৩-৪. সব শুরুরই শেষ

০৩.

সব শুরুরই শেষ আছে; কিন্তু সব শেষেরও তো শুরু আছে।

কলকাতার মাটিতে জোব চার্নক পা দেবার সময় ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে বসাক আর শেঠদের খ্যাতি থাকলেও বাংলাদেশে সচ্ছল ব্যবসায়ীর সংখ্যা নিতান্ত কম ছিল না। পলাশীর যুদ্ধের আগে বাংলাদেশের হিন্দু, মুসলমান ও আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও আরব, পারস্য, তুরস্ক ও তিব্বতে সুতি ও সিল্কের কাপড়, চিনি, লবণ, সোরা ও আফিম বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা আয় করতেন। ঢাকাই মসলিনের চাহিদা তো তখন সারা পৃথিবীতে। মুর্শিদাবাদ সিল্কের জন্য হাহাকার করতেন সমগ্র ইউরোপ ও জাপানের বিত্তবান নারী-পুরুষরা। ইউরোপের ব্যবসায়ীরা বাংলা থেকে কোটি কোটি টাকার সুতি ও সিল্কের কাপড় কিনে জাহাজ বোঝাই করে নিয়ে যেতেন নানা দেশে। নবাব আলিবর্দি খার রাজস্ব বিভাগের হিসেবের খাতায় দেখা যায় শুধু মুর্শিদাবাদ থেকে যে সিল্কের কাপড় ইউরোপে রপ্তানি হয়, তার জন্য শুল্ক বাবদ আয় হয় সত্তর লক্ষ টাকা বাংলার ঘরে ঘরে তখন সত্যি গোলা ভরা ধান।

পলাশীর যুদ্ধের পর কয়েক বছরের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল। হবে না? সিরাজের মৃত্যুর পর মীরজাফর ও মীরকাশিম নিজেদের গদি বাঁচবার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তাদের কিছু কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মচারীর হাতে পঞ্চাশ লক্ষ পাউন্ডের সমতুল্য অর্থ ও সোনা রূপা তুলে দেন। নানা নথিপত্র বিচার-বিবেচনা করে ঐতিহাসিকরা বলেছেন, পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তী তেইশ বছরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা থেকে তিন শ আশি লক্ষ পাউন্ড ইংল্যান্ডে নিয়ে যায়।

দ্বিতীয় পর্বে শুরু হলো জুয়াচুরি। বার্ষিক তিন হাজার টাকা দেবার বিনিময়ে বাংলার গভর্নব যুবরাজ সুজা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যে শুল্ক মকুব করেছিলেন, তার মোল আনা অপব্যবহার করে কোম্পানি যে কত লক্ষ লক্ষ টাকার শুল্ক ফাঁকি দেয়, তার ঠিকঠিকানা নেই।

তৃতীয় পর্বে শুরু হলো বাংলার তাতিদের উপর অত্যাচার। তাঁতিদের মারধর করে কোম্পানির সাহেবরা আসল দামের চাইতেও কম দামে মাল কিনতে শুরু করে। ফলে বাংলার অসংখ্য তাতি তত বোনা ছেড়ে মাঠে নামলেন লাঙল নিয়ে।

তারপর আরো কত কী হলো! বাংলার সমস্ত ঐশ্বর্য লুণ্ঠন শেষ হতে না হতেই ম্যাঞ্চেস্টারে কাপড়ের কল চালু হলো। একদিন যে বাংলার কাপড় পৃথিবীর দিকে দিকে রপ্তানি হতো, সেই বাংলাদেশেই জাহাজ বোঝাই বিলেতি কাপড় আমদানি শুরু হলো।

ফোর্ট উইলিয়ামের প্রথম গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস চলে গেলেন ১৭৮৫এর শুরুতেই অস্থায়ী গভর্নর জেনারেল হলেন স্যার জন ম্যাকফারসন। স্যার জনের পরেই এলেন কর্নওয়ালিশ। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ইনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তও চালু করলেন এবং শুরু হলো জমিদারদের দ্বারা প্রজা শোষণ। দিকে ব্যবসা বাণিজ্য শেষ, তার উপর এই শোষণ! বাংলা ও বাঙালিকে শেষ করার কী অপূর্ব ব্যবস্থা!

এই পরিস্থিতিতেও শুরু হলো নতুন ব্যবসা বাণিজ্য বিলিতি জিনিস বিক্রি। জাহাজ বোঝাই জিনিসপত্র আসতো কলকাতার গঙ্গায়। স্ট্রান্ড রোডের ধারের বড় বড় গুদামে রাখা হতো সে সব জিনিসপত্র। তারপর ঠেলা আর নৌকা বোঝাই করে সে সব জিনিসপত্র ছড়িয়ে পড়তে শহর কলকাতার বাজারে আর গ্রামবাংলার অসংখ্য গঞ্জে।

পরনে আট হাতি মোটা ধুতি, গায় ফতুয়া, গলায় চাদর ও হাতে ছাতি নিয়ে নরোত্তম মল্লিক ঘরে ঢুকেই করজোড়ে নমস্কার করতেই ম্যালকম সাহেব এক গাল হাসি হেসে। বললেন, গুড মর্নিং নড়োটম!

–ভেরি গুড মর্নিং স্যার!

সামনের চেয়ার দেখিয়ে সাহেব বললেন, সিট ডাউন নড়োটম।

কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে নরোত্তম বলেন, নো সিট ডাউন স্যার।

-হোয়াই? কেনো বসিবে না?

-স্যার, আপনি মালিক, আপনি রাজার জাত। আপনার সামনে কি আমার মতো অধম বসতে পারে।

ম্যালকম সাহেব হো হো করে হেসে ওঠেন কিন্তু মনে মনে খুশি হন। তারপর নরোত্তমের দিকে তাকিয়ে একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, ইফ আই অর্ডার ইউ–যদি হামি টুমাকে অর্ডার কড়ি, টাহা হইলে বসিবে?

লজ্জা, ভক্তি, শ্রদ্ধায় নরোত্তম আর সাহেবের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারেন না। মুখ নিচু করে বলেন, স্যার হুকুম করলে কুকুরের পেচ্ছাব পর্যন্ত খেতে পাবি।

ম্যালকম সাহেব মুখ বিকৃতি করে বলেন, ও! ডোন্ট বি সিলি। নাউ টেক ইওর সিট। জরুরি কথা আছে।

সত্যি, জরুরি কথার জন্যই সাহেব ওকে তলব করেছিলেন। ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ ভালই চলছিল কিন্তু লর্ড কার্জন বঙ্গবঙ্গের সিদ্ধান্ত নিতেই এক দল শিক্ষিত ভদ্রলোক সাধারণ মানুষকে এমন খেপিয়ে তুলতে শুরু করেছে যে এম্পায়ার টেক্সটাইল কোম্পানির লন্ডন অফিস পর্যন্ত চিন্তায় পড়েছে। ওরা কদিন আগেই ম্যালকম সাহেবকে তার পাঠিয়ে বলেছে, এই সঙ্কটের মোকাবিলা কীভাবে করা যায় সত্বর জানাও।

নড়োটম।

 ইয়েস স্যার!

–স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, ফেমাস ব্যারিস্টার মিস্টার আনন্ডমোহন বাসু থেকে শুরু করে ফেমাস পোয়েট টেগোর পর্যন্ত এক জোট হয়ে ঠিক করেছেন, আমাদের দেশে টৈরি কাপড় টোমাডের পরতে দেবেন না।

নরোত্তম মল্লিক অধোবদনে সাহেবের কথা শোনেন।

 ম্যালকম সাহেব অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে বলেন, হোয়াট ইজ ইওর ইনফরমেশন? ও সম্পর্কে তোমরা ব্যবসাদাররা কিছু শুনেছ?

 লজ্জায় দুঃখে নরোত্তম মুখ নিচু করেই উত্তর দেন, হ্যাঁ স্যার, শুনেছি বৈকি! উনি এক মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, স্যার, আমি তো স্বপ্নেও ভাবতে পারছি না, এই সব বিলেতফেরত শিক্ষিত ও বনেদী পরিবারের মানুষরা কী করে এই রকম ভুল কাজ করতে পারেন।

–আই অলসনা কান্ট ড্রিম। আমি ভাবতে পারি না বাট দে আর ডুয়িং।

-ইয়েস স্যার।

–এই বিষয়ে তোমরা নিজেদের মধ্যে–আই মিন তোমরা যারা বিলাইতি কাপড়ের মেন ডিস্ট্রিবিউটার–কোনো আলাপ-আলোচনা করেছ?

এবার নরোত্তম মুখ তুলে বলেন, হ্যাঁ, স্যার, করেছি বৈকি।

ম্যালকম সাহেব মুখে কিছু বললেও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকান।

-স্যার, আমার আর কেদার দত্তর ধারণা এইসব ফালতু হইচই করে বিলিতি কাপড় বিক্রি বন্ধ করা যাবে না।

-হোয়াই?

নরোত্তম মল্লিক এক গাল হাসি হেসে বলেন, স্যার, বিলিতি কাপড় ছাড়া লোকে পরবে কী? দেশি কাপড় কি শহুরে মানুষ পরে?

দ্যাটস রাইট বাট এতগুলো ফেমাস লোক যখন মুভমেন্ট করছেন, তখন আমাদের ক্ষতি হতে তত বাধ্য।

মুহূর্তের মধ্যে ঝানু ব্যবসাদার নরোত্তম মল্লিক মনে মনে হিসেব-নিকেশ করে বলেন, তবে স্যার, যদি অনুমতি করেন, তাহলে দুএকটা কথা বলি।

ম্যালকম সাহেব পাইপ ধরাতে ধরাতে বলেন, ইয়েস ইয়েস, সে হোয়াট ইউ লাইক।

–স্যার! নরোত্তম মুখ কাঁচুমাচু করে শুরু করেন, আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, এই আন্দোলনের দ্বারা বিলেতি কাপড় বিক্রি বন্ধ করা যাবে না কিন্তু এতগুলো বিখ্যাত লোক যখন উঠে পড়ে লেগেছেন, তখন কিছু গণ্ডগোল হবেই।

অব কোর্স! ম্যালকম এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বলেন, গণ্ডগোল যে হবে, সে বিষয়ে শুধু আমরা ইংরেজ ব্যবসাদাররা না, গভর্নমেন্টের মনেও কোনো সন্দেহ নেই।

তাই বলছিলাম স্যার, আমাদের যদি কোনো ক্ষতি হয় তাহলে দয়া করে ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা করবেন নয়ত….

ম্যালকম সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে বলেন, লুক হিয়ার নড়োটম, তোমাকে আমি সোজাসুজি বলে দিচ্ছি, এই মুভমেন্টের জন্য তোমাদের যে ক্ষতি হবে, তার মোল আনা ক্ষতিপূরণ তোমরা পাবে।

সাহেব পাইপে একটা টান দিয়ে বলে যান, শুধু তাই নয়, তোমরা যাতে আরো ভাল করে ব্যবসা করতে পারো, তারজন্যও শুধু আমরাই না, স্বয়ং গভর্নর জেনারেল এবং ভাইসরয়ও চেষ্টা করবেন।

মুগ্ধ বিস্ময়ে নরোত্তম হতবাক হয়ে সাহেবের দিকে তাকান। তারপর কোনমতে বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বলেন, স্যার, এত বড় সৌভ্যাগের কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না।

ম্যালকম সাহেব যেন আপন মনেই বিড়বিড় করেন, এই মুভমেন্ট যারা করছে, তাদের উচিত শিক্ষা দেবার জন্যই তোমাদের সাহায্য করতেই হবে।

সাহেবকে শত কোটি প্রণাম জানিয়ে নরোত্তম মল্লিক বিদায় নেন এবং মনে মনে বলেন, এই শালা ইংরেজ জাতটা হচ্ছে হাড় কেল্পনের জাত। ওয়ান পাইস ফাদার-মাদার না, একেবারে গ্র্যান্ড-ফাদার-গ্র্যান্ড-মাদার! এই শালা ম্যালকমকে কত বছর ধরে বলছি, স্যার, আপনি আমাদের বাপ-মা, দয়া করে একটু কমিশন বাড়িয়ে দিন, কিন্তু না, কিছুতেই করল না। কখনও বলেছে, হা দেখছি; আবার কখনও বলেছে, বিলেতে চিঠি লিখেছি….

এই সব কথা ভাবতে ভাবতে ঘোড়ার গাড়ি বৌবাজারে পৌঁছে যায়। বাহান্ন বছরের নরোত্তম মল্লিক আনন্দে খুশিতে প্রায় বাচ্চা ছেলের মতো সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে সুহাসিনীর ঘরে ঢুকেই ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে নাচতে শুরু করেন। সুহাসিনী কোনো মতে পানের পিক গিলে বলে, কিরে মিনসে, কার সব্বোনাশ করে আবার কী সম্পত্তি করলি?

নরোত্তম এবার নাচ থামিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসি হেসে বলেন, ওরে মাগী, এবার আর কোনো বোস-ঘোষ-মিত্তির বা বাঁড়ুজ্যে-চাটুজ্যে না, একেবারে ম্যালকম সাহবকে কুপোকাত করব।

–ওরে মিনসে, তুই কি আজ দিনে-দুপুরে গাঁজা টেনেছিস?

না নরোত্তম মল্লিক গঞ্জিকা সেবন করে আসেনি। এবার ও গম্ভীর হয়ে বলে, সত্যি, সুহাস, ম্যালকম সাহেএমন প্যাঁচে পড়েছে যে…

সাহেব পাচে পড়ল কেমন করে। ওরা রাজার জাত। ওরা কি কাঁচা কাজ করে?

সুহাসিনীকে নরোত্তম সত্যি ভালবাসে। ভালবাসবে না কেন? সারাটা দিন সংসার ধর্ম টাকাকড়ি ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কত ঝামেলা যে ওকে সহ্য করতে হয়, তার ঠিকঠিকানা নেই। এক একদিন অসহ্য মনে হয়। মুহূর্তের জন্য মনে হয়, সব ছেড়েছুঁড়ে কোথাও পালিয়ে যায়। কিন্তু না, নরোত্তম পালিয়ে যায় না, যেতে পারে না। সন্ধ্যের পর গদি থেকে বেরিয়ে হাজার দুঃশ্চিন্তার বোঝা মাথায় নিয়ে ও প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো চলে আসে বৌবাজার।

তারপর?

এক ঝি পাখার বাতাস করে, আরেক ঝি পা ধুইয়ে শুকনো গামছা দিয়ে মুছিয়ে দিতে না দিতেই সুহাসিনী এক গেলাস শরবত আর এক থালা জলখাবার নিয়ে হাজির হয়।

–আজ আর কিছু খাবো না।

-কেন?

–ইচ্ছে করছে না।

–ইচ্ছে করছে না বললেই কি হয়? সুহাসিনী পাশে বসে নিজে হাতে পাখার বাতাস করতে করতে বলে, সেই সাত সকালে বড়গিন্নির হাতে দুমুঠো নাকে-মুখে দিয়েই তো গদিতে গিয়েছ। তারপর সারাদিন তো আর মুখে কিছু দাওনি।

নরোত্তম তবু বলেন, সত্যি সুহাস, এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।

–তাই কি হয়, এই পরিশ্রমের পর পেটে কিছু না পড়লে শরীরটা থাকবে কী করে?

এইটুকু বলেই সুহাসিনী চুপ করে থাকে না। নিজে হাতে ওঁকে খাইয়ে দেয়। নরোত্তম ওকে বাধা দেন না; বরং খুশি হন।

তারপর সুহাসিনীর বুকের মধ্যে আত্মসমর্পণ করে উনি সব দুঃশ্চিন্তার হাত থেকে মুক্তি পান।

.

সমগ্র বাংলাদেশের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগরের ধার, চট্টগ্রামের অরণ্য-পর্বত থেকে বীরভূমের লাল মাটি আর বাঁকুড়ার কাকুরে মাটিতে হঠাৎ এক চাঞ্চল্যর ঢেউ অবাক করে দিল শুধু কার্জন সাহেবকে না, বিলেতের ভারত-ভাগ্য বিধাতাদেরও। সবাই বিস্মিত হতম্ভব! সমস্ত বঞ্চনাকে যারা ভাগ্যের পরিহাস বলে স্বীকার করে নিয়েছিল, সেই বঞ্চিত বুভুক্ষু গভীর নিদ্রামগ্ন বাঙালির ঘুম ভাঙল কী করে? শুধু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদেরই না, সমস্ত ইংরেজকে যে বাঙালি জাতি দেবদূত বলে তাদের প্রত্যেকটি হুকুম নিঃশব্দে তামিল করেছে, সেই বাঙালিই কি মন্ত্রবলে তাদের উপেক্ষা করল? কী আছে ঐ বন্দেমাতরম কথাটির মধ্যে?

ম্যালকম সাহেব তো ভেবেই পেলেন না, বিলেতে তৈরি অত সুন্দর কাপড়ের পরিবর্তে বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে তৈরি মোটা কাপড়গুলো ব্যবহার করার কী আনন্দ বা সার্থকতা থাকতে পারে?

কর্নেল লংম্যানের পার্টিতে সব সাহেবের মুখেই এক কথা, এ আলোচনা।

–জাস্ট টেল মি টড, প্রিন্স দোয়ারকা নাথ টেগোরের গ্র্যান্ডসন হয়ে পোয়েট টেগোর কী করে নাখোদা মস্কের মুসলিমদের এমব্রেস করলেন? হুইস্কির গেলাসে চুমুক দেবার আগেই মিঃ ফ্রিম্যান প্রশ্ন করেন গভর্নর জেনারেলের পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্টের অন্যতম কর্ণধার মিঃ টডসনকে।

টডসন উত্তর দেবার আগেই পাশ থেকে মেজর মার্শম্যান চোখ দুটো বড় বড় করে বলেন, নট ওনলি দ্যাট, পোয়েট টেগোর খালি পায় ক্যালকাটার ডার্টি রাস্তায় প্রসেশন করেছেন একদল ছোটলোককে সঙ্গে নিয়ে।

টডসন সাহেব হুইস্কির গেলাসে সামান্য একটু চুমুক দিয়ে গলাটা একটু ভিজিয়ে নিয়েই অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলেন, পোয়েট টেগোর বিখ্যাত জামিদার বাড়ির লোক হয়ে এইসব কী করে করলেন, তা সত্যি সারপ্রাইজিং….

অ্যান্ড শকিং টু! পাশ থেকে মন্তব্য করলেন এক মেমসাহেব।

-ইয়েস অব কোর্স! মেমসাহেবের দিকে মাথা নেড়ে বললেন টডসন। তারপর একটু থেমে বলেন, ব্যানার্জিকে আই-সি-এস থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি হয়তো হতাশা বা রাগে অনেক কিছু করতে পারেন কিন্তু হোয়াই ফেমাস ব্যারিস্টার আনন্ডমোহন বাসু বা পোয়েট টেগোর? সব ব্যাপারটাই খুব সিরিয়াসভাবে ভেবে দেখা হচ্ছে।

ওদের গুরুগম্ভীর আলোচনার মাঝখানে আই-সি-এস ক্লিফটন সাহেব যে কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা কেউ খেয়াল করেননি। টডসনের কথা শেষ হতেই উনি বললেন, সব চাইতে বড় কথা, এই লোকগুলো কোন সাহসে ক্রাউনের বিরুদ্ধে শুধু নিজেরাই হই হই করল না, বেঙ্গলের হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কমনম্যানকে খেপিয়ে তুলল?

যাই হোক, অসন্তোষের আগুন তখনও চারদিকে ছড়িয়ে থাকলেও দাউ দাউ করে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, তা একটু থামতেই তখন আলাপ-আলোচনা, হিসেব নিকেশের পর্ব চলছে সর্বত্র। নরোত্তম মল্লিক একদিন হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে  ম্যালকম সাহেবের কাছে হাজির।

–হোয়াটস্ দ্য ম্যাটার নড়োটম? এত কাঁদছ কেন?

নরেত্তম মল্লিক সোজা সাহেবের দুটি পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতেই বলল, স্যার, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে।

–এনি বডি ইন ইওর ফ্যামিলি মারা গিয়েছেন?

–স্যার, বাড়ির কেউ মারা গেলে কি এত চোখের জল পড়তো? নরোত্তম অদ্ভুত দুটি চোখে ব্যাকুল দৃষ্টিতে সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, তার চাইতে অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে।

–আচ্ছা! আচ্ছা! আর কাঁদতে হবে না। কী হয়েছে, তাই বলো।

–স্যার, নরোত্তম এবার উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত জোড় করে বলে, স্যার, আমার সেকেন্ড ওয়াইফ-এর ফার্স্ট ছেলে পুরুষোত্তম ইস্ট বেঙ্গলের থেকে আজই…

ম্যালকম সাহেব কোনো মতে হাসি চেপে জিজ্ঞেস করেন, নড়োটম, তোমার কটা ওয়াইফ?

–স্যার, ওনলি টু ওয়াইফ অ্যান্ড…

–অ্যান্ড?

নরোত্তমের ঐ অন্ধকার মুখ মুহূর্তের জন্য একবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলে স্যার, অ্যান্ড সুহাসিনী দাসী মাই কেপ্ট!

–আই সি! ম্যালকম সাহেব এবার আর না হেসে পারেন না :

–স্যার, সুহাসিনী ভেরি বিউটিফুল; ভেরি গুড গার্ল। ও না থাকলে আজ আমি ঠিকই আত্মহত্যা করতাম।

-তাই নাকি?

-হ্যাঁ স্যার!

ম্যালকম সাহেব আবার একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, আই অ্যাম হ্যাঁপি টু নো। ইট। তুমি আত্মহত্যা করলে তো আমি হাজার সমস্যায় পড়তাম।

সাহেব এখানেই থামেন না। বলেন, আমি বেশ বুঝতে পারছি, মহিলাটি সত্যি ভাল এবং বুদ্ধিমতী।

সাহেবের কথা শুনে নরোত্তম মনে মনে আত্মহারা হয়ে যায়। বলে, স্যার, সুহাসিনী ইজ টনিক, সুহাসিনী ইজ গন্ধরাজ!

ওর কথা শুনে সাহেব হো হো করে হেসে ওঠেন।

না, নরোত্তম মল্লিক তার আসল উদ্দেশ্য ভুলে যায় না। বলে, স্যার, সেকেন্ড ওয়াইফএর ফার্স্টসনের কাছে যখন শুনতে পেলাম, এই হতচ্ছাড়া বন্দেমাতরমওয়ালারা আমার কাপড় বোঝাই দশ-বারোটা নৌকা শুধু পদ্মা আর মেঘনাতেই ডুবিয়ে দিয়েছে…

রিয়েলি?

নরোত্তম আবার কাঁদতে শুরু করে।

–ডোন্ট ক্রাই। কী কী ক্ষতি হয়েছে, তাই বলো।

নরোত্তম ধুতির এক কোনা দিয়ে চোখের জল মুছে বলে, স্যার, বন্দেমাতরমওয়ালারা ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিং আর বরিশালের পনের আনা কাপড়ের দোকান পুড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া যশোর-খুলনা রংপুর-বগুড়া রাজশাহীতে দোকান পোড়ানো ছাড়া দোকানদারদের খুব মারধর করেছে।…

ম্যালকম সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলেন, হ্যাঁ, মিঃ টডসন বলছিলেন, পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্টেও এই ধরনের খবর এসেছে।

-স্যার, এদিকে কলকাতা আর ব্যারাকপুরের দুটো গুদামই তো…

লুঠ হয়েছে তো?

 -হ্যাঁ, স্যার।

–ইয়েস দ্যাট আই নো। ম্যালকম সাহেব এবার পাইপ ধরিয়ে একটা টান দিয়ে যেন আপনমনে বলেন, দ্য হোল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কোলাপসড়!

-স্যার, আমাকে কিছু বললেন?

-ইয়েস নড়োটম, তোমার যেখানে যা ক্ষতি হয়েছে, তার পুরো হিসেব আমাকে চটপট দাও। কেডার ডাট্টা অ্যান্ড আদার ডিস্ট্রিবিউটরদেরও বলল, আমাকে পুরো হিসেব দিতে।

–ইয়েস স্যার! তবে আমার মতো ক্ষতি আর কারুর হয়নি।

দ্যাট আই নো।

.

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে সত্যি বহু বিলেতি কাপড়ের ব্যবসাদারদের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে হাটেবাজারে যেসব দোকানদাররা বিলেতি কাপড় বিক্রি করতেন, তাঁদের অধিকাংশ দোকানই আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কিছু কিছু জায়গায় লুটপাটও হয়। ক্ষতি হয়েছিল নরোত্তম মল্লিকেরও; তবে সে ক্ষতি অতি সামান্যই।

–নরোত্তম অতীব ঝানু ব্যবসদার। আন্দোলন শুরু হবার বেশ কিছুদিন আগেই সে সমস্ত গুদাম থেকে পনের আনা কাপড় অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়। তাছাড়া খাতাপত্তরে লিখে রাখে, বিশ-বাইশটা নৌকো বোঝাই কাপড় নানা জেলায় পাঠিয়েছে। তারপর একদিন সুরেন বাঁড়ুজ্যের এক চেলার সঙ্গে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করে, কিহে মিত্তির মশাই, তোমরা নাকি আমাদের কাপড়ের ব্যবসা করেতে দেবে না?

–না, বিলেতি কাপড় আর বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।

 –হবে না মানে?

আমরা সব বিলেতি কাপড় পুড়িয়ে দেব। মিত্তিরমশাই একটু থেমে বলেন, শ্রদ্ধানন্দ পার্কের অনুষ্ঠানের পর স্বেচ্ছাসেবকরা বিলেতি কাপড়ের দোকানে আর গুদামে আগুন দিতে শুরু করবে।

-তাই নাকি?

হ্যাঁ মল্লিকমশাই! নেতারা স্পষ্ট করে কিছু না বললেও স্বেচ্ছাসেবকরা এই রকম ঠিক করেছে।

নরোত্তম বেশ গম্ভীর হয়ে বলে, তাহলে তো যথেষ্ট চিন্তার কথা।

মিত্তিরমশাইয়ের সঙ্গে নরোত্তম মল্লিকের পরিচয় বহুদিনের। তাই মিত্তিরমশাই একটু ভেবে বলেন, শুনছি, কেউ কেউ কাপড়-চোপড় সরিয়ে ফেলছেন। আপনিও সরিয়ে ফেলুন।

-কোথায় সরিয়ে ফেলব বলুন? একি দুএকটা কাপড় যে গিন্নির বাক্স-প্যাটরায় লুকিয়ে রাখব?

–তা ঠিক কিন্তু..

–কিন্তু কী?

–আপনার সব গুদামই তো বড় বড় রাস্তায়। ওগুলো কি বঁচাতে পারবেন? এবার নরোত্তম একটু হেসে বলে, গুদামে আগুন লাগলে আমাকে বিলিতি কাপড়ের ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসা ধরতে হবে। ব্যবসা ছাড়া আমি তো আর কিছু বুঝি না।

-হ্যাঁ, হ্যাঁ, অন্য ব্যবসাই ধরুন।

.

শুধু ইংরেজ সরকার না, ইংরেজ ব্যবসাদারদের সেই মহা দুর্দিনে ম্যালকম সাহেবকে বোকা বানিয়ে নরোত্তম মল্লিক কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক লাখ টাকা কামিয়ে নেয়। ঢাকাই মসলিন, কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদের সিল্ক, তাঁতের কাপড়, লবণ, সোরা, আফিম ইত্যাদি রপ্তানির ব্যবসা বন্ধ হলেও নতুন কিছু বাঙালি ব্যবসাদার ইংরেজদের কৃপায় নতুন করে ধনী হন। নরোত্তম তাঁদেই একজন। বাঙালির সর্বনাশের দিনেই এদের পৌষ মাসের শুরু।

.

হঠাৎ কিছু টাকা পেয়েই কেদার দত্তর মাথায় টাকা ওড়াবার নেশা চেপে ধরল। শুরু হলো দুর্গাপূজা আর কাঙালি ভোজন দিয়ে কিন্তু তারপরই হঠাৎ উনি সঙ্গীতরসিক হয়ে উঠলেন। এমন রসিককে রস-সাগরে ভাসবার জন্য বন্ধুর অভাব হলো না। কেউ খবর দেন, রামপুরের বাঈজী নানু বাঈএর গজল শুনে নাকি জয়পুরের মহারাজা ঠিক করেছেন, জীবনে আর কোনো বাঈজীর গান শুনবেন না। বাগবাজারের নিত্য চাটুজ্যে সে খবর শুনে হেসেই আটখান। কেদার দত্ত অবাক হয়ে বলেন, কিরে নিত্য, হাসছিস কেন?

পিকদানিতে পানের পিক ফেলেই নিত্য চাটুজ্যে বলে, হাসব না? জয়পুরের মহারাজা আবার গানের সমঝদার হলেন কবে?

–তুই কী বলছিস নিত্য? জয়পুরের মহারাজা গানবাজনার সমঝদার না?

–আজ্ঞে না। নিত্য চাটুজ্যে মাথা নেড়ে বলে, জয়পুরের মহারাজা ঘোড়ার ডিম গানবাজনা বোঝেন।

–যাঃ! তাই হয় নাকি?

–ওরে বাপু, জয়পুরের মহারাজা পৃথিবীবিখ্যাত শিকারী কিন্তু…

 কেদার দত্ত দুটো চোখে বড় বড় করে বলে, তাই নাকি?

তবে বলছি কী? নিত্য এবার সোজাসুজি কেদার দত্তর চোখের উপর চোখ রেখে বলে, জয়পুরের মহারাজা বছরের ছমাস থাকেন অফ্রিকার জঙ্গলে আর ছমাস থাকেন বিলেতে।

–উনি জয়পুরে থাকেন না?

–দুচার বছর পর দুচারদিনের জন্য আসেন। নিত্য একটু ঢোক গিলে বলে, গানবাজনার ব্যাপারে ওঁর আগ্রহও নেই, সময়ও নেই।

এবার কেদার দত্ত একগাল হাসি হেসে বলে, শালা নুটু ঘোষ গুল মেরেছে।

কেদার দত্তর কথা শুনে নিত্য চাটুজ্যে খুশি হয়। মনে মনে ভাবে, টোপ গেলাতে পেরেছে। কিন্তু মনের কথা মনে রেখেই গম্ভীর হয়ে বলে, যদি সত্যি গজল শুনতে হয়, তাহলে লাহোরের বিখ্যাত বাঈজী রেশোনারা বাঈএর কাছে যেতে হবে।

কেদার দত্ত গানবাজনার কচু বোঝে কিন্তু ম্যালকম সাহেবের কৃপায় ফালতু লাখ খানেক হাতে আসার পর দুচারজন বাঈজীর মজলিসে যাতায়াত করেই এমন ভান দেখায় যে ও গানবাজনার কত বড় সমঝদার। তাই তো রোশোনারা বাঈএর নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এর কথা ওস্তাদ বদরুদ্দীন খাঁ সাহেবের কাছে বহুবার শুনেছি।

নিত্য চাটুজ্যে সঙ্গে সঙ্গে ফোড়ন কাটে, রোশেনারা বাঈএর নাম বড় বড় ওস্তাদদের কাছেই শুনবে। নুটু হারামজাদা ওর নাম জানবে কেমন করে?

নিত্য একটু থেমে একবার আড়চোখে কেদার দত্তকে দেখে নিয়ে বলে, যারা জন্ম থেকে শ্যালদা স্টেশনের কুলিদের ঢোল পিটিয়ে গান করা শুনে আসছে, তারা এইসব বাঈজীদের কদর বুঝবে কেমন করে?

–ঠিক হ্যায়! চলিয়ে লাহোর!

এই করেই কেদার দত্ত শেষ হয়ে যায় কিন্তু নরোত্তম মল্লিক অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। ম্যালকম সাহেবকে বোকা বানিয়ে বেশ কয়েক লাখ টাকা পকেটে পুরলেও কাউকে বিশেষ কিছু বুঝতে বা জানতে দিল না। বন্দেমাতরমওয়ালাদের হই-হুঁল্লোড় একটু ঝিমিয়ে পড়ার পর বিলেতি কাপড়ের ব্যবসা আবার চালু হলে বড় গিন্নির অনুরোধে একদিন শনি-সত্যনারায়ণ পূজা হলো, ছোট গিন্নির আবদারে দুই বউকে দুখানা। বেনারসী আর সুহাসিনীর জুটল একটা বিছে হার। সবাইকেই এক কথা বলল নরোত্তম মল্লিক, ভেবেছিলাম আরো কিছু করব কিন্তু তা আর পারলাম না। আমরা যদি ডালে ডালে চলি, তাহলে সাহেবরা চলে পাতায় পাতায়। তাছাড়া শালারা সত্যি কথা বলে না।

সুহাসিনী অবাক হয়ে বলে, সেকি গো! রাজার জাত হয়েও ওরা মিথ্যে কথা বলে?

নরোত্তম মুখ বিকৃত করে বলে, আমাদের মতো ও শালাদের কি ধম্মো অধম্মে জ্ঞান আছে? হাজার মিথ্যে কথা বলে ও শালারা শুধু কাজ হাসিল করে নেয়।

-তুমি যে আগে ম্যালকম সাহেবের কত পোসংসা করতে?

–গণ্ডগোল শুরু হবার আগে শালার কত বড় বড় কথা! হ্যাঁনো করেঙ্গা, ত্যানো করেঙ্গা! নড়োটম, ডোন্ট বদার! তোমাদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, তার ষোল আনা ব্যবস্থা আমি করব।

এবার নরোত্তম একটু ম্লান হেসে বলে, যেই গণ্ডগোল থামল, অমনি শালা বেমালুম সব ভুলে গেল।

শুনে সুহাসিনী সত্যি দুঃখিত হয়, হতাশ হয়। তবু জিজ্ঞেস করে, তুমি কিছু বললে?

-কী বলব সুহাস? আমাকে তো ব্যবসা করে খেতে হবে। তারপর খুব জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, জলে বাস করে কি কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যায়.?

সুহাসিনী মাথা নেড়ে বলে, সে তো একশবার।

সুহাসিনীর কাছে পরীক্ষায় পাশ হবার পর নরোত্তম মনে মনে খুশি হয়। একটু হাসে। দুহাত দিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিয়ে বলে, মাগী, তুই যদি আমাকে প্রাণভরে আনন্দ দিতে পারিস, তাহলে ব্যবসা কাকে বলে, তা আমি দেখিয়ে দেব। তুড়ি মেরে লাখ লাখ টাকা আয় করব।

সুহাসিনী একটু ঢল ঢল ভাব করে বলে, তখন কি আর আমাকে ভাল লাগবে? আরো ডাগর-ডোগর কোন মাগী…

নরোত্তম এক গাল হাসি হেসে দুহাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়েই টানতে টানতে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলে, তোর চাইতে ডাগর-ডোগর মাগী হয় নাকি?

-সত্যি?

-সত্যি বলছি; তোকে ছুঁয়ে বলছি।

–ছোটবউকে বেশি ভালবাসিস, নাকি আমাকে?

 নরোত্তম হো হো করে হেসে উঠে বলে, বউকে আবার কেউ ভালবাসে?

ম্যালকম সাহেব ভাবেন, নরোত্তম মল্লিকের মতো সৎ ও ইংরেজ ভক্ত ব্যবসাদার হয় না; সুহাসিনী ভাবে, ওর মতো বাবু হয় না। কিন্তু নরোত্তম নিজে জানে, সে কী। সে ম্যালকম সাহেবকে বলল, সেকেন্ড ওয়াইফ এর ফার্স্ট সন পুরুষোত্তম ইস্ট বেঙ্গল ঘুরে সব রিপোর্ট এনেছে কিন্তু সাহেব তো জানে না, সেকেন্ড ওয়াইফর কোনো ছেলেমেয়েই এখনও পর্যন্ত হয়নি। হবে কেমন করে? এইতো সেদিন বিয়ে করল। তাছাড়া কদিন ও স্বামীর সোহাগ ভোগ করেছে? শ্বশুরমশায়ের বুড়ো বয়সের কচি মেয়ে। দেখেই মনটা গলে গেল। সঙ্গে দুশ-আড়াইশ ভরি সোনা আর মানিকতলার ঐ দোতলা বাড়ি সমেত সাড়ে পাঁচ বিঘে জমি! এ সুয়োগ ছাড়ার মতো কাঁচা রাত্র নরোত্তম মল্লিক না।

খবরটা শুনে বড়বউএর চোখে জল এসেছিল। নরোত্তম ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, হা ভগবান! তুমি কাঁদছ?

–তুমি আমার সব্বোনাশ করতে যাচ্ছে আর আমি কাঁদব না?

–আমি তোমার সব্বোনাশ করতে যাচ্ছি? নরোত্তম অবাক হয়ে বড়বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলে।

–তুমি আমার ঘরে সতীন আনবে আর….

নরোত্তম হেসেই আটখান। ঐ হাসতে হাসতেই বলে, দূর বোকা! এ হুঁড়িকে বিয়ে করছি তোমার সব্বোনাশের জন্য?

–তবে কি আমার মরার পর সর্গে বাতি দেবার জন্য?

এবার নরোত্তম অত্যন্ত ধীর স্থির হয়ে বলে, শোনো বড়বউ, ঐ বুড়ো নগেনের কচি মেয়েটাকে ঘরে আনছি তোমারই ভালর জন্য।

–ঘরে সতীন আনছ আমারই ভালর জন্য?

নরোত্তম মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ। তারপর একটু থেমে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা বড়বউ, আমার বয়স কত হলো?

পুরো পঞ্চাশ।

-তোমার বয়স কত?

–এই সাঁইত্রিশে পড়েছি।

 –কত বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে?

 –পঁচিশ বছর।

–তোমাকে আমি ভালবাসি না?

–আমি কি তাই বলেছি? বড়বউ মুখ নিচু করে বলে, তোমার সোহাগের দয়াতেই তো আমি শাঁখা-সিঁদুর পরে হাসি মুখে দিন কাটাচ্ছি।

বড়বউ এবার হেসে বলে, আমি তো আমার সইকে বলি, আমি যা স্বামীর সোহাগ পাই, তা বোধহয় কোটি কোটি মেয়ের কপালে জোটে না।

হাসে নরোত্তমও। বলে, তবে? তবে? সেই আমি তোমার সব্বোনাশ করব। এবার ও বড়বউকে বোঝায়, সত্যি বলছি, রাধাকৃষ্ণের নামে দিব্যি করে বলছি, এই কচি মেয়েটাকে ঘরে আনছি তোমার আর তোমার ছেলেমেয়ের মুখ চেয়ে। তুমি তো খাটতে খাটতে মরে গেলে। রাধাকৃষ্ণের সেবা করা থেকে সংসারের হাজার ঝুট-ঝামেলা এক হাতে সামলানো কি সহজ ব্যাপার?

বড়বউ চুপ করে স্বামীর কথা শোনে।

নরোত্তম বলে যায়, এ ছুঁড়ি তোমার দাসী হয়ে সংসারে থাকবে। তোমার সেবা যত্ন কাজকর্ম,

–আহাহা! সে করবে কেন?

না করলে লাথি মেরে দূর করে দেব না! নরোত্তম মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, তাছাড়া আরো ব্যাপার আছে।

–কী?

কলকাতা কী করে বাড়ছে দেখেছ? আমাদের চোদ্দ পুরুষ ভাবেনি, কালীঘাটের চারপাশে, আদি গঙ্গার দুদিকে কোনোদিন ভদ্দরলোক বাস করবে। আর এখন?

বড়বউ ওর কথার কোন মাথামুণ্ডু বোবাঝে না। শুধু হাঁ করে চেয়ে থাকে।

নরোত্তম থামে না, বলে যায়, তোমার ছেলেরা যখন বড় হবে, তখন মানিকতলার ঐ সাড়ে পাঁচ বিঘে জমির দাম হয়তো সাড়ে পাঁচ কোটি টাকায় পৌঁছবে।

নরোত্তম একবার কোনো মতে নিঃশ্বাস নিয়েই বলে, দুচার বছর যেতে না যেতেই হয়তো দেখবে, নতুন কারখানা করার জন্য সাহেবরা ঐ জমি কিনতে আমার বাড়িব দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপার বড়বউ কিছুই বোঝে না। তবে এটুকু জানে, এই সব ব্যাপারে তার স্বামী কোনো ভুল করার মানুষ না। তবুও বড়বউ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সবই বুঝলাম কিন্তু সতীন তো সতীনই হবে।

আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি বডবউ, যদি এই হতভাগী কোনো অশান্তি করে, তাহলে আমি তাকে ত্যাগ করব।

বড়বউ মানুষটি সত্যি ভাল। বড় শান্তিপ্রিয় আর স্বামীর প্রতি তার অগাধ ভক্তি। কবছর আগে সুহাসিনীকে রক্ষিতা রাখার সময়ও বড়বউ কান্নাকাটি করেছিল। তখন নরোত্তম বলেছিল, বড়বউ, আমি তোমারই থাকব। শুধু সন্ধেবেলায় দুএক ঘণ্টা ওখানে কাটিয়ে চলে আসব।

–তুমি ঠিকই ওখানে রাত কাটাবে।

বড়বউ, আমি জীবনেও ওখানে রাত কাটাবো না। সংসার আর ব্যবসা নষ্ট করার পাত্তর নরোত্তম মল্লিক না।

-এখন তো অনেক কথাই বলবে কিন্তু ঐ ডাইনীর হাতে পড়লে কি এইসব কথা মনে থাকবে?

বড়বউ, ও মাগী যদি বুনো ওল হয়, তাহলে আমিও বাঘা তেঁতুল।

.

নরোত্তম সত্যি কথা রেখেছে। ঝড়-বৃষ্টি-প্লাবন যাই হোক, নরোত্তম মল্লিক তিনশ পঁয়ষট্টি দিন সন্ধের পর সুহাসিনীর কাছে যাবেই। না যেয়ে পাবে না। কিন্তু দুএক ঘণ্টা সোহাগ-ভালবাসার খেলাধুলা করেই বলে, সুহাস, আজ উঠি।

–এখনই? এরই মধ্যে উঠবে?

-হ্যাঁ। নরোত্তম খুব জোরে একবার নিঃশ্বাস ফেলে বলে, কত কাজ ফেলে তোর কাছে আসি জানিস?

-তোমার যে কাজ অনেক, তা আমি ভাল করেই জানি।

গলায় চাদর, পায়ে পাম্প জুতো দিয়ে বারান্দায় পা দিয়েই নরোত্তম সুহাসিনীর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলে, এই দুএক ঘণ্টা তোর সঙ্গে খেলাধূলা করে মনটাকে একটু তাজা করে নিয়ে আবার কাজে বসি।

স্বামী রক্ষিতা রেখেছে বলে এখন বড়বউ-এর সত্যি কোনো দুঃখ নই। যদি এই বিষয়ে ওকে কেউ কখন কিছু বলে তাহলে তাকে বড়বউ শুনিয়ে দেয়, তোমাদের গগন ঘোষাল যে তাস খেলেই বউ-ছেলেমেয়েকে পথে বসাচ্ছে,তা দেখতে পাও না? কেন, কেষ্ট ভটচাজ যে গলায় পৈতে দিয়ে সোনাগাছিতে পড়ে থাকে, তাও কি কারুর চোখে পড়ে না? হারু দত্ত তো চব্বিশ ঘণ্টা বোতল নিয়ে পড়ে থাকে। সে বেলায় কারুর মুখে কোনো কথা নেই। যত দোষ এই নন্দ ঘোষের; তাই না?

বড়বউ কোনোমতে একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলে, ওরে বাপু, আমার মতো স্বামী পেতে হলে জম্মো জম্মো তপস্যা করতে হবে।

.

ম্যালকম সাহেবের জাহাজ তখনও বোধহয় খিদিরপুর জাহাজঘাট থেকে ছাড়েনি। নরোত্তম মল্লিক ফুলের তোড়া, এক বোতল শ্যাম্পেন আর একটা বিরাট কেক নিয়ে ডেকস্টার সাহেবের বাংলোয় হাজির-স্যার, ভেরি গুড মর্নিং! আই নরোত্তম মল্লিক।

–আই সি! ডেকস্টার করমর্দনের জন্য ডান হাত বাড়িয়ে দিয়েই একটু হেসে বললেন, আমি বিলাটে বসে টুমার কথা শুনেছে।

–স্যার, সে আপনার কৃপা আর আমার চোদ্দপুরুষের সৌভাগ্য।

–টুমি ইম্পিরিয়্যাল টেক্সটাইলের গ্রেট ডিস্ট্রিবিউটার। টুমার কথা বিলাটের অফিসের সবাই জানে।

–স্যার, আপনারা রাজার জাত। আপনারা দেবতা। তাই আমার মতো কীট পতঙ্গকেও স্নেহ করেন।

মিঃ ডেকস্টার সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলেন, টেল মি মিঃ মালিক, কীভাবে আমাদের কোম্পানির কাপড় আরো বিক্রি হতে পারে? অ্যান্ড অলসো টেল মি আমি কীভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?

-স্যার, এককথায় জবাব দেব?

–ইয়েস, ইয়েস।

-স্যার, আমাকে বেঙ্গলের সোল ডিস্ট্রিবিউটার করে দিলেই…

–টুমি পারিবে?

-স্যার, আপনার আশীর্বাদ থাকলে নিশ্চয়ই পিরবো।

লাখখানেক টাকা সিকিউরিটি জমা রাখতে পারবে?

-স্যার, দরকার হলে দুই বউয়ের গহনা বিক্রি করেও ঐ টাকা জমা দেব।

 –অল রাইট! ইউ উইল গেট ইট।

.

০৪.

ইংরেজদের দোষ অনেক। ওদের মতো স্বার্থপর, লোভী, রক্ষণশীল ও আত্মকেন্দ্রিক জাতি পৃথিবীতে আর নেই; কিন্তু ওদের একটি গুণ। ওরা কথার খেলাপ করে না। ডেকস্টার সাহেবও তার কথার খেলাপ করেননি। নরোত্তম মল্লিকও তার প্রতিশ্রুতি রেখেছিল। ওর নিষ্ঠা আর উদ্যমে ইম্পিরিয়্যাল টেক্সটাইল কোম্পানির কাপড় ছড়িয়ে পড়ল কটক থেকে তিনসুকিয়া-ডিব্ৰুগড়, পাটনা-মুঙ্গের-ভাগলপুর থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী রংপুর-বগুড়া থেকে বারাসত-বসিরহাটে বাজারে।

নরোত্তম মল্লিকের বুড়ো ম্যানেজারবাবু জগদীশ ভটচাজ ঠিকই বলেছিলেন, শুধু মানুষের জীবনেই না, ব্যবসা-বাণিজ্যেরও গ্রীষ্ম-বর্ষা শীতবসন্ত আছে। সুরেন বাঁড়ুজ্যের দলবল তো সারাজীবন ধরেই গণ্ডগোল করবে না। দুদিন আগে বা পরে এসব বন্ধ হতে বাধ্য।

জগদীশ ভটচাজ বড়বউয়ের বাপের বাড়ির পুরোহিত এবং ও বাড়ির সবারই খুব শ্রদ্ধার পাত্র। ভদ্রলোকের দুটি ছেলের অকালমৃত্যু হবার পর উনিও আহার-নিদ্রা ত্যাগ করেন। অনেকের অনেক অনুরোধ-উপরোধেও কেনো ফল না হওয়ায় জগদীশবাবুর স্ত্রী ছুটে আসেন নতুন জামাই নরোত্তম মল্লিকের বাড়ি। উনি হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মল্লিক মশায়ের স্ত্রীর দুটি হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, বড় খুকি, তুমিই তো আমাদের বড় মেয়ে মা! তোমার অন্নপ্রাশন, তোমার নামকরণ, হাতে খড়ি থেকে বিয়ে তো উনিই দিয়েছেন। তুমি ওঁকে বাঁচাও মা! তা নইলে চারটি মেয়েকে নিয়ে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে।

জগদীশ ভটচাজ পুরোহিত হলেও সত্যি বড় খুকিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তাইতো বড় খুকীর কান্নাকাটি দেখে উনি শেষ পর্যন্ত মল্লিকবাড়িতে না এসে পারলেন না। পিতৃহীন নরোত্তমও ওঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা-ভক্তি করতে এবং আস্তে আস্তে টুকটাক দায়-দায়িত্ব দিতে শুরু করে। কিছুদিনের মত্যেই নরোত্তম বুঝতে পারে, জগদীশ ভটচাজের শাস্ত্রজ্ঞানের চাইতে ব্যবসায়িক বুদ্ধি অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, মানুষটি যোল আনা সৎ। একেবারে খাঁটি সোনা।

জগদীশ ভটচাজের বিচারবুদ্ধির উপর নরোত্তম মল্লিকের অগাধ আস্থা থাকলেও সুরেন বাঁড়ুজ্যে-আনন্দমোহন বসু রবি ঠাকুর যখন কার্জন সাহেবকে হেনস্তা করার জন্য মেতে উঠেছিলেন, তখন অন্যান্য অনেকের মতো নরোত্তম মল্লিকও ভেবেছিল, হয়তো এ দেশে আর বিলিতি কাপড় বিক্রি হবে না। তবে নরোত্তম মল্লিক মনের কথা মনেই রাখতো। এ আশঙ্কার কথা কাউকে বলতো না। বরং সব সময় মুখে বলতো, অন্য জিনিসপত্তর বিক্রি হবে কি না বলতে পারি না কিন্তু বিলিতি কাপড় বিক্রি হতে বাধ্য। দেশী তাঁতিরা কটা কাপড় বানাবে। মানুষের পেটে ভাত থাক আর নাই থাক, পরনৈ একটুকরো কাপড় চাই-ই।

মুখে এসব কথা বললেও আন্দোলন যখন জমে উঠেছিল, তখন মল্লিমশায়ের মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। তখন জগদীশ ভটচাজ ওঁকে বার বার বলেন, কিছু চিন্তা করো না বাবাজীবন। চাকা ঘুরতে বাধ্য। কিন্তু চাকা যে এমন বনবন করে ঘুরতে শুরু করবে, তা এই বুড়ো ম্যানেজারবাবু স্বপ্নেও ভাবেননি।

আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী ও পরিচিতরা জানলেন, নরোত্তম মল্লিকের ব্যবসা বেশ ভালই চলছে, আয়ও বেড়েছে, কিন্তু ঠিক কতটা ভাল চলছে, তা শুধু জানতেন ঐ বুড়ো ম্যানেজারবাবু আর তার মালিক। একদিন সুযোগ বুঝে জগদীশ ভটচাজ মকিমশাইকে বললেন, যদি কিছু মনে না করো তাহলে একটা কথা বলতাম।

–আপনি আমার পিতৃতুল্য শ্রদ্ধেয় এবং পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। আমাকে সব সময় সব কিছু বলার অধিকার তো শুধু আপনারই আছে।

বুড়ো ম্যানেজারবাবু একটু আত্মতৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, হ্যাঁ বাবা, সেই অধিকারেই তোমাকে কটা কথা বলতে চাই।

নরোত্তমের দিকে তাকিয়ে উনি বলেন, দেখো বাবা, কথায় আছে লক্ষ্মী চঞ্চলা। তাছাড়া তুমি দেখেছ, ব্যবসা-বাণিজ্য কখনও ভাল চলে কখনও খারাপ চলে।….

সম্মতিতে নরোত্তম মাথা নাড়ে।

জগদীশ ভটচাজ বলে যান, মা সিদ্ধেশ্বরীর কৃপায় তোমার এখন সুদিন চলছে কিন্তু এমন আমদানি তো চিরকাল থাকতে পারে না বাবা।

সে তো একশ বার।

–দু জাহাজের মাল ছাড়াবার মতো টাকা তো ব্যাঙ্কেই আছে। এছাড়া পূর্ব বাংলার গদিগুলোর টাকা কয়েক দিনের মধ্যেই জমা পড়বে।

–ওখান থেকে কত টাকা আসবে?

-ঠিক মনে নেই; তবে বোধহয় দুলাখ সত্তর হাজার। বুড়ো ম্যানেজারবাবু একটু থেমে বলেন, এইসব বাদ দিয়ে আমার সিন্দুকে আছে তিন লাখ আশি হাজার, আর তোমার বাড়ির সিন্দুকে আছে ঠিক পঁচাত্তর হাজার। তাই আমার দুটো প্রস্তাব আছে।

বলুন।

–সবার আগে লালদিঘি বা বড়বাজারের আশেপাশে তুমি অবিলম্বে কিন্তু সম্পত্তি কিনে রাখো। কারণ চোখের সামনে দেখতে পারছো, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে জমিজমার দাম বাড়ছে।

নরোত্তম গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনার দ্বিতীয় প্রস্তাবটা কী?

–কোনো একটা ব্যবসা নিয়েই মেতে থাকা ঠিক নয়। শুনেছ তো বোম্বাই রাজ্যের আমেদাবাদ শহরে কাপড়ের কল চালু হচ্ছে বলে বাজারে জোর গুজব। যদি এইসব মিল সত্যি চালু হয়, তাহলে ওদের কাপড়ও তোতা এখানকার বাজারে আসবে।

–আসবে ঠিকই কিন্তু বিলিতি মিলের কাপড়ের সঙ্গে কি পাল্লা দিতে পারবে?

বুড়ো ম্যানেজারবাবু মুখ তুলে একবার চশমাটা ঠিক করে বলেন, বাবাজীবন, খদ্দেররা কখন কী পছন্দ করবে তা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরও আগে থেকে বলতে পারবেন না।

নরোত্তম একটু চিন্তিত হলেও ঈষৎ হাসেন। মাথা নেড়ে বলেন, তা ঠিক।

শুধু তাই না। সব খদ্দেরদেরই তো এক পছন্দ না।

নরোত্তম সব শোনার পর বলে, ভটচাজমশাই, আমাকে দুটো দিন ভাবতে দিন।

–দুদিন কেন, তুমি দশ দিন চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নাও, কিন্তু বেশি দেরি করো না।

হ্যাঁ, ঠিক দুদিন পরই নরোত্তম মল্লিক বুড়ো ম্যানেজারবাবুকে তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল, হ্যাঁ ভটচাজমশাই, আপনার দুটো প্রস্তাবই আমি মেনে নিলাম। সম্পত্তির ব্যাপারে আপনি খোঁজখবর করুন; আমি দেখছি, নতুন ব্যবসা কী করা যায়।

চীনাবাজার ক্যানিং স্ট্রিটের মোড়ের কাছাকাছি যে পাঁচতলা বাড়িটা আজও দক্ষিণের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে, ঐটাই নরোত্তম মল্লিকের বাড়ি। তবে এই সম্পত্তির পিছনে একটা কাহিনী লুকিয়ে আছে।

.

তখনও চীনাবাজার ক্যানিং স্ট্রিট তৈরি না হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এই অঞ্চলটি তখন কিছু আর্মেনিয়ান সাহেব বেছে নেন। বহু আর্মেনিয়ান তখন এই অঞ্চলে বসবাসও করেন। এইসব আর্মেনিয়ান সাহেবরা ব্যবসা-বাণিজ্য করলেও বাংলাদেশের মানুষদের তারা হেয় জ্ঞান করতেন না। শুধু তাই নয়। বাংলাদেশের উপর প্রভুত্ব করার বাসনাও এঁদের মনে কোনোদিন আসেনি। নানা কারণে আর্মেনিয়ানরা দুচোখে ইংরেজদের দেখতে পারতেন না। তাই তো সিরাজদ্দৌলা যখন কলকাতা আক্রমণ করে ইংরেজদের হটিয়ে দেন, তখন কলকাতাবাসী আর্মেনিয়ানরা তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেন। দুঃখের বিষয়, পরের বছরই পলাশীর মাঠে সিরাজের পরাজয় হয়। তারপর থেকে বাঙালিদের সঙ্গে সঙ্গে আর্মেনিয়ানদেরও দুর্দিনের শুরু।

ছলে বলে-কলে-কৌশলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর্মেনিয়ানদের ব্যবসা বাণিজ্য কেড়ে নিতে শুরু করে। কিছু কিছু ইংরেজ আবার আক্রোশবশত প্রায় জোর করে ওদের সম্পত্তি দখল করে। আজকের চীনাবাজার ক্যানিং স্ট্রিটের মোড়ের আড়াই বিঘা জমিও এইভাবে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির এক সাহেবের দখলে এসে যায়। তারপর নানা কারণে হাত বদল হতে হতে এই সম্পত্তি চলে আসে কাশিমবাজারের এক দেওয়ানের হাতে এবং এই জমিরই এক অংশে একটা দোতলা বাড়ি তৈরি করেন, কিন্তু বাকি জামিটা বিক্রি করে দেন এক দেন এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সাহেবকে।

.

যাই হোক, জগদীশ ভটচাজ যখন এই জমিটি পছন্দ করে খোঁজখবর শুরু করেন, তখন উনি জানতে পারেন, সাবিত্রীবালা দাসী নামে এক মহিলা এই জমিটির অর্ধেক অংশ কেনার জন্য জনৈকা মিসেস শিলটনকে পাঁচহাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছেন। জগদীশ ভটচাজু যখন ঐ সত্তর বছরের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বুড়ির কাছে হাজির হলেন, তখন উনি বললেন, পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছি ঠিকই এবং রসিদও দিয়েছি কিন্তু কী জন্য ঐ টাকা নিয়েছি তা কিছু লিখিনি।

–কেন মেমসাহেব?

মিসেস শিলটন একটু হেসে বললেন, মিঃ ভট্টাচার্জি, মাই গ্রান্ডফাদার প্রিন্সও ছিলেন, জমিনডারও ছিলেন না, বাট হি ওয়াজ রিয়েলি এ রিচ ম্যান। ধরমতল্লা-লালবাজার অঞ্চলে এগারটা বাড়ির মালিক আমরা। এছাড়া কত জমি আছে আমাদের।…

–এ তো অত্যন্ত খুশির কথা মেমসাহেব।

মেমসাহেব ওঁর কথায় কর্ণপাত না করেই বললেন, ডে আফটার টুমরো মানডে। ঐদিনের মধ্যে যদি মিসেস ডাসি পুরো টাকা পেমেন্ট না করে, তাহলে ঐ জমি অন্য কাউকে বিক্রি করে দেব।

–কিন্তু…

-নো ইফস্ অ্যান্ড বাট মিঃ ভট্টাচার্জি। বুড়ি মাথা নেড়ে বললেন, ওরা যদি অন্য কোথাও জমি কিনতে চায়, ভেরি গুড! নয়তো সঙ্গে সঙ্গে টাকা ফেরত দেব।

-ম্যাডাম, আমি সোমবার সকালে আসব?

-ইয়েস ইউ ক্যান কাম কিন্তু আটটার আগে না। তাছাড়া যে দাম বলেছি, তার এক পয়সা কম দামে আমি বিক্রি করব না অ্যান্ড ইউ উইল হ্যাভ টু পে ইন ক্যাশ।

জগদীশ ভটচাজ সবিনয়ে বললেন, হ্যাঁ, মেমসাহেব, পুরো টাকাই একসঙ্গে দেব কিন্তু দামের ব্যাপারে যদি একটু দয়া করেন..

মিসেস শিলটন মাথা নেড়ে বললেন, নো দয়া-টয়া। বিজনেস ইজ বিজনেস। তারপর একটু হেসে বললেন, তোমার হোল ফ্যামিলিকে আমি তিন দিন ডিনার খাওয়াবো বাট জমির দাম এক পয়সা কম নিতে পারব না।

.

সোমবার সকালে ঘড়িতে আটটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে জগদীশ ভটচাজ নরোত্তমকে নিয়ে মেমসাহেবের বাড়ি হাজির। মেমসাহেব ওদের দেখেই প্রশ্ন করলেন, পুরো টাকা সঙ্গে এনেছ?

জগদীশ ভটচাজ বললেন, হ্যাঁ, মেমসাহেব।

-ভেরি গুড!

মেমসাহেবের দুই ছেলে টাকা গুনে নিতেই মেমসাহেব কাগজে সই করে দিলেন। শুধু তাই না। মেমসাহেব বললেন, ধরমতল্লায় আমরা বড় বড় দুটো বাড়ি বানাচ্ছি। তাই আমরা লালবাজারের সামনের একটা বাড়ি বিক্রি করব।….

নরোত্তম প্রশ্ন করে, কতটা জমি আছে মেমসাহেব?

অর্ধেক জমি কদিন আগেই খান বাহাদুর আবদুল রসিদ চৌধুরীকে বিক্রি করে দিলাম। এখন জমি আছে লিটল ওভার হাফ বিঘা।

নরোত্তম বলে, ইয়েস মেমসাহেব, আপনি দয়া করে ওটাও আমাদের দিন।

–অল রাইট। সামনের সানডে সকালে এইরকম সময় এসো। আমার এক ছেলে ঐ জমি আর বাড়ি তোমাদের দেখিয়ে দেবে।

–ভেরি গুড মেমসাহেব। তবে দয়া করে এই লালবাজারের সম্পত্তির ব্যাপারে এখন আর কারুর সঙ্গে কথা বলবেন না।

–নো, নো; আমি এককথার মানুষ।

.

যাই হোক, মিসেস শিলটনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা দিতেই মেয়েটিকে ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামতে দেখেই নরোত্তম থমকে দাঁড়ায়। খুব চেনা চেনা মনে হয় কিন্তু ঠিক মনে পড়ে না কোথায় দেখা হয়েছে। মেয়েটি পান চিবুতে চিবুতেই এক গাল হাসি হেসে বলে, কিগো মল্লিকবাবু, অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছো কেন? যেন চিনতেই পারছে না।

–চিনতে পেরেছি কিন্তু ঠিক…

ওর কথা শুনে মেয়েটি হেসেই আটখান। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে, হা আমার কপাল! আগে ছোট শালী বলে কত ঠাট্টা-ইয়ার্কি করেছ আর এখন…।

মেয়েটির হাব-ভাব, চাল-চলন দেখেই নিজের সম্মান বাঁচাবার জন্য জগদীশ ভট্টাচার্য বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছেন। যাই হোক, মেয়েটিকে পুরো কথা শেষ করতে হয় না। এবার নরোত্তম একগাল হাসি হেসে বলে, ও! তুই সাবিত্রী! তা এতো মোটা হয়েছিস যে…

–সরকারবাবুর যত্নে সত্যি একটু মোটা হয়েছি।

-কোন সরকারবাবু?

সাবিত্রীবালা ভুরু নাচিয়ে বলে, তোমার মতোই পাকা রুই। ভবানীপুরে থাকে। তুমি ওকে চেনো না?

নরোত্তম মাথা নেড়ে বলে, না। মল্লিকমশাই সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করে, তা তুমি এখানে? এই সাত সকালে?

সাবিত্রীবালা চোখ দুটো বড় বড় করে বলে, জমি কিনতে গো! জমি কিনতে। তারপরই একটু চাপা গলায় বলে, পরিবারের লোকজনকে জানাবে না বলে সরকারবাবু জমিটা আমার নামে কিনছে।

-ও!

— তুমি একদিন এসে ছোট শালীর ওখানে।

-আসব কিন্তু তুমি এখন থাকো কোথায়?

-ঐ বৌবাজারের বাড়ির যে-কোনো ঝিকে বললেই দেখিয়ে দেবে। একদিন এসো কিন্তু!

-হ্যাঁ আসব।

 সাবিত্রীবালা মিসেস শিলটনের বাড়িতে ঢুকতে গিয়েও পিছিয়ে এসে একটু হেসে নরোত্তমকে বলে, একেবারে খালি হাতে ছোট শালীর কাছে আসতে নেই, তা জানো তো?

নরোত্তম হাসে। মুখে কিছু বলে না।

–তুমি খালি হাতে না এলে আমিও খালি হাতে ফিরিয়ে দেব না। সাবিত্রীবালা মুখ টিপে হেসে বলে, তবে একটু বেলা থাকতে থাকতে এসো।

–আচ্ছা! একটু চাপা হাসি হেসেই নরোত্তম জবাব দেয়।

মাসখানেক পর নরোত্তম মল্লিক সত্যি একদিন সাবিত্রীবালার আস্তানায় হাজির। সাবিত্রীবালা কিছু বলার আগেই মল্লিকমশাই ওর গলায় সাড়ে সাত ভরির একটা হার পরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কিগো ছোট শালী, পছন্দ হয়েছে?

–কি যে বলল মল্পিকমশাই! তোমার জিনিস আমার পছন্দ হবে না? সাবিত্রীবালা ওর কোলের উপর ঢলে পড়ে বলে, তোমাকে যে কত পছন্দ করি, তা তো তুমি জানো না?

সত্যি নাকি?

–মা কালীর দিব্যি দিয়ে বলছি, ঐ সরকারবাড়ির বড়কর্তার চাইতে তোমাকে আমার হাজার গুণ ভাল লাগে।

-কেন? বড়কর্তা কী দোষ করল?

-সে কথা শুনে কী করবে? সাবিত্রীবালা একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আমার পোড়া কপাল বলে তুমি কোনোদিন নজর দিলে না। কী পাও ঐ মুটকি সুহাসিনীর কাছে?

ওর কথা শুনে নরোত্তম মল্লিক একটু না হেসে পারে না। বলে, আমার জন্য যে এত পিরিত তোর মনের মধ্যে জমা আছে, তা জানব কেমন করে?

–একটু নজর দিলেই জানতে পারতে। সাবিত্রীবালা একটু থেমে বলে, বাড়িতে যদি একটা বুড়ি আর একটা হুঁড়ি বউ রাখতে পারো,তাহলে দুটো মাগী রাখতে অসুবিধে কোথায়?

-তোকে পুষলে আমার কী লাভ?

 মল্লিকমশায়ের দুহাতের বন্ধন থেকে হঠাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সাবিত্রীবালা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, দুচোখ দিয়ে একবার আমাকে ভাল করে দেখো। এমন রূপ-যৌবন কটা মাগীর দেখেছ?

মল্লিকমশাইকে কিছু বলতে না দিয়েই সাবিত্রীবালা সঙ্গে সঙ্গে বলে, তোমার আগে সুহাসিনী কোনো ভাল ব্যবসাদার ধরতে পেরেছে? ও তো চিরকাল শ্যালা বাজারের কিছু দোকানদারকে নিয়েই থেকেছে।

নরোত্তম চুপ করে ওর কথা শোনে।

–আর আমি? সাবিত্রীবালা বুড়ো আঙুল দিয়ে নিজেকে দেখিয়ে বলে, আমি কোনোদিন চুনোপুটি ছ্যাচড়া দোকানদারদের কাছে আমার দেহ দিইনি। আমি রুই কাতলা ছাড়া শিকার করি না।

নরোত্তম একটু মুচকি হেসে বলে, ওরে মাগী, তাতে আমার কী লাভ?

সাবিত্রীবালা অত্যন্ত রুক্ষদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, সব শালা ব্যবসাদারদের টিকি কেটে নেবার পর তবে আমি নিজেকে দিয়েছি।

–আমারও টিকি কেটে রাখবি?

সাবিত্রীবালা এক গাল হাসি হেসে দুহাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি মানুষকে ভালবাসতে জানো, তাদের সুখ-দুঃখ বুঝতে পারো। তাই তোমাব টিকি কেটে রাখার দরকার হবে না। আমরা বাজারের মেয়ে বলে কি মন বলে কিছু নেই?

মল্লিকমশাই ওর ভাবান্তর দেখে অবাক।

সাবিত্রীবালা খুব জোরে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এই ছোটলোকগুলো কী করে লাখপতি হচ্ছে, তা আমার জানতে বাকি নেই, কিন্তু আমি যে কারুর উপকার করব, তার সুযোগই বা পেলাম কোথায়? এ দুনিয়ায় কেউই তো আমাদের বিশ্বাস করে না।

–আমি তোকে বিশ্বাস করি।

 -সত্যি?

-তোকে ছুঁয়ে বলছি।

এক মুহূর্তের জন্য সাবিত্রী মনে মনে কী যেন হিসেব-নিকেশ করেই বলে, পরশু দিন একটুবেশি রাত্তিরে আসতে পারবে?

-বেশি রাত্তির মানে?

–সামনের গির্জের ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজলেই সরকারবাড়ির বড়কর্তা চলে যান। তুমি তার একটু পরে আসবে।

কী দিবি আমাকে?

সাবিত্রী হেসে বলে, একটা রাত আমার কাছে কাটিয়েই দেখো না কী পাও। যদি লোকসান হয় তাহলে আর কোনদিন এসো না।

–ঠিক আছে, আসব।

–কিন্তু দেখো, কেউ না জানে।

না, না, কেউ জানবে না।

.

হ্যাঁ, সেদিন রাত্রে মল্লিকমশাই গিয়েছিল, না গিয়ে পারেনি। কেউটে সাপকে মানুষ ভয় পায়, কিন্তু তবু কেউটে সাপের খেলা না দেখে কোনো মানুষই থাকতে পারে না। শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে। এমনকি বার্ধক্যেও। সাবিত্রী বারবণিতা। দুর্বল কামার্ত মানুষকে বশ করে, খুশি করেই তার জীবিকা নির্বাহ হয় এবং তা লুকিয়ে চুরিয়ে হাফ গেরস্ত বাড়ির বউ-ঝিয়ের মতো না। প্রকাশ্যেই সে আদিমতম পেশা চালায় কিন্তু তবু কী যেন একটা মোহ, একটা রহস্য ঘিরে আছে এই মেয়েটাকে। সে সবকিছু বিলিয়ে দিয়েও কী যেন নিজের কাছে লুকিয়ে রাখে। বোধহয় সেই রহস্য আবিষ্কারের লোভেই সেদিন রাতের অন্ধকারে মল্লিকমশাই সাবিত্রীর কাছে হাজির হয়।

সাবিত্রী এক গাল খুশির হাসি হেসে বলল, তাহলে মল্লিকমশাই, সত্যি সত্যি আমার সঙ্গে রাত কাটাতে এলে?

মল্লিকমশাইও হেসে জবাব দেয়, কী করব বল? তুই বললে যে আমি গঙ্গায় ডুবে মরতে পারি, তা তো জানিস না।

সাবিত্রী মুখ নাড়িয়ে, ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে, আহা হা! আমার কি ভাগ্যি গো! এমন মিনসে যে এ জগতে আছে, তা যদি আগে জানতাম!

আগে না জানলেও এখন তো জানলি।

যাই হোক, সাবিত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে ওকে আদর-আপ্যায়ন করল। নিজেকে উজাড় করে দিতেও ত্রুটি রাখল না। কত হাসি-ঠাট্টা গল্প-গুজব হলো। তারপর হঠাৎ সব হাসি-ঠাট্টা বন্ধ করে সাবিত্রী জিজ্ঞেস করল, মল্লিকমশাই, নতুন ব্যবসা করবে?

–কীসের ব্যবসা?

–বিলেতি যন্ত্রপাতির ব্যবসা।

কীসের যন্ত্রপাতি?

–অতশত কি আমি বুঝি? সাবিত্রী একটু থেমে বলে, যদি তোমার গুদাম থাকে। আর গর্ডন সাহেবের অফিসে শনিবারের মধ্যে নগদ লাখ টাকা জমা দিতে পারো, তাহলে বোধহয় বছর বছর লাখ টাকা কামাতে পারবে।

–তোকে কে বলল।

–অত-শত খবরে তোমার কী দরকার? দেরি না করে কালই গর্ডন সাহেবের অফিসে চলে যাও।

নরাত্তম একটু চিন্তিত হয়ে বলে, কালই?

–হ্যাঁ, হ্যাঁ, কালই। দেরি হলে হয়তো ফসকে যাবে কিন্তু দোহাই তোমার, দুনিয়ার কেউ যেন টের না পায়।

ব্যাপারটা একটু খুলেই বল না!

–আগে গর্ডন সাহেবের সঙ্গে দেখা করো। তারপর সব বলব। নরোত্তম একটু ভেবে বলে, কিন্তু গর্ডন সাহেবকে খুঁজে বার করতেও তো দুএকদিন সময় লাগতে পারে।

সাবিত্রী একটু হেসে বলে, ওরে বাপু, গর্ডন সাহেব খুব নামকরা লোক। শুনেছি কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করেন। যে কোনো সাহেবী অফিসে খোঁজ করলেই বোধহয় ওঁর খবর পেয়ে যাবে।

–আচ্ছা দেখি।

 ভোরবেলায় নরোত্তম চলে যাবার আগে সাবিত্রী বলল, কী হয় আমাকে জানিও।

-হ্যাঁ, জানাবো।

.

গর্ডন সাহেব প্রথমেই প্রশ্ন করলেন, আমরা যে এজেন্ট রাখব, এ খবর তুমি জানলে কী করে?

-স্যার, আমার এক ফ্রেন্ড!

সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, দেখছি, তোমার ফ্রেন্ড তো ব্যবসা-বাণিজ্য দুনিয়ার অনেক গোপন খবর রাখে।

-হ্যাঁ, স্যার। নরোত্তমও হেসে জবাব দেয়। কিন্তু মনে মনে ভয় পায়, যদি এই বন্ধুর ব্যাপারে সাহেব আরো কিছু জানতে চান, তাহলে কী উত্তর দেবে।

যাই হোক, গর্ডন সাহেব পাইপ ধরিয়ে একটা টান দিয়েই বললেন, মিঃ মালিক, তোমাকে আমি এবার যেসব প্রশ্ন করব, তার জবাবে মিথ্যে কথা বলবে না।

–স্যার, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে আমি কখনই মিথ্যে কথা বলি না। কারণ মিথ্যে কথা বলে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশি দিন চালানো যায় না।

-ভেরি গুড।

. এবার প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে সাহেব ওকে জেরা করলেন। হাজার রকমের প্রশ্ন। সব শেষে সাহেব বড়বাবুকে ডেকে বললেন, বড়াবাবু, মিঃ মালিককেই আমরা এজেন্ট নিয়োগ করব। কাল সকাল ঠিক দশটায় উনি কাগজপত্র টাকাকড়ি নিয়ে আসবেন।

বড়বাবু বললেন, অল রাইট স্যার। আমি সবকিছু করে দেব।

–আর হ্যাঁ, এগ্রিমেন্ট সই হবার পরই আপনি ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে, বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে আর ই-বি-আর-এর চিফ এঞ্জিনিয়ারকে জানিয়ে দেবেন, ওঁরা যেন এবার থেকে মিঃ মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

–অল রাইট স্যার!

পরের দিন চুক্তি সই হবার পর গর্ডন সাহেব হাসতে হাসতে নরোত্তমকে বললেন, মিঃ মালিক, যদি ঠিক মতো ব্যবসা করতে পারো তাহলে পাঁচ বছরের মধ্যে কোটিপতিও হবে, রায়বাহাদুর উপাধিও পাবে।

নরোত্তম ছত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাত কচলে হাসতে হাসতে জবাব দেয়, স্যার, আপনার কৃপা ছাড়া আমার আর কিছু কাম্য নেই।

.

তখন এমন একটা সময় যখন ভাল ছুঁচ পর্যন্ত বিলেত থেকে আসতো; রেলের যন্ত্রপাতি তো দূরের কথা। তাই চুক্তি সই করার আগেই নরোত্তম মল্লিক জানতো, বছরে কয়েক লাখ টাকার মাল বিক্রি হবেই। কমিশন শতকরা দশ ভাগ থেকে খরচপত্তর বাদ দিয়েও বেশ মোটা টাকা লাভ থাকতে বাধ্য। কিন্তু নরোত্তম ভাবতে পারেনি, রেল কোম্পানিগুলো এত টাকার যন্ত্রপাতি কেনে।

বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে থেকেই প্রথম চেক আসে। এক লাখ সত্তর হাজার তিনশ আঠাশ টাকা বারো আনা। সেইদিন রাত্তিরেই একটা লাল টুকটুকে বেনারসী আর হীরের নাকছাবি নিয়ে নরোত্তম সাবিত্রীবালার ওখানে হাজির।

সাবিত্রী এক গাল হাসি হেসে বলল, কিগো মল্লিকমশাই, আমাকে বিয়ে করবে নাকি?

–তোর সঙ্গে তো আমার বিয়ে অনেক আগেই হয়ে গেছে।

 -তাই নাকি?

তবে কী?

–তবে কি আজ নতুন করে ফুলশয্যা হবে?

-এবার থেকে যেদিনই আসব, সেদিনই আমাদের ফুলশয্যা হবে।

–এত পিরিত সহ্য হবে তো?

 হঠাৎ নরোত্তম গম্ভীর হয়ে বলে, দ্যাখ সাবিত্রী, আমি বেইমান না। তোর জন্যই আমি এই ব্যবসা করতে পারছি। সুতরাং এই ব্যবসা যত দিন চলবে, তোর কোনো চিন্তা নেই।

তুমি যে বেইমানি করতে জানো না, তা আমি ভাল করেই জানি; আর সেই জন্যই তোমাকে গর্ডন সাহেবের খবরটা বলেছিলাম।

সাবিত্রী একটু চুপ করে থাকার পর বলে, দেখো মল্লিকমশাই, তোমরা অনেক কিছু জানো কিন্তু পুরুষমানুষের আসল স্বভাব-চরিত্র শুধু আমরাই জানতে পারি।

-সে তো একশ বার।

কম বড়লোক তো দেখলাম না। সেই তেরো বছর বয়স থেকে একটা না একটা বড়লোক নিয়েই এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম।

সাবিত্রী একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমি জানি, সরকারবাড়ির বড়কর্তা এই ব্যবসা করার সুযোগ পেলেও বেশিদিনও চালাতে পারতেন না।

-কী করে জানলি?

সাবিত্রী একটু মুচকি হেসে বলল, আমরা বাজারের মেয়ে। আমাদের না হয় ধর্ম অধর্ম জ্ঞান নেই। পয়সা পেলেই আমরা নিজেদের বিলিয়ে দিই, কিন্তু যে হারামজাদা নিজের বাড়ির সব বউ আর ঝিদের পর্যন্ত সর্বনাশ করেছে সে আবার ব্যবসা করবে?

–তুই কী করে জানলি?

সাবিত্রী এবার একটু জোরেই হাসে। বলে, পুরুষদের মতো বোকা জাত আছে নাকি? দুগেলাস মদ গিলিয়ে দেবার পর আমরা একটু বুকের কাছে টেনে নিলেই সব পুরুষের গলা দিয়ে সব কথাই বেরিয়ে আসে কিন্তু সকালবেলায় ঘুম ভাঙলে কোনো পুরুষই রাতের কথা মনে রাখতে পারে না।

–আর তোরা সব মনে রাখিস?

–একশবার রাখি। তোমাদের দুর্বলতা না জানলে এই ব্যবসায় টিকে থাকা যায়?

এবার নরোত্তম ওকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে, সত্যি মাগী তোর বুদ্ধি আছে।

.

চীনাবাজার-ক্যানিং স্ট্রিটের মোড়ে নরোত্তম মল্লিকের বাড়ি তৈরির কাজ শুরু হবার কিছু দিন পরই একদিন ভবানীপুরের সরকার বাড়ি বড়কর্তা ওর গদিতে এসে হাজির। হাতের ছড়িটা পাশে রেখে উনি দুহাত জোড় করে বললেন, নমস্কার মল্লিকমশাই।

নমস্কার! মল্লিকমশাই অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়েই বলে, আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না তো।

–আমার নাম নরনারায়ণ সরকার; থাকি ভবানীপুর, আর সামান্য ব্যবসা করি চীনেবাজারে।

কীসের ব্যবসা?

তেমন বলার মতো কিছু না, সামান্য কাগজের ব্যবসা করি। সরকার বাড়ির বড়কর্তা একটু হেসে বলেন, আপনি এক লরি বোঝাই যন্ত্রপাতি রেল কোম্পানিতে সাপ্লাই দিলে নিদেন পক্ষে বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা লাভ করতে পারেন আর আমি এক লরি কাগজ বোঝাই করলে, তার দাম পনের-বিশ হাজারও হয় না।

এবার মল্লিকমশাই হেসে বলে, আপনি রোজ দশ-বিশ লরি মাল সাপ্লাই দেন আর আমি হয়তো মাসে দুএক লরি মেসিনপত্তর রেল কোম্পানিতে বিক্রি করি। হরে-দরে একই ব্যাপার।

বড়কর্তা এক গাল হাসি হেসে বলে, না, না, তাই কি হয়?

গদির পুরনো দারোয়ান গড়গড়াটা বড়কর্তার হাতের কাছে দিতেই উনি বললেন, আমার এইসব নেশাটেশা নেই হে।

নরোত্তম মল্লিক সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ওরে রামলাল, ভবানীপুরের বড়লোকেরা কি এইসব সস্তার নেশা করেন? ওটা নিয়ে যা।

বড়কর্তা আবার হেসেই বলেন, সত্যি আমার কোনো নেশাটেশা নেই।

রামলাল গড়গড়াটা নিয়ে যেতেই মল্লিমশাই একটু ঝুঁকে ফিস ফিস করে বলে, নেশাটেশা তো নেই বললেন, কিন্তু মনটাকে এত সতেজ রেখেছেন কী করে?

বড়কর্তা হো হো করে ওঠেন। বলেন, মনে হচ্ছে, আপনিও বেশ রসিক ব্যক্তি।

–সবই আপনাদের আশীর্বাদ!

 বড়কর্তা এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটু চাপা গলায় বলেন, আজ সন্ধের পর আমার সঙ্গে চলুন। দুজনে মিলে একটু আমোদ-আহাদও হবে, আবার কথাবার্তাও বলা যাবে।

মলিকমশাই চাপা হাসি হেসে জবাব দেয়, আপনি হুকুম করলে কি আমি না শুনে থাকতে পারি?

দুজনেরই সে কি হাসি!

.

সমবয়সী না হয়েও সেদিন থেকে ওঁরা বন্ধু হয়ে গেলেন। নিত্যনৈমিত্তিক না হলেও প্রায়ই ওঁদের দেখাশুনা হয়। ব্যবসা বাণিজ্য ঘর-সংসার থেকে শুরু করে এমনকি সাবিত্রীসুহাসিনীকে নিয়েও ওঁদের কথাবার্তা হয়।

–আরে এসো, এসো নরোত্তম, তোমার কথাই ভাবছিলাম। হাতের ফাইলটা পাশে রাখতে রাখতে বড়কর্তা ওকে অভ্যর্থনা জানান।

তুমি খুব ব্যস্ত না তো?

কাজ তো সারাদিনই আছে কিন্তু সব সময় কি কাজ করতে ভাল লাগে? নরনারায়ণ সরকার এক মুহূর্তের জন্য একটু থেমেই বলেন, তুমি আজ না এলে কাল সকলেই আমি তোমার কাছে যেতাম।

-কেন? কোনো কাজ আছে?

বড়কর্তা এবার কোনো ভূমিকা না করেই বলেন, নরোত্তম, তোমার জন্য একটা জমি দেখেছি।

কোথায়?

–আমাদের ভবানীপুরেই।

–ওখানে জমি নিয়ে আমি কী করব?

–কী আবার করবে? একটা বাড়ি বানাবে।

–বাড়ি তো আমার আছেই।

–সেকি আমি জানি না? কিন্তু ভবানীপুরে কীভাবে জমির দাম বাড়ছে, তার খবর রাখে?

নরোত্তম সে কথার কোনো জবাব না দিয়ে বড়কর্তার দিকে তাকায়। বড়কর্তা একটু হেসে বলেন, যে জমি আগে পাঁচশ টাকায় বিক্রি হতো না, সেইসব জমি এখন তিন থেকে পাঁচ হাজারে পাওয়া কঠিন।

–সারা কলকাতাতেই জমির দাম বাড়ছে। নরোত্তম একটু হেসে বলে, কী বলব বড়কর্তা, বাগবাজারের খালের উত্তরেও এখন দোতলা-তিনতলা বাড়ি হয়ে গেছে। আমি তো ওখানে থাকার কথা ভাবলে শিউরে উঠি।

–আরে আমাদের ওদিকে কালীঘাট পর্যন্ত খালি জমি বিশেষ চোখে পড়ে না। তাই বলছিলাম, সস্তায় যখন জমিটা পাওয়া যাচ্ছে, তখন তুমি নিয়েই নাও।

জমিজমা কিনতো আমার আপত্তি নেই কিন্তু জমিজমায় টাকা আটকে রাখলে আমাদের মতো ব্যবসাদারদের অসুবিধেয় পড়তে হতে পারে।

–তেমন অসুবিধে হলে আমাকে বলো। কিন্তু পঞ্চাশ হাজারে দেড় বিঘে জমি হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বড়কর্তা একটু থেমে বলেন, ভদ্রলোক পুরো

জমিটা একসঙ্গে একজনকে বিক্রি করবেন বলেই এত সস্তায় দিচ্ছেন।

নরোত্তম একটু ভেবে বলে, ঠিক আছে, তুমি যখন বলছে, তখন ঐ জমিতে একটা বাড়ি বানিয়েই ফেলব। ছোট বউএর ছেলেপুলে হলে…

বড়কর্তা এক গাল হাসি হেসে বলেন, এই তো বুদ্ধিমানের মতো কথা!

.

কলকাতার চীনাবাজার ক্যানিং স্ট্রিট তখন এইসব দত্ত-সরকার-মল্লিক-দে আর কিছু বোস-ঘোষ-মিত্তিরদের একচেটিয়া। ক্লাইভ স্ট্রিটের অর্ধেক সাহেবদের দখলে থাকলেও বাকি অর্ধক এদেরই দখলে। গঙ্গার ধারে পর পর সাহা আর কুণ্ডুদের গুদাম। বড়বাজারের অসংখ্য দোকানদাররাও এইসব সাহা-কুণ্ডু বা দত্ত-সরকার-মল্লিকদের কোনো না কোনো দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এছাড়া সারা কলকাতা শহরের সব বাজারের বারো আনা দোকানদারও বাঙালি। ধর্মতলা-চৌরঙ্গির চোদ্দ আনা ব্যবসাই তখন বাঙালি আর পশ্চিমী মুসলমানদের দখলে।

দিল্লির দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ আর মোহনবাগানের আই-এফ-এ শিল্ড জেতার পর বাঙালির ঘরে ঘরে উৎসব আর আলোচনা।

-ওরে বাপু, সারা দেশ কি এমনি বাঙালিদের খাতির করে? না করে উপায় নেই। হাইকোর্টের জজ কে? বাঙালি। বিখ্যাত অধ্যাপক কারা? বাঙালিরা। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কারা? বাঙালি। বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা কারা? তিলক-গোখলে-লাজপত রায়কে বাদ দিলে আর সব নেতাই তো বাঙালি। ডাক্তার-এঞ্জিনিয়ার-উকিল-মোক্তার থেকে সব বড় বড় সরকারি অফিসারও তত বাঙালি।

পাশের ভদ্রলোক নাকে নস্যি দিয়েই বলে, এককথায় বলে দাও, ছোট দারোগাবাবু আর শ্যালদা স্টেশনের টিকিটবাবু থেকে শুরু করে ভাইসরয় কাউন্সিলের মেম্বার পর্যন্ত সবই বাঙালি।

–ঠিক বলেছে মশাই।

এবার আই-এফ-এ শিল্ড জিতেও আমরা দেখিয়ে দিলাম, ফুটবল খেলাতে বাঙালি বেস্ট!

–একশ বার আমরা বেস্ট!

পারুল রেস্টুরেন্টে আজ্ঞা যখন পুরোদমে জমে উঠেছে, ঠিক সেই সময় পরিপাটি সেজেগুঁজে ইম্পিরিয়্যাল ব্যাঙ্কের গোপাল মুখুজ্যে ঢুকতেই সবাই হই হই করে উঠলেন। হই হই করে ওঠার অবশ্য কারণ ছিল।

গোপালবাবুর বাড়ি হাওড়ার কালীবাবুর বাজারে পিছনে। ওখানেই ওঁর সংসার। চাকরি করেন ভবানীপুরের ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্কে। তবে এই ব্যাঙ্কের মাইনে দিয়ে ওঁর সংসার চালাতে হয় না। কবিরাজ দাদুর মকরধ্বজ চ্যবনপ্রাশের কৃপায় সংসার ভালভাবেই চলে। এছাড়া দুটো বতির আয় আছে। সুতরাং দাদুর স্নেহধন্য গোপাল ভবানীপুরের ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্কের টাকাটা এই ভবানীপুরের পারুল রেস্টুরেন্টেই দিয়ে যান। বন্ধুবান্ধব ইয়ার-দোস্তরা ওঁকে ভালবাসবেন না কেন?

আজকে হই হই করার আরো কারণ আছে। গোপালের শশুরমশাই শুধু দিল্লিবাসীই না, হোম ডিপার্টমেন্টের আপার ডিভিসন ক্লার্কও। সুতরাং ওঁর রাজভক্তি সম্পর্কে স্বয়ং ভাইসরয় পর্যন্ত ওয়াকিবহাল এবং খুশি। বছরের অর্ধক সময় দিমি, অর্ধেক সময় সিমলায় কাটান। ভাইসরয় গরমকালে সিমলা গেলে হোম ডিপার্টমেন্টের এই চির অনুগত জীবটিকেও তার অনুগমন করতে হয়। একি কম সম্মান ও সৌভাগ্যের কথা? এ হেন প্রাতঃস্মরণীয় শ্বশুরের বাড়িতে মাস খানেক কাটিয়ে গোপালবাবু আজই প্রথম এই আড্ডায় আসরে হাজির।

নরেন ঘোষাল চিৎকার করে বলেন, এই পঞ্চা! গোলদার নামে সবাইকে একটা করে ফাউল কাটলেট দে!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *