৮. আমার পথপ্রদর্শক

আমার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করল সেরেনা, দুর্গ অবরোধে আমাদের কাজ কেমন চলছে সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল। বিভিন্ন কারিগরি ব্যাপারে ওর জ্ঞান দেখে অবাক হয়ে গেলাম আমি। সব দেখতে দেখতে সময় হয়ে গেল দুপুরের খাওয়ার। একটা এলম গাছের নিচে বসে একসাথে খাবার খেয়ে নিলাম সবাই। এখান থেকে উটেরিকের দুর্গ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পুরোটাই দেখা যায়। দুরে দেখা যাচ্ছে নীলনদ আর সেই চারটি দ্বীপ, যারা এখন আমার চিন্তাভাবনার প্রায় পুরোটাই দখল করে রেখেছে। এই দূরত্ব থেকে ওগুলোকে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না। তবে আমাদের আলাপকে সঠিক দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করল ওদের উপস্থিতি। দ্বীপগুলোর প্রতি আমার আগ্রহের কথা এখনো জানে না রামেসিস এবং সেরেনা। ওরা এবং ইনানা- এ দুই পক্ষের কাকে বেছে নেব তাই নিয়ে একটু দোটানায় আছি আমি। দেবীর সাথে আমার বিশেষ সম্পর্কটার ব্যাপারেও ওদের কিছু জানা নেই, তাই এ ব্যাপারে ইনানার কাছ থেকে পাওয়া সাহায্যের কথা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলাম। পুরো ব্যাপারটা চাপালাম জাহাজের সারেং গানোর্ডের ঘাড়ে, যে কিনা প্রথম টালিটা দিয়েছিল আমাকে।

দ্বীপ চারটি নিয়ে আমি যখন প্রথম কথা বলতে শুরু করলাম তখন প্রথমে রামেসিস আর সেরেনার মাঝে তেমন কোনো আগ্রহ দেখা গেল না। তবে বক্তা হিসেবে আমার দক্ষতাকে কাজে লাগালাম আমি, এবং খুব দ্রুতই দ্বীপগুলোর রহস্য নিয়ে দারুণ উৎসাহী হয়ে উঠল ওরা। গল্পের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ছটফট করে উঠল সেরেনা, দারুণ আগ্রহে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে চোখ জোড়া। এমনকি রামেসিসও দারুণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত আমি যখন জানালাম যে আমার অভিযান মাঝপথেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, কারণ পাথরধস নেমে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সামনে এগোনোর পথ; তখন দুজনের কেউই ব্যাপারটা প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইল না।

তারপর কী হলো টাটা? তখন কী করলে তুমি? প্রশ্ন করল সেরেনা।

হ্যাঁ টাটা। বলো, পাথরধসের ওপাশে কী পেলে তুমি? রামেসিসও যোগ দিল প্রশ্ন ছোঁড়ায়। নাকি এই সবই বানিয়ে বলেছ আমাদের? আমাদের সাথে তুমি মজা করছ না তো?

শেষ পর্যন্ত দুজনই যখন বিশ্বাস করল যে আমি যা বলছি তার কিছুই মিথ্যে নয়, দুজনই সেই মুহূর্তেই দ্বীপ এবং সুড়ঙ্গটা নিজের চোখে দেখতে চাইল। অন্ধকারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, এ কথা বলার পরও দুজনকে রাজি করাতে বেশ বেগ পেতে হলো আমাকে। বাকি সময়টা আমরা পার করলাম চতুর্থ দ্বীপের মাঝখান থেকে শুরু করে আবু নাসকোস দুর্গের নিচ পর্যন্ত যে সুড়ঙ্গটা চলে গেছে তার কথা আলোচনা করে।

ভালোভাবে চিন্তা করলে কিন্তু মনে হয় যে কাজটা এমনিতেই করেছিল প্রাচীনরা, কোনো লাভ হয়নি এতে, বলল রামেসিস।

সাথে সাথে তার ওপর চড়াও হলো সেরেনা। কী বলতে চাইছ তুমি, প্রিয় স্বামী? নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটা কাজ এটা!

অসাধারণ? হেসে ফেলল রামেসিস। খরস্রোতা এক নদীর মাঝে অবস্থিত একটা দ্বীপের নিচ থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে মাটির নিচেই আরেকটা জায়গাতে যাওয়ার চিন্তা করা? আমি তো বলব যে এমন কাজ কেবল গাধার পক্ষেই করা সম্ভব।

তুমি ব্যাপারটা ধরতেই পারোনি, ধমকে উঠল সেরেনা। সুড়ঙ্গটা আসলে শুরু হয়েছে নদীর পুব তীরে, যেখানে এর আগে আমাদের শিবির ছিল। সুড়ঙ্গটা নদীর নিচ দিয়ে এই পারে এসেছে এবং চারটি দ্বীপই এই সুড়ঙ্গের সাথে যুক্ত হয়েছে। নদীর এই পারে আবু নাসকোস দুর্গের নিচে এসে পৌঁছেছে ওটা।

কেন? জানতে চাইল রামেসিস। চারটি দ্বীপ তৈরি করার কী দরকার ছিল?

কারণ নীলনদ অনেক চওড়া নদী, এবং চারটির কম দ্বীপ তৈরি করলে তাতে কাজ হতো না। একটামাত্র সুড়ঙ্গ দিয়ে ভেতরে যে বাতাস ঢুকত তা খুব দ্রুতই বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারত। সুড়ঙ্গটায় যেন পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করতে পারে এ জন্যই ওই দ্বীপ চারটি তৈরি করা হয়েছে।

এবার একটু লজ্জিত দেখাল রামেসিসকে। তাহলে বাকি তিনটি দ্বীপে যে সুড়ঙ্গ রয়েছে সেগুলোর কী হলো?

নিশ্চয়ই সেই প্রাচীন জাতির লোকেরা এখান থেকে সরে যাওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে ওগুলো, মিষ্টি গলায় তাকে জানিয়ে দিল সেরেনা।

ওহ! বলে উঠল রামেসিস। এবার বুঝতে পেরেছি। এবং আমার মাথার ভেতরেও ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল এবার। এতক্ষণ ধরে যে ওদের আলোচনায় অংশ নিইনি, কেবল চুপচাপ শুনে গেছি সে জন্য মনে মনে খুশি হয়ে উঠলাম।

এবার শেয়াল দ্বীপে পাড়ি দেওয়ার সময় আমাদের দলের লোকসংখ্যা হলো সব মিলিয়ে ছয়জন। আমরা তিনজন ছাড়াও নাসলাকে সাথে নেওয়ার চিন্তা করেছি আমি। একটু বেয়াদব হলেও দুর্গ এবং দ্বীপগুলোর গঠন সম্পর্কে ওর জ্ঞান অনেক বেশি। সেইসাথে আরো দুজন সাধারণ সৈনিকও যাচ্ছে। আমরা যখন থাকব না তখন নৌকাটা পাহারা দেবে তারা।

সন্ধ্যা নামার দুই ঘণ্টা পর শেয়াল দ্বীপে পৌঁছলাম আমরা, এবং ওপরে উঠে পড়লাম সাথে সাথেই। আগেরবার এসে ফেরার সময় সুড়ঙ্গের মুখটাকে মরা ডালপালা আর অন্যান্য আবর্জনা দিয়ে ঢেকে রেখে গিয়েছিল নাসলা। আমাদের পর আর কেউ আসেনি এখানে, ফলে একই রকম রয়েছে সেগুলো। এবার সব সরিয়ে ফেলে মুখটা পরিষ্কার করে দিল নাসলা। দলের বাকিদের নিয়ে সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে নামতে শুরু করলাম আমি। মরু শেয়ালের ছবি আঁকা টালিগুলো পরীক্ষা করে দেখার জন্য একটু থামল সেরেনা আর রামেসিস। ছবিগুলো দেখে দারুণ খুশি হয়ে উঠল সেরেনা।

সুড়ঙ্গের নিচে নামার পর এবার সমান্তরাল পথটার মুখে এসে দাঁড়ালাম আমরা। সেরেনা আর রামেসিসকে বুঝিয়ে বললাম যে এখন আমরা নদীর তলায় রয়েছি। মাথার ওপর সুড়ঙ্গের ছাদের দিকে গম্ভীর চোখে একবার তাকাল সেরেনা, তারপর রামেসিসের কাছে সরে এসে তার হাতটা চেপে। ধরল। এবার ওদের নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম আমি। হাঁটতে হাঁটতেই জানিয়ে দিলাম যে, এই সুড়ঙ্গটা তিন শ দশ কদমের মতো লম্বা, যা আমাদের মাথার ওপরে নদীর যে অংশটুকু রয়েছে তার দৈর্ঘের প্রায় সমান। তারপর যখন পায়ের নিচের মেঝে ওপরের দিকে ঢালু হয়ে উঠতে শুরু করল তখন আমি ব্যাখ্যা করলাম এই বলে: আমরা এখন পশ্চিম তীরে পৌঁছে গেছি, এবং ওপরের দিকে উঠছি।

মৃদু হাসি ফুটল রামেসিসের ঠোঁটে। সেরেনাও তার কথা বলার শক্তি ফিরে পেল। এখান থেকে দুই পাশের দেয়ালে যে রহস্যময় লেখার আবরণ রয়েছে। সেদিকে ইঙ্গিত করল ও। তার পরই অবাক হয়ে আমি দেখলাম, লেখাগুলোকে সাবলীলভাবে মিশরীয় ভাষায় অনুবাদ করে চলেছে সেরেনা।

এই পৃথিবীর মানুষ জেনে রাখুক যে আমি, সেনকুয়াত এবং মেস্তানিয়ার রাজা জারারান্ড; এই গুহা নির্মাণের কাজকে উৎসর্গ করছি সকল ভালো এবং আলোকের দেবতা আহুরা মাজদার নামে…

নিজেকে সামলাতে পারলাম না আমি, হড়বড় করে বলে উঠলাম, এটা কী ভাষা সেরেনা? আর তুমি এটা শিখলে কোথায়?

মাঝপথে থেমে গিয়ে অবাক হয়ে রামেসিসের দিকে চাইল সেরেনা। তারপর বলল, তা তো ঠিক মনে নেই আমার। হঠাৎ দ্বিধা ফুটে উঠল ওর চেহারায়। বিগত বছরগুলোতে অনেকগুলো শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেছি আমি। সে জন্যই হয়তো ভুলে গেছি।

সাথে সাথেই নিজের ওপর রাগ হলো আমার। কোনো কিছু চিন্তা না করেই প্রশ্নটা করে বসেছি আমি। আমার বোঝা উচিত ছিল যে এটা আসলে দেবত্বের অধিকারী হিসেবে সেরেনার অনেকগুলো অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের একটা। এর আগের জীবনগুলোর কোনো একটায় এই ভাষা শিখেছিল সে, বর্তমান জীবনেও তার অংশবিশেষ রয়ে গেছে ওর মাঝে।

কে জানে, হয়তো তোমার স্বামীই শিখিয়েছে তোমাকে। মজা করে বললাম আমি। সাথে সাথে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল রামেসিস। ওর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপতেই মজাটা বুঝতে পারল, তারপর হো হো করে হেসে উঠল সে।

তা ঠিক। দোষ মেনে নিচ্ছি, টাইটা। আমিই শিখিয়েছি ওকে, দাঁত বের করে হেসে বলল রামেসিস। যা যা ও জানে তার সবই আমি শিখিয়েছি। এই কথা শুনেই ওর কাঁধে ঘুষি মারল সেরেনা। হেসে উঠলাম আমরা সবাই। অস্বস্তিকর মুহূর্তটা কেটে গেল, আবার সামনে এগিয়ে চললাম আমরা। তবে কিছু দূর যাওয়ার পরেও থমকে দাঁড়াতে হলো পাথরধসের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়।

বাকি তিনজনের দিকে তাকিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিলাম আমি। এর বেশি আর যাওয়ার উপায় নেই।

কী ঘটেছিল এখানে? জানতে চাইল সেরেনা।

সুড়ঙ্গের ছাদটা এখানে ধসে পড়ে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে রাস্তা, ব্যাখ্যা করলাম আমি। এর চাইতে আর সামনে যাওয়া সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। আমার মনে হয় এর পরে কী আছে সেটা চিরকাল একটা রহস্যই থেকে যাবে।

কিন্তু এই পাথরগুলো কি আমরা সরিয়ে ফেলতে পারি না? সেই সময়কার লোকেরা আমাদের জায়গায় হলে তো এটাই করত, তাই না? প্রশ্ন করল ও। কণ্ঠস্বর শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে দারুণ নিরাশ হয়েছে ও।

এটা একটা পাথরধস, আবার বললাম আমি। এর ওপরে কোনো শক্ত ছাদ নেই। সোজা কথায় এটা একটা মরণফাঁদ। তুমি যদি পাথরগুলো পরিষ্কার করে এগোনোর চেষ্টা করো, বলা যায় না ওটা তোমার ওপরেই ধসে পড়তে পারে…

আমাকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল রামেসিস, পাথরের স্তূপের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। মেঝে থেকে শুরু করে পাথরের জমাটবাধা তূপের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করল ও, একেবারে ওপরের প্রান্ত পর্যন্ত স্পর্শ করে দেখল। ছাদের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হতে হলো ওকে। সেখান থেকে এক টুকরো পাথর খসিয়ে আনল ও, তারপর ফাঁকা জায়গায় হাত ভরে দিয়ে হাতড়াল কিছুক্ষণ। অবশেষে একসময় হাত বের করে এনে তাকাল আমার দিকে। একটু আগে বের করে আনা সেই পাথরের টুকরোটা এখনো ওর হাতে ধরা রয়েছে। এবার সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিল ও।

না, টাটা। জীবনে একবার হলেও ভুল হচ্ছে তোমার, আমাকে বলল রামেসিস। একে কোনোভাবেই পাথরধস বলা যায় না। ইচ্ছে করে তৈরি করা হয়েছে এটা। এই যে এই টুকরোটায় বাটালির দাগ রয়েছে। দেখেছ? ওটা বের করে আনার পর ওপরে ছাদের অস্তিত্ব টের পেয়েছি আমি। ছাদটা ধসে বা ভেঙে পড়েনি, এখনো অক্ষত আছে। এই পাথরের স্তূপ আসলে মানুষের হাতে তৈরি। পাথরগুলো ইচ্ছে করেই এখানে রাখা হয়েছে, যাতে পথ বন্ধ হয়ে যায়। কখনোই ধস নামেনি এখানে।

জবাব না দিয়ে রামেসিসের পাশ কাটিয়ে পাথরধসটার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি, এখনো মনে মনে ধস শব্দটাই ব্যবহার করছি। রামেসিসের চাইতে উচ্চতা বেশি আমার, ফলে ওর তৈরি করা ছিদ্রতে হাত ঢোকানোর জন্য পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হওয়া লাগল না। তবে এবার কোনো তাড়াহুড়ো করলাম না আমি। তার বদলে বেশ কষ্ট করে ধসের ওপরের অংশ থেকে আরো দুটো পাথর খসিয়ে এনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলাম সেগুলোকে। সত্যিই মানুষের হাতের ছাপ রয়েছে এগুলোতেও। তারপর ফাঁকা জায়গার মাঝে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ওপরের ছাদে কোনো ফাটল বা ফাঁকা জায়গা আছে কি না পরীক্ষা করে দেখলাম। না, তাও নেই। সম্পূর্ণ নিরেট ছাদ। পাথরের ধস নেমে বন্ধ হয়ে যায়নি সুড়ঙ্গ, বরং মানুষই ইচ্ছে করে এটাকে বন্ধ করে দিয়েছে।

ঘুরে দাঁড়িয়ে রামেসিসের মুখোমুখি হলাম আমি, শক্ত করলাম নিজেকে। বললাম, তুমিই ঠিক। আমার ভুল হয়েছিল। সামান্য কয়েকটা কথা; কিন্তু উচ্চারণ করা কত কঠিন।

তবে আমার কষ্টটা বুঝতে পারল রামেসিস। এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে চাপ দিল ও। বলল, আমাদের সামনে এখনো অনেক কাজ বাকি। কখনো ভুল করলে সেটা আমি মেনে নিতে পারি না, এবং এটা রামেসিস খুব ভালো করেই জানে। তাই এখন আমার মন অন্যদিকে সরিয়ে নিতে চাইছে। সেই মুহূর্তে ওর প্রতি আমার ভালোবাসা আরো বেড়ে গেল।

*

আন্দাজ করলাম, সুড়ঙ্গের নিচে যে জায়গা আছে তাতে একবারে কুড়িজনের বেশি মানুষ একসাথে কাজ করতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে বাধা পরিষ্কার করতে কত সময় লাগবে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই আমাদের। সিদ্ধান্ত হলো যে, শ্রমিকদের মাধ্যমে পাথরের দেয়াল থেকে একটু একটু করে পাথর সরিয়ে ফেলা হবে, তারপর তূপ করে রাখা হবে সুড়ঙ্গের দেয়াল বরাবর। এর পরও যদি জায়গার অভাব হয়ে যায় তাহলে সেগুলোকে সুড়ঙ্গ বেয়ে ওপরে তুলে নিতে হবে, ফেলে দিতে হবে নীলনদের মাঝে।

আরো বেশ কিছু ছোট ছোট সমস্যার সমাধান করা জরুরি হয়ে দাঁড়াল। মাটির কত নিচে আমাদের কাজ করতে হবে আমরা কেউই জানি না, এটাও জানি না যে আমাদের কাজের শব্দ ওপরে অর্থাৎ আবু নাসকোস দুর্গে পৌঁছে যাবে কি না। তা ছাড়া কাজটা শেষ করতে কত সময় লাগবে এবং ওই বদ্ধ জায়গার ভেতরে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিশজন মানুষ কীভাবে থাকবে, খাবে এবং ঘুমাবে সেটাও এখনো জানা নেই আমাদের।

একটা না একটা বুদ্ধি তুমি বের করেই ফেলবে টাটা, খুশি খুশি গলায় আমাকে বলল সেরেনা। তোমার ওপরে নিশ্চিন্তে ভরসা রাখা যায়।

কিন্তু ষোলো দিন পর, এমনকি আমিও আমার ধৈর্য এবং বুদ্ধির প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেলাম। খুব শীঘ্রই বোঝা গেল যে প্রাচীনরা তাদের এই অসাধারণ কাজকে প্রায় অসম্ভব একটা রূপ দিয়ে রেখে গেছে। বড় পাথরগুলোকে পরস্পরের সাথে আটকে রাখার জন্য কাদার মতো একধরনের নরম পদার্থ ব্যবহার করেছে তারা। সেগুলো পরে শুকিয়ে, এমনকি পাথরের চাইতেও শক্ত হয়ে গেছে। সেগুলোকে ভেঙে ভেঙে ছোট টুকরোতে পরিণত করা লাগল, তারপর হাতে হাতে বয়ে আনতে হলো সুড়ঙ্গের পেছন দিকে। হাতুড়ির শব্দ ওই বদ্ধ জায়গার ভেতর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করল যে, কাপড় দিয়ে কান বেঁধে রাখতে বাধ্য হলো শ্রমিকরা। তার ওপর পাথরের স্তূপের মাঝে কিছু দূর পরপরই আলগা পাথরের স্তর রয়েছে, সেগুলো ধসে পড়ে আটজন শ্রমিককে হারালাম আমরা, আরো কয়েকজন গুরুতরভাবে আহত হলো। তারপর হঠাৎ করে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ দেখলাম যে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসেছি আমরা। ছোট একটা খোলা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, চারপাশে রয়েছে ছোট ছোট গুদামঘর আর সরু গলিপথ।

দ্রুত দারুণ আগ্রহের সাথে পুরো জায়গাটা তল্লাশি করে দেখলাম আমরা। কিন্তু বেশ নিরাশ হতে হলো যখন দেখলাম যে এখানে ঢোকার বা বের হওয়ার কোনো পথ নেই, সব দিক দিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ। অগত্যা আবু নাসকোস দুর্গের গঠন সম্পর্কে অভিজ্ঞ নাসলাকে ডেকে নিলাম আমি, জায়গাটার অবস্থান চিহ্নিত করতে বললাম তাকে। আমার এবং রামেসিসের বদ্ধমূল ধারণা, আবু নাসকোস দুর্গ আমাদের মাথার ওপরেই রয়েছে। কিন্তু নাসলা জানাল, বড় ভাইয়ের সাথে কথা না বলে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে রাজি নয় সে। তার কথাকে যৌক্তিক বলে মনে হলো আমাদের। তাই নাসলাকে সুড়ঙ্গের ওপরে হুরোতাসের সৈন্যদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, যারা এখনো দুর্গ অবরোধ করে রেখেছে। একই সাথে শ্রমিকদের বেশির ভাগ অংশকে তার সাথে ওপরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। শুধু সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং দক্ষ পাঁচজন শ্রমিককে নিজেদের সাথে রেখে দিলাম আমরা।

রামেসিস, আমি এবং সেরেনা এবার সুড়ঙ্গ ছেড়ে বাইরে শেয়াল দ্বীপের ওপরে উঠে এলাম। এখানেই অস্থায়ীভাবে আস্তানা তৈরি করলাম আমরা, নাসলা কখন তার ভাই বাতুরের সাথে কথা বলে ফিরে আসবে তার অপেক্ষা করতে লাগলাম। তিন দিন সময় লেগে গেল তার ফিরে আসতে। ভাইয়ের সাথে সহজে যোগাযোগ করার সুযোগ পাচ্ছিল না নাসলা, তবে শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে সে। দুর্গের দেয়ালের দুই পাশে বসেই দীর্ঘ সময় নিজেদের গোপন সংকেতের মাধ্যমে আলাপ করতে পেরেছে তারা।

নাসলা যে খবরগুলো নিয়ে এলো তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা তা হলো, দুর্গের নিচে সুড়ঙ্গপথের শেষ মাথায় এসে যখন আমরা পাথরের দেয়াল ভেঙে সামনে এগোচ্ছিলাম তখন সেই শব্দ শুনতে পেয়েছে বাতুর। শব্দগুলো দারুণ চমকে দিয়েছিল তাকে। তবে রামেসিস আর আমি ঠিক করেছিলাম যে অতিরিক্ত শব্দ হওয়ার সম্ভাবনা আছে যে কাজগুলোতে সেগুলো মাঝরাতের পর করব, যখন উটেরিকের যোদ্ধারা ঘুমিয়ে থাকে অথবা পাহারায় ব্যস্ত থাকে দুর্গ প্রাচীরের ওপরে। তাই আমাদের মাটির নিচে অগ্রগতির শব্দে তেমন কোনো হইচই পড়েনি, কারণ মাঝখানের গুদামঘর এবং পাথুরে দেয়ালগুলোর কারণে শব্দ আরো কমে গিয়েছিল।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খবরটা হচ্ছে, দুই ভাই মিলে এমন একটা বুদ্ধি ঠিক করেছে, যার সাহায্যে বাতুরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার একটা ব্যবস্থা করতে পারব আমরা। এখন এটা পরিষ্কার যে, সুড়ঙ্গ পার হয়ে এসে প্রথম যে ফাঁকা জায়গাটায় উঠেছিলাম আমরা সেটা আসলে প্রাচীন সেনকুয়াতের রাজা জারারান্ডের তৈরি নকশারই একটি অংশ। সুড়ঙ্গের দেয়ালে এই রাজার নামই দেখেছিলাম আমরা।

অনেক শতাব্দী পর যখন সেনকুয়াত রাজ্যের সবাই মিশর ছেড়ে পালিয়ে যায় অথবা কোনো যুদ্ধের ফলে চিরতরে মুছে যায় তাদের নাম; তারপর বহু বছর খালি পড়ে ছিল এই দুর্গ। পরে তা হিকসস শাসকরা দখল করে নেয়। ওরাই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের ওপর নতুন করে বর্তমান দুর্গ গড়ে তোলে। এবং হিকসসরাই ভূগর্ভস্থ ঘরগুলোর মুখ বন্ধ করে দেয়, যেগুলোর মাঝে এসে উপস্থিত হয়েছিলাম আমি আর রামেসিস। এখন এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে, আবু নাসকোস দুর্গের নিচে কী লুকিয়ে আছে তা কোনোভাবেই জানা নেই উটেরিকের।

এ কথা জানার পর আবারও মাটির নিচে সেই সুড়ঙ্গে ফিরে যাওয়ার জন্য অধীর হয়ে উঠলাম আমি আর রামেসিস। সেখান থেকেই বাতুরের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে পারবে নাসলা। তারপর আমার এবং রামেসিসের দায়িত্ব হবে উটেরিকের সৈন্যদের চমকে দেওয়া এবং তাদেরই দুর্গের নিচ থেকে দলবল নিয়ে উঠে এসে তাদের ওপর হামলা চালানো। ওদের চমকে দিতে পারলে পুরো সুযোগটা থাকবে আমাদের পক্ষে। উটেরিক এবং তার চ্যালাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য এটাই চূড়ান্ত সুযোগ আমাদের সামনে। তবে এই কাজটা করার আগে রাজা হুরোতাসের সৈন্যদের সাথে সব পরামর্শ করে নিতে হবে। মাটির ওপরে দুর্গের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে তারা।

তবে রামেসিস আর আমার প্রথম কাজটা হবে মাটির নিচের বদ্ধ ঘর থেকে ছাদ ফুটো করে ওপরে ওঠার ব্যবস্থা করা, যেখানে উটেরিক আর তার সঙ্গীদের বর্তমানে বসবাস। বাতুরের সাথে কথা বলে মধ্যরাতকে নির্ধারিত সময় হিসেবে ঠিক করা হয়েছে আগেই। এবার সেই সময় অনুযায়ী নাসলা এবং আরো পাঁচজন শ্রমিককে নিয়ে নীলনদের নিচের সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলাম আমরা, ঢুকে পড়লাম সেই ভূগর্ভস্থ বদ্ধ ঘরটায়। সবাইকে বললাম মোমবাতি নিভিয়ে ফেলতে, কারণ এখন আর ওগুলোর দরকার নেই আমাদের। তারপর অটুট নীরবতার মাঝে অপেক্ষা করতে লাগলাম সবাই। নিশ্চিদ্র অন্ধকার এখন আমাদের চারপাশে, সেইসাথে সম্পূর্ণ নৈঃশব্দ্য বিরাজ করছে। এমনকি আমি নিজেও এই পরিস্থিতিতে কিছুটা দুর্বল বোধ করতে লাগলাম, তাহলে আমার সাথে যারা ছিল তাদের কী অবস্থা হচ্ছিল তা সহজেই অনুমেয়। একবার মনে হলো চিৎকার করে ওদের সাহস জোগাই; কিন্তু তার পরই সামলে নিলাম নিজেকে। কে জানে চিৎকার করলে হয়তো আমার নিজের মানসিক দুর্বলতা সম্পর্কে বুঝে ফেলবে ওরা।

ধীরে ধীরে সময়ের সব হিসাব হারিয়ে ফেলতে শুরু করলাম আমি। কিন্তু অবশেষে একসময় সেই অটুট নীরবতা ভঙ্গ হলো মাথার ওপরে কোথাও ধাতুর সাথে ধাতুর ঠোকাঠুকির অত্যন্ত মৃদু আওয়াজে। তার সাথে সাথেই শোনা গেল আমাদের লোকদের স্বস্তির নিঃশ্বাস আর উচ্ছ্বসিত গলার আওয়াজ। চকমকি ঠুকে মোমে আগুন ধরাল সবাই। পরবর্তী এক ঘণ্টা সময়ের মাঝে শব্দগুলো ঠিক কোন জায়গা থেকে আসছে সেটা খুঁজে বের করলাম আমরা।

আমাদের মাথার ওপর একটা জায়গায় প্রথমে সরু একটা ফুটো করে রেখেছে। বাতুর। পরে সেই ফুটো দিয়ে একটা ধাতব দণ্ড ঢুকিয়ে দিয়েছে, তারপর আরেক টুকরো ধাতব দণ্ড দিয়ে আস্তে আস্তে বাড়ি দিয়েছে তাতে। এবার আমরাও সেই বরাবর একটা গজালের সাহায্যে ফুটো করতে শুরু করলাম। যদিও কাজটা বেশ কঠিন হলো, কারণ এখানে আমাদের মাথার ওপরের দেয়াল প্রায় চার কিউবিট পুরু। তবে শেষ পর্যন্ত ছিদ্র করার কাজ সম্পন্ন হলো, তাতে কান পেতে ওপাশ থেকে ভাইয়ের ফিসফিসে গলার আওয়াজ শুনতে পেল নাসলা।

এবার বাকি রইল শুধু ফুটোটাকে যথেষ্ট পরিমাণে চওড়া করে তোলার কাজ। সেটার পরিমাণ এমন হবে, যেন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ সম্পূর্ণ বর্মপরিহিত অবস্থায় তার সব অস্ত্র হাতে নিয়ে উঠতে পারে। এই কাজটা করতে আরো তিন দিনের মতো সময় লেগে গেল। তবে শেষ পর্যন্ত সমাপ্ত হলো কাজটা। এবার নাসলার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো আমি এবং রামেসিস পা রাখলাম আবু নাসকোস দুর্গের ভেতরে। এখানেই নাসলার বড় ভাই বাতুর আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিল। দুই ভাই এবার আমাদের সাথে নিয়ে দুর্গের সবচেয়ে নিচের দিকের অংশগুলো ঘুরিয়ে দেখাল। এই জায়গাগুলো বেশির ভাগই শুধু গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং মানুষ থাকে না বললেই চলে। উটেরিকের যেসব সৈন্যের সাথে আমাদের দেখা হলো তাদের বেশির ভাগই বাতুর এবং নাসলাকে খুব ভালো করেই চেনে। তা ছাড়া আমরা সবাই আগে থেকেই গোপন সংকেত জেনে নিয়েছিলাম, তাই কোনো অসুবিধাই হলো না।

এবার কিছু নির্দিষ্ট পথ আমাদের চিনিয়ে দিল দুই ভাই, যেগুলো দিয়ে দুর্গের প্রধান প্রধান অংশগুলোতে যাওয়া যায়। তারপর যে পথে ভেতরে ঢুকেছিলাম সে পথেই আবার বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। বাতুর রয়ে গেল ওপাশে, কারণ আমরা যে পথটা তৈরি করেছি সেটাকে গোপন করে রাখতে হবে তাকে। এই কাজে শুকনো বার্লিভর্তি কিছু বস্তা ব্যবহার করল সে। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, পাশেরই একটা কামরায় রাখা ছিল ওগুলো।

*

এরপর আমরা যেটা করলাম তা হলো পুব তীরে হুরোতাসের পুরনো শিবির থেকে প্রায় তিন শর মতো সৈন্যকে চারটি দ্বীপে স্থানান্তর করা। এখানে ওদের তেমন কোনো অসুবিধা হবে না, আবার প্রয়োজন পড়লে পানির নিচের সুড়ঙ্গপথ দিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিয়ে আসা যাবে উটেরিকের দুর্গের ভেতরে। এই কাজগুলো যখন চলছে তখন আমি আর রামেসিস মিলে সেনাবাহিনীর সকল অধিনায়ককে ডেকে পাঠালাম, তারপর দুর্গের ভেতরের নকশা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে জানিয়ে দিলাম তাদের। এর ফলে তারা যখন সুড়ঙ্গ দিয়ে ভেতরে ঢুকবে তখন ওই বিশাল দুর্গের মাঝে তাদের পথ হারিয়ে ফেলার ভয় থাকবে না। খুব সহজেই নিজ নিজ জায়গা খুঁজে নিতে পারবে তারা। এ ছাড়া এটাও নিশ্চিত করলাম যে, প্রত্যেকটা দলে যেন অন্তত একজন লোক থাকে যে এর আগে উটেরিককে দেখেছে এবং আবার দেখলে সাথে সাথে তাকে চিনতে পারবে। উটেরিক যে নিজের বহু নকল ব্যবহার করার মাধ্যমে শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে চায় এটা অনেক আগে থেকেই জানা হয়ে গেছে আমাদের।

এরপর সৈন্যদের বিভিন্ন দ্বীপে পাঠিয়ে দেওয়ার পর তাদের কাজ কী হবে সে ব্যাপারে তাদের বারবার অনুশীলন করালাম আমরা। প্রথমে শেয়াল দ্বীপের সুড়ঙ্গপথ ধরে নিচে নামবে তারা, তারপর ভূগর্ভস্থ পথ ধরে পশ্চিম তীরে চলে যাবে। তারপর সেখান থেকে মাটির নিচের ঘরটা হয়ে প্রবেশ করবে দুর্গের ভেতরে। পুরো কাজটাই অন্ধকারের মাঝে করতে হবে তাদের। তাই যাওয়ার পথে দশ থেকে বারোজনের এক একটা দলে ভাগ করে দেওয়া হলো, তাদের দলের সবাইকে দড়ির সাহায্যে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করা হলো। প্রতিটি দলের দায়িত্বে থাকল একজন করে দলনেতা। কেবল তার হাতেই একটি করে জ্বলন্ত মশাল তুলে দেওয়া হলো।

এই সমস্ত প্রস্তুতিতে কোনো সমস্যা হলো না, নিখুঁতভাবেই সম্পন্ন হলো সব কাজ। কিন্তু রামেসিসের সামনে একটা সমস্যা এসে হাজির হলো। আর সেটা হলো রানি সেরেনা ক্লিওপেট্রাকে আমাদের এই নৈশ আক্রমণে যোগ না দিতে রাজি করানো। আমরা চাইছি মাটির ওপরে হুরোতাসের সাথেই থাকুক ও, কারণ ওটাই হবে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গা।

তুমি বুঝতে পারছ না, টাটা, জ্ঞান দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল রামেসিস। ও যদি একবার ভেবে বসে যে কেবল মেয়ে বলেই ওকে সাথে নিচ্ছি না আমরা এবং ওর সুরক্ষার জন্য একজন পুরুষের কাছে রেখে যাচ্ছি; তাহলে কোননাভাবেই ওকে রাজি করানো যাবে না।

আমি বুঝতে পারছি, রামেসিস, ওর গলা নকল করেই জবাব দিলাম আমি। তোমার স্ত্রীকে তো বটেই, ওর মা এবং নানিও আমার অত্যন্ত পরিচিত। ওদের সবার মাঝেই একটা জিনিস পরিষ্কারভাবে দেখেছি আমি। সেটা হলো ওরা সবাই নির্দেশ দিতে ভালোবাসে; কিন্তু নিজের ওপর এসে পড়া কোনো নির্দেশ মানতে চায় না। তাই ওকে বোঝাতে হলে একটু কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে তোমাকে। তুমি ওকে বলবে যে, ওর বাবার বয়স হয়েছে, চোখে ভালো না দেখাই স্বাভাবিক। তাই ঘটনাচক্রে উটেরিক যদি দুর্গ থেকে বের হয়ে পালাতে চায় তাহলে তখন তাকে চিনতে সাহায্য করার জন্যই হুরোতাসের সাথে থাকতে হবে সেরেনাকে। এমনিতেও হুরোতাস কখনো উটেরিকের চেহারা দেখেনি, অথচ সেরেনার চাইতে ভালোভাবে কেউ উটেরিককে চেনে কি না সন্দেহ। এমনকি সে যদি মুখোশ পরে থাকে তাহলেও তার হাত দেখে তাকে চিনতে পারবে সেরেনা।

পরদিন সন্ধ্যায় হুরোতাসের শিবির থেকে শেষবারের মতো রাজার সাথে আলোচনা সেরে শেয়াল দ্বীপে ফিরে এলো রামেসিস। আসার সময় পোশাকের নিচে করে বড় এক বোতল সুস্বাদু স্পার্টান মদ নিয়ে এসেছে ও। এবার সেটা থেকে এক পেয়ালা আমার দিকে ঢেলে এগিয়ে দিল ও, দাঁত বের করে হাসছে। পান করো টাটা। দুঃখকে ভুলে থাকতে হলে ইচ্ছেমতো পান করতে হবে আমাদের।

দুঃখের সংবাদ? জানতে চাইলাম আমি।

এর চাইতে ভালো কিছু হতে পারে না। তার পরই জ কুঁচকাল রামেসিস। দুঃখিত, কথাটা ভুলে বলে ফেলেছি। আমি বলতে চাইছি এর চাইতে দুঃখের কিছু হতে পারে না। আসন্ন যুদ্ধে আমার পাশে থাকতে পারবে না আমার প্রিয় স্ত্রী। সুতরাং দুর্গের প্রধান ফটকে পৌঁছানোর সংগ্রামে নিজের সর্বশক্তি এবং সবটুকু মনোযোগ ব্যয় করতে পারব আমি। ফটকের কাছে পৌঁছানোর পর আমার কাজ হবে সেটা খুলে রাখা, যাতে আমাদের বাহিনী ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। সেরেনা থাকবে তার বাবার কাছে, যুদ্ধের বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে যেন উটেরিক পালিয়ে যেতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে, সাহায্য করবে তার বাবাকে। আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি, হুরোতাস নিশ্চয়ই তার একমাত্র মেয়েকে কোনো বিপদে পড়তে দেবে না।

*

সব মিলিয়ে বিশাল আয়োজনের সাথে প্রস্তুতি নিতে হলো আমাদের, এবং কাজটা আরো কঠিন হয়ে উঠল আমাদের শত্রুর বহুরূপী স্বভাবের কারণে। তবে শেষ পর্যন্ত আবু নাসকোস আক্রমণের সকল প্রস্তুতিই সম্পন্ন হলো। আক্রমণের আগের রাতটা নদীর পুব তীরে পুরনো শিবিরে কাটাল রাজকীয় দম্পতি। তবে ভোর হওয়ার সাথে সাথে পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিল তারা। নীলনদ পার হয়ে পশ্চিম তীরে রাজা হুরোতাসের শিবিরে চলে গেল সেরেনা, আর নদীর নিচে অবস্থিত সুড়ঙ্গের মাঝে এসে অবস্থান নিল রামেসিস।

রাত নেমে আসার পর সামনে এগোতে শুরু করলাম আমরা, এবং শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছলাম আবু নাসকোস দুর্গের নিচে অবস্থিত সেই ভূগর্ভস্থ ঘরটায়। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে, নতুন চাঁদ আকাশে দেখা দেওয়ার সাথে সাথে আক্রমণ শুরু করা হবে। হুরোতাস এবং অন্য যারা মাটির ওপরে ছিল তাদের জন্য অবশ্য চাঁদের দেখা পাওয়াটা খুবই সহজ হলো। তবে আমি আর রামেসিস তখন কমপক্ষে পঞ্চাশ কিউবিট মাটির নিচে। তাই শেয়াল দ্বীপের ওপরে নিয়োজিত পাহারাদারদের কাছ থেকে খবর আসার অপেক্ষায় থাকতে হলো আমাদের। সুড়ঙ্গের মুখ থেকে একেবারে ভূগর্ভস্থ ঘর পর্যন্ত সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সৈন্যরা, তাদের মুখে মুখে এসে পৌঁছাল চাঁদ ওঠার খবর।

সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালাম আমি আর রামেসিস, দড়ির মই বেয়ে উঠতে শুরু করলাম ওপরে। এখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বাতুর আর নাসলা। আমাদের পেছনে পেছনে যারা এলো তারা সবাই ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রয়েছে এবং দড়ির সাহায্যে সংযোগ রেখেছে নিজেদের মধ্যে। অন্ধকারের মধ্যে সবাই একসাথে থাকতে হলে এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। শুধু দলের নেতার কাছে রয়েছে একটা করে মশাল।

এই ছোট ছোট দলগুলোর মধ্যে পাঁচটা দল রইল রামেসিসের নেতৃত্বে। ওর কাজ হচ্ছে দুর্গের প্রধান ফটক পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া। সেখানে গিয়ে ফটকটা দখল করবে ওর লোকেরা, তারপর খুলে দেবে; যাতে হুরোতাস এবং হুই নিজেদের শিবির থেকে সৈন্যদের নিয়ে ঢুকে পড়তে পারে ভেতরে। একবার ওরা ভেতরে চলে আসতে পারলে দুর্গে আমাদের আক্রমণ আরো জোরদার হবে।

আমার হাতে রয়েছে বারোজনের দুটো দল। নিজের হাতে এই লোকগুলোকে বাছাই করেছি আমি, যার অর্থ হচ্ছে এদের চাইতে দক্ষ লোক পুরো সেনাবাহিনীতে নেই। নাসলা আমাদের নিয়ে যাবে দুর্গের সর্বোচ্চ অংশে, যেখানে উটেরিকের ব্যক্তিগত বসবাসের স্থান অবস্থিত। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকে জীবিত গ্রেপ্তার করা, যাতে সঠিক লোকটাকে ধরা গেছে কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু এটাও ঠিক করে রেখেছি যে, সামান্যতম ঝামেলার আভাস দেখলেই হত্যা করা হবে তাকে। বাতুরের মতামত অনুযায়ী মাত্র দুই দিন আগেই উটেরিককে দেখা গেছে তার নিজের কামরায় ঢুকতে, এবং তারপর এখন পর্যন্ত তাকে ওই ঘর থেকে বের হতে দেখেনি কেউ।

মাটি থেকে প্রায় আট তলার সমান উঁচু এই দুর্গটা, এবং প্রতিটি তলা কমপক্ষে দশ কিউবিট লম্বা। ফলে প্রায় আশি কিউবিটের মতো ওপরে উঠতে হলো আমাদের। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় বেশ কিছু দূর পর পর দেয়ালের গায়ে মশাল জ্বলতে দেখা গেল। কিন্তু তাতে মোটেই আলোকিত হচ্ছিল না চারপাশ। তাই এবার সবাইকে নিজ নিজ মশালে আগুন ধরাতে নির্দেশ দিলাম আমি। এবার যথেষ্ট আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ। এখন ইচ্ছে করলে সরু এবং প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়েও এক দৌড়ে উঠে যেতে পারবে সবাই, হোঁচট খেয়ে পড়ার ভয় নেই আর।

সঙ্গে কী কী অস্ত্র নেওয়া হবে সেটা খুব সাবধানতার সাথে বাছাই করেছি। আমি। শেষ পর্যন্ত কেবল ধারালো অস্ত্রই সাথে রাখব বলে ঠিক করেছি। কেবল তলোয়ার এবং লম্বা ছুরি ছাড়া আর কিছু নেই আমার লোকদের সাথে। তীর-ধনুক জিনিসটা বেশ ঝামেলার এবং বদ্ধ জায়গার ভেতরে ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া যায় না বললেই চলে। খালা তলোয়ার নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলাম আমরা, যেকোনো সময় শত্রু সৈন্যদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছি। দুর্গের ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত উঠতেই আমাদের নিচ থেকে হঠাৎ হইচই আর চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো। তার পরই আর্তনাদ আর ধাতুর সাথে ধাতুর বাড়ি খাওয়ার শব্দ।

রামেসিসের লোকেরা শত্রুর সামনে পড়েছে! আমার পেছন থেকে বলে উঠল নাসলা।

থেমো না! পাল্টা জবাব দিলাম আমি। দুই শ লোক আছে রামেসিসের সাথে, প্রধান ফটকে পৌঁছে যেতে পারলে আরো সৈন্যের সাহায্য পাবে ও।

সিঁড়ি বেয়ে একটা বাঁক ঘুরলাম আমরা এবং সাথে সাথে শত্রুদের প্রথম দলটার মুখোমুখি হলাম। সিঁড়ি বেয়ে ওপর থেকে নেমে আসছিল তারা। নিশ্চয়ই নিচ তলা থেকে ভেসে আসা লড়াইয়ের শব্দ শুনে সচকিত হয়ে উঠেছে; কিন্তু তাই বলে এত তাড়াতাড়ি আমাদের সামনে পড়তে হবে তা ভাবেনি। এখনো কোমরেই রয়েছে তাদের সবার অস্ত্র। প্রথমজনকে স্রেফ তলোয়ার তুলে ধরে রেখেই খুন করলাম আমি। হুড়মুড় করে নেমে আসছিল লোকটা, সোজা এসে পড়ল আমার তলোয়ারের ফলার ওপর। তার কণ্ঠনালি ভেদ করে শিরদাঁড়া কেটে দিয়ে গলার ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল আমার তলোয়ার, উষ্ণ রক্তে ভিজে গেল আমার হাত আর কবজি। তলোয়ারটা সম্পূর্ণ ঢুকে যেতে দিলাম আমি এবং এর ফলে পেছনের লোকটার বুক বরাবর চলে এলো তলোয়ারের ফলা। লোকটা সম্ভবত তাড়াহুড়ো করে বর্ম পরেছে, বুকের কাছে এখনো ফিতে বাঁধা হয়নি। ফলে সেখানটায় উন্মুক্ত রয়ে গেছে তার বুক। আমার তলোয়ার এবার বাঁট পর্যন্ত ঢুকে গেল প্রথম লোকটার গলায়, একই সাথে বিদ্ধ করল দ্বিতীয়জনের বুক। একই সাথে মাটিতে পড়ল তারা, ছটফট করতে লাগল। শেষে প্রথমজনের বুকে পা দিয়ে চেপে ধরে তাকে থামাতে হলো আমার। তলোয়ারটা এদিক-ওদিক মুচড়ে ক্ষতস্থানটা বড় করে নিলাম আমি। এবার সহজেই বেরিয়ে এলো তলোয়ার। ওদিকে নাসলা এবং বাকিরা তখন শত্রুদের বাকিগুলোর ব্যবস্থা করে ফেলেছে। লাফ দিয়ে মৃতদেহগুলো টপকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলাম আমি। এখন আমরা দুর্গের সর্বোচ্চ তলায় রয়েছি, যেখানে উটেরিকের থাকার কথা।

এবার কোন দিকে? নাসলাকে প্রশ্ন করলাম আমি।

সোজা গিয়ে প্রথম দরজা! থুতনি দিয়ে সামনে ইঙ্গিত করল নাসলা। এক দৌড়ে তার দেখানো দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা, একই সাথে ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেললাম সেটা। কামরার অন্য পাশে জানালার সামনে একটা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে আমাদের ভেতরে ঢোকার আওয়াজ পেয়েছে সে, কারণ প্রায় সাথে সাথেই ঘুরে দাঁড়াল। পুরো দস্তুর বর্ম পরে আছে লোকটা। শিরস্ত্রাণের মুখাবরণ সামনে নামানো, সরু ফুটো দিয়ে দেখা যাচ্ছে জ্বলজ্বলে চোখ। ডান কোমরে ঝোলানো খাপের মাঝে ভরা রয়েছে তলোয়ার। কেবল হাতগুলো দেখা যাচ্ছে। মসৃণ ফর্সা হাত। কোনো ভাঁজ বা কড়া নেই তাতে, যেন কোনো সুন্দরী তরুণীর হাত। এক নজর দেখেই লোকটার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয় গেলাম আমি।

উটেরিক, তোমার সময় শেষ হতে চলেছে। এবার দেখা যাবে তোমার অমরত্বের গুজব কতটুকু সত্যি, বললাম আমি। তলোয়ারের বাটে এক হাত রেখে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো সে। কিন্তু সেই একই মুহূর্তে আমার দলের লোকেরা হুড়মুড় করে দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। আর দ্বিধা করল না উটেরিক। চরকির মতো ঘুরে দাঁড়াল সে, তারপর জানালার কিনারায় তুলে দিল এক পা। পর মুহূর্তে জানালার ওপর উঠে দাঁড়াল সে, তার পরেই যেন উড়াল দিল শূন্যে। নিমেষের মধ্যে আমাদের দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে গেল তার শরীরটা।

*

তীব্র ক্রোধ তার সাথে তিক্ত অসন্তোষের ছোঁয়া টের পেলাম আমি মনের ভেতর। আরো একবার প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হলো আমাকে। আক্রোশে শিকার ছিনিয়ে নেওয়া বাঘের মতো হিসিয়ে উঠলাম আমি। এটাই দুর্গের সর্বোচ্চ জায়গা। এখান থেকে একবার পড়লে কোনো মানুষের পক্ষেই জীবিত থাকা সম্ভব নয়। কামরার অন্য পাশে চলে এলাম আমি এক দৌড়ে, তারপর জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম বাইরে। অজানা আশঙ্কায় কাঁপছে বুকের ভেতর, মনে হচ্ছে অনেক নিচে দলামোচড়া হয়ে পড়ে থাকতে দেখব উটেরিকের মৃতদেহটা। কিন্তু না, আমার কল্পনার সাথে কোনো অংশেই মিলল না বাস্তবের ঘটনাপ্রবাহ। বাইরে প্রায় দিনের মতো উজ্জ্বল আলো। শত শত না, বরং হাজার হাজার জ্বলন্ত মশালের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে চারপাশ। দুর্গের দরজা দিয়ে স্রোতের মতো হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকছে হুরোতাসের সেনাবাহিনী। রামেসিস এবং তার লোকেরা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমতোই পালন করেছে, ফটক খুলে দিয়েছে তারা। উটেরিকের মৃতদেহ যদি ওখানে পড়েও থাকে তাহলে সৈন্যদের পায়ের তলায় ঢাকা পড়ে গেছে এতক্ষণে।

আরো ভালো করে দেখতে পাওয়ার আশায় শরীরের ওপরের অর্ধেক বিপজ্জনক ভঙ্গিতে জানালা দিয়ে বাইরে বের করে দিলাম আমি। এবার আরো প্রসারিত হলো আমার দৃষ্টিসীমা। দেখলাম আমার থেকে খুব বেশি হলে দুই তলার মতো নিচে একটা কার্নিশের মতো অংশ রয়েছে। আর তার ওপরে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে বর্ম পরা একটা দেহ, মেয়েদের মতো হাত তার। আমার চোখের সামনেই উঠে বসল লোকটা, তারপর মুখ তুলে শিরস্ত্রাণের ফুটো দিয়ে চাইল আমার দিকে।

তোমাকে দেখে ফেলেছি আমি, উটেরিক, বলে উঠলাম আমি। এবার আসছি। তোমাকে ধরতে। কথাটা শুনেই ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল সে, উদ্ভ্রান্ত চোখে চাইল এদিক-ওদিক। নিঃসন্দেহে পালানোর পথ খুঁজছে। তার নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারলাম জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে পড়ার সময় একটা পায়ে ব্যথা পেয়েছে সে। আমিও জানালার ওপর উঠে দাঁড়ালাম এবার, তারপর এক মুহূর্ত বিরতি দিয়েই লাফিয়ে পড়লাম উটেরিককে লক্ষ্য করে। আশা করেছিলাম যে তার ওপরেই পড়ব, তারপর একই ধাক্কায় ফেলে দিয়ে চিরকালের মতো সাঙ্গ করে দেব ওর ভবলীলা। কিন্তু যা ভেবেছিলাম তার চাইতে অনেক বেশি ক্ষিপ্র সে। লাফ দিয়ে এক পাশে সরে গেল সে, আর এক মুহূর্ত আগেও সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে এসে পড়লাম আমি। বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ার কারণে আমার হাতে ধরা তলোয়ারটা ছুটে গেল, পড়ল গিয়ে কার্নিশের ওপরেই; কিন্তু আমার নাগালের ঠিক বাইরে।

চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে সেটাকে ধরার জন্য এগিয়ে গেলাম আমি। কিন্তু একই সাথে চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম খাপ থেকে নিজের তলোয়ারটা বের করে এনেছে উটেরিক, সাক্ষাৎ মৃত্যু সেজে এগিয়ে আসছে আমার দিকেই। লাফ দিয়ে নিজের তলোয়ারটা মুঠোয় চেপে ধরলাম আমি, তার পরেই গড়িয়ে সরে গেলাম এক পাশে। ওদিকে উটেরিক ততক্ষণে আমার সামনে চলে এসেছে, দুই পা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তোয়ার দুই হাতে চেপে ধরে তুলে ধরেছে মাথার ওপর, এখনই নামিয়ে আনবে আমার বুক বরাবর।

ঐতিহ্যগতভাবে মিশরীয়দের বর্মে দুই পায়ের মাঝখানে একটা ছিদ্র থাকে। বর্ম বানানোর সময় কামাররা ইচ্ছে করেই ছিদ্রটা তৈরি করে দেয়, যাতে প্রস্রাব করতে অসুবিধা না হয়। চিত হয়ে শুয়েছিলাম আমি, ফলে উটেরিকের বর্মে ওই ছিদ্রটা খুব সহজেই চোখে পড়ল আমার। সাথে সাথে ব্রোঞ্জের জুতো পরা পা দিয়ে ওই জায়গাটা লক্ষ্য করে লাথি ছুড়লাম, এবং লাথিটা পড়ার সাথে সাথেই বুঝলাম যে জায়গামতোই লেগেছে আমার আঘাত।

সবে তলোয়ারটা আমার বুক লক্ষ্য করে নামিয়ে আনতে শুরু করেছে উটেরিক, এই অবস্থায় আমার লাথি গিয়ে লাগল তার ঊরুসন্ধিতে। সরে যাওয়ার কোনো সুযোগই পেল না সে। হঠাৎ করেই ভয়ানক আঘাত পেয়ে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল তার, তীব্র ব্যথার চোটে দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলল। আমার হৃৎপিণ্ডের দিক থেকে সরে গেল তার তলোয়ারের ফলা। কিন্তু পুরোপুরি বাঁচতে পারলাম না আমি, বাম কাঁধে ঢুকে গেল তলোয়ার। তার পরই টলতে টলতে পিছিয়ে গেল উটেরিক। এক হাতে আহত জায়গা চেপে ধরে আছে আর চিৎকার করছে বাচ্চাদের মতো তীক্ষ্ণ গলায়। কিন্তু পিছিয়ে যাওয়ার সময় আমার কাধ থেক তলোয়ারটা বের করে নিয়ে গেছে সে, এবং সেটা এখন নাচাচ্ছে অন্য হাতে।

সোজা হয়ে বসে হাতড়ে হাতড়ে আমার তলোয়ারটা খুঁজে বের করলাম আমি, তারপর সেটা তুলে নিলাম হাতে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হলাম উটেরিকের। কার্নিশটা খুব বেশি চওড়া নয় এবং দুর্গের ভেতরে ঢোকার যে দরজা রয়েছে তার এবং উটেরিকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি। নিচের দিকে এক নজর দেখে নিল উটেরিক; কিন্তু এখনো অনেক ওপরে রয়েছি আমরা। দেখলাম নিজেকে শক্ত করল সে, তারপর মুখোমুখি হলো আমার। এখনো এক হাতে ঊরুসন্ধি ডলছে, আরেক হাতে বাগিয়ে ধরেছে তলোয়ার। বুঝে গেছে যে আমার সাথে লড়াই করতেই হবে তাকে, এবং এ লড়াই থেকে বেঁচে ফিরবে শুধু একজন।

পতনের ব্যথা খুব দ্রুতই কাটিয়ে উঠেছি আমি। ডান হাতে ফিরে পেয়েছি তলোয়ারের অভ্যস্ত ওজন, এখন আর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। এবার ডান পা সামনে রেখে সামনে এগিয়ে গেলাম আমি, একের পর এক আক্রমণ চালাচ্ছি তলোয়ার দিয়ে। উটেরিককে বাধ্য করছি আহত পায়ের ওপর ভর দিতে। একটু আগে ওই পায়েই ব্যথা পেয়েছে সে। শুনতে পাচ্ছি ধীরে ধীরে দ্রুত হয়ে উঠেছে তার শ্বাস-প্রশ্বাস, হাঁপিয়ে উঠছে খুব দ্রুত। কেবল আহত পায়ের যন্ত্রণা নয়, এমনিতেও লড়াই করার মতো শারীরিক শক্তি নেই তার গায়ে। লুক্সরের অ্যাম্ফিথিয়েটারে রাজমন্ত্রী ইরাসের মৃত্যুতে উটেরিক কেমন বিকৃত আনন্দ অনুভব করেছিল সেটা মনে পড়ে গেল আমার। মন্ত্রীর দুই হাত কেটে ফেলেছিল সে, তারপর নিজের রথের পেছনে তার দুই পা বেঁধে চক্কর দিয়েছিল, যতক্ষণ না শক্ত মাটিতে বাড়ি খেয়ে তার মাথা ফেটে ঘিলু বেরিয়ে আসে। একবার মনে হলো ওই একই উপায়ে উটেরিকের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করি। কিন্তু তার পরেই আমার ভেতরের মানবতা বাধা দিল আমাকে।

হঠাৎ করেই আক্রমণের দিক বদলে ফেললাম আমি, ফলে আমার তলোয়ার ধরা হাতের দিকে সরে আসতে বাধ্য হলো উটেরিক। কাজটা করতে গিয়ে হালকা হোঁচট খেল সে এবং সামান্য সময়ের জন্য প্রতিরক্ষার বলয় তুলে রাখতে ভুলে গেল। ঠিক এটাই চেয়েছিলাম আমি। মনে হলো যেন এক ঝলক বিদ্যুতের মতো আঘাত হানল আমার তলোয়ার, এত দ্রুত এগিয়ে গেল যে স্বাভাবিক চোখে ধরাই পড়ে না। তলোয়ারের ফলাটা তার বুকের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম আমি। উটেরিকের হৃৎপিণ্ড ভেদ করে মেরুদণ্ড কেটে আরো আধ হাতের মতো বেরিয়ে এলো তলোয়ারের ফলা। হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেল তার ধপ করে, পড়ে যেতে চাইল শরীরটাও। কিন্তু আমার তলোয়ারের মাথায় তাকে ঝুলিয়ে ধরে রাখলাম আমি। পাগুলো শরীরের নিচে ঝাঁকি খেল কয়েকবার, কার্নিশের মেঝেতে লাথি মারল। তারপর ওই অবস্থাতেই মারা গেল সে। কেবল তার পরেই আমি তলোয়ার নিচু করলাম। আমার পায়ের কাছে দলামোচড়া পাকিয়ে পড়ে রইল উটেরিকের মৃতদেহ।

এবার ঝুঁকে এসে তার শিরস্ত্রাণের মুখাবরণটা ওপরে তুলে দিলাম আমি। আগেই বোঝা উচিত ছিল আমার কাজটা এত সহজ হবে না। বহু রাতে উটেরিকের চেহারা আমার দুঃস্বপ্নে হানা দিয়েছে। এটাও বুঝতে পারছি যে সেই দুঃস্বপ্নের অবসান হয়নি এখনো, আরো দুর্ভোগ বাকি রয়েছে আমার সামনে। কারণ আমার সামনে যে পড়ে রয়েছে সে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক আগন্তুক। শুধু হাত ছাড়া আর কোথাও উটেরিকের সাথে মিল নেই তার। আরো একবার আমাদের ধোকা দিয়েছে উটেরিক। মাথা নাড়লাম আমি, নিজের নির্বুদ্ধিতার কথা বুঝতে পেরে কুঁচকে উঠল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনলাম চারদিক থেকে ভেসে আসা নানা ধরনের শব্দ। মরণপণ যুদ্ধে মেতে আছে সবাই: যুদ্ধের চিৎকার, আহতের আর্তনাদ, শিরস্ত্রাণ এবং বর্মের সাথে ধারালো অস্ত্রের বাড়ি খাওয়ার শব্দ, সেইসাথে আরো নানা রকম আওয়াজ- সব মিলিয়ে যেন নরক গুলজার শুরু হয়ে গেছে এখানে।

*

তারপর হঠাৎ খুলে গেল কার্নিশে প্রবেশের দরজা, অনেকগুলো ভারী জুতো পরা পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম আমি। দলবেঁধে ওপরে উঠে এসেছে আমার লোকেরা, এখন আমার চারপাশে ভিড় জমিয়েছে তারা। সবার মুখে উল্লাসের চিৎকার।

দারুণ, প্রভু টাইটা। শয়তানটাকে মারতে পেরেছেন তাহলে। আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে উঠল নাসলা।

হ্যাঁ। উটেরিকের আরো একজন নকল ছিল এই লোক, তার ভুল শুধরে দিলাম আমি। কিন্তু শুধু হাহোর আর ট্যানাসই জানেন এর আসল পরিচয় কী। তবু এর বর্মটা নিয়ে যাব আমরা। দেখে মনে হচ্ছে আসল জিনিস, নিশ্চয়ই অনেক দাম হবে। তারপর নিচে নেমে সত্যিকারের উটেরিককে খুঁজতে বের হব।

আগন্তুকের অর্ধনগ্ন লাশটা কার্নিশেই ফেলে রেখে ভেতরে চলে এলাম আমরা। সবাইকে নিয়ে এবার এগিয়ে চললাম যুদ্ধের চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার মাঝে যোগ দিতে।

অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে, কারণ এই পরিস্থিতিতে শত্রু এবং মিত্র আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। একই পোশাক রয়েছে সবার পরনে, একই ধাঁচে কথা বলছি, একই ভাষা ব্যবহার করে। তার ওপর দুর্গের ভেতরে সরু পথগুলোতে আলো নেই বললেই চলে, এবং একই রকম অন্ধকার বিরাজ করছে ভেতরের প্রাঙ্গণ এবং হলঘরগুলোতে। এই অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে মানুষের মুখ চিনতে পারা প্রায় অসম্ভব। অগত্যা সংঘর্ষে অংশগ্রহণকারী দুই পক্ষই পরস্পরের দিকে অস্ত্র হাতে তেড়ে যাওয়ার আগে নিজেদের নেতার নাম চিৎকার করে বলে উঠতে বাধ্য হচ্ছে, তারপর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যে আক্রমণ করবে নাকি একে-অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরবে।

তবে দুর্গের প্রধান ফটক এখন পুরোপুরিভাবে হুরোতাসের সৈন্যদের জিম্মায়। খণ্ড খণ্ড লড়াইয়ের মাঝ দিয়ে পথ করে নিয়ে সৈন্যদের নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম আমি, ফটকের কাছাকাছি চলে এলাম। এখানে রাজা হুরোতাসকে পাওয়া গেলাম, সাথে রয়েছে রামেসিস এবং সেরেনা। এরাই দখল করেছে ফটকের কর্তৃত্ব। দুটো দরজারই টানা সেতু নামিয়ে দিয়েছে তারা, তারপর সেগুলো ওঠা-নামা করানোর ব্যবস্থাকে নষ্ট করে দিয়েছে; যাতে শত্রুরা আবার সেগুলো ওপরে উঠিয়ে দিতে না পারে। এখন সেই পথ দিয়ে দলে দলে ভেতরে ঢুকছে হুরোতাসের সৈন্যরা। যদিও উটেরিকের সৈন্যদের সঠিক সংখ্যা আমাদের জানা নেই, তবে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে আমাদের সংখ্যার কাছে ওদের হার মানতেই হবে। হুরোতাস! চিৎকারের কাছে হার মানতে শুরু করেছে উটেরিক! চিৎকারের তীব্রতা। অবশ্য এর আরেকটা অর্থ হচ্ছে, উটেরিকের দলের অনেকেই এখন পক্ষ বদল করতে শুরু করেছে। আমি বুঝতে পারছি আবু নাসকোস দুর্গের বিজয় অবশেষে ধরা দিতে শুরু করেছে। আমাদের হাতে। এবার আমার চিন্তা সরে গেল লুক্সরের দিকে। ওয়েনেগ এবং তার সঙ্গীদের পক্ষে ওই শহরের নিয়ন্ত্রণ রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। হঠাৎ করেই একটা পরিবর্তন চলে এলো যুদ্ধের শব্দে। বিজয়ের উল্লাস হঠাৎ যেন বদলে গেল ভয় এবং বিভ্রান্তিতে ভরা হইচইয়ে। এতক্ষণ সারিবদ্ধভাবে আমাদের সৈন্যরা ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল, হঠাৎ করেই জট পাকিয়ে গেল তাদের সুশৃঙ্খল অগ্রযাত্রায়। এদিক-ওদিক দৌড়ে পালাতে শুরু করল তারা, ফলে পরিষ্কার হয়ে গেল ফটকের রাস্তা। দেখলাম দৌড়াতে দৌড়াতে অনেকেই বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাচ্ছে। তার পরই হঠাৎ চলমান রথের চাকার নির্ভুল শব্দ শুনতে পেলাম আমি। ঘোড়ার খুরের শব্দ, সেইসাথে পাথরে বাঁধাই করা পথের ওপর রথের চাকার ধাতব আবরণের ঘর্ষণ; এই শব্দ চিনতে কখনো ভুল হবে না আমার। তবে এর মাঝে যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত করে তুলল সেটা হচ্ছে শব্দটা দুর্গের ফটকের বাইরে নদীর দিক থেকে আসছে না, বরং ভেতরেই যেন ওই শব্দের উৎপত্তি। কেবল তখনই আমার মনে পড়ল, বাতুর আর নাসলা আমাকে জানিয়েছিল যে উটেরিক তার রথ বাহিনীর প্রায় অর্ধেকের মতো রথ এবং সেগুলো চালানোর মতো ঘোড়া রেখে দিয়েছে এখানে, যাতে হুরোতাস এবং তার মিত্র রাজাদের হাত থেকে পালাতে পারে। বাকি রথ এবং ঘোড়াগুলোকে পাঠিয়ে দিয়েছে নীলনদের অববাহিকায় তার অন্য দুর্গগুলোতে।

এই কথাগুলো মাথায় আসার সাথে সাথেই দেখলাম দুর্গের ভেতর থেকে ফটক লক্ষ্য করে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে একদল রথ। পাগলের মতো ঘোড়াগুলোকে চাবুকপেটা করছে চালকরা। অন্যদিকে রথের ওপর থেকে তীরন্দাজরা একের পর এক তীর ছুঁড়ে যাচ্ছে আমাদের সৈন্যদের লক্ষ্য করে। রথ বাহিনীর সামনে থেকে সরে যাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি লেগে গেছে সবার মধ্যে। যারা রথের ওপর রয়েছে তাদের সবার শরীর আগাগোড়া ঢাকা রয়েছে বর্মে। মাথায় শিরস্ত্রাণ, মুখে মুখাবরণ। ফলে কারো পরিচয় আলাদা করে বোঝার উপায় নেই। হুরোতাসের পক্ষের কয়েকজন দুর্ভাগা সৈন্য রথগুলোর সামনে থেকে সঠিক সময়ে সরে যেতে পারল না। সাথে সাথে ঘোড়াগুলোর খুরের তলায় চাপা পড়তে হলো তাদের, রথের চাকার নিচে পড়ে কয়েক মুহূর্তে পরিণত হলো রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডে। সৈন্যদের ভিড়ের মাঝে পড়ে গেলাম আমিও, তাদের চাপে বাধ্য হলাম দুর্গের দেয়ালের সাথে সেঁটে থাকতে। কিন্তু তাদের মাথার ওপর দিয়ে সামনে দেখার সুযোগ পেলাম ঠিকই, এবং সেটাকে কাজেও লাগালাম। আমার সামনে দিয়ে পার হয়ে যাওয়ার সময় রথগুলোকে গুনে নিলাম এক এক করে।

পাশাপাশি চারটি করে রথ ছুটে চলেছে পথ দিয়ে, এবং এমন দশটা সারি গুনলাম আমি। যার অর্থ হচ্ছে বাতুর আর নাসলা যে কয়টা রথের কথা বলেছিল তার সবই রয়েছে এখানে। শেষ সারিটা যখন পার হয়ে যাচ্ছে তখন হঠাৎ সবচেয়ে কাছাকাছি রথের চালক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আমার দিকে। আমি সেটা কী করে বুঝলাম সে প্রশ্ন হয়তো অনেকের মনেই জাগতে পারে। রথগুলোর ওপর সবাই তো শিরস্ত্রাণ আর মুখাবরণ দিয়ে চেহারা ঢেকে রেখেছিল, কেবল চোখের কাছে সরু দুটো ফুটো ছিল সামনে দেখার জন্য। কিন্তু এই বিশেষ ব্যক্তির দৃষ্টিটাকে যেন অনুভব করতে পারলাম আমি। নিরাসক্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে একবার তাকাল সে, একই সাথে একটা তীর জুড়ল ধনুকে। তার পরেই হঠাৎ ঝাঁকি খেয়ে দ্বিতীয়বার আমার দিকে ঘুরে গেল তার দৃষ্টি। আমাকে চিনতে পেরেছে সে। আর কোনো সন্দেহ রইল না আমার মনে। আমার প্রতি এত তীব্র ঘৃণা কাজ করছিল ওই দৃষ্টিতে, মনে হলো যেন কেউ এক পাত্র ফুটন্ত গরম পানি ছুঁড়ে দিয়েছে আমার মুখে। সেই মুহূর্তেই নিশ্চিতভাবে বুঝে গেলাম আমি, আর কেউ নয়; বরং আমার চিহ্নিত শক্রই রয়েছে ওই রথের ওপর। মিশরের বর্তমান ঘৃণিত ফারাও, নিজেকে মহান এবং অপরাজেয় বলে দাবি করা উটেরিক টুরো।

এবার অবিচল ভঙ্গিতে ডান হাতে ধরা ধনুকটা ওপরে তুলল সে, এক টানে তীরটা নিয়ে এলো তার মুখাবরণের কাছাকাছি। মুখের কাছটায় যেখানে ছোট্ট ফুটো রয়েছে সেই পর্যন্ত তীরের লেজটা টেনে আনল সে। ওদিকে সৈন্যদের ভিড়ের চাপে দেয়ালের সাথে অসহায়ভাবে আটকে রয়েছি আমি, যেন কেউ পেরেক দিয়ে আটকে দিয়েছে। এমনকি মাথাটা নামানোরও সুযোগ নেই আমার। তবে ডান হাতে উটেরিককে ধনুক উঁচু করতে দেখে আমার মনে পড়ল যে সে বাঁহাতি। যার অর্থ হচ্ছে বাম দিকে কিছুটা ঘেঁষে যাবে তার ছোঁড়া তীর। উটেরিকের ডান হাতের আঙুলগুলোর বিশেষ নড়াচড়া চোখে পড়ল আমার, যা দেখে বোঝা যায় যে কখন তীর ছুড়ছে তীরন্দাজ। ঠিক সেই অনুযায়ী মাথা ঘুরিয়ে নিলাম আমি। তীরের গতিপথটা খালি চোখে অনুসরণ করা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে, এত দ্রুত উড়ে এলো সেটা। কিন্তু অনুভব করলাম আমার গালে এক ঝলক বাতাসের ঝাঁপটা দিয়ে কান ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল তীরটা। প্রায় একই সাথে সেটাকে আমার মাথার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের খুঁটির সাথে তীক্ষ্ণ শব্দে ধাক্কা খেতে শুনলাম। সংঘর্ষের ফলে ফেটে কয়েক টুকরো হয়ে গেল তীরটা। প্রায় সাথে সাথেই আমাকে চেপে ধরে রাখা ভিড়ের চাপ কমে গেল হঠাৎ। ধপ করে বসে পড়লাম আমি।

সাথে সাথেই উঠে দাঁড়ালাম না আমি, তবে সেটা উটেরিকের দ্বিতীয় তীরের ভয়ে নয়। কান থেকে রক্ত পড়তে শুরু করেছে, সেটা থামাতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল আমার। শেষ পর্যন্ত যখন উঠে দাঁড়াতে পারলাম তখন শত্রুদের রথগুলো বের হয়ে গেছে প্রধান ফটক দিয়ে। এই মুহূর্তে নদীর পাশের সমতল জমির ওপর দিয়ে পশ্চিম দিক লক্ষ্য করে ছুটছে তারা। তাদের পেছনে ধাওয়া করেছে হুরোতাসের কয়েক শ সৈন্য। তবে পদাতিক সৈন্য তারা, এবং খুব দ্রুত তাদের তীরেরও আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে রথগুলো। অনেকে ইতোমধ্যে রথের পিছু নেওয়ার চেষ্টা ছেড়ে দুর্গের দিকে ফিরে আসতে শুরু করেছে। আগামীকাল সকালের মধ্যেই উটেরিক এবং তার সঙ্গীরা কমপক্ষে বিশ লিগ দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলবে। কিন্তু যাবে কোন দিকে তারা? আমার মনে হলো, উত্তরটা আমি জানি।

*

তাহলে এবার কোথায় যাবে উটেরিক? আবু নাসকোস দুর্গের সম্মেলন কক্ষে বসেছে আলোচনা সভা। সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছে হুরোতাস। উপস্থিতদের মধ্যেই অনেকের দৃষ্টি ঘুরে গেল আমার দিকে। তাই এবার আমার দিকে ও তাকাল সে। বলো, মহামান্য টাইটা। এ ব্যাপারে তোমার মতামত কী?

বাকি সবার মতোই হুরোতাস দারুণ দিলখোলা মেজাজে আছে এখন, যা সাধারণত তার মাঝে খুব কমই দেখা যায়। ঘণ্টাখানেক আগেই দুর্গের কোষাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে। তার সামনেই প্রথমবারের মতো খোলা হয়েছে কোষাগারের দরজা। রাজকীয় হিসাবরক্ষক এবং অন্য কেরানিরা এখনো প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সব সম্পদের হিসাব করবে। তার মাঝ থেকে নির্ধারিত পরিমাণ বণ্টন করা হবে সেই সব সাহসী সৈনিকের মাঝে, যারা মিশরকে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত করেছে এবং প্রতিদানে কী পাবে তার কথা একবারও ভাবেনি।

উটেরিকের জন্ম হয়েছে লুক্সরে, হুরোতাসের প্রশ্নের জবাবে বললাম আমি। সমস্ত জীবন সেখানেই কাটিয়েছে সে। এই মিশরের বাইরে যায়নি কখনো, এবং কখনো যাবে বলেও আমার মনে হয় না। আমি নিশ্চিত, উটেরিক বিশ্বাস করে যে লুক্সর শহর এখনো তার রেখে যাওয়া প্রতিনিধিদের হাতেই রয়েছে। বাচ্চা ছেলে যেমন আগুনে হাত পুড়িয়ে ফেলে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যায়, একইভাবে উটেরিকও এখন রওনা দেবে লুক্সরের পথে।

অল্প কথায় সব পরিষ্কার করে বলে দিয়েছ তুমি, টাইটা, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল হুরোতাস। তাহলে এবার বলো, আমাদের হয়ে তাকে ধরে আনতে পারবে তুমি?

আমার প্রথম ইচ্ছা সেটাই, হুয়োতাসকে আশ্বস্ত করলাম আমি। আনুগত্য, সম্মান এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছে তো আছেই আমার, তা ছাড়া আরো একটা কারণে তার পিছু ধাওয়া করতে চাই আমি। আর সেটা হলো মিশরের ধনসম্পদের অনেক বড় একটা অংশ এখনো অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছে উটেরিক। আজ এই দুর্গে আমরা যা উদ্ধার করেছি তা সেই সম্পদের তুলনায় কিছুই নয়। এবং আমি চাই সেই সম্পদকে পুনরুদ্ধার করতে। যদি তোমার অনুমতি থাকে তাহলে এই মুহূর্তে লুক্সরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে চাই আমি।

মাথা ঝাঁকাল হুরোতাস। অনুমতি দেওয়া হলো তোমাকে।

রাজপরিবারের কাউকে সঙ্গী হিসেবে দরকার হবে আমার, যাতে আমার অভিযান আলাদা গুরুত্ব এবং সম্মান পায়। তাই এই কাজে সঙ্গী হিসেবে ফারাও রামেসিসই আমার প্রথম পছন্দ। কিন্তু এই মুহূর্তে এখানেই তার প্রয়োজন বেশি বলে মনে হচ্ছে আমার।

তাহলে হয় রাজা হুরোতাস, অথবা রানি রেহুতির মাঝ থেকে কাউকে যেতে হবে টাইটার সাথে, আমাকে সমর্থন জানিয়ে বলল রামেসিস। কিন্তু এবার আপত্তি জানাল অন্য কয়েকটা কণ্ঠস্বর।

তুমি আমাদের আপন মেয়ের জামাই, এবং তোমার মাথায় মুকুট পরানোর অনুষ্ঠান পালন করা হবে এখন। এই অবস্থায় অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে টাইটার সাথে যেতে পারি না আমরা, প্রতিবাদ জানাল হুরোতাস। তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে চাপ দিল তেহুতি, স্বামী এবং পরিবারের সিদ্ধান্তের সাথে নিজের একাত্মতা ঘোষণা করল যেন।

এতক্ষণ ধরে কেবল সেরেনাই চুপ করে ছিল। কিন্তু এবার উঠে দাঁড়াল ও, আমার পাশে এসে দাঁড়াল। চেহারায় এমন একটা বিষণ্ণ ভাব ফুটে আছে, যা তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য আর প্রাণোচ্ছল স্বভাবের সাথে একেবারেই যায় না। ফলে সাথে সাথে নীরবতা নেমে এলো পুরো কক্ষের মাঝে। সেরেনা কী বলে শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল সবাই।

আমি যাব টাইটার সাথে, দৃঢ় গুলায় ঘোষণা করল ও।

না! আমি নিষেধ করছি তোমাকে, লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাল হুরোতাস।

প্রিয় বাবা, যে কাজ আমার অবশ্য কর্তব্য তা করতে কেন বাধা দিচ্ছ। আমাকে? মৃদু গলায় প্রশ্ন করল সেরেনা।

কারণ তুমি একজন মেয়েমানুষ। বোঝা গেল কথাগুলো হুরোতাসের মাথায় আসার সাথে সাথেই বলে ফেলেছে সে এবং খুব একটা চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পায়নি।

হ্যাঁ, আমি সেই মেয়েমানুষ, যে ল্যাকোনিয়ান শূকরকে হত্যা করেছে। আমি সেই মেয়ে, যে কুখ্যাত ডুগের মাথা ধুলোয় লুটিয়েছে। বলতে বলতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল সেরেনা। আমি সেই মেয়ে, যে জেনারেল পানমাসির পেটের ভেতর তীর ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আমি মিশরের রানি, এবং এই দেশকে স্বৈরাচারের হাত থেকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। আমি টাইটার সাথে যাচ্ছি বাবা। যদি পারো তো আমাকে ক্ষমা করে দিও। এই বলে রানি তেহুতির দিকে তাকাল সেরেনা। প্রশ্ন করল মা?

এই মুহূর্তে তোমাকে নিয়ে যে অহংকার বোধ করছি আমি তা আর কখনো হয়নি, প্রিয় কন্যা আমার, আবেগে কেঁপে উঠল তেহুতির গলা। এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল সে। গর্বের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে। কয়েক মুহূর্ত পর পিছিয়ে গেল সে, তারপর কোমর থেকে তোয়ারটা খুলে দুই হাতে ধরে এগিয়ে দিল সেরেনার দিকে। আশা করব, কখনো ক্রোধের বশবর্তী হয়ে এই তলোয়ার ব্যবহার করবে না তুমি। কিন্তু যদি কখনো ব্যবহার করো, তখন যেন গভীরে আঘাত করতে ভুলো না, প্রিয় কন্যা। নীল তলোয়ারটা সেরেনার কোমরে ঝুলিয়ে দিল সে। বাঁটের সাথে লাগানো বিশাল চুনি পাথরটা যেন ঝলসে উঠল আগুনের মতো।

এবার মাকে রেখে রামেসিসের দিকে ঘুরে গেল সেরেনার দৃষ্টি। স্বামী? একই সুরে প্রশ্ন করল সে। নরম হয়ে এলো রামেসিসের চেহারা।

এখন শুধু নামে নয়, কাজেও নিজেকে রানি হিসেবে প্রমাণ করেছ তুমি, সেরেনাকে উদ্দেশ্য করে বলল ও। আমি যদি তোমার সাথে যেতে না পারি তাহলে যাকে তোমার সঙ্গী হিসেবে দেখতে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব সে হচ্ছে টাইটা। তোমাদের দুজনের প্রতি আমার শুভেচ্ছা থাকবে সব সময়!

এবার ওর বাবার দিকে তাকাল সেরেনা। তোমার অনুমতি চাইছি আমি, প্রিয় বাবা।

আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুই দিকে দুই হাত ছড়িয়ে দিল হুরোতাস; একই সাথে বিষণ্ণ কিন্তু গর্বের হাসি ফুটেছে চেহারায়। অনুমতি দিলাম তোমাকে, প্রিয় কন্যা আমার।

*

আনন্দের সাথেই আমাদেরকে সৈন্যদের মাঝ থেকে এক শ দক্ষ সৈনিক এবং তাদের জন্য চল্লিশটা রথ আর পর্যাপ্ত ঘোড়া বেছে নেওয়ার সুযোগ দিল হুরোতাস। সেইসাথে বাতুর ও নাসলা এবং আরো ছয়জন যোদ্ধাকে সঙ্গে নিলাম আমি, এরা সবাই উটেরিককে চিনত এবং আরো একবার দেখলে সাথে সাথে চিনতে পারবে। তারপর সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কীভাবে লুক্সর পৌঁছানো যায় তাই নিয়ে আলোচনা করতে বসলাম সেরেনার সাথে। বছরের এই সময়ে নদীর এই অংশে স্রোতের গতি প্রায় একজন মানুষের দ্রুত পায়ে হাঁটার গতির সমান। যার অর্থ হচ্ছে, বিপরীত দিকে চলমান যেকোনো নৌকার গতিকে অর্ধেকে নামিয়ে আনবে এই স্রোত। কিন্তু দিনে ও রাতে যেকোনো সময়েই চলতে পারবে নৌকা। অন্যদিকে অশ্বারোহীরা কেবল নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পথ চলতে পারে, তারপর বিশ্রাম নিতেই হয় তাদের। তাই সেরেনা এবং আমি আমাদের সৈন্য ও ঘোড়াগুলোকে পাঁচটা বড় বড় নৌকায় তুলে নিলাম। আবু নাসকোসের সামনেই নদীর বুকে অপেক্ষা করছিল সেগুলো। দাঁড় বাওয়ার জন্য লোকের অভাব হলো না, এবং নির্দিষ্ট দলে ভাগ করে পালা করে দাঁড়া টানানো হলো তাদের দিয়ে। স্রোতের বুক চিরে নদীর উজানে এগিয়ে চললাম আমরা, লক্ষ্য লুক্সর শহর।

দিনে এবং রাতে উভয় সময়েই উত্তর থেকে বইতে লাগল হাওয়া। সেই হাওয়া লেগে ফুলে উঠল পাল, স্রোতের বিপরীতে চলা আরো সহজ হয়ে উঠল। তবু মনে হতে লাগল দিন এবং ঘণ্টাগুলো যেন অসহ্য রকমের দীর্ঘ হয়ে উঠেছে আর কাটতেই চাইছে না। শেষ পর্যন্ত একদিন ভোরে নৌকার মাস্তুলের ওপর উঠতেই নদীর তীরে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আনন্দের বাগানের সুউচ্চ চুড়া চোখে পড়ল আমার। এক ঘণ্টা পর লুক্সর শহরের প্রধান বন্দরে ভিড়ল আমাদের ছোট্ট বহর। ছয়জন লোককে সাথে নিয়ে তীরে নামলাম আমি এবং সেরেনা। সবাই, বিশেষ করে সেরেনা; ছদ্মবেশ পরে নিয়েছে আগেই। আমরা এখনো জানি না যে আমাদের আগেই শহরে পৌঁছে গেছে কি না উটেরিক। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে অনেক রকম বিপদই ঘটতে পারে আমাদের ভাগ্যে। এমনও হতে পারে যে, আবারও শহর দখল করে নিয়েছে সে। যদিও তার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

তবে শহরের প্রধান দরজায় পৌঁছানোর পর দেখা গেল ইতোমধ্যে খুলে রাখা হয়েছে সেটা। মনে হলো সব কিছু ঠিকঠাকই আছে। এমনকি প্রহরীদের মাঝ থেকে তিন-চারজনকে আমি চিনতেও পারলাম। সবাই ওয়েনেগের লোক তারা। সাথে সাথেই পরিষ্কার হয়ে গেল যে, উটেরিক এবং তার সঙ্গীরা এখনো উত্তর থেকে এখানে এসে পৌঁছায়নি। তবে এটা বুঝতে পারছি যে, আর খুব বেশি দূরেও নেই তারা।

আমাকে দেখে দারুণ খুশি হয়ে উঠল শহরের প্রহরীরা। সেরেনাকে যখন বললাম ছদ্মবেশ সরিয়ে নিজের চেহারা দেখাতে তখন ওকেও সাথে সাথেই চিনতে পারল তারা। সাথে সাথেই বিনয়ে গলে পড়তে শুরু করল সবাই, পারলে সেরেনার পা ধরে বসে থাকে আর কি। শেষ পর্যন্ত তাদের মাঝে সংবিত ফিরিয়ে আনার জন্য কয়েকজনকে কষে লাথি কষলাম আমি, তারপর কাজ হলো। এবার তাদের নির্দেশ দিলাম সোনালি প্রাসাদে অবস্থানরত ওয়েনেগের কাছে নিয়ে যেতে আমাদের। ফারাওইনের এই হঠাৎ আগমনে ওয়েনেগও দারুণ খুশি হয়ে উঠল। তবে বেশিক্ষণ তাকে খুশি হয়ে থাকার সুযোগ দিলাম না আমি, কড়া গলায় মনে করিয়ে দিলাম যে উটেরিক এবং তার রথ বাহিনী আমাদের কাছ থেকে খুব বেশি দূরে নেই।

চার ঘণ্টা পর যখন উটেরিকের রথ বাহিনী শেষ পর্যন্ত লুক্সরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, দেখল যে বন্ধ করে রাখা হয়েছে দরজা। শহরের প্রাচীরের ওপর দেখা যাচ্ছে না কাউকে। পুরো শহরকে যেন চাদরের মতো ঘিরে রেখেছে অখণ্ড নীরবতা। খুব সাবধানে প্রধান দরজা থেকে দূরে রথ নিয়ে দাঁড়াল তারা, যেখানে তীরের পাল্লা পৌঁছবে না। নিঃসন্দেহে আবু নাসকোস থেকে এ পর্যন্ত পূর্ণ গতিতে ঘোড়াগুলোকে ছুটিয়ে এনেছে তারা। রথের সাথে জোড়া ঘোড়াগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনো বেঁচে আছে সেগুলোর শরীর ধূলিমলিন, ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত। আবু নাসকোসের দুর্গ ছেড়ে যখন তারা বের হচ্ছিল তখন তাদের রথের সংখ্যা চল্লিশ বলে শুনেছিলাম আমি। প্রতিটা রথকে টানছিল পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবান পাঁচটা করে ঘোড়া। এখন সেই রথগুলোর সংখ্যা নেমে এসেছে ঊনত্রিশে। বাকি এগারোটা রথ নিশ্চয়ই চাকা হারিয়েছে অথবা শিক ভেঙে অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে সেগুলো পথেই ফেলে রেখে আসতে বাধ্য হয়েছে তারা। বাড়তি যে ঘোড়াগুলো জমা হয়েছে সেগুলোকে রথচালকরা নিজেদের সাথে খেদিয়ে এনেছে। এই কয়েক দিনের মাঝেই ওজন হারিয়েছে ঘোড়াগুলো, স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। তেল চকচকে চামড়ায় এখন ধুলোর পুরু আবরণ। চার-পাঁচটা ঘোড়া খোঁড়াচ্ছে।

শহরের দেয়ালের ভেতর নিজ নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওয়েনেগের লোকেরা। বেশির ভাগই রয়েছে শহরের প্রাচীরের ওপর; কিন্তু তাদের মাথা নামিয়ে রাখতে নির্দেশ দিয়েছি আমি, যাতে নিচ থেকে দেখা না যায়। বাকিরা জড়ো হয়েছে শহরের দরজার এ পাশে। বাইরে থেকে তাদের কাউকে দেখার উপায় নেই; কিন্তু সবাই আমার নির্দেশের অপেক্ষায় উৎকর্ণ হয়ে রয়েছে এই মুহূর্তে।

উটেরিক টুরো নিশ্চয়ই আর যাই হোক প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে বলে আশা করেনি। জেনারেল পানমাসির হাতে শহরটার দায়িত্ব ছেড়ে গিয়েছিল সে। এখন আশা করছিল যে এখানে আসার সাথে সাথে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য দৌড়াতে দৌড়াতে বেরিয়ে আসবে পানমাসি। যখন তার কোনো দেখা পাওয়া গেল না, সাথে সাথে সতর্ক হয়ে উঠল সে। সন্দেহের বীজ তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। এবং ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারলাম, কারণ উটেরিককে খুব ভালো করেই চেনা আছে আমার। বুঝতে পারলাম, দেয়ালের ওপর যারা ছিল তাদের মাথা নিচু করে রাখতে বলে ভুল হয়ে গেছে।

উটেরিককে দেখতে পাচ্ছ? সেরেনাকে প্রশ্ন করলাম আমি। ফটকের ওপর আমার পাশাপাশি শুয়ে আছে সেরেনা। দেয়ালের গায়ে একই ফুটো দিয়ে সামনে চোখ রেখেছি আমরা।

এখনো দেখা যাচ্ছে না, ধুলোর মেঘে ঢেকে আছে সব, জবাব দিল ও। তা ছাড়া এখনো অনেক দূরে রয়েছে ওরা।

বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে উটেরিকের লোকেরা, তার নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছে। শহরের দরজার আরো কাছাকাছি এগিয়ে আসতে চাইছে সবাই। ধীরে ধীরে রুদ্ধশ্বাস একটা অবস্থার দিকে মোড় নিচ্ছে পরিস্থিতি।

আমি দেখলাম, দিনের বেলার প্রচণ্ড গরমের কারণে উটেরিকের রথচালকদের বেশির ভাগই তাদের শিরস্ত্রাণ এবং বর্ম খুলে ফেলেছে। চোখের ওপর হাত রেখে রোদের তীব্রতা থেকে দৃষ্টিকে বাঁচানোর চেষ্টা করলাম আমি, তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলাম দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দলটার দিকে। দেখছি কাউকে চেনা যায় কি না। হঠাৎ করে দলের মধ্য থেকে একজন মাথা থেকে শিরস্ত্রাণটা তুলে ধরল দুই হাতে, সম্ভবত ঘুরিয়ে বসাতে চাইছে। একই মুহূর্তে তার ঘোড়াটা চক্কর খেল একবার। ফলে সূর্যের আলো এসে সরাসরি আঘাত করল তার চেহারায়। সেরেনার বাহু খামচে ধরলাম আমি। ওই যে সে!

এভাবে না বললেও চলত, ব্যথা লাগছে আমার, প্রতিবাদ জানাল সেরেনা। আমার গায়ে যে প্রচণ্ড শক্তি সেটা মাঝে মাঝে আমি নিজেই ভুলে যাই। তবে ওটা যে উটেরিক এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। ভুল দেখেনি আমার চোখ, এবং এটাও বুঝতে পারছি যে শহর প্রাচীরের ওপর কোনো লোকজন না দেখে সন্দেহ জেগে উঠেছে তার মনে। আরো একবার পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। ধনুকে তীর জুড়েই উঠে দাঁড়ালাম আমি। জানি যে দূরত্বটা অনেক বেশি হয়ে যায়, এবং উটেরিকও এক জায়গায় স্থির হয়ে নেই। ঘোড়ার মুখ ঘোরাচ্ছে সে, এবং একই সাথে পেটে পা দিয়ে খোঁচা দিয়ে দৌড়ানোর জন্য তাগাদা দিচ্ছে। তার পরও তীর ছুড়লাম আমি। আমার চোখের সামনেই আকাশে উঠল তীরটা, তারপর নামতে শুরু করল। মনে হলো যেন কোনোভাবেই ভুল হবে না, উটেরিককে খুন করতে না পারলেও অন্তত আহত করবে আমার তীর। নিঃশব্দে উল্লাস করে উঠলাম আমি। কিন্তু তার পরই হঠাৎ এক ঝলক বাতাসের ঝাঁপটা এসে লাগল আমার মুখে। দেখলাম বাতাসের মুখে পড়ে বদলে গেল তীরটার গতিপথ, উটেরিকের মাথার ওপর দিয়ে ছুটে গেল সেটা। এত কাছ দিয়ে তীর ছুটে যাওয়ার শব্দ পেয়ে ঝট করে মাথা নিচু করে ফেলল সে, ঘোড়ার গলার সাথে প্রায় শুইয়ে ফেলল নিজেকে। বাকি ঘোড়সওয়াররা তাড়াতাড়ি এসে উটেরিককে ঘিরে ফেলল চারপাশ থেকে, তারপর দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে পুব দিকে সরে যেতে শুরু করল তারা। ওদিকেই রয়েছে বিশাল এক উপত্যকা, এবং লোহিত সাগর।

*

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের পেছনে রেখে যাওয়া ধুলোর মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। তারপর গলা চড়িয়ে ওয়েনেগকে ডেকে বললাম, উটেরিককে অনুসরণ করতে হবে। এক শ ঘোড়সওয়ার জোগাড় করতে কতক্ষণ লাগবে তোমার?

সাথে সাথে কোনো জবাব দিল না ওয়েনেগ। তার বদলে শোয়া অবস্থান থেকে উঠে দাঁড়াল সে, তারপর প্রাচীরের ওপর দিয়ে এক দৌড়ে এগিয়ে এলো আমার কাছে। চিন্তিত হয়ে আছে তার চেহারা। সত্যিই আপনি উটেরিকের পেছনে ধাওয়া করতে চাইছেন?

হ্যাঁ, সত্যিই চাইছি। নিজের কণ্ঠস্বরে অসহিষ্ণুতার ছোঁয়া টের পেলাম আমি। বোকার মতো প্রশ্ন শুনতে আমার একেবারেই ভালো লাগে না।

কিন্তু সরাসরি শুশুকান এলাকার দিকে যাচ্ছে উটেরিক। মাত্র এক শ জন লোক নিয়ে তার পিছু ধাওয়া করা ঠিক হবে না। এই কাজ করতে হলে কমপক্ষে একটা সেনাবাহিনী দরকার হবে আপনার।

শুশুকান? এবার গলা কিছুটা নামিয়ে আনলাম আমি। এর আগে কখনো এই নাম শুনিনি আমি। কীসের বা কার কথা বলছ তুমি?

ক্ষমা চাইছি প্রভু টাইটা। আরো পরিষ্কার করে বলার দরকার ছিল আমার। কয়েক সপ্তাহ আগে, এমনকি আমি নিজেও ওদের সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ওরা হচ্ছে নির্বাসিত চোর-ডাকাত এবং অপরাধীদের একটা দল। সভ্যতা এবং সমাজের বাইরে বসবাস করে ওরা, কোনো নিয়ম-কানুনের ধার ধরে না। দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিল সে, আমাকে শান্ত করতে চাইছে। আমার মনে হয় তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের একবার আলোচনায় বসা উচিত।

উটেরিক যদি সত্যিই ওই এলাকার দিকে গিয়ে থাকে এবং তোমার কথার সাথে শুশুকানদের চরিত্রের যদি কোনো মিল থাকে তাহলে বলতে হবে যে ভালোই হয়েছে। আমাদের বদলে শুশুকানরাই তার ব্যবস্থা করতে পারবে। তাতে অনেক ঝামেলা থেকেও বেঁচে যাব আমরা, বলে মৃদু হাসলাম আমি। কিন্তু আবারও মাথা নাড়ল ওয়েনেগ।

আমি শুনেছি, উটেরিক নিজেই হচ্ছে ওই শুশুকানদের নেতা এবং ওদের ওই জাতির প্রতিষ্ঠাতা। লোকে যে উটেরিককে বহুরূপী বলে, তা এমনিতে বলে না।

এতক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথা শুনছিল সেরেনা। এবার মুখ খুলল ও। একটা জিনিস আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। উটেরিক কেন ওদের সাথে মিত্ৰতা করতে চাইবে? মিশরের ফারাও হিসেবে নিশ্চয়ই সবার ওপর সর্বময় অধিকার এবং কর্তৃত্ব আছে তার?

মাথা নাড়লাম আমি। সেই কর্তৃত্ব কেবল সভ্য নাগরিকদের ওপরে। কিন্তু এমনকি একজন ফারাওয়ের পক্ষেও অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। উটেরিক যদি একই সাথে ফারাও এবং শুশুকানদের নেতা হিসেবে শাসন চালাতে পারে তাহলে বুঝতে হবে যে ভালো এবং খারাপ উভয় দিকই তার নিয়ন্ত্রণে আছে।

কী চালাক শয়তানটা! বলে উঠল সেরেনা। কিন্তু একই সাথে শিকারের গন্ধ পাওয়া সিংহীর মতো ঝলসে উঠল ওর চোখ জোড়া। কিন্তু এখন তার জন্য ভালো অংশে ফেরার পথ বন্ধ করে দিয়েছ তুমি, টাইটা। লুক্সরসহ এই মিশরের অন্য যেকোনো শহরে ঢোকার রাস্তা এখন তার জন্য বন্ধ। এখন শুধু শুশুকানদের সাথে ছাড়া আর কোথাও আশ্রয় নিতে পারবে না সে, এবং ওটাই তার উপযুক্ত স্থান।

এই অপরাধীদের আস্তানা এবং এলাকা সম্পর্কে যা যা জানার আছে সব জেনে নিতে হবে আমাদের, সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। ওদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য গুপ্তচর পাঠাব আমরা। কে ওখানে শাসন করে, নিয়ম-কানুন কে বা কারা তৈরি করে ইত্যাদি ইত্যাদি- অবশ্য উটেরিক ওখানে যে পরিবেশ তৈরি করেছে তাতে আইন-কানুনের বালাই থাকলেই বরং অবাক হব আমি।

ইতোমধ্যে খোঁজ নিতে শুরু করেছি আমি, আমাকে আশ্বস্ত করল ওয়েনেগ। সুযোগ পাইনি, না হলে আরো আগেই আপনাকে জানাতাম। আপনি এখানে এসে পৌঁছানোর পরপরই উটেরিক এসে হাজির হলো, তাই আর বলা হয়নি। শুশুকানকদের নেতা হিসেবে যে লোকটার নাম শোনা যায় তার আসল নাম কেউ জানে না। তবে নিজেকে পাগলা কুকুর হিসেবে পরিচয় দেয় সে।

একেবারে সঠিক নাম, সন্দেহ নেই, মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম আমি।

আমি জানতে পেরেছি লোকটা নাকি আসলেই অত্যন্ত শয়তান। সোজা কথায় শুশুকানদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তার চাইতে উপযুক্ত লোক কেউ নেই।

এমনও হতে পারে, এই পাগলা কুকুর হচ্ছে উটেরিকেরই অনেকগুলো ছদ্মনামের একটা, বললাম আমি। তারপর প্রশ্ন করলাম, উটেরিকের হাতে কতজন শুশুকান আছে সে সম্পর্কে কিছু জানতে পেরেছ?

তা ঠিক জানা যায়নি। তবে কেউ কেউ বলে লাখখানেকের কম হবে না।

কথাটা শুনে ঢোক গিলোম আমি। উটেরিকের হাতে যদি এর অর্ধেক লোকও থেকে থাকে তাহলে ধরতে হবে যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীটা রয়েছে তার দখলে। আর কী কী জানতে পেরেছ? ওয়েনেগকে প্রশ্ন করলাম এবার।

লোকমুখে জানা গেছে, লোহিত সাগরের তীরে ঘাদাকা নামক জায়গাতে বিশাল এক দুর্গ গড়ে তুলেছে সে। সেখান থেকেই নাকি পুরো পৃথিবী দখলের অভিযান পরিচালনা করবে উটেরিক।

ওয়েনেগের দিক থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে শুরু করলাম আমি। পুব দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাতাসে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে উটেরিকের রথ বাহিনীর রেখে যাওয়া ধুলোর মেঘ। এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার ফিরে এলাম ওয়েনেগের কাছে।

আমাকে যে কথাগুলো তুমি বললে তার সবই তো শোনা কথা, তাকে বললাম আমি। কাঁধ ঝাঁকাল ওয়েনেগ, অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে দাঁড়াল।

এর চাইতে বেশি কিছু জানতে পারিনি আমি, ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলল সে।

এই তথ্যগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এই মুহূর্তে গুপ্তচর পাঠাতে চাই আমি। এই চরদেরকে অবশ্যই বিশ্বাসী এবং সৎ লোক হতে হবে। আলাদা আলাদাভাবে কাজ করবে তারা, যাতে উটেরিকের লোকদের হাতে কেউ ধরা পড়ে গেলেও বাকিরা সব খবর নিয়ে এখানে ফিরে আসার সুযোগ পায়, ওয়েনেগকে বললাম আমি। মাথা ঝাঁকাল সে।

আমাদের হাতে যে তথ্যগুলো আছে সেগুলো আসলেই যাচাই করে নেওয়া দরকার, প্রভু টাইটা।

আবু নাসকোস থেকে অত্যন্ত দক্ষ এবং বিশ্বাসী দুজন লোককে নিয়ে এসেছি। তাদের নাম বাতুর এবং নাসলা, আপন দুই ভাই। আমি চাই বিশেষভাবে ওদেরকেই এ কাজের জন্য পাঠাও তুমি।

তাই হবে, প্রভু টাইটা। তবে একটা সমস্যা আছে। ঘাদাকা পর্যন্ত গিয়ে সব খবর সংগ্রহ করে আবার এখান পর্যন্ত ফিরে আসতে কয়েক দিন সময় লেগে যাবে ওদের।

তাহলে আর দেরি কোরো না, এখনই ওদেরকে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো, জরুরি গলায় বললাম আমি। তারপর তাকালাম সেরেনার দিকে। মহামান্য রানি, উটেরিক আমাদের বিরুদ্ধে কত ব্যাপক আকারে আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে সে ব্যাপারে তো শুনলে তুমি। এখন তোমার সাহায্য চাই আমার। ঘাদাকায় উটেরিকের আস্তানায় হামলা করার আগে আমাদের হাতে যত সৈন্য এবং রথ আছে তাদের সবাইকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখতে হবে আমাদের, এবং এই কাজে আমাকে সাহায্য করবে তুমি।

অবশ্যই। এটা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না, টাইটা।

ধন্যবাদ, সেরেনা। এই বলে ওর হাত ধরে প্রাচীরের ওপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম আমি। আমার ধারণা, উটেরিকের সৈন্যসংখ্যার সম্পর্কে ওয়েনেগ যা শুনেছে তা স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। তা ছাড়া লোহিত সাগরের তীরে এক বিশাল দুর্গ গড়ে তুলল সে অথচ আমরা কিছুই জানতে পারলাম না- এটাও একেবারেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে আমার কাছে। এমন একটা দুর্গ তৈরি করতে কয়েক দশক সময় লেগে যাবে, হাজার হাজার শ্রমিকের শ্রম দেওয়ার প্রয়োজন হবে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এমন একটা দুর্গের অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকত তাহলে অনেক বছর আগেই তার কথা আমার কানে আসত। এমনিতেও ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে আমার খুব বেশি সময় লাগবে না। আর এর মাঝেই উটেরিকের মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমাদের সাধ্য অনুযায়ী সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী সাজিয়ে ফেলব আমরা।

 *

হুরোতাস এবং রামেসিসের সাথে সংঘর্ষের শুরুতে লুক্সর থেকে সরে গিয়েছিল উটেরিক। তার উদ্দেশ্য ছিল নীলনদ ধরে সামনে এগিয়ে গিয়ে আবু নাসকোসে চলে যাওয়া এবং সেখানকার দুর্গ দখলে রাখা। যাওয়ার সময় লুক্সর থেকে বেশির ভাগ রথ এবং তীরন্দাজকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সে। শুধু তার অবর্তমানে শহরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য জেনারেল পানমাসির জন্য যে সামরিক শক্তি দরকার ছিল তার বেশি কিছুই রেখে যায়নি। তাই আবু নাসকোস ছেড়ে আসার সময় রাজা হুরোতাসের কাছ থেকে যে রথগুলো আমরা পেয়েছিলাম সেগুলোর সাথে লুক্সরের রথগুলো যোগ করে সব মিলিয়ে আমাদের রথসংখ্যা দাঁড়াল এক শ এগারোতে।

লোহিত সাগরের তীরে ঘাদাকায় অবস্থিত উটেরিকের তথাকথিত বিশাল এবং দুর্ভেদ্য দুর্গ এবং তার লাখখানেক সৈন্যকে আক্রমণ করার জন্য এ রথগুলোই এখন আমাদের একমাত্র সম্বল। সেই রাতে লুক্সর শহরের প্রাচীরের ওপর রানি সেরেনা ক্লিওপেট্রার সাথে বসে ছিলাম আমি। একপাশে আগুন জ্বলছে, তাতে শক্ত পনির গলিয়ে নরম করে খাচ্ছিলাম দুজন। একই আগুনের তাপে গরম করে নিয়েছি এক বোতল লাল মদ, মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছি সেটাতে।

তার মানে, তোমার মনে হয় আমার মাথায় কিছুটা ছিট আছে? সেরেনাকে প্রশ্ন করলাম আমি।

আমি তো সেটা বলিনি, টাটা, দ্রুত মাথা নাড়ল সেরেনা। আমি বলেছি, আমার ধারণা তুমি একজন বদ্ধ উন্মাদ!

শুধু আমার সিদ্ধান্ত বদল করেছি বলেই এই কথা বলছ তুমি?

না, কথাটা আমি বলছি কারণ একমাত্র কোনো উন্মাদের পক্ষেই মাত্র শ খানেক রথ নিয়ে একটা দুর্ভেদ্য দুর্গের ওপর হামলা চালানোর কথা চিন্তা করা। সম্ভব। বিশেষ করে যখন তার কাছে অবরোধের জন্য প্রয়োজনীয় কিছুই নেই। তোমাকে যে আমার সাথে আসতেই হবে এমন কিন্তু নয়, বললাম আমি।

তুমি যেতে না চাইলে জোর করব না আমি। মরে গেলেও তোমাকে একলা ছেড়ে দেব না আমি, হেসে উঠল সেরেনা। বলা তো যায় না, তুমি সফলও হতে পারো। আর তাহলে আমি জীবনেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।

পরদিন সকালে অন্ধকার থাকতে থাকতেই লুক্সর ছেড়ে রওনা দিলাম আমরা। বিশাল উপত্যকার মুখে পৌঁছতে তিনটে দিন প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাতে হলো আমাদের। এই উপত্যকারই অন্য পাশে শুরু হয়েছে লোহিত সাগর, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলের দিকে এগোতে গেলে যাকে পেরিয়ে যেতে হয়। সাগরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য প্রাণ ভরে দেখলাম আমরা। এই সাগরের রং আসলে কিছুটা ফ্যাকাশে নীল। পুব পাশের সৈকতগুলো কুচকুচে কালো রঙের, কেন কে জানে। হয়তো এ কারণেই লোকে এই সাগরের নাম দিয়েছে লোহিত সাগর। সাধারণ মানুষের বুদ্ধি যে কতটা নিচু স্তরের হতে পারে তা নিয়ে চিন্তা করলে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যেতে হয়।

ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দিলাম আমরা, সাথে নিয়ে আসা থলে থেকে পানি খাওয়ালাম। তারপর উপত্যকার উঁচু ঢাল বেয়ে সৈকতের দিকে নামতে শুরু করলাম। তবে অর্ধেক পথও এগোইনি, এই সময় হঠাৎ দূরে দুই অশ্বারোহীকে দেখতে পেলাম আমরা, ঢাল বেয়ে আমাদের দিকেই উঠে আসছে। আমাদের কাছ থেকে মাইলখানেক দূরে থাকতেই তাদের চিনতে পারলাম আমি আর সেরেনা। দেবত্বের অধিকারী হওয়ার কারণে এত দূর থেকেই ওদের চিনতে পারল সেরেনা, আর আমি পারলাম আমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তির কারণে।

দুজনই আমাদের ঘোড়ার পেটে খোঁচা দিয়ে জোর কদমে এগোনোর নির্দেশ দিলাম। কাছাকাছি আসতে চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, এই যে, বাতুর! কী খবর, নাসলা?

আমি বুঝে গেছি প্রভু, আপনার সাথে তর্ক করে কোনো লাভ নেই, আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল নাসলা। তার ছোট ভাইও তার কথায় সম্মতি জানাল এবার কখনো ভুল হয় না আপনার, এতে কি একটু হলেও একঘেয়েমিতে ভোগেন না আপনি?

তার মানে কোনো দুর্গের অস্তিত্ব নেই এখানে? আরো একবার নিজের অনুমান সঠিক বলে প্রমাণিত হওয়ায় উল্লসিত বোধ করলাম আমি।

তা নেই, জবাব দিল বাতুর। তবে তার চাইতে শত গুণে খারাপ একটা জিনিস আছে। জায়গাটার বেশি কাছাকাছি যাওয়ার সাহস পাইনি আমরা, আধ লিগ দূরত্ব থেকেই ফিরে এসেছি আবার। আমার মনে হয় আপনারাও একই কাজ করবেন। এমনকি উটেরিকের লোকরাও তাকে ফেলে পালিয়ে গেছে। এই পথ দিয়েই যাচ্ছিল তারা, এবং আমাদের সাথে তাদের দেখা হয়েছে। ওরা ভেবেছিল আমরা দুজন এখনো উটেরিকের পক্ষে রয়েছি, তাই কোনো কিছু লুকোয়নি আমাদের কাছে। ফারাও রামেসিসের কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য লুক্সর ফিরে যাচ্ছে ওরা।

আমি আর ধৈর্য ধরতে পারছি না, বাতুর! কড়া গলায় বললাম আমি। কোনো দুর্গ যদি নাই থাকে তাহলে উটেরিক কোথায় আশ্রয় নিয়েছে? বলো?

কুষ্ঠরোগীদের মাঝে আশ্রয় নিয়েছে সে, প্রভু। ঘোড়ার পিঠের ওপর ঘুরে যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে নির্দেশ করল বাতুর। ওই যে, ওই দিকে। ছোট্ট একটা গ্রামের নাম হচ্ছে ঘাদাকা। একাই আছে উটেরিক, তার সঙ্গী বলতে কেবল কয়েক শ কুষ্ঠরোগী। উটেরিকের সঙ্গীরা কেউ তার সাথে থাকতে রাজি হয়নি। সবাই ধরে নিয়েছে যে পাগল হয়ে গেছে সে। অবশ্য আমি ওদের মতামতে রাজি হতে পারিনি। আমার ধারণা, জন্মের পর থেকেই পাগল হয়ে ছিল উটেরিক। নতুন করে আর কি পাগল হবে? কথাগুলো বলার সময় হাসির কোনো চিহ্ন ফুটল না বাতুরের চেহারায়।

মনে হলো যেন বজ্রপাত হলো আমার মাথায়। এমন ঘটনা খুব সম্ভব প্রথমবার ঘটল আমার জীবনে। আর একটা কথাও না বলে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম আমি, তারপর ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলাম। একটা পাথর খুঁজে বের করে বসলাম তার ওপরে, তারপর গম্ভীর চোখে তাকিয়ে রইলাম ঘাদাকা নামের দুরের ওই ছোট্ট গ্রামটার দিকে। গ্রাম বলতে কিছু এক কামরার মাটির কুঁড়েঘরের সমষ্টি কেবল, খুব বেশি হলে পঞ্চাশ কি ষাটটা হবে। এক টুকরো অর্ধচন্দ্রাকৃতি সৈকতের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে সেগুলো। কুঁড়েগুলোর কাছে কিছু মানুষের আকৃতিকেও চিনতে পারলাম আমি, এক দল নারিকেল গাছের নিচে বসে আছে জড়োসড়ো হয়ে। পুরুষ আর মহিলা আলাদা করে চেনার উপায় নেই, সবাই নিজেদের মাথা এবং মুখ কাপড় দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে রেখেছে। কোনো নড়াচড়া নেই কারো মাঝে, যেন মারা গেছে সবাই।

ভয় পেয়েছি আমি। জীবনে প্রথমবারের মতো আমি বুঝতে পারছি মৃত্যুভয় জেগেছে আমার মধ্যে। আমার সামনে ওই এক টুকরো সৈকতের মাঝে নীরব নিঃশব্দ এক মৃত্যুর মহড়া চলছে, সেই মৃত্যুর ভয় পাচ্ছি আমি। আমি জানি যে দেবত্বের চিহ্ন আছে আমার মধ্যে, অন্য সব সাধারণ মানুষের চাইতে আমি আলাদা। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি না যে কেবল ওই জ্ঞানটুকুর ওপর ভরসা করে ওই কুষ্ঠরোগীদের গ্রামে আমার ঢোকা ঠিক হবে কি না।

হঠাৎ করে মৃদু সুগন্ধ ভেসে এলো আমার নাকে। না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম আমার পাশে এসে বসেছে সেরেনা। আমার হাতের ওপর ওর কোমল স্পর্শ পেলাম আমি।

তোমার আর আমার তো কোনো ভয় নেই, মৃদু স্বরে বলল সেরেনা। ঘুরে বসে ওর চোখে চোখ রাখলাম আমি। সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা ও জানে। আমাদের মাঝে দেবত্বের চিহ্ন সম্পর্কে ওর জানা আছে, যদিও ওকে এটা না জানানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি আমি। সবই জানা আছে ওর, এবং হয়তো সে কারণেই আরো একবার বিশ্বাস ফিরে পেলাম আমি।

আর কিছুর দরকার হলো না। সেরেনার হাত ধরে ওকে দাঁড় করলাম আমি। প্রশ্ন করলাম উটেরিকের শাস্তির ভার দেবতাদের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত হতে পারছ না তুমি? মাথা নাড়ল ও।

এতে যে আমি সন্তুষ্ট হতে পারি না, তা তুমি জানো। উটেরিকের কাছে, সেইসাথে নিজের কাছে শপথ করেছি আমি। ঠিক আছে।

ওই গ্রামে যাব আমরা দুজন। তোমার শপথকে সত্যি প্রমাণিত করে আসব।

ঘোড়াগুলো যেখানে রেখে গিয়েছিলাম সেখানে ফিরে এলাম আমরা, তারপর সেগুলোতে চড়ে চলে এলাম আমাদের রথগুলোর কাছে। বাকিদের সাথে এখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বাতুর আর নাসা।

*

পরদিন ভোরে সেরেনা আর আমি পাঁচটা রথে ভর্তি করে নিলাম নানা রকম খাবার এবং জীবনধারণের অন্যান্য উপকরণ। তারপর সেগুলো নিয়ে এগিয়ে গেলাম সমুদ্রসৈকতের ওপর গড়ে ওঠা ছোট্ট বসতিটার কাছে। এখানে এক জোড়া ফটক রয়েছে যদিও, তবে বহু আগেই ভেঙে গেছে তা। এখন স্রেফ একটা কজার ওপর ঝুলছে সেই দরজার পাল্লা। তার এক পাশে রয়েছে একটা নির্দেশনামা। তাতে লেখা রয়েছে একটা সাবধানবাণী: আর সামনে এগিও না, যদি তুমি দেব-দেবীদের এবং নিজের জীবনকে ভালোবেসে থাকো! এখান থেকে যত সামনে এগোবে দুঃখ আর হতাশা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাবে না তুমি।

এই জায়গায় এসে রথ থামাল রথের চালকরা, তারপর বয়ে আনা জিনিসগুলো দ্রুত নামিয়ে রাখতে শুরু করল এক পাশে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ভয়ে কাঁপছে সবাই। শুকনো খাদ্যশস্য আর মাংসের বস্তাগুলো পথের এক পাশে তাড়াহুড়ো করে সাজিয়ে রাখল তারা। কাজটা করার সময় বারবার ভয়ার্ত চোখে তাকাতে লাগল সৈকতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কুঁড়েঘরগুলোর দিকে। শেষ বস্তাটা নামিয়ে রাখার সাথে সাথেই রথে উঠে বসল তারা, ঘোড়ার পিঠে চাবুক মেরে ফিরতি পথে ছুটতে শুরু করল। সঙ্গীরা অপেক্ষা করছে তাদের জন্য, একই সাথে লুক্সর ফিরে যাবে তারা।

এখন এখানে আমি আর সেরেনা বাদে আর কেউ নেই। ঘোড়া নিয়ে কুষ্ঠরোগীদের গ্রামে প্রবেশ করলাম আমরা। কুঁড়েগুলোর দরজা দিয়ে কেউ কেউ উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল আমাদের। যদিও তাদের দেখার কোনো উপায় নেই, কারণ সবাই নিজেদের চেহারা সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছে কাপড় দিয়ে। কুঁড়েগুলোর দরজায় কোনো পাল্লা নেই, মাটির দেয়ালে নেই কোনো জানালা। সৈকতের সামনে গজিয়ে ওঠা নারিকেল গাছের জটলার দিকে এগিয়ে চললাম আমরা, কেউ আমাদের উদ্দেশ্য করে কিছু বলল না বা এগিয়ে এলো না আমাদের দিকে। বাতাসে যেন ভারী হয়ে ঝুলে আছে নীরবতা আর হতাশার ভার।

ঘোড়া নিয়ে আমার কাছাকাছি সরে এলো সেরেনা। একদম পাশাপাশি আসার পর ফিসফিস করে বলল, উটেরিককে এখানে কীভাবে খুঁজে পাব আমরা? সে যদি এখানকার অন্য বাসিন্দাদের মতো মুখোশ আর কাপড় দিয়ে চেহারা ঢেকে রাখে তাহলে তাকে কীভাবে চিনব? কথাগুলো এত আস্তে বলল ও, শোনার জন্য কান পাততে হলো আমাকে।

ওকে খুঁজে বের করা নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে না, জবাব দিলাম আমি। পৃথিবীতে যে দুজন মানুষকে উটেরিক সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে তাদের নাম হচ্ছে সেরেনা এবং টাইটা। আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে। নিজেদের এদের সামনে প্রকাশ করা। তারপর উটেরিকই আমাদের খুঁজে নেবে। তবে সতর্ক থেকো। যখন সে আসবে তখন কিন্তু মোটেই সময় পাব না। আমরা, কেউ সাবধানও করে দেবে না আমাদের।

নারিকেল গাছের জটলার নিচে সেই মানুষগুলোকেই বসে থাকতে দেখা গেল, যাদের ঢালের ওপর থেকে দেখেছিলাম আমি। মনে হলো যেন একটুও নড়েনি তারা, বা জীবনের কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি তাদের মধ্যে। কেবল আমরা যখন জটলার মধ্য দিয়ে এগোতে শুরু করলাম, দুই-একটা মাথা আমাদের লক্ষ্য করে একটু ঘুরল মাত্র। যেখানে ওদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে মনে হলো সেই জায়গাটায় এসে থামলাম আমরা। দশ থেকে বারোজনের মতো রোগী বসে আছে এখানে।

তোমাদের নেতা কে? গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলাম আমি। এখানকার পরিবেশটাই এমন, না চাইলেও ভারী হয়ে ওঠে গলা। কিন্তু কোনো জবাব পাওয়া গেল না, বরং মনে হলো যেন আগের চাইতে আরো ভারী হয়েছে নীরবতার ভার।

তারপর হঠাৎ করেই ভয়ংকর এক হাসির শব্দ চিরে দিল সেই নীরবতা। মাথা ঢেকে বসে থাকা লোকগুলোর মধ্য থেকে কেউ একজন বলে উঠল, সেটা এখনো ঠিক হয়নি। ওই অবস্থানের জন্য কবরস্থানের দেবতা আনুবিসের সাথে এখনো লড়াই করছে মৃত্যুর দেবী হেকাটি। জবাবটা কার মুখ থেকে বের হলো বুঝতে পারলাম না; কিন্তু আরো কয়েকজন হেসে উঠল কথাগুলো শুনে।

তোমাদের কাছে কোনো খাবার আছে? আবার চেষ্টা করলাম আমি।

তোমার খিদে পেয়েছে? তাহলে গত সপ্তাহে যে নারিকেলের শাসগুলো খেয়েছিলাম সেগুলো একবার খাওয়ার চেষ্টা করে দেখতে পারো। এই কয়দিনে কিছুটা হলেও হজম হয়ে যাওয়ার কথা! মুখোশপরা মানুষগুলোর মধ্য থেকে আরেকজন বলে উঠল। এবার আরো জোরালো হলো হাসির শব্দ, তাতে ব্যঙ্গের পরিমাণও যেন বাড়ল আরো। তাদের হাসির তোড় থামার জন্য অপেক্ষা করলাম আমি আর সেরেনা।

তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছি আমরা, গলা চড়িয়ে বলে উঠল সেরেনা, ঘোড়ার রেকাবে পা রেখে উঠে দাঁড়িয়েছে। সেদ্ধ শূকরের মাংস আর শুকনো মাছ। সেইসাথে বাজরা আর জোয়ারের রুটি। অনেক আছে, পেট ভরে খেতে পারবে সবাই!

সঙ্গে সঙ্গে গভীর অটুট নীরবতা নেমে এলো আবার। মানুষগুলোর মাঝ থেকে একজন লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত ভঙ্গ হলো না সেই নীরবতা। এক টানে মাথার ওপর থেকে আবরণ সরিয়ে ফেলল সে, যাতে তার চেহারা ঢাকা ছিল। ভয়ংকর, বীভৎস এক দৃশ্য। কুষ্ঠের কামড়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে তার নাক আর কান, সেইসাথে ওপরের ঠোঁট। ফলে কঙ্কালের খুলির মতো চিরস্থায়ী, ভয়ানক এক হাসি ফুটে আছে তার মুখে। একটা চোখের পাতা অদৃশ্য হয়ে গেছে, আরেকটা বন্ধ হয়ে গেছে চিরতরে। যে চোখটা খোলা সেটা টকটকে লাল। সাগরের লোনা বাতাসে ভর করে মাংস পচা দুর্গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। বমি উঠে আসতে চাইল আমার, অনেক কষ্টে সামলে নিলাম নিজেকে। শয়তানের দল, চেঁচিয়ে উঠল মহিলা। খোলা চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে। আমাদের কষ্ট নিয়ে তামাশা করতে এসেছিস? জানিস যে আমাদের কাছে কোনো খাবার নেই, তাও কেন লোভ দেখাচ্ছিস শুধু শুধু? দয়ামায়া নেই তোদের মনে? কী ক্ষতি করেছি আমরা তোদের যে আমাদের সাথে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করছিস?

তার দিকে ঘুরে তাকাল সেরেনা। করুণায় ভরে উঠেছে ওর কণ্ঠ। বলল, দেবী আর্টেমিসের নামে শপথ করে বলছি, তোমাদের সবার জন্য যথেষ্ট খাবার নিয়ে এসেছি আমি। তোমাদের গ্রামের ঠিক বাইরেই পাঁচটা গাড়ি ভর্তি খাবার অপেক্ষা করছে তোমাদের জন্য। যদি তোমরা খুব বেশি অসুস্থ হয়ে থাকো, খাবারের কাছে যাওয়ার শক্তি না থাকে তাহলে আমি নিজেই গিয়ে নিয়ে আসব ওগুলো। নিজ হাতে খাইয়ে দেব তোমাদের…

সাথে সাথে হঠাৎ উত্তেজিত চিৎকার উঠল ওদের মাঝ থেকে। হাসি কান্না ব্যথা ক্ষুধা আর হতাশার এক অদ্ভুত মিশ্রণ সেই চিৎকারে। অনেক কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল সবাই, তারপর কেউ লাফিয়ে লাফিয়ে কেউ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে গেল গ্রামের প্রবেশপথের দিকে। সেরেনার কাছ থেকে খাবারের কথা শোনার পর আর তর সইছে না কারো।

এগোতে গিয়ে পড়ে গেল কেউ কেউ, আমি আর সেরেনা গিয়ে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলাম তাদের। আমাদের ঘোড়ায় তুলে নিলাম তাদের, তারপর সামনে এগিয়ে গেলাম। ওদিকে রোগীদের প্রথম দলটা ততক্ষণে খাবারের সন্ধান পেয়ে গেছে। অবিশ্বাস আর আনন্দ মেশানো চিৎকার বেরিয়ে এলো তাদের গলা দিয়ে।

হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপা কাঁপা হাতে বস্তাগুলো টেনে ছিঁড়তে শুরু করল তারা। যাদের হাতে আঙুলগুলো ইতোমধ্যে কুষ্ঠের আক্রমণে খসে পড়েছে তারা দাঁত ব্যবহার করে খুলে ফেলল আবরণ, তারপর রক্তাক্ত ফাটা ঠোঁটের মাঝ দিয়ে মুখে পুরতে শুরু করল খাবার।

গ্রামের ভেতরে কুঁড়েগুলোর ভেতর যারা বসে ছিল তাদের কানেও গেল সেই উল্লসিত চিৎকার। মধুর প্রতি আকৃষ্ট মৌমাছির মতো দলে দলে দৌড়ে এলো তারা। যারা একেবারেই দুর্বল এবং যাদের দেহে রোগের আক্রমণ প্রায় শেষ পর্যায় পৌঁছে গেছে; তারা অন্যদের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু তার পরেও হাঁটু আর কনুইয়ে ভর দিয়ে টেনে নিতে লাগল নিজেদের কয়েক টুকরো রুটি অন্তত জোগাড় করতে চায়। যাদের গায়ে এখনো শক্তি আছে তারা এক টুকরো শুকনো মাংসের জন্য কুকুরের মতো মারামারি করতে লাগল নিজেদের মাঝে।

এই হট্টগোলের মাঝে এমনকি আমি আর সেরেনাও আলাদা হয়ে পড়লাম। খুব বেশি দূরে নয় অবশ্য, তবে যেটুকু দূরত্ব তৈরি হলো তা ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই দেবতাদের ভাষা তেনমাস ব্যবহার করে আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল সেরেনা, সাবধান! কাছেই আছে সে।

কীভাবে বুঝলে? একই ভাষায় জানতে চাইলাম আমি।

আমি ওর গন্ধ পাচ্ছি।

সেরেনার ঘ্রাণশক্তিকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না, অনেক আগেই জেনে গেছি আমি। যেকোনো শিকারি কুকুরের চাইতেও তীক্ষ্ণ ওর নাক।

দ্রুত এদিক-ওদিক তাকালাম আমি। সাথে সাথেই চারপাশের ভিড়ের মাঝে কমপক্ষে চারটি চেহারা ঢাকা মানুষকে চোখে পড়ল আমার। সাথে করে দুটো ছুরি এনেছি আমি। কোমরের ডান পাশে খাপের ভেতরে রয়েছে শিকারের বড় ছুরিটা। দুই দিকেই ধার এটার, প্রায় এক কিউবিট লম্বা। ইচ্ছে করলেই ডান হাতে ওটা বের করে আনতে পারব। তারপর আমার পিঠ বরাবর কাপড়ের নিচে রয়েছে আরেকটা ছুরি। যদিও এটার দৈর্ঘ আধ কিউবিটের বেশি হবে না, তবে দুই হাত দিয়েই ওটাকে বের করে আনার সুবিধা রয়েছে আমার। তবে এই মুহূর্তে আমার চারপাশে অনেকগুলো মানুষ, সবাই অসুস্থ এবং দুর্গন্ধযুক্ত এবং তাদের কারণে বেশ বেকায়দা অবস্থায় পড়ে গেছি আমি। আমার বাম কাঁধের পেছন দিকটা অরক্ষিত এখন, ওই জায়গায় কোনো আঘাত এলে চাইলেও ঠেকাতে পারব না। তাই নিজেকে রক্ষা করার জন্য কোনোমতে শরীর মুচড়ে ঘুরে দাঁড়ালাম, যাতে পিঠের দিকটায় কারো আক্রমণ না আসে।

আবারও তেনমাসে সেরেনাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলাম আমি, আমার পেছনে বাম দিকে কোনো অসুবিধা নেই তো?

নিচু হও! হঠাৎ করেই চিৎকার করে বলে উঠল ও। ওর গলায় এমন কিছু একটা ছিল, যা আমি আগে কখনো শুনিনি। সাথে সাথেই পায়ের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলাম, হাটু ভাজ করে পড়ে গেলাম নিচে। অনেকগুলো পা দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে আমার চারপাশে দিয়ে। কোনোটা নগ্ন, তাতে কুষ্ঠরোগের নানারকম ক্ষত আর পুঁজভর্তি ঘায়ে ভর্তি। কোনোটা আবার শুকনো রক্ত আর পুঁজমাখা কাপড় দিয়ে মোড়ানো। সবাই চেষ্টা করছে সামনের জনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।

আমার মাথার ঠিক ওপরে একটা ছুরি ধরা হাত পাগলের মতো কোপ মারছে এদিক-ওদিক, এক মুহূর্ত আগেও ঠিক ওই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। লুক্সরের অ্যাম্ফিথিয়েটারে যখন তীরের আঘাতে মারা পড়েছিল উটেরিক এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে উঠেছিল আবার, তখন তার হাতের যে বর্ণনা আমি সেরেনার কাছে শুনেছিলাম, তার সাথে এই হাতের চেহারা সম্পূর্ণ মিলে যায়। মসৃণ, মেয়েলি একটা হাত, ঝকঝকে পরিষ্কার। কিন্তু হাতের মালিক ব্যক্তিটি যেন সাক্ষাৎ শয়তান।

মাটিতে পড়ে গেছি আমি, এমন একটা অবস্থা যে সঙ্গে থাকা দুটো অস্ত্রের কোনোটাই বের করতে পারছি না। আমার মুখের ওপর দিয়ে ঘুরে গেল উটেরিকের ছুরি ধরা হাত, ভিড়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি করতে থাকা কোনো একজনের নগ্ন ক্ষতবিক্ষত ঊরু চিরে দিল। সাথে সাথে রক্ত বেরিয়ে এলো সেখান থেকে, ব্যথায় চিৎকার করে উঠল লোকটা। সেই চিৎকারে যেন আরো পাগল হয়ে উঠল উটেরিক। প্রচণ্ড আক্রোশের সাথে এদিক-ওদিক ছুরি চালাতে লাগল সে। আরো একটা মহিলা আহত হলো তার ছুরির খোঁচায়।

মাথার ওপর বাম হাতটা বাড়িয়ে ধরলাম আমি, খপ করে চেপে ধরলাম উটেরিকের কবজি। যখনই বুঝলাম যে আমার হাতটা ঠিক জায়গামতোই ধরতে পেরেছে তখন ডান হাত ব্যবহার করে চেপে ধরলাম তার ছুরির হাতল ধরে রাখা আঙুলগুলো। এই অবস্থা থেকে ছুটতে পারার কোনো উপায় নেই তার। এবার কবজিটা ধরে হাতটা উল্টো দিকে মোচড় দিলাম, যতক্ষণ না ভেতরের রগগুলো ছিঁড়তে শুরু করল মট মট করে। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল উটেরিক।

মনে মনে আশা করলাম, এই চিৎকারের শব্দ শুনে আমাদের কাছে এগিয়ে আসবে সেরেনা। আরো জোরে মোচড় দিলাম আমি। কাজ হলো আমার চেষ্টায়, আগের চাইতেও তীক্ষ্ণ কান ফাটানো চিৎকার বেরিয়ে এলো উটেরিকের গলা দিয়ে। তারপর হঠাৎ করেই থেমে গেল চিৎকার, ঢিল পড়ল তার শরীর এবং হাত-পাগুলোতে। তখনো তার হাত ধরে রেখেছি আমি, ওই অবস্থাতেই হুড়মুড় করে আমার ওপর পড়ে গেল সে। তার নিচ থেকে বের হয়ে এলাম আমি, উল্টে দিলাম শরীরটা। দেখলাম পিঠের ঠিক মাঝখান থেকে বেরিয়ে আছে সেই নীল তলোয়ারটার হাতল। চুনি পাথরটা জ্বলছে জ্বলজ্বল করে। উটেরিকের মেরুদণ্ড দুই খণ্ড হয়ে গেছে তলোয়ারের আঘাতে।

ধপ করে আমার পাশে বসে পড়ল সেরেনা। এটা উটেরিক ছিল তো? প্রশ্ন করল ও। ওহ আর্টেমিস! আমরা যাকে খুন করলাম সেই যেন সঠিক ব্যক্তি হয়!

সেটা নিশ্চিত হওয়ার কেবল একটাই উপায় আছে, ওকে বললাম আমি, তারপর হাত বাড়িয়ে দিলাম লাশের চেহারা ঢেকে রাখা কাপড়টার দিকে। এক টানে সরিয়ে ফেললাম সেটা। তারপর চিত করে শুইয়ে দিলাম শরীরটাকে। নীরবে তাকিয়ে রইলাম মৃত লোকটার চেহারার দিকে।

দুই ভাই তারা, সেই হিসেবে রামেসিসের মতোই সুদর্শন এবং অভিজাত হওয়া উচিত ছিল উটেরিকের চেহারা। কিন্তু না, ধূর্ততা আর শঠতার ছাপ স্পষ্ট তার চেহারায়।

ভাইয়ের মতো দয়ালু এবং চিন্তাশীলও হতে পারত তার অবয়ব। কিন্তু তার বদলে তার চেহারায় আঁকা রয়েছে উন্মত্ত, নিষ্ঠুর এক মানুষের ছাপ।

উঠে দাঁড়িয়ে উটেরিকের পিঠে একটা পা দিয়ে চেপে ধরলাম আমি, তারপর আরেক হাতে তার শরীর থেক টেনে বের করলাম তলোয়ারের উজ্জ্বল নীলচে ফলাটা। তারপর সেটাকে উল্টো করে ধরে হাতলটা বাড়িয়ে দিলাম সেরেনার দিকে। কাজটা শেষ করবে না? প্রশ্ন করলাম আমি। কিন্তু মাথা নাড়ল সেরেনা। ফিসফিস করে জবাব দিল :

 গত কয়েক দিনে অনেক রক্তপাত দেখেছি আমি, প্রিয় টাইটা। আর দেখতে চাই না। আমার হয়ে তুমিই শেষ করো এটা।

ঝুঁকে এসে উটেরিকের মাথার পেছন দিকের কোঁকড়া চুলগুলো মুঠো করে চেপে ধরলাম আমি। তারপর ধুলোর মধ্য থেকে তুলে আনলাম তার মাথাটা, যাতে গলায় তলোয়ারের ফলা চালানোর সময় তা নিচের পাথুরে মাটিতে লেগে নষ্ট না হয়ে যায়। এক হাতে মাথাটা উঁচু করে ধরে রাখলাম আমি, আরেক হাতে তলোয়ারের ফলাটা আলতো করে ঘাড়ের ওপর ছুঁইয়ে মেপে নিলাম দূরত্ব। তলোয়ারটা এত ধারালো যে ছোঁয়ানোর সাথে সাথেই সরু একটা লাল দাগ ফুটে উঠল ঘাড়ের চামড়ায়, লক্ষ্যস্থির করতে সুবিধা করে দিল আমার। তারপর তলোয়ারের ফলা মাথার ওপর তুলে ধরে নামিয়ে আনলাম এক কোপে। সাথে সাথে ঘাড় থেকে আলাদা হয়ে গেল উটেরিকের মাথা। নিজের রক্ত থেকে তৈরি হওয়া পুকুরের মধ্যে থপ করে একটা ভোতা আওয়াজ তুলে পড়ে গেল তার শরীর। এবার কাটা মাথাটা আমার মুখের সামনে তুলে ধরলাম আমি। বললাম, যতগুলো মানুষকে খুন করেছিস তুই, তাদের প্রত্যেকের বদলে যেন হাজারবার মরতে হয় তোকে!

তারপর হাঁটু গেড়ে বসে মাথাটাকে জড়িয়ে নিলাম একটু আগে লাশের মুখ থেকে খুলে আনা কাপড়টা দিয়ে। এটা দিয়েই নিজের চেহারা ঢেকে রেখেছিল উটেরিক।

কী করবে ওটা দিয়ে? আমার কাজ দেখতে দেখতে প্রশ্ন করল সেরেনা। পুড়িয়ে ফেলবে, নাকি মাটিচাপা দেবে?

আনন্দের বাগানের প্রধান দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হবে এটাকে, ডুগের খুলিটার পাশে, জবাব দিলাম আমি। হেসে উঠল সেরেনা।

সত্যিই, প্রিয় টাইটা! তোমার কোনো তুলনা হয় না!

*

তখনই ঘাদাকার কুষ্ঠরোগীদের গ্রাম ছেড়ে বিদায় নিতে চাইল না সেরেনা। গ্রামের বাসিন্দাদের সবার নাম লিখে নিল ও, প্রতিশ্রুতি দিল যে জীবনের বাকি দিনগুলো সেরেনার পক্ষ থেকে খাবার এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ পাবে তারা। সবার কষ্ট লাঘব করার জন্য যতটা সম্ভব চেষ্টা করল ও, যখন কেউ মারা গেল তখন তার জন্য শোক প্রকাশ করল। স্বাভাবিকভাবেই আমাকেও থেকে যাওয়ার জন্য বাধ্য করল সেরেনা।

শেষ পর্যন্ত যখন এখান থেকে বিদায় নিয়ে নিজেদের পরিচিত পৃথিবীতে সেরেনাকে ফিরে যাওয়ার জন্য রাজি করাতে পারলাম তখন দশ দিন পেরিয়ে গেছে। রোগীদের মাঝে তখনো যারা হাঁটতে সক্ষম তারা গ্রাম পার হয়েও আরো বেশ কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে গেল আমাদের। নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার আগেও বারবার সেরেনাকে চিৎকার করে ধন্যবাদ জানাল তারা, কেউ কেউ এমনকি কেঁদেও ফেলল।

শেষ পর্যন্ত লুক্সরে ফিরে এলাম আমরা। ফিরে আসার পর সেরেনা প্রথমেই যে কাজটা করল সেটা হচ্ছে ঘাদাকার উদ্দেশ্যে নিয়মিতভাবে খাবার এবং ওষুধপত্র পাঠানোর ব্যবস্থা করা। যদিও এখন ওর হাতে অনেক কাজ, অনেক ব্যস্ততা। মিশরের রাজা এবং রানি হিসেবে রামেসিস এবং ওর অধিষ্ঠিত হওয়ার সময় এখন সমাগত। তা সত্ত্বেও সবার আগে কুষ্ঠরোগীদের সেবার ব্যাপারটাই নিশ্চিত করল ও।

অভিষেক উৎসব উপলক্ষে রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতিকে লুক্সরে থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানাল রামেসিস আর সেরেনা। স্বাভাবিকভাবেই রাজি হয়ে গেল তারা। জেনারেল হুই এবং তার স্ত্রীও হুরোতাস আর তেহুতির উদাহরণ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিল। তার ওপরে বোয়েশিয়ার রাজা বের আর্গোলিদের নেতৃত্বে বাকি চৌদ্দজন মিত্র রাজাও সিদ্ধান্ত নিল যে এই পরিস্থিতিতে তাদের এত দ্রুত ফিরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই; বিশেষ করে এই মুহূর্তে যখন ভয়ানক শীতের মৌসুম শুরু হয়ে গেছে তাদের রাজ্যে।

প্রচুর জনসমাগম ঘটল লুক্সরে। তবে সৌভাগ্যই বলতে হবে, কারণ প্রাক্তন ফারাও উটেরিক টুরো যে সম্পত্তি এবং পদমর্যাদা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল তার সব কিছু আবার এই সময়েই আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ফারাওইন সেরেনা। ফলে আরো একবার আমি টাইটা পরিণত হলাম মিশরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিতে। দেরি না করে আমার প্রাসাদ এবং অন্য যে বাড়িগুলো ছিল সেগুলো ছেড়ে দিলাম রাজা হুরোতাস আর রানির জন্য। অন্য মিত্র রাজারাও আশ্রয় পেল সেখানে।

একই সাথে ফারাও রামেসিসের মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী এবং অধ্যক্ষ হিসেবেও নিয়োগ পেলাম আমি। মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়ার জন্য উটেরিক যে বত্রিশজন ব্যক্তিকে দুঃখ-দুর্দশার ফটকে অর্থাৎ আনন্দের বাগানে পাঠিয়েছিল তাদের প্রায় সবাই জায়গা পেল রামেসিসের মন্ত্রিসভায়। আমার পরামর্শ অনুযায়ী তাদেরকে আনন্দের বাগান থেকে লুক্সরের প্রাসাদে ডেকে পাঠাল রামেসিস। আনন্দে প্রায় নাচতে নাচতে শহরে প্রবেশ করল তারা, এবং কোনো ঝামেলা ছাড়াই সরকার ভবনে নিজ নিজ জায়গা বুঝে নিল। এখানে আমার নেতৃত্বে কাজ করবে সবাই।

মন্ত্রিসভার প্রধান অধ্যক্ষ হিসেবে ফারাও ও ফারাওইনের আনুষ্ঠানিক অভিষেকের দায়িত্ব আমার ওপরেই পড়ল। বিজয়ীর বেশে লুক্সরে প্রবেশের ছয় মাস পর ফারাও রামেসিস ও ফারাওইন সেরেনা ক্লিওপেট্রাকে তাদের নিজ নিজ আসনে আনুষ্ঠানিকভাবে অধিষ্ঠিত করলাম আমি। এই উপলক্ষে প্রাসাদের বিশাল দরবার কক্ষে জড়ো হলো প্রায় চার শ অতিথি। ভূমধ্যসাগরের মাঝে ছড়িয়ে থাকা চৌদ্দটা রাজ্যের রাজা এবং অন্য মিত্ররাও রইল সেই অতিথিদের মাঝে।

পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে প্রিয় দুটো মানুষের মাথায় সোনালি রাজমুকুট পরিয়ে দিলাম আমি। আবারও নিজের সেই সম্মান আর মর্যাদা ফিরে পেয়েছে মিশর- এই ভেবে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল আমার ঠোঁটে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *