০১. রুদ্রশেখরের কথা (১)

রুদ্রশেখরের কথা (১)

মঙ্গলবার ২৮শে সেপ্টেম্বর ১৯৮২ সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় একটি কলকাতার ট্যাকসি—নম্বর ডব্লিউ. বি. টি ৪১২২—বৈকুণ্ঠপুরের প্রাক্তন জমিদার নিয়োগীদের বাড়ির গাড়িবারান্দায় এসে থামল।

দারোয়ান এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে একটি বছর পঞ্চান্নর ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে এলেন। ভদ্রলোকের রং ফরসা, চুল অবিন্যস্ত, মুখে কাঁচা-পাকা গোঁফদাড়ি, চোখে টিনটেড গ্লাসের চশমা, পরনে গাঢ় নীল টেরিলিনের সুট।

গাড়ির ড্রাইভার ক্যারিয়ারের ডালা খুলে একটি ব্রাউন রঙের সুটকেস বার করে ভদ্রলোকের পাশে রাখল।

‘নিয়োগী সাহাব?’ দারোয়ান প্রশ্ন করল।

ভদ্রলোক মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন। দারোয়ান সুটকেসটা তুলে নিল।

‘আসুন, বাবু, আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।’

বাড়ির বর্তমান মালিক সৌম্যশেখর নিয়োগী দোতলার দক্ষিণের বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে বায়ু সেবন করছিলেন। আগন্তুককে দেখে তিনি একটু সোজা হয়ে বসে নমস্কার করে সামনে রাখা চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করলেন। সৌম্যশেখরের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। দৃষ্টির দুর্বলতা হেতু চোখে পুরু চশমা পরতে হয়েছে, এছাড়া শরীরে বিশেষ কোনো ব্যারাম নেই।

‘আপনিই রুদ্রশেখর?’

আগন্তুক ইতিমধ্যে চেয়ারে বসে কোটের বুক পকেট থেকে একটি পাসপোর্ট বার করে সৌম্যশেখরের দিকে এগিয়ে দিয়েছেন। সৌম্যশেখর সেটি হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে একটু হেসে বললেন, ‘দেখুন কী কাণ্ড। আপনি আমার আপন খুড়তুতো ভাই, অথচ আপনাকে পাসপোর্ট দেখিয়ে সেটা প্রমাণ করতে হচ্ছে। অবিশ্যি আপনাকে দেখলে নিয়োগী পরিবারের বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় না।’

ভদ্রলোকের ঠোঁটের কোণে একটা সামান্য কৌতুকের আভাস দেখা গেল।

‘তা যাক্‌গে’, পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বললেন সৌম্যশেখর, ‘আপনার রোম থেকে লেখা চিঠিটা পেয়ে আমি যে উত্তর দিয়েছিলাম সেটা আপনি পেয়েছিলেন আশা করি। আপনি যে’ অ্যাদ্দিন আসেন নি সেটাই আমাদের কাছে একটা বিস্ময়ের ব্যাপার। কাকা ঘর ছেড়ে চলে যান ফিফ্‌টি ফাইভে, অর্থাৎ সাতাশ বছর আগে। থার্টি-এইটে কাকা যখন আপনাকে ছাড়াই দেশে ফিরলেন তখন অনুমান করেছিলাম আপনাদের দু’জনের মধ্যে খুব একটা বনিবনা নেই। কাকা অবিশ্যি এ নিয়ে কোনোদিন কিছু বলেন নি, আর আমরাও জিগ্যেস করি নি। শুধু, জানতুম যে তাঁর একটি ছেলে আছে রোমে। তা এখন যে এলেন, সেটা বোধ করি সম্পত্তির ব্যাপারে?’

সেটা বোধ করি সম্পত্তির ব্যাপারে

‘হ্যাঁ।’

‘আপনাকে ত লিখেছিলুম যে বছর দশেক আগে অবধি মাঝে মাঝে একটা করে কাকার পোস্টকার্ড পেয়েছি। তারপর আর পাই নি। কাজেই আইনের চোখে তাঁকে মৃত বলেই ধরে নেওয়া যায়। আপনি এ বিষয়ে উকিলের সঙ্গে কথা বলেছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘তা বেশ ত। আপনি ক’দিন থাকুন এখানে। সব দেখে-শুনে নিন। ওপরে কাকার স্টুডিও এখনো সেইভাবেই আছে। রং তুলি ছবি ক্যানভাস সবই আছে, আমরা কেউ হাত দিই নি। কী আছে না আছে সব দেখে নিন। ব্যাঙ্কের বই-টই সবই আছে। তবে, আপনাদের ইটালিতে কি রকম জানি না, আমাদের দেশে এসব ব্যাপারে লেখাপড়া হতে হতে ছ’মাস লেগে যায়। আপনি সময় হাতে নিয়ে এসেছেন আশা করি?’

‘হ্যাঁ।’

‘মাঝে মাঝে ত কলকাতায় যাতায়াত করতে হবে; ট্যাক্সিটা রেখে দিয়েছেন ত?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনার ড্রাইভারের থাকার বন্দোবস্ত করে দেবে আমার লোক, কোনো অসুবিধা হবে না।’

‘গ্রা—থ্যাঙ্কস।’

রুদ্রশেখর বলতে গিয়েছিলেন গ্রাৎসিয়ে, অর্থাৎ ইটালিয়ান ভাষায় ধন্যবাদ।

‘ইয়ে, আপনি আমাদের দিশি খাবারে অভ্যস্ত কি? লণ্ডনে ত শনিচি রাস্তার মোড়ে মোড়ে ইণ্ডিয়ান রেস্তোরাঁ, রোমেও আছে কি?’

‘কিছু আছে।’

‘বেশ, তাহলে আর চিন্তা নেই। গাঁয়ে দেশে আপনাকে যে হোটেল থেকে খাবার আনিয়ে দেব তারও ত উপায় নেই। —কী, জগদীশ—কী হল?’

একটি বৃদ্ধ ভৃত্য দরজার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। দেখে বোঝা যায় সে কোনো রকমে অশ্রু সংবরণ করে আছে।

‘হুজুর, ঠুম্‌রী মরে গেছে।’

‘মরে গেছে!’

‘হাঁ হুজুর।’

‘সেকি? ভিখু যে ওকে নিয়ে বেড়াতে বেরোল!’

‘ওরা কেউ ফিরেনি। তাই খুঁজতে গেলাম। বাঁশবনে মরে আছে হুজুর। ভিখু পালিয়েছে।’

সংগীতপ্রিয় সৌম্যশেখরের দুটি ফক্স টেরিয়ারের একটির নাম ছিল ঠুম্‌রী, একটি কাজরী। কাজরী স্বাভাবিক কারণেই মারা গেছে দু বছর আগে। ঠুম্‌রীর বয়স হয়েছিল এগারো। তবে আজ বিকেল অবধি সে ছিল সম্পূর্ণ সুস্থ।

সৌম্যশেখরকে প্রিয় কুকুরের শোকে বিহ্বল দেখে সদ্য রোম থেকে আগত রুদ্রশেখর নিয়োগী চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন।

এই বেলা তাঁর থাকার ঘরটা দেখে নিতে হবে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *