১২. সমুদ্রের ধারে

১২ ॥

জটায়ু আর আমার পিছনে যেহেতু কেউ লাগেনি, বিকেলে আমরা দুজনে সমুদ্রের ধারে গেলাম হাওয়া খেতে। হিঙ্গোরানির কপালে কী আছে জানি না, তবে এটা মনে হচ্ছে যে নয়নের আর কোনো বিপদ নেই। যদি তেওয়ারির টাকা ফেরত দিয়েও হিঙ্গোরানির কাছে বেশ কিছু টাকা অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তরফদারের শো হতে কোনো বাধা নেই। আর প্রথম শো থেকেই ত টিকিট বিক্রির টাকার অংশ আসতে শুরু করবে। মনে হয় হিঙ্গোরানি এখনো বেশ কিছুদিন চালিয়ে যাবেন।

জটায়ুকে বলাতে তিনি চোখ রাঙিয়ে বললেন, ‘তপেশ, আই অ্যাম শক্‌ড্‌। লোকটা একটা ক্রিমিন্যাল, পরের সিন্দুক থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছে, আর সে লোক নয়নকে ভাঙিয়ে খাবে এটা ভেবে তুমি খুশি হচ্ছ?’

‘খুশি নয়, লালমোহনবাবু। হিঙ্গোরানির বিরুদ্ধে যা প্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে ত তাকে এই মুহূর্তে জেলে পোরা যায়। কিন্তু তার পার্টনার যদি পুরোন বন্ধুত্বের খাতিরে তার উপর দয়াপরবশ হয়ে তাকে রেহাই দেন—তাতে আমার-আপনার কী বলার আছে?’

‘লোকটা জুয়াড়ি—সেটা ভুলো না। আমার অন্তত কোনো সিমপ্যাথি নেই হিঙ্গোরানির উপর।’

তেষ্টা পাচ্ছিল দুজনেরই। লালমোহনবাবু কোল্ড কফি খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। ‘এখানকার কফিটা একটা প্লাস পয়েন্ট সেটা স্বীকার করতেই হবে।’

সমুদ্রের কাছেই একটা কাফে আবিষ্কার করে আমরা একটা টেবিল দখল করে বেয়ারাকে কোল্ড কফি অর্ডার দিলাম। কাফেতে অনেক লোক, বুঝলাম এদের ব্যবসা ভালোই চলে।

মিনিটখানেকের মধ্যে ঠক্‌ঠক্‌ করে দুটো গেলাস এসে পড়ল আমাদের টেবিলের উপর। আমরা দুজনেই ঘাড় নীচু করে প্লাস্টিকের স্ট্রয়ের ডগা ঠোঁটের মধ্যে পুরে দিলাম।

‘হ্যাভ ইউ টোল্ড ইওর টিকটিকি ফ্রেন্ড?’

লালমোহনবাবু একটা বিশ্রী শব্দ করে বিষম খেলেন।

মুখ তুলেই দেখি টেবিলের উল্টোদিকে চাক্‌রা-বক্‌রা হাওয়াইয়ান শার্ট পরে দণ্ডায়মান মিস্টার নন্দলাল বসাক।

লালমোহনবাবু সামলে নিতে ভদ্রলোক বললেন, ‘শুধু এইটে বলে দেবেন মিত্তিরকে এবং তরফদারকে যে, নন্দ বসাক পায়ের তলায় ঘাস গজাতে দেয় না। পঁচিশে ডিসেম্বর যদি শো হয়, তাহলে সেই শো থেকে শেষের আইটেমটি বাদ যাবে, এ গ্যারান্টি আমি দিতে পারি।’

আমাদের পাশেই কাফের দরজা। ভদ্রলোক কথাটা বলেই সে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে অন্ধকার, তাই তিনি যে কোনদিকে গেলেন সেটা বুঝতেই পারলাম না।

তেষ্টা মেটেনি, তাই কফিটা শেষ করে দাম চুকিয়ে আমরা আর দশ মিনিটের মধ্যেই বাইরে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে হোটেলমুখো রওনা হলাম।

হোটেলে পৌঁছতে লাগল আধঘণ্টা। ভিতরে ঢুকে দেখি লবি লোকে লোকারণ্য। শুধু লোক নয়, তার সঙ্গে অনেকখানি জায়গা জুড়ে দাঁড় করানো অজস্র লাগেজ। বোঝাই যাচ্ছে একটা বিদেশী টুরিস্ট দল সবেমাত্র এসে পৌঁছেছে। ফেলুদাকে বসাকের খবরটা এক্ষুনি দিতে হবে, তাই আমরা প্রায় দৌড়ে গিয়ে লিফ্‌টে ঢুকে চার নম্বর বোতামটা টিপে দিলাম।

চারশো তেত্রিশের সামনে গিয়েই বুঝলাম ঘরে ফেলুদা ছাড়াও অন্য লোক আছে, আর বেশ গলা উঁচিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে।

বেল টেপার প্রায় পনের সেকেণ্ড পরে দরজা খুলল ফেলুদা, আর আমাকে সামনে পেয়েই এক রামধমক।

‘দরকারের সময় না পাওয়া গেলে তোরা আছিস কী করতে?’

কাঁচুমাচু ভাবে ঘরে ঢুকে দেখি মাথায় হাত দিয়ে কাউচে বসে আছেন সুনীল তরফদার।

‘ব্যাপারটা কী মশাই?’ ভয়ে ভয়ে শুধোলেন জটায়ু।

‘সেটা ঐন্দ্রজালিককে জিজ্ঞেস করুন’, শুকনো গম্ভীর গলায় বলল ফেলুদা।

‘কী মশাই?’

‘আমিই বলছি।’ বলল ফেলুদা, ‘ওর মুখ দিয়ে কথা বেরোবে না।’ খচ্‌ করে লাইটার দিয়ে ঠোঁটে ধরা চারমিনারটা জ্বালিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে ফেলুদা বলল, ‘নয়ন হাওয়া। কিড্‌ন্যাপ্‌ড। ভাবতে পারিস? এর পরেও ফেলু মিত্তিরের মান ইজ্জত থাকবে? পই পই করে বলে দিয়েছিলাম ঘর থেকে যেন না বেরোয়, নয়ন যেন ঘর থেকে না বেরোয়। —আর এই ভর সন্ধেবেলা—গিজগিজ করছে লবি, তার মধ্যে শঙ্করবাবু নয়নকে নিয়ে গেছেন বুকশপে।

‘তারপর?’—আমার বুকের ধুকপুকুনি আমি কানে শুনতে পাচ্ছি।

‘বাকিটা বলো চমকদার মশাই, বাকিটা বলো! নাকি এই কাজটাও আমার উপর ছাড়তে হবে?’

ফেলুদাকে এত রাগতে আমি অনেকদিন দেখিনি।

তরফদার হেঁট মাথা অনেকটা তুলে চাপা গলায় বললেন, ‘নয়ন একা ঘরে বসে অস্থির হয়ে পড়ে বলে শঙ্কর ওর জন্য গল্পের বই কিনতে গিয়েছিল। বই পেয়েও ছিল। দোকানের মেয়েটি দুটো বই প্যাক করে ক্যাশ মেমো করে দিচ্ছিল—শঙ্কর তাই দেখছিল। হঠাৎ মেয়েটি বলে ওঠে—দ্যাট বয়? হোয়্যার ইজ দ্যাট বয়?—শঙ্কর পিছন ফিরে দেখে নয়ন নেই। ও তৎক্ষণাৎ দোকান থেকে বেরিয়ে লবিতে খোঁজে, নয়নের নাম ধরে ডাকে, একে ওকে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু কোনো ফল হয় না। লবিতে এত ভিড় তার মধ্যে একজন ন’ বছরের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে…’

‘এটা কখনকার ঘটনা?’

‘সেখানেই বলিহারি!’ চেঁচিয়ে উঠল ফেলুদা। ‘দেড় ঘন্টা আগে ব্যাপারটা ঘটেছে, আর সুনীল এই সবে দশ মিনিট হল এসে আমাকে রিপোর্ট করছে—হুঁঃ!’

‘বসাক’, বললেন জটায়ু। ‘নো ডাউট অ্যাবাউট ইট।’

‘আপনি দেখি ভয়ঙ্কর আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলছেন কথাটা।’

আমি কাফের ঘটনাটা ফেলুদাকে বললাম। ফেলুদা গম্ভীর।

‘আই সী…আমি এটাই আশঙ্কা করেছিলাম। অর্থাৎ কুকীর্তিটা করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তোদের সঙ্গে দেখা হয়। হুঁ…’

‘শঙ্করবাবু কোথায়?’ জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন।

তরফদার মাথা না তুলেই বলল, ‘থানায়।’

‘শুধু পুলিশে খবর দিলে ত চলবে না’, বলল ফেলুদা, ‘তোমার পৃষ্ঠপোষক আছে, তোমার থিয়েটারের মালিক আছেন। তিনি কি নয়ন ছাড়া শো করতে রাজি হবেন? আই হ্যাভ গ্রেট ডাউট্‌স।’

‘তাহলে হিঙ্গোরানিকে…’

জটায়ু একবার ফেলুদার, একবার তরফদারের দিকে চাইলেন।

‘তাঁকে খবর দেবার সাহস নেই এই সম্মোহক প্রবরের। বলছে—“আপনি কাইন্ডলি কাজটা করে দিন, মিস্টার মিত্তির! আমি গেলে সে লোক আমাকে টুঁটি টিপে মেরে ফেলবে”।’

‘শুনুন—’ লালমোহনবাবু হঠাৎ যেন ঘুম থেকে উঠলেন—‘আপনারও যেতে হবে না, সুনীলবাবুরও যেতে হবে না। আমরা যাচ্ছি। —কী তপেশ, রাজি ত?’

ফেলুদা ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট আর কপালে ভ্রূকুটি নিয়ে শোফায় বসে পড়ে বলল, ‘যেতে হলে এখনই যান। তোপ্‌শে, তুই ইংরিজিতে হেলপ করিস।’

হিঙ্গোরানির ঘরের নম্বর দুশো আটাশি

হিঙ্গোরানির ঘরের নম্বর দুশো আটাশি। আমরা সিঁড়ি দিয়েই নেমে গিয়ে তাঁর দরজার বেল টিপলাম।

দরজা খুলল না।

‘সময়-সময় এই বেলগুলো ওয়র্ক করে না’, বললেন জটায়ু। ‘এবার বেশ জোরে চাপ দিও ত।’

আমি বললাম, ‘ভদ্রলোকের ত বেরোবার কথা না। ঘুমোচ্ছেন নাকি?’

তিনবার টেপাতেও যখন ফল হল না, তখন আমাদের বাধ্য হয়ে লবিতে গিয়ে হাউস টেলিফোনে ২৮৮ ডায়াল করতে হল।

ফোন বেজেই চলল। নো রিপ্লাই।

ইতিমধ্যে লালমোহনবাবু রিসেপশনে গিয়েছিলেন জিজ্ঞেস করতে। তারা বলল—‘মিঃ হিঙ্গোরানি নিশ্চয়ই ঘরেই আছেন। কারণ তাঁর চাবি এখানে নেই।’

এবার জটায়ুর মুখ দিয়ে তোড়ে ইংরিজি বেরোল, ভাষা টেলিগ্রামের।

‘বাট ইম্পর্ট্যান্ট সী হিঙ্গোরানি—ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট। নো ডুপ্লিকেট কী? নো ডুপ্লিকেট কী?’

কাজটা খুব খুশি মনেই করে দিল রিসেপশনের লোকেরা।

চাবি হাতে বয়কে সঙ্গে নিয়ে আমরা লিফ্‌টে দোতলায় উঠে আবার হিঙ্গোরানির ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

ইয়েল লক্ চাবি ঘোরাতেই খড়াৎ করে খুলে গেল, বয় দরজা ঠেলে দিল, আমি বললাম ‘থ্যাঙ্ক ইউ’, জটায়ু আমার আগেই ঘরে ঢুকে তৎক্ষণাৎ তড়াক্‌ করে পিছিয়ে আমারই সঙ্গে ধাক্কা খেলেন। তারপর অদ্ভুত স্বরে তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে তিন টুক্‌রো কথা বেরোল।

‘হিং-হিং-হিক্‌!’

ততক্ষণে আমিও ভিতরে ঢুকে গেছি, আর দৃশ্য দেখে এক নিমেষে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

খাটের উপর চিত হয়ে হাতপা ছড়িয়ে পড়ে আছেন মিঃ হিঙ্গোরানি। তাঁর পা দুটো অবিশ্যি নীচে নেমে মেঝের কার্পেটে ঠেকে আছে। তাঁর গায়ে যে লাল নীল সাদা আলোর খেলা চলেছে, সেটার কারণ হচ্ছে বাঁয়ে টেবিলের উপর রাখা টিভি—যেটাতে হিন্দি ছবি চলেছে, যদিও কোনো শব্দ নেই। ভদ্রলোকের বোতাম খোলা জ্যাকেটের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে সাদা সার্টের উপর ভেজা লাল ছোপ, আর তার মাঝখানে উঁচিয়ে আছে একটা ছোরার হাতল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *