০১. গণচিন

কালো নকশা

গণচিন।

ঘণ্টাখানেক নির্বিঘ্নে উড়ল প্লেন। তারপর, মাসুদ রানার মত আরও হয়তো দুএকজন খেয়াল করল ব্যাপারটা–বড়সড় বৃত্ত তৈরি করে ফিরতি পথ ধরছে ওরা।

চারশো প্যাসেঞ্জার নিয়ে সাংহাই শহর থেকে টেক-অফ করেছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স-এর প্রকাণ্ড বোয়িং সেভেন-সেভেন-সেভেন। জিলান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে রিফুয়েলিং শেষে আবার রওনা হয়েছে, গন্তব্য মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলান বাতোর। মাঝপথে কী ঘটল যে…

একটু পরে সবিনয়ে জানালেন পাইলট, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বাধ্য হয়ে বোয়িংকে ঘুরিয়ে নিয়েছেন তিনি, আর কিছুক্ষণের মধ্যে রাজধানী শহর বেজিঙের লান্তিয়ানচাঙ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতে যাচ্ছেন। তারপর যথাবিহিত অভয়দান আর দুঃখপ্রকাশ করলেন।

নিরাপদেই ল্যান্ড করল প্লেন। এর মধ্যে আর কিছু নেই, ব্যাপারটা স্রেফ যান্ত্রিক ত্রুটিই বটে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মঙ্গোলিয়ায় যাবে এরকম কোন কানেকটিং ফ্লাইট আপাতত পাওয়া সম্ভব নয়।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের তরফ থেকে বলা হলো, বারো ঘণ্টার মধ্যে আরেকটা বোয়িং নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছে তারা, ততক্ষণ প্যাসেঞ্জাররা ফাইভ স্টার কুবলাই খান হোটেলে উঠে সময়টা উপভোগ করুন।

অর্থাৎ অন্তত বারো ঘণ্টার জন্য বেজিঙে আটকা পড়তে হলো বিসিআই এজেন্ট এমআরনাইনকে।

কাজের মধ্যেই রয়েছে রানা, তবে লম্বা একটা ট্যুরে; বিশেষ করে পুব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে ওর এজেন্সির শাখাগুলোর কী অবস্থা দেখছে, কমপিউটার খুলে হিসাব নিচ্ছে আয়-ব্যয়ের, কোথাও কোনও সমস্যা থাকলে সমাধান খুঁজে বের করছে।

ব্যাংকক, ভিয়েনতিয়েন, হ্যানয়, তাইপে আর হংকং হয়ে চিনে ঢুকেছিল রানা। বেইজিং বাদে তিনটে বড় শহরে কাজ ছিল, সেসব সেরে সাংহাই থেকে প্লেন ধরে যাচ্ছিল মঙ্গোলিয়া।

মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলান বাতোরে রানা এজেন্সির নতুন একটা শাখা অফিস খোলা হবে কাল সকালে, কিন্তু বেইজিঙে আটকা পড়ে যাওয়ায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ল রানার জন্য।

এই মুহূর্তে ফাইভ স্টার কুবলাই খান-এর একটা বার-এ রয়েছে রানা, বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে আর হঠাৎ পেয়ে বসা নিঃসঙ্গতায় বিচ্ছিরিভাবে নাজেহাল হচ্ছে।

কবজি একটু উঁচু করে রোলেক্স দেখল রানা। সাড়ে সাতটা বাজে। মাত্র সন্ধে, রাত এখনও শুরুই হয়নি। সময়টা কীভাবে কাটাবে ভাবছে ও। নিজের ভিতর টুপ করে একটা ডুব দিয়ে দেখে নিতে চেষ্টা করল, আসলে চাইছেটা কী ও।

কী চাইছে সেটা পরিষ্কার হলো না, তবে জানা গেল কী চাইছে না।

রানা এজেন্সির অফিসে সারপ্রাইজ ভিজিট বাদ। বাদ হোটেলের গ্যাম্বলিং রুমে ভাগ্যপরীক্ষাও। পুরানো কোন বন্ধুর সঙ্গ? নাহ্, ভাল্মোগছে না। তা হলে আর বাকি রইল কী?

বাকি থাকল পুরুষকে ঈশ্বরের তরফ থেকে দেওয়া সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি: সুন্দরী নারীর মধুর সান্নিধ্য।

বার-এর এদিক ওদিক তাকালেই ওদেরকে দেখতে পাচ্ছে রানা, রূপ আর যৌবনের চোখ-ধাঁধানো ডালি। এদের মধ্যে কেউ কেউ তো প্রকাশ্যেই মুগ্ধদৃষ্টিতে দেখছে ওকে।

ও জানে, এদের বেশিরভাগই অভিজাত পারিবারিক পরিবেশ আর সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক আবহের ভিতর বড় হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের মত কমিউনিস্ট চিনে হোটেল বা পাবে বারবণিতাকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। এদের কারও সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে সময় কাটানো যেতে পারে, হোটেল-কামরায় নিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।

নিজের উপর আস্থা আছে রানার, তা ছাড়া অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে সহজেই ওর প্রতি আকৃষ্ট হয় মেয়েরা, কাজেই চেষ্টা করে দেখা যেতে পারত, কিন্তু না, এতেও মনের তরফ থেকে সায় পাওয়া গেল না।

আচ্ছা, হোটেল রুমে ফেরার সময় শিভাস রিগাল-এর একটা বোতল নিয়ে গেলে কেমন হয়? সেটা খালি করতে পারলে কালঅনেক বেলা পর্যন্ত অঘোরে ঘুমানো যাবে।

ভিতর থেকে মানা করে দেওয়া হলো, নিজেকে সুস্থ আর সচেতন রাখা প্রয়োজন, কখন কী ইমার্জেন্সি দেখা দেয় ঠিক নেই। দূর ছাই, বিরক্ত হয়ে ভাবল রানা, আমি কি কোন অ্যাসাইনমেন্টে আছি নাকি যে…

তারপর, একেবারে ভোজবাজির মত, আশ্চর্য একটা কাণ্ড ঘটল।

যেন কারও অশ্রত নির্দেশে ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে বারে ঢোকার সুইং ডোরটার দিকে তাকাল রানা। ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে ওটা।

আর তারপরই অবাক হয়ে দেখল রানা, শান্ত পায়ে ভিতরে ঢুকছে জিজিয়ানা দালিয়ান।

ভুলটা অবশ্য পরমুহূর্তেই ভাঙল-কোথায় দালিয়ান? এ তো অন্য এক অচেনা মেয়ে! এমনকী জিজিয়ানা দালিয়ানের সঙ্গে এর কোন মিলও নেই। তা হলে এমন হলো কেন?

হলপ করে বলতে পারবে রানা, এই অচেনা মেয়েটির মুখের জায়গায় হুবহু দালিয়ার মুখ দেখেছে ও। পরিষ্কার,স্পষ্ট; সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ ছিল না।

শুধু যে দেখেছে, তা নয়, যাতে দেখতে পায় সেজন্য কে যেন ঝট করে সুইং ডোরের দিকে ঘাড় ফেরাতে বাধ্যও করেছে ওকে।

ব্যাপারটা কী?

মাঝে মধ্যে এমন হতে দেখা যায়; নিয়তির অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে হয়তো একটা ব্যাঘাত সৃষ্টি হলো। এই ছন্দপতনের পরিণতি কখনও শুভ হয়, কখনও অশুভ, আবার স্রেফ অর্থহীন বিড়ম্বনা ছাড়া অন্য কিছু না-ও হতে পারে।

নিয়তির সেরকম একটা ইঙ্গিতেই কি বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর অন্যতম দুর্ধর্ষ এজেন্ট মাসুদ রানা মাঝ আকাশে ছন্দ হারিয়ে ফেলে এই মুহূর্তে হোটেল কুবলাই খানের বারে বসে আছে?

তারপর এখন আবার সেই রহস্যময় নিয়তিই অবচেতন মনকে প্ররোচিত করছে বা দিক-নির্দেশনা দিচ্ছে?

এরপর স্বভাবতই রানা ভাবল, একটা ফোন করে দেখা উচিত না কেমন আছে মেয়েটা? বেশ অনেকদিন হয়ে গেল দালিয়ার কোন খবর-টবর নেওয়া হয় না।

বার কাউন্টার ছেড়ে পে বুদের দিকে এগোল রানা। মনে পড়ে গেল সব–কে দালিয়া, কী দালিয়া।

.

জুন, ১৯৮৯। বেইজিঙ।

সে-সব দুঃস্বপ্ন ভরা দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও শিউরে উঠতে হয়।

চাই গণতন্ত্র, চাই মত প্রকাশের স্বাধীনতা-এই শ্লোগান তুলে ছাত্রদের নেতৃত্বে তখন গোটা চিন জুড়ে চলছে তুমুল আন্দোলন। বলা হয়, ছাত্রদের এই আন্দোলনে গোপনে ইন্ধন যোগাচ্ছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো, যারা চায় না শতকোটি মানুষের দেশ চিন। তার অর্জনগুলো ধরে রাখতে পারুক।

আন্দোলন থামাবার জন্য গতমাসের বিশ তারিখে মার্শাল ল জারি করেছে সরকার। বিদেশীদের চিন ছাড়তে বলা হয়েছে। ঠিকই, কিন্তু গ্রাউন্ড ক্রুরা কাজ না করায় বিমানবন্দর অচল হয়ে। পড়ে আছে।

ছাত্ররা মার্শাল ল মানছে না, বড় বড় শহরে প্রতিদিন বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছেই।

দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পাবলিক প্লাজা তিয়ানানমেন স্কয়্যারে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসাবে তেত্রিশ ফুট উঁচু একটা দুধসাদা মূর্তি তৈরি করেছে ছাত্ররা, নাম দিয়েছে গণতন্ত্রের দেবী।

সবারই জানা আছে যে ১৯৪৯ সালের পয়লা অক্টোবরে ঠিক এখানে দাঁড়িয়ে লালচিনের মহান নেতা মাও সে-তুং পিপলস্ রিপাবলিক অব চায়না ঘোষণা করেছিলেন। দুনিয়ার মানুষ এ-ও জানে যে আধুনিক চিনের যা কিছু অর্জন তার সবই কমরেড মাও সে-তুংয়ের যোগ্য নেতৃত্বের গুণে সম্ভব হয়েছে।

বিশেষ জরুরি একটা কাজে এসে বেইজিঙে আটকা পড়ে গেছে রানা। অলস বসে থাকতে কারই বা ভালো লাগে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজধানীতে যা যা দেখার আছে এই সুযোগে সব দেখে  নেবে।

ওর ফাইভ স্টার হোটেল দা মোঙ্গল বিখ্যাত তিয়ান তান পার্কের একধারে, টেমপল অভ হেভেন থেকে বেশি দূরে নয়।

টেমপল অভ হেভেনকে আর্কিটেকচারাল বিস্ময় বলা হয়-কাঠের তৈরি, অথচ কোন পেরেক ব্যবহার করা হয়নি। মিং আর কিং আমলের সম্রাটরা এখানে প্রার্থনা করতে আসতেন।

ওখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে রয়েছে নিষিদ্ধ নগরী। ওটার আরেক নাম, ইমপেরিয়াল প্যালেস-আটশো ভবনের একটা গুচ্ছ, মিং আর কিং সম্রাটরা বসবাস করতেন। নিষিদ্ধ নগরী তৈরি করা হয় পনেরো শতকে।

৩ জুন বিকেল চারটের সময় ওর গাইড লুসান হুমা ওকে নিতে আসবে। হুমা আসলে রানা এজেন্সির বেইজিং শাখারপ্রধানও বটে।

বেইজিঙেই জন্ম আর বেড়ে ওঠা হুমার, তবে কাজ শুরু করে। সাংহাইয়ে। এজেন্সির সাংহাই শাখা থেকে প্রমোশন দিয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। মাত্র দুদিন হলো অফিসে বসছে, ফলে বেইজিং শাখার অনেক গোপন রহস্য সম্পর্কে এখনও অবহিত নয়। সে।

আজ হুমা যেমন তার প্রাণপ্রিয় মাসুদ ভাইকে ঐতিহাসিক। কয়েকটা জায়গা দেখাতে নিয়ে যাবে, তেমনি রানাও ওর বিশ্বস্ত। একজন শাখাপ্রধানকে গোপন কিছু ফ্যাসিলিটির কথা জানাবে।

কিন্তু তিন তারিখ ভোরবেলা থেকেই রাজধানীতে কারফিউ জারি করা হলো। সরকারের হুকুম পেয়ে আন্দোলন থামাতে ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এল পিপলস্ লিবারেশন আর্মি।

অবরুদ্ধ শহরে ছড়িয়ে পড়ল অসম্ভব আর অবিশ্বাস্য সব গুজব। তারপর জানা গেল, সামরিক বাহিনী আসলেও নির্বিচারে। পাখি মারার মত করে মানুষ মারছে।

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, চিনকে সবার জন্য প্রাচুর্যময় একটা। দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে হলে কঠোর নিয়ম-শৃংখলা আর বিধিনিষেধের বেড়া তুলে নেওয়া যাবে না। সংখ্যাগুরুর স্বার্থ রক্ষা। করার জন্য তাই সংখ্যালঘুকে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। এটা অঙ্ক, এর মধ্যে আবেগের কোন ভূমিকা রাখা হয়নি।

তিয়ানানমেন স্কয়্যার আক্ষরিক অর্থেই রক্তে ভেসে গেল। প্রথম দফাতেই লাশ পড়েছে কয়েকশো। শুরু হওয়ার পর আর। থামছে না, থেমে থেমে হামলা চলছেই।

মারাত্মক সমস্যা দেখা দিয়েছে আহতদের নিয়ে। সংখ্যায় তারা কয়েক হাজার; শহরের সবগুলো হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়েছে মাত্র এক চতুর্থাংশ রোগীকে।

বাকি সবাই এখনও তিয়ানানমেন স্কয়্যারে পড়ে কাতরাচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকেই মারা যাচ্ছে রক্তক্ষরণে।

তারপর আরও খারাপ খবর এল। সেনাবাহিনীর ছোঁড়া বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার জন্য সকাল দশটা থেকে নতুন করে আবারও শুরু হয়েছে প্রতিবাদ মিছিল, নেতৃত্ব দিচ্ছে। পিকিং ইউনিভার্সিটির কয়েকজন অকুতোভয় ছাত্র-ছাত্রী।

এরকম একটা অবস্থায়, বিকেল চারটের দিকে মোঙ্গলের রুফ-টপ বার-এ বসে খুদে ট্রানজিসটার খুলে বিবিসি ধরার চেষ্টা করছে রানা, হঠাৎ ওর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। নম্বরটা দেখেই বুঝতে পারল ও, লুসান হুমা ফোন করেছে।

মাসুদ ভাই, ভারী, থমথমে গলায় বলল হুমা, আমি ভুলিনি আপনাকে নিয়ে বেরুবার কথা ছিল আমার। কথাটা রাখতে পারলাম না বলে আপনি আমাকে মাফ করে দেবেন, প্লিজ!

একজন চিনা হিসাবে যথেষ্ট বিনয়ী হুমা, জানে রানা, কিন্তু এই মুহূর্তে তার কথাগুলো প্রলাপের মত লাগল কানে-শহরের এরকম বিপজ্জনক অবস্থায় দেখা করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়াটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। কী ব্যাপার, লুসান, কিছু ঘটেছে? তুমি কোথেকে বলছ?

আমরা এখন, মাসুদ ভাই, আপনার হোটেলের পিছনেতিয়ান তান পার্কে। ছাদে উঠে তাকালেই দেখতে পাবেন।

কেন? আঁতকে উঠল রানা। এই পরিস্থিতিতে কোন বুদ্ধিতে তুমি বাইরে বেরিয়েছ… হঠাৎ চুপ করে গেল রানা, তারপর জিজ্ঞেস করল, আমরা মানে?

আমরা মানে কয়েকশো মানুষ, মাসুদ ভাই…

কয়েকশো মানুষ…কিন্তু তাদের সঙ্গে তুমি কী করছ পার্কে? শোনো, হুমা, এখনই আমার হোটেলে চলে এসো…

কী করে যাব, মাসুদ ভাই? আমার কাঁধে যে ভারী একটা বোঝা! এটুকু বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল হুমা।

পরবর্তী দশ মিনিট চেষ্টা করে উদভ্রান্ত আর কাতর হুমার কাছে বেশি কিছু জানতে পারল না রানা। তবে ঠিক কী ঘটেছে। বুঝে নিতে তেমন অসুবিধেও হলো না ওর।

ছোট এক ভাই ও এক বোন ছাড়া আর কেউ নেই হুমার। বোন জিজিয়ানা দালিয়ান হোস্টেলে থাকে, বেইজিং ভার্সিটি থেকে কমপিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে-আগামী। মাসে রেজাল্ট। ভাই থাকে দেশের বাড়িতে, লেখাপড়ায় তেমন ভালো না হওয়ায় চাষবাস করে। এ-সব আগে থেকেই জানা আছে। রানার।

ছাত্রদের বিক্ষোভ দমন করার জন্য রাস্তায় আর্মি নামানো হয়েছে, এই খবর পেয়ে সকাল নটার দিকে বোনের হোস্টেলে ছুটে যায় হুমা, জানে ভয় পেয়ে চারদেয়ালের ভিতর বসে থাকার পাত্রী নয় সে।

কিন্তু সেখানে পৌঁছে শুনল, গোলাগুলি শুরু হয়েছে জানার পরই ছোট একটা মিছিল নিয়ে তিয়ানানমেন স্কয়্যারের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে দালিয়ান।

বোনের নিরাপত্তার কথা ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল হুমা। তারপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে-ও ছুটল ওদিকে। ওই বোনই তো তার সব, কাজেই যেভাবে হোক তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

যাবার পথে সে দেখল, শহরের চারদিক থেকে প্রতিবাদে মুখর ছোট ছোট অসংখ্য মিছিল বেরুচ্ছে।

কিন্তু তিয়ানানমেন স্কয়্যারে পৌঁছাতে একটু দেরি করে ফেলল হুমা।

মিছিল নিয়ে স্কয়্যারে পৌছাতে পারেনি দালিয়ান, তাদেরকে লক্ষ্য করে কয়েকটা হেলিকপ্টার থেকে মেশিন গানের ব্রাশ ফায়ার হলো। হুমার চোখের সামনে দালিয়ান সহ প্রায় সবাই লুটিয়ে পড়ল রাস্তার উপর।

লোকজন যে-যেদিকে পারে ছুটে পালাচ্ছে। গুলি করে এক ঝক হেলিকপ্টার চলে গেল, পরক্ষণে দেখা গেল আরেক ঝাঁক ছুটে আসছে অন্যদিক থেকে। এরকম গোলাগুলির মধ্যেই ক্রল করে বোনের কাছে পৌছাল হুমা।

পাঁজরে আর হাঁটুর উপর গুলি খেয়েছে দালিয়ান। নিজের শার্ট ছিড়ে ক্ষতস্থান বাঁধলেও, তাতে রক্তক্ষরণ পুরোপুরি বন্ধ করা গেল না।

অজ্ঞান বোনকে কাঁধে নিয়ে সেই সকাল সাড়ে দশটা থেকে রাজধানীর অন্তত এক ডজন হাসপাতাল আর ক্লিনিকে ছুটোছুটি করল হুমা, কিন্তু কোথাও থেকে সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসাও পেল না।

তারপর জানা গেল বেইজিং মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদ আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য তিয়ান তান পার্কে একটা ক্লিনিক খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বলা হয়েছে আহত লোকজনকে যেন ওখানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

খবরটা পেয়ে কাঁধের ভারী বোঝা নিয়ে আরও কয়েকশো লোকের মত হুমাও পৌঁছেছে ওখানে। কিন্তু ইতিমধ্যে ঘণ্টাখানেক পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ক্লিনিক খোলার কোন লক্ষণ তার চোখে পড়েনি। বরং অন্যরকম একটা বিপদের আশঙ্কা করছে সে।

কোথাও থেকে পাঁচ-সাতজন ছাত্র-ছাত্রী এসে জড়ো হয়েছিল। পার্কের একধারে, তাদের শ্লোগান শুনে চারদিক থেকে তরুণতরুণীরা এসে ভিড় করছে।

ইতিমধ্যে একবার কেউ একজন আর্মি আসছে বলে চেঁচিয়ে ওঠায় ছুটোছুটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরে জানা গেল পাশের রাস্তা। দিয়ে মার্চ করে চলে গেছে তারা।

তবে এখানে যদি ছাত্ররা সমাবেশ করে, এক সময় না এক। সময় আর্মি আসবেই; ব্যাপারটা এরইমধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে, আন্দোলনের নাম-নিশানা মুছে ফেলার জন্য মাঠে নেমেছে তারা। মিছিল করা তো দূরের কথা, কারফিউ-এর মধ্যে রাস্তায় যাকে। দেখবে তাকেই খুন করার জন্য গুলি করবে। ইতিমধ্যে লাউডস্পিকারে সেরকমই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

মোবাইল ফোনে ফেঁপাচ্ছে লুসান হুমা, রানার প্রশ্নের কোন। উত্তরই দিতে পারছে না সে। রানা তাকে জরুরি একটা মেসেজ দিতে চাইছে, কিন্তু মাথাটা ঠিকমত কাজ না করায় ওর কোন কথা ভালো করে শুনছেই না সে।

শোনো, আমি একটা ঠিকানা দিচ্ছি! মোবাইল সেটে। চেঁচাচ্ছে রানা। জায়গাটা কাছেই, একটা কোড বললেই ওরা। তোমার বোনকে…

এই সময় পরপর কয়েকটা আওয়াজ শুনে শিউরে উঠল রানা। প্রথমে কপ্টার ইঞ্জিনের কর্কশ যান্ত্রিক গর্জন, পরমুহূর্তে সাবমেশিন গান থেকে ব্রাশ ফায়ারের একঘেয়ে শব্দ। তারপর একের পর এক গ্রেনেডের বিস্ফোরণ।

এক কি দুসেকেন্ড পর একটা আর্তনাদও শুনতে পেল ও, এটা বেরিয়ে এল মোবাইল সেটের ভিতর থেকে।

পার্কের ভিতর আর্মি ঢুকেছে বুঝতে পেরে বার থেকে খোলা ছাদে বেরিয়ে যাচ্ছে বিদেশী কিছু রিপোর্টার, কারণ বিশতলা দালানটার পিছন থেকে টাইয়ান তান পার্কের অনেকটাই দেখা যায়।

হুমা? হুমা? মোবাইল ফোনে চিল্কার করছে রানা।

ওদিকে ঘন ঘন হাঁপাচ্ছে হুমা। মাসুদ…ভাই… থেমে থেমে কিছু বলতে চেষ্টা করল সে, …বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে, আমি বাঁচব না…কিন্তু চিকিৎসা পেলে দালিয়ান বাঁচত… তারপর হঠাৎই থেমে গেল সে। এমনকী নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেলছে না।

অনেক ডাকাডাকি করেও হুমার আর সাড়া পাওয়া গেল না। অগত্যা বাধ্য হয়ে যোগাযোগ কেটে দিল রানা। টেবিল থেকে তুলে ক্যামেরাটা কাঁধে ঝোলাল ও, তারপর বার থেকে বেরিয়ে এল খোলা ছাদে।

মোঙ্গল বিল্ডিঙের ছাদের পিছনে ইতিমধ্যে অনেক লোকের ভিড় জমে গেছে। পার্কের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে তারা। নিজেদের কাজ সেরে ফিরে গেছে কপ্টারগুলো। গাছের নীচে আর ঝোপের ভিতর পড়ে আছে আহত মানুষ। সংখ্যায় তারা এত বেশি যে গুণে শেষ করা যাবে না।

পার্কের ভিতর মানুষে টানা তিন চাকার ভ্যান দেখা গেল বেশ কিছু। আহত লোকজনকে সম্ভবত ওই ভ্যানে তুলেই তিয়ানানমেন। স্কয়্যার থেকে পার্কে নিয়ে আসা হয়েছে।

কয়েকজন সাংবাদিক সিদ্ধান্ত নিল, দুনিয়ার মানুষকে এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের কথা জানানো তাদের কর্তব্য, কাজেই প্রাণের উপর ঝুঁকি নিয়ে হলেও আহতদের ছবি তুলতে পার্কের ভিতর ঢুকবে তারা।

রানাও বেজিঙে এসেছে একজন রিপোর্টার-এর কাভার নিয়ে, ফলে তাদের সঙ্গে ভিড়ে যেতে ওর কোন অসুবিধে হলো না।

গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে হোটেলের পিছনের বাগান দিয়ে পথ করে নিল ওরা, চুপিসারে পাঁচিল টপকে পৌঁছে গেল তিয়ান তান পার্কে।

মিনিট তিনেক হাঁটার পর ফটো তোলার প্রথম সাবজেক্ট পেয়ে গেল জার্নালিস্টরা একসঙ্গে তিনটে লাশ।

একটু পর রানার মনে হলো জেগে নেই ও, ঘুমের মধ্যে। দুঃস্বপ্ন দেখছে। এরপর যাদেরই লাশ দেখল, তাদেরকে ভাগ্যবান। বলে মনে হলো ওর-কারণ মরে গিয়ে বেঁচে গেছে তারা।

যারা বেঁচে আছে তাদের অনেকেরই হাত বা পা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে কাছাকাছি, কারও হয়তো অর্ধেক শরীরই নেই। কেউ পেট ছিড়ে বেরিয়ে আসা নিজের নাড়িভুঁড়ির দিকে হাঁ করে। তাকিয়ে আছে, কেউ নিজের রক্তস্রোতে সাঁতরাচ্ছে।

বিদেশী লোকজন দেখে সাহায্যের আশায় হাত বাড়াচ্ছে। তারা। চারপাশ থেকে ভেসে আসা কাতর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। রানা। কেউ বলছে, একটু পানি! আবার কেউ মিনতি করছে, মেরে ফেলো, প্লিজ!

আধ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর লুসান হুমাকে দেখতে পেল রানা। নিজের শরীর দিয়ে বোনকে আড়াল করে রেখেছে সে, বোধহয় সেজন্যই মেয়েটির গায়ে নতুন করে কোন আঘাত লাগেনি-না বুলেটের, না গ্রেনেডের। দুজনেরই পালস দেখল রানা।

হুমা মারা গেছে।

কিছু লোক লাশ বা আহত তরুণ-তরুণীদের ভ্যানে তুলে পার্ক। থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। পরিত্যক্ত একটা ভ্যান ঠেলে পার্ক থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল রানাকেও।

বেজিঙে রানা এজেন্সির কয়েকটাই সেফহাউস আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে করা হয় শহরের উপকণ্ঠে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটা মঠকে। মোবাইল ফোনে এই মঠের ঠিকানাই হুমাকে দিতে চেয়েছিল রানা।

সরু অলিগলি ধরে মঠে পৌছাতে এক ঘণ্টার উপর লেগে গেল রানার। তবে একবার পৌছানোর পর আর কোন সমস্যা হলো না।

মঠটা বিরাট, পাঁচশো ভিক্ষু বসবাস করেন। ভিতরে ছোট একটা ক্লিনিক আছে, বাইরের রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করা হয়। ভিক্ষুদের মধ্যেও সবাই জানেন না যে ক্লিনিকের সমস্ত খরচ বহন করছে রানা এজেন্সি।

একদল ভিক্ষু হুমার লাশ নিয়ে চলে গেল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করা হবে তার।

খানিক পর দালিয়ানকে পরীক্ষা করে ক্লিনিকের ডাক্তাররা রানাকে ডেকে পাঠালেন। রক্তের গ্রুপ জানিয়ে ওকে বলা হলো, রোগিণীকে বাঁচাতে হলে অন্তত দুই ব্যাগ রক্ত এই মুহূর্তেই দরকার।

ডাক্তারদের আন্তরিক চেষ্টা, নার্সদের সযত্ন সেবা আর ভাগ্যগুণে তিনদিন পর জ্ঞান ফিরে পেল দালিয়ান। ডাক্তররা জানালেন, সংকট কেটে গেছে; তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে অন্তত দুমাস সময় লাগবে তার।

এক হপ্তা পর চিন থেকে দেশে ফিরে আসে রানা।

কিন্তু দালিয়ানের বিপদ তখনও কাটেনি। আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল, আহত হয়ে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছে, এরকম ছাত্রছাত্রীদের খোঁজে হসপিটাল আর ক্লিনিকগুলোয় হানা দিচ্ছে মিলিটারি।

ধরতে পারলে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালতে পাঠিয়ে দিচ্ছে, সেখানে বিচারের নামে চলছে নিষ্ঠুরতা-মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোন। সাজা নেই, কারণ কারফিউ অমান্য করে যারাই বাইরে বেরিয়ে ছিল সামরিক বাহিনীর দৃষ্টিতে তারা সবাই দেশদ্রোহী।

মঠের কাছাকাছি খ্রিস্টানদের একটা মিশনারি আছে। আমেরিকান দূতাবাস থেকে ফাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আহত ছাত্র-ছাত্রীরা আশ্রয় চাইলে তাদেরকে যেন ফিরিয়ে দেওয়া না হয়। খুব কম মানুষই জানে যে মিশনারিটা আসলে সিআইএ-র একটা আস্তানা।

ডাক্তার আর ভিক্ষুরা আর কোন উপায় না দেখে ওই মিশনারিতে পাঠিয়ে দিলেন দালিয়ানকে, কারণ জানেন মিলিটারি। ওখানে হানা দেবে না। তবে দালিয়ান কেমন আছে না আছে নিয়মিত খোঁজ নেন তারা।

শ্বেতাঙ্গ ডাক্তারদের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল। দালিয়ান। রেজাল্ট বেরুতে দেখা গেল ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে সে।

ইতিমধ্যে ভিক্ষুরা জানিয়েছেন, পার্ক থেকে মিস্টার রায়হান চৌধুরী তাকে ভ্যানগাড়িতে তুলে মঠে নিয়ে আসেন, গ্রুপ মিলে যাওয়ায় তিনিই তাকে রক্ত দিয়েছেন, আর তার ভাই লুসান হুমা কীভাবে মারা গেছেন। বলাই বাহুল্য যে মঠের ভিক্ষুরা রানাকে ওই নামেই চেনে।

প্রায় এক বছর পর ঢাকায় বসে দালিয়ানের একটা চিঠি পেল রানা।

তার চিঠির একটা অংশ ছিল এরকম-বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মুখে সব কথা শোনার পর যে-কারও মনে এরকম ধারণা জন্মানোটা স্বাভাবিক যে মর্ত্যলোকে নেমে আসা কোন দেবতার পবিত্র স্পর্শে জীবনটাকে নতুন করে ফিরে পেয়েছি আমি। কিন্তু কাউকে দেবতার আসনে বসালে ঋণ পরিশোধ করার কোন উপায় থাকে। না, তাই আপনাকে মহৎপ্রাণ একজন মানুষ হিসাবেই ভাবতে চাই। আমি কখনও ভুলব না যে আমাদের সম্পর্কটা এখন রক্তের…

ওই চিঠিতেই কয়েকটা খবর দেয় দালিয়ান। মার্কিন দূতাবাসের কমপিউটার সেকশনে খুব ভালো একটা চাকরি পেয়েছে সে। আগামী মাসে তার বিয়েও হয়ে যাচ্ছে। চৌচেন ঝাও বেইজিং ভার্সিটিরই তরুণ ইংলিশ লেকচারার। পরস্পরকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসে তারা।

এরপর বেশ কয়েকবারই চিনে এসেছে রানা, তবে ব্যস্ততার কারণে প্রথমবার দালিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চার বছর লেগে যায় ওর। আনুষ্ঠানিক পরিচয়, কুশলাদি বিনিময় ইত্যাদির পর লুসান। হুমার স্মৃতি রোমন্থন করেই সময়টা পার করে ওরা।

রানার সস্নেহ আচরণ দালিয়ানকে বুঝিয়ে দেয়, তাকে নিয়ে ওর কোন মতলব নেই। বুঝতে পারে, এ সম্পূর্ণ অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ, এর সামনে এমনকী ঠাট্টা করেও ঋণ পরিশোধের কথাটা তোলা উচিত হবে না।

তারপর এক সময় দালিয়ার স্বামী চৌচেন ঝাওয়ের সঙ্গেও পরিচয় হয় রানার। বুদ্ধিমান আর বিনয়ী তরুণ, দালিয়ার মত তারও খুব ভক্তি আছে রানার প্রতি।

সেই থেকে ওদের মধ্যে শ্রদ্ধা আর স্নেহের একটা সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গেছে। দেখা-সাক্ষাৎ খুব কম হয়, তবে পরস্পরের খবর রাখার চেষ্টা করে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *