১৪. সহকর্মীদের চেয়ে এগিয়ে আছে ফেসেনডেন

সহকর্মীদের চেয়ে এগিয়ে আছে ফেসেনডেন। বিশাল শরীর নিয়ে সহজ ভঙ্গিতে স্যাডলে বসে আছে। ঘোড়ার সাথে তাল মিলিয়ে দুলছে। চিন্তাক্লিষ্ট চেহারা, বিরক্ত। মিসেস ট্যাগার্টের আচরণে, সবার মতো সে-ও আলোড়িত হয়েছে। অন্য কিছু হয়তো তাকে এতটা প্রভাবিত করতে পারত না। কঠিন, হৃদয়ের মানুষ ফেসেনডেন, কত মানুষকে যে হত্যা করেছে ইয়ত্তা নেই। লড়াইয়ের মাঠে নির্দয়-নৃশংসভাবে মানুষ খুন করেছে সে, বেঁচে থাকার জন্যেই!

আগেও বহুবার পিস্তল ভাড়া খাটিয়েছে ফেসেনডেন। সেসব ছিল ক্যাটল বা শিপ-ওঅর, সেয়ানে সেয়ানে মোকাবিলা। প্রতিপক্ষে ছিল ওরই মতো দুরন্ত সব পিস্তলবাজ। কিন্তু একদল মানুষকে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্যে এই প্রথম কারও সঙ্গে যোগ দিয়েছে সে। কাজটা হাতে নেয়ার সময় কোনওরকম চিন্তা-ভাবনা করে নি ও জানে পশ্চিমে পাড়ি জমানো অধিকাংশ লোকই মাথা গোঁজার মতো একটুকরো জমির সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের সংগ্রাম নিয়ে কখনও ভারে নি সে। বার কয়েক ক্যাটল-রেঞ্জ থেকে জবরদখলকারীদের উচ্ছেদে সাহায্যও করেছে। কাজটা ন্যায়সঙ্গত বলেই তার ধারণা। গরু-বাছুর পোষার জন্যে ঘাসের প্রয়োজন, কিন্তু চারণভূমিতে চাষাবাদ শুরু করলে গরু চরবে কোথায়? তা ছাড়া বেশির ভাগ তৃণভূমিই তো খামার বা চাষাবাদের অনুপযুক্ত। কিন্তু, এবার একটা ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। এই প্রথম ব্যাপারটা তলিয়ে দেখছে ফেসেনডেন। গবাদি পশুর সুবিধের জন্যে লোকজকে এখান থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে না, মুনাফাই প্রধান এবং প্রথম। উদ্দেশ্য। সাত বোঝা কঠিন নয়। ফেসেনডেনের মতো লোকেরা পরিস্থিতির আসল রূপ প্রক্ষ করলে সামান্য পার্থক্যই বিরাট হয়ে দাঁড়ায়, তাদের চোখের সামনে।

মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ফেসেনডেন। কীথের কাক্ষিত বিজয় কত কাছেই এসে গিয়েছিল! ক্যানিয়নে আত্মগোপনকারী মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোককে কজা করার মতো সহজ কাজ আর কিছু হয়! প্রথমে ডিনামাইট ব্যবহারের বিরোধিতা করলেও সাময়িক দুর্বলতাটুকু ঝেড়ে ফেলেছিল ও। সবার সঙ্গে ক্যানিয়নে ঢুকেছে, ঝামেলা চুকিয়ে টাকা নিয়ে এখান থেকে কেটে পড়বে বলে। ঠিক তখনই এল অপ্রত্যাশিত বিদ্যুৎ-গতির পাল্টা আক্রমণ। ক্যানিয়নের দেয়াল আরও ভয়ঙ্কর করে তুলল সে আক্রমণকে। বোল্ডারের ফাঁকে আটকা পড়ে গো-হার্য হেরে গেল ওরা। নরক ভেঙে পড়ল যেন মাথার ওপর।

আকস্মিক ধাক্কা আতঙ্ক আর তীব্র বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছে সবার মনে। আত্মরক্ষার স্বাভাবিক তাগিদে কোনওমতে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। কিন্তু ক্লসন আর পয়েন্সেটের মৃত্যু এখনও মেনে নিতে পারে নি কেউ, অদৃশ্য হয়েছে ব্ৰকাউ, লী গফ চলে গেছে। শুধু ফেসেনডেনকেই চলে যাবার কথা বলেছিল গফ। কারণ জিজ্ঞেস করার দরকার মনে করে নি ও।

পেছনে ব্যর্থ হামলায় হতাশ মিক্সাসরা দুই ভাই এগিয়ে আসছে। দয়ামায়াহীন দুই খুনী, মেয়েমানুষ খুন করতেও ওদের হাত কাঁপবে না। লড়াকু লোক নয় ওরা-কসাই। কিন্তু ওরাও বুঝতে পারছে দলে একটা পরিবর্তন এসেছে। ব্ৰকাউ আর গফের ভাগ্যে কী ঘটেছে ওরা জানে না, তবে দলে যে ভাঙন ধরেছে সেটা বুঝতে পারছে পরিষ্কার। এক অর্থে হিংস্র একদল নেকড়েয় পরিণত হয়েছে ওরা। পরস্পরের প্রতি ঘৃণা বোধ করতে শুরু করেছে।

শান্ত মাস্ট্যাংয়ে ফিরে এল ওরা। ঝড়ের পূর্ব মুহূর্তে চারদিক যেমন থমথম করে তেমনি নীরবতা বিরাজ করছে শহরে। ভুগোতে ফিরে যাওয়া গরু-ক্রেতার মতো শহরটাও যেন ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের পূর্বাভাস পেয়েছে। রাস্তায় মেয়েদের দেখা যাচ্ছে না দুচারজন বেপরোয়া লোক বার কিংবা তাসের টেবিলে সময় কাটাচ্ছে। সেইন্ট জেমস-এর সামনে সাজানো চেয়ারগুলো খালি পড়ে আছে। মাতাল অবস্থায় র‍্যাঞ্চে ফিরে গেছে ক্লে অ্যালিসন।

সূর্য যেন গলন্ত আগুন ঢালছে, পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে সব। নিঝুম চারদিক। মাসট্যাং স্যালুনের সামনে ঘোড়া থামাল ফেসেনডেন, ক্লান্ত জানোয়ারটার পিঠ থেকে নামল। উরুর সঙ্গে বাড়ি মেরে টুপি থেকে ধুলো ঝাড়ার ফাঁকে নির্জন রাস্তায় চোখ বোলাল। পশ্চিমের লোক ফেসেনেডেন, বিপদের পূর্বলক্ষণ টের পেতে ভুল হলো না। টুপিটা আবার কোনাচে করে মাথায় বসিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল বিশালদেহী গানম্যান। সোজা বারের দিকে এগিয়ে গেল।

রাই, স্যালুনের অভ্যন্তরে গমগম করে উঠল ওর কণ্ঠস্বর। কামরার চারধারে ঘুরে ফিরল চোখজোড়া, তারপর বারটেন্ডারের ওপর স্থির হলো।

কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না বারটেন্ডার। কী ঘটেছে? ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল সে।

গানম্যানের কঠিন, দুচোখে ক্ষীণ কৌতুকের ছায়া পড়ল। চিরদিনের জন্যে জায়গাটা জিতে নিয়েছে স্কোয়াটাররা! হুইস্কিটুকু গলায় ঢালল ফেসেনডেন। ওখান থেকে ওরা নড়বে না, বুঝিয়ে দিয়েছে! হালকা কণ্ঠে বলল সে। কেয়ামত নামিয়ে দিয়েছে আমাদের ওপর! সংক্ষেপে ঘটনার বিবরণ দিল ফেসেনডেন। যেন হাজার হাজার লোক একসঙ্গে হামলে পড়ল! এমন কিছু হতে পারে কারও মাথায় আসে নি! অন্ধকারে সিঁড়িতে পা রাখতে গিয়ে দেখল কোনও সিঁড়িই নেই-অনেকটা এই রকম ব্যাপার।

আরও এক গ্লাস মদ ঢালল ফেসেনডেন। কেড্রিক ব্যাটাই নষ্টের গোড়া, ভারি গলায় বলল ও, লোকটা ওদের দলে যোগ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার কেটে পড়া উচিত ছিল।

কীথ কোথায়?

সে আর ফিরবে না।

নতুন কণ্ঠস্বর, শুনে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ওরা। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। মুচকি মুচকি হাসছে ডরনি শ! হাসি মুখেই সামনে এসে বারের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। কীথ আর আসছে না, বলল সে। সন্ট ক্রিকের পাড়ে পিস্তল বের করতে গিয়েছিল সে।

নীরব কামরায় ভয়ানক শোনাল উরনির কথাগুলো। টেবিলের এক লোক নড়েচড়ে বসল, ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে আপত্তি জানাল চেয়ারটা। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল ফেসেনডেন, মদের গ্লাসে চুমুক দিল। এখান থেকে ভাগতে হবে, জলদি!

কিছুক্ষণ আগে দেখলাম মেয়েটা ফিরে এসেছে, হঠাৎ বলে উঠল বারটেন্ডার। সামান্থা ফক্স। সেও কি ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে?

মুখ তুলে তাকাল ডরনি শ, জ্বলজ্বল করছে, চোখের তারা। হঠাৎ বিষণ্ণতা ভর করল সেখানে। মদের গ্লাস খালি করে সহজ পদক্ষেপে এগিয়ে গেল সে দরজার দিকে। কাছেপিঠে থেকো, ফেস, একটু আসছি আমি,হাসল সে, বুড়োর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসি।

ফেসেনডেনের দিকে তাকাল বারটেন্ডার। টাকা পেলে তোমাকে দেবে তো?

অন্যমনস্কভাবে মাথা দোলাল ফেসেনডেন। একশোবার! ডরনি চোর নয়। জীবনে কখনও অন্যের জিনিস না বলে ছোঁয় নি ছেলেটা। চুরি-চামারিতে ও বিশ্বাস করে না। কখনও গাল দিতে কিংবা মিথ্যে বলতেও দেখি নি। কিন্তু তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে, তোমাকে খুন করতে পারবে।

নাটকের যবনিকাঁপাত ঘটেছে। কাজ শেষ। কৈটে পড়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। ফেসেনজেন জানে, এখন বিদায় নেয়া উচিত; কিন্তু তবু কেন যেন অনীহা বোধ করছে! আরও এক গ্লাস মদের ফরমাশ দিল সে, বারটেন্ডার ঢেলে দিল। যেন অতল এক গহ্বরে পড়ল মুদটুকু, কোনও প্রতিক্রিয়া হলো না।

.

শহর সীমান্তে ঘোড়ার রাশ টেনে ধরল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। একসঙ্গে কাজে নামব আমরা, শান্ত কণ্ঠে বলল ও, কথ, শ, বারউইক, দুই মিক্সাস আর ফেসেনডেনকে, চাই আমাদের। ওরা ছাড়াও আরও দুচারজন আছে, ওদের চেহারা চিনলেও নাম জানি না। যাই হোক, তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে, কোনওরকম ভুল যেন না হয়। পিট, ডাই রীড আর অন্য দুজনকে নিয়ে রাস্তার বাঁ দিক দিয়ে এগিয়ে যাও তুমি। অহেতুক ঝুঁকি নেবে না। সম্ভব হলে ওদের গ্রেফতার করবে। পরে বিচার হবে। যারা গম্ভীর কেড্রিকের চেহারা–দোষী, তাদের জন্যে দুধরনের শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে, দেশ ছাড়তে হবে, নইলে ঝুলতে হবে ফাঁসিতে। তবে দুই মিক্সাস আর ডরনি শকে ফাঁসিতেই ঝোলাব, বলল ও, ওর খুনী!

স্যাডলে ঘুরে বসে দীর্ঘদেহী টেক্সানের দিকে তাকাল পল কেড্রিক। চলো, শ্যাড, শান্ত কণ্ঠে বলল ও, আমরা চারজন রাস্তার ডানদিক ধরে এগোই। আমাদের ভাগে পড়ছে লিভারিস্ট্যাবল, সেইন্ট জেমস আর মাস্ট্যাং স্যালুন।

ঘাড় ফিরিয়ে আবার পিট লেইনের দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। পিট, বলল ও, অ্যালিসন কিংবা কেচামের সামনা-সামনি পড়ে গেলে দয়া করে ওদের ঘাটাতে যেয়ো না। ওদের সঙ্গে আমাদের শত্রুতা নেই।

লেইনের চেহারা গম্ভীর। আমি ওদের খুঁজছি না, ভারি গলায় বলল সে। কিন্তু সেধে লাগতে এলে ছেড়ে দেব না।

শহরে ঢুকল। ওরা। তারপর যার যার পথে এগোল। কেড্রিকের উদ্দেশে হাসল লরেডো শ্যাড, ওর চোখজোড়া বিষণ্ণ। আজ শয়তানও লেইনের সামনে দাঁড়ানোর আগে দুবাক্স ভাববে, শান্ত কণ্ঠে বলল সে। খুনের নেশা চোপছে ওর মাথায়। বোনের জন্যেই এত রাগ।

দুজন সামনাসামনি পড়ে গেলে কী ঘটবে ভাবছি।

না পড়লেই ভালো, বলল শ্যাড, মেয়েটা সত্যি সুন্দরী। টাকার প্রতি লোভ ছাড়া আর কোনও দোষ নেই।

অন্য দুজন সঙ্গী উদ্বিগ্ন চেহারায় নির্দেশের অপেক্ষা করছে। ওরা দুজনই কৃষক। একজনের হাতে একটা স্পেন্সর পয়েন্ট-ফাইভ-সিক্স; অন্য জনের হাতে শটগান। ওদের দিকে তাকাল শ্যাড ওরা রাস্তা কাভার দিক, কী বলা, পল? বলল ও, তুমি সেইন্ট জেমস-এ যাও, আমি লিভারি স্ট্যাবলে।

একটু ভাবল কেড্রিক। ঠিক হ্যায়, অবশেষে বলল ও, দেখো, বাবা, অনর্থক ঝুঁকি নিয়ে না যেন!

হাসল লরেডো শ্যাড। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাত নাড়ল। তারপর প্রশস্ত দরুজা গলে আস্তাবলে ঢুকে পড়ল। ভেতরে পা রেখে থামল ও। বাইরে নির্লিপ্ত তাচ্ছিল্যের ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে ফণা তোলা গোখরার মতো ভয়ঙ্কর এবং প্রস্তুত টেক্সান। অ্যাবি মিক্সাসের সোরেল পনিটা আগেই দেখতে পেয়েছে ও। খুনী দুটো শহরেই আছে, সন্দেহ নেই। এক কদম সামনে বাড়ল ও। সঙ্গে সঙ্গে খড়ের গাদার আড়াল থেকে একটা রাইফেলের ব্যারেল মাথা জাগাল।

ঝাঁপ দিয়ে ডান দিকের একটা স্টলে ঢুকে পড়ল লরেডো শ্যাড, পিস্তল বেরিয়ে এসেছে হাতে। সোজা অপর মিক্সাসের ঘাড়ে গিয়ে পড়ল ও। প্রচণ্ড সংঘর্ষ হলো দুজনের ভারসাম্য হারিয়ে আছড়ে পড়ল মিক্সাস, গড়িয়ে চিত হলো। পিস্তল বের করতে করতে উঠে দাঁড়াল সে। ঝেড়ে এক লাথি কষাল লরেডো তার হাতে, চরকির মতো ঘুরতে ঘুরতে সাঁ করে দুই সারি স্টলের মাঝে ফাঁকা জায়গায় গিয়ে পড়ল পিস্তলটা।

হিংস্র চিৎকার ছেড়ে পিস্তলের দিকে ঝাঁপ দিল বীন মিক্সাস। পিছলে ওটার কাছে পৌঁছুল। পিস্তল তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। স্টলের ঠিক মুখেই ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে লরেডো শ্যাড। ফাঁদে পড়া বেড়ালের মতো, ঘুরেই পিস্তল উঁচিয়ে ধরতে গেল মিক্সাস, সঙ্গে সঙ্গে ট্রিগার টিপল ও। প্রশস্ত আস্তাবলে বোমা ফাটার মতো শব্দ হলো। পর পর দুটো গুলি খেলো বীন মিক্সাস। একটা লাশ পড়ল মাটিতে।

গর্জে উঠল খড়ের গাদার রাইফেল। লরেড়োর মাথার কাছে স্টলের দেয়ালে খাবলা বসাল বুলেট। গুলির উৎস লক্ষ্য করে দ্রুত দুবার ট্রিগার টিপেই এক লাফে ফাঁকায় চলে এল লরেডো লাফিয়ে উঠল রাইফেলটা, আবার আগুন ঝরাল, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো গুলিটা। অ্যাবি মিক্সাস যেখানে লুকিয়ে রয়েছে, সেই চালাটার নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ল শ্যাড, ছাদ লক্ষ্য করে গুলি করল পর পর দুবার।

খালি পিস্তল হোলস্টারে ভরে অন্য পিস্তলটা বের করে অপেক্ষা করতে লাগল লরেডো শ্যাড। একটু দূরে ককিয়ে উঠল ছাদের পাটাতন। স্টলের আড়ালে আড়ালে পলায়নপর মিক্সাসকে অনুসরণ করল ও। আচমকা পেছনের দরজা সশব্দে খুলে গেল, আলোর বন্যায়, ভেসে গেল আস্তাবলের অন্ধকার। দ্রুত এগিয়ে গেল লরেডো। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

শটগানঅলা লোকটার নাম স্লোয়ান। অ্যাাবি মিক্সাস দরজা গলে বেরিয়েই ওর মুখোমুখি হলো, মাত্র বিশ ফুট তফাত। কোমরের কাছ থেকে রাইফেলের ট্রিগার টিপল অ্যাবি। শ্লোয়ানের পাশে ওঅটর ট্রাফ ফুটো হয়ে গেল। একই সঙ্গে শটগানের বাঁ দিকের ব্যারের খালি করল স্লোয়ান।

অ্যাবির ঠিক কাঁধে লাগল গোলাটা, দরজার গায়ে আছড়ে পড়ল সে। ঝুলে পড়ল তার লম্বাটে চোয়াল, আতঙ্কিত। ঘাড়, কাঁধ রক্তে ভেসে যাচ্ছে, বিরাট একটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। রাইফেল উঁচিয়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করল অ্যাবি। এক কদম সামনে বাড়ল স্লোয়ান। বব ম্যাকলেনন, স্টলম্যান আর সেগালের মৃত্যুর কথা মনে পড়ছে। অন্য ব্যারেটাও খালি হলো। অগ্নিশিখা ছুটে গেল অ্যাবি মিক্সাসের দিকে।

 নিহত ছিন্নভিন্ন মিক্সাস এলিয়ে পড়ল। ছিটকে পড়েছে তার মাথার পুরোনো টুপি। রক্ত আর বালিতে মাখামাখি হয়ে গেছে চোখমুখ।

গোলাগুলির পর অসহনীয় নীরবতা নামল। নীরবতা ভেঙে কথা বলল লরেডো শ্যাড। হয়েছে, স্লোয়ান! আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এল সে। মিক্সাসের লাশের দিকে দৃকপাত করল না। ওর ভাইকেও আর ঝোলানোর কষ্ট করতে হবে না।

পাশাপাশি দাঁড়াল ওরা। স্লোয়ানের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, অসুস্থ, মনে হচ্ছে ওকে। জীবনে এই প্রথম মানুষ হত্যা করল সে; এটাই শেষ। একটা সিগারেট তৈরি করার চেষ্টা চালাল, কিন্তু থরথর করে কাঁপছে হাত দুটো,। ওর কাছ থেকে তামাক আর কাগজ নিয়ে সিগারেট বানাল লরেডো শ্যাড। লজ্জিত চেহারায় মুখ তুলে তাকাল স্লোয়ান। আমি লোকটা আসলে ভীতু, বলল সে। কিন্তু ওই হারামজাদাকে দেখে মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল।

গম্ভীর চেহারায় ওর দিকে তাকাল টেক্সান। এ-ই ভালো, বলল ও। সিগারেট শ্লোয়ানকে দিল। ধরো, বলল, দুএক টান দিলেই চাঙা, বোধ করবে। ভাবছি কেড্রিক কী করছে।

কোনও আওয়াজই নেই এখন পর্যন্ত।

রাস্তার উল্টো দিকে একটা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল পিট লেইন। সব ঠিক আছে? চিৎকার করে জানতে চাইল।

হ্যাঁ, স্লোয়ানের সঙ্গী পাল্টা জবাব দিল। মিক্সাস ভাইদের আর খুঁজতে হবে না। আর কখনও ওদের চেহারা দেখা্যাবে না এদিকে।

রাস্তা বরাবর এগিয়ে গিয়ে সেইন্ট জেমস-এ ঢুকল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। বিশাল লবি জনশূন্য ফাঁকা গহ্বরের মতো লাগছে। তামাক আর চামড়ার গন্ধ ভাসছে বাতাসে। বুড়ো ক্লার্ক ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। আজকের দিনটা একদম শান্ত, বলল সে। কোথাও কেউ নেই। কদিন হলো, মারপিট, গোলাগুলি সব বন্ধ!

বুড়োর কথা শেষ হওয়া মাত্র বাইরে থেকে গুলির আওয়াজ ভেসে এল…আবার…আবার। শটগানের দুটো কানফাটা গর্জন, তারপর নীরবতা।

কানখাড়া করে রইল দুজন। কিন্তু আর কোনও শব্দ পাওয়া গেল না। খানিক পরু-পিট লেইনের প্রশ্ন আর কৃষকের জবাব শোনা গেল। মাথা ঝাঁকাল ক্লার্ক। হ্যাঁ, সেই পুরোনো মাস্ট্যাং, বলল সে। কদিন ধরে ভাবছিলাম ওহাইওতে ফিরে গেলাম নাকি! একদম ঠাণ্ডা মেরে গিয়েছিল সব-গোরস্থানের মতো!

করিডর ধরে এগিয়ে গিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে এল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। ভাঙাচোরা সিঁড়ি ভেঙে পেছনের ঘাসে ছাওয়া। উঠোনে এসে দাঁড়াল। একটা পুরোনো মরচে ধরা টিউবওয়েল আছে এখানে প্রখর সূর্যের আঁচে দগ্ধ হচ্ছে হোটেলের পেছনের দেয়াল।

টিউবওয়েলের দিকে এগিয়ে গেল কেড্রিক, চাপ দিল। প্রথমে আপত্তি জানাল ওটা, বহুদিনের অব্যবহারে মরচে পড়ে গেছে; অবশেষে কাজ হলো, কাঠের গামলায় ছলাৎ করে পড়ল পানির ধারা। কিছুক্ষণ পানি তুলল কেড্রিক, তারপর ক্যান্টিন, ভরে নিল। পরিষ্কার ঠাণ্ডা পানি, ঢক ঢক করে পান করল, ও, একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার খেলো।

দালান-কোঠার পেছনে খানিকটা দরে কাঠ চেরাই করছে এক কাঠরে। কুড়োলের ফলায় রোদের প্রতিফলন চোখে পড়ল ওর। কাঠের গায়ে আঘাত হানল ওটা। কেড্রিক জানে, একটু পরে আওয়াজ শোনা যাবে। কিছুক্ষণ ওদিকে তাকিয়ে রইল পল। হাত দিয়ে মুখের ঘাম মুছে দালান-কোঠার পেছনে পেছনে মাস্ট্যাং-স্যালুনের দিকে পা বাড়াল।

সাবধানে এগোচ্ছে ও, মুহূর্তের জন্যেও থামছে না, সমগ্র অস্তিত্ব সতর্ক। এখন পয়েন্ট ফোর-ফোর রানজোড়া কোমরে ঝুলিয়েছে ও। ওগুলোর ছোঁয়া স্বস্তি জোগাচ্ছে। প্রয়োজনের মুহূর্তে চট করে হাতে উঠে আসবে।

মাস্ট্যাং-স্যালুনের পেছন-দরজায় বহুদিন রঙ পড়ে নি, রোদ আর বৃষ্টির অত্যাচারে কাহিল অবস্থা। কবজার দিকে তাকাল ও, জং ধরে গেছে, খুলতে গেলে শব্দ হবে। হঠাৎ দোতলায় ওঠার বাইরের দিকের সিঁড়িটা দেখতে পেল ও। ঘুরে পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এল কেড্রিক। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে করিডর ধরে এগোল।

নীচের স্যালুনে, প্রায় আধ বোতল হুইস্কি শেষ করে ফেলেছে ফেসেনডেন, কিন্তু এখনও ব্যর্থতার গ্লানি কাটিয়ে উঠতে পারে নি। টেবিল থেকে এক প্যাকেট তাস তুলে নিল ও, নিপুণ হাতে শাফল করল। একটুও কাঁপল না হাত দুটো। আর যাই হোক হাতের ওপর কোনও প্রভাব ফেলতে পারে নি হুইস্কি।

বিরক্তির সঙ্গে কার্ড ছুঁড়ে ফেলে বারটেন্ডারের দিকে তাকাল ফেসেনডেন। ডরনি এত দেরি করছে কেন? দশমবারের মতো বলল সে, এখান থেকে চলে যেতে চাই আমি। এখানে থাকতে আর মন চাইছে না!

রাস্তার গোলাগুলির শব্দ পেলেও বারের কাছ থেকে নড়ল না সে। মাতাল কোনও কাউহ্যান্ডের কাণ্ড বোধ হয়, বলল বিরক্তির সঙ্গে।

তবু একবার খোঁজ নিলে পারতে, বলল বারটেন্ডার, স্যালুনে মারামারি হোক চাইছে না সে। তোমার দলের লোকও তো হতে পারে?

আমার কোনও দল নেই, সংক্ষেপে জবাব দিল ফেস আমি আর এসবে নেই। ইয়েলো বাটের খচ্চরটা কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছে আমাকে। আর ওদের সঙ্গে থাকার সাধ নেই। দোতলার করিডরে পায়ের আওয়াজ, ছন্দময় ভঙ্গিতে হাঁটছে কে যেন। হেসে মুখ তুলে তাকাল, ফেসেনডেন। খেয়াল করেছ, মিলিটারি কায়দায় হাঁটছে!

হঠাৎ, নিজের কথার অর্থ বুঝতে পারল ফেস, হাসি মুছে গেল ঠোঁট থেকে। বারে হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বারটেন্ডারের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। জানতাম! আমি জানতাম- গ্লাসের হুইস্কি গলায়, ঢালল সে তাই তো শহর ছাড়তে চাই নি!

বার থেকে সরে ঘুরে দু পা ফাঁক করে দাঁড়াল, ফেসেনডেন। বিশাল গ্রিজলি ভালুকের মতো লাগছে তাকে। কোমরের কাছে ঝুলছে দুহাত। দোতলার ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে আছে।

পায়ের আওয়াজ থেমে গেল, ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। ফেসেনডেনের দিকে তাকাল।

নীরবে কেটে গেল ঝাড়া একটা মিনিট। দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছে দর্শকরা। ফেসের্নডেনই নীরবতা ভাঙল অবশেষে।

আমাকে খুজছ, কেড্রিক?।

তোমাদের একজনকে হলেই হলো। শ কোথায়? কীথ?

কীথ পটল তুলেছে। ক্যানিয়নে তুমি আমাদের বারটা বাজানোর পর সল্ট ক্রিকের ধারে ওকে খুন করেছে ডরনি শ। সে এখন কোথায়, জানি না।

আবার নীরবতা! পরস্পরকে জরিপ করল ওরা। চিমনি রক-এ তুমিও ওদের সঙ্গে ছিলে, ফেসেনডেন, বলল কেড্রিক, ওটা একটা অ্যামবুশ ছিল–গুপ্তহত্যার চেষ্টা। আরেক কদম সামনে বাড়ল কেড্রিক। পাশ ফিরে সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখল। ছয় ধাপ পর একটা ল্যান্ডিং, তার পর বাঁক নিয়ে নীচে নেমে এসেছে সিঁড়িটা।

দাঁড়িয়ে আছে ফেসেনডেন, ওর পেশীবহুল বিশাল দুই পা মৃদু কাঁপছে। চওড়া মাথা সামনে ঝুঁকে পড়েছে। ধেত্তের! বলেই পিস্তলের বাঁট আঁকড়ে ধরল সে।

চোখের পলকে দুটো পিস্তল খাপ, ছেড়ে বেরিয়ে এল, আগুন ঝরাল। সিঁড়ির মাথায় নিউওয়েল পোস্টের মাথা গুড়ো হয়ে গেল একটা বুলেটের ধাক্কায়; তারপর ছিটকে দেয়ালে গিয়ে বিরল সেটা। কেড্রিকের ঠিক কাঁধের পেছনে দেয়াল ফুটো করল অন্য বুলেটটা। আরও এক ধাপ নামল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। ট্রিগার টিপল পিস্তলের। গুলি খেয়ে পাই করে ঘুরল ফেসেনডের। হালকা পায়ে আরও চার ধাপ নেমে এল পল। ওকে লক্ষ্য করে দুদুবার ট্রিগার টিপল ফেসেনডেন। মাথা নিচু করে ঝাঁপ দিল কেড্রিক। দেয়ালের সঙ্গে মিশে গিয়ে উঠে দাঁড়াল। আবার গুলি করল ফেসেনডৈনের দিকে। একটা পা ভাজ হয়ে গেল তার; টক্কর খেলে বারের সঙ্গে।

দুবার গুলি খেয়েও মাথা ঠাণ্ডা রেখেছে সে। ভয়ঙ্কর। বারের গায়ে এক হাতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল ফেসেনডেন, ডান হাত উঁচিয়ে ধরল, বুড়ো আঙুলে টেনে পেছনে নিয়ে এল পিস্তলের হ্যামার। সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাতের পিস্তল থেকে দ্রুত দুবার গুলি ছুঁড়ল কেড্রিক। বারের ওপর দিয়ে ঘষটে সোজা ফেসেনডেনের পাজরের নীচে ঢুকল একটা বুলেট। অন্যটা ফসকে গেল।

আবার গুলি করল ফেসেনডেন, লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। মরিয়া হয়ে উঠেছে সে, ডানহাতের পিস্তল হোন্টারে রেখে বাঁ হাতের পিস্তল দিয়ে ষষ্ঠ বারের মতো ট্রিগার টিপল ফেসেনডেন। সময় নিয়ে, অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখে পিস্তলটা ডান হাতে পাচার করল সে। বুঝতে পারছে, সময় ফুরিয়ে আসছে। বেপরোয়া ফেসেনডেন; কিন্তু নিরুত্তাপ। এক গ্লাস মৃদ দাও, বারটেন্ডারের উদ্দেশে বলল সে।

বারের পেছনে মুখ ঢেকে শুয়েছিল বারটেন্ডার। নড়ল না লোকটা। ল্যান্ডিংয়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে কেড্রিক, তাকিয়ে রয়েছে ফেসেনডেনের দিকে। তিন তিনবার গুলি খেয়েছে ফেসেনডেন-কাধে, পায়ে, বুকে–তারপরও দাঁড়িয়ে আছে; হাতে উদ্যত পিস্তল; বিরাট, অপরাজেয় মনে হচ্ছে তাকে।

পিস্তল উঠে এল, ওটার সঙ্গে সামনে ঝুঁকে পড়ল ফেসেনডেন। তুমি ডরনি হলে ভালো হত, বলল সে।

ট্রিগার টিপল কেড্রিক। বুকে লাগল গুলিটা। এক কদম পিছিয়ে গেল ফেসেনজেন, আরও এক কদম। পিস্তলটা হাত থেকে খসে পড়ল। বারের ওপর থেকে একটা গ্লাস তুলে নিল সে, মদ ঢালো! আদেশ করল। রক্তের বুদবুদু দেখা দিয়েছে ঠোঁটের কোণে।

পিস্তল হাতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল ক্যাপ্টেন কেড্রিক, ফেসেনডেনের দিকে এগিয়ে গেল। ডান হাতে পিস্তল তৈরি রেখে বাঁ হাতে একটা বোতল তুলে নিল ও, শূন্য, গাস ভরে দিল। তারপর আরেকটা গ্লাসে নিজের জন্যেও ঢালল।

ওর দিকে তাকিয়ে আছে ফেসেনডেন। তুমি খুব ভালো মানুষ, কেড্রিক, আস্তে আস্তে কথাগুলো উচ্চারণ করল সে। আমিও ভালো-কিন্তু আমরা দুই পক্ষে পড়ে গেছি।

এসো পান করি, গ্লাস উঁচু করে ধরল পল কেড্রিক, গ্লাস ছোঁয়াল দুজন। বাঁকা চোখে গ্লাসের ওপর দিয়ে কেড্রিকের দিকে তাকাল ফেসেনডেন।

ডরনির কাছ থেকে সাবধান, পরামর্শ দিল সে, কেউটের মতো ভয়ঙ্কর লোকটা। কথা আটকে যাচ্ছে, ভুরু কোঁচকাল ফেসেনডেন, গ্লাস, তুলল। মদ গলায় ঢালতেই বিষম খেলো সে। বিশাল ডান হাত কেড্রিকের দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপরই হুমড়ি খেয়ে পড়ল মেঝেতে। পিস্তল হোলস্টারে রেখে সামনে। ঝুঁকল কেড্রিক, ধরল বাড়িয়ে দেয়া হাতটা। হাসল ফেসেনডেন, তারপর প্রশান্তিতে চোখ বুজল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *