২৩. মাথুর

মাথুর

মাথুর ।। ধানশী ।।

শ্যাম শুকপাখী,                    সুন্দর নিরখি,
রাই ধরিল নয়ান ফান্দে।
হৃদয় পিঞ্জরে,                   রাখিল সাদরে,
মনোহি শিকলে বান্ধি (১)।।
তারে প্রেম সুধা নিধি দিয়ে।
তারে পুষি পালি,                   ধরাইল বুলি,
ডাকিত রাধা বলিয়ে।।
এখন হয়ে অবিশ্বাসী,                   কাটিয়া আকুসি (২),
পলায়ে এসেছে পুরে (৩)।
সন্ধান করিতে,                   পাইনু শুনিতে,
কুবুজা (৪) রেখেছে ধরে।।
আপনার ধন,                   করিতে প্রার্থন,
রাই পাঠাইল মোরে।
চণ্ডীদাস দ্বিজ,                   তব তজবিজে (৫),
পেতে পারে কি না পারে।।

——————-

(১) তাহাকে হৃদয় পিঞ্জরে মন শিকলে বাঁধিয়া অতি আদর করিয়া রাখিল।
(২) শিকলের কড়া যাহা দ্বারা পাখীর পা আবদ্ধ রাখা হয়।
(৩) মথুরাপুরে।
(৪) সাধারণী রসের পাত্রী।
(৫) বিচারে।

মাথুর ।। শ্রীরাগ ।।

বিরহ কাতরা,                       বিনোদিনী রাই,
পরাণে বাঁচে না বাঁচে।
নিদান দেখিয়া,                      আসিয়া হেথায়,
কহিনু তোহারি কাছে।।
যদি দেখিবে তোমার প্যারী।
চল এইক্ষণে,                      রাধার শপথ,
আর না করিও দেরি।।
কালিন্দী পুলিনে,                      কমলের শেজে,
রাখিয়া রাইয়ের দেস।
কোন সখী অঙ্গে,                      লিখে শ্যাম নাম,
নিশ্বাস হেরয়ে কেহ।।
কেহ কহে তোর,                      বঁধুয়া আসিল,
সে কথা শুনিয়া কাণে।
মেলিয়া নয়ন,                      চৌদিশ নেহারে,
দেখিয়া না সহে প্রাণে।।
যখন হইনু,                      যমুনা পার,
দেখিনু সখীরা মেলি।
যমুনার জলে,                      রাখে অন্তর্জলে,
রাই দেহ হরি বলি।।
দেখিয়া যদ্যপি,                      সাধ থাকে তবে,
ঝাট চল ব্রজে যাই।
বলে চণ্ডীদাসে,                      বিলম্ব হইলে,
আর না দেখিবে রাই।।

——————-
নিদান – অবসান, অন্তিমকাল। তোহারি – তোমার। প্যারী – শ্রীরাধিকার অপর নাম। রাধার শপথ – রাধার দিব্য। কালিন্দী পুলিনে – কালিন্দী তীরে। কালিন্দী – যমুনা। চৌদিশ নেহারে – চৌদিকে তাকায়। ঝাট – শীঘ্র।

মাথুর ।। শ্রীরাগ ।।

ধিক্‌ ধিক্‌ ধিক্‌,                    তোরে রে কালিয়া,
কে তোরে কুবুদ্ধি দিল?
কেবা সেধে ছিল,                   পিরীতি করিতে,
মনে যদি এত ছিল।
ধিক্‌ ধিক্‌ বঁধু,                      লাজ নাহি বাস,
না জান লেহের লেশ।
এক দেশে এলি,                    অনল জ্বালায়ে,
জ্বালাইতে আর দেশ।।
অগাধ জলের,                          মকর যেমন,
না জানে মিঠ কি তীত।
সুরস পায়স,                            চিনি পরিহরি,
চিটাতে আদর এত?
চণ্ডীদাস ভণে,                          মনের বেদনে,
কহিতে পরাণ ফাটে।
তোমার সোণার প্রতিমা,        ধূলায় গড়াগড়ি,
কুবুজা বসিল খাটে।।

——————-

লেহের – পিরীতের, স্নেহের।

মাথুর ।। শ্রীরাগ ।।

ধিক্‌ ধিক্‌ ধিক্‌,                  নিঠুর কালিয়া,
তোরে যে এ বুদ্ধি দিল।
কেবা সেধে ছিল                 পিরীতি করিতে,
মনে যদি এত ছিল।।
ধিক্‌ ধিক্‌ ধিক্‌,                 নিঠুর কালিয়া
লাজের নাহিক লেশ।
এক দেশে এলি                 অনল জ্বালায়ে,
জ্বালাইতে আর দেশ।।
জনম অবধি,                 কালিয়া বদন,
না ধুলি লাজের ঘাটে হে।
ব্রহ গোপীদে’ হ’তে,                 মথুরা নাগরী,
কত রূপে গুণে বটে হে।।
কিম্বা কুবুজা,                 নামে কুবুজিনী,
তেঞি সে লেগেছে মনে।
আপনি যেমন                 ত্রিভঙ্গ মুরারী,
বিহি মিলায়েছে জেনে।।
কিম্বা কুবুজা                 গুণে গুণবতী,
গুণেতে করেছে বশ।
পিরীতি সুখের,                 কি জানে যজিতে,
কিবা সে রেখেছে যশ।।
যতেক তোমারে,                 পিরীতি করুক,
তেমন পিরীতি হ’বে না।
রাধা নাথ বিনে,                 কুবুজার নাথ,
কেহ ত তোমারে ক’বে না।।
কি আর কহিব,                 মনের বেদনা,
কহিতে যে দুখ পাই।
চণ্ডীদাস কহে,                 কহিতে বেদনা,
পরাণ ফাটিয়া যায়।। *

——————-

* হস্তলিখিত প্রাচীন গ্রন্থ।

মাথুর ।। সুহিনী ।।

হে কুবুজার বন্ধু। (১)
পাসরেছ রাই মুখইন্দু।। (২)
হে পাগধারী। (৩)
পাসরেছ নবীন কিশোরী।।
রাই পাঠা’ল মোরে।
দাসখত (৪) দেখাবার তরে।।
যাতে মোরা আছি সাখী (৫)।
পদতলে নাম দিলে লেখি।।
তুমি ব্রজে যা’বে যবে।
করতালি বাজাইব সবে।।
দ্বিজ চণ্ডীদাস ভণে।
গালি দিব যত আছে মনে।।

——————-

(১) সখীরা শ্রীকৃষ্ণকে শ্রীরাধিকার বন্ধু ভিন্ন জানিতেন না, মথুরাতে শ্রীকৃষ্ণ কুবুজাকে রাণী করিয়াছিলেন দেখিয়া সখীশ্লেষপূর্ব্বক “কুবুজার বন্ধু” বলিয়া সম্বোধন করিতেছেন।
(২) রাই মুখ চন্দ্রমা কি তোমার নেই—ভুলিয়া গিয়াছ?
(৩) মথুরাতে শ্রীকৃষ্ণ রাজবেশে রহিয়াছেন। সখীরা সে বেশ কখন দেখেন নাই, সেই জন্য ব্যঙ্গছলে সখী ‘পাগধারী” সম্বোধন করিতেছেন।
(৪) শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধিকার নিকট দাসখত লিখিয়া দিয়াছিলেন।
দাসখত বর্ণনা—
“ইয়াদি কিদ্দ, গুণ সমুদ্র, শত সাধু শ্রীরাধা।
সদুদারস্য, চরিত, তস্য, পুরাহ মনের সাধা।।
তস্য খাতক, হরি নায়ক, বসতি ব্রজপুরি।
কস্য করজ, পত্রমিদং লিখিলাম সুকুমারি।।
ইহার লভ্য, পাইবা ভব্য, বাঞ্ছা তিন করিয়া।
সুদ সমেত, শোধ করিব, সব কলিযুগ ভরিয়া।।
এই করারে, রাই তোমারে, খত দিলাম লিখি।
ললিতাদি, মঞ্জরি সখী, রহল ইহাতে সাক্ষী।।”
– গী, র, ব।
(৫) সাক্ষী।

মাধুর ।। বেলাবলী ।।

রাই’র দশা সখীর মুখে।
শুনিয়া নাগর মনের দুখে।।
নয়নের জলে বহয়ে নদী।
চাহিতে চাহিতে হরল সুধী।।
অব্‌ যতনে ধৈরজ ধরি।
বরজ গমন ইচ্ছিল হরি।।
আগে আগুয়ান করিয়া তার।
সখী পাঠাওল করিয়া সার।।
“এখনি আসিছি মথুরা হৈতে।
অথে আন ভাব না ভাব চিতে।।
অধিক উল্লাসে সখিনী ধায়।
বড়ু চণ্ডীদাস তাহাই গায়।।

————–

দশা – অবস্থা। সুধী – জ্ঞান; বুদ্ধি।
অব্‌ – পাঠান্তর–“অনেক”।-প, ক, ল।
আগুয়ান – অগ্রসর।

মাধুর ।। ধানশী ।।

সই জানি কু-দিন সু-দিন ভেল।
মাধব মন্দিরে,                      তুরিতে আওব,
কপাল কহিয়া গেল।। ধ্রু।
চিকুর ফুরিছে,                      বসন খসিছে,
পুলক যৌবন ভার।
বাম অঙ্গ আঁখি,                      সঘনে নাচিছে,
দুলিছে হিয়ার হার।।
প্রভাত সময়ে,                      কাক কোলাকুলি,
আহার বাঁটিয়া খায়।
পিয়া আসিবার,                      নাম সুধাইতে,
উড়িয়া বসিল তায়।।
মুখের তাম্বুল,                      খসিয়া পড়িছে,
দেবের মাথার ফুল।
চণ্ডীদাস কহে,                      সব সুলক্ষণ,
বিহি ভেল অনুকূল।।

————–

ভেল – হইল। তুরিতে – শীঘ্র। ফুরিছে – স্ফুরণ হইতেছে।
বাম অঙ্গ আঁখি, সঘনে নাচিছে – স্ত্রীলোকের বাম অঙ্গ ও বাম আঁখি নৃত্য করা শুভ লক্ষণ।
সুধাইতে – জিজ্ঞাসা করিতে।
বিহি ভেল অনুকূল – বিধি অনুকূল হইল।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *