০৩. উপাদান বিশ্লেষণ

উপাদান বিশ্লেষণ

এইবার একে একে লিপিগুলি বিশ্লেষণ করিয়া দেখা যাক প্রাচীন বাঙলার শ্রেণী বিভাগের চেহারাটা ধরিতে পারা যায় কিনা। বলা বাহুল্য, পঞ্চম শতকের পূর্বে এ বিষয়ে স্থির করিয়া কিছু বলিবার উপায় আমাদের নাই।

প্রথম কুমারগুপ্তের ধনাইদহ (৪৩২-৩৩ খ্রী) লিপিতে দেখিতেছি, ভূমি-বিক্রয়ের ব্যাপারটি বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে গ্রামের কুটুম্ব, অর্থাৎ অন্যান্য গৃহস্থদের, ব্রাহ্মণদের এবং মহত্তর অর্থাৎ প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের; বিজ্ঞাপন দিতেছেন। একজন রাজপুরুষ; এই সম্রাটের ১নং দামোদরপুর-লিপিতে (৪৪৩-৪৪ খ্ৰী) রাজপুরুষ হইতেছেন কোটিবর্ষ বিষয়ের বিষয়পতি কুমারামাত্য বেত্ৰিবৰ্মা এবং ভূমি-রিক্রয় ব্যাপারে তাহার সহায়ক ও পরামর্শদাতা হইতেছেন। নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম সার্থিবাহ, প্রথম কুলিক এবং প্রথম বা জ্যেষ্ঠ কায়স্থ। ইহারা সকলেই অবশ্য রাজপুরুষ নহেন; প্রথম কায়স্থ খুব সম্ভব। একজন রাজপুরুষ; বাকী তিনজনের দুই জন বণিক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের এবং একজন শিল্পীশ্রেণীর প্রতিনিধি। কয়েকজন পুস্তপালের উল্লেখ আছে, ইহারাও রাজপুরুষ। বৈগ্রাম পট্টোলী (৪৪৭-৪৮ খ্রী) মতে কুমারামাত্য কুলবৃদ্ধি ছিলেন পঞ্চনগরী বিষয়ের বিষয়পতি; কিন্তু এক্ষেত্রে তাহার সহায়ক নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সার্থিবাহ, প্রথম কুলিক অথবা প্রথম কায়স্থের সাক্ষাৎ পাইতেছি না; পরিবর্তে ভূমি-বিক্রয়ের ব্যাপারটি যেখানে জানানো হইতেছে, সেখানে বিষয়াধিকরণকেও জানাইবার ইঙ্গিত আছে। অন্যান্য সমসাময়িক লিপি হইতে আমরা জানি যে, পূর্বোল্লিখিত নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম সাৰ্থবাহ, প্রথম কুলিক এবং প্রথম বা জ্যেষ্ঠ কায়স্থ, ইহারাই বিষয়াধিকরণ গঠন করিতেন। ইহাদের ছাড়া বিক্ৰীত ভূমিসম্পূক্ত দুই গ্রামের কুটুম্ব, ব্ৰাহ্মণ ও সংব্যবহারীদিগকেও বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হইতেছে। এই সংব্যবহারীরা বিষয়, মণ্ডল বা গ্রামের রাজপ্রতিনিধির সহায়ক, কিন্তু রাজপুরুষ ঠিক নহেন। কোনও বিশেষ কারণে বা উপলক্ষে প্রয়োজন হইলে ইহারা আহত হন এবং স্থানীয় রাজপ্রতিনিধিকে সাহায্য করেন। ২নং দামোদরপুর-লিপির সাক্ষ্য (৪৪৭-৪৮ খ্ৰী) প্রথম কুমারগুপ্তের ১নং দামোদরপুর-লিপিরই অনুরূপ। পাহাড়পুর পট্টোলীতেও (৪৭৮-৭৯ খ্রী) আয়ুক্তক ও পুস্তপালের উল্লেখ পাইতেছি, অধিষ্ঠানাধিকরণের উল্লেখও আছে এবং ভূমি মাপিয়া সীমা ঠিক করিয়া দিতে বলা হইয়াছে গ্রামের ব্রাহ্মণ, মহত্তর ও কুটুম্বদিগকে। ৩নং ও ৪নং দামোদরপুর-লিপির (৪৮২-৮৩ খ্ৰী দ্বিতীয়টির তারিখ অজ্ঞাত) সাক্ষ্যও এইরূপই। বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর-লিপিতে (৫০৭-৮ খ্ৰী) পঞ্চাধিকরণোপরিক, পুরপালো পরিক, সন্ধিবিগ্ৰহাধিকরণ, কায়স্থ ইত্যাদি রাজপুরুষদের উল্লেখ দেখিতেছি; অন্য কোনও শ্রেণীর লোকেদের উল্লেখ নাই। দত্ত ভূমি কোনও ব্যক্তিবিশেষ ক্রয় করিয়া পরে দান করিতেছেন কি না, সে-খবর উল্লিখিত অন্যান্য লিপিগুলিতে যেমন আছে, এই লিপিটিতে তেমন নাই; শুধু আছে, জনৈক মহারাজ রুদ্রদত্তের অনুরোধে মহারাজ বৈন্যগুপ্ত শাসন-নির্দিষ্ট ভূমি দান করিতেছেন। পরবর্তী শতকে ত্রিপুরায় প্রাপ্ত লোকনাথের পট্টোলীও ঠিক গুণাইঘর-লিপিরই অনুরূপ। ঠিক এই ক্রমটি দেখা যায় পাল ও সেন-যুগের লিপিগুলিতে। গুপ্তযুগের লিপিগুলি একটু অন্যরূপ; সেখানে কোনও ব্যক্তিবিশেষ রাজসরকারের নিকট হইতে ভূমি কিনিয়া দান করিতেছেন এবং সেক্ষেত্রে রাজসরকারের অর্থলাভ এবং পুণ্যলাভ দুইই হইতেছে (বৈগ্রাম-লিপি ও পাহাড়পুর-লিপি দ্রষ্টব্য; “…অর্থেপচয়ো ধৰ্ম্মষড়ভাগাপ্যায়নঞ্চ ভবতি”– পাহাড়পুর-লিপি)। পাল ও সেন যুগে দানটা কিন্তু করিতেছেন রাজা স্বয়ং, কোনও ব্যক্তিবিশেষের অনুরোধে (ধর্মপালের খালিমপুর-লিপি এবং দামোদর দেবের চট্টগ্রাম-পট্টোলী = দ্রষ্টব্য)। যাহাই হউক, গুণাইঘর-লিপি এবং সপ্তম শতকের লোকনাথের লিপি, ইহাদের উভয়েরই ধারাটা যেন। পরবর্তী পাল ও সেন আমলের; গুপ্ত আমলের অন্যান্য লিপি-নির্দিষ্টরা যেন নয়! গোপচন্দ্রের মল্লসরুল-লিপি সম্বন্ধেও মোটামুটি একই কথা বলা যাইতে পারে।।হাই হউক, গুপ্ত আমলের লিপিগুলিতে আবার ফিরিয়া যাওয়া যাক। দামোদরপুরের ৫নং লিপি বক্ষ্যমাণ বিষয়ের সাক্ষ্য ব্যাপারে এই-স্থানে প্রাপ্ত অন্যান্য লিপির অনুরূপ। ফরিদপুরের ধর্মাদিত্য গোপচন্দ্র ও সমাচারদেব প্রভৃতির তাম্রপট্টোলীর সাক্ষ্য একটু অন্য প্রকার। ধর্মাদিত্যের ১নং শাসনে ভূমি-ক্রয়েচ্ছা জ্ঞাপন করা হইতেছে বিষয়-মহত্তরদিগকে, অর্থাৎ বিষয়ের প্রধান প্রধান লোকেদের এবং অন্যান্য সাধারণ লোকেদের গ্রামীয় ভূমির দান-বিক্রয়ের খবর দেওয়া হইল। ধর্মাদিত্যের ২নং লিপিতে নূতন খবর কিছু নাই। গোপচন্দ্রের লিপিতে বিজ্ঞাপিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রধানব্যাপারিণঃ অর্থাৎ স্থানীয় প্রধান ব্যাপারীদের উল্লেখ আছে। সমাচারদেবের ঘুঘরাহাটি পট্টোলীতে নূতন খবর কিছু নাই। জয়নাগের বপ্যঘোষবাট পট্টোলীতেও তাঁহাই। লোকনাথের ত্রিপুরা-লিপিতে রাজপুরুষদের ছাড়া বিজ্ঞাপিত ব্যক্তিদের মধ্যে ‘সপ্রধান-ব্যবহারিজনপদান’ অর্থাৎ স্থানীয় প্রধান ব্যবহারী ও জনপদদের নাম করা হইতেছে। অষ্টম শতকের খড়গবংশীয় দেবখড়েগর আস্রফপুর-পট্টোলীতে বিষয়পতিদের সঙ্গে সঙ্গে কুটুম্ব-গৃহস্থাদিগকেও বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে।

এই বিশ্লেষণ হইতে আমরা যাহা পাইলাম, তাহা হইতে এক শ্রেণীর লোক আমরা পাইতেছি। যাঁহারা রাজপুরুষ, রাজপ্রতিনিধি। কিন্তু লক্ষ করিবার বিষয় এই যে, কোথাও তাঁহাদের রাজপুরুষ বা রাজপ্রতিনিধি বলা হইতেছে না, এবং সেই ভাবে বিশেষ কোনও একটি শ্রেণীভুক্তও করা হইতেছে না। আর এক ধরনের লোকের উল্লেখ পাইতেছি, যাঁহারা বিশেষ প্রয়োজনে আহূত হইলে রাষ্ট্রব্যাপারে রাজপুরুষদের সহায়তা করিয়া থাকেন, ইহাদিগকে কোথাও ব্যবহারিণঃ, কোথাও সংব্যবহারিণঃ, বিষয়ব্যবহারিণঃ, প্রধান-ব্যবহারিণঃ ইত্যাদি বলা হইয়াছে। ইহাদের বৃত্তি কী ছিল, আমরা জানি না; তবে ইহাই অনুমেয় যে, নানা বৃত্তির প্রধান প্রধান লোকেদেরই আহ্বান করা হইত; বিষয় বা অধিষ্ঠান-অধিকরণের সভ্য, নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সাৰ্থবাহ, প্রথম কুলিক, ইহারাও সেই হিসাবে সংব্যবহারী এবং কোনও কোনও পট্টোলীতে তাহারাও এই আখ্যায়ই উল্লিখিত হইয়াছেন। মহত্তর অর্থাৎ প্রধান প্রধান সম্পন্ন গৃহস্থ, কুটুম্ব অর্থাৎ সাধারণ গৃহস্থ, (তাহারা বিষয়েরই হোন বা গ্রামেরই হোন বা জনপদেরই হোন), অক্ষুদ্র প্রকৃতি বা শুধু প্রকৃতি অর্থাৎ প্রধান প্রধান অধিবাসী অথবা সাধারণ অধিবাসী প্রভৃতি যাঁহাদের উল্লেখ পাইতেছি, তাহাদের কাহার কী বৃত্তি ছিল অনুমানের উপায় থাকিলেও সুনির্দিষ্টভাবে বলিবার উপায় নাই, কিংবা ইহারা কে কোন শ্রেণীর লোক, তাহাও জানা যায় না। তবে, রাজপুত্র ও রাজপ্রতিনিধি ছাড়া এমন কতকগুলি ব্যক্তির খবর পাওয়া গেল যাঁহাদের বৃত্তি সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নাই, যেমন নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সার্থিবাহ ও প্রথম কুলিক। ইহাদের কথা আগেই বলিয়াছি। যে-ভাবে ইহাদের উল্লেখ পাইতেছি, তাহাতে ইহারা যে এক-একটি বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর প্রতিভূ তাহা বুঝা যাইতেছে, এবং তাহা সমর্থিত হইতেছে গোপচন্দ্রের একটি পট্টোলীতে ‘প্রধান-ব্যাপরিণঃ’ বা প্রধান প্রধান ব্যবসায়ীদের উল্লেখ দ্বারা। রাজপুরুষ ও এই বণিক-ব্যবসায়ী-শিল্পীশ্রেণী ছাড়া আর একটি শ্রেণীর পরোক্ষ উল্লেখও আছে; সেটি ব্রাহ্মণদের। ইহাদের বৃত্তি কী ছিল, তাহাও সহজেই অনুমেয়; পূজা, ধর্মকর্ম ইত্যাদির জন্যই তো ইহারা ভূমিদানি গ্রহণ করিতেছেন। অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনাও ইহাদের অন্যতম বৃত্তি ছিল। অবশ্য, ইহাদের মধ্যে অনেকে রাজপুরুষের বৃত্তি কিংবা অন্যান্য বৃত্তিও গ্রহণ করিতেন, লিপিগুলিতে তাহার প্রমাণও আছে, কিন্তু তাহা ব্যতিক্রম মাত্র; সাধারণ ভাবে এই সব বৃত্তি র্তাহাদের ছিল না। এবং সর্বদাই লিপিগুলিতে তাহারা পৃথকভাবে বর্ণবদ্ধ শ্রেণী হিসাবেই উল্লিখিত হইয়াছেন। এইবার অষ্টম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত লিপিগুলি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই দুই পর্বের, অর্থাৎ পঞ্চম হইতে অষ্টম, এবং অষ্টম হইতে ত্ৰয়োদশ শতকের লিপিগুলির স্বরূপের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, তাহা আগেই ইঙ্গিত করিয়াছি। এখানে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।

ধর্মপালের খালিমপুর-শাসনে দেখিতেছি, নরপতি ধর্মপাল দুইটি গ্রাম দান করিতেছেন। দানের প্রার্থনা জানাইতেছেন মহাসামন্তাধিপতি শ্ৰীনারায়ণ বৰ্মা; দানের হেতু হইতেছে নারায়ণ বর্মী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নারায়ণবিগ্রহের পূজা এবং বিগ্রহের পূজারী লাট (গুজরাট) দেশীয় ব্ৰাহ্মণদের এবং মন্দির-ভৃত্যদের ব্যবহার। যাহাই হউক, এই দান এইভাবে বিজ্ঞাপিত করা হইতেছ :

“এযু চতুৰ্ম্ম গ্রামেষু সমুপগতান সর্বানের রাজ-রাজনক – রাজপুত্র – রাজামাত্য – সেনাপতি – বিষয়পতি – ভোগপতি – ষষ্ঠাধিকৃত – দণ্ডশক্তি – দণ্ডপশিক – চৌরোদ্ধরণিক – দৌঃসাধসাধনিক – দূতখেলে – সমাগামিকা – ভিত্বরমাণ – হস্তাশ্ব – গোমহিষাজবিকাধ্যক্ষ’ – নাকাধ্যক্ষ – বলাধ্যক্ষ – তরিক – শৌল্কিক – গৌল্মিক – তদাযুক্তক – বিনিয়ুক্তকাদি রাজপাদোপজীবিনোহন্যাংশ্চাকীর্ত্তিতান্‌ চাটভাটজাতীয়ান্‌ যথাকলোধ্যাসিনো জ্যেষ্ঠকায়স্থ-মহামহত্তর – দাশগ্রামিকান্দি-বিষয়ব্যবহারিণঃ সকরুণান প্রতিবাসিনঃ ক্ষেত্ৰকারাংশ্চ ব্রাহ্মণ্যমাননাপূর্বকং যথাৰ্থং মািনয়তি বোধয়তি সমাজ্ঞাপয়তি চ।”

এই সূত্রটি খালিমপুর-লিপিতে প্রথম পাইলাম। ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ভূমিদানের যত পট্টোলী আছে, তাহার প্রায় সবটিতেই এই ধরনের একটি সূত্র উল্লিখিত আছে; প্রভেদের মধ্যে দেখা যায়, কোথাও রাজপুরুষদের তালিকাটি সংক্ষিপ্ত, কোথাও বিস্তৃততর। এই বিস্তৃততর তালিকার আর উল্লেখ করিয়া লাভ নাই; তবে একটু আধটু নূতন সংযোজনা কোথাও কোথাও আছে, সেগুলি আমাদের কাজে লাগিবার সম্ভাবনা আছে। কাজেই, যেখানে এই ধরনের নূতন সংযোজনা পাওয়া যাইবে, তাহাদের উল্লেখ করা প্রয়োজন।

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যাইতে পারে, দেবপালের মুঙ্গেরী-লিপিতে রাজ্যপাদোপজীবীদের (এ ক্ষেত্রে বলা হইয়াছে, স্বাপদপদ্মোপজীবীনঃ) তালিকায় চাটভাটজাতীয় সেবকদের সঙ্গে উল্লেখ করা হইতেছে-“গৌড়-মালব – খস-হূণ – কুলিক-কর্ণাট – লাট-চাটভাট – সেবকদৌন – অন্যাংশ্চকীর্তিতান”; এবং প্রতিবাসী ও ব্রাহ্মণোত্তরদের সঙ্গে উল্লেখ করা হইতেছে — “মহত্তর-কুটুম্বি -পুরোগমেদানপ্রকচণ্ডালপর্যন্তান”। নারায়ণপালের ভাগলপুর-লিপিতেও ঠিক এই ধরনের উল্লেখ আছে। বস্তুত, পালরাজাদের সমস্ত লিপিই এইরূপ। শুধু গৌড়-মালব-খস-তুণ প্রভৃতিদের সঙ্গে কোথাও কোথাও চোড়দেরও (মদনপালের মনহলি-লিপি দ্রষ্টব্য) উল্লেখ আছে। চাটভাটদের জায়গায় চট্টভট্ট অথবা চাটভটদের উল্লেখ পাওয়া যায়; বৈদ্যদেবের কমৌলি-লিপিতে “ক্ষেত্রকরণ”-এর পরিবর্তে পাওয়া যায় “কর্ষকান্‌”। কিন্তু দশম শতকের কম্বোজরাজ নয়পালদেবের ইর্‌দা-পট্টোলীতে বিজ্ঞাপিত ব্যক্তিদের নামের তালিকা একটু অন্যরূপ। এখানে উল্লেখ পাইতেছি, স্থানীয় “সকরণান ব্যবহারিণঃ”দের (কেরানিকুল সহ অন্যান্য রাষ্ট্রসহায়কদের), কৃষক ও কুটুম্বদিগকে এবং ব্ৰাহ্মণদের। অন্যত্র যেমন, এখানেও তাঁহাই; ব্রাহ্মণদের যে বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে ঠিক তাহা নয়, তাহাদের সম্মান জ্ঞাপনের পর (মাননাপূর্বকং) অন্যদের বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে। আর, রাজমহিষী, যুবরাজ, মন্ত্রী, পুরোহিত, ঋত্বিক, প্রদেষ্টবৰ্গ, সকল শাসনাধ্যক্ষ, করণ (বা কেরানি), সেনাপতি, সৈনিক সংঘমুখ্য, দূতবর্গ, গৃঢ়পুরুষবর্গ, মন্ত্রপালবৰ্গ এবং অন্যান্য রাজকর্মচারীদের বলা হইতেছে এই দান মান্য করিবার জন্য।

সেনরাজাদের এবং সমসাময়িক অন্যান্য রাজবংশের লিপিগুলি সম্বন্ধে বলিবার বিশেষ কিছু নাই; বক্ষ্যমাণ বিষয়ে তাহাদের সাক্ষ্য পাল-লিপিগুলিরই অনুরূপ। তবে পাল ও সমসাময়িক অন্য রাজাদের লিপিতে যেখানে পাইতেছি প্রতিবাসীদের কথা, পরবর্তী লিপিগুলিতে ঠিক সেইখনেই আছে জনপদবাসী (জনপদান কিংবা জনপদান)দের কথা। কিন্তু, একটি বিষয় বিশেষ উল্লেখযোগ্য বলিয়া মনে করি। পাল ও সমসাময়িক অনেকগুলি লিপিতে দেখা যায়, বিজ্ঞাপিত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষেত্রকর ইত্যাদির পরেই নিম্নস্তরের যে অগণিত লোক তাহাদিগকে সব একসঙ্গে গাথিয়া দিয়া বলা হইতেছে, “মেদান্ত্ৰচণ্ডালপর্যন্তান” অথবা “আচণ্ডালান”, অর্থাৎ, নিম্নতর স্তরের চণ্ডাল পর্যন্ত; অর্থাৎ বর্ণ-বিন্যাস অধ্যায়ে স্লেচ্ছ ও অন্ত্যজ পর্যায়ে যতগুলি উপবর্ণের উল্লেখ আমরা পাইয়াছি তাহারা সকলেই ঐ “মেদান্ধিচণ্ডাল” পদের মধ্যেই উক্ত হইয়াছে। পরবতী লিপিগুলিতে, অর্থাৎ কম্বোজ-বর্মণ-সেন আমলের লিপিগুলিতে কিন্তু এই পদটি কোথাও নাই; চণ্ডাল পর্যন্ত নিম্নতম শ্রেণী ও বর্ণের অন্যান্য লোকেরা একেবারে অনুল্লিখিত। পালযুগের পরে সেন-আমলে রাষ্ট্রের ও সমাজের উচ্চস্তরের, অর্থাৎ, এক কথায় উৎপাদন ও বণ্টন কর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যেন বদলাইয়া গিয়াছিল। এই অনুমান অস্বীকার করা কঠিন।

 

সমসাময়িক সাহিত্য

সমসাময়িক সাহিত্যেও এই শ্রেণী-বিন্যাসের চেহারা কিছুটা ধরিতে পারা যায়; পূর্ববর্তী বর্ণ-বিন্যাস অধ্যায়ে বর্ণ ও শ্রেণী এবং বর্ণ ও কোম প্রসঙ্গে তাহার আভাস দিতে চেষ্টা করিয়াছি। বৌদ্ধ চর্যাগীতিতে কয়েকটি আদিবাসী কোম ও উপবর্ণ এবং তাঁহাদের বৃত্তির ইঙ্গিত আছে; সেন আমলের দুই-একটি লিপিতেও আছে। সমসাময়িক বঙ্গীয় স্মৃতি ও পুরাণে ইহারা অন্তজ বা স্লেচ্ছ পর্যায়ভুক্ত, এবং শুধু বর্ণ হিসাবেই নয়, অর্থনৈতিক শ্রেণী হিসাবেও ইহারা সমাজের নিম্নতম শ্রেণীর লোক; ইহাদের অনুসৃত বৃত্তিতেই তাহা পরিষ্কার। মেদ, অন্ধ ও চণ্ডালদের মতো কোল, পুলিন্দ, পুককস, শবর, বরুড় (বাউড়ী?), চর্মকার, ঘট্টজীবী, ডোলাবাহী (দুলিয়া, দুলে) ব্যাধ, হাড়ডি (হাড়ি), ডোম, জোলা, বাগাতীত (বাগদী?), ইত্যাদি সকলেই সমাজের শ্রমিক-সেবক, আজিকার দিনের ভাষায় দিনমজুর, এবং আজিকার মতোই ভূমিহীন প্রজা। ইহাদের অব্যবহিত উপরের স্তরেই আর-একটি শ্রেণীর আভাস ধরিতে পারা যায়; ইহারা বিভিন্ন উপবর্ণে বিভক্ত, প্রত্যেকের পৃথক পৃথক বৃত্তি ও উপজীবিকা। কিন্তু লক্ষণীয় এই যে, ইহারা প্রায় সকলেই বৃহদ্ধৰ্মপুরাণের মধ্যম-সংকর এবং ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণের অসৎশুদ্র পর্যায়ভুক্ত। ইহাদের মধ্যে শিল্পজীবীও আছেন, কৃষিজীবীও আছেন, এমন-কি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও নাই, এমন নয়; শিল্পজীবী, যেমন তক্ষণ, সূত্ৰধার, চিত্রকার, অট্টালিকাকার, কোটক ইত্যাদি; কৃষিজীবী, যেমন রাজক, আভীর (বিদেশী কোম), নট, পৌণ্ডক (পোদ্য?), কৌয়ালী, মাংসচ্ছেদ ইত্যাদি; ব্যবসায়ী, যেমন তৈলকার, শৌণ্ডিক (শুড়ি), ধীবর-জালিক ইত্যাদি। নিজ নিজ বৃত্তিই ইহাদের জীবিকা সন্দেহ নাই, কিন্তু জীবিকার জন্য ইহারা কমবেশি আংশিকত কৃষিনির্ভরও ছিলেন, এরূপ অনুমান অত্যন্ত স্বাভাবিক। ইহাদের বৃত্তিগুলির প্রত্যেকটিই সামাজিক কর্তব্য; সেই কর্তব্যের বিনিময়ে ইহারা ভূমির উপর অথবা ভূমিলব্ধ দ্রব্যাদির উপর আংশিক অধিকার ভোগ করিতেন, এই অনুমানও স্বাভাবিক। ইহারাই অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের অস্থায়ী প্ৰজা, ভাগচাষী ইত্যাদি। অস্থায়ী প্রজা ও ভাগচাষের প্রজা যে ছিল, তাহা তো ভূমি-বিন্যাস অধ্যায়েই আমরা দেখিয়াছি। উন্নত সমাজাধিকার বা উৎপাদন ও বণ্টন-কর্তৃত্ব যে ইহাদের নাই তাহা বর্ণ-বিন্যাসের স্তর হইতেও কতকটা অনুমান করা যায়। ইহাদেরই অববাহিত উপরের স্তরে ক্ষুদ্র ভূম্যধিকারী, ভূমিস্বত্ববান কৃষক বা ক্ষেত্রকর, শিল্পী, ব্যবসায়ী, করণ-কায়স্থ বৈদ্যাক-গোপ -যুদ্ধ-চারণ প্রভৃতি বৃত্তিধারী বিভিন্ন লোক লইয়া একটি বৃহৎ মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের পরিচয়ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ ও ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণের বর্ণতালিকার মধ্যে ধরিতে পারা কঠিন নয়। তাহা ছাড়া, শিক্ষাদীক্ষা-ধৰ্মকর্মবৃত্তিধারী ব্ৰাহ্মণ ও বৌদ্ধ যতি সম্প্রদায় তো ছিলেনই।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *