৯৬-৯৮. এক একটা রাত

এক একটা রাত কখনও কখনও এমন নিষ্ঠুর হয়! হিংস্র পশুর মতো সময়ের টুটি কামড়ে ধরে থাকে। ছাড়তেই চায়, ছাড়তেই চায় না। মনে হয় এ রাতের হাত থেকে বুঝি আর কোনওভাবে নিস্তার নেই।

তবু যায় রাত। সময়ের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে ক্লান্ত হয়ে হার মানে এক সময়ে। প্রহর ফুরোয়। রাতভর স্থির বসেছিল তিতির। নিদ্রাহীন, নিষ্পন্দ। লম্বা রাতের শেষে কখন যেন চোখের পাতা ভারী হয়ে গেল। তখনই স্পষ্ট শুনতে পেল ডাকটা, ফিরে আয় তিতির, ফিরে আয়।

বাবার গলা!

চমকে চোখ খুলল তিতির। সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু কেমন গোলমাল হয়ে গেছে। আলো আঁধারে কড়িবরগা পাখা দেওয়াল দরজা জানলা সব কেমন অন্যরকম। এ কার ঘর? কার বিছানা? কোথায় আছে তিতির?

ক্ষণ পরেই মনে পড়ে গেছে। বাড়ি ছেড়ে সে তো চলে এসেছে বহু দূর, এখানে বাবা আসবে কোত্থেকে!

সবে ভোর ফুটছে। খোলা জানলার বাইরে আবছা আবছা সাদাটে আলো। যেন আলো নয়, আলোর মায়া। কোথায় যেন একটা পাখি ডেকে উঠল পিক পিক। ছলাত করে একঝলক শিরশিরে হাওয়া ঢুকে পড়েছে ঘরে, ছুঁয়ে গেল তিতিরকে। পৃথিবী এখন কী স্নিগ্ধ! কী নরম!

হঠাৎই তীব্র এক কষ্টে তিতিরের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। বাবার জন্যে, শুধু বাবার জন্যে। একটা লোহার বল আটকে গেছে গলায়, বুজে এল কণ্ঠনালী। বাবার জন্যে, শুধু বাবার জন্যে। খরখরে শুকনো চোখে হঠাৎ জ্বালা জ্বালা ভাব। বাবার জন্যে, শুধু বাবার জন্যে।

বাবা কি পাগলের মতো খুঁজছে তিতিরকে!

দুর দুর, কে বাবা! কার বাবা! তিতিরের কোনও বাবা ফাবা নেই। ওরে বোকা মেয়ে, সত্যিটাকে মেনে নে, হজম কর, মন অনেক হালকা হয়ে যাবে। যা ফেলে এসেছিস তা ফেলেই এসেছিস। তার জন্য এখনও কেন পিছুটান!

ভাবতেই তিতির ঝাঁকি খেয়ে সিধে হল। পিছুটানের কথা আসে কোত্থেকে! সে কি ফেরার কথা ভাবছে! ওই শয়তানীটার কাছে! ওই নষ্টচরিত্র মেয়েছেলেটার নকল সংসারে! কক্ষনও না।

পার হয়ে আসা রাত ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ল তিতিরের বুকে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে হনহন হাঁটছে তিতির। কতদূর হেঁটেছে তিতির? যাদবপুর ফাঁড়ি? সামনে একটা টেলিফোন বুথ, তিতির থমকে দাঁড়াল। একটা মোটাসোটা অবাঙালি ব্যবসায়ী ফোন করছে, ফুটপাথে পায়চারি করছে তিতির। অনন্তকাল কথা বলে যাচ্ছে লোকটা, ছটফট করছে তিতির। লোকটা বেরোতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলেছে রিসিভার। কাকে ডাকবে? কোথায় যাবে? ঝুলন? দেবস্মিতা? টোটোকে ফোনে ছারছ্যার করে বলে দেবে সব কিছু? চুরমার করে দেবে সুখী অহঙ্কারী ছেলেটার মুখ? থাক, আদরের ছেলে নিশ্চিন্তে ঘুমোক লম্পট বাপটার কোলে। সুখে থাক।

তিতিরের আঙুল ডায়াল ঘোরাচ্ছে, আমি তিতির বলছি। …হা হা হা, তিতির। তুমি এক্ষুনি একবার আসতে পারবে?

–কোথায়?

–আমি যাদবপুর থানার সামনে ওয়েট করছি। শিগগিরই এসো।

–কি হয়েছে তোমার বলো তো? এত তড়বড় করছ কেন?

–আহ, যা বলছি শোনো। এক্ষুনি চলে এসো। এক্ষুনি।

আনোয়ার শাহ রোডের দিকে দাঁড়িয়ে ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে তিতির। নটা বত্রিশ… নটা পঁয়ত্রিশ… চল্লিশ. পঁয়তাল্লিশ..। উফ, কী ক্যালাস ছেলে! এইটুকু আসতে এতক্ষণ লাগে!

অবশেষে এসেছে। দুলতে দুলতে। মুখে এক গাল হাসি, মাঝরাত্তিরে জরুরি তলব কেন? আমার সঙ্গে পালাবে নাকি?

–হাঁ। এক্ষুনি। এই মুহূর্তে।

–মসকা মারছ! হেসে উঠতে গিয়েও থমকেছে সুকান্ত, কেসটা কি বলো তো? মুখে লোডশেডিং কেন? বাড়িতে বাওয়াল হয়েছে?

বাজে বোকো না। যা বলছি, পারবে? যাবে আমার সঙ্গে?

–এত তেতে আছ কেন? মাথা ঠাণ্ডা করো। চলো, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।

–না। বাড়িতে আমি ফিরব না।

–রাগ করে বাড়ি থেকে কাটার পরিণাম কি জানো? তুমিও ধরা পড়বে, আমিও ফেঁসে যাব।

তুমি ভয় পাচ্ছ? এত যে মুখে বুকনি শুনি, ভালবাসা! ভালবাসা! আমার জন্য নাকি জীবন দিতে পারো! … থাক, তোমাকে আমার দরকার নেই।

বলেই উল্টো মুখে হাঁটা দিয়েছে তিতির।

দৌড়ে এসে খপ করে কবজি চেপে ধরল সুকান্ত, কী পাগলামি করছ!

–আমাকে ছেড়ে দাও। ছাড়ো বলছি।

সুকান্ত তবু হাত ছাড়ছে না, হয়েছে কি খুলে বলো তো? রাগী বাপটা বকেছে? মার সঙ্গে ঝগড়া করেছ?

রাগে তিতিরের মুখে বাক্য সরল না।

–এরকম করে না। লক্ষ্মী মেয়ে

–অ্যাই অ্যাই, উপদেশ দিয়ো না। আমি লক্ষ্মী মেয়েও নই, বাচ্চা মেয়েও নই। তুমি আমাকে কতটা চেনো, অ্যাঁ? এক হেঁচকায় হাত ছাড়িয়ে নিল তিতির, –তুমি কি ভাবছ একা একা আমি কোথাও যেতে পারি না?

–কোথায় যাবে?

–যেখানে খুশি। জাহান্নমে। নরকে।

তিতির কি খুব চেঁচাচ্ছিল? ভিড় জমে যাচ্ছিল কি চার পাশে? বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত মানুষের অত কিছু স্মরণে থাকে না। শুধু মনে আছে, কোত্থেকে একটা ট্যাক্সি ডাকল সুকান্ত। ঝড়ের গতিতে ছুটেছে ট্যাক্সি, সোজা শেয়ালদা স্টেশন। তারপর যেন কি হল? তারপর যেন কি হল? সুকান্তর পিছন পিছন এক ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে উঠেছে তিতির, ভোঁ ভোঁ করছে মাথা। আশপাশে এত লোক, ঘাম, দুর্গন্ধ, চিৎকার, তবু যেন কোথাও কোনও মানুষের অস্তিত্ব নেই। অন্তহীন সময়ের পর কি একটা স্টেশনে যেন নামল তারা, প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে হাঁটছে পিচ রাস্তায়। ডাইনে ঘুরল, বাঁয়ে ঘুরল, ডাইনে ঘুরল, বাঁয়ে ঘুরল। তারপরই তো এই বাড়ি! সুকান্ত বেশ কয়েক বার হাঁকডাক করার পর এক আধবুড়ো মতো লোক গেট খুলে দিল। ঘরের দরজাও। লোকটা খুব অবাক হয়ে দেখছিল তিতিরকে। কি দেখছিল? বাজে মেয়ে ভাবছিল? বয়েই গেল তিতিরের। ওই ডাইনিটার চেয়ে তো খারাপ নয়! তিতিরের তো কোনও ভণ্ডামি নেই! উফ, তিতির কাল মরে গেল না কেন। ইশ, তিতির মরবেই বা কেন! ঢং করে পাথর সেজে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দুটোকে কালই যদি চোখের আগুনে পুড়িয়ে মারতে পারত তিতির! চোরের মতো পালিয়ে গেল লোকটা! মুখ ঢেকে বসে আছে আর এক জন! বায়োলজিকাল ফাদার! বায়োলজিকাল মাদার! থুঃ থুঃ।

এক ঝটকায় তিতির উঠে দাঁড়াল। ঘৃণাটা সাপটে নিয়ে খাটে পড়ে থাকা ওড়না কুড়োল। বিছিয়ে নিল গায়ে। প্রকাণ্ড খাটের পাশে দেওয়ালে একটা গোল আয়না, কারুকাজ করা স্টিল ফ্রেমে বাঁধানো। অজান্তেই চোখ পড়ল আয়নায়। আবছায়া মাখা আরশিতে ও কে? ঝাপসা ঝাপসা? এলোমেলো চুল? মুখ ভরা অন্ধকার?

চোখ ঘুরিয়ে নিল তিতির। দরজা খুলে বাইরে এসে অবাক হল একটু। গোলমতো বারান্দার এক কোণে বেতের চেয়ারে ঘাড় হেলে আছে সুকান্তর। দুপা মেঝেতে ছড়ানো। হাত দুটো কোলের ওপর জড়ো। আরও তো ঘরদোর ছিল, এখানে ঘুমোচ্ছ কেন? বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটু বুঝি মায়াও হল তিতিরের। বেচারার বোধহয় খাওয়া দাওয়াও জোটেনি রাতে। এখানে পৌঁছে টাকা বার করে আধবুড়ো লোকটাকে কি যেন কিনতে পাঠাচ্ছিল মাঝরাতে, এমন বিশ্রীভাবে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল তিতির! কি করবে, একা থাকতেই যে তখন তিতিরের মন চাইছিল। খিদেতেষ্টার বোধই ছিল না ..!

রাতে কি ডেকেছিল সুকান্ত? সম্ভবত না। অন্তত তিতির শুনতে পায়নি। বন্ধ দরজার বাইরে সারা রাত তিতিরকে পাহারা দিচ্ছিল ছেলেটা!

ফর্সা হচ্ছে সকাল। প্রচুর পাখপাখালির ডাক শোনা যায় চারদিকে। তিতির পায়ে পায়ে বারান্দার মুখটায় এল। কটেজ প্যাটার্নের বাড়ি, সামনে একটুখানি লন, তারপর লোহার গেট ঘিরে মানুষসমান পাঁচিল। কাল রাতে জায়গাটাকে অনেক ছোট মনে হয়েছিল, এখন দেখা যাচ্ছে কম্পাউন্ড বেশ বড়। একটু প্রাচীন প্রাচীন ভাব আছে জায়গাটায়। লনের ডান দিকে ছোট একখানা ঘর, আউটহাউস মতন, দরজায় তার এক মলিন চেহারার ব্লাউজবিহীন মহিলা দাঁড়িয়ে দাঁতন করছে। ওটাই কি আধবুড়ো লোকটার ডেরা? লনের ঘাসগুলো বেশ বড় বড় হয়ে গেছে, ঘাস মাড়িয়ে মাড়িয়ে বাড়ির পিছন দিকে যাচ্ছে মহিলা। যেতে যেতে তিতিরকে একবার আড়চোখে দেখে নিল। ওদিকে পুকুর টুকুর আছে নাকি! ওপাশে কয়েকটা কলাগাছ দেখা যায় না।

–মাথা ঠাণ্ডা হল?

 তিতির ঘাড় ঘোরাল। জেগেছে সুকান্ত। হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙছে। চেয়ারে বসে বসে।

উদাসভাবে তিতির বলল, -মাথা আমার ঠাণ্ডাই আছে।

–হুঁউ, বুঝলাম। সুকান্ত হাই তুলল, –ঘুমিয়েছিলে একটু?

অর্থহীন প্রশ্ন। তিতির উত্তর দিল না।

–মধুদা উঠেছে? চা ফা দিয়েছে তোমায়?

–কে মধুদা?

এ বাড়ির কেয়ারটেকার। দ্যাখোনি কাল রাতে?

হুঁ। তিতির ভুরু কুঁচকে তাকাল, –এই বাড়িটা কার?

ধরো আমারই।

–মানে?

–মানে বাবা যতক্ষণ বেঁচে আছে, ততক্ষণ বাবার। তারপর আমারই।

–এখানে তোমাদের বাড়ি আছে কখনও বলোনি তো?

বলিনি পলতার বাগানবাড়িটার কথা? বলেছিলাম, তোমার মনে নেই।

 হবেও বা। আলাপের প্রথম দিকে সুকান্ত একটানা তাদের পরিবারের ধনসম্পত্তির ফিরিস্তি দিত, কিছুই তেমন শুনত না তিতির, তখন বলে থাকলেও থাকতে পারে। ইদানীং অবশ্য সুকান্তর শোঅফ করার অভ্যেসটা চলে গেছে।

 সুকান্ত উঠে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তিতির আলগাভাবে বলল, –এ বাড়িটা বুঝি ফাঁকাই পড়ে থাকে?

ফাঁকা পুরোপুরি থাকে না। বাবা মাঝে মাঝেই আসে। সব ফুর্তিফাতা তো কলকাতায় হয় না, কিছু কিছু শহরের বাইরে এসে করতে হয়।

–মানে তোমার বাবার ফুর্তির বাড়ি?

বলতে পারো।

তুমিও এখানে আসো নাকি মাঝে মাঝে? তিতির টেরা চোখে তাকাল, কাল দেখলাম লোকটা তোমায় খুব খাতির করছিল!

–সে তো মনিবের ছেলে বলে।

–চিনল কী করে তোমায়?

বা রে, দোকানে মাইনে আনতে যায় না! তখন আমাকে ..

ব্যস, ওইটুকুই?

না মানে … এসেছি এক আধ বার … নমাসে ছমাসে … সুকান্ত খপ করে তিতিরের হাত চেপে ধরল, –বিশ্বাস করো, তোমার সঙ্গে ভাব হওয়ার পর আমি আর এখানে কোনওদিনও আসিনি।

বন্ধুবান্ধব নিয়ে ফুর্তি করতে আসত সুকান্ত? নাকি কাউকে নিয়ে …? যাই করুক না, তিতিরের কি আসে যায়! শান্তভাবে হাতটা ছাড়িয়ে নিল তিতির। সুকান্তকে তো দেবচরিত্র মহাপুরুষ ভেবে তার সঙ্গে চলে আসেনি সে। প্রতিশোধ যদি নিতেই হয়, নিজের জীবনটাকে ধ্বংস করতে হয়, তবে সুকান্তর চেয়ে যোগ্য সঙ্গী আর কে হতে পারে!

সুকান্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু করে। একটু পরে ধীর পায়ে লনে নেমে গেল। কেয়ারটেকারের ঘরের দিকে যাচ্ছে। চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এল আধবুড়ো লোকটা, অনুগত মুখে কথা বলছে সুকান্তর সঙ্গে। ফিরছে সুকান্ত।

ঝলমল করছে সকালটা। উজ্জ্বল হলুদ আলো এসে পড়েছে পাঁচিলধারের নারকেল গাছটার মাথায়, ঝিকমিক করছে। বাইরের রাস্তা দিয়ে একটা সাইকেল রিকশা হর্ন বাজাতে বাজাতে চলে গেল। কাছে কোথাও কারখানায় ভোঁ বাজছে। আবার একটা দিন শুরু হয়ে গেল। ..

তিতির বেতের চেয়ারে গিয়ে বসেছে। সুকান্ত সামনে এল। নিচু গলায় বলল, -মুখটুখ ধুয়ে নিতে পারো। বাথরুমে পেস্ট রাখা আছে।

নেবখন।

–খিধে পেয়েছে তো? আমি কিন্তু জলখাবার বলে দিয়েছি। মধুদা এক্ষুনি চা দিয়ে দিচ্ছে।

সত্যিই পেট ছুঁই ছুঁই করছে। খিধেতেষ্টার কোনও বোধই ছিল না সারা রাত, সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জৈবিক অনুভূতিগুলো ফিরতে শুরু করেছে। সেই কখন কাল সন্ধেবেলা তিন চামচ চাউমিন খেয়েছিল, বারো ঘণ্টা হয়ে গেল একটা দানাও পেটে পড়েনি। তিতির চুপচাপ উঠে বাথরুমে চলে গেল। ফিরে দেখল সুকান্ত চিন্তিত মুখে বসে আছে চেয়ারে। চা এসে গেছে, টেবিলে রাখা কাপ দুটো থেকে গরম ধোঁয়া উঠছে।

আর একটা চেয়ার টেনে পাশে বসল তিতির, কী ভাবছ?

কিছু না। সুকান্ত মাথা নাড়ল, কী ঠিক করলে?

কীসের কি?

–আজ বাড়ি ফিরবে তো?

–কেন? আমি থাকলে তোমার অসুবিধে হচ্ছে?

–তা নয়। কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছ … এতক্ষণে তোমাদের বাড়িতে নিশ্চয়ই হুলুস্থুল …

–সে তোমাকে দেখতে হবে না।

–বেশ …। সুকান্ত চায়ে চুমুক দিল, –কিন্তু আমাকে তো একবার বাড়ি যেতে হবে।

 তিতিরের গলায় ব্যঙ্গ ফুটল, –কেন? বাবা বকবে?

নাহ, বাবা এখন নেই। ব্যবসার কাজে মালদা গেছে, ফিরবে সেই শনিবার।

—তাহলে?

 সুকান্ত জবাব দিল না। একটু সময় নিয়ে বলল, কি কিচাইনটা হয়েছে একটু খুলে বলো তো?

 দু-এক মুহূর্ত চিন্তা করল তিতির। এখানে যদি থাকতেই হয়, সুকান্তর কাছে একটা কিছু জবাবদিহি করতেই হবে। কী বলা যায়? কতটা বলা যায়? আদৌ বলা যায় কি!

নিপুণ অভিনেত্রীর মতো হাসল তিতির, –মনে করো, তোমাকে ভালবাসি বলে সব ছেড়ে চলে এসেছি।

পলকের জন্য সুকান্তর চোখ বিহ্বল। অস্ফুটে বলল, সত্যি যদি তাই হত!

–সত্যিই তাই।

–আমাকে নিয়ে মজাক করছ? সুকান্তর গলা কেঁপে গেল, –আমার জন্য তিতির মোটেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসবে না।

–কেন নয়?

–আমি জানি আমি কী মাল। একটা অপদার্থ, নির্বোধ, বখা …

ঠিক যেন বাবার কণ্ঠস্বর! বুকটা টনটন করে, উঠল তিতিরের। নিশ্বাস ভারী হয়ে এল। অকম্পিত রাখতে গিয়েও গলা কেঁপে গেল তিতিরের, –তোমাতে আমাতে এখন আর খুব তফাত নেই সুকান্ত। তুমি বলো, তোমার বাবা তোমার মাকে খুন করেছেন? আমার মাও তেমনি আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে।

-যাহ, কী বলছ তুমি! সুকান্তর চোখ বড় বড় হয়ে গেল, তোমার মা …

–সব খুন ফিজিকাল মার্ডার হয় না সুকান্ত। ইংরিজিতে একটা কথা আছে অ্যানিহিলেশান। ধ্বংস। ধরো, সেভাবেই আমার বাবাকে … প্রাণপণ চেষ্টা করেও তিতির চোখের জল আটকাতে পারল না। ফুঁপিয়ে উঠল, –এর বেশি তোমাকে আর কিছু আমি বলতে পারব না।

সুকান্ত কী বুঝল কে জানে, চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে। পায়চারি করছে অশান্ত পায়ে। আর একটা কি প্রশ্ন করতে গিয়ে চুপ করে গেল।

দু আঙুলে চেপে চেপে চোখ মুছল তিতির। নাক টেনে বলল, যাক গে, আমি ওসব ভুলে গেছি। আমার কোনও পাস্ট নেই। কাল সারা রাত ধরে আমি অনেক ভেবেছি … আমরা দুজনে নিউ লাইফ স্টার্ট করতে পারি। আমরা বিয়ে করে ফেলতে পারি।

সুকান্ত স্ট্যাচু হয়ে গেল। তোতলাচ্ছে, বিবিবিবিয়ে!

–হ্যাঁ। বিয়ে। আর এক-দেড় মাসের মধ্যে আমার হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরিয়ে যাবে, আঠেরো বছর বয়সও হয়ে যাবে … আমি একটা ছোটখাট চাকরি জোগাড় করে নেব … এই ধরো, নার্সারি টার্সারি কি কিন্ডারগার্টেনে পড়ানো … তুমিও একটা কিছু করবে। কারখানা টারখানায় কাজ হোক, যা হোক … কোনও কাজই তো খারাপ নয়, কী বলো? … তবে, কিন্তু তোমার বাবার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে পারবে না। আমরা এখান থেকে চলে যাব। অন্য কোথাও গিয়ে থাকব। … একদম পরিচিত পৃথিবীর বাইরে …

এই বয়সই বুঝি এমন অদ্ভুত অবাস্তব কথা বলে যেতে পারে, অবিরাম। এমন বয়সই বুঝি এসব স্বপ্ন বিশ্বাস করতে চায়। জীবন যেন এমনই সোজা সরল পথ! যেন নিশ্বাস প্রশ্বাসের মতো অতি সহজ ক্রিয়া! টোটোর ঘরে দেখা সেই স্বপ্নের বাড়িটার কথা কি মনে পড়ল তিতিরের! হায় রে বয়স!

নিজেরই অলীক কল্পনায় তিতিরের বুকটা হঠাৎ কেমন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল। সার সার মুখের মিছিল দুলে যাচ্ছে চোখের সামনে দিয়ে। দাদা ছোটকা অ্যাটম বড় কাকা কাকিমা … কারুর সঙ্গে আর এ জীবনে দেখা হবে না। দাদা কি বাড়ি এসে খুব মিস্ করবে তিতিরকে? অ্যাটম খুঁজবে দিদিভাইকে? ছোটকা একটা ক্যামেরা কিনে দেবে বলেছিল। দামি ক্যামেরা, টোটোর যেমন আছে। ছোটকার বিয়েতে তিতিরের আর থাকা হল না। বড়কাকা কাকিমারও তিতিরের জন্য মন কেমন করবে। করবেই। তিতির জানে। সকলে এরা এত আপন তিতিরের, তবু তিতির এদের কেউ নয়! এরা কি কেউ জানবে কোনওদিন!

সুকান্তকে লুকিয়ে আবার চোখের জল মুছল তিতির।

.

ও প্রান্তে রিঙ হচ্ছে টেলিফোনে। সুকান্ত ঝুপ করে রিসিভারটা নামিয়ে রাখল। হাত কাঁপছে, পা কাঁপছে, হাঁটুর জোড়গুলো যেন ঢলঢলে হয়ে গেছে হঠাৎ। জীবনে অনেক লুচ্চামি তো করেছে সে, আজ তার এই বেহাল দশা কেন!

ক্রেডলে হাত চেপে আছে সুকান্ত! ওষুধের দোকানের কর্মচারী সন্দিগ্ধ চোখে প্রশ্ন করল, রঙ নাম্বার হল?

দুদিকে ঘাড় নাড়ল সুকান্ত, এনগেজড।

কলকাতার লাইন তো?

–হ্যাঁ।

–আজ কলকাতার লাইন এনগেজডই থাকবে। কাল ইলেকশান, আজ সারাদিন শুধু লিডারে ক্যাডারে ফোনাফুনি চলবে।

যত্ত সব বাজে কথা। অন্য দিন যেন এক চান্সে কলকাতার লাইন পাওয়া যায়! ক্যাশ কাউন্টারের কর্মচারীটি সরবে প্রতিবাদ করল।

দুজনে তর্ক বেধে গেছে।

সুকান্ত তাদের কথা শুনছিল না। প্রাণপণে শক্ত করে নিচ্ছে নিজেকে। ডায়াল ঘোরাল। তিতির কি বেরিয়েছে স্নান সেরে? হে ঈশ্বর, এক্ষুনি যেন কিছু টের না পায়।

রিঙ বাজতেই পুরুষকণ্ঠ, –হ্যালো!

–আমি কি একটু আদিত্য রায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারি?

–কে বলছেন?

–আমাকে আপনি চিনবেন না। আমার আদিত্য রায়কে দরকার, তাঁকে একটু ডেকে দিন।

ধরুন।

ফোন ধরে আছে সুকান্ত। জোরে নিশ্বাস টেনে ফুসফুস দুটোকে পরিপূর্ণ করে নিল। স্বপ্নটা চোখে লেগে থাকতে থাকতেই জেগে ওঠা ভাল।

.

৯৭.

-কালকের জন্য কি মশলা বেটে রেখে যাব বউদি?

 –উঁ? দূরমনস্ক ইন্দ্রাণী জানলা থেকে ফিরল, কেন, কাল তুমি আসবে না?

বারে, কাল ভোট দিতি যাব না? আমার তো নাম উঠেছে সেই তালদিতে। সন্ধ্যার মা আঙুলে আঁচলের খুঁট পাকাচ্ছে, তোমাকে তো পরশু বলেছিলাম।

ও।

–আজ কিন্তু আমি একটু তাড়াতাড়ি চলে যাব। দিদি জামাইবাবু দেশে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে.. দুটো দশের কেনিং-এ।

সন্ধ্যার মা দেশে যাবে শুনলেই ইন্দ্রাণী বিরক্ত হয়। আজ কোনও ভাবান্তর নেই। বলল, যেয়ো। …রান্নাবান্না হয়ে গেছে?

–ভাত বসিয়েছি। ছোড়দা তো আজ বাজারে গেল না …ফিজে কটা ডিম ছিল, ওরই ঝোল…। ভাজা-টাজা কিছু করতে হবে?

থাক।

সন্ধ্যার মা যেতে গিয়েও দরজায় দাঁড়িয়ে গেছে। কী দেখে সন্ধ্যার মা? ইন্দ্রাণীর মুখে চোখে কি কোনও অস্বাভাবিকতার ছাপ পড়েছে? গলা কাঁপছে কি তার? খুব বেশি বিচলিত দেখাচ্ছে? উঁহু, এমনটা তো হওয়ার কথা নয়! চরম সিদ্ধান্তটা নেওয়ার আগে পর্যন্তই যা আলোড়ন ছিল বুকে, এখন তো আর তা নেই। ইন্দ্রাণীর হৃদয় এখন উথাল-পাথাল ঝঞ্ঝা শেষে শান্ত সমুদ্র। জলোচ্ছ্বাস থেমে গেছে।

সন্ধ্যার মার চোখের দিকে তাকাল ইন্দ্রাণী, কিছু বলবে?

–না… বলছিলাম… দিদিমণি কখন ফিরবে গো বউদি?

 –দুটো-তিনটে বেজে যাবে।

–ওমা, সে কি গো! কদ্দূর গেছে দিদিমণি? কোন বন্ধুর বাড়ি?

–তুমি কি ওর সব বন্ধুদের চেনো?

উত্তরের বদলে পাল্টা প্রশ্ন এল, ওই প্যান্টশার্ট পরে যে মেয়েটা আসে? খুব হাত পা নেড়ে কথা বলে?

না। অন্য একজন। তুমি চেনো না।

–দাদা কেন দিদিমণিকে আনতে গেল গো? দিদিমণির কি শরীর খারাপ?

 –ওই একটু।

কাল তো দিদিমণি ঠিকই ছিল! সন্ধ্যার মার স্বরে অবিশ্বাস, শরীর খারাপ নিয়ে গেছে? না গিয়ে হয়েছে?

গিয়ে হয়েছে।

–জ্বর? পেট খারাপ?

–পেট খারাপের মতো। …সেইজন্যই রাতে ফেরেনি।

ইন্দ্রাণী বোধহয় জীবনে এই প্রথম সন্ধ্যার মার সঙ্গে এত কথা বলছে। নাকি জীবনে শেষবার? অত প্রশ্নই বা করে কেন সন্ধ্যার মা? খটকা লেগেছে কোনও? লাগতেই পারে, সকালে এসে যে দশায় দেখেছে মানুষজনদের! কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে, কেউ ঘাড় ঝুলিয়ে, কেউ মুখ গুঁজে। একটা করে ফোন বাজে, ঝাঁপিয়ে পড়ে তিন ভাই। সুদীপ কি বাড়ি যাওয়ার সময়ে সন্ধ্যার মার সামনে কিছু বেফাঁস কথা বলেছিল? ফোনটা আসার পর আদিত্য যেমন চেঁচাচ্ছিল, তাতেই কি সন্ধ্যার মা আঁচ করল কিছু?

কী আসে যায়! কে কী বুঝল, কে কী ভাবল, কে কী জানল, তাতে আর ইন্দ্রাণীর কী!

তবু তাকে এরকম সাজানো গোছানো মিথ্যে বলতেই হবে। যারা এই পৃথিবীতে এখনও বহুকাল থেকে যাবে তাদের জীবন যাতে আরও বিষময় না হয়ে ওঠে, অন্তত সেইজন্যে। তাছাড়া সত্যি মিথ্যে সবই তো এখন ইন্দ্রাণীর কাছে নিতান্তই অলীক। মিথ্যে দিয়ে যার জীবন সাজানো, সত্যি মিথ্যে নিয়ে ভাবতে বসা তার বোধহয় শোভাও পায় না।

সন্ধ্যার মা রান্নাঘরে গেছে। তার বাসন-কোসন নাড়াচাড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল ইন্দ্রাণী। ঝনঝন শব্দ হল হঠাৎ, বোধহয় হাত থেকে কাঁসি পড়ে গেল। কী যে করে! সব বাসনগুলোকে তুবড়োচ্ছে!

এ সময়েও এই ভাবনা আসে, আশ্চর্য!

শব্দের রেশটুকু মিলিয়ে যেতেই বাড়ি আবার নিথর, নিস্পন্দ। ইন্দ্রাণী জোরে শ্বাস টানল। না, বাড়িটা নিঝুম বটে, তবে তেমন দমবন্ধ ভাব আর নেই। দিব্যি সহজে নিশ্বাস নেওয়া গেল। বুকের পাথর সরে গেছে বলেই কি এমনটা বোধ হচ্ছে?

পাথর সরল? না পাথরের নীচে চাপা পড়ে গেল ইন্দ্রাণী? আমূল। আপাদমস্তক।

টেলিফোন বেজে উঠেছে। সহসা। বাইরে, খাওয়ার জায়গায়। ক্ষণিক নৈঃশব্দ্য ছিঁড়েখুঁড়ে ককিয়ে ককিয়ে বাজছে। ইন্দ্রাণীর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমস্রোত নেমে গেল। শুভ নয় তো? ওই একটি ফোনের থেকে সে শত হস্ত দূরে থাকতে চায়। এখন, এই মুহূর্তে। কাল রাতে দীপু চাঁদু বারকয়েক শুভর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিল, ইন্দ্রাণীই বারণ করেছে। অনেক তো হল, আর জটিলতা বাড়িয়ে কী লাভ! তিতির যখন মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল, কী ভীষণ পাংশু হয়ে গিয়েছিল শুভর মুখ! তারপরে মাঝরাতে ওই দুঃসংবাদ কি সহ্য করতে পারত শুভ! অত মনের জোর শুভর নেই। হয়তো বেশি উদভ্রান্ত হয়ে পড়ত, হয়তো ধরা পড়ে যেত ছন্দার কাছে। মাগো, ভাবতেই শরীর অবশ হয়ে আসছে। হৃৎপিণ্ডে সপাং সপাং চাবুকের আওয়াজ। জানলে জানুক শুভ, নিজে নিজে জানুক। খবর দিয়ে ইন্দ্রাণী আর নিমিত্তের ভাগী হতে রাজি নয়।

সন্ধ্যার মা টেলিফোন ধরে চেঁচাচ্ছে, – মেজদা তোমায় ডাকছে গো বউদি।

ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল ইন্দ্রাণীর। স্খলিত পায়ে এসে রিসিভার তুলেছে।

–হ্যালো বউদি? …চাঁদু এই মাত্র খবর দিয়ে গেল। উফ, কী রিলিফ!

হুঁ। অজান্তেই ইন্দ্রাণীর গলা বেয়ে শব্দটা উঠে এল।

–ছেলেটা কে? চেনো তুমি?

–নাহ।

–ছেলেটাকে ভাল বলতে হবে।

হুঁ।

–বেঁচে গেল মেয়েটা। কত কি হয়ে যেতে পারত, বলো তো? …ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।

হুঁ।

দু-এক সেকেন্ড থেমে রইল সুদীপ, আমি তা হলে এখন আর ওবাড়ি যাচ্ছি না বউদি। বিকেলে রুনা অ্যাটমকে নিয়ে…। রুনাও কাল সারা রাত ঘরবার করেছে। ভাবছি দুপুরে একটু রেস্ট করে…

–ঠিক আছে।

বউদি, একটা কথা বলব? তিতির ফিরলে তুমি কিন্তু প্লিজ ওকে বকাবকি কোরো না। ঝোঁকের মাথায় একটা ভুল করে ফেলেছে…

হুঁ।

–বোঝোই তো, এই বয়সের মেয়েরা সব সময়েই একটু হাই স্ট্রাং থাকে। কোথায় কখন কি কথায় মানে লেগে যায়…

–হুঁ।

–তাহলে বিকেলে দেখা হচ্ছে। রাখছি।

রিসিভার নামিয়েই ইন্দ্রাণী ঘড়ি দেখল। এগারোটা বাজতে পাঁচ। সময় নেই, হাতে আর বেশি সময় নেই। আদিত্য নিশ্চয়ই এতক্ষণে শেয়ালদা পৌঁছে গেছে। সন্ধ্যার মাকে বলল বটে ওদের ফিরতে দুটো-তিনটে হবে, তার আগেও তো এসে যেতে পারে। যদি আসে? চাঁদু তো বলেই গেল, সামান্য কাজ আছে স্টুডিওতে, চারটের মধ্যে ফিরবে। যদি আরও আগে এসে যায়? সন্ধ্যার মাই বা যাবে কখন? এখনই ছুটি দিয়ে দেবে সন্ধ্যার মাকে? না। যদি কিছু সন্দেহ করে?

নিপুণ অপরাধীর মতো একটুক্ষণ মনে মনে হিসেব ছকল ইন্দ্রাণী। তারপর দ্রুত হাতে শাড়ি সায়া ব্লাউজ গুছিয়ে নিল। বাথরুমে ঢোকার আগে ডাকল সন্ধ্যার মাকে, ভাত গালা হল?

–হ্যাঁ বউদি। এবার সব টেবিলে গুছিয়ে দিচ্ছি।

কালকের মশলা কি বাটা হয়ে গেছে?

–না। যাওয়ার আগে করে দিয়ে যাব।

–থাক, লাগবে না। তুমি ভাত খেয়ে চলে যাও। খাবারগুলো সব ভাল করে ঢাকা দিয়ে যেয়ো।

–সে কি! তুমি খাবে না?

–ওরা ফিরলে খাব।

সকাল থেকে কিছু দাঁতে কাটোনি, তারা কখন ফিরবে ঠিক নেই..

–যা বলছি করো। ধমকে উঠতে গিয়েও ইন্দ্রাণী স্বরের অসহিষ্ণুতা সতর্কভাবে দমন করল, আমার শরীরটা ভাল লাগছে না। কাল নিশ্বাসের খুব কষ্ট হচ্ছিল, রাতে ভাল ঘুম হয়নি। চান করে আমি একটু শোব। ডেকো না। যাওয়ার সময়ে গেটে তালা দিয়ে চাবিটা বারান্দায় ফেলে দিয়ে যেয়ো।

–ছোড়দা কয়েকটা জামা প্যান্ট রেখে গেছে, কেচে দিয়ে যাব?

মুহূর্তের জন্য টাল খেয়ে গেল ইন্দ্রাণী। এ সময়ে এভাবেই বুঝি বিঘ্ন আসে। সব কিছুতেই না না থাক থাক করাটা কি সোজা চোখে দেখবে সন্ধ্যার মা? উঁহু, সময় বয়ে যাচ্ছে, সময় বয়ে যাচ্ছে।

— স্বর অকম্পিত রাখল ইন্দ্রাণী, এখন ভিজিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কাচলে তোমার ছোড়দার জামাকাপড় পরিষ্কার হবে? পরশু এসে কেচো।

সন্ধ্যার মার মুখে খুশির ঝলক। বাথরুমে ঢুকে ইন্দ্রাণী দরজা বন্ধ করল। দরজার পিঠে কন্দর্প একটা আয়না লাগিয়েছে, অনেক সময়ে বাথরুমেই দাড়ি কামায়। নিষ্পলক ইন্দ্রাণী আয়নায় দেখছে নিজেকে। কার মুখ বিম্বিত হয়েছে আরশিতে? চোখের কোল কুঁচকে যাওয়া, হনুর হাড় ঠেলে ওঠা, খসখসে চামড়ার ওই নারীই কি ইন্দ্রাণী? এর কাছেই কি ছুটে আসে শুভ? এর মুখের একটু হাসি দেখার জন্যই কি ব্যাকুল হয়ে থাকে আদিত্য? কক্ষনও না। ওটা একটা ভুল ইন্দ্রাণী। অন্য কেউ। ইন্দ্রাণীর ছদ্মবেশে এক সর্বনাশা স্ত্রীলোক। এ জীবনে যা যা করতে চায়নি ইন্দ্রাণী, তাকে দিয়ে সেই সেই কাজ করিয়ে নিয়েছে ওই মহিলা। ঠিক ঠিক মুহূর্তে ইন্দ্রাণীর মনের সমস্ত জোর কেড়ে নিয়েছে।

আজ তোর শেষ দিন। আমি নেই তো তুইও নেই!

 ইন্দ্রাণী জোরে শাওয়ার খুলে দিল। অবিরল জলধারায় ধুয়ে যাচ্ছে নিরাবরণ দেহ, প্রতিটি রোমকূপে জলকণার স্পর্শ অনুভব করছে ইন্দ্রাণী। চেপে চেপে ঘা ঘষল, ডলে ডলে মুখ ঘষছে। থুপে থুপে প্রতিটি চুলে ছোঁয়া লাগাচ্ছে জলের। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর নিজেকে শেষবারের মতো স্নান করাচ্ছে ইন্দ্রাণী!

হঠাৎই বুকটা হু হু করে উঠল। এখন থেকে বাকি সময়টা কত কাজই তো শেষবারের মতো করা হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো চুল আঁচড়াবে, শেষবারের মতো টিপ পরবে কপালে, শেষবার চেনা বিছানায় শোবে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াবে একবার, শেষবারের মতো? শেষ কাজগুলো সব কমে যাবে ক্রমশ, তারপর, তারপর…

স্নান সেরে শুকনো জামাকাপড়গুলোর দিকে ইন্দ্রাণী শেষবারের মতো হাত বাড়াল। যাহ, শাওয়ারের ছাঁটে শাড়ি সায়া ব্লাউজ সব ভিজে গেছে। কোনও মানে হয়? কতদিন ধরে ওদিকের দেয়ালে একটা অ্যালুমিনিয়াম ব্র্যাকেট টাঙাবে টাঙাবে ভাবছে, আর হয়ে উঠল না।

আলগা শাড়ি জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল ইন্দ্রাণী। ঘরে ঢুকে নিঃশব্দে ভেজাল দরজা, সন্তর্পণে ছিটকিনি তুলে দিল। শেষবারের মতো।

.

পৃথিবীতে আজ বড় তাত। নির্মেঘ আকাশে দাউ দাউ জ্বলছে সূর্য। খর গ্রীষ্মের তীব্র দাহে পুড়ছে আকাশ, পুড়ছে মাটি, মানুষ পুড়ছে। পশুপাখিরা খুঁজছে শীতল আশ্রয়, গাছেরা এখন রুদ্ধশ্বাস।

পুকুরপাড়ে জামরুল গাছের ছায়ায় বসেছিল তিতির। পুকুর নয়, ডোবা একটা। মিহিন সবুজ পানায় ঢেকে আছে তার জলতল। গরম বাতাস বইছে হঠাৎ হঠাৎ। জল কাঁপছে থর থর, তিতিরের চোখ সেই জলে স্থির। জলে, না ঘন সবুজ পানায়? ছোট ছোট মাটির ডেলা কুড়োচ্ছে মেয়ে, ছুঁড়ছে ডোবায়। ফেটে যাচ্ছে সবুজ আস্তরণ, বৃত্তাকার তরঙ্গ ফুটে উঠছে জলে। ভেঙে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে। সবুজ পানা ছেতরে যাচ্ছে। বিশ্রীভাবে।

খানিক দূর থেকে দৃশ্যটা একটুক্ষণ দেখল আদিত্য। চারদিকে অকরুণ রোদ্দুরের মাঝে একটুখানি ছায়ায় কী দুঃখী দেখাচ্ছে মেয়েটাকে!

নিচু গলায় আদিত্য ডাকল, তিতির?

অন্যমনস্কভাবে ওপর পানে তাকাল তিতির, যেন চেনা কোনও পাখির ডাক শুনতে পেয়েছে। পরমুহূর্তেই ভীষণ চমকে পিছন ফিরল, — তুমি! তুমি কোত্থেকে এলে?

বাড়ি থেকে। আদিত্য বিহ্বল গলায় বলল, তোকে আমি সারা রাত পাগলের মতো খুঁজেছি রে তিতির।

তিতির ঝট করে উঠে দাঁড়িয়েছে, জানলে কী করে আমি এখানে আছি? বলেই চোখ ছোট করল। কয়েক পা দৌড়ে গেল কটেজের দিকে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, সুকান্ত গেল কোথায়?

–এই তো ছিল। হয়তো ওদিকে বারান্দায়… আদিত্য হাসার চেষ্টা করল, – ওই তো আমাকে স্টেশন থেকে…

কথা শেষ হল না, তার আগেই তীর বেগে ছুটে গেছে তিতির। লম্বা লম্বা ঘাস মাড়িয়ে ছপছপ সমুখভাগে চলে গেল। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চল থেকে আদিত্যও দৌড়েছে পিছু পিছু।

বারান্দার এক কোণে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা, তিতির এক লাফে তার সামনে পৌঁছে গেছে। তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, তুমি খবর দিয়ে দিয়েছ? তুমি! ইউ বিট্রেয়ার।

ছেলেটা মাথা নিচু করল। কথা বলছে না।

টকটকে লাল হয়ে গেছে তিতিরের মুখ। নাকের পাটা ফুলছে, তোমার সঙ্গে বেরোনই আমার ভুল হয়েছে। কাপুরুষ… স্পাইনলেস…।

ছেলেটা ঘাড় গোঁজ করে বলল, – যা করেছি তোমার ভালর জন্যই করেছি।

–হু দা হেল ইউ আর টু সি মাই ভাল? রাগী টাট্টু ঘোড়ার মতো মেঝেয় পা ঠুকছে তিতির, আমার ভাল মন্দ দেখার তুমি কে?

ছেলেটা মিন মিন করে বলল, আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি।

–চোপ। কর্তব্য দেখাচ্ছ? ভাল ছেলে সাজছ? তিতির ঠাস করে ছেলেটার গালে চড় কষিয়ে দিল, এত কাকে ভয়, অ্যাঁ? বাপকে? পুলিশকে? সোজাসুজি আমায় সেটা জানিয়ে দিলেই পারতে? আমি এখান থেকে চলে যেতাম!

চোখে দেখেও তিতিরের এই খুনে রূপ বিশ্বাস হচ্ছিল না আদিত্যর। তার তিতির পাখি কবে এত পালটে গেল! মাত্র একদিনে কেউ এমন আদ্যন্ত বদলে যায়!

কয়েক পল স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে থেকে হন হন বারান্দায় উঠে এল আদিত্য। ভারিক্কি গলায় বলল, ওকে অত বকছিস কেন? ঠিক কাজই করেছে। কাউকে কিছু না বলে চলে এসেছিস…

তিতির আদিত্যকে দেখলই না। দু চোখে আগুন ছেটাল ছেলেটার দিকে। গটমটিয়ে ঢুকে গেছে ঘরে। সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল।

অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। নতমুখেই পায়ে পায়ে লনে নেমে গেল। গেটের দিকে এগোচ্ছে। থামল, ফিরল কয়েক পা। শুকনো গলায় বলল, – মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার সময়ে আমাদের কেয়ারটেকারকে বলে দেবেন, ও দরজায় তালা লাগিয়ে দেবে।

–তুমি কোথায় যাচ্ছ?

কান্নার মতো হাসল ছেলেটা, জবাব দিল না। বড় বড় পা ফেলে গেট পেরিয়ে মিলিয়ে গেল।

ঘামছিল আদিত্য। হাতের পিঠে কপাল মুছল। মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষণিক খুশিটুকুর কিছুই যেন আর অবশিষ্ট নেই! কোথা থেকে কী হচ্ছে কিছুই মাথায় ঢুকছে না।

তিতিরের দরজায় আস্তে টোকা দিল আদিত্য।

 সাড়া নেই।

আলতো ঠেলল, তিতির, দরজা খোল।

সাড়াশব্দ নেই।

আদিত্য ধরা-ধরা গলায় ডাকল, – আমায় আর কষ্ট দিস না রে তিতির। লক্ষ্মী মা আমার, কথা শোন।

ভেতর থেকে হিসহিস শব্দ উড়ে এল, আমি যাব না। তুমি চলে যাও।

–কেন যাবি না মা?

 উত্তর নেই।

ঠিক আছে, যাস না। দরজাটা তো খোল। তেতে পুড়ে এলাম, দুটো কথা তো বলবি।

–আমার কোনও কথা নেই।

–আমার আছে। বুকটা যে আমার ফেটে যাচ্ছে রে তিতির।

 আবার কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ধড়াস করে দরজা খুলে গেছে, –কি বলবে বলল।

–এমন করে কি কথা হয়! মেয়ের কাঁধে আলগা হাত রাখল আদিত্য, চল, বসি।

তিতির ঝটকা মেরে কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে দিল। দ্রুত বিছানায় গিয়ে বসল। জানলার বাইরে চোখ।

আদিত্য ক্ষণকাল দেখল মেয়েকে। মাত্র এক রাতেই অনেক শুকিয়ে গেছে মেয়ে। চোখ দুটো অসম্ভব ফোলা ফোলা, মনে হয় সারা রাত কেঁদেছে খুব। আপাত রুক্ষ চোয়ালে এখনও যেন জলের রেখা।

আদিত্য মেয়ের পাশটিতে গিয়ে বসল। নরম গলায় বলল, – তোর হঠাৎ কী হয়ে গেল রে তিতির? কী হয়েছিল?

-কিছু না। তিতিরের চোয়াল আরও কঠিন।

কিছু তো একটা হয়েছেই। ..মার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল?

না।

মা কিছু বলেছে? বকেছে?

না।

–তবে? কথাটা বলেই আদিত্য সচকিত হল। গোয়েন্দা চোখে দেখল মেয়েকে, ওই ছেলেটা…কী যেন নাম… সুকান্ত…. ওকে তুই…তোরা বিয়ে করতে চাস?

তিতির চুপ।

–তা আমাকে বললি না কেন? এরজন্য তোর বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার কী দরকার?

–আমি সুকান্তর জন্য বাড়ি থেকে চলে আসিনি।

তা হলে?

–তা হলে আবার কি? ও বাড়িতে থাকব না বলে চলে এসেছি।

–কিন্তু কেন?

–শুনতে চেয়ো না। তুমি সহ্য করতে পারবে না।

–খুব পারব। তুই আমাকে বল।

তিতির আবার চুপ। জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে। কামড়ে ধরেছে ঠোঁট।

আদিত্য মেয়ের মুখ ঘোরাল, — আমাকেও বলবি না তিতির?

তিতির চোখের দিকে তাকাচ্ছে না। ঢোঁক গিলছে। খটখটে চোখ একটু একটু করে জলে ভরে গেল। হঠাৎই ডুকরে উঠেছে, তুমি আমার বাবা নও।

–ওমা, ও কী কথা! আমি কী করলাম? আদিত্য হতভম্ব, তুই আমার ওপর অভিমান করছিস কেন?

সজোরে মাথা ঝাঁঝাল তিতির। ফোঁপাচ্ছে। কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে শরীর। হেঁচকি তুলছে। তারই মধ্যে উগরে দিল ইন্দ্রাণী আর শুভাশিসের গত রাতের সংলাপ। পুঞ্জীভূত ঘৃণা গলগল বমি করল।

আদিত্যর ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেল। নিঃসীম মহাশূন্যের মতো ফাঁকা। কিন্তু প্রকৃতি যে শূন্যতা পরিহার করে, ক্রমে আদিত্যর অন্তস্তল ভরে গেল এক ভয়ানক যন্ত্রণায়। যন্ত্রণা, না বিষবাষ্প? জ্বলে গেল বুকটা। লক্ষ লক্ষ বুনো ষাঁড় ছুটে এল কোত্থেকে, দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে মাথায়। এত অপমান? এত বড় প্রতারণা? হাতের কাছে ওই দুই প্রবঞ্চককে পেলে এক্ষুনি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেবে আদিত্য। ভাবে কি তারা নিজেদের, অ্যাঁ? অসূয়া নেই বলেই কি আদিত্য এক জরদগব প্রাণী বনে গেছে? শেষ করে দেবে, এক কফিনে ঢুকিয়ে দেবে দুটো লাশ।

হায় রে, আদিত্য সত্যি যদি তা পারত! উন্মাদ মস্তিষ্ক কেমন ঝিম মেরে আসছে। ব্যথা, বড্ড ব্যথা। গরম সিসেয় ঝাঁঝরা হয়ে এল ফুসফুস, সুতীক্ষ্ণ এক শলাকা হৃৎপিণ্ড এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। একটা মাত্র সুখস্মৃতি নিয়ে বেঁচে ছিল আদিত্য, তাও ভেঙে গেল? কটা তো মাত্র রাত স্বেচ্ছায় মোহিনী হয়েছিল বউ, সেখানেও শঠতা? ওরে বউ, কাকে ঠকালি তুই?

হা ঈশ্বর, এখনই আদিত্য মরে যাচ্ছে না কেন?

মৃত্যুকে চেনে না আদিত্য। মৃত্যু বড় তেএঁটে বজ্জাত, সে কারুর হুকুমদাস নয়। এমনকী ঈশ্বরেরও না। তাছাড়া আদিত্য ট্রেনের কামরায় সেই আশ্চর্য জিমন্যাস্টের খেলা দেখেছে, সে কি এখন চাইলেই মরতে পারবে?

তিতির মুখ ঢেকে বসে আছে। চাপা গোঙানির স্বর শুনে চমকে তাকাল, তুমি কাঁদছ?

আদিত্য করুণ স্বরে বলে উঠল, তুইও আমার রইলি না রে তিতির!

আদিত্যর ওই স্বরে বুঝি কিছু ছিল। কিংবা চোখে, কিংবা শরীরের জ্যামিতিতে। বাঁধ ভাঙা নদীর মতো আদিত্যর কোলে আছড়ে পড়ল তিতির, তোমায় ছেড়ে আমি কোথাও যাব না বাবা। কোনওদিন না।

মমতায় প্লাবিত হচ্ছিল আদিত্য। ঘৃণা ক্রোধ যন্ত্রণা অপমানবোধ খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছে, পিতৃত্ব শুধুই এক জৈবিক পরিচিতি নয়। তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। অনেক গভীর এক অনুভূতি।

তিতির অঝোরে কাঁদছে। মেয়ের পিঠে হাত বোলাচ্ছে আদিত্য। আহা, কাঁদুক। কেঁদে হালকা হোক মেয়ে। আদিত্যও বুঝি তাতে কিছুটা লঘু হতে পারে। এক সময়ে থামল মেয়ে। কতক্ষণ পর, আদিত্য জানে না। পাঁচ মিনিটও হতে পারে, দু ঘণ্টাও হতে পারে। শুধু টের পেল, খোলা জানলা দিয়ে ঝামরে আসা গরম হাওয়া আর বুঝি তত তপ্ত নেই।

আদিত্য ঠেলল মেয়েকে। উঠে বসেছে মেয়ে, চোখ মুছছে ওড়নায়।

আদিত্য গলা ঝাড়ল, চল, ফিরি।

তিতির অস্ফুটে বলল, ওখানেই আমায় ফিরতে হবে বাবা?

–কোথায় যাবি বল?

–অন্য কোথাও। যেখানে খুশি।

কোন কাঁটাটা মেয়েকে বিঁধছে, বুঝতে পারছিল আদিত্য। ইন্দ্রাণীর জন্য হঠাৎ কেমন যেন মায়াও হচ্ছিল। মায়া, না করুণা? নাকি এ এক ধরনের আনন্দ? যার কাছে আদিত্য চিরকাল হাত পেতে দাঁড়িয়েছে, তাকে ভিখিরি দেখতে পাবার এক গোপন সুখ?

আদিত্য মলিন হাসল, বেশ তো, তোর বড়কাকার বাড়িতেই চল না হয়। ওখানেই থাক কিছুদিন।

মনে মনে বলল, আমার এখন একা ফেরাই ভাল। ইন্দ্রাণীর সঙ্গে একটিবার অন্তত বোঝাপড়া হওয়া দরকার।

তিতির আপত্তি করল না।

ঝাঁঝাঁ দুপুর। পলতা স্টেশন প্রায় জনবিরল। বাপ-মেয়ে বসে আছে ট্রেনের প্রতীক্ষায়। শেডের নীচে, সিমেন্টের বেঞ্চিতে। তিতিরের চোখ দূরে, প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে।

আচমকা আদিত্যর হাত টানল তিতির, বাবা… সুকান্ত।

কই?

–ওই তো। ওই গাছটার নীচে… ওকে ডেকে নেব বাবা?

অনেকক্ষণ পর আদিত্য অনাবিল হাসল, — যা।

মলিন শীর্ণ জল-না-পাওয়া ম্যাগনোলিয়া গাছটার কাছে চলে গেল মেয়ে। আদিত্য সিগারেট ধরাল। ধোঁয়াটা বেশ স্বাদু লাগছে। অন্যমনস্ক চোখ হঠাৎই ট্রেন লাইনের তারে আটকে গেল। একটা কাক তারে বসে। হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছে তার, কাকটাও দুলছে।

আদিত্যর গা সিরসির। তারে তারে না লেগে যায়!

জোর জোর তালি বাজাল আদিত্য, — হ্যাট হ্যাট। সরে যা। মরবি যে!

 নড়ছে না কাক। দোল খাচ্ছে উদাস।

.

তৃতীয়বারও তনুময়কে লেখা চিঠিটা মনোমত হল না ইন্দ্রাণীর। হচ্ছে না, কিছুতেই ঠিক গুছিয়ে লেখা যাচ্ছে না। চিন্তাশক্তি কি জট পাকিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ? এ সময়ে বোধহয় এমনটাই হয়।

ইন্দ্রাণী চিঠিটা পড়তে শুরু করল। নিঃশব্দে, কিন্তু ঠোঁট নড়ছে। …প্রিয় তনু, যখন এই চিঠি পাবি তখন আমি আর কোথাও নেই। তোকে বোধহয় এই আমার প্রথম চিঠি, এই শেষ। কেন লিখছি জানিস? হঠাৎ একটা পুরনো ঘটনা খুব মনে পড়ছে। তোর মনে আছে, টুনুমাসির বাড়ি একবার কে এক সাধুবাবা এসেছিল? গোকুলানন্দ না কি যেন নাম? তুই বোধহয় তখন ক্লাস নাইন-টাইনে পড়িস। খুব ভিড় হচ্ছিল টুনুমাসির বাড়ি, আজব আজব ভেলকি দেখাচ্ছিল সাধুটা। শুন্য থেকে শাঁকালু বার করে আনছে, ফাঁকা মুঠো খুললেই হাত ভর্তি গোলাপ! এর পরীক্ষার ফল কি হবে বলে দিচ্ছে, ওর চাকরি কবে হবে তার দিনক্ষণ! মা তোকে আমাকে দুজনকেই তার কাছে নিয়ে যেতে চাইল। তুই সোজা বলে দিলি, ম্যাজিক দেখতে হলে পয়সা দিয়ে ম্যাজিক দেখব, কিছুতেই ওই ভণ্ড বুজরুকের কাছে যাব না। আমি মার মুখের ওপর না বলতে পারলাম না। গেলাম। বাবরি চুল, ঢুলুঢুলু চোখ লোকটাকে দেখে আমার এতটুকু ভক্তি আসেনি, তবু মার কথায় তাকে প্রণাম করলাম। আশীর্বাদ ছলে লোকটা আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। আঙুলগুলো মাকড়সার মতো ঘুরছিল লোকটার। কী ঘেন্না! সারা রাত আমি ঘুমোত পারিনি। তোকে আভাসে ইঙ্গিতে কথাটা জানাতেই তুই বললি, ঠিক হয়েছে। যা মন থেকে চাস না, তা জোর করে করতে গেলে এরকমই হয়।

মন থেকে চাওয়াটা কী রে তনু? আমার ভেতরের আমি যা চায়? কেন আমি তার উল্টো মুখে হেঁটে গেলাম রে সর্বদা? কে হাঁটাল? সংস্কার? অসহায়তা? অহং?..

বিরক্ত মুখে পড়া থামাল ইন্দ্রাণী। এ কী আত্মবিলাপ রচনা করে চলেছে সে। হতে পারে তনু তার লক্ষ্যে স্থির, বিশ্বাসে দৃঢ়, আদর্শে অটল, তা বলে তার কাছে ইন্দ্রাণী কেন নিজেকে মেলে ধরবে? ন্যায়-অন্যায় পাপপুণ্য বিচার করার তনু কে? যা যা ভুল হয়েছে, প্রতিটি ভুলের জন্য ইন্দ্রাণী একমাত্র ইন্দ্রাণীর কাছেই দায়ী। একটা মানুষ যদি অবিরাম নিজের বিবেক বিশ্বাস ইচ্ছে আবেগের সঙ্গে লড়াই করে চলে, তবে তার জবাবদিহি তো নিজের কাছেই নিজেকে করতে হয়। তার অপরাধবোধ তো তারই। দহনও তার একার। অন্য কেউ যদি তাতে পুড়েও থাকে, তার জ্বালা ইন্দ্রাণীর চেয়ে বেশি হতে পারে না।

তাছাড়া তনুকে সে চিঠি লিখছেই বা কেন? তনু তার চিঠি পেয়ে ছুটে আসবে, বাবা-মার দায়িত্ব নেবে, এই আশায়? প্রথমত, এই আশাটাই মূর্খামি। দ্বিতীয়ত যদি তনু আসেও, সেটা হবে তার পিছুটান, বিচ্যুতি। কেন ইন্দ্রাণী তার ওপর অপ্রত্যক্ষ চাপ তৈরি করবে? একজন অন্তত নিজের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে বাঁচুক। আর বাবা-মা? তাদেরও দিন চলে যাবে। বরং সব সময়ে নিজেদের নির্ভরশীল ভাবার যন্ত্রণা থেকে তো বেঁচে যাবে।

চিঠিটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ল ইন্দ্রাণী। ময়লা কাগজের ঝুড়িতে ফেলল না, বন্ধ জানলা খুলে উড়িয়ে দিল পথে। সুনসান রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট শ্বাস ফেলল। এ সময়ে একজন জীবিত মানুষের মুখ দেখলে বুঝি ভাল লাগত।

এমন ইচ্ছে এখন এল কেন? তবে কি ইন্দ্রাণীর বাঁচার লোভ হচ্ছে?

ত্বরিত পায়ে সরে এল ইন্দ্রাণী। ড্রয়ার খুলে ঝটিতি নতুন ব্লেডটা বার করল। খাটে বসেছে। বিছানায় পুজোয় কেনা নতুন বেডকভার, হাতি উট কত কি প্রাণীর ছবি। এত সুন্দর চাদরটাকে নষ্ট করবে? ইন্দ্রাণী মেঝেয় নেমে এল। মাথার ওপর বনবন ঘুরছে পাখা, তবু ঘামতে শুরু করেছে ভীষণ। ঘড়ি দেখল। একটা বেজে গেছে, আর সময় নেই। যদি তিতিররা ফিরে আসে! ফিরবে কি তিতির? যদি না ফেরে? যদি আদিত্য গিয়ে দেখে তিতির নেই, চলে গেছে অন্য কোথাও?

তখনই বন্ধ ঘরের পলকা আঁধারে ফুটে উঠেছে একটু আগে বাথরুমে দেখা আয়নার সেই মুখ। তার ফিসফিস কথা স্পষ্ট শুনতে পেল ইন্দ্রাণী, বোকামি করিস না। কেন মরবি তুই? যদি তিতির আদৌ না ফেরে তাহলে তো আর কোনও সমস্যাই নেই। তোর গোপন কথাটি গোপনই রয়ে গেল। তিতিরকে হারিয়ে তোর কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু ভেবে দেখ, তোর বাবা-মাও তো তনুকে হারিয়ে দিব্যি বেঁচে আছে। বরং বসে বসে প্রার্থনা কর, তিতির যেন চিরকালের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ভাবনা কি, তোর তো বাপ্পা আছে। ওই দেখ আকাশের মতো ইউনিফর্ম পরে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে বাপ্পা… তোর বাপ্পা…।

প্রাণপণে চোখ টিপে বাঁ হাতের কবজিতে আড়াআড়ি ব্লেড টেনে দিল ইন্দ্রাণী। মুহূর্তে হাত বদলেছে ইস্পাতের ফলা, ঘষে চিরে দিল ডান কবজি। পলকের জন্য চাপা চিনচিনে অনুভূতি, পরক্ষণে রক্তে রক্তে লাল হয়ে গেছে হাত। আহ্ মুক্তি। আর তুই আমাকে নিয়ে কোনও সর্বনাশা খেলা খেলতে পারবি না রে শয়তানি।

দেহাধার থেকে মুক্তি পেয়ে কুলকুল ছুটে আসছে রক্তধারা, বয়ে যাচ্ছে অবিরাম। গাঢ় লাল আলপনা আঁকা হয়ে যাচ্ছে মেঝেয়। শরীরটা হঠাৎ কেমন কেঁপে উঠল। শীত শীত করছে। মৃত্যু কি খুব ঠাণ্ডা!

ইন্দ্রাণী কুঁকড়ে-মুকড়ে শুয়ে পড়ল। বন্ধ চোখের পাতায় সার সার ছবি। কলেজ স্ট্রিটে পড়ে আছে লাশ, ফুটপাথ ধরে বেভুল হাঁটছে ইন্দ্রাণী। তালহীন সুরহীন আদিত্য বাসর ঘরে গান গাইছে, লজ্জা লজ্জা মুখে নববধূর দিকে তাকাচ্ছে। কতটুকুনি এক বাপ্পা সর্ষের বালিশে শুয়ে হাত পা ছুঁড়ছে। শুভ দরজা খুলে বলল, – এসো, তনু আমার কাছেই আছে। শুভ বুকে মুখ গুঁজল। বেসিনে বমি করছে ইন্দ্রাণী, আয়নায় বিস্ফারিত চোখ। ছবি ঝাপসা হয়ে এল। জয়মোহন কলম ভেঙে দিলেন। তিতির আঙুল নাচিয়ে উঠল, তোমায় কি আমি চিনি না!

ইন্দ্রাণীর ঠোঁটের কোণে বিচিত্র হাসি ফুটল। কে চিনেছে ইন্দ্রাণীকে? ইন্দ্রাণী নিজেই কি…? নাহলে ঠিক এখনই আদিত্যকে মনে পড়ে কেন? …তোমার সঙ্গে আমি দয়া করে এতকাল ঘর করেছি… সত্যি, না মিথ্যে? …শুভর জন্য একটা কুঠুরি, আদিত্যর জন্য একটা… কোন কুঠুরিটা কোথায়?

শীত বাড়ছে। ইন্দ্রাণী আর একটু কুঁকড়ে যেতে চাইল। পারছে না। আবছা একটা সুর দুলছে দূরে… ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে.. কে গায়? কে নিতে এল ইন্দ্রাণীকে? …আমার গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে দে না রে তিতির।

অন্ধকার। চাপ চাপ অন্ধকার। দুপুর যেন রাত হয়ে এল। ওরা কারা কলকল করতে করতে স্কুল থেকে দৌড়ে বেরোচ্ছে? হজমিঅলার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল, ওই মেয়েটা কে? ইন্দ্রাণী? না না, তিতির। না না, ও তো ইন্দ্রাণী। হজমি শেষ, বুভুক্ষুর মতো পাতা চাটছে মেয়েটা। শুন্য পাতা… চাটছে… চাটছে। ওভাবে চাটিস না তিতির, পাতাটা ফেলে দে।

ইন্দ্রাণীর বুকটা শেষবারের মতো হু হু করে উঠল। তিতিরের জন্য কি? ইন্দ্রাণী জানতে পারল না।

.

৯৮.

শোকের সঙ্গে সময়ের এক সূক্ষ্ম রেষারেষি আছে। তাদের মধ্যে এক চাপা লড়াই চলছে অবিরাম। এই দ্বৈরথের প্রথম দফায় শোকই জেতে, চকিত আঘাত হেনে সময়কে সে নিশ্চল করে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে সময় বলবান হয়ে ওঠে, তার অদৃশ্য শরজালে হঠে যেতে থাকে শোক। ক্রমশ নির্জীব হয়ে পড়ে সে। তবে তাকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার শক্তি বুঝি সময়েরও নেই। এক শীতল বিষণ্ণতা হয়ে সে টিকে থাকে বহুকাল। অনেকটা যেন মেরুপ্রভার মতো। ক্ষীণ দীপ্তি, অথচ কী তার অপার বিস্তার!

সেই মেরুপ্রভায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে শুভাশিস। এখন, ইন্দ্রাণীর মৃত্যুর তিন মাস পর।

ইন্দ্রাণীকে দাহ করে আসার পর হৃৎপিণ্ডে এক তীব্র ব্যথা অনুভব করে শুভাশিস। এয়ারকন্ডিশন্ড ঘরে বসেও ঘামছে গলগল, চেনা নিয়তি যেন আঁচড় টানছে বুকে। সরবিট্রেট মুখে পুরতে ব্যথা একটু কমল বটে, কিন্তু মেলাল না। সঙ্গে সঙ্গে উতলা ছন্দা ফোনে হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছে। অরূপকে ডাকছে, উৎপলকে ডাকছে…। শুভাশিস টের পাচ্ছিল পেইনটা রিট্রোস্টার্নাল, তবে এসে এসে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ হৃদয়ের ইনফিরিয়ার ওয়ালে বড়জোর একটা ছোটখাট ইনফার্কশান হয়েছে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ উৎপলও ই সি জি করে সেরকমটা বলল। নাড়ি আর রক্তচাপের বেহিসেবি ওঠাপড়া দেখে ভুরু কুঁচকোল। কামপোজ ইনজেকশান দিয়েই কড়া হুকুম, মিনিমাম পনেরো দিন বিছানা থেকে উঠবি না।

বাড়িতেই কার্ডিয়াক মনিটর চলছে, টানা তিনদিন কড়া সিডেটিভে চেতন-অচেতনের মধ্যিখানের সাঁকোয় ঘোরাফেরা করছে শুভাশিস, তার মধ্যেই ইন্দ্রিয় মেসেজ পাঠাচ্ছে… ছন্দা এসে বসল মাথার কাছে.. কখনও বা টোটো… অরূপ শালিনী আসছে ঘন ঘন… উৎপল এল, টোটো উদ্বিগ্ন স্বরে কথা বলছে উৎপলের সঙ্গে… নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে শালী ভায়ারাভাই… থেকে থেকে ড্রয়িংরুমে ফোন বেজে উঠছে.. রবিবার মাধবপুর যায়নি বলে ছুটে এল তুফান… দাদার হাল দেখে হাউমাউ কান্না জুড়ল, থামাল ছন্দা… শুভাশিসের হাত ধরে বসে আছে তুফান, উঠে গেল একসময়ে…। অর্ধচেতন শুভাশিস মনে মনে স্বস্তি পাচ্ছিল, তাকে অন্তত কারওর সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে না। চুপচাপ চোখ বুজে পড়ে থাকে। অস্বচ্ছ কাচের ওপারে নিথর শুয়ে থাকে ইন্দ্রাণী। বিড়বিড় করে শুভাশিস ডাকে তাকে, ইন্দ্রাণী শুনতে পায় না। কখনও ঘষা কাচে ফুটে ওঠে তিতির। আদিত্যকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদে মেয়ে, নোনতা জলে ভিজে যায় শ্মশানভূমি। একটিবারের জন্যও মেয়ের মাথায় হাত রাখতে পারল না শুভাশিস!

সময় বয়ে যায়। কীভাবে বয় শুভাশিস জানে না, শুধু বয়ে যায়। আপন মর্জিতে হেঁটে চলে সময়।

সময়ই একদিন ঠেলে দাঁড় করিয়ে দিল শুভাশিসকে।

থেমে থাকার জো নেই, অনেক কাজ জমে গেছে, দিন কুড়ি বিশ্রাম নিয়ে আবার রুটিনে ফিরতে হল শুভাশিসকে। আবার অপারেশন থিয়েটার, আবার ছুরি কাঁচি ফরসেপ, এ চেম্বার থেকে ও চেম্বার, নার্সিংহোমে থেকে নার্সিংহোমে। টলমল পায়ে ছোটা, ধুঁকতে ধুঁকতে ছোটা, ইচ্ছের বিরুদ্ধে ছোটা। স্পৃহাহীন উদ্যমহীন শুভাশিস যেন এক অদৃশ্য পরিচালকের আজ্ঞাবহ দাস। নিজেই নিজের জন্য গোলকধাঁধা তৈরি করেছিল একদিন, এখন কি আর চাইলেই বেরোনো যায়! ক্লান্ত শুভাশিস বাড়ি ফিরে উগরে দিচ্ছে নোটের বান্ডিল, ব্যাঙ্কের টেলার মেশিনের মতো। শুভাশিসের অভ্যস্ত হাত মানুষের দেহ খুঁড়ছে, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির মতো।

সময় বয়ে যাচ্ছে।

জোর কদমে বর্ষা নেমে গেল।

 টোটোর জয়েন্ট এন্ট্রান্সের রেজাল্ট বেরিয়েছে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পেয়ে কানপুর আই আই টিতে চলে গেল ছেলে, ছন্দা আপত্তি করল না, শুভাশিস বাধা দেওয়ার জোরই পেল না। বাড়ি আরও খাঁ খাঁ করতে লাগল। শুধু শুভাশিস আর ছন্দা, ছন্দা আর শুভাশিস। ছন্দা এখন আর উঁচুগ্রামে কথা বলে না, কখনও ঝগড়া করে না, ঔদাসীন্য ঝেড়ে ফেলে শুভাশিসের সুখ-সুবিধের দিকে তার এখন তীক্ষ্ণ নজর। অনেক বদলে গেছে ছন্দা, বুঝি বুঝে গেছে যে ছিল তাকে সরানোর জন্য যুদ্ধ করা চলে, কিন্তু যে নেই তাকে মুছে ফেলা তার সাধ্যের অতীত। এক এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় শুভাশিসের, দেখে বিছানায় উঠে বসে আছে ছন্দা, হাঁটুতে থুতনি রেখে কী যেন ভাবছে। কী ভাবে? ইন্দ্রাণীর পরিণামের কথা? হারজিতের হিসেবটা খতিয়ে দেখে? এত কাছে ছন্দা, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, তবু অন্ধকারে তাকে কেমন অপার্থিব লাগে! শুভাশিস কিছুতেই তার কাছে যেতে পারে না। ইন্দ্রাণী থাকতে যেটুকুনি বা মানসিক নৈকট্য ছিল দুজনের, ইন্দ্রাণী চলে যেতে তার কণামাত্র বুঝি অবশিষ্ট রইল না। কী অবলীলায় ছন্দাকে একদিন ভালবাসি বলেছিল শুভাশিস, আজ কেন সেই মিথ্যেটুকুনিও বলতে পারে না!

ইন্দ্রাণীর অনস্তিত্ব শুভাশিস আর ছন্দার মাঝে বাতাসের নতুন প্রাচীর তুলে দিয়েছে।

সপ্তাহভর ছটফট করে শুভাশিস, শনিবার হলেই চলে যায় মাধবপুর। নিয়মিত দু দিন করে এখন বাবার চেম্বারে বসে। ছন্দাও যায় সঙ্গে। ঘোরে এবাড়ি ওবাড়ি, তুফান-অলকার সঙ্গে এতাল-বেতাল কথা বলে, হুটহাট তুফানকে নিয়ে চলে যায় দুধগঞ্জের হাটে, আলতু-ফালতু হাজারো জিনিস হাট থেকে সওদা করে আনে। হয়তো বা এতে খানিক তাজা বাতাসের ঝলক পায় ছন্দা। হয়তো বা তাদের দুজনকে ঘিরে গড়ে ওঠা নির্জনতার ফাঁস একটু আলগা হয়।

মাধবপুরে এসে শুভাশিস অবশ্য বড় একটা বাড়ি থেকে বেরোয় না। রুগী দেখা ছাড়া বাকি সময়টুকু সে এখন মনোরমার ঘরে কাটায়। কখনও বা নিশ্চুপ বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও বা অনর্গল কথা বলে যায়। কত কথা, কত প্রশ্ন, কত কৈফিয়ত যে জমে আছে শুভাশিসের রক্তমাংসের খাঁচায়! জরতী দেহ, বোধহীন মনোরমা যেন এক কনফেশান বক্স, তাঁর সামনে শুভাশিস নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে। ভুলের কথা বলে, অপরাধের কথা বলে, লোভের কথা বলে, যন্ত্রণার কথা বলে। বলতে বলতে কখনও মনে হয় মনোরমা নয়, শিবসুন্দরের সামনে বসে আছে সে। শিবসুন্দর যেন মিশে আছেন মনোরমায়। কখনও মনে হয় এই মনোরমার গর্ভ থেকে জন্ম হয়েছিল তার, এই বসে থাকা যেন নিজেরই মুখোমুখি বসে থাকা।

মাঝে মাঝে মাধবপুরে বৃষ্টি নামে জোর। ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে যায় চারদিক, অবিরল জলধারায় ধুয়ে যায় পৃথিবী। সেসব দিনে, রাতে মনোরমার পাশের চৌকিতে শুয়ে ঝমঝম ধ্বনি শুনতে শুনতে আশ্চর্য সব অনুভূতি জাগে শুভাশিসের। মনে হয় সে আর তার মা ছাড়া গোটা দুনিয়াটাই বুঝি লোপ পেয়ে গেছে। মনে হয় মনোরমা আর ইন্দ্রাণীর মধ্যে কোথায় যেন একটা গভীর মিল আছে। ঠিক মিলও নয়, এক ধরনের অভিন্নতা। সময়ই কি চারপাশের জগৎ থেকে ওই দুই নারীকে উপড়ে তুলে দেয়নি? সময়, না শুভাশিস নিজে? ইন্দ্রাণীর মৃত্যুর জন্য শুভাশিসের যদি কোনও প্রত্যক্ষ দায় থাকে, তবে কি মনোরমার এই জীবন্মৃত থাকার জন্যও তার কোনও পরোক্ষ দায় নেই? শুভাশিস না জন্মালেই কি ভাল ছিল না?

হ্যাঁ, এসব আজগুবি চিন্তারা আসতে থাকে সার সার। আসে, আসতেই থাকে। সময় বয়ে যায়।

.

ভাদ্র মাস চলছে।

নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে গড়িয়ার চেম্বারে যাচ্ছিল শুভাশিস। কদিন ধরে চিটপিটে গরম পড়েছে। ছাড়া ছাড়া বৃষ্টি হয়, কিন্তু গুমোট ভাব কাটে না তাতে। শুভাশিস গাড়ির পিছনের সিটে বসে টিপটিপ ঘামছিল।

আজকাল শুভাশিস গাড়ির পিছনের সিটেই বসে। মাইল্ড অ্যাটাকটার পর থেকে স্টিয়ারিং-এ বসা তার বারণ হয়ে গেছে। আরও অনেক কিছুই বারণ। যেমন, সিঁড়ি ভাঙা, সিগারেট খাওয়া, টেনশান করা…। সব নিষেধ কি অক্ষরে অক্ষরে মানা যায়! মাধবপুর গেলে দু চারবার ওপর-নীচ করতেই হয়, ও-টি থেকে বেরোনোর পর একটা অন্তত সিগারেট না খেলে চলে না। আর তার কাজের প্রকৃতিটাই এমন যে টেনশানও সঙ্গী হয়ে থাকবেই। শুধু গাড়ি চালানোটাই যা সে পুরোপুরি ছাড়তে পেরেছে। বেছে বেছে এক বয়স্ক ড্রাইভার রেখেছে, যাতে গাড়ির গতিও খুব বেশি বাড়ে না এখন। আর জোরে ছুটতে ভাল লাগে না।

টালিগঞ্জের ঘিঞ্জি রাস্তা। সামনে একটা গাড়ি খারাপ হয়েছে, ট্রাফিক জ্যাম। শুভাশিসের সাদা মারুতি দাঁড়িয়ে পড়ল। অন্যমনস্ক চোখ রাস্তার ধারের চা দোকানে পড়তে পিঠ সোজা করল শুভাশিস। তথাগত না? খুব হাত মুখ নেড়ে তথাগত কথা বলছে একজনের সঙ্গে, ভারী সতেজ সপ্রাণ ভঙ্গি।

শুভাশিসের দু চোখ করকর করে উঠল। পাছে তথাগত দেখে ফেলে, মুখ ঘুরিয়ে আড়াল করল নিজেকে। তখনই বুকটা হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠেছে। তনুময়কে তো ইন্দ্রাণীর খবরটা দেওয়া হয়নি। নিজের দুঃখ নিয়েই নিজে বিভোর ছিল, ধীরাজ-উমা কেমন আছেন কে জানে! একটা চিঠি লিখে তনুময়কে সব জানিয়ে দেওয়া কি শুভাশিসের কর্তব্য নয়? কালই লিখে দেবে? নাকি নিজে গিয়ে বলে বুঝিয়ে অন্তত একটিবারের জন্যও…? তনুময়রা কি ফেরে?

চিন্তাটা সঙ্গে নিয়েই গড়িয়ার চেম্বারে পৌঁছল শুভাশিস। রতিকান্তর ঘরে যথারীতি কিটকিটে ভিড়, তার ঘরেও আজ নয় নয় করে পাঁচজন পেশেন্ট। একজন রিপোর্ট দেখাবে, দুজনের চেকআপ আছে, একজন নতুন। পঞ্চমজনটি পুরনো পেশেন্ট, গলব্লাডারে পলিপ আছে, মাঝে মাঝেই অ্যাসিডিটিতে কষ্ট পায়, তবু অনেককাল ধরে অপারেশান করব করব করছে, কিন্তু করাচ্ছে না। একটু মেন্টাল প্রবলেম আছে লোকটার, নিজেই নিজের ডাক্তারি করে মুঠো মুঠো ওষুধ খায়, ব্যথা বাড়লেই চিঁচিঁ করতে করতে এখানে ছুটে আসে। শুভাশিসকে দেখে বছর চল্লিশের রুগীটি ঘনিষ্ঠ পরিচিতের মতো হাসল, মেজাজ খিঁচড়ে গেল শুভাশিসের।  

নিজের চেয়ারে এসে বসতেই লোডশেডিং হয়ে গেল। পুরনো জেনারেটর নিয়ে কার্তিক যথারীতি বিব্রত হয়ে আছে, হাঁকাহাঁকি করতে ঘরে মোমবাতি দিয়ে গেল। রতিকান্তর এমার্জেন্সি লাইট-জ্বলা ঘরে গজল্লা চলছে, স্বল্প আলোয় সর্বক্ষণের সঙ্গী হিমেল বিষাদ বেড়ে যাচ্ছে আরও, ভার ভার মুখে শুভাশিস একে একে রুগীদের ডাকল।

পুরনো রুগীটি এসেছে সবার শেষে।

 শুভাশিস গোমড়া মুখে বলল, আবার আপনার কী প্রবলেম?

রুগী বলার আগে তার ভালমানুষ চেহারার স্ত্রী উত্তর দিল, কিছু খেতে চাইছে না ডাক্তারবাবু। জোর করে খাওয়ালে বমি করে দিচ্ছে। সবাই মানা করল, তবু সকালবেলা গিয়ে ব্যথা কমানোর ইঞ্জেকশান নিয়ে এল…অফিস যাওয়া বন্ধ করে বসে আছে…।

–তা আমি কী করব? বলেছি তো অপারেশান না করালে হবে না।

–সেই পলিপটা কিন্তু আর নেই স্যার। লোকটা তড়িঘড়ি বলে উঠল, এ ব্যথাটা অন্য কিছু।

বুঝলেন কী করে? টেস্ট-ফেস্ট কিছু করিয়েছেন?

–টেস্ট মানে তো আলট্রাসোনোগ্রাম! মুখ বিকৃত করল লোকটা, ছবি তুলে মানুষের ভেতরটা বোঝা অত সহজ নয় স্যার। ছবি যা ধরতে পারে স্যার, ভেতরটা তার থেকে অনেক বেশি জটিল।

–তবে আর কী! আপনি তো ডাক্তারি পড়েই ফেলেছেন।

না স্যার। মেডিকেল বুক পড়লেই কি সব বুঝে ফেলা যায়? আপনি কি নিজেই জানেন আপনার ভেতরে কোথায় কী চলছে এখন? লোকটা পিটপিট তাকাচ্ছে। হঠাৎ গলা নামিয়ে বলল, একটা পলিপ নয় আপনি বাদ দিলেন, কিন্তু ভেতরে আরও যে হাজারো পলিপ নেই তা কে বলতে পারে? তার চেয়ে বরং….

–ওর কথা আপনি শুনবেন না ডাক্তারবাবু। বউটি ঝংকার দিয়ে উঠল, অপারেশানের ভয়ে এরকম আবোল-তাবোল বকছে। আজও কি আসতে চায়? এত কষ্ট পাচ্ছে তবু…। অনেক সাধ্যসাধনা করে ধরে এনেছি। আপনি একটা ডেট দিয়ে দিন ডাক্তারবাবু, আমি ওকে ঠিক সেই মতো নার্সিংহোমে ভর্তি করে দেব।

প্রতিবারই এ দৃশ্যের অবতারণা হয়। শুভাশিস বিরস মুখে বলল, – ই.সি.জি. আর ব্লাড টেস্টগুলো করিয়ে আনুন আগে। তারপর…। বলতে বলতে রুগীর দিকে তাকাল, আসুন, শুয়ে পড়ুন।… রাতে এখন কটা করে ঘুমের বড়ি খাচ্ছেন, অ্যাঁ? 

রুগীটি প্রেসক্রিপশান নিয়ে চলে যাওয়ার পর মনে মনে একটু হাসল শুভাশিস। ধূসর হাসি। খুব ভুল কিন্তু বলেনি লোকটা। ভেতরকার কতটুকু ছবি বাইরের যন্ত্রে ধরা পড়ে! কত জায়গায় কত যে অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড গজাচ্ছে কে তার খোঁজ রাখে! ইন্দ্রাণী কি ভেতর থেকে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল? না হলে শেষ দেখার দিন অত ভেঙে পড়ল কেন?

চোখ বুজে ইন্দ্রাণীর মুখটা মনে করার চেষ্টা করছে শুভাশিস। মাথা নিচু করে খাতা দেখছে ইন্দ্রাণী, টেবিলল্যাম্পের আলো এসে পড়েছে মুখে। হঠাৎ হঠাৎ পেনসিল দাঁতে চাপছে, অতি সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ছে ভুরুতে, মিলিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বসংসার ভুলে ডুবে থাকা ওই মুখটাই যে কেন মনে পড়ে বারবার!

দোল-দরজায় মৃদু শব্দ। চোখ খুলতেই মস্তিষ্কে লক্ষ ভোল্টের শক। সামনে ইন্দ্রাণী, পরনে সেই সাদা খোলের ছোট ছোট বুটিঅলা শাড়ি! এ কী করে সম্ভব!

–তুমি আসছ না কেন?

 –ও, তুই! আমি ভাবলাম….। শুভাশিস মাটির পৃথিবীতে ফিরল।

তিতিরের মুখে এক অচেনা হাসি। আবার ঠিক যেন অচেনাও নয়। একটু ঝুঁকে বলল, আমাকে আশা করনি, তাই না?

না না, সে কি! ….বোস। তিতিরের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল শুভাশিস, তোরা সব কেমন আছিস?

–কেটে যাচ্ছে।

 –তোর হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট কেমন হল?

–মোটামুটি।

কী নিয়ে ভর্তি হলি?

ইংলিশ। মা চেয়েছিল…তিতির চুপ করে গেল। চোখ নামিয়ে হাতের নখ দেখছে। মোমের শিখা কাঁপছে থর থর।

শুভাশিস অস্ফুটে বলল, – টোটো তো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল। কানপুর। শুনেছিস?

 তিতির যেন শুনতেই পেল না, তোমার শরীর এখন কেমন আছে?

-মন্দ কি!

–সাবধানে থাকছ?

শুভাশিসের বুকটা কনকন করে উঠল। খুব নিচু গলায় বলল, – তোরা খবর পেয়েছিলি?

হুঁ। মধুমিতা আন্টি খবর দিয়েছিল।

 শুভাশিস মনে মনে বলল, – তবু তোরা কেউ আমার খোঁজ নিসনি। আমি তো মরেও যেতে পারতাম রে তিতির। মুখে বলল, তেমন কিছু হয়নি। কদিন রেস্ট নিয়ে নিতেই…হ্যাঁরে, বাপ্পা এসেছিল?

–হ্যাঁ। দাদা দিন সাতেক ছিল। আবার বোধহয় ডিসেম্বরে আসবে।

–ছেলেগুলো কেমন সব দূরে দূরে চলে গেল। টোটো সেই কানপুর, কবে কোন ভেকেশান পড়বে… আসবে…

তিতির এবারও যেন কথাটা শুনতে পেল না। সিলিং-এর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, আমরা পুজোর পরে নতুন ফ্ল্যাটে যাচ্ছি।

–তৈরি হয়ে গেল?

–মোজাইকের কাজ চলছে। কিছু ফিটিংস-টিটিংস বাকি।

কতদিন পর তিতির ভাল করে কথা বলছে! ভাবলেশহীন, কিন্তু স্বচ্ছ ঋজু স্বর। ভাল লাগছিল শুভাশিসের। পুরনো ক্ষতয় যেন নরম প্রলেপ পড়ছে। চোরা মায়ায় ভরে গেল হৃদয়।

অনেকটা সহজভাবে বলল, আমরা তো লেকগার্ডেন্সের জমিটা বোধহয় রাখব না। তোর ছন্দা আন্টি বলছিল টোটো আলটিমেটলি কোথায় সেট করে ঠিক নেই….

এবারও তিতির শুনল না। কথার মাঝখানে বলে উঠেছে, জানো, বাবা গত মাস থেকে একটা চাকরি করছে।

বাবা শব্দটা শুভাশিসের কানে টঙ করে বাজল। বাজার কথা নয়, চিরকাল এমনটাই তো শুনে এসেছে, তবুও। সব জেনেশুনেও তিতির এত স্বচ্ছন্দে তার সামনে শব্দটা উচ্চারণ করল কী করে!

শুভাশিস আহত মুখে বলল, এই বয়সে চাকরি করছেন? কোথায়?

ছোটকার এক বন্ধুর ট্রাভেল কোম্পানিতে। কডাক্টেড ট্যুরে কোম্পানির লোক হয়ে যেতে হয়। অনেকটা ম্যানেজারের মতো। এই তো জয়েন করেই পুরী ভুবনেশ্বর চিলকা ঘুরে এল।

–সে তো খুব ছোটাছুটির কাজ। ওঁর পোষাচ্ছে?

বলছে তো ভালই লাগছে। নানা রকম মানুষের সঙ্গে থাকে, মানুষ দেখে…করছে করুক, কিছু নিয়ে তো আছে। তিতিরের গলা হঠাৎ ভারী হয়ে এল, মা মারা যাওয়ার পর বাবা খুব একা হয়ে গেছে ডাক্তার আঙ্কল।

শেষ বাক্যটা এবার বুকে বেজেছে। অনেক অনেক গভীরে, মর্মমূলে। সঙ্গে একটা বল্লমের ফলাও বিঁধল কি? বুক জ্বলে যায় কেন? শুভাশিসের গলা কাঁপিয়ে দু টুকরো অসংলগ্ন শব্দ ছিটকে এল, –হুঁ…একা…

–হ্যাঁ আঙ্কল, একা। লোনলি। মা যে বাবার কতখানি ছিল, আগে আমি বুঝেও বুঝতে পারিনি। মা চলে যাওয়ার পর থেকে বাবা আমাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে। যেন নিজেই মা, নিজেই বাবা। আমি ছাড়া আমার বাবারও এখন আর কেউ নেই। তবু আমি বুঝতে পারি, বাবার লসটা আমি কোনও ভাবেই…হঠাৎ হঠাৎ কী ভীষণ আনমাইন্ডফুল হয়ে যায় বাবা….এই ট্যুরে গেছিল, আমার যা চিন্তা হচ্ছিল….।

মেয়ে কি আজ তাকে যন্ত্রণা দিতেই এসেছে? ইন্দ্রাণীর হয়ে প্রতিশোধ নিতে চায় তিতির? নাকি আদিত্যর হয়ে? শুভাশিস আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না।

বিস্বাদ গলায় বলে ফেলল, আদিত্যবাবুর জন্য তোর এই ফিলিংস খুব জেনুইন, আমি জানি।

মুহূর্তের জন্য তিতিরের চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। কঠিন গলায় বলল, – জেনুইন নয়, বলো অবভিয়াস। স্বতঃসিদ্ধ। আমার বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক চিরকালই এরকম।

তিতির নয়, ইন্দ্রাণী কথা বলছে? সেই এক জেদী ভঙ্গি! তিতির কি বুঝবে না তার বাবা হওয়ার জন্য কত হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করে আছে শুভাশিস!

করুণ গলায় শুভাশিস বলতে চাইল, তিতির প্লিজ, একবার আমাকে..

তিতির উঠে দাঁড়িয়েছে, তা হলে তুমি আমাদের বাড়ি আসছ তো?

শুভাশিস মলিন মুখে বলল, – দেখি।

–দেখি নয়। এসো। বোঝো না, তুমি না এলে মার অসম্মান হয়? এতদিনের আসা-যাওয়া তোমার, হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল….তিতির ফিরতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়াল, অন্তত আমার জন্যও এসো।

শুভাশিস চোখ বুজে ফেলল। বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠেছে এক দ্বীপ। দ্বীপ থেকে অসংখ্য গাছ নেমে এসেছে জলে, পর পর দাঁড়িয়ে আছে। জলঅরণ্যের ফাঁকে ফাঁকে খেলা করছে আদিম আলোছায়া। ওই আলোছায়ায় প্রতিটি জলডুবি গাছই কী ভীষণ একা। পাশাপাশি থেকেও।

একা? না পরস্পরের নিশ্বাস পরস্পরকে ছুঁয়ে যায় গোপনে?

একা? না এক গাছের ছায়ায় সম্পৃক্ত হয় অন্য গাছ?

চোখ খুলল শুভাশিস। সুয়িংডোর দুলছে অল্প অল্প। ইন্দ্রাণীর প্রতিবিম্ব মিলিয়ে গেছে আবছায়ায়।

শুভাশিস অস্থির ভাবে মাথা নাড়াল। ইন্দ্রাণীর আহ্বান সে উপেক্ষা করতে পারেনি। তিতিরের ডাকেও সাড়া দিতে হবে। রবাহূতের মতোই হাজিরা দিতে হবে আবহমানকাল। ছন্দা টোটোর বন্ধন থেকেও তার মুক্তি নেই।

এটাই শুভাশিসের নিয়তি।

এ’ই মানুষের বেঁচে থাকা।

2 Comments
Collapse Comments
পূর্ণতা October 15, 2021 at 2:00 pm

আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র তিতির এবং সুকান্ত। এই জুটি যেন মোহ। আমি কতবার যে শুধু ওদের অংশগুলো পড়েছি। এ মোহ কাটতেই চায় না। কিন্তু সুচিত্রা ম্যাডাম সুকান্ত চরিত্রটি অবহেলিত রেখেছেন পুরো উপন্যাসে। একটি পাতা, শুধু একটি বারের জন্যও তিনি সুকান্তর হয়ে লেখেননি। যাই হোক, সবশেষে সুকান্ত তিতিরের মিল দেখিয়েছেন তাতেই কৃতজ্ঞতা।

আমি ইউটিউবে মেগা সিরিয়াল টা দেখতে ছিলাম। কিন্তু শেষের অংশটুকু খুঁজে না পেয়ে অবশেষে টেক্সট পড়লাম।

কোনো পাপ কিংবা অপরাধবোধ থেকে একজন নারী সহজে মুক্তি পেতে পারে। কিন্তু একজন পুরুষ পারে? সে তো দিনশেষে একজন দায়িত্ববান বাবা কিংবা স্বামীর ভূমিকায়!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *