১.৬-১.১০ অনুসন্ধানের ফলাফল

১.৬ অনুসন্ধানের ফলাফল

চিমনি থেকে কিছু দূরেই উঁচু একটা পাহাড়-সেটার উপরে উঠে দ্বীপের চারদিক খুব ভালো করে দেখতে হবে।

পেনক্র্যাফটের পরামর্শে বনের মধ্য দিয়ে যাওয়াই ঠিক হল। পাহাড়ের কাছে যাওয়ার জন্যে এই পথটাই সবচেয়ে সোজা এবং সহজ। ফেরবার সময়ে অন্য পথে ফিরতে হবে।

বনের মধ্য দিয়ে যাবার সময় টপ ছোটোখাটো জানোয়ারগুলোকে তাড়া করতে লাগল। কিন্তু খামকা সময় নষ্ট হবে বলে হার্ডিং টপকে বাধা দিলেন। আগে পাহাড়ে চড়ে দ্বীপটা দেখা যাক, পরে অন্য কাজ।

ধীরে-ধীরে বন পেরিয়ে সকলে ভোলা জায়গায় এলে দেখা গেল, সামনে একটু দূরেই সেই পাহাড়। পাহাড়ের দুটো চুড়ো, দেখতে মোচার ডগার মতো। একটা চুড়োর আগাটা প্রায় আড়াই হাজার ফুট উপরে কে যেন হেঁটে দিয়েছে। চুড়োটার একদিকে ঠিক যেন। পোস্তা বাঁধা। এই পোস্তা দু-দিকে পাখির পায়ের মতো হয়ে চলে এসেছে। তার মধ্যিখানে সমান জমি, তাতে বড়ো-বড়ো গাছ-গাছগুলি প্রায় নিচু চুড়োটার সমান উঁচু। পাহাড়ের উত্তর-পুব দিকে গাছের সংখ্যা কম, এবং পাহাড়ের গায়ে ছোটো-ছোটো ঝরনার মতো দেখা গেল। ঠিক ছিল, ওঁরা প্রথমে ছোটো চুড়োটাতেই উঠবেন। হার্ডিং দেখলেন, জমি পাহাড়পর্বত সবকিছুর উপর দিয়েই যেন এককালে অগ্ন্যুৎপাত হয়ে গিয়েছে। তার চিহ্ন এখনও পরিষ্কার বর্তমান। ভূমিকম্পের দরুন চারদিকের সমস্ত জমিই খুব উঁচু-নিচু, এবড়োখেবড়ো! হাবার্ট পাহাড়ে ওঠবার সময়ে মাটিতে বুনো জানোয়ারের পায়ের দাগ দেখতে পেলে।

পেনক্র্যাফট বললে, এ-সব জানোয়ার যদি ওঠবার সময় আমাদের বাধা দেয়, তখন কী হবে?

স্পিলেট ভারতবর্ষে বাঘ শিকার করেছেন, আফ্রিকায় সিংহ মেরেছেন। তিনি বললেন, পথে জানোয়ারেরা এসে বাধা দিলে তার ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু যখন বড়ো জন্তুর পায়ের দাগ দেখা গেছে, তখন আমাদের সাবধান হয়ে চলা উচিত।

দুপুর বারোটার সময় ওঁরা সবাই একটা ঝরনার ধারে গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করলেন, এবং কিছু আহার সেরে নিলেন। ততক্ষণে ওঁরা চুড়োর প্রায় অর্ধেক পথ উঠছেন। এখান থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র দেখা যায়। দক্ষিণ দিকটা পর্বতের একটা উঁচু টেকের জন্যে দেখা যায় না। বাঁদিকে উত্তরে অনেকদুর পর্যন্ত দৃষ্টি চলে।

বিশ্রাম ও আহারের পর বেলা একটার সময় সকলে আবার পর্বতের চুড়োয় উঠতে ঘন ঝোঁপের মধ্যে এসে হাজির হলেন। মাঝে-মাঝে মোরগের মতো বড়ো ফেজান্ট জাতের ট্রেগোপান পাখি দেখা যেতে লাগল। গিডিয়ন স্পিলেট আশ্চর্য কৌশলে একটুকরো পাথর ছুঁড়ে একটা ট্রেগোপান মেরে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। পেনক্র্যাফট শিকার পেয়ে ভারি খুশি হল।

ক্রমে ঝোপ পেরিয়ে, যাত্রীরা একে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে প্রায় একশো ফুট খাড়া পথ ওঠবার পর সমান জমি পাওয়া গেল। এখানকার জমিতে অগ্ন্যুদ্গারের চিহ্ন বেশ স্পষ্ট।

এখানে স্যাময় আর ছাগল জাতের জন্তুর পায়ের দাগ অনেক দেখা গেল। তারপর হঠাৎ দেখা গেল, প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে দুটো বড়োরকমের জন্তু দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় বড়ো-বড়ো শিং-পেছনের দিকে বাঁকানো। গায়ে ভেড়ার মতো লোম।

জানোয়ারগুলোকে দেখেই হার্বার্ট বলে উঠল, আরে, এগুলো যে মুশমন!

কতকটা ভেড়ার মতো দেখতে জানোয়ারগুলো বড়ো-বড়ো কালো পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ওঁদের দেখতে লাগল। মনে হল, যেন আগে তারা কখনও মানুষ দেখেনি। তারপর হঠাৎ কেন যেন ভয় পেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করে দিল।

বিকেল চারটের সময় গাছের সীমানা শেষ হল। আর পাঁচশো ফুট উঠতে পারলেই প্রথম চুড়োর নিচের সমতল জমিতে পৌঁছুনো যাবে। ক্যাপ্টেন হার্ডিং সেখানই রাত কাটাবেন বলে ঠিক করলেন। উঁচু-নিচু আঁকা-বাঁকা পথ ঘুরে অনেক কষ্টের পর সকলে সমান জমিতে উপস্থিত হলেন।

হার্বার্ট, নে ও পেনক্র্যাফট লেগে গেল আগুন জ্বালানোর কাজে। রাত্রে ঠাণ্ডা পড়বে সাংঘাতিক, আর সেইজন্যেই আগুনের দরকার—রান্নার জন্যে ততটা নয়।

আগুন জ্বলল। শুয়োরের মাংস যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তা দিয়েই আহার শেষ হল। সন্ধে সাড়ে-ছটার মধ্যেই খাওয়া-দাওয়া সব শেষ।

আহারের পর স্পিলেট তাঁর নোটবুক নিয়ে বসলেন দিনের ঘটনা লেখবার জন্যে। নেব ও পেনক্র্যাফট ঘুমুবার তোড়জোড় করতে লাগল। হার্ডিং হার্বার্টকে সঙ্গে নিয়ে চললেন পাহাড়ের উঁচু চুড়োটার অবস্থা দেখতে।

সুন্দর পরিষ্কার রাত্রি। অন্ধকারও বেশি নয়। প্রায় কুড়ি মিনিট চলে হার্ডিং একটা জায়গায় দাঁড়ালেন। এখানে চুড়োটার ঢালু গা মিলে গিয়ে এক হয়েছে। চুড়োর গা ঘুরে আর এবার জো নেই। যাই হোক, সৌভাগ্যবশত চুড়োয় ওঠবার একটা উপায় হল। ঠিক তাঁদের সামনেই দেখলেন একটা গভীর গর্ত রয়েছে। এটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। ভারি অসমান, উঁচুনিচু। আগে যে-অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল, তার দরুন লাভা গন্ধক ইত্যাদি মাটিতে পড়ে বেশ সিঁড়ির মতো হয়েছে। উঁচু চুড়োটার উপরে ওঠা খুব মুশকিলের ব্যাপার হবে না।

এইসব দেখে হার্ডিং আর দেরি করলেন না। হার্বার্টের সঙ্গে অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করলেন। তখনও প্রায় হাজার ফুট উঠতে হবে। হার্ডিং ঠিক করলেন, বাধা না-পাওয়া পর্যন্ত গহ্বরের ভিতরকার চড়াই দিয়ে উঠতে থাকবেন। সৌভাগ্যবশত চড়াইয়ের পথ ক্রেটারের ভিতরেও ঘুরে-ঘুরে উপরের দিকে উঠছিল। তাতে ওঠবার পক্ষে সুবিধেই হল।

আগ্নেয়গিরি এখন একেবারে নিভে গেছে। পাহাড়ের জ্বালামুখ দিয়ে এখন আর ধোঁয়া বেরোয় না, গহ্বরের ভিতর তাকালে আর আগুনও দেখা যায় না। সাড়া নেই, শব্দ নেই, গর্জন নেই, কম্পন নেই-আগ্নেয়গিরি এখন যে শুধু ঘুমন্ত তা-ই নয়, একেবারে মরে গেছে।

হার্ডিং হার্বার্টকে নিয়ে ক্রেটারের ভিতর দেয়াল বেয়ে কেবলই উপরের দিকে উঠতে লাগলেন। ক্রমে ক্রেটারের মুখের কাছে আসবার পর উপরের দিকে তাকালে একটুকরো গোল আকাশ দেখা গেল। হার্ডিং আর হার্বার্ট যখন উঁচু চুড়োর ডগায় দিলেন, তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেছে। অন্ধকারও বেশ গভীর হয়েছে ইতিমধ্যে। মাইলদুয়েকের বেশি দেখা যায় না। তবে কি সমুদ্র জায়গাটিকে ঘিরে রেখেছে? না এটা কোনো মহাদেশের সঙ্গে যুক্ত? এখনও সে-কথার মীমাংসা হল না। চারদিকে তাকিয়ে দেখে মনে হলসবদিকেই সমুদ্র যেন আকাশের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। হঠাৎ মনে হল। আকাশে যেন একটা আলো দেখা গেল। এই আলোর ছায়া যেন জলের উপর পড়ে কাপছে। এই আলো চাঁদের—সরু ধনুকের মতো চাঁদ-একটু পরেই ড়ুবে যাবে।

হার্বার্ট চারদিকে তাকিয়ে বললে, যেদিকে তাকাই, সেইদিকেই সমুদ্র! খালি জল, আর জল!

হার্ডিং হার্বার্টের হাত ধরে একটু চাপ দিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, হার্বার্ট, বুঝতে পেরেছি-আমাদের এটা দ্বীপ। এ-কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে চাঁদ ঢেউয়ের নীচে অদৃশ্য হয়ে গেল।

প্রায় আধঘণ্টা বাদে হার্ডিং হার্বার্টের সঙ্গে অন্য-সকলের কাছে ফিরে এলেন। অভিযানের ফলাফল বর্ণনা করে বললেন, এবার তো সবকিছু জানা গেল। এ-জীবনে হয়তো-বা আর এই দ্বীপ ছেড়ে কোথাও যাওয়া যাবে না। এই দ্বীপে বাস করাই যখন আমাদের ভাগ্যলিপি, তখন বসবাসের জন্যে সুব্যবস্থা করতে হবে।

গিডিয়ন স্পিলেট শুধু বললেন, হ্যাঁ, জীবনে হয়তো-বা এই দ্বীপ থেকে কখনোই আর অন্য কোথাও যাওয়া যাবে না!

পরদিন তিরিশে মার্চ। সকাল সাতটার সময় কিছু জলযোগ করে সবাই আবার রওনা হলেন। সেই মরে-যাওয়া আগ্নেয়গিরির চূড়ায় উঠে দিনের আলোয় খুব ভালো করে চারদিক দেখতে হবে। হার্ডিং আগের দিন সন্ধেবেলায় যে-পথে গিয়েছিলেন সেই পথ ধরেই চললেন। চুড়োয়, পৌঁছেই চারদিকে তাকিয়ে সকলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, সমুদ্র, সমুদ্র! চারদিকেই সমুদ্র।

হার্ডিং হয়তো ভেবেছিলেন চুড়োয় উঠে দিনের আলোয় দূরে তীর দেখতে পাবেন। আগের দিন অন্ধকার ছিল বলে হয়তো তা দেখা যায়নি। কিন্তু চারদিকে প্রায় পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে কিছুই দেখা গেল না—সমুদ্র যেন সবদিকেই আকাশের প্রান্তের সঙ্গে মিশে গেছে। তীর কিংবা কোনো জাহাজের পাল–কিছুই দেখতে পাওয়া গেল না। অসীম জলরাশির ঠিক মাঝখানে তাদের এই দ্বীপ-প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে যেন ভীষণ-কোনো সামুদ্রিক জন্তু, যেন একটা তিমি ঘুমুচ্ছে।

আসলে দ্বীপটা দেখতে সত্যিই অনেকটাই তিমির মতো। গিডিয়ন স্পিলেট তক্ষুনি দ্বীপটার একটা নকশা এঁকে ফেললেন। দ্বীপটার পরিধির একশো মাইলের বেশি হবে বলেই মনে হল।

দ্বীপের পূর্বদিকের অংশটা, যেখানে তাঁরা বেলুন থেকে পড়েছিলেন, দেখতে একটা উপসাগরের মতো। তার একপাশ তীক্ষ্ণ অন্তরীপের মতো হয়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়েছে। উত্তর-পূর্ব দিকে আরো দুটি অন্তরীপ, আর সেখানেই উপসাগরটির শেষ। উত্তর-পূব তীর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম তীরটা গোল। এই তীরের প্রায় মধ্যিখানে সেই মরে-যাওয়া আগুনের পাহাড়। দ্বীপের সবচাইতে সরু জায়গাটা অর্থাৎ চিমনি আর পশ্চিম তীরের নদী পর্যন্ত জায়গাটা দশ মাইল চওড়া দ্বীপের লম্বালম্বি দূরত্ব ত্রিশ মাইলের কম তো নয়ই, বরং বেশিই। হতে পারে। দ্বীপের মধ্যকার জায়গাটা-পাহাড় থেকে শুরু করে দক্ষিণ দিক জুড়ে সমুদ্র পর্যন্ত—বিশাল অরণ্য। উত্তর ভাগটা শুকনো, বালুময়। হার্ডিংরা দেখে অবাক হলেন যে, আগ্নেয়গিরি আর পুব তীরের মাঝখানে একটা হ্রদ রয়েছে। তার কিনারায় অগুনতি সবুজ গাছপালা। হ্রদটি দেখে মনে হল এটি যেন সমুদ্র থেকে খানিকটা উঁচুতে অবস্থিত।

পেনক্র্যাফট জিজ্ঞাসা করল, হ্রদের জল কি খাওয়ার উপযোগী হবে?

হার্ডিং বললেন, নিশ্চয়ই! দেখছো না, হ্রদের জল পাহাড়ের ঝরনা থেকে নেমে আসছে?

হার্বার্ট বললে, ওই দেখুন, একটা ছোটো নদী যেন হ্রদে এসে পড়েছে।

হার্ডিং বললেন, এই নদীর জল দিয়েই যখন হ্রদের সৃষ্টি, তখন খুব-সম্ভব অন্যদিকে। অতিরিক্ত জল বেরিয়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়বার একটা পথও আছে। ফেরার পথে এইটে দেখে যেতে হবে।

এই বাঁকাচোরা ঝরনা আর নদীর জল দিয়েই দ্বীপটা উর্বর। হয়তো-বা গভীর বনের মধ্যে অন্যকোনো ঝিল বা হ্রদ আছে। বনটি তো আর কম বড়ো নয়। দ্বীপের দুই তৃতীয়াংশ জুড়ে হবে। উত্তর দিকে তাকিয়ে সেখানে নদী কিংবা ঝরনার অস্তিত্ব আছে বলে বোঝা গেল না। তবে মধ্যে-মধ্যে জলাভূমি আছে বটে।

প্রায় একঘণ্টা পাহাড়ের চুড়োয় থেকে সবাই চারদিক তন্নতন্ন করে দেখলেন। এখন একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তরের উপর এই আগন্তুকদের ভবিষ্যৎ ভালোমন্দ নির্ভর করে :

এই দ্বীপে কি মানুষের বাস আছে?

প্রশ্নটি করলেন গিডিয়ন শিলেট। চারদিক দেখেশুনে যা মনে হলতাতে এই প্রশ্নের জবাব হয় : না—এখানে কোনো জনমানবের বসতি নেই। ঘর-বাড়ি, গ্রাম, ধোঁয়া কিছুই দেখা গেল না। অবশ্য এঁরা যেখান থেকে দেখেছেন, সেখান থেকে দ্বীপের শেষ সীমা ত্রিশ মাইলের উপর। এত-দূরে লোকের বসতি থাকলে ঈগলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিও দেখতে পাবে না।

পরে আরো খোঁজখবর নেয়া যাবে। এখন না-হয় মেনে নেয়া গেল, দ্বীপটি জনমানবশূন্য। তাহলেও কাছাকাছি অন্যকোনো দ্বীপের নোক এখানে আসতে পারে তো? এ-প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজসাধ্য নয়। চারদিকে পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে তো কোনো দ্বীপ দেখতেই পাওয়া গেল না। যা-ই হোক, পঞ্চাশ মাইলের পরেও দ্বীপ থাকতে পারে। সেখানকার লোকের পক্ষে নৌকো কিংবা ক্যানুতে করে এই দ্বীপে আসা মুশকিল হবে না। এমন অবস্থায় ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কায় সবসময় তৈরি হয়ে থাকতে হবে।

আপাতত অনুসন্ধান শেষ হল। ফেরার আগে হার্ডিং ধীর গভীর গলায় বললেন, হয়তো এই দ্বীপে আমাদের অনেকদিন থাকতে হবে। অবশ্য হঠাৎ কোনো জাহাজ এসে হাজির হওয়াও বিচিত্র নয়। হঠাৎ বলছি এইজন্যে যে এটা অতি নগণ্য দ্বীপ-জাহাজ চলাচলের পথ মোটেই নয়।

স্পিলেট বললেন, ক্যাপ্টেন, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। যা-ই হোক, আমরা সকলেই উদ্যোগী মানুষ। তাছাড়া আপনার উপরে আমাদের ভরসা খুব আছে। আমরা এই দ্বীপে উপনিবেশ স্থাপন করে বাস করবো।

স্পিলেটের কথায় সকলেই খুব উৎসাহের সঙ্গে সায় দিল।

ফেরবার সময় হার্ডিং বললেন, চলো এক কাজ করি। দ্বীপের পাহাড়-পর্বত, নদী নালা, উপসাগর, অন্তরীপ—সবগুলোরই এক-একটা নাম দেওয়া যাক।

পেনক্র্যাফট বললে, আমাদের প্রথম আচ্ছাটির নাম দিয়েছি চিমনি–কারু কোনো আপত্তি না-থাকলে সেটার নাম চিমনিই থাক।

হার্বার্ট বললে, ক্যাপ্টেন হার্ডিং, মিস্টার স্পিলেট, পেনক্র্যাফট, নে—সকলের নামেই এক-একটার নাম দেয়া যাক।

আমার নামে নাম হবে। এই বলে নেব চকচকে শাদা দাঁতগুলো বের করে হাসতে লাগল।

যা-ই হোক, সবাই উত্তর আমেরিকার লোক, তাই শেষটায় হার্ডিং-এর প্রস্তাবমতো আমেরিকার প্রসিদ্ধ নামসমূহ দিয়েই দ্বীপের ভিন্ন-ভিন্ন জায়গার নামকরণ করা হল। বড়োদুটি উপসাগরের একটার নাম হল ইউনিয়ন বে, অন্যটার নাম হল ওয়াশিংটন বে। পাহাড়টার নাম রাখা হল মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন। দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের উপদ্বীপটার নাম হল সার্পেন্টাইন পেনিনসুলা, কারণ উপদ্বীপটা দেখতে অনেকটা সাপের ল্যাজের মতো। অন্য প্রান্তের উপসাগরটার নাম শার্ক গালফ-দেখত যেন হাঙরের মুখ হাঁ করে আছে। এই শার্ক গালফের দুটি অন্তরীপ হল নর্থ ম্যাবিল আর সাউথ ম্যাণ্ডিবল অন্তরীপ 1 বড়ো হ্রদটার নাম লেক গ্র্যান্ট চিমনির উপরে গ্র্যানাইট  পাথরের খাড়া পাহাড়গুলোর চুড়োয় যে-সমতল জমিটুকু ছিল, তার নাম হল প্রসপেক্ট হাইট। এখান থেকে সমস্ত উপসাগর বেশ ভালোরকম দেখা যায়। তারপর যে-নদীর জল তারা পান করবার জন্যে ব্যবহার করেন, যার কাছে তারা বেলুন থেকে পড়েছিলেন, তার নাম হল মার্সি নদী। দ্বীপের যে-সংকীর্ণ অংশটায় তারা বেলুন থেকে পড়েছিলেন, তার নাম হল সেফটি আইল্যাণ্ড। সবশেষে গোটা দ্বীপটার নাম দেয়া হল লিঙ্কন আইল্যাণ্ড।

এ হল আঠারোশো পঁয়ষট্টি খ্রিষ্টাব্দের তিরিশে মার্চের কথা। তারা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি যে এর ঠিক ষোলো দিন পরে ওয়াশিংটনে এমন-একটা বীভৎস ব্যাপার অনুষ্ঠিত হবে, যার ফলে সারা দুনিয়া শিউরে উঠবে। আব্রাহাম লিঙ্কন যে কোনো নিষ্ঠুর আততায়ীর হাতে নিহত হতে পারেন, এ-কথা অবিশ্যি কেই বা ভাবতে পারত।

.

১.৭ উপক্রমণিকা

পরদিন সকলের ঘুম ভাঙতেই সাইরাস হার্ডিং বললেন, আজ আমরা নতুন পথে চিমনিতে ফিরবো। তাহলে এই ফাঁকে গোটা দ্বীপ সম্পর্কে একটু মোটামুটি আন্দাজ করে নেয়া যাবে। এখানে আমরা প্রকৃতির কাছ থেকে কী-কী জিনিশ পাচ্ছি, আগে সেগুলো সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা করে নিতে হবে–তারপর খুব ভেবে আমাদের কাজ করতে হবে। কে জানে কতদিন এই দ্বীপে থাকতে হবে, কিন্তু তার ব্যবস্থা তো করা দরকার।

পেনক্র্যাফট বললে, কিন্তু ক্যাপ্টেন হার্ডিং, আমার একনম্বর প্রার্থনা হল, আপনি দয়া করে আমাকে কোনোদিন হাতিয়ার তৈরি করে দিন-বন্দুক বা রিভলভার। এভাবে গাছের ডাল দিয়ে শিকার করা একটা বড়ো বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। পারবেন আপনি বন্দুকের ব্যবস্থা করতে?

হয়তো পারতেও পারি। হার্ডিং উত্তর করলেন, কিন্তু এখন আগে আমাদের কয়েকটা তীর ধনুক তৈরি করে নিতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার শিকারীদের মতো তীর-ধনুক ব্যবহারে দু-দিনেই তোমরা ওস্তাদ হয়ে উঠতে পারবে, যদি একটু একাগ্রতা থাকে।

তীর-ধনুক! মুখটা কালো করে বললে পেনক্র্যাফট, ও-তে ছেলেখেলা!

এত গর্ব কোরো না, পেনক্র্যাফট, বললেন স্পিলেট, রক্তপাতের জন্যে তীর-ধনুকই আরো কয়েক শতাব্দীর জন্যে যথেষ্ট। গোলা-বারুদ আর কবেকার? এইতো সেদিন সবে গোলাবারুদ ব্যবহার করা হল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত খুন-জখম লড়াই সেই আদিম যুগ থেকেই চলে আসছে।

সে-কথা ঠিক, মিস্টার স্পিলেট। পেনক্র্যাফট উত্তর করলে, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি সবসময়েই একটুও না ভেবে, হ-য-ব-র-ল যা মাথায় আসে দুমদাম বলে ফেলি।

হার্ডিং বললেন, কিন্তু এখন আর একটুও দেরি করা চলবে না। সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। তারপরই আমরা বেরিয়ে পড়বে।

একটু পরে সবাই খেয়ে-দেয়ে বেরিয়ে পড়লেন। এবার হ্রদের পশ্চিম দিয়ে চিমনির দিকে চললেন সবাই। সারাদিন দ্বীপের নতুন-নতুন বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করতে-করতে হাসিগল্পগুজব করতে-করতে সবাই চললেন। দুপুরবেলার দিকে নেব আবার টপের সাহায্যে দুটো খরগোশ ধরে নিয়ে এলো। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে উৎসাহী হল পেনক্র্যাফট। সে-তো খরগোশ দুটো দেখে মহা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠে বললে, যাক, আজ রাত্রিরে খরগোশের রোস্ট দিয়ে ভোজটা জমবে ভালো।

সারাদিন ওঁরা লেক গ্ল্যান্টের আশপাশে ঘুরে বেড়ালেন। তারপর মার্সি নদীর বাঁ-ধার দিয়ে সবাই যখন চিমনিতে এসে পৌঁছুলেন, তখন সন্ধে হয়ে গেছে।

আলো জ্বালিয়ে নেওয়া হল ভালো করে। রান্নাবান্নার কাজে খুব ওস্তাদি দেখালে নেব আর পেনক্র্যাফট। রাত বেশি বাড়বার আগেই খাওয়া-দাওয়া করে নিলেন সবাই। সারাদিন হাঁটাহাঁটির পর খরগোশের রোস্ট খেতে যে খুব ভালো লাগল, সেটা না-বললেও চলে।

খাওয়া-দাওয়ার পর অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে সবাই গোল হয়ে বসল। তখন সাইরাস হার্ডিং পকেট থেকে নানা ধরনের খনিজ দ্রব্যের নমুনা বার করলেন, সারাদিন তিনি এ-সবই সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর একটু কেশে সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, এই হল লোহা, এটা পাইরাইট, এটা চুন, এই হল কয়লা আর এটা এখানকার কাদামাটি। প্রকৃতি আমাদের এইসব জিনিশ দিয়েছে। ঠিকভাবে এদের কাজে লাগানো হল আমাদের কর্তব্য। কাল থেকে আমাদের কাজ শুরু হবে।

স্পিলেট শুধু বললেন, হ্যাঁ। শুভস্য শীঘ্রম্।

কিন্তু ক্যাপ্টেন, আমরা শুরু করবো কোত্থেকে? পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই পেনক্র্যাফট হার্ডিংকে প্রশ্ন করলে।

একেবারে শুরু থেকে–বললেন সাইরাস হার্ডিং।

আর, সত্যিই একেবারে শুরু থেকে করতেই বাধ্য ছিলেন এঁরা। যন্ত্রপাতি বানাবার মতো যন্ত্রপাতি পর্যন্ত এঁদের ছিল না। বাঁচবার পক্ষে যে জিনিশগুলো না-হলেই নয়, সেইসব জিনিশ পর্যন্ত ছিল না এঁদের। প্রত্যেকটি জিনিশ তাঁদের নিজের হাতে তৈরি করে নিতে হবে। তাদের লোহা আর ইস্পাত অপরিশুদ্ধ খনিজ পদার্থের আওতায় পড়ে, তাদের মাটির জিনিশপত্র, পোশাক-আশাক এখনো তৈরি হয়নি। আবিশ্যি এ-কথা বলতেই হবে যে, তাঁরা সবাই মানুষ শব্দটির পূর্ণ বিকাশ। এঞ্জিনিয়ার হার্ডিং-এর সঙ্গীরা সকলে বুদ্ধিমান। হার্ডিং তাঁদের ক্ষমতায় আস্থা রাখেন। যে-পাঁচজন আকস্মিকভাবে এক হয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই আপন-আপন ক্ষেত্রে সেরা, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করবার ক্ষমতা রাখেন, সেই লড়াইয়ে জেতবার শক্তিও তাঁদের আছে।

সাইরাস হার্ডিং বললেন, একেবারে শুরু থেকে। এই যে শুরুর কথা বলছি, তা হল এমন একটি যন্ত্র তৈরি করবার কথা, যে-যন্ত্রের সাহায্যে প্রাকৃতিক বস্তুসমূহকে কাজে লাগানো যায়। এ-কাজে উত্তাপের কতটুকু ক্ষমতা, তা সকলেরই জানা আছে। এখন কাঠই হোক আর কয়লাই হোক, তা ব্যবহার করবার জন্যে সব-আগে দরকার একটা চুল্লি।

কেন? চুল্লি দিয়ে কী হবে? প্রশ্ন করলে পেনক্র্যাফট।

ইট বানাবার জন্যে হার্ডিং উত্তর করলেন, এবং তা বানাতে হবে ইট দিয়েই।

কিন্তু সে-ইট কী করে বানাবো?

কাদামাটি দিয়ে। এখুনি শুরু করতে হবে আমাদের। হ্যাঙামা কমাবার জন্যে আমাদের চুল্লিটা তৈরি করতে হবে উৎপাদনের স্থানেই! নেব খাবার-দাবার নিয়ে যাবে—রাঁধবার জন্যে আগুনের অভাব সেখানে হবে না। হ্রদের পশ্চিম তীরে যেতে হবে আমাদের। সেখানে কাদামাটির কোনো অভাব হবে না। কাল ওখান দিয়ে আসবার সময় আমি জায়গাটা ভালো করে দেখে এসেছি।

***

মার্লি নদীর তীর দিয়ে সবাই চলতে লাগলেন। প্রসপেক্ট হাইট পেরিয়ে মাইল পাঁচেক চলবার পর তারা অরণ্যের কাছে ঘাসে-ছাওয়া একটি জমিতে এসে পৌঁছুলেন। লেক গ্র্যান্ট সেখান থেকে প্রায় দুশো ফুট দূরে। পথে হাবার্ট তালগাছের মতো একটা গাছ আবিষ্কার করলে, যার ডাল দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার রেড-ইণ্ডিয়ানরা তীর-ধনুক তৈরি করে। পাশেই এমনএক জাতের গাছ দেখা গেল, যার ছাল দিয়ে অনায়াসে ধনুকে তৃণ পরানো চলে। পেনক্র্যাফট অনায়াসেই তার ধনুক পেয়ে গেল। এখন শুধু তীরের ওয়াস্ত্র।

আগের দিন যে-জায়গাটা হার্ডিং দেখে গিয়েছিলেন, সবাই সেখানে এসে পৌঁছুলেন। যে মাটি দিয়ে ইট তৈরি হয় ঠিক সেই জাতের মাটি বলে দের অনেক ঝামেলা কমে গেল। বালি মিশিয়ে সেই কাদামাটি দিয়ে সুন্দর ছাঁচের ইট তৈরি করে কাঠের আগুনে পুড়িয়ে নিলেই তাদের সব পরিশ্রম সার্থক হয়ে উঠবে। ছাঁচ না-থাকায় অবিশ্যি হাত দিয়েই ইট তৈরি করতে হবে, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না—সুন্দর না-হয়-না-ই হল, প্রয়োজনটুকু তো মিটবে। ওস্তাদ মজুর অবিশ্যি যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই সকাল-সন্ধে খেটে দিনে দশ হাজার ইট তৈরি করতে পারে, কিছু অপটু হাতেও এঁরা পাঁচ জনে দু-দিনের মধ্যে হাজার তিনেক ইট তৈরি করে ফেললেন। তিন-চার দিন চুল্লি বানাবার মতো ইট তৈরি হল। চুল্লি তৈরি করবার আগে দুদিন ধরে সবাই মিলে জ্বালানি কাঠ জোগাড় করলেন।

এই ফাঁকে পেনক্র্যাফট গাছের ডাল দিয়ে বহু তীর তৈরি করে নিলে। প্রত্যেকের জন্যে একটা করে ধনুকও তৈরি করা হল। তারই সাহায্যে শিকার জোগাড় করতে তাদের খুব বেশি অসুবিধে হল না। সাইরাস হার্ডিং সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কারণ অরণ্যে হিংস্র জানোয়ার থাকতে পারে। তার আন্দাজে ভুল হয়নি। গিডিয়ন স্পিলেট আর হার্বার্ট একদিন এমন-একটা জানোয়ার দেখেছিলেন বনে, যাকে তাদের জাগুয়ার বলে মনে হয়েছিল। সৌভাগ্য বলতে হবে, জানোয়ারটা তাদের আক্রমণ করেনি। যদি করতো তাহলে বিপদ হতে পারতো. 1 স্পিলেট তো তখনি প্রতিজ্ঞা করে ফেললেন যে, কোনোমতে যদি একটা বন্দুক পাওয়া যায় তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে হিংস্র জানোয়ারদের সঙ্গে লড়াই ঘোষণা একটুও দ্বিধা করবেন না। দ্বীপ থেকে যে-করেই হোক এই সাংঘাতিক জানোয়ারদের বিনাশ করতেই হবে।

এই ক-দিনে তারা কিন্তু চিমনির প্রতি বিশেষ নজর দেননি। সাইরাস হার্ডিং ঠিক করেছিলেন যে শিগগিরই নতুন-একটা বাসস্থান ঠিক করে নেবেন। কেননা চিমনিটি বাসের পক্ষে বেশ বিপজ্জনক। চিমনির জায়গায় ফাঁক ছিল—দেখে মনে হয়, সমুদ্রের জল যখন বেড়ে ওঠে তখন চিমনির মধ্যেও জল ঢোকে।

স্পিলেট সাংবাদিক। কাজেই লিঙ্কন দ্বীপে আসবার পর থেকে প্রত্যেকটা দিনের হিশেব রাখছিলেন তার রোজনামচায়। পাঁচই এপ্রিল স্পিলেট জানালেন যে, এই দ্বীপে আসবার পর বারো দিন কেটে গেছে। ছয়ই এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, সূর্যোদয়ের সঙ্গে-সঙ্গেই সবাই চুল্লির কাছে এসে হাজির হলেন। শুকনো ইটের পাঁজার মধ্যে পুঞ্জীভূত করা হল কাঠকুটো, ডালপালা। সারা দিন ধরে চুল্লিটাকে কার্যকরী করার চেষ্টা চলল। সন্ধের সময় ইটের পাঁজায় আগুন দেয়া হল। সে-রাত্রে আর কেউ ঘুমুলেন না। সতর্কভাবে আগুন জ্বালিয়ে রাখলেন।

তিনদিন ধরে পোড়ানো হল ইট। এবারে ঠাণ্ডা হবার সময় দিতে হবে। অসংস্কৃত চুনা-পাথরকেও সাধারণ পাথরের সঙ্গে আর বালির সঙ্গে মিশিয়ে চমৎকারভাবে কাজে লাগানো হল। নয়ই এপ্রিল সাইরাস হার্ডিং কাজ শুরু করবার উপযোগী কয়েক হাজার ইট আর পরিশুদ্ধ চুনাপাথর পেলেন।

আরো-কয়েক দিন বাদে দেখা গেল, দ্বীপের আগন্তুকেরা একরাশ মাটির বাসন-কোশন তৈরি করেছেন, ব্যবহারের জন্যে। মাটির সঙ্গে সামান্য চুনাপাথর আর অন্য-এক ধরনের খনিজ পদার্থ মিশিয়ে তৈরি-করা বাসন টেকসই হল খুব দেখতে অবিশ্যি খুবই বিশ্রী হল কিন্তু কাজ চলল খুব ভালোই। পেনক্র্যাফ্ট তো ওই চুন-মাটি ইত্যাদি দিয়ে একটা পাইপ তৈরি করে ফেললে। কিন্তু তামাক না-পাওয়ায় সেই পাইপ বেচারির কোনো কাজেই লাগল না। পনেরোই এপ্রিল পর্যন্ত কুমোরের কাজই চলল। পরদিন হল ঈস্টার সানডে, সেদিন তারা জিরিয়ে নিলে। সেদিন বিকেলের দিকে সাইরাস হার্ডিং একটা স্মরণীয় জিনিশ আবিষ্কার করলেন। নাগলতা বা ওঅর্ম উড বলে এক ধরনের গাছ আবিষ্কার করলেন তিনি দ্বীপে, যা ভালো করে শুকিয়ে নিয়ে পটাসিয়াম নাইট্রেটের সাহায্যে চলনসই-গোছ দেশলাই তৈরি করা যায়। আর দ্বীপে পটাসিয়াম নাইট্রেটের অভাব ছিল না। কাজেই এই মূল্যবান আবিষ্কার তাদের জীবনে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে উঠল।

ইতিমধ্যে হার্ডিং লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের অবস্থানও বের করে নিয়েছিলেন। মোটামুটিভাবে জানা গেল যে, দ্বীপটি পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ ডিগ্রি অক্ষরেখা এবং একশো বাহান্ন ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমা রেখায় অবস্থিত। তার মানে দ্বীপটি তাহিতি থেকে বারোশো মাইল, নিউজিল্যাণ্ড থেকে আঠারোশো মাইল এবং আমেরিকার উপকূল থেকে প্রায় সাড়ে-চার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরের এই অঞ্চলে এমনি কোনো দ্বীপের কথা কখনো শুনেছিলেন কি না, সে-কথা ভাবতে চেষ্টা করলেন সাইরাস হার্ডিং। কিন্তু লিঙ্কন দ্বীপের মতো কোনো দ্বীপের কথা তাঁর স্মরণে এলো না।

রবিবার দিন পেনক্র্যাফট তার তীর-ধনুক দিয়ে কোনোকিছুই শিকার করতে পারেনি। সন্ধের পর সবাই চিমনিতে ফিরলে সে আপশোশ করে বললে : এভাবে আর ক-দিন চলবে ক্যাপ্টেন বলুন তো? বন্দুক ছাড়া সাংঘাতিক অসুবিধে হচ্ছে যে!

সে-কথা ঠিক। স্পিলেট বললেন, কিন্তু সে-তো তোমার উপরেই নির্ভর করছে। লোহা জোগাড় করে ব্যারেলের জন্যে, ট্রিগারের জন্যে ইস্পাত, সল্ট পিটার, কয়লা আর গন্ধক বারুদ তৈরির জন্যে, পারদ নাইট্রিক অ্যাসিড আর সিসে গুলির জন্যে—দেখবে, ক্যাপ্টেন আমাদের চমৎকার বন্দুক তৈরি করে দিয়েছেন।

সাইরাস হার্ডিং বললেন : সবগুলো জিনিশই আমরা দ্বীপে পাবো–কিন্তু বন্দুক হল এমন-একটা জিনিশ, যা বানাতে বিশেষ কয়েক ধরনের ভালো যন্ত্র চাই। কিন্তু সে যা-ই হোক, পরে দেখা যাবে-খন।

বেলুন থেকে সব জিনিশপত্র ফেলে দিয়ে কী ভুলই না করেছি! বললে পেনক্র্যাফট।

যদি সব জিনিশপত্র আমরা ফেলে না-দিতুম, তাহলে নির্ঘাৎ জলে ড়ুবে মরতুম, পেনক্র্যাফট। বললে হার্বার্ট।

স্পিলেট সে-কথায় সায় দিলেন : হাবার্ট ঠিক কথাই বলেছে।

পরদিন ভোরে বেলুনটা না-দেখতে পেয়ে ফরেস্টার আর তার সঙ্গীদের মুখের যে দশা হয়েছিল, তা কল্পনা করেও আমার হাসি পাচ্ছে, বললে পেনক্র্যাফট।

ওদের মুখের কী দশা হয়েছিল, স্পিলেট বললেন, তা জানবার জন্যে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।

একটু গর্বের স্বরে পেনক্র্যাফট বললে : গোটা বুদ্ধিটা কিন্তু আমার মগজেই এসেছিল প্রথম।

চমৎকার বুদ্ধিটা-হাসতে-হাসতে বললেন স্পিলেট, কারণ তার দরুনই তো আজ আমাদের এই দুরবস্থা!

রিচমরে বদমায়েশগুলোর হাতে বন্দী হয়ে থাকার চাইতে এই দ্বীপে সারা জীবন কাটানোও আমি ভালো বলে মনে করি! পেনক্র্যাফট চেঁচিয়ে বললে।

.

১.৮ নতুন আস্তানার সন্ধানে

আজ সতেরোই এপ্রিল।

আগের দিন প্রাতরাশের পর তারা চিমনি থেকে সাত মাইল দূরে ম্যাণ্ডিবল অন্তরীপ পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এর ফলে কাঁচা লোহার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। সেই লোহাকে পরিশুদ্ধ করে না-নিলে কোনো কাজেই লাগানো অসম্ভব। সুতরাং সাইরাস হার্ডিং ভোরবেলা পেনক্র্যাটকে ডেকে বললেন: পেনক্র্যাফট, এবার কিন্তু তোমাকেই সবচেয়ে বেশি কেরামতি দেখাতে হবে। আমার এখন কয়েকটা সীল চাই। পাথুরে লোহা থেকে লোহার ভাগকে আলাদা করে নিতে হবে।

পাথুরে লোহা থেকে লোহার ভাগকে আলাদা করতে সীল চাই কেন? বিস্মিত, হয়ে শুধোলে পেনক্র্যাফট।

সীলের চামড়া দিয়ে হাপর বানাতে হবে। সাইরাস হার্ডিং জানালেন : হাপর ছাড়া লোহা আগুনে তাতানো যাবে না।

গোটা দিনটা কাটল নীল শিকারে। পেনক্র্যাফটের নেতৃত্বে সবাই মিলে বেশ কয়েকটা সীল মারলেন। সীলের চর্বি থেকে তেল পাওয়া যাবে-চামড়া দিয়ে হাপরও বানানো চলবে। সুতরাং সীল-শিকার তাদের কাছে সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর গুরুত্ব দিয়েছিল বলে প্রচুর পরিশ্রম করে পেনক্র্যাফট সীল শিকার করলে।

বিশে এপ্রিলের মধ্যেই একটা বেশ-বড়ো হাপর তৈরি হয়ে গেল। মাউন্ট ফ্রাঙ্কলিনের। নিচে, চিমনি থেকে ছ-মাইল দূরে, বিপুল পরিমাণ কয়লা আর পাথুরে লোহা পাওয়া গেল। হার্ডিং ঠিক করলেন, ওইখানেই তাদের লোহার কারখানা বসবে। প্রত্যেকদিন এখান থেকে। চিমনিতে ফেরা সম্ভব নয় বলে গাছের ডাল দিয়ে ছোট্ট একটা কুটির তৈরি করা হল ওখানে। তাতে একটা সুবিধে হল এই যে, দিন-রাত্রি কাজ করা চলবে।

পাথুরে লোহা থেকে লোহার ভাগ আলাদা করা রীতিমতো কঠিন ব্যাপার। পঁচিশে এপ্রিলের আগে তো কোনোরকমেই পরিশুদ্ধ লোহা পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত যখন পঁচিশে এপ্রিল বিকেলের দিকে কয়েক তাল বিশুদ্ধ লোহা পাওয়া গেল, সবাই আনন্দে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন। তারপর অনেকবার চেষ্টা করে অনেক পরিশ্রম করে কয়েকটা অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্র তৈরি করলেন ওঁরা। কুঠার প্রভৃতি যে-সব সাধারণ জিনিশ এঁরা বানালেন, তা-ই ওঁদের অমুল্য রত্নের সমান হয়ে উঠল। মোটামুটিভাবে কাজ চালানোগোছ কয়েকটা জিনিশ বানানো গেলেও, ইস্পাত কিন্তু প্রথমটা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইস্পাত তৈরি করতে হয় লোহার সঙ্গে কয়লা মিশিয়ে; ওই মিশ্রণে যদি কোনো-একটার পরিমাণ বেশি হয়ে পড়ে, তবে কিন্তু ইম্পাত তৈরি করা যাবে না। সুতরাং ইস্পাত তৈরি করাটা সাংঘাতিক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু মে মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে তারা যখন ইস্পাতের তৈরি বিশেষ প্রয়োজনীয় কয়েকটি জিনিশ তৈরি করতে পারলেন, তখন পেনক্র্যাফটের আনন্দ দ্যাখে কে!

জিনিশপত্রগুলো দেখতে অবিশ্যি খুবই বিশ্রী হল, কিন্তু তবু এই কর্মকারের দল একটুও নিরুৎসাহ অনুভব করলেন না। কাজ চললেই তো হল–সুন্দর অসুন্দর ধুয়ে জল খেলেই তো চলবে না!

ছয়ই মে দ্বীপে বিষম ঠাণ্ডা পড়ল : সাইরাস হার্ডিং বুঝতে পারলেন, শীত আসছে। ঠাণ্ডাতে হয়তো না–ঘাবড়ালেও চলে, কিন্তু আকাশে বর্ষার পূর্বাভাস দেখে হার্ডিং খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মধ্য-সাগরের এই নির্জন দ্বীপে বর্ষার যে কী ভয়ংকর রূপ হবে, তা কল্পনা করে হার্ডিং ঠিক করে ফেললেন, শিগগিরই নতুন-একটি আস্তানা চাই এবার। বর্ষাকালে যে-চিমনিতে সাগরের জল ঢুকবে না তা-ই বা কে বলতে পারে! আগে যে সাগরের জল ঢুকেছিল, তার প্রমাণ প্রথম দিনেই পাওয়া গিয়েছিল, পাঠকদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে। প্রথম দিনে চিমনিতেই সামুদ্রিক ঝিনুক আবিষ্কার করেছিল পেনক্র্যাফ্ট। সুতরাং শিগগিরই যে নতুন একটা আস্তানা চাই এ-বিষয়ে কারু একটুও মতদ্বৈধ রইল না। এ ছাড়া সাইরাস হার্ডিং আরো বললেন যে, বাসস্থান সম্পর্কে তাদের খুব সাবধান হওয়া উচিত। কেননা, যদিও এই দ্বীপে এখনও পর্যন্ত জংলি অধিবাসীদের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়নি, হিংস্র জানোয়ার তো আছে। এই ক-দিনে দু-একবার তাদের সাক্ষাৎও পাওয়া গেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই অঞ্চলে যে মালয় বোম্বেটেরা ঘাঁটি করে থাকে, সে-কথাও হার্ডিং আবার সকলকে স্মরণ করিয়ে দিলেন।

নতুন আস্তানার অবস্থান যাতে মার্সি নদী আর লেক গ্ল্যান্টের কাছাকাছি হয়, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। কেননা, দ্বীপের মধ্যে এই এলাকাই সবচাইতে ভালো। গ্র্যানাইট  পাথরের পাহাড়ের মধ্যে যদি কোনোরকমে একটা আস্তানা করা যায়, তাহলেই সবচেয়ে ভালো। কেননা, গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়াল ঝড়-ঝঞ্জার হাত থেকে যেমনি রক্ষা করবে, তেমনি রক্ষা করবে হিংস্র জানোয়ার কিংবা বোম্বেটেদের হাত থেকে।

সেদিনই সবাই নতুন আস্তানার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। লেক গ্ল্যান্টের জলের উৎস হল পাহাড়ের বেশখানিকটা উপরের একটি ঝরনার জল। কিন্তু হ্রদের অতিরিক্ত জল যে কোনদিক দিয়ে বেরিয়ে সাগরে পড়ে, সেটা কোনোমতেই জানা যায়নি। লেক গ্ল্যান্টের তীর দিয়েই সবাই দ্বীপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। কিন্তু আস্তানার জন্যে যে-রকম জায়গা। আর সুবিধে তাঁরা চাইছিলেন, সে-রকম কোনো জায়গা কিন্তু আবিষ্কার করা গেল না।

সাইরাস হার্ডিং কিন্তু ভেবেছিলেন যে হ্রদের সঙ্গে সমুদ্রের সংযোগ আছে। কিন্তু এই সংযোগস্থল আবিষ্কার করা গেল না। অনেক ঘোরাঘুরি করেও যখন সেই সংযোগস্থল পাওয়া গেল না, অথচ সন্ধে হয়ে এল, তখন হার্ডিং ঠিক করলেন পরদিন তিনি আবার এসে ভালো করে খুঁজে দেখবেন সংযোগস্থলটি, কারণ তিনি নিশ্চিত যে অতিরিক্ত জল সমুদ্রে গিয়ে পড়বার একটা পথ কোথাও আছেই।

পরদিন সকালবেলাতেই স্পিলেট আর হার্ডিং আবার হ্রদের কাছে এলেন, সমুদ্রের সঙ্গে হ্রদের সংযোগ-পথটি খুঁজে বার করবার জন্যে। ওঁরা দুজনে কথা বলতে-বলতে পথ চলতে লাগলেন। হঠাৎ এক জায়গায় এসে হার্ডিং-এর নজরে পড়ল, হ্রদের জলে তীব্র স্রোত। সেই স্রোতের মধ্যে কয়েকটা কাঠের টুকরো তিনি ফেলে দিলেন। হ্রদের দক্ষিণ দিক অভিমুখে সেই কাঠের টুকরোগুলো ভেসে চলল। সেই স্রোত অনুসরণ করে তাঁরা হ্রদের দক্ষিণ সীমান্তে এসে পৌঁছুলেন। সেখানে হ্রদের জলে তীব্র একটা ঘূর্ণিপাকের সৃষ্টি হয়েছে; হঠাৎ সেখানে এসে জল যেন অনেকটা নিচে পাতালে চলে যাচ্ছে। হার্ডিং উৎকৰ্ণ হয়ে শুনতে লাগলেন। হ্রদের সমতল মাটিতে কান লাগিয়ে একটা জলপ্রপাতের শব্দ শুনতে তার বিলম্ব হল না।

উঠে দাঁড়িয়ে হার্ডিং বললেন : এইখান দিয়েই অতিরিক্ত জল সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। নিঃসন্দেহে গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়ালের মধ্য দিয়ে কোনো পথ আছে। যে-করেই হোক সেই পথটি বার করতেই হবে।

লম্বা একটা গাছের ডাল কেটে নিলেন হার্ডিং। তারপর সেটাকে জলে ড়ুবিয়ে দিলেন।

সঙ্গে-সঙ্গে জলের সমতলের এক ফুট নিচে, তীরের গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়ালে একটা গর্ত আছে বলে বোঝা গেল। সেখানে জলে এত তীব্র স্রোত যে, ক্যাপ্টেনের হাত থেকে তীরের মতো ছিটকে বেরিয়ে গেল ডালটি এবং পলকের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আবার বললেন হার্ডিং : এবার আর-কোনো সন্দেহই নেই-এখানেই অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যাবার পথ। এই পথটিকে দৃষ্টিপথে আনতেই হবে।

কী করে আনবেন? শুধোলেন স্পিলেট।

জলের সমতলটা তিন ফুট নিচে নামিয়ে দিয়ে।

কিন্তু কী করে নামাবেন?

এর চেয়ে বড়ো আর-একটা জল বেরুবার পথ করে দিয়ে।

কোন জায়গায় আপনি সেই পথটা করবেন?

উপকূলের সবচেয়ে কাছে যে-তীর, সেখানে।

কিন্তু সেখানে তো গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়াল!

তা জানি। উত্তর দিলেন হার্ডিং। ওই গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়াল আমি উড়িয়ে দেবো। ওইদিকে পথ পেয়ে জলের সমতল অনেক নেমে যাবে, তাহলেই এই পথটা–

এবং তীরে একটা জলপ্রপাত তৈরি করে–স্পিলেট বললেন।

–সেই জলপ্রপাত আমরা কাজে লাগাবো। সাইরাস হার্ডিং বললেন : চলুন, এবার ফেরা যাক।

দ্রুতপদে তারা চিমনিতে ফিরে এলেন। পেনক্র্যাফট আর হার্বার্ট তখন সদ্য-সদ্য বন থেকে কাঠ কেটে বোঝা নিয়ে ফিরেছে। তাঁদের দেখেই পেনক্র্যাফট হেসে বললে : কাঠুরেরা এইমাত্র তাদের কাজ শেষ করে ফিরল, ক্যাপ্টেন। এবার আপনি যদি রাজমিস্ত্রি চান, তবে তা-ও আমরা হতে পারি।

রাজমিস্ত্রি? হার্ডিং বললেন : না-না, এবার চাই রাসায়নিক।

জানো পেনক্র্যাফট, আমরা এবার দ্বীপটা উড়িয়ে দিতে চলেছি। জানালেন স্পিলেট।

দ্বীপটা উড়িয়ে দিতে চলেছি! চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট।

গোটা দ্বীপটা নয়,–স্পিলেট হাসলেন : একটা অংশ মাত্র।

তখন হার্ডিং তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সবার কাছে খুলে বললেন। সব শুনে হার্বার্ট বললে : ডাইনামাইট ছাড়া ওই গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়াল আপনি উড়িয়ে দেবেন কী করে?

ডাইনামাইটের চেয়েও শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরি করে।

পরদিন, মে মাসের আট তারিখে, ক্যাপ্টেন হার্ডিং বেশ কিছু পরিমাণ সালফারেট অভ আয়রন সংগ্রহ করলেন। আগ্নেয়গিরির কল্যাণে দ্বীপে এইসব খনিজ পদার্থের কোনো অভাব ছিল না। সালফারেট অভ আয়রন থেকে সালফেট বার করে নিতে খুব-বেশি দেরি হল না। সালফেট পাওয়া গেলে সালফিউরিক অ্যাসিডের আর ভাবনা কী?

চিমনির পিছনে নিখুঁত সমতল একটি জায়গা বার করে নিলেন হার্ডিং। সেইখানেই তৈরি করলেন তার ল্যাবরেটরি। আর ল্যাবরেটরিতেই প্রস্তুত হল সালফিউরিক অ্যাসিড।

সীলের চর্বি থেকে গ্লিসারিন বার করতেও কোনো অসুবিধে হল না। কেননা দ্বীপে চুনের কোনো অভাব নেই। রসায়ন নিয়ে যারাই সামান্য নাড়াচাড়া করেছে তারাই জানে, চর্বি থেকে গ্লিসারিন বার করতে হলে চুন কিংবা সোডার প্রয়োজন। সোডাও দ্বীপে পাওয়া গেল, কেননা ক্ষারযুক্ত গাছের অভাব নেই দ্বীপে; আর সেই গাছ থেকে সোজা বার করে নেয়া খুব বেশি কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়।

সালফিউরিক অ্যাসিড আর গ্লিসারিন যখন জোগাড় করা গেল, তখন প্রয়োজন পড়ল অ্যাজোট অভ পটাশ-এর। এই অ্যাজোট অভ পটাশ সল্টপিটার নামেই অভিহিত হয়। আজোটিক অ্যাসিডের সাহায্যে সহজেই উদ্ভিদসমূহের মধ্য থেকে কার্বনেট অভ পটাশ পাওয়া যায়। কিন্তু অ্যাজোটিক অ্যাসিড পাওয়াটা মুশকিলের ব্যাপার হয়ে উঠল। তবে, সৌভাগ্যবশত ফ্র্যাঙ্কলিন পর্বতের পাদদেশে অতি সামান্য সল্টপিটার পাওয়া গেল। হার্ডিং তাকে পরিশুদ্ধ করে নিলেন। এইসব কাজেই কেটে গেল এক সপ্তাহ। এই ক-দিনে চুনবালি-কাদা দিয়ে একটা ফারনেস তৈরি করে নিয়েছিলেন হার্ডিং। সেই ফারনেসের সাহায্যে সালফারেট অভ আয়রন থেকে সালফিউরিক অ্যাসিড আর সল্টপিটার একত্র করে অ্যাজোটিক অ্যাসিড পাওয়া গেল। সেই অ্যাজোটিক অ্যাসিড আর গ্লিসারিন মিশিয়ে হার্ডিং তার বহু-আরাধ্য বিস্ফোরক পেলেন—সামান্য একটু তেলতেলে হলদে তরল পদার্থ। একটা বোতলের মধ্যে সেই বহু-আরাধ্য পদার্থটি নিয়ে হার্ডিং সবাইকে বোতলটি দেখালেন, বললেন : এই হল তোমাদের নাইট্রোগ্লিসারিন।

সেদিন হল মে মাসের বিশ তারিখ।

চোখ মাথায় তুলে পেনক্র্যাফট বললে : এই কয়েক ফোঁটা নাইট্রোগ্লিসারিন দিয়ে আপনি গ্র্যানাইট  পাথর উড়িয়ে দেবেন?

হ্যাঁ। হার্ডিং বললেন : কালকেই নিজের চোখে সব দেখতে পাবে।

পরদিন একুশে মে ভোরবেলা সবাই লেক এ্যান্টের পুব তীরে গিয়ে হাজির হলেন।

জায়গাটা সমুদ্র-উপকুল থেকে মাত্র পাঁচশো ফুট দূরে। এই জায়গাতেই মাটি ঢালু হয়ে নেমে গেছে। গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়াল না-থাকলে হ্রদের জল ঝরনার মতো হয়ে গিয়ে বেলাভূমির কাছে নেমে যেতো। যদি গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়ালটি উড়িয়ে দেয়া যায়, তবে জলের সমতল অনেক নিচে চলে যাবে-এবং সঙ্গে সঙ্গে যে-বহিথ দিয়ে হ্রদের অতিরিক্ত জল সমুদ্রে গিয়ে পড়ে, তা দৃশ্যমান হবে।

হার্ডিং-এর নির্দেশমতো পেনক্র্যাফট একটি শাবল সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। হুদের তীরে গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়ালে একটু জায়গা নির্দেশ করলেন হাডিং 1 পেনক্র্যাফট সেখানে একটা গর্ত করতে লাগল। গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়ালে গর্ত করা মোটেই সোজা ব্যাপার নয়। অথচ গর্তটা একটু গভীর করা প্রয়োজন। সুতরাং, একটু পরে যখন পেনক্র্যাফটের শরীর দিয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরতে লাগল, তখন নেব পেনক্র্যাফটের হাত থেকে শাবলটা নিলে।

বেলা চারটের সময় গর্ত করা হয়ে গেল। সেই গর্তের মধ্যে হার্ডিং অতি সন্তর্পণে নাইট্রো-গ্লিসারিনের বোতলটা রাখলেন।

এবার সেই বিস্ফোরকে অগ্নিসংযোগের প্রশ্ন উঠল। কয়েকটি গাছের ছাল দিয়ে একটা লম্বা দড়ির মতো তৈরি করা হল। তারপর সেই দড়িটা সালফিউরিক অ্যাসিডে ভিজিয়ে নিয়ে তার একটা মুখ ওই গর্তটায় ঢুকিয়ে দেয়া হল। ঠিক হল এর অন্য প্রান্তে অগ্নিসংযোগ করা হবে। গোটা দড়িটা পুড়তে পঁচিশ মিনিটের মতো সময় লাগবে।

দড়িটার এক প্রান্তে অগ্নিসংযোগ করে সবাই দৌড়ে চিমনিতে ফিরে এলেন। ঠিক পঁচিশ মিনিট বাদে অতি ভয়ংকর একটি বিস্ফোরণের শব্দে লিঙ্কন আইল্যাণ্ড এত জোরে কেঁপে উঠল যে, মনে হল যেন সাংঘাতিক একটি ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। বড়ো-বড়ো পাথরের চাঁই ছিটকে পড়ল ফ্রাঙ্কলিন পর্বতের গা থেকে, যেন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুদ্গার, শুরু হয়েছে।

বিস্ফোরণের স্থান থেকে চিমনি প্রায় দু-মাইল দূরে অবস্থিত হলেও, সবাই চিমনির ভিতরে এ-ওর ঘাড়ে গিয়ে ছিটকে পড়লেন। সংবিৎ ফিরে পেয়ে সবাই ছুটলেন লেক গ্ল্যান্টের দিকে। একটু পরেই সমস্বরে সবাই চেঁচিয়ে উঠলেন আনন্দে।

গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়ালে বেশ বড়ো আকারের একটি পথ দেখা গেল। হ্রদের ফেনিল জল সেই পথ দিয়ে বেরিয়ে এসে তিনশো ফুট নিচে সমুদ্র-সৈকতে আছড়ে পড়ছে।

.

১.৯ গ্র্যানাইট  হাউস

নতুন বহির্পথটির পরিধি এত বড়ো হল যে, দেখা গেল অল্প সময় পরেই হ্রদের জলের সমতল তিন ফুটের মতো নেমে গেছে। সবাই তখন চিমনিতে ফিরে এলেন। কুঠার, শাবল ইত্যাদি কিছু হাতিয়ার নিয়ে সবাই এবার রওনা হলেন হ্রদের পুরোনো বহিপথের সন্ধানে। টপ এবার তাদের সঙ্গে চলল।

রাস্তায় পেনক্র্যাফট হার্ডিংকে একটা কথা জিজ্ঞেস না-করে পারলে না। শুধোলে : আচ্ছা ক্যাপ্টেন, আপনার ওই নাইট্রোগ্লিসারিন দিয়ে কি কেউ এই গোটা দ্বীপটাকে উড়িয়ে দিতে পারে না?

কোনো সন্দেহ নেই তাতে। শুধু এই দ্বীপ কেন-হার্ডিং জবাব দিলেন, দেশ, মহাদেশ এমনকী দুনিয়া পর্যন্ত উড়িয়ে দেয়া যায়। প্রশ্ন শুধু পরিমাণের।

বন্দুকে কি এই নাইট্রোগ্লিসারিন আপনি ব্যবহার করতে পারেন না? শুধধলে পেনক্র্যাফট।

না পেনক্র্যাফট এটি একটি সাংঘাতিক বিস্ফোরক। বন্দুকের জন্যে সাধারণ বারুদ তৈরি করা মোটেই কঠিন নয়। অ্যাজোটিক অ্যাসিড সল্টপিটার, গন্ধক, কয়লা—কিছুরই অভাব নেই এই দ্বীপে। কিন্তু দুর্ভগ্যবশত একটিও বন্দুক নেই আমাদের।

পেনক্র্যাফট উত্তর করলে : ক্যাপ্টেনের সামান্য ইচ্ছে থাকলেই—

লিঙ্কন দ্বীপের অভিধান থেকে অসম্ভব কথাটা মুছে ফেলেছিল পেনক্র্যাফট।

খানিকক্ষণ বাদেই হ্রদের পুরোনো বহির্পটির সামনে এসে দাঁড়ালেন সবাই। গ্র্যানাইট পাথরের মধ্য দিয়ে টানেলের মতো পথ চলে গেছে। বাইরে থেকে দেখা গেল ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে সেই পথটি। টপ তো সোজা সেই টানেলের ভিতর প্রবেশ করল। টানেলটা দেখে মনে হল, কেউ যেন কোনো উদ্দেশ্যে পাহাড় কেটে তা প্রস্তুত করেছে। হার্ডিং খুব ভালো করে বুঝতে পারলেন যে, টানেলটার বয়স দ্বীপের বয়সের কম হবে না। সম্ভবত এই ঢালু টানেলটা গিয়ে পড়েছে একেবারে সমুদ্রের সমতলে।

হার্বার্ট বললে : চলুন, এবার ভিতরে ঢোকা যাক।

চলো-বলে হার্ডিং সবে পা বাড়িয়েছেন, এমন সময় দেখতে পেলেন, চীৎকার করতে করতে টপ ভিতর থেকে ছুটে আসছে।

নেব বিরক্ত হয়ে বললে : তোর আবার কী হল রে টপ, অত ডাকছিস কেন?

সবাই টানেলের ভিতর প্রবেশ করলেন। টপ গর্জন করতে-করতে ছুটতে ছুটতে সেই টানেলের অভ্যন্তরে এগিয়ে চলল। আস্তে আস্তে সেই ঢালু সুড়ঙ্গপথ দিয়ে নামতে লাগলেন সকলে। এই না-জানা পাতালের দিকে প্রথম চলেছেন তারা–এই কথা ভেবে তাদের মনে ঈষৎ ভীতি এবং একটু বিস্ময়ের ভাব জেগে উঠল। কেউ একটিও কথা বলছিলেন না। এমনও তো হতে পারে, এই সুড়ঙ্গ-পথের মধ্যে কোনো সামুদ্রিক জীবজন্তু বাস করে! তাদের সঙ্গে দেখা না-হলেই ভালো একহিশেবে।

পিচ্ছিল, ঢাল সুড়ঙ্গপথ দিয়ে প্রায় একশো ফুট নামবার পরে সবাই একটা চওড়া গহ্বরের মতো জায়গায় এসে থামলেন। ছাদ থেকে তখনো ফেঁাটা-ফোঁটা জল পড়ছিল। একটু স্যাঁতসেঁতে ভাব থাকলেও হাওয়া সেখানে বিশুদ্ধ।

ক্যাপ্টেন, গিডিয়ন স্পিলেট বললেন : এই হল নিরাপদ আস্তানা-একেবারে পাহাড়ের অভ্যন্তরে। কিন্তু তবু বাসযোগ্য নয়।

বাসযোগ্য নয় কেন? নাবিক পেনক্র্যাফটের গলা শোনা গেল।

কারণ এ-জায়গাটা খুব ছোটো, আর অন্ধকার।

কেন, এটাকে কি বড়ো করা যায় না? আলো-হাওয়ার জন্যে দু-একটা জানলা করে নিলেই চলে।

পেনক্র্যাফট তার অভিধান থেকে অসম্ভব কথাটা একেবারেই মুছে ফেলে দিয়েছিল।

চলো এগিয়ে চলো। সাইরাস বললেন : সবে তো তিনভাগের একভাগ পথ মাত্র এসেছি। আরো, নিচে হয়তো দেখতে পাবো প্রকৃতি আমাদের সমস্ত পরিশ্রম লাঘব করে রেখেছে।

টপ কোথায়? হঠাৎ নে একটু উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল।

চারদিকে তাকালেন সবাই। মশালের আলোয় তন্ন-তন্ন করে দেখলেন জায়গাটা। কিন্তু টপকে দেখা গেল না।

পেনক্র্যাফট বললে : টপ হয়তো এগিয়ে গিয়েছে।

চলো—আমরাও এগোই। হার্ডিং বললেন।

আবার সবাই নিচে নামতে লাগলেন। আরো পঞ্চাশ ফুট এগিয়ে যাবার পর হঠাৎ সবাই থমকে দাঁড়ালেন। অনেক তলা থেকে কীসের একটা শব্দ যেন ভেসে আসছে।

একটু কান পেতে শুনেই হার্বার্ট বললে : আরে! এ-যে টপ ডাকছে!

হ্যাঁ, পেনক্র্যাফট বললে : ভীষণভাবে ডাকছে টপ!

শাবল আর কুঠারগুলো বাগিয়ে ধরে সাবধানে এগিয়ে চলো। হার্ডিং-এর নির্দেশ পাওয়া গেল।

দ্রুতপদে টপকে সাহায্য করবার জন্যে এগিয়ে চললেন সকলে। টপের ডাক ক্রমশই বাড়ছিল—সাংঘাতিকভাবে ডাকতে লাগল সে।

কোনো সামুদ্রিক জন্তুর দেখা পেয়েছে কি টপ? সাইরাস হার্ডিং একটু নিচু গলায় বললেন : বিনা কারণে তো টপ কখনো এত উত্তেজিত হয় না! নিশ্চয়ই কোথাও কিছুএকটা ঘটেছে, আমরা বুঝতে পারছি না।

আরো ষোলো ফুটের মতো নামবার পর টপের দেখা পাওয়া গেল। সেখানটা বিশাল এবং চমৎকার একটা চত্বরের মতো। টপ খুব উত্তেজিত হয়ে ছুটোছুটি করে ডাকতে লাগল। মশালের আলো জ্বেলে খুব সতর্কভাবে চারদিক দেখলেন সবাই। কিন্তু বিপুল গুহাটি শূন্য, একেবারে কঁকা। প্রত্যেকটি কোণে গিয়ে পরীক্ষা করলেন তখন। কোনো জন্তু বা মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া গেল না। কিন্তু তবু টপ ডেকেই চলল একটানা। ভয় দেখিয়ে বা চুপ করতে নির্দেশ দিয়েও টপকে থামানো গেল না।

হার্ডিং বললেন : এই গুহার মধ্যে এমন-একটা পথ নিশ্চয়ই আছে, যেখান দিয়ে হ্রদের জল সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।

নিশ্চয়ই, পেনক্র্যাফট বললে : সাবধানে চলাফেরা করতে হবে আমাদের। ও-রকম কোনো গর্তের মধ্যে পড়ে গেলেই সর্বনাশ!

হার্ডিং ডাকলেন : টপ, টপ, চল।

হার্ডিং-এর কথায় উত্তেজিত হয়ে টপ ছুটে গেল গুহাটির একেবারে প্রত্যন্ত প্রান্তে —সেখানে গিয়ে দ্বিগুণ জোরে চীৎকার করতে লাগল। টপকে অনুসরণ করে সে-জায়গায় পৌঁছে দেখা গেল, গ্র্যানাইট  পাথরের কোলে রীতিমত একটা কুয়ো সেখানে। এই কুয়ো দিয়েই হ্রদের জল সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। কুয়োটা সোজা নেমে গেছে। সুতরাং এর ভেতর ঢুকে পরীক্ষা করে দেখাটা সম্ভব নয়। কুয়োর মুখের কাছে মশাল ধরা হল, কিন্তু কিছুই দেখা গেল না। হার্ডিং একটা জ্বলন্ত মশাল কুয়োর মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। ছলাৎ করে একটা শব্দ শোনা গেল, বোঝা গেল মশালটা সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। সমুদ্রের জলে পড়তে মশালটার যত সময় লাগল তা হিশেব করে হার্ডিং কুয়োর গভীরতা নির্ণয় করলেন। প্রায় নব্বই ফুট গভীর হবে কুয়োটা। গহ্বরের মেঝে তাহলে সমুদ্রতলের নব্বই ফুট উপরে অবহিত!

হার্ডিং বললেন : এই হল আমাদের নতুন আস্তানা।

কিন্তু এই জায়গায় নিশ্চয়ই কোনো প্রাণী থাকে? স্পিলেটের কৌতূহল তখনো নিবৃত্ত হয়নি। হয়নি।

সে-প্রাণী এতক্ষণে ওই কুয়ো দিয়ে সমুদ্রে চলে গেছে,  হার্ডিং উত্তর দিলেন। জায়গাটা আমাদের দিয়ে গেছে।

সত্যিই প্রশস্ত গহ্বরটা বাসের পক্ষে খুব ভালো। এত চওড়া, যে অনায়াসেই ইটের গাঁথুনি দিয়ে দেয়াল তুলে কয়েকটা কামরায় ভাগ করে নেয়া সম্ভব। তবে, দুটো অসুবিধে আছে। প্রথমত, এই পাথরের তৈরি হায় আলো পাওয়া যাবে কী করে, আর দ্বিতীয়ত, সংস্কার করে আরো স্বাচ্ছন্দ্য আনতে হবে। গ্রানাইটের পুরু ছাদ ভেদ করে আলোর পথ করে দেয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না, তবে, সমুদ্রের দিকের দেয়ালে কয়েকটা জানলা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। ক্যাপ্টেনের নির্দেশ মতো পেনক্র্যাফট সমুদ্রের দিকের দেয়ালে শাবল দিয়ে ঘা মারতে লাগল। একটু পরে স্পিলেট গিয়ে তার স্থান গ্রহণ করলেন, তারপর নেব কাজে লাগল। অনেকক্ষণ চেষ্টার পরও যখন সবাই দেয়ালে জানলা করবার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন এমন সময় নেবের শেষ একটা আঘাতের সঙ্গে-সঙ্গে শাবলটা ছিটকে পাথরের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বাইরে পড়ল। হার্ডিং মেপে দেখলেন, দেয়ালটা তিন ফুট পুরু। সেই ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন ক্যাপ্টেন। দেখতে পেলেন, প্রায় আশি ফুট নিচে সমুদ্র-সৈকত, তারপর সেফটি আইল্যাণ্ড, তারও পর উত্তাল সমুদ্রের নীল জল। সেই ফাঁক দিয়ে বন্যার মতো ছুটে এলো আলো। তখন ভালো করে গহ্বরটি দেখতে পাওয়া গেল। বিরাট গহ্বরটি-বাঁ দিকে ত্রিশ ফুট উপরে ছাদ, ডান দিকে ছাদ আশি ফুট উপরে। মাঝে-মাঝে শূন্যে মাথা তুলেছে গ্র্যানাইট  পাথরের থাম। অনায়াসেই একাধিক কক্ষে গহ্বরটি ভাগ করা সম্ভব হবে। যেখানে মাথা গোঁজবার জন্যে সামান্য একটা আশ্রয় চাচ্ছিলেন, সেখানে এই বিরাট আস্তানা পেয়ে সবাই আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন।

সাইরাস হার্ডিং বললেন : প্রথমেই কয়েকটা জানলা বানাতে হবে। গোটা গুহাটা আলোকিত হয়ে গেলে পর বাঁ দিকে আমরা থাকবার ঘর আর ভাড়ার বানাবো, আর ডান দিকের অংশটুকু হবে আমাদের স্টাডি আর জাদুঘর।

হাবার্ট জিগেস করল : আমাদের নতুন আস্তানার নাম কী হবে?

গ্র্যানাইট  হাউস। হার্ডিং উত্তর করলেন।

ঠিক হল, পরদিন থেকেই গ্র্যানাইট  হাউসের কাজ শুরু হয়ে যাবে। তখন তারা ফিরতি পথ ধরলেন। ফেরার আগে আবার কুয়োর কাছে এসে ভিতরে দৃষ্টিপাত করলেন হার্ডিং। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই দেখা গেল না।

সবাই যখন সেই গুহার বাইরে এসে দাঁড়ালেন, তখন প্রায় চারটে বাজে।

পরদিন বাইশে মে থেকে নতুন আস্তানা গড়ে তোলবার কাজ শুরু হয়ে গেল। প্রথমেই ভারি একটা ঢাকনি গড়ে তোলবার কাজ। কুয়োটার মুখ এমনভাবে বন্ধ করে দেয়া হল, যাতে উপর থেকে সেই ঢাকনি খোলা গেলেও কুয়োর ভিতর থেকে সেই ঢাকনি মনুষ্যেতর কোনো প্রাণী খুলতে না-পারে। পাঁচটি জানলা এবং একটি দরজা বানানো হলযাতে বাইরে থেকে আলো-হাওয়া আসে। সমুদ্রমূখী পাঁচটি কক্ষে গুহাটিকে বিভক্ত করা হল। ডানদিকে একটি পথ—সেখান থেকে নিচে ঝোলানো সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হল। কেননা দ্বীপে কোনো লোক না-থাকলেও মালয় বোম্বেটেরা হয়তো দ্বীপে আসতে পারে—তারা যাতে গ্র্যানাইট  হাউসে প্রবেশ করতে না-পারে, এইজন্যেই ঝোলানো সিঁড়ির ব্যবস্থা। ঠিক হল সবাই যখন বাইরে যাবেন তখন সিঁড়িটি ফেলে দেয়া হবে-ফিরে আসবার পর আবার তুলে ফেলা হবে। প্রবেশ-পথের পরেই ত্রিশ ফুট লম্বা একটি রান্নাঘর। তারপর প্রায় চল্লিশ ফুট লম্বা খাওয়ার ঘর। এর পরে ঠিক তত বড়ো একটি শোবার ঘর, আর সবশেষে বিরাট একটি হলঘর–ভঁদের বৈঠকখানা। এছাড়াও গহ্বরের মধ্যে যে-জায়গা ছিল, তাতে একটি ভাড়ার ঘর বানানো হলআর বাকিটুকু করিডর হিশেবে ব্যবহারের জন্যে রাখা হল। যে-টানেলটি দিয়ে হুদের জল গহ্বরে প্রবেশ করতো, হঁটের দেয়াল দিয়ে সেটা বন্ধ করে দেয়া হল। ঝোলানো সিঁড়িটা খুব সতর্কভাবে অত্যন্ত মজবুত করে বানানো হল। সেই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করাটা অসুবিধে হলেও নিরাপত্তার পক্ষে প্রচুর সহায়ক। আঠাশে মে ঝোলানো সিঁড়িটা নির্দিষ্ট স্থানে বসানো হল প্রায় আশি ফুট লম্বা সিঁড়ি-একশোটার মতো সোপান তাতে। সৌভাগ্যবশত সিঁড়িটা দু-ভাগে ভাগ করা গেল। মাটি থেকে চল্লিশ ফুট উপরে

একটি পাথরের চাই-প্রকৃতি যেন তাদের জন্যে আগে থেকেই একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে রেখেছে। সেই প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্বিতীয় সিঁড়ি শুরু হল। সুতরাং তাদের ওঠানামা অপেক্ষাকৃত সহজসাধ্য হল। পেনক্র্যাফট টপকে শিখিয়ে দিতে শুরু করলে কী করে ওই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে হয়। টপ কিছুদিনের মধ্যেই সার্কাসের কুকুরের মতো ওই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত ওঠানামা করতে সক্ষম হল।

গোটা জুন মাসটা কাটল গ্র্যানাইট  হাউসকে গড়ে তুলতে। ইতিমধ্যে দিন ছোটো হয়ে আসছিল—আস্তে-আস্তে শীত পড়ছিল। শীতের সময় হয়তো সবদিন বাইরে বেরুনো সম্ভব না–ও হতে পারে, তাই শীতের জন্যে খাদ্য সঞ্চয় করা প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। হার্বার্ট আর স্পিলেটের উপর ভার পড়ল শিকারের। মার্সি নদীর পাশের অরণ্যে শিকারের অভাব। নেই। সুতরাং প্রত্যেকদিনই বেশকিছু পরিমাণ খাদ্য সংগৃহীত হতে লাগল। ইতিমধ্যে একদিন সীল শিকারেও বেরিয়েছিলেন সবাই। সীলের চর্বি দিয়ে মোমবাতি প্রস্তুত করা যায়। সেই মোমবাতি বানানোর জন্যেই সীল-শিকারে গেলেন সবাই। সৌভাগ্যবশত তিনটে সীল শিকার করা সম্ভব হল। সুতরাং কিছুকালের জন্যে যে আলোর ভাবনা ভাবতে হবে না, সেই আশ্বাস পেয়ে সবাই খুব খুশি হয়ে উঠলেন। সালের চামড়া দিয়ে সবাই একজোড়া করে জুতো তৈরি করে নিলেন। বলা বাহুল্য দেখতে জুতোগুলো ভালো হল না, কিন্তু কাজ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

জুন মাসের গোড়া থেকেই মাঝে-মাঝে কয়েক পশলা করে বৃষ্টি হতে লাগল। একদিন বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। সবাই সেদিন গ্র্যানাইট  হাউসের বৈঠকখানায় বসে মোমবাতি তৈরি করছিলেন। এমন সময় হঠাৎ হার্বার্ট চেঁচিয়ে উঠল : এই দেখুন ক্যাপ্টেন, একটা গমের দানা! এই বলে সে সবাইকে একদানা গম—মাত্র একটি দানা-দেখালো। দানাটা তার ওয়েস্ট-কোটের লাইনিং-এ আটকে ছিল। রিচমণ্ডে থাকতে হার্বার্ট কয়েকটা পায়রা পুষেছিল–নিজের হাতে তাদের সে খাওয়াতে। খুব-সম্ভব সেই সময়কারই গম এটি।

একটা গমের দানা? তক্ষুনি উৎসুক কণ্ঠে ক্যাপ্টেন শুধোলেন।

হ্যাঁ ক্যাপ্টেন। কিন্তু একটা–মাত্র একটা দানা!

পেনক্র্যাফট হো হো করে হেসে উঠল : একটা গমের দানা দিয়ে আমরা করবো–কী?

এমন কী চঁচিয়ে বলার মতো ব্যাপার এটা?

রুটি—আমরা রুটি পাবো এ থেকে! হার্ডিং বললেন।

রুটি, কেক-আরো কত-কী! হেসে উঠল পেনক্র্যাফট : চমৎকার! একটা মাত্র গমের দানা, অথচ তা নিয়ে কত স্বপ্ন!

হার্বার্ট দানাটা ফেলে দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় হার্ডিং দানাটা নিজের হাতে নিয়ে খুব ভালো করে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। একটু পরে পেনক্র্যাফটের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন : পেনক্র্যাফট, তুমি জানো একটা গমের দানা থেকে কটা অঙ্কুর হয়?

বিস্মিত হয়ে পেনক্র্যাফট বললে কেন? একটা বোধহয়।

না, দশটা। আর, একটা অঙ্কুরে কটা করে গমের দানা থাকে, জানো?

না।

প্রায় আশিটা। সাইরাস হার্ডিং বললেন : তাহলে, আমরা যদি এই গমের দানাটা রোপণ করি, তবে প্রথম বারে আটশোটা দানা পাব—দ্বিতীয় বারে তা থেকে পাবো ছশো চল্লিশ হাজার, তৃতীয় বারে পাঁচশো বারো লক্ষ, আর চতুর্থ বারে চারশো হাজার লক্ষেরও বেশি।

এই কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেল। সাইরাস হার্ডিং বলে চললেন : এই দ্বীপের আবহাওয়ায় বছরে দু-বার চাষ করা সম্ভব—সুতরাং দু-বছরের মধ্যেই আমরা বিরাট এক গম-খেতের মালিক হতে পারবো। সুতরাং হার্বার্ট, তোমার এই আবিষ্কার আমাদের কাছে। প্রায় অমূল্য। যে-কোনো কিছু-এখন যে-অবস্থায় আছি, তাতে প্রত্যেকটি তুচ্ছ জিনিশও আমাদের কাজে লাগবে, এ-কথা তোমরা কেউ ভুলে যেয়ো না, এই অনুরোধই তোমাদের করছি।

না ক্যাপ্টেন, না, আমরা কখনো ভুলবো না এ-কথা, উত্তর দিলে পেনক্র্যাফট : আচ্ছা এখন আমরা কী করবো?

এই গমের দানাটা রুইবো আমরা। উত্তর করলে হার্বার্ট।

হ্যাঁ। যোগ করলেন গিডিয়ন স্পিলেট : খুব সতর্কভাবে এটি রুইতে হবে। কেননা, এইটের ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ ফসল নির্ভর করছে।

যদি এটা থেকে অঙ্কুর না-বেরোয়? চেঁচিয়ে বললে পেনক্র্যাফট।

বেরুবেই। সাইরাসের দৃঢ় কণ্ঠ শোনা গেল।

সেদিন হল বিশে জুন। এই একটিমাত্র মহামূল্য গম রুইবার উপযুক্ত সময় তখন। প্রথমে ঠিক করা হল একটা টবের মধ্যে এটি রোয়া হবে, কিন্তু পরে ঠিক হল, প্রকৃতির হাতেই সব ভার ছেড়ে দেয়া হবে, মাটিতে রোয়া হবে এটি। সেইদিনই রোয়া হল এটি, আর কষ্ট করে না-বললেও চলে যে, যাতে এই পরীক্ষা সার্থক হয় সেজন্যে খুব সতর্ক ব্যবস্থা অবলম্বন করা হল।

আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় সবাই বেরিয়ে পড়লেন। গ্র্যানাইট  হাউস ছাড়িয়ে আরো উপরের দিকে উঠে একটা সমতল জমির উপর খুব ভালো করে জায়গা করা হল গমটি রুইবার জন্যে। তারপর এর চারিদিকে একটা বাঁশের বেড়াও দেয়া হল, যাতে কোনো জীবজন্তু এটাকে নষ্ট করতে না-পারে। যদি এই গমটি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে যায়, এই জনমানবহীন দ্বীপে আর-কোথাও আর-একটি গমের দানাও জোগাড় করা যাবে না।

.

১.১০ রহস্যের কালো মেঘ

সেইদিন থেকে পেনক্র্যাফট একদিনের জন্যেও তার গম-খেত দেখতে যেতে ভোলেনি।

যে-সব কীট সাহস করে ওই খেতের আশেপাশে ঘুরে বেড়াত, বলা বাহুল্য, তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র ক্ষমা প্রদর্শন করা হত না।

জুন মাসের শেষের দিকে আবহাওয়া ভয়ানক খারাপ হয়ে গেল। ভীষণ ঠাণ্ডা পড়ল দ্বীপে। উনত্রিশে জুন তো এমন ঠাণ্ডা পড়ল যে, যদি থার্মোমিটার থাকতো তবে তাতে নিশ্চয়ই কুড়ি ডিগ্রির বেশি তাপ ধরা পড়তো না। পরদিন এমন ঠাণ্ডা পড়ল যে তাকে তিরিশে জুন না-বলে অনায়াসে একত্রিশে ডিসেম্বর বলা চলে। মার্সি নদীর মুখে বরফ জমতে শুরু করল। লেক গ্ল্যান্টের দশাও শিগগিরই মার্সি নদীর মতো হয়ে গেল।

প্রায়ই সেই অসহ্য ঠাণ্ডার মধ্যে কাঠ আর কয়লা আনতে বেরুতে হত সবাইকে। এবার তাই মার্সি নদীকে কাজে লাগানো হল। কাঠ জড়ো করে বাণ্ডিল বেঁধে স্রোতে ভাসিয়ে দেয়া হলস্রোতে ভেসে-ভেসে তা গ্র্যানাইট  হাউসের প্রায় নিচে এসে উপস্থিত হওয়ায় অনেক পরিশ্রমের হাত থেকে রেহাই পেলেন তাঁরা।

এর মধ্যেই একদিন আবহাওয়া শুকনো থাকায় সবাই মিলে ঠিক করলেন, মার্সি নদী আর ক্ল অন্তরীপের মাঝখানের জায়গাটা দেখতে যাবেন। পাঁচই জুলাই সকাল ছটায় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই বেরিয়ে পড়লেন—তাঁদের অস্ত্র-শস্ত্র–মানে কুঠার, তীর-ধনুক, বল্লম ইত্যাদি নিয়ে। মার্সি নদীর জল সব বরফ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের পক্ষে বেশ সুবিধেই হল। বরফের উপর দিয়েই মার্সি নদী হেঁটে পেরুনো গেল। পেরুবার সময় হার্ডিং বললেন : কিন্তু এই বরফ তো আর চিরকাল মার্সি নদীর উপর সেতুর ভূমিকায় কাজ করবে না, সুতরাং আমাদের আরো-একটা কাজ বাড়ল। এখানে একটা সেতু তৈরি করতে হবে।

ক্ল অন্তরীপের মধ্যকার অঞ্চল গ্র্যানাইট  হাউসের পাশের অঞ্চলের থেকে একেবারে বিপরীত। এই দিককার জমি এত উর্বর যে দেখে রীতিমতো লোভ হয়। হার্ডিং এইসব দেখে বললেন : লিঙ্কন দ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল দেখছি বিভিন্ন রকম। একটা ছোট্ট দ্বীপের জমিতে এত বৈচিত্র্য যে কী করে সম্ভব, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। এই দ্বীপের প্রকৃতি আর গঠন ভারি অদ্ভুত। একটা মহাদেশের সংক্ষিপ্তসার যেন এই দ্বীপটি! আগে কোনো মহাদেশের অংশ ছিল বলে যদি জানা যায়, তাহলেও বিস্মিত হবো না।

কী! প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে একটি মহাদেশ! বিস্মিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট।

অসম্ভব কী? উত্তর দিলেন হার্ডিং:অস্ট্রেলিয়া, নিউ-আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলেশিয়া ইত্যাদি যে এক ছিল না, তা কে বলতে পারে? আমার তো মনে হয়, বিশাল সমুদ্রের মধ্যে যেসব ছোটোখাটো দ্বীপ দেখা যায় তা সেই ষষ্ঠ মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চুড়ো মাত্র–প্রাগৈতিহাসিক যুগে যে-মহাদেশটির অস্তিত্ব ছিল; এইসব চুড়ো ব্যতীত আজ তার আর কোনো চিহ্নই নেই।

হার্বার্ট বললে, আগে যেমন অ্যাটল্যান্টিস ছিল, ঠিক তেমনি?

হ্যাঁ, অবিশ্যি যদি অ্যাটল্যান্টিস কোনোকালে থেকে থাকে।

এই লিঙ্কন আইল্যাণ্ড সেই ষষ্ঠ মহাদেশের একাংশ তাহলে? প্রশ্ন করলে পেনক্র্যাফট।

সম্ভবত। হার্ডিং বললেন : দ্বীপের জমিতে এত বৈচিত্র্যর কারণ বোধহয় তা-ই।

প্রকৃতি-বিজ্ঞানের ছাত্র হার্বার্ট। সে বললে : এই দ্বীপে যে বিভিন্ন ধরনের বহু জীবজন্তু দেখা যায়, তা-ও বোধ হয় এই কারণেই।

হ্যাঁ। হার্ডিং উত্তর করলেন : আমার মত তাতে আরো টেকসই হল, পেনক্র্যাফট। আমরা এ ক-মাসে দেখেছি এই দ্বীপে অসংখ্য জীবজন্তুর বাস এবং আশ্চর্য, এত বিভিন্ন জাতের জীবজন্তু, এত বৈচিত্র্য তাদের মধ্যে যে তাই যদি বলা যায় লিঙ্কন আইল্যাণ্ড আগে এমন-কোনো মহাদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল বা ক্রমে-ক্রমে প্রশান্ত মহাসাগরের অতল গর্ভে স্থান নিয়েছে, তবে সে-কথা একেবারে উড়িয়ে দেয়া চলে না।

পেনক্র্যাফট বললে : তাহলে, দেখছি একদিন সেই প্রাচীন মহাদেশের অবশিষ্ট অংশও জলের তলায় অদৃশ্য হয়ে যাবে—আর এশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল জল ছাড়া আর-কিছু থাকবে না!

সম্ভবত! হার্ডিং বললেন : তাই বলে আমরা কাজে দিলে দেবে না বা হাল ছেড়ে দেবো না। সেই ভয়ংকর দিনটি আসতে এখনো ঢের বাকি আছে।

গোটা দিনটা ঘুরে-ঘুরে কাটল। খুব ভালো করে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করলেন হার্ডিং। সেদিন শিকারও পাওয়া গেল অনেক। সন্ধে পাঁচটার সময় তারা সবাই ফিরে চললেন এবং সন্ধে আটটার সময় গ্র্যানাইট  হাউসে এসে প্রবেশ করলেন।

পনেরোই আগস্ট পর্যন্ত ভয়ংকর ঠাণ্ডায় যেন জমে রইল লিঙ্কন দ্বীপ। ইতিমধ্যে তারা প্রসপেক্ট হাইটের আশপাশে বিভিন্ন স্থানে কয়েকটা ফঁদ পাতলেন। অতি সাধারণ সেই সব ফাঁদ। বড়ো-বড়ো গর্ত খুঁড়ে তার উপর ডাল-পালা পাতা বিছিয়ে রাখা হল। তারা কিন্তু দ্বীপের সব জায়গাতেই এইভাবে গর্ত খুঁড়লেন না। যে-সব জায়গায় জীবজন্তুর প্রচুর পায়ের ছাপ দেখা গেল শুধুমাত্র সেইসব জায়গাতেই এইরকম গর্ত খুঁড়ে-খুঁড়ে ফাঁদ। পাতা হল। প্রথম দিকে অবিশ্যি ফাদে কোনো জানোয়ার পড়ল না। কিন্তু আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মাঝে-মাঝে একাধিক জানোয়ার ফাঁদে পড়ল, তাদের মধ্যে একটি জাত উল্লেখযোগ্য। ঠিক বরাহ এদের বলা চলে না, বরং পিকারি বলেই এদের অভিহিত করা উচিত। এগুলো সেই বিরল জাতের পিকারি, যাদের দেখা সব জায়গায় পাওয়া যায় না। পেনক্র্যাফট তো তার শিকার পেয়ে মহা খুশি হয়ে উঠল।

পনেরোই আগস্ট থেকে দ্বীপের আবহাওয়া একটু-একটু করে ভালো হয়ে উঠতে লাগল। তাপ কয়েক ডিগ্রি বাড়ল। এর মধ্যেই কয়েকদিন প্রচুর বরফ পড়েছিল, এত প্রচুর পড়েছিল যে প্রায় দু-ফুট পুরু হয়েছিল সেই বরফের চাদর। এই তুষার-ঝড়ের জন্যে বিশে আগস্ট থেকে পঁচিশে আগস্ট গ্র্যানাইট হাউসের বাইরে তাঁরা বেরুতে পারলেন না। তাই বলে শুধু-শুধু বসে রইলেন না। অনেক কাঠ ছিল গ্র্যানাইট  হাউসে, তাই দিয়ে তাঁরা এ ক-দিনে টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি তৈরি করলেন। এই দ্বীপে এসে তারা যে কী-না করেছেন সে-কথা বলা দুষ্কর। প্রথমে তারা হলেন কুমোর, তারপর কাঠুরে, তারপর রাসায়নিক, এরপরে রাজমিস্ত্রি, এবারে ছুতোর আর ঝুড়িওয়ালা। সীলের চামড়া দিয়ে জুতোও বানিয়েছিলেন তারা।

আগস্টের শেষ দিকে আবহাওয়া আবার প্রসন্ন হয়ে উঠল। তুষারঝড় অন্তর্হিত হল। এবার তারা বাইরে বেরুতে সক্ষম হলেন। যদিও দু-ফুট পুরু বরফের চাদরে পথঘাট ঢেকে ছিল, তবু সেই কঠিন বরফের উপর দিয়ে চলতে তাদের খুব বেশি অসুবিধে হল না।

সারা দ্বীপ যেন শাদা হয়ে গেছে। মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের চুড়ো থেকে শুরু করে সমুদ্রসৈকত, অরণ্য, সমভূমি, হ্রদ, নদী সবকিছু শাদায়-শাদাময় হয়ে গেছে। হার্বার্ট, স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট গিয়ে তাদের ফাঁদগুলো পরীক্ষা করে এল। ফাঁদের আশপাশে জানোয়ারদের পায়ের অনেক ছাপ দেখা গেল, কিন্তু ফাদে একটিও জানোয়ার দেখা গেল না। বরং ফাঁদওলোয় এমন-কতগুলো থাবার দাগ দেখা গেল, বা গভীরভাবে মাটিতে বসে গেছে।

হার্বার্ট তীক্ষ্ণ চোখে থাবার দাগগুলো পরীক্ষা করে দেখলে, তারপর বললে : জাওয়ারের থাবার দাগ।

জাগুয়ার! পেনক্র্যাফট চেঁচিয়ে উঠল এই দ্বীপে তাহলে অমন হিংস্র জন্তুও আছে। সেইজন্যে ফাদে কোনো শিকার দেখা যাচ্ছে না! ওই ব্যাটা জাগুয়ারই সবগুলোকে সাবাড় করেছে!

স্পিলেট বললেন : এবার থোক আমাদের সকলের খুব সর্তক হয়ে চলা-ফেরা করা উচিত।

হ্যাঁ। পেনক্র্যাফট বললে : আজকেই গিয়ে ক্যাপ্টেনকে আবার বন্দুকের কথা বলতে হবে।

হ্যাঁ, দ্বীপে যখন বন্য জানোয়ার আছে তখন তাদের সবংশে বিনাশ করতেই হবে সবআগে। স্পিলেট বললেন।

সেদিন ফিরেই সব বলা হল হার্ডিংকে। হার্ডিং কিন্তু তখন বন্দুকের কথা ভাবছিলেন না—কাপড়-চোপড়ের সমস্যাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাংসাশী জাতীয় জীবের চামড়া কিংবা ভেড়া-জাতীয় প্রাণীর, যথা মুসমনের লোম দিয়ে কিছু জামাকাপড় বানাতেই হবে। তিনি আরো ভাবছিলেন, মুসমন ইত্যাদি জন্তুকে এবং বন্য মুরগি, বালি হাঁস ইত্যাদিকে পোষবার জন্যে একটা আস্তানা বানালে পর প্রত্যেকদিন শিকারে যাওয়ার হ্যাঙামা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে, অনেক কাজ হালকা হবে। তার মানে: শিকারেই যদি এত সময় নষ্ট হয়, তবে আর অন্যান্য কাজ করবার সময় পাওয়া যাবে কেথায়? কিন্তু তারও আগে এই দ্বীপের প্রত্যেকটি অংশ তন্ন-তন্ন করে পরীক্ষা করতে হবে। এখনো অধিকাংশ অঞ্চলই দেখে আসা হয়নি।

আবহাওয়া তখন বিশেষ অনুকূল ছিল না বলেই দ্বীপ-ভ্রমণের সংকল্প অল্পদিনের জন্যে স্থগিত রাখতে হল। একটু-একটু করে তাপ বাড়ছে তখন। বরফ গলতে শুরু করেছে। এ-ছাড়া দিনকয়েক প্রবল বর্ষণও চলল। এ ক-দিন গ্র্যানাইট  হাউসে বসে-বসে সবাই ঘরোয়া কাজগুলো সমাধা করলেন। কিন্তু এরমধ্যেই এমন-একটা ঘটনা ঘটল, যাতে সবাই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন, একটা আতঙ্ক এসে অধিকার করল তাদের মন; আর গোটা দ্বীপটা তন্ন-তন্ন করে পরীক্ষা করবার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে একটা দৃঢ় সংকল্পে পরিণত হল।

যে-দিনটির কথা বলছি, সেটি অক্টোবর মাসের চব্বিশ তারিখ। সেদিন পেনক্র্যাফট একাই তার ফাঁদগুলো পরীক্ষা করে দেখতে গিয়েছিল। দেখা গেল যে তিন-তিনটে প্রাণী ধরা পড়েছিল। তাই দেখে পেনক্র্যাফট তো আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠল। সেই তিনটে প্রাণী হল একটি স্ত্রী-পিকারি, আর দুটো খুব বাচ্চা।

পেনক্র্যাফট হৈ-হৈ করতে-করতে তার শিকার নিয়ে গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরল, ও বারকয়েক হুরে-হুরে বলে চ্যাঁচালে। তার শিকার দেখে অন্যরাও, বলা বাহুল্য, খুশি হয়ে উঠতে একটুও দেরি করলেন না।

পেনক্র্যাফট চেঁচিয়ে বললে : আজ আমাদের রীতিমতো একটা ভোজ হবে, ক্যাপ্টেন। আর মিস্টার স্পিলেট, আশা করি আপনিও আমাদের সঙ্গে আহারে বসে যৎসামান্য মুখে দেবেন।

আপনার নেমন্তন্ন পেয়ে আমি খুব সুখী হলম, পেনক্র্যাফট সাহেব! স্পিলেট বললেন : কিন্তু আজকের মেনুর প্রধান আকর্ষণটা কী বলুন তো?

বাচ্চা পিকারির মাংস!

বাচ্চা পিকারির মাংস! আমি তো তোমার চাচামেচি শুনে মনে করছিলুম না-জানি কী শিকার করে এনেছো?

আরো চাই! পেনক্র্যাফট বললে : আপনি দেখছি বাচ্চা পিকারির মাংস খেতে হবে শুনে নাক সিটকোচ্ছেন!

না, সে-কথা নয়। আমার বক্তব্য হল কারুই বেশি খাওয়া উচিত নয়। স্পিলেট বললেন : দ্বীপে তো আর ডাক্তার নেই! বেশি খেয়ে অসুখ বাধিয়ে বসাটা খুব-একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

সে-কথা ঠিক। কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন, সাত মাস আগে আমরা যখন এদ্বীপে এসে পৌঁছুই, তখন এ-রকম শিকার দেখলে পর আপনি স্বয়ং হৈ-চৈ বাধিয়ে বসতেন।

সাংবাদিক-সুলভ গাম্ভীর্য এনে আপ্তবাক্য আওড়ালেন স্পিলেট : মানুষ কখনো কোনো অবস্থাতেই সন্তুষ্ট হয় না, পেনক্র্যাফট।

আপনার বক্তৃতা বাদ দিন। পেনক্র্যাফট বললে : আমি জানি নেবের রান্নার কল্যাণে আজকের ভোজটা জমবে ভালো। এই ছোট্ট দুটো পিকারির বয়স তিন মাসের বেশি কোনোমতেই হবে না। সুতরাং খেতে চমৎকার লাগবে। এসো নেব, এসো আজ আমি নিজেই রান্নার তদারক করবো।

নেব আর পেনক্র্যাফট তক্ষুনি রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল।

রাত্তির বেলা গ্র্যানাইট  হাউসের ডাইনিং রুমে রীতিমত ভোজসভা বসে গেল। মাংসটা চমৎকার রান্না করেছে নেব। পেনক্র্যাফট অবিশ্যি বললে যে সে না-থাকলে কখনো নেব এত ভালো রান্না করতে পারতো না।

প্রত্যেকের প্লেটেই বিপুল পরিমাণ মাংস দেয়া হল। সত্যি, বাচ্চা পিকারিগুলো চমৎকার লাগল খেতে 1 পেনক্র্যাফট বড়ো একটুকরো মাংস তুলে মুখে পুরল আর পরক্ষণেই প্রচণ্ড চেঁচিয়ে উঠল। আর্ত স্বরে একটা শপথ করে উঠল সে।

কী হল আবার? জিগেস করলেন সাইরাস হার্ডিং।

কী হল? পেনক্র্যাফট বললে : হবে আবার কী? আমার একটা দাঁত ভেঙে গেছে!

তোমার মাংসে পাথরের কুচি ছিল? গিডিয়ন স্পিলেট প্রশ্ন করলেন।

তা-ই তো মনে হচ্ছে! এই বলে পেনক্র্যাফট মুখের ভিতর থেকে তার দাঁত-ভাঙার কারণটি বার করলে। কিন্তু–

কিন্তু জিনিশটা পাথরের কুচি নয়—একটা বন্দুকের গুলি!!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *