, ও আছে স্বর্গে!

বুঝবার আগেই এক পলকে তীরের কাছে পৌঁছে গেল রানা। ঝপাস্ করে পড়ল পানির ভেতর। কান-মাথার যন্ত্রণায় মনে হলো মারা পড়বে ও।

শুরু হয়েছে আরও ভয়ঙ্কর কী যেন!

বিকট আওয়াজে থরথর করে কাঁপছে দুনিয়া।

প্রচণ্ড ব্যথায় রানার শরীর থেকে হারিয়ে গেল সমস্ত শক্তি।

চারপাশ থেকে আসছে জোরালো গুমগুম আওয়াজ!

তলিয়ে যেতে লাগল রানা। চেতনা হারাতে হারাতে ভাবল, তা হলে এই পাহাড়ি লেকেই ছিল মৃত্যু?

পানির নিচেও একই গর্জন!

তারপর হঠাৎ করেই থেমে গেল সব আওয়াজ।

রানা টের পেল, লেকের তীরের কাছে অগভীর জলে ঠেকে গেছে ওর পা! নাক ডুবে আছে, কিন্তু চোখদুটো দেখছে একটু দূরের ঢালু দেয়ালের পার।

রানা! ডাকল কে যেন।

চেনা মিষ্টি কণ্ঠস্বর শুনে সামান্য ঘুরে তাকাল ও।

তীরের কাছে দাঁড়িয়ে আছে মিতা!

হঠাৎ কোত্থেকে যেন জোর পেল রানা, কয়েক পা হেঁটে উঠল অগভীর একটি ধাপে। পরক্ষণে পা রাখল ওপরের পাথুরে জমিতে। উড়তে শুরু করলে কী হয়েছিল? জানতে চাইল।

তার আগে সঠিক জায়গায় তুলেছিলে স্ফটিক, বলল মিতা। ভীষণ অগোছালো। কালো আকাশের মতই কালিমাখা।

তবুও ওকে দারুণ সুন্দর লাগল রানার।

তারপর পুরো এক শ ফুট উড়ে এলে। জলের ভেতর নাক ডুবিয়ে বকের মত কী যেন ভাবছিলে। ওই মেয়ে দারুণ সুন্দরী, তাই না?

তুমি উড়ে যাওনি কেন? জানতে চাইল রানা।

তুমি ছিলে খোলা জায়গায়। আমার কপাল ভাল, খোড়লের মত জায়গায় বড় এক পাথর জাপ্টে শুয়ে ছিলাম। তবে আরেকটু হলে উড়ে যেতাম। ফ্যাকাসে হয়ে গেল মিতার মুখ। চোখ থেকে পড়ে গাল বেয়ে নামল দুই ফোঁটা অশ্রু। চুপ করে চাইল রানার চোখে।

কী হয়েছে, মিতা?

জবাব দিল না মেয়েটা।

নীরবতাই কখনও হয় উত্তর। মিতার জবাব পেয়ে গেছে রানা। একটু দূরে অগভীর এক গর্তের পাশে নিথর পড়ে আছে পিচ্চি পাবলো। ওকে নিয়ে ওই গর্তে আশ্রয় নিয়েছিল মিতা।

মগজে রাখা স্ফটিকের টুকরোর কারণে দুই কান দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়েছে পাবলোর।

বাচ্চাটার পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল রানা। পালস্ দেখল।

নেই!

অসহায় পিচ্চি পাবলোর করুণ মৃত্যু খারাপ করে দিয়েছে রানার মন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ তুলে তাকাল। আকাশ প্রায় ছাইয়ের মত। তার বুকে বারবার ঝিলিক দিচ্ছে সাদা-নীল রশ্মি। খুব দ্রুত কমে আসছে ওসব আলো।

তুমি তো ফিযিসিস্ট, জানো এসব আলো কীসের? জানতে চাইল রানা।

অ্যাটমসফেয়ারের চার্জড় পার্টি। ম্যাগনেটিক লাইনের সঙ্গে মিলে বেরিয়ে যাচ্ছে মহাশূন্যে।

পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার মন্দিরের স্ফটিক রক্ষা করল আধুনিক বিশ্বের মানুষকে, বলল রানা, কিন্তু মেরে ফেলল পাবলোকে। হঠাৎ নিজেকে খুব দুর্বল লাগল ওর, চুপ করে বসে থাকল পাথুরে জমিতে।

পাশে বসল মিতা। মাথা রাখল রানার কাঁধে। নীরবে কাঁদছে পাবলোর জন্যে।

.

৫২.

ইউ.এস.এ-র মেরিল্যাণ্ড, বেথেসড়া নেভাল হসপিটাল।

আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে রানা, মিতা, জর্জ হ্যারিসন ও ইগোর দিমিতভকে ভর্তি করা হয়েছে এই হাসপাতালে। কান-চোখ ভালভাবে পরীক্ষা করে আপাতত রানাকে বিশ্রাম নিতে বলেছেন ডাক্তার। লো-লেভেল রেডিয়েশন পয়জনিং-এর জন্যে চলছে মিতার চিকিৎসা। অপারেশন হয়েছে আর্কিওলজিস্টের পায়ের ক্ষতে। ড্রেস করা হয়েছে নতুন করে। ভাঙা গোড়ালি ঠিক করা হয়েছে ইগোর দিমিতভের।

আলাদা আলাদা কামরায় ওদেরকে রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

কাজ বলতে কিছুই নেই, তাই এরই ভেতর ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠেছে রানা। বিকেলে যখন ওর ঘরে উঁকি দিলেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান, খুশিই হলো ও। দেখল, এইমাত্র দুর্দান্ত কোনও পুরস্কার পেয়ে খুশিতে গদগদ হয়েছেন, এমনভাবে হাসছেন ভদ্রলোক। তবে বেধড়ক মারধর খাওয়ার চিহ্ন নাকে-মুখে।

রানার বেডের পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন। নিচু স্বরে খুলে বললেন ইয়াকা মাউন্টেনে কী ঘটেছে। শেষ করলেন এই বলে: ওই তিন স্ফটিক মিলে মহাশূন্যে পাচার করেছে প্রচণ্ড ম্যাগনেটিক ওয়েভ। তবে কিছুক্ষণের জন্যে বিদ্যুহীন ছিল গোটা পৃথিবী। আপনারা অসফল হলে ভেঙে পড়ত সব যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখন অন্যসব দেশের কর্তা-কত্রীদের সঙ্গে আলাপ করছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে বুঝিয়ে বলছেন, আসলে কী ঘটেছে। আপত্তি তোলার উপায় নেই কারও। ন্যাচারাল অকারেন্স।

এবার আমাকে ছেড়ে দিন, বাড়ির ছেলে বাড়ি ফিরি, বলল রানা।

নিশ্চয়ই যাবেন, মিস্টার রানা, বললেন ব্রায়ান, তবে আপনার সঙ্গে দেখা করতে খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন এক ভদ্রলোক। চলে আসবেন একটু পর।

উনি কে? জানতে চাইল রানা।

ইউনাইটেড স্টেটস্-এর প্রেসিডেন্ট। পাশে রাখা ব্রিফকেস তুলে নিলেন ব্রায়ান। ওটা খুলে বের করলেন রানার জন্যে এক সেট নিখুঁত পোশাক। আমি অন্যদের জড় করতে গেলাম। দয়া করে পোশাক পরে নিন। একটু পর পৌঁছে যাবেন তিনি।

এনআরআই চিফ বেরিয়ে যেতেই কাপড়গুলো দেখল রানা। কসেকেণ্ড পর স্বীকার করল, রুচি অত্যন্ত ভাল জেমস ব্রায়ানের।

বেড থেকে নেমে পড়বে ভাবছে, এমনসময় আজকে পনেরো বারের মত কামরায় ঢুকল সুন্দরী নার্স। বেয়াড়া রোগীকে দেখলেই কুঁচকে ফেলে ডান দিকের ভুরু।

আবার কী দোষ করলাম? জানতে চাইল রানা।

অনেক! এক বোতল পানি বাড়িয়ে দিল মেয়েটা। ওর অন্য হাতে ক্লিপবোর্ড। আপনাকে ডিসচার্জ করা হয়েছে। পোশাক পরে মিস্টার ব্রায়ানের সঙ্গে দেখা করতে সোজা চলে যাবেন কনফারেন্স রুমে।

পাঁচ মিনিট পর কামরা থেকে বেরিয়ে সোজা মিতার ঘরে ঢুকল রানা। ব্রায়ানের সঙ্গে চলে গেছে মেয়েটা। একমিনিট পর করিডোরে এসে ও দেখল, একটু দূরের একটা কামরার সামনে হাজির হয়েছে সিক্রেট সার্ভিসের একদল এজেন্ট।

তারা কেউ বাধা দিল না। কনফারেন্স রুমে ঢুকে রানা দেখল, হাজির আছেন প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন, এনআরআই চিফ ব্রায়ান ও মিতা।

গত দুদিন দেখা করার সুযোগ হয়নি ওদের।

রানাকে দেখে পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে মিতার মুখ। জানো, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আসছেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে!

রানা জবাব দেয়ার আগেই ঘরে ঢুকল দুজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট, পেছন পেছন ঢুকলেন প্রেসিডেন্ট। লেজের মত পিছু নিয়ে সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু।

বদমাশ ব্যাটা কালো গু, বিড়বিড় করল রানা।

কয়েক সেকেণ্ড পর খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরে ঢুকলেন রেড ইণ্ডিয়ান বিজ্ঞানী ক্যাথিবা আলিহা। হাতে বরাবরের মতই আঙুরের রসের বোতল। কাউকে পাত্তা না দিয়ে বসে পড়লেন চেয়ারে। চেহারা দেখে রানার মনে হলো, এই লোক কথা বলবেন না, এসেছেন প্রেসিডেন্টের সম্মানে।

প্লিয, দয়া করে বসুন আপনারা, খুশিমনে আহ্বান জানালেন প্রেসিডেন্ট।

সবাই বসতেই প্রথমে রানা, মিতা ও আর্কিওলজিস্ট জর্জ হ্যারিসনকে ধন্যবাদ দিলেন প্রেসিডেন্ট। জানালেন, ওদের কাছে চিরকালের জন্যে কৃতজ্ঞ রইল আমেরিকা। এরপর বললেন, আমরা প্রচার করছিঃ ইউনাইটেড স্টেটস, রাশা, মেক্সিকো, বাংলাদেশ আর চিন মিলে ঠেকিয়ে দিয়েছে ভয়ঙ্কর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বিবৃতি শুনে এসব দেশের প্রধানরা খুশি হয়েছেন।

মিতার মনে পড়ল, স্যান ইগন্যাসিয়ো শহরের গোরস্তানে কবর দেয়া হয়েছে পাবলোকে। প্রেসিডেন্টের কাছে জানতে চাইল ও, স্যর, ইগোর দিমিতভের খোঁজ জানি না, তার কী হলো?

চিকিৎসার পর তুলে দেয়া হয়েছে বিমানে, বললেন প্রেসিডেন্ট, পৌঁছে যাবে নিজের দেশে।

ওই লোকই স্যান ইগন্যাসিয়ো শহরে খুন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিল হ্যারিসন ও মিতাকে। পরে তার সাহায্য নিয়েই রানার কাছে পৌঁছেছিল মিতা। হাতে পেলে মেরে ফেলবে না এফএসবি? চিন্তিত কণ্ঠে বলল ও।

ভাববেন না, বললেন প্রেসিডেন্ট, ইগোর দিমিতভ এখন রাশার সত্যিকারের হিরো। আপনাদের মতই। রক্ষা করেছে বর্তমান আধুনিক বিশ্ব। তা ছাড়া, রাশান কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে, বিলিয়নেয়ার হুয়াং লি ল্যাং-এর লোকদের সঙ্গে যুদ্ধে মারা গেছে দিমিতভেদ্র সঙ্গীরা। বাকি জীবন অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে থাকবে এফএসবির ওই প্রাক্তন এজেন্ট।

এবার আমাদের কী হবে, কোনও রোগবালাই নেই, কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়ছে না! নালিশ করলেন জর্জ হ্যারিসন।

এবার মুখ খুলল সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু, আপনাদের কথা দিতে হবে, সত্যিকারের ঘটনা কাউকে বলবেন না। সেজন্যে প্রথমেই উনিশ শ ঊনপঞ্চাশের অ্যান্টি এসপিয়োনাজ অ্যাক্ট অনুযায়ী শপথ করতে হবে; তারপর…।

বাদ দিন তো আপনার প্যাচাল, প্রায় ধমক দিলেন ব্রায়ান।

ক্যালাগু, এঁদের বিষয়ে আপনাকে আর নতুন করে ভাবতে হবে না, বলে দিলেন প্রেসিডেন্ট। পৃথিবীর এত বড় বিপদ যারা ঠেকিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের বিব্রত করা কোনওভাবেই উচিত হচ্ছে বলে মনে করি না।

কথাগুলো শুনে কেঁচোর মত গুটিয়ে গেল মার্ল ক্যালাগু।

চেয়ার ছাড়লেন প্রেসিডেন্ট। আবারও বলছি, অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাদেরকে। তার চোখ সরাসরি রানার ওপর। মিতার কাছ থেকে সবই শুনেছে ব্রায়ান। ওর কাছ থেকে আমি। বিশেষ করে আবারও ধন্যবাদ দিচ্ছি আপনাকে, মিস্টার রানা।

বিড়বিড় করে ধন্যবাদ জানিয়ে চুপ করে থাকল রানা।

রানা ওর প্রাপ্য সম্মান পেয়েছে দেখে আরেকবার পূর্ণিমার চাঁদের মত ঝলমল করে উঠল মিতার মুখ।

প্রেসিডেন্ট উঠে পড়তে চেয়ার ছাড়ল অন্যরা।

বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট। তার পর বিজ্ঞানী ক্যাথিবা আলিহা। পিছু নিয়ে গেল দুই সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ও সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু।

এবার সোজা ইউনিভার্সিটির কাজে ফিরব, বললেন জর্জ হ্যারিসন।

তাই বোধহয় ভাল, বলল মিতা। রানার দিকে তাকাল। ওই যে দুই তরুণ বিসিআই এজেন্ট এল স্যান ইগন্যাসিয়ে শহরে, তাদের কাজ কি শেষ হয়েছে?

মাথা দোলাল রানা। মাত্র কয়েকজন জানেন, কোথায় রাখা হয়েছে ওই দুই স্ফটিক। আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে জানানো হয়েছে। তাতে আপত্তি তোলেননি তিনি।

রানা থেমে যেতেই জিজ্ঞেস করলেন ব্রায়ান, আচ্ছা, একটা কথা, মিস্টার রানা, বলুন তো, আমার সমস্ত টাকা আমি দিয়েছিলাম আপনাকে! তা হলে…

আপনি সত্যিই খুব মারকুটে লোক, মৃদু হেসে বলল রানা। সিআইএ-র ক্যালাগুর সঙ্গে মারপিট করতে গিয়ে খেয়ালই ছিল না, সব টাকা ফেরত গেছে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।

কিন্তু কেন? অবাক চোখে রানাকে দেখছেন ব্রায়ান।

তাড়াতাড়ি ফেরত দিয়েছি, কারণ যে বিপদে পাঠিয়েছিলেন, যে-কোনও সময়ে মারা যেতে পারতাম।

জেমস ব্রায়ান মাথা নাড়লেন। কিন্তু কেন বলুন তো? আমি তো সব তুলে দিয়েছিলাম আপনার হাতে, যাতে…

যাতে ফেরত পান আপনার মেয়েকে। এই তো?

 হ্যাঁ।

কিন্তু একটা কথা জানতেন না যে, কারও কলজের টুকরোকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে আনতে টাকা নিই না আমি। এবার বুঝেছেন?

হাঁ হয়ে গেছে ব্রায়ানের মুখ। অবাক হয়ে রানাকে দেখছে মিতাও। খুশিতে চকচক করছে দুই চোখ। অন্তরে নতুন করে উপলব্ধি করেছে: শুধু ওরই জন্যে কী ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে ঝাঁপ দিয়েছিল মাসুদ রানা।

হাসল রানা।

আপনার মেয়ে তো ফিরে পেয়েছেন; ব্যস, আর কী চাই?

খুকখুক করে কাশলেন ব্রায়ান। তারপর বললেন, ধন্যবাদ!

এবার ঘরে গিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে যে যার মত চলে যেতে পারি তো? বলল রানা।

হ্যাঁ, আর ঝামেলা করতে পারবে না কেউ, বললেন। ব্রায়ান। মিতার দিকে তাকালেন। তোমার জন্যে অপেক্ষা করব লবিতে। রানার কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন তিনি।

করিডোরে বেরিয়ে এল রানা, মিতা ও হ্যারিসন।

টুকটাক জিনিস নিতে নিজ কামরায় গেলেন প্রফেসর।

এবার কী? রানার চোখে তাকাল মিতা।

দেশে ফিরব, বলল রানা। বেকার লোক, তবে বিসিআই চিফ হয়তো দয়া করে জুটিয়ে দেবেন কোনও কাজ।

ওর কথা শুনে হাসল মিতা। নিচু স্বরে বলল, আমিও যেতে চাই। একবার ঘুরিয়ে দেখাবে তোমার দেশ? শুনেছি অদ্ভুত সুন্দর নাকি আমার পিতৃভূমি। তবে ভিন দেশের পর্যটকদের জন্যে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা নেই বলে অবহেলায় পড়ে আছে সব।

কথা মিথ্যে নয়, বলল রানা, চলে এসো, ঘুরিয়ে দেখাব কত সুন্দর দেশটা। তবে তোমার তো জুটে যাবে অনেক কাজ। সময় কি আর পাবে?

চোখ নিচু করে নিল মিতা। মনে মনে বলল, পাব, অনেক সময় পাব। এটাও জানি, চিরকালের জন্যে পাব না তোমাকে।

ঘরে চললাম, মালপত্র গুছিয়ে নেব, বলল রানা, তুমি যখনই জানাবে বাংলাদেশে আসছ, রিসিভ করব তোমাকে এয়ারপোর্টে।

ঘুরে রওনা হলো রানা।

পেছন থেকে চেয়ে রইল মিতা, ওর চোখে চলে এল অবুঝ অশ্রু। বেপরোয়া মানুষটা বিদায় নিতেই প্রায় দৌড়ে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল মিতা। আছড়ে পড়ল বেডের ওপর। আকুল হয়ে কাঁদছে। কিন্তু একটু পরেই গালে খোঁচা দিল শক্ত খাম। অবাক হয়ে ওটা তুলে নিল ও।

খামের ওপর লেখা: বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত।

ফড়াৎ করে খাম ছিঁড়ে ভেতরের কাগজটা নিল মিতা।

 হতবাক হয়ে গেল লিখিত বক্তব্য পড়ে।

বাংলাদেশ সরকারের নির্মাণাধীন সবচেয়ে আধুনিক ও বড় আণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রধান ফিযিসিস্ট হিসেবে কাজে যোগ দেয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ওকে!

অশ্রু এখনও শুকিয়ে যায়নি, ফিক করে হেসে ফেলল মিতা।

রানা সত্যিই কী যে অদ্ভুত সব কাণ্ড করে!

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওকে এনে দিয়েছে মস্তবড় সম্মান!

লাফ দিয়ে বেড ছাড়ল মিতা, ছুটে গিয়ে ঢুকল রানার ঘরে।

 কিন্তু চলে গেছে নিষ্ঠুর মানুষটা।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল মিতা, এলিভেটরের জন্যে অপেক্ষা না করে সিঁড়ি বেয়ে উড়ে নেমে এল রিসেপশনে। দেখল, দূরে মেইন গেটের কাছে রানা। হরিণীর মত ছুটল মিতা। কিন্তু থমকে গেল মাঝপথে। এইমাত্র রানার পাশে থেমেছে এক ট্যাক্সি। পেছনের দরজা খুলে সিটে উঠে পড়ল মানুষটা।

এখন ছুটেও লাভ হবে না।

তবুও আনমনে ক’পা এগিয়ে গেল মিতা। চোখের সামনে ট্যাক্সি রওনা হতেই বিড়বিড় করল, ঠিক আছে, চাকরি নেব। তখন নিশ্চয়ই দেখা পাব, তাই না, রানা? অন্তরের গভীরে শুনল জীবনের প্রথম প্রেম মাসুদ রানার দরাজ কণ্ঠ: চলে এসো, মিতা!

মিতা জানল না, ট্যাক্সিতে আনমনে ভাবছে রানাঃ সত্যি কি আসবে মিষ্টি মেয়েটা? আমি অপেক্ষা করব ওর জন্যে!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *