৩.৫-৩.৮ রহস্য ঘনীভূত

৩.৫ রহস্য ঘনীভূত

রিচমণ্ড থেকে পালানোর পর লিঙ্কন দ্বীপে বাস তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। লড়াই যে এতদিনে শেষ হয়েছে, দ্বীপবাসীদের সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রায়ই এ-বিষয়ে এঁদের মধ্যে আলোচনা হত। এতদিন পর্যন্ত দেশে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগই পাওয়া যায়নি। আর সুযোগ পাওয়া যায়নি বলেই দ্বীপটার উন্নতির জন্যে প্রাণপণে খেটেছে—বলা যায় তো না–হয়তো-বা এই দ্বীপ ছেড়ে যাওয়া জীবনে আর সম্ভব না-ও হতে পারে-আর এই দ্বীপেই যখন থাকতে হবে, তখন দ্বীপটাকে বাসযোগ্য করে তোলা উচিত। এই ভেবে তারা দ্বীপটার উন্নতির জন্যে খেটেছেন, খাটতে-খাটতে মায়া পড়ে গেছে দ্বীপটার উপর। আর তাই তারা ঠিক করলেন যে নিজেদের হাতে-গড়া এই দ্বীপেই জীবনের বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দেবেন। তবে, তার আগে অন্তত দিন-কয়েকের জন্যে হলেও দেশে ফিরে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে আসার ইচ্ছে সকলের মনেই প্রবল। কিন্তু মানুষ তো অনেক কিছুই ভাবে—সব কি আর ঘটে?

সে-ইচ্ছে পূর্ণ হতে পারে দুই উপায়ে-হঠাৎ যদি কোনো জাহাজ এসে লিঙ্কন দ্বীপে ভিড় জমায়, কিংবা সমুদ্রযাত্রার উপযোগী একটা বড়ো জাহাজ যদি এঁরা প্রস্তুত করে নিতে পারেন। মোটামুটিভাবে কাজ-চালানো-গোছ একটা জাহাজ তৈরি করতে কম করেও মাসছয়েক লাগবে।

সাইরাস হার্ডিং একদিন পেনক্র্যাফটের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করতে-করতে শুধোলেন : একটা বড়ো জাহাজ তৈরি করতে ক-দিন লাগবে বলতে পারো? জাহাজ যখন তৈরি করতে হবে, তখন বেশ বড়ো করে তৈরি করাই ভালো। স্কটিশ জাহাজ টেবর দ্বীপে আসবে কি না তার কোনো ঠিক নেই, হয়তো-বা এর মধ্যেই এসে সেখানে আয়ারটনের সন্ধান না-পেয়ে ফিরে গেছে। সুতরাং এমন জাহাজ তৈরি করতে হবে, যাতে শুধু টেবর দ্বীপে নয়—নিউজিল্যান্ড কিংবা অন্য কোনো বড়ড়া দ্বীপে যাওয়াও সম্ভব হয়। তোমার কী মনে হয় পেনক্র্যাফট?

আমার মনে হয় পেনক্র্যাফট বললে : যখন কাঠ বা যন্ত্রপাতির কোনো অভাব নেই তখন যত বড়ো ইচ্ছে তত বড়ো জাহাজই আমরা তৈরি করতে পারবো। তবে, সময় লাগবে।

সাইরাস হার্ডিং কী-যেন ভাবলেন। বললেন : আচ্ছা, আড়াইশো-তিনশো টনের জাহাজ তৈরি করতে ক-দিন লাগবে বলে মনে হয়?

সাত-আট মাস তো লাগবেই। পেনক্র্যাফট জবাব দিলে : তার উপর আবার শীত পড়ছে শিগগিরই, সে-কথাটাও মনে রাখতে হবে–শীতের সময় কাঠের কাজ বড়ো ঝামেলার। তা এখন থেকে শুরু করলে আসছে নভেম্বর নাগাদ জাহাজ শেষ হতে পারে। আপনি নকশার খশড়া করে ফেলুন-আমরা কাঠটাঠ কেটে সব ঠিক করে রাখি।

চিমনির কাছেই একটা জায়গা ঠিক করা হল। জাহাজ তৈরি করবার জন্যে সাইরাস হার্ডিং সেখানে একটা ডকইয়ার্ডের মতো তৈরি করলেন। জাহাজের ডেক, খোল, সবকিছুর জন্যেই বন থেকে কাঠ কেটে এনে ডকইয়ার্ডে জড়ো করা হল। সাইরাস হার্ডিং তখন জাহাজের নকশা আর ছোটো একটা মডেল তৈরি করতে শুরু করলেন।

প্রসপেক্ট হাইটের সর্বনাশ করে গিয়েছিল দস্যুরা। তাদের আবার নতুন করে ঘরবাড়ি, ফসলের খেত, মিল, সবকিছু তৈরি করতে হল। টেলিগ্রাফের তার পর্যন্ত দস্যদের নিষ্ঠুর হাত থেকে রেহাই পায়নি—তাও মেরামত করা হল। দস্যুরা আর নেই, তাই আর দুর্ভাবনাও নেই এখন। তবু, নতুন-কোনো দস্যুদল যে এসে হাজির হবে না, তা কে জানে? দ্বীপের অধিবাসীদের দৈনন্দিন রুটিন হয়ে দাঁড়ালো প্রসপেক্ট হাইটের উপর থেকে দুরবিন নিয়ে চারদিক আঁতিপাঁতি করে খোঁজা! বরাত ভালো যে সন্দেহজনক কিছু দেখা যায়নি কোনোদিন। তবু সাবধানের মার নেই বলে সর্বদা সতর্ক থাকতে হত।

দিনের পর দিন কাটে। ক্রমে জুন মাস এলো। দারুণ হিম পড়েছিল বলে সবাইকে গ্র্যানাইট  হাউসে আশ্রয় নিতে হল। এই নিদারুণ বন্দিত্ব গিডিয়ন স্পিলেটকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত। একদিন স্পিলেট নেবুকে আকুল গলায় বললেন : নেব, তুমি যদি আমাকে কোনোরকম একটা খবর-কাগজের গ্রাহক করে দিতে পারো, তবে দেশে আমার যা-কিছু সম্পত্তি আছে সব তোমাকে লিখে-পড়ে দেবো।

নেব অবিশ্যি তার শাদা ধবধবে বত্রিশটা দাঁত বের করে ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিলে, কিন্তু সত্যিই স্পিলেট এই নিদারুণ একঘেয়েমি কিছুতেই আর সহ্য করতে পারছিলেন না।

দেখতে-দেখতে জুন জুলাই আগস্ট-শীতের তিন মাস কেটে গেল। এই দীর্ঘ শীতে গ্র্যানাইট  হাউসের অধিবাসী সবারই স্বাস্থ্য বেশ ভালো ছিল। বাচ্চা জাপের শীতটা একটু বেশি লাগতো বলে তাকে বেশ-পুরু একটা ড্রেসিং-গাউন তৈরি করে দেয়া হয়েছিল। পরিচারক হিশেবে জাপ চমৎকার,অমন চালাক-চতুর, কার্যক্ষম, পরিশ্রমী দ্বিতীয়-কাউকে খুঁজে পাওয়া শক্ত।

শীত শেষ হয়ে গেল। বসন্ত এলো। আর সঙ্গে সঙ্গে নতুন একটা আশ্চর্য ঘটনা এসে হাজির হল, যার পরিণাম ভয়াল ও ভয়ংকর। সাতই সেপ্টেম্বর সাইরাস হার্ডিং দেখতে পেলেন ফ্র্যাঙ্কলিন পাহাড়ের চুড়ো থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে।

ফ্র্যাঙ্কলিন পাহাড়ের চুড়ো থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে—এই কথা শুনে যেযার কাজকর্ম ফেলে একদৃষ্টে পাহাড়ের চুড়োর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

দীর্ঘ নিদ্রার পর আবার জেগেছে আগ্নেয়গিরি। তবে কি আবার অগ্নিবৃষ্টি শুরু হবে, আবার হবে অগ্ন্যুৎপাত? সে যা-ই হোক, অগ্ন্যুৎপাত হলেও সমস্ত লিঙ্কন দ্বীপটির বিপদ নাও ঘটতে পারে, আগেও এখানে অগ্ন্যুৎপাত হয়ে গিয়েছে। পাহাড়ের গায়ে উত্তর দিকে রয়েছে আগেকার জ্বালা-মুখ, সেই পুরোনো পথেই হয়তো উৎক্ষিপ্ত গলিত পদার্থ বয়ে যাবে; সুতরাং দ্বীপের তেমন গুরুতর অবস্থা না-ও হতে পারে।

অদূর ভবিষ্যতে কী-কী বিপদ ঘটবার সম্ভাবনা আছে, সাইরাস হার্ডিং সকলকে বুঝিয়ে বললেন। বিপদ যদি উপস্থিতই হয়, তাকে বাধা দেবার সাধ্য কারু নেই। তবে গ্র্যানাইট  হাউস নিরাপদ বলেই মনে হয়। অবিশ্যি দারুণ ভূমিকম্প হলে সারা পর্বত কেঁপে উঠবে,তখন যদি ফ্র্যাঙ্কলিন পর্বতের ডান পাশে নতুন কোনো জ্বালামুখের সৃষ্টি হয়, তবে কোর‍্যালের গুরুতর ক্ষতি হবার সম্ভাবনা।

সেদিন থেকে ধোঁয়া বের-হওয়া তো বন্ধ হলই না, বরং দিনের পর দিন যেন ধোঁয়ার পরিমাণ বেড়েই চলন।

জাহাজের কাজে বাধা পড়ল না। ফসল তোলার জন্যে দিন-কয়েক কাজ বন্ধ ছিল, তারপর আবার দ্বিগুণ উৎসাহে সবাই কাজে লাগলেন।

পনেরোই অক্টোবর। রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই মিলে গল্পগুজব করছিলেন। অন্যদিনের চাইতে রাত সেদিন বেশি হয়েছিল। পেনক্র্যাফট ঘুমোতে যাওয়ার জন্যে সবে তখন আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় খাবার ঘরের ইলেকট্রিক বেলটা হঠাৎ ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠল।

সাইরাস হার্ডিং, গিডিয়ন স্পিলেট, হার্বার্ট, আয়ারটন, পেনক্র্যাফট, নেব—সবাই এখানে, কোর‍্যালে তো কেউ নেই। তবে কেন ইলেকট্রিক বেল বাজল? আর, বাজালোই বা কে?

হতভম্ব হয়ে পরস্পরের দিকে চাওয়া-চাউয়ি করতে লাগলেন সবাই। একটু পর সংবিৎ ফিরলে সাইরাস হার্ডিং বললেন : দাঁড়াও-ঘণ্টা যে-ই বাজাক না কেন, যদি কোনো সংকেত করবার জন্যে বাজিয়ে থাকে, তবে আবার নিশ্চয়ই বাজাবে।

নেব বললে : কিন্তু বাজালে কে?

পেনক্র্যাফট বললে : উনি—উনি ছাড়া আর কে বাজাবেন?

পেনক্র্যাফটের কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই আবার ঘণ্টা বেজে উঠল।

সাইরাস হার্ডিং যন্ত্রটার কাছে গিয়ে টরে টক্কা করে প্রশ্ন করলেন : কী দরকার? কী চাই?

একটু বাদে জবাব এল : এক্ষুনি কোর‍্যালে চলে এসো।

সাইরাস হার্ডিং উত্তেজিত হয়ে উঠলেন : এতদিনে সব রহস্যের সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে।

হ্যাঁ, এ পর্যন্ত দ্বীপে পর-পর যে-সব আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে, এতদিনে তার মীমাংসার সম্ভাবনা এসেছে!

অবসাদ, শ্রান্তি-ক্লান্তি, ঘুম—সব ভুলে নীরব কৌতূহলে তক্ষুনি সবাই সমুদ্রতীরে নেমে গেলেন। শুধু জাপ আর টপ গ্র্যানাইট  হাউসে রইল।

কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত্রি। মেঘে-মেঘে আকাশ ছাওয়া। তারার মিটিমিটি পর্যন্ত। নেই। একটু পরেই হয়তো শুরু হবে ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত। যত গাঢ় অন্ধকার হোক না কেন, কোর‍্যালের পথ চেনা, সেখানে যেতে অসুবিধে হবে না। গভীর গহন অন্ধকারেই সবাই রওনা হলেন। কৌতূহলে আর উত্তেজনায় সকলেরই হৃদস্পন্দন চলেছে দ্রুত, কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই। পেনক্র্যাফট দু-একবার বললে : একটা মশাল নিয়ে এলে ভালো হত।

সাইরাস হার্ডিং জবাব দিলেন : মশাল কোর‍্যালে গেলেই পাওয়া যাবে।

গ্র্যানাইট  হাউস থেকে কোর্যাল পাঁচ মাইল দূরে। রাত সাড়ে নটার সময় সবাই তিন মাইল পথ পেরুলেন। এমন সময় বিদ্যুতের নখে-নখে আকাশ ছিঁড়ে-খুঁড়ে একাকার হয়ে যেতে লাগল—শুরু হল ঘন-ঘন বজ্রপাত। সেদিকে গ্রাহ্য নেই কারু–একটা অদম্য আকর্ষণ সবাইকে কোর‍্যালে টেনে নিয়ে চলল।

রাত দশটার সময় বিদ্যুতের উজ্জ্বল ঝলকে কোর‍্যালের বেড়া দেখতে পাওয়া গেল। কোর‍্যালের দরজায় পৌঁছনোর সঙ্গে-সঙ্গে সাংঘাতিক ঝড়ে উন্মাদ হয়ে উঠল আকাশ। মুহূর্তমধ্যে কোর‍্যাল পেরিয়ে ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন সবাই। ভিতরে অন্ধকার জমাট বেঁধে। হার্ডিং দরজায় শব্দ করলেন, কোনো জবাব নেই। সবাই ঘরের ভিতর ঢুকলেন। নেব আলো জ্বাললে না, নেই, কেউ নেই, ঘরের মধ্যে কোথাও কোনো জনপ্রাণী নেই।

কিন্তু এর মানে? তবে কি সমস্তই স্বপ্ন? কিন্তু তাও বা কী করে হবে? টেলিগ্রাম স্পষ্ট বলেছে : এক্ষুনি কোর‍্যালে চলে এসো, এক্ষুনি! তবে কেউ নেই কেন এখানে?

এমন সময় হার্বার্ট দেখতে পেলে টেবিলের উপর একটা চিঠি পড়ে আছে। হার্ডিং চিঠিটা পড়লেন। তাতে শুধু লেখা : নতুন তারটি অনুসরণ করো।

চিঠি পড়েই সাইরাস হার্ডিং বললেন : চলো—এই তার ধরেই।

স্পষ্টই বোঝা গেল যে, খবর কোর্যাল থেকে পাঠানো হয়নি। পুরোনো তারে নতুন তার লাগিয়ে সেই অজ্ঞাত অধিকর্তার গোপন বাসস্থান থেকে সোজা গ্র্যানাইট  হাউসে খবর পাঠানো হয়েছে।

নেব লণ্ঠন হাতে নিয়ে এল—সবাই কোর্যাল পরিত্যাগ করলেন।

কোর‍্যাল থেকে বেরিয়ে সাইরাস হার্ডিং বিদ্যুতের আলোয় দেখতে পেলেন, টেলিগ্রাফের প্রথম খুঁটিটাতেও একটা নতুন তার ঝুলছে; তারটির এক মাথা উপরের তারের সঙ্গে লাগানো; তারপরই তারটা মাটিতে পড়ে সরাসরি বনের মধ্য দিয়ে যেন পশ্চিম দিকে চলে গেছে।

এই তার অনুসরণ করেই সবাই চললেন। তারটা কখনো গাছের নিচু ডালের উপর দিয়ে, আবার কখনো-বা মাটির উপর দিয়ে চলেছে। সাইরাস হার্ডিং ভেবেছিলেন তারটি হয়তো-বা উপত্যকার প্রান্তসীমায় গিয়ে শেষ হবে, আর সেখানেই সন্ধান পাওয়া যাবে সেই অজ্ঞাত অধিদেবতার গোপন বাসস্থানের। কিন্তু সেখানে এসে তার তবুও চলেছে দেখা গেল। তারা পাহাড়ের গায়ের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক ধরে চললেন। মাঝে-মাঝে এক-একজন ঝুঁকে পড়ে তারটা আছে কিনা দেখতে লাগলেন। বোঝা গেল, তার ক্রমে সমুদ্রের দিকে চলেছে। সমুদ্রের কিনারে পাহাড়ের অভ্যন্তরে বোধহয় গোপন বাসস্থানের খোঁজ পাওয়া যাবে।

রাত প্রায় এগারোটা তখন। হার্ডিং দলবল নিয়ে পাহাড়ের পশ্চিম দিকে একটা উঁচু টিবির উপর এসে পৌঁছলেন। সেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়। প্রায় পাঁচশো ফুট নিচে সমুদ্রের ঢেউ আলুথালু হয়ে গর্জনে-গর্জনে ফেটে পড়ছে।

এখানে এসে তারটি পাহাড়ের ভিতরে গিয়ে ঢুকেছে একটা প্রকাণ্ড ফাটলের ধার দিয়ে। জায়গাটা ভালো নয়, যে-কোন সময়ে বিপদ ঘটতে পারে। কিন্তু সকলে তখন অদম্য কৌতূহলে দ্রুত পায়ে চলেছেন। বিপদের কথা কারু মনেও হল না। একবারের জন্যেও না। এই সাংঘাতিক জায়গাটা সাবধানে পেরিয়ে শেষে তারা নিচের দিকে নামতে নামতে দেখতে পেলেন, তারটা তাদের সমুদ্রতীরে নিয়ে এসেছে। সাইরাস হার্ডিং তখন হাত দিয়ে তারটা ধরে দেখলেন। তারটা সমুদ্রের জলের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

দারুণ নিরাশায় সবাই হতভম্ব হয়ে পড়লেন। তবে কি গোপন আস্তানা সন্ধান করবার জন্যে জলে ড়ুবতে হবে? সাইরাস হার্ডিং সবাইকে শান্ত করবার চেষ্টা করলেন।

পাহাড়ের গায়ে একটা গহ্বরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বললেন : আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এখন ভরা জোয়ার-ভাটার সময় নিশ্চয়ই পথটা ভেসে উঠবে।

পেনক্র্যাফ্ট শুধোলে : পথ যে একটা আছে, এ আপনি কী করে আন্দাজ করলেন?

ওঁর কাছে যাবার পথ না-থাকলে, দৃঢ় কণ্ঠে হার্ডিং জবাব দিলেন : উনি কক্ষনো আমাদের ডেকে পাঠাতেন না।

এমন দৃঢ়তার সঙ্গে সাইরাস হার্ডিং এ-কথা বললেন যে সকলেরই বিশ্বাস হল যে পথ জোয়ারের জলে ড়ুবে গেছে; ভাঁটার সময় সেটা যে ভাসতে পারে, আর তখন সেপথে যাওয়া সম্ভবপর-এ তো আর কোনো অসম্ভব আজব ব্যাপার নয়!

সবাই সেই গহূরের ভিতর অপেক্ষা করতে লাগলেন। তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। পাহাড়ে-পাহাড়ে তুফানি হাওয়া আর বজ্রপাতের শব্দ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে সৃষ্টি করছে। এক তুলকালাম কাণ্ড।

রাত তখন দুপুর, সাইরাস হার্ডিং লণ্ঠন হাতে সমদ্রতীরে নামলেন। হার্ডিং-এর আন ঠিক। স্পষ্টই দেখা গেল, জলের নিচে একটা বিশাল গহ্বরের চিহ্ন বেশ ফুটে উঠেছে।

তারটিও ঠিক সেখানে খাড়া হয়ে গহ্বরের মধ্যে প্রবেশ করেছে।

হার্ডিং ফিরে এলেন আর-সকলের কাছে। বললেন, আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এই পথটার ভিতর যাওয়া যাবে।

পেনক্র্যাফট শুধোলো : পথটা আছে তাহলে?

হার্ডিং বললেন : তোমার কি তাতে সন্দেহ ছিল নাকি?

হার্বার্ট বললে : শুকনোও তো থাকতে পারে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা হেঁটেই যেতে পারবো। আর যদি জল থাকেই তবে আমাদের যাবার জন্যে একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করা আছে।

একটা ঘণ্টা কেটে গেল। সকলে এই জল-ঝড় মাথায় নিয়েই সমুদ্রতীরে নেমে গেলেন। তখন প্রায় আট ফুট উঁচু পথ বেরিয়েছে। পথের মুখ সেতুর খিলানের মতো। তার তলা দিয়ে গর্জন করতে করতে ছুটেছে সমুদ্র-তরঙ্গ। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে হার্ডিং দেখতে পেলেন, একটা কালো-মতে কী যেন ভাসছে। সেটাকে টেনে কাছে এনে দেখা গেল সেটা একটা ডিঙি নৌকো, গহ্বরের ভিতরে পাথরের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। নৌকোটা লোহার পাত দিয়ে মোড়া। নৌকোর পাটাতনে দুটো দাঁড় পড়ে আছে।

তক্ষুনি নৌকোয় উঠে বসলেন সকলে। নে আর আয়ারটন দাঁড় ধরলে। পেনক্র্যাফট বসলে হাল ধরে। সাইরাস হার্ডিং লণ্ঠন হাতে নৌকোর মুখে দাঁড়ালেন, অন্ধকারে পথ দেখাবার জন্যে।

গহ্বরের ভিতরে ঢোকবার পরেই ধনুক-বাঁক ছাদটা খুব উঁচু হয়ে পড়ল।

গভীর অন্ধকার। লণ্ঠনের ম্লান আলোয় গহ্বরের বিশালতা, উচ্চতা-কোনো কিছুই বোঝা গেল না।

চারদিক নীরব নিস্তব্ধ। বাইরের বজ্রপাতের প্রচণ্ড আওয়াজ পর্যন্ত সেখানে ঢুকতে পারে না।

গহ্বরটা কতদূর পর্যন্ত গেছে? দ্বীপের মধ্যভাগ পর্যন্ত? কে জানে!

মিনিট পনেরো চলার পর হার্ডিং বললেন : নৌকোটাকে আরো ডানদিকে নিয়ে যাও। তার মংলব, তারটা দেয়ালের গায়ে লাগানো আছে কি না দেখা। দেখা গেল, তার। ঠিকই চলেছে। আরো মিনিট পনেরো কাটল। ততক্ষণে তারা আধ মাইলটাক এসেছেন। সাইরাস হার্ডিং হঠাৎ বললেন, থামো।

নৌকো থামলো। সকলে দেখতে পেলেন, সামনের একটা তীব্র উজ্জ্বল আলোয় সেই বিশাল গহরটি আলোকিত হয়ে আছে। প্রায় একশো ফুট উঁচু বাঁকানো ছাদটা কালো-কালো। থামের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। এমন গভীর, এত-বড়ো একটা গহ্বর যে দ্বীপের নিচে আছে, তা তাঁরা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি! তীব্র উজ্জ্বল আলোয় গহূরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত চোখের সামনে ফুটে উঠল। আলোটা এত উজ্জ্বল আর এত ধবধবে শাদা যে মনে হল, আলোটা নিশ্চয়ই বৈদ্যুতিক শক্তি দিয়ে জ্বালানো হয়েছে।

নৌকোটা আলোর কাছে নিয়ে যাওয়া হল। এখানে জল প্রায় সাড়ে তিনশো ফুট গভীর। আলোর পরেই বিশাল পাথরের দেয়াল। সেদিকে আর এগুবার পথ নেই। এখানে গহ্বরটা খুব চওড়া। দ্বীপের নিচে যেন বড়ো-একটা হদ সৃষ্টি হয়েছে।

এই হ্রদের মাঝখানে ঠিক চুরুটের মতো দেখতে একটা বিরাট বিশাল জিনিশ ভাসছে। জিনিশটা স্থির, নিস্তব্ধ। এর গায়ে যেন জ্বলন্ত দুটো চোখ, তার মধ্যে দিয়েই সেই উজ্জ্বল আলো বেরুচ্ছে।জিনিশটাকে দেখে মনে হয় যেন প্রকাণ্ড একটা তিমি। প্রায় আড়াইশো ফুট লম্বা, আর জলের উপর দশ-বারো ফুট উঁচু।

নৌকো আস্তে-আস্তে আরো কাছে গেল। সাইরাস হার্ডিং উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠলেন। তারপর হঠাৎ স্পিলেটের হাত চেপে সজোরে ঝাঁকুনি দিলেন : এ তিনি। তিনি ছাড়া আরকেউ হতে পারে না! হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তিনি। এরপর বসে পড়ে গিডিয়ন স্পিলেটের কানে ফিশফিশ করে একটা নাম বললেন।

গিডিয়ন স্পিলেটও সেই নাম জানতেন। শুনেই তীব্র উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠলেন স্পিলেট : অ্যাঁ! এ আপনি কী বলছেন, ক্যাপ্টেন হার্ডিং! তিনি। তিনি তো সাংঘাতিক অপরাধী!

 হার্ডিং ঘাড় নাড়লেন : হ্যাঁ, তিনিই।

সাইরাস হার্ডিং-এর কথামতো নৌকোটাকে এই ভাসমান জিনিশটার গায়ে লাগানো হল। জিনিশটার বাঁ পাশ থেকে পুরু কাঁচের মধ্য দিয়ে তীব্র ঝলসানো আলোর রেখা বেরুচ্ছিল। হার্ডিং দলবল নিয়ে এর উপরে উঠলেন। উঠে দেখলেন, ভিতরে যাওয়ার একটা দরজা রয়েছে। সেই দরজা দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। সিঁড়ির নিচে জাহাজের ডেকের মতো ডেক–তীব্র আলোয় উজ্জ্বল। এই ডেকের শেষে একটা দরজা। হার্ডিং দরজাটা খুললেন। খুব সাজানো-গোছানো একটা ঘর পেরিয়ে লাইব্রেরি ঘর। এই ঘরের ছাদ থেকে উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে ঘরটা আলোকিত করেছে। লাইব্রেরি-ঘরের শেষে একটা বন্ধ দরজা। হার্ডিং সেই দরজাটাও খুললেন।

বড়ো জাহাজের সেলুনের মতো প্রকাণ্ড একটা ঘর; যেন একটা মিউজিয়াম। নানান রকমের অজস্র মূল্যবান জিনিশপত্র আর আশবাবে ঘরটা এমনভাবে সাজানো-গোছানো যে, তাদের মনে হল, যেন হঠাৎ কোনো জাদুঘরে এসে পড়েছেন।

ঘরে ঢুকে সবাই দেখলেন, একটা দামি সোফার উপর আধ-শোয়া অবস্থায় একজন লোক। চোখদুটো আলতোভাবে বোজা। ভদ্রলোক তাদের প্রবেশ যেন লক্ষ্যই করেননি।

হার্ডিং ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেলেন : ক্যাপ্টেন নেমো! আপনি আমাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন, আমরা এসেছি।

সবাই এই কথা শুনে স্তম্ভিত বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়লেন।

.

৩.৬ সমস্যার সমাধান

সাইরাস হার্ডিং-এর কথা শুনে ভদ্রলোক সোজা হয়ে বসলেন। বৈদ্যুতিক আলো এসে পড়ল তার চোখে মুখে। উদাস ও উজ্জ্বল অবয়ব, কপালটা উঁচু, চোখে প্রতিভার দ্যুতি, ধবধবে শাদা দাড়ি, মাথার চুল এসে পড়েছে কাঁধে।

শক্ত, সম্রান্ত, গম্ভীর চেহারা। কিন্তু দেখেই বোঝা গেল, শরীর বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু কণ্ঠস্বর তখনো বেশ জোরালো।

সাইরাস হার্ডিং-এর কথার জবাবে বললেন : আমার তো কোনো নাম নেই!

সাইরাস হার্ডিং বললেন : আপনার কোনো নাম থাক বা না-থাক, আপনার কথা আমি জানি।

ক্যাপ্টেন নেমো তীক্ষ্ণ চোখে হার্ডিং-এর দিকে তাকালেন। চোখের তারাদুটো একবার জ্বলে উঠল। পরমুহূর্তে সোফার কুশনের উপর হেলান দিয়ে বললেন : যাক, তাতে এখন আর কোনো ক্ষতি নেই–আমি তো মরতেই চলেছি।

সাইরাস হার্ডিং ক্যাপ্টেন নেমোর কাছে গেলেন। গিডিয়ন স্পিলেট তার হাতখানি নিজের হাতে নিয়ে দেখলেন, জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন নেমো হাত টেনে নিয়ে সাইরাস হার্ডিং আর স্পিলেটকে বসতে ইঙ্গিত করলেন।

উত্তেজনায় আর কৌতূহলে সবাই তখন অস্থির।

ক্যাপ্টেন নেমে সোফায় বসে হাতের উপর ভর দিয়ে হার্ডিংকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখতে লাগলেন। একটু বাদে শুধোলেন : আমার আগেকার নাম আপনি জানেন?

হার্ডিং ঘাড় নাড়লেন : হ্যাঁ, জানি। আর আপনার নটিলাসের কথাও জানি।

ক্যাপ্টেন নেমো যেন অবাক হলেন একটু : কী করে জানলেন? আমাদের তো অনেক বছর ধরে পৃথিবীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই! তিন বছর ধরে আমি একলা সমুদ্রের নিচে বাস করছি। তবে কে আমার এই অজ্ঞাতবাসের কথা প্রকাশ করলে?

এমন-একজন লোক প্রকাশ করেছেন, আপনার সঙ্গে যাঁর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই

হার্ডিং উত্তর করলেন : সুতরাং তাকে বেইমান বলা চলে না।

হুঁ, বুঝতে পেরেছি। ক্যাপ্টেন নেমো বললেন : ষোলো বছর আগে যে ফরাশি অধ্যাপকটি হঠাৎ আমার জাহাজে এসে পড়েছিল, সে-ই তবে আমার কথা বলে বেড়িয়েছে সবার কাছে!

হার্ডিং ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন।

ক্যাপ্টেন নেমো বললেন : তাহলে সেই ফরাশি অধ্যাপক আর তার সঙ্গী দুজন নরোয়ের সেই ঘূর্ণিপাকে ড়ুবে মরেনি? নটিলাস তখন ঐ ঘূর্ণিপাক থেকে উদ্ধার পাবার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল বলে ওদের দিকে নজর রাখতে পারেনি।

তারা মরেনি। তারপরই টোয়েন্টি থাউজ্যা লীগস আণ্ডার দি সী (সমুদ্রতলে ষাট হাজার মাইল) নামে একটা বই ছাপা হয়েছে। সেই বইতে আপনার ইতিহাস লেখা আছে।

আমার ইতিহাস? ও হা-কয়েক মাসের ইতিহাস মাত্র।

হার্ডিং কাঁধ ঝাঁকালেন : সে-কথা ঠিক। কিন্তু সেই কয়েক মাসের আশ্চর্য ইতিহাসই আপনাকে পরিচিত করাবার পক্ষে যথেষ্ট।

অবজ্ঞার হাসি হাসলেন ক্যাপ্টেন নেমো : অপরাধী হিশেবে, মানুষের শত্রু হিশেবে পরিচিত করতে তা-ই যথেষ্ট, না?

হার্ডিং আহত হলেন একটু : ক্যাপ্টেন নেমো! আপনার অতীত জীবনের কাজকর্মের বিচার করবার অধিকার আমার নেই—সে-চেষ্টাও আমি করিনি। কেন যে আপনি অমন অদ্ভুত জীবন যাপন করতেন, তার কারণ আমি জানি না। আমি শুধু এইটুকু জানি যে, লিঙ্কন দ্বীপে পৌঁছুনোর পর থেকে একজন উপকারী বন্ধু সবসময় আমাদের সাংঘাতিক-সাংঘাতিক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে আসছেন। আমরা যে বেঁচে আছি, সে শুধু সেই শক্তিশালী দয়ালু মহাত্মার কল্যাণে। সেই অজ্ঞাত বন্ধু আপনি স্বয়ং।

এই কথার জবাবে ক্যাপ্টেন নেমে শুধু একটু মৃদু হাসলেন।

হার্ডিং আর স্পিলেট উঠে দাঁড়ালেন। সকলেরই মন কৃতজ্ঞতায় ভরা। সেকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবার জন্যে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ক্যাপ্টেন নেমে তা বুঝতে পারলেন। ইশারায় সবাইকে শান্ত করে বললেন, দাঁড়ান, আগে আমার সমস্ত ইতিহাস শুনে নিন।

ক্যাপ্টেন নেমো সংক্ষেপে তাঁর কাহিনী শেষ করলেন। শেষ পর্যন্ত বলতে গিয়ে তাঁর দেহ মনের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছিল। অনেকবার হার্ডিং তাকে বিশ্রাম করবার জন্যে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কিন্তু সে-কথায় কান না-দিয়ে তিনি সব খুলে বললেন। ক্যাপ্টেন নেমোর কাহিনীর সারমর্ম এ-রকম দাঁড়ায় :

ক্যাপ্টেন নেমো একজন ভারতীয়। তখনকার স্বাধীন রাজ্য বুন্দেলখণ্ডের রাজার ছেলে, নাম ছিল যুবরাজ ডাক্কার। তার যখন দশ বছর বয়স, তার বাবা তাকে ইওরোপে লেখাপড়া শিখতে পাঠিয়েছিলেন। সব বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করে দেশে ফিরে এসে অধঃপতিত বুন্দেলখণ্ডকে ইওরোপের মতো করে তুলতে হবে, এই ছিল উদ্দেশ্য। আশ্চর্য বুদ্ধি ছিল বলে ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যেই কলা, বিজ্ঞান ও শিল্পবিদ্যায় অদ্ভুত নৈপূণ্য লাভ করলেন ডাক্কার। সারা ইওরোপে তিনি চষে বেড়ালেন। রাজার ছেলে, তাই টাকা-কড়ির অভাব নেই। সবখানেই সমাদর পেলেন। জ্ঞানপিপাসু ডাক্কারের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, ভবিষ্যতে যাতে একটা স্বাধীন, সুসভ্য দেশের রাষ্ট্রনায়ক হিশেবে বিখ্যাত হতে পারেন।

আঠারোশো উনপঞ্চাশ খ্রিষ্টাব্দে ডাক্কার বুন্দেলখণ্ডে ফিরে এলেন। অভিজাত বংশের একটি মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হলদুটি ছেলেও হল তার। কিন্তু পারিবারিক সুখ-সৌভাগ্য তাকে তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারল না। ডাক্কার তার উদ্দেশ্য-সিদ্ধির সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।

এমন সময়, আঠারোশো সাতান্ন খ্রিষ্টাব্দে শুরু হল সিপাহী বিদ্রোহ। অন্য সকলের মতো ডাক্কারও বিদ্রোহে যোগ দিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সবার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি লড়াই করতেন। কুড়িটি লড়াইয়ে দশবার তিনি আহত হয়েছিলেন। একসময়ে বিদ্রোহের অবসান হল। এই বিদ্রোহে অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়ে ডাক্কার খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বিদ্রোহের অবসান হলে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করলেন, যুবরাজ ডাক্কারকে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে অঢেল পুরস্কার দেয়া হবে। বিস্তর ইনাম, আর সেইসঙ্গে ভূষণ ও খেতাব।

বুন্দেলখণ্ড ইংরেজদের দখলে এল। ডাক্কার বুন্দেলখণ্ডের পাহাড়ে পাহাড়ে লুকিয়ে। বেড়াতে লাগলেন। জীবনের চরম আকাঙ্ক্ষা নিমূল হয়ে গেল। ডাক্তার গোড়ায় দমে গিয়েছিলেন। সভ্য জগতের প্রতি, সারা মানব-জাতির প্রতি তার একটুও শ্রদ্ধা রইল না। ধন-দৌলত যা-কিছু ছিল সব সংগ্রহ করে কুড়িজন বিশ্বাসী অনুচরসমেত যুবরাজ ডাক্কার একদিন অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তার গতিবিধির চিহ্ন কিছুই প্রকাশ পেলো না।

ডাক্কার তবে কোথায় গেলেন তখন? স্বাধীন দেশের স্বপ্ন যখন চূর্ণ-চূর্ণ হয়ে গেল, তখন কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিলেন ডাকার?-সমুদ্রের অতলে; যেখানে পৃথিবীর কেউ তার অনুসরণ করতে পারবে না।

বীর নির্ভীক যোদ্ধা এবার বৈজ্ঞানিক হয়ে দাঁড়ালেন। প্রশান্ত মহাসাগরে একটি নির্জন নিরালা দ্বীপে ডক তৈরি করে নিজের পছন্দসই ড়ুবোজাহাজ তৈরি করলেন। নিজের আবিষ্কৃত উপায়ে বৈদ্যুতিক শক্তিকে এমনভাবে কাজে লাগালেন যে, জাহাজ চালানো, জাহাজের আলোর কাজ, জাহাজের শীততাপ-নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি সবকিছুই ঐ বৈদ্যুতিক শক্তিতেই সম্পন্ন হত। এই শক্তির শেষ নেই … সমুদ্রের স্রোত থেকে ইচ্ছেমতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। রত্নগর্ভ সমুদ্র। এ ছাড়া, মানুষ কত সময় কত মূল্যবান জিনিশপত্র, ধনদৌলত এই সমুদ্রগর্ভে হারিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। সমুদ্রের অতলে মাছ, শাকসজিও প্রচুর। সুতরাং ডাক্কারের আর-কোনো অভাবই রইল না। এত দিনে তার স্বপ্ন সার্থক হবে। ড়ুবোজাহাজে করে সমুদ্রের অতলে স্বাধীনভাবে যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। জাহাজের নাম দেয়া হল নটিলাস। নিজে নাম নিলেন ক্যাপ্টেন নেমো অর্থাৎ কেউ না।

অনেক বছর ধরে ডাক্কার সমুদ্রের অতলে এক মেরু থেকে অন্য মেরু পর্যন্ত ঘুরে বেড়ালেন। নির্জন সমুদ্রগর্ভ থেকে তিনি কত-যে ধনদৌলত সংগ্রহ করলেন তার সীমা নেই। সতেরোশো দুই সালে কোটি-কোটি স্বর্ণমুদ্রা-সমেত স্পেনের একটা জাহাজ ভিগো উপসাগরে ড়ুবেছিল। ক্যাপ্টেন নেমে সেই সম্পদ সমুদ্রগর্ভ থেকে সংগ্রহ করলেন। যারা নিজেদের দেশ স্বাধীন করবার জন্যে লড়াই করতো, নিজের নাম গোপন রেখে এই ধনদৌলত দিয়ে ক্যাপ্টেন নেমো তাদের সাহায্য করতেন।

এইভাবেই অনেকদিন পৃথিবীর লোকের সঙ্গে কোনো সংস্রব না-রেখে সমুদ্রগর্ভে বাস করলেন তিনি। শেষে আঠারোশো ছেষট্টি খ্রিষ্টাব্দের ছয়ই নভেম্বর রাত্রে দৈবাৎ তিনজন লোক তার জাহাজে এসে পড়ে। সেই লোক তিনজন হল—একজন ফরাশি অধ্যাপক, তার পরিচারক, আর ক্যানাড়ার এক তিমি-শিকারী।অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন নামে একটা আমেরিকার জাহাজ নটিলাসকে তাড়া করেছিল, নটিলাসের সঙ্গে সেই জাহাজের ধাক্কা লাগে। তখন এরা তিনজন নটিলাসের উপর পড়ে গিয়েছিল।

সেই ফরাশি অধ্যাপকের কাছে ক্যাপ্টেন নেমো শুনেছিলেন যে নটিলাসকে পৃথিবীর লোকে তিমি-জাতীয় কোনো বিশাল জানোয়ার কিংবা বোম্বেটে ড়ুবোজাহাজ বলে মনে করে–আর এই নটিলাসকে অন্য-সব জাহাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ক্যাপ্টেন নেমে এদের তিনজনকে কয়েদির মতো নটিলাসে আটক রাখলেন। সাত মাস পর্যন্ত তারা সমুদ্রের অতলের আশ্চর্য-আশ্চর্য ব্যাপার দেখতে পেয়েছিল।

আঠারোশো সাতষট্টি সালের বাইশে জুন লোক তিনজন নটিলাসের একটা নৌকোয় চড়ে পালিয়ে যায়। সেই সময়ে নটিলাস নরোয়ে উপকূলের সমুদ্রতলের নিদারুণ ঘূর্ণিপাকের পাল্লায় গিয়ে পড়েছিল। নরোয়ের মেলস্টর্ম তার প্রলয়ক্ষমতার জন্যে কুখ্যাত। ক্যাপ্টেন নেমো তাই ভেবেছিলেন যে এরা সমুদ্রে ড়ুবে মরেছে। এদিকে তারা যে সৌভাগ্যবশত রেহাই পেয়েছিল, সে-কথা ক্যাপ্টেন নেমে জানতে পারেননি। এই ফরাশি অধ্যাপকই দেশে ফিরে ক্যাপ্টেন নেমোর সাত মাসের ঘটনাবলি টোয়েন্টি থাউজ্যাণ্ড লীগ আণ্ডার দি সী বইতে লিখে বের করেছিলেন।

এই ঘটনার পর অনেকদিন পর্যন্ত ক্যাপ্টেন নেমো সমুদ্রতলে ঘুরে বেড়ালেন। কিন্তু তার সঙ্গীরা ক্রমশ একে-একে মারা যেতে লাগলেন। শেষে এই সমুদ্রতলের অধিবাসীদের মধ্যে একমাত্র বেঁচে রইলেন ক্যাপ্টেন নেমো। তার বয়স তখন ষাট। একলা হলেও নটিলাস নিয়ে তিনি লিঙ্কন দ্বীপের নিচে জলগর্ভে যে একটি বিশাল গহ্বরের মধ্যে তার একটা আশ্রয় ছিল, সেখানে হাজির হলেন। এই ধরনের বন্দর আরো ছিল, দরকার হলে তিনি সে-রকম বন্দরে গিয়ে বিশ্রাম করতেন। লিঙ্কন দ্বীপের বন্দরে ছ-বছর ধরে আছেন ক্যাপ্টেন নেমো। এখন আর সমুদ্রের নিচে ঘুরে বেড়ান না। সঙ্গীদের সঙ্গে মেলবার জন্যে মৃত্যুর অপেক্ষা করছেন।

এমন সময় একদিন ক্যাপ্টেন নেমো দেখতে পেলেন, একটা বেলুন জনকয়েক লোক নিয়ে লিঙ্কন দ্বীপে এসে শূন্য থেকে পাক খেতে-খেতে পড়ছে। তিনি তখন ড়ুবুরির পোশাক পরে সমুদ্রতীর থেকে খানিক দূরে জলের নিচে বেড়াচ্ছিলেন। সেই সময় সাইরাস হার্ডিং বেলুন থেকে জলে পড়ে গেলেন। হার্ডিং-এর অবস্থা দেখে তার মমতা হল। হার্ডিংকে জল থেকে উদ্ধার করলেন নেমো।

এরপর থেকে তাঁর একমাত্র চিন্তা হল, এই পরিত্যক্ত পাঁচজনের কাছ থেকে দূরে পালানো। কিন্তু তাঁর আশ্রয় থেকে বেরুবার পথ বন্ধ হয়ে পড়েছিল। আগ্নেয়গিরির আভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার অত্যাচারে গহূরের মুখের উপর পাথর নেমে পড়েছিল। ছোটোখাটো জাহাজের পক্ষে গহ্বরের মুখ যথেষ্ট ছিল বটে, কিন্তু নটিলাসের পক্ষে সে-পথ কিছুই না। সুতরাং সেখানেই আটকে থাকতে হল তাকে।

ক্যাপ্টেন নেমো তখন গোপনে এঁদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলেন। দেখলেন, এরা সৎ, সহিষ্ণ, পরিশ্রমী, কার্যক্ষম-আর সকলের মধ্যে আশ্চর্য একতা রয়েছে। নেমে ড়ুবুরির পোশাক পরে গ্র্যানাইট  হাউসের কুয়োর কাছে যেতেন পাহাড়ের গা বেয়ে খানিকটা উঠে; দ্বীপবাসীদের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে যে আলোচনা হত তা শুনতে। এমনিভাবে একদিন শুনতে পেলেন, দাস-ব্যাবসা বন্ধ করবার জন্যে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বেধেছে। সাইরাস হার্ডিংরা সবাই দাসত্বপ্রথা নিবারণের পক্ষের লোক। কাজে-কাজেই ক্যাপ্টেন নেমোর সহানুভূতি পাওয়ার সম্পূর্ণ উপযুক্ত। আগেই বলেছি, নেমো সাইরাস হার্ডিংকে জল থেকে বাঁচিয়েছিলেন। উনিই কুকুর টপকে নিয়ে গিয়েছিলেন চিমনিতে; ঝিলের জল থেকে টপকে তিনিই উদ্ধার করেছিলেন; সমুদ্রতীরে দ্বীপবাসীদের অত্যাবশ্যকীয় জিনিশপত্রে ভরা সিন্দুকটিও রেখেছিলেন উনি; ক্যানটাকে আবার মার্জিনদীর জলে এনে দিয়েছিলেন উনিই; বানরের দল গ্র্যানাইট  হাউস আক্রমণ করবার সময় উপর থেকে দড়িটা নিচে ফেলে দিয়েছিলেন উনিই; আয়ারটনের খবর লিখে উনিই সমুদ্রের জলে বোতল ভাসিয়ে দিয়েছিলেন; প্রসপেক্ট হাইটের উপরে যে-আগুন দেখে পেনক্র্যাফট পথ চিনেছিল, সে-আন উনিই জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন; উনিই প্রণালীর জলে টর্পেডো দেগে দস্যুদলের জাহাজ উড়িয়ে দিয়েছিলেন। হার্বার্টকে সাক্ষাৎ-মৃত্যুর কবল থেকে কুইনাইন এনে দিয়ে রক্ষা করেছিলেন উনিই; উনিই ইলেকট্রিক গুলি মেরে দস্যু পাঁচজনকে হত্যা করেছিলেন : এই ইলেকট্রিক গুলির রহস্য শুধু ওঁরই জানা ছিল, এই গুলি দিয়ে সামুদ্রিক জীবজন্তু শিকার করতেন উনি।

লিঙ্কন দ্বীপে যতগুলো রহস্যময়, অত্যাশ্চর্য, বিস্ময়কর, অতিমানবিক ঘটনা ঘটেছিল, এতদিনে মীমাংসা হল সেগুলোর : সবগুলো ঘটনাতেই ক্যাপ্টেন নেমোর মহত্ত্ব আর অসাধারণ ক্ষমতার পরিচয়চিহ্ন অঙ্কিত।

তবু ক্যাপ্টেন নেমোর মনে দ্বীপবাসীদের আরো উপকার করবার ইচ্ছে হয়েছে, তাদের আরো অনেক বিষয়ে উপদেশ দিতে হবে; তাই গ্র্যানাইট  হাউসের লোকদের বৈদ্যুতিক তারের সাহায্যে ডেকে পাঠিয়েছেন এখানে।

ক্যাপ্টেন নেমো তার জীবন-কাহিনী শেষ করলে সাইরাস হার্ডিং সকলের তরফ থেকে তাকে কৃতজ্ঞতা জানালেন।

ক্যাপ্টেন নেমো সাইরাস হার্ডিং-এর কথায় কান দিলেন না, শুধু বললেন : আমার কাহিনী তো শুনলেন, এখন আমার কার্যকলাপ সম্পর্কে আপনাদের মত কী?

একটা বিশেষ ঘটনা সম্পর্কেই ক্যাপ্টেন নেমো সকলের মত জানতে চেয়েছিলেন। সেই ফরাশি অধ্যাপক পালিয়ে গিয়ে ক্যাপ্টেন নেমোর কাহিনী লিখে যে-বই প্রকাশ করেছিল, সেই বইতে ওই বিশেষ ঘটনাটির উল্লেখ ছিল, আর তা পড়ে সারা ইওরোপে তখন শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। ফরাশি অধ্যাপক ও তাঁর সঙ্গী দুজন পালিয়ে যাবার কিছুদিন আগে অতলান্তিক মহাসাগরের উত্তরভাগে নটিলাসকে একটা জাহাজ তাড়া করেছিল–বাধ্য হয়ে নটিলাস সেই জাহাজটা ডুবিয়ে দিয়েছিল। সাইরাস হার্ডিং-এর বুঝতে বাকি রইল না যে ক্যাপ্টেন নেমো এই বিশেষ ঘটনাটি সম্পর্কেই তাঁদের মত জানতে চেয়েছেন। হার্ডিং চুপ করে রইলেন, কোনো জবাব দিলেন না।

তখন ক্যাপ্টেন নেমো আবার বললেন : একটা কথা মনে রাখবেন, সেটা ছিল শত্রুজাহাজ। আর ওটাই আগে আমাকে তাড়া করেছিল। তখন আমি ছিলাম একটা সংকীর্ণ উপসাগরের মধ্যে যেখানে জল কম, জাহাজটা আমার পথ আটকে ফেলেছিল। আমি সেটাকে ডুবিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখন বলুন, কাজটা কি আমার অন্যায় হয়েছিল, না আমি ঠিকই করেছিলুম?

সাইরাস হার্ডিং বললেন : দেখুন, আপনার কাজের বিচার করবার অধিকার আমার নেই। মানুষ ঈশ্বরের কাছ থেকে কাজের প্রেরণা পায়, তার ফলাফলের বিচারকও ঈশ্বরই। ক্যাপ্টেন নেমো! আমাদের শুধু এইটুকুই বলার আছে যে, আপনার মতো এমন মহৎ ও উপকারী বন্ধু হারিয়ে আমাদের মনে দারুণ দুঃখ হবে।

হার্বার্ট ক্যাপ্টেন নেমোর কাছে গিয়ে নতজানু হয়ে তার হস্তচুম্বন করল। হার্বার্টের মাথায় হাত রেখে অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে নেমো বললেন : ভগবান তোমার মঙ্গল করুন।

তখন সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু সূর্যালোকের একটি কণাও প্রবেশ করল না গহ্বরে। তখন ভরা জোয়ার। গহ্বরের মুখও বন্ধ হয়ে গেছে। নটিলাসের বিদ্যুতালোকেই চারদিক আলোয় আলোময়।

ক্যাপ্টেন নেমো উত্তেজনায় ক্লান্ত হয়ে সোফার উপর এলিয়ে পড়লেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত প্রায় অজ্ঞানের মতো পড়ে রইলেন তিনি। সাইরাস হার্ডিং আর গিডিয়ন স্পিলেট মনোযোগ  দিয়ে ওঁর অবস্থা দেখতে লাগলেন। এ-কথা বুঝতে বাকি রইল না যে, তার শক্তি-সামর্থ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। তাকে বাঁচানোর আর-কোনো উপায় নেই।

পেনক্র্যাফট বললে বাইরে নিয়ে গেলে হয় না? খোলা হাওয়ায় আর রোদে হয়তো সুস্থ হতে পারেন।

কোনো লাভ নেই। ঘাড় নাড়লেন সাইরাস হার্ডিং : তাছাড়া নটিলাস ছেড়ে যেতে কিছুতেই রাজি হবেন না উনি। প্রায় বারো বছর ধরে উনি একাই নটিলাসে আছেন। ওঁর ইচ্ছে, এই নটিলাসেই যেন ওঁর মৃত্যু হয়।

সাইরাস হার্ডিং-এর কথা বোধহয় শুনতে পেলেন ক্যাপ্টেন নেমো। মাথা তুলে দুর্বল অথচ স্পষ্ট গলায় বললেন : ঠিক, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। নটিলাসেই আমার মৃত্যু হোক এই আমার ইচ্ছে। এখন আমার একটা অনুরোধ আছে। আপনারা কথা দিন যে আমার অন্তিম কামনাটি আপনারা পূর্ণ করবেন, তাহলেই আপনাদের কৃতজ্ঞতার ঋণ পরিশোধ করা হবে।

সবাই শপথ করলেন যে তারা ক্যাপ্টেন নেমোর অন্তিম কামনা পূর্ণ করবেন।

তখন ক্যাপ্টেন নেমো বললেন : কাল আমার মৃত্যু হবে, আর এই নটিলাসেই হবে আমার সমাধি। আমার বন্ধুবান্ধব সবাই সমুদ্রের অতলে আশ্রয় নিয়েছেন, এই সমুদ্রগর্ভেই আমারও আশ্রয় হোক। আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন। গহ্বরের মুখটা ছোটো হয়ে গেছে, তাই নটিলাস আটকা পড়ে গেছে। তবে, বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব না-হলেও জল খুব গভীর এখানে, নটিলাস সহজেই ডুবতে পারবে এবং আমার সমাধি হবে। কাল আমার মৃত্যুর পরে আপনারা নটিলাস থেকে চলে যাবেন। এইসব মূল্যবান জিনিশপত্র, আশবাবপত্র ইত্যাদি সমেত নটিলাসও আমার সঙ্গে বিনষ্ট হবে। শুধু একটি উপহার যুবরাজ ডাক্কারের স্মৃতিচিহ্ন হিশেবে আপনাদের কাছে থাকবে। এই যে বাক্সটা দেখছেন, এর মধ্যে অনেক লক্ষ টাকা দামের অনেকগুলো হিরে-জহরৎ আছে। যাবার সময় এই বাক্সটা আপনারা নিয়ে যাবেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনাদের মতো সৎ ব্যক্তি এই টাকা ভালোকাজেই খরচ করবেন। আমার মৃত্যুর পরেও আপনাদের প্রত্যেক কাজে আমি পূর্ণ সহানুভূতির সঙ্গে যোগ দেবো। কাল আপনারা এই বাক্সটা নিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে চলে যাবেন। তারপর নটিলাসের ডেকের উপর উঠে নিচে দরজাটা একেবারে বন্ধ করে দেবেন।

সাইরাস হার্ডিং বললেন : আপনার সমস্ত আদেশই আমরা পালন করবো।

হ্যাঁ ভালো কথা। ক্যাপ্টেন নেমো বললেন : তারপর আপনারা যে-নৌকোটা চ’ড়ে এসেছিলেন, সেই নৌকোয় চড়ে চলে যাবেন। যাবার আগে আরেকটা কাজ করবেন। নটিলাসের মুখের কাছে গেলে দেখতে পাবেন, ঠিক জলের সমতলে এক লাইনে দু-পাশে দুটো ফুটো আছে; সেই ফুটোর মুখ বন্ধ, সেই মুখ খুলে দেবেন। তাহ’লে জল আস্তে আস্তে নটিলাসের নিচের চৌবাচ্চায় ঢুকবে, আর নটিলাস আস্তে-আস্তে একেবারে ডুবে যাবে। আপনাদের ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। ততক্ষণে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। সুতরাং আপনারা মৃত ব্যক্তিকেই সমাধিস্থ করবেন। আমার আর কিছু বলবার নেই। আশা করি আমার ইচ্ছেগুলো সব আপনারা পূরণ করবেন।

সাইরাস হার্ডিং বললেন : আমরা কথা দিচ্ছি, আপনার সকল আদেশই পালিত হবে।

ক্যাপ্টেন নেমো সকলকে ধন্যবাদ জানালেন। তাৰপর বললেন : এখন ঘণ্টাকয়েকের জন্যে আপনারা এ-ঘর থেকে একটু চলে যান।

.

এরপর সবাই খাবার ঘর ও লাইব্রেরি-ঘর থেকে বেরিয়ে এঞ্জিন-ঘরে এসে পৌঁছুলেন। এই ঘরটা ছিল নটিলাসের সানের দিকে—এই ঘরেই সব যন্ত্রপাতি ছিল। নটিলাসের বিরাট এঞ্জিন-ঘর দেখে সবাই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন।

দ্বীপবাসীরা নটিলাসের উপরের প্ল্যাটফর্মটাকে উঠলেন। প্ল্যাটফর্মটা জল থেকে সাত ফুট উঁচুতে। সেখানে দেখলেন, খুব পুরু কাচের লেন্সের মতো আবরণ দিয়ে ঢাকা, বড়ো বড়ো চোখের মতো ফুটো রয়েছে। তার ভিতর দিয়ে উজ্জ্বল আলোকরশ্মি বার হচ্ছে। এর পিছনেই একটা ঘর। এই ঘরের মধ্যে নটিলাসের হালের চাকা। চালক এই ঘরে উজ্জ্বল আলোর সাহায্যে নটিলাসকে সমুদ্রগর্ভে চালাতো।

সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। সকলের মন আবেগে ভরে আছে। যে-মহাপুরুষ এতকাল নানাভাবে তাদের অজস্র উপকার করেছেন, যার সঙ্গে সবেমাত্র তাদের পরিচয় হয়েছে, তিনি কিনা মৃত্যুশয্যায়!

এমন সময় আযাটন বললে : আচ্ছা, এই নটিলাসে চড়ে আমার লিঙ্কন আইল্যাণ্ড থেকে চলে যেতে পারি?

তা কী কবে হবে? সাইরাস হার্ডিং বললেন : নটিলাস তো আর আমাদের নয়। তা ছাড়া নটিলাস এখানে আটকা পড়ে গেছে, গহ্বরের ভিতর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আর উপায় যদি-বা থাকতোই, ক্যাপ্টেন নেমো যখন ইচ্ছে করেছেন নটিলাস-সমেত তাকে সমুদ্রের অতলে কবর দিতে হবে–তখন সে-কাজই আমরা করবো।

এইভাবে কথাবার্তায় খানিকক্ষণ কাটল। তারপর সাইবার হার্ডিং সকলকে নিয়ে আবার নটিলাসের খাবারঘরের ভিতরে ঢুকলেন। সেখানে কিছু জলযোগ করে পরে আবার ক্যাপ্টেন নেমোর ঘরে ঢুকলেন।

ততক্ষণে ক্যাপ্টেন নেমোর অবসাদ অনেকটা দূর হয়েছে। আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে-চোখমুখ। উজ্জ্বল হয়েছে চোখের তারা। সবাইকে দেখে একটু হাসলেন তিনি।

সকলে তাকে ঘিরে দাঁড়ালেন।

সাইরাস হার্ডিংকে তিনি বললেন : আপনাদের সকলেরই আশ্চর্য সাহস। আপনাদের মতো সজ্জন দুনিয়ায় বিরল। আমি এতদিন ধরে আপনাদের কার্যকলাপ সবই দেখেছি। আপনাদের আমি শ্রদ্ধা করি। মিস্টার হার্ডিং, আপনার হাতটি পেলে খুব বাধিত হব।

সাইরাস হার্ডিং তার হাত বাড়িয়ে দিলে ক্যাপ্টেন নেমো গভীর স্নেহে তার হাতে একটু চাপ দিয়ে বললেন : আমার নিজের কথা অনেক বলেছি। এবার আপনাদের কথা আর লিঙ্কন আইল্যান্ডের কথা বলবো। এই দ্বীপ ছেড়ে যেতে চান আপনারা?

পেনক্র্যাফট তাড়াতাড়ি উত্তর করলে : ‘যেতে’ চাই বটে, কিন্তু আবার আমরা ফিরে আসবো।

ক্যাপ্টেন নেমো একটু হাসলেন : সে তো আসবেই জানি। দ্বীপটাকে তোমরা ভয়ানক ভালোবাস। তোমাদের জন্যেই তো দ্বীপটার এত উন্নতি হয়েছে।

সাইরাস হার্ডিং বললেন : আমাদের ইচ্ছে, দ্বীপটাকে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেবো। ভবিষ্যতে প্রশান্ত মহাসাগরের এই অংশ লিঙ্কন আইল্যাণ্ড একটা বন্দরের মতো হয়ে উঠবে।

ক্যাপ্টেন নেমো খানিকক্ষণ নীরব থেকে বললেন, তাই হবে। তারপর হার্ডিং বললেন : আপনার সঙ্গে আমি নিভৃতে গোপনে একটু কথা বলতে চাই।

 অন্য-সবাই সেই ঘর ছেড়ে বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণ বাদেব হার্ডিং সবাইকে আবার ডেকে আনলেন। ক্যাপ্টেন নেমো গোপনে তাকে যে-সব কথা বলেছিলেন, হার্ডিং তা কারু কাছে প্রকাশ করলেন না।

সারাদিন এভাবে কেটে গেল। নটিলাসের মধ্যেই রইলেন সকলে। ক্যাপ্টেন নেমোর মুখে কোনো যন্ত্রণার চিহ্ন দেখা গেল না বটে, কিন্তু স্পষ্টই বোঝা গেল, তিনি ক্রমশ নির্জীব হয়ে পড়ছেন। অবশেষে রাত্রির দ্বিতীয় যাম অতিক্রম হবার পর প্রবল চেষ্টায় তিনি তার দু-হাত গুটিয়ে বুকের উপর রাখলেন। রাত একটার সমোয় ‘জননী জন্মভুমি’ কথাটি উচ্চারণ করলেন তিনি। তারপর তার শেষ নিশ্বাস পড়ল।

সাইরাস হার্ডিং ক্যাপ্টেনের বুকে ক্রশচিহ্ন আঁকলেন, তারপর প্রার্থণা করলেনঃ ঈশ্বর! এই মহাপুরুষের আত্মাকে তোমার পায়ে সমর্পণ করলুম।

ক্যাপ্টেন নেমোর মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা বাদে দ্বীপবাসিরা তার সবগুলো আদেশ পালন ক’রে তাদের প্রতিজ্ঞা রাখলেন। তারপর সকলে অভিজ্ঞান হিশেবে পাওয়া বাক্সটা সঙ্গে নিয়ে নটিলাস  পরিত্যাগ করলেন।

ক্যাপ্টেন নেমোর উজ্জ্বল আলো-ভরা ঘরটা সযত্নে বন্ধ করে দেয়া হল। ডেকের উপর যাবার লোহার দরজাটা এমনভাবে বন্ধ করে দেয়া হল যাতে একফোটা জলও নটিলাসের ভিতরে ঢুকতে না-পারে।

এরপর সবাই গিয়ে নৌকোয় উঠলেন। নৌকোটাকে নটিলাসের গলুইয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হ’ল। সেখানে জলের সমতলে দুটি বড়ো ফুটো দেখতে পাওয়া গেল। সেই ফুটোর সঙ্গে জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া চৌবাচ্চার যোগাযোগ। এই ফুটো দুটি খুলে দেয়া হল।

আস্তে-আস্তে চৌবাচ্চা জলে ভরে গেল। ধীরে-ধীরে ডুবতে লাগল নটিলাস। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল জলের অতলে।

.

৩.৭ ভয়ংকরের সম্ভাবনা

সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গে সবাই নীরবে গহ্বরের মুখের কাছে উপস্থিত হলেন। এই গহ্বরটির নাম রাখা হ’ল ডাক্কার-গহ্বর’। তখন ভাটার সময়। নিরাপদেই গহ্বরের মুখ পার হয়ে গেলেন সবাই। যাবার সময় নেব আর পেনক্র্যাফট নৌকোটাকে গহ্বরের দেয়ালে একটা উঁচু প্ল্যাটফর্মের মতো জায়গায় তুলে রাখলে। জায়গাটা সম্পূর্ণ নিরাপদ।

ডাক্কার গহ্বর ছেড়ে সবাই কোর‍্যালে  র দিকে চললেন। ক্যাপ্টেন নেমো যে কতবার তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছেন, সেই কথা ভেবে সবাই তখন অভিভূত। চুপচাপ তারা পথ চলতে লাগলেন।

সকাল ন-টার সময় গ্রানাইট হাউসে এসে পৌঁছুলেন সবাই। এবার থেকে নৌকোর কাজ আরো উৎসাহের সঙ্গে শুরু হল। সাইরাস হার্ডিং আরো-মনোযোগ  দিলেন এ-কাজে। ভবিষ্যতে কী হবে, কিছুই বলবার উপায় নেই। নৌকো যত শিগগির তৈরি করা যায় ততই ভালো। লিঙ্কন আইল্যাও পরিত্যাগ করতে না-পারলেও অন্তত টেবর আইল্যান্ডে গিয়ে আয়ারটনের খবর রেখে আসতে হবে। বলা তো যায় না, স্কটিশ-জাহাজ এলেও আসতে পারে।

আঠারোশো আটষট্টি খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগ অব্দি অন্য-সব কাজ ফেলে রেখে সকলে নৌকোর কাজেই লেগে রইলেন। আড়াই মাস পরিশ্রম করে নৌকোর পাঁজরটা তৈরি হল। তারপর শুরু হল তক্তা বসানোর কাজ।

আঠারোশো উনসত্তর খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসের পয়লা তারিখে হঠাৎ সাংঘাতিক ঝড়তুফান শুরু হ’ল, সঙ্গে-সঙ্গে দ্বীপ জুড়ে অবিশ্রাম বজ্রপাত। বড়ো-বড়ো গাছ বজ্রের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

আকাশের এই আকস্মিক উৎপাতের সঙ্গে পৃথিবীর অভ্যন্তরের গোলযোগের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

সাইরাস হার্ডিং-এর মনে কিন্তু সেই ধারণাই হ’ল। কারণ, দেখা গেল, এই ঝড়-ঝঞ্ঝা বজ্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে আগ্নেয়গিরির নতুন-নতুন লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

জানুয়ারি মাসের তিন তারিখে আগ্নেয়গিরির চুড়ো থেকে ঘন মেঘের মতো ধোঁয়া বেরুতে শুরু করল। ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায় একাকার হয়ে গেল আকাশ। সাত-আটশো ফুট উপর পর্যন্ত আকাশ ধোঁয়ায় একেবারে ছেয়ে গেল।

সাইরাস হার্ডিং অনেকক্ষণ ধ’রে মনোযোগ  দিয়ে এই ধোঁয়া দেখলেন। তারপর সবাইকে ডেকে বললেন : শিগগির ভয়ংকর কিছু একটা ঘটবে, এ-কথা আর গোপন রাখা চলে না। একটা সর্বগ্রাসী পরিবর্তন আসবে। আগ্নেয়গিরির ভিতরকার সবকিছুতেই আগুন ধ’রে গিয়েছে। একটা ভীষণ অগ্ন্যুদগারের যে আর বেশি দেরি নেই– কোনো সন্দেহ নেই সে সম্পর্কে।

আয়ারটন মাটিতে কান পেতে শুনলে। তারপর উত্তেজিত কণ্ঠে বললে আমি যেন ভিতরে ভীষণ একটা গুড়-গুড় আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি!

তখন সবাই কান পেতে খুব মনোযোগ  দিয়ে শুনলেন। হ্যাঁ, আয়ারটন মিথ্যে বলেনি। গুড়গুড় শব্দের সঙ্গে মধ্যে-মধ্যে গভীর গর্জনের মতোও শোনা গেল। বোঝা গেল দ্বীপের অভ্যন্তরে সাংঘাতিক একটা আলোড়ন শুরু হয়েছে।

একটু পরে পেনক্র্যাফট বললে : ফ্র্যাঙ্কলিন পর্বত যতই ধোঁয়া ছাড়ুক, অগ্ন্যুদগার করুক, হাঁক-ডাক যা খুশি করুক, তা-ব’লে কি আমরা আমাদের জাহাজের কাজ বন্ধ রাখবো? চলুন, আমরা গিয়ে কাজে লাগি।

এবার সবাই দ্বিগুণ মনোযোগের সঙ্গে নৌকোর কাজে লেগে গেলেন। যত তাড়াতাড়ি পারা যায়, নৌকোটা শেষ করতেই হবে। কে জানে, ভবিষ্যতে হয়তো-বা এই নৌকোই মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবে সবাইকে।

সন্ধের আগে বেরিয়ে সবাই যখন প্রসপেক্ট হাইটের উপত্যকায় পৌঁছুলেন, তখন সন্ধে হ’য়ে গেছে। চারদিকেই ঘন অন্ধকার। গন্তব্য স্থানে পৌঁছেই দেখা গেল, পর্বতের চুড়ো দিয়ে আগুন বেরুচ্ছে। হলদে রঙের আগুন যেন তার হাজার জিভ মেলে আকাশ চাটতে শুরু করেছে।

সেখান থেকে ফ্র্যাঙ্কলিন পর্বত প্রায় দু-মাইল দূরে। তবু মনে হল, পর্বতের চুড়োয় যেন ভীষণ একটা মশাল জ্বলছে! সমস্ত দ্বীপটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আগুনের আলোয়।

সাইরাস হার্ডিং বললেন : পরিবর্তনটা দেখছি একটু দ্রুতই শুরু হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি যে বিপদ আসবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি।

গিডিয়ন স্পিলেট বললেন : এটা আশ্চর্যের বিষয় কিছুই নয়। আগ্নেয়গিরির উৎপাত তো শুরু হয়েছে প্রায় আড়াই মাস আগে থেকে–সেই যখন আমরা ক্যাপ্টেন নেমোর আবাস খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম, তখন থেকে। ভিতরের আগুন তখন থেকে ঘুষ-ঘুষ করে জ্বলতে শুরু করেছিল, এখন একেবারে দাউদাউ করে জ্বলছে।

সাইরাস হার্ডিং শুধোলেন : মাটির একটা মৃদু কম্পন টের পাচ্ছেন না কি?

স্পিলেট বললেন : হ্যাঁ, তা পাচ্ছি বটে। কিন্তু এই মৃদু কম্পন আর ভূমিকম্প এ-দুটোয় ঢের তফাৎ।

ভূমিকম্প হবে বলে আমার মনে হয় না। হার্ডিং বললেন : এবং ঈশ্বর করুন, সেইটে যেন আর না-হয়। কিন্তু তা না-হলেও, অন্যসব ঘটনা এমন সাংঘাতিক হতে পারে যে তাতে আমাদের বিপদের সীমা থাকবে না। 

কী-রকমের বিপদ হতে পারে?

সেইটে এখন ঠিক করে বলতে পারছি না। হার্ডিং উত্তর করলেন : একটু ভেবে দেখতে হবে। কিন্তু ভয়ংকর কিছুর সম্ভাবনা আছেই।

চৌঠা, পাঁচুই, ছয়ই—জানুয়ারি মাসের তিন দিন পার হয়ে গেল। নৌকোর কাজে কোনো বাধা পড়ল না; খুব মনোযোগ  দিয়ে সবাই সেই কাজ চালাতে লাগলেন। কিন্তু দ্বীপের অন্যান্য জায়গাগুলোও মধ্যে-মধ্যে দেখা দরকার। বিশেষ করে কোর‍্যালে গিয়ে জন্তুগুলোর আহারের ব্যবস্থা করা উচিত। তখন ঠিক হল, পরের দিন সাতই জানুয়ারি আয়ারটন কোর‍্যালে যাবে।

এই কাজের জন্যে আয়ারটন একাই যথেষ্ট। অথচ এর উপর সাইরাস হার্ডিং যখন বললেন : আয়ারটন, কাল আমিও তোমার সঙ্গে কোর‍্যালে  যাবো – তখন সবাই অবাক হলেন।

পেনক্র্যাফট বললে : এখনো নৌকোর কাজ ঢের বাকি আছে। আপনিও যদি যান, তবে তো কাজের খুব ক্ষতি হবে।

হার্ডিং বললেন : আমরা তো কালই আবার ফিরে আসবো। আমার কোর‍্যালে যাওয়া বিশেষ দরকার। এই অগ্ন্যুৎপাতের রকম-সকম একটু ভালো করে দেখতে হবে।

পরদিন ভোরবেলা সাইরাস হার্ডিং আয়ারটনের সঙ্গে ওনাগার গাড়ি চড়ে কোর‍্যালে রওনা হলেন। বনের উপর দিয়ে বিশালকায় ঘন মেঘের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছিল। মেঘগুলো অগ্ন্যুদগারের ধুলোয় ভরা। তারা কোর‍্যালের কাছে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে বারুদের মতো কালো ধুলো পড়তে লাগল আকাশ থেকে। দেখতে-দেখতে চারদিকের গাছপালা, জমি কয়েক ইঞ্চি পুরু ধুলোয় ঢেকে গেল।

আয়ারটন বললে : এটা তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার।

সাইরাস হার্ডিং বললেন : শুধু অদ্ভুত নয়, আয়ারটন, এটা বড়ো সাংঘাতিক ব্যাপার! এই-যে কালো পাথরের গুঁড়োর মতো খনিজ ধুলো সব পড়ছে, এতে প্রমাণ হচ্ছে যে আগ্নেয়গিরির পেটের মধ্যে একটা দারুণ ওলোট-পালোট ব্যাপার শুরু হয়েছে।

আয়ারটন শুধোল : এর একটা-কিছু করা যায় না?

কিছুই করবার নেই। মাথা নাড়লেন হার্ডিং : শুধু নজর রাখতে হবে ব্যাপার কদ্দুর গড়ায়। তুমি এক কাজ করো, আয়ারটন। জীবজন্তুগুলোর খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করতে থাকো, কোর‍্যালের কাজকর্মগুলো শেষ করে ফ্যালো। আমি এই ফাঁকে আগ্নেয়গিরির অবস্থাটা একটু দেখে আসি। ঘণ্টা-দুয়েকের মধ্যেই আমি ফিরে আসবো। তারপর একবার ডাক্কার-গহ্বরটা দেখতে যেতে হবে।

ডাক্কার-গহ্বর কেন?

ওখানে গেলে পৃথিবীর অভ্যন্তরের একটা আন্দাজ করা যাবে। ক্যাপ্টেন নেমো মৃত্যুর পূর্বে আমাকে গোপনে কী বলেছিলেন, জানো, আয়ারটন? বলেছিলেন, আগ্নেয়গিরি সম্পর্কে সাবধান থেকো। সমুদ্রের জল আগ্নেয়গিরির মধ্যে চুঁইয়ে-চুঁইয়ে ঢুকছে।

সমুদ্রের জল! আয়ারটন উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল :গোটা দ্বীপটাই যে তাহলে বয়লারের মতো ফেটে পড়বে!

হ্যাঁ। সেইটেই হল সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনা। যা-ই হোক, তুমি এদিককার কাজকর্মগুলো সেরে ফ্যালো। আমি ততক্ষণে আগ্নেয়গিরির অবস্থাটা একবার দেখে আসি।

ফ্র্যাঙ্কলিন পর্বতের অবস্থা দেখে-শুনে হার্ডিং ফিরে এলেন। আয়ারটন ইতিমধ্যে কোর‍্যালের সমস্ত কাজ শেষ করেছে। সাইরাস হার্ডিংকে দেখে সে বললে : ক্যাপ্টেন হার্ডিং, জীবজন্তুগুলো যেন কেমন অদ্ভুতরকম অস্থির হয়ে উঠেছে।

তা তো হবেই। এরা সব টের পায়। এদের স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই এরা বুঝতে পেরেছে যে শিগগিরই একটা সাংঘাতিক বিপদ উপস্থিত হবে। থাক সে-কথা, একটা কাজ করো। একটা আলো সঙ্গে নাও; এক্ষুনি ডাক্কার-গহ্বরে যেতে হবে।

গহ্বরের কাছে পৌঁছে তারা প্রবেশপথটা খুঁজে বার করলেন। তখন হার্ডিং বললেন : লোহার নৌকোটা তো থাকবার কথা। আয়ারটন নৌকোটা টেনে বার করবার পর দু-জনে নৌকোতে উঠলেন। আয়ারটন আলোটা জেলে নৌকোর গলুইএ রাখল। হার্ডিং হাল ধরে বসলেন। আয়ারটন দাঁড় টেনে চলল।

এ-যাত্রায় আর নটিলাসের আলো নেই। ঘন অন্ধকারে গহ্বরের ভিতর যাওয়া। বাতির আলো ক্ষীণ হলেও তারই সাহায্যে গহ্বরের দেয়ালের গা ধরে আস্তে-আস্তে এগুতে লাগলেন তারা। খানিক দূর এগুতেই সাইরাস হার্ডিং স্পষ্ট শুনতে পেলেন-পর্বতের ভিতর থেকে গুম-গুম আওয়াজ বের হচ্ছে।

এই শব্দ ছাড়াও একটা জোরালো ভারি গন্ধ পাওয়া গেল। গন্ধকের ধোঁয়ার গন্ধ। নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম।

সাইরাস হার্ডিং বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন :এ-রকমটা যে হবে, সেটা ক্যাপ্টেন নেমো নিজেও ভয় করেছিলেন। যাক-তবু গহ্বরের শেষ অব্দি যেতে হবে আমাদের।

প্রায় পঁচিশ মিনিট বাদে তারা গহ্বরের প্রান্তে এসে হাজির হলেন। তখন সাইরাস হার্ডিং উঠে দাঁড়িয়ে গহ্বরের দেয়ালে আলো ফেললেন। এই দেয়ালের পরেই আগ্নেয়গিরির কেন্দ্রস্থল। এই দেয়াল কতটা পুরু? কে জানে। দশ ফুটও হতে পারে, একশো ফুটও হতে পারে। ঠিক কতটা পুরু, তা নিশ্চয় করে বলবার উপায় নেই। কিন্তু ভিতরের আগ্নেয়গিরির শব্দ এমনি সুস্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল যে, দেয়াল খুব বেশি পুরু নয় বলেই মনে হল।

সাইরাস হার্ডিং আলোটাকে একটা দাঁড়ের ডগায় বেঁধে দেয়ালের অনেকটা উঁচু পর্যন্ত পরীক্ষা করে দেখলেন। দেয়াল ফেটে একেবারে চৌচির হয়ে গেছে। সেই ফাটলের মধ্যে দিয়ে দুর্গন্ধ ধোঁয়ার মতো গ্যাস বেরিয়ে গহ্বরের হাওয়া নষ্ট করে ফেলেছে।

সাইরাস হার্ডিং চুপ করে কী যেন ভাবলেন খানিকক্ষণ। তারপর ভারি গলায় বললেন, ক্যাপ্টেন নেমো ঠিক কথাই বলেছিলেন। বলেছিলেন বিপদের উৎপত্তি হবে এখান থেকেই, আর সেইটেই সবচেয়ে ভয়ংকর হবে। সাংঘাতিক মারাত্মক হবে তার পরিণাম।

এরপর তারা ফিরে চললেন। আধঘণ্টা পরে গহ্বরের মুখে তাঁদের দেখা গেল।

.

৩.৮

ক্যাপ্টেন নেমোর শেষ দান

এক দিন এক রাত্রি কোর‍্যালে কাটিয়ে পরদিন আটই জানুয়ারি সাইরাস হার্ডিং আর আয়ারটন গ্রানাইট হাউসে ফিরে এলেন। তক্ষুনি সবাইকে ডেকে হার্ডিং জানালেন যে বিষম সাংঘাতিক এক বিপদে লিঙ্কন আইল্যান্ড ফেটে চৌচির হয়ে যেতে পারে। যে-কোনো মুহুর্তে। কোনো মানুষের সাধ্য নেই সেই বিপদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করে।

হার্ডিং আরো বললেন : ক্যাপ্টেন নেমো গোপন আলোচনার সময় আমাকে এই ভয়ংকর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।

ক্যাপ্টেন নেমো! সবাই বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলেন।

হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন নেমো। এবং মৃত্যুর পূর্বে সেইটিই তার শেষ দান।

শেষ দান। বিস্মিত হল পেনক্র্যাফট। শেষ দান! তার মানে, যদিও তিনি মারা গেছেন, তবুও তিনি আমাদের সাহায্য করছেন এখনো।

স্পিলেট জানতে চাইলেন : কিন্তু ক্যাপ্টেন নেমো কী বলেছিলেন আপনাকে?

হার্ডিং উত্তর করলেন : প্রশান্ত মহাসাগরের অন্য-কোনো দ্বীপের মতোই নয় এই লিঙ্কন আইল্যাণ্ড। এবং ক্যাপ্টেন নেমো আমাকে জানিয়ে গেছেন যে, অবিলম্বেই এই দ্বীপ ফেটে বয়লারের মতো চৌচির হয়ে যাবে। কেননা সমুদ্রের জল আগ্নেয়গিরির মধ্যে চুঁইয়ে-চুঁইয়ে ঢুকতে শুরু করেছে। গতকাল আমি এই সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ডাক্কার-গহ্বরে গিয়েছিলুম। ডাক্কার-গহ্বরের দেয়াল একেবারে আগ্নেয়গিরির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। একটামাত্র সামান্য পুরু দেয়াল দিয়ে গহ্বরটি আগ্নেয়গিরির মধ্যস্থল থেকে আলাদা। কাল আমি গিয়ে দেখেছি, সেই দেয়াল ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, আর আগ্নেয়গিরির সালফারাস গ্যাস তখনই গহ্বরের বাতাস দূষিত করে তুলেছে। আরো দেখতে পেলুম, শিগগিরই ঐ দেয়ালের মধ্যে ছোট্ট একটা পথের মতো তৈরি হবে, আর তাই দিয়েই হু-হু করে জল ঢুকবে আগ্নেয়রিরির ভিতরে। জ্বলন্ত লাভার মধ্যে যখন গিয়ে জল পড়বে, তক্ষুনি পলক ফেলতে-না-ফেলতেই লিঙ্কন আইল্যাণ্ড চৌচির হয়ে উড়ে যাবে।

হার্ডিং-এর কথা শুনে সবাই ভয়ে আতঙ্গে একেবারে বিমূঢ় হয়ে গেলেন। সাইরাস হার্ডিং যে কিছুই বাড়িয়ে বলেননি, তা বুঝতে কারু বিলম্ব হল না। তক্ষুনি সকলের মনে একটা কথা পরিষ্কার হয়ে উঠল : তাড়াতাড়ি খুব তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে জাহাজ।

প্রত্যেকে দ্রুত হাতে জাহাজের কাজে লাগলেন। অন্য-কোনোদিকে মনোযোগ দেয়ার বিন্দুমাত্র অবসর নেই এখন। গ্রানাইট হাউসের ভাঁড়ার বাড়িয়ে কী লাভ আর! ভাঁড়াড়ে যে-সব জিনিশ আছে, একটি সমুদ্রযাত্রার পক্ষে তা যথেষ্ট। অবশ্যম্ভাবী সেই বিপদ শুরু হবার আগেই যাতে জাহাজের কাজ শেষ হয়ে যায়, সেইজন্যে সবাই আপ্রাণ পরিশ্রম করতে লাগলেন, উন্মাদের মতো খাটতে লাগলেন।

তেইশে জানুয়ারি জাহাজের ডেকের কাজ অর্ধেক সাঙ্গ হল। ইতিমধ্যে ফ্র্যাঙ্কলিন পর্বতের চুড়োর কোনো পরিবর্তন হয়নি। একটানা ধোঁয়া বর্ষণ করে চলেছে আগ্নেয়গিরি। তেইশে জানুয়ারি রাত্রিবেলা ভয়ংকর একটি আওয়াজ হল। আকাশ লাল হয়ে উঠল আগুনে আগুনে। গ্র্যানাইট হাউসে থেকেই সকলে আগ্নেয়গিরির উত্তাপ অনুভব করতে পারলেন। জ্বলন্ত জলধারার মতো আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে বেরুতে শুরু করল গলানো লাভা। জ্বলন্ত এবং চলন্ত আগুন দ্রুতবেগে নিচে নামতে লাগল ঝরনার মতো।

আয়ারটন ভীতি-বিহ্বল স্বরে চেঁচিয়ে উঠল : কোর‍্যাল! কোর‍্যাল।

সত্যি কোর‍্যালের দিকে দ্রুতবেগে ধেয়ে চলছিল লাভা। দেখতে-না-দেখতেই রেড ক্রীকের ঝরনা আর জ্যাকামার অরণ্য জুলন্ত ধ্বংসের নিচে তলিয়ে গেল।

আয়ারটন চেঁচিয়ে উঠতেই সংবিৎ ফিরল সকলের। তক্ষুনি কোর‍্যালের উদ্দেশ্যে দ্রুত রওনা হলেন সকলে পোষা জীবজন্তুগুলোকে মুক্ত করে দেবার জন্যে।

ভোর তিনটের মধ্যে কোর‍্যালে এসে পৌঁছুলেন সকলে। জন্তুগুলো ভয়ে উম্মাদের মতো ডাকতে শুরু করে দিয়েছে। পাগলের মতো ছুটোছুটি করছে ওরা কোর‍্যালের ভিতরে। আয়ারটন তক্ষুনি কোর‍্যালের দরজা খুলে দিলে। আতঙ্কবিমূঢ় জীবগুলি মুহূর্তের মধ্যে দ্বীপের চারদিকে ছুটে চলে গেল।

এর প্রায় ঘণ্টাখানেক পরেই লাভায় স্রোতের নিচে ঢাকা পড়ে গেল কোর‍্যাল।

তক্ষুনি তারা ফিরে এলেন তাঁদের ডকইয়ার্ডে। আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা চলবে না। জ্যাকামার অরণ্যের ঘন গাছপালার দরুন লাভার গতি রুদ্ধ হবে। এরপর লেক গ্র্যান্ট আর প্রসপেক্ট হাইটের জন্যেও লাভার গতি বন্ধ হবার সম্ভাবনা আছে। দ্বিতীয় কোনো অগ্ন্যুদপাত না-হওয়া পর্যন্ত এই জ্যাকামার অরণ্য পর্যন্ত এসেই বন্ধ হয়ে যাবে জ্বলত তরল মৃত্যুর বিদ্যুৎগতি। দ্বিতীয় অগ্ন্যুদপাত হতে যদি আর-কিছুদিন বিলম্ব হয়, ততদিনের মধ্যে হয়তো-বা জাহাজের কাজ শেষ হয়ে যেতে পারে।

দেখতে-দেখতে তেসরা মার্চ এসে গেল। এর মধ্যে আর-এক মুহূর্তও বিশ্রাম করেননি কেউ। হিশেব করে বুঝতে পারলেন যে, আর দিন-দশেকের মধ্যেই তারা জাহাজ নিয়ে সমুদ্রপাড়ি দেতে সক্ষম হবেন। দ্বিতীয় কোনো অগ্ন্যুদপাত এখন না-হলেও দিন-দিনই খারাপ হচ্ছে দ্বীপের অবস্থা। এখন যে-অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, তাতে যে-কোনো মুহূর্তে দ্বীপটি বয়লারের মতো ফেটে পড়তে পারে। কে জানে আর দিন-দশেক সময় পাওয়া যাবে কি না। হয়তো তীরে এসে তরী ডুববে শেষ পর্যন্ত। তবু তাঁদের মনে আশার আলো ফিরে এলো। এতদিনের মধ্যে যখন দ্বিতীয় কোনো অগ্ন্যুৎপাত হয়নি, তবে হয়তো আর দিন দশেকও নিরাপদে কাটবে। আর, তার মধ্যেই জাহাজের কাজ শেষ হয়ে যাবে। সবাই প্রাণপণে খাটতে লাগলেন।

কিন্তু আবার আগ্নেয়গিরির অবস্থা খারাপ হয়ে উঠল। জ্বালামুখের উপরের আকাশ আগুনে লাল হয়ে গেল। ঝরনা-ধারার মতন লাভার স্রোত বেরোতে লাগল জ্বালামুখ দিয়ে। লেক গ্র্যান্টের পশ্চিম তীর ধরে সেই জ্বলন্ত মৃত্যু প্রসপেক্ট হাইটের সমভূমি পর্যন্ত ছুটে এলো। মূহুর্মূহু আর্তনাদ করতে লাগল টপ আর জাপ। বোঝা গেল তারাও আসন্ন, অবশ্যম্ভাবী, মৃত্যুর কথা বুঝতে পেরেছে।

প্রথমবারের অগ্ন্যুদপাতেই দ্বীপের বহু জীবজন্তু মারা গিয়েছিল। যারা কোনোমতে আত্মরক্ষা করে ছিল, তারা টাউন মার্শ-এ আশ্রয় নিয়েছিল। কেউ-কেউ আশ্রয় নিয়েছিল প্রসপেক্ট হাইটে। সেই-শেষ আশ্রয়ের দিকেও এবার বিদ্যুদ্বেগে ছুটে এলো তরল আগুন। গ্রানাইট পাথরের দেয়াল পর্যন্ত এসে সেই লেলিহান আগুন পথ পরিবর্তন করে বিদ্যুতের মতো নামল সমুদ্র সৈকতে। এই ভয়ংকরের কোনো বর্ণনা দিতে লেখনী অসক্ষম। রাত্রিবেলা এই লাভাস্রোতকে দেখে মনে হল যেন তরল আগুনের নায়াগ্রা প্রপাত এসে আশ্রয় নিয়েছে লিঙ্কন আইল্যান্ডে।

তখনও জাহাজের শরীরে এসে স্পর্শ করেনি লাভাস্রোত। হার্ডিং ঠিক করে ফেললেন, আর দেরি করা চলবে না, তক্ষুনি সমুদ্রে রওনা হয়ে পড়তে হবে। পেনক্র্যাফট আর আয়ারটন সঙ্গে-সঙ্গেই সমুদ্রযাত্রার জন্যে আবশ্যকীয় প্রস্তুতিতে লেগে গেল, ঠিক হল আগামী কাল নয়ই মার্চ সমুদ্রযাত্রা শুরু হবে।

কিন্তু আট তারিখ রাত্রিবেলাতেই জ্বালামুখ থেকে সবেগে ছিটকে বেরিয়ে এলো আগুনের ধারা, অজস্র বজ্র যেন গর্জন করে উঠল একসঙ্গে, চূর্ণ-চূর্ণ হয়ে গেল আস্ত দ্বীপটাই, আর তিন হাজার ফুট উপর পর্যন্ত উঠল সেই হাজারখণ্ড দ্বীপের এক-একটা টুকরো।

নিশ্চয়ই ডাক্কার-গহ্বরের দেয়াল গ্যাসের চাপে ফেটে চুরমার হয়ে গেছে, আর বিদ্যুদ্বেগে সমুদ্রতরঙ্গ প্রবেশ করেছে অগ্নিস্রাবী পর্বতের কেন্দ্রে। একটি জ্বালামুখে কুলোয়নি, সহস্রধারায় লাভা বেরিয়ে আসছে দ্বীপের সহ অংশ দিয়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেখা গেল, যেখানে লিঙ্কন আইল্যাণ্ড দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে নীল প্রশান্ত মহাসাগরের সীমাহারা উত্তাল তরঙ্গ কীসের জন্যে যেন ক্রমাগত উদ্দাম আক্রোশে ফেটে পড়ছে।

একটিমাত্র পর্বতখণ্ড-ত্রিশ ফুট লম্বা আর বিশ ফুট চওড়া : জলের কিনারা থেকে ফুটদশেক দুরে শুধু এই জমাট স্থানটুকুই প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে আছে। এইটুকুই গ্রানাইট হাউসের পর্বতের অবশিষ্ট খণ্ড চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে গ্রানাইট হাউসের দেয়াল। বড়ো হলটার কতগুলো পাথর একটার উপরে আরেকটা পড়ে একত্রে জড়ো হয়ে এই পর্বতখণ্ডটি প্রস্তুত হয়েছিল। চারদিকে অন্যকিছুর চিহ্নমাত্র নেই। লিঙ্কন আইল্যান্ডের একমাত্র অবশিষ্ট রইল এই পর্বতখণ্ডটি। টপকে সঙ্গে করে এখানে এসেই আশ্রয় নিলেন সবাই। হতভাগ্য জাপ একটা ফাটলের মধ্যে পড়ে মারা গেছে।

সাইরাস হার্ডিং, গিডিয়ন স্পিলেট, হার্বাট, পেনক্র্যাফট, আয়ারটন আর নেব-এরা সবাই আশ্চর্য উপায়ে রক্ষা পেলেন। অগ্ন্যুৎপাতের প্রচণ্ড আক্ষেপে সবাই ছিটকে পড়েছিলেন সমুদ্রের জলে। তারপর কাছে এই পর্বতখণ্ডটি দেখে সাঁতরে গিয়ে আশ্রয় নিলেন সেখানে। নৌকোটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। এই জায়গা ছেড়ে যাবার কোনো উপায়ই আর নেই। সবাই মৃত্যুর অপেক্ষা করতে লাগলেন।

এভাবে ন-দিন কেটে গেল পর্বতখণ্ডে। চরম দুরবস্থার আর দেরি নেই। স্নায়বিক উত্তেজনার চরম সীমায় এসে পৌঁছুলেন সবাই। হার্বাট আর নেব অনাহারে অনিদ্রায় প্রলাপ বকতে শুরু করে দিলে। আশার ক্ষীণতম আলোকবিন্দু পর্যন্ত তখন অদৃশ্য হয়েছে। কী করে যে আরও চার-পাঁচদিন কেটে গেল, তা কেবল ঈশ্বরই জানেন। সৌভাগ্যবশত সেই পর্বতখণ্ডের ফাটলে কিছু বৃষ্টির জল জমেছিল। তা পান করেই কাটল সকলের।

অবশেষে চব্বিশে মার্চ তারিখে বহু দূরে, সমুদ্রের দিগন্তে একটি বিন্দুর মতো কী যেন দেখতে পেলে আয়ারটন। সে উঠে দাঁড়িয়ে ভালো করে লক্ষ করলে সেই বিন্দুটিকে, তারপর সেই বিন্দুর দিকে হাত দিয়ে সংকেত করতে লাগল।

ক্রমে দেখা গেল, পাহাড় থেকে অনেক দূরে একটা জাহাজের পাল দেখা যাচ্ছে। এই পর্বতখণ্ডটির দিকেই যেন এগিয়ে আসতে লাগল জাহাজটি। তাদের যদি শক্তি থাকত, তারা যদি সমূদ্রের চারদিকে দৃষ্টি রাখতেন, তবে অনেক আগেই জাহাজটিকে দেখতে পেতেন। জাহাজটি দেখেই আয়ারটন বিড়বিড় করে বলে উঠল : ডানকান জাহাজ … তারপরেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

সাইরাস হার্ডিং আর তার সঙ্গীদের যখন সংবিৎ ফিরল, তখন তারা দেখতে পেলেন তারা একটা জাহাজের ক্যাবিনের মধ্যে শুয়ে আছেন। কী করে যে তারা নিশ্চিত বিনাশের হাত থেকে রেহাই পেলেন প্রথমটা তা বুঝতে পারলেন না। পরে আয়ারটনের একটা কথায় বিষয়টা পরিষ্কার হল। আয়ারটন জানালে যে এইটেই ডানকান জাহাজ।

ডানকান! বিস্মিত হয়ে বললেন হার্ডিং, তারপর হাত তুলে ধন্যবাদ জানালেন ঈশ্বরকে।

সত্যিই এই জাহাজটি লর্ড গ্নেনারভনের ডানকান। কাপ্তেন গ্র্যান্টের ছেলে রবার্ট এখন এই জাহাজের কাপ্তেন। বারো বছর পরে আয়ারটনকে নিয়ে যাবার জন্যে তাঁকে টেবর আইল্যাণ্ডে পাঠানো হয়েছিলো। সেইজন্যেই দ্বীপবাসীরা শুধু যে এখন রক্ষাই পেয়েছেন তাই নয়, জাহাজে চড়ে চলেছেন আমেরিকার দিকে–স্বদেশে।

 সাইরাস হার্ডিং কাপ্তেন রবার্ট গ্র্যান্টকে জিগেস করলেন : আচ্ছা, আপনি তো আয়ারটনের খোঁজে টেবর আইল্যান্ডে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে পাননি। কিন্তু, তারপরে এখানে, তার দেড়শো মাইল উত্তর-পুবদিকে আপনি এলেন কেন? কে আপনাকে এ-জায়গার খবর দিলে?

রবার্ট গ্র্যান্ট বললেন : কাপ্তেন হার্ডিং, আমি এখানে শুধু আয়ারটনের খোঁজে নয়, আপনার আর আপনার সঙ্গীদের খোঁজেও এসেছি।

আমার আর আমার সঙ্গীদের খোঁজে!

নিশ্চয়ই— রবার্ট গ্র্যান্ট উত্তর করলেন : লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে।

আপনি লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের খোঁজ পেলেন কী করে? ম্যাপে তো এই দ্বীপের নামটার পর্যন্ত উল্লেখ নেই।

রবার্ট গ্র্যান্ট বললেন : টেবর আইল্যাণ্ডে যে আপনারা একটা চিরকুটে লিখে রেখে এসেছিলেন, সেই কাগজটুকু পড়ে লিঙ্কন আইল্যাণ্ড আর আপনাদের কথা জানতে পেরেছিলুম। এই বলে রবার্ট গ্র্যান্ট সেই কাগজটুকু বার করে দেখালেন।

সাইরাস হার্ডিং কাগজের লেখা দেখে বুঝতে পারলেন, বোতলের মধ্যে যে-চিঠিটা পাওয়া গিয়েছিল আর কোর‍্যালে যে-চিঠিখানা তারা পেয়েছিলেন, তার লেখা আর এই কাগজের লেখা একই হাতের।

 বুঝতে পেরেছি, বললেন হার্ডিং :কাপ্তেন নেমোর সর্বশেষ দান এটা। আর-একবার তিনি আমাদের প্রাণ বাঁচালেন। আমাদের বন-অ্যাডভেনচারে চড়েই তাহলে তিনি একদিন টেবর আইল্যান্ডে গিয়েছিলেন।

এমন সময় আয়ারটন এসে দাঁড়ালে সেখানে। তার হাতে কাপ্তেন নেমোর দেয়া সেই বাক্সটা। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পড়েও আয়ারটন বাক্সটা প্রাণপণে রক্ষা করেছে! এবার সে বাক্সটা সাইরাস হার্ডিং-এর হাতে তুলে দিলেন।

রুদ্ধ কণ্ঠে হার্ডিং বললেন, আয়ারটন!

তারপর মাথার টুপি খুলে অভিবাদন জানালেন কাপ্তেন নেমোর মহৎ আত্মাকে।

মহাসমুদ্রের সুনীল তরঙ্গ কেটে-কেটে ডানকান তখন নতুন মহাদেশ আমেরিকার দিকে এগিয়ে চলেছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *