১৬-২১. বাড়ি ফিরে

বাড়ি ফিরে বিন্দুবাসিনীকে সেদিনই ফোন করেছে রণিতা। ডকু-ফিচারটা করা যাবে না শুনে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি। বলেছেন, ওটা হল না বলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কটা যেন নষ্ট না হয়, রণিতারা যেন যোগাযোগটা রাখে এবং সময় পেলে ও আলিপুরে তাঁর কাছে চলে আসে। রণিতা জানিয়েছে, অবশ্যই যাবে এবং তাদের সম্পর্কটা চিরকাল বজায় থাকবে।

সেদিন রাতে ইন্দ্রনাথকেও তার ব্যর্থতার কথা জানিয়েছে রণিতা। বাবা কিন্তু চূড়ান্ত আশাবাদী, মেয়েকে তিনি উৎসাহই দিয়েছেন। তাঁর ধারণা শেষ পর্যন্ত নয়নতারা মত পালটাবেন কিন্তু বাবার মতো রণিতা অতটা আশান্বিত হতে পারে নি। নয়নতারাকে যেটুকু সে দেখেছে তাতে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে এক চুল নড়বেন কিনা সন্দেহ।

মাঝখানে দিল্লি থেকে রজনীও একবার ফোন করেছিল। কাজটা কতদূর এগিয়েছে সেটা জানার জন্য সে প্রচণ্ড আগ্রহী। তাকে অবশ্য পরিষ্কার করে সবটা জানায় নি রণিতা, শুধু বলেছে আপাতত নানা কারণে ডকু-ফিচারটা করা যাচ্ছে না, দিনকয়েক পর ফোন করে বলবে কবে ওটা শুরু করা সম্ভব। শুনে প্রথমটা নিরাশ হয়ে পড়েছে রজনী, তারপর গলায় বেশ জোর দিয়ে বলেছে, ছবিটা তোকে করতেই হবে। শুটিং আরম্ভ হলে আমি কদিন কলকাতায় গিয়ে থাকব।

দ্বিধান্বিতভাবে রণিতা বলেছে, আচ্ছা, থাকিস।

.

সেদিন রণিতা ঠিক করেছিল কসবায় গিয়ে রজনী দত্ত রোডে সেই জমিটার, খোঁজ করবে। আজ বিকেলে অমিতেশকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে হানা দিল সে এবং দু-একজনকে জিজ্ঞেস করে জায়গাটা বারও করে ফেলল।

জমিটা চৌকো এবং বেশ উঁচু। তার একধারে ভাঙাচোরা খাপরার চালায় একটা চায়ের দোকান। বৃষকাঠের মতো চেহারা, মাঝবয়সী একটা লোক মান্ধাতার আমলের একটা ডেকচিতে চা ফোঁটাচ্ছিল। সামনের দুটো নড়বড়ে বেঞ্চে বসে কটি মজুর ক্লাসের লোক সতৃষ্ণ চোখে সেদিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল।

জানা সত্ত্বেও রণিতা দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, এটা কি আঠারো নম্বর রজনী দত্ত রোড?

লোকটার চোখের ডাঁটি ভাঙা নিকেলের গোল চশমা মাথার পেছন দিকে সুতো দিয়ে বাধা। চশমার ওপর দিয়ে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে দোকানদার জিজ্ঞেস করে, কেন বলুন তো?

পালটা প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না রণিতা। একটু থমকে যায় সে, পরক্ষণে একটা বিশ্বাসযোগ্য জবাব মনে মনে বানিয়ে ফেলে। বলে, আমরা একটা ফ্ল্যাট কিনব। শুনেছি এই জামিতে একটা ফ্ল্যাট-বাড়ি তৈরি হবে। তাই–

লোকটা খোলা ছাড়ানো শুকনো নারকেলের মতো মাথাটা নাড়তে নাড়তে বলে, সে গুড়ে বালি মেমসাহেব–

মানে?

এ জমি কাকে যেন বিক্রি করে দিচ্ছে মালিক। ফ্ল্যাট বাড়িটাড়ি কিসসু হবে না। যে কিনছে নিজের থাকার জন্যে বাড়ি করবে।

জমিটার মালিক কে?

অবিনাশ তরফদার।

তিনি থাকেন কোথায়?

ডান পাশে তিনটে বাড়ির পর চার নম্বর বাড়িটা দেখিয়ে দেয় দোকানদার। সেখানে গিয়ে কলিং বেল টিপতেই কাজের লোক রণিতা আর অমিতেশকে সাদামাঠা একটা ড্রয়িং রুমে নিয়ে বসিয়ে ভেতরে খবর দিতে চলে যায়।

কিছুক্ষণ পর বাষট্টি তেষট্টি বছরের একজন বৃদ্ধ ঘরে এসে ঢোকেন। এই বয়সেও ভারি সুপুরুষ অবিনাশ তরফদার। অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র, সৌম্য চেহারা। তাকে দেখলে শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা হয়।

রণিতারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। অবিনাশ বলেন, বসুন আপনারা। রণিতারা বসলে তিনিও মুখোমুখি একটা সোফায় বসেন, কোত্থেকে আসছেন?

রণিতা বলে, আমরা কলকাতাতেই থাকি।

আমার কাছে কিছু দরকার আছে?

হ্যাঁ। আঠারো নম্বর রজনী দত্ত রোডে আপনার যে জমিটা রয়েছে সে সম্পর্কে আমরা ইন্টারেস্টেড। কো-অপারেটিভ করে একটা ফ্ল্যাট-বাড়ি বানাতাম।

অবিনাশ বলেন, কিন্তু মা ওটা তো আর কাউকে দেওয়া যাবে না।

অমিতেশ জিজ্ঞেস করে, কেন বলুন তো?

পরশু জমিটা বায়না হয়ে গেছে।

বায়নার টাকাটা কি ফেরত দেওয়া যায় না?

তা কী করে সম্ভব! অবিনাশ হাসেন।

রণিতা বলে, যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা জানতে চাইছি। যাঁরা বায়না করেছেন, তাঁরা কিরকম দাম দিচ্ছেন? অবশ্য যদি আপত্তি থাকে–

অবিনাশ বলেন, আপত্তির কিছু নেই। আমি কাঠায় চল্লিশ হাজার করে পাচ্ছি।

জমিজমার দাম সম্বন্ধে বিশেষ ধারণা নেই রণিতার। বিষয়-আশয় নিয়ে কোনোকালে সে মাথা ঘামায় নি। তবে এটুকু শুনেছে, এ অঞ্চলের জমি নাকি ইদানীং সোনার দরে বিকোচ্ছে। অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো সে বলে, শুনেছি এখানকার জমি পার কাঠা এক লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তার থেকেও বেশি–দেড় লাখ।

আমরা আপনাকে ঠিক দাম দিতে চাই। জমিটা দয়া করে আমাদের দিন।

অবিনাশ বলেন, আপনাদের তো বললাম, বায়না নেবার পর তা আর হয় না। তা ছাড়া বেশি টাকার আমার দরকার নেই। স্ত্রী মারা গেছেন বছর পাঁচেক আগে। এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে থাকে বাঙ্গালোরে, ছেলে আমেরিকায়। লস এঞ্জেলেসে ছেলে বিরাট বাড়ি করেছে, অঢেল রোজগার। সে আমাকে একা একা এখানে থাকতে দিতে চায় না। দু-চার মাসের ভেতর এসে আমাকে নিয়ে যাবে। তার আগে এখানকার জমিজমা বেচে দিতে চাই। মানুষটি ভারি সরল, নইলে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা দুই অচেনা তরুণ তরুণীকে এভাবে জানাতেন না।

অবিনাশ আরো বলেন, যে বাড়িতে বসে আমরা কথা বলছি সেটা দেব আমার এক ভাইপোকে। তারপর একেবারে মুক্তপুরুষ হয়ে আমেরিকায় পাড়ি।

রণিতারা তো আর জমি কিনতে আসে নি, নানা কথা বলে ঐ পাঁচ কাঠা জমির আসল রহস্য বার করে নিতে চায়। সে জিজ্ঞেস করে, ঐ আঠারো নম্বরের জমিটা কারা কিনছেন?

অবিনাশ একটু মজা করে বলেন, কেন, আপনারা কি তার কাছে গিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওটা নিতে চান?

না। এমনি কৌতূহল আর কি।

মমতা রায় নামে এক ভদ্রমহিলা মহৎ উদ্দেশ্যে ওটা কিনছেন, সেই জন্যে আমিও কম দামে রাজি হয়ে গেলাম। নইলে অনেক বেশি টাকার অফার এসেছিল।

নয়নতারার নামে জমিটা বায়না হয় নি। আসল নামে তিনি তা হলে জমিটা কিনছেন? রণিতা জিজ্ঞেস করে, আপনি মমতা রায়কে দেখেছেন?

অবিনাশ বলেন, না। ওঁর লোক এসে বায়না করে গেছেন। তাকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দেওয়া আছে। তিনি দু-এক সপ্তাহের ভেতর আলিপুরে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেবেন।

মহৎ উদ্দেশ্যের কথা কী বলছিলেন?

মমতা রায় ঐ জমিটায় ডেস্টিটিউট মেয়েদের জন্যে একটা বড় হোম করতে চান।

ও। সত্যিই নোবল কজ।

আরো কিছুক্ষণ কথা বলে অবিনাশ তরফদারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় চলে আসে রণিতারা। বিজন সেতুর দিকে হাঁটতে হাঁটতে অমিতেশ বলে, একটা ব্যাপার আমার গুলিয়ে যাচ্ছে রণি–

রণিতা বলে, কী?

নয়নতারা গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের সেন্টার স্টেজে এতকাল ছিলেন, হঠাৎ তিনি সেখান থেকে মেয়েদের জন্য বাড়ি করতে চাইছেন কেন?

সেটাই জানতে হবে। মানুষের চরিত্রে কত রকমের অ্যাঙ্গল যে থাকে!

.

১৭.

নয়নতারার বাড়ি থেকে সেদিন চলে আসার পর দু সপ্তাহ কেটে গেছে

বর্ষা এবারের মত বিদায় নিয়েছে। ঝকঝকে নীলাকাশে পেঁজা তুলোর মতো ধবধবে হালকা কিছু মেঘ আজকাল ভেসে বেড়ায়। যত দিন যাচ্ছে শরতের রোদে তত বেশি করে সোনালি আভা ফুটে বেরুচ্ছে।

ইদানীং যতক্ষণ রণিতা বাড়িতে থাকে তার কান পড়ে থাকে টেলিফোনের দিকে। ইন্দ্রনাথের বিপুল উৎসাহ তাকে পুরোপুরি হতাশ হতে দেয় না। যদিও দুরাশা, তবু আবছাভাবে মনে হয়, হয়তো নয়নতারা শেষ পর্যন্ত মত পালটে তাবে ফোন করবেন।

এদিকে মায়ের সঙ্গে ঠাণ্ডা লড়াইটা এখনও শেষ হয়নি, তার বিয়ে ন। হওয়া পর্যন্ত হবেও না। তবে কিছুদিন হল সুধাময়ী মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন, যদিও মুখটা সবসময় থমথমে হয়ে থাকে।

বাড়ি থেকে বেরুবার সময় রোজই রণিতা সুধাময়ীকে বলে যায়, কেউ ফোন করলে যেন তার নামটা লিখে রাখেন। কিন্তু চোদ্দ দিন কেটে গেলেও নয়নতারার দিক থেকে কোনোরকম সাড়াশব্দ নেই।

যখন নয়নতারা পর্বটা মাথা থেকে পুরোপুরি বার করে দিয়ে অন্য কোনো সাবজেক্ট নিয়ে রণিতা ভাবতে শুরু করেছে সেই সময় একদিন সকালে নয়নতারার ফোন এল, আমি রণিতার সঙ্গে কথা বলতে চাই।

সেই সুরেলা, স্বপ্নগন্ধী কণ্ঠস্বর যা শ্রোতাদের মধ্যে বিদ্যুৎপ্রবাহ ঘটিয়ে দেয়। শিরদাঁড়া টান টান করে রণিতা বলে, আমিই রণিতা–

ভাল আছ তো?

হ্যাঁ, আপনি?

চমৎকার। কদিন ধরেই তোমার কথা ভাবছিলাম।

রণিতা উত্তর দেয় না, এরপর নয়নতারা কী বলেন তা শোনার জন্য উগ্রীব হয়ে থাকে।

নয়নতারা বলেন, তুমি কি আমাদের বাড়ি একবার আসতে পারবে?

রণিতা ভাবে, তিনি মত পালটেছেন কিনা জিজ্ঞেস করে কিন্তু পরক্ষণে মনে হয় ওঁর কাছে গেলেই তো সব জানা যাবে। ততক্ষণ ধৈর্য ধরে থাকা যাক। বলে, নিশ্চয়ই পারব। কবে যেতে বলছেন?

কোনো জরুরি কাজ না থাকলে এখনই চলে এস না—

ঠিক আছে। ঘণ্টাখানেকের ভেতর পৌঁছে যাচ্ছি।

আর ঐ ইয়ংম্যানটি যে সারাক্ষণ তোমার গায়ে আঠার মতো জুড়ে থাকে, তাকেও এনো।

রণিতা হাসে, আচ্ছা–

নয়নতারা ফোন ছেড়ে দিতেই রণিতা অমিতেশকে তাদের বাড়িতে ডায়াল করে ধরে ফেলে, তোমার কাছাকাছি ঘড়ি আছে?

অমিতেশ লেট-রাইজার, সাড়ে আটটার আগে কোনোদিন তার ঘুম ভাঙে না। জড়ানো গলায় বলে, আছে। কেন?

কণ্ঠস্বর শুনে মনে হল ঘুমের রেশ এখনও কাটে নি অমিতেশের। রণিতা বলে, কটা বাজে দেখ।

আটটা বেয়াল্লিশ।

আটাশ মিনিট সময় দিলাম। ঠিক নটা দশে মেট্রো রেলের কালিঘাট স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে–

ইয়ার্কি নাকি! এখনও আমার মুখটুখ ধোওয়া হয়নি, শেভ করিনি, এত তাড়াতাড়ি–

কোনো কথা শুনতে চাই না। যা বললাম তাই করবে। শার্প অ্যাট টেন মিনিটস পাস্ট নাইন–

কিন্তু ব্যাপারটা কী?

দেখা হলে বলব। রণিতা লাইন কেটে দেয়।

.

নটা পঁচিশে রণিতা আর অমিতেশ চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের দোতলার হল-ঘরে যখন সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসে, নয়নতারা একটা সোফায় বসে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বললেন, বসোরণিতারা বসলে বলেন, খুব অবাক হয়ে গেছ, না?

রণিতা বলে, তা একটু হয়েছি। ভাবতে পারি নি, আপনি ফোন করবেন।

.

বিশেষ দরকারে ফোনটা করতে হল। নয়নতারা বলেন, আগেই করতাম। ভেবে দেখলাম, কটা দিন তোমাদের ওপর নজর রাখি।

তাঁর কথার মধ্যে একটা ইঙ্গিত ছিল, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না রণিতার। বলে, আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করি কিনা, সেটা দেখতে চাইছিলেন?

হ্যাঁ। সেনসেসন ক্রিয়েট করতে তোমরা যে আমার কথা কাগজে বার করে দাও নি, সে জন্যে খুব খুশি হয়েছি।

একটু চুপচাপ।

তারপর নয়নতারা বলেন, তোমরা সেদিন চলে যাবার পর তোমাদের পোপোজালটা নিয়ে অনেক বার ভেবেছি।

রণিতারা উন্মুখ হয়ে ছিল। বলে, কী ভাবলেন?

নয়নতারা বলেন, আর্টিস্ট হিসেবে, বিশেষ করে একজন মানুষ হিসেবে আমার অনেক কিছু বলার আছে। সেই জন্যে তোমাদের প্রস্তাবে আমি রাজি।

সমস্ত শরীরে যেন শিহরন খেলে যায় রণিতার। গাঢ় আবেগের গলায় বলে, আপনাকে কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাব বুঝতে পারছি না। আমার অনেক দিনের স্বপ্ন এবার সার্থক হবে।

নয়নতারা বলেন, আমার কথা কিন্তু শেষ হয় নি।

রণিতা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। তার মনে সংশয়ের একটু ছায়া পড়ে।

নয়নতারা বলেন, আমার কিছু শর্ত আছে।

রণিতা বলে, কী শর্ত?

ডকু-ফিচারটা করতে হবে গোপনে। কেউ জানুক সেটা আমি একেবারেই চাই না।

তা কী করে সম্ভব?

অসুবিধেটা কোথায়?

রণিতা বলে, দূরদর্শন এটা কমিশন করছে, তারা টাকা দেবে। ওদের তো জানাতেই হবে।

ওদের টাকা নিতে হবে না।

অবাক হয়ে রণিতা বলে, না নিলে ছবিটা করব কী করে? আমার কি টাকা আছে?

নয়নতারা বলেন, তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, আস্তে আস্তে ছবিটা কর। শুরু করার জন্যে যাদরকার আমি তার ব্যবস্থা করব।ভিডিও করতে চাও,না ফিল্মে?

ফিল্ম করারই ইচ্ছে।

তা হলে ক্যামেরাম্যান, সাউন্ড রেকর্ডিস্টও চাই। তারা আবার বাইরে আমার কথা জানিয়ে দেবে না তো?

আমার টিমে যারা কাজ করে তারা খুবই ট্রাস্টওয়ার্দি, তারা এ নিয়ে কারো সঙ্গে আলোচনা করবে না। কিন্তু–

কী?

ডকু-ফিচারটা করতে অনেক টাকা লাগবে বলতে বলতে চুপ করে যায় রণিতা।

নয়নতারা তার মনোভাব বুঝতে পারছিলেন। বলেন, আরম্ভ তো কর, তারপর দেখা যাক।

পুরো টাকাটা নয়নতারা জোগাড় করে দিতে পারবেন কিনা, রণিতার কাছে তা পরিষ্কার হয় না। কিন্তু এ নিয়ে প্রশ্ন করলে যদি বিরক্ত হয়ে গোটা প্রোপোজালটা নাকচ করে দেন তাহলে তো আর আশাই নেই। বণিতা বলে, আপনি যা বলবেন, তাই হবে।

আরেকটা কথা–

বলুন।

ছবিটা হয়ে যাবার পর আমাকে না জানিয়ে কাউকে দেখাতে পারবে না। রাজি?

রাজি।

তা হলে নেক্সট উইক থেকে কাজ শুরু করতে পার।

নেক্সট উইকে পারব না।

কেন?

রণিতা জানায়, নয়নতারা সম্পর্কে তারা যেটুকু জেনেছে তার সবটাই কাগজপত্র পড়ে এবং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, থিয়েটার ওয়ার্ল্ডের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে। অবশ্য নয়নতারার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে তেমন কিছু জোগাড় করা যায় নি। কিন্তু সেসবের ওপর নির্ভর করে,একটা নিখুঁত বিশ্বাসযোগ্য জীবনচিত্র তৈরি করা যায় না। বিদ্বেষের কারণে অনেকে নয়নতারা সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য করেছে, আবার প্রবল উচ্ছ্বাসে অন্ধ অনুরাগীরা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তাঁর অলৌকিক এক ইমেজ তৈরি করে চোখ কান ধাঁধিয়ে দিয়েছে। সেটা নয়নতারার জীবনের একটা বড় দিক নিঃসন্দেহে, কিন্তু এর বাইরেও তাঁর ব্যক্তিগত একটা জীবনও রয়েছে তা একান্তভাবেই তার নিজস্ব। সেখানে মিডিয়া এখনও পৌঁছুতে পারে নি।

গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের মানুষ, বিশেষ করে চিত্রতারকারা দুধরনের হয়ে থাকে। হয় তারা দারুণ খোলামেলা, এদের গোপন বলতে কিছু নেই। আবার কেউ কেউ আছে যারা নিজের সম্বন্ধে খানিকটা জানিয়ে বেশির ভাগটাই রহস্যের মোড়কে ঢেকে রাখে। এরা হয়তো মনে করে এই গোপনতা তাদের সম্পর্কে লোকের কৌতূহল অনেক বাড়িয়ে দেবে। মিডিয়া এদের পেছনে উদভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকে। নয়নতারা কিন্তু এই দুদলের কোনোটাতেই পড়েন না। স্টেজ বা স্ক্রিন কেরিয়ার নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মোহ নেই। মিডিয়াকে হাজার মাইল দূরে সরিয়ে একেবারে নিজের মতো করে জীবনযাপন করতে চান। কোনো গ্ল্যামার বা রহস্যসৃষ্টির জন্য নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে।

অন্য চিত্রতারকারা টাকা, নাম, গ্ল্যামার, এসব নিয়েই খুশি। কিন্তু তাদের থেকে আলাদা নয়নতারা, নইলে গ্ল্যামারের সেন্টার স্টেজে থাকতে থাকতে কেউ এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়?

মিডিয়া যে মিথ তৈরি করে রেখেছে তার বাইরেও অন্য এক নয়নতারা আছেন যিনি গ্ল্যামারের মধ্যে জীবন কাটাতে চান না। স্টেজ এবং স্ক্রিনের বাইরে কোন ভূমিকা তিনি পালন করছেন সেটা এখনও জানা যায়নি। তবে এই দুই নয়নতারাকে মেলাতে পারলে তবেই তাব ডকু-ফিচারটা জীবন্ত হয়ে উঠবে।

এ সব জানিয়ে রণিতা নয়নতারাকে বলে, এর জন্য বেশ কিছুদিন কাছে কাছে থেকে আপনাকে অবজার্ভ করা দরকার।

চোখ কুঁচকে কয়েক পলক রণিতাকে লক্ষ করেন নয়নতারা। তারপর বলেন, সেটা কী করে সম্ভব? তুমি থাকো ও বালিগঞ্জে, আমি ওল্ড আলিপুরে। চার মাইল দূরে থেকে অবজার্ভ করবে কী করে?

আপনি একটু ভাবুন–

ভাবাভাবির কী আছে। কাছে থেকে অবজার্ভ করতে হলে তো তোমাদের এখানে এসে থাকতে হয়–

আমারও তাই মনে হয়।

নয়নতারা ঝাঁঝিয়ে উঠতে গিয়ে হেসে ফেলেন, তুমি অতি ধুরন্ধর ছুকরি, সাঙ্ঘাতিক ফন্দিবাজ। আমার মুখ দিয়ে নিজের মতলবের কথাটা ঠিক বার করে নিলে।

রণিতা হাসতে থাকে।

নয়নতারা জিজ্ঞেস করেন, কতদিন আমার বুকের ওপর চেপে বসে থাকতে চাও?

রণিতা বলে, যতদিন না আপনাকে পুরোপুরি জানতে পারছি। একটু চুপচাপ।

এবার রণিতা বলে, আমরা সকালে চলে আসব, সন্ধের পর ফিরে যাব। রাত্তিরে থাকব না।

নয়নতারা অবাক হবার ভান করেন, সে কী! তাঁর বিস্ময়ের কারণটা বুঝতে না পেরে রণিতা বিমূঢ়ের মতো তাকায়।

নয়নতারা ঝপ করে গলা নামিয়ে চাপা ফিসফিসানির মতো বলে, রাত্তিরে থাকলে কেলেঙ্কারি টেলেঙ্কারি করছি কিনা জানবে কী করে?

রণিতার মতো স্মার্ট ঝকঝকে মেয়েও কেমন যেন হকচকিয়ে যায়, কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না।

নয়নতারা থামেন নি, এইসব কেলেঙ্কারি টেলেঙ্কারি যদি ভাল করে ইউজ করতে পার তোমার ডকু-ফিচারটা কিন্তু দুর্দান্ত জমে যাবে।

রণিতা বুঝতে পারছিল নয়নতারা মজা করছেন। সে সসম্ভ্রমে বলে, আপনি ওসব করেন, এ আমি বিশ্বাস করি না।

কৌতুকে নয়নতারার ভুরু অল্প অল্প নাচতে থাকে। তিনি বলেন, আমার বয়েস ষাট হয়েছে বলে? জানো না আমার নামে চারদিকে কত স্ক্যান্ডাল। আট বছর আগে ফিল্ম টিন্ম ছেড়ে চলে এসেছি, স্ক্যান্ডালটা কিন্তু আমার পিছু ছাড়ে নি, সুযোগ পেলে কেউ না কেউ এখনও আমার নামে কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়।

যে যা খুশি করুক, স্ক্যান্ডাল নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।

কিছুক্ষণ কেউ আর কিছু বলে না।

তারপর নয়নতারা শুরু করেন, বেশ, সকালে এসে সারাদিন থেকে চলে যেও। একজন নিবাপিত চিতারকা যে এখন আর কিছুই করে না, সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, তার কাছে থাকতে থাকতে বোর হয়ে যাবে।

হাসিমুখে রণিতা বলে, দেখা যাক।

কবে থেকে আমাকে পর্যবেক্ষণ করতে চাও?

আপনি যেদিন থেকে বলবেন।

নয়নতারা বলেন, জ্বালাতন যখন করবেই তখন আর দেরি করে কী হবে। কাল থেকেই শুরু করে দাও।

রণিতা বলে, থ্যাঙ্ক য়ু ম্যাডাম।

ওদের কথাবার্তার মধ্যে কটা ফোন আসে। সবাইকেই ওপার বাংলার ডায়লেক্টে সেই সেদিনের মতো নয়নতারা জানিয়ে দেন, মেমসাব বাড়িতে নাই। কহন তেনারে পাইবেন, কইতে পারুম না। নমস্কার–পন্নাম আইচ্ছা রাখি।

ফোনের কথোপকথন শেষ হলে নয়নতারা রণিতাকে বলেন, তোমাদের যে এই বাড়িতে ঢুকে ডকু-ফিচারটা করতে দিচ্ছি তাতে আমার কিছু স্বার্থ আছে। আমার একটা কাজ হয়তো তোমাদের করে দিতে হবে।

রণিতা উৎসুক সুরে জিজ্ঞেস করে, কী স্বার্থ? কী কাজ?

এক্ষুনি সেটা বলছি না। নয়নতারা বলেন, কিছুদিন তোমাদের দেখি, তারপর বলব।

হালকা গলায় রণিতা বলে, আমাদের যাচাই করে নিতে চান?

যা বলেছ। নয়নতারাও হাসেন।

.

১৮.

পরদিন বেশ সকালেই অমিতেশ আর রণিতা টেপ রেকর্ডার, নোট বুক পেন, নানা রঙের টিউব, তুলি, একটা স্টিল ক্যামেরা ব্যাগে পুরে চলে আসে রণিতার আঁকার হাত চমৎকার, যদিও আর্ট স্কুলে কোর্স করে ডিগ্রি বা ডিপ্লোম নেয় নি। তাকে মোটামুটি স্বয়ংশিক্ষিত বলা যায়, নিজের চেষ্টাতেই যা শেখার সে শিখেছে।

চিত্রনাট্য লেখার ব্যাপারে সত্যজিৎ রায় তার মডেল। তাঁর মতোই নানা দৃশ্যের ছোট ছোট স্কেচ সে আগেই এঁকে নেয়। নয়নতারাকে নিয়ে যে ডকু ফিচারটার পরিকল্পনা রণিতা করেছে তার স্ক্রিন-প্লে লেখার সময় এখনও আসে নি, তবু তাঁর নানা মুডের বেশ কিছু ছবি এঁকে রাখবেরণিতা, পরে এগুলোকে চলমান দৃশ্যমালার ফাঁকে ফাঁকে ব্যবহার করবে। রঙিন এই স্কেচগুলো ডকু ফিচারটির আকর্ষণ অনেক বাড়িয়ে দেবে।

এখানে আপাতত তাদের একমাত্র কাজ হবে নয়নতারাকে সারাদিন অনুসরণ করে যাওয়া, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত তিনি কিভাবে কাটান তা লক্ষ করা। মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে কথা বলে নানা তথ্য জেনে নেওয়া এবং যে সব উপকরণ এতদিন ধরে জোগাড় করেছে সেগুলো কতটা সত্যি আর কতটা রটনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা।

আটটার আগেই এ বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল রণিতারা। এর মধ্যে স্নান শেষ নয়নতারার। হালকা গোলাপি রঙের মিহি টাঙ্গাইল শাড়ি আর ঐ রঙেরই ব্লাউজ তাঁর পরনে। শ্যাম্পু-করা ফাঁপানো চুল পিঠময় ছড়ানো, চোখে সরু করে কাজলের টান, কপালে ম্যাজেন্টা রঙের গোল টিপ।

দোতলার বড় হল-ঘরে রণিতাদের বসিয়ে নয়নতারা বলেন, কাজ শুরুর আগে ব্রেকফাস্টটা করে নাও।

রণিতা বিব্রতভাবে বলে, আমরা খেয়ে এসেছি।

নয়নতারার চোখমুখ দেখে মনে হল, বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বললেন, কাল থেকে খেয়ে এলে কিন্তু চলবে না। সকালে ব্রেকফাস্ট, দুপুরে লাঞ্চ, বিকেলে স্ন্যাকস–সব এখানে, বুঝলে?

রণিতারা ঠিক করে রেখেছিল ব্রেকফাস্ট সেরে সকালে তারা এখানে আসবে, দুপুরে এক ফাঁকে বেরিয়ে কোথাও গিয়ে লাঞ্চটা খেয়ে আসবে। বিকেলে বিশেষ খাওয়া টাওয়ার অভ্যাস নেই তাদের। এ বাড়িতে তখন একটু চা পাওয়া গেলে ভাল, না পেলেও অসুবিধা নেই। সব রকম পরিস্থিতিতেই তারা অভ্যস্ত। মধ্যপ্রদেশের দুর্গম অঞ্চলে কিংবা আসামের মিকির পাহাড়ে ডকুমেন্টারি ছবি তুলতে গিয়ে বহুদিন তাদের খাওয়া জোটেনি। এসব নিয়ে তারা বিশেষ মাথা ঘামায় না। রণিতাদের কাছে কাজটাই আসল।

আতিথেয়তার ব্যাপারে বিন্দুবাসিনীর সঙ্গে নয়নতারার দারুণ মিল। খাওয়া নিয়ে আপত্তি করলে যদি এ বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায় সেই ভয়ে রণিতা বলে, ঠিক আছে, আপনি যা বলবেন তাই হবে।

নয়নতারা খুশি হন, গুড। একটু থেমে আবার বলেন, তোমাদের আসতে কিন্তু বেশ দেরি হয়ে গেছে। আমার দিন শুরু হয় ভোর সাড়ে পাঁচটায়। তখন একজন ইনস্ট্রাক্টর এসে আমাকে চল্লিশ মিনিট নানা রকম যোগাসন করিয়ে দিয়ে যায়। সেটা কিন্তু তোমাদের দেখা হল না।

আরেক দিন দেখে নেব।

অত ভোরে কি এখানে পোঁছুতে পারবে? দেখতে হলে আগের দিন রাত্তিরে এ বাড়িতে থেকে যেতে হয়।

আপনি অনুমতি দিলে থাকব।

ঠিক আছে, যেদিন ইচ্ছে থেকো।

একটা মুভি ক্যামেরা নিয়ে আসব কিন্তু।

আসনের ছবিগুলো তুলে রাখবে তো?

হ্যাঁ।

রেখো।

একটু চুপচাপ।

তারপর হঠাৎ হল-ঘরের ওয়াল ক্লকটার দিকে চোখ যেতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন নয়নতারা, আমাকে এবার উঠতে হবে। মেটিরিয়ালের খোঁজে তোমরা এ বাড়ির যেখানে ইচ্ছে যেতে পার। কাজের লোকেদের বলা আছে, কেউ বাধা দেবে না। চা খেতে ইচ্ছে হলে ওদের বলল, দিয়ে যাবে। বলতে বলতে উঠে পড়েন তিনি।

রণিতা জিজ্ঞেস করে, আবার কখন দেখা হবে আপনার সঙ্গে?

দুঘণ্টা পর।

আপনি কি বাইরে কোথাও যাবেন?

না, বাড়িতেই থাকব।

রণিতাদের আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে নয়নতারা বাঁ দিকের একটা ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যান।

তারপরও বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকে রণিতা আর অমিতেশ। নয়নতারা ওভাবে চলে যাওয়ায় তারা বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল।

একসময় অমিতেশ জিজ্ঞেস করে, হঠাৎ উনি চলে গেলেন কেন?

রণিতা বলে, কী করে বলব? হয়তো কোনো জরুরি কাজ আছে। একটু ভেবে বলে, বসে থেকে লাভ নেই। চল, বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখা যাক। কোন কোন স্পট থেক শুটিং করব সেগুলো ঠিক করে রাখি।

সেই ভাল।

এ বাড়ির যেখানে খুশি যাবার জন্য ঢালাও অনুমতি দিয়েছেন নয়নতারা। রণিতারা দোতলার ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। এখানে পাঁচটা বেড-রুম। সবগুলোই চমৎকার সাজানো গোছানো। হল-এর মতো শোবার ঘরের দেওয়ালেও নামকরা শিল্পীদের অসংখ্য চোখ-জুড়নো পেইন্টিং।

একটা ব্যাপার লক্ষ করল রণিতা, এত বড় বাড়িতে নিজের একটি ছবিও নেই। এমনকি যে শ দেড়েক ফিল্ম আর নাটকে তিনি নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তার একটি স্টিলও দেখা গেল না।

অমিতেশও তা লক্ষ করেছিল। সে বলে, কী ব্যাপার বল তো, নয়নতারার কোনো ছবি চোখে পড়ল না! নিজের সম্বন্ধে এত উদাসীনতা কেন ভদ্র মহিলার?

রণিতা বলে, কী জানি অন্য স্টাররা শুনেছি তাদের সারা বাড়ি নিজের ছবি দিয়ে বোঝাই করে রাখে। সেদিক থেকে নয়নতারা একটি মিস্টিরিয়াস ক্যারেক্টার।

দোতলা থেকে খানিক বাদে ওরা ছাদে চলে আসে। এখানে যেদিকেই তাকানো যাক, পলিথিনের পুরু শিটের ওপর দেড় ফুট মাটি বসিয়ে তার ওপর দারুণ একখানা রুফ গার্ডেন বানানো হয়েছে। মাঝখানে সবুজ কার্পেটের মতো খানিকটা ঘাসের জমিকে ঘিরে ছোট বড় অসংখ্য টবে পাতাবাহার, ঝাউ থেকে শুরু করে নানা ধরনের ফুল আর ফলের গাছ। একটা প্রকাণ্ড টবে অজস্র পাতিলেবু ফলে আছে, আরেকটায় গোল গোল পেয়ারা।

নয়নতারা যে গাছপালা ভালবাসেন সেটা এ বাড়িতে পা দিলেই টের পাওয়া যায়। সামনের দিকের খোলা বাগানে, একতলার সারি সারি পেতলের টবে আর এই রুফ গার্ডেনে শুধু গাছ আর গাছ।

মুগ্ধ চোখে রুফ গার্ডেনটা দেখছিল রণিতারা। হঠাৎ স্তোত্রপাঠের মতো কিছু কানে আসতে এধারে ওধারে তাকাতে থাকে। ছাদের পুব দিকের শেষ মাথায় একটা বেশ বড় ঘর চোখে পড়ে তাদের, সেখান থেকে কণ্ঠস্বরটা ভেসে আসছে।

রণিতা আর অমিতেশ পরস্পরের দিকে একবার তাকায়। তারপর নিঃশব্দে ঘরটার কাছে চলে আসে।

দরজা বন্ধ রয়েছে, তবে ডানপাশের জানালাটা খোলা। পায়ে পায়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় রণিতারা। উঁকি দিতে চোখে পড়ে একটা উঁচু বেদির ওর পশমের পুরু আসনের ওপর পা মুড়ে বসে আছেন নয়নতারা। চোখ দুটি বোজা, মেরুদণ্ড টান টান, হাত দুটি হাঁটুর ওপর ন্যস্ত। একেবারে ধ্যানস্থ চেহারা। সামনে কোনো দেবদেবীর মূর্তি নেই।

তন্ময় হয়ে নয়নতারা কিছু আবৃত্তি করে যাচ্ছিলেন, হয়তো কোনো ধর্মগ্রন্থের শ্লোক। তাঁর কণ্ঠস্বর আশ্চর্য সুরেলা, শোনাচ্ছিল অনেকটা গানের মতো। এই মুহূর্তে নয়নতারাকে ভারি পবিত্র মনে হচ্ছিল। ভারতীয় সিনেমার গ্ল্যামার কুইনকে এমন এক চেহারায় দেখা যাবে, কে ভাবতে পেরেছিল। মুগ্ধ চোখে পলকহীন তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে রণিতা।

অমিতেশ পাশ থেকে নিচু গলায় বলে, ভদ্রমহিলা যে এমন রিলিজিয়াস মাইন্ডেড সেটা এ বাড়িতে না এলে জানাই যেত না।

রণিতা অস্পষ্টভাবে কী উত্তর দেয়, বোঝা যায় না।

খানিকক্ষণ পরে দুজনে দোতলার হল-ঘরে নেমে এসে সোফায় বসে পড়ে।

অমিতেশ বলে, এখন এক কাপ চা পেলে খুব ভাল হত।

রণিতা বলে, নয়নতারা তো বলেই দিয়েছেন, আমাদের যা দরকার । কাজের লোকেদের জানালেই পেয়ে যাবে।

আশে পাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। নিচে গিয়ে–

অমিতেশের কথা শেষ হবার আগেই ডান ধারের ঘরটা থেকে একটি মাঝবয়সী লোক হল-ঘরে এসে ঢোকে। একে আগেও দেখেছে অমিতেশা, নাম হারাধন। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে রোজ সারা বাড়ির ধুলোবালি পরিষ্কার করা খুব সম্ভব তার আসল কাজ। অন্তত দেখে শুনে সেটাই মনে হয়েছে অমিতেশদের।

রণিতা বলে, আমাদের একটু চা খাওয়াতে পার হারাধনদা?

হারাধন সসম্ভ্রমে বলে, আমি এক্ষুনি সন্ধ্যাদিদিকে গিয়ে বলছি। বলে শশব্যস্তে চলে যায়।

কিছুক্ষণ পরে সেই মহিলাটি ট্রেতে টি-পট, সুগার কিউব, মিল্কপট এবং বোন চায়নার কাপ টাপ সাজিয়ে এনে রণিতাদের সামনে সেন্টার টেবিলে রাখে। বাড়িতে প্রথম যেদিন রণিতা আসে, তার জন্য এই মহিলাই ট্রলিতে করে ব্রেকফাস্ট . নিয়ে এসেছিল। এর নাম যে সন্ধ্যা সেটা অবশ্য জানা ছিল না।

সন্ধ্যা দাঁড়ায় না, ট্রে নামিয়ে রেখে চলে যায়। হয়তো ভেতরে তার কোনো জরুরি কাজ আছে।

ধীরেসুস্থে চা তৈরি করে একটা কাপ অমিতেশকে দিয়ে নিজে এক কাপ নেয় রণিতা। সবে ওরা চায়ে চুমুক দিয়েছে, নয়নতারা হল-ঘরে চলে আসেন। খুব সম্ভব সোজা ছাদ থেকেই আসছেন তিনি। ওঁকে দেখে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল রণিতারা, নয়নতারা বলেন, বস, বস। নিজেও ওদের পাশে বসতে বসতে বলেন, এত বেলায় চা খাচ্ছ। লাঞ্চের সময় কিন্তু হয়ে গেছে।

অমিতেশ বলে, চাটা আমরা একটু বেশিই খাই। আমাদের কাছে এনি টাইম ইজ টি টাইম।

নয়নতারা এ নিয়ে আর কিছু বলেন না।

একটু চুপচাপ।

তারপর রণিতা বলে, আজ একজন বিখ্যাত মানুষকে আমরা নতুন করে আবষ্কার করেছি। সাজানো গোছানো বইয়ের ভাষাতেই কথাগুলো বলল সে।

নয়নতারা কিছু একটা অনুমান করে উৎসুক সুরে জিজ্ঞেস করেন, কাকে আবিষ্কার করলে?

রণিতা বলে, আপনাকে। ধর্মের ব্যাপারে আপনার যে এতটা নিষ্ঠা, আগে আমাদের ধারণা ছিল না।

নয়নতারা চোখ সরু করে সকৌতুকে রণিতাকে লক্ষ করতে করতে বলেন, বুঝেছি। তোমরা নিশ্চয়ই ছাদে গিয়েছিলে?

হ্যাঁ। আস্তে মাথা নাড়ে রণিতা।

আসলে ধর্ম কিনা জানি না, আমার ঠাকুরদা ছেলেবেলায় গীতা, চণ্ডী, ব্যাসদেবের মহাভারত আর বেদ-উপনিষদের অসংখ্য শ্লোক আমাকে মুখস্থ করিয়েছিলেন। তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন বোজ সকালে একঘণ্টা করে শ্লোকপাঠ করতে হত। তিনি মারা যাবার পরও অভ্যাসটা গেল না। ওটা কেমন যেন নেশার মতো হয়ে দাঁড়াল। পরে আমার বিয়ে হল, তারপর দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় চলে এলাম। বেঁচে থাকার জন্যে অভিনয় শুরু করলাম। তিরিশ বত্রিশটা বছর সিনেমা আর স্টেজে কী প্রচণ্ড ব্যস্ততার ভেতরেই না কেটে গেল কিন্তু তার মধ্যেও সময় করে শ্লোকপাঠটা চালিয়ে যেতে লাগলাম। আর এখন তো রিটায়ার্ড লাইফ। হাতে অনন্ত সময়। আগে এক ঘণ্টা শ্লোকপাঠ করতাম, আজকাল সেটা বাড়িয়ে করেছি দুঘণ্টা। একটানা বলতে বলতে একটু থামেন নয়নতারা। তারপর ধীরে ধীরে ফের শুরু করেন, এর সঙ্গে ধর্মের যোগ কতটা, বলতে পারব না। তবে আমার খুব ভাল লাগে। কী যে আনন্দ পাই, বোঝানো যাবে না। কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনটা সবরকম গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এই সময়টা আমার মনে হয়, বিরাট কিছু পেয়ে গেলাম।

রণিতারা লক্ষ করল, নয়নতারার সারা মুখে আশ্চর্য প্রশান্তি। তাঁর দুই চোখ অপার্থিব কোমল আলোয় ভরে গেছে।

অনেকক্ষণ কেউ আর কিছু বলে না।

এদিকে রণিতাদের চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। একসময় নয়নতারা বলেন, চল এবার খেয়ে নেওয়া যাক।

এ বাড়ির একতলা এবং দোতলা, দুজায়গাতেই ডাইনিং হল রয়েছে। নয়নতারা রণিতাদের সঙ্গে করে একতলায় চলে আসেন।

খাবার ঘরের পাশেই কিচেন। সেখানে বয়স্ক রান্নার লোক ছাড়া সন্ধ্যা এবং আরেকটি কম বয়সের মেয়ে যার নাম মালতী, অপেক্ষা করছিল।

নয়নতারা বলেন, বসো।

বড় রেক্ট্যাঙ্গুলার টেবিলের একদিকে বসেন নয়নতারা, তাঁর মুখোমুখি রণিতা আর অমিতেশ।

সন্ধ্যারা প্রস্তুত হয়েই ছিল। রণিতারা বসার সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট টেবল ম্যাট, চামচ, ফর্ক, ন্যাপকিন ইত্যাদি সাজিয়ে খাবার দিতে শুরু করল। প্রথমে এল ভেজিটেবল সুপ। তারপর রণিতা এবং অমিতেশের জন্য ধবধবে সরু চালের ভাত, ঘি, নারকেল দিয়ে মুগের ডাল, আলু ও বড়ি ভাজা, কপির ডালনা, রুই মাছের কালিয়া, টমাটোর চাটনি এবং ঘরে পাতা ঘন দুধের দই। নয়নতারা ভাত খান না, তাঁর জন্য এল সাদা গমের ছোট ছোট তিনখানা রুটি, সুপ, এক প্লেট সবজি সেদ্ধ, দু টুকরো মাছ, এক বাটি ডাল আর টক দই।

খেতে খেতে হঠাৎ রণিতার চোখে পড়ে, কিচেনের দেওয়ালে নয়নতারার তিনটি ফিল্মের তিনটে স্টিল ফটো এনলার্জ করে টাঙানো রয়েছে। অবাক হয়ে সে জিজ্ঞেস করে, একটা কথা বলব?

নয়নতারা বলেন, নিশ্চয়ই।

গোটা বাড়িতে আপনার কোনো ছবি নেই। দেড়শরও বেশি ফিল্ম আর নাটকে অভিনয় করেছেন। তার বেশির ভাগই সুপার ডুপার হিট। কিন্তু সে সব বাদ দিয়ে বক্স অফিসে মোটামুটি সাকসেস হয়েছে এমন তিনটে ছবির স্টিল টাঙিয়ে রেখেছেন, তাও কিনা কিচেনের ওয়ালে!

নয়নতারা উত্তর দেন না, সামান্য হাসেন।

রণিতা বলে, আমার খুব আশ্চর্য লাগছে, আপনার এত পপুলার ছবি থাকতে শুধু এই তিনটে ফিল্মের স্টিল কেন?

নয়নতারা স্থির চোখে রণিতার দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি তো বুদ্ধিমতী মেয়ে, তুমিই বল না–

এবার খুব ভাল করে স্টিলগুলো লক্ষ করতে থাকে রণিতা। জনপ্রিয় ছবি বা নাটককে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মাঝারি ধরনের সফল তিনটি ছবির স্টিল সযত্নে টাঙিয়ে রাখার মধ্যে কী মনোভাব কাজ করতে পারে?

স্টিল তিনটি যে ছবিগুলোর তা হল নিবেদিতা, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ এবং রানী রাসমণি। তিন মহীয়সী মহিলার জীবনী নিয়ে ফিল্মগুলো বিশ-পঁচিশ বছর আগে তৈরি হয়েছিল। বিদ্যুৎচমকের মতো রণিতার মনে হল, জাতির জীবনে যে তিন অসামান্যা নারী: বিরাট ভূমিকা পালন করে গেছেন, তাঁদের চরিত্রে অভিনয় করে নয়নতারা সবচেয়ে তৃপ্ত। ছবি তিনটি রণিতা দেখেছে, তার মনে হয়েছিল প্রাণ ঢেলে চরিত্রগুলি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। তার মানে, অনবরত রোমন্টিক ছবির নায়িকা হয়ে যে গণ্ডা গণ্ডা ছবিতে তিনি অলীক স্বপ্ন বিকিরণ করে গেছেন সেগুলো সম্বন্ধে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। নেহাত পয়সার জন্য নানা মালমশলা দিয়ে তৈরি এই ছবিগুলো তিনি করে গেছেন। যে ছবিতে সামাজিক তাৎপর্য বা দেশকাল সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা না থাকে সে ছবি তার কাছে মূল্যহীন।

রণিতা স্টিলগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে বলে, একটু বোধ হয় বুঝতে পেরেছি।

হাসিমুখে, বুঝিবা একটু মজার সুরেই নয়নতারা বলেন, শুনি, কী বুঝেছ–

স্টিল তিনটে দেখতে দেখতে খানিক আগে রণিতার যা মনে হয়েছিল, আস্তে আস্তে বলে যায় রণিতা।

শুনতে শুনতে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন নয়নতারা। তাঁর কণ্ঠস্বর থেকে কিছুক্ষণ আগের মজার ভাবটা দ্রুত মুছে যায়। বেশ জোর দিয়েই বলেন, দ্যাটস লাইক আ ভেরি ভেরি ইনটেলিজেন্ট গার্ল। তুমি ঠিকই ধরেছ, যে ছবি বা নাটকে সোসাল অ্যাসপেক্ট নেই বা দেশ আর মানুষ সম্পর্কে যার মধ্যে কোনোরকম কমিটমেন্ট নেই তা আমার ভাল লাগে না। নায়কের বুকে মুখ বা মাথা রেখে, কী তাকে মুহুর্মুহু জড়িয়ে ধরে, তার গালে নাক ঘষে দিনের পর দিন পদায় সফট পননা তৈরি করে কিছু পয়সা পাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু অ্যাজ অ্যান আর্টিস্ট, আ রিয়াল হিউম্যান বিয়িং, এটাই কি জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য?

নয়নতারাকে যেন এবার অল্প অল্প বোঝা যাচ্ছিল, সেই সঙ্গে তাঁর স্বেচ্ছা নির্বাসনের কারণটাও। রণিতা জিজ্ঞেস করে এই জন্যেই কি সব ছেড়ে একদিন অজ্ঞাতবাসে চলে গিয়েছিলেন?

আজ খুব একটা ভাল মুডে আছেন নয়নতারা। যে কথা আট বছর ধরে কখনও প্রকাশ করেন নি, ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে পারে নি তাঁর আকস্মিক গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড ত্যাগের কারণ, দুটি ঝকমকে, শ্রদ্ধাশীল তরুণ-তরুণীকে সামনে পেয়ে তা বলার জন্য তিনি উন্মুখ হয়ে উঠেছেন।

নয়নতারা বলেন, তা বলতে পার। তবে অন্য কিছু কারণও আছে। সে সম্বন্ধে পরে আলোচনা করা যাবে। একটু থেমে ফের বলেন, আসল ব্যাপারটা কী জানো, ঐ সব কমার্শিয়াল ছবিতে কাজ করতে করতে আমি টায়ার্ড হয়ে পড়েছিলাম। প্রতিটি ছবিতে প্রায় এক ধরনের ক্যারেক্টার, একই রকম ডায়লগ, একই টাইপের সিচুয়েশন। বাচ্চারা শ্লেটের ওপর যেমন দিনের পর দিন দাগা বুলিয়ে যায়, অনেকটা সেই রকম। কিংবা বলতে পার একটা ছবি আরেকটার প্রায় জেরক্স কপি। এসব তো ছিলই, সেই সঙ্গে একটা প্রশ্ন বার বার আমাকে খোঁচা দিয়ে যাচ্ছিল।

জিজ্ঞাসু সুরে রণিতা জিজ্ঞেস করে, কী সেটা?

স্টোরি রাইটার ক্যারেক্টার তৈরি করত–কোনো ছবিতে তার নাম শ্যামলী, কোনো ছবিতে বিশাখা, কোনোটায় সুপর্ণা বা মীনাক্ষী। ছবিতে নেমে আমি কখনও শ্যামলী, কখনও বিশাখা ইত্যাদি হয়ে গেলাম। ডায়ালগ রাইটাররা সংলাপ লিখে দিল, আমি গড়গড় সেগুলো আউড়ে গেলাম। ডিরেক্টর যেভাবে হাত-পা নাড়তে বলল, যেভাবে হাসতে বা লাফাতে ঝাঁপাতে বলল, হুবহু তাই করতে লাগলাম। স্বপ্নের সওদাগরেরা আমাকে স্ক্রিনের ড্রিম গার্ল বানিয়ে দিল। মিডিয়ার লোকেরা আমাকে নিয়ে হাজারটা মিথ তৈরি করে ফেলল। এমনকি আমার আসল নামটা পালটে নয়নতারা রাখা হল। ঠিক আছে, ধরা যাক, নামে না হয় কিছু আসে যায় না। কিন্তু–

রণিতারা কিছু বলে না, শুধু উন্মুখ তাকিয়ে থাকে।

নয়নতারা থামেন নি, আমর মনে হল, চিরকাল সুপণা, বিশাখা, শ্যামলী হয়েই কাটিয়ে দেব? মিডিয়া আমার যে ইমেজ তৈরি করে দিয়েছে তার বাইরে কোনোদিন বেরিয়ে আসতে পারব না? অন্যের হুকুমে নেচে গেয়ে আর ডায়ালগ বলেই জীবনটা শেষ হয়ে যাবে? নিজের বুকে একটা আঙুল রেখে বলেন, আমার মধ্যে যে লক্ষ্মী বা মমতা রয়েছে তার কি কিছুই করণীয় নেই? তাই

একদিন সব ফেলে নির্বাসনে চলে গেলাম। কিন্তু–

কিন্তু কী?

মিডিয়ার তৈরি মিথ আর ইমেজ আমার পিছু ছাড়ল না। ওরা আমার গায়ে এমন একটা স্ট্যম্প মেরে দিয়েছে যে রাস্তায় বেরুনো অসম্ভব। আট বছর আমি গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে নেই, তবু পুরনো ইমেজ আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সত্যি বলছি আমি এর হাত থেকে মুক্তি চাই।

কিছুক্ষণ চুপচাপ।

তারপর রণিতা বলে, আপনি তো নিজের মতো কিছু করার জন্যে নাটক আর ফিল্ম ছেড়েছিলেন। এই আট বছর কী করলেন?

নয়নতারা বলেন, সেটা বলার মতো নয়। তবে অনেক কিছুই করার ইচ্ছা।  

যেমন?

তোমরা তো এখন থেকে রেগুলার আসছ। চোখ কান খোলা রাখলে নিজেরাই জানতে পারবে।

রণিতা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, কসবায় যে জমিটা কিনতে যাচ্ছেন সেটা দিয়ে কী করতে চান? যদিও জমির মালিকের সঙ্গে সেদিন কথা বলে তারা জেনে এসেছে মহৎ উদ্দেশ্যেই ওটা কেনা হচ্ছে, তবু প্রশ্নটা করল সে।

নয়নতারা চমকে ওঠেন, তোমরা জানলে কী করে? পরক্ষণে হেসে ফেলেন, ও বুঝেছি। সেদিন একজনের সঙ্গে ফোনে জমিটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। তখন তোমরা কাছে বসে ছিলে। তা কসবা পর্যন্ত ও তোমরা পৌঁছে গেছ? কী বিচ্ছু ছেলেমেয়ে!

অমিতেশ নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছিল। এবার সে বলে, আমাদের সময়ের একজন লিজেন্ডারি আর্টিস্টকে নিয়ে ছবি করতে যাচ্ছি। তাঁর জীবনের সব দিক জানতে না পারলে ছবিটায় অনেক ফাঁক থেকে যাবে যে। কসবার খবরটা পেয়েই তাই ছুটে যেতে হল।

নয়নতারার কপাল সামান্য কুঁচকে যায়। তবে তিনি যে এই গোয়েন্দাগিরির জন্য বিরক্ত হন নি সেটা তাঁর মুখ দেখে টেব পাওয়া গেল। হাল ছেড়ে দেবার মতো কপট একটা ভঙ্গি করে বলেন, তোমাদের নিয়ে আর পারা যায় না।

রণিতা জিজ্ঞেস করে, ঐ জমিটা নিয়ে দারুণ কিছু একটা করার পরিকল্পনা নিয়েছেন নিশ্চয়ই?

তার ইচ্ছা নয়নতারা নিজের মুখেই সব বলুন। কিন্তু তিনি মৃদু হেসে শুধু বলেন, ওয়েট অ্যান্ড সি।

আপনি বলেছিলেন, আমাদের দুজনকে কী একটা কাজে লাগাবেন—

এই তো সবে যাওয়া-আসা শুরু করলে। কদিন যাক না, নিশ্চয়ই লাগাব।

কিছুক্ষণ চুপচাপ খেয়ে যায় ওরা।

একসময় রণিতা বলে, একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করে।

নয়নতারা জিজ্ঞাসু চোখে তাকান।

রণিতা বলে, আপনি তো এত বড় একজন শিল্পী। আপনার কি আর অভিনয় করতে একেবারেই ইচ্ছে নেই?

অনেকক্ষণ উত্তর দেন না নয়নতারা। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, নিশ্চয়ই করে। একবার যে ক্যামেরা আর ফুটলাইটের সামনে দাঁড়িয়েছে তার পক্ষে অভিনয় ছেড়ে দেওয়াটা যে কত কষ্টকর, একজন অ্যাক্টর বা অ্যাক্ট্রেস না হলে সেটা বোঝানো যাবে না। তবে মিনিংফুল, পারপাসফুল ছবি ছাড়া আমি কিছু করব না। আমি চাই না কেউ আমাকে টাকা তৈরির মেশিন হিসেবে ব্যবহার করুক।

ধরুন তেমন ছবির অফার নিয়ে কেউ যদি আপনার কাছে আসে?

তোমার ভীষণ উৎসাহ দেখছি। তোমার হাতে তেমন কেউ আছে নাকি?

রণিতা বলে, না। তবে খবরের কাগজে যদি লিখি, আপনি আপনার শর্ত অনুযায়ী ফিল্ম ওয়ার্ল্ডে ফিরতে চান, বহু প্রোডিউসার ডিরেক্টর এ বাড়ির সামনে লাইন লাগিয়ে দেবে।

নয়নতারা আঁতকে ওঠেন, না, একেবারেই না। তোমাদের সঙ্গে জেন্টলম্যানস এগ্রিমেন্ট হয়েছে, আমাকে না জানিয়ে আমার কোনো খবর বাইরে জানাবে না, সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। তা ছাড়া এ ব্যাপারে আমি এখনও মনস্থির করে উঠতে পারিনি। যদি কখনও করি প্রোডিউসারদের দরকার নেই। নিজেই সব ব্যবস্থা করব।

খাওয়া শেষ হলে নয়নতারা বলেন, আমাকে এখন তিন ঘণ্টা ছুটি দিতে হবে কিন্তু। ঠিক চারটের সময় আবার তোমাদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

রণিতা জিজ্ঞেস করে, দুপুরে কি আপনার ঘুমনোর অভ্যাস আছে? একেবারেই না।

তা হলে?

নয়নতারার মুখে লাজুক একটু হাসি ফোটে। বলেন, এই সময়টা একটু আধটু বইটই পড়ি, আর–

রণিতা বলে, আর কী?

সামান্য লেখালিখির চেষ্টা করি।

দারুণ উৎসাহিত হয়ে ওঠে রণিতা, কী লেখেন আপনি? ডায়েরি?

নয়নতারা বলেন, তেমন কিছু নয়।

এদিকে অমিতেশ তৎপর হয়ে ওঠে। সে জানে নয়নতারার লেখার কোয়ালিটি যেমনই হোক তাঁর নামের মধ্যে একটা ম্যাজিক রয়েছে। ওঁর লেখা ছাপতে পারলে চারদিকে হই হই শুরু হবে, রাতারাতি কাগজের সার্কুলেশন অনেক বেড়ে যাবে। এমন সুবর্ণ সুযোগ ছাড়া যায় না। সে বলে, ডায়েরি লিখলে আমরা ইন্টারেস্টেড। ফার্স্ট অফারটা কিন্তু আমি দিয়ে রাখলাম। আপনার সব শর্ত মেনে ওটা ছাপাতে চাই। যদি বলেন অ্যাডভান্স অনারেরিয়াম কালই দিয়ে যাব।

নয়নতারা হাসেন, অত ব্যস্ত হতে হবে না। তবে এটুকু জেনে রাখো, ডায়েরি আমি লিখছি না।

যা-ই লিখুন আমরা তাই ছাপব।

ছাপার যোগ্য কিনা সেটা না জেনেই?

অমিতেশ বলে, আপনি যখন লিখেছেন তখন নিশ্চয়ই ভাল হবে।

নয়নতারা বলেন, আমার ওপর তোমার অগাধ আস্থা দেখছি। পরক্ষণে চোখ সরু করে, গলার স্বর অনেকখানি নামিয়ে ফের বলেন, নাকি আমার নামের গ্ল্যামারটা কাজে লাগাতে চাও?

অমিতেশ থতমত খেয়ে যায়। মহিলা যে দুর্দান্ত বুদ্ধিমতী তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। সে বলে, না না, মানে–

নয়নতারা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, তোমার অফার আমার মনে থাকবে। এখন দুজনে ইচ্ছে হলে কিছুক্ষণ রেস্ট নিতে পার।

রণিতা বলে, আপনি যখন লেখাপড়া করেন, সেই সময়কার কিছু ছবি নিতে চাই।

ডকু-ফিচারের জন্যে?

হ্যাঁ।

ঠিক আছে, পরে নিও।

নয়নতারা আর দাঁড়ান না, বড় বড় পা ফেলে চলে যান। রণিতারা ঠিক জানে না, তবে ওদের মনে হল, একতলার কোথাও বসে লেখাপড়ার কাজটা করেন নয়নতারা।

দুপুরে বিশ্রাম বা ঘুমনো টুমনো রণিতাদের ধাতে নেই। দোতলার হল-এ সোফায় গা এলিয়ে নয়নতারাকে নিয়ে আলোচনা করে করেই তারা তিনটে ঘণ্টা কাটিয়ে দিল।

.

১৯.

ঠিক চারটেতেই নয়নতারার সঙ্গে আবার দেখা হল রণিতাদের। সন্ধ্যাকে সঙ্গে নিয়ে একতলা থেকে তিনি ওপরে উঠে এলেন। সন্ধ্যার হাতে একটা বড় ট্রেতে চায়ের সরঞ্জাম, কটা কেক, কিছু বিস্কুট এবং সন্দেশ।

মহিলা যে অত্যন্ত সময়ানুবর্তী, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে তাঁর চলাফেরা, ঘুম বিশ্রাম, শ্লোকপাঠ, একদিনেই এসব টের পেয়ে গেছে রণিতারা।

ট্রে রেখে চলে যায় সন্ধ্যা। নয়নতারা চা তৈরি করে রণিতাদের দিয়ে নিজে এক কাপ নেন, তারপর জিজ্ঞেস করেন, সারাদিন বাড়ির ভেতর থেকে থেকে খুব একঘেয়ে লাগেছে, না?

রণিতা বলে, না না, একেবারেই না। আমরা বরং আপনাকে নানা দিক থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছি।

জিভের ডগায় চুক চুক আওয়াজ করে ফিচেল ধরনের একটু হাসেন নয়নতারা। মজার গলায় বলেন, কোথায় দুজনে চুটিয়ে প্রেম করে বেড়াবে, তা নয়। আমার মতো এক বৃদ্ধার পেছনে ঘুর ঘুর করছ। কোনো মানে হয়? কদিন এখানে যাওয়া-আসা করলে একেবারে বুড়িয়ে যাবে।

কথাগুলো যে নিছক মজা করার জন্যই বলা তা বুঝতে পারছিল রণিতারা। তারা শুধু হাসে।

নয়নতারা আবার বলেন, আমাদের ইস্ট বেঙ্গলে একটা কথা ছিল–সঙ্গ দোষে রং ধরে। আমার সঙ্গে থেকে থেকে একদিন দেখবে চোখে ক্যাটার্যাক্ট, হাঁটুতে আর্থারাইটিস, এই সব ধরিয়ে ফেলেছ।

রণিতারা হাসতেই থাকে। নয়নতারা কপট হতাশার একটা ভঙ্গি করে বলেন, যাক, আমার বার্ধক্যটা যখন শেয়ার করতেই চাও তখন আর বলার কিছু নেই। এবার বল এখন তোমাদের কী প্রোগ্রাম–

আগে থেকেই সব ঠিক কবে রেখেছিল রণিতা আর অমিতেশ। রণিতা বলে, আপনার সম্বন্ধে অনেক ইনফরমেশন আমরা জোগাড় করেছি। সেগুলো কতটা সত্যি আর কতটা রটনা ভেরিফাই করে নিতে চাই। তা ছাড়া ইস্ট বেঙ্গলে আপনার অনেকগুলো বছর কেটেছে। সে সম্পর্কে আমরা তেমন কিছুই জানি না। আপনার ঐ লাইফটাও আমাদের জানা দরকার।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন নয়নতারা। তারপর বলেন, বেশ, ইস্ট বেঙ্গলের ব্যাপারটাই আগে শোন। তোমাদের সঙ্গে টেপ রেকর্ডার আছে তো?

আছে।

ওটা চালিয়ে দাও।

অমিতেশ তার ব্যাগ থেকে টেপ রেকর্ডার বার করে সুইচ টিপে সেন্টার টেবলে রাখে। নয়নতারা বলতে শুরু করেন।

নয়নতারা জন্মের পর প্রথম একুশটা বছর কাটিয়েছেন পূর্ব বাংলায়। সেই জীবনটা আদৌ চমকপ্রদ নয়, খুবই সাদামাঠা, নিস্তরঙ্গ। তাঁর বাবা ছিলেন হাই স্কুলে জিওগ্রাফির টিচার। পুরনো জমানার মাস্টারমশাইরা যেমন ছিলেন তিনি

তেমনি আদর্শবাদী, পা থেকে মাথা পর্যন্ত সৎ এবং বেশ রক্ষণশীলও। নয়নতারা, তখনকার লক্ষ্মী বা মমতা, মা-বাবার একমাত্র সন্তান। খুব একটা সচ্ছলতা ছিল না, তবু বেশ আদরেই মানুষ হয়েছেন। ঢাকার কলেজ থেকে বি.এ পাস করেছিলেন। যে পরিবারে তাঁর বিয়ে হয়েছিল সেখানে সবাই অল্পবিস্তর শিক্ষিত। তাঁর স্বামী এবং এক দেওর গ্র্যাজুয়েট, স্বামীর অন্য ভাইয়েরা কেউ ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছিল, কেউ সে আমলের ম্যাট্রিকুলেট। তবে ওরা কেউ চাকরি বাকরি করত না। মাঝারি ধরনের পৈতৃক ব্যবসা ছিল ঢাকায়, সবাই সেটা চালাত। অবস্থা মোটামুটি ভালই বলা যায়।

শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দু-একটা পাশ টাশ করলেও, লেখাপড়ার খুব একটা চর্চা ওখানে ছিল না। ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি টিগ্রি ওরা জোগাড় করেছিল কিছুটা ওজন আর ইমপটান্স বাড়বার জন্য। নইলে ওগুলোর বিশেষ প্রয়োজন ছিল না।

ছোটখাট ব্যবসায়ীদের বাড়ির অখ্যাত গৃহবধূ হয়েই জীবন কেটে যেত সে আমলের মমতা বা লক্ষ্মীর। কিন্তু হঠাৎ দাঙ্গা এবং দেশভাগ হয়ে গেল। দাঙ্গায় তাঁর মা আর বাবা মারা যান। আর দেশভাগের কারণে ভাসতে ভাসতে তাঁরা কলকাতায় চলে আসেন শরণার্থী হিসেবে।

জীবন সংগ্রাম বলে একটা কথা আছে। তার চেহারা যে কতটা মারাত্মক, এবার সেটা টের পেতে থাকেন লক্ষ্মীরা। তাঁর স্বামী গ্র্যাজুয়েট হওয়ায় একটা কেরানির চাকরি জুটে গেল। তাঁর অন্য ভাইরা এবং শ্বশুর হন্যে হয়ে সারা শহর তোলপাড় করে ফেলতে লাগলেন কিন্তু দশ টাকার একটা কাজও জোগাড় করতে পারলেন না। অথচ বেঁচে তো থাকতে হবে। একজনের সামান্য কেরানির চাকরি সংসারের এতগুলো লোককে তো বাঁচাতে পারে না। তাই লক্ষ্মীকেই অন্য ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

কলকাতায় এসে প্রথমে কালিঘাটে উঠেছিলেন তাঁরা। তাঁদের পাশাপাশি থাকত ফিল্মের একজন অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টর বিনয় ধর। লক্ষ্মীদের অবস্থা দেখে সে ফিল্মে ওঁর কাজ করার সুযোগ করে দেয়।

নয়নতারা বলেন, এর পরের ইতিহাস কারো অজানা নেই। আশা করি তোমরাও জেনে গেছ।

রণিতা বলে, হাঁ। তবু দু-একটা প্রশ্ন আছে।

বল–

আমরা যেটুকু ইনফরমেশন পেয়েছি তাতে জানতে পেরেছি, আপনাদের ফ্যামিলি ছিল ভীষণ কনজারভেটিভ। তাঁরা আপনার ফিল্মে নামাটা যে ভালভাবে নেয়নি, সেটাও আমাদের জানা আছে। কিন্তু আপনার স্বামীর রি-অ্যাকশান কোথাও পাই নি।

নয়নতারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে জানান, তাঁর স্বামী ছিলেন ভাল মানুষ, নিরীহ টাইপের এবং ভীষণ চাপা। মুখে কিছু না বললেও তিনি যে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন সেটা স্পষ্ট বোঝা যেত। আসলে পুরুষ মানুষের গোপন অহঙ্কার ছিল তাঁর মধ্যে। স্বামী হয়ে লক্ষ্মীর ভরণ পোষণ করতে পারছেন না, বরং লক্ষ্মীই তাঁদের পরিবারে অন্ন জোগাচ্ছেন, এটাই তাঁকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিয়েছিল।

অমিতেশ জিজ্ঞেস করে, ওঁর সঙ্গে এই নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি, তর্কাতর্কি হয়েছে?

একেবারেই না। ও একেবারে চুপ হয়ে গিয়েছিল।

রণিতা বলে, শুনেছি, সিক্সটিজের গোড়ার দিকে আপনি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে গলফ ক্লাব রোডের একটা বাড়িতে একাই চলে গিয়েছিলেন। আপনার স্বামী আসেন নি কেন?

নয়নতারা বলেন, ও ছিল পুরনো ধ্যানধারণার মানুষ। স্ত্রীর জন্যে মা বাবাকে ছাড়তে রাজি হয়নি।

অমিতেশ মজার গলায় বলে, রামচন্দ্রের মডার্ন সংস্করণ।

নয়নতারা উত্তর দিলেন না।

রণিতা জিজ্ঞেস করে, শশুরবাড়িতে থাকলেন না কেন?

থাকা গেল না।

কারণটা কী?

আমার নাম হচ্ছিল। সোসাইটির ভি আই পিদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পাচ্ছিলাম। তাঁদের ধরে দেওরদের, এমন কি শ্বশুরেরও চাকরি করে দিয়েছি, ননদের এমন ছেলের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করেছি যা ওরা কল্পনাও করতে পারত না। নতুন একখানা বাড়িও করে দিলাম। তবু ওরা আমার সঙ্গে ভীষণ খারাপ ব্যবহার করতে লাগল। প্রোডিউসর ডিরেক্টররা তখন লাইন দিয়ে বাড়িতে আসছে, তাদেরও নানাভাবে অপমান করত।

আশ্চর্য! আপনার কাছে তো ওদের আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

নয়নতারার মুখে মলিন একটু হাসি ফোটে। তিনি বলেন, আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এটা ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স হীনম্মন্যতা। ঘরের বউয়ের গাদা গাদা

ছবি বেরুচ্ছে খবরের কাগজে, ম্যাগাজিনে, সারা শহর জুড়ে তার কাট আউট, তার মুখ দিয়ে পোস্টার, হোর্ডিং। এত নাম তার, অজস্র টাকা আনছে সে, তার দয়ায় সবার চাকরি হয়েছে– এসব কি মেনে নেওয়া যায়! হিউম্যান নেচার একটা বিচিত্র জিনিস।

কিছুদিন আগে নয়নতারার খোঁজে তাঁর শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল রণিতারা। তার দেওর তাদের সঙ্গে জঘন্য ব্যবহার করে। হেতুটা এতদিনে পরিষ্কার হয়ে যায়। কয়েক পলক কী ভেবে রণিতা বলে, একটা কথা জিজ্ঞেস করলে কিছু মনে করবেন না?

মনে করার মতো আশা করি কোনো প্রশ্ন করবে না।

শুনেই দেখুন না—

নয়নতারা উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকেন।

আপনি একজন হাউস ওয়াইফ। ফ্যামিলি পিসের জন্য ফিল্মটা তো ছেড়ে দিতে পারতেন।

বাঘের পিঠে কখনও চড়েছ?

না, মানে–

নয়নতারা গম্ভীর গলায় বলেন, চড়লে আর নামা যায় না। আমিও তেমনি সাকসেসের কাঁধে তখন চেপেছি। গ্ল্যামার, টাকা, নাম– এসব ছাড়ার কথা ভাবতেও পারতাম না, অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে তখন ছুটছি।

একটু চুপ।

তারপর রণিতা বলে, শুনেছি, আপনার সঙ্গে আপনার স্বামীর সম্পর্ক শেষ দিকে আর ছিল না।

নয়নতারা বলেন, ঠিকই শুনেছ।

ডিভোর্স হয়েছিল কি?

না। তবে ডিভোর্সের চাইতে ভাল কিছুও তো হয়নি। বলতে বলতে একটু থামেননয়নতারা।মুখ নামিয়ে চাপাবিষণ্ণসুরে বলেন, তারপর তোওমারাই গেল। আমাকে না জানিয়ে ওকে শ্মশানে নিয়ে গিয়েছিল। খবর পেয়ে ছুটলাম। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমাকে কাছে যেতে দিল না, কুৎসিত গালাগাল করতে লাগল। এদিকে আমাকে দেখে প্রচুর ভিড় জমে গিয়েছিল। কী বিশ্রী সিচুয়েশন ভেবে দেখ। নিরুপায় হয়ে পালিয়ে এলাম। স্বামীকে শেষ দেখাটাও ওরা দেখতে দিল না।

এরপর অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলে না। দোতলার এই বিশাল ঘরে গাঢ় স্তব্ধতা নেমে আসে।

কতজনের সঙ্গে আমাকে শুতে হয়েছে? নয়নতারা মনে মনে হিসেব করে বলেন, টোয়েন্টি– ইয়েস কুড়ি জন।

রণিতা চমকে ওঠে। রুদ্ধ স্বরে জিজ্ঞেস করে, আপনি যা বললেন তা কি ডকু-ফিচারে ইউজ করতে পারি?

এক মুহূর্তও চিন্তা করলেন না নয়নতারা। বললেন, নিশ্চয়ই। আমাদের দেশের বায়োগ্রাফি বা অটোবায়োগ্রাফিগুলোতে এত মিথ্যে বা হাফ-টুথ থাকে যে তাকে কোনোভাবেই নিখুঁত বলা যায় না। বিখ্যাত পুরুষ হলে তাকে দেবতা, আর মহিলা হলে তাকে দেবী বানাবার চেষ্টা। আরে বাবা, দোষত্রুটি ভালমন্দ মিশিয়েই তো মানুষ, সাদাকালো নিয়েই জীবনের ড্রামা। কেউ কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়ে যায়, যেমন আমি হয়েছিলাম। ব্ল্যাক সাইডটা বাদ দিলে লাইফ তো ম্যাড়মেড়ে, ওয়ান-ডাইমেনশানাল হয়ে যায়। তার কি কোনো চার্ম থাকে?

রণিতারা চুপ।

নয়নতারা বলেন, তোমাকে যা বললাম তার একটা শব্দও বাদ দেবে না।

রণিতা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, ঐ কুড়িজন কারা?

নয়নতারা চোখ বুজে ঠোঁট টিপে কী ভাবেন। তারপর বলেন, সেটা এখন বলছি না।

কেন?

এদের ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনিরা রয়েছে। তারা ওদের ঘৃণা করুক, ওদের পারিবারিক শান্তি নষ্ট হোক, সেটা আমি চাইছি না। তবে এই লোকগুলোর নাম এবং কখন কিভাবে ওরা আমার শরীর নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে রেকর্ড হিসেবে সব একটা ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। আমি ওগুলো প্রকাশ করতে চাই না। আমার মত্যুর পর কারো হাতে ডায়েরিগুলো পড়লে কী হবে, জানি না।

রণিতারা কোনো প্রশ্ন করে না, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে।

নয়নতারা একটানা বলে যান, হয়তো কোনোদিন সেসব প্রকাশ হয়ে পড়বে, হয়তো বা গোপনই থেকে যাবে।

রণিতা হঠাৎ বলে ওঠে, যে কুড়ি জনের কথা বললেন, আপনি নাম করার পর তাদের সঙ্গে আর কি দেখা হয়েছে? 

ফিল্ম ওয়ার্ডে তারপরও এতকাল কাটিয়ে দিলাম, দেখা হবে না?

সেই সময় আপনার সঙ্গে ওদের ব্যবহারটা কেমন ছিল?

প্রশ্নটা ঘুরিয়ে করলে ভাল হয়। ওদের না, আমার ব্যবহার কেমন ছিল। ঐসব বাস্টার্ডদের সঙ্গে রাস্তার কুকুরের মতো ব্যবহার করতাম। আমি যে ছবিতে নামতাম তখন সেটা সুপার ডুপার হিট হয়ে যেত। মিনিমাম ফুল হাউস-এ গোল্ডেন জুবিলি তো হতই। ঐ লোকগুলো এসে লিটারেলি আমার পায়ে ধরত, তাদের ছবিতে যদি দয়া করে অভিনয় করি। আমাকে নামাতে পারলে সিওর বক্স অফিস সাকসেস।

আপনি নামতেন ওদের ছবিতে!

হাঁ, নামতাম।

অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে রণিতারা।

নয়নতারা বলেন, একশবার ঘুরিয়ে, ফ্যাবুলাস অ্যামাউন্ট নিয়ে ছবিতে সাইন করতাম। শুটিংয়ের সময় যত ভাবে পারি ট্রাবল দিয়েছি। এক শিফটে যেখানে আট ঘন্টা কাজ করার কথা সেখানে আধ ঘন্টা কাজ করেছি। দিনের পর দিন শুটিং করতে যাই নি। মেক-আপ নেবার পর মুড নেই বলে বাড়ি চলে এসেছি। কাউকে কাউকে দিয়ে জুতোর স্ট্র্যাপ পর্যন্ত বাঁধিয়ে ছেড়েছি। প্রতি মোমেন্টে বুঝিয়ে দিয়েছি, পুরনো কথা ভুলি নি।

রণিতা বলে, এতে তো ওদের ক্ষতি হয়েছে।

অবশ্যই হয়েছে। আর সেটাই তো আমি চাইতাম। কিন্তু ব্যাপারটা কি জানো, প্রতিটা ছবিই বক্স অফিসে সাকসেস পেয়েছে।

রিভেঞ্জটা তা হলে ওভাবে নিয়েছেন?

তা একরকম বলতে পার।

রণিতা জিজ্ঞেস করে, নাম করার পর কেউ আর সুযোগ নিতে চেষ্টা কবে নি?

নয়নতারা বলেন, কোনো শুয়ারের বাচ্চাকে পা ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও হাত দিতে দিই নি।

মহিলার ক্রোধ এবং আক্রোশ যে এতদিন বাদেও কত তীব্র আকারে জমা হয়ে আছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না রণিতার। সে বলে, আপনার স্বামী যখন মারা যান, আপনার বয়স তখন আর কত, খুব বেশি হলে তিরিশ টিরিশ

হ্যাঁ, ঐ রকমই হবে।

সেই সময় কারও সঙ্গে ইমোশানাল অ্যাটাচমেন্ট কিছু হয় নি?

একটা চোখ ছোট করে নয়নতারা বলেন, তার মানে প্রেম করেছি কিনা জানতে চাইছ?

রণিতা বলে, হ্যাঁ। দুজন হিরোর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা তো বলেন–

তাকে থামিয়ে দিয়ে নয়নতারা বলেন, অমলকুমার আর চিরঞ্জীবের কথা বলছ নিশ্চয়ই?

হ্যাঁ।

পঁচিশ তিরিশ বছর আগেই ওদের বাজার শেষ হয়ে গেছে। আমাকে নিয়ে যখন ক্রেজ চলছে, ওদের তখন আর তেমন ডিমাণ্ড নেই। হিরো হবার অফার ওরা তখন পেত না বললেই হয়। দাদা, কাকা কি অন্য কোনো ক্যারেক্টার রোলেই বেশি নামত। আজকাল তো লোকে ওদের প্রায় ভুলেই গেছে। মাঝে মাঝে কাগজে দেখি অমলকুমার আমাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে কিছু কিছু স্ক্যাণ্ডাল বানিয়ে বাজারে ছাড়ে। সব বেসলেস, মিথ্যে। আসলে পাবলিসিটি হোক, ওর নাম নতুন করে লোকের মনে পড়ুক, খুব সম্ভব এটাই সে চায়। আমি আর কী করতে পারি বল। মনে মনে শুধু হাসি। তবে চিরঞ্জীব ঐ ধরনের নয়।

হঠাৎ অন্য একজন হিবোর কথা মনে পড়ে রণিতার। মাত্র কদিন আগে এর কথা জানতে পেরেছে সে। জিজ্ঞেস করে, আর প্রশান্ত ঘোষাল?

একটু চুপ করে থাকেন নয়নতারা। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, হি ইজ আ পারফেক্ট জেন্টলম্যান। কালচারড, ডিসেন্ট। আমার ওপর তিনি খুবই সিমপ্যাথেটিক। স্বীকার করছি ওঁর সঙ্গে আমার একটা ইমোশানাল অ্যাটাচমেন্ট ঘটেছিল। আমরা পরস্পরকে ভালবেসেছিলাম। রুচি এবং মানসিকতার দিক থেকে আমাদের যথেষ্ট মিল ছিল।

রণিতা জিজ্ঞেস করে, তখন কি আপনার স্বামী জীবিত ছিলেন?

না।

তা হলে বিয়ে করে আপনারা একসঙ্গে থাকলেন না কেন? এটা একটা আইডিয়াল ম্যারেজ হতে পারত।

এই বিয়েটা না হওয়ায় নয়নতারা যে একদিন ভেঙে পড়েছিলেন, সেই হতাশা যে এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেন নি, তাঁর মুখচোখ দেখে সেটা টের পাওয়া গেল। জোরে শ্বাস টেনে বিষণ্ণ সুরে বলেন, তার উপায় ছিল না।

রণিতা বলে, কেন?

সে অনেক কথা–

প্লিজ বলুন।

নয়নতারা আর আপত্তি করলেন না। ব্যক্তিগত যে ইতিহাস দীর্ঘকাল সঙ্গোপনে ছিল তা প্রকাশ করার জন্য অদ্ভুত এক ব্যাকুলতা হয়তো ভেতরে ভেতরে তীব্র হচ্ছিল। রণিতাদের মতো সহৃদয় শ্রোতা পেয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে তা বেরিয়ে আসতে লাগল।

নয়নতারা বলেন আজ আর কনফেস করতে দ্বিধা নেই, শুধু ভালবাসা নয়, আমরা পরস্পরকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিলাম। নিজের স্বামীকে যে ভালবাসিনি, তা নয়। সেটা বোধহয় সামাজিক সংস্কার পালনের জন্য। সমাজে দশজনের মধ্যে থাকতে গেলে স্বামীকে ভালবাসতে হয়, সেই নিয়মটা পালন করে গেছি। তবে এটা ঠিক, অনেক দিন এক সঙ্গে থাকলে মানসিক একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার স্বামী মানুষটা খারাপ ছিল না, ওর ওপর কেমন একটা মায়াও পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সত্যিকারের প্রেমটা যে কী, তা প্রশান্তর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার পর বুঝতে পারলাম। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারতাম না। মাঝে মাঝেই আমরা কলকাতা থেকে দূরে কোথাও চলে যেতাম। এই নিয়ে সে আমলে মিডিয়াগুলোতে কিছু স্ক্যাণ্ডাল রটেছে, আমরা গ্রাহ্য করতাম না। টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় আমাদের নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড চলত। তবে সামনাসামনি কারো কিছু বলার সাহস ছিল না। কেননা আমরা যে ছবিতে নামতাম তা পয়সা দিত। কে কী বলবে? অকপটে বলছি, ওর সঙ্গে আমার দৈহিক সম্পর্কও ছিল।

তবে এ বিয়েটা হল না কেন?

আমার দিক থেকে অসুবিধে ছিল না। তখন আমি একেবারে মুক্ত। আমরা মনে মনে তৈরিও হচ্ছিলাম, কিন্তু–

কী?

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না নয়নতারা। ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে বাঁ ধারের জানলা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকালেন। সেখানে অদৃশ্য টিভির পর্দায় যেন তার ফেলে আসা জীবনের কিছু ছবি ফুটে উঠতে থাকে। আকাশে চোখ রেখেই বলেন, একদিন দুপুরবেলা একজন বিধবা বয়স্কা মহিলা একটি শ্যামলা রঙের সুশ্রী বিবাহিত তরুণীকে নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে এসে হাজির। বিধবামহিলাটি প্রথমে নিজেদের পরিচয় দিলেন। তিনি প্রশান্তর মা, আর তরুণীটি তার স্ত্রী। স্ত্রীর নাম অমলা। এভাবে যে তারা আসবেন, ভাবতে পারি নি, তাছাড়া প্রশান্তর যে বিবাহিত, আমার জানা ছিল না। একেবারে হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। যাই হোক, খানিকটা সামলে নিয়ে ওদের আসার উদ্দেশ্যটা জানতে চাইলাম। প্রশান্তর মা আমার দুহাত ধরে বললেন, অমলার মা বাবা নেই, মামার কাছে মানুষ এবং সে বোবা এবংকালা এটা গোপন রেখে তার সঙ্গে প্রশান্তর মামাশ্বশুররা ওর বিয়ে দেয়। যখন প্রতারণাটা ধরা পড়ে প্রশান্ত স্ত্রীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। স্বাভাবিক কারণেই দাম্পত্য জীবনে সে ঘোর অসুখী। কিন্তু অমলা খুবই ভাল মেয়ে। তার যেমন মায়া-মমতা তেমনি কর্তব্যবোধ। এখন যদি প্রশান্ত নয়নতারাকে বিয়ে করে, আইন অনুযায়ী অমলাকে ডিভোর্স করতে হবে। বিবাহ বিচ্ছেদ হলে মামার সংসারে জায়গা হবে না তার, প্রশান্তদের বাড়িতেও থাকা সম্ভব হবে না। কোথায় যাবে দুঃখী অসহায় মেয়েটা? প্রশান্তর মা আমার দুহাত জড়িয়ে ধরে বললেন, এই মেয়েটার জন্যে আমি আমার ছেলেকে তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি। লক্ষঈরলামমলার বড় বড় সরল নিষ্পাপ চোখ দুটো জলে ভরে গেছে। আমার বুকের ভেতরটা ভেঙেচুরে তছনছহয়ে যাচ্ছিল।তবু প্রাণপণে নিজেকে সংযত করে বললাম, আমার সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনার ছেলে অমলারই থাকবে। আমাকে প্রচুর আশীর্বাদ করে ভদ্রমহিলা পুত্রবধূকে নিয়ে চলে গেলেন। সেই মুহূর্ত থেকে প্রশান্তর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আর রইল না।

এরপর ঘরের ভেতর অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে আসে।

অনেকক্ষণ পর চোখ দুটো আবার হল-ঘরে ফিরিয়ে আনেন নয়নতারা। মলিন একটু হাসি ফোটে তার মুখে। বলেন, আশা করি প্রশান্তর সঙ্গে আমার বিয়ে না হওয়ার একটা স্যাটিসফ্যাক্টরি ব্যাখ্যা দিতে পেরেছি।

বিমর্ষ সুরে রণিতা জিজ্ঞেস করে, আপনার সঙ্গে প্রশান্ত ঘোষালের আর দেখা হয় নি?

হবে না কেন? তার সঙ্গে এরপর কত ছবিতে কাজ করেছি, দেখা তো হবেই। এক ছবিতে কাজ না করলেও স্টুডিওতে তো যেতে হত। দেখতাম ও অন্য ছবির কাজ করছে।

বিয়ে নিয়ে কোনো কথা হত না?

আমি বলে দিয়েছিলাম, বন্ধুত্ব ছাড়া আমাদের ভেতর আর কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত না। আগেই বলেছি, প্রশান্ত ভদ্রলোক, আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলত। আমার ফ্ল্যাটে কখনও আসত না। টেলিফোনে অবশ্য খোঁজখবর নিত, কোনো দরকার আছে কিনা জিজ্ঞেস করত।

এখনও কি ওঁর সঙ্গে কথাবার্তা হয়?

না। আট বছর আগে স্টেজ আর ফিল্ম ছেড়ে দিলাম, তারপর আর কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখি নি।

এবার কিছুক্ষণ চুপচাপ।

নয়নতারা গভীর ঘোরে যেন ডুবে থাকেন। কতক্ষণ কেটে যায় কারো খেয়াল থাকে না।

একসময় নয়নতারা আচ্ছন্নতার ভেতর থেকে নিজেকে তুলে আনেন। ঘোরটা অনেকখানি কেটে গেছে। কিছুটা তরল গলায় বলেন, আমার আর কোনো অ্যাফেয়ার নিয়ে প্রশ্ন আছে?

আছে।

যথা–

রণিতা বলে, শুনেছি একজন পলিটিক্যাল লিডার এক সময় আপনাকে খুব জ্বালিয়েছিল।

নয়নতারা হাসতে হাসতে বলেন, ওহ, এত খবরও জোগাড় করেছ। ফিল্মমেকার না হয়ে তোমার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে যাওয়া উচিত ছিল।

রণিতা হাসে। বলে, যা বলেছেন, আপনার সম্পর্কে মেটিরিয়াল জোগাড় করতে গিয়ে আমাকে একজন ছোটখাট শার্লক হোমস হতে হয়েছে। এবার জননেতাটির কথা বলুন–

নয়নতারা বলেন, একজন না, দুজন পলিটিক্যাল লিডার। রমাপতি সরমেল আর জ্যোতিষ বটব্যাল।

রণিতা বলে, রমাপতির কথা ডিটেল কাগজে পড়েছি। কিন্তু জ্যোতিষ বটব্যাল সম্পর্কে কিছুই জানি না। যদি এর সম্বন্ধে বলেন–

নয়নতারা বলেন, এরকম স্কাউড্রেল আমার জীবনে খুব কমই দেখেছি। একেবারে দু-কান কাটা, নির্লজ্জ। আগে নাম-করা মাস্তান ছিল, একজন এম.পির হয়ে মারদাঙ্গা করত, ছাপ্পা ভোট দিত, বুথ জ্যাম করে তার স্যারকে জেতাবার ব্যবস্থা করত। এসব করতে করতে তার তৃতীয় নয়ন খুলে গেল। এই কৌশলে যদি ইলেকশানে জেতা যায় তা হলে সে দোষটা করল কী? কিছু মাসল পাওয়ার, কয়েকটা রাইফেল, কিছু বোমা, এসব তো তার হাতে আছেই, অতএব ভোট পাওয়াটা এমন কী ব্যাপার? নয়নতারা বলতে থাকেন, ব্যাকগ্রাউন্ডটা সাতকাহন করে বলছি, তার কারণ লোকটাকে বুঝতে সুবিধে হবে।

রণিতা বলে, হা হা, বলুন। ভেরি ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার।

নয়নতারা ফের শুরু করেন, তা ছাড়া মস্তানদের লোকে ভয় পেলেও মনে মনে ঘৃণা করে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা হতে পারলে মানুষ খাতির করে, স্যালুট পাওয়া যায়, সামাজিক প্রতিপত্তি বাড়ে। লোকটা অতএব পলিটিকসে এসে গেল। পলিটিকসের চেয়ে বড় বিজনেস তো আর নেই। আমি সবার কথা বলছি না, তবে বেশির ভাগই একবার এম এল এ, এম পি বা মন্ত্রী-টন্ত্রী হতে পারলে নিচের চোদ্দ পুরুষ নবাবের হালে থাকার ব্যবস্থা করে নেয়। এই লোকটি মস্তানি ছেড়ে দিল। তার নিজস্ব একটা বাহিনী ছিল। তারাই তার হয়ে ইলেকশানে খাটল। পুরনো বদনাম ঘুচিয়ে ভাল একটা ইমেজ তৈরি করার জন্যে নিজেকে পুরোপুরি পালটে ফেলল সে। শুধু বন্দুক দিয়ে খানিকটা ভোট টানা যায়, ইলেকশান পুরোপুরি জেতা যায় না। তার জন্যে আলাদা কৌশল দরকার। সবচেয়ে ভাল হয়। যদি একটা সোসাল ওয়ার্কার অর্থাৎ সমাজসেবীর ইমেজ তৈরি করা যায়। ভবিষ্যতের জন্যে ছক কেটে এগুতে লাগল সে। মোটা টাকা চাঁদা দিয়ে তার এলাকার অনেকগুলো পুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট হয়ে বসল। পটাপট কটা টিউবওয়েল বসাবার ব্যবস্থা করল, বস্তির কয়েকটি দুঃস্থ মেয়ের বিয়ে দিল। ক্লাবে ক্লাবে ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টনের সরঞ্জাম কিনে দিল। অনেকটা রবিন হুডের মতো ব্যাপার।

নয়নতারা আরো যা বলেন তা এইরকম। কয়েক বছরের ভেতর লোকটা পুরনো বদনাম প্রায় সবটাই কাটিয়ে রীতিমত একজন নেতা হয়ে উঠল। খুবই প্রতিভাশালী সে। একদিন তার নজর এসে পড়ল নয়নতারার ওপর। গোড়ায় এক মাস কি দুমাস পর একবার ফোন করত, গদগদ হয়ে বলত, সে নয়নতারার একনিষ্ঠ ভক্ত, তার প্রতিটি ছবি আর নাটক ওর দেখা। একজন ব্যস্ত জননেতা বিপুল কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর ফ্লিম-টিল্ম দেখে ফোন করছে, এ তো শুধু খুশি নয়, রোমাঞ্চিত হবার মতো ঘটনা।

ক্রমশ ফোনের উৎপাতটা বাড়তে লাগল। এক-দুমাসের বদলে কবে বোজ রাতে সে রিং করা শুরু করল, এখন আর মনে পড়ে না। কিন্তু পরম ভক্তটির ভেতর থেকে দ্রুত অন্য একটা চেহারা বেরিয়ে আসতে লাগল। নয়নতারাকে রোজ একবার না দেখতে পেলে জীবন নাকি ব্যর্থ হয়ে যাবে। তার আবদার, প্রতিদিন রাতে সে একবার নয়নতারার বাড়ি আসবে। কোনো ভয় নেই, কেউ যাতে টের না পায়, সেইভাবেই যাবে সে। পরিষ্কার বোঝা গেল, লুকিয়ে চুরিয়ে সে অভিসারে আসতে চায়। নয়নতারা বুঝিয়ে দিলেন, অমন একটা বেয়াড়া সময়ে তাকে কোনোভাবেই তার বাড়িতে অভ্যর্থনা জানানো সম্ভব নয়। শোনার পর সে বিকল্প একটা প্রস্তাব দিল। সাদার্ন অ্যাভেনিউতে তার একটা বড় ফ্ল্যাট আছে। রোজ ঘন্টাখানেকের জন্যও যদি নয়নতারা একবার সেখানে যান সে কৃতার্থ হবে। নয়নতারা এ প্রস্তাবও নাকচ করে দিলেন।

এরপর উৎপাতের চেহারাটা বদলে যেতে লাগল। সেই সময় নয়নতারা যেসব ছবিতে সাইন করেছেন তার সবগুলোরই বেশির ভাগ শুটিং হচ্ছিল আউটডোরে। মাসের ভেতর পনের কুড়ি দিন বাইরে বাইরে কাটাতে হত। কখনও উটি, কখনও দার্জিলিং, নৈনিতাল বা জয়শলমীর। শুটিং স্পটগুলোর কাছাকাছি কোনো হোটেলে থাকতেন। যখন যে হোটেলেই উঠুন, দেখা যেত, তার পাশের সুইটটি দখল করে আছে সেই নেতাটি। কিভাবে যে তার আউটডোরে যাবার খবর জোগাড় করত কে জানে।

দিনের বেলা যেন নয়নতারাকে চেনে না, এমন একটা ভান করত লোকটা কিন্তু রাত্তিরে হোটেলটা ঘুমিয়ে পড়লে দরজায় ধাক্কা দিত। জীবন একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল সে।

প্রথম দিকে ঐরকম ইনফ্লুয়েন্সিয়াল পলিটিক্যাল লিডারের বিরুদ্ধে কড়া স্টেপ নেবার কথা ভাবতেও সাহস হচ্ছিল না নয়নতারার। লোকটা তাঁর ক্ষতি করে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠলেন।

নয়নতারা বলেন, আত্মরক্ষার জন্যে এ ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। কী করলাম জানো?

রণিতারা কিছু বলার আগে ফোন বেজে ওঠে। সেটা তুলে নয়নতারা বলে যান, হ্যাঁ, যা ওষুধ লাগে কিনে দিও… সাতাশ নম্বর ওই বস্তির স্কুলটার জন্যে সব চেয়ার টেবল আমি কিনে দেবো… হ্যাঁ, চিন্তা করো না।

এর আগেও একদিন কাকে যেন এভাবে আশ্বস্ত করেছিলেন নয়নতারা। তার যে নানাম গোপন দান ধ্যান আছে, এতদিনে তা জেনে গেছে রণিতারা।

কথাবার্তা শেষ করে নয়নতাবা টেলিফোন নামিয়ে রাখতে রাখতে বলেন, যা বলছিলাম– একদিন দার্জিলিংয়ের এক হোটলে লোকটা মাঝরাতে যখন দরজায় টোকা দিল, আমি দরজা খুলে সোজা তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিলাম।

রণিতা এবং অমিতেশ চমকে ওঠে, বলেন কী!

ইয়েস–  আস্তে মাথা নাড়েন নয়নতারা।

তারপর–  শিবদাঁড় টান টান করে বসে রণিতারা।

মজার গলায় নয়নতারা প্রশ্ন করেন, তারপর কী হতে পারে অনুমান করতে পার?

খানিক চিন্তা করে রণিতা আর অমিতেশ একসঙ্গে বলে ওঠে, না।

নেতাটিকে বললাম, আর একবার বিরক্ত করলে কলকাতায় ফিরে প্রেম কনফারেন্স করে তার স্বরূপটি জানিয়ে দেব। শুধু তাই না, যে কনস্টিটিউয়েন্সি থেকে ভোটে দাঁড়াবে সেখানে মিনিমাম দশটা মিটিং করে সবাইকে জিজ্ঞেস করব, এইরকম দুশ্চরিত্র লম্পটকে কি আপনাদের প্রতিনিধি করতে চান? শুনে ভীষণ নার্ভাস হয়ে গেল লোকটা। সে আমার পপুলারিটির কথা জানে। আমি পাবলিক মিটিংয়ে দাঁড়িয়ে কিছু বললে সেটা ওর পক্ষে মারাত্মক হবে। একজন ফিল্ম অ্যাকট্রেসের চাইতে পলিটিকাল পাওয়ার যে অনেক বেশি লাভজনক সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি ওর ছিল। ফলে–

ফলে কী?

একটি কথাও না বলে ল্যাজ গুটিয়ে আমার সুইট থেকে পালাল। পরের দিন ঘুম থেকে ওঠার পর শুনলাম দার্জিলিং থেকেই সরে পড়েছে।

পরে আর আপনাকে ফোন টোন করে নি?

নেভার।

দেখা হয় নি?

মনে পড়ছে না। বোধ হয় না।

রণিতা হাসতে হাসতে বলে, নেতাটিকে দারুণ ওষুধ দিয়েছিলেন তো?

তা দিয়েছিলাম। নয়নতারাও হাসতে থাকেন।

একটু চুপচাপ।

তারপর নয়নতারা বলেন, নেতাটিকে নিয়ে যা যা ঘটেছে সব তোমাদের বললাম। অথচ লোকে ব্যাপারটাকে ডিসটর্ট করে, নানা রকম রং চড়িয়ে এমন একটা রগরগে স্ক্যান্ডাল তৈরি করেছিল যেন লোকটার সঙ্গে শোওয়া ছাড়া জীবনে আমার আর আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।

রণিতারা উত্তর দেয় না।

নয়নতারা এবার বলেন, যাদের সঙ্গে আমার নাম জড়িয়ে স্ক্যান্ডাল রটেছে, কিংবা যাদের সঙ্গে ইমোশানাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাদের সবার কথাই বলা হল। আমি কিন্তু কিছুই লুকোই নি। আশা করি, তোমাদের ডকু-ফিচারের জন্যে গরম কিছু মেটিরিয়াল পেয়ে গেলে। বলে এক চোখ টিপে হাসলেন। তাঁর হাসিটি ফিচলেমিতে ভরা।

অমিতেশ এতক্ষণ একটি কথাও বলে নি। সামনের দিকে ঝুঁকে সে চাপা গলায় বলে, প্রায় সবার কথাই বলেছেন, শুধু একজন বাদ।

অবাক হয়ে নয়নতারা জিজ্ঞেস করেন, কার কথা বলছ? তার প্রশ্নটি শেষ হতে না হতেই সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। পরক্ষণে দোতলার হল-ঘরে যিনি উঠে আসেন তাকে আগে না দেখলেও কিছুকাল আগে নর্থ বেঙ্গল থেকে এক মহিলার বেনামি চিঠিতে তাঁর চেহারার বর্ণনা পাওয়া গিয়েছিল। বর্ণনাটি এতই নিখুঁত যে অমিতেশ আর রণিতার স্পষ্ট মনে আছে। অতএব ভদ্রলোককে চিনতে তাদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না।

নয়নতারা বলেন, তোমার না সকালে আসার কথা ছিল? এত দেরি করলে?

ভদ্রলোক বলেন, একটা ঝামেলায় আটকে গেলাম। তাই—

নয়নতারা বলেন, ও। এস তোমাদের আলাপ করিয়ে দিই। এ হল–

আলাপ না করিয়ে দিলেও চলবে। তোমার মুখে ওদের কথা এত শুনেছি যে ইনট্রোডিউস না করে দিলেও চিনতে অসুবিধা হচ্ছে না। ওরা হল রণিতা আর অমিতেশ।

অমিতেশ বলে, আমরাও আপনাকে চিনি। পরিচয় করানোর দরকার নেই।

দুচোখে বিস্ময় নিয়ে নয়নতারা জিজ্ঞেস করেন, চেনো? এ কে বল তো?

সমরেশ ভৌমিক।

তোমরা জানলে কী করে? আগে কি কখনও ওকে দেখেছ?

না।

তা হলে?

অমিতেশ চকিতে একবার রণিতার দিকে তাকায়। সে যা বলতে চায় সেটা বলা ঠিক হবে কিনা বুঝে নিতে চায়। রণিতা মাথা নাড়ে, অর্থাৎ বলা যেতে পারে।

অমিতেশ বলে, নর্থ বেঙ্গল থেকে মাসখানেক আগে আমরা একটা চিঠি পেয়েছিলাম, তাতে ওঁর চেহারার ডেসক্রিপশান আছে। তার থেকেই চিনে ফেললাম।

শুধু ডেসক্রিপশান থেকে চেনা যায়?

তা হয়তো যায় না। তবে চিঠিটায় এমন কিছু আছে যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে উনি সমরেশ ভৌমিক ছাড়া অন্য কেউ হতে পারেন না। তা ছাড়া মাঝে মাঝে আপনি ফোনে কোনো এক সমরেশ-এর সঙ্গে কথা বলেন। তার থেকেও কু পেয়ে গেলাম।

নয়নতারা গালে তর্জনী ঠেকিয়ে বলেন, কী সাঙ্ঘাতিক ছেলেমেয়ে রে বাবা!

সমরেশ শ্বাসরুদ্ধের মতো বসে ছিলেন। বলেন, চিঠিটা কে লিখেছে?

রণিতা বলে, নিচে নাম নেই। অ্যানোনিমাস লেটার।

আমার সম্বন্ধে কী লেখা আছে তাতে?

সত্যিই শুনতে চান?

সমরেশ রীতিমত থতিয়ে যান। গলার স্বর নামিয়ে বলেন, আপত্তির কিছু। নেই।

রণিতা বলে, সেটা কিন্তু আপনার পক্ষে খুব প্রীতিকর হবে না।

নয়নতারা ওদের লক্ষ করছিলেন। বলেন, বুঝেছি, ওই চিঠি তোমার স্ত্রী শীলা দিয়েছে।

সমরেশ চুপ কবে থাকেন।

অমিতেশ এই সময় বলে, কিছুক্ষণ আগে বলেছিলাম, ইমোশানাল রিলেশনশিপ গড়ে উঠেছিল, এমন সবার কথা জানালেও, একজনের কথা আপনি গোপন করে রেখেছেন। সমরেশবাবু সম্পর্কেই বলেছি। ওঁর সঙ্গে আপনি যে এখনও গভীরভাবে জড়িয়ে আছেন সেটা না বলে দিলেও চলে।

নয়নতারা স্তম্ভিত। সমরেশের সামনে এমন উঁছাছোলা ভাষায় কেউ যে বলতে পারে, ভাবা যায় না।

তার মুখের দিকে তাকিয়ে অমিতেশের মনে হয়, এভাবে বলাটা বোধ হয় ঠিক হয়নি। সে বলে, আসলে কী জানেন, আপনাদের আঘাত দেবার বা বিব্রত করার জন্যে আমি কথাটা বলিনি। শুধু জানতে চেয়েছি টুথ, টুথ ওনলি, যেটুকু পেলে আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ স্ক্রিন আর স্টেজ পার্সোনালিটিকে বুঝতে কিছুটা সুবিধা হবে।

অনেকক্ষণ স্থির চোখে অমিতেশের দিকে তাকিয়ে থাকেন নয়নতারা। তারপর বলেন, কোন টুথ তুমি জানতে চাও?

অমিতেশ বলে, আপনি তো অকপটে নিজের জীবনের এমন সব কথা বলেছেন যা ভারতবর্ষের অন্য কোনো মহিলা বলত কিনা সন্দেহ। আমি জানতে চাইছি সমরেশবাবুর সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা ঠিক কী ধরনের?

এক মুহূর্তও না ভেবে নয়নতারা বলেন, গভীর বন্ধুত্বের। এবং তোমরা যা ইঙ্গিত করছ সেটা একেবারেই ঠিক নয়।

ইঙ্গিত? কিসের?

তোমরা নিশ্চয়ই জানতে চাইছ, সমরেশের সঙ্গে কোনোরকম ফিজিক্যাল রিলেশন আছে কিনা– এই তো?

যে অমিতেশ অত্যন্ত স্পষ্টভাষী, ঘুরিয়ে কথা বলা যার একেবারেই অপছন্দ সে পর্যন্ত বিব্রত বোধ করে। সমরেশের সামনে এভাবে নয়নতারা বলবেন, ভাবা যায়নি, যদিও ঠিক এটাই জানতে চেয়েছে অমিতেশ। তার মুখ লাল হয়ে ওঠে। কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না।

অমিতেশকে লক্ষ করতে করতে হয়তো একটু করুণাই হয় নয়নতারার। চোখ টিপে মজার গলায় বলেন, ও আমার শুধু বন্ধু– প্রাণের সখা। ওই যে দারুণ একটা পদ আছে, নিকষিত হেম কামগন্ধ নাহি তায়– ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা হুবহু তাই। জানো, যে আটটা বছর আমি অজ্ঞাতবাসে আছি, ও আমাকে আগলে আগলে রেখেছে। সমরেশ পাশে না থাকলে আমার কী অসুবিধা যে হতো বলে বোঝাতে পারব না।

অমিতেশ জিজ্ঞেস করে, উনি থাকেন কোথায়?

সকৌতুকে নয়নতারা বলেন, তুমি যে একেবারে ক্রিমিনাল লইয়ারের মতো জেরা শুরু করলো একটু থেমে বলেন, কী জানতে চাইছ তা অবশ্য বুঝতে পারছি। আমি আর সমরেশ একই বাড়িতে থাকি কিনা– কেমন?

অমিতেশ চুপ।

নয়নতারা বলেন, এক বাড়িতে থাকলে আমাদের সম্বন্ধে একটা খুব সহজ কনকনে যে কেউ আসতে পারে। যদিও একটু আগে জানিয়েছি আমাদের সম্পর্কের ভেতর সেক্সের আঁশটে গন্ধ নেই, তবু হয়তো তোমার বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু যত বার যেভাবেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানতে চাও, আমার উত্তর একটাই– সমরেশ আমার বন্ধু এবং প্রেমিকও। তবে প্রেম তত বহুৎ কিসিমকা। সব সময় একটি পুরুষ আর একটি রমণীর বিছানায় ওঠাটাই তার আলটিমেট গোল নয় অমিতেশ। সে যাক, তোমার অবগতির জন্যে জানাই,যাদবপুরে সমরেশের একটা ফ্ল্যাট আছে।ও সেখানেই থাকে এবং রোজ একবার এখানে এসে আমার দেখাশোনা করে যায়।

রণিতা এই সময় আচমকা বলে ওঠে, একটা কথা জিজ্ঞেস করব, কিছু মনে করবেন না?

নয়নতারা বলেন, না, করব না।

সমরেশবাবুর সঙ্গে আপনার যা সম্পর্ক, সে ব্যাপারে বিবেকের দিক থেকে আপনি কি পরিষ্কার?

চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় নয়নতারার। ধীরে ধীরে অনুচ্চ কিন্তু তীব্র স্বরে জিজ্ঞেস করেন, কী বলতে চাইছ?

কিছুক্ষণ আগে বলেছিলেন, একজন হিরোর সঙ্গে আপনার হৃদয়ঘটিত রিলেশান গড়ে উঠেছিল। কিন্তু তিনি বিবাহিত জানার পর তার সঙ্গে আর কোন সম্পর্ক রাখেন নি। সেদিক থেকে সমরেশবাবুর সঙ্গেও তো আপনার যোগাযোগ থাকার কথা নয়।

শিরদাঁড়া টান টান হয়ে যায় নয়নতারার। তীক্ষ্ণ চোখে রণিতাকে লক্ষ করতে করতে বলেন, তার মানে?

মানে সমরেশবাবুও বিবাহিত। এথিকসের এই পর্যন্ত বলে থেমে যায় রণিতা।

নয়নতারা হকচকিয়ে যান। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন তিনি, তারপর বলেন, সমরেশ বিবাহিত, তুমি জানলে কী করে? হঠাৎ কী মনে পড়ে যাওয়ায় পরক্ষণে দ্রুত বলে ওঠেন, ও, বুঝেছি। বেনামা যে চিঠিটা পেয়েছ তাতেই এই খবরটা রয়েছে, কী বল?

হ্যাঁ।

নিঃশব্দে বসে বসে ওদের কথাবার্তা শুনছিলেন সমরেশ। বলেন, নিশ্চয়ই শীলা এ সব জানিয়েছে।

রণিতা সমরেশের দিকে ঘুরে বসে, নয়নতারা দেবী সম্পর্কে যেমন, তেমনি আপনার সম্বন্ধেও ওই চিঠিতে প্রচুর অভিযোগ। আপনার ছেলেমেয়ে স্ত্রী, সবাইকে নাকি ভাসিয়ে দিয়ে চলে এসেছেন।

আস্তে আস্তে মাথা নাড়েন সমরেশ। অনেকক্ষণ নিঝুম হয়ে বসে থাকার পর বলেন, অভিযোগটা ঠিক। সংসারের প্রতি বিশেষ কোনো কর্তব্য আমি পালন করতে পারিনি। কিন্তু মানুষ তো দেবতা নয়। নয়নের মধ্যে এমন কিছু আছে যা আমাকে ঘর থেকে বার করে এনেছিল।

এর জন্যে আপনি কি অনুতপ্ত?

সন্তান এবং স্ত্রীর জন্য দুঃখ হয়, মনও খারাপ লাগে, কিন্তু অনুতাপ নেই।

কিন্তু–

হাত তুলে রণিতাকে থামিয়ে দিয়ে সমরেশ বলেন, তুমি হয়তো বলতে চাইছ স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের ফেলেও এলাম, বাইরে এসেও কিছুই পেলাম না।

রণিতা বলে, হ্যাঁ, মানে–

সমরেশ বলেন, বিশ্বাস কর, নয়নের কাছে আমি এমন কিছু পেয়েছি যা এই পৃথিবীতে আর কেউ আমাকে দিতে পারত না।

কী সেটা?

তোমাদের এই বয়সে তা বুঝবে না।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর সমরেশ অনেকটা স্বগতোক্তির মতো বলে ওঠেন, পাপপুণ্য নিয়ে আমি চিন্তা করি না। মৃত্যুর পর মানুষের কী পরিণতি, আমার জানা নেই। হয়তো অনন্ত নরকে আমার স্থান হবে। তবে একটা কথা স্পষ্ট করে বলি, এ জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি, কিন্তু পেয়েছি তার বহুগুণ। তাতেই আমার তৃপ্তি। এর জন্যে আমাকে বহু মূল্য দিতে হয়েছে। পরলোক বলে যদি কিছু থাকে সেখানেও অপেক্ষা করছে চরম কোনো শাস্তি। তার জন্যে আমি প্রস্তুত। এটাই আমার নিয়তি।

সমরেশ যেন কাছে বসে নেই, অনেক দূর থেকে তাঁর কণ্ঠস্বর বুঝিবা অদৃশ্য বায়ুস্তর ভেদ করে ভেসে আসতে থাকে।

রণিতা বা অমিতেশ কেউ আর কোন প্রশ্ন করে না। হল-ঘরের আবহাওয়া কেমন যেন ভারি হয়ে উঠতে থাকে।

অনেকক্ষণ পর নয়নতারা বলেন, লাভ, সেক্স, স্ক্যান্ডাল, পাপপুণ্য– এ সব তো অনেক হল। কিন্তু এর বাইরেও জীবনে আরো অনেক কিছু আছে। এবার বরং সে বিষয়ে একটু মন দেওয়া যাক।

রণিতা আর অমিতেশ চকিত হয়ে ওঠে, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। নয়নতারা সমরেশের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেন, কসবার ওই জায়গাটাকে ঘিরে কম্পাউন্ড ওয়াল তোলার ব্যবস্থা করেছ তো?

সমরেশ বলেন, কাল মিস্তিরিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। কী খরচ পড়বে ওদের জানাতে বলেছি। চিন্তা করো না, দিন পনের কুড়ির ভেতর ওয়াল উঠে যাবে।

কসবার কোন জায়গাটা নিয়ে নয়নতারারা কথা বলছেন, রণিতার বুঝতে অসুবিধে হয় নি। সে জিজ্ঞেস করে, জমিটা কেনা হয়ে গেছে?

ওই জমিটার ব্যাপারে খোঁজখবর করতে রণিতারা যে কসবায় ছুটেছিল তা নিয়ে নয়নতারার সঙ্গে আগেই একদিন ওদের আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, হ্যাঁ, লাস্ট উইকে রেজিস্ট্রি হয়েছে।

রণিতা মনে মনে ভেবে দেখল, সেই সময়টা সে জ্বরে বিছানায় পড়ে ছিল। নইলে এই কেনার খবরটা আগেই জেনে যেত। বলল, ওখানে মেয়েদের একটা হোম করার কথা ভেবেছিলেন না?

নয়নতারা বলেন, হোমই তো করব।

কোন মেয়েদের জন্যে?

আর কয়েক দিন অপেক্ষা কর, সব জানতে পারবে। বলে সমরেশকে জিজ্ঞেস করেন, ওদের কবে রিলিজ করা হচ্ছে?

সমরেশ বলেন, নেক্সট মানথে।

ওদের থাকার কোনো অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছ?

না। এখনও করে উঠতে পারি নি। তিনজন দালালের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। টালিগঞ্জে একটা বাড়ি কয়েক বছরের জন্যে লিজে পাওয়া যাবে, মনে হচ্ছে।

ওরা রিলিজ পাওয়ার আগে যেভাবেই হোক বাড়িটার ডিল কমপ্লিট করে ফেলবে। নইলে খুব মুশকিলে পড়ে যাব।

ডিল হয়ে যাবে।

কারা কোত্থেকে রিলিজ পাবে, কাদের থাকার জন্য বাড়ি লিজ নেওয়া হবে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এ সব সম্পর্কে রণিতা জানতে চায়।

নয়নতারা এবারও তাকে ধৈর্য ধরতে বলেন।

রণিতা আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।

.

২১.

আরো কয়েক দিন কেটে যায়।

এর ভেতর নয়নতারার দৈনন্দিন রুটিনটা মুখস্থ হয়ে গেছে রণিতাদের। ভোরবেলায় উঠে প্রথম আসন, তারপর স্নান, শ্লোকপাঠ, নিজের স্টাডিতে বসে নিবিষ্ট হয়ে লেখাপড়া– এইসব কর্মসূচিতে কোনরকম হেরফের নেই। এরই ফাঁকে ফাঁকে বাইরের লোকজনের সঙ্গে ফোনে কথাবার্তা তো আছেই।

নিয়মিত যাতায়াতের ফলে রণিতাদের জানা হয়ে গেছে, গোপনে প্রচুর দান করে থাকেন নয়নতারা। সারা জীবনে অজস্র টাকা রোজগার করেছেন তিনি। তার একটা বড় অংশ ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছেন। এতে মোটা সুদ পাওয়া যায়। সেই টাকাটা বহুজনের হিতে অকাতরে খরচ করে থাকেন। কোন মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, কোন দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান পয়সার অভাবে বস্তিতে ওষুধপত্র দিতে পারছে না, কোথায় কোন গ্রাম বন্যায় ভেসে গেছে। জানা মাত্র টাকা পাঠিয়ে দেন।

নয়নতারার পক্ষে তো বাড়ি থেকে বেরুনো সম্ভব না। বেরুলে মিডিয়ার লোকেরা একেবারে হুলস্থুল বাধিয়ে ছাড়বে। তার অজ্ঞাতবাসের শান্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তার হয়ে এ সব করে থাকেন সমরেশ।

আসলে মানুষের জন্য কিছু করতে চান নয়নতারা। এখনও গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড তার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। কী পাননি তিনি? অর্থ, খ্যাতি, সম্মান, যশ, সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণে দুর্নাম। সব সময় তিনি প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাকে ঘিরে সারা দেশ জুড়ে আজও প্রবল উন্মাদনা। কিন্তু এ সব নয়নতারাকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। জীবনের অন্য একটি অর্থও যে আছে, একদিন তারই খোঁজে তিনি সব কিছু ছেড়ে গ্ল্যামারের জগৎ থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু খুব বেশি কিছু করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে নি। মিডিয়া তার এমন একটা ইমেজ তৈরি করে দিয়েছে যে সেটা ভেঙে একজন সাধারণ নাগরিকের মতো রাস্তায় বেরিয়ে কিছু যে করবেন তার উপায় নেই। সেই জন্যই সমরেশকে তার প্রয়োজন। সমরেশকে দিয়েই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রেখে চলেছেন।

একদিন খুব সকালে আলিপুরে এসে বেশ অবাকই হল রণিতা আর অমিতেশ। দোতলার হল-ঘরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন সমরেশ এবং নয়নতারা। সমরেশ কখনও এত সকালের দিকে এ বাড়িতে আসেন না। অসময়ে তার আসাটাই রণিতাদের বিস্ময়ের কারণ।

হল-এ বসে ব্রেকফাস্ট করতে করতে নয়নতারা বললেন, তোমাদের অনেক বার বলেছি, একটা জরুরি কাজে তোমাদের সাহায্য চাই। মনে আছে?

রণিতা বলে, নিশ্চয়ই। কী কাজ বলুন না

নন-ক্রিমিনাল লুনাটিক কাদের বলে জানো?

জানি। যারা অপরাধী নয়, তবে নানা কারণে যাদের মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে–

ঠিক। এরকম বত্রিশটি নানা বয়সের মেয়েকে জেলে আটকে রাখা হয়েছিল। কাল তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।

রণিতা শিরদাঁড়া টান টান করে বলে, এদের রিলিজের কথাই কি সেদিন মিস্টার ভোমিককে বলেছিলেন?

হ্যাঁ।

আস্তে আস্তে মাথা নাড়েন নয়নতারা। বলেন, এই মেয়েদের আত্মীয়স্বজনরা ওদের বাড়ি ফিরিয়ে নিতে চায় না।

রণিতা চমকে ওঠে, তা হলে ওরা কোথায় যাবে? কে দেখবে ওদের?

নয়নতারা জানান, এই নিরাশ্রয় মেয়েদের জন্য টালিগঞ্জে আপাতত কয়েক বছরের জন্য একটা বাড়ি লিজ নেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কসবায় যে জমিটা তিনি কিনেছেন সেখানে একটা চারতলা বাড়ি করা হবে। সেটা হয়ে গেলে, মেয়েরা ওখানে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকবে। তাদের সব দায়িত্ব নয়নতারার। এই কাজটা যদি শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবে করতে পারেন, নিজের বেঁচে থাকার একটা অর্থ হয়।

অনেক আগে থেকেই এই পরমাশ্চর্য মহিলাটিকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করেছিল রণিতা। শ্রদ্ধাটা এখন শতগুণ বেড়ে যায়। অভিভূতের মতো সে নয়নতারার দিকে তাকিয়ে থাকে।

নয়নতারা বলেন, এবার শোন তোমাদের কাছে কী সাহায্য চাই।

উৎসুক সুরে রণিতা বলে, বলুন।

যে মেয়েদের কাল জেল থেকে ছেড়ে দিচ্ছে তাদের চিকিৎসা আর খাওয়া পরার জন্যে প্রচুর টাকা দরকার। তাছাড়া ওদের জন্যে কসবায় বাড়িটাও করতে হবে। আমার কাছে অত টাকা নেই যাতে এতবড় দায়িত্ব পালন করা যায়। তাই কিছুদিন ধরেই ভাবছি– কথা শেষ না করে তিনি থেমে যান।

রণিতা কিছু বলে না, উদগ্রীব হয়ে থাকে।

নয়নতারা বলেন, ভাবছি, আমি আবার অভিনয়ের মধ্যে ফিরে যাব। এ ছাড়া কোথায় টাকা পাব? বলে একটু হাসেন।

রণিতার স্নায়ুমণ্ডলীর মধ্যে বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে যায় যেন। সে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, এ তো দারুণ খবর। কোন ডিরেক্টরের ছবিতে নামবেন, কিছু ঠিক হয়েছে?

ফিল্মে নামছি না।

তবে?

স্টেজে নামব।

কী নাটক?

দ্রৌপদী। ওটা আমারই লেখা। তোমরা জানতে চেয়েছিলে না, আমি কী লিখি? সেদিন জানাই নি, আজ বলি তিন বছর ধরে একটু একটু করে ওই নাটকটা লিখেছি। মহাভারতের এই চরিত্রটা আমার কাছে দারুণ সিগনিফিকাষ্ট মনে হয়েছে। লিখে খুব আনন্দ পেয়েছি। নয়নতারা বলতে থাকেন, আর একটা কথা, এই নাটকে আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে চাই।

রণিতা জিজ্ঞেস করে, কিরকম?

দ্রৌপদী তো বটেই, তাকে ঘিরে যত চরিত্র এসেছে সবগুলোতেই আমি অভিনয় করব।

একটু চুপ।

তারপরনয়নতারা আবার বলেন, আপাতত এইঅভিনয়ের ব্যাপারে কোনো প্রচার আমি চাই না। মিউজিক ডিরেক্টর বসন্ত মুখার্জি আর লাইটের সুনীল সেনকে দু-একদিনের ভেতর ফোন করব। তোমরা ওঁদের এখানে নিয়ে আসবে।

ওঁরা যদি কাউকে জানিয়ে দেন?

আমি অনুরোধ করলে আগে থেকে কাউকে জানাবেন না। ওঁদের ওপর আমার বিশ্বাস আছে। ফাইনাল রিহার্সাল হবার পর তোমরা কলাকুঞ্জ হলটা ভাড়া করবে, দর্শকদের জন্যে টিকেট ছাপাবে, পুলিশ আর কর্পোরেশনের পারমিসান নেবে। তারপর টিভি আর কাগজে কাগজে আমার ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দেবে। অনেক দিন পর স্টেজে নামতে যাচ্ছি, একটু নার্ভাস লাগছে। তোমাদের কি ধারণা, লোকে আমার নাটকটা দেখবে না?

অমিতেশ আর রণিতা একসঙ্গে বলে ওঠে, দেখবে না মানে। সারা শহর। আপনার নাটকের জন্য উন্মাদ হয়ে যাবে।

কলাকুঞ্জ কলকাতার সবচেয়ে অভিজাত হল। ওখানে অনুষ্ঠান করার জন্য মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির অফিসার্স ক্লাব থেকে শুরু করে বড় বড় গ্রুপ থিয়েটারগুলো সারা বছর লাইন দিয়ে থাকে।

মাস দুই ঘোরাঘুরির পর দ্রৌপদী নাটকের জন্য একটা ডেট পাওয়া গেল। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক হয়েছে আপাতত দশটা শো করা হবে। তাতেও যদি সব টাকা না ওঠে, আরো শো করতে হবে।

নাটক মঞ্চস্থ হবার কুড়ি দিন আগে পাবলিসিটি শুরু হল। নয়নতারার চার ফুট ছবিওলা পোস্টারে পোস্টারে গোটা শহর ছয়লাপ। তা ছাড়া কাগজে কাগজে বিরাট বিরাট বিজ্ঞাপন বেরুতে লাগল। টিভিতেও দিনে দু বার করে প্রচার চলল। বড় বড় মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো নাটকটা স্পনসর করার জন্য রণিতাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে। প্রথম শো-এর জন্য নয়নতারা স্পনসর নিতে একেবারেই রাজি নন। যা করার রণিতাদের সাহায্য নিয়ে নিজের উদ্যোগেই আপাতত করতে চান।

রণিতারা যা ভেবেছিল, দেখা গেল নয়নতারার নাটক নিয়ে উদ্দীপনা তার হাজার গুণ বেশি। অ্যাডভান্স বুকিংয়ের কাউন্টার খোলা হয়েছিল পাঁচ দিন আগে। টিকেটের জন্য এক কিলোমিটার লম্বা লাইন পড়ে গিয়েছিল। কাউন্টার খোলার দু ঘন্টার ভেতর সব টিকেট শেষ। যারা টিকেট পায় নি, খেপে গিয়ে কাউন্টার ভাঙচুর করেছে। অগত্যা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হয়েছে, খুব শিগগিরই আবার দ্রৌপদীর শো করা হবে। কলাকুঞ্জ-এ বুকিং না পাওয়া গেলে অন্য হল এ নাটকটি মঞ্চস্থ করবেন নয়নতারা।

আসলে গত আট বছরে এত বড় ঘটনা সাংস্কৃতিক জগতে আর ঘটে নি। নয়নতারা আবার অভিনয় করবেন, এটা জানা মাত্র সারা শহর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে।

নাটকের জন্য নির্দিষ্ট দিনটি এসে গেল। যারা টিকেট পেয়েছে তারা অনেক আগেই হল-এ ঢুকে পড়েছে। যারা পায় নি, এমন কয়েক হাজার মানুষ নয়নতারাকে দেখার জন্য কলাকুঞ্জ-এর সামনে দু ঘন্টা আগে থেকে জমা হয়েছে। ভিড়ের ভেতর দিয়ে হল-এ যেতে বেশ কষ্টই হল নয়নতারার।

ভেতরে শখানেক ফটোগ্রাফার আর টিভির ক্যামেরাম্যান গিস গিস করছিল।

কিছুক্ষণ পর পর্দা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যেই দ্রৌপদীর মেক-আপ নিয়ে নয়নতারা মঞ্চে প্রবেশ করলেন, চারদিক থেকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশগুলো অনবরত জুলতে লাগল। গোটা হল-এর দেড় হাজার দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে যেন হিস্টিরিয়ার ঘোরে চেঁচাতে চেঁচাতে হাততালি দিতে থাকে। আট বছর বাদে তাকে দেখে সবাই যেন উন্মাদ হয়ে গেছে।

কী আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব নয়নতারার! হাত তুলে সবাইকে পলকে থামিয়ে দেন। তারপর শুরু হয় অভিনয়।

এক পাশে মঞ্চের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল রণিতা। কয়েক মিনিটের ভেতর সে টের পায় সমস্ত হলটা একেবারে নিঝুম হয়ে গেছে। মঞ্চে এখন যেন এক অপার্থিব ম্যাজিক তৈরি হচ্ছে।

যে নয়নতারাকে চার মাস ধরে দেখে আসছে রণিতা, তাকে এখন আর চেনা যায় না। তার কণ্ঠস্বর, বাচনভঙ্গি, চলাফেরা, তাকানো, সব আগাগোড়া বদলে গেছে। মহাভারতের দ্রৌপদীকে তিনি যেন ধীরে ধীরে নির্মাণ করছেন। পলকহীন, আচ্ছন্নের মত তাকিয়ে ছিল রণিতা। এতকাল বাদে যে উদ্দেশ্যে নয়নতারা মঞ্চে উঠেছেন সেটা যেন তাকে ক্রমশ মহিমান্বিত করে তুলছিল।

জীবনে পূর্ণতা কাকে বলে, নয়নতারাকে দেখতে দেখতে বার বার তা উপলব্ধি হচ্ছিল রণিতার।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *