১৭. ব্যান্ডেজ বেঁধে

ব্যান্ডেজ বেঁধে কনুইয়ের মতো উঁচু হয়ে থাকা একটা পাথরের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে ইতিউতি তাকাল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। সামনে নিকষ কালো আঁধার। পাহাড়ের নীচে কোথাও ওদের ঘোড়া দুটো আছে। একটা সম্ভবত মরতে বসেছে, অন্যটা খোঁড়া হয়ে গেছে।

চারদিকে কালো অন্ধকার। আকাশ-ছোঁয়া পাথুরে দেয়াল, বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল। এই আঁধারে একজন খুনী হন্যে হয়ে খুঁজছে ওদের। অবিশ্বাস্য তার হাতের টিপ তিনশো গজ দূর থেকে বিদ্যুতের ক্ষণিক আলোয় পলকের জন্যে দেখেই দুদুবার শিকার প্রায় ঘায়েল করে এনেছিল! পরের গুলিতেই হয়তো প্রাণ হারাতে হবে। শত্রুর ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। পরিস্থিতি এখন স্পষ্ট। বাঁচতে চাইলে লোকটাকে খুঁজে বের করে হত্যা করতে হবে।

আলবৎ, শুষ্ক কণ্ঠে বলল লরেডো শ্যাড, শালাকে ধরতেই হবে। তবে সাবধান। স্পেন্সারে ব্যাটার হাত দেখেছ তো?

হগব্যাক রিজ থেকে তাড়াতাড়ি নেমে যাওয়া দরকার তোমার, জোর দিয়ে বলল কেড্রিক, এখানে থাকলে শীত আর বৃষ্টির হামলায় নির্ঘাত পটল তুলবে!

ও নিয়ে ভেব না, সংক্ষেপে জবাব দিল লরেডো। আমি হামাগুড়ি দিয়ে নীচে চলে যাব। কপাল ভালো হলে তৈমার অ্যাপালুসাকে পেয়ে যেতে পারি, ওটার স্যাডলব্যাগে খাবার, আর কফি আছে, তাই না?

হ্যাঁ, কিন্তু আমি ফেরার আগে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করো না। হাসল শ্যাড। জলদি ফিরো। একা একা খাওয়াআমার পছন্দ না।

বর্ষাতির পকেটে হাত ঢুকিয়ে পিস্তল দুটোর বাঁট আঁকড়ে ধরল কেড্রি। রাইফেল স্যাডল স্ক্যাবার্ডে রয়ে গেছে। নিপুণ এক শিকারীকে শিকার করতে যাচ্ছে ওঁ। আপন ঘাটিতে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছে সশস্ত্র মার্কসম্যান। অস্ত্রের নাম: স্পেন্সর পয়েন্ট-ফাইভ-সিক্স!

বিদ্যুৎ চমকাল, কিন্তু এবার কোনও গুলি তেড়ে এল না। তবে, সন্দেহ নেই, কাছেপিঠেই আছে লোকটা, ওদের খুঁজছে। এখন আর ইস্তফা দেবে না সে, ফিরে যাবে না। ওদের হত্যা করার এটাই তার শেষ সুযোগ। তার হাইডআউটের ঠিকানা ফাঁস হয়ে গেছে, ওরা পালালে তার নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে। এতদিন এখানে রয়ে যাওয়ায় একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গেছে, কিছুতেই এখান থেকে নড়তে রাজি নয় লোকটা।

একটা ঝোঁপের আড়াল নিয়ে পাথরের নীচ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল পল কেড্রিক। বিদ্যুৎ চমকাল, সামনে একটা বোল্ডারের স্তূপ দেখতে পেল ও। এগোল সেদিকে। বাতাসে, পতপত করছে বর্ষাতির কিনারা, উড়ে যেতে চাইছে মাথার টুপি। ডান হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করে নিয়েছে পল, বর্ষাতির নীচে লুকিয়ে রেখেছে।

এগিয়ে চলল ও। আবার বিদ্যুৎ চমকাল। ঝলমল করে উঠল চারদিক। সঙ্গে সঙ্গে মাটির সঙ্গে মিশে গেল পল। কিন্তু স্পেন্সার ঠিক গর্জে উঠল। উত্তপ্ত পাথর কুচি যেন, হুল ফোঁটাল চোখেমুখে। গড়িয়ে সরে গেল কেড্রিক, গুলি করবে কি, দুহাতে চোখ পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে।

বৃষ্টি আর বাতাসের হাহাকার ধ্বনি ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। হঠাৎ বহুদূর থেকে মেঘের গুরুগুরু গর্জন ভেসে এল, পাহাড়ের গায়ে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলল সে শব্দ 18 ফের বিদ্যুৎ চমকালে হগব্যাকের চূড়া বরাবর সামনে তাকাল কেড্রিক। অবিরাম বৃষ্টির আক্রমণে ইস্পাতের মতো চকচক করছে পাথরগুলো। নীচে নেমে এসেছে মেঘের দল, মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। চারপাশে কুয়াশা ভাসছে, হিম অশরীরী হাত বোলাচ্ছে গালে। মরা পাইন গাছের শাদা কঙ্কাল আঙুল তুলে আকাশকে যেন অভিযুক্ত করছে।

বৃষ্টির ছাট লাগছে চোখে মুখে। প্রতিবার বিদ্যুৎ চমকানোর সঙ্গে সঙ্গে গুলি খাওয়ার আশঙ্কায় কুঁকড়ে যাচ্ছে ও। বজ্রের আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে পাহাড় চূড়া, পোড়া গন্ধ নাকে লাগছে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল কেড্রিক। নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে ও। এক সময় টনটনিয়ে উঠল চোখজোড়া।

মুখের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ, ছুঁচোর কেত্তন চলছে পেটে। অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। ভয়? আতঙ্ক? এভাবে আর পড়ে থাকা যায় না। অসীম ধৈর্যের সঙ্গে সামনে বাড়ল কেড্রিক। রিজের প্রান্ত বরাবর বহু বছরের বাতাসের হামলায় অদ্ভুত আকৃতি নিয়েছে একটা জুনিপার আর অন্যান্য গাছপালার ঝোঁপ; সেটার উদ্দেশে এগিয়ে গেল।

বাতাসের শব্দ ছাড়া কোনও শব্দ নেই। কিছু দেখার উপায় নেই। পল ভাবছে, ক্লিফ-হাউস আর কতদূর! খুনীর আগেই ওখানে পৌঁছুতে পারবে? নাকি মাঝপথেই খুনীর চোখে ধরা পড়ে যাবে? আচমকা অগ্নিশিখা অন্ধকার ছিন্নভিন্ন করল, আগুন লাগল যেন কেড্রিকের কাঁধে। কিছু না ভেবেই গড়ান দিল ও, সরসর করে দশ বার ফুট নীচে একগাদা শুকনো ডালপালার স্তুপে পড়ল।

সময় নষ্ট করল, না খুনী। আচমকা ব্রিজের মাথায় তার বিশাল ছায়া দেখা গেল। ফাঁদে পড়া জন্তুর মতো গুটিসুটি হয়ে সাবধানে পিস্তলের ট্রিগার, টিপল পল কেড্রিক।

প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি খেলো ছায়ামূর্তি। পরমুহূর্তে গর্জে উঠল স্পেন্সর পয়েন্ট ফাইভ-সিক্স। বুলেটের আঘাতে কাছের একটা ডাল উড়ে গেল। আগে গুলি করতে পেরেছে বলেই এ-যাত্রা বেঁচে গেছে, বুঝতে পারল কেড্রিক। আবার গুলি, করল ও। তারপর স্বেচ্ছায় পেছনের অন্ধকারে গড়িয়ে পড়ল। অনেকটা নীচে এসে থামল, হামাগুড়ি দিয়ে সরে গেল। তারপর উঠেই আবার ঝাঁপ দিল অন্ধকারে, হাত ভাঙা বা মাথা ফেটে যাওয়ায় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও। এখন খুনীর সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোটাই জরুরী। আচমকা বিদ্যুৎ চমকে উঠল। এবং ভেলকিবাজির মতো গর্জল স্পেন্সার। ওর গতিবিধি লোকটা খেয়াল রাখছে কীভাবে, খোদা মালুম! চারদিকে বৃষ্টির মতোই বুলেট পড়ছে। প্রায় নির্ভুল গুলি করছে লোকটা, বেশিক্ষণ ফাঁকি দেয়া যাবে না।

দু’কাঁধে আগুন জ্বলছে, কিন্তু চোটটা, মারাত্মক না, সামান্য চামড়া ছড়ে গেছে, বুঝতে পারছে না কেড্রিক। মেরুদণ্ড বেয়ে গড়িয়ে নামছে তরল পদার্থের ধারা। রক্ত? পানি?

ঘুরে পেছনে সরে গেল কেড্রিক। আরেকটা গুলি ছুটে এল। কিঞ্চিৎ বাঁ দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল ওটা। সঙ্গে সঙ্গে আবার বামে চলে এল ও। মুহূর্তে একটু আগের অবস্থানের কাছে মাটিতে গাঁথল একটা বুলেট। অনুসন্ধানী গুলি ছুঁড়ছে খুনীক্রমশ দূরত্ব কমিয়ে আনছে!

এক কদম পিছনে সরতে গিয়ে হোঁচট খেলো কেড্রিক, ধপাস করে আছড়ে পড়ল। চোখের পলকে মাথার ওপর দিয়ে বিশ্রী শব্দ তুলে, ছুটে গেল এক ঝাক বুলেট। গুলি ভর্তি একটা বেল্ট আছে লোকটার কাছে, নয়তো পকেট ভর্তি করে গুলি নিয়ে এসেছে।

উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল কেড্রিক। হঠাৎ হাতের তালুতে মসৃণ পাথরের ছোঁয়া অনুভব করল। ভালো করে চারপাশে হাত বোলাল ও। পাথর নয়, মাটি আর নুড়ি।

রাস্তা! একটা রাস্তায় এসে পড়েছে ও! নিশ্চয়ই ক্লিফ-হাউসের দিকে গেছে।

সাবধানে হাতড়ে হাতড়ে এগোতে শুরু করল কেড্রিক। হঠাৎ বাম দিকে পাথর গড়ানোর শব্দ পেয়ে আন্দাজে ট্রিগার টিপে দিল। তারপরই ডিগবাজি দিয়ে সরে গেল ও। পরক্ষণে একটু আগের অবস্থানে পর পর তিনটে গুলি এসে লাগল। আবার গুলি করল পল, আবার; গুলি করছে আর দৌড়চ্ছে।

বিদ্যুৎ চমকাল ফের। পেছনে তাকাতেই ট্রেইলে বিশাল এক ছায়ামূর্তি দেখতে পেল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। দৈত্যাকৃতি, চকচকে এবং কালো। অগ্নিশিখা তেড়ে এল ওদিক থেকে। বুলেটের ধাক্কা খেলে কেড্রিক। সামলে নিল নিজেকে, আবার ট্রিগার টিপল।

তারপর আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। রাস্তা ধরে এগোল সামনে। হঠাৎ দেখল চোখের সামনে ফাঁকা-ট্রেইলটা এখানে চুলের কাটার মূতো বাঁক নিয়েছে। আর এক কদম এগোলেই হয়েছিল। আবার বিদ্যুৎ চমকে উঠতেই মুক্তির উপায় দেখতে পেল পল কেড্রিক। নীচে ধূসর শাদা অ্যাপলুসাটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে।

ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল কেড্রিক। কিছুদূর নামতেই একটা চাতালে পৌঁছুল ও। এবং তারপর হাতে লাগল ক্লিফ-হাউসের অমসৃণ, পাথুরে দেয়াল। দেয়াল হাতড়ে এগোল কেড্রিক। দরজা খুঁজে পেতে অসুবিধে হলো না। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ও। নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। দরজার কবাট টেনে দিল ও।

বাতাস আর বষ্টির অত্যাচারের পর ঘরটাকে যেন খোদার আশীর্বাদ বলে মনে হচ্ছে। একটানে মাথা থেকে ভেজা টুপি খুলে ফেলল পল কেড্রিক। বর্ষাতিটাও খুলে নিল গা থৈকে। খুনী ভাবতেও পারবে না এ জায়গার কথা ও জানে। আগে থেকে জানা না থাকলে এই ঝড়-তুফানের রাতে এটা খুঁজে পেত না।

কামরার একটু সামনে এগোতেই একটা পর্দার মুখোমুখি হলো পল, কেড্রিক। প্রথম ঘরকে ভেতরের ঘর থেকে আলাদা করেছে এটা। পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে একটা বাংকের ওপর বসল পল। বর্ষাতি আর টুপি বিছানায় রেখে বাম হোলস্টারের পিস্তল বের করতে গিয়ে দেখল হোলস্টার খালি। ডান হাতের পিস্তলে এ পর্যন্ত পাঁচবার গুলি করেছে ও। সহসা দুলে উঠল পর্দাটা, এক ঝলক বাতাস ঢুকে পড়ল ঘরে। তারপর সব কিছু স্থির। এসেছে খুনী! পাশের কামরায়!

বিছানা ককিয়ে উঠতে পারে এই ভয়ে ওঠার সাহস হলো না কেড্রিকের। ফস করে একটা দেশলাই জ্বলে উঠল। মোমবাতি জ্বালাল খুনী। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ কথা বলে উঠল লোকটা। কেড্রিক, আমি জানি তুমি এখানে আছ। ঘরের মেঝেতে পানির দাগ দেখতে পাচ্ছি। এ-ঘরে একটা পাথুরে দেয়ালের পেছনে আছি আমি, টেবিল হিসেবে ব্যবহার করি এটাকে। সুতরাং বুঝতেই পারছ, আমার গায়ে গুলি লাগাতে পারবে না। কিন্তু ওই ঘরে কোনও আড়াল নেই। তো; কী করতে হবে বুঝতেই পারছ, পিস্তল ফেলে মাথার ওপর দুহাত তুলে লক্ষ্মী ছেলের মতো বেরিয়ে এসো। নইলে একটানা গুলি শুরু করব আমি,ঘরের এক ইঞ্চি জায়গাও বাদ দেব না!

দুঘরের মাঝখানে একটা আড়াআড়ি খুঁটির সাহায্যে পর্দাটা ঝোলানো, পর্দার ওপর দিয়ে ও-পাশের ঘরের ছাদ দেখা যাচ্ছে। এ-ঘরটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক উঁচু। সম্ভবত একটা বেরিয়ে থাকা পাথর কিংবা কোনও গুহাকেই দেয়ালে ঘিরে নিয়েছে খুনী। কয়েকটা ভারি সিডার কাঠের বীম দেখা যাচ্ছে, সিলিং বসানোর জন্যে ওগুলো লাগানো হয়েছিল, এখন আর সিলিংয়ের চিহ্ন নেই। এ-ঘরেও ও-রকম বীম থাকা উচিত।

নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল কেড্রিক। হঠাৎ নড়াচড়ার শব্দ পেয়েই গুলি করল ও।

পাশের কামরা থেকে হাসির শব্দ ভেসে এল। জানতাম গুলি করবে! তা একটা পিস্তল তো এখন খালি! অন্যটা ফেলে এবার বেরিয়ে এসো! উপায়। নেই, কেড্রিক!

জবাব দিল না পল। মাথার ওপর হাত তুলে দিয়েছে ও, বীম খুঁজছে। হঠাৎ আলতো ছোঁয়া লাগল হাতে। হ্যাঁ, আছে। পাশের ঘরের, বীমের উচ্চতা দেখে কৃত ওপরে লাফ দিতে হবে হিসেব করে নিল ও।

বীমটা পুরোনো হলে! ওর ভার সইতে পারবে তো? কিন্তু ঝুঁকিটা নিতেই হচ্ছে।

লাফ দিল কেড্রিক। বীম আঁকড়ে ধরল ওর হাত-নিঃশব্দে টেনে নিজেকে ওপরে তুলল। আলোকিত পাশের ঘরের অভ্যন্তর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু খুনীর অবস্থান বুঝতে পারল না কেড্রিক।

আবার কথা বলল লোকটা। নাহ, আর সময় দিতে পারছি না; কেড্রিক। বেরিয়ে এসো! নইলে গুলি করল! জলদি পিস্তল ফেলে দাও!

অখণ্ড নীরবতা নামল কামরায়।

আচমকা পিস্তলের কানফাটা আওয়াজে, খানখান হলো নীরবতা। গুলি করছে খুনী! অবিরাম! একটা সিক্স-গান খালি হলো। তারপর আরও, একটা পিস্তল খালি করল সে। খোদাই মালুম লোকটার কাছে কটা পিস্তল আছে! ওর মতিগতি বোঝারও উপায় নেই। আবার সযত্নে ছটা গুলি করল সে! দেয়ালে বাড়ি খেয়ে কৈড্রিকের ঠিক মাথার কাছ দিয়ে ছুটে গেল একটা বুলেট!

দীর্ঘ নীরবতা। তারপর নড়াচড়ার আওয়াজ।

ঠিক হ্যায়, এখনও বেঁচে থাকলে ফের গুলি করছি আমি। তবে হার স্বীকার করতে রাজি থাকলে শেষ বারের মতো সুযোগ দিচ্ছি। তোমাকে জ্যান্ত পেলে আমারই লাভ।

আচমকা সরে গেল পর্দা। ফাঁকায় এসে দাঁড়াল অ্যাল্টন বারউইক। হাতে উদ্যত পিস্তল। গুলি করার জন্যে তৈরি।

.

কোনওরকম আওয়াজ দিল না পল কেড্রিক। ইতিউতি তাকাল বারউইক। তারপর ছুটে এল ভেতরে। ক্রোধে চিৎকার করছে। প্রথমে কেড্রিকের টুপি, তারপর বর্ষাতি ছুঁড়ে ফেলল বিছানার ওপর থেকে। বর্ষাতির সঙ্গে কেড্রিকের অন্য পিস্তলটাও পড়ল মেঝেতে, হোলস্টার থেকে বেরিয়ে বর্ষাতির সঙ্গে আটকে ছিল, কোনওমতে। হিংস্র চেহারায় ওটার দিকে তাকিয়ে রইল বারউইক একটানে সরিয়ে ফেলল বিছানাটা। রাগে উন্মাদপ্রায়। খাটের নীচে কেড্রিককে খুঁজল। কেড্রিক নেই বিশ্বাস করতে পারছে না। দিশেহারা চেহারা।

হঠাৎ থমকে দাঁড়াল বারউইক। আস্তে আস্তে স্তিমিত হলো ক্রোধের আগুন। দাঁড়িয়ে আছে সে, হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে বিশাল বুক। এখনও পিস্তল ধরে রেখেছে। চলে গেছে! চলে গেছে! নিকটাত্মীয় বিয়োগব্যথায় কাঁদছে যেন। অথচ এখানেই বাগে পেয়েছিলাম!

বীমের গা থেকে ছোট্ট একটা টুকরো ভেঙে নিল কেড্রিক। বারউইকের গাল, বরাবর ছুঁড়ে মারল। যেন মৌমাছির হুল ফুটেছে, চমকে উঠল লোকটা। ঘাড় কাত করে অকাল ওপর দিকে। দৃষ্টি বিনিময় হলো দুজনের। ধীর পায়ে পিছিয়ে গেল বারউইক, হাসছে। সত্যি চালু ছেলে তুমি, কেড্রিক! ধূর্ত! গবেট কীথের জায়গায় তোমাকে যদি পাশে পেতাম! লোকটা খালি বড় বড় বুলি কপচাত, ভেতরে কিছু নেই-ঠন ঠন!

যাক গে, লম্বা করে দম নিল বারউইক। এবার তোমাকে পেয়েছি। আমাকে অনেক জ্বালিয়েছ তুমি, সেজন্যে পস্তাতে হবে। মেঝে থেকে কেড্রিকের পিস্তল তুলে নিয়ে আরেকটু পিছিয়ে গেল সে। ঠিক হ্যায়, নেমে এসো এবার!

মেঝেয় নামল পল কেড্রিক। বিরক্তির সঙ্গে মাথা নেড়ে ওর পিস্তলের দিকে ইঙ্গিত করল বারউইক। ধাপ্পাবাজি রাখো! ওটা খালি। ফেলে দাও!

ব্যাপারটা কী, বারউইক? হঠাৎ জানতে চাইল কেড্রিক। এখানে কেন? বর্মটা কীসের জন্যে? ডরনি শয়ের এ-অবস্থা কেন?

আচ্ছা? এসব তুমি জানলে কীভাবে? অবশ্য এখন আর তাতে অসুবিধে নেই। তুমি তো বেঁচে থাকছ না! পিছিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল বারউইক। পিস্তল উঁচিয়ে কেড্রিকের দিকে সতর্ক নজর রাখছে। ব্যাপারটা খুবই সোজা। সোনার জন্যে, বাছা, সোনা! অনেক টাকার সোনা! ওয়্যাগন ট্রেনের ওপর হামলা চালানোর জন্যে ইন্ডিয়ানদের আমিই উস্কে দিয়েছিলাম। ওয়্যাগন ট্রেনের সোনা হাতাতে চেয়েছি। ডরনির এক বন্ধুর বাবা ছিল ওই সোনার মালিক!

সোনার খবর, আগেই আমার কানে আসে। ডজ সিটি থেকেই ওদের অনুসরণ করি। ব্যাংক থেকে তোলার সময় সোনার পরিমাণ জেনে নিয়েছিলাম।

কিন্তু ওরা আমাকে বোকা বানিয়ে দেয়। হামলা চালানোর আগেই কোথাও পুঁতে ফেলে সব সোনা। এদিকে যে কোনওখানে হতে পারে মুশকিল হয়েছে সেখানেই। ট্রেইলের ধারে কাছে কোথাও, জানি, কিন্তু অনেক খোঁড়াখুঁড়ি করেও পরে পাইনি! তবে পাব-আর কাউকে হাত দিতে দেব না!

জমি কিনতে চেয়েছি কেন, জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, না? লাভের জন্যে তো বটেই! কিন্তু আমার আসলে দরকার ছিল এ-এলাকাটা, যাতে ভালো করে সোনার খোঁজ করতে পারি। থিভিং রক আর এই পাহাড়ের মাঝামাঝি কোথাওই সোনাটা থাকতে বাধ্য।

মাথা দোলাল কেড্রিক। এবার সব কিছু পরিষ্কার হচ্ছে। বারউইক, পিস্তল ফেলল! ধরা দাও!

বিরস কণ্ঠে হাসল বারউইক। ধোকা দিচ্ছ? জানতাম চেষ্টা করবে! সাহস, আছে বলতে হয়! তুমি পিস্তল ফেলো, কেড্রিক, নইলে মালাইচাকি গুঁড়িয়ে দেব?

লোকটা গুলি করবে, বুঝতে পারছে ক্যাপ্টেন কেড্রিক। বারউইকের পিস্তলের ওপর থেকে চোখ না সরিয়ে পিস্তল ওঠাল ও। ঠাণ্ডা মাথায় ট্রিগার টিপল, বারউইক গুলি করার ঠিক আগমুহূর্তে। গুলিটা বারউইকের পিস্তলধরা হাতের বুড়ো আঙুল ঘেঁষে পেটের একপাশে ঢুকল।

কেঁপে উঠল তার বিশাল শরীর, বেঁকে গেল ঠোঁটজোড়া। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে পলের পিস্তলের দিকে তাকাল। গুলি করার জন্যে পিস্তল ওঠাল। অবিচল হাতে আবার ট্রিগার টিপল কেড্রিক। একবার, দুবার। থপ থপ শব্দে বারউইকের শরীরে আশ্রয় নিল বুলেটগুলো। রক্ত সরে শাদা হয়ে গেল লোকটার মুখ হাত থেকে পিছলে পড়ল পিস্তলটা। এগিয়ে এসে ওকে ধরে ফেলল কেন্দ্রিক, শুইয়ে দিল আস্তে করে। বারউইকের থলথলে গাল শাদা হয়ে গেছে। বোকার মতো ওর দিকে তাকাল সে। কী হলো? ওটা-ওটা?।

এটা ওয়েলশ টুয়েলভ-শট-নেভী-পিস্তল, বুঝিয়ে দিল কেড্রিক। পয়েন্ট ফোর-ফোর রাশানের বদলে কদিন হলো এগুলো সঙ্গে রাখছি।

ওর দিকে তাকিয়ে আছে বারউইক, দৃষ্টিতে বিদ্বেষের লেশমাত্র নেই। চালাক! বলল সে। সত্যি চালাক ছেলে তুমি। বরাবর এক চাল এগিয়ে রইলে! তোমার হবে বাছা, তোমার হবে!

.

বৃষ্টি থেমে গেছে। উত্তাপ ছড়াচ্ছে সূর্য।

মাস্ট্যাং।

দ্বিতীয়বার আহত হওয়ার পর আবার হাঁটার শক্তি ফিরে পেয়েছে ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। সামান্থা ফক্সের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে ও। ওদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে লরেছো শ্যাড। স্যুটটায় কিন্তু চমৎকার মানিয়েছে তোমাকে, পল। ভালো কথা, তোমাদের কি ফিরতে দেরি হবে?

নাহ! স্যান্তা ফে-তে বিয়েটা সেরেই মগোলন-এ র‍্যাঞ্চ করতে ফিরে আসব আমরা।

সোনার খোঁজে বের হচ্ছ না কেন, বুঝলাম না, লরেডোর কণ্ঠে অভিযোগ। তবে বারউইকের কাৰ্গজপত্রই আসল জিনিস। এবার ঠিক গর্ত খুঁজতে শুরু করবে কামিংস। যাই বলো, সোনার জন্যে কিন্তু সত্যি খারাপ লাগছে।

আমার লাগছে না, বলল সামান্থা। ওই সোনার জন্যে এমনিতেও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। সোনার লোভে বারউইক সহ কতগুলো লোক মারা গেল। তার চেয়ে যেভাবে আছে, সেভাবেই থাক ওই সোনা। ভালো কোনও লোক হয়তো একদিন ওগুলো খুঁজে পাবে-সৎ কাজে লাগাবে।

হায় হায়! হঠাৎ বলে উঠল লরেডো। আমাকে যে যেতে হয়! স্যুর সঙ্গে দেখা করার সময় বয়ে গেল। চলি, হ্যাঁ!

শ্যাডের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল পল, আর সামান্থা। স্টেজ আসবে একটু পর।

শান্ত মাস্ট্যাং–খুন খারাবী ছাড়া পুরো তিনটি দিন কেটে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *