৯-১১. কয়েকদিন অপেক্ষা করে

০৯.

কয়েকদিন অপেক্ষা করেও যখন শিহাব যোগাযোগ করল না তখন জাহিদ হাসান একদিন তার অফিসে ফোন করলেন।

শিহাবের পি.এ. সাওকাত ফোন ধরে বললেন, কে বলছেন?

আমি জাহিদ হাসান, শিহাবের সঙ্গে কথা বলতে চাই।

একটু অপেক্ষা করুন বলে সাওকাত ইন্টারকমে সাহেবকে বললেন, জাহিদ হাসান আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছেন।

শিহাব বললেন, ঠিক আছে, লাইন দিন। লাইন দেয়ার পর শিহাব সালাম দিয়ে বললেন, চাচা কেমন আছেন?

ভালো, তুমি কেমন আছ?

আল্লাহ ভালোই রেখেছেন। হিমুর কাছে মনে হয় সব কিছু শুনেছেন। আমি যোগাযোগ করব করব করেও কাজের চাপে সম্ভব হয় নি। গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি, এলে খুব খুশি হব।

কাজে খুব ব্যস্ত বললে, অফিসে আলাপ করা যাবে কি? তার চেয়ে বিকেলে আমি তোমার বাসায় আসছি। ক’টায় বাসায় ফিরবে?

পাঁচটায়। আপনি ঐ সময়ে আসুন। গাড়ি পাঠিয়ে দেব।

গাড়ি পাঠাতে হবে না। আমি নিজেই আসব।

তাই আসুন। তারপর সালাম বিনিময় করে শিহাব রিসিভার নামিয়ে রাখলেন।

.

শিহাব সাড়ে চারটের সময় বাসায় ফিরে স্ত্রী ও শ্বশুরকে জাহিদ হাসানের আসার কথা জানিয়ে কিভাবে হিমুর সঙ্গে রিজিয়ার বিয়ে দেয়া যায় আলাপ করলেন।

জাহিদ হাসান নিজের গাড়িতে করে ঠিক পাঁচটার সময় শিহাবদের বাসায় এলেন।

শিহাব জাহিদ হাসানের আসার কথা দারোয়ানকে বলে বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন। জাহিদ হাসান গাড়ি থেকে নামার পর সালাম বিনিময় করে ড্রইংরুমে এনে বসালেন।

বসার পর জাহিদ হাসান বললেন, প্রায় বিশ বছর আগে তোমার ও রিজিয়ার সঙ্গে এবং তার নানার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছি, সেজন্য আমি খুবই অনুতপ্ত। হিমুর কাছে তোমার ও রিজিয়ার আমার ওপর কোনো ক্ষোভ বা রাগ নেই শুনে বুঝতে পারি তোমরা কত মহৎ, তোমাদের মন কত উদার। তাই তোমাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য এসেছি। আর রিজিয়াকে নাতবৌ করে ঘরে তোলার জন্য তোমার সঙ্গে আলাপ করতেও এসেছি। রিজিয়ার নানা বেঁচে থাকলে তার কাছেও ক্ষমা চাওয়ার জন্য গ্রামের বাড়িতে যেতাম।

শিহাব বললেন, এ আপনি কি বলছেন চাচা? রিজিয়ার নানা সম্পর্কে যা বললেন, সে ব্যাপারে কিছু বলার নেই। কিন্তু আপনি আমার ও রিজিয়ার কাছে ক্ষমা চাইবেন কেন? রিজিয়া হল আপনার নাতনি। আপনার ওপর তার ক্ষোভ বা রাগ আগে ছিল কি না জানি না, কিন্তু এখন যে কিছুই নেই, তা আমি জানি। সে আপনার পায়ের সেবা করার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। আর আমি হলাম আপনার ছোট ছেলের বন্ধু। বন্ধুর বাবাকে নিজের বাবার মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করতে হয়, নিজের বাবার মতো সম্মান করতে হয়। পারতপক্ষে আমি আপনার ছেলের মতো। মায়ের কাছে জেনেছি, মা-বাবা অথবা মুরুব্বিদের দোষ-ক্রটি মনে রাখতে নেই। তাই সেদিন মনে খুব ব্যথা পেলেও মনে রাখি নি। তা ছাড়া আমাদের নবী করিম (সঃ) বলেছেন, অপরাধী নিজের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হলে ক্ষমার যোগ্য হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।

জাহিদ হাসান তার কথায় খুব খুশি হয়ে বললেন, রিজিয়াকে ডাক, ওকে দেখার জন্য খুব অস্থিরতা বোধ করছি।

অফিস থেকে এসে শিহাব যখন স্ত্রীকে জাহিদ হাসানের আসার কথা বলছিলেন তখন ফারিহা শুনেছে। তাড়াতাড়ি রিজিয়াকে কথাটা জানিয়ে তারা এতক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। তাকে ডাকার কথা শুনে রিজিয়া আর স্থির থাকতে পারল না। একরকম ছুটে এসে এই তো আপনার হতভাগী নাতনি রিজিয়া বলে দাদাজীর দু’পা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

জাহিদ হাসান হতবাক হয়ে নাতনির মুখের দিকে তাকিয়ে রাকিবের প্রতিচ্ছবি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না।

কিছুক্ষণের মধ্যে সামলে নিয়ে রিজিয়া বলল, জ্ঞান হওয়ার পর নানাজীর কাছে ঘটনা শুনে আপনাদের ওপর খুব ক্ষোভ ও রাগ হয়েছিল। এস.এস.সি. পাস করার পর নানাজী যখন কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যাসহ অন্যান্য ইসলামিক বই কিনে দিয়ে পড়তে বললেন তখন সেইসব পড়ে যে শিক্ষা পাই, সেই শিক্ষা মনের সব রকমের ক্ষোভ, রাগ ও দুঃখের কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে প্রত্যেক নামাযের পর আল্লাহর কাছে জানাতাম, তিনি যেন আপনাদের ক্ষমা করে দিয়ে আমাকে আপনাদের পায়ের সেবা করার সুযোগ দেন।

জাহিদ হাসান নাতনির মাথায় চুমো খেয়ে পাশে বসিয়ে বললেন, তুমি আল্লাহর খাস বান্দি। তাই তিনি তোমার দোয়া কবুল করে তোমাকে আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। তারপর শিহাবকে বললেন, আমার আর এক নাতনি কোথায়?

বাবা কিছু বলার আগে ফারিহা ভেতরে ঢুকে এই তো আপনার আর এক নাতনি বলে কদমবুসি করল।

জাহিদ হাসান তার মাথায়ও চুমো খেয়ে বললেন, থাক ভাই থাক। আল্লাহ তোমাকে সুখী করুক। তোমার কথা হিমুর কাছে অনেক শুনেছি।

এমন সময় আরমান চৌধুরী সেখানে এসে সালাম দিয়ে বললেন, আমি শিহাবের শ্বশুর।

জাহিদ হাসান সালামের উত্তর দিয়ে দাঁড়িয়ে হ্যাঁন্ডসেক করার জন্য ডান হাত বাড়ালেন।

আরমান চৌধুরী দুই হাতে ওনার হাতটা ধরে বললেন, আপনিও দুই হাত দিয়ে আমার হাত ধরুন। ধরার পর বললেন, আমার চোখে চোখ রেখে বলুন আল্লাহুমাগ ফেরলি। অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। এটাকে মুসাফাহা বলে। মুসাফাহা হল ইসলামী প্রথা। আর হ্যাঁন্ডসেক হল বিধর্মীদের প্রথা। আমরা মুসলমান, আমাদের ইসলামী প্রথাই তো মেনে চলা উচিত, তাই না?

জাহিদ হাসান এসব জানতেন না। তাই লজ্জিত স্বরে বললেন, হ্যাঁ উচিত।

আরমান চৌধুরী হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জাহিদ হাসানকে বসতে বলে নিজেও বসলেন। তারপর দুই নাতনিকে উদ্দেশ করে বললেন, দাদুকে পেয়ে খুশিতে নাস্তা খাওয়াবার কথা ভুলে গেছিস নাকি? যা, তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা কর।

নাস্তা খাওয়ার পর আরমান চৌধুরী নাতনিদের বললেন, তোমরা গিয়ে আরিফাঁকে পাঠিয়ে দাও।

কিছুক্ষণের মধ্যে আরিফা বেগম এসে জাহিদ হাসানের সঙ্গে সালাম বিনিময় করে বাবার পাশে বসলেন।

জাহিদ হাসানকে উদ্দেশ করে আরমান চৌধুরী বললেন, এ হল আমার মেয়ে। তারপর বললেন, আমি শিহাবের কাছে সব কিছু শুনেছি। আপনি তো ইচ্ছা করলে রিজিয়ার আসল পরিচয় ছেলে-বৌমাকে জানিয়ে ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন।

জাহিদ হাসান বললেন, হ্যাঁ, পারি। কিন্তু আমি তা করব না। কারণ আমার ছেলে-বৌমাকে আমি চিনি। তারা আভিজাত্যের অহঙ্কারে অন্ধ হয়ে আছে এবং ধনী হওয়া সত্ত্বেও বন্ধুর সমস্ত সম্পত্তির লোভে তার একমাত্র মেয়েকে বৌ করতে চায়। আমি রিজিয়াকে নাতবৌ করে তাদেরকে শিক্ষা দিতে চাই। আর সেইজন্য হিমুর সঙ্গে আলাপ করে একটা প্ল্যানও ঠিক করেছি।

আরমান চৌধুরী বললেন, প্ল্যানটা বলুন।

শিহাবকে আমার ছেলে ও বৌমা চেনে; কিন্তু তারা বাসার ঠিকানা জানে। আমি তাদের কাছে এই ঠিকানা জানিয়ে সুলতানার জন্য প্রস্তাব দেব। রিজিয়ার নতুন নাম হবে সুলতানা। হিমুর মা-বাবাকে এনে রিজিয়াকে দেখাব। হিমুর মা একবার মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য দেখেছে। দেখে যদি রিজিয়াকে চিনে ফেলে তখন বলব, এ রিজিয়া নয়, সুলতানা। অনেক ক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়ে দেখতে প্রায় একই রকম হয়। তারপর তারা যাতে রিজিয়াকে বৌ করতে রাজি হয়, সেরকম ব্যবস্থা আমি করব। তবে বিয়ে পড়াবার আগে পর্যন্ত শিহাব তাদের সামনে আসবে না। আর রিজিয়াকে শিখিয়ে দিতে হবে দেখতে এসে তারা যদি নাম জিজ্ঞেস করে তখন যেন নতুন নাম সুলতানা বলে। তারপর বললেন, আমি একজন মুফতির কাছে জেনেছি, বাবা বেঁচে থাকতে ছেলে মারা গেলে ছেলের ঘরের নাতি-নাতনিরা দাদার সম্পত্তি থেকে মাহরুম হয়ে যায়। তবে দাদা ইচ্ছা করলে কিছু সম্পত্তি নাতি-নাতনিকে দিতে পারেন। এটাও ইসলামে জায়েজ আছে। তাই বিয়ের আগে আমি আমার বাড়িটার অর্ধেক অংশ রিজিয়ার নামে লিখে দেব। তা হলে ওদের বিয়ের পর রাগিব রিজিয়ার আসল পরিচয় জেনে যদি ছেলে-বৌকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়, তখন আর তা পারবে না।

আরমান চৌধুরী বললেন, প্ল্যানটা আপনার ভালো। তবে একটু ফাঁক রয়ে গেছে। আমি সেই ফাঁকটা পূরণ করে দিতে চাই।

কি ফাঁক আছে বলুন।

সবার কাছে আমাকে আপনার বন্ধু বলে পরিচয় দেবেন। আর আপনার ছেলে-বৌ যখন লোভী তখন তাদেরকে বলবেন, মেয়ের নানা মা-বাবা হারা নাতনিকে বিয়ের সময় অনেক সোনা তো দেবেনই, নাতজামাইকেও প্রচুর টাকা-পয়সা দেবেন এবং বিয়ের পর তাকে ফরেনে পড়তে পাঠাবেন এবং ফরেন থেকে ফিরে আসার পর একটা ক্লিনিক করে দেবেন।

ফাঁকটা আপনি ঠিকই ধরেছেন, কিন্তু পূরণ করার জন্য যা বললেন, তা হয় না। হিমু আমার বড় ছেলের ঘরের নাতি, আর রিজিয়া ছোট ছেলের ঘরের নাতনি। সোনা-দানা যাই দেন না কেন, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য ব্যাপারে যেসব কথা বললেন, তা মেনে নিতে পারি না। ওটা আমিই করব। রিজিয়ার প্রতি আপনারা যা কিছু এতদিন করেছেন, সেটা আমারই করা কর্তব্য ছিল। তাই আপনাদের কাছে আমি চিরঋণী। এখন যদি এতটুকু না করি, তা হলে সেই ঋণের বোঝা আরো ভারি হয়ে যাবে।

আরমান চৌধুরী বললেন, বেশ, আপনার কথা মেনে নিলাম। আপনার ছেলে কানাডা থেকে ফিরে আসুক, তারপর প্ল্যান মতো কাজ করবেন।

.

১০.

শিহাব আজ দু’দিন হল অসুস্থতার জন্য অফিসে যান নি। দশটার সময় ফাহিম অফিস থেকে ফোন করল।

ফোনের কাছ থেকে ফারিহা রুমে যাচ্ছিল। রিং বাজতে শুনে ফোন ধরে সালাম দিয়ে বলল, কে বলছেন?

ফাহিম সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আমি অফিসের ম্যানেজার। আপনি কে বলছেন?

ফারিহা ভাবল, বাবা যখন এই ম্যানেজারকে রিজিয়ার জন্য পছন্দ করেছিল তখন নিশ্চয় ছেলেটা ভালো। কতটা ভালো জানার জন্য তার সঙ্গে দুষ্টুমি করার খেয়াল চাপল। বলল, আমি কে জানতে চাচ্ছেন কেন? সাহেবকে চাইলেই তো ল্যাটা চুকে যেত।

তার কথা শুনে ফাহিমের মনে হল মেয়েটা ফাজিল। বলল, আপনি তো আচ্ছা মেয়ে, কে ফোন রিসিভ করল জানতে চাওয়া বুঝি অন্যায়?

আপনিও তো আচ্ছা ছেলে, মেয়েদের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়, সেই ভদ্রজ্ঞানটাও নেই আপনার!

ফাহিম খুব বিরক্ত হল। বলল, আপনার পরিচয় জানতে চেয়ে ভুল করেছি, মাফ করে দিন।

হাতের কাছে গজ ফিতে নেই, মাপ করব কি করে?

ফাহিম চিন্তা করল, মেয়েটার মাথার স্কু ঢিলে নাকি? মোলায়েম স্বরে বলল, প্লিজ, সাহেবকে একটু দিন না, জরুরি কথা আছে।

হ্যাঁ, এতক্ষণে ভদ্রলোকের মতো সরি, ভদ্রলোকের ছেলের মতো কথা বললেন। একটু অপেক্ষা করুন দিচ্ছি।

ফাহিম বুঝতে পারল মেয়েটি সাহেবের।

ফারিহা সেটটা নিয়ে বাবার ঘরে গিয়ে বলল, তোমার অফিসের ম্যানেজার ফোন করেছেন।

শিহাব ফোন ধরে বলল, কি খবর ফাহিম?

ফাহিম সালাম বিনিময় করে বলল, আপনি কেমন আছেন? আজও কি অফিসে আসবেন না?

না, অফিসে যেতে পারব না। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, এনি প্রবলেম?

না মানে, স্টাফদের আজ বেতনের দিন। তাই একাউন্টেন্ট বলছিলেন

তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে শিহাব বললেন, তাই তো, আমার সে কথা একদম মনে নেই। তুমি একটা স্কুটার নিয়ে চলে এস। আমি চেক সই করে দেব। তারপর লাইন কেটে দিয়ে মেয়েকে বললেন, এটা নিয়ে যা। আর শোন, কিছুক্ষণের মধ্যে ম্যানেজার আসবে। তুই দারোয়ানকে ম্যানেজারের আসার কথা বলে গেটের দিকে লক্ষ্য রাখবি। ম্যানেজার এলে আমার কাছে নিয়ে আসবি।

ফারিহা অবাক হয়ে বলল, তোমার বেডরুমে কেন? ড্রইংরুমে বসালেই তো হয়?

শিহাব মৃদু হেসে বললেন, আগের ম্যানেজার হলে ড্রইংরুমেই বসাতে বলতাম। কিন্তু ফাহিমকে বসানো যাবে না।

তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। কত সম্মানীয় মেহমানকে ড্রইংরুমে বসান গেলে ওঁনাকে বসানো যাবে না কেন?

শিহাব মেয়ের কথায় বিরক্ত হলেন। কিন্তু তা প্রকাশ না করে বললেন, তুই তো খুব বাকপটু হয়ে উঠেছিস?

কোনো কিছু জানতে চাওয়া কি বাকপটুতা?

না তা নয়। তবে কি জানিস মা, বাবা অথবা মুরুব্বিদের কেউ কোনো হুকুম করলে তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করতে নেই। করলে বেয়াদবি করা হয়। আর বেয়াদবকে যেমন কেউ দেখতে পারে না, তেমনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) বেয়াদবকে পছন্দ করেন না। ফাহিমের ব্যাপারে এতটুকু জেনে রাখ, সে আমার শুধু প্রিয় নয়, ডান হাতও। এবার যা, যা বললাম কর।

ফারিহা সেটটা আগের জায়গায় রেখে দারোয়ানকে ম্যানেজারের আসার কথা জানাল। তারপর গেটের দিকের বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে চিন্তা করল, বাবার একজন প্রিয় ছেলের সঙ্গে দুষ্টুমি করা উচিত হয় নি। এলে মাফ চেয়ে নিতে হবে। আরো চিন্তা করল, ওঁর মধ্যে নিশ্চয় এমন কোনো গুণ আছে, যে জন্যে বাবার শুধু প্রিয় নয়, ডান হাতও। রিজিয়ার সঙ্গে বিয়ে হলে বাবা বোধহয় খুব খুশি হত। মা বলল, ছেলেটা দেখতে খুব সুন্দর। ছেলেটার মা-বাবা ভাইবোন আছে কি না কে জানে। হঠাৎ তার মন বলে উঠল, রিজিয়ার সঙ্গে বিয়ে হলে যদি তোর বাবা খুশি হতেন, তোর সঙ্গে বিয়ে হলে তোর বাবা আরো বেশি খুশি হবে। মনের কথা শুনে ফারিহা এত গভীরভাবে চিন্তা করছিল যে, বাস্তবজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। পুরুষ কণ্ঠের সালাম শুনে চমকে উঠে বাস্তবে ফিরে দেখল, একটা সুদর্শন যুবক তার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবল, ইনি ম্যানেজার নয়তো? কথাটা মনে হতে লজ্জায় তার মুখটা লাল হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি গায়ে-মাথায় ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে বলল, আপনি?

আমি ফাহিম। সাহেব আমাকে আসতে বলেছেন। তারপর বলল, আমি কিন্তু আপনাকে সালাম দিয়েছি।

আরো লজ্জা পেয়ে ফারিহা মুখ নিচু করে সালামের উত্তর দিয়ে বলল, সরি, একটু অন্যমনস্ক ছিলাম, তাই শুনতে পাই নি।

আপনার পরিচয় দিলেন না তো?

সাহেবের মেয়ে বলতে গিয়ে সামলে নিয়ে বলল, আমি ফারিহা। আসুন আমার সঙ্গে। তারপর তাকে বাবার রুমে নিয়ে এসে বলল, বাবা, ম্যানেজার সাহেব এসেছেন।

ফাহিম ভেতরে ঢুকে সালাম দিল।

শিহাব সালামের উত্তর দিয়ে সোফায় বসতে বলে বললেন, ডাক্তার কয়েকদিন অফিসে যেতে নিষেধ করেছেন। তবে তোমার কোনো চিন্তা নেই। যখনই প্রয়োজন মনে করবে চলে আসবে।

ফারিহা চেকবই বের করে দাঁড়িয়েছিল। শিহাব তার হাত থেকে নেয়ার সময় ফাহিমকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার বড় মেয়ে ফারিহা, পরিচয় হয়েছে?

ফাহিম বলল, জি হয়েছে।

শিহাব চেক কেটে ফাহিমের হাতে দিয়ে বইটা ফারিহাকে দিয়ে ব্রিফকেসে রাখতে বললেন।

ফারিহা চেকবই ব্রিফকেসে রেখে বেরিয়ে এসে ফাহিমের কাছে ক্ষমা চাইবে বলে বারান্দায় অপেক্ষা করতে লাগল।

ফাহিম চেকটা পকেটে রেখে বলল, এবার তা হলে আসি স্যার?

শিহাব বললেন, যাবে তো নিশ্চয়, আর একটু বস। একটা কথা বলব। তোমাকে আর ভাড়া বাসা খুঁজতে হবে না। শান্তিনগরে আমার একটা বাড়ি আছে। সামনের মাসে দোতলার ভাড়াটিয়া চলে যাবেন। তুমি মাকে নিয়ে ঐ ফ্লাটে থাকবে। কোম্পানি তোমার বাসা ভাড়া বহন করবে।

ফাহিম মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলল, জি আচ্ছা। এবার অনুমতি দেন।

ঠিক আছে এস, বলে শিহাব মেয়ের নাম ধরে ডেকে বললেন, কোথায় গেলি রে মা, ফাহিমকে এক কাপ চাও দিলি না?

ফাহিম বলল, আমি খুব কম চা খাই। অফিস থেকে বেরোবার আগে খেয়েছি। এখন আর খাব না।

বারান্দা থেকে ফারিহা তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিল। বাবা ডাকতে ততক্ষণে দরজার কাছে চলে এসেছে।

তাকে দেখে শিহাব বললেন, ফাহিম চা খাবে না বলছে। ফ্রিজ থেকে কোক দে। তারপর ফাহিমকে বললেন, তুমি ওর সঙ্গে যাও, কোক খেয়ে তারপর যাবে।

ফারিহা তাকে নিয়ে ড্রইংরুমে এসে বসতে বলে ভেতরে চলে গেল। একটু পরে এক গ্লাস কোক এনে তার হাতে দেয়ার সময় বলল, আপনি ফোন করেছিলেন জানতাম না। ফোনে আপনার সঙ্গে অবাঞ্ছিত ব্যবহার করে ফেলেছি। সেজন্য অত্যন্ত দুঃখিত। দয়া করে মাফ করে দিন।

ফাহিম বিসমিল্লাহ বলে গ্লাসে দু’তিনটে চুমুক দিয়ে মৃদু হেসে বলল, আমি আপনার বাবার অফিসের একজন কর্মচারী। সাহেবের ছেলে-মেয়েদের অনেক কিছু যে সহ্য করতে হয় তা জানি, তাই কিছু মনে করি নি।

আমি ওসব কথা শুনব না, বলুন মাফ করে দিয়েছেন?

ফাহিম আবার মৃদু হেসে বলল, তা হলে তো আপনার কথাটাই বলতে হয়, কাছাকাছি গজ ফিতে নেই, মাপ করব কি করে?

ফারিহা না হেসে পারল না। হাসতে হাসতে বলল, আপনি তো দারুণ ছেলে?

ফাহিম বলল, আমার তো মনে হচ্ছে, আপনি আমার থেকে আরো দারুণ।

প্রমাণ করুন।

পর্দানশীন হয়েও প্রথম আলাপের সময় যে মেয়ে এত ফ্রি, তিনি দারুণ নয় তো কি?

ফারিহা হাসি মুখেই বলল, তা হলে মাফ করছেন না কেন?

আপনার পুরো নাম অথবা আসল নাম বললে মাফ করতে পারি।

আমি দারুণ মেয়ে হলে আপনি দারুণ চালাক ছেলে।

কি জানি, হয়তো আপনার কথা ঠিক বলে ফাহিম খালি গ্লাস টেবিলের উপর রেখে দাঁড়িয়ে উঠে বলল, অনেক দেরি হয়ে গেল, এবার আসি।

ফারিহাও দাঁড়িয়ে উঠে বলল, মাফ করেছেন কি না বলবেন না?

বললাম না, পুরো অথবা আসল নাম…

তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে ফারিহা বলল, পুরো অথবা আসল নাম ফারিহা শাহানা।

নামের অর্থ জানেন?

জি, সুখী শাহজাদী। আপনার পুরো নাম অথবা আসল নাম বলুন।

ফাহিম মৃদু হেসে বলল, আমার পুরো অথবা আসল নাম ফাহিম শাহরিয়ার। অর্থ হল বুদ্ধিমান বাদশাহ।

ফারিহা শুধু হেসে উঠল, কোনো কথা বলল না।

হাসলেন কেন?

আমার পুরো নাম ও অর্থ শুনে আপনি যে কারণে হেসেছিলেন, ঐ একই কারণে আপনার পুরো নাম ও অর্থ শুনে হাসলাম। এবার আসুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে বললেন না!

ফাহিম সালাম বিনিময় করে চলে গেল।

ফাহিমের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর শিহাব স্ত্রীকে তার আসার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, ফারিহার সঙ্গে পরিচয় করবার জন্য ওকে নিয়ে আসব আসব করেও মনে থাকে না বলে আনা হয় নি। আজ যখন আসছে তখন পরিচয় করিয়ে দিতে হবে এবং ওরা যাতে নিরিবিলি আলাপ করতে পারে সে ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে। কারণটা তো তুমি জান।

আরিফা বেগম বললেন, বেশ তো কি করতে হবে বল?

যা করার আমি করব। তুমি শুধু রিজিয়াকে কাজের অজুহাতে নিজের কাছে রাখবে।

ঠিক আছে, তাই হবে।

ফাহিম যখন ফোন করে রিজিয়া তখন বাথরুমে গোসল করছিল। তাই তার আসার কথা জানতে পারে নি।

গোসল করার পর স্বামীর কথামতো আরিফা বেগম তাকে রান্নাঘরে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, আমার হাত দুটো ব্যথা করছে। ওষুধ খেয়েও কমে নি। তুই আজ রান্না কর, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।

রান্নার কাজ শেষ করতে অনেক সময় লাগল। তাই রিজিয়া ফাহিমের আসার কথা যেমন জানতে পারে নি, তেমনি ফাহিমও ফারিহার আলাপের কথাও জানতে পারল না। তবে তখনও ওদের আলাপ চলছিল।

রান্নার কাজ শেষ করে রুমে এসে ফারিহাকে দেখতে না পেয়ে মামিকে জিজ্ঞেস করল, ফারিহা কোথাও গেছে নাকি?

আরিফা বেগম বললেন, না যাই নি। অফিসের ম্যানেজার তোর মামার কাছে এসেছিল। তার সঙ্গে ড্রইংরুমে কথা বলছে। তুই যেন আবার ওখানে যাস না।

রিজিয়া মামির চোখে-মুখে খুশির আমেজ দেখতে পেল। সেই সাথে ড্রইংরুমে যাওয়ার নিষেধের মধ্যে কিছু যেন ইঙ্গিত রয়েছে বুঝতে পারল। হঠাৎ তার মনে হল, তা হলে কি ম্যানেজারকে ফারিহার জন্য সিলেক্ট করেছেন। ম্যানেজারকে দেখার ইচ্ছা দমন করতে পারল না। দরজার আড়াল থেকে দেখলে মামিমা দেখে ফেলতে পারেন ভেবে বারান্দার জানালার কাছে গিয়ে পর্দা অল্প একটু ফাঁক করে ফাহিমকে দেখে ভাবল, মামা এই ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে দেয়ার জন্য পছন্দ করেছিলেন। তারপর এতক্ষণ তাদের আলাপ শুনছিল। ফাহিম চলে যাওয়ার পর ভেতরে ঢুকে না জানার ভান করে জিজ্ঞেস করল, কে রে ছেলেটা? দেখতে শাহজাদার মতো।

তার কথা শুনে ফারিহা অবাক হলেও তা প্রকাশ না করে বলল, বাবার অফিসের ম্যানেজার। বাবা ইনাকেই তোর জন্য পছন্দ করেছিল। সত্যি, ছেলেটা খুব সুন্দর।

রিজিয়া হেসে উঠে বলল, শুধু কি সুন্দর? দারুণ হ্যাঁন্ডসাম ও দারুণ বুদ্ধিমান।

ফারিহা এবার অবাক হয়ে বলল, তুই এসব জানলি কি করে?

কারো চোখ-মুখ দেখলেই বোঝা যায় বোকা না বুদ্ধিমান। আর কথাবার্তা শুনলে জানা যায়, শুধু বুদ্ধিমান না দারুণ বুদ্ধিমান। তোর সঙ্গে মিলবে ভালো। তুই সুন্দরী, উনিও সুন্দর, তুই যেমন বুদ্ধিমতী, উনিও তেমনি বুদ্ধিমান, তুই সুখী শাহজাদী, উনি বুদ্ধিমান বাদশাহ। ওনাকে যদি তোর পছন্দ হয় বল, মামা-মামিকে শুভস্য শীঘ্রম করতে বলব।

তুই তা হলে আড়াল থেকে সব কিছু শুনেছিস।

শুধু শুনেছি নয়, তোদের কথা বলার এ্যাকটিংও দেখেছি।

তারপর রিজিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, সত্যি বলছি, তোদের দু’জনকে যা মানাবে না…

তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে তার পিঠে কয়েকটা আদরের কিল মেরে বলল, এসব আজেবাজে কথা বলছিস কেন?

এটা আজেবাজে কথা হল বুঝি? কিল মারিস আর যাই করিস তোর চোখ-মুখ দেখে ও কথা শুনেই বুঝতে পারছি ম্যানেজারকে তোর পছন্দ হয়েছে। তুই আমার জন্য তোর মা-বাবার কাছে ওকালতি করেছিস। এবার আমি তোর জন্য মামা-মামির কাছে ওকালতি করব। দেখিস, যেমন করে হোক ওনাদের রাজি করাবই ইনশাআল্লাহ।

তুই জড়িয়ে রয়েছিস কেন? ছেড়ে দে, গোসল করব। তুই তো আগেই গোসল করে ফেলেছিস।

রিজিয়া ছেড়ে দিয়ে বলল, পছন্দ হয়েছে কি না বললি না যে?

ফারিহা বলল, আজই প্রথম দেখলাম ও আলাপ করলাম, এখনই কিছু বলা যাবে না বলে সেখান থেকে চলে গেল।

অনুমানটা ঠিক কিনা জানার জন্য রিজিয়া মামিমার কাছে গিয়ে বলল, একটা কথা বলব কিছু মনে করবেন না বলুন?

আরিফা বেগম বললেন, ওমা, মেয়ের কথা শোন, তোর কথায় কিছু মনে করতে যাব কেন? বল কি বলবি?

আপনি ড্রইংরুমে যেতে নিষেধ করেছিলেন বলে আড়াল থেকে ম্যানেজারকে দেখেছি। খুব সুন্দর ছেলে, বলে লজ্জায় মুখ নিচু করে নিল।

আরিফা বেগম মৃদু হেসে বললেন, হ্যাঁ, খুব সুন্দর ছেলে। তোর মামা ছেলেটার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাই তোর জন্য পছন্দ করেছিল। আর কিছু বলবি?

রিজিয়া সাহস করে বলে ফেলল, এখন ফারিহার জন্য পছন্দ করলে হয় না মামিমা?

আরিফা বেগম তার কথা শুনে অবাক হলেও খুশি হলেন। পছন্দ করলে তুই খুশি হবি?

রিজিয়া মামিমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, এত খুশি হব, যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।

আরিফা বেগম তার দু’গালে চুমো খেয়ে বললেন, তোর ও হিমুর ব্যাপারটা জানার পর আমি ও তোর মামা ম্যানেজারকে ফারিহার জন্য সিলেক্ট করেছি। তাদের বিয়ের পরপরই ওদের বিয়ে দেব।

আনন্দে টগবগিয়ে উঠে রিজিয়া আবার মামিমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, সত্যি বলছেন মামিমা?

আরিফা বেগম হাসতে হাসতে বললেন, হ্যাঁরে সত্যি।তারপর বললেন, মেয়ের কাণ্ড দেখ, ছাড় ছাড়, তোর মামাকে খেতে দেব।

রিজিয়া মামিমাকে ছেড়ে দিয়ে ছুটে রুমে এসে দেখল, ফারিহা নেই। বুঝতে পারল, গোসল করতে গেছে। হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। বারান্দা থেকে ফোনের সেটটা নিয়ে এসে হিমুকে ফোন করল।

হিমু রুমেই ছিল। ফোন ধরে সালাম দিয়ে বলল, কে বলছেন?

রিজিয়া সালামের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করল, চিনতে পারছ, না নাম বলতে হবে?

কি ব্যাপার? এ সময়ে ফোন করলে যে?

একটা দারুণ খবর আছে।

দারুণ খবরের পালা তো শেষ। আর তো থাকার কথা না?

আমাদের শেষ হলেও ফারিহার বাকি আছে না?

ও হ্যাঁ, তাই তো। ফারিহা কি কারো প্রেমে পড়েছে?

রিজিয়া হেসে উঠে বলল, ঠিক প্রেমে পড়ে নি, পছন্দ করেছে। শুধু তাই নয়, মামা-মামি ঐ ছেলেটাকে সিলেক্ট করে ফেলেছেন এবং আমাদের বিয়ের পরপরই ওদেরও বিয়ে দেবেন।

খবরটা তুমি কার কাছে শুনেছ?

মামিমার কাছে।

তা ছেলেটাকে চেন নাকি?

হ্যাঁ, মামার অফিসের ম্যানেজার। আমার জন্য যাকে মামা পছন্দ করেছিলেন।

তাই নাকি? তা হলে তো খবরটা সত্যিই দারুণ। আচ্ছা সিলেক্টের ব্যাপারটা কি ফারিহা জানে?

না। এমনকি আমি যে জানি, তাও ফারিহা জানে না। তাই তো জানার পরপরই তোমাকে ফোন করলাম। শোন, তুমি তো ফারিহাকে খুব মূল্যবান কিছু দেবে বলেছিলে, এই দারুণ খবরটা তাকে দিলে কেমন হয়?

খুব ভালো কথা বলেছ। কি বলে যে তোমাকে ধন্যবাদ দেব?

থাক, ধন্যবাদ দিতে হবে না, তোমার সাক্ষাৎ পেলেই ধন্য হয়ে যাব।

সাক্ষাৎ তো প্রায় রোজই হচ্ছে।

 যাতে ভুলে না যাও, তাই রিমাইন্ড দিলাম।

ঠিক আছে, ভুলব না, এবার রাখি, সাক্ষাতে কথা হবে বলে হিমু সালাম বিনিময় করে লাইন কেটে দিল।

.

১১.

রাগিব হাসান কানাডা থেকে ফিরে আসার পর জাহিদ হাসান একদিন ছেলে ও বৌমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হিমুর ব্যাপারে কি চিন্তা-ভাবনা করলে?

রাগিব হাসান বললেন, ওকে ফরেনে পাঠাতে চাই। কিন্তু ও তো রাজি হচ্ছে না। বলছে চেম্বার করে দাও প্র্যাকটিস করব।

ফরেনের ডিগ্রি না থাকলে আজকাল সাধারণ মানুষরাও শুধু। এম.বি.বি.এস. ডাক্তারের কোনো দাম দেয় না। ওকে সে কথা বল নি?

বলেছি। শুনে বলল, আমি টাকা রোজগার করার জন্য ডাক্তার হই নি। সাধারণ ও গরিব মানুষেরা যাতে সহজে ও অল্প খরচে চিকিৎসা করতে পারে, সেজন্য ডাক্তার হয়েছি।

ওর উদ্দেশ্য মহৎ। তাই বলে উচ্চ ডিগ্রি নিতে ফরেনে যাবে না এটা ঠিক বলে নি। ঠিক আছে, আমি ওকে বোঝাব। আর শোন, আমি ওর জন্য ধনী ও সম্ভ্রান্ত ঘরের খুব ভালো একটা মেয়েকে অনেক দিন থেকে পছন্দ করে রেখেছি। মেয়েটি এ বছর ডিগ্রি পরীক্ষা দেবে। মা-বাবা নেই। নানা-নানি মানুষ করেছে। মেয়ের নানা, আমার বন্ধু। মেয়ে দেখতে খুব সুন্দরী বলে অনেক সম্বন্ধ আসছে। সে কথা জানিয়ে আমাকে খবর দিয়েছিল। আমি একদিন গিয়ে বলেছি, হিমু ফরেন থেকে উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে আসুক, আর আপনার নাতনি ততদিন মাস্টার্স কমপ্লিট করুক। উনি রাজি হলেন না। বললেন, আজকাল সমাজের অবস্থা ভালো না। বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে ছেলে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে মেয়ের মুখে এসিড মারে। মেয়েকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে। তাই এ বছরই আমি নাতনির বিয়ে দিতে চাই। আরো বললেন, বিয়ের পর নাতজামাইকে ফরেনে পাঠাবেন। বিয়ের সময় প্রচুর সোনা-দানা দেবেন এবং ফরেন থেকে ফিরে আসার পর চেম্বার নয়, একটা ক্লিনিকও করে দেবেন। এখন তোমরা কি বল?

রাগিব হাসান ও সাবিহা বেগম তাদের ইচ্ছার কথা বলতে না পেরে চুপ করে রইলেন।

জাহিদ হাসান ছেলে ও বৌমার ইচ্ছার কথা হিমুর কাছে শুনেছেন। তবু বললেন, তোমরা কিছু বলছ না কেন?

স্বামী বলার আগে সাবিহা বেগম বললেন, আপনার ছেলে বন্ধুকে কথা দিয়েছেন, তার একমাত্র মেয়েকে এ বাড়ির বৌ করে আনবেন।

হিমু কি সেই মেয়েকে দেখেছে?

জি।

সে কি রাজি আছে?

হা-না কিছু বলতে না পেরে সাবিহা বেগম চুপ করে রইলেন।

কি হল? রাজি আছে কি না বলছ না কেন?

ধনী লোকের একমাত্র সন্তান বলে মেয়েটি একটু আধুনিকা ও আদুরে। তাই হিমু একটু অমত করেছে। আমি বলেছি, মেয়েরা বাবার বাড়িতে যাই থাকুক না কেন, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে বদলে যায়। এ কথা শুনে হিমু কি বলল?

ঠিক রাজি হয় নি। তবে আমি তাকে বুঝিয়ে রাজি করাব। আপনিও একটু বোঝাবেন।

স্ত্রী থেমে যেতে রাগিব হাসান বললেন, হ্যাঁ বাবা, আপনি বোঝালে হিমু করতে পারবে না।

জাহিদ হাসান বললেন, যেদিন তোমরা ওকে মেয়ে দেখাবার জন্য বন্ধুর বাসায় নিয়ে গিয়েছিলে তার পরের দিন কথাটা আমাকে জানিয়ে বলেছে, মেয়েটি দেখতে ভালো হলে কি হবে, ভীষণ আল্টা মডার্ন। অশ্লীল পোশাক পরে। তার অনেক বয়ফ্রেন্ড। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করে। লজ্জা-শরমের বালাই নেই। মা-বাবা যতই বলুক, আমি ঐ মেয়েকে কিছুতেই বিয়ে করব না।

রাগিব হাসান ছেলের ওপর খুব রেগে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে রাগ সামলে নিয়ে বললেন, আজকাল হাই সোসাইটির ছেলেমেয়েদের অনেক গার্লফ্রেন্ড ও বয়ফ্রেন্ড থাকে। আর আজকাল কটা ছেলেমেয়ে শালীনতা বজায় রেখে পোশাক পরে? তারা এটাকে সভ্য যুগের ফ্যাশন মনে করে। আসলে ওতো কোনো এক পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরের এতিম মেয়েকে পছন্দ করে। সেইজন্যে অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছে না।

সে কথা আমাকেও বলেছে। তবে সে মেয়ের খোঁজ আজও পাই নি। কিছুদিন আগে নাকি আড়ং-এ সেই মেয়েকে দেখেছিল, কিন্তু আলাপ করার আগেই সঙ্গের মেয়েটির সঙ্গে গাড়িতে উঠে চলে যায়। হিমু গাড়ির নাম্বার মনে রাখে। তারপর বাসায় এসে আমাকে মেয়েটির সব কথা বলে গাড়ির নাম্বার একটা কাগজে লিখে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কিভাবে এই নাম্বারের গাড়ির মালিকের ঠিাকানা পাব। আমি নাম্বার দেখে বললাম, এটা তো আমার বন্ধুর গাড়ির নাম্বার। তার তো দু’টো নাতনি। একটা মেয়ের ঘরের অন্যটা ছেলের ঘরের। হিমু বিশ্বাস করল না। একদিন তাকে নিয়ে বন্ধুর বাসায় গিয়ে দু’জনকেই দেখালাম। হিমু যে মেয়েটির কথা বলল, সে হল বন্ধুর মেয়ের ঘরের নাতনি। তার নাম সুলতানা। ফেরার পথে আমার ইচ্ছার কথা জানিয়ে বললাম, পাড়াগাঁয়ের যে মেয়েকে তুমি পছন্দ কর, এতদিনে তার হয়তো বিয়ে-শাদি হয়ে ছেলেমেয়ে হয়ে গেছে। সুলতানা যখন তার মতো দেখতে ওকেই বিয়ে কর। তারপর বাসায় এসে অনেক বুঝিয়ে রাজি করিয়েছি। এখন তোমাদের মতামত পেলে তাড়াতাড়ি ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করব। দেরি করলে হিমুর মত পাল্টে যেতে পারে। তারপর সাবিহা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বৌমা, তুমিও তো সেদিন আড়ং-এ মেয়েটাকে দেখেছ?

সাবিহা বেগম মেয়ের নানার লেনদেনের কথা শুনে সুলতানাকেই বৌ করতে রাজি হয়ে গেলেন। আনন্দিত স্বরে বললেন, জি বাবা দেখেছি। আমিও সেদিন হিমুকে বলেছিলাম, অনেক সময় একই রকমের ছেলে বা মেয়ে দেখতে পাওয়া যায়। এখন হিমু যদি আপনার বন্ধুর নাতনিকে বিয়ে করতে রাজি হয়, তা হলে আমাদের আপত্তি করার কিছু নেই। তারপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি বল?

রাগিব হাসান স্ত্রীর কথা শুনে রেগে গেলেন। রাগের সঙ্গে বললেন, ওর বিয়ের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। বাবা ও তুমি যা করার কর। আমাকে একটু বেরোতে হবে বলে সেখান থেকে চলে গেলেন।

.

আজ হিমুর বিয়ে। মেয়ে দেখা ও বিয়ের কথাবার্তার মধ্যে কোনো গোলমাল হল না। কিন্তু বিয়ের সময় কাজী সাহেব মেয়ের ও মেয়ের বাবার নাম-ঠিকানা জানতে চাইলে আরমান চৌধুরী যখন মেয়ের নাম সুলতানা রিজিয়া, বাবার নাম মরহুম রাকিব হাসান ও জাহিদ হাসানের বাসার ঠিকানা বলে জাহিদ হাসানকে বললেন, দেনমোহর বাবদ আপনার বাড়ির অর্ধেক অংশ আমার নাতনির নামে করে দেয়ার দলিলটা দেন এবং জাহিদ হাসান দলিলটা দিলেন তখন রাগিব হাসান যতটা না অবাক হলেন তার চেয়ে অনেক বেশি রেগে গেলেন। রাগের সঙ্গে জাহিদ হাসানের দিকে তাকিয়ে বললেন, এসব কি শুনছি ও দেখছি বাবা?

জাহিদ হাসান বললেন, যা শুনছ ও দেখছ সব সত্য। এই সুলতানা রিজিয়াই তোমার ছোট ভাই রাকিব হাসানের সন্তান। দৈবচক্রে বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে একেই দেখে হিমু পছন্দ করে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। অবশ্য তখন সে জানত না রিজিয়া তার ছোট চাচার মেয়ে। পরে তার বংশ পরিচয় খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারে। যখন দু’বছরের রিজিয়াকে তার নানা ও রাকিব হাসানের বন্ধু শিহাব আমাদের কাছে দিতে এসেছিল তখন আমরা আভিজাত্যের অহঙ্কারে এতই অন্ধ ছিলাম যে, তাদের কথা সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ আমাদের অহঙ্কার চূর্ণ করে সেই রিজিয়াকে সুলতানা করে অর্থাৎ সম্রাজ্ঞী করে আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থার করেছেন। তারপর শিহাবকে ডেকে আনার জন্য একজনকে বললেন। শিহাব আসার পর আবার ছেলেকে বললেন, দেখো তো একে চিনতে পার কি না?

শিহাব বন্ধু হিসাবে অনেকবার রাকিবদের বাসায় গেছেন। সেই সময় তাকে রাগিব হাসান দেখেছেন। তাই দাড়ি ও টুপিওয়ালা শিহাবকে চিনতে পারলেন। বললেন, হ্যাঁ চিনতে পারছি।

জাহিদ হাসান বললেন, আমরা আমাদের বংশের সন্তানকে ফিরিয়ে দিলেও এই শিহাবই বন্ধুর সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করেছে। আবার এত টাকা-পয়সা খরচ করে বিয়েও দিচ্ছে। আর তুমি অর্থের লোভে বন্ধুর গোল্লায় যাওয়া মেয়েকে ঘরের বৌ করতে চেয়েছিলে?

রাগিব হাসান নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায় ও অপমানে মুখ নিচু করে নিলেন।

তাই দেখে শিহাব বললেন, চাচাজান, সবার সামনে ভাইয়াকে এসব কথা বলা ঠিক হয় নি আপনার। বাসায় গিয়ে বলতে পারতেন।

জাহিদ হাসান চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, তা আমিও জানি। তবু কেন বললাম, তা যাদের বোঝার ক্ষমতা আছে তারা বুঝতে পেরেছেন। আর যারা বুঝতে পারেন নি, তাদেরকে শুধু এতটুকু বলছি, আমারও তখন আভিজাত্যের অহঙ্কার ছিল। আর অহঙ্কার খুব শক্ত গুনাহ। যার অহঙ্কার থাকবে, একদিন না একদিন আল্লাহ তার অহঙ্কার চূর্ণ করে দেবেন। যেমন আজ আমাদের চূর্ণ করে দিলেন। তারপর রাগিব হাসানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি আগেই শিহাবের কাছে মাফ চেয়ে নিয়েছি। রিজিয়ার নানা বেঁচে থাকলে তার কাছেও মাফ চেয়ে নিতাম। তুমিও শিহাবের কাছে মাফ চেয়ে নাও।

রাগিব হাসান অনুতপ্ত হয়ে এতক্ষণ মুখ নিচু করে চোখের পানি ফেলছিলেন। বাবার কথা শুনে শিহাবকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমাকে মাফ করে দে ভাই।

শিহাব বললেন, আপনি আমার বড় ভাই। ছোট ভাইয়ের কাছে মাফ চেয়ে নিজেকে ছোট করবেন না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাফ করুন। তিনি আজ আমাদের সবাইকে যে এই শুভ মজলিশে মিলিত করিয়েছেন এবং আমাদের ভুল ভাঙ্গিয়ে দিয়েছেন, সেজন্য তার পাক দরবারে জানাচ্ছি শতকোটি শুকরিয়া। আর তার পেয়ারা হাবিব (সঃ)-এর ওপর হাজার হাজার দরুদ ও সালাম পেশ করছি।

জাহিদ হাসান কাজি সাহেবকে বললেন, এবার বিয়ে পড়িয়ে দিন।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *