২. একটি খামারের গল্প

একটি খামারের গল্প

জাফরুল্লা ব্যাপারির খামারে এখন সকাল হচ্ছে। তার উঁচু ডারিঘরের ছাদের ওদিকে যদি আকাশে এখনো কোনো রং থাকে তবে এদিক থেকে তা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে বড়জোর একফালি মরচে ধরা মেঘ দেখা যাচ্ছে।

আসফাক উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলদগুলোর পিঠের উপর দিয়ে দিনের আলোর খোঁজ করছিল। আলো দেখতেই সে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল যেন ঘুম থেকে। তার এ চেষ্টা ব্যর্থ হল কারণ কেউ দেখল না, ছমির পর্যন্ত ধারেকাছে ছিল না। আসলে সে আদৌ ঘুমোয়নি, এবং তার রাত্রির আশ্রয় এই বলদদের ঘরে সে ভোর-ভোর সময়ে এসে ঢুকেছে।

এই বড় চালাঘরটার জাফরুল্লার ছ জোড়া বলদ থাকে। তার একপাশে এক মাচায় ঘুমোয় আসফাক। তাকে উঠতে দেখে বলদগুলোও উঠে দাঁড়াল। রাত্রির জড়তা কাটিয়ে তারা মলমূত্র ত্যাগ করল। বাষ্পে যেন ঘরটা ভরে গেল। আর তার মধ্যে দিয়ে মুখ বার করল আসফাক। বছর ত্রিশেক বয়স হবে তার। রোগা লম্বাটে চেহারা। চোখদুটো এত ভাসাভাসা যে মনে হয় ঠেলে বেরিয়ে আসছে। চিবুকে গোটা দশ-পনেরো চুল তার দাড়ির কাজ করছে।

আসফাক যেন অবাক হয়েই চারিদিকে চাইতে লাগল। ডারিঘরের একটা জানালা খোলা। তার সামনে ধানমাড়াইয়ের ঘাস-চাঁছা মাটি, যার বাঁদিকে ধানের মরাই আর ডানদিকে বলদদের ঘর যে ঘরে আসফাক শোয়। ধানের মরাইয়ের পিছনে খড়ের মঠ আকাশের গায়ে ঠেকেছে। মঠের মাথায় শিমুলগাছের ডাল। তার উপরে একটা পাখি বসে আছে। অত উঁচুতে, পাখিটাকে ছোট দেখাচ্ছে। তাদের দেশে এমন সব মঠের মাঝখানে থাকে বাঁশ। এখানে শিমুলগাছটা বাড়ছে, মঠও উঁচু হচ্ছে। ধানমাড়াইয়ের মাটির যে দিকে ডারিঘর তার বিপরীত দিকে টিনের দেয়ালের সেই ঘর যার একপাশে তামাকের গুদাম, অন্যপাশে জাফরুল্লার প্রকাণ্ড সেই সিন্দুক-খাট। এই খাটেই থাকে জাফরুল্লা। বিস্মিতের মতো দেখতে লাগল আসফাক। অথচ । এমন পরিচিতই বা কী তার–সাত বছর হল, দশ হতে তিন বাদ।

এমন সময়ে কে যেন খুক করে কাশল। আসফাক চমকে উঠে কাছিম যেমন খোলায় গলা ঢুকিয়ে নেয় তেমনি করে সরে গেল দরজা থেকে। জাফরুল্লার টিনের দেয়ালের শোয়ার ঘরের দিকে চাইল। না সেদিকে কোনো জানালা খোলেনি। বরং ছমিরই আসছে।

তখন তার মনে পড়ল এতক্ষণ সারারাত ঘুমিয়ে এইমাত্র ওঠার যে অভিনয় করার চেষ্টা করছিল সে তার কোনো মানে হয় না। কারণ ছমির দেখেছে তাকে ফিরে আসতে। সে যতই চেষ্টা করুক ছমিরের নিশ্চয়ই মনে থাকবে আসফাক সন্ধ্যায় না ফিরে রাত শেষ করে ফিরেছে।

ভোর-ভোর রাতের সেই দৃশ্যটা মনে পড়ল তার।

ডারিঘর পর্যন্ত এসে সে তখন থমকে দাঁড়িয়েছে। এতক্ষণ সে কোন সাহসে এগিয়েছে তা যেন খুঁজেই পেল না। অন্ধকার ছিল বলেই বোধহয় সাহস।

এগোবে, না পিছোবে ভাবছে সে, এমন সময়ে একজন বেরিয়ে এল অন্দরের দিক থেকে। হাতে পাটকাঠির মশাল।

আসফাক এগিয়ে গেল ধীরে ধীরে।

কে?

আসফাক।

আসফাক?

জে।

জে না। আমি ছমির। আসলা?

একটা অবসন্নতায় তার শরীর ঝিমঝিম করে উঠেছিল। টলতে টলতেই যেন সে বলদদের ঘরে গিয়ে ঢুকল।

ছমির ডারিঘরের ভিতরের দিকের বারান্দায় তামাক সাজতে বসল। কী করবে এখন আসফাক? রোজ সকালে যেমন বলদগুলোকে খুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তেমন কিছু করবে!

এতে আর সন্দেহ নেই যে এবারেও ব্যাপারটা বোকামিই হয়ে গিয়েছে। অথচ তখন সেটাকেই একবার ঠিক কিছু বলে মনে হয়েছিল।

আর এ সবের জন্য সে হকিমবাবুই দায়ী। সরকারি কর্মচারী। রাজ বদলেছে। গল্পে শোনা রানীর আমল তো আর ফেরেনি। তাই বলে সরকারি কর্মচারীরা তো আর বদলায় না। বিশেষ করে তার হাকিমের মতো পোশাক। টুপি পর্যন্ত ছিল।

সেই হাকিমই দায়ী কিন্তু, এই স্থির করল আসফাক। জাফরুল্লা ব্যাপারির দ্বারিঘরে সে বসেছিল দপ্তর বিছিয়ে। গ্রামের অনেক লোকই গিয়েছিল তার সঙ্গে দরবার করতে। দুদিন ধরেই চলছে। অন্তত তাই ধারণা হয়েছিল আসফাকের। তাদের অনেকের অনেক অভিযোগ কর্মচারীটি শুনেছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাগজেও টুকে নিচ্ছিল। আর এসবই শুনতে পেয়েছিল আসফাক সেই ঘরের দাওয়ায় বসে তামাকের গুঁড়োয় গুড় মিশিয়ে ছিলিমের উপযুক্ত তামাক বানাতে বানাতে। তারপর অবশেষে জাফর খেতে গেল। এমনকী তার অন্য চাকররাও। তখন এদিক ওদিক চেয়ে আসফাক হাকিমের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার পরনে নেংটি। হাত দুখানা চিটেগুড় আর তামাকের গুঁড়োয় কালো।

হাকিম বলেছিল, কী চাও?

জে। আসফাক ঘরের আসবাব পর্যবেক্ষণ করল যেন।

কী দরকার তাই জিজ্ঞাসা করলাম।

জে।

আসফাক বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না।

হাকিম উঠে দাঁড়াল। তার তখন বিশ্রামের সময়। সেই ঘরেই তার বিছানা পাতা। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এদিকে দশখানা গাঁয়ের মধ্যে জাফর ব্যাপারির মতো ধনী কেউ নেই, লোকে অবশ্য বলে অমন মেহেদি-রাঙানো দাড়িও না, শহরের হাকিমরা এলে জাফর ব্যাপারির এ দ্বারিঘরেই থাকে। টিনের ছাদ কাঠের দেয়াল। যেন ডাকবাংলোর মতোই সাজানো।

হাকিম চেয়ারে শুয়ে সিগারেট ধরাল। কিছুক্ষণ ধোঁয়া ছাড়ল। যেন ঘরে আর কেউই নেই। তারপর পাশ ফিরে যেন আসফাককে দেখতে পেল।

কী, যাওনি? এখানেই চাকরি করো?

জে।

কত টাকা পাও?

তিনটাকা।

বলো কী! খেতে পরতে দেয়?

জে।

তিনটাকা। হাকিম হাসল। বলি মাইনা টাইনা পাচ্ছ তো?

না।

না?

জে।

হাকিম আবার হাসল। কতদিন পাও না?

দশ সাল।

হাকিম হো হো করে হেসে উঠল। এই অদ্ভুত কথা শুনে এবং আসফাককে দেখে তার খুব মজা লেগেছে সন্দেহ নেই। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, কার চাকর? জাফর ব্যাপারির?

আসফাকের মুখে তখন হাসি ফুটে উঠেছে। সে নিজের বুদ্ধিমত্তায় আশ্চর্যও কম হয়নি। সে ভেবে উঠতেই পারল না এমন নালিশ সে কী করে সাজিয়ে গুছিয়ে করতে পারল। কারণ হাকিমের সম্মুখে দাঁড়িয়ে কতটুকু উচ্চারণ করেছিল আর কতটুকু চিন্তা করেছিল সে হিসেব করার চাইতে অনেক উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে তখন। বরং যা উচ্চারণ করেনি সে কথাগুলোকেই স্পষ্ট করে বলেছে এমন অনুভব করছিল সে তখন। নতুবা তিনটাকা মাইনা দশ বছর না পাওয়াটা কথা নয়। বরং শুধু সেটা বললে মিথ্যা নালিশ হয়ে যাবে। মাইনা বন্ধ আছে হয়তো তিন সাল এবং তা আসফাক চায়নি বলেই। নালিশ হল অব্যক্ত মনের কথা, অনেক কথা। প্রথম এসে দশবিঘা জমি পেয়েছিল সে চাষ করতে। কিন্তু সে জমিতে খোরাকির ধান ফলাতে পারত না। সে জমি কি ধান ফলানোর? জাফরুল্লাকে বখরা দেওয়ার পর যা থাকত তাতে ছমাসের খোরাক হত। বাকি ছ মাসের ধান সে ধার নিত আর ধান উঠলে ন মণ দিয়ে ধার শোধ করত। কিন্তু নমণ দিলে ছ মাসের খোরাকও থাকে না। ডাঙা জমি। জমির বিরুদ্ধেও নালিশ করেছে সে মনে মনে। তারপর একদিন জাফরুল্লা তার খাওয়াপরার ভার নিল। কেমন যেন কিসের একটা টানে টানে সেখানে পৌঁছাল আসফাক। আর খাওয়াপরা ছাড়া তিনটাকা মাসমাইনার কথা নিজেই প্রস্তাব করেছিল সে। হাকিমকে কি এসব কথাও সাজিয়ে গুছিয়ে সে বলেনি!

হাকিমের সম্মুখ থেকে চলে আসতে আসতে আসফাক নিজেকে অদ্ভুত রকমে ভারমুক্ত মনে করল। এসব নালিশ শুনলে গ্রামের লোকে ঠাট্টা করতে পারে। অবশ্য গত দশ বছরে কি একবারও সে নালিশ করেছে? হাকিমও হেসেছে বলতে পারো। তা হলেও

কী অদ্ভুত কাণ্ড! দুপুরে আসফাক সেদিন খেতেই পারল না। তারও আগে ঝোরায় স্নান করতে গিয়ে উত্তেজনায় যেন তার দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। স্নান করে ভিজে গায়েই খানিকটা সময় সে ঝোরার পার ধরে দুপুর-রোদ মাথায় ঘুরে বেড়াল। অদ্ভুত একটা শক্ত কাজ করে বসেছে। তার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠেছিল তখন। হাকিমকে কিনা সব বলে দিয়েছে।

কিন্তু হঠাৎ তার গা ছমছম করে উঠেছিল। হাকিম সাহেব কি ব্যাপারিকে সব বলে দেবে? এতক্ষণ বলেও দিয়েছে হয়তো। তা হলে?

প্রায় বিকেল হলে আসফাক ফিরেছিল ব্যাপারির বাড়িতে সেদিন। তখন আগুই ধান মাড়াই করছে ব্যাপারির অন্য চাকররা দ্বারিঘরের সামনের চত্বরে। তারা যেন আসফাককে দেখেও দেখতে পেল না। আসফাক এদিক ওদিক চেয়ে ব্যাপারিকে খুঁজল। তাকেও দেখতে পেল না। একথা সব চাকরই জানে যে আসফাক বিকেলে যদি কিছু কাজ করে তবে তা জাফরুল্লার তামাক সাজা আর দড়ি পাকানো। তখন চাকররাও ছিলিম পেয়ে থাকে তার কাছে চাইলে। কিন্তু সেদিন যেন কেউ তা চাইছে না। চারিদিক থমথম করছে। বাতাসও চলছে না। খড়ের উপরে বলদগুলো চলছে তারই শব্দ কানে আসছে। আর মাথার উপরে মশা ওড়ার শব্দ।

এমন সময়ে মুন্নাফ বেরিয়ে এসেছিল অন্দর থেকে। মুন্নাফকে কে না চেনে এ গেৰ্দে? জাফরুল্লা ব্যাপারির একমাত্র ছেলে। তার চার নম্বর বিবির। দরুন চার বিবির ওই এক সন্তান।

সে এসে খুঁজল এদিক ওদিক চেয়ে। তারপর আসফাককে দেখে তার দিকে এগিয়ে এল। আর তখন দু পা পিছিয়ে সরে পড়ার চেষ্টা করেছিল আসফাক।

এই যে মিঞাসাহেব, শোনো। আব্বাজানের ওষুধ ফুরায়ে গিছে, সলসবাড়ি যাওয়া লাগে।

আসফাক ধীরে ধীরে বলেছিল, সল্লাবাড়ি?

হ্যাঁ, পিরহান পরে আসো।

আসফাক সেই বলদদের ঘরে গিয়ে দেয়ালে গোঁজা জামাটা ঝেড়েঝুড়ে গায়ে দিয়ে এসেছিল। আর মুন্নাফ তাকে খুচরোয় আর নোটে মিলিয়ে আট-দশটা টাকা এনে দিয়েছিল আর একখানা কাগজ। সলসলাবাড়ির দোকানটাও চেনা। কাগজ দেখালেই ওষুধ দেবে।

আসফাক হাঁটতে শুরু করেছিল।

ব্যাপারির বাড়ি থেকে বেরিয়ে খানিকটা পথ খুব তাড়াতাড়ি এসেছিল আসফাক। ওষুধ যা কিনা মানুষের চূড়ান্ত বিপদের সময় লাগে। ব্যাপারির বয়স হয়েছে, তিন কুড়ির কম নয়। আজকাল কঠিন কঠিন অসুখ হয়। কয়েকমাস আগেই একবার শহর থেকে ডাক্তার এসেছিল। যাওয়া-আসার। মোটরভাভা দুশো টাকা নিয়ে গিয়েছিল ডাক্তার। তা এমনটাই মানায় জাফরকে। এখনো আটশো বিঘা জমি তার–তার পাঁচশো বিঘাই একলপ্তে শালমারির বনের সীমা পর্যন্ত।

আসফাক তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করেছিল কিন্তু সলসলাবাড়ি যখন কাছে এসে পড়েছে পথের উপরে হঠাৎ সে থেমে দাঁড়াল। অভ্যাসমতো কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করার দিকে মন চলে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা অস্বস্তির মতো কিছু মনে দেখা দিল। কিছু ভুলে গেলে যেমন হয়। তারপর সেই অস্বস্তিটাই যেন উষ্ণ হয়ে উঠল। আর আসফাকের মনে পড়ল হাকিমঘটিত ব্যাপারটা। আজ যা সে করে ফেলেছে তার তুলনা তার নিজের জীবনে নেই। কিন্তু ঠিক সে কথাই নয়। অন্য আরো কিছু, যা আরো উষ্ণ। এই চিন্তাগুলোই যেন তার গতিকে শ্লথ করে দিল। যেখানে সে তখন পৌঁছেছিল সেখান থেকে দুটো পথে সলসলাবাড়ি যাওয়া যায়। একটা পথ সোজা গিয়ে উঠেছে। হাটখোলায় যেখানে ওষুধের দোকান। অন্যটা সলসলাবাড়ির পশ্চিমে গিয়ে উঠেছে। প্রথমটি আলের পথ, দ্বিতীয়টি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের। আসফাক নিজেকে যুক্তি দিয়েছিল–পথ তো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের, আলের পথ তো গ্রামের লোকের মনগড়া কিছু। ও পথেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। সেবার যে ডাক্তার এসেছিল সেও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পথে।

আসফাকের মনে হল একবার একটু জিরিয়ে নিলে হয়। ওষুধ আনতে বলেছে তাই কি মানুষ জিরোবে না। প্রায় পাঁচ মাইল পথ সে হেঁটে এসেছে। আলোর পথে তিন মাইল হত হয়তো। জিরিয়ে নিতে তখন সে একটা গাছতলায় বসেছিল। সলসলাবাড়ির বন্দরে যখন সে ঢুকল তারপরে তখন সন্ধ্যা পার হয়েছে। এরকম সময়ে তার মনে একটা কথা উঠল : দেরি হয়ে যাচ্ছে না? ওষুধ আনার ব্যাপার তো। আসফাক এই কথাটা শুনেই ওষুধের দোকানের দিকে না গিয়ে অন্য এক দোকানের সামনে বসে পড়েছিল। সেখানে বসেও অনেক দেরি করে ফেলেছিল। আর দেরি করতে পারার আনন্দেই খুঁতখুঁত করে হেসেছিল সে।

আসফাক দেরি করে ফেলেছে। কাজের ভার নিয়ে এমন দেরি করতে পারে সে–এ তার সম্বন্ধে কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু এটা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। ফিরেই তো এসেছে সে। এরকম বোকামি তার নতুনও নয়।

সেই সেবারের কথা। ব্যাপারটা ঘটবে আগেই জানা ছিল। অনেকেই বলেছিল তাকে। সংসারে থাকার মধ্যে ছিল তার বাবা আর মা। মার বয়স অনেক হয়েছিল। চুলগুলো ছিল শণের নুড়ি, আর চোখেও সে ঝাপসা দেখত। কাজেই তার মৃত্যু ঘটার মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন। কিন্তু তার বাবা জোয়ানই ছিল বলতে হবে। চুলও পাকেনি। অথচ মায়ের মৃত্যুর দু-চার সপ্তাহের মধ্যেই তারও মৃত্যু হল। তখনই বুঝতে পারা গিয়েছিল অঘটন কিছু ঘটবেই। বাড়ি বলতে একখানা চৌরী খড়ের ঘর যার বারান্দায় রান্না হত; অন্য আর একখানা ঘর ছিল যার বেড়া ছিল ফাটানো বাঁশের, আর ছাদ ছিল খড়ের চালা। এই ঘরে একটা নড়বড়ে মই, একটা লাঙল থাকত এক কোণে। কিছু দড়িদড়া থাকত। অন্যদিকে থাকত একটি বুড়ো বলদ যার পিঠে একটা পাকাঁপোক্ত রকমের ঘা হয়েছিল। ছবিঘা জমি চষত আসফাকের বাবা। জমির মালিক বুধাই রায়। বাবার মৃত্যুর পরই আসফাক শুনতে পাচ্ছিল এবার নতুন আধিয়ার আসবে। এই ছবিঘা জমিতে সে সোনা ফলার্বে। ও আর আসফাকের কর্ম নয়। কী বলিস আসফাক? আসফাক হেসে বলত–হেঁ। আসফাক নিজেই জানত সে বোকা। লোকের মুখে শুনে শুনে এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহের কারণই দেখতে পেত না সে। কাজেই খড়ের ওই চৌরীখানা যে ছাড়তে হবে এ বিষয়েও সে নিঃসন্দেহ ছিল। কিন্তু এত সব জেনেও কী হল। সেই সকালে নতুন চাষি যখন বাড়ি দখল নিতে এল তখন কার কাছে দখল নেবে তা খুঁজে পেল না। কারণ গোয়ালঘরের চালার নীচে পাট-তামাক রাখার জন্য আসফাকের বাবা যে বাঁশের টোং-মাচা বেঁধেছিল সেখানে লুকিয়ে আসফাক তখন ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। গরমে যত ঘামছে তার চাইতে ভয়েই বেশি। চোখ বন্ধ করে সে সেখানে পড়েছিল একটা দিন একটা রাত্রি। অথচ কী ছিল ভয়ের? নতুন বর্গাদার তো আদালতের পেয়াদা নয়, পুলিশও নয়।  

আসফাক এখন চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখল। এটাই তার রোগ; পরে সে ঠিক বুঝতে পারে, কিন্তু যখন বোঝা দরকার তখন যেন সব গুলিয়ে যায়। সে লোকের মুখেও শুনেছে যেটা আগে হওয়া দরকার সেটা তার বেলায় সময় পার করে দিয়ে–যেমন কথা বলতে শেখা।

এখন ছমিরের মনোভাবটা বোঝা দরকার। ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে তার এই দেরি করার ফলে তা কিছুটা বোঝা যাবে। সে ছমিরের দিকে এগোতে যাচ্ছিল। পিছিয়ে আসতে হল তাকে, কে যেন জাফরুল্লার ঘরের জানালাটা খুলছে। জানালাটা খুলল কিন্তু কিছুই ঘটল না।

এমন বিস্ময় কেউ কল্পনাও করতে পারবে না, এই কিছু না ঘটা। আসফাক এবার সত্যি বিস্মিত হল। এতক্ষণেও এটা তার নজরে পড়েনি! এর মধ্যে জাফরুল্লার দুছিলিম তামাক পুড়ে যায়। আসফাককেই দিতে হয় ঠিক করে। সে না থাকলে ছমির দিতে পারত। কিন্তু দেখো ছিলিম ধরিয়ে নিজেই টানছে ছমির।

তাহলে? তা হলে কি ব্যারামের মুখে ওষুধ না পেয়ে জাফরুল্লা–(বাক্যটা চিন্তাতেও শেষ করতে পারল না সে)। স্তম্ভিত আসফাক চিবুকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল তার দেরি করার এই ফল দেখে।

ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে ছমিরের দিকে।

মৃদু স্বরে সে বলল, তা, ছমির, ব্যাপারি?

ব্যাপারি শহরে, মুন্নাফও।

ছমির ছিলিমে সুখটান দিয়ে উঠে দাঁড়াল। চলেও গেল।

আসফাক বসে পড়ল। অবসন্নতায় শরীর যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। রাত্রিতে ঘুম হয়নি। কাল দুপুর থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। আর ভয়–যা এইমাত্র চূড়ান্ত একটা ধাক্কা দিয়েছে তাকে।

কিন্তু এটার একটা ভালো দিকও আছে। খানিকটা সময় পাওয়া গেল। বসে থাকতে থাকতে বুদ্ধি এল আসফাকের মাথায়। বুদ্ধিটাকে আর একটু পাকা করে নেয়ার জন্য নতুন করে ছিলিম ধরিয়ে নিল সে। অবশেষে স্থির করল–ছমির বা অন্য কোনো চাকর হয়তো এখনো ব্যাপারটা সবটুকু বোঝেনি। সময়মতো ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে এটা কৈফিয়ত হিসেবে দাঁড় করানো যায় কিনা দেখতে হবে। দেরি হয়নি ফিরতে, ঘুমই দায়ী।

রোজকার মতো কাজ শুরু করল সে। সেটাই কৌশল হিসাবে ভালো হবে। বলদগুলোকে ছেড়ে দিল। অন্যান্য দিনের মতো হেইহাই করে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলল। না তাড়ালে খড়ের মঠে মুখ দেবে।

.

খামার থেকে কিছু দূরে এক চিলতে বন আছে। এক চিলতে বনই বটে, ত্রিশ-চল্লিশটা শালগাছ। এই বনের পাশ দিয়ে নদী। নদীর ওপারে কাশের ঝোপ একেবারে জলের ধার ঘেঁষে। নদীতে একহাঁটু জল। এপার থেকে ঢিল ছুঁড়লে ওপারে গিয়ে পড়ে। কিন্তু স্রোত আছে। জলটাও ঘোলা। এই নদীর জল সব জায়গাতে একরকম নয়। সলসলাবাড়ির পশ্চিমে এর জল স্বচ্ছ। পাথরের কুচি মিশানো বালির খাত–অনেকটা চওড়া কিন্তু শুকনো। তার উপর দিয়ে অনেকগুলো ধারায় তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যেখানে দাঁড়িয়ে আছে আসফাক সেখান থেকে সিকি মাইল গেলে ব্যাপারির দহজাফরুল্লার নাম থেকেই নাম। সেখানে জলটা বেশ গভীর। জলের রংও প্রায় নীল। আর তার পাশেই জাফরুল্লার খামারবাড়ি। নদী সম্বন্ধে এই দার্শনিক আলোচনা করে আসফাক আবার খামারের দিকে ফিরে গেল।

তার তখন মনে হল–যাই হোক, ছমির কী ভাবছে তা এখনো বোঝা যায়নি। এবং এটা মনে হতেই তার মুখটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। ঠোকটা পার হতেই সে দেখতে পেল ঝোরার ধার ঘেঁষে একটা জমিতে চাষ দিচ্ছে। কয়েকজন কৃষাণ। জলবৃষ্টি নেই অথচ জমিটা যেন জলে টইটম্বুর। আসফাক বুঝতে পারল হেঁউতির বীজ দেয়া হবে। হ্যাঁ, ছমিরও আছে ওদের মধ্যে। কিন্তু এত লোকের মধ্যে কি কথাটা বলা যাবে? বরং অন্য সময়ে। বলদগুলোর ঘরটা এখনো সাফ করা হয়নি। আসফাক ফিরে গিয়ে ঝুড়ি করে গোবর ফেলতে শুরু করল। যেখানে সেখানে ফেললে চলবে না। হয় খামারের পিছনে উঁইতে জমা করতে হবে, কিংবা তামাকের খেতে। অন্যদিনের চাইতে বেশি মন দিয়ে সাফ করলেও ঘরটা সাফ করতে খুব সময় লাগল না। আর তারপরেই আবার তার ছমিরের কথা মনে হল। আশ্চর্য, ছমির নিজে থেকে কিছুই বলছে না।

ডারিঘরের বারান্দা থেকে ছিলিম নিল আসফাক, বেশ বড় একদল তামাক। খড়ের নুড়ো পাকানো ছিল। তাতে আগুন ধরিয়ে নিয়ে কৃষাণরা যেখানে চাষ দিচ্ছে সেদিকে গেল সে।

সেখানে পৌঁছে আলের উপরে বসে ছিলিম ভরল আসফাক। নুড়ো ভেঙে আগুন ধরাল তামাকে। তখন একজন করে কৃষাণ আসতে লাগল হাল ছেড়ে রেখে। তিনটে হাল চলছে। ছমির ছাড়া আরো দুজন। নসির আর সাত্তার। সবশেষে ছমির এল। ছিলিম নতুন করে ভরল আসফাক। তার হাতে ছিলিম তুলে দিয়ে সে নিঃশব্দে ছমিরের দিকে চেয়ে রইল। ছমিরও নিঃশব্দে তামাক টানতে লাগল।

অবশেষে আসফাক বলল, কেন, জমির হেঁউতি?

তা না তো কী?

আর কেউ চাষ দেয় না কিন্তুক। জল ঝরি নাই।

ছমির ছিলিমটা ফিরিয়ে দিল আসফাককে।

কেন, ছমির–?

কী?

 না। তাই কই।

ছমির আল থেকে নেমে গিয়ে আবার লাঙল ধরল। চাষিদের পা কাদায় ডুবে যাচ্ছে। বলদগুলোরও সেই অবস্থা। নদী থেকে জল তুলে এই কাদা করা হয়েছে।

কিন্তু ছমির এবারও কথা বলল না। তা হলে তার ফিরতে কত দেরি হয়েছে তা কি জানে না ছমির?

জানে, নিশ্চয়ই জানে। দম মেরে আছে। ব্যাপারি ফিরলে লাগাবে। সাতখানা করে।

আসফাকের হাতে তামাকটা বৃথা পুড়তে লাগল। লাগাবেই বা কী ছমির? ব্যাপারি শহরে যাওয়ার আগে কি জেনে যায়নি নিজেই।

হঠাৎ কথাটা মনে এল। সে কি ইতিমধ্যে এদের কাছে অচ্ছুৎ হয়ে গিয়েছে? সে একটা গল্প শুনেছে ইতিপূর্বে দাগি আসামীদের নাকি এরকম হয়। তার নিজের গ্রামের লোকরাও কথা বলে না। বললেও তা না-বলার শামিল। অথচ দেখো ওরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে পর পর একই রেখায় হাল চালাতে চালাতে। সাত্তার হাসলও যেন একবার কিছু বলে। আসফাক কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করল।

কিন্তু কি আশ্চর্য দেখো, সে যে বসে আছে এখানে তা যেন ওরা দেখছে না। অনেকক্ষণ ধরে আসফাক ওদের আলাপের পরিধিতে ঘুরে ঘুরে বেড়াল যেন। সে যেন দলে ঢুকে পড়তে চায়, আর ওরা তাকে দলে নেবে না স্থির করেছে।

শেষে আসফাক বলল, বুঝলা না?

কিন্তু ওরা যেন শুনতেই পেল না।

দ্বিতীয়বারও সে প্রায় চিৎকার করেই বলল, বুঝলা না?

এবার সাত্তার বলল, কও?

হ্যাঁ। বুঝলা না, আসফাক বলল, কাল ভুলুয়া না কী বলে তাই লাগছিল।

সাত্তার হাল ধরে ততক্ষণে কিছুটা দূরে চলে গিয়েছে। সেখান থেকেই বলল, তা লাগে অনেক সময়।

আসফাক বলল, সন্ধে থেকে দুপুররাত–শেষে দেখি শালমারির বনে চলে গেছি।

এবার নসির দাঁড়িয়ে পড়ল। ভুলুয়া অপদেবতা, যে নাকি মানুষকে পথ ভুলিয়ে মারে। নসিরের বয়স হয়েছে। শুনে সে অবাকও হল। নসির বলল, শুনছ না, সাত্তার! আসফাক কয় ভুলুয়া লাগছিল পাছে। কোথায় গিছলা, আসফাক?

সল্লাবাড়ি।

সলসলাবাড়ি? নসির কথাটা যেন ভালো করে জেনে নিল।

সলসলাবাড়ি? সাত্তার বলল, ও সেই, ব্যাপারির ওষুধ আনতে!

আসফাকের বুকের মধ্যে ধকধক করে উঠল–জানে, এরা সবই জানে তা হলে!

সাত্তার বলল, তা আসফাক, ভুলুয়া লাগলে বসে পড়া লাগে। হাঁটা লাগে না।

নসির বলল, বুঝলা না, সাত্তার, আমার বড়চাচার একবার লাগছিল ভুলুয়া। তা সে অন্যখানে।

নসির আর কী বলল তা আসফাক শুনতে পেল না, কারণ প্রথমে সাত্তার, তার পিছনে নসির এবং সবশেষে ছমির হালের পিছন পিছন আবার দূরে চলে গেল গল্প করতে করতে। ভুলুয়া লাগার গল্পই।

দূর থেকেই সে দেখতে পেল ওরা যেন হাসছেও। বিমর্ষ মনে সে ভাবল–ওরা নিশ্চয়ই গল্পটাকে বিশ্বাস করেনি। মিথ্যাটা ওরা ধরে ফেলেছে। তাছাড়া সকলেই জানে ভুলুয়া পিছনে লাগে বোকাদেরই।

হঠাৎ আসফাক উঠে দাঁড়াল। কী সর্বনাশই সে করে ফেলেছে। সাত্তার আর নসির হয়তো জানত না তার দেরি করে ফেরার কথা। তারাও এখন . জেনে ফেলল। একা থাকাই ভালো ছিল। এই আর এক বোকামি হল তার।

কিন্তু কী করবে এখন সে? কোথায় যাবে? যা সত্যি তা সকলের সম্বন্ধেই খাটবে। একটা অন্যায় দিয়ে আর একটা ঢাকতে গেলে, তারপর সেটা ঢাকতে আর একটা–এমন করে অন্যায়ের জাল তৈরি হল, আর তাতে জড়িয়ে মুখ থুবড়ে পড়লে। অন্যদিন কত কাজ থাকে হাতে। আজ তাও নেই। কিছুই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

নিজের চারিদিকে তাকিয়ে দেখল আসফাক, সে তামাকের খেতের কাছে এসে পড়েছে। যতদূর চোখ যায় একখানা বাদামি কাগজ যেন বিছানো আর তার উপরে সমান দূরে দূরে সবুজের ছোপ। কিন্তু এখানে কেন এল সে? এখানে কী কাজ আছে? কথাটা চিন্তায় ফুটে ওঠার আগেই আবেগটা দেখা দিল। এই খেতেই, এই তামাকের খেতে কাজ করতে গিয়ে জাফরুল্লার কাছে থাপ্পড় খেয়েছিল আসফাক একদিন। কানের মধ্যে ঝা ঝা করে উঠল আসফাকের। সে মাথা কাত করে কানটাকে কাঁধের উপরে চেপে ধরল যেন শব্দটাকে থামাতে। কোনো দিকেই এখন তার যাওয়ার নেই। এখন শুধু অপেক্ষা করে থাকতে হবে। এখানে লোক নেই। এখানেই বসে ভেবে নেয়া যেতে পারে।

আলের উপরে বসল আসফাক।.চেষ্টা করে সান্ত্বনার মতো একটা চিন্তা নিজের মনে ফুটিয়ে তুলল সে। কানের মধ্যে আঁ আঁ করছিল–তা সে বোধহয় না খেয়ে থাকার জন্যে। কাল দুপুর থেকেই খাওয়া হয়নি তার। তারপর তামাকের খেতের খুঁটিনাটি লক্ষ করতে লাগল। তা এটা দেখার মতো কিছু বটে। তাকিয়ে দেখো, যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখো–একটা ঢিল দেখতে পাবে না, কিংবা একটা ঘাস। যে জমিতে গোবরসার দেয়ার জন্যই দুকুড়ি গোরুবাছুর আছে জাফরের। গর্ব করার মতো কিছু বটে। আসফাকের কৃষকমনে অকৃত্রিম প্রশংসার ভাবটাই দেখা দিল। সে নিজে বোধহয় এ জমির সব কাজ শিখতে পারেনি। এ জমির কাজ প্রকৃতপক্ষে কে-ই বা জানে? আর সেই কিনা গিয়েছিল তামাকের পাতা ঝুরতে। জল দেয়ার জন্য দহের মধ্যে যে টিউবকল, বসে তা পাম্প করো–আচ্ছা। জমির ঘাস তোলো খুঁটে খুঁটে–তাও খুব। কিন্তু পাতা ঝোরা? জাফর নিজে ছাতা মাথায় অষ্টপ্রহর, দাঁড়িয়ে থেকে মুনিষ দিয়ে পাতা ঝোরায়। আসফাক তাদের দেখাদেখি দা হাতে করে একটা গাছে কোপ দিতেই ছুটে এসে থাপ্পড় কষিয়ে দিয়েছিল জাফর।

স্বীকার করতেই হবে বুদ্ধি আছে জাফরের। সেই হেঁউতি বিছনের খেতটা ভাবো। আর কেউ কি ভাবতে পারে ডোঙা দিয়ে জল ঘেঁচে এই না-বৃষ্টির দিনে হেঁউতির বিছন বোনা যায়? আর এই তামাকের খেত? বুড়ো বুড়ো লোকেরাও তাকে জিজ্ঞাসা না করে এক পা এগোয় না এই তামাকের খেতে।

তা বুদ্ধি আছে বটে জাফরের। আটশো বিঘা জমি এখনো তার। নতুন। আইনে দুশো বিঘা খসেই নাকি এই। তখন ব্যাপারির বাড়িতে খুব গোলমাল লেগেছিল বটে। তারপর জাফর তা কাটিয়ে উঠল। চার বিবি তার, আর এক ছেলে। সকলের নামেই জমি লিখে দিল সে। শেষে বাড়ির পাঁচজন চাকরের নামে। আসফাকের নামেও জমি লেখা হয়েছিল তখন। তারপর জাফর সকলকেই একশো টাকা করে নগদ দিয়ে পাঁচহাজার টাকার খত লিখিয়ে নিয়েছে জমিগুলোকে খাই-খালাসি বন্দোবস্ত দেখিয়ে। বুদ্ধি আছে বটে। সেই জমিতে ধান হয়, আর তামাক।

আসফাক যেখানে বসেছিল সেখান থেকেই সে ছমিরদের আবার দেখতে পেল। তাদের একজন ছিলিম ধরাতে বসল। অন্য দুজন গেল জাফরুল্লার বাড়ির দিকে। আজই বোধহয় ওরা ধান ছিটোবে।

হ্যাঁ, ধান। শুধু এ শব্দদুটোই তার মনে এল পুর্বাপর বিচ্ছিন্ন হয়ে।

দু-তিনটে আল পার হলেই সেই আল যেখানে ওদের তিনজনের একজন ছিলিম ধরাতে বসেছে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আসফাকের মনে হল–ও যদি ছমির না হয়ে সাত্তার কিংবা নসির হয় তবে কিছু খবর নেয়া যায় ওর কাছে। একটা প্রশ্ন হঠাৎ উঠল তার মনে–জানা দরকার জাফরুল্লা কখন ফিরবে। এটা ছমিরকেও জিজ্ঞাসা করা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। কিন্তু যদি ছমির হয়?

সে যেখানে বসেছিল তার কিছুদূরে একটুকরো জমি। দূর থেকে বাতাসে দোলা গাছগুলো দেখলে মনে হয় ধান। কিন্তু আউশ নয়। ছন বলে। ঘর ছাওয়ার ছন। কচি অবস্থায় বলদ খায়। কিন্তু বেশি খেলে সহ্য হয় না।

হঠাৎ ফোঁস করে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল সে। তারপর সে কড়ে গুনল সালগুলো। চার সাল হল। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে হাসল খুঁতখুঁত করে। কেউ পারেনি ধান ফলাতে। ছনই হয়। তিন বছর প্রাণপাত করেছিল আসফাক। দশ বিঘায় আট-ন মণ ফললে খুব। চার সাল হল সে ওই জমি ছেড়েছে।

জমিটার দিকে অবাক হয়ে সে চেয়ে রইল। ওটার প্রায় চারিদিকেই জাফরুল্লার চৌরস সরস জমি। তার মধ্যে ওটা যে ওরকম তা কেউ ভাবতেই পারবে না। এত কচকচে বালিই বা কী করে এল এখানে তাও বোঝা যায়। না। কিন্তু তার চিন্তা ঘুরে গেল। জাফরুল্লা কখন ফিরবে এই ভাবতে ভাবতে এদিকে মন চলে এসেছিল।

সে স্থির করল আর দেরি করা উচিত হবে না। হয়তো ও ছমির নয়। আর–আর সেই ভুলুয়া লাগার গল্পটাকেও হেসে উড়িয়ে দিতে হবে। দেরি করে ফিরেছে সে, কিন্তু খুব দেরি হয়েছে একথা স্বীকারই বা করবে কেন।

আল কয়েকটি পার হয়ে ধানবীজের জমিটার কাছে গেল আসফাক। ছমির নয়, সাত্তার।

কথা বলার আগেই আসফাক হাসল খুঁতখুঁত করে।

সাত্তার বলল, ছিলিম?

আসফাক হাত বাড়াল। ছিলিমটা দিল সাত্তার।

সাত্তার বলল, পিঁপড়ে চলতেছে। বৃষ্টি হতে পারে কিন্তুক।

আসফাক বেশ খানিকটা ধোঁয়া গিলে কাশল। ছিলিমটা সাত্তারের হাতে ফিরিয়ে দিল।

বলল, পারে বোধহয়।

হলে হেঁউতির চাষ আগুই হবে মনে কয়। বলল সাত্তার।

আসফাক বলল, কী যেন বলব মনে হল।

কী বলবা, সেই ভুলুয়া সাত্তার হাসল।

আরে না–কী কও। আসফাক গড়গড় করে হাসল।

তারপর সে বলল, ব্যাপারি গেল কখন দেখছ না?

কেন সেই হাকিমের সঙ্গে। সন্ধের পর ভকভকি আসছিল তার। তারই সঙ্গে ব্যাপারি গেল। আর মুন্নাফও। হাকিমই পেড়াপিড়ি করল।

অ।

ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগল আসফাকের। তার পরে সে আবার হাসল। ভারমুক্ত বোধ হল যেন হঠাৎ নিজেকে। সে একটু জোরে জোরেই হেসে উঠল দ্বিতীয়বার।

একটু পরে সে বলল, বুঝলা না, আচ্ছা, ও কীসের হাকিম কও তো।

কেন, শোন নাই? ডিস্টি বোডের। সড়ক নাকি হবে একটা তারই মাপজোখ।

তা– একটু ভাবল আসফাক, আচ্ছা—

 কী?

লোকে কিন্তু দুঃখকষ্টের কথাও বলতেছে।

জমির উপর দিয়ে সড়ক যাবে। সে সম্বন্ধে দু-এক কথা হইছে।

ছিলিমটা সাত্তারের হাতে দিয়ে উঠে দাঁড়াল আসফাক। নিঃশব্দে সে হাঁটতে শুরু করল। এ সব ক্ষেত্রে কাজ করতে করতে এসে ধরানো ছিলিমে টান দিয়ে আবার কাজের দিকেই ফিরে যাওয়াই প্রথা। বিদায় দেয়া-নেয়ার জন্য বাক্যব্যয় করতে হয় না। অন্তত এখন প্রথার এই নিঃশব্দ দিকটা আসফাককে সুবিধা দিল। আশ্চর্য লাগছে। কাল বিকেল থেকে কী হয়েছে তার, একটার পর একটা জালেই যেন জড়িয়ে পড়ছে। কে জানত যে হাকিমটাও এমন? সে ভেবেছিল ম্যাজিস্টর!

আলের উপর দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করল সে। খুব একটা দরকারি কাজই যেন মনে পড়েছে। সেই ভঙ্গিতে চলতে চলতেই সে যেখানে বলগুলোকে বেঁধে রেখে এসেছিল সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল। এটার পিঠ চাপড়াল, ওটাকে ধাক্কা দিয়ে রোদ থেকে ছায়ার দিকে সরিয়ে দিল। যেন সব কয়েকটি ঠিক খাচ্ছে কিনা দেখল। তারপর তাদের কাছাকাছিই একটা গাছের ছায়ায় বসে পড়ল। এখন ওরা সব খেতে গেল।

জাল ছাড়া আর কী? বিস্ময়ের জাল। এটাই তার সব বোকামির শেষ বোকামি–ডিস্টি বোডের হাকিমকে ম্যাজিস্টর ভাবা। বালি চিবিয়েছে সে। আর তাও কিনা এমন হাকিম যে হয়তো সে সব কথা জাফরুল্লাকে বলেও দিয়েছে।

সব কথার সার কথা সে এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে। উৎকণ্ঠায় ঢোক গিলল। আসফাক। কিন্তু এমন ঠকাই বোধহয় তার নসিব। চিরকালই ঠকতেও হবে।

ধীরে ধীরে একটা উদাসীনতায় তার মন ভরে গেল। এমন ঠকার পরে বোধহয় কিছুতেই কিছু এসে-যায় না। গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসল সে। তার অনুভূতি হল সে যেন কথা বলছে জাফরুল্লার সঙ্গে। হ্যাঁ, শোধবোধ, ব্যাপারি, তোমার আমার শোধবোধ; না কথাটা বোধহয় তামাম শুধ। কী জানি। মোট কথা শেষ পর্যন্ত ওষুধ আনলেও আমিও খুব দেরি করেছি। অসম্ভব দেরি। কবুল। তা তুমিও মরো নাই।

হাকিমের কাছে থেকে সরে আসতে আসতে তার মন অস্পষ্ট ভাবে যেন একটা পুরনো পরিচয়ের সম্বন্ধই অনুভব করল জাফরের সঙ্গে। তা সাত সাল হল।

ধরতে গেলে ধীরে ধীরে জাফর তাকে অন্য চাকরদের থেকে আলাদা করে নিয়েছে। সেই থাপ্পড়ের ঘটনাটা ঘটলেও। তামাকের খেতে তাকে যেতে হয় না। ধানের খেতে বেচাল বর্ষায় ঘাস বেশি হলে দু-একদিন নিড়ানি নিয়ে বসতে হয়। কিন্তু ভারি পরিশ্রমের কাজ ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছে। বলদদের দেখাশোনা, দড়ি পাকানো, রাখালদের খবরদারি করা, তামাক বানানো, বাজারসওদা করা–এসবই তার কাজের ফিরিস্তি। আর মুন্নাফ-তাও দেখো–জাফরুল্লা ব্যাপারির চার বিবির ঘরের এক ছেলে তার উত্তরাধিকারী, দশ বছরের সে ফুটফুটে ছেলেটার ডাক শোনো। কী, না, মিঞাসাহেব। কখনো সে আসফাক বলে না।

আর এ ছাড়াও প্রমাণ আছে। প্রায় তিন সাল পুরনো হল ব্যাপারটা।

জমি নিয়ে কাজিয়া। যদিও জাফরুল্লার বাড়িটা তখনই সবটুকু সাদা, তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। সঙ্গে সঙ্গে তার আট-দশজন চাকর-আধিয়ারকেও।

সে যখন যাচ্ছে আসফাককে ডেকে বলেছিল–আসফাক, বাপজান, ইদিক শোনো। সব দেখে শুনে রাখবা কেমন? আসফাক বড় ভালো ছাওয়াল। সেই দশবিঘা জমির কথা। ঘুষ?

এই শুনে, তাকে নিয়ে যেতে দেখে, আর জাফরের চার বিবি আর মুন্নাফের কান্নার সামনে আসফাকের চোখেও জল এসে গিয়েছিল।

সেবার প্রায় পনেরোদিন জাফর অনুপস্থিত ছিল। সে সময়ে আসফাক কী না করেছে। ধান তামাকের খেত-খন্দ দেখাশোনা তো বটেই জাফরের বিবিদের তদবির-তদারক পর্যন্ত। আর বলদ কটি, যা তার আসল জিম্মি, তাদের চেহারা তেমন কোনোদিনই আর হবে না, যা সেই পনেরোদিন আসফাকের কাছে আদরযত্ন পেয়ে।

অবশ্য জাফর যখন ফিরে এসেছিল তখন তেমন খোঁজ নেয়নি তার। জাফরকে কোনোদিক দিয়ে ক্লিষ্ট দেখায়নি। বরং তারপর থেকে তার সাদা দাড়ি মেহেদি দিয়ে রাঙাতে শুরু করেছে।

জাফর কি তবে ঠাট্টা করেছিল তাকে? অমন অবস্থায় কেউ ঠাট্টা করে না।

না–তখন সে-ই বরং পালিয়ে বেড়িয়েছিল। আর তার কারণ ছিল। সে কথাটাই আবার মনে আসতে চাচ্ছে। গৃহপালিত পশু যেমন লাঠি দেখে শরীর গুটিয়ে নেয় তেমন যেন কথাগুলো তার মনের মধ্যে লুকিয়ে পড়তে চাইল। উদাসীনতাটা ফেটে ফেটে যাবে মনে হল। তামাম শুধ বলে যে ঔদাস্যটা এসেছিল মনে।

বলদগুলোকে গাছের ছায়া দেখে বেঁধে দিয়ে আসফাক ফিরে চলল জাফরুল্লার বাড়ির দিকে। যেতে যেতে ভাবল–কী করা যায় এখন? তার মনে হল দড়ি পাকালে হয়। কাল সারাদিনই তা হয়নি। কিন্তু এখন তো ঠিক কাজের সময় নয়। দুপুর হয়েছে। কাল থেকে খাওয়া নেই। ক্ষুধা বোধ হচ্ছে। রাত্রিতে ঘুম হয়নি।

সেই ফেরাই তো ফিরে এসেছে সে। এখন সব চুকে যাবে। এইরকম একটা মনোভাব হল তার।

দুপুরটা কাটল। খানিকটা ঝিমিয়ে, খানিকটা উদাসীনতায়। ছমির এসেছিল, চলেও গিয়েছে। সে চলে গেলে আসফাকের মনে পড়ল ছমির হাটে যাচ্ছে। সপ্তাহের হাট।

আসফাক ভারিঘরের বারান্দায় বসেই দড়ি পাকায়। সেখানেই উঁচু বাঁশের আড়াটায় পাট আছে, আর তার কাছে লাটাই। লাটাই ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ দড়ি পাকাল আসফাক। তারপর তার বলদদের কথা মনে পড়ল।

সে যখন বলদদের খোঁজে যাচ্ছে, ছমিরের সঙ্গে আবার দেখা হল। ছমির তাহলে হাটে যায়নি। টাকাপয়সা ধামা আনতে অন্দরে গিয়েছিল।

মুখোমুখি দেখা হতে আসফাক বলল, হাটে যাও একা?

একা না। রাখালও যাবে।

ও, আচ্ছা। এই বলে আসফাক পা বাড়াল।

ছমির বলল, এক কথা–

কী?

আজ তো তুমি আছ। তা আমি আজ বাড়ি যাব। কী কও?

আর কে থাকবে?

কেউ না।

কেন ব্যাপারি?

আজ রাত্তিরে আসবে না।

ছমির চাকর বটে কিন্তু এই গ্রামেই তার বাড়ি আছে। কাল রাত্রিতে সে বাড়ি যায়নি। জাফরুল্লার বাড়িতে পাহারা দিয়েছে। আজ আসফাককে সে কাজের ভার দিয়ে সে বাড়ি যেতে চায়।

আসফাক বলল, আচ্ছা যায়ো।

এই বলে সে হাঁটতে শুরু করল।

সে হাকিমও কিনা ম্যাজিস্টর না। এই কথাটাই আবার মনে হল তার।

খানিকটা দূর গিয়ে সে ভাবল : ছমির আজ থাকবে না। তা হলে সেই যে আসফাক জাফরুল্লার ঘরবাড়ি পনেরোদিন পাহারা দিয়েছিল আজও তেমন হল।

কিন্তু তফাতও দেখো। সেবার সে বুক ফুলিয়ে বেড়াত। আর এবার?

ঘাড় কাত করে থুথু ফেলল আসফাক।

ঝোরার পাশ দিয়েই তার পথ। পথের ধারে একজায়গায় দু-তিনটে পিটুলিগাছ। আসফাকের মনে পড়ল জাফর একদিন বলেছিল–বড় গাছটাকে খড়ির জন্য কাটলে হয়। আসফাক স্থির করল এবারও যদি জাফরের দু-চারদিন দেরি হয় ফিরতে গাছটাকে সে কাটবে।

কিন্তু তফাত দেখো। সেবার যা ছিল এবার তা নয়। আর এসব কিছুর জন্যই দায়ী সেই হাকিম।

পিটুলিগাছটার নীচে একটা পুরনো গোবরের স্তূপ। অনেকটা উঁচু। উপরটা শুকিয়ে কালো হয়ে গিয়েছে। ঢিপিটার পাশে একটা বড় মোরগ চরছে। প্রকাণ্ড খয়েরি রঙের মোরগ। মাথার ঝুঁটি টকটকে লাল। আধা-ওড়া আধা-ছোটার ভঙ্গিতে সে ঢিপিটার উপরে লাফ দিয়ে উঠল। তারপর পাঁয়তারা করার ভঙ্গিতে একবার ডান একবার বাঁ পা দিয়ে গোবরের শুকনো আবরণটা সরাতে লাগল। আর তখন আসফাক তার পায়ের বড় বড় নখগুলোও দেখতে পেল। পুরনো, সার হয়ে যাওয়া কিন্তু উপরের স্তরের চাইতে নরম গোবর বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু ঠোঁট না নামিয়ে নিজের এই আবিষ্কারের গর্বে গলা ফুলিয়ে মোগরটা কক কক কক করে ডাকল। ঝপ করে একটা শব্দ হল। আসফাক দেখল মোরগটার কাছে একটা মোটাসোটা তার মতোই বড় মুরগি উড়ে এসে পড়ল। কিন্তু মোরগটা এক ধাক্কা দিয়ে সেটাকে সরিয়ে দিল। সেটা ঢিপির একটু নীচে পা দিয়ে গোবরের স্তরটাকে খাবলাতে লাগল। মোরগটাও আবার বড় বড় নখওয়ালা পা দিয়ে গোবরের আবরণটাকে ভাঙতে শুরু করল। ঝুপ করে আর একটা শব্দ হল। আর একটা মুরগি এসে পড়ল। আর তা দেখে মোরগটা অত্যন্ত বিরক্ত হয়েই যেন তার গোবরশৃঙ্গ থেকে নেমে পড়ল। যেন তার পুরুষোচিত পরিশ্রমের পথে এরা বাধাস্বরূপ। কিন্তু ঠিক তা নয়। গোবরের আড়াল থেকে আর একটি মুরগি আসছিল সেটিকেই পছন্দ হল তার। তার দিকে তেড়ে গেল।

আসফাক ঢিপিটার পাশ দিয়ে গেল। মোরগটা তাকে গ্রাহ্য করল না।

হাকিম তার মনের উপরে যে শক্ত স্তরটা জমেছিল সেটাকে ওই মোরগটার মতো খাবলে দিয়েছে। নীচের নরম কিছু বেরিয়ে পড়েছে।

কিন্তু কয়েক পা যেতে না যেতেই থমকে দাঁড়াল আসফাক। সেই পুরনো কথাটাই যেন আবার মনে পড়ল। সেবার যখন জাফর ফিরে এসেছিল আসফাক বেশ কিছুদিন পালিয়ে বেড়াত।

সারাদিন তার মনে যে উদাসীনতার ভাবটা ছিল সেটার চাপেই যেন সে ক্লান্ত হয়ে উঠল। যে বোঝা প্রথমে তোলার সময়ে হালকা থাকে অনেকক্ষণ বয়ে নিয়ে গেলে সেটাই সহ্যের বাইরে চলে যায়। হাঁপাতে লাগল আসফাক। বলদ যেমন স্তব্ধদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে নিঃশব্দে হাঁপায়–তেমন করেই যেন হাঁপাতে লাগল সে।

বুদ্ধি আছে জাফরের। জমি রাখার মতো অন্য অনেক ব্যাপারেই তার বুদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এটাই যেন চিন্তা তার। কিন্তু অসংলগ্ন হয়ে গেল। সে হাসল খিকখিক করে–ওই মোরগটাই জাফরুল্লা। তারপর একটা উষ্ণতা তার মনে ঢুকে পড়ল এদিক ওদিক থেকে। ক্লান্তির মতোই সেই উষ্ণতা কিংবা ভয়ের মতো। ভয়েই যেন বিনবিন করে ঘাম ফুটল তার মুখে।

অনেকদিন আগেকার কথা। তা সাত সাল হবে।

চালার নীচের লুকানো জায়গা থেকে নেমেই আসফাক হাঁটতে শুরু করেছিল। অবশেষে এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছিল সে যেখানে উত্তর আকাশের গায়ে নীল মেঘের মতো পাহাড় সব সময়েই চোখে পড়ে। আর দেশের চেহারাও বদলে গিয়েছিল। শালের জঙ্গল। তারপর কৃষকদের ঘরবাড়ি জোতজমা। হলুদ ফসল। তারপর আবার সবুজ বন। এমন করে বন আর কৃষকের জমি পর পর। সাধারণত মানুষ দিনে হাঁটে রাত্রিতে বিশ্রাম করে। আসফাক তখন উলটোটাই করছিল। কিন্তু চতুর্থ দিনে ব্যাপারটা অন্যরকম হল। আগের দিন সন্ধ্যায় পথের ধারের একটা জমি থেকে শসা চুরি করেছিল সে। কিন্তু আজ কী হবে এই ভাবতে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়িয়েছিল। অদ্ভুত দৃশ্য তার সামনে। জঙ্গলের মধ্যে নীল-নীল আলোর চোখ। আরো দুরে দপদপ করে মেটে-মেটে আলো জ্বলছে। তার কাছাকাছি সাদা-সাদা যেন কী সব। আর দু-এক পা এগিয়ে গিয়েছিল আসফাক আর তখন সে আবিষ্কার করেছিল অস্পষ্ট আলোতে আট-দশটা মোষ চরছে। আর সেগুলোর পিছনেই চার-পাঁচটা তাঁবু। হাত তিনেক উঁচু একটা বাঁশের আড়ের উপর দিয়ে একটা করে রং করা কাপড় দুদিকে নামিয়ে এনে চারটে খোঁটায় কাপড়ের চার কোনা বাঁধা। সেই তাঁবুর মধ্যে পুরুষ মেয়ে শিশু। রান্না হচ্ছে। সকলে একই সঙ্গে কথাও বলছে, যেন ঝগড়া লেগেছে। কিংবা ভয় পেয়েছে।

এই তাঁবুর বস্তির কাছাকাছিই কমরুনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার। আর ক্ষুধাই ফিরিয়ে এনেছিল তাকে। চেয়েচিন্তে কিছু পাওয়া যাবে না?

আসফাক লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছিল তাঁবু খুলে নিয়ে লোকগুলো কোথাও যাওয়ার যোগাড় করছে। একটা করে তাঁবু ওঠে আর মোষের পিঠে তাঁবু আর অন্যান্য সরঞ্জাম চাপিয়ে একটা করে দল রওনা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব তাঁবু উঠে গেল, সব দল রওনা হয়ে গেল। আর তখনই সে দেখতে পেয়েছিল খানিকটা দূরে যেন একটা মোষ তখনো বাঁধা আছে। হ্যাঁ, অন্য সব মোষ যেমন করে বাঁধা ছিল–একটা পা লম্বা দড়ি দিয়ে বাঁধা। আর একটা ঝোপের আড়ালে, অন্য তাঁবুগুলো যেখানে ছিল তার থেকে কিছু দূরে একটা ঘেঁছে তবুও যেন। আশ্চর্য, ভুলে গেল নাকি?

ঝোপের আড়ালে আড়ালে চলে তাঁবুটার একেবারে কাছে গিয়ে চমকে উঠেছিল আসফাক। সেই তাঁবু ছিল কমরুন আর তার স্বামীর। স্বামীর বসন্ত হয়েছিল, রাত্রিতেই তার মৃত্যু হয়েছে। কমরুন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সে সময়ের কথা সব মনে আসে না। আসফাক মনে। করতে পারে না, কেন সে না পালিয়ে কমরুনের কান্না শুনতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। অনেকক্ষণ সে নিজের চিবুকে হাত দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়েছিল। কমরুন কাঁদতে কাঁদতে মুখ তুলে নাক ঝেড়ে আর একবার কাঁদতে শুরু করার আগে আসফাককে দেখে থাকবে।

তারপর কবর দেয়া হয়েছিল কমরুনের স্বামীকে। একটা সুবিধাও জুটে গিয়েছিল। বর্ষার শেষে মাছ ধরার জন্য কারা একটা গর্ত করে রেখেছিল। সেই গর্তেই মৃতদেহটাকে রেখে নদীর চরার পাথরকুচি মিশানো বালি আঁজলা আঁজলা তুলে গর্তটাকে বুজিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এদিক ওদিক থেকে বড় বড় পাথর গড়িয়ে এনে আসফাক যখন সেই গর্তটার উপরে রাখছিল, বালিতে আছড়ে পড়ে কাঁদতে শুরু করেছিল কমরুন।

বিকেলের দিকে কমরুন যখন তার তাঁবুর কাছে ফিরে এল তখনো আসফাক তার সঙ্গেই আছে।

কমরুন নতুন করে তাঁবু খাঁটিয়ে বসলে আসফাক বলল, খাবার নাই?–

আশ্চর্য ক্ষুধার কথাটা সে এতক্ষণ ভুলেই ছিল। এটা তার বোকামির লক্ষণ। যে আসল কথাটাই সে ভুলে গিয়েছিল। এর আগেও এমন হয়েছে দু-দুবার। যে দুদিন তার বাপ-মাকে কবর দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু খাওয়াটা অত সোজা ব্যাপার নয়। কমরুনই বরং কতগুলো সরু সরু বাঁশের টুকরো নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সন্ধ্যার একটু আগে। আসফাককে একটু দুরে থাকতে বলে সে নদীর ধারে ধারে এগিয়ে গিয়েছিল। বক সাবধানী শিকারি, কিন্তু বকের চাইতেও সাবধানে কমরুন একটা বাঁশের টুকরোয় আর একটাকে লাগিয়ে সরু লম্বা একটা নল তৈরি করে তাই দিয়ে একটা বককে ঠুকে দিয়েছিল। সেই বকটাকে পুড়িয়ে খেয়েছিল কমরুন, আসফাককেও দিয়েছিল খেতে।

কিন্তু স্বামীকে কবর দেয়ার পরের দিনে যে অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটে গেল তার মতো আশ্চর্য ব্যাপার আর কিছু নেই। এমনকী কমরুনের তাঁবুর কাছে দুই হাঁটুর উপরে হাত দিয়ে ঘের তৈরি করে তার মধ্যে আসফাকের মাথা গুঁজে বসে থাকাও তার তুলনায় কিছু নয়। খুব ভোর থাকতে উঠেই নদীর দিকে গিয়ে থাকবে কমরুন। মোষটাকে দড়ি ধরে খানিকটা দূরে নিয়ে গিয়ে বেঁধে দিল আসফাক। তারপর কমরুনকে খুঁজতে বেরুল! নদীর ধারে ধারে কিছুদূর গিয়ে কমরুনের বাঁশের টুকরো কটিকে দেখতে পেল সে। তার পাশে দুটো ডাহুক দড়িতে বাঁধা। একটা তখনো নড়ছে। কিন্তু কমরুন কোথায়? অবশেষে দেখা গেল তাকে। ঘাগরা জামা পাথরে রেখে সে স্নান করছে। পাহাড়ি নদী। স্বচ্ছ জল স্নানের উপযুক্তই বটে, কিন্তু এক হাঁটুর বেশি নয়। গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে রাখবে কমরুন এমন সুযোগ কোথায়?

সকালেই একটা ডাহুক পুড়িয়ে খাওয়া হয়েছে। আর একটা বাঁধা আছে। কাল চলবে। কমরুন এতক্ষণ কী সেলাই করছিল। এখন শুয়ে পড়েছে তাঁবুর ছায়ায়। দুপুরে এখন কাজ নেই।

বিস্ময়ের মতো শোনালেও জন্মদরিদ্র আসফাক সেই প্রথম নারীদেহ দেখেছিল। তখন ঘাগরায় জামায় ঢাকা আছে বটে। আসফাক এখন ভেবে পায় না কী করে অমন সাহস হল তার। কমরুন তাকে ঘুসি মেরেছিল। সেই শক্ত ঘুসি কানে লেগে অন্য সময় হলে আসফাক অজ্ঞান হয়ে যেত কিন্তু সেই প্রথম আসফাক যেন আকাশের কোনো শক্তির সন্ধান পেয়েছিল বুকের মধ্যে। আর কী সর্বগ্রাসী মাধুর্য! কমরুনের মুখে, তার একটু খোলা ঠোঁটদুটিতে, নীল মীনা করা পিতলের নাকফুলে, আধবোজা চোখদুটোতেও একটা হাসি তারপরে ফুটে উঠেছিল।

এরপর মোষের পিঠে তাঁবু চড়িয়ে কমরুন একদিন হাঁটতে শুরু করেছিল। আর তার পিছন পিছন আসফাক।

কমরুনই বা কী করবে? দলের সন্ধান পাওয়া গেলে আসফাক তার সঙ্গে। থাকত কিনা তা ভেবে লাভ নেই, হয়তো থাকত না। কিন্তু জাফর ব্যাপারির গ্রামে এসে অন্য একটা ব্যাপারও ঘটল। মোষটা যে বুড়ো তা কমরুনের কাছেই শুনেছিল আসফাক। তার একটা চোখের মণিও সাদা হয়ে গিয়েছিল বয়সের জন্য। কিন্তু সে বার্ধক্য যে এমন তা বোঝা যায়নি। একদিন সেটা কাদার মধ্যে বসে পড়ল। দুদিন ধরে মোষের তদবির চলল। গাছগাছড়ার দাওয়াই যা জানা ছিল কমরুনের সে সব প্রয়োগ করা হল। কিন্তু তৃতীয় দিনের সকালে এসে দেখা গেল শেয়াল খেতে আরম্ভ করেছে। সেই কমরুন এখন জাফরুল্লার চার নম্বর বিবি।

তা বুদ্ধি আছে জাফরুল্লা ব্যাপারির। এখানে আসার মাস পাঁচ-ছয় পর থেকেই ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল, যদিও আসফাক তা তখন ধরতে পারেনি। কবেই বা সে ঠিক সময়ে ধরতে পারবে? তখন সেই বেলে ডাঙা জমি চষত আসফাক। কমরুন যেত জাফরের অন্দরে কাজ করতে। তারপর বন্দোবস্ত উলটে গেল। আসফাক সারাদিন জমিতে কাজ করত, আর কমরুন রাতভোর ব্যাপারির বাড়িতে ধান ভানত, চিড়ে কুটত। এই কৌশলে তফাত করে রাখল দুমাস। তারপর নিকা করেছিল কমরুনকে। জাফরুল্লার চার নম্বর বিবি–তার একমাত্র উত্তরাধিকারীর মা।

কিন্তু, আসফাক নিজের অবস্থিতিটা বুঝবার জন্য এদিক ওদিক চাইল, কিন্তু–। পিছন দিকে জাফরুল্লার বাড়ি চোখে পড়ল। চোখ মিটমিট করল সে। যেন দেখতে চায় না।

.

আসফাককে এখন কেউ দেখলে বলত পক্ষাঘাত হয়েছে। চোয়ালটা অবশ হয়ে গিয়েছে। মুখটা হাঁ করা।

.

সেই সেবার যখন জাফরুল্লাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

.

তখন একদিন বলদ বাঁধতে গিয়েছিল আসফাক দহের ধারে। বলদদের যখন সে বাঁধছে কেউ যেন মৃদুস্বরে ডেকেছিল আসফাক, ও আসফাক। বাতাসটায় জোর ছিল, শব্দটা ঠিক এল না। একবার সে মাথা তুলে শুনতে পেল কে যেন কুই করে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। বাতাসটা আরো জোরে উঠে পড়েছিল। পথের পাশের বড়-বড় ঘাস। সেগুলো বাতাসের তোড়ে ছপছপ করে গায়ে লাগছে। আসফাক পশ্চিম আকাশের দিকে তাকাল। ফাঁক খাওয়া এই ঝোড়ো বাতাসে ঝড় উঠবে কিনা তা বোঝার চেষ্টা করল। এমন সময়ে বাতাসে ভেসে কী যেন একটা তার গায়ে এসে পড়ল। সেটা গড়িয়ে পায়ের কাছে পড়লে আসফাক দেখল টোপাকুল। সে বিস্মিত হল। এদিকে টোপাকুলের গাছ কোথায়? দহের ওপারে একটা আছে বটে। ওপারের টোপাকুল এপারে এসে পড়বে এত জোর বাতাসে? কাজেই সে ওপারের দিকে ফিরে তাকাল। আর তখন সে দেখতে পেল। সাঁকোর উপরে, সাঁকোটা প্রায় পার হয়ে এসে, দাঁড়িয়ে আছে কমরুন। বাতাসে তার চুল উড়ছে। মাথার কাপড় খসে গিয়েছে। পায়ের কাছে এলোমেলো কাপড়ের ঢেউ ওঠানামা করছে। আঁচলে তার টোপাকুল। আঁচল সামলে, শাড়ি সামলে সে আর এগোতে পারছে না।

ও আসফাক, আসফাক।

কী?

নামায়ে দাও।

কমরুন। জাফরুল্লা ব্যাপারির চার নম্বর বিবি কমরুন।

আসফাক এগিয়ে গিয়ে কাছে দাঁড়াল। আর তখন ছোট ছেলেমেয়েরা যেমন কোলে ওঠে তেমন করে আসফাকের গলা জড়িয়ে ধরে কমরুন সাঁকো থেকে নামল। কেমন যেন লজ্জা পেয়ে হাসল সে। সাঁকো থেকে নেমেছে বটে কিন্তু তখনো পায়ে মাটি ছুঁলেও, কমরুন তার দুহাত দিয়ে আসফাকের গলা জড়িয়ে ধরে আছে। একবার সে মুখ তুলল, আসফাকের মুখটা দেখল, তারপরে আসফাকের কাঁধের উপরেই মুখ রাখল। যেন তখনো সাঁকোটা পার হচ্ছে ।

তারপরে মাটিতে পা দিয়ে দাঁড়াল সে আসফাকের মুখোমুখি। বাতাস আর একপাক খেলে গেল। খানিকটা ধুলো উড়িয়েও গেল। বাতাসের জন্যই কমরুনের পদক্ষেপগুলো অসমান হচ্ছে। কয়েক পা গিয়ে পথের ধারে বড়-বড় ঘাসগুলো যেখানে বাতাসে কাত হয়ে পড়েছে শুয়ে পড়ল কমরুন, যেন হঠাৎ পড়ে গিয়েছে। বাতাস যেমন শব্দ করছে তেমন যেন খিলখিল করে হাসল সে।

আসফাক বলল, পড়ে গেলা?

কমরুন হাসল। তার চোখদুটো (তার চোখে সুর্মার টান ছিল) ঝিকমিক করল। মুখটা গাঢ় বাদামি হয়ে উঠল। আসফাক অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল একটা মুহূর্ত। আর তখন ধনুকের ছিলার মতো উঠে পড়ল কমরুন। হাসল সে। তারপর দৌড়ে পালাল।

কমরুনের অমন ভালো হয়নি। বিশেষ যখন জাফরুল্লা বিদেশে। তা ছাড়া সেখানে কেউ ছিল না। সেই বাতাসের মতোই তার রক্তের মধ্যে কী একটা চঞ্চলতা দেখা দিয়েছিল। তাতে যেন দম বন্ধ হয়ে যায়। তার চাপে কী হয়? সব নিষেধ, সব বাধা ভেঙে মানুষকে একটা দিশেহারা গতির মতো কিছুতে পরিণত করে। তার টান আর বাধার টান এই দুই রশির টানে দম ফেটে যায়। চোখের সম্মুখে সব অন্ধকার হয়ে যায় আর সে অন্ধকার যেন রক্তের মধ্যে এলোমেলো চঞ্চলতা তারই ঢেউ। দহের জল যেমন লাফাচ্ছিল তখন।

.

চাকররা সারাদিন কাজ করে। সন্ধ্যা লাগতে লাগতেই তাদের খাবার দেয়ার নিয়ম। আজও কিছুক্ষণের মধ্যেই ছমির এসে খেতে ডাকল। আসফাককে। কিন্তু নিজে সে খাবে না। বাড়ি যাবে। সে কথাটাই আবার মনে করিয়ে দিল। কিন্তু ছমিরদের দিনের কাজ শেষ হয়েছে। তাকে এখন কতগুলো কাজ করতে হবে। আসফাক বড়বিবির ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

বড়বিবি যথারীতি মোড়ায় বসে ফুরসি টানছে। তার সামনে গিয়ে ওষুধের শিশি আর পয়সা নামিয়ে রাখল আসফাক।

কে, আসফাক?

জে।

বড়বিবি হাসল। নিঃশব্দ হাসি কিন্তু তার মুখের পেশীগুলোর মধ্যে চোখদুটো ডুবে গেল হাসির দমকে।

হাসি থামলে বড়বিবি বলল, কেন, পথ হারাইছিলা?

জে।

 আবার ফুরসিতে মন দিল বড়বিবি।

মেজবিবি আজ খাবারঘরের মালিক। কথা সে কার সঙ্গেই বা বলে? আসফাক আর তার মতো দুজন বারান্দায় উঠে বসতেই সানকি করে ভাত দিয়ে গেল মেজবিবি। একবারও সে কিছু জিজ্ঞাসা করল না আসফাককে। যেন এরকম কাণ্ড রোজই করছে সে।

খাওয়া যখন মাঝামাঝি হঠাৎ দমাদম পা ফেলে রসুইঘরে এল ছোটবিবি। তার পায়ের মল ঝমঝম করে বাজল। তার ভাব দেখেই বোঝা যায় এবার কী হবে। চাকররাও এ ওর দিকে চেয়ে চোখ টিপল। মাঝে মাঝে যা হয়। ঘরের মধ্যে কথাগুলো চাপা গলায় হচ্ছে কিন্তু অন্যদিনের মতো বাইরে থেকেই কানে যাচ্ছে। মেজবিবির দিকে ছোটবিবি যদি অমন ছুটে আসে বুঝতে হবে ঝগড়া হবেই। এ ঝগড়ায় কে-ই বা দৃপাত করে এখন? আসফাকের কিন্তু কানে গেল কথাগুলো। আর তখন তার অনুভব হল সবই ঠিক আগের মতোই। মাঝখানে তার দেরির ব্যাপারটা। আর তাও এরই মধ্যে লোকে ভুলে যেতে বসেছে।

অবশ্য অতটা বলা ঠিক হয়নি। ঝি নিয়ে ঝগড়া শেষ করে ছোটবিবি আবার বার হল রসুইঘর থেকে। তখন আসফাকদের খাওয়া প্রায় হয়ে গিয়েছে। ধাপ বেয়ে নামতে নামতে থামল ছোটবিবি।

বলল, আসফাক?

জে।

পরী ধরছিল?

আসফাক লজ্জিত হয়ে মুখ নামাল।

অন্য চাকররা অস্ফুট শব্দ করে হাসল।

অন্য চাকরদের বাড়ি যাওয়ার তাগাদা ছিল। ছিলিমে দুটান দিয়ে চলে গেল তারা। তখন আসফাক খুঁতখুঁত করে হাসল ছিলিম টানতে টানতে। পরী ধরার কথা বলেছে ছোটবিবি।

ছিলিমটা ঢেলে নতুন করে ছিলিম ভরল আসফাক। তা পরীর মতোই দেখতে বটে ছোটবিবি, সলসলাবাড়ির পথে আসফাককে পরী ধরুক আর নাই ধরুক। চোখের কী জেল্লা, নাকফুল আর কানফুলের কাঁচগুলোর চাইতে যেন সুর্মার টানের মধ্যে বসানো চোখের মণিদুটো বেশি ঝকঝকে। আর ঝগড়া–কী ঝগড়াই না করতে পারে। অমন যে আদরের মেজবিবি সেও পালাতে পথ পায় না। আজ রসুইঘরেও চুপ মেরে গিয়েছিল ছোটবিবির মুখের সামনে।

অন্ধকারে পা ছড়িয়ে বসল আসফাক। আরাম করে বসে ছিলিমে আগুন ধরাল। সবই ঠিক দেখো আগের মতোই। মাঝখানে হাকিম সাহেবের পাগলামি। অন্ধকারে স্নিগ্ধতায় তার শরীর জড়িয়ে আসতে লাগল। ছিলিম ঢেলে সে হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। ছোটবিবির ঝগড়াটায় যে কৌতুক তাই যেন দিনশেষের রসিকতা যা ভাবতে ভাবতে ঘুমাতে যাওয়া যায়।

আসফাক ঝগড়াটা যেন আবার শুনতে পেল।

ছোটবিবি বলল, নুরীকে বলছিলাম পা দাবাতে।

এদিকেও তরকারি কোটা লাগে।

মানুষের তো ব্যথাবিষও হতে পারে।

বাব্বা! একরাত বাড়ি নাই তাতেই এত গায়ে ব্যথা।

সে বিষ হয় তোমার।

বেশ, হয়। নছিব করা লাগে।

অত দেমাক দেখায়ো না। নছিব? তবু যদি খ্যামতা থাকত।

খ্যামতা?

 তা না? তা না হলে কমরুনবিবিকে আনা লাগে না। আমি আর বড়বিবি না হয় বাদ, তুমি কেন পতিত থাকলে?

বলদের ঘরে ঢুকে আসফাক শোয়ার যোগাড় করে নিল। কিন্তু তখনই শোয়া হল না তার। তার মনে পড়ল কিছু কাজ বাকি আছে। জাফরুল্লা বলেছিল কয়দিনের মধ্যেই তামাক বাঁধার চটি বাঁশ লাগবে। সোজা নয় প্রয়োজনটা। পাঁচ-ছয়টা আস্ত বাঁশের চটি করতে হবে। তাও আবার মাপ মতো হওয়া চাই–লম্বায় পোন হাত, চওড়ায় দুই সুত, আর মোটা কাগজের মতো। তামাকের ডাটা একহাতে ধরে অন্যহাতে ভঁটাগুলোর উপরে তিন পাক বেঁধে দিতে হবে। কাল সকালে বাঁশ কাটা হয়েছে। শুকিয়ে গেলে চটি উঠবে না। আর ব্যাপারি ফিরে এসে যদি দেখে।

আসফাক তার মাচা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে ঠিক করল দু-তিন ঘণ্টা কাজ করা যাবে এখন। আর তা করাও দরকার।

কিন্তু একটা টেমি না হলে কী করা যাবে? উঠে দাঁড়িয়ে সে অন্দরের দিকে গেল। বড়বিবির ঘরেই থাকে তেল। কিন্তু ভিতর থেকে ফুরসির শব্দ পাওয়া গেলেও ঘরের দরজা বন্ধ। রসুইঘরের দিকে আলো চোখে পড়ল। সেদিকে এগোতেই মেজবিবির গলার সাড়া পাওয়া গেল।

কে?

আসফাক।

কী চাই?

না। একটি টেমি।

ছোটবিবির দুয়ারে দেখো।

ছোটবিবির দুয়ারে টেমি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু একটু লজ্জাও পেতে হল। চাকর হলেও পুরুষ তো। বাড়িতে পুরুষ নাই, আর নুরীও পুরুষ নয়, কিন্তু আবরু থাকা দরকার।

কাটারি দিয়ে বাঁশ থেকে চটি তুলতে বসল আসফাক টেমির আলোয়। একবার তার মনে হল–আচ্ছা, তিন বিবিকে দেখলাম কিন্তু কমরুনকে দেখা গেল না। সে কি ব্যাপারির সঙ্গে গেছে?

তারপর সে কাজ করতে বসল।

টেমিটায় তেল নাই। মিটমিট করছে। রাত্রির অন্ধকারটাও গম্ভীর হয়ে আসছে। চটি তুলতে তুলতে অন্ধকারের দিকেও চাইছিল আসফাক। চারিদিক সুমসাম হয়ে গিয়েছে। বলদের ঘর থেকে মাঝে মাঝে বলদের নিঃশ্বাসের কানে আসছে। আর নিজের হাতের কাটারি বাঁশের উপরে যে মৃদু শব্দ করছে।

সেবার কিন্তু দড়ি পাকিয়েছিল আসফাক। সেবার মানে ওই যে পনেরো দিনের জন্য যখন জাফরুল্লাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। তখন কিন্তু এমন সুমসাম হয়ে যেত বাড়িটা। আজও তেমনি। শুধু ব্যাপারি এবার তাকে দেখাশোনা করতে বলে যায়নি। তা হোক। কেমন একটা আলসেমি লাগছে। এবার সে শুতে যাবে। এই টুকরো কটা শেষ হলেই হয়।

কাজ করতে করতে হঠাৎ সে থামল। সেবার কিন্তু শোওয়ার আগে বাড়ির চারিদিকটা দেখে আসত। বিবিরা ঘরের দরজা দিল কিনা খোঁজ নিত। শুধু দহের পারের সেই ঘটনার পরের তিন-চারদিন সে শুধু বড়বিবির ঘরের সামনেই দাঁড়াত।

বাঁশ আর কাটারি সরিয়ে রাখল সে। উঠে দাঁড়াল। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কী যেন লক্ষ করল। চিবুকে হাত রাখল। কিছু যেন একটা মনে আসছে, কিন্তু ঠিক ধরতে পারছে না কী সেটা। সে ঘরের দিকে চলল। শোবে এখন সে।

কিন্তু এবারেও তার শুতে যাওয়া হল না। তার মনে হল কমরুনবিবিকে আজ সে দেখেনি। খবর নেয়া দরকার। সত্যি কি জাফর তাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে? নিতে হলে মেজবিবিকেই নিত। খুবসুরত ছোটবিবিরও সে সুবিধে নেই। ওরা যেমন বেহিসেবি-বিবিরা দরজাটরজা ঠিকঠাক দিল কি তা দেখবার জন্য অন্দরের দিকে পা বাড়াল আসফাক। আর কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ যেমন একটা আলসেমি লেগেছিল কাজ করতে করতে তেমন কিছু একটা অনুভব করল সে আবার। তারপর গা শিরশির করে উঠল। গলার কাছে উৎকণ্ঠা যেন একটা দলার মতো ঠেলে উঠল। আবার তার মনে পড়ল সেবারেও এমন নিঃসঙ্গ ছিল ব্যাপারির বাড়ি।

সে অন্দরের দিকে একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে গেল। সে অনুভব। করল–দেখো এ ব্যাপারটাও সে আগে বুঝতে পারেনি, অন্য সব ব্যাপারের মতো। ভাবো তো কতদিন দেখা হয় না কমরুনের সঙ্গে। সেবারের সেই সাঁকোর কাছে কথা হওয়ার পর আর কথাও হয়নি। অন্য বিবিদের তদারক না করে সে সোজা কমরুনের ঘরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তখন তার রক্ত পাগল হয়ে উঠেছে।

কমরুন, কমরুন, ঘুমাও? ওঠো। ফিসফিস করল আসফাক।

কমরুন তখনো ঘুমোয়নি। ঘরের মেঝেতে পাটি পেতে বসে কী একটা সেলাই করছে সে।

ভাক শুনে কমরুন সেলাই নামাল হাত থেকে। উঠে এল জানালার কাছে।

কে! সর্বনাশ! আসফাক? কমরুনের মুখ, একেবারে রক্তহীন হয়ে গেল।

সে ফিসফিস করে বলল, ব্যাপারি বাড়ি নাই।

জানি।

তা হলে। কমরুন যেন হাঁপাচ্ছে।

যন্ত্রলিতের মতো কমরুন দরজা খুলে দিল। দরজা খুলে দিয়ে ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল সে।

আসফাক কমরুন কী বলবে খুঁজে পেল না।

আসফাক বলল, কমরুন, কী খুবসুরত দেখায় তোমাকে।

 কমরুন বলল, রাগ করো না, আসফাক, আমি একটু ভেবে নিই। তুমি বোসো।

আসফাক কমরুনের দিকে চেয়ে রইল। হলদে সাদায় ডুরি একটা শাড়ি পরনে তার। গলায় একেবারে নতুন একটা রুপোর চিকহার লণ্ঠনের আলোয় চিকচিক করছে। আসফাকের বাঁদিকে কমরুনের বিছানা। মশারিটা তোলা। সাদা ধবধবে বিছানায় দু-একটা মাত্র কোচকানো দাগ।

কেন কমরুন—

কী আসফাক?

তুমি কেমন আছো তাই খোঁজ নিতে আসছিলাম।

তুমি রাগ কোরো না আসফাক।

না। রাগ কী!

 দরজার কাছে ফিরে গেল আসফাক।

 কমরুন এগিয়ে এল।

 আসফাক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলল, দুয়ার দেও কমরুনবিবি।

যন্ত্রচালিতের মতো দরজা দিতে গিয়ে থামল কমরুন। ফিসফিস করে বলল, শোনো। আমি মুন্নাফকে শিখায়ে দিছি। আমি যতদিন বাঁচব সে তোমাকে মিঞাসাহেব কয়ে ডাকবে।

আসফাক ফিরে গেল বিবিদের তদারক করে।

 নিজের শোবার মাচাটায় গিয়ে বসে তার যে অনুভূতি হল কথায় দাঁড় করালে তার অর্থ হয়–এ কমরুন সে কমরুন নয়।

কোনো কোনো কথা আছে উচ্চারণের সময়ে তার যতটা অর্থবোধ হয়। পরে তার চাইতে বেশি গভীর মনে হতে থাকে।

কথাটা তো ঠিকই–এই ভাবল আসফাক–জাফরুল্লা ব্যাপারি তাকে অন্য চাকরদের চাইতে আলাদা দেখে। তা না হলে, সেবার তাকেই বা সব কিছুর ভার দিয়ে যাবে কেন? আজ কমরুনও বলছে সে মুন্নাফকে শিখিয়ে দিয়েছে। যাতে সে আসফাককে মিঞাসাহেব বলে ডাকে। একে যদি খাতির না বলে কাকে বলবে?

মিঞাসাহেব, মিঞাসাহেব না? এই বলল আসফাক মনে মনে হাসলও সে।

কিন্তু ঠিক ওভাবে বলল কেন কথাটা কমরুন? অবাক কাণ্ড দেখো, কমরুনের কথাবার্তা কেমন বিবিসাহেবদের মতো। হঠাৎ যেন চিড় খেল তার সামনের অন্ধকারটা। এদিক ওদিক তাকাল সে। আসলে তা তো নয়। আসফাকের মনেই কথাটা বিদ্যুতের মতো চমকে উঠেছে। কেন, কারুনবিবি ওভাবে ওকথা বলে কেন? রাগ করতে নিষেধ করে সে তা না হয় বোঝা যায়। কিন্তু তার সঙ্গে ওকথা কেন? এমন ঠাট্টা জাফরুল্লার অসাক্ষাতে চাকররা করে বটে। তা দু-একবার শুনেছে আসফাক। কিন্তু তারা তো কত কী-ই বলে– বড়বিবির নাকি রোজ এক বস্তা চিড়ে লাগে নাস্তায়। ছোটবিবি নাকি রাত্রিতে উড়ে কোথায় যায় সে জন্যেই তার চোখদুটো অমন ধারালো। মেজবিবি নাকি মন্তরে বশ করেছে ব্যাপারিকে। দাড়িতে যে রং দেখো সেটাই ওষুধ মেজবিবির। তেমনি মুন্নাফ সম্বন্ধেও একটা ঠাট্টা আছে তাদের।

আসফাকের মনের এই চিড়খাওয়া ফাটল দিয়ে বিবিদের ঝগড়ার কথাগুলো ভেসে উঠল। মেজবিবির সঙ্গে ছোটবিবির ঝগড়া। ঝগড়াটা ঠিক নয়। ঝগড়ায় যে সংবাদ ছিল। মেজবিবিও তা হলে পতিত থাকল কেন? কমরুনবিবি কি তা হলে মুন্নাফকে কোমরে নিয়েই ঢুকেছিল ব্যাপারির ঘরে? আর তা যদি হয়, তবে মুন্নাফ কি? সে জন্যই কি মুন্নাফ তাকে নাম ধরে : ডাকে না, আর তার মা তাকে শিখিয়ে দিয়েছে আসফাককে সম্মান করতে।

আর জাফর কি জানত? জেনেই, কমরুনকে দেখে তার অবস্থা বুঝতে পেরেই তাকে নিকা করেছিল?

.

অদ্ভুত কথা তো! ভারি অদ্ভুত কথা! এছাড়া কোনো কথাই তার মন তৈরি করতে পারল না। আর কথা তৈরি না হলে কি চিন্তা করা যায়? কিন্তু চিন্তা কখনো কখনো বুকের একটা কোণও ভরতে পারে না। সেই খালি অংশগুলোতে যেন এই রাত্রির অন্ধকারও ধূসর হয়ে উঠতে লাগল, কখনো যেন সেই আকাশে চোখে দেখা যায় এমন মেটে রঙের বাতাস বয়ে গেল, কখনো গোটা আকাশটাও গলে গলে ধরা হয়ে নেমে এল কোনো কালো রঙের ধানখেতের উপরে, যার বুকে একটা কাঠি পোঁতা অনেক স্রোতকে বিভক্ত করে। হাকিম সাহেবের কথা নয়। আরো গভীর আরো ব্যাপক কিছু। এমন টান এই স্রোতের।

ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙল আসফাকের। ধড়মড় করে সে সজাগ হল। ঠিকই শুনেছে যেন সে, জাফরুল্লা ব্যাপারি তাকে ডাকছে। মাচার উপরে খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকতে থাকতে সকালের দিকে বোধহয় তন্দ্রা এসেছিল তার। অনেক বেলা হয়ে গেলে যেমন করে চাকররা তেমন করে চোখ ডলে মাচা থেকে নামল সে।

কিন্তু জাফরুল্লা নয়। মুন্নাফ ডাকছিল। বেলা একটু হয়েছে। কিন্তু যতটা আশঙ্কা করেছিল তা নয়।

.

মুন্নাফ বলল, উঠছ আসফাক!

উঠলাম। কখন আসলে? আসফাক হাসল বিবর্ণ মুখে।

 ভোরে।

কেন, শহর থেকে রাত্তিরে রওনা দিছলে? আন্ধারের পথ তো।

লরিতে আসলাম যে। তা দেখো নাই! আব্বাজান লরি কিনছে একখানা। সে জন্যেই তো শহরে যাওয়া।

ও।

এখন থেকে আর গোরুগাড়িতে তামাক পাট যাবে না বন্দরে। লরিতে যাবে। কী ভকভক হরন। আর কত বড় বড় চাকা। ডারাইবারও আসছে।

ও। তা মুন্নাফ।

আর মুন্নাফ না। শোন তোমাকে এক কথা কই, আসফাক। বলদ এড়ে দাও। আব্বাজানের ঘুম ভাঙার আগেই বলদ নিয়ে দূরে চলে যায়ো। আম্মা কয়ে দিয়েছে।

আসফাক বলদের গলার দড়ি খুলে দিতে লাগল। বারোটা বলদই বেরিয়ে পড়ল দিনের আলোয়।

মুন্নাফ দরজার কাছ থেকে কিছুদূরে সরে গিয়েছিল।

 সেখান থেকে সে ডাকল, শোনো, আসফাক, আর এক কথা কই।

আসফাক এগিয়ে গেল। তার বুকের ভিতরে ভয় ধকধক করতে লাগল। সেই গল্প জানো তো? খুরপি চুরির জন্য চোরকে ধরলে খুঁজে খুঁজে তার সব পুরনো চুরি ধরা পড়ে। কিন্তু কী আর গোপন থাকবে? সে তো নিজেই নিজের কাছে ঢাকতে পারছে না। দেরি তো দেরি, হাকিমসাহেবকে যা বলেছে তা নিজেও সে ভুলতে পারছে না। গোপন করাও যাবে না। জাফরুল্লা এসে গেছে, জাফরুল্লা এসে গেছে। সেবার তবু সেই দহের ধারে উশকোখুশকো চুল ছিল কমরুনের, সাদামাটা শাড়ি ছিল পরনে।  

আম্মা বলেছে আব্বা খাওয়া-লওয়া করে না শুলে তুমি বাড়িতে আসবা ।

আসফাকের মনে একটা প্রশ্ন দেখা দিল। একটু ইতস্তত করল সে, কী ভাবে আরম্ভ করা যায় তা খুঁজতে দেরি হল।

কেন, মুন্নাফ, তুমি আর মিঞাসাহেব বলবা না আমাকে?

মুন্নাফের মুখে লজ্জার মতো কিছু একটা ভাব দেখা দিল, না। আব্বা বলছে চাকরকে তা বলা লাগে না।

ঠিক এমন সময়ে কে যেন ডাকল–আসফাক।

কে যেন কয়? চিনতে কি ভুল হয়? এই বজ্রগর্জনের মতো স্বর। টিনের দেয়ালের ঘরের জানালা খোলা। সেই খোলা জানালায় মেহেদি-রাঙানো দাড়ির খানিকটা দেখা গেল।

আসফাক বলদগুলোর পিছনে দৌড়ে চলার মতো হাঁটতে শুরু করল।

আকাশের চেহারা ভালো নয়, আসফাক। বলদ দূরে নিস না।

আকাশের দিকে তাকালো আসফাক। আকাশে কালো মেঘ নেই। দিনের আলোয় যে আকাশ ঝকঝক করে তাও নয়। এমন নোংরা আকাশ আর কোনোদিনই দেখেনি সে। বলদদের ঘরের মেঝের মতো কাদামাখা যেন। আর রাত্রিতে ঘুম না হলে যেমন হতে পারে তেমন ফ্যাসকা। মোটকথা এমন রংচটা আকাশ সে আর কখনো দেখেনি।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *