২.৫-২.৭ ভাসমান লিপি

২.৫ ভাসমান লিপি

সন্ধের আগেই রাশি-রাশি শিকার নিয়ে ফিরল হার্বার্টরা। সবার কাঁধেই শিকারের বোঝা; টপের গলায় টীল পাখির মালা, জাপেরও সারা গায়ে স্নাইপ পাখির পালক ঝোলানো।

সাইরাস হার্ডিং তাঁর অনুসন্ধানের কথা গোপনে স্পিলেটকে বললেন। সব শুনে স্পিলেট বললেন : খুঁজে কিছু দেখতে না-পেলেও কোনো জন্তু নিশ্চয়ই কুয়োর মধ্যে থাকে কিংবা মাঝে-মাঝে সেখানে আসে। দেখা যাক, ভবিষ্যতে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায় কি না।

নেব স্পিলেটের সাহায্যে শিকারগুলির ব্যবস্থায় মন দিল। প্রচুর পরিমাণ শিকার। এত ঠাণ্ডায় নষ্ট হয়ে যাওয়ারও কোনো ভয় নেই। রাশি-রাশি পাখি ও জন্তুর মাংস ভবিষ্যতের জন্যে নুন মাখিয়ে জারিয়ে রেখে দেয়া হল।

পেনক্র্যাফট হার্বার্টকে নিয়ে ফের নৌকোর কাজে মন দিলে। বেলুনের কাপড় দিয়ে নৌকোর জন্যে সুন্দর একটা পাল তৈরি হল। নৌকোর সাজ-সরঞ্জাম সবকিছুই নৌকো শেষ হওয়ার আগেই প্রস্তুত হল। নৌকোর মাস্তুলে টাঙিয়ে দেয়ার জন্যে একটা নিশানও প্রস্তুত করলে পেনক্র্যাফট। বলা বাহুল্য নিশানটি হল মার্কিন মুলুকের জাতীয় নিশান। আমেরিকার জাতীয় নিশানে সাঁইত্রিশটা নক্ষত্র থাকে, এই নিশানে আটত্রিশটা নক্ষত্র এঁকে দেয়া হল। এই অতিরিক্ত নক্ষত্রটা হল লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের নামে। নৌকো তখনও শেষ হয়নি, তাই নিশানটিকে গ্র্যানাইট  হাউসের জানালায় টাঙানো হল। সবাই তিনবার জয়ধ্বনি করে নিশানটিকে অভিবাদন জানালেন।

শীত প্রায় শেষ হয়ে এলো। সেপ্টেম্বরের শেষে শীত একেবারে চলে গেল।

পেনক্র্যাফটও দ্বিগুণ উৎসাহে মন দিলে নৌকোয় কাজে। তার উপরেই নৌকোর সব কাজের ভার। শুধু নৌকো নয়, নৌকোর সাজ-সরঞ্জাম—মাস্তুল, হাল, ডেক, ক্যাবিন —সবই হল পেনক্র্যাফটের পছন্দমতো। নৌকোর কাজে লোহার জিনিশ যা-কিছু লাগল, সবই চিমনির কারখানায় প্রস্তুত। এইভাবে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমের পর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নৌকোটি শেষ হল : এবার চড়ে দেখলেই হয়।

দশই অক্টোবর নৌকোটি জলে ভাসানো হল। পেনক্র্যাফটের তখন আনন্দ দ্যাখে কে! সে হৈ-চৈ করে রীতিমতো একটা তুমুল কাণ্ড বাধিয়ে বসল। এমন সুন্দর নৌকো হয়েছে দেখে সবাই খুশি হয়ে উঠলেন। এবার নৌকোর একটা নাম দেয়া চাই। ঠিক হল নৌকোর নাম দেয়া হবে বোনাভেনতুর, অর্থাৎ বন-অ্যাডভেনচার। সকালবেলা প্রাতরাশ সেরেই নৌকো চালিয়ে পরখ করে দেখা হবে বলে ঠিক হল। সঙ্গে খাবার-দাবার নেবারও ব্যবস্থা করা হল। ফিরতে দেরিও হতে পারে তো।

সাড়ে-দশটার সময় সবাই নৌকোয় চড়লেন। বলা বাহুল্য, টপ আর জাপও বাদ গেল। পাল তুলে দেয়া হল। মাস্তুলের আগায় পৎ-পৎ করে উড়তে লাগল নিশানটি। পেনক্র্যাফটকে কাপ্তেন করে বন-অ্যাডভেনচার নীল সমুদ্রে অ্যাডভেনচারে বেরিয়ে পড়ল।

দেখতে-দেখতে এই নতুন নৌকো পোর্ট বেলুন পেরিয়ে আরো তিন-চার মাইল চলে আসার পর নৌকোর ডেক থেকে লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের দৃশ্যটি দেখালো আশ্চর্য সুন্দর।

চারদিকের দৃশ্য দেখে সবাই রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলেন। পেনক্র্যাফট বললে : নৌকো কেমন লাগছে, ক্যাপ্টেন? খুশি হয়েছেন তো?

একটু হাসলেন হার্ডিং : বেশ ভালোই চলছে বলে তো মনে হচ্ছে।

এখন কি আপনার মনে হয়, বললে পেনক্র্যাফট, যে এতে চড়ে নির্ভয়ে দূরে যাওয়া যায়?

দূরে আবার যাবে কোথায়?

কেন? বললে পেনক্র্যাফট, টেবর আইল্যাণ্ডে!

হার্ডিং বললেন : দ্যাখো পেনক্র্যাফট, খুব দরকারে পড়লে বন-অ্যাডভেনচারে চড়ে টেবর আইল্যাণ্ডের চেয়ে দূরে যেতেও আমার কোনো আপত্তি হবে না। কিন্তু কোনো দরকার নেই, অথচ খামকা-খামকা টেবর আইল্যাণ্ডে যাওয়াটা আমার ভালো মনে হয় না। এ ছাড়া তুমি তো আর একা টেবর আইল্যাণ্ডে যেতে পারো না?

একজন মাত্র সঙ্গী পেলেই হয়।

তবেই তো! বললেন সাইরাস হার্ডিং: লিঙ্কন আইল্যান্ডের মোট পাঁচজন লোকের মধ্যে দু-জনের জীবনই খামকা বিপন্ন হবে।

কিন্তু এতে বিপদের তো কোনোই সম্ভাবনা নেই, ক্যাপ্টেন।

হার্ডিং কোনো জবাব দিলেন না। পেনক্র্যাফ্টও মনে-মনে একটু বিরক্ত হয়ে চুপ করে গেল। সে ভাবলে, এখন আর ঘাঁটাঘাঁটি না-করে পরে এ-সম্পর্কে আরো আলোচনা করা যাবে। এই ভেবে সে চুপ করে রইল। টেবর আইল্যান্ডে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা যে অল্পক্ষণের মধ্যেই এসে উপস্থিত হতে পারে, তা সে তখন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

একটু পরেই বন-অ্যাডভেনচার ফিরে তীরের দিকে চলল। লক্ষ্য তার পোর্ট বেলুন। পোর্ট বেলুনের কাছেই চ্যানেলের মধ্যে নৌকোটা রাখতে হবে, সুতরাং এই চ্যানেলগুলো ভালো করে দেখা দরকার। নৌকো তখন তীর থেকে আধ মাইল দূরে, হার্বার্ট দাঁড়িয়েদাঁড়িয়ে পথ বলে দিচ্ছে, এমন সময় সে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল : পেনক্র্যাফট, ওই দ্যাখো, একটা বোতল জলে ভেসে আসছে! এই বলেই উপুড় হয়ে জলে হাত ড়ুবিয়ে দিলে সে। একটু পরেই দেখা গেল, তার হাতে একটা ছিপি-আঁটা বোতল।

সাইরাস হার্ডিং হার্বার্টের হাত থেকে বোতলটা নিলেন। ছিপিটা খুলে ফেললেন। তারপর বোতলের ভিতর থেকে বার করলেন একটুকরো কাগজ। তাতে লেখা : একজন নির্বাসিত ভাগ্যহত ব্যক্তি …টেবর আইল্যাণ্ড…১৫৩° পশ্চিম-দ্রাঘিমা এবং ৩১°১১ দক্ষিণ-অক্ষাংশ।

.

২.৬ অ্যাডভেনচারের ডাকে

সাইরাস হার্ডিং লেখাটুকু পড়বার সঙ্গে-সঙ্গেই ব্যস্ত হয়ে উঠল পেনক্র্যাফট। বললে : টেবর আইল্যাণ্ডে নির্বাসিত ব্যক্তি! লিঙ্কন আইল্যাণ্ড থেকে মোটে দুশো মাইলের মধ্যে একজন লোক রয়েছে! ক্যাপ্টেন হার্ডিং, এখন নিশ্চয়ই টেবর আইল্যাণ্ডে যাওয়া সম্পর্কে আপনি আর আপত্তি করবেন না?

হার্ডিং ঘাড় নাড়লেন : না, পেনক্র্যাফট। এখন যত শিগগির সম্ভব তোমাকে টেবর আইল্যাণ্ডে যেতে হবে। তুমি কালকেই রওনা হয়ে পড়ো।

তারপর সেই কাগজের টুকরোটুকু আবার পড়ে হার্ডিং বললেন : এই লেখাটুকু পড়ে মনে হচ্ছে টেবর আইল্যাণ্ডের লোকটির নৌ-বিদ্যা সম্পর্কে বেশ জ্ঞান আছে। দ্বীপটা সমুদ্রের কোনখানে, ঠিকভাবে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে। আর, লোকটি হয় ইংরেজ, নয়তো আমেরিকান। নইলে ইংরেজিতে চিঠি লিখত না।

এদিকে পেনক্র্যাফট নৌকো ঘুরিয়ে ক্ল অন্তরীপের দিকে নিয়ে চলল। সবার মনেই এবার টেবর আইল্যাণ্ডের লোকটির কথা তোলপাড় করছে। ঈশ্বরের অনুগ্রহে লোকটি বেঁচে থাকতে থাকতেই সেখানে পৌঁছতে পারলে হয়। ক্ল অন্তরীপে ঘুরে বেলা বারোটার সময় বন-অ্যাডভেনচার মার্সি নদীর মুখে এসে নোঙর ফেলল।

সেদিন সন্ধের আগেই যাত্রার সমস্ত আয়োজন ঠিক হয়ে গেল। পরদিন এগারোই। অক্টোবর রওনা হলে অনুকূল হাওয়ার সাহায্যে টেবর আইল্যাণ্ডে পৌঁছুতে আটচল্লিশ ঘণ্টার বেশি লাগবে না। দ্বীপে একদিন থাকতে হবে, ফিরে আসতে আরো তিন-চার দিন; তাহলে সতেরোই নাগাদ লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে ফিরে আসা যাবে। হার্ডিং আর স্পিলেট নেবকে নিয়ে ততদিন গ্র্যানাইট  হাউসে কাটাবেন।

এই ব্যবস্থায় কিন্তু স্পিলেট তুমুল আপত্তি করলেন। বললেন : আমি নিউইয়র্ক হেরাল্ডের নিজস্ব প্রতিনিধি। এমন খাশা সুযোগটা কি আমি ছাড়তে পারি? আমিও পেনক্র্যাফটের সঙ্গে যাবে। যদি দরকার হয়, তবে সাঁৎরে যেতে হলেও যাবো।

এ-কথার আর কী উত্তর দেয়া যায়! বাধ্য হয়ে হার্ডিং স্পিলেটকেও যেতে দিলেন।

পরদিন ভোরবেলা বন-অ্যাডভেনচার তিনজন যাত্রী নিয়ে টেবর আইল্যাণ্ড অভিমুখে চলল।

প্রায় সিকি মাইল যাওয়ার পর যাত্রীরা ফিরে তাকিয়ে দেখলে, গ্র্যানাইট  হাউসের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে হার্ডিং আর নেব টুপি ও রুমাল উড়িয়ে তখনও শুভযাত্রা জানাচ্ছেন। পেনক্র্যাফট, হার্বার্ট আর শিলেট রুমাল উড়িয়ে তার উত্তর দিতে লাগলো। তারপর দেখতে-দেখতে ক্ল অন্তরীপের উঁচু পাহাড়ের আড়ালে গ্র্যানাইট  হাউস অদৃশ্য হয়ে গেল। দিনের গোড়ার দিকে অনেক দূর থেকে লিঙ্কন আইল্যাণ্ড দেখা যাচ্ছিল যেন সবুজ রঙের একটা ঝুড়ি, আর তার মধ্যিখানে মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন। বিকেলের দিকে লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের আর-কোনো চিহ্নই দেখা গেল না।

প্রসন্ন মৃদু হাওয়ায় ঢেউয়ের উপর দিয়ে নাচতে-নাচতে বন-অ্যাডভেনচার চলল।

পেনক্র্যাফটের মনে তো আনন্দ আর ধরে না! কখনো-বা হালের ভার হার্বার্টকে দিয়ে সে স্পিলেটের সঙ্গে গল্প করতে লাগল। এমনি করে সারাদিন কেটে গেল, তারপর নেমে এল অন্ধকার রাত্রি। রাত্রি অন্ধকার হলেও আকাশ বেশ পরিষ্কার-অগুনতি তারার আলোয় কম্পাসের সাহায্যে অবিরাম এগিয়ে চলল বন-অ্যাডভেনচার।

নিরাপদেই রাতটা কেটে গেল। পরের দিনটাও ভালোয়-ভালোয় কাটল। হিশেব করে দেখা গেল, ততক্ষণে বন-অ্যাডভেনচার লিঙ্কন আইল্যাণ্ড থেকে প্রায় একশো মাইল পথ এসেছে। হিশেব ঠিক হয়ে থাকলে আর বন-অ্যাডভেনচার ঠিক পথে এসে থাকলে, পরদিন ভোরবেলা টেবর আইল্যা নজরে পড়ার কথা। সে-রাত্রে আর কারু ঘুম এলো না। দারুণ উদ্বেগে কাটল রাত ভোরবেলা টেবর আইল্যাণ্ড দেখা যাবে কি? পরিত্যক্ত লোকটি কি এখনও দ্বীপেই আছে? এক কারাগার ছেড়ে অন্য কারাগারে যেতে কি সে রাজি হবে? এইসব ভাবনা তোলপাড় করতে লাগল মনে, তাই রাত্রি কাটল অতন্দ্র।

ভোরবেলা ছ-টার সময় পেনক্র্যাফট চেঁচিয়ে উঠল : ঐ-যে ডাঙা! ঐ দূরে তার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে!

পেনক্র্যাফটের মতন অভিজ্ঞ নাবিকের পক্ষে ভুল হওয়া অসম্ভব। ডাঙার দেখা পেয়ে তাদের আর আনন্দের সীমা রইল না। আর ঘণ্টা-কয়েক বাদেই টেবর আইল্যাণ্ডে নামা যাবে। আস্তে আস্তে সত্যিই টেবর আইল্যাণ্ডের তীররেখা স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। আর মাইল-পনেরো দূরেই দ্বীপ। সামনের দিকে এগিয়ে চলল নৌকো।

বেলা এগারোটার সময় বন-অ্যাডভেনচার দ্বীপ থেকে মাত্র দু-মাইল দূরে এসে পৌঁছুল। পেনক্রাফট এবার খুব সতর্ক হয়ে আস্তে-আস্তে অগ্রসর হতে লাগল। অজানা পথ জলের নিচে হঠাৎ কোনো কিছুতে ঘা খেয়ে নৌকোর বিপদ হতে পারে তো। ছোটো দ্বীপটা আস্তে আস্তে চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। দ্বীপের গাছপালা অনেকটা লিঙ্কন আইল্যান্ডের মতোই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, গোটা দ্বীপে কোথাও কোনো ধোঁয়া দেখতে পাওয়া গেল না, কিংবা মানুষের অস্তিত্বের কোনো চিহ্নও দেখা গেল না। কিন্তু বোতলের কাগজটুকুতে পরিষ্কার লেখা ছিল, পরিত্যক্ত ব্যক্তি, টেবর আইল্যাণ্ড। লোকটির উচিত ছিল সমুদ্র, তীরে নজর রাখা, তার উদ্ধারের জন্যে কেউ আসে কি না।

বেলা বারোটার সময় বন-অ্যাডভেনচার-এর তলা টেবর আইল্যান্ডের বালিতে আটকে গেল। নোঙর ফেলে সবাই তীরে নামলেন। তীর থেকে আধ মাইল দূরে প্রায় তিনশো ফুট উঁচু একটা পাহাড়। তার উপর থেকে গোটা দ্বীপটা স্পষ্ট দেখা যাবে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সবাই সেদিকে এগুলেন।

পাহাড়টার নিচে পৌঁছুনোর পর তার চুড়োয় উঠতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগল না। উঠে দেখা গেল, দ্বীপটা ছোটো; পরিধি ছ-মাইলের বেশি হবে না। পাহাড়-পর্বত, নদীনালা ইত্যাদি লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের মতো তেমন-কিছুই নেই, সমতল ভূমি ও বনসমেত একটা দ্বীপ, আর ডিমের মতো তার আকৃতি। চারদিক দেখে-শুনে পেনক্র্যাফট বললে : চলুন, নেমে গিয়ে ভালো করে খোঁজা যাক।

সবাই বন-অ্যাডভেনচার-এর কাছে ফিরে এসে ঠিক করলেন, গোড়ায় দ্বীপটার চারদিক ঘুরে দেখবেন, তারপর ভিতরে ঢুকে খবর নেয়া যাবে। সমুদ্রের তীর ধরে চলাই সুবিধে। মধ্যে-মধ্যে ছোটো ছোটো পাহাড় পড়ল সামনে, কিন্তু তাতে চলার কোনো ব্যাঘাত হল না।

সবাই দক্ষিণ দিকে চললেন। পথে দলে-দলে সামুদ্রিক পাখি আর সীল তাদের দেখেই ছুটে পালাতে লাগল। তাতে মনে হল ইতিপূর্বে এরা মানুষ দেখেছে, সেইজন্যেই তাদের দেখে ভয়ে পলায়ন করল। এক ঘণ্টা চলে যাত্রীরা দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে উপস্থিত হলেন। এইভাবে চার ঘণ্টা চলবার পর দ্বীপের চারদিক ঘুরে দেখা গেল। কিন্তু জনমানবের কোনো চিহ্নই দেখা গেল না। মনে হল টেবর আইল্যাণ্ডে যেন কোনোকালে মানুষ আসেনি, কিংবা এসে থাকলেও সে এখন অন্যত্র প্রস্থান করেছে। হয়তো-বা বোতলটা অনেকদিন ধরেই জলে ভাসছিল, ইতিমধ্যে সেই ব্যক্তি কোনো উপায়ে দেশে ফিরে গেছে, কিংবা অনেক কষ্টভোগের পর লোকান্তরিত হয়েছে।

এরপর বন-অ্যাডভেনচারে ফিরে সবাই খাওয়া-দাওয়া করলেন। তারপর বিকেল পাঁচটার সময় চললেন দ্বীপের অভ্যন্তরটায় সন্ধান করবার জন্যে। তাদের দেখে বনের জানোয়াররা সশব্দে পালাতে লাগল। তার মধ্যে বেশির ভাগই ছাগল আর শুয়োর। আগে কোনো সময়ে যে টেবর আইল্যাণ্ডে মানুষ এসেছিল, সে-বিষয়ে আর সন্দেহ রইল না। বনের মধ্যে মানুষের চলাফেরার পথের চিহ্ন পর্যন্ত দেখা গেল! মধ্যে-মধ্যে বড়ো-বড়ো গাছ পড়ে আছে—পরিষ্কার দেখা গেল কুড়ুল দিয়ে কাটা।

স্পিলেট বললেন : এ-সব দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, মানুষ যে শুধু এখানে এসেছিল তা-ই নয়, কিছুকাল এখানে বাসও করেছে। কিন্তু এখন কথা হচ্ছে-এরা কারা? এদের কেউ কি এখনও দ্বীপে আছে?

হার্বার্ট বললে : বোতলের কাগজে লেখা ছিল : একজন এই দ্বীপে আছে।

সে-লোক যদি এখনও এখানে থেকে থাকে, বললে পেনক্র্যাফট : তবে নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে বার করতে পারব।

দ্বীপের ঠিক মাঝখান দিয়ে কোনাকুনিভাবে একটা পথ গেছে। সে-পথে একটা নদীর তীর বেয়ে চললেন সবাই। নদীটা গিয়ে পড়েছে সীমাহারা নীলকান্ত সমুদ্রে। মধ্যে-মধ্যে খোলামেলা জায়গা দেখা গেল। কে যেন কোনোদিন শাক-সজির চাষ করেছিল।

হার্বার্ট চিনতে পারলে : বাঁধাকপি, গাজর, টারনিপ প্রভৃতির চাষ করা হয়েছিল। এদের বীজ লিঙ্কন আইল্যান্ডে নিয়ে যেতে হবে।

স্পিলেট বললেন : তা না-হয় নেয়া যাবে। কিন্তু চাষের অবস্থা দেশে তো মনে হয়, সে-লোক বেশিদিন এখানে থাকেনি। তা নইলে এ এমনভাবে নষ্ট হয়ে যেতো না। আমার মনে হয় সেই লোক চলে গেছে। বোতলটা বোধহয় সেই কাগজটুকু নিয়ে অনেকদিন সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

সন্ধে হয়ে গেছে দেখে সবাই ফিরবার উদ্যোগ করলেন। এমন সময় হঠাৎ হার্বার্ট বলে উঠল : ওই দেখুন, গাছের ফাঁক দিয়ে একটা কুঁড়েঘর দেখা যাচ্ছে!

সবাই, তখন সেদিকে ছুটলেন। গিয়ে দেখা গেল, ঘরটা কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি, চালটা মোটা টাপলিনের। ঘরটার দরজা অর্ধেক ভেজানো ছিল। পেনক্র্যাফট ঠেলে ভিতরে ঢুকল। ঢুকে দেখল, ঘরটা খালি।

হাবার্ট, পেনক্র্যাফট, আর স্পিলেট সেই অন্ধকার ঘরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন।

খানিকক্ষণ পরে চেঁচিয়ে ডাকলে পেনক্র্যাফট : কে আছো?

কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।

পেনক্র্যাফট আগুন জ্বাললে। এবার সব স্পষ্ট দেখা গেল। শূন্য ছোট্ট একটা ঘর, তার পেছনের দিকে একটা চুল্লি, কিছু সাঁৎসেঁতে কয়লা, আর একবোঝা কাঠ পড়ে আছে। কাছে। ঘরে একটা বিছানাও আছে। কিন্তু স্যাৎসেঁতে, হলদে চাদর দেখে মনে হল, সেবিছানা অনেকদিন ধরে কেউ ব্যবহার করেনি। চুল্লির এককোণে দুটো কেটলি পড়ে আছে; জং ধরে গেছে তাতে। একটা র্যাকের উপর নাবিকের জীর্ণ, ময়লা কামিজ। একটা টেবিলের উপর একটা টিনের প্লেট আর একটি বাইবেল। ঘরের এককোণে কিছু যন্ত্রপাতি, কোদাল, কুড়ল, আর দুটো বন্দুক। একটা বন্দুক আবার ভাঙা। দেয়ালের গায়ে তক্তার তাক। সেই তাকে একপিপে বারুদ, একপিপে গুলি আর অনেকগুলো ক্যাপের বাক সব ধূলিধূসর।

পেনক্র্যাফট বললে, ঘর তো খালি। আর, অনেকদিন ধরে কেউ এখানে বাস করেনি বলেই মনে হচ্ছে। আমি বলি, নৌকোয় ফিরে না গিয়ে আজ রাতটা এখানেই কাটানো যাক।

স্পিলেট বললেন : ঠিক বলেছো। ঘরের মালিক যদি ফিরে আসে, তবে হয়তো আমাদের দেখে দুঃখিত হবে না।

মালিক আর ফিরে আসবে না, বললে পেনক্র্যাফট : এই দ্বীপ ছেড়েও সে চলে যায়নি। দ্বীপ ছেড়ে চলে গেলে কি সে তার অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি সব ফেলে যেতো? জাহাজড়ুবির লোকদের কাছে এ-সব জিনিশ যে কী-রকম মূল্যবান, সেটা তো বুঝতে পারছেন। সে-যে দ্বীপ ছেড়ে চলে যায়নি, সে-বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। কিন্তু এ–ঘরে আর ফিরে আসবে কি না, সে-বিষয়ে সন্দেহ আছে। হয়তো মারা গেছে। যদি মারা গিয়ে থাকে, তবে শরীরটা তো আর সে নিজে কবর দেয়নি, তার চিহ্ন কিছু-না-কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে।

সেই রাত্রে ঘরের ভিতর আগুন জ্বালিয়ে তিনজনে বসে রইলেন। বলা যায় না, লোকটি যে-কোনো একসময়ে এসে হাজির হতে পারে। রাত ভোর হয়ে এলো, কিন্তু ঘরের দরজাও কেউ খুলল না, বাইরেও কারু সাড়াশব্দও পাওয়া গেল না। সবাই ঠিক করলেন, রাত ভোর। হলেই আবার খুঁজতে বেরুবেন। লোকটির মৃতদেহের কোনো চিহ্ন পাওয়া গেলে তা কবর দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।

ভোর হলে ওঁরা তিনজনে প্রথমে বাড়ির বাগান, মাঠ ইত্যাদি ঘুরে দেখলেনবাড়ির সামনে মাঠ, তারপর নীলের উচ্ছ্বাস। একটা পাহাড়ের নিচে বড়ো-বড়ো কতগুলো গাছের মধ্যিখানে কুটিরটা। জায়গাটা ভারি সুন্দর। বাড়ির সামনের মাঠের চারদিকে কাঠের বেড়া। এখন অবিশ্যি সব ভেঙে-চুরে গেছে। এই বেড়ার একটু দূরেই সমুদ্র। বেড়ার বাঁ দিকে সেই সমুদ্রের মুখ। ঘরটার কাঠ, ও—সবই কোনো জাহাজ থেকে নেয়া। সম্ভবত দ্বীপের কাছাকাছি কোনো জাহাজ ড়ুবেছিল, তারই তত্তা দিয়ে এই লোকটি ঘর তৈরি করেছিল। স্পিলেট দেখতে পেলেন একটা তক্তার অস্পষ্টভাবে লেখা : Br-tan-ia—অর্থাৎ জাহাজটির নাম ছিল Britannia (ব্রিটানিয়া), কয়েকটা হরফ একেবারে উঠে গেছে। এরপর তিন জনে বন-অ্যাডভেনচারে ফিরে এসে খাওয়া-দাওয়া করলেন। একটু বেশিই খেয়ে নিলেন। সারাদিন ঘোরাঘুরিতে কাটিয়ে আবার কখন খাওয়ার সুবিধে হবে, কে জানে! আহারের পর তন্নতন্ন করে দ্বীপের অর্ধেকের বেশি খুঁজে দেখা হল, কিন্তু কোথাও কারু কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না।

তবে কি লোকটি মরে গেছে, আর বুনো জানোয়ারে তার শরীরটা খেয়ে ফেলেছে? একেবারে হাড়-টাড় সমেত!

পেনক্র্যাফট বললে : খুঁজে আর কী লাভ? আমরা তাহলে কাল সকালেই ফিরে যাবো।

বেলা দুটোর সময় একটা গাছের নিচে বসে জিরোতে-জিরোতে পরামর্শ করলেন তিনজনে।

যাওয়ার সময়, বললে হার্বার্ট : পরিত্যক্ত ব্যক্তির বাসনকোশন, যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র সবই নিয়ে যাবো। দু-একটা শুয়োর আর ছাগলও ধরে নিয়ে যেতে হবে।

ঠিক বলেছো, বললেন স্পিলেট : কিন্তু তাহলে তা আরো-একদিন টেবর আইল্যাণ্ডে থাকা দরকার।

না, বললে পেনক্র্যাফট : আমরা কাল ভোরেই রওনা হবো। মনে হচ্ছে শিগগিরই পশ্চিমের হাওয়া শুরু হবে। আসার সময় নিরাপদে এসেছি, যাবার বেলায়ও তা-ই চাই। হার্বার্ট, তুমি তাহলে এখুনি গিয়ে শাক-সজির বীজ যা পাও জোগাড় করে নাও। আমি আর মিস্টার স্পিলেট চেষ্টা করে দেখি দু-একটা শুয়োর ধরতে পারি কি না।

তক্ষুনি খেতের দিকে গেল হার্বার্ট, পেনক্র্যাফট আর স্পিলেট গেলেন বনের দিকে। ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর একটা ঝোঁপের মধ্যে দুটো শুয়োর পাকড়াও করলেন স্পিলেটরা। এমন সময় উত্তর দিকে একটা আর্ত চীৎকার শোনা গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল ভীষণ একটা গর্জন।

কী সর্বনাশ। এ-যে হার্বার্টের চীৎকার!

উর্ধ্বশ্বাসে ছুটলেন দুজনে। পথটার বাঁক ফিরেই দেখলেন, সামনে একটা ভোলা জায়গায় হার্বার্ট মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে, আর তার বুকের উপরে ঠিক মানুষের মতো দেখতে ভীষণ-একটা হিংস্র জন্তু বসে তাকে আঘাত করবার চেষ্টা করছে। পলকের মধ্যে ছুটে গিয়ে হার্বার্টকে মুক্ত করে সেই হিংস্র জন্তুটাকে ওঁরা বেঁধে ফেললেন। ভালো করে তাকিয়ে দেখা গেল, আততায়ী পশু নয়, একজন মানুষ; কিন্তু এমন ভীষণ বুনো আর হিংস্র চেহারার মানুষ কল্পনাও করা যায় না। ঠিক সময়ে মুক্ত করতে না-পারলে হার্বার্ট নির্ঘাৎ মারা পড়তো তার হাতে।

স্পিলেট বললেন : নিঃসন্দেহে এই লোকটিই টেবর আইল্যাণ্ডের পরিত্যক্ত ব্যক্তি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এর মধ্যে এখন আর মনুষ্যত্ব বলে কিছু নেই। আকারে-প্রকারে লোকটি

একেবারে জানোয়ার হয়ে গেছে।

স্পিলেট মিথ্যে বলেননি। নির্জনে একলা বাস করবার দরুন সত্যিই লোকটির মনুষ্যত্ব একেবারে লোপ পেয়েছে। মুখ দিয়ে কথার বদলে শুধু ভাঙা-ভাঙা আওয়াজ বেরোয়। দাঁতগুলো প্রায় মাংস-খেকো হিংস্র জানোয়ারের মত ছুঁচলো। তার স্মৃতিশক্তি লুপ্ত। নিজের অস্ত্রশস্ত্র যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবারও ক্ষমতা নেই। কী করে আগুন জ্বালাতে হয়, তা পর্যন্ত ভুলে গেছে। স্পিলেট তাকে উদ্দেশ করে কথা বললেন, কিন্তু সে-যে কিছু বুঝেছে এমনটা মনে হল না। শুনতে পেলো কি না সে-বিষয়েও সন্দেহ। কিন্তু স্পিলেট তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, তার জ্ঞান একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। চুপ করে বাঁধনে পড়ে আছে, দাঁড়ানোর কোনো চেষ্টা নেই। তবে কি বহুকাল পরে তারই মতো মানুষ দেখে স্মৃতিশক্তি ফিরে এসেছে? কে জানে।

স্পিলেট অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বললেন : লোকটি যে-ই হোক, আর ভবিষ্যতে এর অবস্থা যা-ই হোক না কেন, একে লিঙ্কন আইল্যান্ডে নিয়ে যেতেই হবে।

নিয়ে তো যেতে হবেই, বললে হাবার্ট : আর আমার বিশ্বাস, ঠিক মতো শুশৃষা হলে এর বুদ্ধিশুদ্ধিও সব ফিরে আসবে।

স্পিলেট সে-কথায় সায় দিলেন : আমারও তা-ই বিশ্বাস। কিন্তু একে এখন নৌকোয় নিয়ে যেতে হবে। আমার মনে হয়, এর পায়ের বঁধন খুলে দিলে বোধহয় এখন আমাদের সঙ্গে হেঁটেই যেতে পারবে।

কয়েদির হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয়ার পর সে নিজেই উঠে দাঁড়ালে। পালাবার কোনো চেষ্টা করলে না। ওঁদের সঙ্গে সঙ্গেই চলল। মাঝে-মাঝে তীক্ষ্ণ চোখে ওঁদের পানে তাকালে। কিন্তু সে যে ওঁদের মানুষ বলে চিনতে পেরেছে, এমনটা বোঝা গেল না।

পিলেটের কথামতো প্রথমে তাকে সেই ঘরে নিয়ে যাওয়া হলনিজের জিনিশপত্র দেখে যদি তার স্মৃতিশক্তি ফিরে আসে। কিন্তু তার স্মৃতি ফিরে এলো না। মনে হল, সে যেন সবকিছুই ভুলে গেছে। স্পিলেট ভাবলেন, হয়তো আগুন দেখলে তার মনে কোনো স্মৃতি জাগতে পারে। আগুন জ্বালানোর পর পলকের জন্যে তার দৃষ্টি সেদিকে গেল বটে, কিন্তু পরক্ষণেই সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলে।

কী আর করা যায়? এবার তাকে বন-অ্যাডভেনচারে নিয়ে-যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। নৌকোয় যাওয়ার পর তাকে পেনক্র্যাফটের পাহারায় রেখে স্পিলেট আর হার্বার্ট তাদের কাজগুলো শেষ করতে গেলেন।

কয়েক ঘণ্টা বাদেই তারা বাসনকোশন, অস্ত্রশস্ত্র আর একরাশ শাকসজি আর বীজ, আর দু-জোড়া শুয়োর নিয়ে ফিরে এলেন। জিনিশপত্র সবই ব-অ্যাডভেনচারে তোলা হল।

ভোরবেলা জোয়ার এলেই নৌকো ছেড়ে দেয়া হবে। কয়েদিকে রাখা হল সামনের ক্যাবিনে। সে কালা-বোবার মতো চুপচাপ রইল সবসময়। পেনক্র্যাফট তাকে খেতে দিলে সে অপছন্দের ভঙ্গিতে রান্না-করা খাবার সব ঠেলে সরিয়ে দিলে। হার্বার্ট কতকগুলো হাঁস শিকার করে এনেছিল। পেনক্র্যাফট একটা হাঁস তার সামনে ধরবার সঙ্গে-সঙ্গেই বুনো বেড়ালের মতো ছোঁ মেরে হাঁসটা নিয়ে কাঁচাই খেয়ে ফেলল।

পেনক্র্যাফট বললে : না, আর-কখনও এর জ্ঞান ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়! তবে, অবিশ্যি নির্জন-বাসের জনেই বেচারির এমনধারা দুরবস্থা হয়েছে। তাই আমাদের সঙ্গে থেকে, আমাদের সেবা-যত্নে, খানিকটা বদল হওয়া বিচিত্র নয়।

রাত কেটে গেল। রাত্রে লোকটি ঘুমিয়েছিল কি না বলা যায় না। তবে তার বাঁধন খুলে দেয়া সত্ত্বেও সে আর নড়াচড়া করেনি। বুনো জানোয়ারকে প্রথমে ধরলে সে যেমন হতবুদ্ধি হয়ে যায়, লোকটির অবস্থাও বোধহয় তেমনি হয়েছে।

পনেরোই অক্টোবর ভোর পাঁচটার সময় বন্অ্যাডভেনচার ছেড়ে দেয়া হল। পাল তুলে দিয়ে পেনক্র্যাফট উত্তর-পুব দিকে নৌকো চালালে। এবার সোজা লিঙ্কন আইল্যাণ্ড।

প্রথম দিন বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটল না, কিন্তু পরদিন হাওয়ার বেগ খানিকটা বেড়ে যেতে সবাই একটু ভাবনায় পড়লেন। সমুদ্র ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠল। লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে পৌঁছুতে দেরি হতে পারে। পেনক্র্যাফটের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল বটে, কিন্তু সে এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করলে না।

সতেরোই অক্টোবর ভোরবেলা আটচল্লিশ ঘণ্টা কেটে গেল। কিন্তু তবুও মনে হল নৌকো লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের কাছাকাছি এসেছে। আরো চব্বিশ ঘণ্টা লাগল। কিন্তু তবু ভাঙার দেখা পাওয়া গেল না। সমুদ্র ক্রমেই উথাল-পাথাল হয়ে উঠতে লাগল। বাড়তে লাগল বাতাসের বেগও। আঠারো তারিখে একটা উত্তাল ঢেউ নৌকোর উপর বেগে এসে আছড়ে পড়ল। যাত্রীরা সবাই আগে থেকে সতর্ক না-হলে সেই ঢেউ সকলকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতো।

তারপর ক্রমশ গুরুতর হয়ে উঠল সবার অবস্থা। পেন্যাফটের ভয় হল, বিশাল বিরাট সীমাহারা সমুদে দিগভ্রান্ত হয়ে বুঝি-বা লিঙ্কন আইল্যান্ডে আর পৌঁছুনো গেল না।

তারপর আস্তে-আস্তে নেমে এলো নিদারুণ অন্ধকার রাত্রি বইতে লাগল উত্তাল হিমেল বাতাস। কিন্তু রাত এগারোটার সময় সৌভাগ্যবশত বাতাসের বেগ কমে গেল। আবার শান্ত হল অশান্ত সমুদ্র। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুততর হল নৌকোর গতি।

পলকের জন্যেও চোখ বুজলেন না কেউ। উদ্বেগে, দুশ্চিন্তায় আলোড়িত হতে লাগল মন! হয়তো কাছেই লিঙ্কন আইল্যাণ্ড-হয়তো ভোরবেলাতেই দেখা যাবে শ্যামলবরণ তীর। কিন্তু তা যদি না-হয়, তবে হয়তো হাওয়ার টানে বন-অ্যাডভেনচার এত দূরে চলে যাবে যে, আবার ঠিক পথে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে। সকলের চাইতে আলোড়িত হল পেনক্র্যাফটের মন। কিন্তু তবু হাল ছাড়লে সে। হাল ধরে গভীর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

রাত তখন প্রায় দুটো হবে, হঠাৎ পেনক্র্যাট চেঁচিয়ে উঠল : আলো! ওই যে আলো!

সত্যিই দেখা গেল আলোর উজ্জ্বল রেখা। উত্তর-পুব দিকে প্রায় কুড়ি মাইল দূরে উজ্জ্বল একটি আলোক-স্পন্দন আকাশের তারার মতো জ্বলছে। ওইদিকেই লিঙ্কন আইল্যাণ্ড!

নিশ্চয়ই সাইরাস হার্ডিং আলো জ্বালিয়েছেন, যাতে যাত্রীদল অন্ধকার রাত্রে ওই আলো দেখে পথের সন্ধান করতে সক্ষম হন। পেনক্র্যাফট উত্তর দিকে অনেকটা চলে গিয়েছিল। এবার আলো লক্ষ্য করে নৌকো চালিয়ে দিলে।

আর-কোনো ভয় নেই।

.

২.৭ রহস্য-লিপি

পরদিন বিশে অক্টোবর। চারদিনের দিন সকাল সাতটার সময় মার্সি নদীর মুখের কাছে এসে নোঙর ফেলল বন-অ্যাডভেনচার। এদিকে সাইরাস হার্ডিং আর নেব এই বিষম দুর্যোগ, আর সঙ্গীদের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে উদ্বিগ্ন মনে সকালবেলাই প্রসপেক্ট হাইটে উঠে দেখছিলেন। এমন সময় দূরে বন-অ্যাডভেনচারকে দেখে হার্ডিং বললেন : এই-যে ওরা এসে পড়েছে।

বন-অ্যাডভেনচার-এর ডেকের উপরের লোক শুনে হার্ডিং প্রথমে মনে করেছিলেন যে, টেবর আইল্যাণ্ডের সেই লোকটিকে পাওয়া যায়নি, কিংবা পাওয়া গেলেও সে টেবর আইল্যাণ্ড ছেড়ে আসতে রাজি হয়নি। নৌকো তীরে ভেড়বার আগেই হার্ডিং নেবকে নিয়ে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ওদের দেখেই শুধোলেন : তোমাদের এত দেরি দেখে আমরা ভারি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কোনোরকম মুশকিলে পড়তে হয়নি তো? হ্যাঁ, ভালো কথা। তোমরা যে-কাজে গিয়েছিলে, তা দেখছি নিস্ফল হয়েছে। চতুর্থ ব্যক্তিটিকে তো দেখতে পাচ্ছি না।

না ক্যাপ্টেন, বললে পেনক্র্যাফট : আমরা চারজনই আছি।

পরিত্যক্ত লোকটিকে তাহলে খুঁজে পেয়েছ?

হ্যাঁ, একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।

কোথায় সে? প্রশ্ন করলেন হার্ডিং : লোকটি কে?

লোকটি যে কে, তা বলা ভারি মুশকিল, বললেন স্পিলেট : একদা আমাদেরই মতো মানুষ ছিল বটে, তবে এখন আর তা নেই। এই বলে স্পিলেট সবকিছু হার্ডিংকে খুলে বললেন। এখন যে লোকটিকে আর মানুষ বলা যায় না, তাও স্পিলেট বললেন।

তারপর পেনক্র্যাফট বললে : সত্যি ক্যাপ্টেন, আমার তো মনে হচ্ছে যে লোকটিকে এখানে এনে ভালো কাজ হয়নি।

তা কেন বলছো? বললেন হার্ডিং: তাকে এনে যে ভালো করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন হয়তো ওর বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারে লোপ পেয়েছে, কিন্তু মাস-কয়েক আগেও তো সে ঠিক আমাদেরই মতো মানুষ ছিল। নির্জন-বাসের মতো অভিশপ্ত জীবন আর-কিছুই নেই।

স্পিলেট বললেন : মাসকয়েক আগে যে ওর জ্ঞান ছিল, তা কী করে বুঝবো? বোতলের চিঠিটা হয়তো ওর কোনো সঙ্গী লিখে থাকবে।

অসম্ভব! ঘাড় নাড়লেন হার্ডিং : তাহলে চিঠিতে নিশ্চয়ই দুজনের কথা লেখা থাকতো।

এরপর লোকটিকে ক্যাবিন থেকে তীরে নিয়ে আসা হল। তার চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেলেন হার্ডিং। লোকটির মুখ দেখে মনে হল, যেন তার মনে পালানোর ইচ্ছে জেগেছে। হার্ডিং তার দিকে এগিয়ে তার কাঁধে হাত দিলেন। তার উজ্জ্বল মুখ আর করুণ চোখ দেখে লোকটি তক্ষুনি মাথা নিচু করলে। তার অস্থিরতা অদৃশ্য হল। পলায়নের ইচ্ছে পর্যন্ত দূর হয়ে গেল।

মনোযোগ দিয়ে কিছুক্ষণ লোকটিকে দেখলেন হার্ডিং। বুঝতে পারলেন, সত্যিই তার মানবিকতা অন্তর্হিত হয়েছে। কিন্তু তবু তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, তার চোখে যে-আলো তখনও জ্বলছে সে-আলো মনুষ্যত্বের। সেবায়-যত্নে এর মনুষ্যত্ব ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হবে না। তখন ঠিক করা হল, তাকে গ্র্যানাইট  হাউসের একটা ঘরে রাখা হবে, যেখান থেকে পালানোর কোনো সম্ভাবনা নেই।

তাকে গ্যানাইট হাউসে নিয়ে যেতে কোনো মুশকিল হল না।

স্পিলেট, পেনক্র্যাফট আর হার্বার্টের খুব খিদে পেয়েছিল। নেব তাড়াতাড়ি আহারের ব্যবস্থা করল। সবাই আহার করতে বসলেন

আহারের সময় হার্ডিং ওদের অ্যাডভেনচারের সব কথা শুনলেন। সবাই আন্দাজ করলেন, লোকটি হয় মার্কিন, নয় তো ইংরেজ। সেই ব্রিটানিয়া জাহাজের নামটিতেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তার চেহারা দেখেও তা-ই মনে হয়।

হঠাৎ হার্ডিং জিগেস করলেন তা, তোমার সঙ্গে কী করে লোকটির দেখা হল, হার্বার্ট?

কী করে দেখা হয়েছিল, তা ঠিক বলতে পারছি না। বললে হার্বার্ট : আমি গাছগাছড়া, শাকসজি সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলুম, এমন সময় হঠাৎ শুনতে পেলুম, কাছেই খুব উঁচু একটা গাছ থেকে সাঁৎ করে যেন কী একটা নেমে এলো। বোধহয় এই লোকটিই গাছের উপরে লুকিয়ে ছিল। তীরের মতো নেমে এসে হঠাৎ কখন আমার উপর পড়ল, তা বোঝবারও সময় পেলুম না। মিস্টার স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট যদি সে-সময়

হার্বার্টের কথা শেষ না-হতেই হার্ডিং বললেন, তুমি তাহলে জবর বিপদে পড়েছিলে বলো! তবে এ-কথা ঠিক যে, তোমার এই বিপদটি না-হলে লোকটি হয়তো এখনও লুকিয়েই থাকতো; টেবর আইল্যাণ্ড থেকে নতুন সঙ্গীটিকে তোমাদের আর আনা হত না।

আহারের পর সবাই সমুদ্রতীরে গেলেন। নৌকোর জিনিশপত্র সবই যথাস্থানে রেখে দেয়া হল। শুয়োরগুলি গেল খোঁয়াড়ে। বারুদের পিপে, গুলির বাক্স ইত্যাদি সযত্নে রেখে দেয়া হল। এবার বন-অ্যাডভেনচারকেও একটা নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে।

হার্ডিং বললেন : নৌকোটা মার্সি নদীর মুখে রেখে দিলে হয় না?

পেনক্র্যাফট আপত্তি জানালে : না ক্যাপ্টেন, মার্সি নদীর মুখে বেশি সময় বালির মধ্যে পড়ে থাকবে, তাতে নৌকোর কাঠ নষ্ট হতে পারে। আমার ইচ্ছে, আপাতত ওটাকে পোর্ট বেলুনে রেখে দিই।

তবে সেখানেই রাখো, বললেন হার্ডিং : কিন্তু আমার মনে হয় ওটাকে চোখের সামনে কোনো জায়গায় রাখতে পারলেই ভালো হয়। যাক, পরে সুবিধেমতো ব-অ্যাডভেনচারের জন্যে একটা বন্দর বানাতে হবে।

কিছুদিনের মধ্যেই আগন্তুকের ভালোর দিকেই বেশ-একটু পরিবর্তন দেখা গেল। এত শিগগির পরিবর্তন দেখা যাওয়ায় বোঝা গেল যে তার জ্ঞান একেবারে লোপ পেয়েছে বলে সকলে আগে যে-ধারণা করেছিলেন, তা ভুল। টেবর আইল্যান্ডে খোলা হাওয়ায় স্বাধীনভাবে সে ঘুরে বেড়াতো। তাই গ্র্যানাইট  হাউসে বন্ধ থেকে সে প্রথমটা বিরক্ত মুখে বসে থাকতো। সবাই ভয় করতেন, পাছে সে গ্র্যানাইট  হাউসের জানলা দিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়ে। ক্রমশ তার সেই বিরক্তি দূর হল। তখন তাকে চলাফেরা সম্পর্কে একটু স্বাধীনতা দেয়া হল। বুনো জানোয়ারের মতো কঁচা মাংস সে আর খায় না। রান্না করা খাবার দিলে দ্বিরুক্তি না-করে গ্রহণ করে। একদিন যখন ঘুমিয়েছে, তখন হার্ডিং তার চুল-দাড়ি কেটে দিলেন। তার পোশাকও বদলে দেয়া হল। এখন তার মুখের ভাব বেশ স্নিগ্ধ হয়েছে। এবং পোশাক পরাবার পর আর তার হিংস্র চেহারার বিন্দুমাত্র চিহ্ন রইল না।

প্রত্যহ হার্ডিং তার সঙ্গে একটু সময় কাটাতেন। তার কাছে বসে তার দৃষ্টি আকর্ষণ। করবার জন্যে নানান ধরনের কাজ করা হত। চেঁচিয়ে কথা বলতেন সবাই। উঁচু গলায় আলোচনা করতেন নৌ-বিদ্যা-যে-সব কথা শুনলে নাবিক-মাত্রেরই কৌতূহল জাগে, সেসব কথা প্রায়ই আলোচনা করা হত। কখনো-কখনো লোকটি তাঁদের কথাবার্তায় মনোযোগ দিতো। স্পষ্টই বোঝা যেতো যে সে কিছু-কিছু বুঝতে পারছে। মধ্যে-মধ্যে তার মুখে ফুটে উঠতো বিষাদের ছাপ। এ ছাড়া সবসময়েই সে থাকতো গম্ভীর হয়ে। আস্তে-আস্তে হার্ডিংএর প্রতি তার আকর্ষণ জেগেছে বলে বোঝা গেল। হার্ডিং ভাবলেন তাকে একবার বনের কাছে নিয়ে যাবেন-দৃশ্যপট বদলের সঙ্গে সঙ্গে যদি তার ভাবের পরিবর্তন হয়।

স্পিলেট কিন্তু এ-কথায় আপত্তি জানালেন। বললেন : স্বাধীনতা পেলে যদি পালিয়ে যায়?

তাহলেও, হার্ডিং বললেন, পরীক্ষা করে দেখতেই হবে। আমার তো মনে হয় সে পালাবে না।

এইসব কথাবার্তা যেদিন হল, সেদিন তিরিশে অক্টোবর। অর্থাৎ ন-দিন হল গ্র্যানাইট  হাউসে বন্দী হয়ে আছে লোকটি। সে যে-ঘরে শুয়ে ছিল, পেনক্র্যাফটকে নিয়ে সে-ঘরে গেলেন হার্ডিং। তাকে বললেন, ওঠো, একবার আমার সঙ্গে যেতে হবে তোমায়।

তখুনি উঠে দাঁড়ালে লোকটি একবার তাকালে হার্ডিং-এর দিকে, তারপর দ্বিরুক্তি না-করে সঙ্গে-সঙ্গে চলল। পেনক্র্যাফট চলল তার পিছনে-পিছনে। গ্র্যানাইট  হাউসের দরজার কাছে এসে হার্ডিং লোকটিকে লিফটে চড়ালেন। লিফট থেকে সমুদ্রতীরে গেলে পর সবাই খানিক দূরে সরে গিয়ে আগন্তুককে স্বাধীনতা দিলেন।

ধীরে-ধীরে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেল লোকটি। উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চোখ। কিন্তু সে একটুও পালানোর চেষ্টা করলে না। ছোটো-ছোটো ঢেউ ভেঙে পড়ছে তীরে, তারপর শাদা ফেনা হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সে অপলক চোখে তা-ই দেখতে লাগল।

স্পিলেট বললেন : সমুদ্র দেখে পালানোর ইচ্ছে ওর মনে জাগবে কিন্তু।

বেশ, বললেন হার্ডিং, তবে ওকে বনের কাছেই নিয়ে যাওয়া হোক।

সবাই আগন্তুককে নিয়ে মার্সি নদীর মুখের দিকে গেলেন। তারপর নদীর বাঁ-তীর ধরে গিয়ে প্রসপেক্ট হাইটে উপস্থিত হলেন। এখান থেকেই শুরু অরণ্য। একদৃষ্টে অরণ্যের দিকে তাকিয়ে লোকটি একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করলে। সবাই তার পিছনে দাঁড়িয়ে রইলেন। পালানোর চেষ্টা করলেই যাতে ধরে ফেলতে পারেন তাকে, সেইজন্যে প্রস্তুত হয়ে রইলেন। সামনে ছোটো নদী, তার পরই গহন অরণ্য। একবার মনে হল, আগন্তুক হয়তো জলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মুহূর্তের জন্যে সে পা দুটি বাঁকালে লাফ দেবার জন্যে। পরক্ষণেই আবার পিছনে সরে এসে প্রায় বসে পড়ল।

সঙ্গে-সঙ্গে দেখা গেল, সে কঁদছে, তার চোখ দিয়ে হু-হু করে জল গড়িয়ে পড়ছে।

সাইরাস হার্ডিং নিচু স্বরে বললেন : তোমার চোখে যখন জল দেখা দিয়েছে, তখন তোমার মনুষ্যত্বও যে ফিরে এসেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সবাই আগন্তুককে পুরো স্বাধীনতা দিয়ে খানিকক্ষণের জন্যে দূরে সরে এলেন। কিন্তু এতেও তার পালানোর ইচ্ছে দেখা গেল না। তখন তাকে নিয়ে সবাই গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এলেন।

এই ঘটনার দু-দিন পরে মনে হল, আগন্তুক যেন সকলের প্রাত্যহিক কাজে যোগ দিতে চায়। স্পষ্ট বোঝা গেল, সে অন্যের কথা মন দিয়ে শোনে, বুঝতে পারে। কিন্তু নিজে সে একটাও কথা বলে না।

তারপর আগন্তুক যন্ত্রপাতি নিয়ে বাগানে কাজ করতে শুরু করলে। এই কাজের সময় কেউ তার কাছে গেলেই সে কাজ ছেড়ে গম্ভীর মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যেতো। হার্ডিং-এর কথামতো সে-সময় কেউ তাকে কোনো কথা বলে বিরক্ত করতো না।

কয়েকদিন পরে তেসরা নভেম্বর আগন্তুক বাগানের কাজ করতে করতে হঠাৎ হাতের কোদাল ফেলে দাঁড়ালে।

দূর থেকে হার্ডিং তার উপর নজর রেখেছিলেন। দেখতে পেলেন, আগন্তুক কাঁদছে।

দুঃখিত হলেন হার্ডিং। তার কাছে এসে তার হাত ধরে বললেন : আমার দিকে তাকাও তো!

আগন্তুক তার দিকে তাকালে। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল সে, তারপর তার চোখদুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভাঙা গলায় সে শুধোলে : আপনারা কারা?

হার্ডিং বললেন : আমরাও তোমার মতোই পরিত্যক্ত মানুষ। তুমি টেবর আইল্যাণ্ডে অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিলে, তাই তোমাকে তোমার সঙ্গী বন্ধুদের মধ্যে আনা হয়েছে।

আমার বন্ধু! সঙ্গী! না, না-পৃথিবীতে আমার বন্ধু কেউ নেই। কেউ নেই! এই বলে সে সমভূমির কিনারায় ছুটে গিয়ে একদৃষ্টে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রায় দু-ঘন্টা সে সমুদ্রতীরে গভীর চিন্তায় ড়ুবে রইল। দু-ঘণ্টা পরে সে যেন মন ঠিক করে এসে উপস্থিত হল। কান্নার ফলে চোখ লাল হয়ে উঠেছে, মুখে বিষাদের ছাপ।

নতমুখে সে হার্ডিংকে শুধোলে : আপনারা কি ইংরেজ?

না, আমরা আমেরিকান! তুমি কোন দেশের লোক?

ইংল্যাণ্ডের।

এই কথা বলেই সে আবার সমুদ্রতীরে চলে গেল। সেখানে গিয়ে সে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল। একবার হার্বার্টের কাছে এসে জিগেস করলে : এটা কোন মাস? কোন সাল?

আঠারোশো ছেষট্টি সালের নভেম্বর।

অস্ফুট কণ্ঠে সে উচ্চারণ করল : বারো বছর! তারপর ফের হার্বার্টের কাছ থেকে চলে গেল।

হার্বার্ট সবাইকে এ-কথা বলতেই হার্ডিং বললেন : লোকটি তবে বারো বছর ধরে টেবর আইল্যাণ্ডে রয়েছে। এত বছর নির্জন বাসে যে তার জ্ঞান লোপ পেয়ে যাবে, তাতে আর বিচিত্র কী!

আমার মনে হয়, বললে পেনক্র্যাফট : জাহাজড়ুবির দরুন ও মোটেই টেবর আইল্যাণ্ড আসেনি। কোনো সাংঘাতিক অপরাধের দরুণ টেবর আইল্যাণ্ডে ওকে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল।

হয়তো তোমার কথাই ঠিক, বললেন হার্ডিং : তাহলে হয়তো যারা ওকে ফেলে গিয়েছিল, তারা আবার ওকে নিয়ে যাবার জন্যে টেবর আইল্যাণ্ডে ফিরে আসতেও পারে। কিন্তু এই সম্পর্কে কোনো কথাই ওকে জিগেস করা চলবে না। পাপ যদি সে করেও থাকে, তবে তার জন্যে সে যথেষ্ট প্রায়শ্চিত্ত করেছে।

এরপর কিছুদিন পর্যন্ত আগন্তুক একটা কথাও বললে না। বাগানেই সে থাকে। নীরবে কাজকর্ম করে। এক মুহূর্তও জিরোয় না। শাকসজি চিবিয়ে খায়। অনুরোধ করা সত্ত্বেও গ্র্যানাইট  হাউসে এসে সবার সঙ্গে আহারে যোগ দেয় না। রাত্রেও গ্র্যানাইট  হাউসে ঘুমোতে আসে না। বাগানেই ঝোঁপের মধ্যে ঘুমোয়। দুর্যোগ উপস্থিত হলে আশ্রয় নেয় গুহায়। সে যেন টেবর আইল্যাণ্ডের বুনো জীবনই যাপন করছে আবার। সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে একদিন সে তার জীবনের ভীষণ কাহিনী না-বলে আর থাকতে পারলো না।

দশই নভেম্বর রাত প্রায় আটটার সময় সবাই বারান্দায় বসে আছেন, এমন সময় আগন্তুক হঠাৎ সেখানে এসে হাজির হল। চোখ তার জ্বলছে, মুখ আগের মতোই হিংস্র আর ভয়াবহ।

এসেই সে অসংলগ্নভাবে বলতে শুরু করল : এখানে আমাকে এনেছেন কেন? কোন অধিকারে এনেছেন আমায়? জানেন আমি কে? জানেন আমি কী অপরাধ করেছিলুম? কেন আমি একলা টেবর আইল্যাণ্ডে থাকতুম, জানেন? আমি যে চোর, ডাকাত কিংবা খুনে নই, তা বুঝলেন কী করে?

তার এই উত্তেজনা দেখে হার্ডিং তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু সে সেদিকে। দৃকপাত না-করে বলল : একটা কথা আমি জানতে চাই। আমি কি স্বাধীন?

হ্যাঁ, হার্ডিং বললেন : নিশ্চয়ই তুমি স্বাধীন।

তবে আমি চললুম-বলেই সে পাগলের মতো অরণ্যের দিকে ছুটে চলে গেল।

সংবিৎ ফিরতেই হার্ডিং বললেন : যাক, ওকে আর ঘাঁটিয়ে কাজ নেই। আমি ঠিক জানি, ও আবার ফিরে আসবে।

বেশ কিছুদিন কেটে গেল, কিন্তু আগন্তুকের কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না। হার্ডিং কিন্তু স্থির নিশ্চিত যে, সে আবার ফিরে আসবে। এভাবে ও-যে একলা থাকছে, তা কেবল অনুতাপের জন্যে। নির্জন-বাসে ভয় পেয়ে আবার তাকে ফিরে আসতেই হবে।

এবার সবাই আবার নিয়মিত কাজ শুরু করে দিলেন। টেবর আইল্যাণ্ড থেকে আনা বীজগুলো সযত্নে রোপণ করা হল। ফসল এখন যথেষ্ট ফলে। একটা হাওয়াকল বা উইণ্ডমিল তৈরি করতে পারলে গম থেকে ময়দা তৈরি করা যাবে। হার্ডিং ঠিক করলেন প্রসপেক্ট হাইটের উপরে একটা শাদাসিধে ধরনের উইণ্ড-মিল তৈরি করবেন। প্রসপেক্ট হাইটের উপর সমুদ্রে জোরালো হাওয়া লাগবে-অনবরত ঘুরতে থাকবে প্রপেলার। হার্ডিং ছোটো-একটা নমুনাও বানালেন। পাখির বাসার দক্ষিণে লেকের তীরে মিল বানানোর জায়গা ঠিক হয়ে গেল। দিনরাত খেটে দিন-কয়েকের মধ্যেই উইণ্ড-মিলটা প্রস্তুত করা হল।

তখনও পর্যন্ত কিন্তু আগন্তুকের কোনো খবর নেই। গ্র্যানাইট  হাউসের কাছে বনের মধ্যে স্পিলেট হার্বার্টকে নিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করলেন, কিন্তু তার কোনো চিহ্নই দেখা গেল না। হার্ডিং কিন্তু তবু বলতে লাগলেন যে লোকটি ফিরে আসবেই, এবং এসে তাঁদের দলে যোগও দেবে।

শেষ পর্যন্ত হার্ডিং-এর কথাই ঠিক হল। তেসরা ডিসেম্বর হাবার্ট হ্রদের দক্ষিণ তীরে মাছ ধরতে গিয়েছিল। পেনক্র্যাট আর নেব পাখির বাসায় কাজে ব্যস্ত। হার্ডিং আর স্পিলেট তখন চিমনিতে বসে সাবান তৈরির জন্যে সোড়া প্রস্তুত করছেন, এমন সময় হঠাৎ একটা আর্ত চীৎকার শোনা গেল : বাঁচাও! বাঁচাও!

হার্ডিং আর স্পিলেট দূরে ছিলেন বলে চিৎকার শুনতে পাননি। পেনক্র্যাফট আর নেব উধর্বশ্বাসে হদের দিকে ছুটল। তারা হ্রদের তীরে পৌঁছুবার আগেই আগন্তুক বন থেকে ছুটে এসেছে। দেখা গেল হার্বার্টের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে একটা ভীষণ-দর্শন জাওয়ার।

জাগুয়ারটা হার্বার্টের উপর প্রায় লাফিয়ে পড়বে, এমন সময় আগন্তুক এসেই শুধু একটা ছুরি হাতে নিয়ে জাওয়ারের উপর লাফিয়ে পড়ল। জাগুয়ারটাও তখন হার্বার্টকে ছেড়ে তাকেই আক্রমণ করলে। অসাধারণ শক্তি আগন্তুকের শরীরে। একহাতে জাগুয়ারের টুটি টিপে ধরে অন্যহাতে সে সজোরে ছুরিটা আমুল বসিয়ে দিলে জাগুয়ারের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে জাগুয়ারটা মাটিতে পড়ে গেল।

আগন্তুক তক্ষুনি ফেরবার উপক্রম করলে, এমন সময় অন্যরা সেখানে এসে পৌঁছুলেন। এদিকে হার্বার্টও আগন্তুককে জড়িয়ে ধরে চ্যাঁচাতে লাগল : না, না, কিছুতেই তোমাকে যেতে দেবো না।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *