৫-৬. রাগিব হাসান একদিন

০৫.

রাগিব হাসান একদিন ছেলেকে বললেন, আমি তোকে উচ্চশিক্ষা নেয়ার জন্য ফরেনে পাঠাতে চাই। কোথায় যেতে চাস বল।

বাবা এমন কথা বলবে হিমু চিন্তাই করতে পারে নি। তাই খুব অবাক হয়ে বলল, রেজাল্ট বেরোবার পর আমি যখন ফরেনে যেতে চাইলাম তখন তোমরা একমাত্র সন্তানের অসিলা দিয়ে রাজি না হয়ে বললে, এখানে চেম্বার করে দেব প্র্যাকটিস কর। এখন আবার এ কথা বলছ কেন?

রাগিব হাসান বললেন, তখন চিন্তাভাবনা না করে বলেছিলাম। এখন আমি ও তোর মা চাই কোনো এক বিষয়ে ফরেন থেকে স্পেশালিস্ট হয়ে আয়। তা না হলে আজকাল শুধু এম.বি.বি.এস. ডাক্তারকে কেউ মূল্যায়ন করে না। তা ছাড়া হাই সোসাইটিতে আমাদের সম্মানও থাকবে না।

আমি তোমাদের হাই সোসাইটির পরওয়া করি না। আর শুনে রাখ, টাকা উপার্জনের জন্য আমি প্র্যাকটিস করব না, গরিব ও সাধারণ মানুষদের অল্প খরচে চিকিৎসা করব।

রাগিব হাসান রেগে গিয়ে গম্ভীরস্বরে বললেন, তুই তা হলে আমাদের মনের আশা পূরণ করবি না?

দেখ বাবা, আমি তোমাদের ছেলে। তোমরা আমার স্বভাব-চরিত্র জান। আর এটাও জান, একবার কোনো ব্যাপারে না করলে, তা কিছুতেই হা করি না। তাই বলছি, এ ব্যাপারে আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করো না। যদি কর, যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব।

রাগিব হাসান রাগ সামলাতে পারলেন না। চিৎকার করে বললেন, তাই যা, যে ছেলে মা-বাবার অবাধ্য তেমন ছেলের মুখ দেখতে চাই না।

সেখানে সাবিহা বেগমও ছিলেন। একমাত্র সন্তানের কথা শুনে আগেই ভয় পেয়েছিলেন। স্বামীর কথা শুনে আরো বেশি ভয় পেয়ে ভাবলেন, হিমু যদি সত্যি সত্যি বাবার ওপর রাগ করে বাসা ছেড়ে চলে যায়, তা হলে বাঁচবেন কি করে? তাই স্বামীকে রাগের সঙ্গে বললেন, বাবা হয়ে একমাত্র ছেলেকে এরকম কথা বলতে পারলে? তারপর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর বাবার কথায় কিছু মনে করিস না। তুই ফরেনে যেতে না চাইলে আমরা জোর করব না। এখানে যা করতে চাচ্ছিস তাই করে দেব।

রাগিব হাসান রাগের সঙ্গে স্ত্রীকে বললেন, তোমার আশকারা পেয়েই তো ও আমার মুখের ওপর কথা বলতে শিখেছে। ছেলেমেয়েকে স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে মানুষ করলেও আশকারা দিতে নেই। দিলে তারা মা-বাবার অবাধ্য হয়। তারপর গজর গজর করতে করতে উঠে চলে গেলেন।

পরে এক সময় সাবিহা বেগম স্বামীকে বললেন, হিমু যখন ফরেনে যেতে চাচ্ছে না তখন জোর করা ঠিক হবে না। তার চেয়ে চেম্বার করে দিয়ে তাড়াতাড়ি একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দাও। তা হলে ঐ মেয়েটার কথা ভুলে যাবে।

রাগিব হাসান বললেন, তোমার কথা যুক্তিসঙ্গত হলেও হিমু বিয়ে করতে রাজি হবে বলে মনে হয় না। তখন হয়তো বলবে, জোর করে বিয়ে দিলে বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও থাকবে।

তবু যা বললাম কর। বেকার থাকলে মেয়েটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। আর বিয়ের ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। যেমন করে হোক আমি ওকে রাজি করাব।

তা হলে শোন, আমার এক বন্ধুর মেয়ে আছে। ইংলিশে অনার্স করে মাস্টার্স করছে। দেখতে শুনতে খুব ভালো। মেয়েটা তাদের একমাত্র সন্তান। তোমাকে একদিন তাদের বাসায় নিয়ে যাব। দেখলে তোমারও পছন্দ হবে।

ঠিক আছে, যাব। হিমুকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। মেয়ের সঙ্গে পরিচয় থাকলে রাজি করাতে সুবিধা হবে।

বেশ, তাই হবে।

তোমার বন্ধু বা তার বৌ হিমুকে যদি পছন্দ না করে?

পছন্দ করবে না মানে? সেই তো একদিন কথায় কথায় হিমুকে জামাই করার কথা বলে ফেলল। আমি বলেছি হিমু বেকার অবস্থায় বিয়ে করতে রাজি হবে না। বন্ধু বলল, সেজন্যে চিন্তার কিছু নেই। বিয়ের পর আমি হিমুকে ফরেনে পাঠিয়ে দেব। সেখান থেকে উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এলে আমিই চেম্বার করে দেব।

তাই নাকি? তা এতদিন কথাটা আমাকে জানাও নি কেন?

রোজই বলব বলব মনে করি, কিন্তু ভুলে যাই।

ঠিক আছে, দেরি না করে দু’একদিনের মধ্যে যাই চল।

.

রাগিব হাসানের বন্ধু মফিজ সাহেবও একজন বড় ব্যবসায়ী। তার একমাত্র মেয়ে উঁই। জুঁই যখন তের-চৌদ্দ বছরের তখন তার মা মারা যান। মফিজ সাহেব আর বিয়ে করেন নি। মেয়েকে মা-বাবার স্নেহ দিয়ে মানুষ করেছেন। বকাবকি তো দূরের কথা, এতটুকু চোখও রাঙান নি। যা আবদার করেছে তৎক্ষণাৎ পূরণ করেছেন। ফলে জুঁই খুব মেজাজি, একগুঁয়ে ও বেশ একটু উদ্ধৃঙ্খল ধরনের। সুন্দরী ও ধনীর একমাত্র দুলালী বলে অহঙ্কারীও। আর খুব অল্টা মডার্ন। লজ্জা-শরম নেই বললেই চলে। সব সময় অশালীন পোশাক পরে।

রাগিব হাসান এক ছুটির দিন স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে বন্ধুর বাসায় বেড়াতে এলেন। অবশ্য সে কথা বন্ধুকে আগেই বলে রেখেছিলেন। জুঁইকে দেখে সাবিহা বেগমের খুব পছন্দ হল। ভাবলেন, এ রকম মেয়েই তাদের বাড়ির বৌ হওয়ার উপযুক্ত।

জুঁইকে হিমুর একদম পছন্দ হল না। তার পোশাক দেখে হিমুর যেমন লজ্জা পেল তেমনি রাগ হলেও তা প্রকাশ করল না। উঁইয়ের বাবা যখন তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তখন হিমু মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে আলাপ করল। পরে যখন উঁই একাকী তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশতে চাইল হিমু অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে উঁইয়ের অহঙ্কার ক্ষুণ্ণ হল। ভাবল, ভার্সিটির কত বড় বড় ধনী ঘরের ও হাই সোসাইটির ছেলেরা তার সঙ্গে একটা কথা বলতে পারলে ধন্য হয়ে যায়, যে কেউ তার দিকে তাকালে চোখ ফেরাতে পারে না, আর হিমু কিনা তার দিকে ভালো করে তাকাচ্ছে না? তাই এক ফাঁকে তাকে বলল, আপনি ডাক্তারি পড়ার সময় মেয়েদের লাশ কাটাছেঁড়া করেছেন, মেয়েদের সঙ্গে পড়াশোনা করেছেন, হৈ-হুঁল্লোড় করেছেন, তবু আমাকে এড়িয়ে চলছেন কেন?

হিমু বলল, আমার স্বভাবই এরকম। সব সময় আমি মেয়েদের এড়িয়ে চলি।

কেন?

কেনর উত্তর এই মুহূর্তে দিতে পারছি না, সেজন্য ক্ষমা চাইছি।

আপনি ডাক্তার হলেও মনটা সেকেলে রয়ে গেছে। মনটাকে মডার্ন যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করুন। নচেৎ হাই সোসাইটিতে মিশবেন কি করে?

হাই সোসাইটিতে মিশতেও আমার মন চায় না।

আমার সঙ্গে কিছুদিন মেলামেশা করুন, দেখবেন সব কিছু ভালো লাগছে।

আপনাকেও আমার ভালো লাগছে না। মেলামেশা করব কি করে?

এই কথা শুনে জুঁই খুব রেগে গেল। রাগের সঙ্গে বলল, আমাকে ভালো লাগছে না কেন বলুন তো?

মাফ করবেন, তাও এখন বলতে পারছি না।

আপনি একটা পুরুষত্বহীন কাপুরুষ বলে উঁই তার কাছ থেকে চলে গেল।

হিমু তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল।

বাসায় ফিরে সাবিহা বেগম ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, জুঁইকে কেমন মনে হল?

বাবার বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে হিমু মা-বাবার মতলব বুঝতে পেরে রেগে গিয়েছিল। তাই উঁইয়ের কাছে পুরুষত্বহীন ও কাপুরুষের মতো ব্যবহার করেছে। এখন মায়ের কথা শুনে বলল, যদি জানতাম বাবার বন্ধুর ঐ রকম যাচ্ছেতাই একটা মেয়ে আছে, তা হলে কিছুতেই যেতাম না। তোমাদের আবার বলছি, আমার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করো না। আমার সিদ্ধান্তের কথা জানাবার পরও কেন যে তোমরা মেয়ে দেখাতে নিয়ে গেলে বুঝতে পারছি না।

সাবিহা বেগম খুব রেগে গিয়ে বললেন, আমিও বলে রাখছি, পাড়াগাঁয়ের আনকালচার্ড গরিব ঘরের এতিম মেয়েকে কিছুতেই এ বাড়ির বৌ করব না।

ঠিক আছে, তোমরা যদি তোমাদের ছেলেকে চিরকুমার করে রাখতে চাও তাই থাকব। এই কথা বলে হিমু বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।

.

রাগিব হাসানকে ব্যবসার কাজে দু’মাসের জন্য কানাডা যেতে হল। যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলে গেলেন, কানাডা থেকে ফিরে হিমুর ব্যাপারে যা করার করব।

হিমু একদিন দাদুকে বলল, আমি একটা গল্প লিখেছি। কিন্তু কিভাবে নায়ক-নায়িকার মিল দেব ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি যদি একটু হেল্প করতেন, তা হলে গল্পটা শেষ করতে পারতাম।

জাহিদ হাসান বললেন, বেশ তো, গল্পটা যতদূর লিখেছ শোনাও। শোনার পর বলব কিভাবে নায়ক নায়িকার মিল দেয়া যায়।

হিমু প্রথমে আযীয মাস্টারের পরিচয় ও তার মেয়ে সাবেরার বিয়ের ঘটনা এবং সাবেরার পেটে সন্তান থাকা অবস্থায় স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা, রিজিয়ার জন্ম ও সাবেরার মৃত্যু এবং আযীয মাস্টার দু’বছরের রিজিয়াকে দাদা-দাদির কাছে ফেরত দিতে যাওয়ার ঘটনা বলার পর জিজ্ঞেস করল, রিজিয়াকে তার দাদার ফিরিয়ে দেয়া কি উচিত হয়েছে?

গল্পটা শুনে জাহিদ হাসান মনে চমক খেলেও তা প্রকাশ না করে ভাবলেন, এই গল্পের সঙ্গে ছোট ছেলে রাকিব হাসানের অনেক কিছু হুবহু মিল রয়েছে।

দাদুকে চুপ করে থাকতে দেখে হিমু বলল, উচিত হয়েছে কি না বললেন যে?

নাতির কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে জাহিদ হাসান হেসে উঠে বললেন, এটা খুব সস্তা ধরনের গল্প। আজকাল আমাদের দেশের সিনেমাগুলোতে এইধরনের ছবি দেখাচ্ছে।

আমি কখনো সিনেমা দেখি নি, সস্তা না দামি জানব কী করে? ওসব কথা বলে যা জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দিন।

সে কথা পরে বলছি, গল্পটা আগে শেষ কর।

এবার হিমু নিজেকে নায়ক ও রিজিয়াকে নায়িকা করে তাদের সম্পর্কের কথা ও নায়কের বাবা-মার অমতের কারণ এবং নায়কের সিদ্ধান্তের কথা বলে বলল, গল্পের আর একটা অংশ বাদ পড়ে গেছে। বলছি শুনুন, দু’বছরের নায়িকাকে দাদা-দাদির কাছে দেয়ার ঘটনার সময় তার বড় চাচার আট বছরের ছেলেও সেখানে ছিল। ছেলেটার মনে তখন রিজিয়ার প্রতি সহানুভূতি জাগে এবং ঘটনাটা গভীরভাবে মনে দাগ কাটে। বড় হওয়ার পরও সেই দাগ মুছে যায় নি। বরং আরো বাড়ে। ঘটনাচক্রে নায়ক তার এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে যে মেয়েটিকে দেখে মুগ্ধ হয় এবং বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই মেয়েই হল এই গল্পের নায়িকা। আর নায়ক হল নায়িকার বড় চাচার ছেলে। এবার বলুন কিভাবে তাদের মিল দেব?

গল্পের প্রথম অংশ শুনে জাহিদ হাসানের যে ধারণা হয়েছিল, শেষের অংশ শুনে সেই ধারণা আরো দৃঢ় হল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তুমি গল্পের প্রথম অংশ বলার পর যে প্রশ্ন করেছিলে তার উত্তরে বলব, নায়িকার দাদা ও বড় চাচার উচিত ছিল সত্য-মিথ্যা যাচাই করা এবং ঘটনা সত্য হলে নায়িকাকে গ্রহণ করা। আর গল্পের নায়ক-নায়িকার মিল দিতে হলে প্রথমে নায়ককে জানতে হবে নায়িকা তাকে বিয়ে করতে রাজি আছে কি না। যদি রাজি থাকে, তা হলে নায়ক মা-বাবার অমতের কথা ও তার কারণ জানিয়ে গোপনে বিয়ে করার কথা বলবে। সব কিছু জানার পরও নায়িকা রাজি থাকলে কাজি অফিসে বিয়ে দিয়ে গল্পটা শেষ করবে।

হিমু বলল, বিয়ে দিয়ে শেষ করলে গল্পটা সম্পূর্ণ হবে না। কারণ ছেলের বৌকে নায়কের মা-বাবা গ্রহণ করবে কি না, না করলে নতুন বৌকে নিয়ে নায়ক কি করবে? কোথায় তুলবে? এসব প্রশ্ন পাঠকদের মনে জাগবেই। তখন তারা লেখককে যা তা বলবে।

জাহিদ হোসেন মৃদু হেসে বললেন, আরে ভাই, আমি তো আর লেখক নই, এসব বলব কি করে? তুমি যখন গল্পটার লেখক তখন তোমাকেই গল্পের শেষটা লিখতে হবে। আমার তো মনে হচ্ছে, গল্পটা কারো কাছে শুনে লিখেছ। তার কাছেও জিজ্ঞেস করতে পার। আমার অনুমান সত্য কি না বল?

আপনি জানেন কি না জানি না, লেখকরা কিন্তু কোনো বাস্তব ঘটনা দেখে-পড়ে অথবা শুনে গল্প বা উপন্যাস লেখেন। অবশ্য সেটাকে পাঠকদের কাছে আকর্ষণীয় ও সুখপাঠ্য করার জন্য কল্পনার আশ্রয় নেন।

একজন ডাক্তার হয়ে তুমি লেখকদের এসব কথা জানলে কি করে?

আমার একজন বন্ধু আছেন, তিনি গল্প উপন্যাস লেখেন, তার কাছে। শুনেছিলাম। ইদানীং কিছু গল্প উপন্যাস পড়ে বন্ধুর কথাই ঠিক মনে হয়েছে।

নাতির শেষের দিকের কথা জাহিদ হাসানের কানে গেল না। তখন তিনি চিন্তা করছেন, বিশ বছর আগের ঘটনা। শিহাবের কথা বিশ্বাস করলেও আভিজাত্যের অহঙ্কারে অস্বীকার করে তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও বেশ কিছু টাকা আযীয মাস্টারকে দিতে গিয়েছিলেন। পরে অবশ্য নাতনিকে গ্রহণ না করে যে অন্যায় করেছিলেন, সে জন্য অনুশোচনা হয়েছিল। এখন নাতির পুরো গল্প শুনে নিশ্চিত হলেন, সেই নাতনিই নায়িকা এবং নায়ক নাতি হিমু।

নিশ্চিত হয়ে জাহিদ হাসান এত আনন্দিত হলেন যে, অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে সেই আনন্দের জোস সামলাবার চেষ্টা করলেন। তবু একসময় বন্ধ চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

দাদুর অবস্থা দেখে হিমু বুঝতে পারল, সে সময় আভিজাত্যের অহঙ্কারে যে অন্যায় করেছিলেন, এখন অনুশোচনার আগুন নেভাবার চেষ্টা করছেন চোখের পানি ফেলে। তবু জিজ্ঞেস করল, গল্পটা শুনে, আপনার চোখে পানি কেন?

জাহিদ হাসান নাতিকে জড়িয়ে ধরে ভিজে গলায় বললেন, সত্যি করে বল, এই গল্পের নায়ক তুই আর নায়িকা তোর ছোট চাচার মেয়ে?

হিমু বলল, হ্যাঁ দাদু, আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন।

জানিস দাদু, সেদিন তোর ছোট চাচার মেয়েকে ও শ্বশুরকে ফিরিয়ে দিয়ে যে অন্যায় করেছিলাম, তার মাশুল আজও দিতে হচ্ছে। তুই কোনো চিন্তা করবি না। তোর মা-বাবা যতই অমত করুক না কেন নায়িকাকে নাতবৌ করে আনবই আনব। নায়িকার নামটা কি বলত ভাই।

রিজিয়া।

ওটা নিশ্চয় ডাক নাম, পুরো নাম জানিস না?

না।

শোন, ডাক নামটাই যদি পুরো নাম হয়, তা হলে বিয়ের সময় নাম দেব সুলতানা রিজিয়া। ইতিহাসে একজন বিখ্যাত মহীয়সীর নাম ছিল সুলতানা রিজিয়া। বলত তিনি কে?

আমি সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেছি ইতিহাসের কথা জানব কি করে?

উনিই প্রথম নারী, যিনি দিল্লির সিংহাসনে বসে দেশ শাসন করতেন। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে সৈনিকের পোষাক পরে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যও পরিচালনা করতেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, কবে তার সঙ্গে দেখা করাবি বল। দেখার জন্য খুব অস্থিরতা অনুভব করছি।

বাসায় আনা যাবে না। মা চিনে ফেলবে। তাই ওর সঙ্গে আলাপ করে আপনাকে জানাব।

তোর ছোট চাচার বন্ধু শিহাব নিজের বাসায় রেখে রিজিয়াকে পড়াচ্ছে, তাই না?

জি।

শিহাবের বাসা চিনিস তা হলে?

 জি, চিনি।

জাহিদ হাসান চিন্তিত মুখে বললেন, রিজিয়াকে দেখতে শিহাবের বাসায়ও যেতে পারব না, অন্য জায়গায় ব্যবস্থা করবি।

দাদু কেন শিহাব চাচার বাসায় যেতে চান না, তা বুঝতে পেরে হিমু বলল, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি অন্য জায়গায় ব্যবস্থা করব।

এমন সময় সাবিহা বেগম সেখানে এসে শ্বশুরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, নাতির সঙ্গে সেই কখন থেকে কি এত গল্প করছেন? এদিকে ক’টা বাজে খেয়াল করেছেন? দেড়টা বাজে, গোসল করবেন কখন আর খাবেনই বা কখন? কতবার বলেছি, এই বয়সে সময়মতো সব কিছু না করলে অসুখ করবে। তারপর ছেলেকে বললেন, তুই ডাক্তার হয়েছিস, না গাধা হয়েছিস? দাদুর সব কিছুর দিকে লক্ষ্য রাখবি না?

জাহিদ হাসান বললেন, ওকে শুধু শুধু বকছ কেন বৌমা? ঐ তো আমার সব কিছুর দিকে লক্ষ্য রাখে। এখন ওর সঙ্গে একটা জরুরি ব্যাপারে আলাপ করছিলাম। তাই একটু দেরি হয়ে গেছে। তুমি যাও, আমরা এক্ষুনি গোসল করে খেতে আসছি।

রিজিয়ার কাছ থেকে হিমু জেনেছে, শিহাব চাচা দুপুরে খেতে এলেও তিনটের আগে আবার অফিসে যান। আর তার মামি স্বামী অফিসে চলে যাওয়ার পর বিশ্রাম নেন। ফারিহার ছোট বোন ও ভাই পাঁচটা পর্যন্ত স্কুলে থাকে। ফারিহা ও রিজিয়া সেই সময় পড়াশোনা করে। তবে ফারিহা বেশিরভাগ দিন ঘুমায়। সোয়া তিনটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে রিজিয়া তাকে ফোন করার কথা বলেছে। কয়েকদিন আগে রিজিয়া তাকে নিয়ে বায়তুল মোকাররমে গিয়েছিল। তখন মিলাদুননবী উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশন মসজিদের দক্ষিণ দিকের গেটের বাইরের চাতালে এক মাসব্যাপী ধর্মীয় বই-এর মেলার ব্যবস্থা করেছে। রিজিয়া তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্টল ঘুরে কয়েকটা ইসলামিক বই কিনে দিয়েছিল।

আজ খেয়ে উঠে ভাবল, সাড়ে তিনটেয় রিজিয়াকে ফোন করবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আড়াইটা বেজেছে দেখে ঘুমাল না। রিজিয়ার কিনে দেয়া বইগুলো থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ইমাম বুখারী (রঃ) এর ‘আল আদাবুল মুফরাদ’ বইটির বঙ্গানুবাদ ‘অন্যন্য শিষ্টাচার’ বইটি নিয়ে পড়তে লাগল। যতই পড়তে লাগল ততই ইসলামের দেয়া বিধানসমূহ জেনে হতবাক হতে লাগল। ভাবল, ইসলাম পিতা-মাতা, স্ত্রী-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবী, এতিম-মিসকিন, দাস-দাসি, এমন কি মুশরিক আত্মীয় ও সৎ-অসৎ নির্বিশেষে সকলের প্রতি সদয় ব্যবহার করার যে নির্দেশ দিয়েছে, তা কয়জন মুসলমান জানে আর কয়জন মুসলমান মেনে চলে? পড়তে পড়তে কখন ঘড়ির কাঁটা সাড়ে তিনটে পার হয়ে গেছে খেয়াল ছিল না। হঠাৎ খেয়াল হতে ঘড়ি দেখল, প্রায় চারটে বাজে। বইটা রেখে রিজিয়াকে ফোন করল।

ফারিহা ফোন ধরে সালাম দিয়ে বলল, কে বলছেন?

সালামের উত্তর দিয়ে হিমু বলল, আমি হিমু। আপনি কে?

আমি ফারিহা। কেমন আছেন?

ভালো। আপনি কেমন আছেন?

আমি ভালো, তবে রিজিয়া ভালো নেই।

সিরিয়াস কিছু?

না, তেমন কিছু নয়। তবে…

তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে হিমু বলল, ও বুঝেছি। দু’দিন ফোন করিনি, তাই মনে হয় খুব রেগে আছে।

তা আমি বলব কি করে? কেন ভালো নেই তাকেই জিজ্ঞেস করুন।

ওকে দিন তো।

দেব কি করে, ওতো নেই।

নেই মানে?

নেই মানে নেই?

 প্লিজ, দুষ্টুমি না করে কোথায় গেছে বলুন।

প্রায় এক ঘণ্টা আপনার ফোনের অপেক্ষায় থেকে একটু আগে বাথরুমে গেছে। কথা শেষ করে ফারিহা হেসে উঠল। তারপর বলল, জানেন ও খুব সেলফিস। অভিসারে যাওয়ার সময় কতবার বলি, আমাকেও নিয়ে চল না তোর হিমু সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবি। প্রতিবারেই বলে, পরেরবারে নিয়ে যাব, কিন্তু একবারও নিয়ে যায় না। আচ্ছা আপনিই বলুন তো, আমি কি ওর কাছ থেকে আপনাকে কেড়ে নেব?

এটা রিজিয়ার উচিত হয় নি। ঠিক আছে, আমি ওকে এক্ষুনি বলে দিচ্ছি, কালই যেন আপনাকে নিয়ে আসে।

দেখা যাক ও আপনার কথা রাখে কি না।

এমন সময় রিজিয়া বাথরুম থেকে এসে ফারিহাকে জিজ্ঞেস করল, কার সঙ্গে কথা বলছিস?

তোর হিমু সাহেবের সঙ্গে বলে ফারিহা তার হাতে রিসিভার ধরিয়ে দিল।

রিজিয়া সালাম বিনিময় করে অভিমানভরা কণ্ঠে বলল, দু’দিন ফোন কর নি কেন?

হিমু বলল, ফোন না করে দেখলাম, তুমি কতটা অভিমান করতে পার।

তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে প্রতিদিন ফোন করবে?

কথাটা মনে ছিল না। এবার থেকে মনে রাখার চেষ্টা করব। এই একটা সুখবর আছে।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, তাই।

তা হলে তাড়াতাড়ি বল।

 এখন আর অভিমান নেই তো?

 একটু একটু আছে, সুখবরটা শোনার পর একেবারেই থাকবে না।

কিন্তু সুখবরটা ফোনে বলা যাবে না যে!

কেন?

সুখবরের আগে দুঃখের খবর আছে। সেটা না শুনলে সুখবরের গুরুত্ব বুঝতে পারবে না। তাই সামনা-সামনি বলতে চাই।

এখন না হয় আগে দুঃখের খবরটা বলে তারপর সুখবরটা বলবে।

সেসব অনেক কথা। অত কথা ফোনে বলা যাবে না। তাই তো সামনা সামনি বলার কথা বললাম। এক কাজ কর, এক্ষুনি ফারিহাকে নিয়ে গুলশানের ঐ চায়নিজ রেস্টুরেন্টে চলে এস, আমি অপেক্ষা করব। আর একটা কথা, ফারিহা তোমার সঙ্গে আসতে চাইলে তুমি নাকি প্রতিবারেই বল, পরেরবারে নিয়ে আসার কথা?

রিজিয়া হেসে উঠে বলল, ফারিহা বুঝি তোমাকে তাই বলেছে?

হ্যাঁ, একটু আগে তাই তো বলল।

রিজিয়া হাসতে হাসতে বলল, ও না ভীষণ ফাজিল। আমিই বরং ওকে প্রতিবারে যাওয়ার জন্য বলি। ও তখন বলে, আমি সঙ্গে থাকলে তোদের ডিস্টার্ব হবে। তাই কোনো অভিসারিণীর সঙ্গী হতে চাই না। হিমু সাহেব যখন তোর বর হবে তখন চুটিয়ে আলাপ করব।

ফারিহা ঝট করে রিজিয়ার হাত থেকে রিসিভার কেড়ে নিয়ে বলল, হিমু সাহেব, ওর কথা বিশ্বাস করবেন না, ও মিথ্যে বলতে ওস্তাদ।

ওরে আমার সত্যবাদী রে বলে রিজিয়া তার হাত থেকে রিসিভার কেড়ে নেয়ার সময় বলল, তুই দিন দিন খুব বেশি ফাজিল হয়ে যাচ্ছিস। তারপর হিমুকে বলল, আমরা আসছি, এবার রাখি তা হলে?

রাখ বলে হিমু সালাম বিনিময় করে লাইন কেটে দিল।

রিজিয়া রিসিভার ক্র্যাডেলে রেখে ফারিহাকে বলল, তৈরি হয়ে নে, এক্ষুনি যেতে বলল।

ফারিহা বলল, তুইতো জানিস কেন আমি তোদের অভিসারের সঙ্গী হতে চাই নি, তবু বলছিস কেন?

রিজিয়া বলল, আজ তোর কোনো কথাই শুনব না। ফাজলামি না করে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।

ফারিহা ও রিজিয়া রেস্টুরেন্টে ঢুকে এদিক ওদিক তাকিয়ে হিমুকে একা একটা টেবিলে বসে থাকতে দেখে রিজিয়া বলল, ঐ যে তোর হিমু সাহেব আমাদের আগেই এসে গেছেন।

ফারিহা মৃদু হেসে বলল, হিমু সাহেব আমার না, তোর?

রিজিয়া বলল, আমার শুধু হিমু, আর তোর হিমু সাহেব। চল, বেশি ফাজলামি করবি না বলছি।

কাছে এসে দু’জনেই সালাম দিল।

হিমু সালামের উত্তর দিয়ে বসতে বলল। বসার পর ফারিহার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি হিমু, আপনি নিশ্চয় ফারিহা?

মৃদু হেসে ফারিহা বলল, জি।

রিজিয়া হিমুকে বলল, ভালোমন্দ কি সব খবর শোনাবার জন্য আসতে বললে বল।

হিমু কিছু বলার আগে ফারিহা বলল, তার আগে আমি একটা কথা বলতে চাই।

রিজিয়া মনে করল, ফারিহা একটু দুষ্টুমি করতে চাচ্ছে। তাই বলল, তুই আবার কি বলবি? চুপচাপ বসে থাক।

ফারিহা বলল, তোর হিমুর সাথে যদি একটা কথাও বলতে না দিবি, তা হলে নিয়ে এলি কেন?

রিজিয়া কিছু বলতে যাচ্ছে দেখে হিমু হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, বলুক না উনি কি বলতে চান। তারপর ফারিহাকে বলল, রিজিয়া শুনতে না চাইলে কানে আঙ্গুল দিয়ে থাকুক, আমি শুনব, আপনি বলুন।

ফারিহা এক পলক রিজিয়ার দিকে চেয়ে নিয়ে বলল, আমি ওর থেকে দু’বছরের ছোট। ওকে যখন তুমি করে বলেন, আমাকেও তুমি করে বলবেন। এটা হল প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা হল, ওর সম্পর্কে ফোনে যা কিছু বলেছি, দুষ্টুমি করে বলেছি। ও আমার কাছে মাঝে মধ্যে এক আধটা মিথ্যে বললেও আপনার কাছে কোনোদিন বলে নি, ভবিষ্যতেও কোনো দিন বলবে না। কারণ ও খুব ধার্মিক। তাই দুজনের কাছে ক্ষমা চাইছি। আমার আর কিছু বলার নেই।

ফারিহা থেমে যেতে হিমু রিজিয়ার মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

রিজিয়া বলল, এতক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কি দেখছ? যা বলার তাড়াতাড়ি বল।

হিমু যেন এতক্ষণ অন্য জগতে ছিল। রিজিয়ার কথায় বাস্তবে ফিরে এসে বলল, কি যেন বললে?

রিজিয়ার আগে ফারিহা বলে উঠল, বিয়ের আগে যদি রিজিয়ার মুখ দেখে বাস্তবজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বিয়ের পর কি করবেন আল্লাহ মালুম।

রিজিয়া মিষ্টি ধমক দিয়ে বলল, তোকে নিয়ে এসে ভুল করেছি, না আনাই উচিত ছিল।

ফারিহা বলল, বকছিস কেন? আমি তো আসতেই চাই নি, তুই তো জোর করে নিয়ে এলি।

হিমু হাসতে হাসতে বলল, প্লিজ তোমরা চুপ কর। তারপর রিজিয়াকে বলল, কি বললে বলবে তো?

রিজিয়া আগের কথাটা রিপিট করে বলল সুখ-দুঃখের খবরগুলো বল।

হিমু বলল, প্রথমে দুঃখের খবরটা বলছি। মাকে তোমার পরিচয় দিয়ে আমার সিদ্ধান্তের কথা বলি। আড়ং-এ তোমাকে দেখে মা পছন্দ করলেও তোমার পরিচয় জানার পর আমাকে খুব রাগারাগি করে বলল, পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরের এতিম মেয়ে এ বাড়ির বৌ হওয়ার উপযুক্ত নয়। তারপর মা যা কিছু বলেছিল সব বলার পর বলল, আমিও আর একবার আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছি। মা নিশ্চয় বাবাকে সব কিছু জানিয়েছে। তাই বাবা আমার ওপর খুব অসন্তুষ্ট। যদিও বাবা আমাকে বকাঝকা করে নি, তবু আমার ধারণা তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার জন্য আমাকে ফরেনে উচ্চ ডিগ্রি নিতে পাঠাবার কথা বলেছেন। আমি রাজি না হয়ে বলেছি, চেম্বার করে দাও, এখানেই প্র্যাকটিস করব। শুনে বাবা ভীষণ রাগারাগি করেছেন। আমিও বলেছি প্রয়োজনে যেদিক দু’চোখ যায় চলে যাব, তবু ফরেনে যাব না। আমার কথা শুনে বাবা আরো রেগে উঠে বলল, তাই যা। যে ছেলে মা-বাবার অবাধ্য, তার মুখ দেখতে চাই না। মা তখন বাবার ওপর রেগে গিয়ে বলল, আমাদের একমাত্র সন্তানকে এসব কথা বলতে পারলে? ও চলে গেলে আমরা কাকে নিয়ে বাঁচব? কে আমাদের এই সম্পত্তি ভোগ করবে? তারপর আমাকে প্রবোধ দিয়ে বলল, তোর বাবার কথায় রাগ করিস না। তোকে এখানে চেম্বার করে দেব। তারপর থেকে তারা আমার বিয়ে দেয়ার জন্য পাত্রী দেখে বেড়াচ্ছে। এই হল দুঃসংবাদ বলে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, ভয় পেয়ে দু’জনেরই মুখ শুকিয়ে গেছে।

রিজিয়া কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না।

ফারিহা ভেবেছিল রিজিয়া কিছু বলবে। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল, তা হলে তো খুব চিন্তার কথা। মা-বাবার মনে কষ্ট দিতে আল্লাহ কুরআন পাকে নিষেধ করেছেন। আপনি মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তাদের মনে কষ্ট দেয়া মোটেই উচিত হবে না। তাদের অমতে গোপনে বিয়ে করলে ইহকালে যেমন সুখ-শান্তি পাবেন না, তেমনি পরকালেও দোযখের আগুনে জ্বলতে হবে।

হিমু বলল, ওসব কথা আমিও জানি। তাই মা-বাবার মনে কষ্ট না হয় সেই রকম একটা পথ আল্লাহ আমাকে করে দিয়েছেন।

রিজিয়া ভয়ে এতক্ষণ কোনো কথা বলে নি। হিমুর শেষের কথা শুনে বলল, সেই পথটার কথা বল।

হিমু বলল, এত ভয় পাচ্ছ কেন? সুখবরটা শুনলেই পথটার কথা জানতে পারবে। সুখবরটা পরে বলছি, তার আগে যে কথা বলব শুনে চমকে উঠবে। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার বাবার নাম রাকিব হাসান, তাই না?

রিজিয়া খুব অবাক হয়ে বলল, হ্যাঁ, কিন্তু তুমি জানলে কি করে? তোমাকেতো বাবার নাম বলি নি।

এমন সময় বেয়ারা নাস্তা নিয়ে এলে হিমু বলল, আগে নাস্তা খেয়ে নিই এসো তারপর বলব।

নাস্তার আইটেম দেখে ফারিহা বলল, আমরা তো কেউ অর্ডার দিই নি, তবু এসব দিল কেন?

হিমু বলল, আমি প্রায় সময় এখানে নাস্তা খাই। এখানকার সবাই আমাকে চেনে এবং কি কি খেতে পছন্দ করি তাও জানে। তা ছাড়া রিজিয়াকে নিয়ে কয়েকবার এখানে নাস্তা খেতে এসেছি। তাই এখানে এলে অর্ডার দিতে হয় না। এসব আইটেম কি তোমার পছন্দ নয়?

ফারিহা বলল, না-না, তা নয়। বরং এগুলো আমিও পছন্দ করি।

তা হলে শুরু করা যাক বলে হিমু খেতে শুরু করল।

খাওয়ার পর রিজিয়া হিমুকে বলল, বাবার নাম জানলে কি করে বল।

হিমু বলল, শুধু নামই নয়, বাড়ি ঢাকায়, বড় বিজনেস ম্যানের ছেলে। তোমার মায়ের নাম সাবেরা তাও জানি। আরো জানি, রাকিব হাসান বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে তোমার মাকে দেখে মুগ্ধ হন এবং মা-বাবাকে না জানিয়ে বিয়ে করেন। বিয়ের ছ’মাসের মধ্যে কানাডায় রোড এ্যাকসিডেন্টে মারা যান। তোমার বয়স যখন দু’বছর তখন তোমার মাও মারা যান। আরো অনেক কিছু জানি। সেসব শোনার দরকার আছে বলে মনে করি না।

হিমুর কথা শুনে রিজিয়া এত অবাক হল যে, বেশ কিছুক্ষণ স্ট্যাচুর মত বসে রইল।

ফারিহা এসব কথা বাবার কাছে কিছু কিছু শুনলেও রিজিয়ার কাছে সব কিছু শুনেছে। কিন্তু উনি কি করে এসব কথা জানলেন ভেবে সেও খুব অবাক হল।

তাদের অবস্থা দেখে হিমু মৃদু হেসে বলল, আমার কথা শুনে তোমরা যতটা অবাক হয়েছ, এবার যা বলব, শুনে আরো বেশি অবাক হবে। তারপর রিজিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমার বাবা রাকিব হাসান আমার আপন ছোট চাচা। আর তুমি হলে আপন চাচাত বোন।

ফারিহা শুনে চমকে উঠে মূক ও বধির হয়ে গেল।

আর রিজিয়া চমকে উঠলেও আনন্দ ও বেদনায় তার চোখ দিয়ে পানি গড়ে পড়তে লাগল।

এক সময় ফারিহা বলে উঠল, তা হলে আপনি সব কিছু জেনেই রিজিয়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

হিমু বলল, কথাটা ঠিক না হলেও একেবারে অস্বীকার করতে পারব না। দু’বছরের রিজিয়াকে যখন তার নানা দাদা-দাদির কাছে দিতে এসেছিলেন তখন আমার বয়স আট-নয় বছর হবে। তাদেরকে অপমান করে তাড়িয়ে দিতে আমি খুব দুঃখ অনুভব করি। পুরো ঘটনাটা শুনে আমার মনে দাগ কাটে এবং আজও ছবির মতো মনে আছে। বড় হওয়ার পর একদিন দাদাজীকে জিজ্ঞেস করে সব কিছু জেনে নিই। তারপর চাচার মতো আমিও এক বন্ধুর সঙ্গে তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে রিজিয়াকে দেখে মুগ্ধ হই এবং বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই। তাই বন্ধুর কাছে রিজিয়ার সব কিছু জানার চেষ্টা করি। সে অনেক কিছু বলতে পারলেও সবটা পারল না। তখন তার বাবার কাছ থেকে জেনে নিই এবং সিদ্ধান্তটা দৃঢ় করি। তারপর বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণ, ডাক্তারি পাস করার পর রিজিয়াদের গ্রামে যাওয়ার কথা ও ঢাকায় ফিরে রিজিয়াকে খোঁজাখুঁজির কথা বলল।

রিজিয়া সামলে নিয়ে চোখ মুছে হিমুর কথা শুনছিল। সে থেমে যেতে বলল, এবার সুখবরটা বল।

হিমু আবার বলতে শুরু করল, আড়ং-এ তোমাকে দেখার পর দাদাজীকে তোমাকে পছন্দ করার কথা জানাই। তিনি আমাকে ভীষণ ভালবাসেন। তাই তোমাকে দেখতে চাইলেন। আমি বললাম, নিশ্চয় দেখাব। তারপর গতকাল যখন তোমার পরিচয়, মা-বাবার অমতের কথা ও আমার সিদ্ধান্তের কথা বললাম তখন অভয় দিয়ে বললেন, তুই কোনো চিন্তা করিস না, আমি যেমন করে তোক রিজিয়াকে নাতবৌ করে ঘরে আনবই। তারপর ছলছল চোখে বললেন, দু’বছরের রিজিয়াকে সেদিন আভিজাত্যের অহঙ্কারে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম বটে, কিন্তু সেই থেকে বিবেকের কষাঘাতে আজও আমি জর্জরিত। আরো বললেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা কর। তাই বলছি, দাদাজী যখন আমাদের পক্ষে তখন আর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এখন বল, কোথায় তোমার ও দাদাজীর সাক্ষাৎ হতে পারে?

রিজিয়া বলার আগে ফারিহা বলল কেন? আমাদের বাসায় দাদাজীকে নিয়ে আসুন অথবা রিজিয়াকে আপনাদের বাসায় নিয়ে যান।

হিমু বলল, মা রিজিয়াকে দেখেছে, চিনে ফেলবে।

তা হলে আমাদের বাসায় নিয়ে আসুন। রিজিয়াকে দেখাও হবে আর সেই সাথে বাবার কাছে প্রস্তাবও দেবেন।

কথাটা মন্দ বল নি। দাদুর সঙ্গে আলাপ করে দেখি উনি কি বলেন।

এবার রিজিয়া বলল, মনে হয় দাদু আমাদের বাসায় যাবেন না। কারণ শিহাব মামা আব্দুর বন্ধু ছিলেন। তাকে দাদু চেনে। ছোটবেলায় যখন নানাজী আমাকে দিতে এসেছিলেন তখন শিহাব মামাও সঙ্গে ছিলেন এবং তিনিই আব্বার বিয়ের ঘটনা বলে আমাকে গ্রহণ করতে বলেছিলেন। সেদিন তাকেও দাদু যা তা বলে অপমান করেছিলেন।

হিমু বলল, তোমার ধারণা ঠিক। ছেলের বন্ধু জেনেও যাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তার বাসায় যাবেনইবা কি করে? আর বিয়ের প্রস্তাবই বা দেবেন কি করে?

ফারিহা বলল, শুধু দেখতে চাইলে একদিন দাদুকে এখানে নিয়ে আসুন, রিজিয়াকেও সেই সময় আসতে বলবেন।

হিমু বলল, ঠিক আছে, একটু আগে বললাম না, দাদুর সঙ্গে আলাপ করে দেখি, তিনি যা বলবেন তাই করব?

তা হলে এখন ওঠা যাক বলে রিজিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল।

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে স্কুটারে ওঠার সময় ফারিহা হিমুকে বলল, একদিন আমাদের বাসায় আসুন না।

হিমু বলল, গেলে মা-বাবাকে কি পরিচয় দেবে?

রিজিয়ার দিকে একবার চেয়ে নিয়ে ফারিহা বলল, কি আবার বলব? যা সত্য তাই বলব।

হিমু কিছু বলার আগে রিজিয়া মিষ্টি ধমকের স্বরে বলল, এতক্ষণ তো বেশ ছিলি, এখন আবার ফাজলামি শুরু করলি?

ফারিহা হাসিমুখে হিমুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনিই বলুন তো, আমি কি ফাজলামি করলাম?

রিজিয়া বলল, থাক, সাফাইয়ের জন্য আর সাক্ষী মানতে হবে না। তারপর হিমুর সঙ্গে সালাম বিনিময় করে ড্রাইভারকে স্কুটার ছেড়ে দিতে বলল।

.

বাসায় ফিরে হিমু দাদুকে বলল, আপনি যে রিজিয়াকে দেখতে চান, কোথায় কিভাবে দেখবেন? কারণ বাসায় নিয়ে এলে মা চিনে ফেলবে। আর শিহাব চাচাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাদের বাসায় যাওয়াও কি ঠিক হবে? তিনি যদি অপমানের বদলা নেয়ার জন্য আপনাকে অপমান করেন?

জাহিদ হাসান ম্লান হেসে বললেন, জ্ঞান অনুপাতে তোমার কথা ঠিক। তবে আমার যতদূর মনে হয় শিহাব তা করবে না, বরং খুশিই হবে। আর যদি সত্যি সত্যি অপমান করে, তবু আমি যাব এবং বিয়ের প্রস্তাবও দেব। তোমাকে ও রিজিয়াকে সুখী করার জন্য সব অপমান হজম করতে পারব। তুমি এখন যাও, চিন্তাভাবনা করে তোমাকে জানাব।

.

০৬.

আজ শিহাব একটা সুদর্শন ছেলেকে নিয়ে অফিস থেকে বেশ দেরিতে বাসায় ফিরলেন। তাকে ড্রইংরুমে বসিয়ে ভেতরে গেলেন।

স্বামীকে দেখে আরিফা বেগম বললেন, ফিরতে দেরি হল যে?

শিহাব স্ত্রীর কথার উত্তর না দিয়ে বললেন, কিছুদিন আগে আমাদের অফিসের ফাহিম নামে একটা ছেলের কথা বলেছিলাম মনে আছে?

আরিফা বেগম কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, কই, মনে পড়ছে না তো।

তোমার যদি কিছু মনে থাকে। মাস ছয়েক আগে মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া একটা গরিব ঘরের ছেলেকে অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজারের পোস্টে চাকরি দেয়ার কথা বলেছিলাম না?

ও হা হা মনে পড়েছে। চাকরি দেয়ার কিছুদিন পর বলেছিলে ছেলেটা খুব ধার্মিক ও কর্মঠ। তা সে কি অফিসে কিছু অঘটন ঘটিয়েছে?

আরে না, অঘটন ঘটাইনি বরং বর্তমান যুগে এক বিরল ঘটনা ঘটিয়েছে। বলছি শোন, আমাদের অফিসের ম্যানেজার বেশ কয়েক বছর ধরে কারসাজি করে অফিসের প্যাডে সরকারের বিভিন্ন অফিসে টেন্ডার দিয়ে মাল সাপ্লাই দিচ্ছিলেন। এ বছর ফাহিম তার কারসাজি ধরে ফেলে এবং ম্যানেজারকে সেকথা জানায়। ম্যানেজার ওকে একলক্ষ টাকা দিয়ে ঘটনাটা আমাকে জানাতে নিষেধ করে বলেন, পরবর্তীতে সাহেবের অগোচরে যা কিছু করব, তার ফিফটি পার্সেন্ট আপনাকে দেব। আর এসব কথা যদি সাহেবের কানে তোলেন, তা হলে আপনাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলা হবে। ফাহিম ম্যানেজারকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে আমাকে সব কিছু জানায় এবং টাকাটা আমার টেবিলের উপর রাখে। আমি ম্যানেজারকে ডেকে ঘটনাটা সত্য কিনা জিজ্ঞেস করি। ম্যানেজার ধারণাই করতে পারেন নি, ফাহিম এতবড় টোপ না গিলে আমাকে জানাবে। তাই আমার কথা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে মুখ নিচু করে চুপ করে রইলেন। তখন টাকাটা টেবিলের উপর ছিল আর ফাহিমও সামনে দাঁড়িয়েছিল। ঘটনা সত্য বুঝতে পেরে ম্যানেজারকে বললাম, আপনাকে ডিসচার্জ করা হল টাকা নিয়ে সিটে গিয়ে বসুন, ডিসচার্জ লেটার একটু পরে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ম্যানেজার টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার পর ডিসচার্জ লেটারের একটা ড্রাফট লিখে ফাহিমের হাতে দিয়ে বললাম, এটা টাইপিস্টের কাছ থেকে টাইপ করিয়ে আন। ফাহিম টাইপ করিয়ে আনার পর পিয়নকে দিয়ে ম্যানেজারের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। আর ফাহিমকে বললাম, তোমাকে ম্যানেজারের পোস্ট দেয়া হল। কাল থেকে তুমি ম্যানেজারের সিটে বসবে। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি থাক কোথায়? বলল, খিলগাঁয়ে ম্যানেজারের বাড়ির পাশের বাড়িতে মাকে নিয়ে থাকি। বললাম ম্যানেজার তোমার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। তা ছাড়া খিলগাঁও মতিঝিল থেকে অনেকটা দূর। মুগদাপাড়া অথবা গোপীবাগ খুব কাছে। ওদিকে বাসাভাড়া নাও। আমার কথা শুনে ফাহিম মৃদু হেসে বলল, আমি আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় করি না। তবু আপনি যখন বলছেন, তাই করার চেষ্টা করব। আজ ওকে ম্যানেজারের কাজ কর্ম বোঝাতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। তা ছাড়া ওকে নিয়ে একটু গুলশানে গিয়েছিলাম। বাসা চেনাবার জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। আমি ড্রইংরুমে যাচ্ছি, আমাদের চা-নাস্তা পাঠিয়ে দাও।

ফাহিম যখন নাস্তা খাচ্ছিল তখন আরিফা বেগম পর্দার আড়াল থেকে তাকে দেখেছেন। সে চলে যাওয়ার পর ভেতরে এলেন।

শিহাব জিজ্ঞেস করলেন, ফাহিমকে দেখেছ?

আরিফা বেগম বলেন, হ্যাঁ দেখেছি। খুব সুন্দর ছেলে। একবার দেখলে বারবার দেখতে ইচ্ছা করে।

ঠিকই বলেছ। ছেলেটা দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি মনও খুব সুন্দর। এত ভালো ছেলে এ যুগে দেখাই যায় না। ভাবছি ওর সঙ্গে রিজিয়ার বিয়ে দেব। এ ব্যাপারে তোমার মতামত বল।

ছেলেটাকে দেখে আমারও তাই মনে হয়েছে।

 কিন্তু রিজিয়া আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।

আরিফা বেগম অবাক হয়ে বললেন, রিজিয়া তোমাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে মানে?

বললেই বুঝতে পারবে। কিছুদিন আগে বাসায় ফেরার সময় ওকে আমাদের গলির মোড়ে একটা প্রাইভেট কার থেকে নামতে ও ড্রাইভারের সিটে বসা একটা হ্যাঁন্ডসাম ছেলের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলতে দেখেছিলাম। আজ গুলশান হয়ে ফেরার সময় একটা রেস্টুরেন্টের সামনে রিজিয়া, ফারিহা ও সেই ড্রাইভারকে আলাপ করতে দেখলাম। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না।

কি বললে, ফারিহাও ওদের সঙ্গে ছিল?

হ্যাঁ ছিল এবং ফারিহাকেই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি।

তাই যদি হয়, তা হলে ফারিহাকে জিজ্ঞেস করলে সব কিছু জানা যাবে।

জানার পর আমাকে বলবে। এখন আমি একটু বেরোব বলে শিহাব উঠে দাঁড়ালেন।

পরের দিন একসময় আরিফা বেগম মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, কাল বিকেলে তোরা কোথায় গিয়েছিলি?

মা কখনও কোনো কিছুর কৈফিয়ৎ চায় নি। তাই আজ চাইতে ফারিহা খুব অবাক হয়ে বলল, হঠাৎ এরকম প্রশ্ন করছ কেন? এর আগে তো কোনো দিন করো নি?

আগে প্রয়োজন হয় নি, তাই করি নি। কাল বিকেলে তোর বাবা তোদেরকে গুলশানে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে একটা ছেলের সঙ্গে আলাপ করতে দেখেছে। সেই ছেলেটা কে? আর তোদের সঙ্গেই বা ছিল কেন?

মায়ের কথা শুনে ফারিহা ঘাবড়ে গিয়ে মুখ নিচু করে চুপ করে রইল।

 কিরে, চুপ করে আছিস কেন? বলবি তো ছেলেটা কে?

ফারিহা চিন্তা করল, মিথ্যে বলে লাভ নেই, একদিন না একদিন তো ছেলেটার কথা বলতেই হবে। সাহস সঞ্চয় করে বলল, ছেলেটার নাম হিমু। ডাক্তারি পাস করেছে। রিজিয়াকে ভালবাসে। রিজিয়াও ছেলেটাকে ভালবাসে।

মেয়ের কথা শুনে আরিফা বেগম যেমন রেগে গেলেন তেমনি অবাকও হলেন। বললেন, ইসলামে ছেলে মেয়েদের মধ্যে প্রেম-ভালবাসা নিষেধ জেনেও রিজিয়া এ পথে পা বাড়াল? আর তুইও জেনেশুনে তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছিস? এদিকে তোর বাবা রিজিয়ার জন্য আমাদের অফিসের ম্যানেজারকে পছন্দ করেছে। ছেলেটা খুব সুন্দর ও ধার্মিক। এসব কথা তোর বাবা জানলে কি হবে ভেবে দেখ। আর তুই তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছিস শুনলে তোকে আস্ত রাখবে?

মা তুমি সব কথা না শুনে রাগ করছ। ওদের সম্পর্কে সব কিছু শোন, তারপর যা বলার বলো। তারপর হিমুর পরিচয়, কিভাবে হিমু রিজিয়াকে দেখে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ও ঢাকায় কিভাবে রিজিয়াকে দেখে, সব কিছু খুলে বলল।

আরিফা বেগম আর একবার অবাক হয়ে বললেন, এসব তুই কি বলছিস?

হ্যাঁ মা, হিমু ভাই আজ সব কিছু জানাবার জন্য আমাদেরকে গুলশানের ঐ রেস্টুরেন্টে যেতে বলেছিলেন।

আরিফা বেগম চিন্তা করলেন, তা হলে কিছুদিন আগে আমাদের গলির মুখে রিজিয়াকে ঐ ছেলেটাই গাড়ি করে পৌঁছে দিতে এসেছিল?

মাকে চিন্তা করতে দেখে ফারিহা বলল, বাবাকে ওদের সম্পর্কে সব কিছু জানাব ভেবেছিলাম, তার আগেই তোমাকে জানালাম। তুমি বাবাকে সব কিছু বলে ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে বলবে।

তোর বাবা আর হিমুর চাচা যে বন্ধু ছিল, তা কি হিমু বলেছে?

হ্যাঁ বলেছে। আরো বলেছে, ছোট বেলায় রিজিয়াকে তার দাদা-দাদির কাছে দিতে তার নানার সঙ্গে বাবা এসেছিলেন। ওঁনারা তাদেরকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

আরিফা বেগম অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তোর বাবা শুনলে মনে হয় খুব রেগে যাবে।

কিন্তু মা, বাবার রেগে যাওয়া কি উচিত হবে? যদি হিমু ভাইকে ছাড়া রিজিয়া অন্য কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে না চায়? কাল ওদের দু’জনের কথা শুনে মনে হয়েছে, ওরা একে অপরের জন্য জীবন পর্যন্ত দেবে, তবু একে অপরকে ছাড়া বিয়েই করবে না। বাবাকে তুমি বুঝিয়ে বলবে।

কিন্তু তোর বাবা যে ম্যানেজারের সঙ্গে ওর বিয়ে দেয়ার কথা বলল, তার কি হবে? কাল বিকেলে তোর বাবা ম্যানেজারকে বাসায় নিয়ে এসেছিল। আমি ছেলেটাকে দেখেছি। অত সুন্দর ছেলে কখনো দেখি নি। তোদের ফেরার পাঁচ মিনিট আগে চলে গেছে। একটু আগে এলে তোরাও দেখতে পেতিস।

যত সুন্দর ও ভালো ছেলে হোক, এক্ষুনি বললাম না, রিজিয়া হিমু ভাইকে ছাড়া বিয়ে করবে না। এমনকি মরে গেলেও না।

তুই এতকিছু জানলি কি করে?

 রিজিয়াই বলেছে।

 ঠিক আছে, তোর বাবাকে বলে দেখি, সে কি করে।

.

ফারিহা মায়ের কাছ থেকে এসে রিজিয়াকে সব কিছু জানিয়ে বলল, শেষ পর্যন্ত তোর বিয়ের ওকালতি করতে হল। মনে হচ্ছে, মা রাজি আছে, বাবাও রাজি হয়ে যাবে।

রিজিয়া ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, মামা যদি রাজি না হন?

তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? মাকে বলেছি বাবাকে বুঝিয়ে বলতে। তবু যদি বাবা রাজি না হয়, আমি বাবাকে বোঝাবার চেষ্টা করব।

মামা রেগে গেলে তুই কিছু বলতে পারবি?

পারব না মানে, নিশ্চয় পারব। তোকে সুখী করার জন্য আমি সব কিছু করতে পারব। এমনকি জীবনও দিতে পারব।

রিজিয়া ছলছল চোখে বলল, তুই আমাকে এত ভালবাসিস কেন? তোর ঋণ শোধ করব কি করে?

কে তোকে ঋণ শোধ করতে বলেছে? আমি তোকে কর্জে হাসানা দিচ্ছি। তুই শোধ করতে না পারলে আমি কোনদিন তাগিদ দেব না। আমাকে আল্লাহ উত্তম জাজা (প্রতিদান) দেবেন।

দোয়া করি, আল্লাহ যেন তোকে তোর মনের মতো বর দেন।

এই রিজিয়া কি হচ্ছে? ছোট বোনের সঙ্গে ফাজলামি করছিস?

আরে আমার ছোট রে, আমাকে বড় বলে মানিস? ছোট হয়ে তুই যখন বড়র সঙ্গে ফাজলামি করতে পারিস, আমি বড় হয়ে পারব না কেন? তা ছাড়া আমি তো দোয়া করলাম। দোয়া করাকে কেউ ফাজলামি বলে না।

যাই বল না কেন, এবার হিমু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে দুলাভাই বলে ডাকব।

তবে রে তোর ফাজলামি বের করছি বলে রিজিয়া ওকে মারার জন্য ধরতে গেল।

ফারিহা দৌড়ে পালাবার সময় বলল, দেখিস যা বললাম তাই করব।

.

সময় সুযোগমতো আরিফা বেগম স্বামীকে বললেন, তুমি যে তোমার অফিসের ম্যানেজারের সঙ্গে রিজিয়ার বিয়ে দিতে চাচ্ছ, এদিকে তো রিজিয়া তার চাচাত ভাইকে ভালবাসে। তাকে ছাড়া অন্য কোনো ছেলেকে বিয়ে করবে না।

শিহাব খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

কি? খুব অবাক হয়েছ তাই না?

অবাক হওয়ার কথা নয় কি?

হ্যাঁ,অবাক হওয়ারই কথা। শুনে আমিও খুব অবাক হয়েছিলাম।

কার কাছে শুনেছ?

ফারিহার কাছে।

শিহাব আরো বেশি অবাক হয়ে বললেন, কি বললে?

 বললাম তো ফারিহার কাছে। রিজিয়া ওকে বলেছে।

চাচাত ভাইটা কে? বুঝতে পারছি না।

না বোঝার কি আছে? তোমার বন্ধুর বড় ভাইয়ের ছেলে হিমু।

আশ্চর্য, ছেলেটার নামও জান দেখছি?

বললাম না, ফারিহা বলেছে? তারপর ফারিহা তাদের দু’জনের সম্পর্কে যা কিছু বলেছে আরিফা বেগম বললেন।

সব কিছু শুনে শিহাব অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

কি হল? মনে হচ্ছে কিছু যেন চিন্তা করছ?

হ্যাঁ, চিন্তা করছি। এইজন্য লোকে বলে, আল্লাহ যার সঙ্গে যার জোড়া করে থাকেন, যেমন করে হোক তাদের বিয়ে হবেই।

আরিফা বেগম ভেবেছিলেন, রিজিয়ার ঘটনা শুনে স্বামী তার ওপর খুব রেগে যাবে। তা হল না দেখে মনে মনে খুশি হয়ে বললেন, তুমি তা হলে রিজিয়াকে তার চাচাত ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতে রাজি?

হা রাজি। তবে সহজে হিমুর দাদা ও বাবার কাছে নতি স্বীকার করব না। আমি তাদের আভিজাত্যের অহঙ্কার ভেঙ্গে দিতে চাই। দেখি, আল্লাহ কোন পথে রাজি।

আর ম্যানেজার ফাহিমের ব্যাপারে কিছু ভাববে না?

ওর ব্যাপারে আবার কি ভাবব? তাকে তো বলি নি, রিজিয়ার সঙ্গে বিয়ে দেব। ভালো জেনে রিজিয়ার জন্য পছন্দ করেছিলাম।

যদি কিছু মনে না কর তা হলে একটা কথা বলি?

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের কাছে ইসলামের পরিপন্থী ছাড়া সব কিছু বলতে পারে। এতে কারো কিছু মনে করা উচিত নয়। নিশ্চিন্তে বল, কি বলতে চাচ্ছ।

ফাহিমকে ফারিহার জন্য সিলেক্ট করলে হয় না?

তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ দেব, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আমি প্রথমে ফারিহার জন্যই ওকে পছন্দ করি। পরে চিন্তা করে দেখলাম, নিজেদের অফিসের কর্মচারীকে তুমি হয়তো পছন্দ করতে নাও পার। তাই রিজিয়ার কথা বলি। ফারিহাকে হয়তো আল্লাহ ফাহিমের জোড়া করেছেন তাই এরকম হল। তারপর বললেন, ফারিহা যেন রিজিয়াকে বলে, হিমুকে একদিন বাসায় নিয়ে আসতে। আর শোন, এখন অফিসে কাজের চাপ। চাপ কমলে একদিন ফাহিমকে নিয়ে আসব। সেদিন ফারিহা যেন কোথাও না যায়। ওদের পরিচয় করিয়ে দেব। একে অপরকে দেখুক, আলাপ করুক। ওদেরও তো নিজস্ব মতামত আছে।

তাতো বটেই। যেদিন ফাহিমকে নিয়ে আসবে, সেদিন টাইমটা ফোন করে জানাবে। ফারিহা যদি কোথাও যেতে চায়, নিষেধ করব। আচ্ছা, আগের ম্যানেজার ফাহিমের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে কিনা খোঁজ নিয়েছ?

তা আবার নিই নি। সে রকম কিছু ঘটনা ঘটে নি।

ওকি আগের বাসা ছেড়ে দিয়েছে?

না, বাসা খুঁজছে। পেলে ছেড়ে দেবে।

ততদিন যদি ফাহিমের কোনো ক্ষতি হয়ে যায়? তার চেয়ে আমাদের বাড়ির একটা ফ্লাট খালি করে সেখানে ফাহিমকে থাকতে দিলে হয় না?

তুমি খুব ভালো কথা বলেছ। এটা আমার মাথায় আসে নি। ওকে যখন আমরা জামাই করতে চাচ্ছি তখন ওর ভালোমন্দ আমাদেরই চিন্তা করা উচিত। সামনের মাসে যাতে একটা ফ্লাট খালি হয় সেই ব্যবস্থা করতে কেয়ারটেকারকে আজই বলে দেব।

হ্যাঁ, তাই কর। আমাদের বাড়িটা এখান থেকে কাছে। মাঝে মধ্যে গিয়ে ওর মায়ের সঙ্গে আলাপ করে আসব।

শিহাব হেসে উঠে বললেন, আলাপ করতে যাবে, না মেয়ের হবু শাশুড়ির আচার ব্যবহার কেমন দেখতে যাবে?

মেয়ের শাশুড়ি কেমন, মেয়েকে জ্বালাবে কি না মা হয়ে দেখব না? সামনের মাসেই যেন ফ্লাট খালি হয়, সেই ব্যবস্থা করবে।

বললাম তো করব।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *