১.১-১.৫ ঝড়ের মধ্যে বেলুন

দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যাণ্ড ১
আকাশ থেকে পতন

১.১ ঝড়ের মধ্যে বেলুন

ঝোড়ো হাওয়ার গর্জনকে ছাপিয়ে হাওয়ায় একটা আর্ত স্বর বেজে উঠল, আমরা কি উপরে উঠেছি আবার?

উত্তর এল, না, আমরা নেমে যাচ্ছি।

অন্য আর-একটা গলা শোনা গেল, বেলুনের বোঝাগুলো কেউ তাড়াতাড়ি ফেলে দাও!

অনেক আগেই বেলুন খালি করে সব বোঝা ফেলে দেয়া হয়েছে।

তবু বেলুন একটুও উপরে উঠছে না?

সে-কথার কোনো উত্তর এল না, বরং আবার সেই প্রশ্নটাই করে বসলেন অন্য-কেউ : বেলুনটা কি একটু-একটু করেও উপরে উঠছে না?

না। নিচে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

একটা চীৎকার শোনা গেল, সর্বনাশ! বেলুনের ঠিক নিচেই সমুদ্র! বেলুন বোধহয় সমুদ্র থেকে পাঁচশো ফুট উপরে নেই!

তখন কে-একজন দ্রুত উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, বেলুনের উপর থেকে সব ভার ফেলে দাও–যা আছে সব ফেলে দাও! একটুও দেরি কোরো না।

***

আঠারোশো পঁয়ষট্টি খ্রিষ্টাব্দের তেইশে মার্চ বিকেল চারটের সময় তরঙ্গময় প্রশান্ত মহাসাগরের মাত্র পাঁচশো ফুট উপরে এই কথাগুলো শোনা যাচ্ছিল।

ওই বছর উত্তর-পুব দিক থেকে যে-সাংঘাতিক ঝড় বয়ে গিয়েছিল, এখনো হয়তো অনেকের সে-কথা মনে আছে। আঠারোই মার্চ থেকে ছাব্বিশে মার্চ পর্যন্ত—ন-দিন ধরে তুমুল ঝড় যে-সব উম্মত্ত কাণ্ড করে গিয়েছিল, বুড়োদের মুখে প্রায়ই তার ভয়াবহ বর্ণনা পাওয়া যায়। ওই ঝড়ে আমেরিকা, এশিয়া আর ইওরোপের অত্যন্ত ক্ষতি হয়েছিল। কত গাছপালা উপড়ে গেল, বড়ো-বড়ো নগর ধ্বংস হয়ে গেল, তার কোনো পরিমাণ করা যায় না। এই অপরিমেয় ক্ষতির সামান্য যে-বিবরণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল তা পড়েই শিউরে উঠতে হয়। প্রায় একশোটি জাহাজ তীরে আছড়ে পড়ে গুড়িয়ে গিয়েছিল, কত লোক যে মারা গিয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই।

জলে-স্থলে যখন এই ভয়ংকর ধ্বংসলীলা চলছিল, তখন ঝোড়ো আকাশে যেরোমাঞ্চকর নাটকের যবনিকা উঠেছিল, তাও তুলনায় কম রোমহর্ষক নয়।

সেই ঝোড়ো হাওয়ার তাড়নে আকাশ থেকে একটি বেলুন ঘুরতে-ঘুরতে নিচে নেমে আসছিল। বেলুনের তলায় ঝুলে ছিল একটি দোলনা। কুয়াশায় আকাশ এমনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল যে, বেলুনের আরোহী পাঁচজনকে দেখাই যাচ্ছিল না।

গন্তব্য পথের কোনো হদিশই নেই আরোহীদের। দিশেহারা হাওয়ায় তারা যে কোন পথে ভেসে চলেছেন, তার কিছু ঠিক ছিল না। তবে–অবাক শোনালেও কথাটা সত্যি যে-এত ঝড়েও তাদের খুব-একটা কষ্ট পেতে হয়নি।

মাতালের মতো ঘুরতে-ঘুরতে নিচে নামছে বেলুন। নিচে সমুদ্রের রাগি, বুনো, হিংস আওয়াজ, যার ভিতর ভয়ংকরের উদ্দাম দামামা বেজে চলেছে। বেলুন যে আর-কিছুক্ষণের মধ্যেই সমুদ্রের উপর আছড়ে পড়ে তলিয়ে যাবে, সে-বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু যাত্রীদের অবস্থাও এমনি অসহায় যে করবারও কিছুই নেই। উপরে প্রচণ্ড ঝড় বেলুনের ঝুঁটি ধরে নিষ্করুণভাবে নাড়ছে, নিচে রাগি সমুদ্র।

আরোহীরা আতঙ্কে অভিভূত হয়ে পড়লেন। আরোহীদের একজন প্রশ্ন করলে : এখন। কী করা যাবে?

উত্তর হল : বাজে জিনিশপত্র সব ফেলে দাও।

যাত্রীরা বেলুন থেকে সব জিনিশ ফেলে দিতে আরম্ভ করল। তুলনামূলকভাবে বিচার করে যে-জিনিশগুলোকে অপেক্ষাকৃত কম জরুরি বলে মনে হল, প্রথমটায় সে-সবই ফেলে দেয়া হল। কিন্তু তবু যখন বেলুন একটুও উপরে উঠল না, তখন খাবার-দাবার প্রভৃতি ফেলে দিতে পর্যন্ত কেউ কোনো দ্বিধা করলেন না। সলিল-সমাধির হাত থেকে উদ্ধার পেলে তারপর তো খাবার-দাবারের ভাবনা।

কাছাকাছি কোথাও ছোটোখাটো কোনো দ্বীপ আছে কি না তা বোঝা গেল না। নিচে শুধু জল আর জল-বেলুনের যাত্রীদের গ্রাস করবার জন্যে সমুদ্র যেন অধীর হয়ে উঠেছে। যেন প্রশান্ত মহাসাগরের সীমাহীন আলুথালু জলে কোনো ভয়ংকর পরিণামের অশুভ ইঙ্গিত ফেটে পড়তে চাচ্ছে।

অনেক জিনিশ ফেলে দেয়া হয়েছে বলে বেলুন একটু উপরে উঠল। হাওয়ার তাড়নে কাঁপতে-কাঁপতে সামনের দিকে এগিয়ে চলল। কিন্তু সেখানেই তো আর মহাসাগরের শেষ নয়। সুতরাং আবার যখন আমরা আবার নামছি এই তথ্য ঘোষণা করে একটি আর্তনাদ শোনা গেল, তখন সকলের শরীর আতঙ্কে শিউরে উঠল।

তাহলে শেষ পর্যন্ত সমুদ্র-সমাধিই আমাদের ভাগ্যে! আর্ত কণ্ঠে একজন বলে উঠল। আরেকজনের গলা শোনা গেল, সমুদ্র! ঢেউয়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি?

আমরা ড়ুবে মরব!

কে যেন ক্লান্ত স্বরে সাহস দিতে চেষ্টা করলেন, হতাশ হোয়ো না, এখনো সময় আছে।

কোথায় সময়! হতাশ গলায় আরেকজন বলে উঠল, আর আমাদের রেহাই নেই!

সব ফেলে দেয়া হয়েছে তো? না। আমাদের কাছে দু-হাজার টাকা আছে, তা এখনও ফেলে দেয়া হয়নি।

কথা শেষ হতে-না-হতেই দু-হাজার টাকা সমুদ্রে ফেলে দেয়া হল। ভার খানিকটা কমল বটে, কিন্তু বেলুন তবু উপরে উঠল না। আশঙ্কায় অবসাদে সবাই প্রায় নির্জীব হয়ে পড়ল। বেলুন খুব নিচে নেমে এসেছিল। প্রায় দুশো ফুট নিচে ক্ষুব্ধ মহাসাগরের ক্রুদ্ধ গর্জন বাজের মতো গড়িয়ে যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগর যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। যা-কিছু তার কবলে পড়বে, নিমেষের মধ্যে তা আত্মসাৎ করে নিজের অতলে টেনে নিতে এক মুহূর্তও দেরি করবে না।

দৃঢ়স্বরে একজন বলে উঠলেন, একটা কাজ করলে হয় না? বেলুন থেকে যেদড়িগুলো ঝুলছে, সেই দড়িগুলোতে নিজেদের শরীর বেঁধে নিয়ে যদি এই বসবার দোলনাটাকে খুলে ফেলে দিই, তাহলে, আমার বিশ্বাস, অনেকটা ভার কমে যাওয়ায় বেলুন ফের উপরে উঠবে।

জলে ড়ুবে মরতে বসলে লোক খড়কুটোকেও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একটা সম্ভাবনার সন্ধান পেয়ে সকলেই চেঁচিয়ে উঠলেন, ঠিক বলেছেন, ক্যাপ্টেন!

বেলুনের দড়ির সঙ্গে নিজেদের শরীর কঠিনভাবে বেঁধে নিলে সকলে। ক্যাপ্টেনের প্রভুভক্ত কুকুর টপকেও একটা দড়িতে বেঁধে দেয়া হল। তারপর খুলে দেয়া হল দোলনাটাকে।

বিপুল ভার কমে যাওয়ায় বেলুন এবার হু-হু করে উপরে উঠতে লাগল। প্রায় দুহাজার ফুট উপরে উঠে গিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলল ঝোড়ো হাওয়ায়। এমনিতেই প্রচণ্ড ঝড় আর ঘন কুয়াশা, তার উপর আবার রাত্রি ঘনিয়ে আসছে। পাঁচটি মানুষ বেলুনের দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে চলেছে। কারু মুখেই টু-শব্দ নেই, শুধু মাঝে-মাঝে ক্যাপ্টেনের কুকুর টপ চেঁচিয়ে উঠছিল। এ-ভাবে ঝুলে যেতে তার নিশ্চয়ই খুব অসুবিধে হচ্ছিল।

কয়েকশো মাইল নির্বিঘ্নে অগ্রসর হবার পর আবার তাদের ভাগ্যের আকাশে ঝড়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। তীব্র পাক খেয়ে নিচে নেমে এল বেলুন। এবার আর নিষ্কৃতি নেই, সকলে হতাশ হয়ে মৃত্যুর জন্যে তৈরি হল। দৈব সহায় না-হলে এবার আর রক্ষা নেই। বেলুন যেন নিশ্চত মৃত্যুর দিকে তীব্র বেগে নেমে আসছে।

নিচে, অনেক নিচে নেমে এল বেলুন। সমুদ্র আর একশো ফুট তলায়, তবু এখনো নামছে। বিপদের আর দেরি নেই বুঝে সবাই ভয়ে চোখ বুজল।

হঠাৎ প্রবল এক ঘূর্ণিহাওয়া বেলুনটার ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে গেল। ক্যাপ্টেন চেঁচিয়ে বললেন, শরীর থেকে বেলুনের দড়িগুলো শিগগির সবাই খুলে ফ্যালো, সাঁতার দেয়ার সুবিধে হবে। না-হলে ড়ুবে মরার আশঙ্কা আছে।

শরীর থেকে দড়ির বাঁধন খুলে হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রইলেন সকলে। টপ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চীৎকার করে উঠল। আর-একটা দমকা হাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে বেলুনটা আছড়ে পড়ল সমুদ্রে। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন, টপ নিশ্চয়ই কিছু একটা দেখতে পেয়েছে!

কিন্তু হঠাৎ সমুদ্রের তীরে আরেকটা বিপরীত তরঙ্গের ধাক্কা খেয়ে বেলুনটা ছিটকে আকাশে উঠে পড়ল। তারপর সমুদ্রের সামান্য উপর দিয়ে আরোহীদের নিয়ে উড়ে চলল। কয়েকশো ফুট চলে যখন বেলুনটা আবার নিচে পড়ল, তখন আরোহীরা পায়ের তলায়

জলের বদলে ডাঙার স্পর্শ পেলে।

আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল একজন, মাটি! মাটি! ডাঙা! আমরা কোনো মহাদেশে বা দ্বীপে এসে নেমেছি।

রাত্রির দুর্নিরীক্ষ্য অন্ধকারে দৃষ্টি চলল না। কিছুই দেখবার উপায় নেই। যেখানে সবাই নামল সেটা ছোটোখাটো কোনো দ্বীপ, না কোনো মহাদেশের একাংশ, তা কেউ জানতে পারল না। কিন্তু দ্বীপই হোক আর মহাদেশই হোক, প্রাণ যে বেঁচেছে এইটেই ঢের। পায়ের তলায় ডাঙার স্পর্শ পেয়ে যেন নতুন জীবন পেলে সবাই। এবার কী করা যায় তার পরামর্শ করবার যখন উদ্যোগ হল, তখন একজন বলে উঠল : আরে! ক্যাপ্টেন কোথায়? তার গলার আওয়াজ তো পাচ্ছি না।

সে-কথায় সকলের চমক ভাঙল। সত্যিই তো, ক্যাপ্টেন তাহলে গেলেন কোথায়? টপকেই বা দেখা যাচ্ছে না কেন?

.

১.২ কে, কেন, কবে, কোথায়

আরোহী ক-জনকে নিয়ে বেলুনটা কোত্থেকে এসেছে, সে কথা জানবার জন্যে অনেকের কৌতূহল হতে পারে। বিশেষ করে এইরকম দুর্যোগের মধ্যে আকাশে ওঠবারই বা এমন কী দরকার পড়েছিল, সে-প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয়।

ঝড় শুরু হয়েছে পাঁচদিন হল। আঠারোই মার্চ থেকেই ঝড়ের কিছু-কিছু আভাস পাওয়া গিয়েছিল। এই তীব্র ঝড়ের পাল্লায় পড়ে বেলুনটা যে অনেক দূরের দেশ থেকে তীরবেগে ছুটে এখানে পড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

শখ করে এঁরা কেউই এই ভয়ংকর ঝড়ের মধ্যে আকাশ-বিহারে বের হননি, বা নেহাৎ দৈবাৎও এ-ঘটনা ঘটেনি। যে কজন আরোহী এই বেলুনের, তারা সবাই ছিলেন রিচমণ্ড শহরের বন্দী। বন্দিত্বের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যেই তাঁরা এই বেলুনের সাহায্য নিয়েছিলেন। আসল ঘটনাটি হল এইরকম :

আঠারোশো পঁয়ষট্টি খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকায় যে-গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তার মুলে ছিল ক্রীতদাস প্রথা উচ্ছেদের সংকল্প। লড়াইয়ের বিস্তারিত বর্ণনায় আমরা যাবো না। শুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট যে, গৃহযুদ্ধ বন্ধ করবার জন্যে দাসপ্রথা উচ্ছেদকারীদের দল বিশেষভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাদের একজনই হলেন জেনারেল গ্র্যান্ট জেনারেল গ্র্যান্ট মরিয়া হয়ে রিচমণ্ড শহর আক্রমণ করেন। কয়েক জায়গায় জায়লাভ হল বটে কিন্তু রিচম কিছুতেই দখল করা গেল না।

এই লড়াইয়ের সময় জেনারেল গ্রাস্টের জনকয়েক বড়ো অফিসার শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়েন। ক্যাপ্টেন সাইরাস হার্ডিং তাদের অন্যতম। সাইরাস হার্ডিংএর মতো সুদক্ষ এঞ্জিনিয়ার বিরল। সরকারের তরফ থেকে তাকে লড়াইয়ের এলাকায় রেলপথ নির্মাণের জন্যে নিযুক্ত করা হয়। সাইরাস হার্ডিংএর বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর। অনতিদীর্ঘ দেহ, ছিপছিপে চেহারা। শরীরের গড়ন যেন লোহা পেটানো।

সাইরাস হার্ডিংএর কর্মজীবন শুরু হয় অতি সামান্যভাবে। তার বুদ্ধি যেমন তীক্ষ্ণ ছিল, কর্মক্ষমতাও ছিল তেমনি আশ্চর্য। এইজন্যেই অল্প দিনের মধ্যেই হার্ডিং জীবনে উন্নতি করতে পেরেছিলেন। যে উদগ্র অভীপ্সার বলে চিরকাল সব কাজে জয়লাভ করা যায়, সেই দৃঢ় অভীপ্সার ছিল হার্ডিংএর।

যেদিন হার্ডিং গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, সেদিন আরো-একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। নিউইয়র্ক হেরাল্ড-এর প্রধান সাংবাদিক গিডিয়ন স্পিলেটও সেদিন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁকেও রিচমণ্ডে আনানো হয়েছিল।

অকুতোভয় গিডিয়ন স্পিলেট সংবাদ সংগ্রহের জন্যে ভয়ংকর বিপদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তেও ইতস্তত করতেন না। অন্যান্য খবরের কাগজের চেয়ে অনেক আগেই যাতে নিউইয়র্ক হেরাল্ড খবর জোগাড় করতে পারে, সেদিকে তার তীক্ষ্ণ নজর ছিল। শালপ্রাংশু দেহ তার। বয়স বছর চল্লিশের মতো। তার অনন্যসাধারণ বুদ্ধি, প্রচণ্ড উদ্যম আর উৎসাহ অন্যান্য সাংবাদিকদের ঈর্ষার বস্তু হয়ে উঠেছিল। সে-সময় যতগুলো লড়াই হয়েছিল তার প্রায় প্রত্যেকটিতেই খবর জোগাড় করবার জন্যে স্পিলেট উপস্থিত থাকতেন { অগুনতি গোলা-গুলির মাঝখানে ঠাণ্ডা মাথায় খবর জোগাড় করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। তার কর্তব্যজ্ঞান ছিল প্রখর। একহাতে রিভলভার আর অন্যহাতে পেন্সিল নিয়ে খবর লিখতেন তিনি। বিপদের মুহূর্ত পর্যন্ত খবর লিখে চলতেন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তার ডায়েরিতে এই পর্যন্ত লেখা ছিল : একজন সৈনিক আমার দিকে তার বন্দুক উঁচিয়ে লক্ষ্য স্থির করছে, কিন্তু লাইনটা আর শেষ হয়নি। এরপর স্পিলেট কী লিখতেন, তা অনুমান করা মোটেই কঠিন নয়। তিনি লিখতেন : কিন্তু সে আমায় শেষ পর্যন্ত গুলি না-করে গ্রেপ্তার করল।

এর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, তার সাহস আর কর্তব্যজ্ঞান কী অনন্যসাধারণ। তিনি গুলি খেতে চলেছেন, কিন্তু তবু খবর লিখতে তার বিরতি নেই।

ক্যাপ্টেন সাইরাস হার্ডিং আর গিডিয়ন স্পিলেট যখন রিচমণ্ডে বন্দী হলেন, তখন এঁদের মধ্যে কোনো আলাপ-পরিচয়ই ছিল না। কিন্তু দুজনেই দুজনের বিপুল খ্যাতির কথা শুনেছিলেন। সুতরাং দুজনের মধ্যে আলাপ জমে উঠতে দেরি হল না। বিশেষ করে তারা দুজনেই একই দলের লোক, আর দুজনেরই উদ্দেশ্য হল, কী করে পালানো যায়।

কিন্তু পালাবার কোনো পথ ছিল না। শহরের মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর অধিকার অবিশ্যি তাঁদের ছিল, কিন্তু শহরের বাইরের বেরুনোর পথ ছিল বন্ধ। শহরের প্রত্যেকটি বহিদ্বারে কড়া পাহারা, ভেতরেও পাহারা। সেই পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে পালানোর কোনো জো ছিল না। বাইরের লোকের পক্ষে ভিতরে আসা অবিশ্যি ততটা অসুবিধের ছিল না, কিন্তু রিচমণ্ড ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ছিল একেবারে অসম্ভব।

সাইরাস হার্ডিংএর প্রভুভক্ত নিগ্রো ভৃত্য একদিন রিচমণ্ডে হার্ডিংএর কাছে পালিয়ে এল। এতদিন সে হার্ডিংএর বাড়িতেই ছিল। কিন্তু যখন সে শুনল যে সাইরাস হার্ডিংকে শত্রুপক্ষের

লোকেরা গ্রেপ্তার করেছে, তখন সে বিন্দুমাত্র বিলম্ব না-করে টপকে সঙ্গে করে চলে এল। ভৃত্যটির নাম নেবুশ্যাডনেজার, ওরফে নেব।

এদিকে জেনারেল গ্র্যান্ট রিচমণ্ড দখল করবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তিনি রিচমণ্ড দখল করলে শহরের লোকদের পক্ষে বেরুনোর পথ সুগম হত, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে সেসম্ভাবনা সুদূরপরাহত ছিল। যারা ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্যে রিচমণ্ডে এসেছিল, লড়াই শুরু হওয়ায় ভেতরে আটকা পড়ে তারাও দারুণ অসুবিধেয় পড়ল। রিচমণ্ডের অনেকেই পালানোর জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

এর কিছুদিন বাদেই এ্যান্টের ফৌজ বাইরে থেকে রিচমণ্ড অবরোধ করল। শহরের শাসনকর্তা জেনারেল লী তখন প্রমাদ গুনলেন। এমনভাবে শহরটা অবরোধ করা হয়েছিল যে বাইরে কোনো খবর পাঠানোও অসম্ভব হয়ে উঠল, কাজেই জেনারেল লীও আর বাইরে তাঁর ফৌজের কম্যাণ্ডারের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে পারলেন না। বাইরে লড়াইয়ের হালচাল যে কেমন, তাও তিনি জানতে পারলেন না।

অনেক ভেবেচিন্তে জেনারেল লী বাইরে খবর পাঠানোর জন্যে এক উপায় বের করলেন। তখনকার দিনে বেলুনই ছিলো একমাত্র আকাশ-যান। বেলুনে করে কয়েকজন লোককে বাইরে পাঠিয়ে লড়াইয়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, আর ফৌজের অধিনায়ককে সকল খবর জানানো হবে ঠিক হল। সেইজন্যে শিগগিরই একটা বেলুন তৈরি করা হল। কয়েকজন লোকের উপযোগী চলনসই-গোছের একটা দোলনা বেলুনের তলায় ঝুলিয়ে দেয়া হল। আঠারোই মার্চ রওনা হওয়ার কথা, কিন্তু সেদিন সকাল থেকেই আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা দেখা গেল।

রিচমণ্ডের অনেকেই যে পালানোর জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল, সে-কথা আগেই বলা হয়েছে। পেনক্র্যাফট নামে একটি নাবিক এই বেলুন তৈরির খবর শুনে একটু উৎসাহিত হয়েছিল। সে খবর নিয়ে জানলে যে ক্যাপ্টেন ফরেস্টারের নেতৃত্বে কয়েকজন সৈনিক বেলুনে করে আঠারোই মার্চ সকালবেলা রওনা হবে। ঘুম থেকে উঠেই আকাশে ঝড়ের পূর্বাভাস দেখে পেনক্র্যাফট উৎসাহিত হয়ে উঠল। যে-ময়দানে বেলুনটা যাত্রার জন্যে তৈরি হয়েছিল, সেই সাত-সকালেই পেনক্র্যাফট সেখানে গিয়ে হাজির হল। সে আড়াল থেকে দেখতে পেলে, জেনারেল লী, ক্যাপ্টেন ফরেস্টার এবং কয়েকজন সৈনিক বেলুনের কাছে দাঁড়য়ে কথা বলছে। সে একটু দূর থেকে ওদের কথা শোনাবার চেষ্টা করলে। সে শুনতে পেলে ক্যাপ্টেন ফরেস্টার বলছেন : যতক্ষণ-না এই ঝোড়া হাওয়া কমছে, ততক্ষণ রওনা হওয়া যাবে না, জেনারেল। এ-যে দেখছি রীতিমত হারিকেন!

জেনারেল লী সে-কথায় সায় দিলেন : আপনি ঠিকই বলেছেন, ক্যাপ্টেন ফরেস্টার। এই ঝড়ের মধ্যে রওনা হলে নির্ঘাত মরতে হবে। বরং কাল সকালে রওনা হলে ভালো হবে।

তাহলে সবাই তৈরি হয়ে থেকো। কাল সকালেই রওনা হওয়া যাবে। কিন্তু দেখো, বেলুনটা নিয়ে যেন অন্যরা আবার না-পালায়।

আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন জেনারেল, এই প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে সাধ করে মরতে কেউ বেলুনে উঠবে না।

ওদের এই কথা শুনে পেনক্র্যাফট মনে-মনে বললে : আমি নিশ্চিত জানি ক্যাপ্টেন হার্ডিং এই সুযোগ ছাড়বেন না। আবহাওয়া অবিশ্যি বিচ্ছিরি ননাংরা হয়ে আছে। কিন্তু সেইটেই তো আমাদের সুযোগ! তক্ষুনি পেনক্র্যাফট হার্ডিংএর খোঁজে রওনা হয়ে পড়ল।

হার্ডিং তখন দু-একটি দরকারি জিনিশপত্র কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলেন। রাস্তাতেই পেনক্র্যাফটের সঙ্গে তার দেখা হল। পেনক্র্যাফট তাকে বললে :

আমার একটা কথা শুনবেন, ক্যাপ্টেন হার্ডিং?

হার্ডিং পেনক্র্যাফটের মুখের দিকে তাকালেন।

পেনক্র্যাফট তখন বললে : আপনি কি এখান থেকে পালিয়ে যেতে চান?

অন্যমনস্কভাবে হার্ডিং শুধোলেন : কখন?

আজকেই–বলে পেনক্র্যাফট তার জবাবের প্রতীক্ষা করতে লাগল।

সাইরাস হার্ডিং পালানোর জন্যে এত উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন যে, পালানোর নামেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। একটু বাদেই তার হুঁশ হল। পেনক্র্যাফটের নীল কামিজের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে তিনি বললেন : কী বলছিলে তুমি?

পেনক্র্যাফট উত্তর করলে : এখান থেকে পালানোর কথা বলছিলুম, ক্যাপ্টেন। আমাকে আপনি সন্দেহ করবেন না, কোনো বদ মৎলব আমার নেই। আমি আপনার নাম জানি এবং আপনাকে চিনিও। অবিশ্যি আপনাকে কে-ই বা না-চেনে? তবে আমার মতো একজন সামান্য নাবিককে অবিশ্যি আপনি চিনবেন না। যা-ই হোক, আজ সে-সুযোগ পাওয়া গেছে

অসহিষ্ণ হয়ে উঠলেন হার্ডিং। পেনক্র্যাফটের কথায় বাধা দিয়ে বলে উঠলেন : সুযোগ! কী এমন সুযোগ তুমি পেয়েছো?

বেলুন, কাপ্টেন হার্ডিং, বেলুন! বেলুনে করে উড়ে পালানোর সুযোগ পাওয়া গেছে। আপনি রাজি হলে আজ রাত্রেই আমরা পালিয়ে যেতে পারি!

জেনারেল লী-র বেলুনের কথা হার্ডিংও শুনেছিলেন, কিন্তু তারই সাহায্যে পালানোর মৎলব তার মাথায় আসেনি! উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, বাঃ! চমৎকার! এই সহজ ব্যাপারটা এতক্ষণ আমার মগজে আসেনি! আমি একটা গাধা! আমার নতুন বন্ধুটির নাম জানতে পারি কি।

পেনক্র্যাফট। নাবিক পেনক্র্যাফট।

তারপর দুজনের মধ্যে কথাবার্তা চলতে লাগল। পেনক্র্যাফট জানালে, অনেকদিন রিচমণ্ডে আটকা থেকে সে অস্থির হয়ে উঠেছে। ব্যাবসা উপলক্ষে সে রিচমণ্ডে এসেছিল। তার সঙ্গে তার স্বৰ্গত প্রভুর একটি কুড়ি বছরের ছেলে আছে। আগে সে এই যুবকটির বাবার জাহাজে কাজ করত। বছর কয়েক আগে প্রভুর মৃত্যু হয়, এবং বদ লোকে নানানভাবে প্রভুপুত্রকে একেবারে সর্বস্বান্ত করে ফ্যালে। সে এখন নিজেই একটা ব্যাবসা খুলে প্রভুপুত্রকে নিজের কাছে রেখেছে। ব্যাবসা উপলক্ষে এই শহরে আসবার পর আর বেরুতে না-পেরে তারা অসুবিধেয় পড়েছে।

কথা বলতে-বলতে পেনক্র্যাফটকে সঙ্গে নিয়ে সাইরাস হার্ডিং গিডিয়ন স্পিলেটের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। সব কথা শুনে স্পিলেটও আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। তারপর তিনজনে বসে অনেকক্ষণ ধরে শলা-পরামর্শ চলল। ঠিক হল, দরকারি জিনিশপত্র সঙ্গে নিয়ে সেদিনই রাত দশটায় যাত্রা করা হবে। রাত্রে কোথায় সবাইকে মিলতে হবে, তাও ঠিক করা হল।

হার্ডিং শুধু বললেন : ঈশ্বর করুন, ঝড় যেন না-কমে।

পেনক্র্যাফট বললে : আশ্চর্য সুযোগ পাওয়া গেছে। ঝড়ের জন্যে রাত্রে বেলুনের কাছে পাহারাও থাকবে না।

একটা শক্ত খুঁটিতে দড়ি দিয়ে বেলুনটাকে খুব ভালো করে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সকাল থেকেই জোরে হাওয়া বইছিল, আকাশের হালচালও ভালো ছিল না। হার্ডিংএর ভয়। হল, পাছে দড়ি ছিঁড়ে বেলুনটা আকাশে উড়ে যায়। তাই তিনি শহরতলির ময়দানে গিয়ে দূর থেকে বেলুনটাকে একবার দেখে এলেন।

রাত্রির নিরেট অন্ধকারে যখন সারা রিচম ঢাকা পড়ে গেল, তখন যাওয়ার জন্যে তৈরি হতে লাগলেন সবাই। খাবার-দাবার, জল ইত্যাদি দরকারি জিনিশ গুছোতে.গুছোতে হার্ডিং কুকুর টপকে বললেন, আকাশে উড়তে তোর ভারি মজা লাগরে, না রে টপ? এ কিন্তু ভারি বিপজ্জনক। আমরা মারাও পড়তে পারি।

স্পিলেট তখন তৈরি হয়ে হার্ডিংএর বাসায় এসে হাজির হয়েছিলেন। হার্ডিংএর কথা শুনে বললেন, আপনি যখন আমাদের নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন আমি অসাফল্যের ভয় করি না, ক্যাপ্টেন।

একটু পরেই ক্যাপ্টেন হার্ডিং আর স্পিলেট নেব আর টপকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। বেলুনটাকে যে-মাঠে রাখা হয়েছিল, সেই মাঠের কাছেই নির্দিষ্ট জায়গায় পেনক্র্যাফট আর তার প্রভুপুত্র হার্বার্টের সঙ্গে তাঁদের দেখা হল। হার্ডিংদের আসতে দেরি দেখে পেনক্র্যাফট তখন বলছিল, ক্যাপ্টেন হার্ডিংরা এখনও এলেন না। যে-তুমুল ঝড় তাতে যে-কোনো মুহূর্তে বেলুনটা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই টপের গলার ডাক শুনে সে চেঁচিয়ে বললে, একটু শিগগির করুন, ক্যাপ্টেন হার্ডিং! নইলে পরে হয়তো পস্তাতে হবে, সব প্ল্যানই ভেস্তে যাবে।

মাঠে তখন একজনও পাহারাওলা ছিল না। ওই দুর্যোগের রাতে বেলুন পাহারা দেয়া তারা দরকার মনে করেনি। সবাই অন্ধাকারে গা-ঢাকা দিয়ে নির্বিঘ্নে গিয়ে বেলুনে চেপে বসলেন। এক-এক করে বেলুনের সবগুলো দড়ি কেটে দেয়া হল। অমনি শাঁ-শাঁ করে। মহাশূন্যে উঠে গেল বেলুন, তারপর তীব্র গতিতে হাওয়ার টানে ভেসে চলল।

এরই কয়েকদিন পরের ঘটনা আগেই বলা হয়েছে। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে সবাই যখন মুখর হয়ে উঠেছেন, তখুনি দেখা গেল, তাদের অধিনায়ক সাইরাস হার্ডিং নিখোঁজ। হার্ডিংএর কুকুর টপ-টপই বা গেল কোথায়? হার্ডিং হয়তো কাছাকাছি কোথাও আছেন, এই ভেবে সবাই অনেক ডাকল তার নাম ধরে। কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। সাইরাস হার্ডিং তবে গেলেন কোথায়?

.

১.৩ নেব্‌ কোথায় গেল

ক্যাপ্টেন হার্ডিং কোথায় গেলেন?

দুর্নিরীক্ষ্য অন্ধকারে স্পিলেটের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ক্যাপ্টেন হার্ডিং কোথায় গেলেন?

বেলুন সমুদ্রে আছড়ে পড়বার আগের মুহূর্তে ক্যাপ্টেনের গলা শোনা গিয়েছিল। সুতরাং সমুদ্রে আছড়ে পড়ার পর থেকেই তিনি দল-ছাড়া হয়ে পড়েছেন। কাজেই সকলেরই আশা ছিল, ক্যাপ্টেনকে শিগগিরই খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু তবু একটা ভাবনার বিষয় ছিল। বেলুনটা যখন জলে আছড়ে পড়েছিল তখন যদি তিনি জলে পড়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে সমুদ্রের ঢেউয়ে সাঁতার কেটে তীরে ওঠা সহজ ব্যাপার হবে না। তাছাড়া তিনি জানতেও পারবেন না কাছে কোথাও তীর আছে কি না। চারদিকেই সীমাহারা বিস্তীর্ণ সমুদ্র ভেবে হতাশ হয়ে সাঁতার কাটবার চেষ্টা না-ও করতে পারেন। এই সন্দেহটাই ভাষা পেল পেনক্র্যাফটের গলায় : উনি নিশ্চয়ই সমুদ্রে পড়ে গেছেন।

হাবার্ট বললে, কিন্তু আমরাই বা কোথায় এসে নামলুম?

সে-প্রশ্নের উত্তর পরে খুঁজলেও চলবে। স্পিলেট বললেন, এখন সবাই চলো দেখি। হয়তো ক্যাপ্টেন হার্ডিং সৎরে তীরে এসে উঠেছেন।

তারপর সেই অন্ধকার রাত্রেই ক্যাপ্টেন হার্ডিংএর খোজে সবাই এগিয়ে চললেন। রাত্রির অন্ধকারে তারা দিক ঠিক করতে পারলেন না, তবু বেলুনটা যেদিক থেকে এসেছিল মনে হল, ক্যাপ্টেনের খোঁজে সেদিকেই পা চালালেন সকলে। অম্বেষণ শুরু হল।

নেব প্রভুকে না-দেখতে পেয়ে ক্রমশই অধীর হয়ে উঠছিল। সকলে যাতে ভালো করে অনুসন্ধান করে, সেইজন্যে সে বললে, ক্যাপ্টেনকে আমাদের খুঁজে বার করতেই হরে। নইলে এই অজ্ঞাত দ্বীপে আমাদের পদে-পদেই বিপদের সম্ভাবনা।

নিশ্চয়ই! বলে স্পিলেট নেবকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন।

কিন্তু পরমুহূর্তেই কী-একটা কথা মনে হতে নেব শিউরে উঠল। যে-সন্দেহটা সে অনেক্ষণ জোর করে চেপে রাখবার চেষ্টা করছিল, এবার সেই প্রশ্নটাই সে জিগেস করে বসল: কিন্তু তাকে আর জীবিত অবস্থায় পাওয়া যাবে কি? আপনাদের কী মনে হয়?

সকলের মনেই এই সন্দেহটা তোলপাড় করছিল, আর সকলেই এই সন্দেহকে মন থেকে তাড়াবার চেষ্টা করছিল। এবার নেব সরাসরি তার সন্দেহ প্রকাশ করবার পর কেউই কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। দেবার সাহসও করলেন না। সমুদ্রে যদি পড়ে থাকেন, তবে ক্যাপ্টেন হার্ডিংকে আর না-পাওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। তবে যদি কাছেই কোথাও ভাঙায় পড়ে গিয়ে থাকেন তাহলে তাঁকে পাওয়া গেলেও যেতে পারে।

থেকে-থেকে সাইরাস হার্ডিংএর নাম ধরে জোর গলায় ডাকতে-ডাকতে সবাই অন্ধকারে আস্তে-আস্তে পথ চলতে লাগলেন। প্রতি পদক্ষেপেই বিপদের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কারণ সেই ভূখণ্ডে কোথায় কী আছে, তা তারা জানতেন না। সুতরাং একবার অন্ধকারে অসাবধানে কোথাও পা দিলেই কোখেকে কী হয়ে যাবে, কে জানে? হার্বার্ট বললে, হয়তো ক্যাপ্টেন হার্ডিং আহত হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় কোথায় পড়ে আছেন, তাই আমাদের ডাকে সাড়া দিতে পারছেন না।

তবে এক কাজ করা যাক–পেনক্র্যাফট বললে, যদি তা-ই হয়, তবে পথের মধ্যে জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে যাওয়া উচিত। তাহলে জ্ঞান ফিরলে সকালে উঠে হাঁটতেহাঁটতে ক্যাপ্টেনের মতো বুদ্ধিমান লোক নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন আমরা কোন পথে গেছি।

স্পিলেট এ-কথায় সায় দিলেন : ঠিক বলেছো, পেনক্র্যাফট। দ্যাখো তো নেব, আশপাশে কোথাও শুকনো ডালপালা কাঠকুটো কিছু পাও কি না।

হার্বার্ট শুধোলে, কারু কাছে দেশলাই আছে কি?

আছে, আমার কাছে। পেনক্র্যাফট উত্তর দিলে : দেশলাইটা আমি পোশাকের ভিতর এমন যত্ন করে রেখেছিলুম যে, জলে পড়বার সময়ও সেটা ভেজেনি।

কিন্তু, দেশলাইটা থাকলেও শুকনো বা কঁচা কোনোরকম ডালপালা পাওয়া গেল না। কাঠকুটোর সন্ধানে খানিকক্ষণ খামকা এদিক-ওদিক খুঁজে ফিরে এসে নে জানালে, না। গাছপালা কাঠকুটো কিছু পেলুম না।

জায়গাটা তবে বোধহয় মরুভূমির মতো, উদ্ভিদবিহীন, স্পিলেট বললেন : কোনো গাছপালাই বোধহয় এই পাথুরে জমিতে জন্মায় না।

খুঁজতে-খুঁজতে আরো কিছু দূর তারা এগিয়ে গেলেন। হঠাৎ সামনে আওয়াজ শুনে বোঝা গেল যে কাছেই জল রয়েছে, এবং এবার পথ বন্ধ। নে খুব জোরে জোরে হার্ডিংএর নাম ধরে ডাকতে লাগল। অবাক হয়ে সবাই শুনলেন, দূর থেকে নেএর ডাকের প্রতিধ্বনি

ভেসে আসছে।

পেনক্র্যাফট নাবিক। সে বললে, নিশ্চয়ই এইটে একটা নদী। এর ওপারে আর-একটা ভূখণ্ড আছে। নইলে নেবএর ডাকের প্রতিধ্বনি কখনো ভেসে আসতো না। যদি আমাদের ওপাশে ভূখণ্ড বা দ্বীপ না-থাকত, তবে বিশাল সমুদ্রে নেএর কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি উঠত—সেই স্বর অনেক দূরে চলে যেত।

স্পিলেটও তার কথার সমর্থন করলেন : আমারও তা-ই মনে হয়। কারণ, যদি এর চারদিকেই সমুদ্র থাকত, তাহলে আমাদের কথার প্রতিধ্বনি না-উঠে তা মিলিয়ে যেত।

নিরেট অন্ধকার ভেদ করে এপারেই দৃষ্টি চলছিল না, ওপারে তো দূরের কথা। চারধারেই ছোটো-ছোটো পাহাড়। তাতে একটাও গাছপালা না-থাকায় হিংস্র জন্তুর অনস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। আর খামকা না-ঘুরে ক্লান্ত দেহে সবাই একটা পাথরের চাতালের উপর বসে পড়লেন।

খানিকক্ষণ নিঃশব্দে কাটল। তারপর নীরবতা ভেঙে সর্বপ্রথম কথা বললে নাবিক পেনক্র্যাফট : ক্যাপ্টেনকে আর পাওয়া যাবে বলে তো আমার মনে হয় না। বোধহয় আমরা তাকে মহাসমুদ্রেই হারিয়েছি।

স্পিলেট নিজেও মনে আশা পাচ্ছিলেন না। তবু তিনি বললেন, আমরা ক্যাপ্টেনকে খুঁজে বার করতে পারবো, পেনক্র্যাফট। হতাশ হওয়াটা আমাদের ঠিক হবে না। হয়তো তিনি কোথাও আহত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছেন, তাই আমাদের ডাকে সাড়া দিতে পারছেন না।

কেউ আর কোনো কথা বললে না। সবাই চুপ করে বসে রইল। শুধু খানিকক্ষণ বাদে হার্বার্ট একবার বললে, ইশ! কী বিচ্ছিরি ঠাণ্ডা! একেবারে জমে যাওয়ার জোগাড়!

পেনক্র্যাফট নিজের সন্দেহের কথা খুলে বলতেই নেব মনে-মনে উত্তেজিত হয়ে উঠল। ক্যাপ্টেন হার্ডিংএর মৃত্যুর কথা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না নেব।

অসম্ভব। এইভাবে কখনোই ক্যাপ্টেন হার্ডিংএর মৃত্যু হতে পারে না! উনি যে-রকম কৌশলী ও বুদ্ধিমান, তাতে ডাঙার এত কাছে এসেও কি তার মৃত্যু হতে পারে? না-না, তা কখনোই হতে পারে না। নেব সেইদিনই ক্যাপ্টেন হার্ডিংএর মৃত্যুকে বিশ্বাস করবে, যেদিন সে ক্যাপ্টেনের স্পন্দন-রহিত শরীর নিজে খুঁয়ে অনুভব করবে তার শীতল স্পর্শ, আর অঝোর ধারায় অশ্রু বিসর্জন করে সিক্ত করে দিতে পারবে সেই দেহ। ক্যাপ্টেনের মৃতদেহ নিজে স্পর্শ না-করা পর্যন্ত নে তার মৃত্যুতে বিশ্বাস করতে পারবে না। ক্যাপ্টেন হার্ডিংএর মৃত্যু কি এতই সহজ? এমন অজ্ঞাতসারে কি তার মৃত্যু হতে পারে?

একটা তীব্র অধীরতায় ভরে উঠতে লাগল নেএর মন। তারপর হঠাৎ একসময় অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠল, আমি কিন্তু ও-কথা মোটেই বিশ্বাস করতে পারছি না। যেমানুষ এর চেয়েও সাংঘাতিক সংকটের মধ্যে পড়েও এতদিন প্রাণরক্ষা করে এসেছেন, তার পক্ষে এত সহজে প্রাণ হারানো বিশ্বাসযোগ্য নয়।

স্পিলেট বললেন, তোমার কথাই যেন সত্যি হয়, নেব! পেনক্র্যাফট শুধু তার একটা অনুমানের কথা বলছিল। তার কথায় রাগ কোরো না।

তারপর স্পিলেট, পেনক্র্যাফট আর হার্বার্ট পরামর্শ করতে বসলেন। রাত্রি তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। ভোরের আর বেশি দেরি ছিল না। সুতরাং ভোরবেলা থেকেই যাতে অন্যভাবে সাইরাস হার্ডিংএর অনুসন্ধান করা যায়, সে-কথাই ভাবতে লাগলেন সকলে।

বিমর্ষ নেব একটু দূরে চুপ করে বসে রইল। সাইরাস হার্ডিং সম্পর্কে সে তখন আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। যে-হার্ডিংএর গ্রেপ্তার হওয়ার কথা শুনে সে অবরুদ্ধ রিচণ্ড শহরে ছুটে এসেছিল, সেই হার্ডিংকেই, তার সেই প্রভুকেই এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! এর চেয়ে শোচনীয় ব্যাপার আর কী হতে পারে?

একটু বাদেই ফুটফুটে এক ভোরের সোনালি আলো দেখা দিল আকাশে। আর-একবার সাইরাস হার্ডিংএর অনুসন্ধান করবার জন্যে পা চালিয়ে দিলেন সবাই। এটি যে একটি ছোটো দ্বীপ তা বুঝতে অসুবিধে হল না। নেবুর কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি গত রাত্রিতে যেখান থেকে শুনতে পাওয়া গিয়েছিল, তারা ক্রমে সেই জায়গায় এসে হাজির হলেন। দেখা গেল, ওপারে সত্যি-সত্যিই একটু বড়ো আর-একটা দ্বীপ রয়েছে। দ্বীপদুটির মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা অপ্রশস্ত একটি নদী। দৃষ্টিকে তীক্ষ্ণ করে তীব্র কৌতূহলের সঙ্গে অপলক চোখে সবাই ওপারের দ্বীপটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমন সময় হঠাৎ পিছনে ঝপাং করে একটা আওয়াজ হল। চমকে সবাই তাকিয়ে দেখলেন, নেব সেই খরস্রোতা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দেখে সকলে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন।

হতভম্ব ভাবটা কেটে যেতেই চেঁচিয়ে উঠলেন স্পিলেট : কোথায় যাচ্ছো তুমি, নেব? শিগগির ফিরে এসো!

নেএর কিন্তু ফিরে আসার ইচ্ছে মোটেই ছিল না। সেই তীব্র স্রোতের মধ্যেই সুকৌশলে সাঁতার কাটতে কাটতে নে উত্তর করলে, ওপারে গিয়ে ক্যাপ্টেন হার্ডিংকে খুঁজে বেড়াবো। হয়তো তিনি সাঁতার কেটে এসে এই দ্বীপেই উঠেছেন।

নেবএর দেখাদেখি স্পিলেটও জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পেনক্র্যাফট তাকে ধরে ফেলল। গম্ভীর গলায় সে বললে, প্রাণটা এত শস্তার নয় মিস্টার স্পিলেট, যে অমনভাবে আগাগোড়া না-ভেবেই নষ্ট করে ফেলবেন। এই তীব্র স্রোতের মধ্যে সাঁতার কাটতে যাওয়া মানেই হল প্রাণ হারানো। আমরা নেবএর মতন অত ভালো সাঁতারুও নই। আমার মনে হয়, ঘণ্টাখানেক পরেই ভাটার টানে নদীর জল একদম কমে যাবে, তখন আমরা অনায়াসেই ওপারে যেতে পারবো।

স্পিলেট নিরস্ত হলে সবাই ওপারের দিকে তাকালেন। দেখলেন, নেব ওপারে গিয়ে পৌঁছেছে। ভিজে কাপড়ে শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে-কাঁপতে সে তাদের বিদায় অভিনন্দন জানালে।

পাহাড়ের আড়ালে নেব অদৃশ্য হয়ে না-যাওয়া অব্দি নিমেষহীন চোখে তারা তাকে দেখতে লাগলেন। নিগ্রো ভৃত্যটির অসাধারণ প্রভুভক্তি দেখে তিনজনের চোখে জল এল। তারপর তিনজনেই ক্যাপ্টেনকে খুঁজতে খুঁজতে সর্বত্র চষে বেড়ালেন। তন্নতন্ন করে চারদিকে খোঁজাখুঁজি চলল। কিন্তু হার্ডিংএর কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না।

খিদেয়, তেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে পড়লেন সবাই। তারপর আবার সেই নদীর ধারে এসে দাঁড়ালেন তিনজনে।

নদীর জল তখন খুব তাড়াতাড়ি কমতে শুরু করেছে। এই ফাঁকে কিছু খাবার-দাবার পাওয়া যায় কি না দেখবার জন্যে তারা চারদিকে তাকালেন। কিন্তু গলাধঃকরণ করা যায় এমন-কিছুই নজরে পড়ল না। তেষ্টায় এদিকে তালু শুকিয়ে আসছে। কিন্তু নোনা জল তো আর পান করা যায় না। বেলুনে যে খাবার-দাবার ও জল ছিল বেলুনকে হালকা করার জন্যে তা আগেই ফেলে দেয়া হয়েছিল। গত রাত্রি থেকে একটুও খাবার বা জল পেটে পড়েনি। তাই, এই পরিশ্রমের পর তারা অত্যন্ত অবসন্ন হয়ে পড়লেন। শ্রান্তিতে শরীর যেন এলিয়ে পড়তে চাইল।

নদীর জল যেভাবে কমছিল, তাতে তাদের মনে হল আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নদী প্রায় জলশূন্য হয়ে পড়বে। সেই খিদে-তেষ্টার সময় একমাত্র আশা হল ওপারের এলাকাটি —হয়তো সেখানে কিছু খাবার-দাবার পাওয়া যেতে পারে, সেই ভরসায় সতৃষ্ণ চোখে সবাই নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

বিকেলের দিকে জল একেবারে কমে গেল। দ্বীপদুটির মাঝখান দিয়ে স্রোতহীন যেসরু জলধারা বর্তমান রইল তাকে আর কোনোরকমে নদী বলা চলে না—নিছকই একটা খাল মাত্র।

তিনজনে হেঁটেই খালটুকু পার হয়ে গেলেন। আহার্যের আশায় ব্যাকুল হয়ে তারা দ্বীপে উঠে এলেন।

স্পিলেট উপরে উঠে বললেন, আমি নেবএর খোজে যাচ্ছি। সন্ধেবেলা আবার এখানেই দেখা হবে। তোমরা যদি কিছু খাবার জোগাড় করতে পারো, আমার জন্যেও রেখে দিও। আমিও যদি পথে কিছু খাবার পাই নিয়ে আসবো।

হার্বার্ট শুধোলে, আমি আপনার সঙ্গে যাবে কি?

না। তোমরা বরং মাথা গোঁজবার মতো একটা আস্তানা, আর কিছু খাবার জোগাড় করো। এই বলে নেব যে-পথে গিয়েছিল, স্পিলেট সেই পথে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

স্পিলেট প্রস্থান করবার পর হার্বার্ট আর পেনক্র্যাফট নদীতীর থেকে খানিকটা দূর এগিয়ে গেল। চারদিকে গ্র্যানাইট  পাথরের ছোটো-বড়ো পাহাড় শূন্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তারা এদিক-সেদিক ঘুরতে-ঘুরতে একটা বেশ বড়ো পাহাড়ের নিচে এসে থামল। পেনক্রাফট বললে, হার্বাট, এসো, আমরা পাহাড়টায় উঠে একবার চারদিকটা দেখে নিই। কিছু খাবারের জোগাড়ও তো আমাদের করে নিতে হবে।

তারা দুজনে পাহাড়ের উপর উঠতে লাগল। একটু উঠতেই দেখা গেল অনেকগুলো। নামনা-জানা পাখি বসে আছে। পাখিগুলো বোধহয় কখনও মানুষ দ্যাখেনি, তাই ওদের দেখে ভয় পেল না। ওরা দুজনে যখন পাখিগুলোর কাছে গিয়ে উপস্থিত হল, তখনও তারা ভয় পেল না, বা উড়ে যাওয়ার উপক্রম করল না।

ওদের কাছে এমন-কোনো হাতিয়ার ছিল না যা দিয়ে দু-একটা পাখি মারা যায়। রাত্রের আহারের জন্যে আপাতত গুটিকতক পাখি নিতান্তই প্রয়োজন। পেনক্র্যাফট হাত বাড়িয়ে দু-একটাকে ধরতে গেল, কিন্তু তারা তাড়া খেয়ে উড়ে গেল। হতাশ হয়ে পড়ল পেনক্র্যাফট। বললে, নাঃ, এরা আমাদের আজকেও কিছু খেতে দেবে না দেখছি!

হার্বার্ট কোনো কথা না-বলে চুপচাপ উপরে উঠতে লাগল। পাহাড়ের মাথার উপর উঠে চারদিকে তাকিয়ে দুজনেই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। দূরে সবুজ গাছের সারি দেখা যাচ্ছে। গাছ যখন দেখতে পাওয়া গেছে, তখন এই দ্বীপে কিছু-না-কিছু আহার পাওয়া যাবে বলে তাদের আশা হল।

দুজনেই তখন নামতে শুরু করলে। নামতে-নামতে পাহাড়ের গায়ে চিমনির মতন একটা বড়ো গুহা দেখতে পেয়ে পেনক্র্যাফট বললে, রাত্তিরে এই গুহাতেই আমরা থাকতে পারবো।

আস্তে-আস্তে তখন সন্ধে নেমে আসছিলো। সূর্য ড়ুবেছিল সমুদ্রের সেই সীমান্তে, যেখানে আকাশ আর সমুদ্র মিলে-মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে।

ক্রমেই সন্ধে হয়ে আসছে দেখে পেনক্র্যাফট বললে, তাড়াতাড়ি গুহাটা একবার দেখে নিয়ে নিচে যেতে হবে। আমাদের হাতে এখনও ঢের কাজ পড়ে আছে। কোনো খাবার জিনিশ বা জল এখনো জোগাড় করা হয়নি।

কিন্তু আর-বেশিক্ষণ খাবারের ভাবনায় মাথা গরম করতে হল না ওদের।

গুহা পরীক্ষা করতে গুহার ভেতরে কতকগুলো সামুদ্রিক ঝিনুক দেখতে পাওয়া গেল। ইংরেজিতে এদের বলে মাসেল। গুহার এক জায়গায় পাঁক আর জল দেখা গেল। সেই পাঁকের মধ্যে ঝিনুকগুলো পড়ে ছিল। দেখে মনে হল, সমুদ্রের জল যখন বেড়ে ওঠে, তখন গুহার মধ্যেও জল ঢোকে।

হার্বার্ট বললে, যাক, বাঁচা গেল। খাওয়ার ভাবনা আপাতত আর ভাবতে হবে না। এই ঝিনুকগুলো খেতে নাকি খুব ভালো। আজ আগুনে পুড়িয়ে দিব্যি খাওয়া যাবে।

গুহাটি পরীক্ষা করে দুজনেই খুব খুশি হয়ে উঠল। তারা ঠিক করলে গুহার মুখে আগুন জ্বালিয়ে রাখবে, তাহলে আর বাইরে থেকে সমুদ্রের ঠাণ্ডা হাওয়া ভেতরে ঢুকে তাদের জ্বালাতন করতে পারবে না।

পেনক্র্যাফট বললে, খাওয়ার ভাবনা না-হয় ঘুচল, কিন্তু এবারে জল পাওয়া যাবে কোথায়? এখানে কোথাও তো ভালো জল পাওয়ার কোনো উপায়ই দেখছি না। অথচ জল না-হলে চলবেই বা কী করে?

হাবার্ট বললে, চলো, নিচে গিয়ে কোথাও জল পাওয়া যায় কি না খুঁজে দেখি। শেষ পর্যন্ত যদি একান্তই ভালো জল না-পাওয়া যায়, তবে এই নদীর ঘোলা জল খেয়েই কোনোরকমে থাকতে হবে।

দুজনে ঢাল বেয়ে নিচে নামতে লাগল। নামতে-নামতে পাহাড়ের পাথরের ফাঁকেফাঁকে কয়েকটা শাদা রঙের গোল-গোল জিনিশ পেনক্র্যাফটের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। একটা সে হাতে তুলে নিলে। পরীক্ষা করে সে বুঝতে পারলে যে জিনিশটা পাখির ডিম। অমনি আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। বললে, এই দ্যাখো হার্বার্ট, আমরা খাবারের জন্যে আরেকটা জিনিশ পেয়েছি-পাখির ডিম!

ডিম দেখে হার্বার্টও আনন্দে লাফিয়ে উঠল। হালকা গলায় বললে, কয়েকদিন বাদে আজ আমাদের আহার খুব ভালোভাবেই হবে দেখছি! এ-যে দেখছি রীতিমতো ভোজ!

কয়েকটা ডিম কুড়িয়ে তারা আবার নামতে লাগল। এবং জলের খোঁজেও তাদের আর খুব বেশি দূরে যেতে হল না। তারা দেখতে পেলে, নেবকে সঙ্গে নিয়ে স্পিলেট একটা পাহাড়ের ভেতর থেকে বের হলেন। তাদের দেখতে পেয়েই স্পিলেট চীৎকার করে বললেন, নেবকে পেয়েছি, কিন্তু ক্যাপ্টেন হার্ডিং-এর কোনো খোঁজ পেলুম না।

একটু বাদেই নেবের সঙ্গে স্পিলেট এসে উপস্থিত হলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, কিছু খাবার জোগাড় করতে পারিনি, তবে জলের সন্ধান পেয়েছি। ওইদিকে খানিকটা দূরে একটা বড়ো হ্রদ আছে। খেয়ে দেখলুম, তার জল বেশ মিষ্টি। কিন্তু তোমাদের জন্যে কী করে জল নিয়ে আসবো ভেবে পেলুম না। শেষটায় আর-কোনো উপায় না-দেখে দুটো রুমাল ভিজিয়ে এনেছি, সেই জল নিংড়ে তোমাদের খেতে হবে। আমার আর আপাতত জলের দরকার নেই, পেট পুরে খেয়ে এসেছি। নেবও একটু খেয়ে নিয়েছে।

ভালোই করেছেন, হার্বার্ট বললে, আমরাও খাবারের জোগাড় করে রেখেছি।

পাহাড়ের তলা থেকে কিছু শুকনো কাঠকুটো সংগ্রহ করে সবাই আবার ওপরে উঠতে লাগলেন। গুহায় হাজির হয়ে পেনক্র্যাফট দেশলাই বার করে দেখল, দেশলাইয়ে মাত্র একটা কাঠি আছে।

কাঠিটা হাতে করে খানিকক্ষণ কী যেন ভাবলে পেনক্র্যাফট। একটামাত্র কাঠি-একবার নিভে গেলে আর রেহাই নেই। এই নির্জন দ্বীপে না-খেয়ে ঠাণ্ডায় জমে মরতে হবে সবাইকে। আগুন জ্বালিয়ে খুব ভালো করে খেয়াল রাখতে হবে, সেই আগুন যাতে কোনোমতেই নিভে না-যায়। একটু বাদে-বাদেই আগুনে কাঠ গুঁজে দিয়ে জিইয়ে রাখতে হবে আগুনকে।

গুহার এককোণে কতগুলো শুকনো গাছের পাতা জড়ো করে খুব সাবধানে তাতে আগুন ধরালে পেনক্র্যাফট। তারপর সরু ডালপালা আগুনে নিক্ষেপ করতেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল।

হার্বার্ট ডিম আর ঝিনুকগুলোকে তাড়াতাড়ি আগুনে ঝলসে নিতে লাগল। পেনক্র্যাফট আর স্পিলেট বসে-বসে তাঁদের ভবিষ্যৎ কর্তব্য সম্পর্কে আলাপ করতে লাগলেন। নেব কিন্তু কোনো কথা বললে না। চুপ করে একপাশে বসে রইল। সারাদিন আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও সাইরাস হার্ডিং-এর কোনো চিহ্নই দেখতে পায়নি সে। সন্দেহে আশঙ্কায় সে একেবারে মুষড়ে পড়েছে।

স্পিলেট কী করে নেবকে খুঁজে পেয়েছিলেন সে-কথাই বলতে লাগলেন পেনক্র্যাফটকে : তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে খানিকটা দূরে গিয়ে একটু খোঁজাখুঁজি করতেই আমি নেবের দেখা পাই। ও তখন চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে ক্যাপ্টেনের নাম ধরে ডাকছিল, আর কাঁদছিল। আমরা দুজনে যতদূর খুঁজেছি ততদূরের মধ্যে কোথাও কোনো মানুষের পদচিহ্ন দেখতে পাইনি। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমি নেবকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। কিছুতেই আসতে চাইছিল না।

ইতিমধ্যে খাবার তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সকলে মিলে সেই ঝলসানো ঝিনুক আর ডিমই খেলেন। নেব বিশেষ কিছু খেল না। তখন স্পিলেট তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বললেন, নেব, তুমি উতলা হচ্ছো কেন? আমি ঠিক জানি ক্যাপ্টেনকে আমরা খুঁজে পাবোই।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অগ্নিকুণ্ডের কাছে সবাই ঘেঁষাঘেষি করে শুয়ে পড়লেন। পরিশ্রমে আর উত্তেজনায় সবাই একেবারে অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন। কাজেই শুতে-না–শুতেই সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন। কিন্তু শুধু একজন সারা রাত না-ঘুমিয়ে অস্থিরভাবে ছটফট করতে লাগল। কষ্ট করে না-বললেও চলে যে, সেই অস্থির-হৃদয় তন্দ্রাবিহীন লোকটি হল ক্যাপ্টেন সাইরাস হাডিং-এর প্রভুভক্ত ভৃত্য ভাগ্যহত নেব।

সকালে উঠে পেনক্র্যাফটই প্রথম আবিষ্কার করলে যে নেব গুহার ভিতরে নেই। সে বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল, আরে! নেব কোথায় গেল? সবাই মিলে গুহার চারপাশে খোঁজাখুঁজি করলেন। কিন্তু কোথাও নেবকে দেখা গেল।

প্রথমটা তারা মনে করলেন হয়তো সে কাছেই কোথাও গেছে। কিন্তু অনেকক্ষণ কেটে গেল, অথচ নেব তবু ফিরে এল না। এতক্ষণের মধ্যেও সে যখন ফিরে এল না, তখন সবাই আন্দাজ করলেন যে সাইরাস হার্ডিংএর খোঁজেই সে কোথাও চলে গেছে। কিন্তু যেতে হলে বলে যেতে তো পারতো! না-বলে এইভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল কেন? আর, গেলই বা কোথায়? এ প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর কেউ বার করতে পারলে না।

.

১.৪ আশ্চর্য ঘটনা

ঝড়ের বেগ একটু কমে এসেছিলো, এবার সেই ঝড় আবার একটু-একটু করে বেড়ে উঠতে লাগল। মহা গর্জনে গুহার বাইরে ফেটে পড়তে লাগল হাওয়া। একে শীতকাল, তার উপর সমুদ্রের ধারের ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া। গুহার ভিতরে আগুনের কুণ্ডের কাছে বসেও সবাই ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল, হার্বার্ট শুধু একবার বাইরে গিয়ে কোনোরকমে কিছু শুকনো ডালপালা আর গোটাকতক ডিম কুড়িয়ে নিয়ে এল। সারাদিনটা এইভাবে গুহায় বসেই কেটে গেল। তবে, একেবারে বসে রইলেন না কেউই। এই নির্জন দ্বীপের এই গুহাটাকে বাসযোগ্য করে তোলবার জন্যে খুব খাটতে লাগলেন তিনজনে।

সন্ধেবেলায় ঝড়ের তর্জন-গর্জন খুব বেড়ে গেল। সমুদ্রের উত্তাল বাতাস যেন পাগল হয়ে উঠল। আর ঝড়-বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। সে-কী বৃষ্টি! সারাটা আকাশ ফুটো করে কে যেন তুমুলভাবে জল ঢেলে চলেছে! যাঁরা কখনও দ্যাখেননি, তারা এই। সামুদ্রিক মেঘ-বৃষ্টি-ঝড়ের কথা কল্পনাও করতে পারবেন না। গুহায় বসে তিনজনে উম্মাদ ঝড়ের তাণ্ডবলীলা দেখতে লাগলেন।

কালো রঙের মেঘে সারা আকাশ ছাওয়া। কাজেই সন্ধের অন্ধকার একেবারে নিরেট হয়ে উঠল যেন। নিচ্ছিদ্র, দুর্নিরীক্ষা অন্ধকারে ঝড়ের পাখসাটে পাহাড়ের উপরকার বড়োবড়ো পাথরের চাইলো মধ্যে-মধ্যে ভীষণ আওয়াজ করে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। দ্বীপদুটির মাঝখানের নদীটাও কানায়-কানায় ভর্তি হয়ে উঠেছে। কী সেই জলের তোেড়! আর সেই। ছোটো নদীতেই ঢেউয়ের কী ক্রুদ্ধ গর্জন! গুহার ভিতর থেকেই জলের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

এমন দারুণ দুর্যোগের রাতে একলা নেব অসহায়ভাবে কোথায় পড়ে আছে—সেই কথা ভেবে সকলেরই মন দুঃখে ভরে উঠল। সাইরাস হার্ডিংকে তো আর পাওয়ারই আশা নেই। তিনি বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন–কে জানে! কোনো দুর্ঘটনায় হয়তো প্রাণ খুইয়ে বসেছেন। নেবের কথা ভেবে সকলেই বিচলিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু খামকা অস্থির হয়ে উঠেও বা কী লাভ। তাদের হাতে তখন করবার মতো কিছুই ছিল না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নিদারুণ ভাগ্যকে মেনে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সবাই বিমর্ষ হয়ে উঠলেন। বাইরের ঝড়ের তুমূল গর্জনে শুধু থেকে-থেকে গুহার ভিতরের নীরবতা কেঁপেকেঁপে উঠতে লাগল।

রাত্রি তখন অনেক গভীর। ঘেঁসাঘেঁসি করে তিন জনে তখন গুহার ভিতরে নিবিড় নিদ্রায় আচ্ছন্ন। বাইরে তেমনি তুমুল গর্জনে ফেটে পড়ছে দুর্যোগ। হঠাৎ কেন যেন স্পিলেটের ঘুম ভেঙে গেল। তার মনে হল বাইরে ঝড়ের গর্জন ছাড়াও অন্য কী-একটা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। স্পিলেট তাড়াতাড়ি পেনক্র্যাফটকে ডেকে তুললেন পেনক্র্যাফট, ওঠো ওঠো! শুনছো বাইরে ও কীসের শব্দ?

ঘুমজড়ানো চোখে পেনক্র্যাফট একটু হকচকিয়ে রইল। তারপর সংবিৎ ফিরতেই কান পেতে খানিকক্ষণ কী শোনবার চেষ্টা করলে। তারপর বললে, কই? কোনো শব্দই তো শুনতে পাচ্ছি না! ও কিছু না, ঝড়ের আওয়াজ বোধহয়।

না, না, স্পিলেট আবার বললেন, আরো-একটু ভালো করে শোনো দিকিনি। টপের গলার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না?

সতর্কভাবে কান পাতল পেনক্র্যাফট। বাইরে ঝড়ের তুমুল গর্জন। তবু পেনক্র্যাফট কান পেতে কী যেন শুনতে লাগল। আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, ঠিক ঠিক? টপের লোই তো বটে!

ওদের কথা শুনে হার্বার্টও জেগে উঠেছিল। সেও সায় দিলে হ্যাঁ, আমারও তা-ই মনে হচ্ছে!

উত্তেজনায় সকলের মন ভরে উঠল। একটা জলন্ত শঠ হাতে নিয়ে দ্রুতপায়ে হার্বার্ট গুহার মুখে এসে হাজির হলতারপর টপকে নাম ধরে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল—টপ, টপ! এই যে! এদিকে!

টপকে ডাকবার পর দেখা গেল, যেন তার চীৎকার ক্রমশই কাছে এগিয়ে আসছে। আরো-খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পরেই ভিজে-জবজবে শরীরে টপ তাদের কাছে এসে হাজির। অস্থিরভাবে ডাকতে লাগল সে। চঞ্চলভাবে বার-বার গুহার বাইরে ছুটে যেতে লাগল, আবার ভিতরে আসতে লাগল। কিন্তু হায়! সাইরাস হার্ডিংকে দেখা গেল না।

তবু হতাশা আসতে দিলেন না স্পিলেট। বললেন, টপ নিশ্চয়ই আমাদের কিছু-একটা বলতে চাচ্ছে।

তখনও অস্থিরভাবে ল্যাজ নাড়ছে টপ। হার্বার্ট বললে, টপ বোধহয় আমাদের কোথাও নিয়ে যেতে চায়, তাই অমন ছটফট করছে। চলুন, ও আমাদের কোথায় নিয়ে যায় দেখা যাক। আমার মনে হচ্ছে টপকে যখন পাওয়া গেছে, ক্যাপ্টেন হার্ডিংকেও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।

পেনক্র্যাফট বললে তাহলে এক্ষুনি আমাদের বেরিয়ে পড়া উচিত। একটুও দেরি করা ঠিক হবে না। টপই আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।

তক্ষুনি তিনজনে হাত-ধরাধরি করে সেই ঝড়ের মধ্যেই বেরিয়ে পড়লেন। ঝড় তখনও একটুও কমেনি, আগের মতোই তার উথালপাথাল দামাল নৃত্য চলেছে। বাইরে জমাটবাঁধা অন্ধকার, সেই অন্ধকারে দৃষ্টি চলে না। টপ ডাকতে-ডাকতে অগ্রসর হচ্ছে। অন্ধকারে টপের স্বর শুনে-শুনে সবাই তাকে অনুসরণ করে চললেন।

তারা চললেন বটে, কিন্তু সেই ঝড়ের মধ্যে চলাটা সহজে হল না। সামান্য পথ যেতেই বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল। কতক্ষণ ধরে চলেছেন, উত্তেজনার কারুই সে, খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল তখন, যখন অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে, একটু আলো ফুটছে আকাশে। টপ তখন একটা পাহাড়ের উপর উঠছিল। সৌভাগ্যের বিষয় বলতে হবে ঝড় তখন অনেকটা কমে গিয়েছিল, বৃষ্টিও আর পড়ছিল না। আকাশের অবস্থা আর হাওয়ার গতি দেখে বোঝা গেল, শিগগিরই আকাশ একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে—ঝড়ও আর থাকবে না। দ্রুতপায়ে সবাই পাহাড়ে উঠতে লাগলেন।

খানিকটা ওঠবার পরেই সামনে একটা গুহা দেখা গেল। টপ ডাকতে-ডাকতে দৌড়ে সেই গুহার ভিতর ঢুকল। তারা ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে না-পেরে টপের অনুসরণ করলেন।

কিন্তু ভিতরে ঢুকেই যা দেখলেন তাতে সবাই শুম্ভিত হয়ে গেলেন। চোখে পুঞ্জিত বিস্ময় নিয়ে তারা দেখতে পেলেন, ক্যাপ্টেন হার্ডিং স্পন্দনরহিত দেহে শুয়ে আছেন। বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন—দেখে তা বোঝবার জো নেই। তার মাথা কোলে নিয়ে উদাস, করুণ চোখে বসে আছে একটি লোক। বলা বাহুল্য, সেই লোকটি আর-কেউ নয়, হার্ডিং এর অনুগত ভৃত্য নেব।

তিনজনে খানিকক্ষণ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলেন। কারু মুখেই কোনো কথা ফুটল না। এমন-একটা দৃশ্য যে কখনও তাদের নজরে পড়বে, এ-কথা তারা। ভুলেও কল্পনা করেননি। তাঁরা ভেবেছিলেন টপ তাদের জীবিত ক্যাপ্টেনের কাছে হাজির করবে! ঘটল তার বিপরীত। সাইরাস হার্ডিং-এর সমাধির ব্যবস্থা করবার জন্যেই তাদের হাজির হতে হল।

সেই করুণ নীরবতা ভাঙলো হার্বার্টের গলার স্বরে। সে জিগেশ করলে নেব, ক্যাপ্টেন কি বেঁচে আছেন?

নেব্‌ ঘাড় নাড়লো। জানালে যে তা সে ঠিক জানে না। যে-রকম নিরাশ্বাস গলায় সে কথা বললে, তাতে মনে হল না-বেঁচে থাকারই সম্ভাবনা বেশি। তারপর তাঁরা তিনজনে সামনের দেকে এগিয়ে এলেন। স্পিলেট নাড়ি দেখতে জানতেন। ক্যাপ্টেনের একটি হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিলেন তিনি। কিন্তু নাড়ি দেখে কিছুই বোঝা গেল না। তখন স্পিলেট নাকের কাছে হাত দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ বাদে মনে হল, যেন খুব ধীরে-ধীরে নিশ্বাস পড়ছে। স্পিলেটের মুখ আশায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল : এখনও ক্যাপ্টেন হার্ডিং-এর দেহে প্রাণ আছে! চেষ্টা করলে এ-যাত্ৰা তিনি বেঁচে উঠতেও পারেন!

শুনে নেবের শরীরে যেন বিদ্যুৎশিহরন খেলে গেল। পলকের মেধ্যে উঠে দাঁড়ালো সে। ব্যগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলে, এখনও বেঁচে আছেন! বলুন–কী করলে ওঁর জ্ঞান ফিরবে।

পুবদিক তখন বেশ ফরসা হয়ে উঠেছে। হাওয়ার এলোমেলো ঝাপটাও আর নেই বললেই চলে।

একবার বাইরের দিকে তাকিয়ে স্পিলেট বললেন, অত ব্যস্ত হোয়ো না, নেব। ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমরা যখন এসে পড়েছি, তখন ক্যাপ্টেন হার্ডিংকে বাঁচিয়ে তুলবোই। প্রথমে ক্যাপ্টেনের ঠাণ্ডা হাত-পাগুলোকে সেঁক দিয়ে গরম করতে হবে।

কিন্তু সেঁক দেয়া হবে কী করে? উদগ্রীব স্বরে পেনক্র্যাফট জিজ্ঞাসা করলে, এই গুহায় তো আগুনও নেই, অন্যকিছুও নেই!

নেব্‌ তক্ষুনি বললে, আমি সেই গুহায় গিয়ে এক্ষুনি আগুন নিয়ে আসছি। একটু অপেক্ষা করুন আপনারা।

হার্বার্ট নেবকে বাধা দিলে। বললে, তোমার কাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, নেব। তোমায় আর কষ্ট করতে হবে না। যা-কিছু আনবার আমিই আনছি।

নেব প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু স্পিলেট তার দিকে তাকিয়ে বললেন, হার্বার্ট ঠিকই বলেছে, নেব। তোমার এখন কিছু করবার দরকার নেই। তারপর হার্বার্টের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি সেই গুহা থেকে একটু আগুন আর কিছু খাবার নিয়ে এসো।

হার্বার্ট দ্রুতপদে বের হয়ে গেল। নেব বললে, আমি তবে কিছু কাঠকুটো জোগাড় করে আনি। আগুন জ্বালাতে হবে তো।

তার উৎসাহে আর বাধা দিতে চাইলেন না স্পিলেট। নেবও তখনি বের হয়ে পড়ল। পেনক্র্যাফট আর স্পিলেট তখন হার্ডিং-এর প্রাথমিক পরিচর্চায় লেগে গেলেন।

আগুন আর খাবার নিয়ে ফিরতে হার্বার্টের ঘণ্টা-দেড়েকের বেশি সময় লাগল না। অন্ধকার দুর্যোগের রাতে পথ চলতে যত সময় লেগেছিল, এবার তার থেকে ঢের কম সময় লাগল। নেব ইতিমধ্যে বাইরে থেকে কিছু ডালপালা জোগাড় করে এনেছিল। কিন্তু সেগুলো ভিজে থাকায় আগুন জ্বালাতে বেশ কষ্ট হল। পেনক্র্যাফটের পকেটে বেশ বড়ো একটা রুমাল ছিল, সেঁক দেবার জন্যে আগুনের আঁচে সেটাকে গরম করতে-করতে সে জিজ্ঞাসা করলে, ক্যাপ্টেন হার্ডিং-এর দেখা তুমি কেমন করে পেলে, নেব?

নেবের অস্থিরতা তখন বেশ কমেছে। পেনক্র্যাফটের প্রশ্নের উত্তরে সে বললে, আমি তো সেই রাত্তিরেই আপনার কাছ থেকে পালিয়ে আসি। সারাক্ষণ ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে আঁতিপাঁতি করে খুঁজেছি চারদিক। শেষে এইখানে এসে দেখি টপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। টপকে দেখেই আমার ভারি আনন্দ হল। ভাবলুম, তাহলে ক্যাপ্টেনও নিশ্চয়ই এখানে আছেন। তার সন্ধানে আমি তখন এদিক-সেদিকে তাকাতে লাগলাম।

তারপর? টপ আমাকে দেখেই ঘেউ-ঘেউ করে চীৎকার করে আমার কাছে দৌড়ে এলো। নেব বলে চলল, আমি প্রশ্ন করলুম, ক্যাপ্টেন কোথায়, টপ? টপ আমার কথা শুনে চঞ্চল হয়ে জোরে জোরে ডাকতে লাগল। শেষটায় আমার পোশাক কামড়ে ধরে এই পাহাড়টায় উঠতে লাগল সে। এই গুহাটার মধ্যে যখন সে আমাকে টেনে নিয়ে এল, তখন দেখি ক্যাপ্টেন এই অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। আমার মনের যে তখন কী অবস্থা তা আপনাদের আমি বলে বোঝাতে পারবো না। আমার মনে হল, উনি বোধহয় আর বেঁচে নেই। সেই থেকে আমি ঠায় এখানে বসে আছি। একবার টপকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলুম, যদি আপনাদের খুঁজে আনতে পারে। টপ আমাদের শেখানো কুকুর, ও ঠিক আপনাদের এনে হাজির করেছে।

তখনও সমানভাবে সেঁক দেয়া চলছিল। ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে সবাই চুপচাপ বসে রইলেন। এমনিভাবে আরো-খানিকক্ষণ কেটে গেল। তারপর মনে হল, ক্যাপ্টেনের জীবনীশক্তি যেন একটু-একটু করে ফিরে আসছে। আস্তে-আস্তে তার দেহে স্পন্দন এল।

ক্যাপ্টেনের একটি হাত ধীরে-ধীরে একবার একটুখানি উঠেই আবার পড়ে গেল।

এই দেখে নেব আনন্দে বলে উঠল, এবার তাহলে ক্যাপ্টেন ভালো হয়ে উঠবেন!

আমারও তাই মনে হচ্ছে। স্পিলেট বললেন, একটা মস্ত সোয়াস্তির ব্যাপার হল, ক্যাপ্টেনের শরীরে জ্বর নেই। এর উপর যদি জ্বর থাকতো তাহলে আর রক্ষা ছিল না। বোধহয় আকস্মিক কোনো-একটা আঘাতে ক্যাপ্টেন অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন, তারপর শুশৃষার অভাবে আর অনাহারে আর জ্ঞান ফেরেনি।

পেনক্র্যাফট ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালে : আমারও তা-ই মনে হয়। কিন্তু গুহার ভিতরে তিনি এলেন কী করে? এখানে এসে নিশ্চয়ই তিনি আঘাত পাননি, যা-কিছু চোট তা হায় আসার আগেই পেয়েছেন।

স্পিলেট তার কথার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। শুধু বললেন, সে-সব কথা ক্যাপ্টেনের জ্ঞান ফিরলেই জানতে পারবো।

নিঃশব্দে আরো ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। ক্যাপ্টেনের শরীর মাঝে-মাঝে নড়ে উঠতে লাগল। অসংলগ্নভাবে দু-একটা কথাও তাঁর মুখ দিয়ে বেরুল। একবার আচ্ছন্নভাবেই তিনি অনতিস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলেন, নেব কি এখানে আছো?

আমায় ডেকেছেন, ক্যাপ্টেন আমায় ডেকেছেন! বলতে-বলতে আনন্দে ছুটে এলো নেব। হার্ডিং-এর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললে, হ্যাঁ আমি আপনার কাছেই আছি, ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টেন নেবের কথা বুঝতে পারলেন কি না বোঝা গেল না। আবার ক্ষীণ স্বরে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, অন্ধকার রাত্রিবেলুন যে নিচে পড়ে যাচ্ছে-নিচে যে সীমাহীন সাগর!

আবার একটু পরেই শোনা গেল : কিন্তু বাঁচবার কি কোনো উপায় নেই? স্পিলেট ইশারায় হার্বাটকে বললেন, পাখির ডিমগুলো আগুনে পুড়িয়ে নাও, হার্বার্ট। ক্যাপ্টেনকে খেতে দিতে হবে।

তাঁর কথামতো ডিমগুলো একে-একে আগুনের আঁচে ঝলসে নেয়া হল। পেনক্র্যাফট বললে, নেব, এইবার তুমি কিছু খেয়ে নাও, অনেকক্ষণ তোমার কিছু খাওয়া হয়নি।

আগে ক্যাপ্টেনের জ্ঞান ফিরে আসুক নেবের প্রতিবাদ শোনা গেল, তিনি আহার করুন, তারপর আমি খাবো।

তার কোনো দরকার নেই, নেব। স্পিলেট বললেন, ক্যাপ্টেনের জ্ঞান ক্রমেই ফিরে আসছে। আর-কোনো ভয়ের কারণ নেই। তুমি এবার নিশ্চিন্ত হয়ে একটু খেয়ে নাও।

নেব আর দ্বিরুক্তি না-করে আহার করতে লাগল।

হার্ডিং পাশ ফিরে শুলেন। স্পিলেট তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ধীর স্বরে ডাকলেন, ক্যাপ্টেন।

ক্ষীণ কণ্ঠে হার্ডিং উত্তর করলেন, কী? আপনি এখন একটু সুস্থ বোধ করছেন কি? সামান্য সুস্থ হয়েছি বটে, তবে বড় দুর্বল বোধ করছি।

দুটো ডিম তার কাছে নিয়ে গিয়ে স্পিলেট আবার বললেন, ডিমদুটো খেয়ে নিন, তাহলে অনেকটা শক্তি ফিরে পাবেন। আপনি হাঁ করুন, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।

ক্যাপ্টেন হাঁ করলেন। স্পিলেট একটু-একটু করে তাঁকে খাওয়াতে লাগলেন।

ক্যাপ্টেনের খাওয়া শেষ হলে পর বাকি ডিমগুলো অন্য-সবাই খেয়ে নিলেন। গুহার বাইরে, পাহাড়ের উপর পাথরের কোলে-কোলে গতরাত্রির বৃষ্টির পরিষ্কার জল জমে ছিল। সবাই সেই জলই খেলেন।

দুপুরবেলার দিকে ক্যাপ্টেন হার্ডিং উঠে বসতে পারলেন। হার্বাট শুধোলে, বেলুন থেকে পড়বার পর কী-কী ঘটেছে, তা আপনি বলতে পারবেন কি?

হ্যাঁ। এবার আমি কথা বলতে পারবো। হার্ডিং একবার চারদিকে তাকিয়ে নিলেন। তারপর বলতে লাগলেন :

বেলুনটা যখন সমুদ্রে পড়ল, তখন আমি ঢেউয়ের আঘাতে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়লাম। পরমুহূর্তেই আর-একটা কী যেন আমার কাছে এসে পড়ল! আমার তখন বুঝতে দেরি হল না যে, আমার মতন আর-একজন কেউ নিশ্চয়ই এসে পড়েছে। কিন্তু কে যে পড়ল, অন্ধকারে তা বুঝতে পারলুম না। অনেক চেষ্টা করে সাঁতার দিয়ে শরীরটাকে জলের উপর ভাসিয়ে শুধোলুম, কে জলে পড়েছো? কিন্তু কোনো জবাব পেলুম না। তার একটু পরে সামনেই সাঁতার কাটার আওয়াজ শুনতে পেলুম। আবার জিজ্ঞাসা করলুম, কে? তখন ঘেউ ঘেউ করে একটা শব্দ হল। স্পষ্টই বুঝতে পারলম, টপ লাফিয়ে পড়ে আমাকে অনুসরণ করছে। আবার আমি যথাসাধ্য বেগে সাঁতার কাটতে লাগলুম।

একটু থামলেন হার্ডিং। দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, কিন্তু সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে পড়ে ক্রমশই আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসতে লাগল। যদিও আমার জ্ঞান তখনও বিলুপ্ত হয়নি, তবু কেমন যেন একটা আচ্ছন্ন ভাব আমায় দখল করে নিয়েছিল। আর সাঁতার কাটতে পারছি না, ক্রমেই তলায় ড়ুবে যাচ্ছি, এমন সময় টপ আমার পোশাক কামড়ে ধরল। তারপর খুব নিপুণভাবে সাঁতার কাটতে-কাটতে আমাকে টেনে নিয়ে চলল।

নেব বললে, তাহলে এই উপই আপনাকে রক্ষা করেছে!

ক্যাপ্টেন হার্ডিং বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু জানেনা, তখন আমার ভারি হাসি পেয়েছিল। ভেবেছিলুম, টপের শক্তি আর কতটুকু! কতক্ষণ আর সে আমায় এই সীমাহারা সমুদ্রে টেনে নিয়ে যাবে! কিন্তু পরমুহূর্তেই পায়ের তলায় ঠেকল মাটি। মাটি! হতাশার হাসি মুখেই মিলিয়ে গেল। আমার আর আনন্দের সীমা রইল না। ঈশ্বরের অনুগ্রহে আর টপের সাহায্যে আমার পায়ের তলায় মাটি ঠেকেছে। এখন বুঝতে পারছি, রাত্রিবেলা কুকুরদের দৃষ্টিশক্তি তীক্ষ্ণ হয় বলে কাছের এই ডাঙার সন্ধান আগেই পেয়েছিল টপ। কোনোরকমে অতি কষ্টে টপকে কোলে নিয়ে আমি উপরে উঠে এলুম। তখন আর আমার দাঁড়াবার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই। ডাঙায় উঠেই আমি চেতনা হারিয়ে পড়েছিলাম। তোমাদের চেষ্টায় এই একটু আগে জ্ঞান ফিরেছে।

আশ্চর্য! অবাক হয়ে প্রশ্ন করল পেনক্র্যাফট, আপনি তবে এই গুহায় এলেন কী করে? টপ কি আপনাকে কামড়ে টেনে এনেছে নাকি?

কেন? হার্ডিংকেও অবাক দেখালো : তোমরা কি এখানে নিয়ে আসোনি আমায়!

না। এই গুহাতে এসেই তো আমরা আপনার দেখা পাই। এর আগে নেবও তো আপনাকে এই গুহাতেই দেখছে।

কী আশ্চর্য! সবিস্ময়ে কাপ্টেন বললেন, তবে আমায় এখানে আনলে কে? টপ নিশ্চয়ই আনেনি। তবে কি আমি নিজেই উঠে এসেছি? কিন্তু তা-ই বা এলুম কখন?

ভারি আশ্চর্য তো! কোনো লোকজন এখানে বাস করে কি?

স্পিলেট ঘাড় নাড়লেন।না, অন্তত আমরা তো কাউকেই দেখতে পাইনি। আর যতদূর দেখছি তাতে মনে হয়, এটা একটা জনমানবশূন্য দ্বীপ।

উত্তেজনায় ক্যাপ্টেন উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীরে তখন যেন যৌবন ফিরে এসেছে। তাড়াতাড়ি তিনি গুহার বাইরে বেরিয়ে এলেন। অন্যরাও তার অনুসরণ করলে। বাইরে এসে হার্ডিং পাহাড় থেকে নিচে নামলেন। তারপর নিচু হয়ে মাটির উপর কীসের দাগ। লক্ষ করতে লাগলেন।

খানিক লক্ষ করে হার্ডিং সকলের পায়ের দিকে তাকালেন। আরে! সকলের পায়েই তো জুতো আছে? তাহলে এই খালি পায়ের ছাপ এখানে এলো কী করে? বলে তিনি মাটির দিকে তর্জনী নির্দেশ করলেন।

সবাই অবাক হয়ে দেখতে পেলে ভিজে মাটিতে খালি-পায়ের একাধিক দাগ।

হার্ডিং-এর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল : এই দ্বীপ মোটেই জনশূন্য নয়। এই দ্বীপে নিশ্চয়ই মানুষ আছে। অন্তত এমন-একজন মানুষ আছে, যে আমাকে সমুদ্রের ধার থেকে তুলে এনে এই গুহায় রেখে দিয়ে গেছে। কিন্তু কে সে? সে কি এই দ্বীপের কোনো বুনো অধিবাসীদের একজন? না, প্রশান্ত মহাসাগরের নির্জন দ্বীপে যে-সব বোম্বেটের আস্তানা আছে সেই বোম্বেটেদের দলের লোক? কিন্তু তাদের যে মানুষের প্রতি বিশেষ দয়া আছে তা তো মনে হয় না। তবে কে সেই লোক, যে আমাকে এই গুহায় নিয়ে এলো? কে?

কে? সমস্বরে সবাই এই প্রশ্নই করলেন।

কিন্তু সঠিক কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।

নিঃশব্দে, একটিও কথা না-বলে, সবাই তাড়াতাড়ি আবার গুহাটায় ফিরে এলেন।

.

১.৫ আরেকটা আশ্চর্য ব্যাপার

যদিও সাইরাস হার্ডিং উঠে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন, তবু তাঁর সুস্থ হতে পুরো একটা দিন লাগল।

সেইজন্যে সে-রাত্রে আর আগের গুহায়, অর্থাৎ চিমনিতে না-গিয়ে তারা সেই গুহাতেই কাটিয়ে দিলেন। নেব আর পেনক্র্যাফট একবার মাত্র বনে গিয়ে আহারের জন্যে কয়েকটা পাখি মেরে আনলে। একদিন শুধু ডিম আর ঝিনুক খেয়ে থাকবার পর মাংস খেতে পেয়ে সবাই খুশি হয়ে উঠলেন।

পরদিন ভোরবেলায় ক্যাপ্টেনকে সঙ্গে নিয়ে সবাই চিমনিতে ফিরে এলেন। কিন্তু ফিরে এসে একটা ব্যাপার দেখে তাদের চোখ মাথায় উঠল। গুহার জ্বালানো আগুন নিভে গেছে। এককণা জুলন্ত অঙ্গর পাওয়ার জন্যে তারা ছাই তুলতে লাগলেন। কিন্তু বৃথাই শুধু হয়রানই হতে হল–আগুন একেবারেই নিভে গেছে।

যে-গুহা তারা এইমাত্র ছেড়ে এসেছেন, সেই গুহাতেও তারা আগুন রেখে আসেননি।

সবচেয়ে চঞ্চল হয়ে উঠল পেনক্র্যাফট। বললে সর্বনাশ! এখন আমাদের উপায় কী হবে? এইবার কাঁচা মাংস বা ডিম ছাড়া আর আমাদের বরাতে ঝলসানো মাংস বা ডিম জুটবে না! রাত্তিরে একটু আলোর দরকার হলেই বা পাবো কোথায়?

স্পিলেট জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার কাছে কি দেশলাই আছে, ক্যাপ্টেন হার্ডিং?

না। হার্ডিং জবাব দিলেন, আমি সিগারেট খাইনে বলে ও-সব জিনিশ কাছে রাখার দরকার হয় না। আর যদিই-বা আমার কাছে থাকতো, তাহলেও জলে পড়ে গিয়ে ভিজে নষ্ট হয়ে যেতো।

পেনক্র্যাফট চিন্তিত হয়ে পড়ল। শুধু কেবল আগুনের অভাবে এই জনমানবহীন দ্বীপে বেঁচে থাকা যে অসম্ভব, তা সে স্পষ্টই বুঝতে পারলে। তার আর দুশ্চিন্তার সীমা রইল না।

নেব তার কানে-কানে বললে, আপনি খামকা এত ভাববেন না! ক্যাপ্টেন যখন আমাদের কাছে আছেন, তখন এর একটা উপায় তিনি করবেনই।

হার্ডিং বললেন, এসো আমরা এখন ওই পাহাড়টার উপর উঠে দেখি, এটা কোনো দ্বীপ না মহাদেশের কোনো অংশ। যদি এটা দ্বীপই হয়, তাহলেও এই দ্বীপটা কত বড়ো, তা আমাদের জানা দরকার। কেননা, বাধ্য হয়ে যখন এখানে আমাদের অন্তত কিছুদিনের জন্যেও থাকতে হচ্ছে, তখন এর আয়তনটাও আমাদের জেনে রাখা ভালো।

সবাই আস্তে-আস্তে পাহাড়টার উপর উঠতে লাগলেন। স্পিলেটের হাতে রিস্টওয়াচ ছিল। পাহাড়ে ওঠা শেষ হলে পর তিনি ঘড়ি দেখে জানালেন, বেলা বারোটা বেজেছে।

উপরে উঠে ভালো করে চারধার অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করে ক্যাপ্টেন বললেন, এটা দ্বীপ, না কোনো মহাদেশের একাংশ, সেটা ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। পাহাড়টা বড্ড ছোটো। একটা বড়ো পাহাড়ে উঠে আমাদের ভালো করে অনুসন্ধান করতে হবে। তবে এটা যদি দ্বীপই হয়, তবে নেহাৎ ছোটো দ্বীপ নয়, লম্বায় বোধহয় বিশ মাইলের মতন হবে।

পেনক্র্যাফট আগুনের ভাবনায় আর খিদেয় ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠছিল। তার নীল কামিজে হাত ঘসতে ঘসতে সে বললে, এটা দ্বীপই হোক, আর মহাদেশই হোক—বড়ো হোক কিংবা ছোটোই হোক–আজ থেকে না-খেয়ে মরতে হবে আমাদের। আপনি সে, বিষয়ে কিছু ভাবছেন কি, ক্যাপ্টেন হার্ডিং?

ক্যাপ্টেন হার্ডিং শুধু একটু হাসলেন। বললেন, পাখির মাংস জোগাড় করে আনতেই যা দেরি, নইলে আগুনের আর ভাবনা কী?

বিস্ময়ে পেনক্র্যাফটের চোখদুটি গোল হয়ে উঠল : কী বলছেন আপনি! পাখির মাংস জোগাড় করে আনতেই যা দেরি—আর আগুনের জন্যে ভাবনা নেই? কিন্তু আগুন আপনি পাচ্ছেন কোথায়?

তার হাবভাব আর কথা বলার ভঙ্গিতে সবাই হেসে উঠলেন। হার্ডিংও তার দুর্ভাবনা দেখে না-হেসে পারলেন না। বললেন, পেনক্র্যাফট, তুমি পাখির মাংস জোগাড় করে আনো, আগুন জ্বালাবার ভার আমার উপর রইল।

এবার পেনক্র্যাফটের বিস্ময় অনেকটা কমে এল। বললে দুটো কাঠকে ঘসে আগুন জ্বালাবার কথা বোধহয় আপনি বলছেন, ক্যাপ্টেন? তাতে কিন্তু কোনো কাজই হয় না। আমি একটা অ্যাডভেনচারের বইতে ওই কথা পড়েছিলুম বটে, কিন্তু সে-কাঠ নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো এক ধরনের কাঠ। কেননা, দুঃখের সঙ্গে আমি আপনাকে জানাচ্ছি যে, এতদিন এক ঘণ্টা ধরে আমি দুটো কাঠ ঘসে একটুও আগুনের ফুলকি পর্যন্ত বার করতে পারিনি, আগুন তো দূরের কথা!

এই কথা বলে পেনক্র্যাফট ভেবেছিল এবার বোধহয় ক্যাপ্টেন দমে যাবেন, কিন্তু তিনি মোটেই দমলেন না। তার রকম-সকম দেখে আবার একটু হেসে হার্ডিং বললেন, কিন্তু। আমি আগেই তোমাকে বলেছি পেনক্র্যাফট, সে-ভার আমার, তোমার নয়। মাংস জোগাড় করতেই তোমার যা দেরি হচ্ছে। তুমি বরং একটু তাড়াতাড়ি যাও।

আর-একটি কথা না-বলে পেনক্র্যাফট বেরিয়ে পড়লো। হাবার্ট আর নেবুও শিকারের লোভে তার অনুসরণ করলে। খানিকটা দূরে এগিয়ে তারা পিছন ফিরে দেখে, টপও লাফাতেলাফাতে তাদের সঙ্গে আসছে।

পাহাড় থেকে একটু দূরেই যে-অরণ্য ছিল, তারা তিনজনে সেই অরণ্যে শিকার করতে চলল। অবস্থা অবিশ্যি অনেকটা ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতন। হাতে কোনো অস্ত্র নেই, হাতিয়ার নেই, অথচ শিকারীরা শিকার করতে চলেছে। পেনক্র্যাফট একটা গাছের কয়েকটা সরু ডাল ভেঙে নিলে। কোনো পাখি বা জানোয়ার সামনে পড়লে এই ডাল দিয়ে আঘাত করেই মারতে হবে। হার্বার্ট আর নেবের হাতেও সে এক-একটা ডাল তুলে দিলে।

অরণ্য এত নিবিড়, এত অন্ধকার যে তার ভিতরে প্রবেশ করাই রীতিমতো অ্যাডভেনচার। নেব গাছের ডাল হাতে নিয়ে লতাপাতা প্রভৃতির উপর ঘা মেরে দু-হাতে পাতা সরিয়ে পথ করে চলতে লাগল, আর অন্য দুজন তার পিছনে-পিছনে চলল। এইভাবে বেশ খানিকটা এবার পর অরণ্য একটু পাৎলা হয়ে এলো। অরণ্যের অন্ধকারও ঈষৎ ফিকে হয়ে এলো। শিকারের সন্ধানে এদিক-ওদিক তাকালো সবাই। কিন্তু একটা জানোয়ারও দেখা গেল না।

হার্বার্ট বললে, বনের ভিতর এসেও শিকার জুটল না আমাদের বরাতে। কিন্তু আর বেশিদূর এগিয়ে যাওয়াও বিপজ্জনক। এই দ্বীপে যদি অসভ্য বুনো অধিবাসীরা থাকে, তাহলে হয়তো আমাদের ধরে নিয়ে যাবে। আজও না-হয় আমরা ডিম আর ঝিনুক খেয়েই থাকবো।

ঘাড় নেড়ে উঠল পেনক্র্যাফট না হার্বার্ট, আজ শুধু-হাতে ফিরলে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাবে। ক্যাপ্টেন হার্ডিং আগুন নিয়ে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবেন, আর আমরা শুধু হাতে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াবো? অসভ্য বুনোদের ভয় যদি থাকে, তোমরা ফিরে যাও। আমি আজকে কিছু একটা শিকার না-করে ফিরছি না।

হার্বার্টের বড়ো অভিমান হল। সেও কি তাই বলতে চাইছে না? বুনোদের ভয়ে সে তার আশ্রয়দাতাকে ছেড়ে চলে যাবে-সে কি এতই কাপুরুষ! কোন কথা না-বলে সে চুপ করে রইল।

এমন সময় কয়েকটা গাছপালার আড়ালে একটা হুটোপাটির আওয়াজ শোনা গেল। ব্যাপার কী দেখবার জন্যে গাছের ডাল সরিয়ে তিনজনেই একসঙ্গে ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু ব্যাপার দেখে তারা না-হেসে থাকতে পারল না। টপ একটা খরগোশের পা সাংঘাতিকভাবে কামড়ে ধরেছে, আর খরগোশটা টপের কবল থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। নেব তখন তার হাতের ডালটার আঘাতে খরগোশটাকে মারলে।

পেনক্র্যাফট ভারি খুশি হয়ে উঠল। যাক, এবার আমাদের কাজ শেষ হয়েছে, এখন চলো ফিরে যাই সবাই। আমি কিন্তু তোমায় বলে রাখছি, হার্বার্ট, ক্যাপ্টেন হার্ডিং কোনোমতেই আগুন জোগাড় করতে পারবেন না। তাকে আজ হার মানতেই হবে।

নেব তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে উঠল : আমিও বলে রাখছি আপনাকে, ক্যাপ্টেন কখনোই হারবেন না।

আচ্ছা, দেখা যাক। বলে তিনজনে ফেরার পথ ধরলে। নেব খরগোশটাকে পিঠে ঝুলিয়ে নিলে। তিনজনে দ্রুতপদে ওহার দিকে পা চালাতে লাগল।

খানিক এগিয়েই বড়ো একটা হ্রদ চোখে পড়ল সকলের। এই হ্রদটা লম্বায় প্রায় এক মাইল, চওড়ায় সিকি মাইলের মতো হবে। স্পিলেট প্রথম দিন এই হ্রদ থেকেই জল নিয়ে গিয়েছিলেন।

গুহার কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল, গুহার মুখ থেকে ধোঁয়া উঠছে। আগুন ছাড়া ধোঁয়া ওঠে কোত্থেকে? পেনক্র্যাফট হতভম্ব হয়ে গেল। বিস্মিত হয়ে বললে, তাই তো হে, হার্বার্ট, ধোঁয়া ওঠে কোত্থেকে বলে দিকিনি।

ধোঁয়া যে কোথকে উঠছে, তা বুঝতে আর কারু বাকি রইল না। সাইরাস হার্ডিং যে আগুন জ্বালাতে পেরেছেন, তা সকলেই বুঝতে পারলে। গুহায় আসতেই দেখা গেল বড়ো একটা অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত হয়েছে।

ওদের দেখে হার্ডিং হাসতে হাসতে বললেন, এই যে, তোমরা এসে গেছ? আমি সেই কখন থেকে আগুন জ্বালিয়ে তোমাদের জন্যে বসে আছি।

পেনক্র্যাফট কথা বলবে কি, বিস্ময়ে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়েছিল। আগুন জালানোর কোনো উপকরণ না-থাকলেও যে আগুন জ্বালানো সম্ভব হয়েছে, একে ভুতুড়ে ব্যাপার ছাড়া আর কী বলা যায়? একটু বাদে নিজেকে খানিকটা সামলে সে বললে, আপনি কি জাদু জানেন, ক্যাপ্টেন?

হো-হো করে হেসে উঠলেন হার্ডিং : জাদু? ম্যাজিক? না পেনক্র্যাফট, ম্যাজিক আমি কোনোকালেই শিখিনি। তবে ম্যাজিকের চেয়েও আশ্চর্য-কিছু করা যায়, এমন ধরনের কতগুলো বিজ্ঞানের বই এককালে পড়েছিলুম।

কী করে আগুন জ্বালালেন আপনি? বিস্মিত পেনক্র্যাফট প্রশ্ন করলে।

হার্ডিং উত্তর করলেন, কেন? আগুন জ্বালানো আর একটা বেশি কী? মিস্টার স্পিলেটের আর আমার রিস্টওয়াচের কাচদুটো খুলে নিয়ে, ওই কাচদুটোকে দু-পাশের ঢাকনির মতো করে পাঁক দিয়ে তার ধারগুলো বন্ধ করে দিলুম। তখন দেখতে হলে ঠিক একটা কৌটোর মতো। তখন একপাশ দিয়ে তার ভিতর জল পুরে দিয়ে সেই মুখটাও বন্ধ করে দিলাম। তারপর সেই কাচের উপর সূর্যরশ্মি ফেলে কতগুলো শুকনো পাতার উপর সেই রশ্মি প্রতিফলিত করতেই একটু পরে সেই পাতাগুলো জ্বলে উঠল।

পেনক্র্যাফট এতক্ষণ চোখ গোল করে তার কথা শুনছিল। এবার তার মনে হল, ক্যাপ্টেনের প্রতিভা সত্যিই সাধারণ নয়, তার কাছে যা-কিছু চাওয়া যাবে তা-ই পাওয়া যাবে। তাই সাহসে ভর করে সে বললে, ক্যাপ্টেন হার্ডিং, আপনার কাছে আমার আরো-একটা প্রার্থনা আছে। আপনি আপনার অসাধারণ প্রতিভার জোরে যেখান থেকে হোক একটা ছুরি আমাকে দিন, খরগোশের মাংস কাটতে সুবিধে হবে।

বিব্রতভাবে চারদিকে তাকালেন হার্ডিং। বললেন, ছুরি! ছুরি আবার এখানে আমি পাবো কোথায়? আমাদের কারু কাছেই তো একটাও ছুরি নেই!

কিন্তু পেনক্র্যাফটের সাহস বেড়ে গিয়েছিল। তার মনে হল, হার্ডিং-এর কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। যিনি বিনা আগুনে আগুন জ্বালান তার কাছে মাংস কাটবার জন্যে একটা ছুরি পাওয়া এমন-কিছু বিচিত্র ব্যাপার নয়। সে বললে, কিন্তু আপনি একটু মাথা খাটালেই

একটা ছুরি হয়তো পাওয়া যায়।

কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন হার্ডিং। তারপর বললেন, আচ্ছা, দেখছি। কাজ-চালানোগোছের একটা ছুরি পেলেই তো তোমার চলবে?

পেনক্র্যাফট ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালে।

সাইরাস হার্ডিং টপকে কাছে ডাকলেন। তার গলায় লোহার যে-পাৎলা পাতটা পরানো ছিল, তা খুলে নিয়ে ভেঙে দু-টুকরো করলেন। তারপর পেনক্র্যাফটের দিকে পাতদুটো বাড়িয়ে ধরে বললেন, এই নাও তোমার ছুরি–একটা নয়, দুটো। পাথরে ঘষে একটু ধার দিয়ে নিলেই তোমার কাজ-চলার মতন চমৎকার ছুরি তৈরি হয়ে যাবে।

পেনক্র্যাফট তো আনন্দে লাফ দিয়ে উঠল প্রায়। উত্তেজিত স্বরে বললে, ক্যাপ্টেন, আপনার মাথায় কী বুদ্ধিই খেলে! এইসব সহজ-সহজ জিনিশগুলো পর্যন্ত আমার মাথায় আসে না। আমি একটা রীতিমতো গর্দভ!

যাক সাংবাদিক হাসতে হাসতে বললেন, তাহলে এবার তোমার আত্মজ্ঞান হবার পর থেকে ক্যাপ্টেনের সব কথাই তোমার বিশ্বাস হবে তো, পেনক্র্যাফট?

নিশ্চয়ই বলে পেনক্র্যাফট লোহার পাতদুটোয় ধার দিতে লাগল।

নেব এসে, কানে-কানে বললে, ক্যাপ্টেনের ক্ষমতা অদ্ভুত কি না, এখন প্রমাণ হল তো?

পেনক্র্যাফট বললে, ক্যাপ্টেন যে এত-বড়ো প্রতিভাবান, না-দেখলে তা কী করে জানবো, বলো?

খরগোশের মাংস দিয়ে সেদিন তো তাদের রীতিমতো একটা ভোজ হয়ে গেল।

বলবার মতো কোনোকিছু সে-দিন আর ঘটল না। কিন্তু পরদিন একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল।

পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই হার্ডিং পেনক্র্যাফটকে বললেন, আজ আর তোমার শিকারে গিয়ে কাজ নেই, পেনক্র্যাফট। পাখির ডিম আর ঝিনুক খেয়েই আজ আমাদের বেশ চলে যাবে। শিকার করতে গেলে মাঝখান থেকে খানিকটা দেরি হয়ে যাবে, কিন্তু আজ আমাদের কোথাও অযথা সময় নষ্ট করলে চলবে না। তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে একবার চারধারে ঘুরে দেখতে হবে।

হার্বাট বললে, কিন্তু কিছু মাংস খেতে পেলে ভালো হত। ডিম আর ঝিনুক অনেকগুলো খেলেও আমার পেট ভরে না।

হার্ডিং একটু হাসলেন। বললেন, কী আর করা যাবে বলো। কোনো উপায় তো নেই। যদ্দিন আমরা এখানে থাকবো তার কোনোদিন জুটবে খরগোশের মাংস, আর কোনোদিন পাবো শুধু পাখির ডিম আর সামুদ্রিক ঝিনুক।

কিন্তু কতদিন আমাদের এখানে থাকতে হবে?

নির্বিকারভাবে হার্ডিং উত্তর করলেন, যতদিন-না আমরা কোনো উপায় ঠিক করতে পারি। দুর্ভাগ্য আমাদের যেখানে টেনে এনেছে, যতদূর মনে হচ্ছে সেটা একটা দ্বীপ। এই দ্বীপের চারপাশে সীমাহারা নীল নির্জন প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল তরঙ্গ। কে জানে, একশো মাইলের ভিতরে, আর-কোনো দ্বীপ বা মহাদেশ আছে কি না!

হার্বার্ট হতাশ হয়ে বললে, ঈশ্বর জানেন, এই দ্বীপ থেকে কখনও মুক্তি পাবো কি। আর কখনও মুক্তি পাবে বলে তো আমার মনে হয় না।

মুক্তি আবার আমরা পেতে পারি–হার্ডিং উৎসাহ দেবার চেষ্টা করলেন, যেমনভাবে আমরা এই দ্বীপে এসে পড়েছি, তেমনি অপ্রত্যাশিত কিছু যদি ঘটে।

পেনক্র্যাফট বললে, সে-রকম অসম্ভব–কিছু ঘটবার সম্ভবনাই বা কোথায়? কোনো যাত্রী বা মালবাহী জাহাজ বোধহয় এই দ্বীপের কয়েকশো মাইলের মধ্য দিয়েও যাওয়া-আসা করে না।

হার্ডিং বললেন, কিন্তু যখন অসম্ভব কিছু ঘটে, তখন তার আভাস আগে থেকে পাওয়া যায় না, সেটা আকস্মিকই হয়।

নেব এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এইবার বললে, এই দ্বীপটায় আর যত অসুবিধেই থাক, এখানে হিংস্র জানোয়ার কিংবা জংলিদের হাতে প্রাণ দেবার কোনো ভয় নেই।

হার্ডিং-এর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। বললেন, কোনো ভয় নেই, এ-কথা তোমায় কে বললে, নেব? প্রশান্ত মহাসাগরের এইসব অজানা ছোটো-ছোটো দ্বীপ কত ভয়ংকর হয়, তা জানো? মালয় বোম্বেটের দল জাহাজ লুঠতরাজ করে এ-সব দ্বীপে এসে আশ্রয় নেয়। তারা বুনো জানোয়ার বা নরখাদক জংলিদের চেয়ে কম ভয়ংকর নয়।

এ-কথা শুনে সকলের মুখই গম্ভীর হয়ে উঠল। হার্ডিং আবার বললেন, কে বলতে পারে যে আমাদের এই দ্বীপটাই বোম্বেটেদের একটা ঘাঁটি নয়?

খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন সবাই। তারপর ধীর স্বরে পেনক্র্যাফট বললে, তাহলে এই দ্বীপে নেমে অব্দি এখনও যে কোনো বোম্বেটে দলের সামনাসামনি পড়িনি, এটাকে সৌভাগ্যই বলতে হবে।

নিশ্চয়ই। হার্ডিং বললেন, আর এসব দ্বীপে আস্তানা তৈরি করাই তাদের তরফে সবচেয়ে সুবিধের। প্রশান্ত মহাসাগরের এ-সব ছোটো-ছোটো দ্বীপ বাইরের দুনিয়ার অজ্ঞাত। কবে যে অকস্মাৎ এই দ্বীপগুলোর সৃষ্টি হচ্ছে আর কবে যে এগুলো আবার আকস্মিকভাবে জলের তলায় মিলিয়ে যাচ্ছে, তা কেউ জানে না।

একরাশ আতঙ্ক ঝরে পড়ল নেবের গলা থেকে : দ্বীপ আবার জলের তলায় মিলিয়ে যায় নাকি, ক্যাপ্টেন? তাহলে আমাদেরও একদিন এই দ্বীপের সঙ্গে জলের তলায় যেতে হবে।

তার আতঙ্ক দেখে হাডিং না-হেসে পারলেন না। নেবুকে আশ্বস্ত করে বললেন, না নেব, সম্প্রতি তোমার জলে ডোববার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। তবে, আমার কথায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের ধারণা, শুধু ছোটোখাটো দ্বীপ কেন, বড়ো-বড়ো মহাদেশগুলোরও জন্ম রয়েছে এমনিভাবে জলের থেকে ভূত্বকের আলোড়নের দরুন। আবার হয়তো একদিন সেগুলোও এই জলের তলায় মিলিয়ে যাবে।

হতবুদ্ধি হয়ে নেব শুধু বলে উঠল, কী ভয়ংকর কথা!

হার্ডিং বলে চললেন, ভূমিকম্পের দরুন প্রায়ই তো কত জায়গা মাটির তলায় বসে যায় কিংবা জলের তলায় মিলিয়ে যায়। আবার ভূমিকম্পে হয়তো হঠাৎ-একদিন জলের উপর নতুন দ্বীপের সৃষ্টি হয়। এই-যে আফ্রিকার প্রকাণ্ড শাহারা মরুভূমি-অনেকেরই ধারণা একদিন ওটা ছিল একটা সাগর। তারপর সংঘাতিক একটা ভূমিকম্পে একদিন সেই সাগর স্থানচ্যুত হয়ে গেছে, আর জলের তলা থেকে বালি উঠে এসেছে। আগে সাগর ছিল বলেই তো শাহারা মরুভূমিতে অত বালি!

কথায়-কথায় বেলা বেড়ে উঠেছে দেখে সবাই তখন খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থায় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কয়েকটা পাখির ডিম আর সামুদ্রিক ঝিনুক জোগাড় করতে খুব বেশি দেরি হল না। সেগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে নিয়ে আহার করতে-করতে বেলা দুপুর হয়ে গেল। ঘণ্টাখানেক জিরিয়ে সবাই বেড়াতে বেরুলেন। টপও সঙ্গে চলল।

কখনও-বা ছোটো-বড়ো পাহাড়ের উপর দিয়ে কখনও-বা পাহাড়ের পাশ দিয়ে তারা চলতে লাগলেন। পাহাড়গুলো গ্র্যানাইট  পাথরের, তার চারদিকে ইতস্তত কত গ্র্যানাইট  ছড়িয়ে আছে। যেখানে পাহাড় নেই, সেখানে গাছ-গাছালির ভিড়। পাহাড়ের উপর নানান জাতের পাখি দেখা গেল।

অনেক ঘোরাঘুরি করে এক অজানা পথ দিয়ে তখন সকলে প্রায় বনের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছেন, এমন সময় নেবের চীৎকারে সবাই থমকে দাঁড়ালেন। হার্ডিং আর স্পিলেট গল্প করতে-করতে একটু পেছনে আসছিলেন, নে হাবার্ট আর পেনক্র্যাফট এগিয়ে চলছিল। নেব হঠাৎ দৌড়ে এসে বললে, সর্বনাশ হয়েছে, ক্যাপ্টেন! ওই দেখুন পাহাড়ের গা থেকে ধোঁয়া উঠছে, বোধহয় ওই দ্বীপের জংলিরা আগুন জ্বেলেছে? যদি ওরা আমাদের দেখতে পেয়ে থাকে, তাহলে আর আমাদের কোনোরকমেই রেহাই পাওয়ার জো নেই?

উত্তেজিত হয়ে হার্ডিং শুধোলেন, হাবার্ট আর পেনক্র্যাফট কোথায়? তাদের তো দেখতে পাচ্ছি না!

নেব হাঁপাতে হাঁপাতে জবাব দিলে, তারা দুজনে ওই ঝোপে অপেক্ষা করছেন। আপনি এখন কী করতে বলেন?

হার্ডিং স্পিলেটের মুখের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, আড়ালে লুকিয়ে থেকে তাকিয়ে-তাকিয়ে ব্যাপারটা দেখলে মন্দ কী?

সাংবাদিক সায় দিলেন, আমারও তা-ই ভালো বলে মনে হচ্ছে।

তারপর তারা দ্রুতপদে এগিয়ে যেখানে হার্বার্ট আর পেনক্র্যাফট অপেক্ষা করছিল সেখানে এসে হাজির হলেন। তারপর খুব সাবধানে আস্তে আস্তে পাহাড়ে উঠতে লাগলেন সকলে।

জংলিরা পাছে দেখতে পায়, এই ভয়ে পাথরের আড়ালে একটু-একটু করে এগিয়ে হার্ডিং সকলকে থামতে ইশারা করলেন। তারপর কী ব্যাপার দেখবার জন্যে মুখ বাড়িয়েই। হো-হো করে হেসে উঠলেন, যেন একটা হাসির তুবড়ি ফুটল। একটু পরে হাসি চেপে তিনি বললেন, দেখুন মিস্টার স্পিলেট, একটা নালা দিয়ে জ্বলন্ত সালফিউরিক অ্যাসিডের

স্রোত বয়ে যাচ্ছে, আর তা থেকেই ধোঁয়া উঠছে। আগুনের রঙ লাল নয়, নীল।

ক্যাপ্টেনের পেছনে ছিলেন বলে ব্যাপারটা কেউই বুঝতে পারেননি। হঠাৎ তাঁর এই হাসির বহরে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। এবার ব্যাপার কী দেখবার জন্যে সবাই মাথা বাড়ালেন। ক্যাপ্টেন ততক্ষণে নামতে শুরু করে দিয়েছেন। সবাই তার পেছনেপেছনে সেই নীল আগুনের বহমান ধারার দিকে এগিয়ে চললেন। কী সুন্দর দেখাচ্ছে সেই জ্বলন্ত নীল সালফিউরিক অ্যাসিডের স্রোত! অ্যাসিড জমা হয়ে আগুন জ্বলছে।

হার্ডিং বললেন, এই ব্যাপার থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই দ্বীপের বেশিরভাগ পাহাড়ই আগ্নেয়গিরি। এখনও মাঝে-মাঝে হয়তো একটু-একটু অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকে। পাহাড়ের কোনো-একটা জ্বালামুখ দিয়ে বোধহয় এইসব জ্বলন্ত ধাতু ও অ্যাসিড ইত্যাদি বেরিয়ে এসে এ-সব নালায় জমা হয়েছে, আর বাইরে এসেও তাই এগুলো এখনও জ্বলছে, ঠাণ্ডা হয়নি।

একটুক্ষণ সবাই সেই নীল রঙের আগুনের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার চলতে লাগলেন।

বেলা তখন অনেকটা পড়ে এসেছিল। আরো খানিকটা এবার পরই সামনে হ্রদটা গেল।

হ্রদটিকে ডানপাশে রেখে সবাই চলতে লাগলেন। হ্রদের আশপাশে আগাছা জন্মেছে। একটু পর-পর ঘন ঝোপও দেখা গেল। নানান জাতের পাখি জলের উপর বসে খেলা করছিল। বিকেলের রক্তিম আলোয় হ্রদের জল ঝলমল করতে লাগল। সবাই হ্রদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমন সময় টপ হঠাৎ একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সে খুব চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল। সাইরাস হার্ডিং টপকে কাছে ডাকলেন : টপ, এদিকে আয়।

কিন্তু টপ তাঁর কাছে এলো না। বরং তাদের নিশ্চিন্ত ঔদাসীন্যে সে যেন আরো খেপে উঠল। হঠাৎ সে চীৎকার করতে-করতে লাফ দিয়ে হদের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পলকের। মধ্যে টপ যখন জলের তলায় অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন সবাই চঞ্চল হয়ে উঠলেন। তার অদ্ভুত রকম-সকমের কোনো মানে খুঁজে পেলেন না কেউ। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলেন, একটু পরেই টপ জলের উপর ভেসে উঠল, তারপর একটুও দেরি না-করে ডাঙায় উঠে এল।

টপের এই অদ্ভুত আচরণের কারণ কিন্তু শিগগিরই জানা গেল। টপের ডাঙায় উঠে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই একটা বিশালদেহী জলজন্তুর দেহের এক অংশ জলের উপর ভেসে উঠল। জটা কোন শ্রেণীর তা দেখবার জন্যেই সবাই ঝুঁকে দাঁড়ালেন। কিন্তু টপ কাউকে ভালো দেখতে দিলে না। জন্তুটাকে ভালো করে দেখবার আগেই টপ চীৎকার করে আবার তার উপর লাফিয়ে পড়ল। তাকে বাধা দেয়ার এক সেকেণ্ডও সময় পাওয়া গেল না।

তারপরেই ডাঙার জানোয়ারের সঙ্গে জলের জানোয়ারের তুমুল লড়াই বেধে উঠল। প্রবল ঝাপটা-ঝাপটি হয়ে গেল হ্রদের জলে। কিন্তু সেই বিপুলকায় জন্তুর কাছে ছোট্ট টপের শক্তি আর কতটুকু। একটু পরেই টপের এক পা কামড়ে ধরে সেই জটা জলের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর ওঁরা সবাই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তীরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

একটু পরে হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে নেব করুণ গলায় বলে উঠল, হায়, হায়! আমাদের টপকে আর আমরা ফিরে পাবো না, ক্যাপ্টেন! ওই শয়তান জানোয়ারটাই তাকে মেরে ফেলল।

হার্ডিংও তখন সেই কথাই ভাবছিলেন। কিন্তু করবার কিছুই ছিল না। তাছাড়া গোটা ব্যাপারটাই এমনই আচমকা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে, তখনও সবাই ভালো করে বুঝে উঠতে পারেননি। যখন সংবিৎ ফিরল, তখন তীরে দাঁড়িয়ে হাত কামড়ানো ছাড়া করবার কিছুই ছিল না।

কিন্তু শিগগিরই জলের ভিতরে সাংঘাতিক একটা আলোড়ন শুরু হল। জলের ভিতরকার সেই দারুণ আলোড়নে টপ ছিটকে জলের উপর উঠে এলো। জলের উপরে প্রায় দশ-বারো হাত লাফিয়ে উঠে টপ আবার জলে পড়ে গেল। কিন্তু এবার তাড়াতাড়ি সাঁতার কেটে ডাঙায় এসে উঠল।

টপের আঘাতটা কী-রকম দেখবার জন্য সবাই টপের কাছে ছুটে এলেম। কিন্তু পরীক্ষার পর দেখা গেল, তার আঘাত তেমন গুরুতর-কিছু নয়। পেছনের একটা পা সামান্য একটু জখম হয়েছে মাত্র, শরীরের অন্য কোনো জায়গায় আঘাতের কোনো চিহ্নই নেই।

সকলে তখন জলের দিকে তাকালেন আবার। টপের সঙ্গে সেই জটার লড়াই তখন শেষ হয়েছিল বটে, কিন্তু দেখা গেল জলের তলায় তখনও আগের মতো প্রবল আলোড়ন চলেছে।

এর কোনো মানে খুঁজে পেলে না কেউ। লড়াইই যদি শেষ হয়ে গেল, তবে আলোড়ন এখনও থামেনি কেন?

সাইরাস হার্ডিং বললেন, আমার মনে হয় জন্তুটা অন্যকোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়াই করছে।

স্পিলেট ঘাড় নেড়ে তাঁর কথায় সায় দিলেন বটে, কিন্তু জন্তুটার নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী কে হতে পারে, তা তিনি আন্দাজ করতে পারলেন না।

হ্রদের নীল জল তখন লাল হয়ে উঠেছে। শেষ বিকেলের রক্তিম আলোয় নয়, টকটকে লাল রক্তের রঙে। প্রতিদ্বন্দ্বী দুজনের মধ্যে একজন নিশ্চয়ই সাংঘাতিকভাবে আহত হয়েছে। আরো মিনিট পনেরো পরে আগেকার সেই বিশালদেহী জলজন্তুটার বিরাট শরীর জলের উপর ভেসে উঠল। এবার সবাই স্পষ্টভাবে জন্তুটাকে দেখতে পেলেন।

হার্বার্ট বলে উঠল, এ-যে দেখছি প্রকাণ্ড একটা সীল?

তাঁরা আর একটুও দেরি না-করে কয়েকটা শক্ত দেখে একটা গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে এলেন, তারপর একটু জলে নেমে সেই ডাল দিয়ে সীলটাকে তীরের দিকে টেনে আনতে লাগলেন। তীরের কাছে এলে পাঁচজনে সেটাকে টেনে ডাঙায় তুললেন। টপ লেজ নাড়তে নাড়তে তার মৃত শত্রুর দেহ শুঁকতে লাগল।

কোন জায়গায় আঘাত পেয়ে সীলটা মারা গেল, তা দেখবার জন্যে পাঁচজন ঝুঁকে পড়লেন! এত-বড়ো একটা প্রাণী যার সঙ্গে লড়াইয়ে নিহত হয়, সে নিশ্চয় আরো-অনেক, বেশি শক্তিশালী। কিন্তু, কী আশ্চর্য! এত-বড়ো একটা লড়াই হয়ে গেল, অথচ অন্য জন্তুটাকে এতটুকু সময়ের জন্যেও জলের উপরে দেখা গেল না!

পেনক্র্যাফট সীলটার গলার কাছে তর্জনী নির্দেশ করল, এই দেখুন ক্যাপ্টেন প্রাণীটার গলায় কত-বড়ো একটা দাঁতের দাগ।

হার্ডিং খুব ভালো করে দাগটা পরীক্ষা করলেন। আস্তে-আস্তে তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। একটা দুর্ভাবনায় কালো হয়ে উঠল তার মুখ। শান্ত, স্পষ্ট স্বরে তিনি বললেন, হ্যাঁ, এই আঘাতেই ওর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আরো-একটা কথা আছে। এ-আঘাত দাঁতের কিংবা কোনো জন্তুর খড়গের নয়। কোনো লোহার হাতিয়ার ছাড়া এ-রকম আঘাত কিছুতেই সম্ভব হয় না।

পেনক্র্যাফটের চোখদুটি গোল হয়ে উঠল। বিস্মিত কণ্ঠে সে বললে, জলের তলায় লোহার হাতিয়ার! এ আপনি কী বলছেন, ক্যাপ্টেন! নিশ্চয় অন্যকোনো প্রাণীর তীক্ষ্ণধার খড়গের আঘাতে ওই দাগ হয়েছে!

হার্ডিং সন্দেহ-গম্ভীর গলায় বললেন, কী জানি, পেনক্র্যাফট, আমার তো তাই মনে হয়। যেদিন থেকে আমি জানতে পেরেছি যে আমার অজ্ঞাতে আমাকে কেউ গুহার ভিতরে শুইয়ে দিয়ে গেছে, সেদিন থেকেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বেশি না-হোক, আমরা পাঁচজন ছাড়াও এই দ্বীপে অন্তত আর-একজন ব্যক্তি আছে। আর এই সাংঘাতিক আঘাতটা হয়তো সেই ব্যক্তিরই কাজ।

কিন্তু সে কী করে হবে, ক্যাপ্টেন? যদি ষষ্ঠ কোনো ব্যক্তি দ্বীপে থেকেই থাকে, তার বাস কি জলের তলায়?

ঠিক বলতে পারছি না। হয়তো জলের তলাতেই থাকে।

এ তো ভারি অদ্ভুত কথা! আমার কিন্তু তা মনে হয় না।

ষষ্ঠ কোনো ব্যক্তি যদি না থাকে তবে ভালোই, দুর্ভাবনার হাত-থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এই বলে হার্ডিং একটু হাসলেন।

এরপর আর এই সম্পর্কে কোনো আলোচনা না-করে সকলে চিমনির পথ ধরলেন। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। এই অজানা রহস্যময় দ্বীপে সন্ধের পর আস্তানার বাইরে থাকাটা ভালো হবে না, শিগগির গুহায় ফিরতে হবে। বিশেষত ক্যাপ্টেন যখন মনে করছেন দ্বীপে কোনো অজ্ঞাত রহস্যময় ষষ্ঠ ব্যক্তি আছে!

পথ চলতে-চলতে স্পিলেটকে লক্ষ্য করে হার্ডিং বললেন, বোধহয় আপনিও দেখে থাকবেন মিস্টার স্পিলেট, কোনো তীক্ষ্ণধার ভারি তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলে সে-আঘাতটা

যে-রকম দেখায়, এই ক্ষতটাও তেমনি।

স্পিলেট তার কথায় সায় দিলেন, হ্যাঁ, দেখলে তা-ই মনে হয় বটে।

তখন হার্ডিং ফিশফিশ করে স্পিলেটকে বললেন, এই দ্বীপে নিশ্চয়ই কোনো-একটা গভীর রহস্য আছে। সমুদ্র-তরঙ্গের হাত থেকে কীভাবে আমি রক্ষা পেয়েছিলুম? এইমাত্র টপকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচালে কে? হয়তো একসময় সব রহস্যেরই সমাধান হবে, কিন্তু তবু এমন দুর্ভাবনায় সময় কাটাতে আমার ভালো লাগছে না!

স্পিলেট আস্তে আস্তে বললেন, আপনার কথাগুলো ঠিক, ক্যাপ্টেন হার্ডিং। যে-করেই হোক, এই রহস্যটা আমাদের ভেদ করতেই হবে। কিন্তু তবু কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে, আমরা ছাড়া এখানে ষষ্ঠ কোনো ব্যক্তি নেই।

না-যদি থাকে, তাহলেই ভালো। হার্ডিং বললেন, কিন্তু আপনি যেন আমার সন্দেহের কথা পেনক্র্যাটদের কাছে বলবেন না। ভেবে ভেবে আমারই মাথা গরম হয়ে উঠছে, আর ওদের তো নেহাৎ অল্প বয়স। শেষে ঘাবড়ে-টাবড়ে গিয়ে একটা কাণ্ড না করে বসে।

সেই সীলটাকে দুটো ডালে ঝুলিয়ে নিয়ে নেব, পেনক্র্যাফট আর হার্বার্ট হৈ-হৈ করে পথ চলছিল। স্পিলেট আর হার্ডিং-ও এবার দ্রুতপায়ে এগুতে লাগলেন। সকলে যখন চিমনিতে পৌঁছুলেন, তখন চারধারে রাত্রির অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে।

সীলটাকে হার্ডিং-এর কথামতো আগামী দিনের জন্যে রেখে দেয়া হল আসছে কাল ওটাকে দিয়ে নানান কাজ করা চলবে।

দুপুরবেলার মতো রাত্রিতেও পাখির ডিম আর ঝিনুকই আহার করলেন সকলে। পরদিন ভোরবেলা সবাই ঘুম থেকে উঠলে সাইরাস হার্ডিং বললেন, আজ থেকে আমাদের অনেক কাজ। প্রথমে নদীর ধার থেকে কিছু এঁটেল মাটি এনে আমাদের কয়েকটা মাটির পাত্র তৈরি করতে হবে। তার পরের কাজ হল গতকালকার মৃত সীলটার চর্বি থেকে তেল প্রস্তুত করা। আজকের আহারের জন্যে শিকারে যাওয়া দরকার। সূতরাং সময় যাতে বাজেখরচ না-হয় সেদিকে লক্ষ রেখো।

সঙ্গে-সঙ্গেই নে আর পেনক্র্যাফট বেরিয়ে গেল শিকারের সন্ধানে। হার্বার্ট গেল ছোটো নদীটির ধার থেকে কিছু এঁটেল মাটি জোগাড় করে আনার জন্যে আর স্পিলেট আর হার্ডিং মৃত সীলটার চর্বি থেকে তেল তৈরির কাজে লেগে গেলেন।

এমনি ধরনের প্রাথমিক দরকারি কাজে পর-পর কয়েকটা দিন যে কোথা দিয়ে উড়ে গেল, কেউই খেয়াল করলেন না। পেনক্র্যাফট শিকারের সুবিধার জন্যে কয়েকটা গাছের ডালের বল্লম তৈরি করেছিল। সেই বল্লমের সাহায্যেই সে একদিন যখন একটা ক্যাপিবারা শিকার করলে, সেদিন তার ফুর্তি দ্যাখে কে! এছাড়া খরগোশ আর পাখি শিকার করতে টপ কম সাহায্য করেনি! কাজেই এই ক-দিন তাদের খাওয়াদাওয়ার কোনো কষ্ট তো হয়ইনি, বরং বেশ তোফা রকমের ভোজই হয়েছে প্রত্যেকদিন।

সপ্তাহখানেক পরে একদিন রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর সাইরাস হার্ডিং সবাইকে ডেকে বললেন, এবার সারা দ্বীপটা খুঁজে দেখবার সময় এসেছে। আসলে এটা দ্বীপ, না কোনো মহাদেশের অংশ, তাও এখনও আমরা ঠিক করে জানি না। সেই সম্পর্কেও আমাদের নিশ্চিত হতে হবে। আগামী কাল আমরা চিমনির কাছে যে-পাহাড়গুলো আছে তারই একটার চূড়ায় উঠবো। তাহলে আশপাশে পঞ্চাশ মাইলের মতো ভালো করে দেখা যাবে। এই জায়গা সম্পর্কে আমাদের মোটামুটি একটা ধারণা করে নেয়া দরকার। কারণ এটা দ্বীপই হোক, আর কোনো মহাদেশের কোনো অংশই হোক, এখানে আমাদের কতদিন থাকতে হবে, তার ঠিক কী?

নেব বললে, এই দ্বীপে যদি অন্যকোনো অধিবাসী থাকে, তাহলে তাকেও হয়তো আমরা বের করতে পারবো।

হয়তো পারবো। হার্ডিং বললেন, অবিশ্যি আদৌ যদি এই দ্বীপে আমরা ছাড়া অন্যকোনো মানুষ থাকে।

তারপর হার্ডিং মনে-মনে বললেন, কে জানে, সত্যিই এই দ্বীপে কেউ আছে কি না। বুনো জংলি হোক, আর এখানকার সজ্জন আদিম জাতিই থোক, কোনো-কেউ যদি না-থাকে, তবে দ্বীপের ষষ্ঠ ব্যক্তিটি কে? তার দেখা কালকের অনুসন্ধানে পাওয়া যাবে কি না, কে জানে? অভিযানের ফলাফলের উপরই নির্ভর করছে সকলের ভবিষ্যৎ।

কত-কী আকাশ-পাতাল কথা ভাবতে-ভাবতে ক্যাপ্টেন সাইরাস হার্ডিং একসময়ে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেলেন।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *