২. মস্কোর পার্ক কালচুরি

২১.

মস্কোর পার্ক কালচুরি মেট্রো স্টেশনে সাবওয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়ল ইগোর দিমিতভ। এই স্টেশন ভবন এতই সুন্দর, যে কেউ ভাববে, এটা জাদুঘর বা প্রকাণ্ড কোনও অপূর্ব প্রাসাদের অংশ। পালিশ করা বড় টাইল দিয়ে তৈরি মেঝে দাবার ছকের মত। দেয়ালে দেয়ালে মার্বেলের কারুকাজ, এখানে-ওখানে দুর্দান্ত সব মূর্তি। ছাত থেকে ঝুলছে একরাশ উজ্জ্বল ঝাড়বাতি।

এসব স্টেশন ছিল সোভিয়েত রাশার গর্ব। তৈরি উনিশ শ পঞ্চাশ থেকে ষাট দশকে। কথা ছিল এ দেশে সবার ওপর সম্মান পাবে সাধারণ কর্মীরা, তাই যাওয়া-আসার পথে তাদেরকে খুশি রাখতে নির্মাণ করা হয় বিশাল এসব স্টেশন।

ইগোর দিমিতভের মনে পড়ল, উরাল থেকে এসে প্রথমবারের মত নেমেছিল এই স্টেশনে। নতুন রিক্রুট, মাত্র যোগ দিয়েছে এফএসবিতে। তকতকে স্টেশন দেখে এ দেশের নাগরিক বলে গর্ব হয়েছিল ওর। তারপর দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল সময়, দুবছর আগে অবসর নিয়েছে। বিয়ে করেনি, সন্তান নেই, টাকার কোনও অভাব নেই। তবুও কাজই খুঁজে নেয় ওকে।

মেট্রো স্টেশন থেকে বেরোতে দরজার দিকে পা বাড়াল দিমিতভ। খুব ঠাণ্ডা পড়েছে বাইরে। আগেই দুহাত ভরে দিল কোটের পকেটে। সোজা দেখছে সামনের দিক। কিন্তু পেছন থেকে ডাকল কেউ। গলার আওয়াজ নুড়িপাথর বাড়ি খাওয়ার মতই কর্কশ। ইগোর দিমিতভ। এত তাড়া কীসের?

থমকে গেল দিমিতভ। ওই কণ্ঠস্বর ভাল করেই চেনে।

ইউরি ম্যাকারভ।

দিমিতভের পাশে পৌঁছল দানবাকৃতি লোকটা। চলো, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।

হঠাৎ এখানে কেন, ম্যাকারভ? ধীর পায়ে এগোল দিমিতভ, আমাকে সকালে মিটিঙে আসতে বলা হয়েছে। তাড়া কীসের?

হাতে বাড়তি সময় নেই, বলল ম্যাকারভ, এরই ভেতর বড়কর্তারা জেনেছেন হংকঙে কী হয়েছে। এবার আগুনে পুড়বে কেউ না কেউ।

আর সেই লোকটা আমি, না?

অথবা তোমার মতই আমিও পুড়ে মরব।

 চুপ করে হাঁটছে দিমিতভ।

ওই বাঙালি গুপ্তচরকে কাজে নিলে কেন? জানতে চাইল ম্যাকারভ।

থমকে দাঁড়িয়ে ম্যাকারভের মুখোমুখি হলো ইগোর। আমার মনে হয়েছিল, আড়াল থেকে কাজ করিয়ে নিতে পারব।

তিক্ত হাসল ম্যাকারভ। মস্ত ভুল করেছ।

যা হবার হবে, এখন ভেবে কী লাভ! আবারও হাঁটতে শুরু করল দিমিতভ। পৌঁছে গেল ওরা সিঁড়ির কাছে। এক পা পেছনে আসছে ম্যাকারভ। সতর্ক হয়ে উঠল প্রাক্তন এজেন্ট।

মস্কোর হিমঠাণ্ডা পরিবেশে বেরিয়ে এল ওরা। আকাশ থেকে নামছে পেঁজা তুলোর মত তুষার। শহরের আলোয় কেমন অস্বাভাবিক লাগছে দেখতে। রাস্তায় জমে গেছে পাঁচ ইঞ্চি তুষার। একটু দূরে অপেক্ষা করছে কালো এক ম্যাসেরেটি সেডান। ওটার চাকা বেলুনের মত ফোলা।

ইগোর দিমিতভের কাঁধে হাত রাখল ম্যাকারভ। তুমি আমার সঙ্গে আসছ।

কোথায় যেতে হবে? কেন?

সব খুলে বলার জন্যে। শক্তভাবে দিমিতভের কাঁধ ধরল সে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেডানের পেছনের দরজা খুলে সিটে বসল দিমিতভ। ভেতরে আছে আরেকজন। তাকে চিনল না ও। বিশাল দেহ নিয়ে সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে চাপল ম্যাকারভ। রওনা হয়ে গেল ড্রাইভার।

ও, তা হলে মস্কোর তুষার ঝরা এক রাতে শেষ হলো আমার সময়? ভাবল ইগোর দিমিতভ। আত্মীয়রা কেউ জানবে কী হয়েছে! হারিয়ে যাবে লাশ। তবে পাওয়া যাবে গ্রীষ্মে।

মস্কো নদী পেরিয়ে গেল সেডান। থামল রেড স্কোয়্যার-এ।

এখানে খুন করবে? হয়তো তাই! তাতে সাবধান করে দেয়া যাবে অন্যদেরকে।

সেডানের পাশে থামল আরেকটা গাড়ি। এত ঘেঁষে আছে, দরজা খুলতে পারবে না কেউ।

জানালার কাঁচ নিচু করে দ্রুত কী যেন বলল ম্যাকারভ। খপ করে ধরে কী যেন রাখল সিটের পাশে। ড্রাইভারকে বলল, রওনা হও। 

চলতে শুরু করল ম্যাসেরেটি। আধঘুরে দিমিতভের দিকে তাকাল ম্যাকারভ। হাতে পুরু এনভেলপ। আরেকবার সুযোগ দিয়েছে। এখন থেকে সরাসরি এফএসবির নির্দেশে কাজ করবে।

কী লিখেছে? জানতে চাইল দিমিতভ।

খুঁজে বের করবে ওই ছেলেকে নিয়ে আসবে সায়েন্স ডিরেক্টোরেট-এ। যদি মনে হয় দেশে আনতে পারবে না, দেরি না করে মেরে ফেলবে। যারা ওর সঙ্গে কোনওভাবে জড়িত, বাঁচতে দেবে না তাদেরকে।

এনভেলপ নিয়ে খুলল ইগোর দিমিতভ। ভেতরে নতুন একটা পাসপোর্ট, প্রচুর টাকা ও পরামর্শের চিঠি। আজকাল আর এ ধরনের কাজ করি না, বলল সে। ওদেরকে বলল, অন্য কাউকে যেন বেছে নেয়।

দেশকে ছোট করেছ, রাগী গলায় বলল ম্যাকারভ। সার্গেই দিমিতভ তোমার ভাই ছিল।

সত্তাই, বলল ইগোর।

তাতে কী? বলল ম্যাকারভ। তোমাদের পরিবার বেঈমানি করেছে। সুদে-আসলে সব বুঝে নেবে এফএসবি।

বাইরে তাকাল ইগোর দিমিতভ। বংশের সুনাম কলঙ্কিত করেছে তার সম্ভাই। এখন দেশের হয়ে কাজ না করলে বাঁচবে না ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের কেউ।

মেক্সিকো সিটিতে এফএসবির লোক যোগাযোগ করবে। তোমার কাছ থেকে নির্দেশ নেবে ওরা। কিন্তু তাদেরকে ফেলে কোথাও যাবে না। কথাটা বুঝতে পেরেছ?

সবই বুঝেছে ইগোর। এফএসবির লোক ওরা। বেছে নেয়া হয়েছে নাই ডিরেক্টোরেট থেকে। খুন করা পেশা। যা বলা হবে, তাই করবে। যদি পাবলোকে ফেরত আনতে না পারে ও, খুন হয়ে যাবে তাদের হাতেই।

হয়তো ভাবছ হারাবার কিছুই নেই, বলল ম্যাকারভ, কথাটা কিন্তু ঠিক নয়। তোমার ভাতিজা-ভাতিজিরা রয়ে গেছে। তুমি সফল না হলে কেউ বাঁচবে না ওরা।

ম্যাকারভের দিকে চেয়ে রইল ইগোর দিমিতভ। পলক পড়ছে না দানবের চোখে। যা বলার বলে দিয়েছে সে। কোটের পকেটে এনভেলপ রেখে জানালা দিয়ে দূরে চেয়ে রইল ইগোর দিমিতভ। গাড়ি পৌঁছে গেছে মস্কো ইন্টারন্যাশনাল-এর কাছে। বাড়ি ফেরার সুযোগ নেই। একটু পর উঠতে হবে বিমানে।

বিশ্রাম নেয়ার কোনও উপায় তার নেই।

.

২২.

 উপসাগরের ঢেউ কেটে তরতর করে চলেছে তিরিশ ফুটি ফিশিং বোট, বয়স চল্লিশ বছরেরও বেশি। এখানে-ওখানে চটে গেছে রঙ। সাগরের জল প্রায় পচিয়ে দিয়েছে পুরনো কাঠের খোল। ইঞ্জিন চালু হতেই প্রাচীন ট্রাক্টরের মত শুরু করল ফ্যাট-ফ্যাট আওয়াজ। কিন্তু থ্রটল ঠেলতেই খেলা দেখাল টুইন আউটবোর্ড মোটর, যেন খেপা ষড়। এই মুহূর্তে শান্ত সাগরে তুমুল গতি তুলে পেছনে ফেলছে দীর্ঘ ঢেউ।

মিতা, পাবলো ও প্রফেসরকে দেখল রানা। সবাই হাসিখুশি। নতুন করে গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে ফেলেছেন হ্যারিসন। গত দুদিন ধরে তাঁর ক্ষত ড্রেস করছে মিতা, দিয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের মেগা ডোয। বাপ-বাপ করে ভেগেছে সংক্রমণ। ঘুমের ওষুধ দেয়ায় বহু রাত পর নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পেরেছেন প্রফেসর। এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে না পাগলাগারদ থেকে ভেগে এসেছে ভয়ঙ্কর উন্মাদ।

অন্যদের মতই, খুশি পাবলো। রানা ভেবেছে, সত্যি রাশান ক্যাপ্টেনের কথা ঠিক হলে এনার্জি ফিল্ড ভরা ব্যস্ত শহর ছেড়ে নীরব জেলেগ্রাম পুয়ের্তো আযুলে এসে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল বেচারা। এখন চুপচাপ দেখছে শান্ত সাগর।

ওর পাশেই আছে মিতা। হঠাৎ সাগর থেকে চোখ সরিয়ে রানাকে বলল, এরচেয়ে ভাল বোট পেলে ভাল হতো।

পাব কোথায়? মাথা নাড়ল রানা। সবগুলোর ভেতর এটাই সবচেয়ে দ্রুতগামী।

তাই? মৃদু হাসল মিতা।

 ওরা এই বোট ব্যবহার করে ওয়্যাহু মাছ ধরতে।

আমাদের ডাইভ গিয়ারও প্রথম সারির, বলল মিতা, সাগরে নামলে বিপদে পড়ার কথা নয়।

চুপ করে থাকল রানা। আধুনিক ইকুইপমেন্ট বলতে ওদের রয়েছে জিপিএস রিসিভার ও সস্তা এক সোনার ডেথ সাউণ্ডার। এতেই চলবে। বারবার হিসেব কষে প্রফেসর স্থির করেছেন, কোথায় যেতে হবে। তার হিসেব অনুযায়ী, বর্শার ডগা উপকূল থেকে সাত মাইল দূরে। সাগরের গভীরতা ওখানে কম। তবে কিছুই নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। ওদিকের সাগরতলের ডেটা কখনও পরীক্ষা করেনি কেউ। তাতে সমস্যা নেই, নিচে পুরনো ধ্বংসাবশেষ রয়ে গেলে দাম্ভিক মেয়ের মত নাক উঁচু করে রাখবে ওটা।

আচ্ছা, পানির নিচে কেন মন্দির তৈরি করবে মায়ারা? জানতে চাইল মিতা। ওদের দ্বারা এ কাজ তো প্রায় অসম্ভব!

দুই কারণে ওদিকে হয়তো আছে মন্দির, বললেন প্রফেসর, প্রথম কথা, ওরা ওটা সাগরে তৈরি করেনি। ডাঙায় করেছিল, পরে তলিয়ে গেছে। হাত দিয়ে চারপাশ দেখালেন। এদিকের সাগরে প্রায়ই বদলে যায় স্রোত ও টেকটোনিক প্লেট। নিচের পাথর নরম। কিছু দিনের জন্যে জেগে উঠছে অনেক দ্বীপ, আবার তলিয়ে যাচ্ছে যখন-তখন। তা ছাড়া, হাজার বছরে পাল্টে যায় বহু কিছুই। আমাদের জানা আছে, চার-পাঁচ হাজার বছর ধরে এ এলাকায় বাস করেছে মায়ারা। ওই সময়ে তৈরি করা মন্দির সাগরে ডুবে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

আর অন্য কারণটা কী? জানতে চাইল মিতা।

সাগরের বুকেও তৈরি করা যায় মন্দির, বললেন প্রফেসর। তোমরা জানো, কেমিকেল রিঅ্যাকশনে শক্ত হয় কংক্রিট। সঠিকভাবে মিশ্রণ তৈরি করলে পানির নিচেও বাড়িঘর বা মন্দির তৈরি সম্ভব। বিশেষ করে যদি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায় আগ্নেয় ছাই।

মিতার দিকে তাকালেন হ্যারিসন। আমরা যখন গেলাম আইলা কিউবিয়ার্তায়, জানলাম হাজার হাজার বছর আগে আগ্নেয় এলাকার মাঝ দিয়ে গেছে মায়ারা। এমনি এমনি নিশ্চয়ই তা করেনি? জরুরি কারণ ছিল কঠিন পথে যাওয়ার। তারা চেয়েছিল স্ফটিক রাখার মত ভাল জায়গা। এমন কোথাও, যেখানে তৈরি করবে টেকসই মন্দির। আগ্নেয়গিরি থেকে দরকারী সব উপাদান নিয়েছিল তারা।

মনের চোখে মিতা দেখল, হাজার হাজার লোক টুকরি ভরা ছাই নিয়ে হাঁটছে সাগরের দিকে।

জিপিএস রিসিভারে চোখ রাখল রানা। আরেকটু গেলেই জানব, সত্যিই মন্দির আছে কি না।

থ্রটল পিছিয়ে নিতেই কমে গেল বোটের গতি।

 সহজ পরিকল্পনা করেছে ওরা।

যেহেতু নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে গেছে, দুঘণ্টা করে গ্রিড প্যাটার্ন অনুযায়ী খুঁজবে মন্দির।

অবশ্য বিশ মিনিট তন্নতন্ন করে চারপাশ খুঁজেও কিছুই পাওয়া গেল না। আগের মতই থাকল সাগরের গভীরতা।

এটা খারাপ নয়, বললেন প্রফেসর হ্যারিসন। ভাবছিলাম আসলে কী খুঁজছি আমরা। মনে আছে, ব্রাযিলের জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল বিশাল মনুমেন্ট। পাহারা দিচ্ছিল একদল অদ্ভুত হিংস্র জন্তু। মায়ারা চেয়েছিল মন্দিরটাকে নিরাপদে রাখতে, যদিও থাকবে ওটা সবার চোখের সামনে।

যাওয়া কঠিন, কিন্তু খুঁজে পাওয়া সহজ, মন্তব্য করল মিতা।

আমাযনের জঙ্গলে খুঁজে বের করাও সহজ ছিল না, বললেন প্রফেসর। মায়ারা এমন মন্দির তৈরি করেছে, যেটা কখনও হারাবে না।

জন্তুগুলোর হামলায় আরেকটু হলে খুন হতাম আমরা, বলল মিতা। আপনি ভাবছেন, এবারও সহজে পাওয়া যাবে, এমন কোথাও থাকবে মন্দির- কিন্তু ওটাকে রক্ষা করবে কোনও কিছু?

জরুরি কোনও কারণে স্ফটিক নির্দিষ্ট সব জায়গায় রেখেছে ওরা, বললেন প্রফেসর। চেয়েছে এমন কোথাও রাখতে, যেখান থেকে চুরি হবে না ওসব।

নিশ্চয়ই জরুরি কাজেই রেখেছে, বলল মিতা, ফিযিক্সের সূত্র কাজ করছে না ওগুলোর ওপর। আমাদের জানতে হবে, বাইশ ডিসেম্বরে কী করবে এসব স্ফটিক। কেউ চাইবে না, প্রচণ্ড ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভের কারণে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিহীন হয়ে উঠুক পৃথিবীর মানুষ।

ধীর গতি তুলে ধিকধিক করে চলেছে বোটের ইঞ্জিন।

 সবাই চুপ হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পাবলো। চলে গেল রেলিঙের পাশে। চোখ রেখেছে বামদিকের সাগরে।

বোটের গতি আরও কমাল রানা। ঘুরে আবারও চলল ফিরতি পথে। মিতা বসল হুইলে।

বিপ-বিপ আওয়াজ ছাড়ল ডেথ সাউণ্ডার।

উত্তেজিত হয়ে উঠেছে পাবলো। রেলিং থেকে ঝুঁকে তাকাল সাগরে। পানি ভেদ করে যেন দেখবে অনেক নিচে।

চট করে পোর্ট সাইড থেকে সরে স্টারবোর্ড সাইডে দৌড়ে গেল বাচ্চা ছেলেটা। আঁকড়ে ধরল রেলিং। চিৎকার করে বলল, সাইরেন! সাইরেন! সাইরেন!

মনে হলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না নিজেকে। সামনে পেছনে দুলছে। কী মনে করে সাগরে নেমে পড়তে চাইল। কিন্তু দুকাঁধ ধরে ওকে পিছিয়ে নিল রানা।

শান্ত হও, বাছা! বললেন প্রফেসর।

সাইরেন! সাইরেন! সাইরেন!

জোর আওয়াজে বাজতে শুরু করেছে ডেপথ গজ। সাগরের খুব অগভীর অংশে হাজির হয়েছে ওরা।

রানার মুঠো থেকে নিজেকে ছুটিয়ে নিতে চাইছে পাবলো। ঘুরে কামড় বসাতে চাইল গত কয়েক দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর হাতে।

বাচ্চা ছেলেটাকে শূন্যে তুলল সতর্ক রানা। ওর থুতনির নিচে ঝুলতে ঝুলতে চিৎকার করল পাবলো, সাইরেন! সাইরেন! সাইরেন! সাইরেন!

মিতা, বোট সরিয়ে নাও, বলল রানা।

 থ্রটল ঠেলে দিতেই লাফ দিয়ে সামনে বাড়ল বোট।

ঘাড় কাত করে পেছনের সাগর দেখল পাবলো। নরম সুরে বলল, সাইরেন। সাইরেন।

কিছু দূর যাওয়ার পর বোটের গতি কমাল মিতা। বুকের কাছ থেকে পাবলোকে ডেকে নামাল রানা।

দৌড়ে গিয়ে মিতার কোমর জড়িয়ে ধরল বাচ্চা ছেলেটা।

রাশানরা জটিল কোনও অপারেশন করেছে ওর মগজে, রানাকে বলল মিতা। হাত বুলিয়ে দিল পাবলোর মাথায়। বসে কোলে নিল ছেলেটাকে। বলো তো, বাবু সোনা, সাইরেন আসলে কী জিনিস?

ঘাড় কাত করে অবাক চোখে ওকে দেখছে পাবলো, মুখে কোনও বোল নেই।

ঠিক আছে, কিছু হয়নি, তাই না? বলল মিতা। পাবলো অস্বস্তির ভেতর পড়েছে বলে মনে হচ্ছে ওর।

তুমি ঠিক আছ তো, পাবলো? জানতে চাইল রানা।

জবাব দিল না ছেলেটা। আবারও সানগ্লাসের দুই উঁটি ঠুকছে ঠুক-ঠাক শব্দে।

ওর কোনও ক্ষতি হয়নি তো? জানতে চাইলেন প্রফেসর হ্যারিসন।

মন খারাপ হয়ে গেছে মিতার। নিচু স্বরে বলল, জানি না।

তবে আপনি বোধহয় পেয়ে গেছেন আপনার বর্শার ডগা, মন্তব্য করল রানা। ঘুরিয়ে নিয়ে একটু দূরে বোট রাখল ও।

মুখে কিছু না বলে কাজে নেমে পড়ল মিতা। কতক্ষণ সাগরতলে থাকবে, কেমন হবে এয়ার মিক্সচার, বা কত সময় লাগবে ডিকমপ্রেশনে, এসব বুঝতে ডাইভ কমপিউটার ব্যবহার করছে।

এদিকে শার্ট খুলে উদোম গায়ে ইকুইপমেন্ট লকার থেকে গিয়ার বের করছে রানা।

একবার মুখ তুলে তাকাল মিতা।

যুবকের চওড়া কাঁধ, প্রশস্ত বুক, সরু কোমর, বটগাছের মত ঊরু পৌরুষদীপ্ত, পেশিবহুল সুঠাম দেহ দেখে রক্তিম হলো মিতা।

ভারী অক্সিজেন ট্যাঙ্ক বোটের পেছনে রাখল রানা।

বেখেয়াল রানার দিকে আবারও চোরা চোখে তাকাল মিতা। ওই দেহে নানান অংশে পুরনো ক্ষতের দাগ। মিতার ইচ্ছে হলো উঠে গিয়ে মানুষটার ক্ষতগুলো স্পর্শ করে।

মিতা, মন শক্ত রাখো, বললেন প্রফেসর হ্যারিসন। রানার মত মানুষকে কখনও বাঁধা যায় না। ও মুক্ত বিহঙ্গ।

তাই আসলে, স্যর, মুখ নিচু করে নিল মিতা। গত কয়েক দিন জাহাজে খুব কাছে ছিল রানা, কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একটিবারও হাত বাড়ায়নি ওর দিকে।

তবে, তাই বলে হতাশ হয়ো না, দর্শনের বুলি ঝাড়লেন হ্যারিসন, আমার বাজপাখির মত তীক্ষ্ণ চোখে ধরা পড়েছে, গোপনে গোপনে পাকা চোরের মত তোমাকে দেখছে ছোকরা।

মাথা নিচু করে হাসল মিতা, লজ্জা গোপন করার ব্যর্থ প্রয়াস। চোখ তুলে দেখল: এখনও মুচকি হাসি লেগে আছে প্রফেসরের ঠোঁটে। আবার মনোযোগ দিল সে কমপিউটারের স্ক্রিনে। ওখান থেকে চোখ না সরিয়ে নিচু গলায় বলল, খবরদার! ও যেন টের না পায়!

হাসি বেড়ে গেল বদমাস বুড়োর।

যন্ত্র ঠিক হয়ে থাকলে এখানে সাগরতল বালিময়, গভীরতা আশি ফুট। সাগরের যেখানে এসে চেঁচিয়ে উঠেছিল পাবলো, ডেপথ ফাইণ্ডার অনুযায়ী পানির গভীরতা ওখানে পঞ্চান্ন থেকে সত্তর ফুট। সেডিমেন্ট থেকে ওপরে উঁচু হয়ে আছে কিছু। হয়তো রিফ, তলিয়ে যাওয়া দ্বীপ, অথবা মানবসৃষ্ট কোনও দালানকোঠার ধ্বংসাবশেষ।

হাতের ইশারা করছে রানা।

বোটের সামনে চলে গেল মিতা। আড়ালে সরে গিয়ে পরল ত্বকের মত পাতলা ডাইভ স্কিন লাইক্রা। ওটা নিয়োপ্রেন ওয়েট সুটের মতই, তবে ব্যবহার হয় উষ্ণ জলে। নিয়োপ্রেনের মত ভেসে ওঠে না, ছড়েও দেয় না ত্বক।

মিতার কোমল দেহে রাবারের গ্লাভসের মত এঁটে বসেছে পোশাকটা। গোড়ালির কাছে বেল্ট দিয়ে বেঁধে নিল চার ইঞ্চি ফলার ছোরা। ফিরল বোটের পেছনে।

রানাও তৈরি, পরনে ডাইভ শর্টস্ ও র‍্যাশ-গার্ড শার্ট। পরীক্ষা করে দেখছে ফুল ফেস ডাইভিং মাস্ক। সঙ্গে রয়েছে। রেডিও কমিউনিকেশন সিস্টেম এবং মিনিয়েচার হেড-আপ ডিসপ্লে। শেষের জিনিসটা আধুনিক ফাইটার বিমানের পাইলটের মুখোশের মতই ডানদিকে দেখাবে সাগরের গভীরতা, সময় ও কমপাস।

একেকটা মাস্কের দাম হাজার ডলার। এ ছাড়া, আরও আছে দুই ডাইভারের জন্যে অ্যালিউমিনিয়ামের দুই ট্যাঙ্ক ও প্রপালশান ভেহিকেল বা ডিপিভি। সবমিলে খরচ পড়েছে প্রায় দশ হাজার ডলার।

রানার এক মেক্সিকান বন্ধুর মাধ্যমে কেনা হয়েছে বলে দাম পড়েছে কম। গতকাল বিকেলে সব পৌঁছে দিয়েছে সে পুয়ের্তো আয়ুল গ্রামে।

স্ট্র্যাপ দিয়ে মিতার পিঠে ট্যাঙ্ক বেঁধে দিল রানা।

আমরা এই ডাইভের জন্যে নাইট্রক্স ব্যবহার করছি, বলল মিতা।

গভীর পানিতে বেশিক্ষণ রয়ে যেতে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ ওই মিক্সচার তৈরি হয়েছে অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন মিশিয়ে।

ফোরটি পার্সেন্ট মিক্সচার? জানতে চাইল রানা।

মাথা দোলাল মিতা।

মাত্র আশি ফুট নিচে নামতে প্রয়োজন পড়ে না নাইট্রক্স, কিন্তু সাগরতলের ওই সাইটের ভেতর অংশ কতটা নিচে গেছে জানা নেই, তাই ওই মিক্সচার ব্যবহার করছে ওরা। মন্দিরের ভেতর পারতপক্ষে দ্বিতীয়বার ফিরতে চায় না।

ডিকমপ্রেশন ছাড়াই সত্তর মিনিট থাকতে পারব, বলল মিতা, সবমিলে পারব দুঘণ্টা। তবে সেক্ষেত্রে ওঠার সময় দিতে হবে পুরো আধঘণ্টা।

ডাইভ ঘড়ি চালু করে পিঠে ট্যাঙ্ক ঝুলিয়ে নিল রানা। প্রফেসর হ্যারিসনকে বলল, নোঙর ফেললেও এদিক-ওদিক চলে যেতে পারেন। যেখানে আছি, সেটা জিপিএস-এ তুলে দিয়েছি। কিছুই ডিলিট করবেন না, নইলে ঠিক জায়গায় ফিরে তুলে নিতে পারবেন না আমাদেরকে।

তোমাদের মাস্কে না রেডিও আছে? বললেন হ্যারিসন।

 বোটের ট্রান্সমিটার শক্তিশালী, কিন্তু আমাদেরগুলো অনেক দুর্বল, বলল রানা। মিতা আর আমি নিজেদের কথা শুনব, কিন্তু তিরিশ ফুট গভীরে যাওয়ার পর আপনার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারব না।

মাথা দোলালেন প্রফেসর।

রানা ইশারা করতেই বোটের পাশে সাগরে নামল মিতা। আগেই পরে নিয়েছে মাস্ক। ওর পর পর নেমে পড়ল রানা। সাগরের পানি বেশ উষ্ণ। টর্পেডো আকৃতির ডিপিভি পরীক্ষা করল ওরা। যন্ত্রটার সামনের দিকে দুপাশে খাটো ডানা, একটু পেছনে হ্যাঁণ্ডেলবার। চেপে বসে চালাতে হবে মোটর সাইকেলের ভঙ্গিতে।

ঝকঝকে নীলচে উপসাগরে তলিয়ে গেল ওরা। হেড-আপ ডিসপ্লে চালু করল রানা। চোখের সামনে দেখল উজ্জ্বল কিছু সবুজ সরল রেখা, যেন খেলতে বসেছে ভিডিয়ো গেম।

ডেপথ: ৪, বেয়ারিং: এনএনওডাব্লিউ (৩২৪), টেম্প: ৮৮, টাইম ইল্যান্স: ১:১৩।

কোন দিকে? জানতে চাইল মিতা।

বোটের তলা দিয়ে ওয়ান-ও-সিক্স বেয়ারিং-এ। ঝক থেকে সরে যাওয়া ডলফিনের মতই বামে বাঁক নিয়ে রওনা হলো রানা।

পিছু নিল মিতা। বোটের নিচ দিয়ে চলেছে আধমাইল দূরের বালির ঢিবি লক্ষ্য করে। 

পানির তলা দিয়ে উড়ে যাওয়ার অনুভূতি নিয়ে রেডিয়োতে মিতার কথা শুনল রানা।

সত্যিই কি সামনে মন্দির পাব?

চলো, গেলেই দেখব কী আছে।

চল্লিশ ফুট গভীরতায় নেমে এল ওরা।

নিচের বালি সত্যিকারের রূপার মতই রুপোলি, কিন্তু অত গভীরে কমে গেছে সূর্যের আলো।

চোখের কোণে মিতাকে থামতে দেখল রানা।

 ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটা।

কোনও সমস্যা? জানতে চাইল রানা।

দূরে আঙুল তাক করল মিতা। হাঙর!

দেখা দিয়েছে বিশাল এক দানব!

হাতুড়িমাথা হাঙর, ফিসফিস করল মিতা।

 সাধারণত মানুষের ওপর হামলা করে না, বলল রানা।

ভয় পেয়ে ঢোক গিলল মিতা। ওই হাঙরটা দৈর্ঘ্যে অন্তত বিশ ফুট, ওজন এক হাজার পাউণ্ড। কিন্তু সত্যি যদি… শুরু করেও চুপ হয়ে গেল সুন্দরী। দূরের অন্ধকার থেকে এল আরও দুটো হাঙর। দুসেকেণ্ড পর আরও একটা। ওটার লেজ ধরে এল আরও দুটো। আগে কখনও দেখিনি, ঝাঁক বেঁধে চলে!

অলসভঙ্গিতে সাগরের ওপরের দিকে উঠছে হাঙরের পাল।

 এসো, থ্রটল মুচড়ে রওনা হয়ে গেল রানা।

 কোথায় যাবে? চাপা স্বরে বলল মিতা।

 ওদেরকে অনুসরণ করব, বলল রানা।

ওদেরকে বিরক্ত না করলে ভাল হতো না? আপত্তি তুললেও রানার পিছু নিল মিতা।

ওদের দিকে খেয়াল নেই হাঙরের ঝাঁকের। ধীর গতি তুলে বামে বাক নিল।

মিতার মনে পড়ল, পানিতে সামান্য কম্পন হলেও সতর্ক হয় হাঙর। ভয় চেপে শুকনো গলায় বলল ও, আমরা বরং ওদের পিছু না-ই বা নিলাম?

চমকে গিয়ে থামল রানা।

ধীর গতি তুলে ওদের দিকে আসছে কিছু হাঙর। এবার চার-পাঁচটা নয়, তৈরি করেছে সাগরতলে কয়েকটা হাইওয়ে। সংখ্যায় অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশটা! খুলে বসেছে এবড়োখেবড়ো, হলদেটে মুলোর দোকান!

নিঃশব্দে সাগরের মেঝের দিকে চলল রানা। চুপচাপ পিছু নিল মিতা। বালিতে নেমে যাওয়ার পর সূর্যের আলোয় ওপরের দৃশ্য পরিষ্কার দেখল ওরা। আধমাইল বৃত্তাকার এক পথে ঘুরছে ঝক ঝক হাঙর।

আমি কোনও সাবমেরিনে থাকলে এত ভয় পেতাম না, বলল মিতা।

আগেও দেখেছি দল তৈরি করে, কিন্তু একসঙ্গে আগে কখনও এতগুলো দেখিনি, বলল রানা।

সংখ্যায় কত হবে?

এক শর বেশি।

কাছাকাছি থাকছে সাত-আট ফুটি হাঙর, দূরত্ব বজায় রাখছে বড়গুলো। হাঙরের তৈরি বৃত্তের মাঝে চোখ গেল রানার। ওখানে আছে প্রবালের টিলা, মাঝে পাথর ও কাদার উঁচু স্তূপ। ঘুরে ঘুরে পাক দিচ্ছে হাঙরের ঝক। সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের তথ্য মনে পড়ল রানার। হ্যামারহেড হাঙরের উটে থাকে সেনসিটিভ অর্গ্যান অ্যামপিউলা অভ লরেনযিনি। ওই নার্ভের একগাদা তন্তুর কারণে ওরা টের পায় ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ অথবা পালস্।

সাগরতলে অদ্ভুত ওই স্ফটিকের এনার্জি টের পেয়েই হাজির হচ্ছে হাঙরের দল। মিতার কাছে শুনেছে রানা, বেয়ারিং সাগরে কী হয়েছিল পাবলোকে বহনকারী বোটের।

জ্বলন্ত প্রদীপের শিখাকে ঘিরে যেভাবে ঘোরে উড়ন্ত পোকা, সেভাবেইঘিরে ঘুরছে ঝক ঝক হাঙর, বুকে কীসের এক হুতাশ।

ওপরে ঘুরন্ত হাঙরের ঝক একবার দেখে নিয়ে, প্রবালে ভরাদেখল রানা। কসেকেণ্ড পর বলল, ওদিকের প্রবালের রিফে যাব। স্ফটিক থাকলে, ওটা আছে প্রাচীন কোনও মন্দিরের ভেতরে।

হাঙরের ওপর চোখ রেখে প্রবাল প্রাচীরের দিকে চলল রানা। ওকে অনুসরণ করল মিতা। কাছে গিয়ে দেখল ওরা, পাথরের বিশাল সব চৌকো চাই দিয়ে তৈরি মন্দির। প্রতিটি পাথর নিখুঁতভাবে কাটা। ওজন রাখছে একটা আরেকটার ওপর।

পাথুরে দেয়ালের পাশ দিয়ে চলল রানা। বাইরের দিক অক্ষত, ভেতরে ঢুকতে হবে।

প্রফেসর বলেছেন: খুঁজে নেয়া কঠিন, তবে হারিয়ে ফেলা আরও কঠিন, বলল মিতা।

মন্দিরের নিরাপত্তার জন্যে ভাল ব্যবস্থা করেছে মায়ারা, হাত তুলে সাগর সমতলে হাঙরের মিছিল দেখাল রানা। আগেও দেখেছে এমন পাথুরে মায়া ডিযাইনের স্থাপত্য। হায়ারোগ্লিফিক নেই, তবে পাথরের বুকে খোদাই করা আছে দুটো সরীসৃপ।

রানাকে বলল মিতা, চলো, দেখি ঢোকা যায় কি না।

উঁচু দালানের ওপর দিয়ে ভেসে গেল ওরা। একটা চোখ রেখেছে হাঙরের দিকে। মন্দিরের ওদিকে পৌঁছে নামল বালির মেঝেতে।

সামনেই পাথুরে দেয়ালে সরু ফাটল। ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে ভেতরে আলো ফেলল রানা। মনে হচ্ছে সরু টানেল।

সুড়ঙ্গের দুপাশের দেয়াল প্রায় বুজে গেছে প্রবালে। একবার কৌতূহলী চোখে রানাকে দেখল মিতা।

ওর বাহু ধরল রানা। ঢুকতে পারবে, কিন্তু ভেতরে হয়তো আঁটবে না তোমার ট্যাঙ্ক।

উত্তেজিত মিতা ভুলে গিয়েছিল পিঠে রয়েছে জোড়া-ট্যাঙ্ক। ও দুটো ওর কোমরের চেয়ে চওড়া। পিঠ থেকে ট্যাঙ্ক নামাল ও।

বাড়তি কোনও ঝুঁকি নেবে না, নরম সুরে বলল রানা।

আমার ভয় কীসের, কাছেই তো আছে ওস্তাদ, মৃদু হাসল মিতা। চট করে একবার ওদিকটা দেখেই ফিরব। রেগুলেটর খুলে ট্যাঙ্কদুটো পাথুরে মেঝেতে রাখল। ফ্লিপার নেড়ে ঢুকে পড়ল সুড়ঙ্গে। তবে পনেরো ফুট যেতেই সংকীর্ণ হয়ে উঠল টানেল।

দম ফুরিয়ে আসতেই বেরিয়ে এল। ট্যাঙ্কের সঙ্গে আটকে নিল রেগুলেটর। পাশ করেছি?

তাই তো মনে হচ্ছে, মৃদু হাসল রানা।

বারকয়েক বড় করে শ্বাস নিল মিতা, চাইছে ফ্রি ডাইভারদের মত হাইপারঅক্সিজেনেট করতে। কপাল ভাল হলে তিন মিনিট টিকবে পানির নিচে। এতে ঝুঁকি আছে, কিন্তু প্রফেসর হ্যারিসনের অনুবাদ, হিসেব-নিকেশ, পাবলোর উত্তেজিত হওয়া আর হাঙরের উপস্থিতি ওকে জানিয়ে দিচ্ছে, ওরা পেয়ে গেছে স্ফটিকের দ্বিতীয় মন্দির।

রেগুলেটর খুলে আবারও টানেলে ঢুকল মিতা। অলিম্পিকের সাঁতারুদের মত চলছে দুই পা। পৌঁছুল টানেলের সংকীর্ণ অংশে।

টানেলের দুদেয়ালে ছোটবড় সব মরা প্রবাল।

গা বাঁচিয়ে সাবধানে এগোল মিতা।

অপেক্ষা করো, আমিও আসছি, পেছন থেকে বলল রানা।

বাতাস অপচয় অনুচিত, তাই চুপ থাকল মিতা। আরেক ফুট যেতেই পাঁজরের হাড়ে কামড় বসাল দুপাশের দেয়ালের প্রবাল। সামনের পথ আা রও সরু।

এবার ফিরতে হবে। কিন্তু পাথুরে টানেলে ঘুরতেই পারল মিতা, দুদিক থেকে চেপে ধরেছে মৃত প্রবালের ধারালো, শক্ত সব ডাল। তলোয়ারের ডগার মত ঠেকে গেছে বুক ও পিঠে। এদিকে ফুসফুঁসে শুরু হয়েছে ব্যথা। ধড়াস্-ধড়াস্ লাফ দিচ্ছে হৃৎপিণ্ড। জোর খাটাতেই মুটমুট শব্দে ভাঙল কিছু মরা প্রবাল, কিন্তু তার ফলে খুলল না ফেরার পথ।

আসছি, পেছন থেকে জানাল রানা।

ঘাড় কাত করে মিতা দেখল, হঠাৎ ভুস্ সুস্ শব্দ তুলল কিছু বুদ্বুদ। ট্যাঙ্ক বাইরে রেখে টানেলে ঢুকেছে রানা।

মিতা আবছাভাবে টের পেল, কোমর ধরে টানছে কেউ। কিন্তু ওকে ছাড়ছে না মরা প্রবাল। চিরে দিচ্ছে ত্বক।

ভয় পেয়ে বলল মিতা, একমিনিট!

রানাও বুঝতে পেরেছে বিপদটা, একবার রক্ত বেরোলেই তা মিশবে সাগরে। ওই লোভনীয় গন্ধ পেলেই হামলা করবে হাঙরের পাল, বাঁচার উপায় থাকবে না ওদের। এবার কী করবে ভাবতে গিয়ে মিতার কোমর থেকে হাত পিছিয়ে নিল রানা।

ফুসফুসের প্রচণ্ড চাপ অসহ্য হতেই, মেয়েটার নাক-মুখ দিয়ে বেরোল একরাশ বুদ্বুদ। রানা খেয়াল করল, ছাতে আটকে না গিয়ে নিঃশব্দে ফেটে গেছে বুদ্বুদ!

পেছন থেকে মিতাকে আটকে রাখা মরা সব প্রবাল মট-মট করে ভাঙতে লাগল রানা। এদিকে কয়েকবার খাবি খেল দিশেহারা মিতা, গলগল করে পেটে ঢুকল নোনা জল। হঠাৎ শিথিল হলো ওর বিবশ দেহ। চোখ জুড়ে নামল ঘুটঘুটে আঁধার।

চোখা আরও কিছু প্রবালের শাখা ভাঙতেই শিথিল মিতাকে ছুটিয়ে নিতে পারল রানা। সামনে বেড়ে দুহাতে ওর সরু কোমর ধরল ও, তুলে নিয়ে যেতে লাগল ছাতের দিকে। চাপা স্বরে বলল, একটু ধৈর্য ধরো! ওপরে বোধহয় বাতাস আছে!

কোনও সাড়া দিল না অচেতন মিতা।

কয়েক সেকেণ্ড পর ছাতের কাছে ভেসে উঠল রানা। ভাবল, এই মন্দিরে বিষাক্ত গ্যাস থাকলে নির্ঘাৎ মরব। তবে দম নিতেই বুক ভরে উঠল তাজা অক্সিজেনে। ছাত থেকে কয়েক ফুট নিচে রানার কাঁধের পাশেই শেষ হয়েছে পুরু এক প্রাচীর, ওদিকে প্রশস্ত পাথুরে চাতাল। বেশ ওপরে ওটার ছাত। অচেতন মিতাকে চাতালে তুলল রানা। পানি ছেড়ে উঠে এল নিজেও।

হ্যাঁ, ওরা পৌঁছে গেছে দুই নম্বর মায়া মন্দিরের অভ্যন্তরে!

.

২৩.

দুপা চেয়ারে তুলে মৌজ করে রেডিয়ো শুনছে ফলক্যান বোট রেন্টালের এজেন্ট। মাথায় কাত করে বসানো বেসবল হ্যাট। কিছুতেই চোখে রোদ পড়তে দেবে না। গান শুনতে শুনতে কান আরও খাড়া হলো তার।

কাঠের জেটিতে পায়ের আওয়াজ, এই বুঝি এল কাস্টোমার!

মুখ তুলে তাকাল এজেন্ট। অবাক হতে হলো তাকে। এগিয়ে আসছে বেশ কয়েকজন চাইনিজ। পরনে কালো স্ন্যাক্স আর গাঢ় নীল শার্ট। মনে হলো না কেউ মাছ ধরতে এসেছে।

হোলা, নরম সুরে বলল এজেন্ট।

তিন চাইনিজের মধ্যে সবচেয়ে বড়জন ঢুকে পড়ল বুথে। অন্যরা দাঁড়িয়ে পড়েছে বাইরে।

সকালে ভাড়া দিয়েছ একটা বোট, এজেন্টকে জানাল প্রকাণ্ডদেহী চাইনিজ। এক বাদামি লোক, এক কালো লোক, এক সুন্দরী আমেরিকান মেয়ে আর এক বাচ্চা ছেলে।

কত মানুষকেই তো বোট ভাড়া দিই, বলল এজেন্ট।

ওদেরকে তোমার মনে থাকার কথা। ওই ছেলে ওদের কেউ নয়।

মনে পড়েছে, মাথা দোলাল এজেন্ট। ছেলেটা কারও সঙ্গে কথা বলে না।

খুশি হয়েছে চাইনিজ। পকেট থেকে বের করল এক বাণ্ডিল এক শ ডলারের নোট। ওখান থেকে দুশ ডলার নিয়ে এজেন্টের দিকে বাড়িয়ে দিল। তোমার কি মনে হয়, ওদের সঙ্গে অস্ত্র আছে?

দুএকটা স্পিয়ার গান থাকতেও পারে, বলল এজেন্ট।

গেছে কোথায় ওরা?

ওয়্যাহু মাছ ধরতে। সুন্দরীর বাদামি সঙ্গীর কথা মনে পড়তেই বলল এজেন্ট, সঙ্গে নিয়েছে ডাইভিং ইকুইপমেন্ট।

এবার তার হাতে দেয়া হলো আরেকটা এক শ ডলারের নোট। এজেন্ট বুঝে গেল, আজ ওর দারুণ দিন!

কোনওভাবে ট্র্যাক করতে পারবে?

মাথা নাড়ল এজেন্ট। না। আমরা বোটের জন্যে ওদের কাছ থেকে টাকা জমা রেখেছি। ওটা নষ্ট হলেও ক্ষতি হবে না কোম্পানির। তবে একটা কথা, ওদের সঙ্গে যে ফিউয়েল আছে, যেতে পারবে বড়জোর পঞ্চাশ মাইল। তা ছাড়া, অন্য ডকগুলোয় খবর নিলেই জানব কোন দিকে গেছে।

একবার কেশে নিল ধেড়ে চাইনিজ। তা হলে কোন্ দিকে। গেছে ওরা?

বন্দর থেকে বেরিয়ে সোজা উত্তরদিকে।

এজেন্টের হাতে আরেকটা এক শ ডলারের নোট দিল চাইনিজ। আরও কিছু জানলে বলল। তারপর দেবে তোমাদের কোম্পানির সেরা বোট।

না, আর কিছু জানি না, কাউন্টারের তাক থেকে চাবি নিল এজেন্ট। যেটা দিচ্ছে, ওটার আছে পাইলট হাউস ও ইনবোর্ড মোটর। ব্যবহার করা হয় সোর্ডফিশ শিকারে। বাদামি লোকটার বোটের মত একই গতি তুলতে পারবে বিশেষ এই বোট।

.

২৪.

 পায়ের সামান্য আওয়াজও প্রতিধ্বনি তুলছে মায়া মন্দিরের ভেতর। ঘুটঘুটে আঁধার। লেড ফ্ল্যাশলাইটের বাতি জ্বালল রানা।

একটু দূরে উঁচু গম্বুজ। এই ঘর বেশ বড়, চারদিকে পাথরের দেয়াল। সামনেই পাঁচ ধাপ সিঁড়ি নেমেছে শুকনো কোনও সুইমিং পুলের মত জায়গায়। মাঝে কাঠের বড় এক কফিন।

ফ্ল্যাশলাইট মেঝেতে রেখে মিতাকে কাত করে শোয়াল রানা, চাপড় দিতে লাগল পিঠে।

একটু পর খুকখুক করে কেশে উঠল মিতা। মুখ থেকে বেরোল দুই ঢোক পানি। তারপর বমি করল। খুলে গেছে। চোখ। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে উঠে বসল। তিক্ত চেহারা।

খুব অসুস্থ লাগছে? জানতে চাইল রানা।

মাথা নাড়ল মেয়েটা। নাইট্রোজেন নারকোসিস। বলা উচিত অক্সিজেন নারকোসিস। এই মিক্স ব্যবহার করেছি এর আগে মাত্র একবার। তাই বুঝিনি কী করা উচিত, আর কী নয়। ভেবেছি বেরোতে পারব টানেল ছেড়ে।

সত্যিই বেরোতে পেরেছ, তা হলে আর চিন্তা কী, হালকা সুরে বলল রানা।

লজ্জা পেয়ে ওর বাহুতে হাত রাখল মিতা। অনেক ধন্যবাদ। আজ তুমি না বাঁচালে পৌঁছে যেতাম ওপারে।

তাতে কমে যেত পৃথিবীর অনেক সৌন্দর্য, মৃদু হাসল রানা।

বেশ কিছু দিন ধরেই ঘুমাতে পারি না, বলল মিতা। চিনে অনেক ধরনের ড্রাগ দিয়েছে। ওদের হাতে বন্দি ছিলাম সব মিলে দশ দিন। তবে মনে রাখতে পেরেছি মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা।

শরীর থেকে ড্রাগ যেতে সময় লাগবে, বলল রানা। টর্চ তুলে চারপাশে আলো ফেলল ও।  

নিমজ্জিত মন্দিরের স্থাপত্য দেখার মত। ছাত নিখুঁত পাথরে তৈরি, কারুকাজ করা। হাজারো বছর ধরে আটকে রেখেছে। খাঁটি বাতাস। এখানে পৌঁছুতে হলে ব্যবহার করতে হবে সরু টানেল। আপাতত হামলা করতে পারবে না হাঙর।

একপাশে আলো পড়তেই ওরা দেখল হায়ারোগ্লিস্।

এখানে এলে খুবই খুশি হতেন প্রফেসর, বলল মিতা।

সিঁড়ি বেয়ে নেমে মস্তবড় কফিনের পাশে থামল রানা। পিছু নিয়েছে মিতা।

ঢাকনি খুলে দেখব, বলল রানা। তোমার আপত্তি নেই তো?

জবাব না দিয়ে ওর সঙ্গে হাত লাগাল মিতা। খুব সাবধানে ভারী কাঠের ঢাকনি,তুলে মেঝেতে নামিয়ে রাখল ওরা।

.

শান্ত সাগরে বোটে চুপচাপ বসে আছেন প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন। মন খারাপ। অবাক কাণ্ড, রানা বিদায় নিতেই ভীষণ ভয় লাগছে তাঁর। বাচ্চা ছেলেটা একটু দূরে বসেছে। কিছু জানতে চাইলে জবাব দেয় না। সত্যিই, তিনি বড় একা।

ত্রিশ সেকেণ্ড পর পর দেখছেন জিপিএস স্ক্রিন। নিশ্চিত হতে চাইছেন হালকা বাতাস বা স্রোত দূর থেকে দূরে সরিয়ে নেবে না তাকে। আবছা দেখছেন সবজেটে তীর। বারকয়েক মনে হয়েছে, বিনকিউলার চোখে তুলে দেখবেন ওদিকটা। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়েছেন। মন বলেছে, বিনকিউলার ব্যবহার করলেই হাজির হবে মস্ত কোনও বিপদ।

আরও কিছুক্ষণ পর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। বিনকিউলার চোখে লাগিয়ে দেখলেন তীর।

না, ওদিকে কেউ নেই।

আবার মন দিলেন পাবলোর ওপর। বোটের মাঝখানে বসে আছে ছেলেটা, পরনে লাইফ জ্যাকেট।

বুঝলে, বললেন প্রফেসর, আমি বোধহয় পাগলই হয়ে যাচ্ছি। চোখের সামনে কীসব দেখি। আবার শুনতে পাই। ছেলেটা দেখছে সানগ্লাসের উঁটি। খুটখুট আওয়াজ তুলল। না, ছেলে, আমি এত কিছু জেনেও হেরে গেলাম তোমার ওই প্লাস্টিকের সানগ্লাসের ডাঁটির কাছে!

উপসাগরের দূরে বিনকিউলার তাক করলেন হ্যারিসন।

মাঝদুপুর। রুপালি-নীল আকাশ ঝরাচ্ছে গনগনে রোদ। তবে পুবে বিশাল এক মেঘ। অনেক দূরে। ধীরে ধীরে ছেয়ে ফেলছে চারপাশ। এখন ঝড় না এলেই বাঁচা যায়!

কী হলো, বাপু? আনমনে বললেন প্রফেসর। তোমরা কি সারাদিন সাগরের নিচে পার করে দেবে?

নতুন করে শুরু হলো ঝিরঝিরে হাওয়া।

আজ কথা বলছ না কেন, হান্না? আনমনে ভাবলেন প্রফেসর। জবাব দিল না কেউ। উদাস হয়ে পাবলোকে দেখলেন তিনি। ওর দিকেই ঘুরে তাকাল ছেলেটা। বোধহয় কিছুই শোনেনি।

কথা বলো না কেন? জানতে চাইলেন হ্যারিসন।

এবার শুনলেন গম্ভীর আওয়াজ। ওটা এসেছে পুবের মেঘ থেকে দূরে ওই মেঘ। ছড়িয়ে পড়ছে দক্ষিণ আকাশে। বিনকিউলার দিয়ে আবার উপকূল দেখলেন প্রফেসর। ঝড় আরম্ভ হলে তীরে পৌঁছানো কঠিন হবে।

নতুন কিছু চোখে পড়ল তাঁর।

দুটো বোট। দ্রুতগামী। আসছে তাঁদের দিকেই। সময় লাগবে পৌঁছুতে। এখনও আছে অন্তত পাঁচ বা ছয় মাইল দূরে।

সর্বনাশ! বিনকিউলার নামিয়ে ফিসফিস করলেন প্রফেসর। এবার কী করব? পাবলোকে দেখলেন।

পাত্তা দিল না পিচ্চি।

অগ্রসরমাণ দুই বোটের ওপর আবারও চোখ রাখলেন হ্যারিসন। ওগুলোর পেছনে মোরগের লেজের মত উঠছে পানি। হয়তো এসব বোট টুরিস্টদের, কিন্তু প্রফেসরের মনে হলো, এরা আসছে তাদের বারোটা বাজাতেই!

চেয়ার ছেড়ে পাবলোকে তুলে নিলেন হ্যারিসন, প্যাসেঞ্জার সিটে বসিয়ে ভালভাবে বেঁধে দিলেন সিটবেল্ট। পরক্ষণে গিয়ে চালু করলেন ইঞ্জিন।

.

গভীর মনোযোগ দিয়ে লাশটা দেখছে রানা ও মিতা। ওটা সাধারণ সাদা গজ কাপড় দিয়ে মোড়ানো। কফিনও আহামরি কিছু নয়। দুপাশে দুটো করে দণ্ড, বয়ে নেয়ার জন্যে।

লাশের করোটির ওপরের সাদা কাপড় খুলে ফেলল মিতা।

লোকটার চোয়াল ছিল জাগুয়ারের চোয়ালের মতই।

 মায়ান রাজা। কিংবা ভিনগ্রহের কেউও হতে পারে।

কফিনের একদিকের তাকে রাজকীয় পোশাক। সূক্ষ্ম সোনার তার দিয়ে কারুকাজ করা। রাজার একহাত বুকের ওপর। মুঠোর ভেতর পানপাত্র। নাভির ওপর কাঁচের মত কিছু। ওটা চিনে ফেলল রানা ও মিতা। ব্রাযিলে পাওয়া স্ফটিকের মতই একই জিনিস। আকারে হবে আপেল বরইয়ের সমান।

রানার ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় ঝিকমিক করছে স্ফটিক। সতর্ক চোখে লাশের আশপাশ ভাল করে দেখে নিল ও।

না, কোথাও বুবি ট্র্যাপ নেই। এ

একবার রানার চোখে চোখ রাখল মিতা, তারপর লাশের নাভির ওপর থেকে তুলে নিল স্ফটিক। ওর মনে হলো, জিনিসটা অস্বাভাবিক ভারী। বেশ উষ্ণ। বিচ্ছুরণ করছে কোনও শক্তি। অন্তরটা বলল, কীভাবে যেন অনেক ক্ষমতা পেয়ে গেছে ও।

তুমি ঠিক আছ তো? জানতে চাইল রানা।

হ্যাঁ, মৃদু স্বরে বলল মিতা। ভাবতেই পারছি না, যেজন্যে এত দূরে এসেছি, পেয়ে গেছি সেটা। সাবধানে বেল্ট থেকে পাউচ নিয়ে ওটার ভেতর স্ফটিক রাখল ও। পাউচ ঝুলিয়ে নিল বেল্টে। এবার ব্যবহার করল প্রাচীন আমলের ফিল্ম ক্যামেরার মত দেখতে একটা ক্যামেরা। ওটা দিয়ে তুলছে ছবি।

ব্রাযিলের জঙ্গলে এক পর্যায়ে নষ্ট হয়েছিল রানাদের প্রায় সব বৈদ্যুতিক ইকুইপমেন্ট। তবে এই সেকেলে যন্ত্রে বৈদ্যুতিক কিছুই নেই।

মিতার ছবি তোলার জন্যে ঠিক দিকে আলো ফেলল রানা। কফিন, ঢাকনি, লাশ ও পোশাকের ছবি নিল মিতা। বাদ পড়ল না হায়ারোগ্লিস্। এরপর মন দিল মন্দিরের অন্যদিকে।

সবকিছুরই ফিল্ম নেয়ার পর রানার দিকে তাকাল মেয়েটা।

মাথা দোলাল রানা। এবার যেতে হবে।

সাগর সমতলে নিরাপদে উঠতে হলে চাই অন্তত বিশ মিনিট ডিকমপ্রেশন। অথচ বাইরে একপাল হাঙর।

ক্যামেরা গুছিয়ে রাখছে মিতা।

টানেলে চলে গেল রানা। একটু পর ফিরল চাতালের পাশে। দুহাতে ওদের দুজনের এয়ার ট্যাঙ্ক।

ডাইভিঙের জন্যে তৈরি হয়ে নিল ওরা।

আরেকবার প্রেশার গেজ দেখল রানা। বিশ মিনিটের বেশি বাতাস পাব। চলো, এবার বেরিয়ে যাই।

ঝুপ করে পানিতে নামল মিতা। বিশ সেকেণ্ড পর ওর পিছু নিয়ে মন্দির থেকে বেরোল রানা। ভাল লাগল আবারও স্বাভাবিক আলোয় ফিরতে পেরে। তখনই খড়মড় করে উঠল ইয়ারপিস। যোগাযযাগ করতে চাইছেন প্রফেসর হ্যারিসন।

..আসছে… দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে… শুনছ তোমরা? দুটো বোট! হাই স্পিড! সোজা আমাদের…

.

২৫.

 মায়া মন্দিরের টানেল থেকে বেরিয়েই ডিপিভিতে চেপে বসেছে রানা ও মিতা। স্টার্টার টিপে দিতেই চালু হলো প্রপেলার। দেরি না করে রওনা হয়ে গেল ওরা। উঠছে ওপরে। কপাল ভাল, সাগরতলে এতক্ষণ নেই যে, সত্যিকারের ডিকমপ্রেশন করতে হবে। তবে, রকেটের গতি তুলে উঠলে পরে বিপদে পড়বে।

কোনাকুনিভাবে সাগর সমতলের দিকে চলেছে ওরা। সময় দিচ্ছে শরীর থেকে নাইট্রোজেন দূর হবার।

আর বড়জোর এক বা দুমিনিট, তারপর দেখবে প্রফেসর হ্যারিসনের বোট। তখন কাজ শেষ হবে ডিপিভির।

সাবধান! হঠাৎ বলে উঠল রানা।

ওর কথা শুনে ঘাড় কাত করে তাকাল মিতা। কী যেন সাঁই করে গেল মাথার ওপর দিয়ে।

হ্যামারহেড!

পিছু নিল দ্বিতীয়টা। ঘেঁষে গেল মিতাকে। ডানদিকে ছিটকে যেতে গিয়েও সামলে নিল মেয়েটা।

দূর অন্ধকারে হারিয়ে গেছে হাঙরটা।

ওটার মতই লাইন ধরে আসছে একদল হ্যামারহেড!

একেকটা যেন মিসাইল!

.

 সাগরসমতলে দুই বোটের ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছেন না প্রফেসর হ্যারিসন। তুমুল গতি তাদের।

ট্রান্সমিটারের মাউথপিস খপ করে ধরে চিৎকার করে উঠলেন হ্যারিসন, শুনছ? জলদি! উঠে এসো! ওরা বড়জোর দুমাইল দূরে!

বিপদ কমাতে চাইলে ফুল স্পিডে পালাতে হবে পশ্চিমে। ওদিকেই আছে মেক্সিকোর কোস্ট গার্ডদের বোট। থাকতে পারে হেলিকপ্টার। ওগুলো ভয় দেখিয়ে তাড়াতে পারবে শত্রুদেরকে।

এখনই উচিত রওনা হওয়া, কিন্তু বন্ধুদের ফেলে যেতে আপত্তি আছে প্রফেসরের। থ্রটল পিছিয়ে নিয়ে বোট ঘোরালেন তিনি। আবারও ফিরছেন ডাইভ যোন লক্ষ্য করে। ট্রান্সমিটারের মাউথপিস মুখে তুলে বললেন, তোমাদেরকে যেখানে ফেলে এসেছি, ওখান থেকে আধমাইল দূরে আমি। যতক্ষণ পারি অপেক্ষা করব তোমাদের জন্যে।

হঠাৎ হাত থেকে সানগ্লাস ফেলে দিল পাবলো। সিটবেল্ট খুলে উঠে দাঁড়াল। চোখ সোজা সামনের সাগরে।

.

হাঙরের পালের হামলা থেকে বাঁচতে বামে বাঁক নিল মিতা, চলেছে নিচে। কিন্তু ডিপিভির প্রপালশন যথেষ্ট নয়। অন্তত তিন থেকে চার গুণ গতি তুলে আসছে হাঙরগুলো।

মিতাকে পাশ কাটিয়ে রকেটের মত গেল ছোট কয়েকটা হ্যামারহেড। পরক্ষণে ওপর থেকে ডাইভ বারের মত নামল বড় একটা। তো লাগাল মিতার মেরুদণ্ডে।

ভীষণ ভয় পেয়ে রানাকে খুঁজল মেয়েটার চোখ।

একটু পিছিয়ে পড়েছে বলে ডিপিভির পূর্ণ গতি ব্যবহার করছে রানা। তবে ওকে মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না হাঙরের পাল। কারণটাও বুঝতে পারছে রানা। স্ফটিক মিতার কাছে।

ওই একই কথা ভেবেছে মিতা। ওটা ফেলে দিলেই কাটবে বিপদ, কিন্তু মরে গেলেও হাতছাড়া করবে না স্ফটিক। বহু কষ্টে পাওয়া জিনিস।

এখন পর্যন্ত কোনও হাঙর চায়নি কামড়ে দিতে। আসলে সেনসরি ওভারলোড হওয়ায় হতভম্ব ওরা। একের পর এক ওয়েভ আছড়ে পড়ছে ওদের মগজে।

আরেকটা বড় হাঙরের গুঁতো এড়াতে গিয়ে নতুন করে বাঁক নিল মিতা। কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ টিকবে না। চারপাশে হাঙর! কাছেই ঝলসে উঠছে সাদা পেট, মস্ত হাঁ করতেই দেখা যাচ্ছে। এবড়োখেবড়ো দাঁত!

মিতার ডান পায়ে গুঁতো দিয়ে গেল আরেকটা। পরেরটা প্রায় একইসময়ে ঘষা দিল পাঁজরে। ছিটকে গেল মিতা। চোট লেগেছে ঘাড়ে।

অপেক্ষা করো, আসছি! ব্যস্ত সুরে বলল রানা।

ওরা স্ফটিক চায়, দুর্বল কণ্ঠে বলল মিতা।

পরক্ষণে ওর ওপর হামলে পড়ল তরুণ একদল হাঙর। ওকে মাঝখানে রেখে ঘুরছে সিলিং ফ্যানের পাখার মত। ভীষণ ভয় পেয়েছে মিতা। টর্পেডোর মত দূর থেকে এল বড় এক হ্যামারহেড। সোজা গুতো দিল ডিপিভির বুকে। হাত থেকে হ্যাঁণ্ডেলবার ছুটে গেল মিতার। নিচের দিকে রওনা হলো হলদে যন্ত্রটা।

যান্ত্রিক সাহায্য হারিয়ে গেছে, নিজেকে সামলে নিয়ে ওপরে তাকাল মিতা। ওই যে একটু দূরে সাগর সমতল! কিন্তু পা-দুটো ছোঁড়ার আগেই খপ করে ওর কোমর কামড়ে ধরল কী যেন!

ঝট্‌ করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল মিতা।

একহাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে ডিপিভির গতি বাড়াল রানা। কিন্তু ওদের দিকে এল আরেক দল হাঙর। ব্যথা এবং মৃত্যুর জন্যে তৈরি হয়ে গেল মিতা। তেড়ে এল পাশাপাশি দুটো হাঙর, পেছনেই আরেকটা।

কিন্তু তখনই সাগর সমতলে উঠে এল রানার ডিপিভি, সরাসরি ছুটল প্রফেসরের বোট লক্ষ্য করে।

বিড়বিড় করে বলল মিতা: অনেক ধন্যবাদ!

গতি কমছে হ্যারিসনের বোটের। কিছুক্ষণ পর থামল রানা ও মিতার পাশে।

বোটের মই বেয়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ হুমড়ি খেল মিতা। সাগর চিরে উঠে এসেছে সবুজ-ধূসর কী যেন! টর্পেডোর মত লাগল ওর কোমরে!

মিতাকে ওপরে ঠেলছিল রানা, ছুটে গেল ওর দুহাত। হতবাক হয়ে দেখল, দাঁতের সারির মাঝে মেয়েটাকে রেখে সরসর করে পিছিয়ে সাগরে নেমে পড়ল মস্তবড় হাঙর!

মই বেয়ে দৌড়ে ডেকে উঠল রানা। পিছু নিন, প্রফেসর!

থ্রটল খুলে বোট ঘুরিয়ে নিলেন হ্যারিসন।

এদিকে খপ করে ডেক থেকে স্পিয়ারগান নিল রানা।

.

খসে পড়ে গেছে মাস্ক, বিশাল হাঙরের করাল মুখে ছেঁড়া পুতুলের মত ঝুলছে মিতা, সই-সাঁই করে পেছনে পড়ছে নীল সাগর। ওর মনে হয়েছে, কোমরে বেদম ধাক্কা দিয়েছে দ্রুতগামী ট্রেন। এবার বাঁচবে না কোনওভাবেই। গা মুচড়ে নিজেকে মুক্ত করতে চাইল। কিন্তু কাজটা অসম্ভব। হাঙরের ত্রিকোণ মসৃণ মাথা ধরে নিজেকে ছোটাতে পারল না। এয়ার ট্যাঙ্ক কামড়ে ধরে রেখেছে দানবটা।

হঠাৎ কাত হয়ে গতি কমাল ওটা। এরই ভেতর মিতাকে সরিয়ে নিয়েছে বোট থেকে কমপক্ষে দুশ ফুট। এয়ার ট্যাঙ্কে কামড় ছেড়ে নতুন আগ্রহে মেলল আরও বড় হাঁ। এই সুযোগে দ্রুত পা নেড়ে সরে যেতে চাইল মিতা। হাঁফ লেগে গেছে ওর। পাগলের মত চারপাশে তাকাল বোটের জন্যে।

ওই যে! ঘুরে আসছে বোট ওর দিকে!

 মিতার দুপায়ের মাঝে মাথা গুঁজে দিল মস্ত হাঙর, পরক্ষণে ছিটকে ফেলল দূরে! নতুন করে ঝপাস্ করে সাগরে পড়ল মিতা। ব্যথা পেয়েছে। ভেসে উঠেই দেখল হাঙরের গুঁতো খেয়ে কেটে গেছে কপাল। জলে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত!

ভীষণ ভয় পেল মিতা। ঝট করে পিঠ থেকে খুলে ফেলল এয়ার ট্যাঙ্ক, পরক্ষণে প্রাণপণে সাঁতরাতে লাগল বোটের দিকে। পানি থেকে তুলে রাখতে চাইছে মুখ।

.

বোট থেকে মিতাকে দেখছে রানা, হাতে স্পিয়ারগান। কেটে গেছে মেয়েটার কপাল। রক্তের গন্ধে পিছু নিয়েছে বেশ কয়েকটা হাঙর। সাগর চিরে আসছে ত্রিকোণ ডর্সাল ফিন!

ঝপাস করে বোট থেকে কার্গো নেট ফেলল রানা। জলদি, প্রফেসর!

সর্বোচ্চ গতি তুলে মিতার দিকে চলেছে বোট।

পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আগেই নেট খামচে ধরল মিতা।

এদিকে গায়ের সমস্ত জোর ব্যবহার করে নেটসহ ওকে বোটে তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে রানা।

তিন সেকেণ্ড পর জালে জড়িয়ে মৎস্যকুমারীর মত বোটে উঠে এল মিতা। একইসময়ে চিত হয়ে সাগর ছেড়ে বোটে উঠল এক হাঙর। এপাশ-ওপাশ করছে পিছিয়ে যাওয়ার জন্য। ওটার ভারী ওজনের কারণে কাত হলো বোট। হুড়মুড় করে উঠে এল অনেকটা পানি। নানান দিকে মাথা ঘোরাচ্ছে হাঙর, কিছু কামড়ে দিতে বেরিয়ে এসেছে দুই সারি দাঁত। কষে হাঙরের মাথায় লাথি মারল রানা, পরক্ষণে তুলে নিল স্পিয়ারগান।

কিন্তু আরেক ঝাঁকি মেরে বোট ছেড়ে সাগরে নেমে গেল হাঙর, বিশাল এক ঝল্পাস্ আওয়াজ তুলে।

প্রফেসর, সরে যান এখান থেকে! নির্দেশ দিল রানা।

প্রফেসর থ্রটল খুলে দিতেই লাফিয়ে সামনে বাড়ল বোট।

রানা খেয়াল করল, পিছু নিয়েছে পাল পাল হাঙর!

এদিকে জাল খুলে সত্যিকারের মৎস্যকুমারীর মতই উঠে বসল মিতা। কাঁপা গলায় বলল, ক্যাপ্টেন দিমিতভ মিথ্যা বলেননিঃ হাঙর আর কিলার ওয়েইল পাগল হয়ে যায় স্ফটিকের কাছাকাছি হলে! আমাদের কপাল ভাল যে বেঁচে গেছি!

মিতার পাশে বসে পড়েছে পাবলো। পাউচে হাত রাখল। এই তো সাইরেন। সাইরেন!

ছেলেটা উত্তেজিত। কাঁধে হাত রেখে ওকে শান্ত করতে চাইল মিতা। তাতে কাজ হচ্ছে না দেখে উঠে গিয়ে লকার খুলল, ভেতর থেকে নিল সীসা দিয়ে বাঁধানো বাক্স। ওটা এ ধরনের স্ফটিক রাখতেই তৈরি। বাক্সে রেখে ওটা ব্যাকপ্যাকে জল মিতা।

পাশে থেমে ফিসফিস করল ছেলেটা, সাইরেন। সাইরেন।

লকার আটকে দিল মিতা। হাত বুলিয়ে দিল ছেলেটার চুলে।

ওদিকে দূরে চেয়ে আছে রানা।

ওর চোখ অনুসরণ করল মিতা। দেখল, তুমুল বেগে ছুটে আসছে দুটো বোট। আর এক মাইল দূরেও নেই এখন। সোজা এগোচ্ছে এই বোটের দিকে।

রানার দিকে তাকাল মিতা।  

নিচু স্বরে বলল রানা, সবচেয়ে কঠিন কাজটা বাকি এখন। এদেরকে এড়িয়ে উঠতে হবে তীরে।

.

২৬.

জায়গাটা নেভাডার পশ্চিম মরুভূমি। গুড়গুড় আওয়াজ তুলে পুরনো রাস্তা ধরে চলেছে ভেহিকেলের কনভয়। মাঝে রাখা হয়েছে কেমোফ্লেজ রঙ করা আঠারো হুইলের এক ট্রাক। সামনে ও পেছনে মেশিনগানবাহী হামভি। আকাশে এক শ ফুট ওপরে উড়ছে দুটো মিসাইল সজ্জিত ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার।

আরও পঞ্চাশ মাইল এগোবার পর কনভয় পৌঁছল ইয়াকা পর্বতে।

ঠিক হয়েছিল এ এলাকায় ফেলা হবে দেশের সব নিউক্লিয়ার বর্জ্য, কিন্তু হামলে পড়ল হাজারে হাজারে পরিবেশবাদীরা। কেস হলো আদালতে। বেশ কয়েক বছর চলল সেই মামলা। এদিকে পাল্টে গেল রাজনৈতিক পট। ফলে নির্জন পড়ে রইল ইয়াকা মাউন্টেন। পলিটিশিয়ানরা ভুলে যেতে চাইলেন, দেশের বেশিরভাগ রেডিও অ্যাকটিভ মেটারিয়াল রয়ে গেছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। হালকাভাবে পাহারা দেয়া হচ্ছে এক শ সাতটি রিঅ্যাক্টর সাইটের বিপুল বর্জ। কারও খেয়াল নেই দেশের সবচেয়ে জনবহুল এলাকা থেকে বড়জোর কয়েক মাইল দূরে ওসব সাইট। যারা আপত্তি তুলেছিল ইয়াকা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে, তারা খেয়ালও করল না অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ছিল নির্জন পাহাড়ে বর্জ্য জমিয়ে রাখা।

সেই থেকে ফাঁকা পড়ে আছে ইয়াকা মাউন্টেন। কাজেই সিআইএ থেকে বলে দেয়া হয়েছে, ইচ্ছে করলে এই এলাকা ব্যবহার করতে পারবে এনআরআই। এ কারণেই এনআরআই ভল্ট থেকে বের করে ব্রাযিল স্টোন তুলে দেয়া হয়েছে এক মিলিটারি সি-১৭-এ। চারঘণ্টা আকাশপথে চলার পর এনআরআই চিফ নেমেছেন নেভাডার এয়ারফিল্ডে। ওখান থেকে রওনা হয়ে মায়ান স্ফটিক পৌঁছে গেছে ইয়াকা মাউন্টেনে।

যাত্রার প্রতিটি পদে সতর্ক ছিল সবাই। কখন কম বৈদ্যুতিক ফেয চলবে, সেটা হিসাব কষে সরানো হয়েছে স্ফটিক। আবার ম্যাগনেটিক ফিল্ড বাড়লে ওটাকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে নিরাপদ জায়গায়। বিপদের সম্ভাবনা সবসময়ই ছিল, তবে পরেরবার বা হওয়ার সাত ঘণ্টা আগেই চলে এসেছে স্ফটিক পাহাড়ি বাঙ্কারের কাছে।

সেমিট্রাকের ক্যাবে বসে মাথার ওপর দিয়ে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার যেতে দেখলেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান। তীরের মত চলেছে মিলিটারি কপ্টার। মৃদু হাসলেন ব্রায়ান। তার মনে হয়নি এত সতর্কতার দরকার ছিল।

কনভয় চলেছে মিলিটারি নিয়ন্ত্রিত এলাকার মাঝ দিয়ে অচেনা সড়কে। তাদের ওপর হামলা করতে চাইলে পাড়ি দিতে হবে কমপক্ষে এক শ মাইল মরুভূমি। এ দেশের সবচেয়ে নিরাপদ বেস এটা। চারপাশে নেলিস বমিং রেঞ্জ। আকাশ পাহারা দিচ্ছে মিসাইল সজ্জিত হেলিকপ্টার ও এফ-টোয়েন্টি-টু র‍্যাপ্টর যুদ্ধবিমান। ব্রায়ানরা এখানে আসার আগেই ক্যামেরা ও ইনফ্রারেড সেন্সর ব্যবহার করে প্রতিটি ইঞ্চি পরীক্ষা করেছে আর্মি। এমপিদের জানানো হয়েছে, অনুপ্রবেশকারী দেখলেই দেরি না করে গুলি করতে হবে। এত সতর্কতার মূল কারণ, মরুভূমির এদিকটায় রয়েছে গ্রুম লেক। এখানেই পরীক্ষা হয় স্টেল্থ বারের টপ সিক্রেট ফ্লাইট। এই এলাকার নিরাপত্তায় কোনও খুঁত রাখা হয়নি, তার আরেকটা কারণ এদিকেই রয়েছে কুখ্যাত এরিয়া ফিফটি-ওয়ান।

ব্রায়ানরা পৌঁছে গেছেন গন্তব্যের খুব কাছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। রুক্ষ, পরিত্যক্ত বালুমাটিতে হাজার হাজার বোমার গর্ত। পাথুরে পাহাড়ও খুব কুৎসিত। হাজার ধরনের বোমার পরীক্ষা করতে গিয়ে এই দশা হয়েছে এই এলাকার। বোমাগুলোর ভেতর রয়েছে ডেইযি কাটার থেকে শুরু করে নিউক্লিয়ার ওঅরহেড।

শুকনো মরুভূমির বুকে কোথাও নেই প্রাণের কোনও চিহ্ন। জন্মায়নি একটা ঘাসও। এলাকা ছেড়ে উধাও হয়েছে ক্যাকটাস। এই এলাকা যেন ভিন্ কোনও গ্রহ, অথবা চাঁদের বুক। এ কারণেই ইউএফও জাঙ্কিরা ভাবে, এখানে রাখা হয়েছে এলিয়েনদেরকে, যাতে সহজেই জীবন কাটাতে পারে তারা।

ট্রেইলারের দরজা খুলে মাথা বের করলেন এক সায়েন্টিস্ট। স্যর, একটা সমস্যার ভেতর পড়েছি।

বুক ধক্ করে উঠল ব্রায়ানের। কী হয়েছে?

অপ্রত্যাশিত এনার্জি ওয়েভ, বললেন বিজ্ঞানী, বাড়ছে খুব দ্রুত!

.

মেক্সিকো উপসাগর। সামনে থেকে দুটো বোট ছুটে আসতে দেখছে মাসুদ রানা।

আমাদেরকে বন্দি করবে, বেসুরো কণ্ঠে বললেন হ্যারিসন।

রানার হাতের ইশারায় ড্রাইভিং সিট ছেড়ে সরে গেলেন আর্কিওলজিস্ট। সিটে বসে ইঞ্জিনের শক্তি একটু কমিয়ে দিল রানা, যেন থামবে। পরমুহূর্তে প্রফেসরকে চমকে দিয়ে সোজা ছুটল বোটদুটোর দিকে। খুলে দিয়েছে পুরো থ্রটল।

ক্রুদ্ধ গর্জন ছাড়ছে ইঞ্জিন। দমকা হাওয়া ও পানির কণা এড়াতে নিচু হয়ে বসেছে রানা, তুমুল বেগে চলেছে দুই বোটের দিকে যেন চাইছে মুখোমুখি সংঘর্ষ হোক। অপেক্ষাকৃত বড় ওয়্যাহু বোটের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে দুপাশে সরে গেল সোর্ডফিশ শিকারি বোট দুটো।

গোঁয়ার গোবিন্দ ভঙ্গি নিয়ে রানাকে এগোতে দেখে মিতাকে বললেন প্রফেসর হ্যারিসন, মেঝেতে শুয়ে পড়ো, মিতা। আমিও তাই করছি।

পাবলোকে পাশে নিয়ে ডেকে শুয়ে পড়ল মিতা।

একটু দূরে হ্যারিসন।

এদিকে ড্রাইভিং সিটে আরও ঝুঁকে বসল রানা।

সামনের সোর্ডফিশ শিকারিরা সরে জায়গা দেয়ার পরও নাক ঘুরিয়ে ডানদিকেরটাকে ধাওয়া করল ওয়্যাহুশিকারি রানা। গতি কমপক্ষে সত্তর থেকে আশি নট। শক্ত হাতে হুইল ধরে রেখেছে ও।

ওকে উন্মাদ ধরে নিয়ে আরও সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ডানের বোটটা। সামান্য একটু বাঁয়ে কেটে সোর্ডফিশ শিকারির একেবারে গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল রানা। পেছনে পড়ল দুই বোট। অন্তত দশটা গুলি গেল রানার মাথার ওপর দিয়ে। যদিও ওগুলোর লক্ষ্য ছিল আউটবোর্ড ইঞ্জিন।

কিন্তু চলন্ত ও দুলন্ত ডেক থেকে লক্ষ্যস্থির প্রায় অসম্ভব।

ইঞ্জিনের আওয়াজ বদলে গেল কি না তা বুঝতে কান। পাতল রানা।

না, সবই ঠিক আছে।

অনেক পেছনে পড়েছে দুই শত্ৰুবোট।

কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল রানা। পথ ছাড়তে গিয়ে বাধ্য হয়ে উত্তরদিকে গেছে একটা বোট। অন্যটা কোর্স ঠিক করে নতুন উদ্যমে আবার শুরু করেছে ধাওয়া।

আর কিছু করার নেই রানার।

 শুরু হয়েছে তীরে পৌঁছুবার রেস।

নেভাডার রুক্ষ মরুভূমি চিরে চলেছে কনভয়। বিজ্ঞানীর আতঙ্ক ভরা চোখে তাকালেন ব্রায়ান। এসব কী বলছেন আপনি? এনার্জি বাড়ছে কী করে?

জানি না, বললেন বিজ্ঞানী।

সিট ছেড়ে উঠতে চাইলেন ব্রায়ান, কিন্তু বাধা দিল সিটবেল্ট। কিন্তু এ তো অসম্ভব! বাঁধন খুলে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। কী করবেন বুঝছেন না। প্রায় কিছুই জানতে পারেননি তাঁরা ব্রাযিল স্টোনের ব্যাপারে!

ট্রাকের পেছনে গিয়ে ঢুকলেন ব্রায়ান। ভার্জিনিয়া ল্যাবের ক্ষুদ্র সংস্করণ তৈরি করা হয়েছে ট্রাকের ভেতর। তাঁর স্টাফরা মনিটর করছে জ্বলজ্বলে স্ফটিক। কমপিউটারের স্ক্রিনে রিডআউট দেখলেন তিনি। অন্তত চারগুণ বেড়ে গেছে এনার্জি।

কখন থেকে শুরু হয়েছে? জানতে চাইলেন।

পাঁচ মিনিট আগে থেকে, বললেন বিজ্ঞানী, প্রথমে খেয়াল করলাম, নতুন এনার্জি ডিসট্রিবিউশন প্যাটার্ন। বাড়তে লাগল এনার্জি। অনেক কমল ব্যাকগ্রাউণ্ড রিডিং। বদলে গেল কাউন্টডাউন সিগনাল। অনেক জটিল আর অনিশ্চিত হয়ে উঠল।

কী হয়েছে জানি না, তবে কিছু পাল্টে দিয়েছে একটু আগের সিগনাল, বলল ব্রায়ানের স্টাফ। হয়তো আপনাআপনি আগের মতই শান্ত হবে।

ধূসর চুলে হাত বোলালেন ব্রায়ান। লক্ষ করলেন স্ক্রিনে পাওয়ার কার্ভ। আরও বাড়ছে এনার্জি। ডিসচার্জের সময় এমনই করে স্ফটিক। কিন্তু এ মুহূর্তে চার্টের বেঞ্চমার্ক লেভেল খুব কম।

স্ফটিকের সঙ্গে সংযুক্ত কমপিউটার ফ্ল্যাশ করছে লাল বাতি, সেইসঙ্গে আছে জোরালো বিপবিপ সতর্কসঙ্কেত। বাড়ছে স্ফটিকের এনার্জি লেভেল। ধূসর হলো স্ক্রিন। রেডিওজুড়ে শুরু হয়েছে স্ট্যাটিক।

ড্রাইভারের উদ্দেশে চিৎকার করে বললেন ব্রায়ান, আশপাশে কোনও বাঙ্কার আছে?

কথা শুনে হতভম্ব হয়েছে এয়ারফোর্সের সার্জেন্ট। মিস্টার ব্রায়ান? কী বললেন?

এই জিনিস লুকাবার মত কোনও জায়গা আছে?

না, স্যর, বলল ড্রাইভার। এটা খোলা রাস্তা।

.

শক্ত করে পাবলোকে জড়িয়ে ধরে ডেকে শুয়ে আছে মিতা। ঝড়ের গতি তুলে তীর লক্ষ্য করে বোট ছুটিয়েছে মাসুদ রানা। প্রথমে সরে গেল ডানে, তারপর বামে। সহজ টার্গেট দেবে না। পিছন থেকে ধাওয়া করছে দুই শত্রুবোট।

তুমুল বেগ তিন বোটের, কিন্তু বারবার বাঁক নিতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ছে রানারা।

এখন মাত্র পঞ্চাশ গজ পেছনে দুই বোট। দুপাশে সরে গিয়ে গুলি করছে ইঞ্জিন লক্ষ্য করে।

পাঁচ মিনিটের ভেতর বন্দরে পৌঁছবে ওরা। রানা আশা করছে, ব্যস্ত জায়গায় যা খুশি করতে পারবে না পেছনের লোকগুলো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ওরা ওই পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে কি না, তার ঠিক নেই। মাত্র একটা বুলেট খতম করে দিতে পারে আউটবোর্ড মোটর।

রানার দুফুট পেছনের ডেকে বিঁধল রাইফেলের গুলি। কানের পাশ দিয়ে গেল আরেকটা। আরও ঝুঁকে বসল রানা। পেছনে শুনল পাবলোর চিৎকার। মিতার হাত থেকে ছুটে গেছে বাচ্চা ছেলেটা। আঙুল তাক করল লকারের দিকে। বিস্ফারিত দুই চোখ, যেন আবিষ্কার করেছে নতুন কিছু। হঠাৎ চিকন কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল: টু! আবার দেখল মিতাকে। টু!

প্রফেসরের দিকে তাকাল মিতা।

ভদ্রলোক হামাগুড়ি দিয়ে পাশে চলে এসেছেন। ছেলেটা পাগল হয়ে গেল না তো?

জানি না, বিড়বিড় করল মিতা। ওকে শক্ত করে ধরে বসুন।

মিতা, হুইল ধরো, নির্দেশ দিল রানা।

মেয়েটা ড্রাইভিং সিটে বসতেই বোটের পেছনে এল রানা। সিটের পেছন থেকে নিল নোঙর। তীরের কাছে পৌঁছে গেছে ওরা। আর বড়জোর কয়েক মিনিট। সোজা এগিয়ে যাও, মিতা! ছোরা বের করে নোঙরের দড়ি কেটে দিল রানা।

সোজা ছুটছে বোট।

দড়ি ঘুরিয়ে হ্যামার থ্রোর মত করে নোঙর ছুঁড়ল রানা। ধাওয়াকারীদের দিকে উড়ে গেল ওটা। কিন্তু টার্গেট থেকে একটু আগেই ঝপাস করে পড়ল সাগরে।

আরও দূরে ফেলতে হলে গায়ে হাতির জোর লাগবে, চেঁচিয়ে বলল মিতা।

মাথা দোলাল রানা। এবার নিল বৈঠা, ওটা ঠিকই পড়ল শত্রুবোটের সামনে। কিলের নিচে চাপা পড়ে দুটুকরো হলো জিনিসটা।

জবাবে দুই বোট থেকে এল একরাশ গুলি। বাঁক নিয়ে ডানে চলেছে মিতা। সাগরে নাক ঔজল কয়েকটা বুলেট। বসে পড়েছে রানা। ওর চোখ পড়ল ফ্লেয়ার গানের ওপর। কয়েক সেকেণ্ড কী যেন ভাবল, তারপর একটা বয়ার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিল স্পেয়ার ডাইভিং ট্যাঙ্ক।

এবারের মিসাইল লক্ষ্যভেদ করবে? জানতে চাইল মিতা।

দেখা যাক! সরল রেখার মত সাদা ঢেউ তৈরি হয়েছে পেছনে। ভালভ খুলে ট্যাঙ্ক সাগরে ফেলল রানা। তলিয়ে গেছে ভারী জিনিসটা। কিন্তু পরিষ্কার চোখে পড়ল বুদ্বুদ ও বয়া।

অপেক্ষা করল রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর ফায়ার করল ফ্লেয়ার।

বুদ্বুদের দিকে গেল আগুনের কমলা হলকা। ট্যাঙ্কের বাতাসে আছে চল্লিশ পার্সেন্ট অক্সিজেন। এক সেকেণ্ড পর বোমার মত বিস্ফোরিত হলো স্পেয়ার দুই এয়ার ট্যাঙ্ক।

সরে যেতে অনেক দেরি করে ফেলেছে সামনের বোট, পেটের নিচে ট্যাঙ্ক বিস্ফোরিত হতেই সাগর থেকে পুরো দেড় ফুট ওপরে উঠল গোটা জলযান। বেকায়দাভাবে কাত হয়ে সাগরে পড়ল বোট। চাকা-ফাটা দ্রুতগামী গাড়ির মত কয়েক ডিগবাজি খেল ওটা। চারপাশে ছিটিয়ে গেল হাজারো ভাঙা টুকরো। শেষ গড়ান দিয়ে আবারও ভেসে উঠল। পেট ভরা পানি। দেখা গেল না কাউকে।

গুড শট! হৈ-হৈ করে উঠলেন হ্যারিসন।

ইচ্ছেপূরণ হলো না রানার। সঙ্গীদের তুলে নিতে থামল না দ্বিতীয় বোট। বিধ্বস্ত বোটকে পাশ কাটিয়ে ছুটে আসছে ফুল স্পিডে।

মাথার ওপর দিয়ে গুলি যাচ্ছে দেখে এঁকেবেঁকে চলেছে মিতা। এ সুযোগে আবারও কাছে এল দ্বিতীয় বোট। গুলি করছে লোকগুলো। বুলেট ও ট্রেসার বিধছে রানাদের বোটে।

মিতা ব্রেকওঅটার পেরিয়ে বন্দরে ঢুকতেই ডেকে শুয়ে পড়ল রানা। নোঙর করা একগাদা সেইল বোটের মাঝ দিয়ে চলল ওদের বোট। পেছনে চিকন গলায় চিৎকার করে উঠল পাবলো। গা মুচড়ে নিজেকে ছুটিয়ে নিল প্রফেসরের হাত থেকে। লাফিয়ে পড়ল লকারের ওপর। চিৎকার ছাড়ল: টু! টু! টু! টু! টু! লকারের ডালায় কিল বসাল ছোট্ট দুই হাতে।

.

রেডিয়ো থেকে কর্কশ আওয়াজ বেরোতেই গলা ফাটিয়ে নির্দেশ দিলেন জেমস ব্রায়ান: নামতে বলো হেলিকপ্টার দুটোকে!

কেন? জানতে চাইল ড্রাইভার।

নামতে বলো! জলদি!

রেডিয়োর রিসিভার তুলে ব্রায়ানের নির্দেশ রিলে করতে চাইল মাস্টার সার্জেন্ট, কিন্তু সেট থেকে এল শুধু ফিডব্যাক ও স্ট্যাটিক।

ওভারলোড হলো ট্রাকের পেছনের কমপিউটার। নানান ভেন্ট দিয়ে ছিটকে বেরোল কমলা ফুলকি। বিস্ফোরিত হলো সেটআপ-এর সঙ্গের একটা অসিলোস্কোপ।

বন্ধ করো সব! দলের লোকদের উদ্দেশে চিৎকার করলেন ব্রায়ান। স্ফটিক রাখা ভারী সীসার বাক্সের দিকে বাড়িয়ে দিলেন হাত। বন্ধ করো ওটা! বন্ধ করো!

করুণ আর্তনাদ ছাড়ল রেডিয়ো। একের পর এক বিস্ফোরিত হচ্ছে! শর্ট হয়ে গেল কমপিউটার। ব্রায়ান আর বিজ্ঞানী মিলে বন্ধ করতে চাইলেন ভারী সীসার বাক্স, কিন্তু তখনই স্ফটিক থেকে বেরোল অত্যুজ্জ্বল সাদা আলো। শক ওয়েভ ছড়িয়ে গেল ট্রাক থেকে চারপাশের মরুভূমিতে।

.

টু! টু! টু! পাগলের মত চিৎকার করছে পাবলো। বড় বড় হয়ে উঠেছে দুই চোখ। ওয়ান!

বোটের ভেতর বিস্ফোরিত হলো কী যেন!

আরেকটু হলে বোট থেকে পানিতে গিয়ে পড়ত রানা। ড্রাইভার্স প্যানেলে আছড়ে পড়েছে মিতা। কাত হয়ে পড়ে গেল ডেকে। বিস্ফোরিত হলো ইঞ্জিন। আগুনের হলকা বেরোল ডেথ ফাইণ্ডার আর রেডিয়ো ট্রান্সমিটার থেকে।

রানার মনে হলো, পুরু কাঁচের কোনও কিছু দিয়ে বাড়ি মেরে নাক-মুখ সমান করে দেয়া হয়েছে ওর। বুক থেকে বেরিয়ে গেছে বাতাস। ঝনঝন করছে কান। আবছা দেখল, পাবলোর ওপর ঝুঁকে পড়েছেন প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন। একটু সামলে নিয়ে হুইলের পেছনে বসতে চাইছে মিতা।

ঘুরে তাকাল রানা। ওদের আউটবোর্ড মোটর থেকে ভলকে ভলকে উঠছে কালো ধোঁয়া। কোর্স পাল্টে আরেক দিকে চলেছে পেছনের শত্রুবোট। ওটার ইঞ্জিন কমপার্টমেন্ট চাটছে আগুন। একই সমস্যায় পড়েছে বন্দরে বাঁধা কয়েকটা ভেসেল।

হুইল ধরে ঠিক দিকে বোট নিতে চাইল মিতা। এখনও যে গতি আছে, উঠে পড়তে পারবে সৈকতে।

কয়েক সেকেণ্ড পর ঘ্যাঁস্ শব্দে বালির বুকে উঠল বোট।

 রানার দিকে তাকাল বিস্মিত মিতা। কী হলো বলো তো?

জানি না, বলল রানা। ঘুরে দেখল, পাবলোকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন প্রফেসর। রক্তে ভিজে গেছে ছেলেটার কান।

হায়, ভগবান! বিড়বিড় করল মিতা।

চলো, সরে যেতে হবে, বলল রানা, আমি নিচ্ছি ওকে। হাত বাড়িয়ে প্রফেসরের কাছ থেকে অচেতন পাবলোকে নিল ও। লকার থেকে ইকুইপমেন্ট ব্যাগ নিয়ে নেমে পড়ল সৈকতে। ব্যাগের ভেতর রয়ে গেছে ওই স্ফটিক।

সৈকতে নামতে প্রফেসরকে সাহায্য করল মিতা, তারপর নেমে পড়ল নিজেও।

পাবলোকে কাঁধে রেখে পা বাড়িয়ে রানা ভাবল, ওরা পেয়ে গেছে দ্বিতীয় স্ফটিক। কিন্তু কে জানে, সেজন্যে দিতে হবে কত বড় মূল্য!

.

২৭.

একহাতে দরজা ঠেলে ইমার্জেন্সি রুমে ঢুকল রানা, কাঁধে পাবলো। পেছনেই মিতা। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল, আমাদের ডাক্তার দরকার! একই কথা স্প্যানিশ ভাষায় জানাল: নেসেসিতামোস উন মেদিকো!

চারপাশে চোখ বোলাল রানা। এই ঘর প্রায় অন্ধকার। টিন্টেড জানালা দিয়ে আসছে রোদের আবছা আলো। এ ছাড়া, দুপ্রান্তে জ্বলছে দুটো করে ইমার্জেন্সি বাতি।

বিদ্যুৎ নেই, নিচু স্বরে বলল মিতা।

ঝোড়ো গতি তুলে ড্রাইভ করে এই হাসপাতালে পৌঁছেছে ওরা। কয়েকবার বেঁচে গেছে মারাত্মক দুর্ঘটনার কবল থেকে। রাস্তায় কাজ করছে না কোনও ট্রাফিক বাতি। জটলা পাকিয়ে গেছে অনেকগুলো গাড়ি। বাধ্য হয়ে ফুটপাথে জিপ তুলে অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়েছে রানা।

এখানে এসেও বিদ্যুৎ নেই। হৈ-চৈ করছে রোগীরা। রেগে ওঠারই কথা। ইমার্জেন্সি রুম, কিন্তু নেই যথেষ্ট নার্স বা ডাক্তার। ওয়েটিং রুমে গাদাগাদি করে অপেক্ষা করছে নতুন রোগীরা। আগে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে চরম অসুস্থদেরকে। মৃদু ট্রমা হয়েছে এমন রোগীদের অপেক্ষা করতে হবে ঘণ্টার পর ঘন্টা।

মিতার ধারণা, এত সময় পাবে না পাবলো। কাজেই এক নার্স চাইতেই ইশারা করে শিথিল, অচেতন ছেলেটাকে দেখাল ও। প্রায় দৌড়ে এল নার্স, হাতে স্টেথোস্কোপ।

আপনি ইংরেজি বলতে পারেন? জানতে চাইল মিতা।

মাথা দোলাল নার্স। স্টেথোস্কোপ রাখল পাবলোর বুকে। কী হয়েছে ওর?

জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছে, বলল মিতা।

পাবলোর রক্তাক্ত কান পরীক্ষা করল নার্স, তারপর চোখের পাতা তুলে ফ্ল্যাশলাইটের আলো ফেলল। গম্ভীর হয়ে গেল মহিলা। সাড়া নেই। শাস ফেলছে না বললেই চলে। রানাকে ইশারা করল সে। আমার সঙ্গে আসুন।

প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন এক করিডোরে ওদেরকে নিয়ে এল সে, সামনেই পর্দা ঢাকা দরজা। ওদিকে জ্বলছে ইমার্জেন্সি বাতি। ঘরের ভেতরে পুরনো কিন্তু পরিষ্কার সব ইকুইপমেন্ট। দরকারি সব কিছু পাবলো এখানে পাবে কি না, জানা নেই। অসহায় চোখে রানার দিকে তাকাল মিতা। স্টেটস্-এ নিতে পারলে হতো।

আমাদের ভাল ডাক্তার আছে, চিন্তা করবেন না, বলল নার্স।

চুপ করে থাকল মিতা।

এগযামিনেশন টেবিলে পাবলোকে শুইয়ে দিল রানা। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল নার্স। ফিরল কয়েক মিনিট পর। এখন সঙ্গে এক মহিলা ডাক্তার। উনি বললেন, আমি ডাক্তার ফার্নেন্দেজ। রানা বা মিতার দিকে না চেয়েই টেবিলের পাশে থামলেন। জ্ঞান হারিয়ে গেছে এই ছেলের?

জী, বলল মিতা।

টেবিলের আরেক পাশে সরে পালস্ ও ব্লাড প্রেশার পরীক্ষা করছেন ডাক্তার। কখন এটা ঘটে?

বিশ মিনিট আগে।

মুখ তুলে তাকালেন মহিলা ডাক্তার। যখন বিদ্যুৎ চলে গেল? ওই সময়ে কী করছিল ও?

চুপ করে কী বলবে, ভাবছে মিতা।

টিভি দেখছিল? তখন কি অস্বাভাবিক আলো ছিল ঘরে?

টিপটিপ করা আলোয় অনেক সময় অচেতন হয়ে পড়ে রোগী। বেশি হয় টিভি বা কমপিউটার স্ক্রিনের সামনে থাকলে। মাথা নাড়ল মিতা। না। আমরা ছিলাম সাগরে ভোলা জায়গায়।

অবাক চোখে ওকে দেখলেন ডাক্তার। আপনারা ছিলেন  পুয়ের্তো আয়ুলের দিকে?

মৃদু মাথা দোলাল রানা। বুঝে গেছে, এই ছোট শহরে পৌঁছে গেছে অদ্ভুত ওই দুর্ঘটনার খবর। ঘুমন্ত গ্রামের কাছে বিস্ফোরিত হয়েছে বোট, আর তখনই গেছে বিদ্যুৎ। সৈকতে উঠে এসেছে একটা বোট। ওটা থেকে নেমে গেছে কয়েকজন। তাদের সঙ্গে ছিল ছোট এক আহত ছেলে। চোখ এড়াবার কথা নয় কারও।

এ ছেলের জ্ঞান নেই, বলল রানা। কান থেকে রক্ত পড়ছে। তাই দেরি না করে নিয়ে এসেছি হাসপাতালে।

হয়তো মগজে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, বলল মিতা, দেখুন এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করতে পারেন কি না।

অস্বস্তির ভেতর পড়ে গেলেন ডাক্তার ফার্নেন্দেজ। চাপা স্বরে বললেন, আপনারা ছেলেটার বাবা-মা নন।

ঘরে ঢুকল লম্বু এক চওড়া কাঁধের আর্দালি। টের পেয়েছে ঘরের উত্তেজনা। ডাক্তার ফার্নেন্দেজের দিকে তাকাল।

রিকো… বলতে শুরু করে অ্যালার্ম বাটনের দিকে হাত বাড়ালেন ডাক্তার।

কী করবে ভাবতে শুরু করেছে মিতা, কিন্তু ওর দিকে এগোল আর্দালি। তার চেয়ে ঢের দ্রুত রানা, কাঁধের গুঁতো মেরে তাকে দেয়ালে ফেলল ও। হাতে উঠে এসেছে ওয়ালথার। নল তাক করল লোকটার কপালে।

ভীষণ ভয় নিয়ে রানার দিকে তাকালেন ডাক্তার।

মন দিয়ে শুনুন, নরম সুরে বলল রানা, চোখ ডাক্তারের চোখে। দয়া করে ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের ক্ষতি করতে আসিনি। কোনও ক্ষতিও করিনি ছেলেটার।

ওর চোখে চোখ রেখে বড় করে দম নিলেন ডাক্তার ফার্নেন্দেজ। পিস্তলের নল সরিয়ে নিল রানা। তবে দরকার পড়লে ওটা ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না।

মিতার দিকে তাকালেন মহিলা ডাক্তার।

না, আমি ওর মা নই, বলল মিতা, এমন কেউ নই যে ওকে কিডন্যাপ করেছি। ওকে সরিয়ে নিয়েছি একদল ভয়ঙ্কর লোকের কাছ থেকে। তারা কিডন্যাপ করেছিল ওকে। ড্রাগ দিয়েছিল। আমরা চাই না আবারও ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাক তারা।

রানা খেয়াল করল, নরম হলো ডাক্তারের চোখের ভাষা। পাবলোর দিকে তাকালেন তিনি। যদি চিৎকার করে, তাই মুখে হাত চাপা দিতে তৈরি থাকল রানা।

আপনারা কারা? জানতে চাইলেন মহিলা ডাক্তার।

সিকিউরিটি সার্ভিসের সঙ্গে আছি, বলল রানা।

আপনারা বেআইনিভাবে এ দেশে যা খুশি করতে পারেন না, বললেন মহিলা।

অবশ্যই পারি না, মাথা দোলাল রানা। ডাহা মিথ্যা বলল এবার, আমেরিকান কর্তৃপক্ষকে সব জানানো হয়েছে। তারা কথা বলছে এখন এ দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। আধঘণ্টার ভেতর সব ধরনের অনুমতি পাব। কাজেই, প্লিয, দয়া করে ছেলেটাকে সাহায্য করুন। চিকিৎসা শেষ হলে কোনও ঝামেলা না করেই বিদায় নেব আমরা।

দ্বিধায় পড়ে পাবলোকে দেখলেন ডাক্তার।

সাহায্য না করে উপায় কী তাঁর? ডাক্তার তো!

নরম সুরে বললেন ফার্নেন্দেজ, আমরা এমআরআই করব। তারপর বিদায় নেবেন আপনারা।

মৃদু মাথা দোলাল রানা। চাইছে, অন্তত মেডিকেল পরীক্ষা করে দেখা হোক পাবলোকে।

.

একদল মানুষের ভেতর পাবলিক প্লাযায় ঘুরঘুর করছেন প্রফেসর হ্যারিসন। দুপুরের দিকে কারেন্ট যেতেই বেরিয়ে এসেছে টুরিস্ট ও শহরবাসীরা। গাড়ির জ্যাম বেধে গেছে রাস্তায়।

চারদিকে চোখ রেখেছেন হ্যারিসন, গোলমাল দেখলেই পালাবেন। ভয় লাগছে তার। পিঠে ঝুলছে ব্যাকপ্যাক। ওটার ভেতরের মায়ান স্ফটিক থেকেই বিচ্ছুরিত হয়েছিল বিপুল ইলেকট্রোম্যাগনেটিক এনার্জি। ওই জিনিসের জন্যেই তাদেরকে খুঁজছে দুই দল সশস্ত্র খুনি। যখন-তখন খুন হবেন। রানা বা মিতা চায়নি স্ফটিকটা হাসপাতালে নিতে, বাচ্চা ছেলেটার ওপর নানান পরীক্ষা হবে, তখন ওই জিনিস থেকে বিচ্ছুরণ হলে বাতিল হবে সব যন্ত্রপাতি, তাই বাধ্য হয়ে ওটা রাখতে হয়েছে তাকে।

হ্যারিসনের কাছ থেকে একটু দূরেই কংক্রিট দিয়ে তৈরি এক ফোয়ারা। ওখানে ঘুরছে শত শত মানুষ। বিদ্যুৎ নেই বলে ঘরের গরম থেকে বেরিয়ে এসেছে তারা। এক পাশে ফুটবল খেলছে একদল তরুণ। তাদের তৈরি মাঠের সীমানার বাইরে থেকে খেলা দেখছে ইউনিফর্ম পরা একদল ফেডারাল। তাদের কয়েকজন ঘুরছে টুরিস্টদের মাঝে। তাদেরকে হরিণের পালে নেকড়ে বলে মনে হলো হ্যারিসনের। তাঁর যৌক্তিক মন বলল, ভিড় সামলাতে এসেছে এরা। কিন্তু কু ডাকল মন। পুলিশগুলো আসলে খুঁজছে তাঁদেরকে! একবার ধরতে পারলেই পুরে দেবে কারাগারে। বাকি জীবনে আর বেরোতে পারবেন না ওই নরক থেকে!

.

ডক্টর ফার্নেন্দেজের পাশে দাঁড়িয়ে এমআরআই রিপোর্ট দেখছে রানা ও মিতা। হাইলাইট করা হয়েছে পাবলোর মগজের একটা অংশ। ওদিকে লাল-কমলা, কিন্তু আরেকটা দিক নীল ও ঝাপসা।

এটা কী? জানতে চাইল মিতা।

মেশিনের কন্ট্রোল অ্যাডজাস্ট করলেন ডাক্তার। নতুন করে স্ক্যান করছেন। বিশাল টিউবের মধ্যে নিথর পড়ে আছে পাবলো। জোরালো ক্লিক-ক্লিক আওয়াজ তুলল এমআরআই স্ক্যান। নতুন করে তুলল পাবলোর মগজের ছবি।

এবারের ছবি আগের চেয়ে স্পষ্ট। তবুও আবছাই রয়ে গেল নীল অংশের ছবি।

ইমেজের কোনও ভুল? জানতে চাইল মিতা।

মাথা নাড়লেন ডাক্তার ফার্নেন্দেজ। নিশ্চিত হতে আরেকটা অ্যাংগেল থেকে ছবি নিয়েছি। নীল অংশে আঙুল তাক করলেন তিনি। মেশিনের ত্রুটি থাকলে আবছা অংশ নড়ত। তা হয়নি। কয়েকবার দেখেছি, নীল অংশের ইমেজ রয়ে গেছে শুধু বাচ্চার মগজের নির্দিষ্ট জায়গায়।

জিনিসটা কী? জানতে চাইল মিতা।

আপনি না বলেছিলেন কারা যেন এক্সপেরিমেন্ট করেছে ওর ওপর?

তাই শুনেছি।

দুঃখিত চেহারায় মাথা নাড়লেন মহিলা ডাক্তার। তা হলে আপনারা বোধহয় দেখছেন তাদের এক্সপেরিমেন্টের পরিণাম। ওটা বৈদ্যুতিক কিছু, গেঁথে দেয়া হয়েছে সেরেব্রাল কর্টেক্স-এ।

বৈদ্যুতিক?

ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ তৈরি করছে, বললেন ডাক্তার, খুব সামান্য। কিন্তু সেজন্যেই নীল দেখাচ্ছে ছবি।

উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে রানাকে দেখল মিতা। পরক্ষণে চমকে উঠল। টিউবের ভেতর জেগে উঠে চিৎকার শুরু করেছে পাবলো!

.

পার্কের বাইরে এসে দাঁড়ালেন প্রফেসর হ্যারিসন। পাশেই এক হকার। ছোট ছোট অসংখ্য জিনিস তার ডালায়।

আবার পুলিশদের দেখলেন আর্কিওলজিস্ট।

তাদের কয়েকজন রওনা হয়েছে তার দিকেই!

ওরা আসছে স্ফটিক কেড়ে নিতে!

 তা হলে কি তার মনের কথা বুঝে ফেলেছে তারা?

 পালাও, হ্যারিসন! বুকের ভেতর তাড়া দিল কেউ।

পালাও!

ঘুরেই রাস্তার দিকে ছুটলেন প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন।

.

জ্ঞান ফিরতেই গলা ফাটিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে পাবলো। তবে এমআরআই মেশিনের বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করতেই শান্ত হয়ে গেল ও। টিউব থেকে বেরোবার পর আর ছাড়ল না মিতার বাহু। কয়েক ধরনের পরীক্ষা করলেন ডাক্তার ফার্নেন্দেজ।

ব্রেন ফুলে ওঠেনি, বললেন তিনি, নিউরোলজিকাল রেসপন্স যথেষ্ট ভাল।

চুপ করে আছে রানা।

মিতা জানতে চাইল, আর ওর কানের রক্ত?

কানের গর্তে ফুসকুড়ি হয়েছিল, অচেতন হয়ে যাওয়ার সময় ফেটে গেছে, বললেন ডাক্তার। কানে ঠিকই শুনছে। কোনও ক্ষতি হয়নি। মৃদু হাসলেন তিনি। ওর কপাল ভাল।

স্বস্তি নিয়ে পাবলোকে দেখল মিতা।

এবার ওকে কোথায় রাখবেন? জানতে চাইলেন ডাক্তার।

নিরাপদ কোথাও, যেখানে হামলা হবে না, বলল রানা।

আমাদের কাছে রেখে যেতে পারেন, বললেন মহিলা। ওর অযত্ন হবে না, সেটা দেখব।

দ্বিধা নিয়ে রানার দিকে তাকাল মিতা। কী যেন ভাবছে রানা।

ভাল হতো পাবলো হারিয়ে গেলে।

 ল্যাং বা রাশানরা খুঁজে পেত না!

আস্তে করে মাথা নাড়ল রানা। ওকে খুঁজে বের করবে।

প্রয়োজনে খুন করবে আশ্রয়দাতাদেরকে।

কেন খুন করবে? জানতে চাইলেন ফার্নেন্দেজ।

দীর্ঘ কাহিনি, বলল রানা, আপনার বা আমাদের হাতে এত সময় নেই যে বিস্তারিত বলব। এখান থেকে আমরা বেরিয়ে গেলেই যোগাযোগ করবেন পুলিশে। পাবলোর কিডন্যাপাররা এখানে চলে আসতে পারে। তার ফলাফল ভাল হবে না।

মৃদু মাথা দোলালেন ফার্নেন্দেজ, নার্ভাস। একবার দেখলেন, এখনও রানার হাতে পিস্তল। ঠিক আছে, তা হলে আপনারা বেরিয়ে যাওয়ার পাঁচ মিনিট পর পুলিশে কল দেব। ভুলেও ফিরবেন না।

পাবলোর কাঁধে হাত রেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল মিতা। পিছু নিল রানা।

আমি কি সিকিউরিটির লোক ডাকব? জানতে চাইল রিকো।

না, মানা করে দিলেন মহিলা ডাক্তার।

চলে যেতে দেবেন ওদেরকে?

সেটাই ভাল, বললেন ফার্নেন্দেজ। এদেরকে স্পাই মনে হয়েছে, এসবের ভেতর না জড়ানোই ভাল আমাদের।

আর সত্যি যদি মিথ্যে বলে থাকে?

তা হলে এখান থেকে অনেক দূরে কোথাও গ্রেফতার হবে পুলিশের হাতে।

সামান্য আপত্তি নিয়ে মাথা দোলাল রিকো। দরজার পাশের ছোট এক ডিভাইসের ওপর চোখে পড়ল ওর। বারবার ঝলসে উঠছে সবুজ লেড বাতি।

বাচ্চাটার মগজে ওটা কি রেডিয়োঅ্যাকটিভ? জানতে চাইল রিকো।

না, বললেন ডাক্তার ফার্নেন্দেজ, হঠাৎ জিজ্ঞেস করছ কেন?

লেড বাতি দেখাল রিকো। ওই যে ওয়েস্ট অ্যালার্ম। ওই তিনজনের মধ্যে অন্তত একজন রেডিয়োঅ্যাকটিভ মেটারিয়ালের সংস্পর্শে এসেছে।

.

হনহন করে হেঁটে পালাচ্ছেন প্রফেসর হ্যারিসন। নিজেই বুঝতে পারছেন, আরও জোরে হাঁটলে বা দৌড় দিলে অস্বাভাবিক লাগবে লোকের চোখে। আহত পায়ে শুরু হয়েছে ব্যথা। প্রাণের ভয়ে অস্থির লাগছে বুকের ভেতরটা।

প্রাণপণে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, যেভাবে হোক সরে যেতে হবে পুলিশের লোক, রানা, মিতা আর শত্রুদের কাছ থেকে। প্রথম সুযোগে…

কয়েক সেকেণ্ড পর অন্য চিন্তা ঘাই দিল তার মনে। আরে, আগে এ কথা ভাবেননি কেন? রানা আর মিতা তো তাঁর দলের! ওরা নিরাপদে রাখতে চাইছে তাঁকে! তা হলে অবচেতন মন কী বোঝাতে চাইছে?

হাসপাতালের সামনের ব্যস্ত রাস্তায় একটা সিটি বাস থামতে দেখলেন প্রফেসর। প্রায় দৌড়ে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। গতি কমতেই বিকট চুই আওয়াজ তুলল বাসের

প্রফেসর? ডাকল কে যেন!

ঘুরে হ্যারিসন দেখলেন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসেছে রানা ও মিতা। পাশেই হাঁটছে পাবলো। ছেলেটা সুস্থ দেখে খুশি হলেন তিনি।

কী করছিলেন? কাছে এসে সন্দেহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল মিতা।

বেসুরো কণ্ঠে বললেন হ্যারিসন, আমি পালাচ্ছিলাম। যাতে কেউ দেখতে না পায়। হাতের ইশারা করে পার্ক ও রাস্তার কোণে পুলিশ দেখালেন তিনি।

পুলিশ আমাদেরকে খুঁজছে না, বলল মিতা।

বুঝবে কী করে? আপত্তির সুরে বললেন হ্যারিসন।

কী করা উচিত ভাবছ, রানা? গম্ভীর সঙ্গীর দিকে তাকাল মিতা।

ভুলে যেতে হবে পুরনো ওই জিপের কথা, বলল রানা।

অবাক হলেন প্রফেসর। তা হলে কি আমরা বাসে চাপব?

ঠিকই ধরেছেন, বলল রানা, চলুন, উঠে পড়ি বাসে।

.

২৮.

ইয়াকা পাহাড়ের সুড়ঙ্গের চিরকালীন প্রায়ান্ধকারে বসে আছেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান, কপালে ধরে রেখেছেন বরফঠাণ্ডা পট্টি। চারপাশে ব্যস্ত একদল টেকনিশিয়ান। নানান ইকুইপমেন্টের সঙ্গে যুক্ত করছে অজস্র কেবল। দ্বিগুণ চওড়া এক ট্রেইলারে নতুন করে সাজিয়ে নেয়া হচ্ছে গবেষণাগার।

উদাস হয়ে সবার কাজ দেখছেন ব্রায়ান। দুর্ঘটনার পর থেকেই প্রতি দশ বা পনেরো মিনিট পর পর ভীষণ বমি পাচ্ছে তার। এবার সুযোগ পেয়ে তাঁকে একহাত নিয়েছে সিআইএ চিফ ক্যালাগু। লোকটার মুখে বমি করতে পারলে তিনি খুশি হতেন।

নতুন ল্যাবোরেটরির ফ্ল্যাট-স্ক্রিন মনিটরে দেখা যাচ্ছে নতুন রিভিউ। স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে এনার্জি বিচ্ছুরণ। তবে ওটা দেখার জন্যে উদগ্রীব নন তিনি। বারবার প্যু করে দেখছেন দৃশ্যটা। আবারও চালু করছেন।

মরুভূমির মেঝে ভরা বোমার গর্ত। পাশেই পড়ে আছে আঠারো চাকার ট্রাক। ধোয়া উঠছে ওটা থেকে। একই অবস্থা হামভিগুলোর। একটু দূরে প্রায় বিধ্বস্ত হয়েছে দুই ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার। প্রথমটা মোটামুটিভাবে নেমে এলেও অন্যটা কাত হয়ে পড়েছে, বালির স্তূপে। পুরনো এলপি রেকর্ডের মত খান খান হয়েছে রোটর।

আবারও দৃশ্য পযূ করলেন ব্রায়ান। ওই জ্বলন্ত হেলিকপ্টার থেকে ঝাঁপিয়ে নেমে পড়ছে এক লোক!

ব্রায়ান রওনা হওয়ার আগেই ইয়াকা মাউন্টেনে হাজির হয়েছেন সিআইএ চিফ ক্যালাগু। পুরনো কথা আবারও বললেন, ভাল কোনও ভিডিয়ো নেই আমাদের হাতে। পুরো বেস ভরা হাজারো ক্যামেরা, সেগুলোর ভেতর রয়েছে নিউক্লিয়ার ব্লাস্টের দৃশ্য ধারণের বিশেষ ক্যামেরা, অথচ বিস্ফোরণের চার মিনিট উনিশ সেকেণ্ড আগে থেমে গেছে সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। আবার চালু হয়েছে বিস্ফোরণের এক মিনিট ত্রিশ সেকেণ্ড পর।

কিন্তু আমাদের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, মরুভূমির ওপর দিয়ে গেছে শক ওয়েভ। ওটা ছিল নিউক্লিয়ার ব্লাস্টের মত। যদিও ব্যাঙের ছাতার মত মেঘ ছিল না।

আবারও ডিসপ্লে দেখলেন ব্রায়ান। বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট পর জ্ঞান ফিরেছে তাঁর।

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত পনেরোটা কমার্শিয়াল এয়ারলাইন্স, বললেন ক্যালাগু। সেগুলোর নয়টা পুরোপুরি বৈদ্যুতিক পাওয়ার হারিয়ে বাধ্য হয়েছে ইমার্জেন্সি ল্যাণ্ড করতে। নেলিস রেইডার ও কমিউনিকেশন বন্ধ হয়েছে। সবচেয়ে বড় গ্রিড বিপর্যয় হয়েছে পশ্চিম উপকূলে। ভেগাস, হেণ্ডারসন এবং টাহোও হয়ে গেছে বিদ্যুত্তীন।

কথাগুলো পাত্তা দিতে চাইলেন না ব্রায়ান।

আরও খারাপ দিক, যোগ করলেন ক্যালাগু, রাশা এবং চিন মিলে একইসঙ্গে অভিযোগ করেছে, আমরা নাকি টেস্ট ব্যান ট্রিটি ভেঙে পরীক্ষা করেছি নতুন সুপারওয়েপন। আগামী পরশু সিকিউরিটি কাউন্সিলের মিটিং ডেকেছে ইউএন। তার মানে ছুটির দিনেও কাজ করতে হবে আমাদেরকে।

ব্যথা করছে বলে মাথা টিপলেন ব্রায়ান। নানান দেশের অন্যায্য সব দাবি আর কড়া ধমক জটিল করে তুলেছে পরিস্থিতি।

আপনি আসলে কী বলতে চান? বিরক্ত সুরে জানতে চাইলেন তিনি।

আমি বলতে চাই, আপনার ওই স্ফটিক খুবই বিপজ্জনক, তিক্ত সুরে বললেন ক্যালাগু।

এত ক্ষমতা যে জিনিসের, সেটা তো বিপজ্জনক হবেই, বললেন ব্রায়ান। গাড়ি, অস্ত্র, বোমা, এসব এমনই হয়। এমন কী আপনি নিজেও বিপজ্জনক। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে এগুলো ব্যবহার করবেন বিপদ এড়িয়ে।

ঠিকই ধরেছেন, ব্রায়ান। আমরা জানি না, ওই স্ফটিক কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। আসলে ওটা কী তা-ও জানি না। আমরা শুধু জানি, প্রায় একবছর ধরে গবেষণা করেও গুরুত্বপূর্ণ কিছুই আবিষ্কার করতে পারেননি আপনারা। আর সে কারণে আমাদের সবার প্যান্ট খারাব হওয়ার অবস্থা হয়েছে।

লোকটা নিশ্চয়ই এরই ভেতর সব ডেটা প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ভাবলেন ব্রায়ান। এমনিতেই নানা দেশের চাপ তাঁর ওপর। এখন মুখ রক্ষার মত জরুরি তথ্য না পেলে বিগড়ে বসবেন আমেরিকার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষটা।

তার বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করবেন ডেটা সংগ্রহে, জানেন ব্রায়ান। বিস্ফোরণে সব নষ্ট হওয়ায় এরই ভেতর ইয়াকা মাউন্টেনে পাঠানো হয়েছে আরও আধুনিক ইকুইপমেন্ট। চালানো হবে আরও কিছু পরীক্ষা।

খুলে গেল ট্রেইলারের দরজা। ভেতরে ঢুকল এয়ার ফোর্সের এক মেজর। পেছনে সিভিলিয়ান পোশাকে কয়েকজন। এঁদের একজন ব্রায়ানের চিফ অ্যানালিস্ট। দুর্ভাগ্য, বিস্ফোরণের সময় তিনি ট্রাকে ছিলেন না। এ ছাড়া রয়েছেন সিআইএর বেছে নেয়া এক বিজ্ঞানী। কঠোর চেহারা তাঁর। বয়স পঁয়তাল্লিশ। মিলিটারির জন্যে অত্যাধুনিক সব অস্ত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত। তৃতীয় লোকটির বয়স অন্তত সত্তর। রেড ইণ্ডিয়ান। ঝুলঝুল করছে গাল ও গলার চামড়া। পাতলা হয়েছে মাথার সাদা চুল। থুতনিতে সামান্য দাড়ি। পরনে কাউবয় শার্ট ও হাজার খানেক পকেটওয়ালা কর্ডের প্যান্ট। পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে নানান যন্ত্রপাতি।

তাকে চিনে ফেললেন ব্রায়ান।

ক্যাথিবা আলিহা। নামকরা থিয়োরিটিকাল ফিযিসিস্ট। আগে কাজ করতেন নিউ মেক্সিকোর অ্যাণ্ডিয়া ল্যাব-এ। এখন। আছেন ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্স-এ।

সুনাম আছে তার পরিবারের। তাঁর দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছিলেন ন্যাভাজো কোড টকার্সের একজন। কোরিয়া যুদ্ধে সাহসিকতার জন্যে মেডেল পান ক্যাথিবা আলিহার বাবা। বড় ভাই ছিলেন রেড ইণ্ডিয়ানদের ভেতর প্রথম গ্রিন ব্যারেট। বুক ভরা ছিল মেডেল। তিনবার যান ভিয়েতনামে যুদ্ধ করতে।

নিজে মিলিটারিতে যোগ না দিয়ে কলেজে গেলেন ক্যাথিবা আলিহা। কিন্তু আত্মীয়দের চেয়েও বেশি নাম করেন মিলিটারির জন্যে নিউক্লিয়ার ট্রিগার আবিষ্কার করে। এখন ট্রাইডেন্ট মিসাইল আরও আধুনিক করা এবং মিসাইল ডিফেন্সের কাজে ব্যস্ত। সত্যি কখনও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধলে, ক্যাথিবা আলিহার অস্ত্রের কারণে যেমন হাজার হাজার মানুষ খুন হবে, তেমনি হাজার হাজার মানুষ রক্ষা পাবে আমেরিকার।

সিআইএ চিফের কথা থেকে এরই ভেতর ব্রায়ান বুঝেছেন, লোকটা চাইছে ধ্বংস করে দেয়া হোক ব্রাযিল স্টোন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত মত অন্যরকম। ভয়ঙ্কর অনুচিত হবে ওই স্ফটিক বিনষ্ট করা। তবে আর কোনও উপায় না পেলে শেষে হয়তো তাই করতে হবে।

স্ফটিক ধ্বংস করা বা রেখে দেয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন ক্যাথিবা আলিহা। শেষ সিদ্ধান্ত হয়তো নির্ভর করবে তার ওপর।

উঠে বিজ্ঞানীর সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করলেন ব্রায়ান। ট্রেইলারের গবেষণাগারে ঢুকে পড়লেন ক্যাথিবা আলিহা। তাঁর সঙ্গে থাকলেন ব্রায়ান। খেয়াল করলেন, স্ফটিক দেখে কুঁচকে উঠেছে রেড ইণ্ডিয়ানের ভুরু। ঠোঁটে চেপে বসল ঠোঁট। কৌতূহলের কারণেও এমন হতে পারে। অথবা, ওটা তার অভ্যেস। তবে ব্রায়ানের মনে হলো, জ্বলজ্বলে স্ফটিক দেখে চরম বিরক্ত হয়েছেন বিজ্ঞানী।

.

২৯.

ভেবেচিন্তে ফাইভ স্টার হোটেলেই উঠেছে মাসুদ রানা। এখন বসে আছে ব্যালকনির চেয়ারে। জায়গাটা পুয়ের্তো আয়ুল থেকে পঞ্চাশ মাইল দক্ষিণে। উপকূলীয় অন্যসব এলাকার মতই বিদ্যুৎ নেই। তাতে খুশিই রানা, ওদের তথ্য ইলেকট্রনিকালি রেকর্ড করতে পারেনি ডেস্ক ম্যানেজার।

রানা ঘুষ দিয়েছে বলে বিদ্যুৎ ফিরলেও ওদের ব্যাপারে তথ্য তুলতে ভুলে যাবে লোকটা। আগাম টাকা দিয়েছে বলে পাশাপাশি দুটো ঘর পেয়েছে। বলে দেয়া হয়েছে, আগামী পাঁচ দিন ওদের উপস্থিতি গোপন রাখলে লোকটা পাবে আরও এক হাজার ডলার। তবে রানা জানে, আগেই এখান থেকে সরে যাবে ওরা।

বিদ্যুৎ তো নেই, তার ওপর চাঁদও নেই আকাশে। কুচকুচে কালো লাগছে সাগর। ওদিকে তৈরি হচ্ছে দুটো ভারী বজ্রবৃষ্টির ঝড়। থেকে থেকে ঝিলিক মেরে রাতকে ফরসা করে দিচ্ছে লালচে-কমলা বজ্রবিদ্যুৎ। জ্বলে উঠছে মেঘের বুকে হাজারখানেক আঁকাবাঁকা বর্শা। সেই আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মিতাকে।

মোমবাতির আলোয় চুপচাপ বসে আছে ওরা।

সাগর থেকে এসে শহর ছেয়ে ফেলছে ঝড়ের মেঘ। থমথম করছে চারপাশ। রানা ভাবছে, অতীতের কথা। কিছুক্ষণ পর ফিরল বাস্তবে। মস্তবড় বিপদে আছে ওরা। একদিকে রাশান এফএসবি, অন্য দিকে হুয়াং লি ল্যাং-এর লোক। যে-কোনও সময়ে খুন হবে ওরা। তবু ভাল লাগছে, পাশেই আছে মিতা। বড় অদ্ভুত কোমল হৃদয়ের মেয়ে। মায়ের মত আগলে রেখেছে পাবলোকে। ছেলেটাও অন্তর থেকে ভালবেসে ফেলেছে ওকে।

রানা বুঝতে পারছে, ঠিকই হামলা হবে। তখন বৃদ্ধ আর্কিওলজিস্ট ও মিতার পাশে থাকবে ও, যে ভয়ানক বিপদই হোক না কেন। এখনও ওরা স্থির করতে পারেনি কোথায় লুকিয়ে রাখবে পাবলোকে।

ঘরে গিয়ে ঢুকল মিতা। চুপ করে বসে থাকল রানা। পাঁচ মিনিট পর আবার ফিরে এল মেয়েটা।

মোমবাতির আলোয় মুখ তুলে ওকে দেখল রানা। তোমার রোগীর কী অবস্থা?

রানার পাশের চেয়ারে বসল মিতা। প্রফেসরের ইনফেকশন কমে গেছে। বসে বসে কাজ করছেন। তোমার বিশ্বাস হবে না, সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে পাবলো।

আমার মাথায় ওভাবে বিলি কেটে দিলে আমিও ঘুমাতাম, মৃদু হাসল রানা।

মানা তো করিনি! লজ্জায় লাল হলো মিতার গাল। ওকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছি। তোমার বোধহয় লাগবে না?

না। লাগবে না। দূরের অন্ধকারে তাকাল রানা।

জানলে, কীভাবে আমাদের খুঁজে নিয়েছিল লোকগুলো? জানতে চাইল মিতা।

সম্ভবত বোটের ডিলারের কাছ থেকে তথ্য সগ্রহ করেছে, কাঁধ ঝাঁকাল রানা। প্রশ্ন হচ্ছে: ওরা জানল কীভাবে, আমরা ওদিকে আছি।

পাহাড়ি দ্বীপের মূর্তি থেকে তথ্য পেয়েছে, বলল মিতা। ওটা দেখেই মায়ান মন্দির খুঁজে নিয়েছিলেন প্রফেসর।

তুমি বলেছিলে ভেঙে দিয়েছ হায়ারোগ্লিগুলো।

সাধ্যমত করেছি, বলল মিতা। তা যথেষ্ট ছিল না।

 মুখ ফিরিয়ে মিতাকে দেখল রানা।

 তুমি কি খুব চিন্তিত? জানতে চাইল মিতা।

 হ্যাঁ। যে-কোনও সময়ে বিপদ আসবে।

স্মিত হাসল মিতা। অত চিন্তা কেন? মায়ান স্কটিক এখন আমাদের কাছে, ধরতেও পারেনি শক্ররা। পাবলো ঠিক আছে। আমরাও সবাই সুস্থ। আর কী চাই?

অস্থির লাগছে রানার মন।

আকাশ চিরে এক পাশ থেকে আরেক পাশে গেল সাদা ঝিলিক। চোখে পড়ল দিগন্ত ও নিচের সাগর। কয়েক সেকেণ্ড পর এল আবছা আওয়াজ। ওই আলো দেখে আবারও মায়ান ফটিকের কথা মনে পড়েছে রানার। বোটে ওই শক ওয়েভ কীসের, বুঝতে পেরেছ, মিতা?

এনার্জি তৈরি করে এসব স্ফটিক, বলল মেয়েটা। বিচ্ছুরণ হয় ওগুলো থেকে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ।

মন্দির থেকে ওটাকে সরিয়ে নিয়েছি বলে এমন হয়েছে?

আমিও তাই ভাবছি। তবে সেসময়ে শক ওয়েভ না এলে খুন হতাম আমরা। সৈকতে নামলেই গুলি করত চিনারা।

কাকতালীয়, বলল রানা।

 দূরের ঝড়ের দিকে চেয়ে নরম সুরে বলল মিতা, তুমি তো না-ও আসতে পারতে আমার সঙ্গে?

টাকা পাব বলে হয়তো এসেছি? হাসল রানা।

কে দেবে টাকা?

এরই ভেতর ফাণ্ডে জমা নিজের সব টাকা আমার হাতে তুলে দিয়েছেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান। পায়ের ওপর পা তুলে কাটিয়ে দিতে পারি বাকি জীবন।

সত্যিই অত টাকা দিয়েছেন?

মাথা দোলাল রানা। তোমাকে মেয়ের মত ভালবাসেন। তাই ফিরে পাওয়ার জন্যে পথে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েছেন।

মায়ান স্ফটিক খোঁজার ব্যাপারে তাঁকে রাজি করিয়েছিলেন হ্যারিসন, তাই আমিও আসি এই অভিযানে, বলল মিতা। তারপর যখন কিডন্যাপ হলাম, সব দায় নিজের কাঁধে তুলে নিলেন আঙ্কেল ব্রায়ান। অদ্ভুত ভাল মানুষ।

উদ্ধার পেয়েও দেশে ফিরলে না, বলল রানা। তুমি নিজেও ভাল, তাই প্রফেসরকে খুঁজতে গিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছ। ভুলে যেতে পারতে তাঁর কথা, তা না করে চেয়েছ তাঁকে নিরাপদে রাখতে।

স্রেফ দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছি। রানার চোখে তাকাল মিতা। সব ফেলে আমার জন্যে ছুটে গেলে তুমি হংকঙে, এটাই আমাকে অবাক করেছে। বুঝে গেছি, যাদেরকে পছন্দ করো, তারা বিপদে পড়লে প্রাণ দিতেও দ্বিধা করো না তুমি।

চুপ করে থাকল রানা।

তুমি এমনই, তাই না? কখনও হেরে যেতে চাও না।

মোমবাতির আলোয় লোভনীয় লাগছে মিতার অধর।

অস্ফুট স্বরে কী যেন বলল মিতা। একটু ফাঁক হলো ঠোঁট।

হঠাৎ ওর দিকে ঝুঁকল রানা।

 পরস্পরের চোখে চোখ, বুকে অদ্ভুত এক তোলপাড়।

ছুঁয়ে গেল দুজনের ঠোঁট, কিন্তু তখনই বেরসিকের মত বেজে উঠল রানার স্যাটেলাইট ফোন। পকেট থেকে ওটা বের করে স্ক্রিন দেখল রানা। মিস্টার ব্রায়ান। চেয়ারে হেলান দিয়ে স্পিকার অন করে কল রিসিভ করল ও। বলুন?

বিস্মিত সুরে বললেন এনআরআই চিফ: পশ্চিম উপকূলে খুব কম মোবাইল ফোন এখনও কাজ করছে। কপাল ভাল যে আপনার ফোন এখনও চালু।

আমারটা বিসিআই থেকে পাওয়া সোলার পাওয়ার্ড ফোন, বলল রানা।

দুঃখিত, দেরি করেছি যোগাযোগ করতে, বললেন ব্রায়ান। খুব ব্যস্ত ছিলাম। এদিকে ঘটে গেছে দুর্ঘটনা।

ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলেন তিনি। শেষে বললেন, সুযোগ পেয়ে এনআরআই-এর ঘাড়ে চেপে বসতে চাইছে এখন সিআইএ। তাদের ধারণা, ধ্বংস করে দেয়া উচিত মায়ান স্ফটিক।

আপনি এখন কোথায় এবং কী করছেন? জানতে চাইল রানা।

ইয়াকা মাউন্টেনে, দেখছি আবারও এনার্জি বিচ্ছুরণ হবে কি না ওই পাথর থেকে। সময়ের আগেই হঠাৎ করে বসেছে।

পরস্পরকে দেখল রানা ও মিতা।

বোট আর ইয়াকা মাউন্টেনে একইসময়ে তৈরি হয়েছিল শক ওয়েভ। হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

বোধহয় জানি কী হয়েছে, বলল রানা। বলুন তো?

আরেকটা মায়ান স্ফটিক পেয়েছি। ওটা ছিল উপকূল থেকে আট মাইল গভীর সাগরে এক ডুবো মন্দিরে।

দুর্দান্ত খবর, খুশি হলেন ব্রায়ান।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এনার্জি বিচ্ছুরণ হয়েছে আমাদের ফটিক থেকেও। সেজন্যে চলে গেছে ইউক্যাটানের অর্ধেক এলাকার বিদ্যুৎ।

আমাদেরটাও একই কাজ করেছে, বললেন ব্রায়ান।

আমার ভুল না হলে এসব স্ফটিক সর্বক্ষণ সিগনাল দেয় পরস্পরকে, বলল রানা।

একটা আরেকটাকে খুঁজে নেয়, যেমনটা করে কমপিউটারের নেটওঅর্ক?

এবার আলোচনায় যোগ দিল মিতা। আপনার স্ফটিক ছিল পাঁচ নম্বর দালানের নিচে, আর আমাদেরটা ছিল উপসাগরের পঞ্চাশ ফুট নিচে। চারপাশ থেকে ঘেরা ছিল হাজার হাজার টন পাথর ও প্রবালে। কিন্তু যখন সরিয়ে নিলেন আপনাদের স্ফটিক, ওই একইসময়ে সাগর থেকে আরেকটাকে তুলে এনেছি আমরা।

দুটোর শক ওয়েভ কাকতালীয় মনে হচ্ছে না, সায় দেয়ার সুরে বললেন এনআরআই চিফ। এনার্জি ওয়েভ কীভাবে বাড়ে, ওটা নিয়ে গবেষণা করছি আমরা। হঠাৎ বিকিরণ হলো। স্ফটিকের ভেতর ম্যালফাংশান হয়েছে, অথবা ওই দুই স্ফটিকের ওয়েভ মিলে যেতেই তৈরি হয়েছে শক ওয়েভ।

আমারও তাই ধারণা, বলল মিতা।

ফলে নতুন তথ্য পাব, ব্রায়ানের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে। সামান্য স্বস্তি। এবার হয়তো বুঝব, কী কারণে বেড়ে গেল সিগনাল।

অস্বাভাবিক এসব স্ফটিক নিজেদের ভেতর সংযোগ রাখছে, ফিযিসিস্ট হিসেবে মতামত দিল মিতা, হয়তো কোনও নেটওর্ক আছে?

শক ওয়েভের সময় হয়তো ছিল, বললেন ব্রায়ান, এখন নেই। তা ছাড়া, কনটেন্টমেন্ট সাইটের মত ইয়াকা মাউন্টেনের টানেল। হয়তো সেজন্যে এখানে আনার পর খুব সাধারণ হয়ে গেছে ব্রাযিল স্টোন।

আপত্তি তুলল না মিতা।

তোমার নতুন এই থিয়োরি অনুযায়ী কাজে নামব আমরা, বললেন ব্রায়ান। আমার ধারণা, ঠিক পথেই ভাবছ।

এবার দেখবেন দুই স্ফটিক এক হলে কি ঘটে? জানতে চাইল মিতা। আমরা অবশ্য এ দেশের সিকিউরিটি এড়িয়ে আমেরিকায় জিনিসটা নিতে পারব না। তা ছাড়া, ওটা বিমানে তোলাও নিরাপদ নয়।

ঠিক, সায় দিলেন ব্রায়ান। আপাতত রাখো তোমাদের কাছে। চেষ্টা করো ওটাকে বদ্ধ কোথাও রাখতে। নইলে আবারও দেশ জুড়ে বৈদ্যুতিক বিপর্যয় হতে পারে।

চেষ্টা করব আগলে রাখতে, কথা দিল মিতা।

আপনি দেখুন পাবলোকে সরাবার জন্যে কাগজপত্র পাঠাতে পারেন কি না, বলল রানা।

আপনাদের সঙ্গে ও থাকলে অসুবিধা কী?

ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালসের জন্যে ক্ষতি হচ্ছে ওর, বলল রানা। আপাতত সুস্থ, কিন্তু ওকে নিরাপদ কোথাও সরিয়ে দেয়া উচিত। রাশানরা যে এক্সপেরিমেন্ট করেছে, সে কারণে বিচ্ছুরণ হলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ও।

আসলে কী করেছিল রাশানরা? জানতে চাইলেন ব্রায়ান। ব্রেনে কিছু ইমপ্ল্যান্ট করেছিল, বলল মিতা, শক ওয়েভের পর আধঘণ্টা অজ্ঞান ছিল। হাসপাতালে নিয়ে এমআরআই করিয়েছি। বড় করে দম নিল ও। বড় কথা, ওর দরকার ভাল একটা পরিবার। আমাদের সঙ্গে রয়ে গেলে যে কোনও সময়ে বিপদে পড়বে।

চুপ করে আছেন ব্রায়ান।

গোপনে নিতে পারবেন ওকে আমেরিকায়? জানতে চাইল রানা।

আগেও বলেছি, একবার ওকে পেলে গাপ করে দেবে সিআইএ, তিক্ত স্বরে বললেন ব্রায়ান। ওটা আরও খারাপ হবে। তার চেয়ে দিমিতভের হাতে ওকে তুলে দেয়াও ভাল।

রেগে গেছে মিতা। কাটা কাটা স্বরে বলল, আমরা চাইলেই তো ওর মত ছোট্ট বাচ্চাকে বিপদের ভেতর রাখতে পারি না!

বুঝতে পারছি কী বলছ, কিন্তু আপাতত আমি নাচার, বললেন এনআরআই চিফ।

আমরাও প্রায় নাচার, বলল মিতা, বিপদের ভেতর আছি।

রানার কাছে বেশি নিরাপদ থাকবে ছেলেটা, অপরাধী সুরে বললেন ব্রায়ান। কয়েক সেকেণ্ড পর জিজ্ঞেস করলেন, আসলে ওখানে কী ঘটছে?

পিছনে লেগে গেছে চিনা বিলিয়নেয়ার আর রাশানরা।

ওই দুটো দেশই খেপে গেছে আমাদের ওপর, বললেন এনআরআই চিফ। বলছে, আমরা নাকি গোপনে নিষিদ্ধ কোনও শক্তিশালী অস্ত্র পরীক্ষা করছি। ওটার ওপর আমাদের নিজেদেরই নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের সঙ্গে একমত সিআইএ চিফ ক্যালাগু। এখন সেটাই বোঝাতে চাইছে প্রেসিডেন্টকে। তিনি হয়তো বুঝবেন না যে এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়। মনোভাব পাল্টে ফেলতে পারেন। তা হলে সমস্ত দায় পড়বে এনআরআই বা আমার ওপর।

এসব থেকে কী বুঝব? জানতে চাইল রানা।

চিনা বিলিয়নেয়ারের কিডন্যাপ করা এক রাশান ছেলেকে আমরা কিডন্যাপ করে সরিয়ে নিলে, সমস্ত দোষ পড়বে আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলোর ওপর।

তা হলে ব্যবস্থা করুন কোনও সেফহাউসের, বলল রানা।

মেক্সিকোতে? এনআরআই-এর? তেমন কিছু আমাদের নেই!

আরও গম্ভীর হয়ে গেল রানা। খেয়াল করল, দরজা দিয়ে ঘরে চোখ রেখেছে মিতা। বিছানায় ঘুমিয়ে আছে পাবলো।

রানার মনে হলো, ফালতু এবং নিষ্ঠুর একটা দেশের জন্যে নিরীহ বাচ্চাটার জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে ও। ওই একই বিপদ ঘাড়ে নিয়েছে মিতা ও প্রফেসর হ্যারিসন। অথচ, এদের তিনজনকে আগলে রাখা প্রায় অসম্ভব ওর পক্ষে!

মেঘের মত গুড়গুড় করে উঠল ওর কণ্ঠ, বলতে চাইছেন, আমাদের সঙ্গে পাবলোর রয়ে যাওয়াই নিরাপদ?

তা নয়, নরম সুরে বললেন ব্রায়ান, বলছি, ছেলেটাকে এ দেশে আনলে ক্ষতি হবে ওর। ওকে কেড়ে নেবে সিআইএ বা মিলিটারি। তাতে লাভ হবে না আমাদের কারও।

ঝিরঝির করে একরাশ হাওয়া বইল ব্যালকনিতে। চুপ করে আছে রানা। ওকে দেখছে মিতা, চোখে দ্বিধা ও ভয়। এই রানাকে চেনে না ও।

সবমিলে পাবেন বিরানব্বই ঘণ্টা, বললেন ব্রায়ান, তারপর একসঙ্গে বাড়বে দুই স্ফটিকের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বিচ্ছুরণ।

একটু পর বলল রানা, কী করব, সেটা ফোনে আপনাকে পরে জানিয়ে দেব। বিরক্ত হয়ে কল কেটে দিল ও।

বাড়ছে বাতাসের জোর। শীতল হয়ে উঠছে চারপাশ। কাত হয়ে ব্যালকনির মেঝেতে পড়ল বৃষ্টির বড় কয়েকটা ফোঁটা। তারপরই শুরু হলো ঝমাঝম বর্ষণ। বিজলি জ্বলে উঠল সাগরের বুকে। সেই আলোয় দেখা গেল অস্থির সব বড় ঢেউ।

চুপ করে দূরের ঝড় দেখছে মিতা।

রানার মনে হলো, মেয়েটার বুকেও ভীষণ তুফান। কীসের, বোঝা কঠিন। ওর মগজে ঘুরছে ব্রায়ানের গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা: সবমিলে পাবেন বিরানব্বই ঘণ্টা, তারপর বাড়বে দুই

স্ফটিকের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বিচ্ছুরণ।

কী ঘটতে চলেছে আসলে? মিতার কাঁধে টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকল রানা।

বিপদের জন্যে প্রস্তুত হতে হবে ওদেরকে।

.

৩০.

ক্যামপেচে শহরতলীতে বিশাল ওয়্যারহাউসটি হুয়াং লি ল্যাং ইণ্ডাস্ট্রিয়ালের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান। আপাতত এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে সাধারণ সব ব্যবসার মালপত্র। ওয়্যারহাউস ব্যবহার হচ্ছে ল্যাং-এর ব্যক্তিগত কাজে। আশা করা হচ্ছে, যে-কোনও দিন বিলিয়নেয়ার পাবে তার সাধের মায়ান স্ফটিক।

হুইলচেয়ারে বসে সবার ব্যস্ততা দেখছে ল্যাং। পেছনের দেয়ালের কাছে স্কাইক্রেন হেলিকপ্টার। ওটা দিয়েই আইলা কিউবার্তো দ্বীপ থেকে আনা হয়েছিল রাজার মূর্তি। নতুন মিশনের জন্যে পাশেই আরও দুটো হেলিকপ্টার। দেয়াল ঘেঁষে অসংখ্য ইকুইপমেন্ট। একপাশে আর্মার্ড ভেহিকেল, ইনফ্লেটেবল রাফট, দুজন আরোহীর উপযোগী সাবমেরিন ও কয়েকটি ড্রোন। শেষের চাইনিজ জিনিসটা ইউ.এস. আর্মির প্রিডেটর ড্রোনের মতই।

চারপাশে চেয়ে গর্বে বুক ভরে গেল ল্যাং-এর। পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী। বছরের পর বছর ধরে বাড়ছে তার হাই-টেক সব ইকুইপমেন্ট। সে-কারণেই যুদ্ধে জয় পাবে সে।

ক্রমেই বেড়েছে শারীরিক অসুস্থতা, তাই বাধ্য হয়ে এসব আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে চোখ রেখেছে সাম্রাজ্যের ওপর। অসুখ বাড়তেই সে সুযোগ নিয়ে তাকে শেষ করতে চেয়েছে। অন্য বিলিয়নেয়াররা। তা সম্ভব হয়নি শুধু টেকনোলজির কারণে। অসুস্থতার শুরুর দিকেই সে বুঝে গিয়েছিল, চারপাশে নজর রাখার ক্ষমতা মানুষের বড় কম। তাই নানান দিক থেকে হামলা করবে বাইরের শত্রুরা।

তার ওপর ছিল ঘরের শত্রু। অনেকেই চেয়েছে, শেষ হোক ল্যাং ইণ্ডাস্ট্রি। চরম অসুস্থতার ভেতর বাধ্য হয়ে ব্যবহার করল সে আট্রামডার্ন সার্ভেইলেন্স সিস্টেম।

আশপাশের প্রতি ইঞ্চি জায়গায় চোখ রাখল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফ্টওয়্যার। শত শত অ্যানালিস্টকে চাকরি থেকে বিদায় করে ওই কাজ নিল আধুনিক সব প্রোগ্রাম। নজরদারীর ভেতর পড়ল দক্ষ ও অদক্ষ সবাই। প্রোগ্রাম স্থির করল, কাকে চাকরিতে রাখবে, আর কাকে নয়। আজকাল কোনও মিটিং হয় না। কাজ করে না আবেগ বা বন্ধুত্ব, শুধু ডেটা ও অ্যালগোরিদম বলে দিচ্ছে কী করতে হবে আর কী করতে হবে না। বাড়তি মানুষ বিদায় নেয়ায় মুনাফা বেড়েছে ল্যাং-এর প্রতিষ্ঠানের।

এবার স্ফটিক খুঁজতে অত্যাধুনিক টেকনোলজি ব্যবহার করছে ল্যাং। ক্যাং লাউ এবং তার দলের লোক যতই চেষ্টা করুক, সে বুঝে গেছে, শেষপর্যন্ত জিতবে আধুনিক যন্ত্রপাতি। ওসব চালাতে মানুষের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তারা ভুল করলেও কখনও ব্যর্থ হয় না মেশিন।

ল্যাং-এর ধারণা, ক্যাং লাউ বা তার দল বড়জোর স্পেয়ার পার্ট। নষ্ট হলে বদলে নেবে। মূল কথা: চালু রাখতে হবে দরকারী মেশিন।

ল্যাং-এর সামনে এসে থামল এক ডাক্তার। নতুন চিকিৎসার জন্যে তৈরি।

হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে নিল ল্যাং, চলল টেস্টের টেবিলের দিকে। বরাবরের মতই পাশেই থাকল বিশ্বস্ত ক্যাং লাউ।

ধাতব টেবিলে নানান চেনা ইকুইপমেন্টের সামনে পৌঁছুল ল্যাং। সেগুলোর ভেতর রয়েছে ইলেকট্রিকাল স্টিমুলেটর, মনিটর বা পাওয়ার প্যাক।

আপনি কি তৈরি? জানতে চাইল ডাক্তার।

টেস্ট শেষ? জানতে চাইল ল্যাং।

মাথা দোলাল ডাক্তার। আগের পরীক্ষা থেকে ফিডব্যাক ও ডায়াগনস্টিক দেখে স্থির করা হয়েছে, কীভাবে চলবে চিকিৎসা।

এবার বোঝা যাবে সুস্থ হবে কি না ল্যাং। মৃদু মাথা দোলাল সে। বাড়িয়ে দিল মুচড়ে থাকা হাত। বেশ। কাজ শুরু করুন।

ব্যস্ত হয়ে উঠল ডাক্তার। টেনে নিল বিলিয়নেয়ারের বাহু। ওটার সঙ্গে যুক্ত করল কাঁধে রাখার মত অদ্ভুত এক হার্নের্স। প্রায় বেঁধে ফেলল ল্যাংকে। হার্নেসের নির্দিষ্ট জায়গায় একের পর এক কেবল লাগাল কয়েকজন ডাক্তার।

আপনি চিকিৎসা নিন, আমি যাই, বলল লাউ।

না, এখানেই থাকবে, নির্দেশ দিল ল্যাং।

অস্বস্তি নিয়ে পাশের চেয়ারে বসল বিশ্বস্ত স্যাঙাত।

কাজে নেমে পড়ল ডাক্তাররা।

ওদিকেই এল হলদে এক ফোর্কলিফ্ট। বয়ে আনছে বড় সব বাক্স। টেবিলের পাশে নামিয়ে দিয়ে গেল। দৌড়ে এসে বাক্স খুলল কয়েকজন মজুর। সবচেয়ে বড় বাক্স থেকে বেরোল বিশাল এক যন্ত্র, দেখতে চতুষ্পদী খচ্চরের মত। মাঝে শক্তিশালী ইঞ্জিনটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে কমপিউটার, নিখুঁত ভারসাম্য রাখবে যন্ত্র, চলবে যে-কোনও উঁচু-নিচু জমিতে। ওটার সঙ্গে আছে কয়েক শ পাউণ্ড ওজনের নানান ইকুইপমেন্ট।

ব্যস্ত হয়ে মেশিন অ্যাসেম্বল করছে ল্যাং-এর টেকনিশিয়ানরা। বিরক্তি নিয়ে ওদিকে চেয়ে রইল ক্যাং লাউ।

তোমার বোধহয় ভাল লাগছে না? জানতে চাইল ল্যাং।

দ্বিধা করল লাউ।

তোমার মনে হচ্ছে খামোকা এসব করছি? রাগ চেপে বলল ল্যাং।

আপনার এত ইকুইপমেন্ট আমাদেরকে দেরি করিয়ে দেবে, বলল লাউ।

না, তার উল্টো হবে, বলল বিলিয়নেয়ার।

তার ও কেবল ঠিক জায়গায় আটকে দিয়েছে ডাক্তাররা। ল্যাং-এর বাহুর ওপর বেঁধে দেয়া হলো হার্নেসের পাওয়ার প্যাক। প্রশংসার চোখে টাইটানিয়ামের ব্রেস, হাইড্রোলিক, অ্যাকচুয়েটর, নকল কনুই ও কাঁধের জয়েন্ট দেখল ল্যাং। কবজিতে ভবিষ্যতের বডি আর্মারের মত জিনিস। বাস্তবে ওটা আরও বেশি কিছু।

সব পরীক্ষা করল ডাক্তাররা। অ্যাডজাস্ট করল কিছু জিনিস। নতুন করে টাইট দিল কয়েকটা স্ট্র্যাপ। এবার নানান ছোট মেশিন আটকে দেয়া হলো ল্যাং-এর আঙুলে।

ওই ছেলে বা মেয়েটার ব্যাপারে তোমার সঙ্গে কথা আছে আমার, বলল ল্যাং, বারবার তোমাকে ফাঁকি দিয়ে গেছে তারা।

আপাতত। কিন্তু ঠিকই ওদেরকে হাতের মুঠোয় পাব, বলল ক্যাং লাউ।

গতকাল প্রায় পেয়ে গিয়েছিলে, বলল ল্যাং, কিন্তু তোমাকে বোকা বানিয়ে উধাও হয়েছে।

ক্যাং ও ল্যাং-এর মাঝে টেবিলের পাশে থামল এক ডাক্তার। ল্যাং-এর আঙুলের তারের সঙ্গে আটকে দিল অ্যাকচুয়েটর।

প্রথম সুযোগে পালিয়ে গেছে, আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল লাউ। পারত না, কিন্তু তখনই এল ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বাস্ট। তবে তার আগে সরাসরি আমরা যেতে পেরেছি সাগরের ওই মন্দিরের কাছে। এখন আমাদের লোক ডাইভ দিচ্ছে ওখানে। মন্দিরের হায়ারোগ্লিফের ছবি তুলছে। দুএক দিনের ভেতর অনুবাদ হবে সব। নতুন তথ্য পেলেই সরাসরি যাব পরের গন্তব্যে।

কথা শুনে খুশি হলো না ল্যাং। তুমি দেরি না করলে অনেক আগেই ওই মন্দির থেকে স্ফটিক পেয়ে যেতাম।

তা ঠিক, স্বীকার করল লাউ, কিন্তু বড় সমস্যা হয়নি, জেনে গেছি ওদের থিয়োরি। সবমিলে আছে মোট চারটে ফটিক। তার মানে রয়ে গেছে আরও দুটো।

না, নিশ্চিত সুরে বলল ল্যাং। ওই জিনিস আছে আর মাত্র একটা।

অবাক চোখে তাকে দেখল লাউ।

 প্রিয় কুকুরের সঙ্গে কথা বলার সময় যেমন নরম হয় মানুষের কণ্ঠ, সেই সুরে বলল ল্যাং, জানি, এসব ভালভাবে বোঝার যোগ্যতা বা দূরদৃষ্টি তোমার নেই। তুমি আসলে যন্ত্রের সামান্য একটা পার্টস্, যেটাকে দরকারে ব্যবহার করা হয়।

টেকনিশিয়ানদের দিকে দেখাল সে। তারা টুইযার দিয়ে সরু সব তার আটকে দিচ্ছে হাতের নানান নার্ভ জংশনে। প্রতিবারে সামান্য নড়ে উঠছে ল্যাং-এর বাহু।

সূক্ষ্ম কাজে ধারালো তলোয়ারের ফলার বদলে হাতুড়ি ব্যবহার করলে যা হয়, বলল ল্যাং, হাতুড়ির দোষ দিতে পারে না মজুর। আসলে নিজের কাজ না বুঝে সময় নষ্ট করেছ। আমি কাজ বুঝিয়ে দিয়েছি বলে দোষটা আমার হতে পারে না। চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছ তুমি।

এখন আমাদের কাছে যে ধরনের তথ্য আছে, এবার ওদের আগেই পরের সাইটে পৌঁছব, বলল লাউ। ওরা যখন ওখানে পৌঁছুবে, দেখবে অপেক্ষা করছি আমরা। তখন ফাঁদ পেতে ধরব ওদেরকে। পালাতে পারবে না চাইলেও।

আমরা এবার পাওয়ার দেব, বলল টেকনিশিয়ানদের নেতা।

বিরক্ত চোখে তাকে দেখল ক্যাং লাউ।

কাজ শুরু করো, বলল ল্যাং। মেশিন চালু হতেই সামান্য নড়ল তার বাহু।

টেকনিশিয়ানদের সামনে গোপন কথা বলতে হচ্ছে বলে অপমানিত সুরে বলল লাউ, আমি চিন্তিত।

কী বিষয়ে? বাহু নাড়াবার ডিভাইসটা দেখছে ল্যাং।

সাবধানে মুখ খুলল লাউ, বুঝতে পারছি আপনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন স্ফটিকের জন্যে, কিন্তু ওটার যে ভয়ঙ্কর শক্তি…

লাউ মুখে মুখে কথা বলছে, তাই রাগী স্বরে বলল ল্যাং, রাশানরা ওটা ব্যবহার করেছে ছোট ছেলেটাকে সুস্থ করতে।

তা ঠিক। কিন্তু ওই স্ফটিকের টুকরো কী করেছে, তা নিজেই বুঝতে পারছেন। ওটা কিন্তু নিরাপদ নয় আমাদের জন্যে।

সামান্য বিস্ফারিত হলো ল্যাং-এর চোখ। কড়া সুরে বলল, আমি যা চাই, সেটা সবসময় পেয়ে অভ্যস্ত।

তাই হবে, আপনার জন্যে ওটা কেড়ে এনে দেব, বলল লাউ। কিন্তু খুব সতর্ক হতে হবে আমাদেরকে।

বাড়াবাড়ি করছে ক্যাং লাউ, রাগে অস্থির লাগল ল্যাং-এর। অন্য কিছুও খেয়াল করেছে। ধনদৌলতের লোভ পেয়ে বসেছে লাউয়ের। এ কারণেই বেঈমানি করছে, নির্দেশ অমান্য করছে। এখন পরিষ্কার সব বুঝতে পারছে সে। ইচ্ছে করেই ব্যর্থ হয়েছে লোকটা। তার চাই ল্যাং ইণ্ডাস্ট্রিয়ালের মালিকানা।

তুমি চাও যেন না পাই ওই স্ফটিক, গনগনে রাগ নিয়ে বলল ল্যাং।

না, তা ঠিক নয়, বলল লাউ।

সবই বুঝেছি, আমি মরলেই পথ খুলবে তোমার, ভাবল ল্যাং। তুমিও আর সবার মতই বিশ্বাসঘাতক, লাউ!

সুযোগ পেলে ওটা সরিয়ে ফেলবে, বলল ল্যাং। তুমি চাও আমি মারা যাই!

না, ভুল ভাবছেন। আমি চাই আপনি যেন ওটা পান। তবে এটাও চাই, ওটার কারণে আপনি যেন বিপদে না পড়েন। সেজন্যে…

কথা শেষ করতে পারল না ক্যাং লাউ। চোখ পড়েছে ল্যাং এর কবজির কাছে। ওখানে অদ্ভুত এক ডিভাইস। ওটার ওপর ফণা তোলা সাপের মত নড়ছে ল্যাং-এর আঙুল। তালু মেলল ল্যাং।

ক্যাং লাউ ও হুয়াং লি ল্যাং-এর কাছেই কফিনের মত বড় এক ক্রেট খুলেছে টেকনিশিয়ান। ধুম শব্দে মেঝেতে পড়ল ডালা। বাক্সের ভেতরে ল্যাং-এর কাঁধ ও হাতের অদ্ভুতদর্শন মেশিনের মতই জিনিস। আরও আছে যান্ত্রিক দুই পা। বুক ও মাথার জন্যে বর্ম ও শিরস্ত্রাণের মত জিনিস। হাইড্রোলিক অ্যাকচুয়েটরের সঙ্গে এক বাণ্ডিল ওয়্যায়ার ও র‍্যাক ভরা জি ফোর লিথিয়াম ব্যাটারি।

ওদিকে চেয়ে খুশি হয়ে উঠল হুয়াং লি ল্যাং।

দ্বিধা ও ভয় ফুটল ক্যাং লাউয়ের মুখে।

কয়েক বছর ধরে তোমার ওপর আমি নির্ভরশীল, লাউকে বলল ল্যাং, সহ্য করেছি তোমার ব্যর্থতা। চুরি থেকে শুরু করে বেয়াদবি কম করোনি। তবে এখন থেকে তোমাকে আর দরকার পড়বে না আমার।

তার বাহু ঝুলছে বড় একটা ক্রু-ড্রাইভারের ওপর। হাইড্রোলিক আঙুলগুলো চোখের পলকে খপ করে ধরল ওটা। পেছনে নিল স্ক্রু-ড্রাইভার, পরক্ষণে সামনে বাড়ল বাহু।

বুলেটের মত গতি চমকে দিল ক্যাং লাউকে। বোঝার আগেই বুকে গাঁথল ধ্রু-ড্রাইভার। কাত হয়ে মেঝেতে পড়ল সে। দুহাতে বের করতে চাইল স্টিলের দণ্ড। কিন্তু হাড়ে লেগেছে, খুলল না ওটা। ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে তাজা রক্ত।

বার কয়েক হাঁফিয়ে উঠে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করল লাউ। চোখ গেল মনিবের চোখে। বিড়বিড় করল, আমি… বেঈমান নই… ওদেরকে ধরে আনব… আপনার জন্যে…।

মৃতপ্রায় লাউকে মৃদু হেসে জানাল হুয়াং লি ল্যাং, তোমাকে আর লাগবে না, লাউ। যখন পাব ওদেরকে, আমি নিজেই শাস্তি দেব!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *