৩. দিনটা ভাল

৩১.

দিনটা ভাল, ভাবছে পাবলো। জোরালো কোনও আওয়াজ নেই। ফিরে এসেছে বিদ্যুৎ। ধীরে ধীরে ঘুরছে সিলিং ফ্যান।

ঘাড় কাত করে ঘরের আরেক দিকে তাকাল পাবলো।

ওই যে টেবিলে বসে কী যেন করছে কালো, বুড়ো লোকটা। বহু কিছু জানে সে। এমন কিছু দেখে বা শোনে, যেটা রানা, মিতা বা ও নিজে বুঝতে পারে না। খুব জানোয়ার লোক, জানে অনেক। কীসব ভাবতে থাকে আর বিড়বিড় করে কার সঙ্গে যেন কথা বলে। কিন্তু কাউকে দেখা যায় না।

বুড়োকে পছন্দ করে পাবলো। দয়ালু লোক। মিষ্টি করে কথা বলে। যদিও তার অচেনা ভাষা বোঝা যায় না। কাগজ পেন্সিল পেলেই খসখস করে কীসব লেখে। আপন মনে কী যেন গাল দেয়। কমপিউটারের চাবি টেপে।

গরম হয়ে উঠছে কমপিউটার, টের পেল পাবলো। কে জানে, হয়তো একদিন পুড়েই যাবে মেশিনটা। ওটার জ্বলজ্বলে আলো পড়লেই জ্বলতে থাকে ওর চোখ।

না, ওই জিনিসটা ভাল না, ভাবল পাবলো।

বুড়োও ওটাকে বেশি পছন্দ করে না। মাঝে মাঝে চাপড় মারে ওটার পিঠে।

আচ্ছা, ওটা নিয়ে গিয়ে ব্যালকনি থেকে ফেলে দেয় না কেন?

চিন্তায় পড়ে গেল পাবলো। ও নিজেই কি ফেলে দেবে ওটা?

না, উচিত হবে না বোধহয়।

গাল দিলেও ওটাকে আগলে রাখে বুড়ো।

দরজা খুলে যেতেই ভেতরে ঢুকল সুন্দরী মেয়েটা। ওকে। খুব ভালবাসে পাবলো। কী আদর করে খাইয়ে দেয়!

বুড়ো লোকটাকে কী যেন বলছে। কিছু বোঝা যায় না!

কপাল খুলল, প্রফেসর? জানতে চাইল মিতা।

হাল ছাড়িনি। অনেক কিছু জেনেও গেছি।

পাবলোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মিতা।

খুব ভাল মেয়ে, ভাবল পাবলো। এমন একটা আম্মু থাকলে ভাল হতো। কিন্তু আমার তো তেমন কেউ কখনও ছিল না।

কিন্তু মেয়েটা আম্মু হবে কী করে? বুড়োর সঙ্গে বসে কী যেন খোঁজে। রানার সঙ্গেও কথা বলে। কিন্তু মনে হয় না ওরা বিয়ে করেছে। ওরা কী যেন চায়। হয়তো একই জিনিস খুঁজছে না।

কাঁচের দরজার দিকে তাকাল পাবলো। ওদিকে আছে মাসুদ রানা। সে খুব গম্ভীর মানুষ। কিন্তু মনে হয় ওকে ভালইবাসে। কখনও কড়া সুরে কথা বলে না। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না। আগে যে লোকগুলো বা মেয়েগুলো আসত, তারা কখনও কখনও খুব বকত ওকে। রানা এমন নয়। রানা ওর বাবা হলে ভাল হতো। তা হলে কেউ বকতে পারত না ওকে।

ভুলও হতে পারে, তবে বোধহয় মিতা আর বুড়ো খুঁজছে কিছু। ওদেরকে পাহারা দিচ্ছে রানা। কিন্তু পাহারা দিচ্ছে কেন?

আবারও বুড়োর দিকে ফিরে কথা বলে উঠল মিতা। আমরা যদি এম্ব্যাসির মাধ্যমে ওকে সরিয়ে নিতে পারি, তা হলে…

সম্ভব নয়, বললেন প্রফেসর। মিস্টার ব্রায়ান তো আগেই বলেছেন, সিআইএ বা আর্মি কেড়ে নেবে পাবলোকে। এদিকে যে-কোনও সময়ে হামলা হবে মনে করছে রানা।

প্লাস্টিকের ব্যাগ খুলল মিতা। ওটা থেকে নিল বেশ কয়েকটা বোতল।

ওষুধ, বুঝে গেল পাবলো। কখনও কখনও এমন বোতল থেকে ওকে ওষুধ খাওয়াত রাগী সব মহিলা। মিতা কখনও রাগারাগি করে না ওর সঙ্গে। ভাল মেয়ে। কিন্তু ওর আম্মু নয়। ওষুধগুলো কোনওটা কালো রঙের, কোনও হালকা রঙের। ওসব না খাওয়াই ভাল। ওষুধ খেলে মাঝে মাঝে শরীর খারাপ লাগে। মাথা ঘোরে, পেট ব্যথা হয়। মিতা কখনও ওকে ওষুধ দেয় না।

একটা বোতল থেকে দুটো ট্যাবলেট নিয়ে প্রফেসরের পাশে থামল মিতা। এ-দুটো খেয়ে নিন।

কীসের ওষুধ? জানতে চাইলেন হ্যারিসন।

নতুন অ্যান্টিবায়োটিক। জ্বরটা প্রায় গেছে, ইনফেকশনও চলে যাচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের ভেতর পুরো সুস্থ হয়ে উঠবেন।

হাত পেতে ট্যাবলেট দুটো নিলেন প্রফেসর। ধন্যবাদ। ঘুরে ব্যালকনির দিকে চলল মিতা।

কালো বুড়ো গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়েও থেমে গেল। চোর-চোর চেহারা করে পকেটে পুরে ফেলল ট্যাবলেট দুটো।

সুন্দরী মেয়েটা কিছুই দেখতে পায়নি। জানবেও না ওষুধ খায়নি লোকটা। নতুন করে গরম মেশিনের দিকে ফিরেছে।

ওষুধ খেলে মন থেকে কিছু হারিয়ে যায়, তাই কালো লোকটা ওসব খাবে না, ভাবল পাবলো। অনেক কিছু দেখতে চায় সে, শুনতে চায় অনেক কিছু।

আনমনে ভাবল পাবলো, ভাল, বড় হলে কখনও ওষুধ খারে না ও।

.

৩২.

 প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যে গ্রুম লেক বেস হাসপাতাল থেকে ঘুরে আসতে হয়েছে এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ানকে। হামভিতে চেপে শটগানধারী সৈনিকরা আবারও ফিরিয়ে এনেছে তাঁকে ইয়াকা মাউন্টেনে। এইমাত্র চাকার গুড়গুড় আওয়াজ তুলে বিশাল সুড়ঙ্গে ঢুকছেন তারা।

ডানদিকে কাত হয়ে পড়ে আছে দানবীয় এক মেশিন, দেখলে মনে হবে স্যাটার্ন ভি বুস্টার। এক শ টনের চেয়েও বেশি ওজন। ওই জিনিস দিয়েই খুঁড়ে নেয়া হয়েছে ইয়াকা মাউন্টেনের সুগভীর সুড়ঙ্গ। কাজ শেষ হলে ওটাকে আর সরানো হয়নি। তাতে একটা একটা করে খুলতে হতো নানান অংশ। রেখে দেয়া হয়েছে, দরকার পড়লে তৈরি করা হবে আরও সুড়ঙ্গ।

পিচের পথে চড়-চড় শব্দে প্রকাণ্ড ব্লাস্টডোর পেরোল হামভি, সামনেই টানা সুড়ঙ্গ। প্রায় জ্বলন্ত নেভাডার পরিবেশ থেকে ঢুকে পড়ল হামভি ঘুটঘুটে আঁধারে। তবে সিলিঙে দূরে দূরে জ্বলছে একটা করে বাতি। ওই আলোয় চলা কঠিন। জ্বেলে নেয়া হয়েছে জিপের হাই বিম।

তোমরা এ পরিবেশে মানিয়ে নিলে কী করে? জানতে চাইলেন ব্রায়ান।

সময় লেগেছে, স্যর, বলল ড্রাইভার, দিনে তিনবার পাহাড় সার্চ করি। বিজ্ঞানীরা এলে খুশি হই। তবে আপনার মত এত বড় বিজ্ঞানী আগে কখনও আসেননি। মুখের কথা না, আপনাকে পাহারা দিয়ে এসেছে অন্তত বিশজন সৈনিক!

আবারও সুড়ঙ্গের দূরে চোখ রাখলেন ব্রায়ান। শুরুর দিকে সুড়ঙ্গ তিনগুণ চওড়া। দু শ গজ যাওয়ার পর সরু হয়েছে। টানেল। দুই লেনের রাস্তার মত। পাথর ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি। সরু, দীর্ঘ টানেলের ভেতর ব্রায়ানের মনে হলো আটকে আসছে দম। অথচ তিনি ক্লসট্রোফোবিক নন।

দেয়াল বা ছাত ধসে পড়লে? জানতে চাইলেন।

চিন্তা নেই, স্যর, বলল ড্রাইভার, একটু পর পর এস্কেপ ভেন্ট। উঠে গেছে একেবারে পাহাড়ের মাথায়। কয়েক শ ফুট মই বেয়ে উঠতে হবে। তবে পাগল হয়ে যাবেন পায়ের ব্যথায়।

দেয়াল ত্বণ ক্লসট্রোফোবিনের মনে হলো অদয়ে তৈরি।

ও, খুশি হতে পারলেন না ব্রায়ান। ভাবছেন, চাপা পড়ে মরা ভাল, না শত শত ফুট মই বেয়ে পাহাড়ে ওঠা। আবার ওখান থেকে নামা। কোনও এলিভেটর নেই?

মাথা নাড়ল ড্রাইভার। না, স্যর।

একমাইল যাওয়ার পর হেডলাইটের আলোয় দূরে দেখা গেল চওড়া ল্যাব ট্রাক। ওটাকে পাশ কাটিয়ে আরও চার মাইল গেছে সুড়ঙ্গ। এরই ভেতর বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই গভীরতা স্ফটিকের জন্যে যথেষ্ট কি না। আগেও নানান এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে টেস্ট টানেলে। সেগুলো ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। এসবের জন্যে মাইলের পর মাইল টেনে নেয়া হয়েছে পাওয়ার কেবল। এ কারণে এনআরআই ও সিআইএর টিম সহজেই ব্যবহার করতে পারছে আধুনিক সব মেশিনারি।

ট্রেইলারের পাশে রকেট স্লেড তৈরি রাখা হয়েছে। সাইড ওয়াইণ্ডার মিসাইল থেকে খুলে ওখানে সেট করা হয়েছে মোটর, ক্রিটিকাল হলে দেরি না করে ব্রাযিল স্টোনটাকে ফেলা হবে পাহাড়ের প্রত্যন্ত গভীরে। তিন সেকেণ্ডে ধুলোয় মিশে যাবে ওটা।

ট্রেইলারের পাশে হামভি থামতেই নেমে পড়লেন ব্রায়ান, দুই ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠলেন অস্থায়ী গবেষণাগারে। শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়তে তৈরি তিনি, কিন্তু এখন অন্যদিকে মন সবার।

উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইউএন মিটিং।

হাই-ডেফিনেশন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টিভি দেখছে ট্রেইলারের উপস্থিত সবাই। একের পর এক দেশের প্রতিনিধিরা উঠে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। 

সবার তর্জনী ইউনাইটেড স্টেটসের দিকে।

এমন কী বন্ধু সব রাষ্ট্রও কঠোর সুরে জানতে চাইছে, কী হয়েছিল আমেরিকার মরুভূমির ভেতর। সত্যিই কি আমেরিকা পরীক্ষা করেছে অচেনা কোনও বিপজ্জনক অস্ত্র?

চুপ করে আছেন ইউ.এস. অ্যাম্বাসেডার। নিজ বক্তব্য কখন দেয়ার সুযোগ পাবেন, এখনও জানেন না। পাথুরে চেহারা করে বসে নোট নিচ্ছেন। বামহাত হেডফোনের ওপর।

সার্কাস চলছে, ভাবলেন ব্রায়ান। সবচেয়ে খারাপ দিক, ওভাল অফিসে বসে এসব দেখছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্টও। চলছে টেলিকনফারেন্স। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে চুপচাপ ইউএন তর্ক শুনছেন তিনি। কপাল ভাল, আপাতত ল্যাংলিতে ফিরেছে ক্যালাগু। আজ জ্বালাবে না লোকটা।

অবস্থা কতটা খারাপ? জানতে চাইলেন ব্রায়ান।

নানান ডেটা থেকে চোখ তুললেন বিজ্ঞানী ক্যাথিবা আলিহা। কেউ জুয়া খেলতে চাইলে তার উচিত হবে না বাজির অঙ্ক বাড়িয়ে দেয়া।

টিভির স্ক্রিনে মন দিলেন ব্রায়ান। চাইনিজ ডেলিগেট বলছেন, বিশেষ কোনও সুপারওয়েপন তৈরি করেছে আমেরিকা। ওটার কারণে নষ্ট হয়েছে চিনের কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক হামলা। কাজটি অগ্রাহ্য করার মত নয় এবং বেআইনী। এর ফলে চিন ধরে নিতে পারে, যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে তার বিরুদ্ধে। ডেলিগেট বললেন না, কী কারণে ইউ.এস. এলাকায় মরতে গেল চিনের কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট। দেশগুলোর ডেলিগেটরা ভাল করেই জানেন, আসলে গুপ্তচরের মত তথ্য সংগ্রহ করে এসব স্যাটেলাইট। তবে সেজন্যে ওগুলো ধ্বংস করে দিলে সত্যিই বেধে যেতে পারে অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধ।

সত্যিই কি পড়ে গেছে চিনা স্যাটেলাইট? জানতে চাইলেন ব্রায়ান।

জবাব দিলেন প্রেসিডেন্ট, আমাদের কাছে তথ্য আছে, আজ সকাল থেকে ব্যস্ত হয়ে একটা ইনফরমেশন গ্যাদারিং স্যাটেলাইট খুঁজতে শুরু করেছে ওটাকে।

কপাল, বিড়বিড় করলেন ব্রায়ান।

পরিস্থিতি আরও খারাপ, বললেন প্রেসিডেন্ট, রাশানরা বলছে, তারাও হারিয়ে ফেলেছে একটা স্যাটেলাইট।

বিড়বিড় করে কী যেন বললেন ব্রায়ান।

অন্য এক সুপারপাওয়ারের আকাশে নষ্ট হয়েছে স্যাটেলাইট। এবং চোখ রাখবেই না কেন রাশা বা চিন, ইউ.এস. রিয়াল এস্টেটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাহারা দেয়া হয় নেলিস এয়ার ফোর্স বেস, গ্রুম লেকের এয়ারফিল্ড ও এরিয়া ৫১। ব্রায়ান যথেষ্ট অবাক হয়েছেন, ওই সময়ে আমেরিকার আকাশে ছিল মাত্র দুটো স্যাটেলাইট।

কোনও মিলিটারি, মুভমেন্ট, স্যর?

রাশা ও চিন নানা দিকে নিয়েছে নিজেদের আর্মির ডিভিশন, বললেন প্রেসিডেন্ট, ব্যস্ত হয়ে উঠেছে নেভি ও এয়ার ফোর্স। যে-কোনও সময়ে হামলা করতে তারা তৈরি।

সবই বুঝছেন ব্রায়ান। যুদ্ধের আগে যে-কোনও দেশ ঘাড়ের কাছ থেকে সরাতে চাইবে শত্রু স্পাই স্যাটেলাইট। এ কারণেই সতর্ক ও ভীত হয়ে উঠেছে ওই দুদেশ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিরাপদে রাখতে আর্মি, এয়ার ফোর্স ও নেভির ইউনিট নানান দিকে সরিয়ে দিয়েছে তারা। যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে ওই একই কাজ করত ইউনাইটেড স্টেটস্।

কপাল টিপলেন ব্রায়ান। অতিরিক্ত চাপের কারণে মাথা জুড়ে শুরু হয়েছে মাইগ্রেনের ব্যথা। আবারও হাসপাতালে গিয়ে আশ্রয় নেবেন কি না ভাবলেন এনআরআই চিফ।

তাদের মুভের কারণে পাল্টা কী করেছি আমরা?

উপায় ছিল না, বাধ্য হয়ে অ্যালার্ট স্ট্যাটাস বাড়াতে হয়েছে, বললেন প্রেসিডেন্ট। ডিফেন্স কণ্ডিশন ফোর ঘোষণা করেছি। জয়েন্ট চিফরা বলছেন রাশা বা চিন নিজেদের মিলিটারি তৈরি রাখলে আমাদেরও উচিত হবে ডেফকন থ্রি ঘোষণা করা।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ব্রায়ান। ওরা ভয় পেয়েছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

অবাক হওয়ার কিছু নেই, না? ভুরু কুঁচকে তাঁকে দেখলেন প্রেসিডেন্ট।

আমাদের উচিত ওদের সঙ্গে কথা বলা, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বললেন ব্রায়ান, লঞ্চ পযিশনে ট্যাঙ্ক বা এয়ারক্রাফট নেয়া ভুল হবে। একটা বাড়াবাড়ি তৈরি করে অন্যের বাড়াবাড়ি। ফলাফল সবসময় খারাপই হয়।

রেগে গিয়ে ভুরু কুঁচকে এনআরআই চিফকে দেখলেন প্রেসিডেন্ট। তুমি কিছুই বুঝছ না, জেমস। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবো। এসব ঝামেলা তৈরির জন্যে অর্ধেক দায় তোমার। এখন পর্যন্ত তোমার পাশে থেকেছি, কিন্তু আমারও ধৈর্যের একটা সীমা আছে। নতুন কোনও জরুরি তথ্য দিতে পারছ না। তোমাকে দেয়া তিন দিনও প্রায় ফুরিয়ে এল। এরপর…

মিস্টার প্রেসিডেন্ট…।

জেমস ব্রায়ানকে থামিয়ে দিলেন প্রেসিডেন্ট, তুমি বলেছিলে কোনওভাবে আমাদেরকে নিরাপদ রাখছে ওসব স্ফটিক। কোথায় কী, এখন তো দেখছি মস্তবড় বিপদে ফেলে দিয়েছে ওগুলো আমাদেরকে! এবার স্থির করতে হবে ওগুলোর কী করব। ভেবে বের করো এই গাড়া থেকে কীভাবে আমাকে বের করবে, নইলে বাধ্য হয়েই ব্যবস্থা নিতে হবে আমাকে।

চুপ করে থাকলেন ব্রায়ান। হুমকির সুরে কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট। বন্ধুত্বের খাতিরে এমনিতেই সীমানার বাইরে চলে গেছেন তিনি। এখন যা ঘটছে, সবই সাধারণ যুক্তির বাইরে। এবার প্রেসিডেন্ট এবং কমাণ্ডার ইন চিফ হিসেবে নিজ দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।

ব্রায়ান ভাবলেন, যখন-তখন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ধ্বংস করে দেয়া হবে ব্রাযিল স্টোন।

আমি দুঃখিত, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বললেন ব্রায়ান। আমি খুব ক্লান্ত। ভুল কথা বলে থাকতে পারি। দয়া করে কি বলবেন, আমরা আপাতত কী বলছি ওদেরকে?

ব্রায়ানের দিকে চেয়ে কাঁধ ঝাঁকালেন প্রেসিডেন্ট। বরং তুমিই বলো কী বলা উচিত? কী বলব আমরা ওদেরকে?

কাজে আসবে এমন যৌক্তিক কিছুই মনে এল না ব্রায়ানের। মাথা নিচু করে নিলেন। স্ট্যাটিক ঠেকিয়ে সূক্ষ্ম সব ইন্সট্রুমেন্ট রক্ষা করতে ট্রেইলারের মেঝেতে রাখা হয়নি কার্পেট। এতই ক্লান্তি, ব্রায়ানের মনে হলো কেমন হতো এখন লোহার শীতল মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লে? প্রেসিডেন্ট নির্ঘাৎ ভাববেন, তিনি চিরকালের জন্যে পাগল হয়ে গেছেন!

গবেষণাগারের যেদিকে সায়েন্স সেকশন, সেদিকে তাকালেন ব্রায়ান। প্রথমবার স্ফটিকটা দেখার পর তার মনে হয়েছিল, ওটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজের জিনিস। ওই চিন্তা এসেছিল বলেই ওটাকে অনেক বেশি মূল্যবান ভেবেছেন? অবশ্য ভাবার যথেষ্ট কারণও ছিল। আজও আছে। বিবেক ও যুক্তির বাইরে একটা পা-ও ফেলেননি তিনি।

প্রায় একবছর ধরে ওটার ওপর গবেষণা করেও পুরো বুঝতে পারেননি তারা। প্রচণ্ড শক্তি ওটার ভেতর। দ্বিতীয় স্ফটিক পাওয়ার পর অন্তত দশ গুণ শক্তির বিচ্ছুরণ হয়েছে ওটা থেকে। এমনও হতে পারে, তৃতীয় স্ফটিক পেলে ওগুলো থেকে বেরোবে এক শ গুণ শক্তি। আর চার নম্বর স্ফটিক হয়তো দেবে হাজার গুণ ক্ষমতা। দুই স্ফটিকের কারণে এরই ভেতর যে শক্তি দেখা গেছে, তা কয়েক শ নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডের এনার্জি বিচ্ছুরণের চেয়েও বেশি।

অথচ, এখন পর্যন্ত স্ফটিকে দেখা যায়নি কোনও রেডিয়েশন, নেই কোনও এক্সপ্লোসিভ কমপোনেন্ট। আছে শুধু প্রচণ্ড শক্তির ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ। কিন্তু এর বাইরে আর কিছু নেই, তা-ই বা বলবেন কী করে? এরই ভেতর তাদেরকে বিস্মিত করে দিয়েছে ওই জিনিস। তিনিই হয়তো ভুল করেছেন, সব হাতের নাগালের বাইরে যাওয়ার আগেই উচিত ছিল ওই স্ফটিক ধ্বংস করে দেয়া।

ওই দুই দেশের কর্তাকে সত্য বলুন, স্যর, বললেন ব্রায়ান।

চুপচাপ চেয়ে আছেন প্রেসিডেন্ট।

কিছুই গোপন না করে দুনিয়ার প্রতিটি দেশের সঙ্গে ডেটা শেয়ার করুন। জরুরি তথ্য এবং ভয়ের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা। সেটা হয়তো পৃথিবীর জন্যে ভাল হবে না।

স্ক্রিনে বিস্মিত দেখাল প্রেসিডেন্টকে, চট করে তাকালেন এক পাশে। নিচু গলায় কার সঙ্গে যেন কথা বললেন। ব্রায়ান আঁচ করলেন, তাঁরা চিফ অভ স্টাফ।

তোমার পরামর্শ মাথায় রাখলাম, প্রেসিডেন্ট জানালেন।

আশা করি এসব ঠিকই বুঝবেন রাশা ও চিনের নেতারা, বললেন ব্রায়ান। মাথায় কথাগুলো খেলে গিয়েছিল বলে বুকে টের পেলেন গর্ব। তারা হয়তো নতুন কোনও পথও দেখিয়ে দিতে পারে। যেটা আমরা এখনও ভেবে বের করতে পারিনি।

প্রেসিডেন্টের পাশে থামলেন এক এইড। টেবিলের ওপর রাখলেন একটা ফোল্ডার। ফিসফিস করে কী যেন বললেন। কথাগুলো শোনার পর আড়ষ্ট হয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট, ঘুরে তাকালেন স্ক্রিনে ব্রায়ানের দিকে। চাপা স্বরে বললেন, আরেকটা সমস্যা। এইমাত্র মিসাইল মেরে চিনের দুটো গুপ্তচর বিমান ফেলে দিয়েছে রাশানরা।

নতুন করে ইউএন স্ক্রিনে তাকালেন ব্রায়ান। শিরশির করছে তার মেরুদণ্ড।

ওই যে, নতুন তথ্যটা পেয়েছেন চিনা অ্যাম্বাসেডার। লাফিয়ে চেয়ার ছেড়ে দৌড়ে গেলেন রাশান ডেলিগেশনের দিকে। আরও খারাপ দিক, চিৎকার করে যুদ্ধের জন্যে তৈরি হতে বলছেন রাশানদেরকে!

ব্রায়ান ভাবলেন, কেমন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে সব!

.

৩৩.

গতরাত ও আজ সকাল জুড়ে নিমজ্জিতথেকে মিতার তুলে আনা ছবি দেখেছেন প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন। ছবি কোনও কোনওটা খুব পরিষ্কার, অন্যগুলোর রেযযালুশন খারাপ। আলো ছিল না বললেই চলে। কিন্তু হায়ারোগ্লিফ থেকে এখন পর্যন্ত তিনি যা জানতে পেরেছেন, তা কম নয়।

নিজের থিয়োরি বলতে শুরু করলেন তিনি। কিন্তু হাত তুলে মানা করল মিতা। স্যর, আমার মনে হয় রানারও জানা উচিত।

মাথা দোলালেন আর্কিওলজিস্ট।

সত্যিই, এরপর তাঁরা কী করবেন, এখনই তা স্থির করতে হবে। সেজন্যে রানার মতামত প্রয়োজন। ওকে ছাড়া কোনও কাজেই নামতে পারবেন না।

ঘরের মাঝ থেকে ডাকল মিতা, নতুন তথ্য পেয়েছেন প্রফেসর। তোমার জানা থাকা দরকার, রানা।

ব্যালকনি ছেড়ে ঘরে এসে ঢুকল রানা। মিতার পাশের চেয়ারে বসল।

রানা, তোমার মনে আছে ব্রাযিলের ওই অভিযানের কথা? বললেন হ্যারিসন।

মৃদু হাসল রানা। খেপে গিয়েছিল আদিবাসী। হামলা করেছিল কুমিরের মত দেখতে খুব দ্রুত চলতে পারে এমন অদ্ভুত জন্তু। খুন করতে চেয়েছে এক উন্মাদ বিলিয়নেয়ার। দারুণ মজা! চলুন, আবারও বেরিয়ে পড়ি ওরকম কোনও অভিযানে!

না, ঠাট্টা নয়, হেসে ফেললেন প্রফেসর। বিপজ্জনক সব জায়গায় যেতে হয়েছে, তাই না?

তাই তো মনে হচ্ছে, বলল রানা।

এখন কথা হলো, ওসব এলাকার হায়ারোগ্লিফ থেকে জানতে পেরেছি, মায়ানরা কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে দেবতা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল অন্য এলাকায়। সঙ্গে ছিল জ্বলজ্বলে স্ফটিক।

তার দুটো আমরা পেয়েছি, বলল মিতা।

অন্যগুলোর জন্যে দরকার জরুরি তথ্য, বললেন প্রফেসর। তবে তথ্য পাইয়ে দেয়ার জন্যে সূত্র রেখে গেছে মায়ানরা। ম্যাপে আঙুল ঠুকলেন। এই ম্যাপ ধরে গেলে পাব পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার আয়নার এক মন্দির। ওটা আগুন দেবতার। ওখানেই আছে তৃতীয় স্ফটিক। নিজের নোট দেখলেন হ্যারিসন। ওই মন্দিরের কাছেই ছিল বা আছে ব্রাদারহুডের অবশিষ্ট সৈনিকরা। হাজার হাজার বছর ধরে পাহারা দিচ্ছে ওই স্ফটিক। নৌকা ব্যবহার করে যেতে হবে ওই মন্দিরে। তারপর ডুব দিতে হবে পাতকুয়ায়। এরপর বেঁচে ফিরলে গ্রামের মোড়ল বুঝবেন এই লোকের অন্তর পবিত্র। তখন ইচ্ছে হলে স্ফটিক সরিয়ে নিতে পারবে সে।

এবার হয়তো অদ্ভুত মিউটেট জন্তু বা হাঙরের বদলে থাকবে আরও অনেক ভয়ঙ্কর কিছু, বলল রানা।

মাথা দোলালেন প্রফেসর। স্ফটিকের কারণে ধ্যানের মত ঘোর তৈরি হবে। ওই পাথর বা স্ফটিকের নাম এমনিতে দেয়া হয়নি পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার আত্মত্যাগের আয়না। ওই স্ফটিকের জন্যে অবাক করা মায়া তৈরি হবে মনে। নইলে প্রাণের ভয় মন থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এ দেশে পড়ে থাকতাম না। ভাল করেই জানি, সুযোগ পেলে আমাদেরকে মেরে ফেলবে দিমিতভ বা ল্যাং।

এসব স্ফটিক সমস্যা তৈরি করে, বলল মিতা, তোমার হয়নি, কিন্তু আমাদের হয়েছে মাসের পর মাস ঘুমাতে পারিনি আমরা। বারবার মনে হয়েছে স্ফটিকের কথা: আরও তো আছে ওই জিনিস। দেরি না করে খুঁজে বের করতে হবে। সবগুলোকে রাখতে হবে নির্দিষ্ট সব জায়গায়।

বলতে চাইছ, তোমরা প্রভাবিত হয়েছ স্ফটিকের কারণে? জানতে চাইল রানা।

ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয়, বলল মিতা, মন পাল্টে দেয় অনেক কিছুই। যেমন শিশুর কান্না অস্থির করে মেয়েদেরকে। মনের ভেতর প্রভাব পড়েছে বলে ওই স্ফটিকের জন্যে প্রাণ দিতেও রাজি হয়ে গেছি প্রফেসর আর আমি।

গম্ভীর হয়ে গেল রানা। কিন্তু ওটার জন্যে আবেগ আসছে কেন? কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারবে?

মায়ান চিলাম বালাম থেকে যা পড়েছি, এসব স্ফটিক ঠেকিয়ে দেবে পৃথিবীর ধ্বংর্স। নিজের নোট দেখলেন প্রফেসর। এখানে লিখেছে, বারো সালের পর থেকে বাবার পাপের জন্যে দায় নেবে তাদের সন্তানরা। অন্ধ হবে আকাশের চোখ। সভ্যতা হবে অসহায়। তা ঠেকাতে হলে লাগবে ওসব স্ফটিক।

স্যাটেলাইটের কথা লিখেছে নাকি? বলল রানা।

তাই তো মনে হয়, জানালেন প্রফেসর। সভ্যতা রক্ষা করতে হলে চাই ওই জ্বলজ্বলে স্ফটিক।

কিন্তু সভ্যতার ধ্বংস ঠেকাবে কী ভাবে? নরম সুরে জানতে চাইল রানা।

তা এখনও জানি না, আরও চাই তথ্য। প্রফেসরের দিকে তাকাল মিতা। আপনার নতুন তথ্যগুলো বলুন।

নিমজ্জিত মন্দির থেকে পাওয়া গ্লিফ দেখিয়ে দিচ্ছে কোথায় পাব পরের স্ফটিক, বললেন হ্যারিসন।

জায়গাটা কোথায়? জানতে চাইল রানা।

পাহাড়ি জায়গা। এই যে।

মানচিত্রের দিকে তাকাল ওরা।

নিমজ্জিত মন্দির থেকে সরল রেখা তৈরি করে প্রফেসরের হাত থামল দক্ষিণ মেক্সিকোয়। কয়েকটা সংখ্যা লেখা মানচিত্রে। ওখান থেকে আর্কিওলজিস্টের তর্জনী গেল গুয়াতেমালার উঁচু জমিতে।

এই অ্যাংগেল থেকে রওনা দিতে হবে, একটা রেখা দেখালেন হ্যারিসন, এটাই নেবে পরের স্ফটিকের কাছে। ওটাই পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার আত্মত্যাগের আয়না।

এই রেখা ধরে কোথায় যাব? মিতার চোখ অনুসরণ করছে রেখাটা।

মানচিত্র দেখলেন প্রফেসর। তার তৈরি পথ গেছে নিচু ম্যানগ্রোভ জঙ্গল ও জলাভূমির মাঝ দিয়ে নিচু টিলাসারিতে। ওদিকটা সিয়েরা মাদরে ওক্সিডেন্টাল। পাঁচ থেকে ছয় হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ার ওপাশে প্রশান্ত মহাসাগর। পৌঁছুতে লাগবে অন্তত এক থেকে দেড় মাস।

একবার মাথা চুলকে নিলেন প্রফেসর, তারপর বললেন, ঠিক বুঝছি না। জটিল করে লিখেছে মায়ানরা: দেবতার পথে হাঁটবে ব্রাদারহুডের সবাই। ওখানেই আছে পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার মন্দির। ওই জ্বলজ্বলে পথে পৌঁছতে হবে দেবতার কাছে।

আসলে কী বলতে চায়? আনমনে বলল মিতা।

জানি না, বললেন হ্যারিসন।

জ্বলজ্বলে পথ? রানার দিকে তাকাল মিতা। মিল্কি ওয়ের কথা বলছে নাকি? জ্যোতির্বিদ্যায় খুব দক্ষ ছিল মায়ানরা।

একই কথা ভেবেছি, বললেন প্রফেসর, কিন্তু গ্লিফের মধ্যে সময় বা ঋতু বলতে কিছুই নেই। একেক মৌসুমে ওপরের দিকে থাকে মিল্কি ওয়ে, আবার অন্য সময়ে নেমে আসে। বছরের নির্দিষ্ট মাস না পেলে কিছুই বুঝব না।

তা হলে এখন কী করবেন? জানতে চাইল মিতা।

রানার দিকে চেয়ে মাথা নাড়লেন প্রফেসর। কোনও পথই তো পাচ্ছি না!

মৃদু হাসল রানা। আমি হয়তো জানি কোথায় ওই জ্বলজ্বলে পথ। এবার আমাদের লাগবে…

হাউস ফোন বেজে উঠতেই চুপ হয়ে গেল ও। খপ করে তুলে রিসিভার ঠেকাল কানে।

প্রফেসর ও মিতা আবছা শুনল ফ্রন্ট ডেস্কের ক্লার্কের বেসুরো, কর্কশ চিৎকার: পালিয়ে যান, সেনোর! পালান! ওরা আসছে আপনাদেরকে ধরতে!

ঠাস্ করে ফোন রাখল রানা। পাবলোকে নিয়ে তৈরি হও, ফটিক নাও! ওরা আসছে! চেয়ার ছেড়ে ক্লসিট থেকে শটগান বের করল ও।

পাবলোকে কোলে তুলে নিলেন হ্যারিসন, ওদিকে সুইটের কিচেন কেবিনেট থেকে ব্যাকপ্যাক নিল মিতা।

দরজা সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিয়েছে রানা। করিডোর ধরে হেঁটে আসছে কয়েকজন লোক, পরনে টুরিস্টদের পোশাক। গম্ভীর চেহারা। ছুটি কাটাবার মুডে নেই। দুজন থেমে গেছে সিঁড়ির মুখে। রানাদের সুইটের দরজা লক্ষ্য করে আসছে বাকি তিনজন।

কপাল ভাল, হোটেলের ডেস্কের ছোকরা চালু, ভাবল রানা। প্রাণে বাঁচলে পরে ওকে মোটা অঙ্কের বকশিশ দেবে।

পাশের ঘরে ঢুকল দুই ককেশিয়ান। তৃতীয়জনের চোখ ওদের দরজার ওপর।

নিঃশব্দে দরজা আটকে পরক্ষণে দূরের মেঝেতে ডাইভ দিল রানা। উড়ন্ত অবস্থায় গলা ছাড়ল, সবাই শুয়ে পড়ো!

দুসেকেণ্ড পর একরাশ গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হলো পাশের ঘরে যাওয়ার দরজা।

মেঝেতে গড়ান দিয়ে উঠেই পাল্টা জবাব দিল রানা। কান ফাটানো আওয়াজে দরজা ও পাতলা প্লাস্টিকের দেয়াল ভেদ করে পাশের ঘরে ঢুকল বন্দুকের চারটে বুলেট। হাউমাউ করে উঠেছে এক লোক। দুই সেকেণ্ড পর ধুপ করে মেঝেতে পড়ল কেউ। ওই ঘরে রয়ে গেছে আরও কেউ।

কাউন্টারের আড়াল থেকে উঁকি দিল মিতা। কোন্ দিকে যাব?

ঝাঁঝরা দরজার ওপর আছড়ে পড়ল কারও ভারী কাঁধ। হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল এক লোক। কী করতে হবে বুঝে গেল মিতা। প্রফেসর ও পাবলোকে নিয়ে দৌড়ে গেল ব্যালকনিতে। বিশ ফুট নিচে বালিময় জমিন। এদিকে দরজার সামনের লোকটাকে এক গুলিতে গেঁথে ফেলেছে রানা।

পাশের ঘরের দেয়াল ভেদ করে এল একঝাক গুলি। চুরচুর হলো একগাদা বাসন-গ্লাস। ঝনঝন করে খসে পড়েছে ব্যালকনিতে যাওয়ার কাঁচের দরজা। পাশের ঘরে পাল্টা গুলি পাঠাল রানা, পরক্ষণে লাফিয়ে সরে গেল নতুন পযিশনে। একবার দেখল ব্যালকনি। এইমাত্র পাবলোকে বুকে নিয়ে রেলিং টপকে খসে পড়েছে মিতা। কমব্যাট ট্রেনিং ভালই শিখেছে, ভাবল রানা। রেলিঙের পাশে থেমে বরফমূর্তি হয়েছেন প্রফে হ্যারিসন।

ভদ্রলোক অন্য পথ খুঁজছেন, বুঝে গেল রানা। ধমকের সুরে বলল, কী হলো, লাফ দিন!

ওর কথা শেষ হতে না হতেই বুলেটের কারণে ঘরে তৈরি হলো ঝড়। নানান দিকে ছিটকে গেল প্লাস্টিক ও কাঠের টুকরো। আগেই মেঝেতে শুয়ে পড়েছে রানা, ক্রল করে চলল ব্যালকনির দিকে। আবারও বলল, লাফ দিন!

রেলিঙের ওদিকে একটা পা নিলেন প্রফেসর হ্যারিসন, করুণভাবে ফিরে চাইলেন রানার চোখে। হেডলাইটের তীব্র আলো চোখে পড়ায় থমকে দাঁড়ানো হরিণ যেন।

পাশের ব্যালকনিতে রাশানরা চলে এলেই মরবেন! ভাবল রানা। নিজে মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে বলে এক লাথিতে সুইটের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল এফএসবির এক এজেন্ট।

রানার চারপাশে বিঁধল অন্তত দশটা গুলি। একটা ছিলে দিয়ে গেল ওর কনুই। ঘুরেই পাল্টা গুলি পাঠাল রানা।

বুলেট গায়ে না বিঁধলেও লাফিয়ে ডানদিকে সরে গেল কালো চুলের মোষ। খালি হয়ে গেছে রানার বন্দুক। ওটা ব্যবহার করল ক্রিকেটের ব্যাটের মত। উড়াল দিল লোকটার হাতের অ্যাসল্ট রাইফেল, মেঝেতে পড়ে খটাং-খট আওয়াজে পিছলে গেল দূরে। ওটা পাওয়ার জন্যে ঝাঁপ দিল রানা। কিন্তু এক পাশ থেকে ওকে জাপ্টে ধরল মোষ। ধড়াস করে পড়ল দুজন মেঝেতে।

রানার বুকের ওপরে পড়েছে লোকটা। গড়ান দিয়ে তাকে মেঝেতে ফেলল রানা। কিন্তু উঠে বসেই শোল্ডার হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করছে সে!

মেঝেতে ছোরার মত চোখা এক কাঁচের টুকরোর ওপর হাত পড়ল রানার। ওটা তুলেই গেঁথে দিল এফএসবি এজেন্টের গলায়। ছেঁড়া গলা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরোল রক্ত। কাত হয়ে মেঝেতে পড়ে ছটফট করতে লাগল মৃতপ্রায় এজেন্ট।

উঠেই ব্যালকনি লক্ষ্য করে ঝেড়ে দৌড় দিল রানা। রেলিং টপকে পড়ার সময় সঙ্গে নিল হতভম্ব প্রফেসরকে। সাঁই করে নেমে এল ওরা বালি-জমিতে। হ্যারিসনের ওপর পড়েছে রানা। প্রফেসরের ওপর থেকে সরে গেল। আপনি ঠিক আছেন তো?

থাকি কী করে? নাকমুখ কুঁচকে উঠে বসলেন প্রফেসর।

সাবধান! একটু দূর থেকে চিৎকার করল মিতা।

ঝট করে ওপরে তাকাল রানা। একইসময়ে হোলস্টার থেকে ওয়ালথার বের করে তাক করেছে ব্যালকনির দিকে। রেলিঙে থেমেছে এক লোক, হাতে রাইফেল। বাঁটে লাগল রানার গুলি। ছিটকে গেল রাশানের অস্ত্র। রানার পরের গুলি বিঁধল লোকটার কপালে। ধড়াস্ করে ব্যালকনির মেঝেতে পড়ল লাশ।

ঘুরে তাকাল রানা। রক্তে ভেসে গেছে প্রফেসরের পোশাক।

 রক্ত তোমার হাতের, বললেন হ্যারিসন।

দেখব পরে, টান দিয়ে তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিল রানা। চলুন, ভাগতে হবে!

সৈকত ধরে দৌড়ে চলেছে ওরা। কাঁচে লেগে কেটে গেছে রানার বাহু। খুব গভীর নয় ক্ষত।

পঞ্চাশ গজ গেলেই সামনে পড়বে হোটেলের কাছের সড়ক। তার আগে এক পাশে ছোট কয়েকটা মেইনটেনেন্স ঘর। একটার ভেতর ঢুকল ওরা। পেছনে দরজা আছে। পিস্তলের বাড়ি পড়তেই খুলে গেল তালা। ঘরের র‍্যাকে তোয়ালে পেয়ে রানার বাহুতে জড়িয়ে দিল মিতা।

পাঁচ মিনিট পর ওরা বেরোল কর্মীদের ওভারঅল পরে। হোটেলের সামনের ঘাসজমি পেরিয়ে চলেছে রাস্তার দিকে। মিতার বাহু শক্ত করে ধরে রেখেছে পাবলো।

দূর থেকে আসছে পুলিশের সাইরেন। যে যার কামরা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে হোটেলের গেস্টরা।

পিস্তল দেখিয়ে ভীত ভ্যালের কাছ থেকে চাবি নিল রানা। দু মিনিট পর হোটেলের আঙিনা ছেড়ে তুমুল বেগে ছুটল চোরাই রেন্টালকার।

সবাই ঠিক আছ তো? জানতে চাইল রানা।

আমি ছাড়া সবাই সুস্থ, বললেন হ্যারিসন।

পাবলোর কী অবস্থা?

রিয়ার ভিউ মিররে রানা দেখল ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মিতা। কোমল স্বরে বলল, মনে হচ্ছে ও ঠিকই আছে।

ছেলেটার চোখে এখন উন্মাদনা নেই, খেয়াল করল রানা।

ওরা ল্যাং-এর লোক নয়, বলল মিতা।

রাশান, বলল রানা, জানতাম, আগে হোক পরে ওদের সঙ্গে দেখা হবেই।

আমাদেরকে খুঁজে পেল কী করে? জানতে চাইল মিতা।

ল্যাং-এর লোকও খুঁজে নিয়েছে ওদেরকে।

 এই দুই প্রশ্নের জবাব খুঁজছে রানা।

ওরা অদ্ভুত এক দল। কৃষ্ণ বর্ণের এক বয়স্ক লোক, রূপসী এক যুবতী, বাচ্চা এক ছেলে, আর এশিয়ার বাদামি এক যুবক। সহজেই ওদেরকে আলাদা করা যাবে ভিড় থেকে।

প্যাসেঞ্জার সিটে বসে আছেন হ্যারিসন। তাঁর দিকে তাকাল রানা। প্রফেসর, আপনি ওপর থেকে নামতে ভয় পান?

গত বছর তোমার হেলিকপ্টারে উঠেছিলাম, নাকের কাছে ছিল গাছের সারি, তখনই কেঁপে গেল আত্মা। তারপর থেকে ভয় লাগে।

তা হলে ভয়টাকে এবার সামলে রাখতে হবে, বলল রানা।

 ঠিক করেছে, ওরা আবারও উঠবে আকাশে।

তছনছ হয়ে যাওয়া হোটেলের কামরায় ঢুকল ইগোর দিমিতভ। সোজা গেল ব্যালকনিতে। একটু আগে ওই পথে পালিয়ে গেছে তার শিকার। পায়ের নিচে কুড়মুড় করে ভাঙল কাঁচ। দূর থেকে আসছে পুলিশের গাড়ির সাইরেন।

রেলিঙের পাশে পড়ে আছে দিমিতভের দলের এক লোক, মৃত। ঘরের ভেতরেও লাশ। একজনের গলা চিরে গিয়েছিল কাঁচের ফালি লেগে। আরও দুজন খারাপভাবে আহত। বন্দুকের বাকশট লেগে ঝাঁঝরা হয়েছে একজনের পাছা। অন্যজনের ছিঁড়ে গেছে যৌনাঙ্গের ডগা। অন্যরা সরিয়ে নিচ্ছে তাদেরকে। আকাশে চোখ রেখে কড়া সুরে বলল দিমিতভ, ওদেরকে ভ্যানে তুলে দাও।

লাশগুলোর কী হবে? জানতে চাইল একজন।

মাথা নাড়ল দিমিতভ। পড়ে থাকুক। ট্রেস করতে পারবে পুলিশ।

পা ছেঁচড়ে ঘর ছাড়ল লোকটা। নিজেও ব্যালকনি ছেড়ে ঘরে ফিরল দিমিতভ। বিড়বিড় করল, বাঙালি গুপ্তচর, এবার নিয়ে দুবার কপাল সাহায্য করল তোমাকে, কিন্তু তৃতীয়বার কপালই রাখব না! 

দরজার দিকে পা বাড়িয়ে চোখের কোণে মেঝেতে খোলা মানচিত্র দেখল সে। ঝুঁকে তুলে নিল ওটা। জায়গায় জায়গায় বৃত্তাকার চিহ্ন। কালো সরল রেখা গেছে বহু দূরে। বিস্মিত হয়ে বৃত্তাকার চিহ্ন ও সরল রেখা মন দিয়ে দেখল সে।

হাসি ফুটে উঠল নিষ্ঠুর ঠোঁটে।

নাহ্, ওদের নয়, আসলে ভাগ্যদেবী ওর সঙ্গেই আছে!

.

৩৪.

 নাসার মিশন কন্ট্রোল-এর মতই হয়ে উঠেছে ক্যামপেচে শহরে ল্যাং-এর ওয়্যারহাউস। এক পাশের টেবিলে সাগরের মন্দির থেকে পাওয়া হায়ারোগ্লিফ অনুবাদ করছেন স্কলাররা। আরেক দিকে সারি সারি কমপিউটার স্ক্রিনের সামনে এক ডজন ট্রেইণ্ড টেকনিশিয়ান নিয়ন্ত্রণ করছে নানান ইকুইপমেন্ট। ওদের জায়গাটা হয়ে উঠেছে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের ঘরের মত।

আরেক দিকে মানুষের ছবি বিশ্লেষণ করছে একুশ শতাব্দীর কমপিউটার। নানা শহর, গ্রাম ও আর্কিওলজিকাল সাইটে ছড়িয়ে পড়েছে ল্যাং-এর একদল কর্মী।

দলবল নিয়ে ওসব জায়গায় যেতে পারে মাসুদ রানা। চোখ রাখা হয়েছে মেক্সিকো সিটির অ্যানথ্রোপলজির মিউযিয়ামে।

সবমিলে দুশ লোকের হাতে ভিডিয়ো ক্যামেরা ও সেন্সিং ইকুইপমেন্ট। ঘুরছে তারা নানান এলাকায়। স্ক্যান করছে হাজারো মানুষের ছবি। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্লযা, এয়ারপোর্ট, রেস্টুরেন্ট, হোটেল, অ্যাভিন, কিছুই বাদ পড়ছে না। ল্যাং-এর লোকদের জানা নেই কাকে খুঁজতে হবে, তাই ইন্টারনেটের মাধ্যমে মনিবের টেকনিশিয়ানদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ছবি। বাকি কাজ করছে কমপিউটার।

ল্যাং-এর পেছনে গুনগুন আওয়াজ তুলছে র‍্যাক ভরা হাই পাওয়ার্ড সার্ভার। পেলেই প্রসেস করছে ডেটা। বিদ্যুদ্বেগে দেখা হচ্ছে হাজার মানুষের মুখের ছবি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দুই মিনিটের ভেতর পাঁচ শ মানুষের ছবি স্ক্যান করছে কর্মীরা।

ঝড়ের গতি তুলে কাজ করছে স্পটারদের দল।

রিডআউট দেখল ল্যাং। তার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম জানিয়ে দিয়েছিল, রানারা এসব এলাকায় থাকবে, সে সম্ভাবনা মাত্র একত্রিশ পার্সেন্ট।

তবে কাজের গতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন আপডেট অনুযায়ী কাজ করছে প্রোগ্রাম। তাতে একটু হতাশ ল্যাং। ওই কালো লোক, বাচ্চা ছেলে, সুন্দরী মেয়েটা আর মাসুদ রানা বোধহয় পরিচিত কোনও মায়ান সাইটে যাবে না।

কমপিউটারের বর্তমান অ্যানালাইসিস অনুযায়ী ওদেরকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হচ্ছে:

* মাসুদ রানার দলের ধরা পড়ার সম্ভাবনাঃ ৩.২৫%,

* মাসুদ রানার দল এরই ভেতর মেক্সিকো ত্যাগ করে চলে গেছে আমেরিকায়। সম্ভাবনাঃ ৯.৩৬%..

* মাসুদ রানার দল আবারও প্রফেসর হ্যারিসনের নিউ ইয়র্কের ইউনিভার্সিটির মেইনফ্রেম ব্যবহার করবে। সম্ভাবনাঃ ১১.৭৮%,

* মাসুদ রানার দল রওনা হয়েছে পরের সাইটের উদ্দেশে। সম্ভাবনাঃ ১৪.৫৯%,

* মাসুদ রানার দল স্থানীয় কোনও ইউনিভার্সিটি বা জাদুঘরে যাবে। সম্ভাবনাঃ ২৮.৯৯%,

* মাসুদ রানার দল যথেষ্ট তথ্য পেয়ে পৌঁছে যাবে পরের সাইটে। সম্ভাবনাঃ ৩১.৫০%,

* অন্যান্য সম্ভাবনাঃ .৫৩%. এই ডেটা আবারও দেখল হুয়াং লি ল্যাং।

সম্ভাবনা সবচে বেশি, যথেষ্ট তথ্য পেয়ে স্ফটিক খুঁজতে বেরোবে রানা।

কখন তা করবে, তার হিসেব দেয়নি কমপিউটারের প্রোগ্রাম। ওই তথ্য লাগবে না। মাসুদ রানা একবার শহর ছেড়ে গেলেই ঢুকে পড়বে ল্যাং-এর মুঠোয়। ওদেরকে খুঁজে নেয়ার জন্যে অন্য ট্র্যাকিং সিস্টেম আছে তার। এরপর যখন পাবে, আশপাশে কেউ না থাকলে হাসতে হাসতে ওদেরকে খুন করবে সে। সাক্ষী বলতে কেউ থাকবে না তখন।

প্রজেক্ট লিডারের দিকে তাকাল হুয়াং লি ল্যাং।

আকাশে তোলার জন্যে তৈরি করো ড্রোন।

.

৩৫.

 হোটেল থেকে চোরাই গাড়ি নিয়ে বেরোবার আধঘণ্টা পর নকল আইনী কাগজ দেখিয়ে এক রেন্টালকার নিয়েছে রানা। আপাতত ওরা চলেছে উত্তরদিকে। আবারও ফিরছে ক্যানকুনের উপকূলীয় ব্যস্ত এলাকায়। ওদিকেই আছে এয়ারপোর্ট।

পেছনে বসে পাবলোর সঙ্গে রাশান ভাষায় টুকটাক কথা বলতে চাইছে মিতা। স্ফটিক এত কাছে বলে প্রায় খেপে আছে পিচ্চি ছেলেটা। বারবার দেখছে ব্যাকপ্যাক।

পাবলো, আমরা নতুন বাড়িতে যাচ্ছি, বলল মিতা। ওখানে কেউ আমাদেরকে ধরতে আসবে না।

স্ফটিক রাখা ব্যাকপ্যাক থেকে চোখ না সরিয়ে বলল পাবলো, অনেক বেশি আলো! অনেক! দুহাতে ঢেকে ফেলল চোখ।

রানা, প্রফেসর এবং মিতার ধারণা, ব্রাযিলের ওই স্ফটিকের মতই এই স্ফটিক। কিন্তু ভাবতে শুরু করেছে মিতা, যদি এক না হয় দুটো? বিচ্ছুরণের খুব কাছে পৌঁছে গিয়ে থাকলে? ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ মেপে দেখার যন্ত্রপাতি ওদের কাছে নেই।

কী দেখছ, পাবলো? জানতে চাইল মিতা।

হাত তুলে আঁকাবাঁকা রেখা তৈরি করল ছেলেটা। চাপা স্বরে বলল, হলদে।

চোখে কষ্ট লাগছে? জানতে চাইল মিতা।

জবাব দিল না পাবলো।

 চোখে ব্যথা? জিজ্ঞেস করল মিতা। মাথাব্যথা করছে না তো? পারলোর মাথা স্পর্শ করল ও।

নিচু স্বরে বলল পাবলো, হলদে মানেই ভাল। নীল খারাপ। যত কালচে, তত খারাপ। ব্যথা লাগে।

মিতা খেয়াল করছে, আগের চেয়ে বেশি সহ্য করছে। পাবলো এই স্ফটিক। তবে আবারও এনার্জি বাড়লে সমস্যা হবে।

ওর আন্দাজ অনুযায়ী, আবারও এনার্জি বাড়বে পাঁচ ঘণ্টা পর। তবে সেটা সাধারণ বিচ্ছুরণ, না বোটে যা হয়েছিল, তেমন ভয়ঙ্কর কিছু বোঝার উপায় নেই। পাবলোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মিতা। ওর কোলে শুয়ে পড়ল পিচ্চি ছেলেটা।

সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে আছেন প্রফেসর হ্যারিসন। মিতার মনে হলো, বেড়ে গেছে মানুষটার পায়ের ব্যথা। সাবধানে ক্ষতের জায়গায় আঙুল বোলালেন তিনি।

আপনি ঠিক আছেন তো, স্যর? জানতে চাইল মিতা।

 হয় পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছি, অথবা বাড়ছে ইনফেকশন।

আরেক দফা অ্যান্টিবায়োটিক দেব, বলল মিতা।

এখন না, বললেন প্রফেসর, কেমন মাথা ঘুরছে। কোথাও পৌঁছে তারপর খাব।

রানার দিকে তাকাল মিতা।

স্থানীয় এয়ারপোর্টের দিকে চলেছে ওরা। সরু দুই লেনের রাস্তায় গিজগিজ করছে গাড়ি। একটু পর পর থামতে হচ্ছে।

এই ছোট শহরে এত ভিড় হয় কী করে? বলল মিতা।

খেয়াল করোনি, সৈকতের কাছের সব হোটেল ভরে গেছে টুরিস্টে? বলল রানা। মেক্সিকোর বড় অনুষ্ঠান ক্রিসমাস আর নিউ ইয়ার।

চুপ করে থাকল মিতা।

রেডিও ছাড়ল রানা।

স্প্যানিশ ভাষায় ব্রডকাস্ট করছে বিবিসি ওঅর্ল্ড। প্রথমেই জানাল সংবাদদাতা: অত্যন্ত ঘোলাটে হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে আমেরিকা, চিন ও রাশা। অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি, যুদ্ধঘোষণা আগে করবে কোন্ দেশ। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, বরাবরের মতই আমেরিকার পাশে থাকবে ব্রিটেন… ইত্যাদি ইত্যাদি।

একটু পর শুরু হলো জটিল এ বিষয়ে কজন বিশিষ্টজনের গালভরা আলোচনা।

ওই অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত হালকা সংবাদ প্রচারের এক স্টেশন ধরল রানা।

সংবাদ পাঠিকা বলল: চমকার পরিবেশের লোভে হাজারো টুরিস্ট এ দেশে এসেছেন ক্রিসমাস ও নিউ ইয়ার পালন করতে। খুশি ছিল সবাই। কিন্তু গতকাল দুপুরে অদ্ভুত এক শক ওয়েভ বন্ধ করে দেয় এ দেশের বেশিরভাগ এলাকার বিদ্যুৎপ্রবাহ। মেক্সিকান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছেন, ইউ.এস.-এর টপ সিক্রেট গ্রুম লেক এয়ার ফোর্স বেস-এ দুর্ঘটনার ফলে ওভারলোড হয়েছে তাঁদের গ্রিড। অনেকেই বলছেন, ওই শক ওয়েভ এতই শক্তিশালী ছিল, তা অনুভব করা গেছে এ দেশ থেকেও। ধারণা করা হচ্ছে, ওটা কোনও টেরোরিস্ট হামলা। …এদিকে আজ এক হোটেলে হঠাৎ হামলা করেছে একদল সশস্ত্র লোক। এ খবর জানার পর বাড়ি ফিরতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে বেশিরভাগ টুরিস্ট। আমরা এখন কথা বলব মেক্সিকান ফরেন মিনিস্টার মিস্টার গুডু হাচ্চির সঙ্গে…।

রেডিও বন্ধ করল রানা। দূরে চোখ ওর। একমাইল দূরে এয়ারপোর্টের প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মেক্সিকান আর্মি ও রায় পুলিশ। একে একে গাড়ি পরীক্ষা শেষ করে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে তারা।

হয়তো ওদের কাছে আমাদের ছবি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ, বলল রানা, চাই না ওই সিকিউরিটির ভেতর পড়তে।

কী করবে? জানতে চাইল মিতা।

খুশি মনে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হেলিকপ্টার ধার নিতাম, কিন্তু আপাতত তা সম্ভব নয়, বলল রানা। লোক বেশি।

সরল স্বীকারোক্তি শুনে হেসে ফেলল মিতা। চুরি করতে?

একে আপন করে নেয়া বলতে পারো।

খুশি হয়ে বললেন প্রফেসর, আমার ভাল লাগছে যে রানার হেলিকপ্টারে আমার উঠতে হচ্ছে না।

দয়া করে অত খুশি হবেন না, স্যর, বিনয়ের সঙ্গে বলল রানা। এবার কাজে লাগাতে হবে বি প্ল্যান।

কথা শুনে চোখ-মুখ শুকিয়ে গেল হ্যারিসনের। পরিষ্কার মনে আছে রানার ঝরঝরে, প্রাচীন হেলিকপ্টারের কথা।

সামনের পেট্রল স্টেশনে ঢুকল রানা। অপেক্ষা করল কয়েক মিনিট, তারপর আবারও বেরোল রাস্তায়। এবার চলেছে ফিরতি পথে। মৃদু হাসি ফুটে উঠল রানার ঠোঁটে।

রিয়ার ভিউ মিররে ওকে দেখে জিজ্ঞেস করল মিতা, অত মিটমিট করে হাসছ কেন?

কারণ মহা-হারামি এক আমেরিকান বিলিয়নেয়ারের কথা মনে পড়েছে, বলল রানা, তার কাছ থেকে কিছু নেয়া সত্যিকারের পুণ্যের কাজ। ভাবছি, ওর পাপ কিছুটা মোচন করি।

.

লেক রেনেগেড এলএ-২৫০ সিঙ্গল ইঞ্জিন উভচর বিমানে পন্টুনের বদলে পেটের নিচে থাকে নৌকার খোল। টেক্সান ট্রাভেলস্ কোম্পানির জিনিস। চাইলে দু শ ডলার খরচ করে ওটাতে চেপে চল্লিশ মিনিটের জন্যে সাগর ও উপকূলের ওপর দিয়ে ঘুরে আসতে পারে টুরিস্ট। আরও কিছু ডলার খরচা করলে দুঘণ্টার জন্যে ঘুরিয়ে আনবে দূরের উপসাগর থেকে। নামা যাবে নির্জন সৈকতে, বাধা নেই পিকনিক করতে। তবে এত সময় নেই যে ওসব করবে রানা, মিতা, হ্যারিসন ও পাবলো।

রানা এজেন্সিকে দিয়ে জরুরি কিছু গোয়েন্দাগিরির কাজ করিয়ে নিয়েছিল টেক্সান ট্রাভেলস্ কোম্পানির বিলিয়নেয়ার মালিক। কাজ শেষে টাকা চাইলে ঘোরাতে লাগল: কাল দেব, পরশু দেব। কাটিয়ে দিল এভাবে কয়েক মাস। এরপর টাকা তো দিলই না, আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে তার তরফ থেকে এল কড়া ধমক।

শাখা প্রধানের কাছ থেকে সব শোনার পর রানা বলল, বাজে লোক, টাকা তো দেবেই না, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লেলিয়ে দেবে, যাতে সমস্যা তৈরি করে। আইনী ঝামেলায় যাব না আমরা। তবে মনে রাখব, ওর কাছে টাকা পাই। সুযোগ পেলেই আদায় করে নেব পাওনা।

আজ রাতে এসেছে সেই লোভনীয় সুযোগ।

প্রায় দুপুর থেকে ঘন জঙ্গলে গাড়ি রেখে অপেক্ষা করেছে। ওরা। বিচ্ছুরণ হওয়ার আগেই গভীর গর্ত খুঁড়ে পুঁতে রেখেছে। স্ফটিক। পরে তুলে নিয়েছে আবার। তারপর মাঝরাতে হাজির হয়েছে জনমানবহীন সাগর-সৈকতে।

অন্যান্য বিমান ভাড়ার এজেন্সিতে না ঢুকে টেক্সান ট্রাভেলস্ কোম্পানির সামনে থেমেছে রানা। স্কেলিটন কি ব্যবহার করে ঢুকেছে ওই অফিসে। মাত্র পাঁচ মিনিট পর বেরিয়ে এসেছে পছন্দের বিমানের চাবি হাতে।

ডকে অপেক্ষা করছিল মিতা, হ্যারিসন ও পাবলো।

রানা যেতেই জিজ্ঞেস করেছেন হ্যারিসন, কোনও গোলমাল হয়নি তো?

মাথা নেড়েছে রানা। না। লবির সোফায় আরাম করে ঘুমিয়ে ছিল পাহারাদার। মাথায় টোকা দিয়ে অজ্ঞান করে হাত পা-চোখ-মুখ সব বেঁধে রেখে এসেছি।

মুচকি হেসে বলেছে মিতা, পাকা চোর বলব, না ডাকাত!

চোর-ডাকাত? এসব আবার কী কথা? ভুরু কুঁচকে ফেলেছে রানা। সুদে-আসলে নিয়েছি প্রাপ্য। এই কোম্পানির মালিকের কাছে অনেক টাকা পাই। একটু দূরের উভচর বিমানের ককপিটে চেপেছে। উঠে পড়ো।

সবাই সিটবেল্ট বেঁধে নেয়ার পর ঝিনুকের মত দরজা বন্ধ করেছে রানা। ইঞ্জিন চালু করে ডক থেকে সরিয়ে নিয়েছে বিমান। গভীর পানিতে যেতেই ঠেলে দিয়েছে থ্রটল।

বিলিয়নেয়ার ব্র্যাড হাডসনের দামি বিমান আকাশে উঠতে সময় নিয়েছে মাত্র ত্রিশ সেকেণ্ড।

সেটা পুরো আড়াই ঘণ্টা আগের কথা।

প্রফেসর হ্যারিসনের মানচিত্রে আঁকা রেখা অনুসরণ করছে। রানা। ভরসা দিয়েছে মিতাকে, ভাল করেই জানে, কোথায় যেতে হবে। তবে এটা বলেনি, যতটা দূরে যেতে হবে, তাতে প্রায় ফুরিয়ে যাবে বিমানের ট্যাঙ্কের তেল। ঠিক সময়ে উপযুক্ত জায়গায় নামতে না পারলে করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে। ওদের জন্যে!

চমৎকার বিমান বেছে নিয়েছে ও। বিশাল জানালা দিয়ে দেখা যায় চারপাশ। ছাতেও ওই একই জিনিস, পরিষ্কার চোখে পড়ে বহু দূরের মিটমিট করা নক্ষত্র।

অন্ধকারে বিকট আওয়াজ তুলছে বিমান। আপাতত দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। খুলে রেখেছে ককপিট দরজা, ঘুরে যাত্রীদের দেখল রানা। ঘুমিয়ে কাদা প্রফেসর হ্যারিসন ও পিচ্চি পাবলো। বিমানের ইঞ্জিনের গর্জনকে দাবিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে আর্কিওলজিস্টের থ্যাবড়া নাক।

পাশের কো-পাইলটের সিটে বসে বলল মিতা, আকাশে উড়তে খুব পছন্দ করো, তাই না?  

পাখির মত ডানা নেই, তাই সাহায্য নিচ্ছি যন্ত্রের, বলল রানা। এই রেনেগেড বিমানের আড়াই শ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন কেবিনের ওপরে পাইলনে বসানো, প্রচণ্ড শব্দ করে। তবে এত আওয়াজ না থাকলে খুশি হতাম।

গতরাতে ফোন দিলেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান, লজ্জায় লাল হলো মিতা। তার আগে কী যেন দিতে চেয়েছিলে?

তাই? একদম ভুলে গেছি। হাসল রানা। জোরালো আকর্ষণে টানছে ওকে মিতা। কিন্তু ওর জীবনে মেয়েটা কোনওভাবে জড়িয়ে যাক, তা চাইছে না রানা। মনে পড়লে তোমাকে জানাব।

কখনও ভেবেছ, এত ঝুঁকির জীবন থেকে অবসর নেয়ার কথা? বলল মিতা। হয়তো সংসার করলে?

নদীর বিপজ্জনক বাঁকে পৌঁছে গেছে মিতা। চুপ করে থাকল রানা।

কী ভাবছ? জানতে চাইল মেয়েটা।

ভাবছি, সামনে বিপদ হবে।

 ও, হতাশ হলো মিতা। নিজেকে মনে করিয়ে দিল, সত্যি, কখনও বাঁধতে পারবে না মানুষটাকে মায়ার জালে। মনে পড়ল আশা ভোঁশলের প্রিয় একটা গানের কথা: তারে ভোলানো গেল না কিছুতেই! এদের ভোলানো যায় না কোনওদিন।

বাইরে দেখো। 

জানালা দিয়ে দূরে তাকাল মিতা। অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। মাইলের পর মাইল প্রায়-অভেদ্য ঘন জঙ্গল। তারপর হঠাৎ দেখল রুপালি ঝিলিক। যেন প্রতিফলিত হয়েছে দানবীয় কোনও আয়নায়। হারিয়ে গেল আলো।

ওটা কী, বুঝল না মিতা। আগে কখনও এমন কিছু দেখেনি। ঝলসে উঠেছিল জঙ্গলের মাঝে।

অন্ধকারে চেয়ে রইল ও। কানফাটা শব্দে এগিয়ে চলেছে বিমান। কিছুক্ষণ পর আবারও দেখল রুপালি ঝলক। এবার চারপাশের অন্ধকারের সঙ্গে মিতালি করে রয়ে গেল ওই আলো। সাপের মত চলেছে ঘাসের মাঝে। হারিয়ে গিয়ে আবারও ফিরল সাদা রশ্মি। বিমানের সঙ্গে যেন পাল্লা দিতে হবে তার।

কয়েক সেকেণ্ড পর মিতা বুঝল, আকাশের চাঁদ প্রতিফলিত হচ্ছে অনেক নিচের সরু নদীর জলে।

আগেও দেখেছ এই দৃশ্য? বলল মিতা।

 হ্যাঁ। দারুণ না?

 মাথা দোলাল মিতা।

এবার ঘুমন্ত সুন্দরকে জাগিয়ে তোল, কুচকুচে কালো প্রফেসরকে দেখাল রানা। কিছুক্ষণ পরেই পৌঁছে যাব।

গিয়ে কাঁধে টোকা দিয়ে হ্যারিসনকে তুলল মিতা।

চোখ কচলে নিয়ে চমকে গেলেন প্রফেসর। নিচে জঙ্গলের মাঝে নদী, নানাদিক্লে তৈরি করেছে ছোট কিছু খাল। সেগুলোরই কোনওটায় নামতে হবে। পিছিয়ে গেল বামে কয়েকটা লেক।

জলে চাঁদের প্রতিফলন। সবমিলে ডজনেরও বেশি লেক।

মিতার মনে হলো, পায়ের ছাপ রেখে গেছে স্বর্গের কোনও দেবতা।

অকল্পনীয় দৃশ্য, বললেন প্রফেসর।

ফুরিয়ে এসেছে তেল, এবার নামব সবচেয়ে বড় লেকে, নইলে বিধ্বস্ত হবে বিমান জঙ্গলে, দুঃসংবাদ দিল রানা।

অবাক চোখে ওকে দেখল মিতা ও কম্পমান প্রফেসর।

অন্য উপায় ছিল না, নইলে রাশানরা, ল্যাঙের লোক, আর্মি বা পুলিশের লোকের হাতে ধরা পড়তাম, ব্যাখ্যা দিল রানা।

মাথা দোলাল মিতা। ও!

শেষে খুন হলাম বেপরোয়া, নচ্ছার, দুর্ধর্ষ রানার হাতে! করুণ সুরে বললেন প্রফেসর।

সরু, আঁকাবাঁকা নদী গেছে জঙ্গলের মাঝ দিয়ে, দুপাশে ছোট পুকুর ও লেক, যেন আলোর দেবতার রুপালি পদচিহ্ন।

প্রফেসরের কাছ থেকে পাওয়া মানচিত্র দেখল রানা। এ দেশের উঁচু জমিতে পৌঁছে গেছে ওরা। নানান দিক থেকে নদী বা লেকে পড়েছে ঝর্না। কিন্তু সবই শীর্ণ। এ বছর অস্বাভাবিক বৃষ্টি হ্রাসের ফলে লেকের গভীরতা কম। হেলিকপ্টার পেলে বিপদ ছিল না, কিন্তু এত ছোটসব লেকে উভচর বিমান নামানো খুব কঠিন কাজ!

.

৩৬.

আগে কখনও হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে এত লোক দেখেননি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। জয়েন্ট চিফ, সিআইএ ডিরেক্টর ক্যালাগু, স্টেটসের ডিফেন্স সেক্রেটারিরা এবং তাদের এইডরা গিজগিজ করছে ঘরে। প্রধান টেবিল ঘিরে অন্যান্য কেবিনেট সদস্যরা।

গত কয়েক ঘণ্টায় আরও জটিল হয়েছে পরিস্থিতি। রাশানরা গুপ্তচর ফাইটার বিমান ফেলে দিয়েছে বলে পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে চিন নেভি। বিতর্কিত সাগরে দুটো গুপ্তচর রাশান বোট দখল করে নিয়েছে তারা। সীমান্তে জড় হচ্ছে দুদেশের সেনাবাহিনী।

বিপজ্জনক সাগরের দিকে যাচ্ছিল আমেরিকার এক নেভির জাহাজ, কিন্তু বিপদ বুঝে পিছিয়ে গেছেন ক্যাপ্টেন। নইলে বেদখল হতো ওই রণতরী। এখন প্রতারক দেশ হিসেবে আমেরিকার দিকে আঙুল তুলছে রাশানরা। একই কথা বলছে চিন সম্পর্কে।

এদিকে চিনা কর্তৃপক্ষ জানতে চেয়েছে, কী কারণে তাদের সাগরে ঘুরঘুর করছে রাশান ও আমেরিকান গুপ্তচর রণতরী। সেক্ষেত্রে তারা কেন ধরে নেবে না, ওই দুই দেশ মিলে হামলা করতে চাইছে চিনের ওপর?

আমেরিকার দিকে আঙুল তাক করছে চিন ও রাশা।

নিজেরাও সন্দেহ করছে পরস্পরকে।

নিজের চেয়ারে চুপ করে বসে সিচুয়েশন রিপোর্ট শুনছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।

বড় ফ্ল্যাট-স্ক্রিন দেখিয়ে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করছেন জয়েন্ট চিফ।

…এদিকে তাদের মোকাবিলা করতে রাশান সীমান্তে পাঠানো হয়েছে চাইনিজ আর্মির চল্লিশটা ডিভিশন। শুধু তাই নয়, কৌশলগত সব জায়গায় মোতায়েন হয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিমান। সবই রাখা হয়েছে সীমান্তের এক শ মাইলের ভেতর।

ক্লিক করে নতুন ছবি আনলেন জয়েন্ট চিফ।

ওটা স্যাটেলাইট ইমেজ। দেখা গেল রাশান আইসিবিএম সাইলো। বিদঘুটে মস্ত এক ট্যাঙ্কার ট্রাক থেকে নানান হোস গেছে মিসাইলের পেটে। যুদ্ধের জন্যে তৈরি হচ্ছে রাশানরা। তৎপরতা দেখে বোঝা যাচ্ছে, তারা হামলা করতে পারে দুদিকে। সেনাবাহিনী সদস্যরা দুভাগে ভাগ হয়েছে, একদল হামলা করবে এশিয়ায় চিনের ওপর, অন্য দল ইউরোপে।

নতুন ছবি এল স্ক্রিনে।

সীমান্তের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল এসএস-২০ লঞ্চার।

বিশেষ একটি ছবি দেখা গেল। বছরের এ সময়ে বরফে ঢাকা থাকে মারম্যানস্ক বন্দর, কিন্তু যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে প্রকাণ্ড আইসব্রেকার দিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়েছে সমস্ত বরফ।

আমাদের দৃষ্টিতে এটা সবচেয়ে বড় সমস্যা, বললেন জয়েন্ট চিফ, আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সাগরে ছড়িয়ে পড়বে তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল বহর। কিউবার মিসাইল ক্রাইসিসের সময় আমরা ধরে নিয়েছিলাম, যুদ্ধে নামতে হলে সময় নেবে রাশানরা। কিন্তু এখন অন্য কিছু দেখছি আমরা।

প্রেসিডেন্টের দিকে তাকালেন তিনি। এটা মস্ত বিপদ সঙ্কেত, স্যর। রাশানরা খুবই সিরিয়াস। আমাদেরও উচিত যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি নেয়া।

কী করবেন ভাবছেন প্রেসিডেন্ট।

আপাতত বিপদ ঘটাবে না ব্রাযিল স্টোন। রাখা হয়েছে ইয়াকা মাউন্টেনের গভীর অংশে। চারপাশের সেন্সর থেকে জানা গেছে, ওই স্ফটিক থেকে বেরোচ্ছে না ইলেকট্রোম্যাগনেটিক এনার্জি। তবে এনআরআই স্টাফ, সিআইএর এক্সপার্ট বা ক্যাথিবা আলিহাও বলতে পারবেন না, আবার কখন মারাত্মক বিচ্ছুরণ হবে ওটা থেকে।

শুরু হয়েছে তিন দেশের স্নায়ু যুদ্ধ, এখন ব্রাযিল স্টোন থেকে আবারও বিচ্ছুরণ হলে মহাবিপদে পড়বে আমেরিকা।

যুদ্ধাবস্থায় পড়েছেন, ভাবছেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু হঠাৎ বুঝলেন, অন্যদিক থেকে কপাল ভাল।

এনআরআই হেডকোয়ার্টারে বা অ্যাড্রিউ এয়ার ফোর্স বেস থেকে রওনা হওয়ার আগেই ওই স্ফটিক বিচ্ছুরণ ঘটালে বিদ্যুত্তীন হতো পুব উপকূল। কানা হতে পেন্টাগন, হোয়াইট হাউস, কংগ্রেস, ল্যাংলির সিআইএ সবই।

ওই বিচ্ছুরণের ফলে বিনষ্ট হয়েছে গ্রুম লেকের প্রায় প্রতিটি সার্কিট ও ব্যাকআপ সিস্টেম। এমন কী আশি মাইল দূরের নেলিস এয়ার ফোর্স বেসও হয়ে পড়েছে অকার্যকর।

ওদিকে নেয়ার আগেই ব্রাযিল স্টোন থেকে বিচ্ছুরণ হলে অসহায় অবস্থায় পড়ত পুরো দেশ। এমন কী কাজ করত না ল্যাণ্ড ফোন। টিভি নেই, রেডিয়ো নেই, ইন্টারনেট নেই। পুবের কোনও এয়ারপোর্টে নামতে পারত না একটাও বিমান। হঠাৎ করেই যেন পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যেত নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন। যে-কেউ ভাবত, আমেরিকার ওপর নিউক্লিয়ার হামলা করেছে কোনও সুপারপাওয়ার।

সন্দেহের বশে অন্য দেশের ওপর নিউক্লিয়ার বোমা হামলা করত ওয়েস্টার্ন কমাণ্ড।

হ্যাঁ, কপাল ভাল, ওই বিচ্ছুরণ হয়েছে সভ্যতা থেকে বহু দূরে। তবে ওটার কারণে মনোভাব পাল্টে গেছে প্রেসিডেন্টের। বারবার সিআইএ চিফ ক্যালার কথা শুনে এখন তাঁরও মনে হচ্ছে, ভয়ঙ্কর স্ফটিক সত্যিই তাদের জন্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক। যারা এসব নিয়ে গবেষণা করছে, তারাও জানে না এরপর কী ঘটাবে ওটা। কাজেই এ ধরনের এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যাওয়া বোকার কাজ।

গত কিছু দিন হলো পুরনো বন্ধু জেমস ব্রায়ানের দিকে ঝুঁকে তাকে সহায়তা করেছেন, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে: কী ধরনের বিপদ আসছে, তা বুঝতে পারছে না সে।

মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বললেন জয়েন্ট চিফ, দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে অনুরোধ করছি, আমরা যেন তৈরি রাখি আমাদের মিলিটারিকে। তাই বলব, আপনার বোধহয় ঘোষণা করা উচিত ডিফেন্স কণ্ডিশন টু।

টু? থমকে গেলেন প্রেসিডেন্ট।

জী, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। রাশা ও চিনের যুদ্ধাবস্থার কারণে এটা ঘোষণা করা এখন জরুরি।  

প্রেসিডেন্টের মনে পড়ল জেমস ব্রায়ানের কথা: একটা বাড়াবাড়ি তৈরি করে অন্যের বাড়াবাড়ি। ঠিকই বলেছে এনআরআই চিফ। তবে নিজে ভুলে গেছে, তার কারণেই আজ এই বিপদ।

ব্রিফিং ফোল্ডারের ছবি দেখলেন প্রেসিডেন্ট।

ফিউয়েল ভরা হচ্ছে রাশান আইসিবিএম-এর বুকে। এটা করা হচ্ছে পুরো দশ বছর পর।

হাতের তালু ঘামছে প্রেসিডেন্টের। একটু আগেও ভেবেছেন, সামলে নেবেন সব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, হাতের বাইরে চলে গেছে পরিস্থিতি। আরও একটা চিন্তা এল তাঁর মনে: পুরনো বন্ধু জেমস ব্রায়ান আর আমেরিকার জনগণকে একইসময়ে নিরাপদে রাখতে পারবেন না।

মিস্টার প্রেসিডেন্ট… জরুরি হয়ে উঠেছে আপনার নির্দেশ।

ফোল্ডার বন্ধ করে মুখ তুললেন প্রেসিডেন্ট। না। ডেফকন থ্রি ঘোষণা করুন। নিরাপত্তার জন্যে সবই করুন, কিন্তু আগেই যেন সাগরে না যায় আমাদের রণতরী। সতর্ক থাকুক বোমারু বিমানের পাইলট ও ক্রুরা। তৈরি রাখা হোক আইসিবিএম। কিন্তু রাশা বা চিনকে কোনওভাবেই ভয় দেখাবেন না। নইলে চাকরি থাকবে না আপনাদের। আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?

এতই গম্ভীর কণ্ঠে বলেছেন প্রেসিডেন্ট, একেবারে থমকে গেছে ঘরের সবাই। এরপর উত্তেজিত হয়ে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করবে না কেউ প্রেসিডেন্টকে।

জী, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বললেন জেসিএস।

চেয়ার ছাড়লেন প্রেসিডেন্ট।

 সবার মনোযোগ চলে এল তার ওপর।

প্রতি দুঘণ্টা পর পর আপডেট চাই। সিআইএ চিফ ক্যালাগুর দিকে তাকালেন প্রেসিডেন্ট। আপনি আমার সঙ্গে আসুন।

দৃঢ় পায়ে সিচুয়েশন রুম থেকে করিডোরে বেরিয়ে এলেন। তিনি। রাগে থমথম করছে চেহারা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যারা অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্যে, সবাই সরে গেল দেয়ালের কাছে। এখন সময় নয় আবদার করার।

প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে পিছু নিয়েছেন সিআইএ চিফ ক্যালাগু। হোয়াইট হাউসের এলিভেটরের দিকে চলেছেন প্রেসিডেন্ট। তাঁকে মাঝ করিডোরে ধরলেন তিনি।

ব্রায়ানের ব্যাপারে কী বুঝলেন? ধমকের সুরে জানতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট।

থমকে গিয়ে দ্বিধা করলেন ক্যালাগু। কয়েক সেকেণ্ড পর কথা গুছিয়ে নিয়ে বললেন, যা খুশি তা-ই করতে চান তিনি। শেষ কথা: বিচার মানি, কিন্তু তালগাছ আমার।

ব্রায়ান অমন লোক নন, ভাল করেই জানেন প্রেসিডেন্ট। যুক্তি না থাকলে এত ঝুঁকি নিতেন না তিনি। আরও কিছু আছে এসবের ভেতর।

করিডোরে বাঁক নিয়ে পরের প্রশ্ন ছুঁড়লেন প্রেসিডেন্ট ব্রায়ান কী ধরনের তথ্য গোপন করছেন?

দূরে চোখ রাখলেন সিআইএ চিফ। ভঙ্গি নিয়েছেন, তিনি ভাবছেন। কয়েক সেকেণ্ড পর বললেন, প্রথম দিন থেকেই এনআরআই-এর বিপক্ষে ছিলাম। ব্রায়ান চিফ হওয়ার পর বিরক্তি বেড়েছে আরও। তিনি মনে করেন, মাঝখান থেকে এসে নাক গলাতে চাইছি। কিন্তু…

কিন্তু কী?

কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে, যা করছি, সবই দেশের জন্যে। এনআরআই থেকে সমস্ত ডেটা নিয়েছি আমরা। সেসবের ভেতর কোনও ত্রুটি থাকলে অবশ্যই তা চোখে পড়বে আমাদের। ব্রায়ান গোপন কিছু করে থাকলে, তা হয়তো রাখেননি ডেটার মাঝে।

একমত হলেন না প্রেসিডেন্ট। তবে অযৌক্তিক কিছু কাজ করেছেন ব্রায়ান। ছোট একটি দল পাঠিয়ে দিয়েছেন মেক্সিকোয়। পরে সাহায্য চেয়েছেন বাংলাদেশের এক লোকের কাছে। এসব দায়িত্ববান, দেশপ্রেমিক ব্রায়ানের চরিত্রের সঙ্গে ঠিক মেলে না।

এলিভেটর থেকে ত্রিশ ফুট আগে থামলেন প্রেসিডেন্ট। অপেক্ষা করছে সিক্রেট সার্ভিসের গার্ড।

আপনার কি মনে হয় ব্রায়ানের কাজ যৌক্তিক? জানতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট।

সবুজ সিগনাল পেয়ে গেছেন সিআইএ চিফ। অবশ্য নালিশ না করে নরম সুরে বললেন, আপনি যদি জানতেই চান, মিস্টার প্রেসিডেন্ট… চুপ হয়ে গেলেন তিনি।

পেটের সব নোংরা প্যাঁচ মারবে এবার ক্যালাগু।

বন্ধু ব্রায়ানের ওপর রেগে গেলেন প্রেসিডেন্ট। তার কারণেই আজ এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে!

আমি চাই আপনি আবারও ফিরবেন ইয়াকায়, বললেন তিনি, ব্যক্তিগতভাবে চোখ রাখবেন ব্রায়ানের ওপর।

মিস্টার প্রেসিডেন্ট…

অনেক জড়িয়ে গেছে ব্রায়ান, চাইলেও তাকে সরিয়ে দেয়া কঠিন। অন্যদের চেয়ে বেশি জানে ব্রাযিল স্টোন সম্পর্কে। আমার মনে হচ্ছে, শেষপর্যন্ত ওই জিনিস ধ্বংস করে দেয়াই ভাল। তবে তাতে আপত্তি থাকতে পারে ব্রায়ানের, সরিয়ে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে তাকে ঠেকাবেন আপনি। কয়েক সেকেণ্ড ভেবে আবারও বললেন তিনি, প্রয়োজনে চরম সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করবেন না।

.

৩৭.

 আকাশ থেকে নিচের জঙ্গলের মাঝে নদী ও লেক দেখছে রানা। একটু পর পর বাঁক নিয়েছে সরু নদী, ওখানে প্লেন নামানো অসম্ভব। এদিকে বর্ষা মৌসুম শুরু হয়নি বলে অগভীর ছোট সব লেকে নামা আরও বিপজ্জনক। কিন্তু ফুরিয়ে এসেছে তেল, ঝুঁকি না নিয়ে কোন উপায়ও নেই।

পুরো সাত মিনিট নদী অনুসরণ করল রানা। না, আশপাশে বড় কোনও লেক নেই। মাত্র পাঁচ মিনিট পর শেষ হবে তেল। বিমান ঘুরিয়ে আগে-দেখা বৃত্তাকার এক লেকের দিকে চলল রানা।

কিছুক্ষণ পর বিমান নিয়ে নেমে এল অনেক নিচে।

একটু গেলেই সামনে সরু কিন্তু অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ এক লেক। কিন্তু পাশ থেকে আসবে জোরালো হাওয়া। বিপদ হতে পারে।

ওটা বাদ দিয়ে বৃত্তাকার লেকের দিকেই চলল রানা। জ্বেলে নিল ল্যাণ্ডিং বাতি। গাছের সারি প্রায় ছুঁয়ে পৌঁছল লেকের কাছে। অগভীর জলে পচা গাছের কাণ্ড ভাসছে দেখে গলা শুকিয়ে গেল ওর। ভাল দিক হচ্ছে, পেছন থেকে আসছে। হাওয়া।

লেক পেরিয়ে আবারও ঘুরল রানা। ইন্টারকমে জানাল, সিটবেল্ট বেঁধে নাও। আবারও কো-পাইলটের সিটে এসে বসেছে মিতা। ওর সিটবেল্ট পরীক্ষা করল রানা। ওদিকে পাবলোকে পাশে নিয়ে চোখ বুজে আছেন প্রফেসর, গলা থেকে বেরোচ্ছে জ্বরাক্রান্ত রোগীর মত কো-কে আওয়াজ।

ইঞ্জিনের গতি কমিয়ে ফ্ল্যাপ আরও খুলল রানা। বিমানের নাক উঁচু রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

আরেকবার ঘুরে দেখলে ভাল হতো না? জানতে চাইল মিতা। তেল আছে?

মাত্র দুমিনিটের, বলল রানা।

 কিন্তু লেকে গাছ থাকলে? আমরা তো খুন হব!

একই কথা ভেবেছে রানা। কিন্তু এ-ও জানে, মেক্সিকোর দুর্ভেদ্য নরকের মত কারাগারে বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়ার চেয়ে জঙ্গলের মাঝের লেকে লাশ হওয়া ঢের আনন্দের ব্যাপার।

পাইলটদের পুরনো একটা বাণী শুনবে? বলল রানা। রাতে ইমার্জেন্সি ল্যাণ্ডিঙের সময় এক শ ফুট ওপরে জ্বেলে নেবে ল্যাণ্ডিং বাতি। যা দেখবে, ওটা অপছন্দনীয় হলে নিভিয়ে দেবে সেটা। তারপর স্রষ্টা বা শয়তানের কাছে প্রার্থনা করবে। তাই, মিতা, তুমি এখন ভগবানের কথা ভাবতে পারো।

বিড়বিড় করে প্রার্থনা শুরু করেছে মিতা। রাগী চোখে একবার দেখল রানাকে।

নির্বিকার চেহারায় কী সব সুইচ দেখছে বাঙালী গুপ্তচর।

ঝাঁকি খেয়ে নামছে বিমান। দুলছে এদিক-ওদিক।

সামনে থ্রটল ঠেলে দিল রানা। গাছের সারির ওপর পড়ল বিমানের ল্যাণ্ডিং বাতি। 

মিতার মনে হলো হাজারটা ডাল ছুটে আসছে ওর দিকে! ভীষণ ভয়ে চিৎকার করে উঠল ও, রানা!

একটা গাছের মগডাল ভেঙে এগোল বিমান। পরক্ষণে বিশাল এক ঝপাস্ শব্দে নামল লেকের জলে। দ্রুত কমছে বেগ। সামনে ছিটকে যেতে চাইল ওদের দেহ, কিন্তু টানটান হয়ে বাধা দিল সিটবেল্ট।

লেকের জল ছেড়ে ওপরে উঠল বিমান। ধুপ করে আবারও নামল নিচে। কালো কাঁচের মত জল ছলকে চলেছে দূরে।

শক্ত হয়ে বোসো, বলল রানা।

 কেন? আমরা তো নেমে গেছি! কাঁপা গলায় বলল মিতা।

একবার ওকে দেখল রানা, তারপর কথাটা পাড়ল, সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কোনও ব্রেক নেই।

নেই? উইণ্ডশিল্ড দিয়ে সামনে তাকাল মিতা।

একই কাজ করছে রানা। ঝড়ের বেগে আসছে লেকের তীর!

বেগ কমছে বটে, কিন্তু তীরে গিয়ে তো দেবে বিমান!

কয়েক সেকেণ্ড পর ধুম্ শব্দে তীরে ধাক্কা মারল বিমান। হুড়মুড় করে উঠে এল জঙ্গলের ভেতর। থামল সরু কয়েকটা গাছ ভেঙে।

সোজা হয়ে বসে রানাকে দেখল মিতা। ব্রেক নেই? এটা জেনেও এমন বিমান নেয় কোনও পাগল?

নিয়েছি, যাতে নামতে পারি লেকে, বলল রানা, তুমি জানতে না, এসব বিমানে ব্রেক থাকে না?

ও! বড় করে দম ফেলল মিতা। না, জানতাম না। এবার এই খাঁচা থেকে বেরোতে চাই!

ওর হাতে ফ্ল্যাশলাইট ধরিয়ে দিল রানা। সিটবেল্ট খুলে ককপিটে চলে এল পাবলো। দরজা খুলে নেমে পড়ল রানা। ঢালু জমিতে ওর পিছু নিল অন্যরা।

পাশে পৌঁছে রানার কাঁধ চাপড়ে দিলেন হ্যারিসন। ভীষণ ভয় পেয়েছি। তবে একেবারে মেরে ফেলোনি, এজন্যে থ্যাঙ্ক ইউ। আর কখনও তোমার বিমানে বা হেলিকপ্টারে জীবনেও উঠব না!

রানা ভাবছে, বিমান তো গেল, কিন্তু ওটার ব্যাটারি আর রেডিও পরে কাজে আসবে।

জঙ্গলে ফ্যাকাসে সাদা আলো ফেলেছে নক্ষত্র ও চাঁদ। রানা টের পেল, যা ভেবেছিল, তার চেয়েও ছোট ছিল বৃত্তাকার লেক। চওড়ায় ও দৈর্ঘ্যে বড়জোর সাত শ ফুট। তীরে পঞ্চাশ ফুটি গাছের সারি। খারাপ ল্যাণ্ডিং হয়নি। কিন্তু তাতে খুশি হওয়ার কিছু নেই। দূরে কাঁপা কাঁপা আলো। তারপর এল ফ্ল্যাশলাইটের উজ্জ্বল রশ্মি। বেশ কয়েকটা কমলা আগুনও জ্বলছে মশালের আগায়।

জঙ্গলের মাঝ দিয়ে আসছে একদল লোক। জেনে গেছে, লেকে নেমেছে বিমান। তারা শত্রু না বন্ধু বোঝা যাবে একটু পর।

থেমে দাঁড়াল রানা। অপেক্ষা করো, ওরা আসুক।

ওরা কারা? জানতে চাইল মিতা।

মায়ানদের উত্তরসূরী, বলল রানা, তবে আমাদেরকে সাহায্য করবে না ক্ষতি করবে, সেটাই দেখার বিষয়।

জঙ্গলের মাঝে ওরা পেল পোড়া কাঠের ধোঁয়ার গন্ধ।

কাছে চলে এসেছে লোকগুলো।

পাবলোর কাঁধে হাত রাখল মিতা। আমাদের উচিত নয় পালিয়ে যাওয়া? জানতে চাইল রানার কাছে।

সম্ভব নয়, বলল রানা। আমরা এই এলাকা চিনি না। ফ্ল্যাশলাইট জ্বালল ও। আলো নেড়ে দেখাল ওরা কোথায় আছে।

দিক বদল করে এদিকে এল মশাল ও ফ্ল্যাশলাইটের আলো।

কাছেই বোধহয় ছোট শহর আছে, বললেন প্রফেসর, কপাল ভাল হলে এখানকার লোক বলতে পারবে, জঙ্গলের ভেতর কোথায় আছে প্রাচীন মায়ান স্থাপত্য।

একই কথা ভেবেছে রানা।

খুব কাছে পৌঁছে গেল আলো। নেমে আসছে টিলার গা বেয়ে। একটু পর ঝোপঝাড় ছেড়ে বেরিয়ে এল অন্তত বিশজন লোক। কয়েকজনের হাতে শক্তিশালী ফ্ল্যাশলাইট।

আলো ফেলতেই চোখ ঢাকল মিতা।

স্প্যানিশ ভাষায় জানতে চাইল রানা, আপনারা কি সাহায্য করতে পারবেন? আমরা বিপদে পড়েছি।

জবাব দিল কর্কশ স্বরের এক লোক, পংগো লস ম্যানোস!

নির্দেশমত মাথার ওপর হাত তুলল রানা। ওর দেখাদেখি অন্যরা। কিছু বলতে হয়নি, কড়াৎ-কড়াৎ কয়েকটা শব্দে বুঝে গেছে, কককরা হয়েছে কয়েকটা পাম্প শটগান।

ঘিরে ফেলা হলো রানা, হ্যারিসন, মিতা ও পাবলোকে। সবার ওপর তাক করা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র।

বয়স্ক এক লোককে দলের নেতা মনে হলো রানার।

দৈর্ঘ্যে খাটো সে। বুক ভরা দাড়ি। গোঁফটা কাঠবিড়ালির লেজের মত বড় ও ফোলা। একহাতে ফ্ল্যাশলাইট, অন্যহাতে পিস্তল।

সার্চ করতে রানাদের বিমানে উঠল এক লোক। আরেকজন কেড়ে নিল মিতা ও হ্যারিসনের ব্যাকপ্যাক। ভালভাবে ওদের দেহ তল্লাশী করল তৃতীয় লোকটা। রানার কাছে ওয়ালথার পেয়ে সরিয়ে ফেলল।

রানাদের ঘিরে পায়চারি শুরু করেছে দাড়িওয়ালা। তবে দূরত্ব রেখেছে। হামলা করে তাকে জিম্মি করবে রানা, সে উপায় নেই। সবার পর পাবলোর ওপর মনোযোগ দিল সে। কিছুক্ষণ পর কোমরে গুঁজে রাখল পিস্তল।

সেনোর, সেনোরা, আপনারা এখানে কী চান?

বিমান ক্র্যাশ করেছে, রানা কিছু বলার আগেই তৈরি জবাব দিল মিতা। আমার স্বামী যাচ্ছিলেন পুয়ের্তো ভ্যালার্তায়, কিন্তু বেসামাল করে দিল দমকা বাতাস। তার ওপর ট্যাঙ্ক ফুটো হয়ে পড়ে গেল সব তেল।

কাছে সরে মিতাকে দেখল বয়স্ক লোকটা। তার চোখ পড়ল ওর হাতে। এই যুবক যদি স্বামীই হবে, তো কোথায় আপনার আঙটি? মিতা কিছু বলার আগেই জানাল, অনেকক্ষণ চক্কর কেটেছেন আকাশে। উপকূলে চলে যেতে পারতেন। কাজেই বুঝতে পারছি, আপনার পেটে অন্য গল্প আছে। তো সেটা কী?

ধরা পড়ে লজ্জায় লাল হলো মিতা।

রানার দিকে ফিরল গোঁফওয়ালা। কিন্তু সে মুখ খোলার আগেই বিমানের পেট থেকে জানাল একজন, ভেতরে কেউ নেই। মালপত্রও নেই।

ব্যাকপ্যাক খুলে ফেলেছে আরেকজন। দাড়িওয়ালার হাতে দিল কাঁচের মত স্ফটিক ও স্যাটেলাইট ফোন।

কাছে স্ফটিক দেখে ছুটে যেতে চাইল পাবলো। শক্ত হাতে ওকে ধরে রাখল মিতা।

পাবলোর প্রতিক্রিয়া খেয়াল করেছে বয়স্ক লোকটা। আপনার ছেলে? জানতে চাইল।

পালক, বলল মিতা। ওর শারীরিক সমস্যা আছে। এখানে জঙ্গলের ভেতর আমাদেরকে আটকে রাখবেন না।

এক তরুণের হাতে স্ফটিক দিল লোকটা। পুরো সময়ে ড্যাবড্যাব করে ওটাকে দেখল পাবলো। সীসা দিয়ে মজবুত করা বাক্সে রেখে দেয়া হলো স্ফটিক।

নানান মিথ্যা বলছেন, বলল গোঁফওয়ালা, যাজকের কাছে আপনাদের স্বীকারোক্তি করা উচিত। তাতে পাপ মোচন হবে। ঘুরে টিলার দিকে পা বাড়াল সে, এদেরকে নিয়ে এসো!

.

৩৮.

 প্রায়ান্ধকার বার-এ বসে আছে ইগোর দিমিতভ। টেবিলে তিনটে গ্লাসে কম পয়সার তিন পেগ ভোদকা। পাশের চেয়ারে বসেছে স্থানীয় এফএসবি ইউনিটের নেতা।

বেয়াড়া যুবককে পছন্দ হয়নি ইগোর দিমিতভের। নেতা হওয়ার যোগ্যতা নেই এর। ইগোর বুঝে গেছে, এদেরকে রাখা হয়েছে ওকে পাহারা দেয়ার জন্যে। প্রশ্ন করলে বা নির্দেশ দিলে জবাব দেবে বা আদেশ পালন করবে, কিন্তু চোখে-মুখে অন্যকিছু। তাদের সত্যিকারের প্রভু রয়ে গেছে মস্কোয় এফএসবি অফিসে।

ভোদকা নেব তোমার জন্যে? বলল ইগোর দিমিতভ।

আমি ড্রিঙ্ক করি না, বলল যুবক।

কাঁধ, ঝাঁকাল ইগোর। করলেই ভাল করতে, খুব বিরক্ত দেখাচ্ছে তোমাকে।

লাশ ফেলে চলে আসা ঠিক হয়নি, বলল এফএসবি ইউনিট দলনেতা।

এ ছাড়া উপায় ছিল না, বলল ইগোর।

পিছু নেয়া উচিত ছিল, জোর দিয়ে বলল যুবক।

এক পেগ ভোদকা শেষ করে আরেকটা গ্লাস নিল ইগোর। কুঁচকে উঠেছে ভুরু। টুরিস্ট ভরা ব্যস্ত সৈকতে অস্ত্র হাতে ধাওয়া করতে? তোমার ধারণা আছে, কয়েক মিনিট পরেই পৌঁছত মেক্সিকান পুলিশ? মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটে হাজির হতো হেলিকপ্টার আর অন্তত দশটা পুলিশের গাড়ি। পালাতে কীভাবে? কাজ এগোত তাতে? আমাদের প্রথম দায়িত্ব পাবলোকে দেশে ফিরিয়ে নেয়া।

যুবক রেগে গেলেও সামলে রাখল নিজেকে। কিছুক্ষণ পর বলল, আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে: আপনি আসলে ওকে ধরতে চান কি না।

বিরক্তি চেপে হাসল ইগোর দিমিতভ। অনেক কিছুই ভাবতে পারো।

উঠে দাঁড়াল এফএসবি ইউনিট দলনেতা। আগামীকাল রওনা হব। পরেরবার আপনার কথামত সময় নষ্ট করব না, সেটা মাথায় রাখবেন।

বার ছেড়ে বেরিয়ে গেল যুবক।

এর বয়স কম, ভাবল দিমিতভ। ওজন ওর চেয়ে ত্রিশ পাউণ্ড বেশি। শক্তিশালী। পুরনো এজেন্টের প্রতি সম্মান নেই মনে।

দিমিতভের মনে পড়ল, কীভাবে বদলে গেছে সব। একসময় ও-ই ছিল সত্যিকারের হিরো, এজেন্টদের মাঝে সবচেয়ে প্রতিভাবান। এফএসবি ছেড়ে দেয়ার পরেও নানান কাজে ডাকা হতো। আর আজ পাঠানো হয়েছে বাচ্চা এক ছেলেকে কিডন্যাপ বা খুন করতে!

এই অপমান রাখবে কোথায়?

এফএসবির কাজ না করলে খুন হবে ও। বাদ পড়বে না আত্মীয়স্বজন। এখন আর সম্মান বলতে কিছুই নেই ওর। কোনও দাম নেই।

আরেক পেগ ভোদকা গলায় ঢালল দিমিতভ। জমে উঠছে নেশা। হ্যাঁ, কিছু করতে হবে, নইলে খুন হবে অর্ধেক বয়সের সব এজেন্টের হাতে!

.

৩৯.

 রানা, মিতা, হ্যারিসন ও পাবলোকে বন্দি করে ঘন ঝোপঝাড় ও জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চলেছে সশস্ত্র লোকগুলো।

অনেকক্ষণ পর হালকা হলো অরণ্য। পাহাড়ি উঁচু এলাকা ছেড়ে নেমে এসেছে ওরা।

পুবাকাশ ফর্সা হয়ে একটু পর উঁকি দিল লাল সূর্য।

দুমাইল হাঁটার পর সামনে পড়ল খেলার মাঠ, অগভীর কাঁটা ঝোপঝাড়, সবুজ ফসলের জমি ও ঘাসে ঢাকা চারণভূমি।

একটু পর ওরা পৌঁছুল ছোট এক শহরে।

সাদা সব স্টাকো করা দালান। জেগে গেছে শহরবাসীরা। কাঁচা রাস্তায় খেলছে বাচ্চারা। গেট আটকে রাখা উঠানে গরু ছাগল। মুক্তি পেয়ে গেছে মোরগ-মুরগি। ছোট সব পোকা খুঁজে নিয়ে সাবড়ে চলেছে খুশি মনে।

হিসাবে ভুল হয়নি, ভাবছে রানা। এটা সন্ত্রাসী দলের আস্তানা নয়। অবশ্য অস্ত্রের মুখে ওদেরকে নেয়া হচ্ছে প্রধান সড়ক ধরে। বন্দিদের দেখে সব ফেলে থমকে গেছে শহরবাসীরা। কয়েক সেকেণ্ড পর এগিয়ে এল অনেকেই।

দলের সামনে হাঁটছে দাড়িওয়ালা বয়স্ক লোকটা। সাধারণ পোশাকের সুন্দরী এক যুবতী আসতেই হাতের ইশারায় সবাইকে থামতে বলল সে। মহিলা শুভ সকাল বলার পর নিচু স্বরে আলাপ শুরু হলো দুজনের।

আড় চোখে মিতা ও পাবলোকে দেখল মেয়েটা।

এরা নিচু স্বরে কী বলছে, কিছুই জানা নেই, আরও শক্ত হাতে পাবলোর হাত ধরল মিতা। প্রাণ থাকতে ছেলেটাকে কেড়ে নিতে দেবে না।

ভাববেন না, আশ্বাসের সুরে বলল দাড়িওয়ালা। আপাতত ওর দায়িত্ব নেবে লিনিয়া। এদিকে আলাপ করব আমরা।

মিতার মনে হলো নরম মনের মানুষ মহিলা। হাত তুলে একটু দূরের ছোট্ট এক বাড়ি দেখাল সে। কয়েক সেকেণ্ড দ্বিধা করে পাবলোকে ছাড়ল মিতা।

আবারও এগোতে ইশারা করল বয়স্ক লোকটা।

দুতিনটা বাড়ি পেরোবার পর সাদা এক বাড়ির উঠানে ঢুকল ওরা। রানা, মিতা ও হ্যারিসন বুঝল, এই দালান আসলে গির্জা। দরজায় লেখা, এই চার্চ স্যান ইগন্যাসিয়োর নামে উৎসর্গকৃত। উনি ছিলেন ক্যাথোলিক যোদ্ধাদের জেসুইট সন্ত।

দালানে ঢোকার পর পেছনে বন্ধ করে দেয়া হলো দরজা।

বেদির সামনে থেমে নতজানু হয়ে ক্রুশ আঁকলেন বয়স্ক লোকটা, নিজের গায়ে ছিটিয়ে দিলেন শ্লোক পড়া পবিত্র জল। এবার খুলে দেয়ালের পেরেকে ঝুলিয়ে রাখলেন পঞ্চো, তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন।

পরনের কালো আলখেল্লা ও সাদা গলাবন্ধ বলে দিল, তিনি একজন ক্যাথোলিক যাজক। ভারী গলায় বললেন, শুভ আগমন স্যান ইগন্যাসিয়োয়। আমি ফাদার ভাসকুয়েজ।

আপনি ফাদার… বিড়বিড় করল মিতা। মন দমে গেছে।

মৃদু হাসলেন ফাদার ভাসকুয়েজ। একগাদা মিথ্যা বলে এখন বুঝি মন খারাপ লাগছে?

রেগে গেছে মিতা। জানতে চাইল, বলুন তো, ফাদার, ঠিক কবে থেকে অস্ত্রের মুখে মানুষকে কিডন্যাপ করছে এই চার্চ?

ওর পাশেই টলে পড়ে যেতে গেলেন প্রফেসর হ্যারিসন, তবে চট করে তাকে ধরে ফেলল রানা। পাশের সরু এক বেঞ্চিতে শুইয়ে দিল। সতর্ক চোখে ওকে দেখলেন ফাদার ভাসকুয়েজ। আবার চোখ ফেরালেন মিতার চোখে। আমি যা করেছি, সেটা এই শহরের মানুষের নিরাপত্তার জন্যে।

কড়া কথা বলার জন্যে মুখ হাঁ করল মিতা, কিন্তু আগেই বলে উঠল রানা, ফাদার, যদি আপনার কাছে সাহায্য চাই, তা কি পাব?

নির্ভর করবে কী চাইবেন, তার ওপর। আমরা নিজেরা কোনও বিপদের ভেতর পড়তে চাই না।

আপনাদের বিপদটা কোথা থেকে আসবে? জানতে চাইল রানা।

ড্রাগ স্মাগলারদের তরফ থেকে।

আমরা তাদের দলের লোক নই, বলল রানা।

এখন তাই মনে হচ্ছে, বললেন ফাদার, কিন্তু আগে বোঝার উপায় ছিল না। কয়েক বছর আগে একদল লোক এসে টাকা সাধল আমাদেরকে। শুনল না কোনও কথা। গাছ কেটে তৈরি করল মাটির রানওয়ে। কেড়ে নিল আমাদের জমি। চাষ করতে লাগল ড্রাগসের গাছ।

যারা তাদের টাকা নিয়েছিল, তারাও ফেরত দিতে চাইল। কিন্তু তত দিনে দানব হয়ে উঠেছে ড্রাগ লর্ড। মেরে ফেলল কয়েকজন সাধারণ নাগরিককে। কিন্তু এই শহরের মানুষের মন। মরে যায়নি। যুদ্ধ ঘোষণা করলাম আমরা। কাজটা খুব কঠিন ছিল। লড়তে গিয়ে মারাও গেল বেশ কয়েকজন। তবে শেষপর্যন্ত তাড়িয়ে দিতে পারলাম দলবলসহ ড্রাগ লর্ডকে। আসলে একবার ঘরে বাঘ ঢুকতে দিলে ওটাকে বিদায় করা খুব কঠিন। শপথ নিলাম আমরা, আর কখনও এ এলাকায় ঢুকতে দেব না ড্রাগ লর্ডের লোকদেরকে।

জানালা দিয়ে নীল আকাশ দেখালেন ফাদার ভাসকুয়েজ। গভীর রাতে শহরের ওপর ঘুরছিল বিমান। তারপর নেমে পড়ল দূরের লেকে। ওদিকেই ছিল আমাদের কয়েকজন কাঠুরে। তাদের ফোন পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ করলাম আমরা। নিশ্চিত ছিলাম না আপনারা কারা। হয়তো জানেন না, মহান সন্ত ইগন্যাসিয়েও যাজক হওয়ার আগে সৈনিক ছিলেন। আমাদের উচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা। আমরা তাই করেছি।

চুপ করে আছে রানা। আগেও দেখেছে দুর্গম এলাকায় মানুষের ওপর কত অত্যাচার করে ড্রাগ লর্ডরা।

লজ্জা পেয়েছে মিতা, ভেবেছিল একদল ডাকাতের হাতে ধরা পড়েছে। আপনার কথা বুঝতে পেরেছি, বলল ও।

তোমার দিকটাও বুঝেছি, বললেন ফাদার, মিথ্যা না বলে উপায় ছিল না। কিন্তু বুঝলাম না, এসেছ কী জন্যে। একটু খুলে বলবে? আমরা হয়তো সাহায্য করতে পারব তোমাদেরকে।

আপনি কি বিশ্বাস করবেন আমাদের কথা? বলল মিতা।

বলেই দেখো না। বিশ্বাস নিয়েই তো আমার কারবার।

আমরা খুঁজছি প্রাচীন এক মায়ান ধ্বংসাবশেষ। নাম ছিল পাহাড়ি জাগুয়ার রাজার মন্দির। আমাদের ধারণা, ওটা আছে এই শহরের কাছেই কোথাও।

হয়তো নেই, বললেন ফাদার ভাসকুয়েজ, এসব না খুঁজে নিজেদের দেশে ফিরলেই ভাল করবে।

পথ ছিল না ফেরার, বলল রানা, অন্যান্য কিছু কারণে শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়েই নেমেছি সবচেয়ে উপযুক্ত লেকে।

বুঝলাম, মাথা দোলালেন ফাদার, ওই মন্দিরের ব্যাপারে গোপন রাখতে চান সব।

তার উপযুক্ত কারণ আছে, ফাদার, বলল রানা।

হয়তো তাই, বললেন ভাসকুয়েজ, এমন জিনিস এনেছেন, যেটা বোঝেন না। খুঁজছেন অমন আরও একই জিনিস। ভাবছেন, খারাপ কারও হাতে ওগুলো পড়লে সর্বনাশ হবে পৃথিবীর। আমি কি ঠিক বলেছি?

কয়েক সেকেণ্ড নিষ্পলক চোখে তাকাল রানা। তারপর মাথা দোলাল। ঠিকই বলেছেন।

জানলেন কীভাবে কী খুঁজছি? জানতে চাইল মিতা।

বোসো, ওকে বেঞ্চি দেখালেন ফাদার, সব বুঝতে হলে ফিরতে হবে কয়েক শ বছর আগের ইতিহাসের পাতায়।

.

৪০.

 দুর্গম ইয়াকা পাহাড়ের গভীর সুড়ঙ্গে চলছে তুমুল বিতর্ক। আসলে এনআরআই চিফ, সিআইএ চিফ বা বিজ্ঞানীরা কেউই জানেন না কীভাবে আসছে বিদ্যুৎ ওই মায়ান স্ফটিকের ভেতর। জিনিসটা যে অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাতে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

এ কারণেই টেলিকনফারেন্স হয়ে উঠেছে উত্তপ্ত। একের পর এক প্রশ্ন ছোঁড়া হচ্ছে এনআরআই চিফ ব্রায়ানের উদ্দেশে।

সমস্ত দায় চাপাতে চাইছেন সিআইএ চিফ ক্যালা তার ওপর।

ব্রায়ান বুঝে গেছেন, ওই স্ফটিক যে সত্যিই কাজের, তা বোঝতে না পারলে ধ্বংস করে দেয়া হবে ওটাকে।

সিআইএ চিফ হাঁফিয়ে যেতেই জানতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট, কোথা থেকে আসছে ওটার শক্তি? ওটা কি নিউক্লিয়ার? বা ওই ধরনের কোনও কিছুর ফিউশন হচ্ছে?

রেডিয়োঅ্যাকটিভ নয়, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বললেন ব্রায়ান, হচ্ছে না কোনও কোল্ড বা হট ফিউশন। আমরা এখনও বুঝিনি, কীভাবে তৈরি করছে শক্তি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এনার্জি সগ্রহ করছে কোথাও থেকে। জিনিসটা কটে (conduit)-এর মত।

ব্যাখ্যা করে বলল, বললেন প্রেসিডেন্ট।

ধরুন বাড়ির বৈদ্যুতিক তারের সকেটে গুঁজে দিলেন। আঙুল, সেক্ষেত্রে শক দেবে ওটা, বললেন ব্রায়ান, কিন্তু বৈদ্যুতিক তার বা সকেট সৃষ্টি করেনি ওই শক্তি। ওগুলো বড়জোর কণ্ডেট। ওই বিদ্যুৎ এসেছে আপনার বাড়ি থেকে বহু মাইল দূরের পাওয়ার স্টেশন থেকে। আমরা ভাবতে শুরু করেছি, স্ফটিকের ওই এনার্জি আসছে অচেনা কোনওখান থেকে।

সেই জায়গাটা কোথায়?

কথা বলতে হাঁ করেছিলেন এনআরআই চিফ, কিন্তু আগেই বলে উঠলেন সিআইএ চিফ ক্যালাগু, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, কখনও শুনেছেন জিওম্যাগনেটিক রিভার্সালের কথা?

সরে যাচ্ছে উত্তর মেরু?

মাথা দোলালেন ক্যালাগু। ফিরলেন তার বিজ্ঞানীর দিকে। প্রেসিডেন্টকে খুলে বলুন, হ্যাঁগার্ড।

চেয়ার ছেড়ে ল্যাব কোট ঝেড়ে নিয়ে দুবার কাশলেন নার্ভাস বিজ্ঞানী। আগে এত ক্ষমতাশালী কারও সামনে পড়েননি। গত এক শ মিলিয়ন বছর ধরে অন্তত বারোবার জায়গা ছেড়ে সরে গেছে দক্ষিণ ও উত্তর মেরু। শেষবার বড় পরিবর্তন এসেছে, সাত শ আশি হাজার বছর আগে। ওটাকে আমরা বলি ব্রানহেস-মাটুয়ামা রিভার্সাল। তবে এর আগে এমনই হয়েছে বিলিয়ন বছর ধরে। কখনও চল্লিশ বা পঞ্চাশ হাজার বছরের ভেতরেও সরে গেছে দুই মেরু। এরপর হয়তো স্থির থেকেছে পঞ্চাশ মিলিয়ন বছর। ওটাকে বলি আমরা সুপারক্রন। অবশ্য কোনও বিজ্ঞানী হিসেব কষে বলতে পারবেন না কখন সরবে মেরু।

সিআইএর বিজ্ঞানী কী বলতে চাইছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই এনআরআই চিফের। অপেক্ষা করলেন তিনি।

চশমা ঠিক করে নিলেন বিজ্ঞানী, দরদর করে ঘামছেন। গত কয়েক বছর ধরে ম্যাগনেটিক ফিল্ড বুঝতে গবেষণা করছেন এনওএএ ও অন্যান্য সংস্থার রিসার্চ স্পেশালিস্টরা…

বাধা দিলেন প্রেসিডেন্ট। আগ্রহী হওয়ার মত বিষয়। কিন্তু এসবের সঙ্গে কীসের সম্পর্ক ওই ব্রাযিল স্টোনের?

মস্ত ঢোক গিললেন সিআইএর বিজ্ঞানী। আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। কমপিউটারের কি বোর্ডে টোকা দিলেন। ল্যাবের ফ্ল্যাট স্ক্রিনে দেখা গেল গ্রাফ।

হোয়াইট হাউসের আরেকটি স্ক্রিনে ওই একই দৃশ্য দেখলেন প্রেসিডেন্ট।

গ্রাফের নিচে লেখা: আঠারো শ সত্তর সাল।

সিআইএর বিজ্ঞানী ব্যাখ্যা দেবেন, চিন্তায় পড়ে গেলেন ব্রায়ান। কী বলতে চাইছে এই লোক?

আঠারো শতাব্দী থেকেই মেপে বের করা হচ্ছে উত্তর মেরুর ফিল্ড স্ট্রেংথ ও পযিশন, বললেন বিজ্ঞানী, এই গ্রাফে দেখানো হয়েছে মেরু সরে যাওয়ার বিস্তার।

চার্টের নির্দিষ্ট অংশে লাল রেখা দেখালেন। এখান থেকেই শুরু হয়েছে দ্রুত সরে যাওয়া। শুরু হয়ে গিয়েছিল আঠারো শ সত্তর সালের আগেই। তা চরম কোনও কারণে বেড়ে ওঠে উনিশ শ আট সালে।

পয়েন্টার দিয়ে লাল রেখা দেখালেন। এরপর ধীর হয়েছে সরে যাওয়া। গত এক শতাব্দী ধরেই প্রতি বছর সাত থেকে আট মাইল দক্ষিণে সরছে উত্তর মেরু। কিন্তু গত কয়েক বছর হলো গতি বেড়ে হয়েছে বছরে বিশ মাইল।

কমপিউটারের মনিটরে ক্লিক দিতেই এল অন্য গ্রাফ। দেখা গেল গত তিন হাজার বছরের তৈরি ফিল্ড স্ট্রেংথ।

দেখছেন কীভাবে হাই-পয়েন্ট থেকে দুহাজার বছর আগে কমে গেছে ফিল্ড স্ট্রেংথ? কিন্তু গত বছর চূড়া থেকে নেমে পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড কমে গেছে পঁয়ত্রিশ পার্সেন্ট। উনিশ শ আট সালের পর থেকে অর্ধেক হয়েছে ম্যাগনেটিক ফিল্ড।

উনিশ শ আট সাল ঘুরছে ব্রায়ানের মগজে। কিন্তু যথেষ্ট তথ্য নেই যে কিছু বলবেন।

এবার স্ক্রিনে দেখা দিল আঁকাবাঁকা রেখা।

টাইম ফ্রেম বর্তমানের।

দেখুন গত তিন বছরের ফিল্ড স্ট্রেংথ।

চেয়ে রইলেন ব্রায়ান। দুবার পতন হয়েছে গ্রাফে। ওপরে উঠেছে দুবার। চট করে এনআরআই চিফ বুঝলেন, কী বোঝাতে চাইছে সিআইএর বিজ্ঞানী।

ব্রাযিল স্টোন এ দেশে আনার সময় গ্রাফে উঠেছে রেখা দুবার। আবার পতন হয়েছে দুবার। শেষের আগেরটা গত নভেম্বরের আর্কটিক সাগরের বিচ্ছুরণ। এরপর চার্টের শেষাংশে আরেকটা। তখন মেক্সিকো সাগরের মন্দির থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল দ্বিতীয় স্ফটিক। তাতে হঠাৎ করে কমে গেছে পঞ্চাশভাগ ম্যাগনেটিক ফিল্ড। গত পঞ্চাশ হাজার বছরের ভেতর ঘটেনি এমন কাণ্ড।

ডেটায় ভুল না থাকলে ম্যাগনেটিক ফিল্ডের দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এসব স্ফটিকের, ভাবলেন ব্রায়ান।

প্রেসিডেন্ট খেয়াল করেছেন তা নিশ্চিত হতে বললেন। সিআইএর বিজ্ঞানী হ্যাঁগার্ড, দেখেছেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, কীভাবে কমে গেছে ফিল্ড স্ট্রেংথ? আমরা ধারণা করছিঃ এনআরআই ব্রাযিল ও মেক্সিকো থেকে স্ফটিক সরিয়ে নেয়ায় এমনটি হয়েছে। গত পাঁচ মাসে এক শ চল্লিশ মাইল দক্ষিণে সরে গেছে ম্যাগনেটিক নর্থ। বাইশ নভেম্বরের পর গেছে কমপক্ষে নব্বই মাইল দূরে।

চুপ করে আছেন এনআরআই চিফ ব্রায়ান।

লাইম লাইটে আসতে চাইলেন সিআইএ চিফ ক্যালাগু। অর্থাৎ, এককথায় বললে: ঠিকই ধরেছে এনআরআই। অজানা এক উপায়ে কণ্ডেটের মত ম্যাগনেটিক ফিল্ড খেয়ে ফেলছে এসব স্ফটিক। চোখের সামনে সর্বনাশ হতে দেখছি আমরা। একটা করে স্ফটিক আবিষ্কার করছে মিস্টার ব্রায়ানের টিম, আর দশ কদম করে নরকের দিকে হাঁটছি আমরা মানবজাতি।

থমথম করছে প্রেসিডেন্টের মুখ। তিনি কিছু বলার আগেই আবারও শুরু করলেন ক্যালাগু, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, ধারণা করছি সমস্ত এনার্জি শুষে নিচ্ছে এসব স্ফটিক। এবং যখন মারাত্মক বিচ্ছুরণ হবে, হয়তো ধ্বংস হবে মানব সভ্যতা। ইলেকট্রনিক কোনও কিছুই কাজ করবে না। ফিরতে হবে আদিম যুগে।

মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ব্রায়ানের। সিআইএ এমন সব তথ্য দিয়েছে, যেগুলো পাননি তিনি। এককথায়, তাকে অপদার্থ প্রমাণ করছেন ক্যালাগু।

বুঝলাম, বললেন প্রেসিডেন্ট, কিন্তু ম্যাগনেটিক ফিল্ড স্বাভাবিক রাখতে কী করতে হবে? আগেও তো এমন হয়েছে। নিশ্চয়ই ডাইনোসরের মত নিশ্চিহ্ন হব না আমরা? এনআরআই চিফের দিকে তাকালেন তিনি। ব্রায়ান?

স্যর, ডাইনোসরের আমল আর আমাদের বর্তমান সময়কে মেলালে চলবে না, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন এনআরআই চিফ। আমাদের সভ্যতা নির্ভর করছে ইলেকট্রনিক শক্তির ওপর। তা ছাড়া, ম্যাগনেটিক ফিল্ড উবে গেলেই বইবে সোলার উইণ্ড।

তার ফলে কী হবে?

ছুটে আসবে বিলিয়ন বিলিয়ন চার্জড় পার্টিকল। ভয়ঙ্কর ক্ষতি হবে মানুষের টির। নষ্ট হবে ইলেকট্রিকাল গ্রিড, কমপিউটার, প্রোসেসর বা আধুনিক প্রতিটি সার্কিট। হলিউডের সিনেমার দৃশ্যের মত পৃথিবী গলে না গেলেও ঘটবে মারাত্মক সোলার ফ্লেয়ার, বা করোনাল ম্যাস ইজেকশন। মিস্টার ক্যালার কথা ঠিক, সেক্ষেত্রে আমরা আবারও ফিরব আঠারো শতকের জীবনে।

চুপ করে মনের ভেতর কথাগুলো নেড়েচেড়ে দেখছেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু হঠাৎ ডুবতে থাকা লোকের মত তীরের খোঁজ পেলেন। ব্রায়ান, তুমি বলেছ, প্রাচীন কোনও সভ্যতার তৈরি এসব স্ফটিক। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড বিনষ্ট হওয়া ঠেকিয়ে দেবে।

ইয়েস, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বললেন ব্রায়ান, ডেটা অনুযায়ী ওগুলোর কাজ পৃথিবী রক্ষা করা।

ভুরু কুঁচকে ফেললেন ক্যালাগু। এত কিছু হওয়ার পর পাগলের মত এসব কী বলছেন! পৃথিবী রক্ষা করবে? এখন তো দেখছি ধ্বংস করতে চাইছে!

ছাপা কাগজ দেখালেন তিনি। আমার সিআইএর লোকের অনুবাদ অনুযায়ী: যারা শিক্ষা নেবে না, তাদেরকে শাস্তি দেয়াই উচিত। লড়াই হবে এক জাতির সঙ্গে অন্য জাতির মানুষের। ফসল ফলবে না। সাগরের মত বইবে মানুষের রক্ত। ছেকে ধরবে ভয়ঙ্কর সব অসুখ। পাইকারি হারে মরবে মানুষ। চলবে লড়াই শত বছর ধরে। আর এসব ঠেকাতে হলে দিতে হবে মানুষের জীবন উৎসর্গ করতে হবে তার সব।

কাগজটা টেবিলে রাখলেন ক্যালাগু। যুদ্ধে মরবে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অসুখে বিলিয়ন বিলিয়ন। না খেয়ে মরবে বেশিরভাগ মানুষ। ব্রায়ান, এসব স্ফটিক আসলে প্রচণ্ড শক্তিশালী অস্ত্র, আমাদের চেনা পৃথিবী ধ্বংস করতে রেখে গেছে অচেনা মায়ান জাতি।

আপনার কথার কোনও যুক্তি নেই, ফুঁসে উঠলেন ব্রায়ান। পেয়েছেন কোনও প্রমাণ?

তপ্ত তেলে পড়া বেগুনের মত ফোঁস করে উঠলেন সিআইএ চিফ, এত কাজেরই যদি হবে, তো লুকিয়ে রেখেছিল কেন? আপনি কি ফার্স্ট-এইড কিট লুকিয়ে রাখবেন? বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার? তা করবেন না। আপনি গোপন করবেন লুকানো মাইন, বুবি ট্র্যাপ বা বোমা। উপকারই যদি করবে, তো তুলে দিত আমাদের হাতে! সেসব না করে কেন হাজার হাজার বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে দুর্গম সব মন্দিরের ভেতর?

এ কথায় নতুন করে শুরু হলো বিতর্ক।

 প্রায় ঝগড়ায় নামলেন এনআরআই চিফ ও সিআইএ চিফ।

নানান যুক্তি দেখাতে লাগলেন দুই দলের বিজ্ঞানীরা।

ব্যস্ত আদালতের বিচারকের ভূমিকা নিয়ে সবাইকে শান্ত হতে আহ্বান জানালেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু চেঁচালেন ব্রায়ান, ক্যালাগু পাগল হয়ে গেছেন! অতীতের মানুষ কেন ধ্বংস করতে চাইবে আমাদেরকে? আমরা তাদের উত্তরসূরি!

নিজেকে চোখ ঠেরে লাভ হবে না, ব্রায়ান, ধমকে উঠলেন ক্যালাগু। মানুষের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি দেশে দেশে যুদ্ধ দূর করে শান্তি বজায় রাখা! এ কাজেই ব্যস্ত সত্যিকারের ভাল মানুষ। আর প্রাচীন আমলে আপনার মায়ানরা চেয়েছে, যেন পরবর্তী সময়ে বেধে যায় দেশে দেশে যুদ্ধ!

তর্কে হারছেন বুঝে চুপ হয়ে গেলেন ব্রায়ান। তাঁর ইচ্ছে হলো চড়িয়ে বত্রিশ দাঁত ফেলে দেবেন ক্যালাগুর। কয়েক সেকেণ্ড পর প্রেসিডেন্টের দিকে তাকালেন। মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমরা আর্নল্ড শোয়ার্যনেগার, এইচ. জি. ওয়েলস্ বা স্টার ট্রেকের গল্প বলতে বসিনি। হাজারো বছর আগে সভ্য একটি জাতি চেয়েছে ভবিষ্যতের মানুষকে রক্ষা করতে। সেজন্যে শত শত মাইল পথ অতিক্রম করে নানান দিকে পৌঁছে দিয়েছে এসব স্ফটিক। এমনি এমনি এত কষ্ট করেনি তারা।

ওটা ছিল ওদের সুইসাইডিং মিশন, টিটকারির সুরে বললেন ক্যালাগু, চেয়েছিল পরবর্তী সময়ে দেশে দেশে যুদ্ধ বাধুক।

এটা যৌক্তিক হতে পারে না, প্রতিবাদ করলেন ব্রায়ান।

অত্যন্ত যৌক্তিক, জোর দিয়ে বললেন ক্যালাগু, অত্যন্ত বিপজ্জনক এসব স্ফটিক ভয়ঙ্কর বোমার মত। অথচ আপনি বা আপনার লোক জানেন না কীভাবে ডিফিউজ করবেন ওগুলোকে। এদিকে নাচতে লেগেছেন: আমরা দারুণ জিনিস পেয়েছি! আরে, আপনারা তো এটাও ভেবেও দেখেননি কোটি কোটি মানুষ যে-কোনও সময়ে খুন হতে পারে!

প্রেসিডেন্টের দিকে চেয়ে ব্রায়ান বুঝে গেলেন, উনি ভাবছেন, যুক্তিতে হেরে গেছেন এনআরআই চিফ।

ভীষণ রাগ হলো ব্রায়ানের। কিছুই করতে পারছেন না!

সবাই ভাবছেন না জেনেবুঝে মস্ত এক প্রজেক্টে হাত দিয়ে সব গুবলেট করে দিয়েছেন তিনি।

এনআরআই-এর বিজ্ঞানীদের দিকে চাইলেন তিনি, অসহায়। আরেকবার দেখলেন প্রেসিডেন্টকে। তারপর তাঁর চোখ পড়ল বিজ্ঞানী ক্যাথিবা আলিহার ওপর।

একটা কথাও না বলে এতক্ষণ দর্শকের মত চুপ থেকেছেন রেড় ইণ্ডিয়ান বিজ্ঞানী।

আপনি কিছু বলুন? মরিয়া হয়ে বললেন ব্রায়ান। মিস্টার প্রেসিডেন্ট আপনাকে পাঠিয়েছেন মতামত দিতে। আপনারই তো জানার কথা, কোন পক্ষ ঠিক বলছে আর কোন পক্ষ অন্যায্য। মুখটা অন্তত খুলুন!

বলে ফেলে ব্রায়ান বুঝলেন, এতক্ষণের খেলার রেফারিকে আক্রমণ করে বসেছেন তিনি। কিন্তু এ ছাড়া কীই বা করতেন? ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর, জ্বলছে খুলির মধ্যে মগজ। যখন তখন পাগল হয়ে যেতে পারেন!

কৌতূহল নিয়ে ব্রায়ানকে দেখলেন বিজ্ঞানী ক্যাথিবা আলিহা। নীরব হয়ে গেছে ঘরের সবাই। হোয়াইট হাউসে স্ট্যাটিকের আওয়াজ। অপেক্ষা করছেন প্রেসিডেন্ট। আলিহা বুঝে গেলেন, তিনি আছেন স্পট লাইটে। আরেক চুমুক আঙুরের রস দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিয়ে বললেন, আপনারা চান আমি কিছু বলি। কণ্ঠ তাঁর দূর থেকে আসা মেঘের গম্ভীর ডাকের মত। আপনারা বাচ্চাদের মত চেঁচামেচি না করলে, বেশ, বলব আমার মতামত।

কেশে গলা পরিষ্কার করলেন। আমার মনে হয়েছে, মিস্টার ব্রায়ান ভুল ভাবছেন।

ব্রায়ান ভাবলেন, তিনি গলা উঁচিয়ে কথা বলেছিলেন বলে খেপে গিয়ে বিপক্ষে চলে গেছেন আলিহা। কণ্ঠ সংযত করে বললেন, তাই? এর বাইরে আর কিছুই বলার নেই আপনার?

না, আরও কথা আছে, বললেন রেড ইণ্ডিয়ান বিজ্ঞানী, মিস্টার ক্যালাগুও ভুল ভাবছেন। আপনারা দুজন নেমেছেন সার্কাসে। কিন্তু চেঁচিয়ে কোনও কিছুই সমাধান করা যায় না। এত হৈ-চৈ করলে মগজ চলে না। আপনারা সময় নষ্ট করছেন। অন্য দিকে মনোযোগ দিয়ে।

ক্যাথিবা আলিহার দিকে চেয়ে আছেন ব্রায়ান।

কঠোর চোখে বিজ্ঞানীকে দেখছেন ক্যালাগু।

কাউকে পাত্তা দিলেন না রেড ইণ্ডিয়ান। আমার ধারণা: বুঝতে পেরেছি ঠিক কোথায় ভুল করেছেন আপনারা।

কোথায় ভুল করেছি? তেড়া সুরে বললেন ক্যালাগু।

আপনারা ভুলে গেছেন অতীতের মানুষ কী লিখে গেছেন।

চুপ করে আছে সবাই।

কাঁধ ঝাঁকালেন বিজ্ঞানী আলিহা। কারণ এবং তার প্রভাব গুলিয়ে ফেলেছেন আপনারা। হাজার বছর আগে যখন অতীতের মানুষ সিদ্ধান্ত নিলেন, কী কারণে কী করতে হবে, সব ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁরা এমনি এমনি নির্দিষ্ট সব জায়গায় ফটিক রাখেননি। আপনারা বাচ্চাদের মত ওগুলো নিয়ে খেলতে চাইবেন, সেটা তাদের ইচ্ছে ছিল না।

সবার ওপর চোখ বোলালেন আলিহা। মানুষই তৈরি করে খারাপ দৃষ্টান্ত, এবং তা-ই করবে ধরে নিয়েই কাজে নেমেছেন প্রাচীন মায়ারা। যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের সর্বনাশ করলে, সে দায় আমাদের। সেজন্যে দোষ পড়বে কেন এসব স্ফটিকের ওপর? আবার পৃথিবীকে স্বর্গ করে নিলে, সে-কৃতিত্বও আমাদের।

তার মানে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড ঠিক রাখার বিষয়ে তেমন কিছুই করার নেই? জিজ্ঞেস করলেন প্রেসিডেন্ট।

তা বলছি না, বললেন বিজ্ঞানী, বহু কিছুই করার আছে। এ পরিস্থিতি হবে ভেবেই অতীতে তৈরি করেছেন মায়ারা ওসব স্ফটিক। অদ্ভুত মেশিনও বলতে পারেন। এখন মানবজাতিকে ধ্বংস করবে, না রক্ষা করবে, সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

বড় করে দম নিলেন এনআরআই চিফ ব্রায়ান।

বিজ্ঞানীর কথা শুনে থমকে গেছেন সিআইএ চিফ ক্যালাগু।

কিন্তু আপনার কথা থেকে তো কিছুই স্পষ্ট হলো না, বললেন ব্রায়ান। আপনি তৈরি করেছেন মস্ত এক বৃত্ত।

জানি, মাথা দুলিয়ে আঙুরের রসে চুমুক দিলেন আলিহা। এ কারণেই নিজের চিন্তা নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলাম।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *