১৬. পর পর তিনটি সপ্তাহ কেটে গেছে

পর পর তিনটি সপ্তাহ কেটে গেছে, অ্যাল্টন বারউইকের খোঁজ নেই। একেবারে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে লোকটা। ঘোড়সওয়াররা বহুবার খুঁজতে বের হলো তাকে, প্রতিবারই ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল তারা।

তৃতীয় সপ্তাহের শেষ দিন, বিকেল। স্টেজ কোচ থেকে নামল তিনজন যাত্রী। সঙ্গে সঙ্গে সেইন্ট জেমস-এ যার যার নির্ধারিত কামরায় পৌঁছে দেয়া হলো তাদের। ঘণ্টাখানেক পর, ওরা যখন ডিনারে বসেছে, ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক দরজা ঠেলে ডাইনিং রুমে ঢুকল; ওকে দেখে তিনজনের একজন উঠে দাঁড়াল। দীর্ঘদেহী, ধোপদুরস্ত পোশাক পরনে; জুলফির কাছে পাক ধরেছে চুলে। কেড্রিকের উদ্দেশে দুহাত বাড়িয়ে দিল সে। এই যে, পল! কদ্দিন পর দেখা! জেন্টলমেন, এর নাম পল কেড্রিক যার কথা এতক্ষণ বলছিলাম। আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ করেছি। পল–এ মিস্টার, এডগারটন আর এ হলো মিস্টার কামিংস।

কামিংস ছোটখাট মানুষ, মোটা, সপ্রতিভ চেহারা; এডগারটন র‍্যানসামের মতো লম্বা চওড়া, বিশাল একজোড়া ধূসর গোফ শোভা পাচ্ছে তার নাকের ডগায়। পল-কে স্বাগত জানাল ওরা। আসন গ্রহণ করল কেড্রিক। সাথে সাথে বিস্তারিত জানতে জেরা শুরু করল দুজন। শান্তকণ্ঠে স্পষ্ট করে নিউ অরলিন্সে কোম্পানির সঙ্গে যোগ দেয়া থেকে শুরু করে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করল কেড্রিক।

বারউইক নিখোঁজ? গোঁফঅলা এডগারটনের প্রশ্ন? খুনটুন হয় নি তো? বোধ হয় না, জবাব দিল কেড্রিক। হাওয়া হয়ে গেছে লোকটা। বিপদ দেখলে সটকে পড়া তার বরাবরের অভ্যেস বলে শুনেছি। বারউইক পালিয়ে যাবার পর মিস সামান্থা ফক্স আর তার মামা, জন গুন্টারের কাগজপত্র থেকে প্রায় সব কিছুই জানতে পেরেছি আমরা। কিন্তু বারউইকের অধিকাংশ কাগজপত্র উধাও হয়ে গেছে।

উধাও হয়েছে? জানতে চাইল এডগারটন। গেল কোথায়? কীভাবে?

মিস ফক্স জানিয়েছে, ডরনি শয়ের মুখোমুখি হওয়ার আগে ঘরে ঢোকার সময় অফিস কামরার সামনে দিয়ে গেছে সে, তখন সব কিছু গোছানো ছিল। কিন্তু পরে ভিড় কমে যাবার পর আমরা অফিসে ফিরে সব কিছু তছনছ অবস্থায় পেয়েছি। তার মানে কেউ তল্লাশি চালিয়েছে কিংবা ইচ্ছে করে ওভাবে ফেলে গেছে।

বারউইক ফিরে এসেছিল বোঝাতে চাচ্ছ? ওই সময় ওখানেই ছিল সে?

তা ছাড়া আর কে হবে বলো? সামান্থা-মনে, মিস ফক্স-জানিয়েছে, সেফের কমবিনেশন বারউইক ছাড়া আর কেউ জানত না। ব্যবসা দেখাশোনার সমস্ত দায়িত্ব তার ওপরই ছিল। কেড্রিকের দিকে তাকাল কামিংস। তুমি বলছ ডরনি শই কীথকে খুন করেছে, কাজটা যে তুমিই করোনি কীভাবে বুঝব? ফেসেনডেনকে হত্যা করার কথা নিজের মুখেই তো স্বীকার করলে।

হ্যাঁ, তা করেছি। সবার সামনে ফেয়ার ফাইটে আমার হাতে মারা গেছে ফেসেনডেন। কিন্তু কীথ মারা যাবার পর তার লাশও দেখি নি আমি।

জন গুন্টারকে কে মেরেছে বলে তোমার বিশ্বাস? জানতে চাইল কামিংস।

বারউইক হবারই সম্ভাবনা বেশি।

তা-ও ভালো কীথের নাম বলো নি, শুষ্ক কণ্ঠে বলল কামিংস।

কীথ ছুরি মারার মতো লোক নয়, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল পল কেড্রিক। এমনকী পেছন থেকেও হামলা করত না সে, এক্ষেত্রে তাই ঘটেছে।

এই জমির ব্যবসায়, প্রশ্ন র‍্যানসামের, তোমার ভূমিকা কী, পল?

আমার? কোনও ভূমিকা নেই, সোজা কথা আমি এর মধ্যে নেই।

ঝট করে তাকাল কামিংস। এ-থেকে তোমার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না? কোনওভাবেই না?

কীভাবে থাকবে? আমার কোনওরকম মালিকানা থাকলে তো? ব্যবসায় আমার তিলমাত্র অধিকার নেই।

কিন্তু এইমাত্র বললে, বারউইক তোমাকে মুনাফার শতকরা পনের ভাগ দেবার প্রস্তাব দিয়েছিল?

ঠিক। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, ওটা ছিল একটা টোপ, যাতে আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে অন্যদের সাথে খুন করা যায়। বারউইকই আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিল, পরে ক্যানিয়নে খনিজ পাথর দেখার উসিলায় সরে পড়ে।

তা হলে মেয়েটা? মানে সামান্থা ফক্স? তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জানতে চাইল কামিংস। তারও কি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই?

জন গুন্টার, ওঁর টাকা ব্যবসায়ে খাটিয়েছিল, এখন ওগুলো ফিরে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ-লাভ তো আরও পরের কথা।

দেখলে তো, কামিংস? বলল র‍্যানসাম। বলেছিলাম না, কেড্রিক ভদ্রলোক। ওকে ভালো করে চিনি আমি।

তদন্ত শেষ হোক, তারপর এ-সম্পর্কে আমার মতামত জানাব। এখন নয়। আমি পুরো ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে চাই। অ্যাল্টন বারউইকের নিখোঁজের ব্যাপারেও খোঁজ খবর নিতে হবে। এখানকার অবস্থা মোটেই সুবিধের ঠেকছে না আমার কাছে।

হাতের কাগজপত্রের দিকে তাকাল কামিংস, তারপর কেড্রিকের দিকে চোখ ফেরাল। ভালো কথা কেড্রিক, ফেসেনডেনকে তুমি হত্যা করেছ, কিন্তু সে ছিল একজন নির্বাচিত শেরিফ, তাই না?

কারচুপি করে জিতেছিল, জবাব দিল কেড্রিক। ওরা নিজেরাই ভোট গুনেছিল। একে বৈধ নির্বাচন বললে ওদের অবশ্য নির্বাচিত বলা যায়।

অ। কিন্তু ওর কর্তৃত্ব নিশ্চয়ই অস্বীকার করবে না?

হ্যাঁ, করছি।

.

নিজের টেবিলে ফিরে কেড্রিক দেখল সামান্থা অপেক্ষা করছে ওর জন্যে। কেড্রিক বসতেই মৃদু হাসল সে। মন দিয়ে দেরি হওয়ার কারণ শুনল। তারপর ভুরু কুঁচকে ভাবল একটু। কামিংস? মামার কাগজপত্রে নামটা দেখেছিলাম বোধ হয়। ওয়াশিংটনে ওদের হয়ে কাজ করেছিল লোকটা।

এবার অনেক কিছু স্পষ্ট হলো, কফির কাপ তুলে নিল কেড্রিক, পরমুহূর্তে শ্যাড এগিয়ে আসছে দেখে তাড়াতাড়ি নামিয়ে রাখল। শ্যাডের চেহারা গম্ভীর। এদিক ওদিক তাকাল সে, কেড্রিককে দেখে প্রায় ছুটে এল, ঝুনঝুন শব্দ উঠল স্পারে। উঠে দাঁড়াল কেড্রিক। কী ব্যাপার? কী হয়েছে?

কী হয় নি! কাল রাতে গুলি খেয়েছে স্লোয়ান, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ইয়েলো বাট শহর!

কী? হতবাক কেড্রিক।

গম্ভীর চেহারায় মাথা ঝাঁকাল লরেডে শ্যাড। ওই ডরনি শয়তানটাকে ছেড়ে দেয়া মোটেই ঠিক হয় নি!

বিরক্তির সঙ্গে মাথা নাড়ল, কেড্রিক। অসম্ভব! তুলোধুনো হয়ে এখান থেকে গেছে সে, তাড়া খাওয়া খরগোশের মতো প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে, এত তাড়াতাড়ি তার প্রতিশোধ নেয়ার কথা নয়। কয়েকমাস পরে হয়তো একবার চেষ্টা করত। উঁহু, ডরনি নয়, অন্য কারও কাজ।

ডরনি ছাড়া আর কে করবে?

সামান্থার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো কেড্রিকের। মাথা দোলাল মেয়েটা, ভয়ার্ত দৃষ্টি তার চোখে। কে, সেটা ভালোই জানো তুমি, পল। বারউইক হওয়ার সম্ভাবনা মোল আনা।

অবশ্যই, কেড্রিকও তাই ভাবছে। কোনওরকম চিহ্ন না রেখে একেবারে গায়েব হয়ে গিয়ে ওকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল নোকটা। বারউইকের বিষ মেশানো দৃষ্টির কথা মনে পড়তেই নিঃসন্দেহ হয়ে গেল কেড্রিক। এখানে জমির ফটকাবাজির ওপর নির্ভর করেছিল বারউইক, অন্যদের চেয়ে বেশি শ্রম ব্যয় করেছে সে, এত সহজে হাল ছাড়তে চাইবে না।

শ্যাড,হঠাৎ বলল কেড্রিক, এতসব ঘটনার সঙ্গে গ্রুটার সম্পর্ক কী, বলো তো? বারবার ওটাকে দেখা যাচ্ছে কেন? আমরা জানি না, এমন কোনও ব্যাপার নেই তো? গৃঢ় কোনও রহস্য? গ্ৰলাটার সওয়ারী কে? তার চেহারা দেখা যায় না কেন? এর নাম শুনলেই এমন তটস্থ হয়ে উঠত কেন ডরনি?

গ্রলাকে ভয় করত সে? ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল লরেডো শ্যাড, ওর সঙ্গে খাপ খায় না।

কেন খাপ খায় না? জানা দরকার। তোমাকে বলেছি, সেদিন ডরনিকে, পেটানোর সময় হঠাৎ মুখ তুলে কী যেন দেখে আঁতকে উঠেছিল সে। আমার ধারণা, কী দেখবে আগে থেকেই জানত লোকটা। ডরনি শ যাবার পর আমি চারদিকে নজর বুলিয়েছি, কিন্তু কিছু দেখি নি। অবশ্য পরে গ্রুলা মাস্টাংটার ট্র্যাক চোখে পড়েছে। হট্টগোলের পুরো সময়টাকে বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়েছিল ঘোড়াটা!

আবার কামরায় এল ফ্রেডরিক র‍্যানসাম। ওদের টেবিলের দিকে এগোল। ঝামেলা বাধানোর পায়তারা করছে কামিংস, একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। সে। তোমাকে ফাসাতে চাইছে। কীথ কিংবা বারউইকের খুনের দায় তোমার ঘাড়ে চাপাতে পারলেই কাজ হয়ে যাবে তারকোম্পানির পার্টনারদের খুন করে সব কিছু ধামা চাপা দেয়ার জন্যে তুমি নাকি গল্প ফেঁদে বসেছ। লোকটা মহা ঘাপলা বাধিয়ে দিতে পারে, যার ফলে স্কোয়াটাররা হয়তো তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। সুতরাং যে করেই হোক এখন বারউইককে খুঁজে বের করা দরকার।

সিগারেট ধরাল লরেডো শ্যাড। কঠিন কাজ, বলল ও, তবে আমি বোধ হয় একটা সূত্র পেয়েছি।

কী? চোখ তুলে তাকাল কেড্রিক।

গ্রুলার ব্যাপারে বারউইক কখনও কিছু বলেছে?

না, আমি অন্তত, শুনি নি। ওর সামনে ঘোড়াটার প্রসঙ্গ উঠেছিল একবার, কিন্তু সে কোনওরকম কৌতূহল প্রকাশ করে নি।

আগে থেকে সব কিছু জানে বলেই হয়তো চুপ মেরে ছিল, বলল শ্যাড। প্রথম থেকেই লোকটা আমাকে ধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল।

চোখ তুলে লরেডোর দিকে তাকাল সামান্থা। হয়তো ঠিকই বলেছ। কিন্তু পিট আর স্যু লেইন বারউইকেরই সৎ-ছেলেমেয়ে, ওরা ঘোড়াটার সম্পর্কে কিছু জানে না কেন? কিছু জানলে একমাত্র ডরনি শই জানত।

উঠে দাঁড়াল পল কেড্রিক। তা হলে দেখা যাচ্ছে একটা পথই খোলা আছে আমাদের সামনে, বলল ও, ঘোড়াটার ট্র্যাক খুঁজে বের করে ট্রেইল করতে হবে, লরেডো। পুরোনো কোনও ট্র্যাক রেছে নিয়ে দেখতে হবে ওটা আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।

.

তৃতীয় দিনে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। সারা সপ্তাহ ঠাণ্ডা হিম হাওয়া দিচ্ছিল, আকাশ ঢেকেছিল কালো মেঘে। বৃষ্টি নামবে সবাই জানত। বর্ষাতির ভেতর কুঁকড়ে গেছে লরেডো, গ্লাভস পরা হাতে তালি বাজাল, বিড়বিড় করে উঠল, সেরেছে! বিরক্তির সঙ্গে বলল ও, সব ট্রাক মুছে সমান হয়ে যাবে।

পুরোনোগুলো তো বটেই, সায় দিল কেড্রিক। যা হোক, এ-পর্যন্ত অন্তত ডজনখানেক ট্র্যাক অনুসরণ করেছি আমরা, লাভ তো হলো না। সবগুলো ট্র্যাক হয় পাথরের মাঝে উধাও হয়েছে, নয়তো বালির সঙ্গে মিশে গেছে।

ক্যানিয়ন ধরে খানিকটা এগোলে এসক্যাভাদার কেবিন, বলল লরেডো শ্যাড। চল ওখানে গিয়ে গলা ভিজিয়ে আসি। এই সুযোগে একটু আগুনও পোহানো যাবে।

চেনো নাকি তাকে?

হ্যাঁ, বিশ্রাম নেয়ার জন্যে একবার ওর ওখানে থেমেছিলাম। আধা স্প্যানিশ আধা উতে লোকটা। কঠিন মানুষ। সেই কবে এখানে আস্তানা গেড়েছে আর যায় নি। ওর কাছে হয়তো কোনও খবর মিলে যেতে পারে।

ক্যানিয়নের অভ্যন্তরে পথ পিচ্ছিল। তুমুল বৃষ্টির মাঝে ক্যানিয়নের লালচে দেয়াল কালো দেখাচ্ছে। চোখের সামনে কেউ বৃষ্টির ফোঁটায় বোনা পর্দা টাঙিয়ে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। পাহাড়ের এক কোণে বুড়োর কেবিনে পৌঁছুতে পৌঁছুতে ভিজে কাক হয়ে গেল ওরা, ঠাণ্ডায় হি-হি করে কাঁপছে। ঘোড়া দুটোর অবস্থাও তথৈবচ। খিদেয় নাড়িভুড়ি হজম হবার যোগাড়।

দরজা খুলে ওদের ভেতরে ঢুকতে দিল এসক্যাভাদা। গাল ভরা হাসি উপহার দিল। তোমাদের দেখে খুশি হলাম, বলল সে। তিন সপ্তাহ হলো মানুষের চেহারা দেখি নি।

বর্ষাতি খুলে বসে পড়ল কেড্রিক আর লরেডো শ্যাড। ওদের কড়া হুইস্কি মেশানো কফি দিল এসক্যাভাদা। আগে শরীর গরম করে নাও, বলল সে। এখুনি আবার বেরোবে না নিশ্চয়ই? ঠাণ্ডা থেকে এসে হুইস্কি খেলে আরাম লাগে, যদি না আবার বাইরে যাও। বাইরে গেলে সব উত্তাপ চামড়া ঠেলে বেরিয়ে আসে, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এজন্যেই হুইস্কি খেয়ে বাইরে গিয়ে মারা যায় লোকে।

আশপাশে কখনও একটা গ্রস্না মাস্ট্যাং দেখেছ তুমি, এসক্যাভাদা? বুড়োর দিকে তাকিয়ে আচমকা জিজ্ঞেস করে বসল লরেডো শ্যাড।

ওদের দিকে তাকাল বুড়ো, দৃষ্টিতে বিদ্রূপ মেশানো কৌতুক তোমরা আবার ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করো না তো?

না, বলল কেড্রিক, কিন্তু তার সাথে এর কী সম্পর্ক?

গ্রুলাটা এই অঞ্চলের একটা কিংবদন্তীর নায়ক, কমপক্ষে তিরিশ-চল্লিশ বছর কিংবা তারও আগের গল্প। ওটাকে মৃত্যু আর বিপদের প্রতীক হিশেবে দেখে সবাই।

কেড্রিকের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল লরেডো শ্যাড। কেড্রিক জানতে চাইল, ঘোড়াটা সম্পর্কে কদূর জানো তুমি? ওটা জ্যান্ত। আমরা দুজনই দেখেছি।

আমিও দেখেছি। বলল বুড়ো এসক্যাভাদা। একটা চেয়ারে বসে ওদের দিকে তাকিয়ে হাসল সে। মাথা ভর্তি পাকা চুল উস্কোখুস্কো, কিন্তু দুচোখে যেন তারুণ্যের দীপ্তি। একবার দুবার নয়, বহুবার। কিন্তু আমার কোনও বিপদ হয় নি, কোদাল হারানোকে বিপদ বললে অবশ্য ভিন্ন কথা।

চেয়ার টেনে লাকড়ির স্তুপের কাছে গেল সে। কয়েকটা লাকড়ি ঠেসে দিল আগুনে। বহুদিন আগে ঘোড়াটার কথা প্রথম শুনি আমি। বর্ম পরা এক স্প্যানিশ লোকের গল্প বলত বুড়োরা, ইঁদুররঙা ঘোড়াটা সে-ই হাঁকিয়ে বেড়াত, পাহাড় থেকে আসত আবার পাহাড়েই হারিয়ে যেত।

অনেকদিন আগে ওরই মতো বর্ম পরা এক লোক নাকি ইন্ডিয়ানদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাত। এ-হচ্ছে তারই প্রেতাত্মা। পনের ষোল বছর আগেও, ধরতে গেলে নিত্যদিনই কারও না কারও মুখে একবার শোনা যেত ওই কাহিনী। তারপর হঠাৎ যেন নতুন করে প্রাণ পেল সেটা!

মানে আবার নতুন করে চালু হয়েছে? কেড্রিক জানতে চাইল।

হ্যাঁ সল্ট ক্রিকের ধারে, ইন্ডিয়ান-আক্রমণে একটা ওয়্যাগন ট্রেন ধ্বংস হওয়ার পর এর শুরু। ওই হামলায় নারী-শিশুসহ ওয়াগন ট্রেনের প্রতিটি যাত্রী খুন হয়েছিল। কিন্তু ছোট একটা ছেলে পালিয়ে বেঁচে যায়, চার পাঁচ বছর বয়স ছিল তার। হামাগুড়ি দিয়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে একটা ঝোঁপের ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল সে। তার মুখেই শোনা গেছে, বর্ম পরা শাদা চামড়ার একজন লোক গ্রুলার পিঠে ইন্ডিয়ানদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল।

গাঁজাখুরি, বলল শ্যাড, অবশ্য এত বড় দুর্ঘটনার পর উল্টাপাল্টা কিছু দেখলে বাচ্চাটাকে দোষ দেয়া যায় না।

ছেলেটা বলেছে; বর্মঅলা লোকটা প্রত্যেকটা মানুষকে ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে ওদের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছিল। একবার ঝোঁপের ভেতর সোজা ওর দিকে তাকিয়েছিল সে। প্রাণ ভয়ে কাদা হয়ে গিয়েছিল বাচ্চাটা। কিন্তু ওকে দেখতে পায় নি লোকটা, তা হলে বাঁচত না!

সেই থেকে গুলাটা নিয়মিত দেখা যাচ্ছে? প্রশ্ন লরেডো শ্যাডের।

হুঁ। কিন্তু আজ পর্যন্ত সওয়ারীর চেহারা দেখতে পায় নি কেউ। মাঝে মাঝে খুব দূরে আরোহীসহ ঘোড়াটা দেখা যায়; আবার অনেক সময় একাই দাঁড়িয়ে থাকে ওটা। ওটাকে দেখলেই খোদার নাম জপতে জপতে পালায় সবাই। উঠে গিয়ে আবার কফিপট নিয়ে এল বুড়ো। কিন্তু ঠিক আজই তোমরা এই গল্প শুনতে চাইলে দেখে অবাক হয়েছি, বলল সে।

একসঙ্গে বুড়োর দিকে তাকাল ওরা। কৌতূহল আঁচ করে আবার খেই ধরল এসক্যাভাদা। কয়েকদিন আগে শিকারে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখি ক্যাকটাস আর মেসকিট ঝোপে কয়েকটা মৌমাছি ঘুর ঘুর করছে। ওদের মৌচাক কোথায় জানার ইচ্ছে হলো। পিছু নিলাম। এখান থেকে দক্ষিণে অনেকটা দূরে চলে গেলাম আমি।

একেবারে দক্ষিণে না, বলা যায় দক্ষিণ-পশ্চিমে। মৌমাছির পেছন পেছন সোজা হগব্যাকে পৌঁছে গেলাম। চেনো তো জায়গাটা?

পাঁচ ছশো ফুটের মতো উঁচু একটা রিজ হগব্যাক, প্রথম চারশো ফুট তো প্রায় খাড়া উঠে গেছে। রিজ বেয়ে উঠে মৌমাছিদের চাকের গুহাটা খুঁজতে গিয়ে একটা ক্লিফ-হাউস চোখে পড়ল। ঘরটা কিন্তু মানুষের তৈরি। বিশ একুশ বছরের বেশি হবে না ওটার বয়স।

যা দেখে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি, আমার কোদাল-যেটা হারিয়ে গিয়েছিল। ওই ঘরে একটা তাকের ওপর রাখা ছিল। তো বুঝলাম কোদালটা হারায় নি, চুরি করেছিল কেউ। ঘরটা তল্লাশি করলাম আমি। চমৎকার গোছানো সব কিছু, খাবার কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব নেই। কেউ থাকে ওখানে, বাতিল জিনিসের নীচে লুকোনো একটা ব্রেস্টপ্লেট আর হেলমেটও দেখেছি আমি।

সত্যি?কেড্রিকের গলায় অবিশ্বাস।

নিশ্চয়ই! হাসল, এসক্যাভাদা, আরও আছে। দেখলাম মেঝের ওপর এক যুবকের লাশ পড়ে আছে। কয়েকদিনের পুরোনো। পুরোনো একটা স্প্যানিশ ছুরি গেঁথে আছে বুকে। বর্ম পরা স্প্যানিশের কাছে এই রকম একটা; ছুরি ছিল, আগেই বলেছি।

লাশ-যুবকের? হঠাৎ সামনে ঝুঁকে পড়ল কেড্রিক। বেমানান কিছু চোখে পড়েছে তোমার? যুবকের এক হাতের বুড়ো আঙুল কি কাটা ছিল?

বিস্মিত হলো এসক্যাভাদা। আশ্চর্য, জাদু জানো নাকি? হ্যাঁ, ছেলেটার এক হাতের বুড়ো আঙুল কাটা ছিল, অন্য হাতের অবস্থাও কাহিল-স্লিংয়ে বাঁধা ছিল। ডরনি শ! ঝট করে উঠে দাঁড়াল লরেডো শ্যাড ইয়াল্লা, ও যে ডরনি শ!

শ? ভুরুতে ভাঁজ পড়ল এসক্যাভাদার, দুচোখ জ্বলজ্বল করছে। আরে, আশ্চর্য, সত্যি আশ্চর্য ব্যাপার! ওয়্যাগন ট্রেনের বেঁচে যাওয়া ছেলেটাই তো ডরনি শ!

কেড্রিকের চেহারায় চিন্তার ছাপ। ডরনি শ-মারা গেছে। ডরনি ওয়্যাগন ট্রেনের সেই ছেলেটা হলে তার গ্রাকে ভয় পাওয়ার যুক্তি আছে। কিন্তু এত বছর পর সেই লোকের হাতেই মারা যাওয়া কিংবা ভূতের হাতে প্রাণ হারানো-যদি ভূত নামে কোনও পদার্থ আদৌ থাকে-পাগলেও বিশ্বাস করবে না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়।

কপালের লিখন কেউ খণ্ডাতে পারে না, গম্ভীর কণ্ঠে বলল এসক্যাদা। ওই ছুরির হাত থেকে পালিয়েছিল ছেলেটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওটার ঘায়েই মরতে হলো।

উঠে দাঁড়াল কেড্রিক। আমাদের ওখানে নিয়ে যেতে পারবে, এসক্যাভাদা? হগব্যাকে?

পারব! বাইরে তাকাল এসক্যাভাদা। তবে এই বৃষ্টিতে নয়। আমার আবার গাঁটবাত আছে কিনা!

তা হলে ঘরটা কোথায় বলে দাও, বলল কেড্রিক। এখুনি যাচ্ছি আমি!

.

কোল মাইন ক্রিকের মুখ পার হচ্ছে ওঁরা, হঠাৎ ট্র্যাকের দেখা পেল লরেডো শ্যাড। সঙ্গে সঙ্গে লাগাম টেনে ঘোড়া থামাল ও। ট্র্যাকের দিকে ইঙ্গিত করল। চমৎকার নাল লাগানো ঘোড়ার পায়ের ছাপ।

গ্রুলা! গম্ভীর কণ্ঠে বলল কেড্রিক। এই ছাপ চিনতে আমার ভুল হবে না।

এগিয়ে চলল ওরা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আগের মতোই মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। বৃষ্টির ফোঁটায় বাদ্য বাজছে. ঘাড়ে, মাথায়। পিচ্ছিল হয়ে আছে ট্রেইল, বিপজ্জনক। অন্ধকার লাগছে চারদিক।

আশ্রয় নেয়ার মতো একটা জায়গা খোঁজা উচিত, বলল শ্যাড, এই বৃষ্টিতে ঘোড়া খুঁজে পাওয়া অসম্ভব!

কিন্তু সকাল হবার আগেই এ-সব ট্রাক মুছে যাবে। তা ছাড়া আমার বিশ্বাস, এসক্যাভাদা যে গুহাটায় ডরনির লাশ দেখেছে সেখানেই আমাদের আসামীকে পাব!

ডরনি ওখানে গেল কীভাবে?

আমার ভুল না হলে, মুখ থেকে বৃষ্টির পানি মুছল কেড্রিক, পরিচিত কারও সঙ্গে ডরনির দেখা হয়ে গিয়েছিল, সে-ই ওকে হাইডআউটে নিয়ে গেছে। ওর মা বাবাসহ ওয়াগন ট্রেনের যাত্রীদের হত্যাকারী গ্রুর রাইডারই এই পরিচিত লোক। বর্মটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সব বুঝে ফেলে ডরনি-তাই মরতে হয়েছে।

কিন্তু, গজগজ করে উঠল শ্যাড, আমার কাছে খোলসা হচ্ছে না। একটা ঘোড়া এতদিন বাচে কীভাবে?

বাঁচে না! এতগুলো বছরে কমপক্ষে গোটা দুয়েক গ্রা মরে ভূত হয়ে যাবার কথা। লোকটা সম্ভবত ইন্ডিয়ান আর মেক্সিকানদের গ্রুলাভীতিকে কাজে লাগিয়ে ওদের নিজের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। যা হোক, কেবিনে পৌঁছুলেই আমাদের সমস্ত জিজ্ঞাসার জবাব মিলবে।

কালো অশুভ প্রেতাত্মার মতো সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে হগব্যাক। কিছুটা সর্পিল কিছুটা খাড়া ট্রেইল তীক্ষ্ণ ছুরির মতো রিজের ওপর দিয়ে গেছে। খাড়াই ধরে উঠতে শুরু করল ওরা। খাড়া পিচ্ছিল পথ ধরে উঠতে গিয়ে হাঁপাচ্ছে ঘোড়া দুটো। ট্রেইলে দুদুবার গ্রর পায়ের ছাপ দেখতে পেল কেড্রিক, আনকোরা নতুন, বড়জোর ঘণ্টা খানেক আগের।

রিজের চূড়ায় পৌঁছে পেছনে তাকাল কেড্রিক আর শ্যাড। নেমে পড়ল স্যাডল থেকে। এবার একটু কষ্ট করতে হবে, গম্ভীর কণ্ঠে বলল পল, পায়ে হেঁটে এগোতে হবে।

নীচের দিকে, মাঝামাঝি দূরত্বে বিদ্যুৎ চমকাল, মুহূর্তের জন্যে আলোর বন্যায় ভেসে গেল চারদিক। চিৎকার করে উঠল লরেডো, সাবধান, পল! ডানে, ওপরে…!

ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল কেড্রিক। সঙ্গে সঙ্গে একটা রাইফেল গর্জাল। ওর পাশে পাথরে খাবলা বসাল বুলেট। পাথরকুচি ছিটাল চোখেমুখে। পিস্তলের দিকে হাত বাড়াল পল। কিন্তু ওটা বর্ষাতির নীচে। আবার গর্জে উঠল, রাইফেল। উপর্যুপরি পাঁচটা বুলেট ধেয়ে এল। আশ্চর্য দ্রুততার সঙ্গে গুলি ছুঁড়ছে শত্রু।

কেড্রিকের পেছনে একটা আহত ঘোড়া আর্তনাদ করে উঠল, খানখান হয়ে গেল রাতের নিস্তব্ধতা। লরেভোর সাবধান বাণী রাইফেলের প্রচণ্ড গর্জনে চাপা পড়ে গেল। পরমুহূর্তে লাফিয়ে ওঠা ঘোড়ার সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে পাথুরে দেয়ালের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিল ও।

পাহাড়ী ছাগলের মতো অনায়াসে ট্রেইল ধরে ছুট দিল ওর অ্যাপলুসা। আবার রাইফেলের শব্দ হলো। ঝট করে মাটিতে শুয়ে পড়ল কেড্রিক।

শ্যাড? ঠিক আছ তো?

এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর কর্কশ অথচ শান্ত কণ্ঠে জবাব এল, একটা গুলি লাগিয়ে দিয়েছে ব্যাটা! অবশ্য মারাত্মক কিছু নয়।

আমি যাচ্ছি ওকে ধরতে। একা থাকতে পারবে?

পারব। তবে যাবার আগে পা-টা একটু বেঁধে দিয়ে যাও।

বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছে পাথর। হগব্যাক রিজের চূড়ায় ঘন কুয়াশা। পাথরের আড়ালে হাঁটু গেড়ে বসল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। বর্ষাতির সাহায্যে বৃষ্টি থেকে গা বাঁচিয়ে লরেডোর পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। শ্যাডের কপাল ভালো, গুলিটা মাংস ফুড়ে বেরিয়ে গেছে, হাড় ভাঙে নি।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *