১২. দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল পল কেড্রিক

দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল পল কেড্রিক। এখন আর শহর বাঁচানো সম্ভব নয়। এখানে থাকলে ওদের নিশ্চিহ্ন কর দেবে প্রতিপক্ষ, জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে।

শ্যাড, তাড়াতাড়ি বলল ও, রাস্তা পেরিয়ে ডাই রীড আর পিটের কাছে যাও। চেঁচিয়ে সবাইকে বলো, যত ঝুঁকিই থাক, পরোয়া না করে ইয়েলো বাট এর গোড়ার ক্যানিয়নে চলে যেতে।

এক কদম পিছিয়ে মাথার ওপর ট্র্যাপডোরের দিকে তাকাল কেড্রিক। ও কী করতে যাচ্ছে বুঝে ফেলল বারটেন্ডার, প্রবল বেগে মাথা নাড়তে শুরু করল সে। পাগলামি করো না। ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।

উপায় নেই; ঝুঁকিটা নিতেই হবে। বড় দলটা এখনও বেশ দূরে আছে। আমি কাভার দিলে তোমরা সহজেই ক্যানিয়নে পৌঁছে যেতে পারবে।

আর তুমি? জানতে চাইল শ্যাড।

আমি পৌঁছে যাব। যাও তো, সময় নষ্ট করো না!

স্যাৎ করে ঘুরল লরেডো শ্যাড। বাইরে পা রেখে মুহূর্তের জন্য থামল, তারপর এক দৌড়ে পার হলো রাস্তা। এক লহমার জন্যে ইতস্তত করল বারটেন্ডার, বিড়বিড় করে বলল কী যেন, তারপর অনুসরণ করল ওকে। এক বোতল হুইস্কি নিয়ে শার্টের ভেতর ঢোকাল পল কেড্রিক। লাফ দিয়ে ট্রাপডোরের কিনারা ধরে ঝাঁকি দিয়ে ক্ষুদে চিলেকোঠায়, সেখান থেকে ছাদে

উঠে এল। সযত্নে পর্যবেক্ষণ করল চারদিক।

ক্রিক থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে। বোঝা যাচ্ছে, খুনীর দল কিছুক্ষণের জন্যে যাত্রা বিরতি করেছে ওখানে। ছাদের চূড়ায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল কেড্রিক। ঈষৎ মাথা জাগিয়ে বোল্ডারের স্তূপের দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাল। হঠাৎ মৃদু নড়াচড়া ধরা পড়ল ওর চোখে। প্রথম দেখায় যেটাকে ধূসর পাথর মনে হয়েছিল, বুঝতে পারল, ওটা আসলে একটা শার্ট। উইনচেস্টার তুলে যত্নের সঙ্গে লক্ষ্যস্থির করল পল, টিপ দিল ট্রিগারে।

লাফিয়ে উঠল ধূসর শার্ট, শূন্যে উঠে এল একটা হাত, পরমুহূর্তে এলিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল একটা স্পেন্সার। মাথার অদূরে ছাদ ফুটো হয়ে গেল। স্প্রিন্টারের ছিটে লাগল চোখেমুখে। পিছলে খানিকটা নীচে নেমে এল কেড্রিক। তারপর রাস্তার উল্টোদিকের একটা জানালা থেকে সঙ্কেত পেয়ে চট করে রাইফেল তুলে নিল ও, মাথা উঁচিয়ে দ্রুত চারবার গুলি করল; একমুহূর্ত বিরতি, তারপর আবার ট্রিগার টিপল দুবার। নুয়ে পড়ে উইনচেস্টার রিলোড করে নিল ও। শত্রুপক্ষের একটা বুলেট খালা বসাল ছাদে। তারপর শুরু হলো এলোপাতাড়ি গুলি, ভারি ক্যালিবারের একেকটা বুলেট ছাদের চূড়ার অল্প কয়েক ইঞ্চি নীচে অসংখ্য ফুটো সৃষ্টি করল।

পিছলে আরও খানিকটা নামল পল, কেড্রিক। ট্র্যাপডোরের মুখে মুহূর্তের জন্যে থামল, বহু দূরে, একলোক ওঅশের লোকগুলোর পেছনে যাবার জন্যে। ঘুর পথে এগোনোর চেষ্টা করছে। দেখার সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল তুলে তাক করল ও। টিপ দিল ট্রিগারে। প্রায় পাঁচশো গজ দূরে ছিল লক্ষ্যবস্তু, স্রেফ কালো একটা বিন্দু। ফসকে গেল গুলিটা, কালো বিন্দুর ফুট দুয়েক দর বালি ছিটকে উঠল। ব্যর্থ হলেও কেড্রিক জানে সম্ভাব্য আততায়ী, আর আগে বাড়ার সাহস করবে না; লুকিয়ে পড়েছে। ট্রাপভোর গলে ফের স্যালুনে, নামল কেড্রিক। বিষণ্ণ চেহারায় তাকাল বারের ওপর সাজানো হুইস্কির বোতলগুলোর দিকে। আরও দুটো বোতল তুলে পকেটে ঢোকাল।

দোনোমনো করল এক মুহূর্ত, তারপর রাস্তার উল্টোদিকের একটা বাড়ির আশ্রয়ের দিকে খিচে দৌড় লাগাল। গর্জে উঠল স্পেন্সার। অদৃশ্য আততায়ী এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। বুলেটের ধাক্কা অনুভব করল পল। টলে উঠল, কিন্তু থামল না।

রাস্তা পেরিয়ে আড়ালে চলে এল ও। পেটের চামড়ায় শীতল ছোঁয়া লাগছে। মাথা নামিয়ে তাকাল। শার্টের ভেতরে রাখা হুইস্কির বোতলটা চুর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে হুইস্কির, মিষ্টি সৌরভ। শার্টের ভেতর থেকে ভাঙা কাঁচের টুকরো বের করে ফেলে দিল কেড্রিক। প্রায় ঝাঁপ দিয়ে ঢুকল লিভারিস্ট্যাবলে। অ্যাপলুসার পিঠে দ্রুত স্যাডল চাপিয়ে উঠে বসল।

রাস্তায় বেরোতেই অবিরাম গুলিবর্ষণ শুরু করল স্পেন্সার। তুফান তুলে ছুটল, পল কেড্রিক। শত্রুর গুলি এড়িয়ে পৌঁছে গেল গন্তব্যে। ও ক্যানিয়নে ঢুকতেই উল্লাস প্রকাশ করল সবাই। স্যাডল থেকে নামল পল।

কাজটা কিন্তু ভালো হলো না, কেড্রিকের উদ্দেশে বলল পিট লেইন, রিজের ওপর উঠে অনায়াসে আমাদের পেছনে চলে আসবে ওরা।

বোল্ডারে বোল্ডারে পা রেখে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ড্র থেকে বেরিয়ে এল দুজন লোক। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল কেড্রিক। নারী-পুরুষ মিলিয়ে চোদ্দজ দাঁড়িয়ে আছে চারপাশে। দুজন আহত। একজনের হাত ভেঙে গেছে। এর হাত থেকে রাইফেল ছিটকে পড়েছিল তখন। অন্যজন সামান্য চোট পেয়েছে। মোট কথা লড়তে সক্ষম, এরকম মাত্র সাত জনকে পাওয়া গেল।

সময় নষ্ট না করে কোথায় লুকোতে হবে সবাইকে জানিয়ে দিল কেড্রিক। তারপর ডাই রীড আর লরেডো শ্যাডকে পাহারায় রেখে ভেতরের দিকে এগোল ওরা।

চিন্তিত চেহারায় দলীয় লোকদের ক্ষমতা পর্যালোচনা করল কেড্রিক। লরেডো, ভাই আর পিট লেইনকে নিয়ে ওর মনে সংশয় নেই। কিন্তু অন্যদের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছে না। ওদের মাঝে নিরীহ গোবেচারা ধরনের লোকও রয়েছে, স্পষ্টতই ভীতু হয়ে পড়েছে দুএকজন, যদিও মুখে বলছে না কেউ কিছু। রক্তশূন্য ফ্যাকাসে চেহারার এক লোক আহত একজনের রাইফেল নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, হাটতে সাহায্য করছে তাকে। পথ দেখিয়ে

সবাইকে সেই খাদের মুখে নিয়ে এল পল। ঢুকে পড়ল ওরা গহ্বরে।

বিস্মিত চেহারায়, সবাই দেখতে লাগল খাদটা। একটা কথা জানো? থুতু ফেলে বলল বারটেন্ডার। সাত বছর ধরে এখানে আছি, কিন্তু খাদটা এই প্রথম দেখলাম!

ওদের সঙ্গে মাত্র চারটে ঘোড়া আছে, ওগুলোকে গুহায় নিয়ে এল পল!

আপত্তি তুলল একজন। ওকে শান্ত করল কেড্রিক। এখানে পানি আছে, কিন্তু বলা যায় না, যে কোনও মুহূর্তে ঘোড়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

ঢোক গিলে কেড্রিকের দিকে তাকিয়ে রইল লোকটা।

কেড্রিকের শার্টের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করল পিট লেইন। তোমার গায়ে গুলি লেগেছে! রক্ত বেরোচ্ছে!

সহজ ভঙ্গিতে হাসল পল। আরে, রক্ত না, হুইস্কি। আমার একটা বোতলের বারটা বেজে গেছে!

পিটও হাসল। রক্ত হলেই ভালো ছিল,বলল সে, ওসব জিনিস নষ্ট হলে চলে!

সুস্থরা সবাই খাদের মুখে জড়ো হয়েছে। কেড্রিকের দিকে তাকিয়ে হাসল একজন। তাই তো বলি, সেদিন পালিয়েছিলে কোথায়? বেরুনোর আরেকটা পথ আছে, না?

মাথা নাড়ল কেড্রিক। থাকলেও জানি না। আসলে এখানেই ঘাপটি মেরে ছিলাম। যেই দেখলাম পাহারা নেই, ক্যানিয়ন দিয়েই সুড়ৎ করে সটকে পড়লাম।

গম্ভীর হয়ে উঠল পিট লেইনের চেহারা। ইচ্ছে করলে আমাদের ঘেরাও করে বসে থাকতে পারবে ওরা, কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল, কিছু করার থাকবে না।

কেড্রিক মাথা দোলাল। একটা পানির ক্যান্টিন আর কিছু খাবার নিয়ে মেসার মাথায় বার্ট উইলিয়ামসের সঙ্গে যোগ দিতে যাচ্ছি আমি। আমার সাথে আরেকজনকে আসতে হবে। ওখানে বসে ব্যাটাদের ঠেকিয়ে দেব।

আমি আছি, শান্ত কণ্ঠে বলল লরেডো শ্যাড। দাঁড়াও জিনিসপত্র নিয়ে আসি।

একটা রাইফেল গর্জে উঠল। একটু পরেই ডাই রীড যোগ দিল ওদের সঙ্গে। ওরা আসছে! বলল সে। কেড্রিকের দিকে তাকাল। বোল্ডারের পেছনে একজন মারা গেছে। দূরবীনে ব্যাটার চেহারা দেখেছি। লোকটার নাম আলফ্রেড ক্রকেট। অন্যজন ছিল পয়েন্টে।

ক্রকেট একটা নির্ভেজাল হারামজাদা, বার্নেট নামে একজন সেটলার বলল, একনম্বর শয়তান। ক্যাম্পাসে থাকতে এক লোককে খুন করে, পালিয়েছিল। আরেকবার তার দলেরই একজন নিখোঁজ হয়ে যায়। সবার। বিশ্বাস লোকটার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে ক্রকেটের হাত ছিল।

পিট লেইনের দিকে তাকাল কেড্রিক। এখানেই শেষ মোকাবিলা হবে মনে হচ্ছে, বলল ও, যতক্ষণ সম্ভব গুলি ছুঁড়ো না। অপ্রয়োজনে কিছুতেই গুলি নষ্ট করা যাবে না। আমরা মেসার চুড়ায় থাকব।

খাদ থেকে বেরিয়ে এল কেড্রিক। তারপর লরেডোকে সঙ্গে করে বোল্ডার আর ঝোঁপঝাড়ের ভেতর ঢুকে পড়ল। শত্রুপক্ষের কারও চেহারা দেখা যাচ্ছে না। কেড্রিকের ধারণা, ক্যানিয়নের পেছনে রিমে উঠে ওদের কাভার দেয়ার জন্যে লোক পাঠানো হয়েছে, তার পৌঁছুনোর অপেক্ষা করছে ওরা।

আকাশছোঁয়া ইয়েলো বাটের চূড়ার দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। ঝাড়া দেড়শো ফুট খাড়াভাবে উঠে গেছে, বেশির ভাগ অংশ নগ্ন-আড়াল নেই। ক্যানিয়নের মাথায় ধুলোর মেঘ দেখা গেল। গুলি করেছে বার্ট উইলিয়ামস।

ওরা মেসার দিকে পা বাড়াতেই এক পশলা গুলি ছুটে এল। পিছিয়ে এল লরেডো। হতোদ্যম। নাহ, সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু তার আগেই যদি হামলে পড়ে ব্যাটারা?

তাতে লাভ হবে না। মেসার পাদদেশে অসংখ্য বোন্ডারের আড়ালে গুটিসুটি হয়ে বসল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। এই যে চমৎকার একটা ফায়্যারিং পয়েন্ট পেয়ে গেছি আমরা। একটা সিগারেট রোল করে ধরাল ও। এই ঝামেলা শেষ হয়ে গেলে কী করবে, শ্যাড? এখানেই থেকে যাবে?

দীর্ঘদেহী টেক্সান কাঁধ ঝাঁকাল। এখনও কিছু ভাবি নি। সময়েই দেখা যাবে। তুমি?

ওদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোগলনস নামে একটা জায়গা আছে, চেনো? ভাবছি ওখানে নিজস্ব একটা র‍্যাঞ্চ গড়ে তুলব।

আমিও হয়তো এরকম কিছুই করব, শান্ত কণ্ঠে বলল লরেডো শ্যাড। নিজের একটা র‍্যাঞ্চ গড়া আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। সত্যি বলতে কী একবার র‍্যাঞ্চ কিনেছিলাম। কিন্তু রাখতে পারি নি, পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়েছি।

ক্যানিয়ন বরাবর বাইরে তাকাল লরেডো শ্যাড। রাইফেলটা হাঁটুর ওপর ফেলে রেখেছে ও। কেড্রিকের দিকে না তাকিয়েই সহজ কণ্ঠে বলল, এখান থেকে রেহাই পেতে আমাদের স্বয়ং খোদার সাহায্য লাগবে, ক্যাপন।

হুম, কেড্রিকের চেহারা গম্ভীর। আচ্ছা, ক্যানিয়নের মুখে পাহারায় কে আছে এখন-মানে কার থাকার কথা?

ওয়ালেস।

ওর সাথে কথা বলতে হবে। এখনও আছে ওখানে?

উম-নাহ, নেই। কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে বোধ হয়।

অথবা বিকিয়ে গেছে। তুমিই বলেছিলে–সিঙ্গারের মতো আরও লোক থাকতে পারে।

সিগারেটের গোড়া পিষে নেভাল, লরেডো শ্যাড। শিগগিরই আক্রমণ চালাবে ওরা, পল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ঝামেলা চুকিয়ে দেয়া দরকার। তারপর সোজা মাস্ট্যাংয়ে যাব, মরতেই যদি হয় কীথ আর বারউইক এই দুই শয়তানকে নিয়ে মরতে চাই আমি।

মাথা নেড়ে সায় দিল কেড্রিক। খাদে আশ্রিতদের কথা ভাবছে। শ্যাঙ, লেইন আর রীডকে বাদ দিলে আরও অন্তত চারজন, সাহসী লোক আছে। এখানে। তার মানে, মোটেই দুর্বল নয় ওরা। অবশ্য সংখ্যায় শত্রুপক্ষ ভারি। যুদ্ধের শুরুতে বারজন লোক ছিল ওদিকে। আলফ্রেড ক্রকেট মারা গেছে। আরও লোকের আমদানি না ঘটে থাকলে, তিনজনে এগিয়ে আছে ওরা। তবে নতুন লোকের আমদানি হওয়াই স্বাভাবিক। কেড্রিকরা আত্মরক্ষার চেষ্টা করবে-এটাই ধরে নেবে প্রতিপক্ষকিন্তু যদি উল্টো হামলা চালানো হয়?

সামনে তাকাল কেড্রিক। হঠাৎ প্রায় দেড়শো গজ দূরে, ক্যানিয়নের দেয়ালে বেশ উঁচুতে একটা ছায়ামূর্তি দেখা দিল। রাইফেল তুলে গুলি করল ছায়াটা, সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা গুলি করল শ্যাড আর কেড্রিক। অদৃশ্য হলো ছায়া, তবে চোট পেয়েছে কি না বোঝা গেল না।

এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হলো এবার। হঠাৎ হঠাৎ ক্যানিয়নের মুখের দিকে লোকজন এগিয়ে আসছে। কিন্তু গুলি করার জন্যে যথেষ্ট সময় খোলা জায়গায় থাকছে না তারা। লুকিয়ে পড়ছে, খানিক পর আরেক জায়গায় মাথা তুলছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। বিদায়ী সূর্যের আলো শত্রুদের চোখ ধাধিয়ে দিচ্ছে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে ওদের গুলি। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। বার কয়েক অগ্রসরমান শত্রুদের উদ্দেশে গুলি ছুঁড়ল লরেডো শ্যাড আর কেড্রিক। কিন্তু কাউকে ঘায়েল করতে পারল না। দুবার মেসার চূড়ায় রাইফেল গর্জাল। আর্তর করে উঠল কে যেন।

বুঝলে, লরেডো, হঠাৎ বলল পল কেড্রিক, ওদের ভয়ে পিছিয়ে যাবার মানে হয় না। আমি মেসার মাথায় উঠছি। ফিরে আসি, তারপর দেখা যাবে, কয়োটের দল কেমন লড়াই জানে!

হাসল শ্যাড, ওর চোখের তারায় কৌতুক। আমিও আছি, পার্ডনার, শুষ্ক কণ্ঠে বলল সে, লুকিয়ে থাকতে আমার একটুও ভালো লাগে না। তা ছাড়া মেয়েরা তো এখন নিরাপদেই আছে।

একজন বাদে, বলল কেড্রিক। মিসেস ট্যাগার্ট, রেচারির স্বামী খুন হয়েছে খানিক আগে। ঘর ছেড়ে নড়ে নি সে।

হ্যাঁ, কে যেন বলছিল তখন। ট্যাগার্ট নাকি কোনও সুযোগই পায় নি। আহা, দুজন ভালো মানুষকে হত্যা করেছে ওরা!

.

আকাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো ইয়েলো বাট মেসার বিশাল কাঠামোর দিকে গম্ভীর চেহারায় তাকাল কর্নেল লরেন কীথ। চূড়ার লোকটা ওদের ঠেকিয়ে রেখেছে। ওখানে ওঠা গেলে কাজ হত। মনে মনে রণাঙ্গনে অধীনস্থ সৈনিকদের সঙ্গে বর্তমান সঙ্গীদের তুলনা করল সে। এরা একদল নৃশংস খুনী ছাড়া আর কিছুই নয়। কীভাবে সে এদের সঙ্গে নিজেকে জড়াল? পা বাড়ানোর সময় কোথায় পা রাখছে দেখে না কেন মানুষ?

ঐশ্বর্য-সারা জীবন বিপুল ঐশ্বর্যের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে লরেন কীথ। অভিজাত সমাজে চলাফেরা করতে হলে প্রচুর সম্পদ দরকার। কিন্তু টাকা যেন সোনার হরিণ, ধরা দিতে চায় না। তিক্ত মনে মেসার দিকে তাকাল কীথ। বারউইকের শার্টের নোংরা কলার আর জ্বলন্ত চোখজোড়া মনের পর্দায় ভেসে উঠল। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য সবাইকে দাবার খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে বারউইক-কাজ আদায় হলে কলার খোসার মতো ছুড়ে ফেলে!

শুরুতে একেবারে উল্টো মনে হয়েছিল ব্যাপারটা। ওর কর্তৃত্ব, সৈনিকসুলভ আচরণ আর স্পষ্ট চিন্তাশক্তির তুলনায় গুন্টারকে সাধারণ একজন ব্যবসায়ী ছাড়া কিছুই মনে হয় নি। বারউইককে মনে হয়েছে স্বল্প বুদ্ধির এক ভাঁড় বিশেষ। অথচ এখন সহসা স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছে বারউইক। সব কর্তৃত্ব হারিয়েছে কীথ, হার মানতে বাধ্য হয়েছে বারউইকের কাছে। এর জন্যে ও নিজেই দায়ী। আগেই বোঝা উচিত ছিল, অ্যাল্টন বারউইক কুৎসিত ভড় নয়, এক অশুভ দানব, ইবলিশের চেয়েও ধূর্ত। তাকে অবহেলা করা মোটেই ঠিক হয় নি।

নিজেকে বরাবর প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী লোক ভেবে এসেছে কীথ। স্বাধীনভাবে কাজ করেছে এতদিন। কারও পরোয়া করে নি। অথচ আজ এমন একজনের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে, যাকে অন্তর থেকে ঘৃণা করে! পালাবে, তার উপায় নেই। তা ছাড়া এখনও কীথের মনে আশা আছে, সবদিক সামলে নেয়া যাবে। শেষ পর্যন্ত-প্রচুর টাকা আসবে হাতে।

একটা লোকের নাম ঘুরপাক খাচ্ছে ওর মাথায়। যত নষ্টের গোড়া। নামটাকে ঘিরে ওর অন্তরের সমস্ত ঘৃণা ক্রোধ আর তিক্ততা প্রচণ্ড হয়ে উঠল। ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক।

প্রথম দিনই ওকে বোকা বানিয়ে দিয়েছিল কেড্রিক, অবশ্য এজন্য হতচ্ছাড়া গুন্টারও কম দায়ী নয়। নিজের ব্যাংক আর বার বছর সামরিক বাহিনীতে চাকরির কথা বলে কেড্রিককে দমাতে চেয়েছিল ও। ওকে মার্সেনারি বলে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পেয়েছিল সে, কিন্তু উল্টো কেড্রিক শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ওর বিদ্রূপ ওকেই ফিরিয়ে দেয়। এতগুলো লোকের সামনে বেইজ্জত করে ছাড়ে! কেড্রিক সম্পর্কে নানা কাহিনী কানে আসলেও তেমন আমল দেয় নি কীথ। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ওগুলো আসলে সত্যি ঘটনা। কেড্রিক র‍্যানসামের বন্ধু, মনে পড়তেই আরও খেপে উঠল কীথ।

অস্থায়ী স্যালুনে ঢুকল সে। গ্লাসে মদ ঢেলে নিরাসক্ত চেহারায় তাকাল তরল পদার্থটুকুর দিকে। লী গফ আর ফেসেনডেন এল।

শালাদের পাকড়াও করতে যাব, কর্নেল? জিজ্ঞেস করল গফ। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে।

এক ঢোকে গ্লাস খালি করল কর্নেল কীথ। হ্যাঁ, জলদি। সবাই এসেছে? পয়েন্সেট ছাড়া, তবে সেও এসে পড়বে।

আবার গ্লাসে মদ নিয়ে গলায় ঢালল লরেন কীথ। তারপর এক সঙ্গে ইয়েলো বাট-এর রাস্তায় নেমে এল ওরা।

মিক্সাসরা দুভাই আর নবাগতদের দুজন ছাড়া সবাই উপস্থিত রয়েছে। ক্যানিয়নের দিকে গেছে, দুই মিক্সাস! স্কোয়াটারদের আশ্রয়, বোল্ডার আর ঝোঁপের পেছনের দেয়ালে ওঠার জন্যে ঘুর পথে এগিয়ে গেছে অন্য দুজন।

লম্বা লম্বা পা ফেলে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে পয়েন্সেট। প্রথম ঘরের সামনে পৌঁছুতেই এক মহিলা দরজা খুলে বেরিয়ে এল। শক্ত সমর্থ গড়ন, পরনে রঙ-জ্বলা নীল সুতি কাপড়; পায়ে গোড়ালি ক্ষয়ে যাওয়া বুট। হাতে একটা ডাবল ব্যারেল্ড শটগান। পয়েন্সেট সামনে আসতেই ঘুরে দাঁড়াল মহিলা। ট্রিগার টিপল।

একসঙ্গে দুটো ব্যারেলই খালি করল সে। পয়েন্ট-ব্ল্যাংক-রেঞ্জ, গোলা দুটো সোজা পয়েন্সেটের পেটে লাগল। আক্ষরিক অর্থেই দুটুকরো হয়ে গেল লোকটা। হুড়মুড় করে লুটিয়ে পড়ল রাস্তায়। একটু কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল। রক্তে লাল হলো ধূসর পাথর। বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পিস্তলবাজরা।

ওদের দিকে ঘুরে দাঁড়াল মহিলা। বয়স্কা, লালচে চেহারা, এক মাথা পাকা চুল বাতাসে উড়ছে। কাজ করতে করতে কঠিন হয়ে গেছে দুটি হাত। শুলিন্য শটগান এখনও আঁকড়ে আছে। ওদের দিকে তাকিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা হালকা চেক শার্ট পরা লোকটার দিকে ইঙ্গিত করল সে।

এই মুহূর্তে তাকে আর অসহায় এক বৃদ্ধা মনে হচ্ছে না। দুচোখে অশ্রুরও চিহ্ন নেই। ওই মানুষটা আমার স্বামী ছিল, কিঞ্চিৎ কেঁপে গেল তার গলা। টাগাট আমাকে ধনসম্পদ হয়তো দিতে পারে নি, দেয়ার ক্ষমতাও ছিল না; কিন্তু একটা জিনিস দিয়েছিল-শান্তি। ওকে হত্যা করেছ তোমরা। আমার কাছে আরও কয়েকটা গোলা থাকলে… ঘুরে দাঁড়াল মিসেস ট্যাগার্ট। একটিবারও পেছনে না তাকিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিল।

গোল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পিস্তলবাজের দল। হঠাৎ যেন বুঝতে পারছে, ওদের অপরাধ কতটা জঘন্য।

সবার আগে নীরবতা ভেঙে কথা বলল লী গফ। দুই পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে সে! শার্ট ছিড়ে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে ওর পেশীবহুল শরীর। বাতাসে উড়ছে মাথা ভর্তি সোনালি চুল। ওই মহিলাকে কেউ উক্ত করলে, বলল গফ, আমার হাতে খুন হয়ে যাবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *