৪. চার্চের বেঞ্চির হাতল

৪১.

চার্চের বেঞ্চির হাতল ডানহাতে ধরে নিজেকে সামলে নিতে চাইলেন প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন। বনবন করে ঘুরছে মাথা। ভেবে পেলেন না অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, না দুলছে মাটি।

কী যেন বলছিলেন? ফাদার ভাসকুয়েজকে বললেন তিনি।

সামনে বেড়ে বয়স্ক আর্কিওলজিস্টের কাঁধে হাত রাখলেন ফাদার। আপনি তো জানেন, মায়ান চিলাম বালামে কী লেখা। সেই অনুযায়ী: এ মাসের বাইশ তারিখে হয়তো ধ্বংস হতে শুরু করবে পৃথিবীর মানবজাতি।

আগেও নানান ধর্মের লোক ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। এবার শেষ হবে পৃথিবী, কিন্তু কিছুই হয়নি, বলল মিতা।

এবারের ব্যাপারটা আলাদা, বললেন ফাদার।

কোন্ দিক থেকে? জানতে চাইল রানা।

কারণ আপনারা এনেছেন অস্ত্র, বললেন ভাসকুয়েজ।

আমরা মাত্র কয়েকটা অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করে দেব মানব সভ্যতা? মৃদু হাসল রানা।

গম্ভীর চোখে ওকে দেখলেন ফাদার ভাসকুয়েজ। না। অন্য কিছু এনেছেন। হারিয়ে যাওয়া পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার মন্দিরে ওই স্ফটিক রাখতে চান আপনারা। উচিত ছিল না আগের জায়গা থেকে ওটা সরিয়ে ফেলা।

স্ফটিক সরিয়ে নিয়েছি গবেষণার জন্যে, বলল মিতা।

সেটা না করলেই ভাল হতো, বললেন ফাদার ভাসকুয়েজ। আপনাদের একটা জিনিস দেখাব। ওটা থেকে অনেক কিছুই বুঝবেন। ঘুরে ছোট একটা দরজার দিকে চললেন তিনি। আসুন আমার সঙ্গে।

বেদি পাশ কাটিয়ে ফাদারের পিছু নিয়ে সরু এক দরজা পেরোল ওরা। করিডোরের সামনেই পড়ল আরেকটা দরজা। এটা মজবুত। ঝুলছে আধুনিক প্যাডলক। তালা খুলে কড়ায় ওটা ঝুলিয়ে রাখলেন ফাদার। কাঁচকোঁচ আওয়াজে খুললেন দরজা। পাঁচ ফুট যেতেই সামনে পড়ল নিচে যাওয়ার কাঠের সিঁড়ি।

ফাদার ইশারা করতে প্রফেসরকে দুপাশ থেকে ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল রানা ও মিতা। পিছু নিয়েছেন ফাদার। নিচে নেমে রানা দেখল, এটা বড়সড় ওয়াইন সেলার। ইট ও কাদার চার দেয়ালের পাশে বিশাল সব ওক কাঠের পিপে।

আগে মিশনের দুর্গ ছিল এটা, বললেন ফাদার ভাসকুয়েজ। পরে গোটা মেক্সিকো জয়ের পর এটাকে ব্যবহার করা হলো মঠ হিসেবে। উর্বর জমিতে ফলানো হলো আঙুর। ওই জিনিস দিয়ে ওয়াইন তৈরি করলেন সাধুরা। আজ রাতে যে অনুষ্ঠান হবে, তার জন্যে সমস্ত ওয়াইন সরবরাহ করা হবে এই সেলার থেকেই।

এক পাশের মস্ত এক পিপের কাছে থামলেন ফাদার। তাক থেকে স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে চাড় দিয়ে খুললেন পিপের ঢাকনি। এই পিপের ওয়াইন সেরা।

ঢাকনি সরিয়ে ওটার ভেতরের দিক থেকে চ্যাপ্টা এক বাক্স নিলেন ভাসকুয়েজ। পাশে থেকে পড়লেন প্রফেসর: ষোলো শ আটানব্বই সাল।

কোটি ডলারের ভিন্টেজ, বলল রানা।

খুব রেয়ার, মাথা দোলালেন ফাদার ভাসকুয়েজ। এর মত দামি ও দুর্লভ ওয়াইন আর নেই। রোযউড বাক্স থেকে নিলেন ছোট এক তোয়ালে। ওটার ভাঁজ খুলতেই বেরোল প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখা পাতলা ফায়ারফ নোমেক্স: ফ্যাব্রিক। সেটা খুলে সিল্কের বর্ডার দেয়া শুকনো, প্রাচীন পার্চমেন্ট নিলেন ভাসকুয়েজ। পাশের ছোট্ট টেবিলে সাবধানে রাখলেন গাছের পাতলা বাকল দিয়ে তৈরি জিনিসটা। প্রথম পাতার ওপরের অর্ধেকাংশ হলদেটে কাগজের মত। নীল কালিতে লেখা প্রাচীন স্প্যানিশ বক্তব্য। নিচে একের পর এক মায়ান হায়ারোগ্লিফ সিম্বল।

জিনিসটা কী? জানতে চাইলেন প্রফেসর হ্যারিসন।

মৃদু হাসলেন ফাদার ভাসকুয়েজ। সে আমলে খুবই নিষ্ঠুর ছিল চার্চের ভূমিকা। এই দেশ বিজয়ী স্প্যানিশ কনকুইস্টেডোরা এ এলাকায় এলে তাদের পিছু নিল চার্চ। কর্টে এবং তার লোক যা ডাকাতি করেনি, বা পুড়িয়ে দেয়নি, সেসবই ধ্বংস করল যাজকরা। তাদের নির্দেশে খুন হয়ে গেল প্রভাবশালী ইণ্ডিয়ানরা। নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো তাদের সংস্কৃতি। প্রায় মূর্খ সব যাজকের আদেশে প্রকাণ্ড সব আগুন জ্বেলে হাজারো বছরের মায়ানদের অর্জিত জ্ঞানের লাখো বই ছাই করে দিল সৈনিকরা। যদি পারত, ভারী পাথরের মনুমেন্টও সাগরে ফেলত স্প্যানিশ দখলদাররা।

আফসোস নিয়ে মাথা দোলালেন প্রফেসর হ্যারিসন। শেষে থাকল মাত্র কয়েকটা মায়ান বই। এখন যেগুলোকে আমরা বলি কোডেক্স।

সে আমলের যাজকরা যে মহাপাপ করেছে, সেজন্যে স্রষ্টার কাছে চরম শাস্তি পেতে হবে তাদেরকে, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফাদার ভাসকুয়েজ।

পার্চমেন্ট কয়েক পাতার, তা দেখে জানতে চাইলেন হ্যারিসন, কিন্তু এই কোডেক্স রয়ে গেল কী করে?

বেশিরভাগ যাজকের লজ্জাজনক আচরণ ভাল লাগেনি এক হৃদয়বান মিশনারি যাজকের। তাঁর নাম ছিল ফারেন ডি সিলভা। সবার আগে এসেছিলেন এই এলাকায়। দেখলেন খ্রিস্টান ধর্মের যাজকদের ছাড়াই ভাল আছে এদিকের মানুষ। তাদেরকে মস্ত বিপদে ফেলতে মন চাইল না সিলভার। মিথ্যা রিপোর্ট পাঠালেন বিশপের কাছে। হাজারো কোটি মশা ভরা জলাভূমি ও অনুর্বর জমি এতই জঘন্য, এই নরকে এলে বেশুমার মরবে স্প্যানিশ যোদ্ধা ও যাজকরা।

এই কোডেক্স কোথায় পান ফারেন ডি সিলভা? জানতে চাইলেন প্রফেসর হ্যারিসন।

উনি পাননি, মাথা নাড়লেন ফাদার। গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটা মৃত্যুর আগে ডেকে নিলেন সিলভাকে। বললেন, আগে কয়েকটি গ্রামে ছিলেন তিনি, কিন্তু অন্য সবার সঙ্গে পালাতে হয়েছিল পাহাড়ে। খুন হয়েছে তাদের ব্রাদারহুডের প্রায় সবাই, রয়ে গেছেন শুধু তিনি। চলে এলেন এ গ্রামে। তারপর যখন এখানে হাজির হলেন সিলভা, নতুন শাসকদের মধ্যে শুধু তাঁকে ভাল মানুষ বলে মনে হয়েছে তার। কথা দিলেন, গ্রামের সবাইকে বলে দেবেন, তারা যেন গ্রহণ করে যিশুর ধর্ম। তবে আছে একটা শর্ত। সিলভা রক্ষা করবেন তাদের শেষ লিখিত মায়ান ইতিহাসের বইটি।

আর এই কোডেক্সেই আছে সেসব হায়ারোগ্লিফ, বললেন হ্যারিসন।

মাথা দোলালেন ফাদার ভাসকুয়েজ। ধর্ম বদল বলতে কী জানেন, জিজ্ঞেস করেছিলেন সিলভা। ইণ্ডিয়ান বৃদ্ধ বলেছিলেন, আমরা জানি, বলি দেয়া বা রক্তক্ষরণের কারণে এক সময়ে এতই পাপ হবে, পচে দুর্গন্ধ বেরোবে আমাদের ধর্ম থেকে। তাই উচিত যিশুর পবিত্র পথে হাঁটতে শুরু করা। একটু চুপ থেকে আবার বললেন ফাদার, আসলে নির্মম সব রাজা বা লোভী পুরোহিতদের বলি বা রক্তক্ষরণের জন্যে চরম বিরক্তি ছিল সাধারণ মানুষের মনে। কাজেই তারা যখন দেখল চার্চ এসব করছে না, অনেকেই আগ্রহ নিয়ে ধর্মান্তরিত হয়েছিল।

তা হলে ধর্মান্তরিত হয়েছিল মায়ান ব্রাদারহুডের ওই ইণ্ডিয়ান বৃদ্ধ, সঙ্গে গ্রামের সবাই, আন্দাজ করল মিতা। ফাদার সিলভার হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল শেষ পার্চমেন্ট।

সিলভা কথা দিয়েছিলেন, প্রাণ থাকতে নষ্ট হতে দেবেন না ওটা, বললেন ভাসকুয়েজ, ওটার লেখা স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করেন। এবার গড়গড় করে বলে গেলেন। তিনিঃ তারা হবে দলে চারজন। আসবে এক বয়স্ক কালো লোক, এক রূপসী যুবতী, এক ছোট্ট বাচ্চা আর পবিত্র হৃদয়ের বাদামি রঙের এক নিষ্ঠুর চেহারার লোক। বাদামি লোকটাই সিদ্ধান্ত নেবে রক্ষা পাবে কি না এই গোটা পৃথিবী।

ফাদার ভাসকুয়েজের কথা শুনে অবাক চোখে রানার দিকে তাকালেন প্রফেসর হ্যারিসন।

যথেষ্ট ভাল স্প্যানিশ জানে মিতা, কাজেই বিস্মিত।

রানার বাহুতে হাত রাখলেন ফাদার ভাসকুয়েজ। কাজেই, রানা, আশা করি বুঝতে পারছেন, আপনার ওপর বর্তে গেছে খুব কঠিন কাজ। হয়তো সফল হবেন, অথবা অসফল। তবে মনে রাখবেন, আপনার একার ওপর নির্ভর করবে মানবজাতির গোটা ভবিষ্যৎ। সুতরাং, যা করার করবেন খুব ভেবেচিন্তে।

গম্ভীর চোখে যাজককে দেখছে নীরব রানা।

অবিশ্বাস্যভাবে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে গেছে প্রাচীন পার্চমেন্টের লেখা।

এটা কাকতালীয় হতে পারে না? বলল মিতা।

কাকতালীয় মনে হয় না। মৃদু হাসলেন ফাদার ভাসকুয়েজ। আগেও পড়েছি কোডেক্সের অনুবাদ করা অংশ। ধারণা করেছি, ওটাতে মিথ্যা লিখেছে মায়ানরা। কিন্তু সে ভুল ভেঙেছে আমার। ভুললে চলবে না, কোডেক্স লেখা হয়েছে হাজারো বছর আগে। যে নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছে চারজনের, তা আঁৎকে ওঠার মতই।

পার্চমেন্ট থেকে অনূদিত স্প্যানিশ ভাষার অংশ পড়ে নিয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল রানা।

প্রায় অন্ধকার সেলারে মায়ান হায়ারোগ্লিফ পড়তে লাগলেন প্রফেসর হ্যারিসন। চকচক করছে চোখ। বিড়বিড় করলেন, তা হলে সত্যি? নিয়তি এনেছে আমাদেরকে এখানে শেষ স্ফটিকের কাছে?

বাস্তবে নিয়তি বলে কিছু আছে? ভাবছে রানা। নিজ চোখে দেখেছে ধর্ম বা স্রষ্টার নামে অবলীলায় কত ভয়ঙ্কর পৈশাচিক কাজ করে আপাতনিরীহ মানুষ। অনেকেই তারা শিক্ষিত ও সভ্য সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ। নানান স্বার্থের জন্যে দেরি হয় তাদের পাগলা কুকুরের মত অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে।

নীরবে ওকে দেখছে মিতা, চোখে অনুরোধ।

একবার ওকে দেখে নিয়ে ফাদারের দিকে ফিরল রানা। আপনি পুরো কোডেক্সের স্প্যানিশ অনুবাদ পেয়েছেন? জানেন কীভাবে রক্ষা করতে হবে মানবসভ্যতা?

না, জানি না, তবে ধৈর্য ধরুন, বললেন ফাদার ভাসকুয়েজ। স্রষ্টা ভালবাসেন ধৈর্যশীলদের।

.

৪২.

 স্যাটেলাইট ফোনের কল রিসিভ করতেই এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ানের দুশ্চিন্তা ভরা আংশিক বিকৃত কণ্ঠ শুনল রানা। ওর পাশেই আছে মিতা। যাতে শুনতে পায়, তাই স্পিকার চালু করল রানা।

মিস্টার রানা, একটু আগে সিআইএ চিফ মিস্টার ক্যালাগু আর আমার এক লোকের মাধ্যমে পেলাম পাবলো সম্বন্ধে নতুন তথ্য। যে এসব জানাল, সে রাশান সায়েন্স ডিরেক্টোরেটের উঁচু পদে আছে। এসব ইনফর্মেশন মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

বলুন, বলল রানা। কু ডাকছে ওর মন।

ফোনের ডেটা স্ক্রিনে পাঠিয়ে দেব সব ইনফর্মেশন। তবে সংক্ষেপে বলছিঃ চের্নোবিলের রেডিয়েশন আক্রান্ত এলাকায় জন্ম নিয়েছিল পাবলো। জেনারেটিভ নার্ভ ডিযিয আছে বলে দুচার দিনের ভেতর ওর বাবা-মা বুঝে যান, অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারবেন না ছেলের। পাবলো মরে যাবে বুঝে যোগাযোগ করলেন তাঁরা সায়েন্স ডিরেক্টোরেট-এ। বিজ্ঞানীরা নিয়ে গেল ওকে। এরপর কী ধরনের গবেষণা করা হয়েছে, তা অজানা। সাধারণত এ ধরনের রোগে প্রথমে শুরু হয় দেহ জুড়ে কম্পন। দ্বিতীয় স্টেজে মানুষ হারিয়ে ফেলে চেতনা। তৃতীয় স্টেজে নষ্ট হয় রোগীর মোটর কন্ট্রোল। চতুর্থ স্টেজে খিচ ধরে বন্ধ হয় হৃৎপিণ্ডের পেশি। ফলাফল আকস্মিক মৃত্যু।

পাবলো কোন্ স্টেজে আছে? জানতে চাইল রানা।

ওর বয়স পাঁচ বছর। পেরিয়ে যাওয়ার কথা স্টেজ থ্রি। বাঁচবে বড়জোর আর পাঁচ বছর।

ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মিতা। বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইল, ভুল হচ্ছে না তো? আমি তো ওর ভেতর কোনও সিম্পটম দেখছি না। হয়তো ভুল হয়েছে ডাক্তারদের?

কোনও ভুল হয়নি, আমি দুঃখিত, মিতা, নরম সুরে বললেন এনআরআই চিফ। পাবলো বেঁচে আছে কারণ, অস্বাভাবিক চিকিৎসা করেছে রাশান বিজ্ঞানীরা। তাতে দেখা গেছে ইলেকট্রো-স্টিমুলেশন দিয়ে নার্ভের তg, মেরুদণ্ড বা সেরেব্রাল কর্টেক্সের রোগের আক্রমণ অনেক ধীর করে দেয়া যায়।

পাবলোর কর্টেক্সে একটা জিনিস আছে, বলল মিতা। ওটা রাশানদের প্ল্যান্ট করা।

এক্সপেরিমেন্ট, বললেন ব্রায়ান, ওটার কারণেই পাবলো টের পায় ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ডিস্টার্বেন্স।

বাচ্চা ছেলেটার ওপর রাশানরা নিষ্ঠুর গবেষণা করেছে ভেবে আগে রাগ ছিল মিতার মনে, এখন বুঝে গেল, এ ছাড়া উপায় ছিল না ওকে বাঁচানোর। পরীক্ষা সফল, অন্তত দৈহিকভাবে সুস্থ আছে পাবলো।

তাতে তেমন খুশি হওয়ার কিছু নেই।

 কেন?

কারণ, আধুনিক কোনও ডিভাইস নয় ওর মগজের জিনিস। ওটা রাশানদের খুঁজে পাওয়া স্ফটিকের অংশ। পঞ্চাশ দশকে পেয়েছিল রাশান সায়েন্স ডিরেক্টোরেট।

বিস্মিত হয়ে রানার দিকে তাকাল মিতা। কী জিনিস?

 চুপ করে শুনছে রানা।

ব্রাযিল স্টোনের মতই আরেকটা ছিল রাশায়, তিক্ত স্বরে বললেন ব্রায়ান, আগের মিটিঙে বেকুব করেছে আমাকে সিআইএ চিফ ক্যালাগু। তাদের বিজ্ঞানীরা খুঁজে বের করেছে, এসব স্ফটিকের কারণে অনেক হ্রাস পেয়েছে পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড। আমরা প্রতিবার একটা করে ওই স্ফটিক পেয়ে সরিয়ে নিলেই সরে যাচ্ছে উত্তর মেরুর ম্যাগনেটিক পোল।

হঠাৎ রানার মনে পড়ল হংকং-এ মিতাকে কারাগার থেকে উদ্ধারের পর ওর কাছে শুনেছিল, কী হয়েছিল দিমিতভের ট্রলারে। পথ হারিয়ে ফেলে লোকটা। আগে থেকেই নষ্ট হয়েছিল জিপিএস, তাই চৌম্বক কমপাস দেখে পথ চলছিল। কিন্তু দক্ষিণের বদলে চলে গেল উত্তর মেরুর দিকে। কিছুই টের পায়নি। অনুসরণ করছিল হাঙর ও কিলার ওয়েইল। এখন রানা বুঝতে পারছে এর কারণ। পাবলোর মগজের স্ফটিক থেকেই ছোট বিচ্ছুরণ ঘটেছিল বেয়ারিং সাগরে নভেম্বর মাসের বাইশ তারিখে।

একইভাবে উনিশ শ আট সালে হ্রাস পায় ম্যাগনেটিক ফিল্ড, বললেন ব্রায়ান, এটা বুঝতে সময় লেগেছে আমার।

অত আগে স্ফটিক পেয়ে গিয়েছিল রাশানরা? জানতে চাইল মিতা।

না, পায়নি, বললেন এনআরআই চিফ, যে কারণেই হোক, রাশায় ওই বছরের জুন মাসে বিস্ফোরিত হয়েছিল ওই স্ফটিক।

জুন মাস, উনিশ শ আট সাল, ভাবছে রানা। নিচু স্বরে বলল, দ্য তুঙগুসকা ব্লাস্ট।

জানেন আপনি ওই ঘটনা সম্বন্ধে?

সামান্য, বলল রানা। উনিশ শ আট সালের জুনের গোটা রাশার তুন্দ্রা এলাকা কেঁপে গিয়েছিল ভয়ঙ্কর এক বিস্ফোরণে। তিন শ মাইল দূর থেকেও দেখা গিয়েছিল আকাশে আগুন। ওই শক ওয়েভে বিশ মাইল বৃত্তের ভেতর পুড়ে যায় সব গাছ। অনেকে ভেবেছে, ছোট কোনও গ্রহানুর জন্যে হয়েছিল ওই বিস্ফোরণ। ওটার অবশিষ্ট অংশ খুঁজতে গিয়েছিল অভিযাত্রীরা। পাওয়া যায়নি কিছুই। বইয়ে পড়েছি, ওই বিস্ফোরণ ছিল ত্রিশ মেগাটন আণবিক বোমা ফাটার মতই প্রচণ্ড।

রাশানদের হিসেব অনুযায়ী ওই বিস্ফোরণ ছিল পঞ্চাশ মেগাটন আণবিক বোমার সমান, বললেন ব্রায়ান, হিরোশিমার ওই বোমার চেয়ে দুহাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।

আপনি বলছেন ওটা ছিল এসব স্ফটিকের একটা? অবাক হয়ে গেছে মিতা।

এ ছাড়া আর কোনও ব্যাখ্যা তো পাওয়া যায় না, বললেন ব্রায়ান। ওই একইসময়ে কমে যায় ম্যাগনেটিক ফিল্ড। পরে ওই এলাকায় পাওয়া যায়নি গভীর কোনও গর্ত। কোথাও ছিল না রেডিয়েশন। তবে একটা জিনিস খুঁজে পেয়েছিল রাশানরা।

ওই স্ফটিকের একটা টুকরো, প্রায় ফিসফিস করল মিতা।

আমাদের কাছে তথ্য আছে, উনিশ শ সাতান্ন সালে কোল্ড ওঅরের সময় এক্সপিডিশন করে রাশানরা, বললেন ব্রায়ান। তবে কখনও স্বীকার করেনি। সে সময়ের আধুনিক টেকনোলজি ব্যবহার করে পেয়ে গিয়েছিল ওই জিনিস। হাইলি ডিসটর্টেড ম্যাগনেটিক রিডিং থেকে ধরে নিয়েছিল, তুন্দ্রার ওখানে পড়েছিল উল্কা। কিন্তু সে সময়ে হঠাৎ করেই ম্যাগনেটিক শক্তির কারণে নষ্ট হলো তাদের প্রধান ড্রেজিঙের বোটের সব ইলেকট্রনিক সিস্টেম। নতুন করে মেশিন চালু করার আগেই একটা ম্যাগনেটোমিটার দেখিয়ে দিল ছোট্ট এক টুকরো স্ফটিক।

তখন থেকে রাশানরা লুকিয়ে রেখেছে ওই জিনিস, বলল মিতা।

সায়েন্স ডিরেক্টোরেটের সেরা জিনিস।

ব্যবহার করেছে পাবলোর মগজে, বলল রানা। স্বাভাবিক কারণেই ওকে দেশে ফিরিয়ে নিতে চাইছে এফএসবি।

পাবলোকে চায় না, ওদের দরকার ওই স্ফটিকের টুকরো, বললেন ব্রায়ান, গোটা দুনিয়া থেকে গোপন করতে চায় ওই এক্সপেরিমেন্ট।

আর এক্সপেরিমেন্ট শেষ হলে? জানতে চাইল মিতা।

 পাবলোর মগজ থেকে সরিয়ে নেবে স্ফটিকের টুকরো, গম্ভীর কণ্ঠে বললেন ব্রায়ান, ফলে মারা পড়বে ছেলেটা।

শিউরে উঠল মিতা।

ওর কাঁধে আলতো করে হাত রাখল রানা, চোখে সহানুভূতি।

ল্যাং কী করে ওর খোঁজ পেল? চাপা স্বরে বলল মিতা।

রাশান সায়েন্স ডিরেক্টোরেটের নরম মনের কয়েকজন ভেবেছিলেন, স্ফটিকের টুকরো পাবলোর মগজ থেকে সরিয়ে নেয়া হবে অমানবিক কাজ। তাঁরাই কিডন্যাপ করে তুলে দেন এক কন্ট্যাক্টের হাতে। বিক্রি হয়ে গেল পাবলো। কিন্তু তার আগে ল্যাংকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন তাঁরা, যাতে পাবলোর ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থা করে চাইনিজ বিলিয়নেয়ার। আমার ধারণা, পাবলো হারিয়ে যাওয়ায় এফএসবির হাতে খুন হয়েছেন সেই মানুষগুলো।

পাবলোকে কেন চাইল ল্যাং? জানতে চাইল মিতা।

কয়েক বছর ধরেই চোখের আড়ালে আছে সে, পাবলোর মত একই রোগে ভুগছে, বললেন এনআরআই চিফ, গুজব ঠিক হলে আর দুএক বছরের ভেতর মারা পড়বে।

সেক্ষেত্রে ল্যাং তো নিজের ডাক্তার দিয়ে পাবলোর মগজের স্ফটিকের টুকরো সরিয়ে ফেলতে পারত, বলল মিতা।

ওটা চাই না তার, ভেবেছে পাবলোর মাধ্যমে খুঁজে পাবে আস্ত কোনও স্ফটিক, বললেন ব্রায়ান। তার ধারণা, ওই জিনিস পেলে পুরো আরোগ্য পাবে সে।

তার মানে এখন আর চতুর্থ স্ফটিক নেই, বলল মিতা।

রানা ভাবছে, তা হলে মায়ানদের ওই ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক হবে কি না। আরেকটা বিষয়: এসব স্ফটিক রাখা হয়েছিল পৃথিবী রক্ষার জন্যে। সেক্ষেত্রে চারটের বদলে মাত্র তিনটে স্ফটিক কী পারবে ম্যাগনেটিক ফিল্ড টিকিয়ে রাখতে? কে জানে, সত্যিই হয়তো এসব স্ফটিক প্রচণ্ড শক্তিশালী অস্ত্র। তাদেরটা বিস্ফোরিত হওয়ায় বেঁচে গেছে আধুনিক রাশা। কিন্তু মধ্য আমেরিকা বা উত্তর আমেরিকার বুকে নেমে আসতে পারে সত্যিকারের প্রলয়।

একটা কথা, আঙ্কেল ব্রায়ান, এসব স্ফটিক মিশন শেষ করলে তারপর কী হবে ওগুলোর? জানতে চাইল মিতা।

জানি না, সরল স্বীকারোক্তি দিলেন ব্রায়ান, মিতা, তুমি তো ফিযিসিস্ট, আমার চেয়ে এসব ভাল বুঝবে।

সব শেষে পাবুলোর কী হবে? জানতে চাইল উদ্বিগ্ন মিতা।

আমাদের ধারণা, এরপরের বিচ্ছুরণ আসছে অনেক বেশি শক্তি নিয়ে, বললেন ব্রায়ান। আগের চেয়ে এক শ গুণ। বা হাজার গুণ। হয়তো ওটার কারণে মারাত্মক ক্ষতি হবে পাবলোর। কাজেই…

তার বক্তব্য বুঝে গেছে মিতা। ধরা গলায় এনআরআই চিফের কথাটা শেষ করল ও, মরে যাবে ও!

রানা দেখল, ভিজে গেছে মিতার চোখের কোণ।

 চুপ করে থাকলেন এনআরআই চিফ।

পুত্র হারাতে হবে জেনে, স্নেহময়ী মা-র অভিমান উথলে উঠেছে আবেগপ্রবণ মিতার হৃদয়ে। ছলছলে চোখে তাকাল রানার চোখে। নীরবে যেন বলছে: রানা, তুমি না আছ আমাদের পাশে? পারবে না পাবলোকে বাঁচাতে? মরে যেতে হবে কেন অসহায় বাচ্চাটাকে?

মন শক্ত করো, মিতা, কয়েক সেকেণ্ড পর বললেন ব্রায়ান। এসব স্ফটিক নাড়াচাড়া করতে গিয়ে কোনও ভুল হলে মরবে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ। তাদের ভেতর রয়েছে পাবলোর মত শত কোটি শিশু।

দূরের সবুজ টিলা থেকে চোখ সরিয়ে কালচে মেঝে দেখল মিতা।

মিস্টার রানা, প্লিয, ঘড়িতে ঠিক করে নিন কাউন্টডাউন, বললেন ব্রায়ান, ট্রিপল যিরোর আগেই আমি যোগাযোগ করলে, দেরি না করে ধ্বংস করে দেবেন ওই দুই স্ফটিক। গভীর কোনও গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা দেবেন ওসব গুঁড়ো।

বুঝলাম, জানাল রানা। এর পরের কাজ কী?

জানি না, দুর্বল স্বরে বললেন ব্রায়ান, সিআইএ মন্দ দৃষ্টিতে দেখছে এসব স্ফটিক। অথচ আমার ধারণা, ওগুলো রক্ষা করবে এই পৃথিবী। তবুও যদি ধ্বংস করে দেয়ার জন্যে ফোন করি; প্লিয, কোথাও রাখবেন না ওগুলোর কোনও চিহ্ন।

ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনুরোধ করতে গিয়ে বুকে পাষাণ বেঁধেছেন ভদ্রলোক, বুঝতে পারছে রানা।

দয়া করে নিজের বিবেক বুঝে কাজ করবেন, মিস্টার রানা, চাপা কণ্ঠে বললেন এনআরআই চিফ। আর, প্রিয, ক্ষতি হতে দেবেন না মিতার। ওর বাবা হিসেবে এটা আপনার কাছে আমার কাতর অনুরোধ।

রানা দেখল, জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে আছে মিতা।

ঘনিয়ে এসেছে সন্ধ্যা।

সামনেই ক্রিসমাস, তাই ছুটি চলছে শহরে।

স্যান ইগন্যাসিয়োর বাসিন্দারা বেরোচ্ছে পার্টির জন্যে।

প্রাণভরে ছুটোছুটি করছে দামাল শিশুরা।

রানা বুঝে গেল, পাবলোর কাছে যাওয়ার জন্যে মন কাঁদছে। মিতার।

আমার সাধ্যমত করব, অন্তর থেকে ব্রায়ানকে বলল রানা।

কথাটা বলেছেন, সেজন্যে অনেক ধন্যবাদ, মিস্টার রানা, বললেন ব্রায়ান। ভাল থাকুন।

আপনিও ভাল থাকুন।

ফোন কল কেটে দিলেন এনআরআই চিফ।

অসহায় পিচ্চি পাবলোর করুণ পরিণতির কথা ভেবে নীরবে কাঁদছে উদ্ভ্রান্ত মিতা। ভরসা পেতে আকুল হয়ে তাকাল রানার চোখে।

কিন্তু আশ্বাস দেয়ার মত কিছুই খুঁজে পেল না রানা।

.

৪৩.

 স্যান ইগন্যাসিয়ো থেকে তিন শ মাইল দূরে ল্যাং-এর কমাণ্ড সেন্টার। ওয়্যারহাউসে বসে ডেটা প্রসেস করছে বিলিয়নেয়ারের টেকনিশিয়ান। পথে পথে ক্যামেরা হাতে মানুষের ছবি তুলছে ল্যাং-এর কর্মীরা। এরই ভেতর স্ক্যান হয়েছে দুলাখ মানুষের চেহারা। এখনও পাওয়া যায়নি রানার দলের কাউকে। আকাশে ঘুরছে ল্যাং-এর এরিয়াল ড্রোন। ইনফ্রারেড ক্যামেরা ব্যবহার করে তন্নতন্ন করে খুঁজছে জঙ্গল ও পাহাড়। ব্যবহার করা হচ্ছে। ম্যাগনেটোমিটার। আছে বিশেষ একটা রিসেপ্টর, অনায়াসেই ধরবে মেডিকেল গ্রেড রেডিয়োঅ্যাকটিভ মেটারিয়াল।

এর ভেতর জঙ্গলে পাওয়া গেছে কয়েক দল ট্র্যাকারকে। ছিল মিলিটারির ভাঙাচোরা ট্রেনিং বিমান। বহু আগে বিধ্বস্ত হয়েছিল জঙ্গলে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই এলাকায় রয়ে গেছে। কয়েকটা মায়ান সাইট। কিন্তু দেখা নেই মাসুদ রানা, মিতা দত্ত, পাবলো বা বুড়ো প্রফেসরের।

কমাণ্ড সেন্টারে চুপচাপ যে যার কাজ করছে টেকনিশিয়ানরা।

ওদিকে ক্যামপেচে শহরে বসে ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করছে এক পাইলট। টয়লেটে যাবে বলে সিট ছাড়বে, এমনসময় অ্যালার্ম বাজিয়ে সতর্ক করল তার দুই কমপিউটার। সেন্সর ধরেছে ড্রোনের টেলিমেট্রি। হালকা ওই বিমান পৌঁছে গেছে নিজের রেঞ্জের শেষপ্রান্তে।

কয়েক সেকেণ্ড পর মিলিয়ে গেল টেলিমেট্রি।

বেদম বেগ চেপে ওদিকের পাহাড়-জঙ্গল আরেকবার ঘুরে আসতে চাইল পাইলট। ভাল করেই জানে, মিলিয়ন ডলারের মেশিন বিধ্বস্ত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে তার বিরুদ্ধে।

একটু পর এল জোরালো সিগনাল।

দেরি না করে নাক-মুখ কুঁচকে ল্যাং-এর অফিসে ফোন করল পাইলট টেকনিশিয়ান কল রিসিভ করতেই বলল, পাঁচ নম্বর ড্রোন থেকে কন্ট্যাক্ট রিপোর্ট পেয়েছি। এখন দেখব ওদিকের এলাকা।

ফোন রেখে ব্যস্ত হয়ে উঠল সে।

এদিকে ল্যাং-এর ওয়্যারহাউসে টেকনিশিয়ান কোঅর্ডিনেট স্ক্রিনে তুলে দিতেই সেন্সর অ্যানালাই করল কমপিউটার। তিন সেকেণ্ড পর কনফার্ম করল সিগনাল।

হুয়াং লি ল্যাং-এর দিকে ফিরল টেকনিশিয়ান। স্যর, স্যান ইগন্যাসিয়ো। ওরা লুকিয়ে আছে ওই শহরে।

.

গেস্ট হাউসের সামনের সিঁড়িতে বসে আছে মাসুদ রানা, দেখছে শহরের প্রধান রাস্তায় ফুর্তি করছে শহরবাসীরা।

বাচ্চাদের জন্যে নাটক লিখে দিয়েছেন ফাদার ভাসকুয়েজ।

একজোড়া কিশোরী ও কিশোর সেজেছে মাতা মেরি ও তার স্বামী জোসেফ। ছেলেটির পরনে নীল আলখেল্লা। পাশেই গাধার পিঠে সাদা-হলদে পোশাকে স্ত্রী মেরি। পিছু পিছু হাঁটছে ছোট বাচ্চারা। তাদের ভেতর পাবলোকেও দেখল রানা।

স্ত্রীকে নিয়ে দোরে দোরে ঘুরছে কিশোর জোসেফ, ভদ্রতা বজায় রেখে বলছে: বলতে পারেন, খালি আছে এই সরাইখানায় কোনও কামরা?

এরই ভেতর সব কামরা ভাড়া হয়ে গেছে বলে, মনে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মাথা নাড়ছে সরাইখানার মালিকরা। অবশ্য, কয়েকটা সরাইখানায় ব্যর্থ হয়ে চার্চের একটু দূরের এক দরজায় টোকা দিল জোসেফ।

দরজা খুলে কিশোরী মেরি ও কিশোর জোসেফকে দেখলেন এক মহিলা। ঠোঁটে ফুটে উঠল মিষ্টি হাসি। হ্যাঁ, কামরা আছে।

এই ঘটনায় খুশিতে হৈ-হৈ করে উঠল বাচ্চারা।

নাটক শেষ হতেই শুরু হলো মূল অনুষ্ঠান। নানান বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে সবাইকে মাতিয়ে তুলল শিল্পীরা। পিনাটা নিয়ে হৈ-চৈ শুরু করল বাচ্চারা। সবার জন্যেই আছে খেলনা ও চকলেট। মস্ত কয়েক টেবিল থেকে হাতে হাতে সরবরাহ করা হবে খাবার ও ওয়াইন। ক্রিসমাসের কয়েক দিন আগে থেকেই মেক্সিকোর প্রতিটি শহর ও গ্রামে চলে এসব অনুষ্ঠান।

এই কদিন মনে দুঃখ রাখবে না কেউ। দূর থেকে রানাকে দেখে হাসল পাবলো। জবাবে হাত নাড়ল রানা। একটু পর অন্য সাধারণ শিশুর মতই খেলায় মেতে উঠল পাবলো।

এ ধরনের ছোট শহরে আগেও থেকেছে রানা। ওর জানা আছে, এসব জায়গা বাচ্চাদের জন্যে স্বর্গ। বিদ্যুৎ সংযোগ আছে শহরে, পথে পথে জ্বলছে স্বল্প ওয়াটের বাতি। বেশিরভাগ বাড়িতে রেডিয়ো, টিভি বা ফোন নেই, তবে তাতে বয়েই গেছে। দরিদ্র কিন্তু সুখী মানুষগুলোর!

ঘনিয়ে আসা বিপদ থেকে অন্যদিকে মন সরিয়ে নিল রানা। সব ঠিক থাকলে, হয়তো এই শহরে কোনও পরিবারে পাবলোকে রেখে যেতে পারবে ওরা। তাতে হয়তো স্বাভাবিক জীবন পাবে ছেলেটা।

রাস্তা পেরিয়ে চার্চে ঢুকে একটু অবাক হলো ও। বেদির সামনে দাঁড়িয়ে আছে মিতা। দেখাচ্ছে পবিত্র কোনও অপরূপা দেবীর মত। এইমাত্র উৎসর্গ করেছে মাতা মেরির কাছে জ্বলন্ত মোমবাতি। সাদা-লাল-কালো ফুল তোলা সুতির গাউন পরনে। কাঁধে লুটিয়ে পড়েছে দীর্ঘ, কালো এলো কেশ।

মিতা সুন্দরী, কিন্তু আগে কখনও এভাবে খেয়াল করেনি রানা। টের পেল, রূপের ওই ঝলক শুকিয়ে দিয়েছে ওর গলা। কী করে এত সুন্দরী হয় কোনও মেয়ে?

খুকখুক করে কেশে নিয়ে ডাকল রানা, মিতা?

ঘুরে তাকাল মেয়েটা। অদ্ভুত মিষ্টি হাসল। মা চলে যাওয়ার পর কখনও কোনও চার্চে ঢুকিনি। আর বাবার মৃত্যুর পর যাওয়া হয়নি কোনও মন্দিরেও।

বিশেষ কোনও ধর্মে আস্থা নেই তোমার, বলল রানা।

মাথা নাড়ল মিতা। ভগবান; গড বা আল্লা যা-ই বলো, তার নানান ভেদ তৈরি করেছে স্বার্থপর একদল মানুষ। আমার মনে হয় না এসবে কিছুই যায় আসে সত্যিকারের স্রষ্টার।

অর্থাৎ ডারউইনের থিয়োরি থেকে একতিল সরবে না।

ধর্মান্ধ তো নই।

 অদ্ভুত রূপসী লাগছে তোমাকে, বলল রানা।

হঠাৎ লাল গোলাপের মত লজ্জায় রক্তিম হলো মিতা। বাইরে পটকা ফাটতেই একটু চমকে গিয়ে তাকাল রানার চোখে। দৃষ্টি নামিয়ে নিল। এই পোশাক তোমার পছন্দ হয়েছে?

হ্যাঁ। আগে কখনও তোমাকে এভাবে দেখিনি। মৃদু হাসল রানা। চমকে গেছি।

পাবলোকে রেখেছে যে মহিলা, তার কাছ থেকে ধার নিয়েছি।

একটু আগে দেখলাম পাবলোকে, বলল রানা। মজায় আছে।

বিষাদের ছাপ পড়ল মিতার চোখে। নিচু স্বরে বলল, আপাতত। ওর হয়তো শেষে মরতে হলো না?

হয়তো, কেন যেন নিজের ওপর রাগ হলো রানার। মনে পড়ল, আমাযন জঙ্গল বা সাগরের মন্দিরে বহু নিচে ছিল স্ফটিক। নিচের সেলারে রাখব ওকে, আশা করি তাতে কমবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ।

ওর মনে হলো, যে-কোনও সময়ে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হু-হু করে কাঁদতে শুরু করবে মেয়েটা।

কোনও আশা নেই ওর, বিড়বিড় করল মিতা, মেনে নিয়েছি নিয়তি। নির্দ্বিধায় স্বীকার করল, তবে তুমি পাশে থাকলে ভয় থাকে না।

প্রসঙ্গ পাল্টে নিল রানাঃ চলো, দেখে আসি সেলারে কী করছেন প্রফেসর।

একটু আগে গিয়েছিলাম, বলল মিতা, হায়ারোগ্লিফ থেকে নতুন কিছু পাননি। ফাদার ভাসকুয়েজ বলেছিলেন, আমাদের কথা লিখে গেছেন মায়ান কোনও জ্ঞানী। কিন্তু তাতে তৃতীয় স্ফটিক পাব না আমরা।

আশা করতে দোষ নেই, বলল রানা, তবে এসব স্ফটিকের কারণে তোমার, পাবলো বা অন্য কারও ক্ষতি হবে বুঝলে দেরি করব না হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়ো করে দিতে। তারপর যা খুশি হোক।

নীরবে রানার চোখে চেয়ে রইল মিতা।

চার্চের প্রকাণ্ড ঘরের চারপাশে ঘুরল রানার চোখ। এবার বাইরে গিয়ে দেখব ওদের অনুষ্ঠান।

আমিও যাব তোমার সঙ্গে, বলল মিতা।

বাইরের শীতল হাওয়ায় বেরিয়ে এল ওরা।

এক সেকেণ্ডের জন্যে ছোট কোনও বিমানের ইঞ্জিনের শব্দ পেয়েছে বলে মনে হলো রানার। সতর্ক হয়ে কান পাতল। কিন্তু কোথাও যান্ত্রিক আওয়াজ নেই। তিন সেকেণ্ড পর রাস্তার মঞ্চে শুরু হলো গান-বাজনা।

মিতার ডানহাত মুঠোয় নিয়ে নাচের মঞ্চ লক্ষ্য করে পা বাড়াল রানা।

.

৪৪.

গভীর রাত। ইয়াকা মাউন্টেনের গভীর সুড়ঙ্গে রয়ে গেছেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান। বিশেষ একটি প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত তার টেকনিশিয়ানরা। মার্ল ক্যালাগুর সংগৃহীত থিয়োরিই ঠিক। ম্যাগনেটিক ফিল্ড হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে জড়িত রহস্যময় স্ফটিক। তবে ভেরিয়েবলের সব সংখ্যা মিলছে না। রয়ে গেছে কোথায় যেন ক্রটি।

এনআরআই বিশেষজ্ঞদের ইনপুট বেশ কয়েকবার বদল করেছেন ব্রায়ান। সংখ্যা একটু বেশি দেখাচ্ছে।

আবারও সংখ্যা পাল্টে নিলেন তিনি।

ম্যাগনেটিক ফিল্ড কমে যাওয়ার অঙ্কের সঙ্গে এখনও মিলল না এবারের সব সংখ্যা।

বিরক্ত হয়ে সিমুলেশনের জন্যে রিভার্স অ্যানালাইয করতে নির্দেশ দিলেন ব্রায়ান। সত্যিকারের ডেটা কী হওয়া উচিত, আর কী আছে, তার তফাৎ জানতে চান।

অপেক্ষা করলেন। কিছুক্ষণ পর স্ক্রিনে এল: Operational parameter invalid.

কী যেন বাধা দিচ্ছে সমীকরণ করতে।

ব্রায়ান টাইপ করলেন: Suggested parameter adjustment?

কয়েক ধরনের হিসাব কষল কমপিউটার, তারপর সবচেয়ে ভাল আন্দাজ জানিয়ে দিল: 

Parameter with highest likelihood of successful adjustment: Number of Magnetic Fields.

কার্সারের দিকে চেয়ে রইলেন জেমস ব্রায়ান।

 বলে কী কমপিউটার?

তা হলে কি আরও আছে ম্যাগনেটিক ফিল্ড?

 এর মানেটা কী?

 ঠিকভাবে নাকের ওপর চশমা বসিয়ে নিলেন। ক্লিক করলেন ইনপুট পেজ-এ। স্ক্রল করে দেখলেন প্রতিটি বর্তমান প্যারামিটার। সেসবের ভেতরেই পেলেন ম্যাগনেটিক ফিল্ডের ইনপুট সংখ্যা। কমপিউটারে সেট করা: One.

নিজেকে বোকা মনে হলো ব্রায়ানের। একটার বেশি ম্যাগনেটিক ফিল্ড থাকতে পারে?

এই প্রোগ্রাম এসেছে নর্থ পোল সার্ভে গ্রুপের তরফ থেকে। ওটার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে মেরুর গতি ও ভবিষ্যৎ পরিবর্তন। এসব হিসেবে রেখে এনআরআই বিশেষজ্ঞরা বিবেচনা করেছে স্ফটিকের প্রভাব।

চিন্তা আরও বাড়ল ব্রায়ানের।

নিজেরা ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করছে ওইসব স্ফটিক?

চশমার ওপর দিয়ে স্ক্রিন দেখে নিয়ে সংখ্যা বদল করলেন। এবার কি বোর্ডে লিখলেন: Two। দ্বিতীয় ফিল্ডের আউটপুট চান তিনি। মিলিয়ে দেখবেন স্ফটিকের পাওয়ার লেভেল। টিপে দিলেন এন্টার।

লেখা উঠল স্ক্রিনে: Operational parameter invalid.

বুঝলাম, বিড়বিড় করলেন ব্রায়ান।

এবার পাল্টে নিলেন সংখ্যা। নতুন ফিল্ডের শক্তির জন্যে সংখ্যা চাইল কমপিউটার। কিন্তু তেমন কোনও তথ্য তার কাছে নেই। টাইপ করলেন X. এবার টিপলেন এন্টার।

এনআরআই-এর তৈরি অত্যাধুনিক সিস্টেম ব্যবহার করে ভাবতে শুরু করেছে কমপিউটার। প্রয়োজনে সাহায্য নেবে সংযুক্ত অন্তত এক শটা মেইনফ্রেম কমপিউটারের। সবাই মিলে কাজ করবে সুপার কমপিউটারের মত করে।

ব্রায়ানের দেয়া জটিল X হিসাব কষতে কমপিউটারের লাগবে প্রচণ্ড ক্যালকুলেটিং ক্ষমতা।

থম মেরে গেছে কমপিউটারের স্ক্রিন।

ওটার দিকে চুপ করে চেয়ে রইলেন ব্রায়ান। ভয় পাচ্ছেন, যে-কোনও সময়ে ক্র্যাশ করবে সিস্টেম।

কয়েক মিনিট পর ফেস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আগের নির্দেশ বাতিল করে দেবেন, এমনসময় স্ক্রিনে এল মেরুর শক্তি বিষয়ে একের পর এক সংখ্যা। সবই ম্যাগনেটিক ফিল্ড সংশ্লিষ্ট।

সংখ্যাগুলো দেখলেন ব্রায়ান।

পেয়ে গেছেন নিখুঁত সব সংখ্যা।

সঠিক তথ্য দিয়েছে কমপিউটার: পৃথিবীতে একটি নয়, সব মিলে রয়েছে পুরো তিনটে ম্যাগনেটিক ফিল্ড!

.

৪৫.

 ছাত থেকে ঝুলন্ত ন্যাংটো বাল ছড়াচ্ছে হলদে আলো। চার্চের ভূগর্ভস্থ সেলারে বসে আছেন প্রফেসর হ্যারিসন। আবারও ঘুরছে তার মাথা। চোখের সামনে ঝাপসা লাগছে পার্চমেন্ট।

মায়াদের হায়ারোগ্লিফ ব্যবহার করেছে স্ক্রলের লেখক।

নিজের করা নোট দেখতে চাইলেন তিনি।

আমি ব্রাদারহুডের মৃতপ্রায় এক জাগুয়ার। এসব লিখছি এমন এক ভাষায়, যেটা আজ আর ব্যবহার করে না কেউ।

নোট করা লেখার পরের লাইনে চোখ রাখলেন হ্যারিসন। কেঁপে গেছে হাত, তাই আঁকাবাঁকা হয়েছে ইংরেজি অক্ষর।

ডানহাতের দিকে তাকালেন প্রফেসর।

ও, আগে থেকেই তিরতির করে কাঁপছে বাহু!

আবার পড়লেন: প্রথমে ছিল চারটি স্ফটিক। সেগুলোকে ঠিক জায়গায় সরিয়ে দিয়েছে ব্রাদারহুডের সদস্যরা। তাদের কাছেই রয়ে গেছে ওই রহস্য।

এসব লেখা মায়াদের সৃষ্টির বিষয়ে, ভাবলেন প্রফেসর। দেবতারা প্রথমে চেষ্টা করেছিলেন মায়াদের তৈরি করতে। কিন্তু তাঁরা পারলেন না বলেই সৃষ্টি হলো কাঠের মানুষ। দেখতে তারা অনেকটা মানুষের মতই। তাদের চেহারা ছিল বিকৃত।

স্কলাররা বলেন, এসব লেখা হয়েছে বাঁদরের বিষয়ে। তারা ছিল গাছে গাছে।

কিন্তু এ থিয়োরি মানেন না প্রফেসর হ্যারিসন।

কাঠের মানুষের রোম ছিল না। কোথাও পাওয়া যায় না তাদের লেজের কথা। দৌড়ঝাঁপ সম্পর্কে কিছুই নেই। হায়ারোগ্লিফে। লেখা আছে, তারা ছিল আড়ষ্ট ও দুর্বল।

প্রচণ্ড এক ঝড় ও বন্যায় মরে সাফ হলো কাঠের মানুষ। বদলে পৃথিবীতে এল সত্যিকারের মানুষ। তবে প্রাণের ভয়ে আমাযন ছেড়ে উত্তরদিকে গেল তারা। সবাই নয়, ব্রাদারহুডের একদল যাজক জানতেন কী করতে হবে। দেবতাদের নির্দেশ অনুযায়ী স্ফটিক নিয়ে দীর্ঘ এক অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন তাঁরা। কিন্তু আগের মন্দিরে রয়ে গেল ব্রাযিলের ওই স্ফটিক।

হ্যারিসনের মনে পড়ল, এক বছর আগে ওটাই আবিষ্কার করেছিল রানা ও মিতা।

এবারের অভিযানে মিতা আর তিনি খুঁজতে বেরোন পরের তিনটে স্ফটিক। ওগুলো: মন উৎসর্গের আয়না, দূর সাগরের আত্ম উৎসর্গের আয়না, আর শেষেরটা দেহ উৎসর্গের আয়না।

মেক্সিকো উপসাগরের মন্দিরে পেয়েছেন তারা মন উৎসর্গের স্ফটিক।

দূর সাগরের আত্মা উৎসর্গের আয়না বা স্ফটিক বোধহয় রয়ে গেছে রাশায়। ওটা খুঁজে বের করতে হবে।

আর শেষের স্ফটিকটা দেহ উৎসর্গের আয়না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রয়ে গেছে পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার কোনও মন্দিরে।

মানবজাতি দুর্বল হলে তাদেরকে নতুন করে উৎসাহিত করত এসব স্ফটিক।

ওগুলোর ব্যবহার জানত মায়ান ব্রাদারহুডের সদস্যরা।

আবারও নিজের নোটে ডুব দিলেন প্রফেসর। কিছুক্ষণ পর বুঝলেন, প্রায় অসম্ভব ওই স্ফটিক খুঁজে বের করা।

বড্ড ঘুরছে প্রফেসরের মাথা। তবুও হায়ারোগ্লিফের বইয়ের ওপর ঝুঁকলেন অনুবাদ করতে। হঠাৎ তাঁর কপাল থেকে একফোঁটা ঘাম পড়ল পার্চমেন্টের ওপর। চট করে তোয়ালে দিয়ে ঘর্মাক্ত মুখ মুছলেন। আবারও মন দিলেন পরের হায়ারোগ্লিফের ওপর।

একটু পর চেনা কয়েকটা মায়ান অক্ষর দেখে ভাবলেন, ভুল না হলে, এসব স্কটিক রক্ষা করবে এই পৃথিবী। কিন্তু রক্ষা করবে কী থেকে?

আরও কিছুক্ষণ অনুবাদের পর পেয়ে গেলেন উপযুক্ত মায়ান বাক্য।

হ্যাঁ, মানবজাতি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করবে এসব স্ফটিক। যদি না পারে, মানবজাতিকে ধ্বংস করবে স্বয়ং প্রকৃতি।

জ্বরের ঘোরে মাথা ঘুরছে বলে নিজের ওপর রেগে গেলেন প্রফেসর। কাজ করছে না মগজ। এখন ডেটা বেস পেলে কাজে আসত। ঘাটতে হতো না পুরনো স্মৃতি। তার আগের নোট বুকটা পেলেও চলত।

চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন হ্যারিসন। গরম সেলারে লাগছে শীত। আজকাল এমনই হচ্ছে। একবার গরম লাগে, আবার মনে হয় বরফের মত জমে যাবেন।

তোয়ালে দিয়ে আবারও মুখ মুছলেন তিনি। বমি এলেও পেট থেকে বেরোতে চাইল না কিছুই। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেন। তারপর স্পর্শ করলেন পায়ে বুলেটের ক্ষত। গর্তের চারপাশে শক্ত হয়ে উঠেছে মাংস। গরম লাগছে।

নতুন করে শুরু হয়েছে ইনফেকশন। বাড়ছে ব্যথা।

 আনমনে স্ত্রীর কথা ভাবলেন প্রফেসর হ্যারিসন।

কই, শুনছেন না হান্নার কথা!

কোথায় গেল মেয়েটা?

ওর কথা শুনবেন আর গল্প করবেন বলেই বন্ধ করেছিলেন অ্যান্টিবায়োটিক।

এখন দেখা যাচ্ছে, ভাল করেননি কাজটা!

.

রাত বারোটার দিকে থিতিয়ে এল স্যান ইগন্যাসিয়ো শহরের অনুষ্ঠান। বাড়ি ফিরতে লাগল যে যার মত।

বিশ মিনিট পর ফাঁকা হয়ে গেল প্রধান সড়ক।

সবার কাছ থেকে আগেই বিদায় নিয়েছে রানা ও মিতা। সরু গলির মুখে গেস্টহাউসের সামনে, বেঞ্চিতে মুখোমুখি বসল ওরা।

চুপ করে আছে।

একটু পর জিজ্ঞেস করল মিতা, কী ভাবছ?

সরল স্বীকারোক্তি দিল রানা, নিয়তি বিশ্বাস করি না।

আমি বিশ্বাস করি, বলল মিতা, নইলে আমার জীবনে আসতে না তুমি। এতক্ষণে খুন হতাম ল্যাং-এর জেলখানায়।

ওকে দেখল রানা, গম্ভীর।

মিতার চোখে পড়েছে কয়েকটা চুল। হাত বাড়িয়ে ওগুলো ওর কানের পেছনে গুঁজে দিল রানা।

বলতে পারো এটা কেন, রানা? হঠাৎ করেই জানতে চাইল মিতা।

বেঞ্চিতে পিঠ ঠেকিয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করল রানা, কেনটা কীসের?

অনেক ভেবেও বুঝিনি, কেন এত আগলে রেখেছ। না আমি আত্মীয়, না বাংলাদেশের কেউ। তবু আমার জন্যে বারবার এত ঝুঁকি কেন নিলে?

মৃদু হাসল রানা। জানতেই হবে?

হ্যাঁ। মাথা দোলাল মিতা।

বেশ, শোনো, আমার সাধ্যমত করছি কারণ ভুলে যাইনি, তুমি বাংলাদেশি এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর মেয়ে। তুমি মুসলিম, হিন্দু বা খ্রিস্টান তা কখনও বিবেচনার বিষয় ছিল না। আর… হ্যাঁ, তোমাকে সাহায্য করার আরও একটা জরুরি কারণও আছে।

সেটা কী? ধনুক ভুরু ওপরে তুলল মিতা।

মুচকি হাসল রানা। এত দুর্দান্ত সুন্দরীর পাশে নিজেকে মস্ত কিছু মনে হয়।

কিল তুলল মিতা, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। রানার হাতটা আলতো করে নিয়ে গালের পাশে চেপে ধরল ও। চোখ স্থির হলো সঙ্গীর চোখে। নীরবে কী যেন বলছে ওর দৃষ্টি।

ওই অলঙ্ঘ্য আহ্বান এড়াতে পারবে না কোনও পুরুষ।

মিতার কমলালেবুর কোয়ার মত ঠোঁট স্পর্শ করল রানার নিষ্ঠুর ঠোঁট। পরক্ষণে টের পেল রানা, সাড়া দিচ্ছে মিতা।

এক হয়ে গেল দুজনের তপ্ত শ্বাস।

একটু থেমে পরস্পরের চোখে তাকাল ওরা।

চলে গেছে অদ্ভুত এক ঘোরের মাঝে। জড়িয়ে ধরল ওরা দুজন দুজনকে।

রানার অবাধ্য হাত চলে গেল মিতার পিঠ পেরিয়ে কোমরের বাঁকে।

ওর কানের কাছে ফিসফিস করল মিতা, রানা! আমার ঘরে?

গাউনের ভেতর থেকে হাত বের করে নিয়ে একটু পিছিয়ে বসল রানা।

কী হলো? সব হারিয়ে বসার সুর মিতার কণ্ঠে। চোখে অবহেলিত যুবতীর দৃষ্টি।

এবার ওর ব্রা-র স্ট্র্যাপ খুলল রানা।

কিন্তু ওর হাত প্রেমিকের নয়। কী যেন খুঁজছে আঙুল।

বিস্মিত হয়েছে মিতা। কী হয়েছে, রানা? এমন করছ কেন?

গত কিছু দিনের ভেতর সার্জারি হয়েছে তোমার? জানতে চাইল রানা।

না তো! অবাক কণ্ঠে বলল মিতা। কেন?

কারণ তোমার দুই শোল্ডার ব্লেড ও মেরুদণ্ডের মাঝে তাজা ক্ষতের দাগ। ত্বকের নিচে শক্ত কিছু।

চমকে গেল মিতা। চলো তো, বেডরুমে গিয়ে দেখব ওটা কী।

কয়েক মুহূর্ত পর মিতার বেডরুমে চলে এল ওরা।

এবার দেখি তোমার ক্ষতটা? বলল রানা।

লজ্জায় লাল হলো মিতা। তবে খুলে ফেলল সুতির গাউন।

বেয়াড়া চোখকে ফর্সা, সুডৌল কোমরের দিকে যেতে দিল না রানা, দৃষ্টি স্থির হলো ক্ষতের ওপর।

ওদিকে মিতার মনে পড়ল, জ্ঞান ফেরার পর হংকঙে ব্যথা ছিল পিঠে। খুব উজ্জ্বল সাদা বাতির একটা ঘরে নেয়া হয়েছিল ওকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে।

তা হলে ওটা কি অপারেশন থিয়েটার ছিল?

ওর পিঠে অস্ত্রোপচার করেছে ল্যাং-এর লোক?

জিনিসটা কী, রানা? শুকনো গলায় জানতে চাইল মিতা।

আমার ধারণা, কোনও ট্র্যাকিং ডিভাইস, বলল রানা। সম্ভবত শর্ট রেঞ্জের। তবে দূর থেকে জানবে রিমোট সেন্সর। লোজ্যাকের মত।

মিতার মনে পড়ল, ফেরত দিয়েছিল ওর জুতো। যাতে পালাতে পারে! ল্যাং ভাল করেই জানত, কী খুঁজছে ও। এ-ও বুঝেছে, অন্য কারও চেয়ে অনেক আগেই ও পৌঁছুবে স্ফটিকের কাছে। জেনেবুঝেই মুক্তি দিয়েছিল। হয়তো চেয়েছিল ওর সঙ্গে থাকুক পাবলো। তাতে সুবিধা হবে মিতার।

কী ঘটেছে, সংক্ষেপে রানাকে জানাল মিতা। তারপর বলল, এখন জানি, কীভাবে সাগরে খুঁজে নিয়েছিল ল্যাং-এর লোক!

মৃদু মাথা দোলাল রানা।

তুমি না সন্ধ্যার দিকে বিমানের ইঞ্জিনের আওয়াজ পেয়েছ? বলল মিতা।

শুনতে ভুল হয়েছে হয়তো, মিতার শঙ্কা দূর করতে চাইল রানা।

কিন্তু অন্তরে জানো, কেউ না কেউ আসছে, বলল মিতা। উঠে গাউন দিয়ে বুক ঢাকল। ঘুরে আয়নায় দেখল পিঠের ক্ষত। ওটা এমন এক জায়গায়, দেখা প্রায় অসম্ভব। হাত যেতে চায় না ওখানে। বুঝে শুনেই ওখানে রাখা হয়েছে ট্র্যাকিং ডিভাইস। রানা পিঠে হাত না দিলে কিছুই জানত না কেউ।

কতটা গভীরে? কাঁপা কণ্ঠে জানতে চাইল মিতা। ভয় পেয়েছে, ওটা আছে পেশির নিচে।

ডিভাইসের কিনারা স্পর্শ করল রানা। ত্বকের ঠিক নিচেই।

চেহারা মড়ার মত ফ্যাকাসে হলেও বিড়বিড় করল মিতা, চামড়া কেটে ওটা বের করো।

অপারেশনটা ছোট হলেও এটা উপযুক্ত জায়গা নয়, বলল রানা। আপাতত থাক, পরে ভাল কোনও হাসপাতালে…

বারকয়েক মাথা নাড়ল মিতা। আমার ভয় কী, আমাদের কাছে আছে কড়া অ্যান্টিবায়োটিক।

একটু দ্বিধা নিয়ে বলল রানা, বেশ। তা হলে উপুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ো।

আমার পেছনের দিকে তাকাবে না তো?

নাহ্, তোমার তো পেছন বলতে কিছুই নেই, সবই সামনের দিক! জানিয়ে দিল গম্ভীর রানা।

শুয়ে পড়ে ঘাড় কাত করে করুণ হাসল অসহায় মিতা। রানার মনে হলো, জবাই হবে বলে তৈরি হয়ে গেছে বেচারি।

একটু ব্যথা, ওটা কিছুই নয়, নিষ্ঠুর দাঁতের ডাক্তারদের মত বলবে কি না ভাবল রানা। পরক্ষণে সিদ্ধান্ত নিল: না, অত পাষণ্ড হতে পারবে না। ফার্স্ট এইড কিট থেকে রাবিং অ্যালকোহল নিয়ে ভালমত ঢালল ক্ষতের ওপর। একহাতে ডলছে। অন্য হাতে মিতার হাতে দিল দুটো যিথ্রোম্যাক্স বড়ি।

গ্লাস ভরা পানি দিয়ে ওগুলো গিলে জানতে চাইল মিতা, খুব ব্যথা লাগবে?

জবাবে নীরবে অ্যালকোহল দিয়ে স্ক্যালপেল ধুয়ে নিল রানা।

ভয়ঙ্কর নীরব জবাব পেয়ে গেছে মিতা। মুখ চেপে ধরল বালিশে। কোমরে চাপল অনেক ভারী কিছু। পরক্ষণে স্পর্শ পেল রানার তপ্ত আঙুলের।

আচ্ছা, রানা, তোমার কি উঠতেই হবে আমার… ওহ্! রানা! …মরে গেলাম!

ভীষণ ব্যথা পেয়ে দম আটকে ফেলেছে মিতা।

ওর পিঠের ত্বক থেকে সরে গেল শীতল কী যেন। পাজর বেয়ে নামল উষ্ণ রক্ত।

একটু আগে মিতা ভাবছিল: রানা খুব কাছে, ঘুরে ওকে বুকে টানলে কেমন হয়? খুশি মনে দেবে কুমারীত্ব! কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, মরেই যাবে ব্যথায়! আর এই নচ্ছার, আনাড়ি ব্যাটার কারণেই ওর এত কষ্ট!

কোমর থেকে নেমে জানিয়ে দিল রানা, তোমার অপারেশন শেষ, এবার ব্যাণ্ডেজ করে দেব।

তুমি ভাল মানুষ হতে পার, কিন্তু পচা ডাক্তার! ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল মিতা। খবরদার! আমার দিকে তাকাবে না! কাত হয়ে তোয়ালে দিয়ে ঢাকল শরীর। জানা নেই, প্যান্টি নেই বলে সবই দেখা শেষ নিশ্চুপ মাসুদ রানার!

.

৪৬.

একটু আগে ঢাকায় বিসিআই-এর অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্রিগেডিয়ার (অব.) সোহেল আহমেদের সঙ্গে জরুরি আলাপ সেরেছে রানা।

এই সুযোগে নতুন পোশাক পরে নিয়েছে মিতা। এখন রানার পাশে হেঁটে চলেছে চার্চের দিকে। নতুন ক্ষত থেকে একটু একটু করে রক্ত পড়ে ভিজে গেছে ব্যাণ্ডেজ।

দ্বিতীয় পাথর সঙ্গে নিয়েছে রানা। বামহাতে ফাস্ট-এইড কিটে প্রফেসর জর্জ হ্যারিসনের জন্যে অ্যান্টিবায়োটিক।

মিতার পিঠের ওই রেডিয়োঅ্যাকটিভ পেলেট ছিল দূর থেকে অনুসরণ করার আইসোটোপ ইকুইপমেন্ট, কাজেই আগের চেয়েও সতর্ক রানা। ল্যাং ভেবেচিন্তেই মাইক্রোট্রান্সমিটার রাখেনি। দূরে সিগনাল দিত না ওটা। সহজ উপায় ব্যবহার করেছে সে। এখন জিনিসটা লো-গ্রেড আইসোটোপ হলেই ভাল, তা হলে কম ক্ষতি হবে মেয়েটার।

স্ফটিক রাখার সীসার পাত দিয়ে মোড়া কেসে পেলেট রেখেছে রানা। ওই টোপ ফেলে এই শহর থেকে সরাতে হবে ল্যাং-এর লোককে। রানা যত দূরে যাবে, ততই সম্ভাবনা কমবে শহরে হামলা হবার।

চার্চে ঢুকে সরাসরি ওয়াইন সেলারে নামল রানা ও মিতা। সিঁড়ির শেষ ধাপ পেরিয়ে ডাকল রানা, প্রফেসর?

তখনই ভারী কিছু পড়ল ধুপ-খটাং শব্দে!

ঘরের কোনায় চেয়ারসহ কাত হয়ে পড়ে আছেন প্রফেসর হ্যারিসন। প্রায় ছুটে গিয়ে তাকে টেনে তুলল রানা। ওকে সাহায্য করল মিতা।

ঘামে জবজব করছে আর্কিওলজিস্টের মুখ-গাল-বুক।

কী হয়েছে, প্রফেসর? একটা চেয়ারে হ্যারিসনকে বসিয়ে দিল রানা।

বুঝতে… বুঝলাম না… বিড়বিড় করলেন হ্যারিসন।

তাঁর কপালে হাত রেখে বলল মিতা, জর অন্তত এক শ পাঁচ ডিগ্রি! পুড়ে যাচ্ছে গা!

রানা কিছু বলার আগেই প্যান্টের পকেট থেকে গত পাঁচ দিনের অ্যান্টিবায়োটিক বড়ি বের করলেন হ্যারিসন। এত দিন ভঙ্গি করেছেন, ওগুলো নিয়মিত খেয়েছেন।

দু-দু-দু… দুঃখিত, বললেন লজ্জিত স্বরে। হান্নাকে দেখতে চেয়েছি। মনে হয়েছিল ওকে এনে দেবে ওই স্ফটিক। এখন বুঝছি… চুপ হয়ে গেলেন।

আপনাকে ওপরে নিয়ে যেতে হবে, বলল মিতা।

ভারবাহী গাধা তো আছেই, বলল বিরক্ত রানা। প্রফেসরের দুবগলে হাত ভরে টান দিয়ে দাঁড় করিয়ে ফেলল তাঁকে, পরক্ষণে ডান কাঁধে তুলল। রওনা হয়ে গেল সিঁড়ির দিকে।

হায়ারোগ্লিফ বুঝতে চাইছিলাম, কিন্তু মাথা চলছিল না, দুর্বল স্বরে বললেন হ্যারিসন।

তারপর চলল আপনার মাথা নরকে? জানতে চাইল রানা।

হ্যাঁ। তবে এসব স্ফটিক রক্ষা করে পৃথিবীকে।

 তাই? সিঁড়ি বেয়ে উঠছে রানা। পেছনে মিতা।

মাটি রক্ষা করে, অপরাধী কণ্ঠে বললেন হ্যারিসন, দুঃখিত, আমি হান্নাকে আবার পাশে চেয়েছি।

চিকিৎসা না পেলে বাঁদরের মত মস্ত এক লাফে পৌঁছে যাবেন তার পাশে, বলল রানা। হাঁফ লেগে গেছে সেলার থেকে সোয়া দুই শ পাউরে লাশ চার্চে তুলে এনে।

নিচু স্বরে বলল মিতা, বাইরের ঠাণ্ডা পরিবেশে তাপ কমবে ওঁর।  

দরজা পেরিয়ে মাটির ওপর প্রফেসর হ্যারিসনকে শুইয়ে দিল রানা। টনটনে ব্যথাভরা কোমর সোজা করে মিতাকে বলল, দাও ওঁকে অ্যান্টিবায়োটিক। যদি ঝামেলা করতে চান, চোয়ালে কষে এক ঘুষি মেরে অজ্ঞান করে নেব।

না-না, ঘুষি লাগবে না, চিচি করে বললেন হ্যারিসন।

লাগবে কি না, সেটা আমি বুঝব, ধমকের সুরে বলল রানা।

তা হলে আপনার ক্ষত পরিষ্কার করতে দেবেন তো? সুযোগ পেয়ে দাবি জানাল মিতা। নাকি রানা আরেক ঘুষিতে…

না-না, দেব-দেব! দেব!

ঠিক আছে, তো চুপ করে শুয়ে থাকুন। বেচারা প্রফেসরের প্যান্টের বোতাম খুলতে লাগল মিতা।

অপমান গিলে বললেন প্রফেসর, আরে, জরুরি কথা তো বলিইনি!

তার চোখে ফ্ল্যাশলাইটের কড়া আলো ফেলল রানা। কী সেই জরুরি কথা? জ্বর আরও বাড়ল যে প্রলাপ বকছেন?

উজ্জ্বল আলোয় চোখ পিটপিট করলেন হ্যারিসন। হাত দিয়ে ঢেকে ফেললেন দুচোখ। তারই ভেতর হঠাৎ তার মনে এল গভীর এক সন্দেহ: দুর্দান্ত হ্যাণ্ডসাম ছোেকরা ওই অপ্সরার মত সুন্দরী মিতাকে পটিয়ে রাত-বিরাতে…

কী হলো, বলে ফেলুন, বলল রানা।

মিনমিন করে বললেন প্রফেসর, ইয়ে… হায়ারোগ্লিফ থেকে সবই জেনে গেছি কোথায় আছে পরের স্ফটিক।

তাই? একটু ঝুঁকল রানা প্রফেসরের দিকে। জ্বরের ঘোরে যা খুশি বকছেন না তো?

মাথা নাড়লেন হ্যারিসন। হাওয়ায় এসে ভাল লাগছে এখন। দুর্বল স্বরে বললেন, হ্যাঁ। পাহাড় পাড়ি দিয়ে ফিরতে হবে ওই লেকে।

তারপর?

দক্ষিণে পড়বে কয়েক সারি টিলা। তৃতীয় ও চার নম্বর টিলার মাঝে ওই সিঙ্কহোল। অনেকটা নিচু জমির সেনোটের মত। বর্ষার এ সময়ে জেগে ওঠে ছোট কামরার সমান ওই দ্বীপ। পানি থাকে কূপের ভেতর।

ওটা মন্দির? অবাক হয়েছে রানা।

ওই দ্বীপ সত্যিই মন্দির, পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার মন্দির। আর তার আয়না হচ্ছে ওই সেনোট।

আয়না নাম হলো কেন?

কূপ বা চারপাশের পানি কাঁচের মত পরিষ্কার, নিজের চেহারা দেখা যায়, বললেন আর্কিওলজিস্ট।

কোথায় আছে ওই স্ফটিক? জানতে চাইল রানা।

চুপ করে থাকলেন প্রফেসর। অপেক্ষা করছে রানা। কিছুক্ষণ পর মুখ খুললেন হ্যারিসন, দ্বীপে উঠলে পাবে সাধারণ কূপের মত ওই সেনোট। কিন্তু অন্যদিক থেকে ওটা আলাদা। নিচে ফেলতে হবে না বালতি, টেনেও তুলতে হবে না দড়ি। ব্যবস্থা করে রেখেছে প্রাচীন মায়ারা। একটা লিভার খুলে দিলেই নেমে যাবে পাথরের স্তূপ, বদলে শেকলের টানে উঠে আসবে ওই স্ফটিক।

তার মানে, কয়েক শ বছর আগেও ছিল মায়ান ব্রাদারহুডের লোক, বলল মিতা।

শেষজন কোডেক্স ফাদার সিলভার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, নইলে হারিয়ে যেত ওই দ্বীপ ও স্ফটিক। রানার চোখে চোখ রাখলেন হ্যারিসন। বিশ্বাস করো, স্ফটিক আছে ওখানে।

ঘুরে এসে হয়তো ধন্যবাদ দেব; একটু পর রওনা হব, বলল রানা। ঠিক করেছে, স্যান ইগন্যাসিয়ো ত্যাগ করে বহু দূরে চলে যাবে। এমন ব্যবস্থা নেবে, যাতে প্রথম সুযোগে ওর পিছু নেয় শত্রুরা।

মায়ারা ভাবতে ভালবাসত, আগামীকালের ওই বিশেষ ভোরে ধ্বংসের দিকে যাত্রা করবে না বিশ্ব, বললেন হ্যারিসন, আরও আসবে লক্ষ লক্ষ স্বাভাবিক ভোর।

খুঁজতে যাব পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার মন্দির, বলল রানা, আপনারা থাকছেন এ শহরে।

আর্কিওলজিস্ট নিচু স্বরে বললেন, বাছা, প্রার্থনা করি, যাতে তোমার মঙ্গল হয়। ভায়া কন ডিয়োস।

শুশ্রূষা দরকার প্রফেসরের। তাঁকে ফেলে কোথাও যাবে না মিতা। ভেজা কণ্ঠে রানাকে বলল, সাবধান থেকো।

পাঁচ মিনিট পর স্যান ইগন্যাসিয়ো ছেড়ে বেরিয়ে এল রানা। ভোর হতে এখনও দুঘণ্টা। ওঁর পিঠে ব্যাকপ্যাকে সাগরের মন্দির থেকে পাওয়া স্ফটিক এবং ল্যাং-এর সেই আইসোটোপ।

.

শহরের ছোট একটি বাড়িতে আঁধারে ঘুম ভাঙল পাবলোর। শুনল কী এক আওয়াজ। চিৎকার করল কেউ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল ও। এল না আর কোনও আওয়াজ। বাতি নেই কোথাও। ঘুমিয়ে পড়েছে অন্য বাচ্চারা। নড়ছে না কেউ।

অথচ, বুকের মাঝে পাবলো বুঝল, কী একটা দূরে চলে যাওয়ার অনুভূতি।

বিছানায় উঠে বসে চারপাশ দেখল ও।

মগজের ভেতর কেউ বলল, সত্যিই দূরে চলে যাচ্ছে ওটা!

শুনল কিট-কিট আওয়াজ।

বিছানা ছেড়ে নেমে নিঃশব্দে জানালার পাশে গেল পাবলো। কোথাও আলো নেই। কিন্তু রঙিন আলো দেখছে চারপাশে। ওই যে শহরের বাইরের টিলা, ওখানে নড়ছে সাইরেন।

হাতড়ে পোশাক পেয়ে পরে নিল পাবলো। পায়ে জুতো গলিয়ে নিয়ে নীরবে বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল।

ওই সাইরেনের পিছু নিতে হবে ওকে!

.

৪৭.

ক্যামপেচের নির্জন এক হেলিপ্যাডে প্রকাণ্ড স্কাইক্রেন হেলিকপ্টারে উঠছে একদল সশস্ত্র চাইনিজ লোক। তিন মিনিটের মধ্যেই অস্ত্র রেখে সিটে বসে পড়ল তারা। সব মিলে বিশজন। সবার পর র‍্যাম্প বেয়ে উঠল তাদের নেতা। যে-কেউ ভাববে তার দেহ জুড়ে রয়েছে নতুন ধরনের কোনও কেভলার আর্মার।

বিশেষ সিটে বসে দলের লোকদের দেখল হুয়াং লি ল্যাং। নিজে বেছে নিয়েছে এই যোদ্ধাদেরকে। বুকে ভয় বলতে এদের কিছুই নেই। আড়চোখে দেখছে আর ভাবছে, নেতা পুরোপুরি মানুষ নন, মেশিনের অংশ। অথবা নেতার অংশ ওই ভয়ঙ্কর মেশিন।

নার্ভের ইনপুট অনুযায়ী নির্দিষ্ট গতি তুলে ককপিটের দিকে তাকাল হুয়াং লি ল্যাং। প্রথমে তার মনে হচ্ছিল, বড় বেশি দ্রুত নড়ছে সে। কিন্তু এখন মানিয়ে নিয়েছে মেশিনের সঙ্গে। নিজেকে মনে হচ্ছে টিভির সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যানের মত শক্তিশালী। ভালুকের চেয়েও বেশি শক্তি, গতি চিতার সমান। ঠিক করে ফেলেছে ল্যাং, স্ফটিক ব্যবহার করে পুরো সুস্থ হলেও, আরও আধুনিক করে তুলবে এই সুট। আসলে সব সময়ই ঠিক ভেবেছে সে: মেশিনই তাকে করে তুলবে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি।

ওই ছেলে আর ওসব পাথর খুঁজে বের করব আমরা, দলের উদ্দেশে বলল ল্যাং। কাজেই দয়া দেখাবে না কাউকে। কোনও বাধা এলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করবে। কাজ শেষ হলে প্রত্যেকে পাবে বড় অঙ্কের বোনাস।

খুশিতে হৈ-হৈ করে উঠল চাইনিজ মার্সেনারিরা। দরকার হলে যোগ্য নেতার সঙ্গে নরকে যেতেও আপত্তি নেই।

পাইলটের দিকে ইশারা করল হুয়াং লি ল্যাং।

দুসেকেণ্ড পর গর্জে উঠল স্কাইক্রেন হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন।

.

সারারাত অক্লান্ত সেবা করেছে মিতা।

প্রফেসর জর্জ হ্যারিসনকে খাটে শুইয়ে আইভি দেয়ার পর পরিষ্কার করেছে ক্ষত, তারপর খাইয়ে দিয়েছে ওষুধ। রানা চলে যাওয়ার একটু পর এসেছেন ফাদার ভাসকুয়েজ। তিনি সাহায্য করেছেন রোগী শুশ্রূষায়। ভোরের দিকে ছেড়ে গেছে হ্যারিসনের জ্বর।

হাঁফ ছেড়েছে মিতা, এবারের মত প্রাণে বেঁচে গেছেন পাগলা প্রফেসর।

চলে গেছেন ফাদার। পাশের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে মিতা।

তবে ওর ঘুম ভাঙল দুঘণ্টা পর চার্চের ঘণ্টির ঢং-ঢং আওয়াজে।

আনমনে ভাবল মিতা, আজ কী রবিবার?

কী জানি!

পাশের ঘরে গিয়ে রোগীকে দেখল, জেগে গেছেন প্রফেসর। চেতনা আছে পুরো।

ঘুম ভেঙে গেল? জানতে চাইল মিতা।

এত আওয়াজ হলে ঘুমানো যায়? দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হ্যারিসন।

কথা ঠিক। বেজেই চলেছে চার্চের ঘণ্টি। মোটেও থামছে না।

হঠাৎ চমকে গেল, মিতা। মস্ত কোনও বিপদ না হলে এভাবে বাজানো হয় না ঘন্টি!

পাশের ঘরে এসে ব্যাকপ্যাক থেকে পিস্তল নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এল মিতা। ওখানেই থামতে হলো ওকে। অস্ত্র হাতে ওর জন্যে অপেক্ষা করছে দুই শ্বেতাঙ্গ লোক। শহরের কয়েকজনকে জিম্মি করেছে ওই দলের আরও দুজন।

এই চারজনের নেতার বয়স চল্লিশ হবে। দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। কঠোর সুরে বলল সে, পিস্তলটা মাটিতে ফেলে দাও, মেয়ে!

নির্দেশ পালন করল মিতা।

ওর দিকে এগিয়ে এল লোকটা। গম্ভীর চেহারায় বলল, আমার নাম ইগোর দিমিতভ। তোমার কাছে রয়ে গেছে আমাদের খুবই জরুরি কিছু।

.

বিশ মাইল দূরে চতুর্থ টিলা বেয়ে উঠছে মাসুদ রানা।

রাতে পেছনে রেখে এসেছে ঘন জঙ্গল ও কয়েকটা টিলা। ছোট, সরু এক ক্যানিয়ন পেরোবার সময় ওটার ভেতর ফেলেছে রেডিওঅ্যাকটিভ পেলেট। কপাল ভাল হলে ওখানে খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করবে ল্যাং-এর লোক। গর্ত ও ফাটলের শেষ নেই, ভাবতে পারে, ওরা আছে ওখানেই।

এরপর নানান বাধা পার করে পুরো পাঁচ মাইল সরে এসেছে রানা, ক্লান্ত। এ মুহূর্তে হাঁটছে স্বাভাবিক গতিতে। কাঁটাগাছের অত্যাচারে ছড়ে গেছে শরীর। চটচট করছে ঘাম মেশা ধুলো। পুরো মনোযোগ সামনের দিকে। আর সে কারণেই শুনতে পেল না ঘনিয়ে আসছে মহাবিপদ।

একটু পর কানে এল আওয়াজটা। বাতাসে গুনগুন গুঞ্জন তুলছে কিছু। বিমান বা হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, আওয়াজটা অনেকটা লন মোয়ারের মত।

চট করে ঘন এক ঝোপে ঢুকল রানা। চোখ পেছনে ফেলে আসা আকাশে। কয়েক সেকেণ্ড পর দেখল, একমাইল দূরে ওটা। উড়ে আসছে এদিকে। রিমোটলি অপারেটেড ড্রোন।

তার মানে, ওকে খুঁজে পেয়ে গেছে ল্যাং!

ঝোপ ছেড়ে বেরিয়েই ঝেড়ে দৌড় দিল রানা। ওপর থেকে ওকে দেখবে ড্রোন। কাজেই চাই ভাল কোনও কাভার। হয়তো টিলার ওপরের দিকে আছে তেমন জায়গা।

ঝোপঝাড় ভেঙে দৌড়ে চলেছে রানা। কিন্তু মাত্র একমিনিট পর মাথার ওপর দিয়ে গুঞ্জন তুলে গেল ড্রোন। আরেকটু হলে ছিলে দিয়ে যেত চাঁদি।

ছুটতে ছুটতে ওপরে তাকাল রানা।

ভাগ্য ভাল, ওই ড্রোন নিরস্ত্র।

অবশ্য, তখনই শুনল আরেকটা গুঞ্জন।

ওটাও ড্রোন!

পরক্ষণে শুনল আনগাইডেড রকেটের তীক্ষ্ণ হুইস!

ডানদিকের ঢালু জমিতে ঝাঁপ দিল রানা। মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে এক শ ফুট দূরের জমিতে পড়ে বিস্ফোরিত হলো রকেট। দুসেকেণ্ড পর এল কংকাশন ওয়েভ ও আগুনের তাপ।

রানার দশ ফুট ওপর দিয়ে গেল দ্বিতীয় ড্রোন। ঘুরে এসে খতম করবে শিকারকে। লাফ দিয়ে উঠে হরিণের গতি তুলল রানা, পাই-পাঁই করে উঠে যাচ্ছে টিলা বেয়ে। কয়েক সেকেণ্ড পর চূড়ার কাছে পৌঁছে লুকিয়ে পড়ল বেশ কিছু বোল্ডারের মাঝে।

আপাতত নিরাপদ।

ড্রোনের খোঁজে আকাশে তাকাল রানা।

পাইলটহীন দুই বিমান অলস শকুনের মত ঘুরছে ওপরে। আটকে রাখবে ওকে, ওদিকে দূর থেকে এসে হাজির হবে সত্যিকারের শিকারীরা!

.

উদ্যত অস্ত্রের মুখে আবারও গেস্টহাউসে ঢুকতে হয়েছে। মিতাকে। ওর পিছু নিয়ে ঢুকেছে ইগোর দিমিতভ। এ ছাড়া, এ বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছে ফাদার ভাসকুয়েজ এবং শহরের কয়েকজনকে। তাদের ভেতর লিনিয়াকে চিনল মিতা। ওই মহিলা রেখেছিল পাবলোকে। অনুষ্ঠানের জন্যে ওকে ধার দিয়েছিল গাউন। এখন হাঁটু গেড়ে সবাইকে বসিয়ে রেখেছে নিষ্ঠুর চেহারার রাশানরা।

দয়া করে ওদের ক্ষতি করবেন না, কাতর সুরে বলল মিতা। আমার সঙ্গে ওদের কোনও সম্পর্ক নেই।

ঠোঁটে ভোদকার বোতল তুলল ইগোর দিমিতভ। এক ঢোক জ্বলন্ত তরল গিলে নিয়ে বলল, আমাদেরকে ফাঁকি দিয়েছ, মেয়ে। তোমার কারণেই ওরা এখানে। লুকিয়ে রেখেছো ছেলেটাকে। কাজেই প্রাণে বাঁচবে না কেউ।

দিমিতভের লোকদেরকে দেখল মিতা। এ ধরনের লোকই গিয়েছিল সেই ফাইভ স্টার হোটেলে। এবার সঙ্গীদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে। চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে রাগ ও ঘৃণা।

দিমিতভের দিকে তাকাল মিতা। লোকটার দৃষ্টি বলে দিল, আগেও মানুষ খুন করেছে সে।

জ্যৈষ্ঠের কাঠের মত শুকিয়ে গেল মিতার গলা। বাঁচবে না ওরা কেউ!

ফাদার ভাসকুয়েজের পাশে বসানো হয়েছে ওকে। সামনে এসে দাঁড়াল ইগোর দিমিতভ। ছেলেটা কোথায়?

এই পাষণ্ডের হাতে বাচ্চা ছেলেটাকে তুলে দিতে হবে ভাবতে গিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে হলো মিতার। কিন্তু উপায়ই বা কী? নইলে এই শহরের সবাইকে মেরে ফেলবে রাশানরা।

আমি জানি না ও কোথায়, সত্য বলল মিতা।

মিথ্যা বলছ! রাগে গর্জে উঠল দিমিতভ। ঠেকিয়ে দিল মিতার মাথার পাশে ম্যাকারভ পিস্তল।

ওটার জোর গুঁতো খেয়ে মেঝেতে কাত হয়ে পড়ল মিতা। তাক করেই গুলি ছুঁড়ল লোকটা। প্রচণ্ড আওয়াজে কেঁপে উঠল ঘর। চমকে গেছে সবাই। ফুটো হয়ে গেছে মিতার নাকের তিন ইঞ্চি দূরের মেঝে।

সাবধানে উঠে বসল মিতা। হাত মাথার ওপর।

এক পা পিছিয়ে বোতল ঠোঁটে তুলে আরেক ঢোক ভোদকা খেল ইগোর দিমিতভ। পরিষ্কার বোঝা গেল, কঠিন কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। এমন কিছু, যেটা পছন্দ নয় তার।

চার্চ আর ওই মেয়েলোকের বাড়ি সার্চ করেছি, এই রাস্তার অন্য বাড়িও বাদ পড়েনি, কিন্তু আশপাশে নেই ওই ছেলে, কঠোর সুরে বলল প্রাক্তন এফএসবি এজেন্ট।

পালিয়ে গেছে, কাঁপা গলায় বলল লিনিয়া, জানি না কোথায়।

মহিলার পেছনে গিয়ে প্রফেসর হ্যারিসনের দিকে তাকাল দিমিতভ। আঙুল তাক করল আইভি লাইনের দিকে।

আমি আপনাকে ভয় পাই না, আড়ষ্ট কণ্ঠে বললেন বৃদ্ধ আর্কিওলজিস্ট।

অসুস্থ? বলল দিমিতভ, তো সবার আগে কষ্ট দূর করব আপনার।

শ্বাস আটকে ফেলল মিতা। বুঝে গেছে, লোকটাকে আরও রাগিয়ে দিলে খুন হবেন প্রফেসর। খুনিটার পায়ের আওয়াজ সরে আসছে শুনে একটু স্বস্তি পেল।

আবারও বন্দিদের সামনে এসে দাঁড়াল ইগোর দিমিতভ। আঙুল নাচিয়ে বলল, তোমরা একই কথা বলছ। তার কণ্ঠ শুনে মিতার মনে হলো, ওদের কথা বিশ্বাস করেছে সে। কিন্তু পরক্ষণে বলল লোকটা, কিন্তু ঝালাই করা মিথ্যা সবসময় জোরালো হয় সত্যির চেয়েও।

সবাইকে নিয়ে কীভাবে মুক্তি পাবে, তাই মগজ খেলাতে শুরু করেছে মিতা। কয়েক সেকেণ্ডে বুঝল, কাজটা অসম্ভব। দরজার সামনেই নীরব চার রাশান, কিন্তু ওরা কেউ উঠে দাঁড়ালেই অস্ত্র তাক করবে ওদের দিকে। খাঁচায় বন্দি বাঘের মত পায়চারি করছে ইগোর দিমিতভ। মিতা দেখল, ধুপ ধুপ শব্দে কাঠের মেঝেতে পা ফেলছে সে। তার মানেই, ফুরিয়ে আসছে ধৈর্য।

মিতার সামনে থামল ইগোর দিমিতভ। ভাল করেই জানো, কীভাবে শেষ হবে খেলা। খুন করব সবাইকে। তবে অন্যদের মরতে দেখবে তুমি। ওদেরকে বাঁচাতে চাইলে, দেরি না করে বলো ছেলেটা কোথায়।

মেঝের দিকে তাকাল মিতা। চোখে চোখ রাখার সাহস হারিয়ে ফেলেছে। চোখের কোণে জমে গেল জল, তারপর টপটপ করে অশ্রু বিন্দু পড়ল শুকনো কাঠের মেঝের ওপর।

চোখ বুজে ফেলল মিতা। কিন্তু কয়েক সেকেণ্ড পর দুহাতে মুছে ফেলল অশ্রু। রাগ হলো ওর রাশানদের ওপর। শহরের সব মানুষকে জিম্মি করেছে এরা। খুন করবে বলছে। অথচ ওদের কোনও দোষ নেই। ইগোর দিমিতভের চোখে চোখ রাখল মিতা।

আমি ভাল করেই জানি তুমি কে, ইগোর দিমিতভ।

অবসর নেয়ার আগে পেশাদার ছিলাম, বলল দিমিতভ, তখন সম্মান ছিল। এখন আমি আবর্জনাখেকো, ঘেয়ো কুকুর।

হয়তো আমাদেরকে খুন করবে, কিন্তু মনে রেখো, নিজেদের কবর খুঁড়ছ তোমরা, বলল মিতা।

ইগোর দিমিতভের কঠোর চেহারায় কীসের এক রহস্যময় অনুভূতি খেলে যেতে দেখল মিতা। কয়েক সেকেণ্ড পর লোকটার পেটের গভীর থেকে উঠে এল অসুস্থকর হাসি। আরেক চুমুক দিয়ে মিতার দিকে বাড়িয়ে দিল ভোদকার বোতল। নিচু স্বরে বলল, অনেক আগেই খোঁড়া হয়ে গেছে আমার কবর।

মুহূর্তের জন্যে তাকে দুঃখী মনে হলো মিতার। আর তখনই মনে পড়ল সেই গোল মুখ। চ্যাপ্টা নাক। চোখের দৃষ্টি ধারালো ছোরার মত।

আমি চিনতাম তোমার ভাইকে, বলল মিতা। তোমার তুলনায় হাজারগুণ ভাল ছিল সে। ছেলেটার প্রতি মমতা ছিল।

খুব ধীরে ম্যাকারভ পিস্তল ওপরে তুলল ইগোর দিমিতভ। মিতার মনে হলো, মাতাল হয়ে গেছে লোকটা। ভারী লাগছে তার কাছে অস্ত্রটা।

তুমি আমার ভাইয়ের কথা বলছ? বলল সে। ও কিডন্যাপ করেছিল পাবলোকে।

বাঁচাতে চেয়েছিল ছেলেটাকে, বলল মিতা।

 তাই? ঘৃণার সঙ্গে বলল ইগোর। এবং ব্যর্থ হয়েছে।

 হয়নি! নিজের প্রাণ দিয়ে রক্ষা করেছে বাচ্চাটাকে!

 ঘুরে ফাদার ভাসকুয়েজের মাথার পেছনে পিস্তল ঠেকাল সে।

এ কাজ কোরো না, অনুরোধ করল মিতা।

সময় হয়ে এল, থমথমে কণ্ঠে বলল ইগোর।

স্রষ্টা মাফ করুন তোমাদের, সরল কণ্ঠে বললেন ফাদার ভাসকুয়েজ।

আশা ছাড়া আর কিছুই নেই মানুষের, বলল ইগোর দিমিতভ। পিস্তল তুলেই ঘুরে ডানদিকের দুই রাশানের বুকে গুলি করল সে। লাশদুটো মেঝেতে পড়ার আগেই পরের দুই গুলি বুকে নিয়ে ছিটকে পড়ল বামদিকের দুই রাশান।

বদ্ধ ঘরে কানে তালা লাগিয়ে দিয়েছে চারটে গুলির আওয়াজ: গুড়ুম! গুড়ম! গুড়ুম! গুড়ম!

এখনও ছটফট করছে এক এফএসবি জুনিয়র এজেন্ট।

আবারও গুড়ম করে উঠল ইগোর দিমিতভের পিস্তল।

খুন করতে এসে পৃথিবী ছেড়ে গেল মাথায় গুলি খেয়ে চার যুবক।

নানান দিকে ছিটকে পড়েছে ঘরের সবাই। উঠে দাঁড়িয়ে দৌড় দিয়েছে লিনিয়া দরজার লক্ষ্য করে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেখছে অবাক মিতা। বরফের মূর্তি হয়েছেন প্রফেসর হ্যারিসন। বিস্ফারিত চোখে দেখলেন মিতার ওপর স্থির হলো দিমিতরে পিস্তলের নল।

ক-কী হলো? জানতে চাইল মিতা। বোঝা সহজ, বলল দিমিতভ। আমার আপত্তি আছে। আজ মরতে।

আমিও তো চাই না মরতে, জানাল মিতা।

মরতে হবে না তোমাকে, পিস্তল নামিয়ে ফেলল ইগোর। অন্তত আমার হাতে মরবে না। আজ সবাইকে খুন করত এরা। মৃত রাশানদের দেখাল সে।

মিতা মুখ খোলার আগেই ফাদার ভাসকুয়েজের দিকে ফিরল প্রাক্তন এফএসবি এজেন্ট। ফাদার, আপনি কী জানেন পাবলো কোথায়?

মাথা নাড়লেন ভাসকুয়েজ।

জানি না মিথ্যা বলছেন কি না, তবে আশা করি, ওকে ভাল কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন আপনারা, বলল দিমিতভ। ভয় পাবেন না, ওকে রাশায় নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই।

আমরা জানিই না ও কোথায়, মাথা নাড়লেন ফাদার।

তা হলে ওকে খুঁজে বের করুন, বলল দিমিতভ। সরিয়ে ফেলবেন এই শহর থেকে। এমন কোথাও, যেখানে ওকে খুঁজে পাবে না এফএসবি। যারা আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে, তাদেরকে বলব, গোলাগুলির সময় মারা গেছে পাবলো। লাশ নিয়ে পালিয়ে গেছে একদল লোক।

চুপ করে আছে মিতা। দেখছে ইগোর দিমিতভকে। ভাবছে, একটু আগে কত খারাপ লোক ভেবেছিল একে!

আসলে কী হলো, সত্যিই বুঝলাম না, বলল মিতা।

দিনের পর দিন ভেবেছি, আমার ভাই অসম্মান করেছে আমাদের বংশের, বলল ইগোর দিমিতভ। কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে, না বুঝে ওকে অসম্মান করে ফেলেছি আমি। যা উচিত, তাই করতে চেয়েছিল ও।

এখন কী করবেন ভাবছেন? জানতে চাইল মিতা।

কী করব? বলল এফএসবির প্রাক্তন তুখোড় এজেন্ট, এখন একদল চিনা সশস্ত্র লোক এবং প্রায় মেশিনের মত একদল দানব যাচ্ছে তোমার বন্ধু মাসুদ রানাকে খুন করতে। এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে বাঙালী যুবক, কেউ পাশে না লড়লে নির্ঘাত মরবে।

মিতার দিকে ডানহাত বাড়িয়ে দিল রাশান। আমরা সাহায্য করতে পারব ওকে।

ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মিতার মুখ। বেসুরো কণ্ঠে বলল, কিন্তু… রানা তো… চলে গেছে অনেক দূরে!

জানি, বলল ইগোর দিমিতভ, কমরেড হুয়াং লি ল্যাং-এর সঙ্গে আছে হেলিকপ্টার। কিন্তু ঘাবড়ে যেয়ো না। আমাদের সঙ্গে যা থাকবে, ওটার কথা ভাবতেও পারেনি ওই নরকের পশু।

এত কিছু ঘটে গেছে, কেমন মাথা ঘুরছে মিতার। কিন্তু হঠাৎ করে ভয়ে বুক আঁকড়ে এল ওর। একা রানাকে বাগে পেয়ে খুন করবে ল্যাং!

ইগোর দিমিতভের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল মিতা। তা হলে চলুন! ওর সাহায্য দরকার!

.

৪৮.

 ইয়াকা মাউন্টেনের সুড়ঙ্গে ড্রাইভার হামভি পুরো থামাবার আগেই লাফিয়ে নেমে পড়লেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান। প্রায় দৌড়ে গিয়ে উঠলেন ট্রেইলার ল্যাবোরেটরির ভেতর।

কার এত তাড়াহুড়ো, তা দেখতে মুখ তুলে তাকালেন বিজ্ঞানী ক্যাথিবা আলিহা, সিআইএ চিফ মার্ণ ক্যালাগু এবং দুই দলের বিজ্ঞানীরা। মাত্র আধঘণ্টা পর প্রচণ্ড বিচ্ছুরণ হবে ব্রাযিল স্টোন থেকে, তাই কীভাবে ওটাকে সবচেয়ে নিরাপদে ধ্বংস করা যায়, তা নিয়ে চলছিল আলোচনা।

ফ্ল্যাট-স্ক্রিন মনিটরের স্পিকার থেকে এল প্রেসিডেন্টের কণ্ঠ: সব ফেলে কোথায় ছিলে, জেমস?

সরি, নতুন একটা থিয়োরি নিয়ে কাজ করছিলাম, বললেন ব্রায়ান।

আর সময় পেলেন না! ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে বললেন ক্যালাগু।

ফালতু কথা বাদ দিন! পাল্টা ধমক দিলেন ব্রায়ান। ঘুরে তাকালেন মনিটরে প্রেসিডেন্টের দিকে।

অনেক দেরি হয়ে গেছে, জেমস, বললেন প্রেসিডেন্ট।

আগে শুনুন আমার কথা, তারপর যা ভাল মনে হবে করবেন, বললেন ব্রায়ান, চাইলে এরপর গুলি করেও মারতে পারেন আমাকে, আপত্তি তুলব না। মাত্র দুটো মিনিট দিন। প্রেসিডেন্ট কিছু বলার আগেই দম না নিয়েই বললেন, মিস্টার ক্যালাগুর তথ্য ঠিক। কিন্তু সংখ্যা ঠিক ছিল না। ওগুলো আমরা বের করেছি। আর তাই জেনে গেছি বাস্তবতা কী।

মিস্টার ক্যালাগু? বললেন প্রেসিডেন্ট।

মাথা নাড়লেন সিআইএ চিফ। আমার জানা নেই ব্রায়ান কী বলতে চাইছেন।

উদ্বিগ্ন হয়ে ঘড়ি দেখলেন প্রেসিডেন্ট। যা বলবে চট করে বলো, জেমস।

বড় করে দম নিলেন ব্রায়ান। দরদর করে ঘামছেন। ঘুরছে মাথা। টিটকারির হাসি হাসছেন ক্যালাগু। বস আবারও অপমানিত হবেন, সেই কথা ভেবে মেঝের দিকে চেয়ে আছে এনআরআই স্টাফরা। মন খারাপ করে অন্যদিকে তাকালেন ক্যাথিবা আলিহা।

এই ল্যাবে কেউ তার সঙ্গে সায় দেবে না, বুঝে গেলেন ব্রায়ান। আড়ষ্ট কণ্ঠে বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, জিয়োলজি অনুযায়ী, পৃথিবীর মাঝের অংশ প্রকাণ্ড এক তপ্ত, ঘুরন্ত তরল। বেশিরভাগ নিকেল আর আয়ার্ন। আর এ কারণেই ওই ঘুরন্ত গোলক তৈরি করছে ম্যাগনেটিক ফিল্ড। ওটা রক্ষা করছে আমাদেরকে।

সবার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছেন, বুঝে গেলেন ব্রায়ান।

তবে সমস্যা হচ্ছে, কেউ নিশ্চিত নন অত গভীরে কী আছে এবং কী হচ্ছে। কারও সাধ্য নেই যে থিয়োরি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আর এ কারণেই কেউ জানাতে পারেননি, কী কারণে পাল্টে যাচ্ছে পৃথিবীর ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড। হয়তো এক বিলিয়ন বছর পর পরিবর্তিত হলো ওটা। আবার মাত্র পঞ্চাশ মিলিয়ন বছর পরেই এল পরিবর্তন। ঘর্মাক্ত চুলে হাত বোলালেন ব্রায়ান। টের পেলেন, ফেটে যেতে চাইছে কপালের পাশের রগ। এর কারণ, স্যর, মাত্র একটা ম্যাগনেটিক ফিল্ড কাজ করছে না পৃথিবী জুড়ে। তিন স্তরের ফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে এই গ্রহ। তাদের ভেতর ঘটছে অনেক কিছুই।

পাগল হয়েছেন? খেঁকিয়ে উঠলেন ক্যালাণ্ড।

তাকে পাত্তা দিলেন না ব্রায়ান। ওই একই ঘটনা ঘটছে সূর্যের বুকে। তৈরি করছে আমাদের গ্রহের ম্যাগনেটিক ফিল্ডের চেয়ে লক্ষ গুণ শক্তিশালী ফিল্ড। তবে প্রতি এগারো বছরে পাল্টে যাচ্ছে সেসব ম্যাগনেটিক ফিল্ড। সহজ নয় বিষয়টি। সূর্যের মেরুর দিকে নিরক্ষরেখা ঘুরছে অনেক জোরে। ফলে সূর্যের বুকে আঁচড়ের মত তৈরি হচ্ছে ম্যাগনেটিক লাইন। ব্যাপারটা পেতে রাখা চাদরের মাঝ থেকে টান দেয়ার মত। ওপরে উঠছে মাঝখান, কিন্তু রয়ে যাচ্ছে আগের জায়গায় চাদরের কিনারা। এলোমেলো হয়ে উঠছে। টেনে রাখা রাবার ব্যাণ্ডের মত ছিটকে যাচ্ছে সূর্যের লাইন। আমরা ওটাকেই বলি সোলার ফ্লেয়ার। বা বলতে পারেন করোনাল ম্যাস ইজেকশন। ওটার কারণে মুহূর্তে তৈরি হচ্ছে অকল্পনীয় পরিমাণের এনার্জি।

কী পরিমাণের কথা বলছ? জানতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট।

এতই, একেক মুহূর্তে মহাশূন্যে ছুঁড়ছে শত শত বিলিয়ন টন তপ্ত মেটারিয়াল।

এরসঙ্গে পৃথিবীর কী সম্পর্ক? জিজ্ঞেস করলেন প্রেসিডেন্ট।

আমরা ধারণা করেছি, পৃথিবীর মাঝের অংশ গোল বলের মত, ঘুরছে। কিন্তু বাস্তবে ভেতরে ঘুরছে তপ্ত তরল। সিমুলেশনের সময় গ্রাফ দেখে বুঝলাম, কখন হবে ফিল্ডের স্ট্রেংথ আর রিভার্সাল। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর বাইরের অংশে নিরক্ষরেখা আর মেরু কিন্তু আলাদা গতি তুলে ঘুরছে। ওটাই হচ্ছে দ্বিতীয় ম্যাগনেটিক ফিল্ড।

তুমি বলেছিলে তিনটে ম্যাগনেটিক ফিল্ড আছে?

হ্যাঁ, মাথা দোলালেন ব্রায়ান। তৃতীয় ফিল্ডটা তৈরি করেছে বিপুল পরিমাণের পাথর মিলে। মাত্র তিন হাজার বছর হলো ওটা তৈরি হয়েছে। ভেতরের গরম তরল যেন ছিটকে বেরিয়ে না আসে, সে চেষ্টা করছে ওটা।

এর ফলে কী হচ্ছে?

 সূর্যের মতই পৃথিবীর বুকেও তৈরি হচ্ছে ভাজ।

গলা পরিষ্কার করলেন প্রেসিডেন্ট। আর এরপর যখন ওই রাবার ব্যাণ্ড ছিঁড়ে যাবে?

মাথা নাড়লেন ব্রায়ান। আণবিক বোমা বিস্ফোরণের মত হবে না সাদা ব্যাঙের ছাতার মেঘ। কিন্তু আমরা টের পাব অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে। হয়তো তা হবে মৃদু ভূমিকম্প, বা থরথর করে কাঁপবে পৃথিবী। তবে সবচেয়ে বেশি বুঝব আমরা

অন্য কারণে। বিচ্ছুরণ হবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক প্রচণ্ড শক্তি। পুরো সংখ্যা দেখিনি, কিন্তু ধরে নিন, ওই বিচ্ছুরণ হবে কদিন আগের ওই মারাত্মক বিচ্ছুরণের চেয়ে দশ হাজার গুণ বেশি।

দশ হাজার গুণ? চমকে গেলেন প্রেসিডেন্ট।

প্রচণ্ড এক সুনামির আঘাতের মত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ ধ্বংস করবে পশ্চিম হেমিস্কেয়ারের প্রতিটি ইলেকট্রিকাল সার্কিট। নষ্ট হবে পৃথিবীর গৃহপথের কাছের সব স্যাটেলাইট। সামান্য দুর্বল ওয়েভ যাবে এশিয়া, রাশা ও উত্তর-পুব ইউরোপের ওপর দিয়ে। এর মানে, আধুনিক সব ইলেকট্রনিকের সর্বনাশ হলেও তাদের রয়ে যাবে মিলিটারি অনেক ইকুইপমেন্ট। বিশেষ করে সাইলোর ভেতর মিসাইল। থাকবে তাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা। কিন্তু আমাদের থাকবে না সে শক্তি। যে-কোনও সময়ে আসবে চিন বা রাশার তরফ থেকে হামলা।

আর এসব স্ফটিকের কী ভূমিকা এসবের ভেতর?

ওগুলো রয়েছে সঠিক সময়ে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ মহাশূন্যে পাচার করে দেয়ার জন্যে, যাতে ছিঁড়ে না যায় পৃথিবীর ওপরের রাবার ব্যাণ্ড, বললেন ব্রায়ান। কিন্তু গণ্ডগোল দেখা দিল রাশার ওই স্ফটিক বিস্ফোরিত হওয়ায়।

অবশ্য, এমন হবে ভেবেছিলেন অতীতের মায়ান বিজ্ঞানীরা। তাই আমরা স্ফটিক সরিয়ে নিলেও নিজেদের ভেতর ছিল ওগুলোর তথ্য আদান-প্রদান। লাইটনিং রডের মত যে যার ভাগের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ নিরাপদে পাঠিয়ে দিয়েছে মহাশূন্যে। কিন্তু এসব স্ফটিক কাজ করবে শুধু মাটির ওপরে তুললে। একটা আছে মেক্সিকোতে। আমাদের কাছে একটা।

চুপ করে আছেন প্রেসিডেন্ট।

থমথম করছে ঘর।

এমন কী নিশ্চুপ ব্রায়ান। জানেন না, ঠিকভাবে বোঝাতে পেরেছেন কি না কমাণ্ডার ইন চিফকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, সাধ্যমত তো করলাম!

আপনারা সবাই আপাতত ল্যাব থেকে বাইরে যান, কিছুক্ষণ পর বললেন প্রেসিডেন্ট, আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে চাই এনআরআই চিফের সঙ্গে।

ব্রায়ানের পাশেই বসেছেন ক্যাথিবা আলিহা। আঙুরের রসের বোতল নিয়ে উঠে পড়লেন। নরম সুরে বললেন, ভালই শোচালালেন।

ওই কথা শুনে ব্রায়ানের মনে হলো, বিজ্ঞানী বুঝে গেছেন, ভাল লড়েও হেরে গেছেন তিনি।

একে একে ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেলেন অন্যরা। সবার শেষে সিআইএ চিফ ক্যালাগু। দরজা বন্ধ করার আগে বিষ চোখে দেখলেন ব্রায়ানকে। যদি পারতেন, গুলি করে পাগলা কুকুরের মত করে খুন করতেন জন্মের শত্রুকে।

.

৪৯.

 আকাশের দুই ড্রোন মিলে কয়েকটা বোল্ডারের মাঝে গেঁথে ফেলেছে রানাকে। কী করবে ভাবছে ও, এমনসময়, দেখল পৌঁছে গেছে তিনটে ভারী হেলিকপ্টার। নেমে পড়ল ওগুলো দুই টিলার মাঝে সমতল জমিতে।

সামনের হেলিকপ্টার থেকে নামল সশস্ত্র একদল লোক। সংখ্যায় হবে কমপক্ষে বিশজন! দ্বিতীয় হেলিকপ্টার থেকে নামল খচ্চরের মত দেখতে বেশ কয়েকটা জন্তু।

ওগুলো আবার কেন?

 চোখে বিনকিউলার তুলল রানা।

খচ্চর নয় ওগুলো!

অদ্ভুত কোনও মেশিন! চার পা খচ্চরের মতই, কিন্তু মাথার জায়গায় মেশিনগানসহ টারেট!

পিছিয়ে পড়ল সশস্ত্র আর্মি, তাদের আগে আগে হাইড্রলিক পায়ে হেঁটে আসতে লাগল যন্ত্রমানবরা! টারেটের মাথা দুলছে এদিক-ওদিক!

ছয়জন, গুনল রানা। গলা শুকিয়ে গেল ওর। যন্ত্রমানব কাছে আসার আগেই ভাগতে হবে এখান থেকে!

দুই বোল্ডারের মাঝে অ্যাসল্ট রাইফেল রেখে সাইট স্থির করল সামনের যন্ত্রমানবের ওপর। ট্রিগার টিপতেই দুই সেকেণ্ড পর বুলেট লাগল বুকে, ছিটকে উঠল লালচে ফুলকি, হোঁচট খেল যন্ত্রমানব। পড়তে গিয়েও সামলে নিল তাল। লম্বা লম্বা পায়ে উঠে আসছে ঢালু জমি বেয়ে।

আবারও গুলি করল রানা। ফলাফল একই। এবার সুইচ টিপে ফুল অটোমেটিকে নিয়ে কয়েক পশলা গুলি করল ও।

মাটিতে পড়ল এক যন্ত্রমানব। ক্ষতি হয়েছে সামনের পায়ের। পেছনের দুই পা এখনও ঠেলছে এগোবার জন্যে। রানার দিকে ঘুরল অন্য পাঁচ যন্ত্রমানব, পরক্ষণে এল একরাশ বুলেট। ছিটকে উঠল রানার সামনের বোল্ডারে লেগে।

ডাইভ দিয়ে একটু দূরের জমিতে পড়ল রানা। ক্রল করে সরে গেল পনেরো ফুট। কয়েকটা বোল্ডারের মাঝ দিয়ে দেখতে চাইল অগ্রসরমাণ দানবগুলোকে। কিন্তু ওর জন্যেই যেন তৈরি ছিল তারা। উঁকি দিতেই আরেক পশলা গুলি এসে লাগল সামনের বোল্ডারে।

রানার জানা নেই, কেমন সেন্সর ব্যবহার করছে। যন্ত্রমানবরা। হয়তো হিট সেন্সর, মোশন ডিটেক্টর, শেপ রেকগনিশন সফ্টওয়্যার ঘটনা যাই হোক, খুব ভালভাবেই জানে ওর বর্তমান অবস্থান।

শিলাবৃষ্টির মত চারপাশে লাগছে অজস্র বুলেট। আবারও সরে কাভার নিল রানা। সবচেয়ে বড় বোল্ডারে ঠেকিয়ে নিল পিঠ। বুঝে গেছে, এবার আর রক্ষা নেই ওর!

বিদঘুটে ঠক-ঠক-ক্যাঁচ শব্দে উঠে আসছে পাঁচ যন্ত্রমানব!

.

ঝড়ের গতি তুলে আকাশ চিরে চলেছে রাশান প্রকাণ্ড মিলিটারি গানশিপ হিন্দ-ডি। গানারের সিটে মিতা। একহাত গান কন্ট্রোল জয়স্টিক-এর ওপর, চাইলেই ব্যবহার করতে পারবে ৩০ এমএম কামান। আরও আছে এক র‍্যাক ভরা এয়ার-টু-গ্রাউণ্ড মিসাইল।

পুরো আড়াই শ নট গতি তুলেছে হিন্দ। টপ স্পিড।

মৃদু কম্পন এয়ারফ্রেম জুড়ে। হেলিকপ্টারের তুমুল বেগ ও প্রচণ্ড শক্তির জন্যে নিজেকে ক্ষমতাশালিনী মনে হচ্ছে মিতার। যেন প্রাচীন এক জেনারেল, বিশাল স্ট্যালিয়নে চেপে চলেছে মহাযুদ্ধে!

হিন্দ-ডি আকাশে তোলার আগে মিতাকে ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে ইগোর দিমিতভ, কীভাবে ব্যবহার করতে হবে সব অস্ত্র। এখন টার্গেট যোন-এর কাছে পৌঁছে গেছে ওরা।

শত্রু ঘায়েল করতে তৈরি মিতা। এই জিনিস এ দেশে আনলেন কী করে? জানতে চাইল ইন্টারকমে।

বড় বাজেটের রাশান সিনেমা করছি, তাই এই জিনিস না আনলে চলবে? কাভার হিসেবে মন্দ নয়, বলল ইগোর দিমিতভ।

ঘাবড়ে গিয়ে জানতে চাইল মিতা, কামানের গোলা আর মিসাইল নকল না তো?

পেট কাঁপিয়ে হাসল দিমিতভ। উষ্ণ সুরে বলল, ভয় নেই, নিশ্চিন্তে থাকুন।

রকেটের গতি তুলে তৃতীয় টিলা পেরোল ওরা। সামনের দৃশ্য দেখা গেল হেলিকপ্টারের রেইডার স্কোপে।

আকাশে উড়ছে একটা স্কাইক্রেন। ওটার দিকে বাঁক নিল দিমিতভ।

টার্গেটিং ডিসপ্লের হলদের বদলে জ্বলে উঠল সবুজ বাতি। ফায়ার বাটনে চাপ দিল মিতা। থরথর করে কাঁপল গানশিপ। মস্ত ভ্রমরের ভারী গুঞ্জন তুলে ঘুরছে কামান, কয়েক সেকেণ্ডে ওটা থেকে ছিটকে গেল অন্তত এক শ গোলা।

আকাশে বাঁকা পথে গিয়ে স্কাইক্রেনের গায়ে বিঁধল একঝাঁক ট্রেসার। প্রতিটি জ্বলন্ত মার্কারের পর গেছে দশটি বিস্ফোরক গোলা। উড়ন্ত হেলিকপ্টার থেকে ভুস্ করে বেরোল কুচকুচে কালো ধোঁয়া, পরক্ষণে প্রচণ্ড আওয়াজে বিস্ফোরিত হয়ে ঝরঝর করে মাটিতে পড়ল হাজারো টুকরো।

পরের টার্গেট খুঁজল উত্তেজিত মিতা।

.

খচ্চরের মত দেখতে অত্যাধুনিক সমরযন্ত্রে চেপে আসছে ল্যাং এর পাঁচ মার্সেনারি। চারপাশে শত শত গুলি লাগছে বলে মাটিতে শুয়ে আছে অসহায় রানা। কিছুই করার নেই। ভাবছে কীভাবে বেরোবে এই গাড়া থেকে। এমনসময় টিলা বেয়ে উঠে এল বজ্রপাতের মত বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ।

কানে ঝিঁঝি ধরে গেল রানার। চোখের কোণে দেখল, পুবে কমলা আগুনের মস্ত এক ফুটবল। কয়েক সেকেণ্ড আগেও ওটা ছিল স্কাইক্রেন হেলিকপ্টার।

হঠাৎ কেন বিধ্বস্ত হলো ওটা?

তখনই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচের ক্যানিয়নের দেয়ালে খসে পড়ল দুই ড্রোন।

আর কিছু জানতে চাইল না রানা, মাটি ছেড়ে তীরের বেগে ছুটল টিলার চূড়ার দিকে।

কয়েক ঘণ্টা আগে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক প্রচণ্ড ঢেউয়ের সঠিক সময় জানিয়ে দিয়েছেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান।

ফুরিয়ে আসছে রানার রোলেক্স ঘড়ির কাউন্ট ডাউন।

হাতে আছে মাত্র দশ মিনিট!

.

চলে গেছে সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু এবং অন্যরা। দরজা বন্ধ হওয়ার আগে এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান দেখলেন রকেট স্লেড। ধ্বংসের ওই যানে শুয়ে আছে মিসাইল। টেকনিশিয়ানরা তৈরি নির্দেশের জন্যে। একটু পর স্ফটিক নিয়ে পাহাড়ের নির্জন এক এলাকায় বিস্ফোরিত হবে রকেট।

তুমি বুঝতে পারছ, কীসের ভেতর আমাদেরকে ফেলেছ, জেমস? ধমকের সুরে বললেন প্রেসিডেন্ট।

আমি? আমি কী করলাম?

স্ফটিক ধ্বংস করতে যে মিটিং ডাকা হয়েছে, সেখানে ছিলে না। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সারারাত কোনও বার-এ বসে মদ গিলেছ। এখন হাজির হয়েছ পৃথিবীর কোর-এর ফালতু থিয়োরি নিয়ে।

নিজের এলোমলো পোশাক ও চেহারা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান আছে মিস্টার ব্রায়ানের। গালে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। চোখের নিচে কালির মত দাগ। পুরো দেড় দিন পাল্টাননি বাসি, নোংরা কাপড়চোপড়।

না ঘুমিয়ে সারারাত কাজ করেছি, যেন…

তাকে থামিয়ে দিলেন প্রেসিডেন্ট, সমস্যার শেষ নেই তোমার! ক্যালাগুর কাছে শুনলাম, মোটেও ঘুমাও না?

চুপ করে থাকলেন ব্রায়ান।

যখন মিটিঙে ঠিক সময়ে এলে না, তোমার স্টাফদের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি সুস্থ আছ কি না, বললেন প্রেসিডেন্ট। মিথ্যা বলেনি ওরা। মাসের পর মাস ধরে মিথ্যা আশায় সময় নষ্ট করেছ। উচিত ছিল না দেশকে এত বড় বিপদে ঠেলে দেয়া।

মিস্টার প্রেসিডেন্ট, জেনে বুঝে…।

নরকের ওই স্ফটিক এ দেশে এনেছ, তাতেই শখ মেটেনি, লোক পাঠিয়ে দিয়েছ আরও ওই জিনিস খুঁজতে, ধমকের সুরে বললেন প্রেসিডেন্ট। মানা করেছিলাম, যাতে মিতা দত্তকে উদ্ধার করতে গিয়ে বিপদে না পড়ো। বারবার ঝুঁকি নিয়েছি তোমার জন্যে। অথচ একবারের জন্যে বোঝোনি, তোমার উচিত নয় আমার কাছে মিথ্যা বলা।

আপনাকে বোঝাতে চেয়েছি…

মিথ্যা বন্ধ করো, জেমস! সবাইকে মস্ত ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছ! এতে হয়তো ক্ষতি হবে গোটা দুনিয়ার! আমি জানতে চাই, কেন এসব করলে তুমি!

মিস্টার প্রেসিডেন্ট…

কেন! ধমকে উঠলেন সিনিয়র বন্ধু। কিছু গোপন করছ!

কিছুই…

প্রেসিডেন্টের চেহারায় ফুটে উঠেছে প্রচণ্ড ক্রোধ। আড়ষ্ট কণ্ঠে বললেন, যথেষ্ট হয়েছে, এবার অবসর নেবে এনআরআই চিফের পদ থেকে। কয়েক সেকেণ্ড বিরতির পর অপেক্ষাকৃত শান্ত গলায় জানালেন, ক্যালাগুকে আমার সামনে আসতে বলো।

 .

৫০.

 রাশান গানশিপের কামান লাল আগুন উগরে দিতেই মিতা দেখল, গোলার প্রচণ্ড আঘাতে ছিঁড়ল দ্বিতীয় স্কাইক্রেনের পাতলা দেহ। ফিউজেলাজ ভেদ করে টেইল রোটর উপড়ে নিয়েছে, ফলে কয়েক টুকরো হয়ে টিলার ঢালে পড়ে বিস্ফোরিত হলো কপ্টার।

তৃতীয়টা পালিয়ে যাচ্ছে, বলল ইগোর দিমিতভ। ঘুরে গেছে শেষ উড়ন্ত শত্রুর দিকে।

বাদ দিন, বলল মিতা। টিলায় উঠছে ল্যাং-এর লোক।

হিন্দ-ডির ক্যামেরায় রয়েছে টেলিস্কোপিক লেন্স, ওটা দিয়ে পরিষ্কার দেখা যায় চারপাশ। ফলে বন্ধু বা শত্রু চেনা সহজ। টেলিস্কোপিক লেন্স ব্যবহার করে জমিতে শুধু ল্যাং-এর লোক এবং যান্ত্রিক কয়েকটা খচ্চর দেখল মিতা।

সর্বনাশ! বলল ফিসফিস করে।

ইন্টারকমে শুনতে পেয়ে জানতে চাইল ইগোর, এদের আশপাশে নেই তো মাসুদ রানা?

কেউ বা কিছুর পেছনে ছুটছে ল্যাং-এর মার্সেনারি আর্মি। একটু পর উঠে পড়বে টিলার চূড়ায়।

না, নেই, তবে জিজ্ঞেস করছেন কেন? পাল্টা জানতে চাইল মিতা।

কারণ, আমরা সামনের জমি পেছনে ফেললে, তখন আর জীবিত কিছুই থাকবে না।

বুঝলাম। প্রতিশোধ নেবেন ভাইয়ের মৃত্যুর।

পঞ্চাশ ডিগ্রি বাঁক নিল ইগোর দিমিতভ। সরাসরি সামনে পড়বে একদল মার্সেনারি ও যন্ত্রমানব। নাক নিচু করে তাদের দিকে তেড়ে গেল হিন্দ-ডি। কামান তৈরি রাখল মিতা।

পেছনে বাজ পড়া আওয়াজে চমকে ঘুরে তাকাল ল্যাং-এর আর্মি। দেরি হলো না গানশিপের দিকে গুলি পাঠাতে।

ওদিকে কামানের ট্রিগার টিপে ধরেছে মিতা। একইসময়ে আকাশে ছাড়ল এয়ার-টু-গ্রাউণ্ড একরাশ মিসাইল।

ঘুরন্ত কামান থেকে প্রতি পাঁচ সেকেণ্ডে বেরোচ্ছে এক শ গোলা। এদিকে ডান ও বামে টার্গেট করা জমিতে আঘাত হানল মিসাইল। প্রচণ্ড সব বিস্ফোরণে কাঁপতে লাগল চারপাশ। নানা দিকে লাফ দিল কমলা আগুন। জ্বলন্ত পাথর ও মাটির সঙ্গে মিশে ছিটকে উঠল ছিন্নভিন্ন মানুষের পোড়া মাংস।

ওই এলাকা পেরিয়ে ধোয়া ও আগুন থিতিয়ে আসবে বলে থেমে অপেক্ষা করল হিন্দ-ডি।

তখনই মিতা দেখল, রয়ে গেছে আরেকদল লোক। বামদিকে! বলে উঠল ও। টেন ও ক্লক! সাবধান!

হিন্দ-ডি সরিয়ে নেয়ার আগেই এল প্রতিপক্ষদের গুলি। কিন্তু জমির খুব কাছে নেমে যুদ্ধের জন্যে তৈরি করা হয়েছে হিন্দ-ডি গানশিপ। শক্তিশালী রাইফেলের গুলি অনায়াসে ছিটকে দিল ওটার আর্মার। তবে অন্য জিনিস রকেট-প্রপেল্ড গ্রেনেড। ফাটল মিতাদের মাথার ওপরের রোটরে।

উইণ্ডশিল্ড ভরে গেল তপ্ত তেল ও লেলিহান আগুনে। ভক্ করে ককপিটে ঢুকল একরাশ কালো ধোঁয়া। চাকা হারিয়ে বসা ছুটন্ত গাড়ির মত হোঁচট খেল গানশিপ।

ওটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইল দিমিতভ। কিন্তু ভালভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রোটর।

চিৎকার করল প্রাক্তন এজেন্ট, শক্ত হাতে কিছু ধরুন!

পানি থেকে ওঠা বিরক্ত কুকুরের মত বারকয়েক ঝটকা দিল গানশিপ, তারপর এক পাশে কাত হয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলল মাটি লক্ষ্য করে।

.

ব্যক্তিগত স্কাইক্রেনে বসে রাশান গানশিপ পড়তে দেখল হুয়াং লি ল্যাং। ভাল লড়াই করেছে তার লোক। ঘুরে এগিয়ে যাও, পাইলটকে নির্দেশ দিল সে।

লোক তুলে নেব?

না, পেরিয়ে যাও টিলার চূড়া।

মেসার ওপর এক লোককে দেখেছে ল্যাং।

 লম্বা লম্বা পায়ে ছুটছে ওইবদমাশ।

ওই লোককে চাই! গর্জে উঠল ল্যাং, ধাওয়া করে ধরো ওকে!

লক্ষ্যবস্তু পেয়ে হেলিকপ্টারের গতি বাড়াল পাইলট। ভীত কণ্ঠে বলল, কিন্তু আমাদের কাছে তো কোনও অস্ত্র নেই!

ইঞ্জিনের গর্জন ছাপিয়ে চেঁচাল ল্যাং, ওর কাছে নিয়ে যাও, নিজের হাতে খুন করব ওকে!

.

অন্ধকারাচ্ছন্ন ইয়াকা মাউন্টেনের গভীর সুড়ঙ্গে দাঁড়িয়ে ট্রেইলার থেকে এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ানকে নামতে দেখলেন সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু। তার শত্রুর কাঁধে বেকায়দাভাবে ঝুলছে কোঁচকানো সুট জ্যাকেট। স্লথ গতি হাঁটার। যাক, ভাল, শেষপর্যন্ত ব্যাটা হেরে গেছে, ভাবলেন ক্যালাগু।

প্রেসিডেন্ট কী বললেন? জানতে চাইলেন। ভাল করেই জানেন, যিরো আওয়ার আসতে বাকি মাত্র পাঁচ মিনিট।

আপনিই জিতলেন, রকেট স্লেডের দিকে মাথা কাত করে ক্লান্ত স্বরে বললেন ব্রায়ান, তৈরি রাখুন ওটা।

মস্ত রেকার টো ট্রাকের দিকে চলেছেন। ওই জিনিসই টেনে এনেছিল ট্রেইলার।

 ব্রায়ানের দিকে চেয়ে আছেন ক্যালাগু, মুখে মুচকি হাসি। বিশাল জয় পেয়েছেন আজ! স্টাফদের দিকে ফিরলেন তিনি। বাকি চার মিনিট। স্লেড রেডি রাখো। কাজ শেষ করতে হবে দেরি না করে।

ট্রেইলারে গিয়ে উঠলেন ক্যালাগু। চোখ পড়ল মনিটরের ওপর।

চেহারায় গনগনে রাগ নিয়ে তাঁকে দেখলেন প্রেসিডেন্ট। এত সময় নিলেন কেন!

ব্রায়ান এইমাত্র জানালেন, বললেন ক্যালাগু, এবার আগামী দুমিনিটের ভেতর ধ্বংস হবে ওই স্ফটিক।

গুড। কাজটা শেষ হলে আমাকে জানাবেন।

ক্যামেরার সামনে থেকে সরে গেলেন প্রেসিডেন্ট। অফ হয়ে গেল স্ক্রিন। ল্যাব সেকশনের দরজা খুলে ভেতরে পা রেখে চমকে উঠলেন ক্যালাগু। ভেতরে জ্বলছে না বাতি। আলো আসছে শুধু কমপিউটারের স্ক্রিন থেকে।

ফটিক দেখার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে গিয়ে আরেকটু হলে হোঁচট খেয়ে পড়তেন ক্যালাগু।

আরে, কী ব্যাপার?

নিচে চেয়ে দেখলেন আঙুরের রসের ভেতর হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছেন বিজ্ঞানী ক্যাথিবা আলিহা। প্রায় অচেতন। কপালে কালশিটে।

কী হয়েছে? চমকে গিয়ে জানতে চাইলেন ক্যালাগু।

গুঙিয়ে উঠে চোখ মেললেন বিজ্ঞানী। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই বুঝে গেলেন ক্যালাগু। লাফ দিয়ে উঠলেন প্ল্যাটফর্মে। ভল্টে এখন আর নেই ব্রাযিল স্টোন!

আহত বিজ্ঞানীকে সাহায্য না করেই এক দৌড়ে ট্রেইলের সামনের অংশে ফিরলেন ক্যালাগু, পরক্ষণে দরজা খুলে ছিটকে বেরিয়ে এলেন দীর্ঘ সুড়ঙ্গে।

গুড়গুড় আওয়াজ তুলে দূরে ছুটছে বক্স ট্রাক। ওটাতে আছে। এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান!

ঠেকাও ওই ট্রাক! চিলচিৎকার ছাড়লেন ক্যালাগু, ব্রায়ানের কাছে ব্রাযিল স্টোন!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *