ফালি ফালি তালি তালি

ফালি ফালি তালি তালি

বড় ম্যানেজ করা গেল না বলে, কেটে ছেটে মাপে নিয়ে আসা হল। থিঙ্ক বিগ, বইয়ের উপদেশে মজুত থাক, যেমন আছে, যেমন থাকবে চিরকাল। মানবের বৃহৎভাবনা সমূহ। বাস্তবের কথা হল, থিঙ্ক ম্যানেজেবল স্মল। ছোট করে নাও। ভেতরে অন্তত বাইরে ডোবা সেই ডোবায় কোলা ব্যাঙ, গ্যাঙের গ্যাং।

বড় পরিবার ইতিহাস। একান্নবর্তী চকমেলান বাড়ি। হাওদা হাওদা ঘর, দালান, উঠোন, বড়, মেজ, সেজ, ছোট, ন, রাঙা, ফুল, কত্তায় কত্তায় ক্ল্যাশ, বউদের খিল খিল গুলতানি, ডজনখানেক বাচ্চার কিচির মিচির। ছাতের আলসেতে সপাটে ঝুলন্ত গোটা চোদ্দ রংবাহারি শাড়ি, যেন ইন্টারন্যাশানাল অলিম্পিক ভিলেজ। লিঙ্গরখানার মতো রান্নাঘরে সার সার গনগনে হাওদা উনুন, মন মন কয়লা, পাহাড়ের মতো ছাইগাদা, তার ওপর ল্যাজমোটা থুপসি তুলো মৎস্যচিন্তায় ধ্যানস্থ। পরিবারের প্রিয়। আদুরে নাম জর্দা, কারণ মেজকত্তা তাকে কিলাপাতি জর্দার মৌজ ধরিয়েছেন। একটা রামপুরিয়া কুকুর আছে ছানাপোনা-সহ। সে ভিজে আলোচাল মশ মশ করে খায়।

পাকা পেয়ারার মতো ঠাকুরদা সাদা। ফতুয়া পরে বাইরের ঘরে ঢালাও ফরাসে বসে বয়স্যদের সঙ্গে শিয়াখালার আমবাগানে ল্যাংড়া আমের গল্প করছেন। অ্যাটি কেমন পাতলা, না তাঁর গিন্নির যৌবনকালের নাকের মতো যেখানে তিলফুলের মতো জ্বলজ্বল করত হীরের নাকছবি। গাত্রবর্ণ দুধে আলতা বললে সবটা বলা হল না, তার সঙ্গে আর একটি বিশেষণ যোগ করতে হবে, সে-রেসেন্ট। বিশাল ময়ুরপঙ্খী খাটের ঠিক কোন জায়গাটায় আছেন তিনি, রাতের অন্ধকারে কী ভাবে লোকেট করা যাবে?

বয়স্যদের সঙ্গে বৃদ্ধিকালে রসের কথা আসতেই পারে। আমি অতি রসাল, গৃহিণী ততোধিক। নাবিক লাইট হাউসের আলোর নিশানায় জাহাজ কুলে ভেড়ায়, ঠিক সেইরকম। নাকছবির হীরে ঝিলিক মারছে, গোড়ালির দ্যুতি, আঙুলের বিজলি, ওই তো আমার বন্দর।।

সন্ধের সামান্য পরে মটরদানার মতো এক গুলি আফিং, এক গেলাস মালাই, দত্তবাগানের কাঁঠাল, শেওড়াফুলির হিমসাগর, ফুসকো লুচি, অঢেল কম্পানির কাগজ, কচি কচি শেয়ার, জোড়া দীঘি, কালবৌশ মৎস্য, প্রতিষ্ঠিত, সুভদ্র সব ছেলেরা, দুৰ্গা ও লক্ষ্মী প্রতিমার মতো সব বউরা, সম্পন্ন সব জামাতারা, সবুজ সবুজ চারাগাছের মতো সব নাতি নাতনিরা। ধানের ক্ষেতে সবুজ ঢেউ,গাছের ডালে দোয়েলের শিস, দালানে জোড়া জোড়া আলতা, রাঙা পা, সুগঠিত নিতম্বে ডুরে শাড়ির সৌভাগ্য বাহার। বৈষ্ণবের খঞ্জনি, গোয়ালে তৃপ্ত গরুর হাম্বারব। দেয়ালে পূর্বপুরুষের সাত্ত্বিক ছবি। আসনে বসে জপের মালা ঘোরাচ্ছেন। স্লাইড ক্যামেরায় সেকালের ফটোগ্রাফার কালো কাপড়ে মাথা ঢেকে সিদ্ধ হস্তে সিদ্ধ মানবের ছবিটি উচিত মুহুর্তে ধরেছেন। ভগবান শ্ৰীরামকৃষ্ণের বয়ানে, এঁরা সব জনক রাজা, এদিক ওদিক দুদিক রেখে খেয়েছিলেন দুধের বাটি।

এই সংসারটিকে স্নেহের বাঁধনে ধরে রেখেছেন বৃদ্ধ শ্বশুমাতা, যেমন চিনির পাকে ধরা থাকে বোঁদের দানা। পচাত্তর বছরেও দেহের বাঁধন আলগা হয়নি। সিঁথিতে টকটকে সিঁদুর। কপালে যেন সূর্য উঠেছে। জাফরানের মতো গায়ের রঙ। চামরের মতো চুল। দুচোখে হাসির আলো। বড় ছেলে দুছেলের বাপ এখনো মায়ের কোলে মাথা রেখে ছেলেবেলার গল্প শোনে; বউরা সব বুড়ির কথায় ওঠবোস করে। গলায় আঁচল দিয়ে ঘিরে বসে জয়-মঙ্গলবারের খিলি খায়। সুবচনীর খোঁড়া হাঁসের উপাখ্যান শোনে। কখনো কখনো গায়ে পড়ে খুনসুটি করে, বলো না মা, তোমার বিয়েতে কী কী হয়েছিল। তোমার শ্বশুরমশাই কেমন করে অভিনয় করতেন বিম্বমঙ্গল পালায়। দস্যু রত্নাকর সাজলে কেমন দেখাত। ছোট বউ সন্তানসম্ভবা, তার জন্যে নিজে বসেছেন আচার তৈরি করতে। রান্নাঘরে টুলে বসে বাউদের শেখাচ্ছেন পায়েসের পাক। সকালে ছেলেরা লাইন দিয়ে প্ৰণাম করে যাচ্ছে। জনীর আশীর্বাদ। কোথাও কোনো বিদ্রোহ নেই। কোন মনেই উকি মারে না কোনোদিন ক্ষুদ্র কুচোটে মন। বড় বউ সকলের বড়দি, মেজ বউ মেজদি। মায়ের পরেই বড়দি অভিভাবিক। সকলের ফ্রেন্ড, ফিলজফার অ্যান্ড গাইড। সব ব্যাপারেই সতর্ক নজর। মেজ তোর বাচ্চাটা সকাল থেকেই আজ আমন খ্যাত খ্যাত করছে কেন রে!” ছুটলেন পরীক্ষা করতে। পেট ফোঁপেছে, ক্ৰিমি হয়েছে, নিয়ে আয় কালমেঘের বড়ি। সেজর বড় মেয়েটার গায়ে গত্তি লাগছে না কেন! খাচ্ছে-দাচ্ছে যাচ্ছে কোথায়। চলো সবাই, পাঁচু ঠাকুরের কাছে ঝাড়িয়ে আনি, নজর লেগেছে। দুর্গাপূজার মণ্ডপে দশমীর সন্ধ্যায় মা আর বউদের পরস্পর পরস্পরকে মুঠো মুঠো সিঁদুর দান। দেবীর মুখে প্ৰসন্ন হাসি, নিবুচ্চারে যেন বলছেন, মা সারদা! এইটাই ঠিক পথ। ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে ভোগ করো। গ্ৰহণেই সুখ, বর্জনে নয়। জ্যান্ত উপনিষদ হয়ে থাকো মা, যেখানে বলা হয়েছে,

ঈশা বা সমিদং সৰ্ব্বং যৎ কিণাঃ জগত্যাং জগৎ।
তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জ থা মা গৃধঃ কস্যা স্বিদ্ধনম।।

সব অনিত্য বস্তুই পরমেশ্বরের মা। ত্যাগের মনোভাব নিয়ে পালন করে। ধনের আকাঙ্ক্ষা এনে না। ঐশ্বৰ্য্য কার মা!

রাত্তিরবেলা বৃদ্ধার খাটে জ্যান্ত গোপালের দল। সবকটা নাতি নাতনি ঘিরে ধরেছে। একটা দুষ্ট পিঠে দোল খাচ্ছে, কচিকচি হাতে আম্মার গলা জড়িয়ে ধরে। আর একটা কোলে গড়াচ্ছে আলুর পুতুলের মতো। যে কথা মাথা ঝাড়া দিয়েছে, তারা বড়বড়, গোল গোল চোখে নীলকমল লালকমলের গল্প শুনছে। আম্মা দৈত্য হয়ে নাকি সুরে হাঁউমাঁউখাঁউ করছেন। অন্ধকারে রূপকথার অরণ্য যেন বাড়ির চৌহদ্দিতে চলে এসেছে। জোনকির ফুলকি গাছের ডালে দোল খাচ্ছে। আকাশে সহস্ৰ তারার নৈশ সভা। দৈত্যের শিং-এর মতো পশ্চিমে ফালি চাঁদ। প্রান্তরের মাটিতে সুখের গন্ধ। আমগাছ বোল ধরাতে ব্যস্ত। বাতাবির ফুল মসৃণ ফল হওয়ার সাধনায় মগ্ন। কটাস পাখি সিন্দুকের তালা খুলছে। জোড়া দীঘিতে বৃহৎ কালবৌশটি অকারণে উৎফুল্ল হয়ে বিশাল এক ঘাই মেরে চলে যাচ্ছে অস্ত্ৰ তলশয্যায়। তার নাকে নোলক পরান হয়েছিল ছোট বউ যেদিন শান্তিপুর থেকে বউ হয়ে এল এ বাড়িতে। লাল বেনারসির ঘোমটায় রাঙা মুখখানি। কালো চুলে ভরা মাথায় সাদা শোলার মুকুট।

এই দিদা, এই আম্মাদের মতো সুন্দর, স্নিগ্ধ টিভি আর কি হতে পারে। কথায় ছবি এঁকে শিশুমনকে যে কল্পলোকে পাঠাতেন, সেখানে অরণ্যে মানুষে, জীব ও জীবনে নিবিড় সম্পর্ক। সেখানে চাঁদের স্নিগ্ধ আলোকে চিরকালের এক বুড়ী চরকায় স্বপ্নের সুতো কাটে। কানখাড়া খরগোস সামনে বসে সেই দৃশ্য দেখে। সেখানে একটি ডালে সাতটি ফুল ফুটে থাকে সাত ভাই চম্পা হয়ে। বীর রাজপুত্র পক্ষীরাজে চড়ে দৈত্য আর রাক্ষসীদের অ্যালয় থেকে উদ্ধার করে আনে রাজকুমারীকে। সেখানে শেয়াল পণ্ডিতের সঙ্গে কথা বলে কুমির ভায়া। হাঁস পাড়ে সোনার ডিম। রাত্রির মধ্যযামে দুধসাদা পরীরা হুস হুস করে আকাশ থেকে নেমে এসে বনের প্রান্তে নাচে গায়। আকাশে আলোর ফাটল ধরা মাত্র উড়ে যায় পূর্ব দিগন্তে ৷ ঘাসের ওপর কোনো কোনো দিন পড়েও থাকতে পারে তাদের কারো একজনের সূক্ষ্ম ওড়না। সেখানে বোয়ালমাছে না টেনে নিয়ে যায়, আর ছিপ নিয়ে যায় চিলে।

এই টিভিতে রেপ ছিল না, খুন ছিল না, অঙ্গ দেখিয়ে নাচ ছিল না, স্যাডিজম ছিল না, পেডোফাইল ছিল না। ঘরভাঙা, সংসার ভাঙা, সমাজ ভাঙার নিয়ত দৃশ্য ছিল না। মানুষ মানুষের দিকে যে হাত বাড়াত সে হাত বন্ধুর হাত, খুনীর হাত নয়। প্রেমে ছিল পূর্ণতা, একালের বণ্টনা নয়। চরিত্ররা সব আদর্শের পতাকা তুলে ঘুরে বেড়াত, একালের সুবিধেবাদীর ঝাণ্ডা নয়। ছোটরা বড় হবে। বড় হয়ে ছোটদের বড় করার জন্যে আদশ সংসার রচনা করবে। সানাই বাজিয়ে বিয়ে করে, আদালতে গিয়ে তাল ঠুকবে না। বাতাবির নিটোল পরিবার, ফাটা বেল নয়। ভাঙা পরিবারের মশলায় তৈরি হবে না। হিট মেগা কমাশিয়াল।

রবীন্দ্ৰনাথ থেকে ধার করা যাক কয়েকটি লাইন :

সৃষ্টির সেই প্রথম পরম বাণী : ‘মাতা, দ্বার খোলো!’
দ্বার খুলে গেল।
মা বসে আছেন তৃণশয্যায়, কোলে তাঁর শিশু।
উষার কোলে যেন শুকতারা।
দ্বারপ্রান্তে প্রতীক্ষাপরায়ণ সূর্যরশ্মি শিশুর মাথায় এসে পড়ল।
কবি দিল আপনি বীণার তারে ঝংকার, গান উঠল আকাশে
‘জয় হোক মানুষের ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের!’

বিশ্বাসযোগ্য মানুষ, বিশ্বাসযোগ্য পিতা মাতার বড়ই অভাব। একালে সবাই কমরেড। কণ্ঠে কণ্ঠে লড়াইয়ের রণদামামা।

অতীত বিসর্জনের বাজনা বাজিয়ে চলে গেল। পড়ে রইল। খড়ের পুতুল। পদ্মপুকুরে আবর্জনা। ভরাট করে বাসা বাঁধবে তৎক্ষণিকের দল! যৌথ জীবনসাধনায় স্বার্থের দানব। পরিবার ছেড়া কাপড়ের ফালি। প্রোমেটারের মেশিন কর্কশ শব্দে অশান্তির মসলা মাখিছে।

বহুতলের খুপরিতে খুপরিতে মানুষ চড়াইয়ের বাসা। দিবস রজনী অবিরল কিচির মিচির। সুখে আছ ভাইসব? উত্তরে শব্দ নেই, গলকম্বল ঠেলে উঠল। মুখের হাসিতে বোধের নির্বোধ ভাঁজ।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *