৭-৮. ফারিহা ও রিজিয়া খেয়ে এসে

০৭.

রাত এগারটা, ফারিহা ও রিজিয়া খেয়ে এসে আবার পড়তে বসেছে। ছোট বোন সাজিদা এসে ফারিহাকে বলল, তোমাকে মা ডাকছে।

মা ডাকছে শুনে ভয়ে ফারিহার বুক ঢিব ঢিব করতে লাগল। ভাবল, বাবা এখন ঘরে, তার সামনে যদি হিমু ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করে, তা হলে কি করবে? সাজিদাকে জিজ্ঞেস করল, বাবা কোথায় রে?

সাজিদা বলল, বাবা টি.ভি. রুমে খবর শুনছে।

ফারিহা স্বস্তি পেয়ে মায়ের কাছে এসে বলল, কেন ডেকেছ তাড়াতাড়ি বল। এখনো এক সাবজেক্টের পড়া তৈরি করতে বাকি আছে।

আরিফা বেগম বললেন, রিজিয়ার ব্যাপারটা তোর বাবাকে বলেছি। শুনে খুব অবাক হলেও রাগারাগি করে নি। শোন, রিজিয়াকে বলিস, হিমুকে যেন একদিন বাসায় নিয়ে আসে।

ফারিহা মাকে জড়িয়ে ধরে উফুল্ল কণ্ঠে বলল, সত্যি বলছ মা, হিমু ভাইকে বাসায় নিয়ে আসার কথা বলব?

হ্যাঁ রে সত্যি। তোর বাবাই কথাটা বলেছে।

আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে ফারিহা বলল, আমার এত খুশি লাগছে না মা, যা তোমাকে বোঝাতে পারব না।

আরিফা মেয়েকে পাশে বসিয়ে বললেন, তোর এত খুশি লাগছে কেন? খুশি তো লাগবে রিজিয়ার।

ফারিহা বলল, রিজিয়া কত দুঃখী, তা তো তুমি জান। দুঃখী মেয়ের সুখের কথা শুনে কে না খুশি হয়! তোমার খুশি লাগছে না?

পাগলী মেয়ের কথা শোন, তোর চেয়ে আমার বেশি খুশি লাগছে। এবার পড়তে যা।

যখন সাজিদা এসে ফারিহাকে বলল ডাকছে তখন রিজিয়াও ভয় পেয়েছে। ভেবেছে, আমার ও হিমুর সম্পর্কের কথা শুনে মামা হয়তো খুব রেগে গেছেন। তাই সাবধান করার জন্য মামিমা ফারিহাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এইসব ভেবে মন খারাপ হয়ে যেতে পড়া বন্ধ করে এতক্ষণ ফারিহার ফেরার অপেক্ষা করছিল। তাকে হাসি হাসি মুখে ফিরে আসতে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেয়ে জিজ্ঞেস করল, মামিমা কেন ডেকেছিল রে?

ফারিহা দুষ্টুমি করে বলল, বলব না।

 কেন বলবি না?

সেটা আমার ইচ্ছা।

প্লিজ বল না, মামিমা কেন ডেকেছিলেন?

বললাম তো বলব না, তবু জিজ্ঞেস করছিস কেন?

বলবি না, দাঁড়া মজা দেখাচ্ছি বলে রিজিয়া ড্রয়ার খুলে একটা তেলাপোকা ধরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

ফারিহা তার হাতে তেলাপোকা দেখে কাতরে উঠে বলল, বস বস বলছি। দয়া করে ওটাকে বাইরে ফেলে দিয়ে আয়। সে তেলাপোকাকে ভীষণ ভয় পায়। ঘরে যদি একটা তেলাপোকা উড়তে দেখে, তা হলে বিছানার চাদর তুলে পা থেকে মাথা পর্যন্ত চাপা দিয়ে রিজিয়াকে বলবে, প্লিজ ওটাকে মেরে বাইরে ফেলে দিয়ে আয়। রিজিয়ার ড্রয়ারে তেলাপোকা থাকে বলে তার টেবিলের কাছে যায় না।

রিজিয়া তেলাপোকটা বাইরে ফেলে দিয়ে এসে বলল, এবার বল।

মা যা কিছু বলেছিল সেসব বলে ফারিহা জিজ্ঞেস করল, কবে তা হলে হিমু ভাইকে আসতে বলবি?

রিজিয়াও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলল, তুই বল না, কবে আসতে বলব?

এখনই ফোন করে হিমু ভাইকে জিজ্ঞেস কর, তিনি কবে আসতে পারবেন।

ঠিক বলেছিস। যা ফোনের সেটটা নিয়ে আয়।

তুই নিয়ে আসতে পারিস না, আমাকে বলছিস কেন? কথাটা ফারিহা বললেও বারান্দা থেকে সেটটা এনে বলল, নাম্বার বল।

দু’বার রিং হওয়ার পর একটা বয়স্ক মহিলার ভারি গলা শুনতে পেল, হ্যালো, কে বলছেন?

ফারিহা মাউথ পিসে হাত চাপা দিয়ে রিজিয়াকে বলল, এক মহিলা ফোন ধরেছেন। মনে হয় হিমু ভাইয়ের মা। কি বলব বল দেখি?

রিজিয়াও বলল, যা হোক কিছু বলে হিমুকে ফোনটা দিতে বল।

ফারিহা মাউথপিস থেকে হাত সরিয়ে বলল, ডা. হিমু আছেন? আমি ওনার বন্ধুর বোন। উনি আমার চিকিৎসা করছেন।

হিমুর মা সাবিহা বেগম ফোন ধরেছিলেন। বললেন, ধরুন হিমুকে দিচ্ছি।

ফোন রাগিব হাসানের রুমে থাকলেও হিমু নিজের রুমে প্যারালাল করে নিয়েছে। হিমু একটা হাদিসের বই পড়ছিল। রিং হতে ঘড়ি দেখে ভাবল, কে তাকে এত রাতে ফোন করবে? নিশ্চয় বাবার ফোন। সাথে সাথে রিং বন্ধ হয়ে যেতে বুঝতে পারল, মা বা বাবা ধরেছে। তাই আবার পড়ায় মন দিল। একটু পরে সেটে টিক টিক শব্দ শুনে বুঝতে পারল, তার ফোন। রিসিভার তুলতে মায়ের গলা পেল, তোর পেসেন্ট ফোন করেছে, কথা বল। তারপর মায়ের রিসিভার রাখার শব্দ পেয়ে বলল, হ্যালো, কে বলছেন?

ফারিহা বলল, জিজ্ঞেস করছেন কেন? আপনার মা তো কে ফোন করেছে বললেন?

ফারিহার গলা বুঝতে পেরে হিমু বলল, দুষ্টুমি না করে এত রাতে কেন ফোন করেছ বল।

ফারিহা বলল, দুষ্টুমি না করলে আপনার মায়ের হাত থেকে উদ্ধার পেতাম না। কি করছিলেন বলুন?

একটা হাদিসের বই পড়ছিলাম। রিজিয়াকে দাও।

কেন? আমার সঙ্গে কথা বলতে বুঝি ভালো লাগছে না?

ভালো লাগবে না কেন? বেশিক্ষণ কথা বললে মা বুঝতে পারবে, প্যারালাল ফোন তো। তাই ওকে দিতে বললাম।

ধরুন দিচ্ছি, বলে ফারিহা রিসিভার রিজিয়াকে দিয়ে বলল, নে কথা বল।

রিজিয়া সালাম বিনিময় করে বলল, মামা-মামি আমাদের ব্যাপারটা জেনে গেছেন। তারা তোমাকে বাসায় আসতে বলেছেন। কবে আসবে বল?

তুমি বললে এক্ষুনি এসে পড়তে পারি।

দুষ্টুমি না করে কবে আসবে বল।

মামা-মামি জানলেন কেমন করে?

সে অনেক কথা, ফোনে বলা যাবে না। শুধু এতটুকু বলতে পারি ফারিহা জানিয়েছে।

ও তো খুব ডেঞ্জারস মেয়ে।

ফারিহা ডেঞ্জারস মোটেই নয়। বরং সাহসী মেয়ে বলতে পার। ওর কথা বাদ দিয়ে কবে আসবে বলবে তো?

তুমি যেদিন বলবে। তবে তার আগে তোমার মামা-মামি কি করে জানলেন বিস্তারিত জানতে হবে। নচেৎ তেমন কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেব কি করে?

তা হলে কাল দেড়টার সময় কলেজের গেটের কাছে থাকবে।

 নিশ্চয় থাকব।

নিশ্চয় থাকব নয়, বলো ইনশাআল্লাহ থাকব। কারণ আল্লাহ রাজি না থাকলে মানুষ কিছুই করতে পারে না।

ইনশাআল্লাহ থাকব বলে হিমু বলল, এবার হয়েছে তো?

হ্যাঁ, হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?

 না তোমার কথামতো হাদিস পড়ছিলাম।

 ক’টার সময় ঘুমাও?

ছাত্রজীবনে কোনো নির্দিষ্ট টাইম ছিল না। বারটা-একটা-দুটা পর্যন্ত পড়তাম। এখন বারটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি।

রিজিয়ার হাত থেকে রিসিভার কেড়ে নিয়ে ফারিহা বলল, কতক্ষণ কথা বলছেন খেয়াল আছে? এখন বুঝি মা জানতে পারবেন না? তারপর রিসিভার ক্র্যাডেলে রেখে রিজিয়াকে বলল, আমাকে বললেন কিনা ‘বেশিক্ষণ কথা বললে মা জানতে পারবে, তাড়াতাড়ি রিজিয়াকে দাও। অনেকক্ষণ তোর সঙ্গে কথা বলছিল, তাই লাইন কেটে দিলাম। রাগ করলি?

রিজিয়া হেসে ফেলে বলল, দিন দিন তুই খুব বেশি ফাজিল হয়ে যাচ্ছিস। তবে তোর উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ না করে পারছি না। আমি ফোন করলে হিমুর মাকে অত সুন্দরভাবে মিথ্যে বলে ম্যানেজ করতে পারতাম না।

তা হলে স্বীকার করছিস, আমি তোর থেকে চালাক?

চালাক কি না জানি না, তবে তোর ব্রেন যে খুব সার্ফ তা স্বীকার করছি।  

তুইও কম না। সোজাসুজি নাক না দেখিয়ে মাথার পেছন থেকে ঘুরিয়ে দেখালি।

হয়েছে হয়েছে, অত আর লেকচার দিতে হবে না। পড়লে পড়, তা না হলে ঘুমিয়ে পড়।

.

পরের দিন হিমু সোয়া একটা থেকে কলেজের গেটের উল্টো দিকের ফুটপাতে অপেক্ষা করছিল। দেড়টার সময় অনেক ছাত্রীদের বেরোতে দেখলেও তাদের মধ্যে রিজিয়া বা ফারিহাকে দেখতে পেল না। ভাবল, তা হলে কোনো কারণে ওরা কি আজ আসে নি? তাই বা কি করে হয়? না এলে নিশ্চয়ই ফোন করে জানাত। যখন দুটো বেজে গেল তখন আর ধৈর্য ধরতে পারল না। গেটের ভেতর ঢুকে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করল, ডিগ্রি আর্টস বিভাগের ছুটি হয়ে গেছে কি না জানেন?

দারোয়ান বলল, না, টিউটোরিয়াল ক্লাস চলছে। আড়াইটায় ছুটি হবে।

হিমু ফিরে এসে আগের জায়গায় অপেক্ষা করতে লাগল।

আড়াইটায় ক্লাস শেষ হওয়ার পর রিজিয়া ও ফারিহা গেটের বাইরে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে হিমুকে দেখতে পেল না।

ফারিহা বলল, তোর কথাই ঠিক, দেড়টা দুটো পর্যন্ত অপেক্ষা করে হিমু ভাই ফিরে গেছে।

আজ টিউটোরিয়াল ক্লাস আছে গতরাতে ফোন করার সময় দু’জনের কারো মনে ছিল না। আজ টিউটোরিয়াল ক্লাস করার সময় মনে পড়ে এবং ফারিহাকে সে কথা বলে বলেছিল, আড়াইটায় টিউটোরিয়াল ক্লাস শেষ হবে। অতক্ষণ কি আর হিমু অপেক্ষা করবে? বড়জোর দুটো পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফিরে যাবে।

ওদেরকে গেট থেকে বেরোতে দেখে হিমু ফুটপাতের একটা মোটা আশুথ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে লক্ষ্য রাখল। তারপর ওরা যখন একটা স্কুটারের দিকে এগোল তখন আড়াল থেকে বেরিয়ে দ্রুত হেঁটে কাছে এসে সালাম দিয়ে বলল, আমি সেই সোয়া একটা থেকে অপেক্ষা করছি, আর তোমরা আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছ?

রিজিয়ার আগে ফারিহা সালামের উত্তর দিয়ে বলল, কোথায় ছিলেন দেখলাম না তো? আমরা চারদিকে তাকিয়ে কত খুঁজলাম।

হিমু বলল, একটু ভালো করে খুঁজলে ঠিকই দেখতে পেতে। ঐ গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, আমাকে না পেয়ে তোমরা কি কর।

রিজিয়া বলল, আজ যে টিউটোরিয়াল ক্লাস আছে, তা আমাদের কারো মনে ছিল না। ক্লাস শুরু হওয়ার পর মনে পড়ে। মনে থাকলে আড়াইটায় আসতে বলতাম। প্লিজ ক্ষমা করে দাও।

হিমু বলল, দেড়টায় অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে তোমাদের বেরোতে না দেখে দু’টো পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তারপর দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তোমাদের টিউটোরিয়াল ক্লাস হচ্ছে। তারপর বলল, ভুল কম বেশি সবারই হয়। মাফ চাওয়ার কি আছে? তবে ভালো করে না খুঁজে চলে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছিল না।

রিজিয়া বলল, ফারিহার মতো তোমার মাথায়ও যে দুষ্টুমিতে ভরা, তা জানব কি করে?

ফারিহা বলল, দেখছেন হিমু ভাই, আপনার সঙ্গে আমাকেও জড়াচ্ছে। এটা কি ওর উচিত হল?

হিমু হাসতে হাসতে বলল, মনে হয় ওর মাথায় কিছু নেই, তা না হলে এমন অনুচিত কথা বলতে পারত না।

রিজিয়া বলল, অনেক হয়েছে এবার চল তো।

 চলতে শুরু করে ফারিহা বলল, চলতো বললি, কোথায় যাবি বলবি না?

রিজিয়া বলার আগে হিমু বলল, আলাপ করার জন্য দুটো জায়গা। একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্ট আর অন্যটা পার্ক। কোথায় যাবে বল।

ফারিহা রিজিয়াকে বলল, তুই বল।

রিজিয়া বলল, তোর তো উপস্থিত বুদ্ধি বেশি। তুই বল।

ফারিহা বলল, পার্কের চেয়ে চায়নিজ রেস্টুরেন্ট উত্তম। একঢ়িলে দু’পাখি স্বীকার হবে। আলাপও হবে, ডান হাতের কাজও হবে। পেটে ক্ষিধে নিয়ে তো আর আলাপ জমবে না? তারপর হিমুকে উদ্দেশ্য করে বলল, পকেট ভারি আছে তো? এসব ব্যাপারে লজ্জা করা উচিত হবে না, নচেৎ খাওয়ার পর তিনজনকেই অপদস্থ হতে হবে।

রিজিয়া তাকে ধমকের স্বরে বলল, তোর লজ্জা সরম বলতে কিছু নেই। ঘণ্টা খানেক আর ক্ষিধে সহ্য করতে পারবি না? বাসায় গিয়েই তো খাবি।

ফারিহা বলল, তোর যদি এতই লজ্জা, তা হলে তুই খাবি না, আমি আর হিমু ভাই খাব, তুই চেয়ে চেয়ে দেখবি। অবশ্য তাতেও তোর লাভ হবে। ঐ যে লোকে বলে, খাওয়ার চেয়ে দেখা ভালো।

ততক্ষণে তারা নীলক্ষেতের মোড়ে এসে গেছে। রিজিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল, হিমু তাকে থামিয়ে দিয়ে একটা দাঁড়ানো স্কুটার ড্রাইভারকে বলল, যাবেন ভাই?

ড্রাইভার রাজি হতে হিমু তাদেরকে পেছনের সিটে উঠতে বলে ড্রাইভারের পাশে বসে বলল, পাঁচ নাম্বার ধানমন্ডির রাস্তার সামনের চায়নিজ রেস্টুরেন্টে চলুন।

ড্রাইভার এত কাছে যেতে রাজি হল না। বলল, আপনারা রিকশায় যান।

হিমু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, কাছে যেতে চাচ্ছেন না তো, দূরের ভাড়া দেব, নিন স্টার্ট দিন।

রেস্টুরেন্টে ঢুকে হিমু বলল, তোমাদের সঙ্গে খাব বলে বাসা থেকে না খেয়ে বেরিয়েছি। তারপর মেনুর বোর্ডটা এগিয়ে দিয়ে বলল, অর্ডার দাও।

খাওয়ার পর ফারিহা বলল, হিমু ভাই, বেশি দেরি করলে মা চিন্তা করবেন।

হিমু বলল, দেরি করা না করা তোমাদের ওপর নির্ভর করছে।

রিজিয়া ফারিহাকে বলল, যা বলার তুই বল।

ফারিহা বলতে শুরু করল, বাবা তার অফিসের ম্যানেজারকে রিজিয়ার জন্য পছন্দ করেন এবং সে কথা মাকে জানান। মা আবার আমাকে জানান। শুনে আমার তো আক্কেল গুড়ুম। সঙ্গে সঙ্গে আপনার পরিচয়, রিজিয়ার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ও আপনারা যে একে অপরকে ভালবাসেন সব কিছু বললাম। মা শুনে প্রথমে আমার ওপর রেগে গেলেও পরে বললেন, তোর বাবাকে বলে দেখি, সে কি করে? বাবা শুনে মাকে বলেছেন, রিজিয়া যেন একদিন ছেলেটাকে বাসায় আসতে বলে।

হিমু বলল, তোমার বাবা আমাদের ভালবাসার কথা শুনে রেগে যান নি?

তা বলতে পারব না। তবে মনে হয় রাগেন নি। রাগলে আপনাকে বাসায় নিয়ে আসার কথা বলতেন না।

এটাও তো হতে পারে, অপমান করে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য বাসায় ডেকেছেন।

সম্ভাবনা যে একদম নেই, তা নয়। তবে আমার যতদূর ধারণা, আপনি যা ভাবছেন তা নাও হতে পারে।

তোমার কথা মেনে নিতাম যদি তিনি রিজিয়ার জন্য ছেলে পছন্দ না করতেন।

তা হলে বাসায় আসতে চাচ্ছেন না?

আসব না মানে, ইনশাআল্লাহ নিশ্চয় আসব। তুমি জান না ফারিহা, রিজিয়া যে আমার হৃদয়ে কিভাবে জড়িয়ে আছে, তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। ওকে পাওয়ার জন্য এমন কোনো কাজ নেই, যা আমি করতে পারব না।

শুনে খুব খুশি হলাম। দোয়া করি আল্লাহ আপনার মনের ইচ্ছা পূরণ করুন।

হিমুর কথা শুনে রিজিয়ার দু’চোখ পানিতে ভরে উঠেছিল। ফারিহা যাতে দেখতে না পায় সেজন্য তাড়াতাড়ি ওড়নায় চোখ মুছে ফেলল।

তার আগেই ফারিহা তার চোখের পানি দেখে ফেলে বলল, তুই বড় ছিচকাঁদুনে মেয়ে। এখন কাঁদার কি হল? নে, এবার চল আর দেরি করা ঠিক হবে না বলে কেউ কিছু বলার আগে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এল।

রিজিয়া ভেজা চোখে হিমুর মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, তোমার ভালবাসার মূল্য আমি কি দিতে পারব? কেবলই মনে হয়, আল্লাহ যদি আমাদের মিলন তকদিরে না লিখে রাখেন, তা হলে তোমার অবস্থা কি হবে? কথাটা শেষ করে আবার চোখ মুছল।

হিমু বলল, সে কথা তকদির যিনি লিখেছেন তিনি জানেন। প্লিজ রিজিয়া, সবুর কর। তুমি তো আমার থেকে হাদিস-কালাম বেশি জান। তবু এত অধৈর্য হচ্ছে কেন? গত রাতে হাদিসে পড়লাম আমাদের নবী করিম (সঃ) বলেছেন, ধৈর্য ঈমানের অর্ধেক। এ কথা জেনেও সবুর করতে পারছ না কেন?

রিজিয়া সামলে নিয়ে চোখ-মুখ মুছে বলল, হাদিসটা জানলেও সব সময় মনে থাকে না। এবার থেকে ইনশাআল্লাহ মনে রাখার চেষ্টা করব। তারপর বলল, ফারিহা বাইরে অপেক্ষা করছে চল যাই। বেরুবার সময় জিজ্ঞেস করল, বাসায় কবে আসছ তা হলে?

পরশু শুক্রবার সকাল আটটার দিকে আসব।

বাইরে এসে দেখল, ফারিহা একটা স্কুটারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওদেরকে দেখে বলল, বিয়ের আগে এতক্ষণ ধরে আলাপ করা উচিত নয়। অবশ্য বিয়ের পর যতক্ষণ ইচ্ছা বলে রিজিয়াকে বড় বড় চোখ বের করে রাগের সাথে তার দিকে তাকাতে দেখে থেমে গেল। তারপর সরি বলে স্কুটারে উঠে হিমুকে জিজ্ঞেস করল, কবে আসছেন ওকে বলেছেন?

হিমু বলল, হ্যাঁ, পরশু সকাল আটটায়।

রিজিয়া হিমুর সঙ্গে সালাম বিনিময় করে স্কুটারে উঠে বলল, আল্লাহ হাফেজ।

হিমুও বলল, আল্লাহ হাফেজ।

.

বাসায় ফিরে হিমু দাদুকে বলল, শিহাব চাচা আমাকে যেতে বলেছেন।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, দাদু তাই।

তা তোমাকে খবরটা দিল কে?

রিজিয়া।

নাতনির নাম শুনে জাহিদ হাসানের চোখে পানি আসার উপক্রম হল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সামলে নিয়ে বললেন, ওকে দেখার জন্য মন ক্রমশ: উতলা হয়ে উঠছে।

আমি তো দেখাতে চেয়েছিলাম, আপনি আজ নয় অন্যদিন বলে এড়িয়ে গেছেন।

জাহিদ হাসান একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, কেন যে এড়িয়ে যাই জানিস?

না বললে জানব কি করে?

ওর সামনে যাওয়ার মুখ আমার নেই।

আমার যত দূর ধারণা, আপনার প্রতি ওর কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই।

কি করে বুঝলি?

আপনি ওকে নাতবৌ করতে রাজি আছেন শুনে খুব খুশি হয়েছে। রাগ বা ক্ষোভ থাকলে কি খুশি হত? পরশুদিন ওদের বাসায় যাব বলেছি, আপনিও চলুন।

শিহাবের কাছেও আমি অপরাধী। সে আমাকে কিভাবে গ্রহণ করবে না জানা পর্যন্ত ওদের বাসায় যাব না। পরশুদিন তুই একা যা, কি কথা হয় না হয় জানার পর ভালো বুঝলে যাব।

.

আজ শুক্রবার। কয়েকদিন খুব গুমোট ছিল। ভোর থেকে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ঝাঁপটা খোলা জানালা দিয়ে হিমুর গায়ে পড়তে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে জানালা বন্ধ করে ঘড়ি দেখল। পাঁচটা বাজে। এতদিন নামায পড়ার জন্য নামায শিক্ষা দেখে বাংলায় কয়েকটা সূরা, নামাযের অন্যান্য সব কিছু মুখস্থ করেছে এবং নামায পড়ার নিয়মকানুন শিখে নিয়ত করেছে, শুক্রবার ফজর থেকে শুরু করবে। সে প্রতিদিন সাতটা পর্যন্ত ঘুমায়। আজ পাঁচটায় ঘুম ভেঙ্গে যেতে নামায শুরু করার কথা মনে পড়ল। তাই বাথরুমের কাজ সেরে অযু করে এসে নামায পড়ল। তারপর গতকালের কিনে আনা কুরআনের বঙ্গানুবাদ পড়তে লাগল। সাতটা বাজতে গোসল করে দাদুর কাছে গিয়ে বলল, তুমি কি এ বেলা কোথাও যাবে?

জাহিদ হাসান বললেন, কেন, গাড়ি নিয়ে কোথাও যাবি বুঝি?

হ্যাঁ দাদু।

নিয়ে যা, তবে দুপুরের মধ্যে ফিরবি, আমি বিকেলে একটু বেরুব।

বেরুবার সময় হিমু মায়ের সামনে পড়ে গেল। সাবিহা বেগম বললেন, এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস? নাস্তা খাবি না?

না মা খেতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। খুব জরুরি একটা কাজে যাচ্ছি। বাইরে নাস্তা খেয়ে নেব।

.

০৮.

শিহাবের শ্বশুর আরমান চৌধুরী দশ কাঠা জমির পূর্ব পার্শ্বে দু’তলা বাড়ি করেছেন। তিনি খুব শৌখিন মানুষ। প্রতি তলায় তিনটি ফ্লাট। ভাড়া দেয়ার জন্য বাড়ি করেন নি, করেছেন নিজেরা থাকার জন্য। নিজে শৌখিন, তার বাড়িটাও শৌখিন। চারপাশে বারান্দা, দোতলায় ওঠার তিনটে সিঁড়ি। একটা নিচতলার ফ্লাটের ড্রইংরুম থেকে। অন্য দুটো দু’পাশের বারান্দা থেকে। গেটের পূর্ব দিকে ড্রাইভার, দারোয়ান ও কাজের লোকদের জন্য পাকা টিনশেডের তিনটে রুম। গাড়ি রাখার গ্যারেজ নেই। বারান্দার কড়িডোর বেশ বড়। তারই একপাশে গাড়ি থাকে। পুরো বাড়িটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পশ্চিম পাশে ফুলের বাগান। বাকি জায়গাটা ফাঁকা রেখেছেন ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা করার জন্য। যদিও আরিফা বেগম তাঁদের একমাত্র সন্তান। ভবিষ্যতে নাতি-নাতনি খেলাধুলা করবে চিন্তা করে এই ব্যবস্থা।

শিহাব আরিফা বেগমকে বিয়ে করার পর যখন শান্তিনগরে বাড়ি করে স্ত্রীকে নিয়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন তখন আরমান চৌধুরী জামাইকে বলেছিলেন, আরিফা আমাদের একমাত্র নয়নের মণি। তাই এই বাড়ি ও অন্যান্য সব কিছু ওর নামে লিখে দিয়েছি। তবু যদি তুমি আরিফাঁকে নিয়ে তোমার বাড়িতে যেতে চাও বাধা দেব না। শুধু এতটুকু বলব, ওকে ছেড়ে থাকতে আমাদের খুব কষ্ট হবে।

সেখানে শিহাবের শাশুড়িও ছিলেন। স্বামী থেমে যেতে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বললেন, তোমার শ্বশুরের সঙ্গে আমি একমত। তা ছাড়া আমাদের বহুদিনের আশা, নাতি-নাতনিদের মানুষ করব, তাদের খেলাধুলার সঙ্গী হব, তাদেরকে নিয়ে বেড়াব, আনন্দ করব। আমাদের সেই আশা ও আনন্দকে বঞ্চিত করে চলে যেও না বাবা। তোমরা চলে গেলে আমরা যে অন্ধ হয়ে যাব। কথা শেষ করে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন।

শ্বশুর-শাশুড়ির কাতরোক্তি শুনে ও তাদের চোখে পানি দেখে শিহাব স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে থেকে যান। আর নিজের বাড়িটা ভাড়া দিয়ে দেন।

হিমু গাড়ি নিয়ে যখন শিহাবদের বাসার গেটে পৌঁছাল তখন আটটা বেজে পাঁচ মিনিট। ঝড় কমলেও তখনও অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। গেট বন্ধ দেখে হর্ন বাজাল।

দারোয়ান ছোট গেট খুলে ছাতা খাটিয়ে বেরিয়ে এসে সালাম দিয়ে বলল, মাফ করবেন, অপরিচিত কাউকে ভেতরে যেতে দেয়ার অনুমতি আমার নেই। আপনার পরিচয় বলুন।

হিমু সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আপনি ভেতরে গিয়ে বলুন হিমু এসেছেন।

দারোয়ান ছোট গেট বন্ধ করে ভেতরে চলে গেল। একটু পরে ফিরে এসে বড় গেট খুলে দিল।

হিমু গাড়ি ভেতরে নিয়ে এসে করিডোরে পার্ক করল। তারপর গাড়ি থেকে নেমে একজন দাড়ি-টুপিওয়ালা পৌঢ়কে দেখে সালাম দিল।

রিজিয়া ও হিমুর সব কিছু জানার পর শিহাব শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে আলাপ করার সময় অফিসের ম্যানেজার ফাহিমকে রিজিয়ার জন্য পছন্দ করার কথাও আলাপ করলেন।

আরমান চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ফাহিমকে দেখেছি ও তার সঙ্গে আলাপও করে বুঝেছি, রিজিয়ার উপযুক্ত। কিন্তু হিমু ও রিজিয়ার সম্পর্ক জেনে মনে হচ্ছে, হিমুর সঙ্গে রিজিয়ার বিয়ে দেয়া আমাদের কর্তব্য। তবে তার আগে হিমু কেমন ছেলে তাও আমাদের জানা উচিত।

শিহাব বললেন, আমরাও হিমুকে দেখি নি, তার সঙ্গে আলাপও করি নি। তাই তাকে আসতে বলা হয়েছে।

আরমান চৌধুরী বললেন, আগে আসুক, পরিচয় হোক, তারপর আমার মতামত জানাব।

আরমান চৌধুরী প্রতিদিন এক ঘণ্টা মর্নিংওয়াক করে বাসায় এসে পৌনে এক ঘণ্টা বিশ্রাম নেন। সেই সময় পেপার পড়ার কাজ সেরে ফেলেন। তারপর পনের মিনিটের মধ্যে গোসল করে কাঁটায় কাঁটায় আটটায় নাস্তা করেন। আজ বৃষ্টির জন্য মর্নিংওয়াক করতে যান নি। কুরআনের তাফসির ও পেপার পড়ে সময় কাটিয়েছেন। তারপর গোসল করে হিমুর জন্য অপেক্ষা করছেন। সে সকাল আটটায় আসবে তাই মেয়ে আরিফা বেগম নির্দিষ্ট সময়ে নাস্তা খেতে ডাকলেও খান নি। বলেছেন, হিমু আসার পর একসঙ্গে খাবেন। তিনি বারান্দায় পায়চারি করছিলেন আর ভাবছিলেন, এই বৃষ্টির মধ্যে হিমু কি আসবে? না বৃষ্টি কমলে বা ছাড়ার পর আসবে? এমন সময় গাড়ির হর্ন শুনে গেটের দিকে তাকিয়ে দারোয়ানের কার্যকলাপ দেখলেন। তারপর তাকে ছাতা মাথায় আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কে এসেছে?

দারোয়ান বলল, হিমু নামে এক যুবক ছেলে।

যাও, তাড়াতাড়ি গেট খুলে দাও।

হিমু গাড়ি থেকে নেমে সালাম দিতে আরমান চৌধুরী উত্তর দিয়ে বললেন, আমি আরমান চৌধুরী, শিহাবের শ্বশুর। তারপরে বললেন ভেতরে চলুন।

হিমু ভেতরে আসার সময় বলল, আপনি আমার দাদুর বয়সী, আমাকে আপনি করে বলে লজ্জা দেবেন না।

আরমান চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন, ঠিক আছে। তারপর ড্রইংরুমে এসে বসতে বলে নিজেও বসে বললেন, এত বৃষ্টির মধ্যে তুমি আসবে ভাবতে পারি নি। পাঁচ মিনিট লেট হলেও তোমার পাংচুয়েলিটি জ্ঞান আছে জেনে খুশি হয়েছি। প্রতিদিন আটটার সময় আমি নাস্তা খেলেও আজ তোমার সঙ্গে খাব বলে খাই নি। আশা করি, তুমিও নাস্তা না খেয়ে এসেছ?

আরমান চৌধুরীকে দেখেই হিমুর মনে শ্রদ্ধাবোধ জেগেছিল। তারপর তার কথা শুনে আরো বেড়েছে। মৃদু হেসে বলল, এখানে নাস্তা খাব বলে আমিও না খেয়ে এসেছি।

গুড, ভেরি গুড বলে আরমান চৌধুরী হাঁক দিয়ে বললেন, কে কোথায় আছ, মেহমান এসে গেছে নাস্তা নিয়ে এস।

রিজিয়া ও ফারিহা শুধু চোখ দুটো ছাড়া মাথা ও সারা শরীর ঢেকে দুপ্লেট নাস্তা, পানির জগ ও গ্লাস নিয়ে এসে সালাম দিল।

হিমু তাদের দিকে তাকিয়ে সালামের উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই আরমান চৌধুরী উত্তর দিয়ে বললেন, তোমাদেরকে কি কাজের বুয়া হিসেবে নতুন এপয়েন্টমেন্ট দেয়া হয়েছে?

কথাটা শুনে হিমু লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে নিল।

রিজিয়াও দাদুর কথা শুনে তাই করল।

কিন্তু ফারিহা তা না করে বলল, কেউ আমাদেরকে এপয়েন্টমেন্ট দেয় নি, নিজেরাই নিয়েছি। মেহমানকে কাজের বুয়াকে দিয়ে মেহমানদারি করালে তাকে অপমান করা হয়। আমাদের নবী করিম (সঃ) নিজের হাতে মেহমানের খেদমত করেছেন।

আরমান চৌধুরী আফসোসের স্বরে বললেন, তা হলে তো আমারই করানো উচিত ছিল।

ফারিহা বলল, আপনি মুরুব্বি মানুষ, আমরা থাকতে আপনি করাবেন কেন? আর আমরাইবা আপনাকে করতে দেব কেন? তা ছাড়া উনি আমাদের মেহমান, আমাদেরই তো করান উচিত।

তোমরা হলে ভাই মডার্ন যুগের শিক্ষিত মহিলা, আর আমি হলাম সেকেলে অল্পশিক্ষিত বুড়ো, তোমাদের সঙ্গে যুক্তিতে কি আর পারব?

হার যখন স্বীকার করলেন তখন আর কোনো কথা না বলে খেতে শুরু করুন। এমনিতেই তো আপনার নাস্তার টাইম দশ মিনিট লেট হয়ে গেছে।

নাস্তা খাওয়ার পর আরমান চৌধুরী হিমুর সঙ্গে তাদের পারিবারিক ও তার এম অফ লাইফ সম্পর্কে আলাপ করে খুশি হয়ে বললেন, তুমি বসো, ফারিহার মা-বাবা তোমাকে আসতে বলেছে। তারা হয়তো এবার আসবে। আমি এখন যাই বলে চলে গেলেন।

মিনিট পাঁচেক পর শিহাব ড্রইংরুমে ঢুকেই সালাম দিলেন।

হিমু জানত ছোটরাই বড়দের সালাম দেয়। তাই শিহাব চাচা আগে সালাম দিতে লজ্জা পেয়ে দাঁড়িয়ে সেও সালাম দিল।

শিহাব তাকে বসতে বলে নিজেও বসলেন। তারপর বললেন, ছোট বড় যে কেউ আগে সালাম দিলে শুধু সালামের উত্তর দিতে হয়। পাল্টা তাকে সালাম দেয়া বেদাত। অর্থাৎ যা ইসলামের বিধানে নেই অথচ নিজের ইচ্ছায় কোনো নতুন নিয়মের প্রচলন করা। এসব কথা থাক, যে কারণে তোমাকে আসতে বলেছি সে ব্যাপারে আলাপ করা যাক। তুমি আমার বন্ধুর বড় ভাইয়ের ছেলে আর রিজিয়া আমার বন্ধুর মেয়ে ও আমাদের গ্রামের মেয়ে। তোমাদের দুজনের ভালোমন্দ চিন্তা করা আমার কর্তব্য। আমার বড় মেয়ে ফারিহার কাছে তোমার ও রিজিয়ার সম্পর্কে সব কিছু শুনেছি। কিন্তু তুমি কি জান, শিশু রিজিয়াকে যখন তার নানা ও আমি তোমার দাদার কাছে দিতে এসেছিলাম, তখন শুধু রিজিয়ার নানাকে নয়, আমি তোমার চাচার অন্তরঙ্গ বন্ধু জানা সত্ত্বেও তিনি ও তোমার বাবা আমাকে অবিশ্বাস করে দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

হিমু বলল, জি জানি।

শিহাব আবার বলল, যে রিজিয়াকে তার নানা শত অভাবের মাঝে না খেয়ে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করিয়েছিলেন, যাকে তোমার দাদাজী ও বাবা স্বীকৃতি দেন নি, তাকে কি তারা মেনে নেবেন? না ঘরে তুলবেন? আমার তো মনে হয়, তা তারা করবেন না। আর আমারও কি উচিত হবে, তাদের বাড়ির ছেলের সঙ্গে রিজিয়ার বিয়ে দেয়া? কখনই উচিত হবে না। আমার একটা কথার উত্তর দাও তো, শুনেছি তুমি বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে রিজিয়াকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছ, কিন্তু তার ও তার মা বাবার পুরো ইতিহাস জান কি?

হিমু বলল, জি জানি।

রিজিয়ার পরিচয় তোমার মা-বাবা, দাদা-দাদি জানেন?

দাদা-দাদি জানেন, মা বাবা জানেন না। তবে তারা শুধু এতটুকু জানেন, রিজিয়া পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরের এতিম মেয়ে।

তারা কি রিজিয়াকে বৌ করতে রাজি আছেন?

মা-বাবা রাজি নন, দাদা-দাদি রাজি আছেন। ওঁনারা শিশু রিজিয়াকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ঠিক, কিন্তু পরে দাদাজী অনুতপ্ত হয়েছিলেন। এখন আমার কাছে রিজিয়ার সব কিছু শুনে আরো বেশি অনুতপ্ত হয়েছেন এবং তাকে দেখার জন্য খুব অস্থির হয়ে আছেন। আজ ওনাকে আসতে বলেছিলাম। বললেন, রাকিবের বন্ধুকে সেদিন অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, এখন তার কাছে ও রিজিয়ার কাছে কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াব।

তাই যদি হয়, তা হলে তো উনি ছেলে বৌকে রিজিয়ার আসল পরিচয় জানিয়ে রাজি করাতে পারেন! আর তুমিও রিজিয়ার আসল পরিচয় মা-বাবাকে জানাতে পারতে। জানার পর তারা হয়তো রাজি হতেন।

দাদাজী কেন জানান নি, তা আমি জানি না। আর আমি জানায় নি, কারণ আমার মা-বাবাকে আমি ভালোভাবেই জানি, তারা ধনের ও আভিজাত্যের অহঙ্কারে অন্ধ হয়ে গেছেন। গরিবদের তারা মানুষ বলে মনেই করেন না। তারা কি রিজিয়ার আসল পরিচয় জেনে রাজি হবেন? কিছুতেই হবেন না। তাই আমি রিজিয়াকে বিয়ে করে তাদের সেই ধনের ও আভিজাত্যের অহঙ্কার চূর্ণ করে দিতে চাই।

তোমার উদ্দেশ্য ভালো হলেও এটা করা তোমার উচিত হবে না। কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) মা-বাবা যতই খারাপ হন না কেন, তবু তাদের মনে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন।

তা হলে আপনিই বলুন, আমার কি করা উচিত।

তুমি কি ইসলামের ওপর পড়াশোনা করেছ?

এতদিন করি নি। কিছুদিন আগে রিজিয়া আমাকে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করতে বলে। তখন থেকে ইসলামের ওপর বিভিন্ন বই-পুস্তক পড়তে শুরু করেছি।

তোমার চাচার সঙ্গে যখন আমার বন্ধুত্ব হয় এবং তোমাদের বাসায় যাতায়াত করতাম তখন কেউ নামায রোযা করতেন না। আমি তোমার চাচাকে ইসলামী বই পড়িয়ে ইসলামের প্রতি অনুরক্ত করি এবং কিছুদিনের মধ্যে ইসলামের বিধান মেনে চলতে শুরু করে। এখন তোমাদের বাসার কেউ কি নামায-রোযা করে না?

জি, না?

তুমিও কর না?

চাচাকে যেমন আপনি ইসলামী বই-পুস্তক পড়িয়ে ইসলামে অনুরক্ত করে নামায-রোযা ধরিয়েছিলেন, তেমনি রিজিয়াও আমাকে তাই করেছে। আজ ফজর থেকে নামায পড়তে শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ আগামী রমযান মাসে রোযাও রাখব।

আল্লাহ সবাইকে ইসলাম বোঝার ও ইসলামের বিধান মেনে চলার তওফিক দান করুন। তোমাকে নামায-রোযার কথা জিজ্ঞেস করলাম বলে মনে কিছু করো না। কেন জিজ্ঞেস করলাম জান, যারা এগুলো করে না, তাদের বাড়িতে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেয়া কোনো মা-বাবার উচিত নয়। জেনে রেখো, ইসলামকে যে জানে না এবং ইসলামের বিধি-বিধান যে মেনে চলে না, মুসলমানের ঘরে জন্মালেও সে প্রকৃত মুসলমান নয়।

হা চাচা, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। এই কয়েকদিন ইসলামী বই পুস্তক পড়ে আমারও তাই মনে হয়েছে।

শুধু নিজে ইসলামকে জানলে ও মানলে হবে না, আস্তে ধীরে খুব হিকমতের সাথে প্রথমে বাসার সবাইকে এবং পরে অন্যান্য মুসলমানদের জানাবার ও মানাবার চেষ্টা করতে হবে। কারণ এটা করাও ইসলামের বিধান।

আমিও সেকথা বুঝতে পেরেছি। ইনশাআল্লাহ সেই চেষ্টাও করব। কিন্তু আমি এখন কি করব বললেন না তো?

তুমি জান কি না জানি না, আমি কিন্তু রিজিয়ার জন্য আমার অফিসের ম্যানেজারকে পছন্দ করেছিলাম। তোমাদের ব্যাপারটা জানার পর মত পাল্টেছি। এখন তোমাকে কিছু করতে হবে না, যা করার আমি করব। তুমি শুধু তোমার দাদাজীকে একদিন এখানে নিয়ে আসবে।

তা নিয়ে আসব, কিন্তু বাবা তো তার বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। আমি প্রতিবাদ করেও কাজ হয় নি। মাও বাবার সঙ্গে একমত। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলতে মা বললেন, বিয়ে করতে যদি না চাস, তা হলে ফরেনে উচ্চ ডিগ্রি নিতে যা। তাতেও আমি রাজি না। আমি বলেছি, দেশের গরিব ও সাধারণ মানুষ যাতে অল্প খরচে চিকিৎসা পায়, সেজন্যে চেম্বার করে প্র্যাকটিস করব।

এরকম সিদ্ধান্ত নেয়া তোমার ঠিক হয় নি। মা-বাবা যখন তোমাকে উচ্চ ডিগ্রি নিতে ফরেনে পাঠাতে চাচ্ছেন তখন তা করাই তোমার উচিত। ফরেনের ডিগ্রি থাকলে গরিব ও সাধারণ মানুষের আরো বেশি উপকার করতে পারবে।

কিন্তু রিজিয়াকে ভুলে যাওয়ার জন্য এটা যে তাদের একটা প্ল্যান, তা আমি জানি। তাই মাকে বলেছি, রিজিয়াকে বিয়ে করে বাসায় রেখে তারপর ফরেনে পড়তে যাব। মাও বাবার মতো রিজিয়াকে বৌ করতে কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। বলেছেন, তোর বাবার বন্ধু বিজনেস ম্যাগনেট। তার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করলে তিনিই তোকে ফরেনে পাঠাবেন এবং ভবিষ্যতে তার সব কিছু তুই ও তার মেয়ে পাবি। বাবা দু’মাসের জন্য কানাডা গেছেন। ফিরে এসে আমার বিয়ে দেয়ার কথা বলে গেছেন। খুব দুশ্চিন্তায় আমার দিন কাটছে।

এই পরিস্থিতি তুমি নিজেই সৃষ্টি করেছ। রিজিয়া পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরের এতিম মেয়ে, এসব কথা তোমার মাকে বলে ভীষণ ভুল করেছ। ওসব না বলে যদি রিজিয়ার শুধু বর্তমান ঠিকানা জানিয়ে বলতে, ঐ বাসায় দুটি বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আছে, তাদের মধ্যে রিজিয়া নামের মেয়েটিকে তুমি পছন্দ কর এবং আমাদেরকে তোমার পরিচয় দিয়ে সব কিছু জানাতে, তা হলে এই পরিস্থিতিতে পড়তে হত না। যাই হোক, যা হওয়ার হয়েছে। এ নিয়ে তুমি দুশ্চিন্তা করবে না। একটু আগে বললাম না, যা করার আমি করব। তোমার বাবা কানাডা গেছেন। এই ফাঁকে আমি তোমাদের বাসায় গিয়ে তোমার দাদুর সঙ্গে আলাপ করতে পারতাম; কিন্তু তোমার মা আমাকে চিনে ফেলবে। তাই ওনাকে আমার বাসায় নিয়ে আসতে তোমাকে বললাম। এবার আমাকে উঠতে হচ্ছে বলে শিহাব দাঁড়িয়ে পড়লেন।

হিমুও দাঁড়িয়ে সালাম দিল।

শিহাব সালামের উত্তর দিয়ে চলে যাওয়ার সময় বললেন, তুমি বস, চা খেয়ে যাবে।

স্বামীর পেছন পেছন এসে আরিফা বেগম দরজার আড়াল থেকে এতক্ষণ তাদের কথা শুনছিলেন। স্বামী বেরিয়ে এলে তার সঙ্গে যেতে যেতে বললেন, হিমু খুব সুন্দর ছেলে, কথাবার্তাও খুব ভালো।

শিহাব মৃদু হেসে বললেন, ফাহিমের থেকে ভালো?

আরিফা বেগম এরকম প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। থতমত খেয়ে বললেন, দু’জনেই খুব ভালো।

এবার শিহাব একটু জোরে হেসে উঠে বললেন, তোমাকে হারাতে গিয়ে নিজেই হেরে গেলাম।

ওমা, এতে আবার হার জিতের কি হল?

বাদ দাও ও কথা, ফারিহা ও রিজিয়া কোথায়? ওদের হাতে হিমুর জন্য চা পাঠিয়ে দাও।

আমাকে পাঠাতে হবে না। এতক্ষণে হয়তো ওরা চা নিয়ে চলে গেছে।

বাবা ড্রইংরুমে যাওয়ার পর ফারিহা রিজিয়াকে বলল, চল, আমরা দরজার আড়াল থেকে কি কথাবার্তা হয় শুনব। তারপর দরজার কাছে মাকে দেখে ওরা বারান্দায় এসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সব কিছু শুনছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর রিজিয়া বলল, কিচেনে চা তৈরি আছে তুই গিয়ে নিয়ে আয়, আমি হিমুর কাছে যাচ্ছি।

হুকুম করার স্বভাবটা এবার পাল্টা। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে কাকে হুকুম করবি? আমাকে আনতে না বলে নিজে নিয়ে আসতে পারিস না? বলে ফারিহা কিচেনের দিকে চলে গেল।

রিজিয়া তার কথা গায়ে মাখল না। মৃদু হেসে ড্রইংরুমে ঢুকে সালাম দিল।

হিমু সালামের উত্তর দিয়ে বলল, এখানে আসার পর বেশ নার্ভাস ফিল করেছিলাম। তোমার দাদুর সঙ্গে আলাপ করার পর কিছুটা কমে। তারপর তোমার মামার সঙ্গে আলাপ করার সময় সম্পূর্ণ কেটে যায়। সত্যি ওনারা খুব মহৎ।

হ্যাঁ, তোমার কথা ঠিক। মামা ও দাদু মহৎ জানতাম; কিন্তু তোমার সঙ্গে ওনাদের আলাপ শুনে মনে হল শুধু মহৎ নন, খুব উদার মনের মানুষও। তারপর বলল, মামা অফিসের ম্যানেজারকে আমার জন্য পছন্দ করেছেন শোনার পর থকে খুব দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল। তার ওপর তোমাকে বাসায় ডেকে আনার কথা শুনে ভেবেছিলাম, খুব অপমান করে তাড়িয়ে দেবেন। তাই তুমি আসার পর থেকে ভয়ে কাঠ হয়েছিলাম। তারপর দাদুর ও মামার কথা শুনে আনন্দে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছি।

এমন সময় ফারিহা তিনকাপ চা নিয়ে এসে রিজিয়ার শেষের কথা শুনতে পেয়ে বলল, আর আমি যে তোর জন্য এত কিছু করলাম সেটা বুঝি কিছু না? আমি বুঝি কারো কাছ থেকে কিছু পেতে পারি না?

রিজিয়া বলার আগে হিমু বলল, নিশ্চয় পাবে। তোমাকে এমন একটা। জিনিস দেব, যা পেয়ে তুমি ধন্য হয়ে যাবে।

কি এমন জিনিস বলুন তো শুনি।

এখন বলা যাবে না। বললে জিনিসটার কদর তোমার কাছে কমে যাবে। তাই যখন দেব তখন জানতে পারবে কি অমূল্য রত্ন পেয়েছ। এবার তা হলে আসি বলে হিমু উঠে দাঁড়াল।

আরে করেন কি? অত কষ্ট করে আপনার জন্য চা নিয়ে এলাম, না খেয়েই চলে যাবেন?

হিমু বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, কথাটা ঠিক বললে কী? আমি খাব এক কাপ আর এনেছ তিন কাপ।

তিন কাপ আনি আর দশ কাপ আনি, উদ্দেশ্যতো আপনার জন্য।

তোমার সঙ্গে তর্কে পারব না বলে হিমু চায়ের খালি কাপ নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর সালাম বিনিময় করে চলে যেতে উদ্যত হলে রিজিয়া বলল, রাতে ফোনের অপেক্ষায় থাকব।

ঠিক আছে বলে হিমু চলে গেল।

ফারিহা বলল, রাতে আবার ফোন করতে বললি কেন? এতক্ষণ কথা বলে সাধ মেটে নি?

তুই তো কারো প্রেমে পড়িস নি, পড়লে এ কথা বলতিস না।

আমার বয়েই গেছে কারো প্রেমে পড়তে। একটা বই-এ পড়েছি, বিয়ের পর যে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রেমে পড়ে, সেই প্রেমই খাঁটি প্রেম। সেই প্রেমে বেহেস্তের সুখ অনুভব হয়। আর যারা আগে প্রেম করে পরে বিয়ে করে, তাদের প্রেম কাচের মতো ঠুনকো। কাচ যেমন সামান্য আঘাতে ফাটল ধরে এবং বড় আঘাতে ভেঙ্গে চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, তেমনি প্রেম করে যারা বিয়ে করে, তাদের মধ্যে সামান্য কোনো ব্যাপারে মনোমালিন্য হলে সেই প্রেমে ফাটল ধরে এবং বড় কোনো বিষয়ে মনোমালিন্য হলে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

রিজিয়া হেসে উঠে বলল, তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে তুই যেন আগে প্রেম করেও বিয়ে করেছিস, আবার বিয়ে করেও স্বামীর সঙ্গে প্রেম করেছিস।

ফারিহাও হেসে উঠে বলল, তোর মাথায় গোবর আছে। কি করে যে সব পরীক্ষায় আমার থেকে ভালো রেজাল্ট করিস বুঝতে পারছি না। আরে গাধা, সরি, আরে গাধী, কোনো কিছু জানতে হলে শুধু যে বাস্তব অভিজ্ঞতা দরকার তা ঠিক নয়। বিভিন্ন বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা পড়লেও জানা যায়। তুই তো ওসব পড়িস না জানবি কি করে?

রিজিয়া বলল, আমার জানার দরকার নেই। আমি বিয়ের আগে প্রেম করলেও বিয়ের পর সেই প্রেম আরো কত গম্ভীর হয় সবাইকে দেখিয়ে দেব। আর বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কত গভীর প্রেম করিস তাও দেখব।

ফারিহা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কাজের বুয়াকে আসতে দেখে থেমে গেল।

কাজের বুয়া এসে বলল, এবার আপনারা যান, আমি ঘর গোছাব।

যেতে যেত ফারিহা বলল, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে দেখব বিয়ের পর তোর কথা ঠিক, না আমার কথা ঠিক।

রিজিয়া বলল, তাই দেখিস।

হিমু বাসায় ফিরে এলে জাহিদ হাসান বললেন, রেজাল্ট শোনাও।

রিজিয়ার দাদু ও মামার সঙ্গে যা কিছু কথাবার্তা হয়েছে হিমু সব কিছু বলল। এমন কি ইসলাম সম্পর্কে শিহাব চাচা যা বলেছিল তাও বলল।

জাহিদ হাসান বললেন, শুনে খুব আনন্দিত হলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, রিজিয়ার সঙ্গে আমার দেখা করার ব্যাপারে আলাপ করিস নি?

জি, করেছি। বললেন, সে ব্যবস্থাও তিনি করবেন।

 শিহাবের অফিসের ফোন নাম্বার জানিস?

জানি, ইনডেক্সে লিখা আছে এক্ষুনি এনে দিচ্ছি বলে হিমু রুমে গিয়ে একটা কাগজে লিখে এনে দাদুর হাতে দিয়ে বলল, বাসার নাম্বারটাও দিলাম।

ঠিক আছে, তুই এবার যা।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *