০৫-৬. বাড়ি ফিরেই পড়ার বই

বাড়ি ফিরেই পড়ার বই নিয়ে বসে গিয়েছিল টুপুর। বসাই সার, মন দিতে পারছে না। ঘুরেফিরে ঝাও ঝিয়েনই চলে আসছেন চিন্তায়। লিয়াংয়ের বাবা, লিয়াং, মেইলি, এমনকী কিউরিও শপের বদমেজাজি মালিকটার কথা শুনে ধরে নেওয়াই যায়, ঝিয়েন মানুষটি ছিলেন নিতান্তই নিরীহ। একটা ওয়ালহ্যাঙ্গিং কেনার দরুন তাকে কিনা দুনিয়া থেকেই সরে যেতে হল? কী এমন বিশেষত্ব থাকতে পারে একফালি কাপড়ের টুকরোয়, যাতে কিনা ইতিহাস বদলে যাবে? মেইলি আবার কোত্থেকে যেন ফু শাং নামের এক আপৌরাণিক ক্যারেক্টারকেও এনে ফেলল!

না, গুলিয়ে যাচ্ছে। এমন নয় তো, স্রেফ এক মোটর দুৰ্ঘটনাকে অকারণে রহস্যময় করে তোলা হচ্ছে? হয়তো সেদিন এমনিই প্রিন্সেপ ঘাটে বেড়াতে গিয়েছিলেন মিস্টার ঝিয়েন! পছন্দের জিনিসখানা হাতে পেয়ে হয়তো বেজায় আনন্দ হয়েছিল, হঠাৎই সাধ জেগেছিল গঙ্গার হাওয়া খাওয়ার। মানুষের মনে কখন কী ইচ্ছের উদয় হয়, কেউ কি তা নিখুঁতভাবে বলতে পারে? …কিন্তু ওয়ালহ্যাঙ্গিংটা যে মিসিং হয়েছে, এতে তো কোনও সন্দেহ নেই। কে নিল? কেন নিল? অবশ্য এ-ও হতে পারে, যে ওয়ালহ্যাঙ্গিংটা নিয়েছে, সে হাতের সামনে পেয়েছে বলেই নিয়েছে। মোবাইলটাও হয়তো সেভাবেই গিয়েছে। ডেডবডির কবজি থেকে ঘড়ি খোলা, কিংবা পকেট থেকে পার্স সরানোর মতো ঝুঁকিতে সে যায়নি। পুরনো হিজিবিজি ন্যাকড়া ভেবে ওয়ালহ্যাঙ্গিংটা সে হয়তো এতদিনে ফেলে দিয়েছে। হতে পারে। হতেও তো পারে।

ভাবনার মাঝেই ভোরবেলের ঝংকার। এবং মেঘ না-চাইতেই জল, মিতিনমাসি স্বয়ং হাজির। হাতে ইয়া এক বাক্স। চিকেন মোমোয় ঠাসা।

সহেলি মহা আহ্লাদিত। দুগাল ছড়িয়ে বললেন, হঠাৎ এত খাবার কেন রে?

পেমেন্ট পেয়েছি, মিতিন মিটিমিটি হাসছে, জাল উইলের রহস্যজাল ফর্দাফাঁই। বাড়ির ছোট ছেলের শ্ৰীঘর বাসের বন্দোবস্ত করে এলাম।

অবনী দোকানের খাবার দুচক্ষে দেখতে পারেন না, তবে মোমোর প্রতি তাঁর কিঞ্চিৎ দুর্বলতা আছে। সহেলিকে বললেন, চটপট দুটো বের করে তো। গরম গরম টেস্ট করে দেখি।

বড় প্লেটে মোমোর পাহাড় সাজিয়ে দিলেন সহেলি। টপাটপ উড়ে যাচ্ছে। মিতিন একটা মোমোতে লঙ্কা-রসুনের চাটনি মাখাতে মাখাতে টুপুরকে প্রশ্ন করল, তারপর মিস ওয়াটসন, তোমার তদন্তের কী হাল?

টুপুর বিরস মুখে বলল, ধুৎ, খুন করার কোনও জোরদার কারণই খুঁজে পাচ্ছি না।

তার মানে তোর মনে হচ্ছে খুন নয়?

 বলতে পারে। তবে লিয়াংরা মানতে চাইছে না।

পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কী বলছে? হোমিসাইড?

ওরা বোধহয় পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এখনও পায়নি। নইলে তো লিয়াং আমায় বলত। টুপুর চোখ কুঁচকোল, আচ্ছা মিতিনমাসি, মিস্টার ঝিয়েন যদি গাড়িচাপা পড়েই মারা গিয়ে থাকেন, পোস্টমর্টেম কী করে ধরবে এটা খুন?

যদি সত্যিই ভদ্রলোক রানওভার হয়ে থাকেন, তা হলে খুন কিনা বোঝা কঠিন। কিন্তু ভদ্রলোক যে গাড়িচাপাই পড়েছেন, এটা কি এখনও প্রমাণ হয়েছে। কোনও প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গিয়েছে কি?

না। তখন তো ওদিকে নিৰ্জন রাস্তা..

নিৰ্জন রাস্তায় তো ডেডবডিও ফেলে দেওয়া যায়। তারপর তার উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিলে প্রাথমিকভাবে রানওভারের কেসই মনে হবে।

তা বটে। কিন্তু কেন…

কেনটেন তো পরে ভাবা যাবে। আগে বল, এটা সম্ভব, কি সম্ভব না?

সম্ভব।

অতএব পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আগে দরকার। যদি দেখা যায়, গাড়িচাপা পড়াটাই মৃত্যুর কারণ, তখন সেটা কেউ ইচ্ছে করে করেছে, নাকি অনিচ্ছাকৃত, সেটা ভাবা যেতে পারে। তার আগে পর্যন্ত গোটা দৌড়টাই বুনো হাঁসের পেছনে ছোটা।

অবনী মন দিয়ে মাসি-বোনঝির কথোপকথন শুনছিলেন। হালকা ভাবে মন্তব্য ছুড়লেন, তার মানে টুপুরের অভিযান বৃথা গেল?

মিতিন হেসে বলল, তা কেন অবনীদা? জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা। দুদিনের ঘোরাঘুরিতে কিছু অভিজ্ঞতা তো হল টুপুরের।

বটেই তো, টুপুর ঘাড় নাড়ল, একটা চিনা পরিবারকে তো কাছ থেকে দেখা গেল।

কী কী কথা হল সেখানে যা বলেছিলাম সেভাবে নোটফোট করেছিস?

হুঁ।

আস্তে আস্তে টুপুরের পেট থেকে আজকের অভিযানের যাবতীয় বৃত্তান্ত নিপুণভাবে বের করে নিল মিতিন। খানিকক্ষণ চোখ বুজে ভাবল কী যেন। চোখ পিটপিট করে বলল, প্রিন্সেপ ঘাটে মৃত্যু… মানে হেস্টিংস থানার কেস?

হ্যাঁ। লিয়াংয়ের বাবা তো হেস্টিংস থানাতেই গিয়েছিলেন।

ঠিক আছে, আমি তো ফ্রি হয়েছি, এবার আমি দেখছি। পরশু তোর স্কুল ছুটি আছে না?

হুঁ। জন্মাষ্টমী।

ওদিন তৈরি থাকিস, তোকে নিয়ে বেরোতে পারি। যে নামঠিকানাগুলো টুকে এনেছি, আমায় একটা কাগজে লিখে দে। তোর লিয়াংয়ের কাকার সম্পর্কে ভাল করে খোঁজখবর করি।

টুপুর ঘর থেকে কাগজকলম নিয়ে এল। দেখে দেখে নামধাম লিখছে, তখনই আবার মিতিনের প্রশ্ন, আচ্ছা টুপুর, তুই বললি মিস্টার ঝিয়েনকে সমাধি দেওয়া হয়েছে বৃহস্পতিবার। অর্থাৎ মৃত্যুর পাঁচ দিন পর। এত দিন দেরি হল কেন? মর্গ থেকে বডি পেতে কি লেট হয়েছিল?

অবনী বললেন, চিনারা একটু দেরি করেই সমাধি দেয়, মিতিন।

কেন?

কারণ, এ ব্যাপারে ওদের একটা সংস্কার আছে। চিনাদের ধারণা, মানুষের আত্মা দেহ থেকে বেরিয়ে যতক্ষণ না পর্যন্ত হোয়াংহো নদীর জলে নিজের ছায়া দেখে বুঝতে পারছে সে আর বেঁচে নেই, ততক্ষণ তার দেহ সমাধিতে শোওয়ানো উচিত নয়। মারা যাওয়ার পর ডেডবডি তাই দু-চার দিন বরফে রেখে দেয় ওরা।

তাই নাকি? এটা তো আমার জানা ছিল না।

স্বীকার করছ তা হলে, তোমারও অনেক কিছুই অজানা রয়ে গিয়েছে? অবনী হো-হো হেসে উঠলেন, আমাদের এই কলকাতায় এখনও কত চিনা বাস করে, সে-খবরটা রাখো তো?

মিতিন বলল, হবে হাজার দশেক।

উহঁ। প্রায় কুড়ি হাজার। অবনী হাসিটা ধরে রেখেই বললেন, আমারও এখানকার চিনাদের সম্পর্কে এত নলেজ ছিল না। টুপুর কেসটায় নাক গলিয়েছে দেখে আমার জ্ঞানপিপাসা বেড়ে গেল। ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে ইনফরমেশনগুলো জোগাড় করে ফেললাম। কিছু নলেজ টুপুরকেও পাস করে দিয়েছি।

গুড। মিতিনও হেসে ফেলল, সব তথ্য মগজে ধরে রাখুন। পরে আমাদের কাজে লাগতে পারে।

সহেলি চা করতে গিয়েছিলেন। কাপে চিনি নাড়তে নাড়তে ফিরলেন আসরে। ডিশগুলো টেবিল থেকে নামাতে নামাতে বললেন, আর কী, মাসি-বোনঝি আবার ধ্যাতাং ধ্যাতাং শুরু করে দাও। …টুপুর, তুমি কিন্তু ভুলে যেও না, পুজোর আগে তোমার পরীক্ষা আছে।

জানি তো। টুপুর মাকে আর এগোতে দিল না। মিতিনকে বলল, কুশলকেও কিন্তু আমরা সঙ্গে রাখব। ও এই কেটায় খুব ইন্টারেস্ট পেয়েছে।

ছেলেটা কেমন? বুদ্ধিসুদ্ধি আছে?

একটু হামবাগ। পেটুক। তবে বোকা নয়।

থাকুক তা হলে। এবার তো আর তোর পার্থমেসো জয়েন করতে পারছে না। প্রেসে ডিটিপি বসিয়েছে, নিজে নিজেই কম্পোজ করছে। পুজো পর্যন্ত তার নড়াচড়ার উপায় নেই। কুশল নয় তোর পার্থমেসোর প্রক্সি দিক।

অবনী বললেন, তা হ্যাঁ হে, পুজোয় বেরোনোটা হচ্ছে তো? পার্থ তো একবার আওয়াজ তুলেই চেপে গেল, আর কোনও সাড়াশব্দ নেই!

সহেলি ঝামরে উঠলেন, শুনছ না, বেচারা এখন ব্যস্ত?

আহা, ট্রেনের টিকিট কাটতে হবে না? অগাস্ট তো প্রায় শেষ হয়ে এল!

মিতিন ফিক করে হাসল। টুপুরকে বলল, অ্যাই, তোর বাবাকে বলে দে গোয়েন্দাগিরির প্রথম শিক্ষাটা কী?

টুপুর মাথা চুলকোল, কী গো?

কোনও কিছু আগে থেকে ধরে নিতে নেই।… অবনীদা, আপনি কেন ভাবছেন আমরা ট্রেনেই মুম্বই যাব? প্লেনেও তো যেতে পারি।

সহেলির মুখ হাঁ হয়ে গেল, এরোপ্লেন? আকাশপথে মুম্বই?.. কিন্তু যদি অ্যাকসিডেন্ট-ফ্যাকসিডেন্ট হয়?

দুর্ঘটনা কীসে হয় না, দিদি? ওভাবে ভাবলে ট্রেন বাস-ট্রামট্যাক্সি, কোনও কিছুতেই তো চড়া যায় না। এমনকী, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকলেও তো গাড়ি এসে ধাক্কা মারতে পারে। তার জন্য কি পথে বেরোনো বন্ধ করে দেবে?

ঠিকই তো। বটেই তো। প্লেনে চড়ার প্রস্তাবে টুপুর টগবগ ফুটছে। উত্তেজিতভাবে বলল, মিস্টার ঝিয়েনের কী হল, অ্যাঁ? তিনি তো বেজায় সাবধানি ছিলেন। তাঁকেও তো গাড়িচাপা পড়েই…

নো টুপুর। নো। মিতিন আঙুল দোলাচ্ছে, ওই ব্যাপারটায় তুমি কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। মিস্টার ঝিয়েনের মৃত্যুর কারণ এখনও তদন্তের পর্যায়ে।

টুপুর অপ্রস্তুত মুখে হাসল, তা ঠিক।

রাতে একটা বিদঘুটে স্বপ্ন দেখল টুপুর। শাঁ-শাঁ করে একটা গাড়ি ছুটছে। লিয়াংয়ের বাবা দৌড়ে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, গাড়িটা তাঁকে পিষে দিয়ে শূন্যে উড়ে গেল। পলকে এরোপ্লেন হয়ে গিয়েছে গাড়িটা, পাইলটের সিটে বসে আছে কিউরিও শপের মালিক। এরোপ্লেনের লেজের দিকটায় ঝুলছে একটা হলুদ রঙের ময়লা কাপড়। কুশল, টুপুর আর লিয়াং তাড়া করছে প্লেনটাকে। বাতাসে ভেসে ভেসে। অনেকটা কুইডিচ খেলার মতো। হঠাৎই বুদুম আওয়াজ, প্লেনটা দাউদাউ জ্বলে উঠল। সহেলি বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন…।

ঘুম ভাঙার পরও ধন্দ-মাখা মুখে বিছানায় বসে রইল টুপুর। বিটকেল স্বপ্নটার কোনও অর্থ আছে কি? কী হতে পারে? ভবিষ্যতের কোনও আভাস?

.

০৬.

কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছিল জোর। প্রায় ঘণ্টাখানেক। বর্ষা যেন এ বছর গিয়েও যাচ্ছে না। মাঝে মাঝেই জানান দিচ্ছে নিজেকে। সকালবেলা অবশ্য মেঘ কেটে গিয়ে ঝিকমিক করছে রোদ্দুর। বেলা বাড়তে না বাড়তে সূর্যের তাপ রীতিমতো চড়া। একটা বিচ্ছিরি চিটচিটে গরমে প্ৰাণ আইঢাই।

পৌনে এগারোটা নাগাদ বেকবাগানের মোড় এসে থামল মিতিনের গাড়ি। নিজের নয়, ভাড়ার। সারাদিনের জন্য আজ গাড়িটা নিয়েছে মিতিন, এতে নাকি ঘোরাঘুরির সুবিধে হয়।

গাড়ি থেকে নামতে নামতে টুপুর বলল, ইস, প্রথমেই আজ ওই লোকটার মুখ দেখতে হবে।

কুশল বলল, আমাকে দেখলে আবার চটে যাবে নিৰ্ঘাত। সেদিন এমন ক্রস করা শুরু করেছিলাম…

মিতিন বলল, আজ কিন্তু তোমরা চুপ থাকবে। যা প্রশ্ন করার আমিই করব। অ্যান্ড ওয়ান মোর থিং, আমার কোনও প্রশ্নেই অবাক হবে না।

কিউরিও শপ খুলেছে সবেমাত্ৰ। দোকান-মালিক আজ একা নন, একজন কর্মচারীও রয়েছে। ডাস্টার বুলিয়ে ঝাড়পোঁছ করছে কাচের শো-কেস। আর মালিক ছোট্ট একটা গণেশের মূর্তির সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে।

ঢুকেই মিতিন গলাখাকারি দিল, এই যে মিস্টার….এই যে মিস্টার? শুনছেন?

ঘুরে মিতিনকে দেখে ঠোঁটে একটা হাসি ফুটব-ফুটব করছিল, কিন্তু পাশে দুই ল্যাংবোটকে দেখে ভদ্রলোকের মুখটা কেমন ভেটকে গেল। কপালে একরাশ ভাঁজ ফুটিয়ে বললেন, ইয়েস?

আমি থার্ড আই থেকে আসছি। ভ্যানিটিব্যাগ খুলে ভিজিটিং কার্ড বের করে বাড়িয়ে দিল মিতিন, আমি একজন লাইসেন্সড প্রাইভেট ডিকেটকটিভ।

কার্ডটায় চোখ বুলিয়ে কাউন্টারের কাচের তলায় রেখে দিলেন ভদ্রলোক। কপালের ভাঁজ সামান্য হাল্কা করে বললেন, আমার কিন্তু নতুন করে কিছু বলার নেই।

কিন্তু আমাদের কৌতূহল যে মেটেনি মিস্টার…

আমি স্বপন দত্ত। আপনি মিস্টার দত্ত বলতে পারেন। অথবা স্বপনবাবু।

স্বপনবাবুই ভাল। মিতিন আলগা হাসল, আমি আপনার বেশি সময় নেব না। জাস্ট দুচারটে প্রশ্ন…

বলুন? চটপট।

মিস্টার ঝিয়েন… মানে যে চিনা ভদ্রলোকটির অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে…

অস্বাভাবিক বলছেন কেন? স্বপনবাবুর গলায় ঠাট্টার সুর, কলকাতার রাস্তায় গাড়িচাপা পড়া তো অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা।

মিস্টার ঝিয়েন গাড়িচাপা পড়ে মারা যাননি, স্বপনবাবু।

যাঃ। কী বলছেন?… তা হলে কী করে মারা গিয়েছেন?

সেটা আপাতত না-জানলেও চলবে। তা ছাড়া বলার হয়তো প্রয়োজনও নেই। মৃত্যুর কারণটা হয়তো আপনার জানাই আছে।

আমি…কী করে জানব?

 সে তো সময়ই বলে দেবে।

স্বপনবাবু বেশ ভ্যাবাচাকা খেয়েছেন। কুশল আর টুপুরও মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। একটা বিস্ময় ঠেলে উঠতে চাইছিল টুপুরের গলায়, কোনওক্রমে সেটাকে গিলে নিল টুপুর।

মিতিন টুল টেনে বসেছে। দোকানটায় চোখ বোলাতে বোলাতে বলল, হ্যাঁ, যে কথা হচ্ছিল… মিস্টার ঝিয়েন আপনার এখান থেকে যে বস্তুটি কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন, আর কেউ কি সেটা কখনও কিনতে এসেছিল? অন্য কোনও কাস্টমার?

আমি তো দোকানে ওটা আগে টাঙাইনি। সুতরাং আর কারও…

ভাল করে ভেবে বলুন। উত্তরটা কিন্তু খুব ভাইটাল।

একটু ভাবার চেষ্টা করে স্বপনবাবু বললেন, মনে পড়ছে না।… মন্টু, ওই ঝঞাটে ওয়ালহ্যাঙ্গিংটা কিনতে আর কেউ এসেছিল নাকি রে?

কর্মচারীটি গোল গোল চোখে তাকিয়ে ছিল। আমতা আমতা করে বলল, একজন বোধহয় এসেছিল। আপনি বেচবেন না বলেছিলেন বলে তাকে হাঁকিয়ে দিয়েছিলাম।

কবে এসেছিল? কখন? এবার স্বপনবাবুর গলায় বিস্ময়, আমাকে বলিসনি তো?

আপনি সেদিন সন্ধেবেলায় তাড়াতাড়ি চলে গেলেন… পরদিন আমার আর মনে ছিল না।

দেখেছেন তো কাণ্ড! আমাকে কেমন অড পজিশানে ফ্যালে! স্বপনবাবু গজগজ করছেন। বিরক্ত গলায় মন্টুকে জিজ্ঞেস করলেন, কবে এসেছিল বল তো? ওই ঝিয়েনবাবু দোকানে ঘুরে যাওয়ার আগে, না পরে?

পরে। মন্টু ঘাড় চুলকোল, হ্যাঁ, পরেই হবে।

এবার মিতিনের প্রশ্ন করার পালা, তিনিও কি চাইনিজ?

না না, বাঙালি।

চেহারা মনে আছে?

 খেয়াল নেই। রোজ এত কাস্টমার আসে…। তবে প্যান্টশার্ট পরা ছিল।

ফরসা? কালো? চোখে চশমা? টাক মাথা?

একদমই মনে নেই ম্যাডাম।

দেখলেও মনে পড়বে না?

 হয়তো..। কী যে বলি..!

অলরাইট। আপনি কাজ করুন। মিতিন আবার স্বপনবাবুতে ফিরল। হেসে বলল, প্রথম প্রশ্নটা তো গুবলেট হয়ে গেল। যাক গে, এবার নেক্সট। …মিস্টার ঝিয়েন যেদিন আপনার দোকান থেকে জিনিসটা কিনলেন, সেদিনটার কথা আপনার স্মরণে আছে তো?

মোটামুটি। উনি অ্যারাউন্ড পৌনে তিনটেয় এসেছিলেন। ওয়ালহ্যাঙ্গিংটা প্যাক করে দিলাম, দুতিন মিতিনটের মধ্যেই উনি দোকান থেকে বেরিয়েও গেলেন।

বাঃ, আপনার মেমারি তো বেশ শার্প।… এবার বলুন তো, মিস্টার ঝিয়েন বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে শুরু করে সন্ধে সাতটা অবধি আপনি কোথায় ছিলেন?

দোকানেই ছিলাম। আর কোথায় যাব!

ভাল করে ভেবে বলুন। আমি কিন্তু আপনার স্টেটমেন্ট ভেরিফাই করব।

এতক্ষণে স্বপনবাবুকে একটু থতমত দেখাল। একটুক্ষণ নাক কুঁচকে থেকে বললেন, ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সেদিন মন্টু আসেনি তো… আমার একটা জরুরি কাজ ছিল, তাই দোকান বন্ধ করে বেরোতে হয়েছিল।

কী কাজ জানতে পারি?

আপনাকে বলব কেন? আমার পারসোনাল কাজ থাকতে পারে না?

অবশ্যই পারে। তবে মিস্টার ঝিয়েনের মৃত্যুটা তো আপনার দোকান থেকে বেরোনোর পর হয়েছে.. আমাকে না বলতে চাইলে ক্ষতি নেই, তবে পুলিশ কিন্তু বের করে নেবে।

স্বপনবাবুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আবার পুলিশ আসবে নাকি? কেন?

বা রে, ডেথটা যদি সিম্পল রানওভার না হয়, পুলিশ সব্বাইকে একটু বাজিয়ে বাজিয়ে দেখবে না?

সক্কাল সক্কাল এ কী শুরু করলেন বলুন তো? স্বপনবাবুকে এবার রীতিমতো বিপর্যস্ত দেখাল। একটুক্ষণ থম মেরে থেকে গোমড়া মুখে বললেন, ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম।

কোন ব্যাঙ্ক?

সেটাও জানাতে হবে? স্টেট ব্যাঙ্ক। থিয়েটার রোড ব্রাঞ্চ

লোকটা ডাহা মিথ্যে কথা বলছে। টুপুরের জিভ নিশপিশ করছিল। ফস করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, কিন্তু সেদিনটা তো ছিল শনিবার। স্যাটারডেতে তিনটের পরে ব্যাঙ্কে তো কাজ হয় না।

মিতিন বলল, দেখেছেন তো, স্কুলের ছেলেমেয়েরাও জানে। এত সিলি মিথ্যে বলার কোনও মানে হয়?

স্বপনবাবু এবার পুরোপুরি কাহিল। মিনমিন করছেন, বিশ্বাস করুন, মিস্টার ঝিয়েনবাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।

আপনি কোথায় গিয়েছিলেন, সম্ভবত সেটা আমি জানি। এবং সে জায়গাটা বোধহয় প্রিন্সেপ ঘাট থেকে খুব দূরেও নয়। কী বলেন?

ভীষণ চমকেছেন স্বপনবাবু। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, আ- আ আপনি আ-আমাকেই খুনি ঠাওরালেন নাকি?

বললাম তো, টাইম উইল টেল। মিতিনের মুখ ভাবলেশহীন। নীরসভাবে বলল, আশা করি, এর পরের প্রশ্নের উত্তরটা আমাকে ঠিকঠাক দেবেন।

আপনি ভুল করছেন ম্যাডাম, আমি কিন্তু খারাপ লোক নই।

মিতিন কথাটাকে আমল দিল না। বলল, আমি ওয়ালহ্যাঙ্গিংটার হিস্ট্রি ডিটেলে জানতে চাই। আপনার কাছে কোত্থেকে এল… কীভাবে এল..

আমি তো আগের দিনই ওদের বলেছি। কুশল আর টুপুরকে দেখালেন স্বপনবাবু, এটা আমার বাড়িতেই ছিল।

হঠাৎ তা হলে দোকানে নিয়ে এলেন কেন? তা-ও মাত্র এক-দু মাস আগে?

সত্যি বলব? বিশ্বাস করবেন তো?

শুনি।

ওই জিনিসটা আগে আমি দেখিইনি। কিছুদিন আগে পুরনো বাক্সপ্যাটরা ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎই চোখে পড়েছিল।

পরিষ্কার হল না। আপনার বাড়িতে ছিল, অথচ আগে দেখেননি…।

তা হলে আর-একটু খুলে বলি। আমরা এখন থাকি ভবানীপুরে। যদুবাবুর বাজারের কাছে। তবে আমাদের আদি বাড়ি বজবজে। ওখানে আমাদের পৈতৃক বাড়িটা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, তাই বছর দশেক আগে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং, আমার এই দোকানের মূলধনের মেজর পোরশন এসেছিল ওই টাকার ভাগ থেকে। ওবাড়ির বড় বড় ফার্নিচারগুলো নিলামঘরে দিয়ে দেওয়া হয়, আর কিছু দরকারি-অদরকারি মাল আমরা জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনরা ভাগাভাগি করে নিই। তখনই বোধহয় ওটা কোনও ট্রাঙ্কে করে এসে গিয়েছিল আমাদের কাছেতে। যে-পুরনো ট্রাঙ্কে ওটা পাওয়া যায়, সেই ট্রাঙ্কটা রাখা ছিল আমাদের ভবানীপুরের বাড়ির চিলেকোঠায়। সম্প্রতি ঘরটা সাফ করাচ্ছিলাম, তখনই…। জিনিসটা দেখে ভারী চোখে লেগে গেল, দোকান ডেকরেট করার জন্য এনে টাঙিয়ে দিলাম।

কিন্তু বিক্রি করতে চাইছিলেন না কেন?

তার অবশ্য একটা কারণ আছে। আমার বাবা… একাশি বছর বয়স… আমার সঙ্গেই থাকেন… ওয়ালহ্যাঙ্গিংটা সেল করতে আমাকে নিষেধ করেছিলেন। ফর সেন্টিমেন্টাল রিজনস।

কীরকম?

 আমাদের এক পূর্বপুরুষ.. কত পুরুষ আগে বাবাও জানেন না, তবে অনেক…. আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদা গোছের কেউ একজন নাকি বিখ্যাত ডাক্তার ছিলেন। তিনি এক চাইনিজকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান। সেই চিনাটিই নাকি আমাদের ওই ডাক্তার পূর্বপুরুষকে ওয়ালহ্যাঙ্গিংটা প্রেজেন্ট করেছিল। আমি অবশ্য এত গল্প জানতাম না, বাবাই বললেন। উনি জিনিসটা দেখামাত্র চিনতে পেরেছিলেন। ইনফ্যাক্ট, ওয়ালহ্যাঙ্গিংটা কার আঁকা বাবা সেই নামটাও বলেছিলেন আমাকে। অ্যান্ড স্ট্রেঞ্জলি, ঝিয়েনবাবুও ওটা দেখে ওই রকমই একটা নাম বলেছিলেন।

কী নাম?

দাঁড়ান। আমি মনে রাখতে পারি না। সোমবার এই ছেলেমেয়েগুলো ঘুরে যাওয়ার পর আবার কোনও বখেড়া হতে পারে ভেবে বাবার কাছ থেকে ফের জেনে নিয়েছি। স্বপনবাবু পকেট থেকে পার্স বের করলেন। হাড়ে হাড়ে একখানা চিরকুট। চোখে চশমা লাগিয়ে পড়লেন, মো-ই-টং।

মিতিন লিখে নিল নামটা। হেসে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ।

স্বপনবাবুর চোখমুখ সামান্য উজ্জ্বল হয়েছে। বললেন, দেখছেন তো ম্যাডাম, কোনও কিছুই গোপন করা আমার উদ্দেশ্য নয়!

এখনও পর্যন্ত যা বললেন, তাতে কিন্তু প্রমাণ হয় না আপনি নির্দোষ। ..যাক গে, একটা ইনফরমেশন কিন্তু এখনও পাইনি। বাবা বারণ করা সত্ত্বেও আপনি জিনিসটা বেচলেন যে বড়?

উনি বারবার এসে চাইছিলেন..

শুধু সেই কারণেই?

এবার আর জবাব নেই। মিতিনকে একবার আড়চোখে দেখে মাথা নামিয়ে নিয়েছেন স্বপন দত্ত। অক্ষুটে বললেন, ভাবলাম ফালতু ফালতু টাকাটা এসে যাচ্ছে… শনিবার টাকাটার খুব দরকারও ছিল..

মিতিন বাঁকা হেসে বলল, লাভ হয়েছিল টাকাটা পেয়ে?

এবারও উত্তর নেই। স্বপনবাবুর মাথা আর উঠছেই না।

 মিতিন মৃদু গলায় বলল, ওকে। আজ তা হলে চলি। প্রয়োজন হলে আবার আসব কিন্তু!

রাস্তায় এসে কুশল বলল, দেখেছিস তো টুপুর, আমি সেদিনই বলেছিলাম, লোকটা সুবিধের নয়!

টুপুর বলল, হুম। তাই তো মনে হচ্ছে। নইলে মিতিনমাসি এতক্ষণ ধরে জেরা করে।

ভাড়াগাড়িটা বেশ খানিকটা দূরে পার্ক করা আছে। সেদিকে এগোতে এগোতে মিতিন বলল, আমি তো ক্রস করলাম খুনের মোটিভ জানতে। সিধে আঙুলে ঘি উঠবে না বলে একটু ভয় দেখাতে হল।

টুপুর বলল, কিন্তু আঙ্কল ঝিয়েন খুনই হয়েছেন তুমি বুঝলে কী করে?

ওরে গাধা, আদৌ কোনও খবর না নিয়ে আমি এগোই নাকি? হেস্টিংস থানা, লালবাজার, দুজায়গাতেই আমার যোগাযোগ করা হয়ে গিয়েছে। আর আমার সংশয়টাই সত্যি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, মৃত্যুর কারণ কার অ্যাক্সিডেন্ট নয়, হেড ইনজুরি। অর্থাৎ মাথায় আঘাত করে মিস্টার ঝিয়েনকে আগে মারা হয়েছিল, তারপর বডিটা ওখানে ফেলে দিয়ে তার উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়।

কী সৰ্বনাশ! লিয়াংরা খবরটা পেয়েছে?

পেয়ে যাবে। কিংবা হয়তো পেয়ে গিয়েছেও।

কুশল উত্তেজিতভাবে বলল, কে করল খুন? ওই স্বপন দত্ত নিশ্চয়ই?

আশঙ্কা কম। লোকটার খুন করার মতো সাহস আছে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া মোটিভটাও তেমন জোরালো নয়। ওয়ালহ্যাঙ্গিংটার মূল্য সম্পর্কে ধারণা থাকলে স্বপন দত্ত থোড়াই ওটাকে বেচত।… লোকটা লোভী… নেশাড়ু… তবে খুন…

কুশল বলল, কিন্তু মাসি, তুমিই তো বললে ও সেদিন প্রিন্সেপ ঘাটের কাছাকাছি ছিল।

মিতিনের ঠোঁটে রহস্যের ঝিলিক, তা ছিল। তবে গঙ্গার ধারে নয়। রেসের মাঠে। দশ হাজার টাকা পেয়ে, দোকান বন্ধ করে, রেস খেলতে চলে গিয়েছিল।

টুপুর বিস্মিত গলায় বলল, এত খবর তুমি জানলে কী করে?

ওহে মিস ওয়াটসন, কত বার বলেছি না, গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে চোখকান খোলা রাখতে হয়। স্বপন দত্তর কাউন্টারের কাচের নীচে রেসের বই পড়ে ছিল দেখেছিস? শৌখিন রেসুড়েরা বই কেনে না। যারা নিয়মিত যায়, তাদের কাছেই ওই বই থাকে। রেসুড়ে লোক শনিবার করকরে দশ হাজার টাকা পেলে দোকানটোকান শিকেয় তুলে আর কোথায়ই বা যেতে পারে! একে-একে দুই করে ওটা মিলিয়ে দিয়েছি। আর তাতে কেমন কাজও হল বল? হুড়মুড় করে পেটের কথা সব বেরিয়ে এল। আমি তো তা-ও অল্পেই ছাড়ান দিলাম, এর পর পুলিশ ওকে যা ভোগাবে! তুলে নিয়ে গারদে না পুরে দেয়।

মিতিনের সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে গিয়ে বসেছে টুপুর আর কুশল।

টুপুর জিজ্ঞেস করল, এবার কোথায়? বাড়ি?

সামনের সিটে বসে মুচকি হাসল মিতিন, ধুৎ, সবে তো কলির সন্ধে। এখন আমরা যাব ঢাকুরিয়ায়।

তোমার বাড়ি?

না। বাসব সমাদ্দারের বাড়ি। আমাদের দাসপাড়ায়।